প্রবন্ধ

তাদের সঙ্গে, তাদের এলাকায়

আকিমুন রহমান | 25 Oct , 2007  

socialiteevenings.jpgতাদের সঙ্গে তাদের এলাকায় ঢুকছিলাম। তারা দুজন। তাদের এলাকা ভিন্ন। সামাজিক পরিমণ্ডল, স্বপ্ন, সাধ-আহ্লাদ, শত্রুর ধরন ভিন্ন। পুরুষ তাদের দুজনেরই প্রবল ঘৃণা ও উপহাসের বিষয়। পুরুষ আসে পুরুষ যায় তাদের জীবনে ও দুনিয়ায়। তবে এইসব নিয়ে ছিলো শুরুটা – তাদের এলাকায় ঢোকার মুখে। তাই শুরুতে আমার ছিলো অন্যমনস্ক প্রবেশ ও এগুতে থাকা। তারপর ধীরে যতোই ঢুকতে থাকি, ততো মূক ও বিহ্বল হতে থাকি। এখানে পতন ও উত্থান, মন্দ ও ভালো, পতন ও পচন অবাধ ও উন্মোচিত। প্রচলিত ন্যায় অন্যায় বোধ -অন্য কোনো পৃথিবীর বিষয় যেনো! তাদের জীবনে এইসবই গুরুত্বহীন। সততা শুদ্ধতা সতীত্ব বিষয়ে তাদের মাথাব্যথা কম। ন্যায়-অন্যায় বিষয়ে চালু বিধি বিধান তারা জানে, তবে তাদের দু’জনেরই আছে নিজস্ব ন্যায় অন্যায় বোধ; তারা চলে নিজস্ব ওই ন্যায় অন্যায় বোধ দিয়ে। বিশ্বাস করে শঠে শাঠ্যং নীতিতে ; অনুশীলনও করে। আর দরকারমতো বিপুলভাবে প্রয়োগ করে ওটি পুরুষের ওপর।এবং তাদের নিজস্ব ধরণে সফলও হয় তারা । পুরুষের সমাজে বাস করে, পুরুষের কাছে থেকে বিবিধ সুবিধা নিয়ে পুরুষের সংসারে ও শয্যায় থেকে থেকে – পুরুষকে ঘৃণা করে খুবই। মনে মনে মানে যে, পুরুষ স্থূলবুদ্ধিওয়ালা এক জীব, এদের কাছ থেকে প্রাণ-ভরে যাওয়ার রোমান্স নারী কিছুতেই আশা করতে পারে না। পুরুষর সাধ্যই নেই ওই গূঢ় আবেগকে বুঝে ওঠার। তারা পুরুষের বিগড়াবাইকে শক্ত হাতে ঢিট্ করার বুদ্ধি ও কৌশল – বেশ ভালোরকম রাখে; সেই কৌশল তাদের মজ্জাগত। একজনকে তা তীব্রভাবে প্রয়োগ করতে হয়, কারণ সে বাস করে গোঁড়া ও হিংস্র পুরুষের সমাজে। আরেকজনের এলাকায় হালকা-পাতলা চালে ওই কৌশল প্রয়োগ করলেই চলে। মৃদুমন্দ গতিতে, শিথিল ও নিরুত্তাপ চিত্তে চলতে নড়তে তার অসুবিধা নেই। কারণ তার সমাজে বিধিবিধান আছে,তর্জন গর্জনও আছে তবে তা অনেকটাই শিথিল। অন্যদিকে, জীবনে সহজে সিদ্ধির মেক্ষম উপায়টিও জানা আছে তাদের দুজনেরই। দুজনেই তা কাজে লাগায়। এসব করে উঠে কোনো গ্লানি. শোকতাপ হয় না তাদের।তাদের সকল ক্রিয়াকাণ্ড পাপপুণ্যবোধশূন্যতা – এ সকল কিছুর ভেতর দিয়ে যেতে যেতে মনে হতে থাকে, বাহ্ বেশ তো! বিদ্রোহ বিপ্লব মুক্তি অর্জন – সব দারুণভাবে এনে ফেলেছে তো তারা জীবনে! আর কী! দারুণ! তাদের একজনের সঙ্গে দেখা হয় আমার শোভাদে’র সোশ্যালাইট ইভিনিংস (১৯৮৯)-এ, অন্যজনের সঙ্গে জাঁ পি স্যাসঁ-র প্রিন্সেস (১৯৯২)-এ।

শোভা দে’র সোশ্যালাইট ইভিনিংস উত্তম পুরুষে লেখা। নারীটি পিছু ফিরে দেখছে তার পেরিয়ে আসা জীবনপথ। পথে পথে বহুজনের সঙ্গে তার দেখা ও মেলামেশা হয়। সহোদরা বোনেরা হয়ে যায় অনাত্মীয় অচেনা, মেয়েবন্ধুরা ক্রমে হয়ে ওঠে বান্ধবের অধিক।পুরুষেরা একে একে আসে যায়, চেনা মুখ দূর ঝাপসা হয় ক্রমে। পেরিয়ে আসা জীবনের গল্প বলে নারীটি। তার কোনো নাম নেই, শুধু তার গল্প বলা আছে। নিজের গল্প বলার সঙ্গে সঙ্গে সে বলতে থাকে বান্ধবী অঞ্জলিরও গল্প। তার এলাকায় পুরুষ ঘোর উগ্র একগুঁয়ে দানব নয় বটে; তবে মিচকি মিনমিনে, অনুদার, কুবুদ্ধিতে ভরা মাথামোটা খুব এষানকার পুরুষ। সে, আমাদের নায়িকা, জন্মায় মধ্যবিত্ত পরিবারের তৃতীয় সন্তান হিশেবে, যে পরিবারের সবক’টি সন্তানই মেয়ে। পুত্র নেই বলে পিতার চিত্তে জ্বালা কতোটা – জানা যায় না, তবে মেয়েরা যে ছায়ার মতো হয়ে বেড়ে ওঠে সেটা স্পষ্ট। পিতা কঠোর সব সময়। মেয়েদের শাসন করে শক্ত হাতে, বাঁধা পথের বাইরে পা রাখা সেই পরিবারে কঠোরভাবে মানা। তারপরেও কনিষ্ঠ কন্যাটি, যে এ-উপন্যাসের প্রধান চরিত্র, কলেজ জীবনের গোড়া থেকেই বেপথু হতে থাকে। সহপাঠীর সহযোগিতায় মডেলিং-এ জড়িয়ে পড়ে। এইভাবে পা রাখে সে বোম্বের গল্যামারের ঝলমলানো জগতে। অ্যাড নির্মাতা অঞ্জলির বন্ধুত্ব পায় সে, যে বন্ধুত্ব দীর্ঘস্থায়ী হয়। বাবা-মায়ের তীব্র আপত্তি ও বারণ সত্ত্বেও সে অঞ্জলির সঙ্গে যেতে থাকে বোম্বের নামী-দামী সব রেস্তোরাঁয়। যায় নানা পার্টিতে। তবে সব কিছুই থাকে সে মোহহীন, উদাসীন দর্শক। অংশগ্রহণ করেও অংশগ্রহণকারী হয়ে ওঠা হয় না তার কখনোই। ক্রমে শুরু হয় পুরুষের সঙ্গে নানা লেনাদেনা। সে পরিচিত হতে থাকে বিনোদন জগতের অনেক অনেক পুরুষের সঙ্গে। কারো কারো সান্নিধ্য তার মন তেতো করে তোলে, কেউ কেউ তাকে দেয় বহু চমকপ্রদ কিছু জানা ও শেখার প্রেরণা। সে উদ্দীপ্ত বোধ করে। কলেজ জীবনের শুরুতেই যে ছেলেটির প্রেমে পড়ে সে, তাকে তখন অপরিণত ও অগ্রহণযোগ্য মনে হতে থাকে তার। এবং প্রত্যাখ্যান করে সে তাকে সহজেই। অচিরেই সে পেয়ে যায় অন্য একজনকে, যে ধনশালী, মার্কিন মুল্লুক থেকে ব্যবসা প্রশাসনে উচ্চ ডিগ্রীধারী এবং পিতৃপিতামহের শতাব্দী পুরোনো ব্যবসার মালিক। তাকে বিয়ে করে সে ঝটপট, এবং সংসার শুরু করে। এই বিবাহের ব্যাপারে সে বাছবিচারহীন থাকে, আর বিবাহ পরবর্তী পরকীয়াসম্পর্কের সময়ও থাকে তড়িঘড়িতে; তবে পরের সম্পর্কগুলোর সময় খুব বাছবিচার করে, এই ভাবে সেইভাবে খুঁটিয়েখাটিয়ে দেখে, খুঁত খুঁত করে। সহজে জড়ায় না।তার বন্ধু অব্ধলি কখনো এরকমটা করে না। সে সবসময় বাছবিচারশূন্য, পুরুষ ব্যাকুল। নিজেকে নিয়ে তার জটিলতা কম। অঞ্জলি স্পষ্ট করে প্রকাশ করতে পছন্দ করে নিজেকে। সে খুব জানে যে, ‘আমি নির্ঘাত মরে যাব ভগবান! যদি একলা এই কঠিন দুনিয়া আমাকে সামলাতে হয়! একদম শেষ হয়ে যাবো যদি আমার পাশে কোনো পুরুষ না থাকে!’ (পৃষ্ঠা ৫৭) পুরুষ না থাকার ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে অঞ্জলি, এবং একের পর এক পুরুষ জুটিয়ে নেয়। প্রথম স্বামী অতি বিত্তবান অ্যাবি ওরফে আব্বাসের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে পরে, সে যেতে থাকে একের পর এক-এর পাশে, প্রত্যেককেই দারুণ লাগে তার প্রথমে, তারপর অসহ্য। ইনকাম ট্যাক্স কর্মকর্তাকে ভালো লাগে, কিন্তু বেশিদিন তাকে সহ্য করা যায় না। কারণ সে অঞ্জলিকে শালীনতা শেখানোর জন্য ঠ্যাটা হয়ে ওঠে। এরপর ফরাশি ভাষার মাস্টারের সঙ্গে দেখা হয় অঞ্জলির, আলিয়াঁস ফ্রঁসেসে। জোর রোমান্স চলে বেশ কিছুদিন, তবে শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গেও অঞ্জলির পোষায় না। কারণ অঞ্জলির পাশে শুধু পুরুষ থাকলেই চলে না, সে পুরুষের ভালো রকম অর্থসামর্থ্য থাকতে হয়। ওই টাকার জোর, ফরাশি ভাষা মাস্টারের, বেশি সুবিধাজনক ছিলো না। তাকে তাই সরায় অঞ্জলি। তারপর তার দেখা হয় কুমারের সঙ্গে – যে সমকামী এবং বিসমকামী একই সঙ্গে। তার আছে ধনদৌলত প্রচুর, আছে সমকামিতা এবং অঞ্জলির প্রতি আসক্তি। অঞ্জলি কুমারের সঙ্গে বিবাহিত হয় – তার সমকামিতা ও অন্যান্য উদ্ভটত্ব সহজভাবে মেনেও নেয়। এই অঞ্জলির ওই পছন্দ দ্বিধাটিধা যদিও পছন্দ নয় আমাদের নায়িকার, কিন্তু অঞ্জলিই থাকে তার পাশে সব সময়, সম্পদে বিপদে।

খুব তাড়াহুড়া করে, বড়ো দু’বোনের বিবাহিত হবার জন্য সময় নষ্ট না করেই, নিজে বিবাহিত হয়ে যায় এ-উপাখ্যানের নায়িকা। যদিও সে নিজেকে জানাতে থ াকে যে, সে যে কেন ওটা করেছে – তা তার কাছেই স্পষ্ট নয়। তবে সে ওটা করে সানন্দেই। বিবাহিত হয়ে যায় বলে তাকে তার বোনদের মতো আর পড়ালেখার ঝামেলা পোহাতে হয় না। মসৃণ সচ্ছল জীবন তার নাগালে এখন সব সময়। তবু মনে হতে থাকে, ‘কী তেতো বিস্বাদ মনে হয় আমার এই বিয়েটাকে। মনে হবে না কেন! ভুল মানুষের সঙ্গে ভুল সময়ে ভুল কারণে যা ঘটে – তার স্বাদ এমনই তো হবার কথা!’ (পৃষ্ঠা ৬৫) সে স্বীকার করে যে তার স্বামীটি পাষণ্ড নির্দয় খলনায়ক নয়। তবু একে তার ভালো লাগে না, ভালোই লাগে না। ‘ও ভিলেন নয়, কিন্তু কী গড়পরতা রকম সাধারণ! কিছুমাত্র চমক নেই ওর, ভোতা এক শাদামাটা লোক!’ (ওই) তার সঙ্গে দিন কাটায় সে ক্রোধ বিরাগ কলহহীন। পার্টিতে যায়, পার্টি থেকে আসে। পকেটমানি পায় ও নেয়, বেড়ায় ঘোরে, ঘর-সংসার সামলানোর জন্য পরিচারকদের হুকুম আদেশ দেয়। এইভাবে চলতে চলতে একদিন পরিচয় ঘটে কৃষ্-এর সঙ্গে – পরোয়াহীন বিবেচনাহীন দায়িত্বহীন স্বপ্নভুক কৃষ্-এর জন্য উতলা হয়ে ওঠে সে, স্বামীর শয্যায় থেকেই। কৃষ্-এর সঙ্গে অবাধ দিন ও রাত্রি যাপনের জন্য সে পরিকল্পনা করে লন্ডনে যাবার। অর্থ যোগানদার হচ্ছে তার স্বামী। যায় সে। তবে রোমান্স ঘন হয়ে আসার আগেই ঝামেলা বাঁধায় নির্বোধ স্বামীটা। তার অনুপস্থিতির কালে তাকে লেখা কৃষ্-এর চিঠিগুলো হাতে আসে স্বামীটির এবং কৈফিয়ত তলব করে সে স্ত্রীর কাছে। তবে ঈর্ষা জরজর, ক্রুদ্ধ হয়েও স্ত্রীর সঙ্গে আপোষেই আসে স্বামী শেষ পর্যন্ত। আর কৃষ্-এর সঙ্গে দিনরাত্রি শয্যা ও স্বপ্নভোগ করার পর, নায়িকার কৃষ্কে মনে হতে থাকে পানসে, অসহ্য। সংসারে ফিরে আসে সে। কিন্তু তার সন্তানসম্ভাবনা ঘনিয়ে আনে বিবাহ বিচ্ছেদ, কারণ স্বামীর ঘোর সন্দেহ এ সন্তান তার নয়, এটি কৃষ্-এর । ভ্রূণহত্যা ঘটিয়ে মুক্ত হতে যায় সে এ ভার থেকে, তবে ঘটনা চক্রে সে মুক্ত হয় এমনকি জরায়ুর ভার বহন থেকেও। কারণ সেখানেও অসুখ ধরা পড়ায় ওটির অপসারণ ঘটানো হয়। এই দুঃসময়ে অঞ্জলি সবসময় তার পাশে। সেরে উঠে তাকে শুরু করতে হয় একলার জীবন। স্বামী বিবাহবিচ্ছেদ ঘটায়, বাবা মা তাকে গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক হয়, সে একলা জীবন শুরু করে। সে মুদ্রা উপার্জন করা শুরু করে নিজেকে চালানোর জন্য, তবে সেখানেও সে থাকে ঘোর অপেশাগত। খণ্ডকালীন কাজ করা শুরু করে, কোনো পূর্ণকালীন কাজ তাকে টানে না। খণ্ডকালীন কাজ করে এক থোকে কিছু আয় করে নিয়ে বাকি সময় থ াকতে চায় অবসর উপভোগে। গুরুত্বের সঙ্গে কোনো পেশায় তীব্রভাবে লেগে থাকা ও রয়ে যাওয়া পছন্দ নয় তার একেবারেই। সে চায় অলস অবসরের কাল। নিজের ইচ্ছেমতো জীবনের স্বাদ অঢেল আস্বাদ করে যেতে চায়, আর তাইই করতে থাকে। একা জীবনে বহু পরুষের সঙ্গে যোগাযোগ হয় নতুন করে, কারো কারো সান্নিধ্যে সে সুখও পেতে থাকে। কিন্তু সে দেখে – ওই পুরুষেরা বড়োই উদাসীন, বড়ো ব্যস্ত – নিরর্থক সবকিছু নিয়ে। সে চায় ‘গাঢ় এক রোমান্সের কাল – বেহালার বিষন্ন মধুর ধ্বনি আর গোলাপের উষ্ণ হাস্য’; কিন্তু সঙ্গী পুরুষ না সে চাওয়া বোঝে, না ওইসব কোমল-মধুরের জন্য কোনো সাড়া বোধ করে। পুরুষেরা থাকে পুরুষদের নির্বোধ ও অসাড় প্রাণ নিয়ে, সে বয়ে চলে তার আকুলতা। ওই আকুলতা বোঝার সাধ্য নেই পুরুষের।পুরুষের কাছ থেকে নারীর কী আর পাওয়ার আছে ! লাঞ্ছনা দুর্দশা ছাড়া!

উপন্যাসের শেষে পাওয়া যায় তার এরকম ভাবনা : “কালকের উদ্বেগ ও দুর্ভাবনাগুলো কালকের জন্য তোলা থাক, আজ থাক শুধু বিশ্রামের দিন, তার জন্য।”

princes1.jpgপ্রিন্সেস এক সত্যিকারের রাজকন্যার কাহিনী, যে থাকে ধর্ম ও প্রথার কঠিন প্রহরায়। তার ছদ্মনাম সুলতানা। তার প্রকৃত নাম জানা যায় না। কারণ তার আসল নাম জেনে উঠতে পারলে তার সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবার তাকে দেবে কঠোর শাস্তি। কেননা সে সরিয়ে দিয়েছে পরদা। বলে দিয়েছে গোপন কথা। জানিয়ে দিয়েছে তার দেশের প্রাসাদে প্রাসাদে – ভারী গাঢ় পরদার ওই পাড়ে কী কী ঘটছে – রাজকন্যা রানী রাজবধূর জীবনে। সেখানে পুরুষের জীবন হাজারোরকমভাবে ভোগমণ্ডিত ও অবাধ। পুরুষ এখানে উগ্র নির্দয়। নারীর জীবন এখানে সহস্ররকমভাবে শেকলে শেকলে মোড়ানো। জানা যায় সেই দেশে, কতোরকমভাবে নারীর শরীর অত্যাচারগ্রস্ত ও নিপীড়িত হচ্ছে। কিশোরী নারী সহ্য করছে খৎনার অত্যাচার, সকল বয়সী ভগ্নি বয়ে চলেছে ভ্রাতাপুরুষের হম্বিতম্বি ও নির্দয়তার ও আধিপত্যের চাপ। তরুণীকে মানতে হচ্ছে বীভৎস বৃদ্ধের স্ত্রী হবার নিয়তি, কেননা বৃদ্ধ পুরুষটির আছে প্রভূত অর্থ, সে অনায়াসে উচ্চ পণ দিয়ে কিনে নিচ্ছে কন্যার পিতাকে। সেখানে সকল নারীর জন্যই আছে যে কোনো মুহূর্তে তালাকপ্রাপ্ত হবার সম্ভাবনা এবং তালাকনামা হাতে পিতৃগৃহে ফিরে যাওয়া। আছে উল্টোরকম বিধান, নারী ধর্ষিতা যদি হয়, তবে সেটা তারই অপরাধ। সে পুরুষকে প্ররোচিত করে কিনা তাই ওটা ঘটে। তাই ধর্ষিতা হবার অপরাধে প্রকাশ্যে প্রস্তরাঘাতে মৃত্যু বরাদ্দ নারীর জন্য। একাধিক সতীনের সঙ্গে অবহেলিত অথবা ঈর্ষা বিদ্বেষ ক্র ূরতায় ভরা পরিপূর্ণ জীবন অবধারিত সকল নারীর জন্য। নারীর জীবন ওই সমাজের উচ্চস্তরে যেমন, মধ্য বা নিম্নস্তরেও তেমনি। একই রকম দমবন্ধকর ও পাশব হিংস্র। তার মধ্যে রাজকন্যাদের অবস্থা কিছুটা ভালো – কারণ তাদের পিতাদের আছে অঢেল অর্থবিত্ত, সুইস ব্যাংকে অপরিমিত মুদ্রা ও বিপুল স্থাবর সম্পত্তি। তাদের অন্তঃপুরে কন্যা বধূরা তাদের হুকুম মতো থাকে ও আরাম আয়েস পায়। সুলতানাও পাচ্ছিলো। কিন্তু নিজের স্বভাব দোষেই সে নিজে নিজে অশান্তি ভোগ করা শুরু করে। সে বুঝতে পারে তার সদ্য কিশোর ভাই আলীর দাপট ও প্রতিপত্তির কারণ। আলী সংসারের নবীন পুরুষ, পিতার পরেই আলী। সে রাজপুত্র – তাই সে সকলের মান্য, সকল মনোযোগের কেন্দ্রে সে এবং সকল স্বাধীনতা ভোগের অধিকারী সে। মেয়েদের এইসব পাওয়া নেই। কারণ তারা মেয়ে। এইসবে সুলতানা যতো বিষন্ন হয়, তারো চেয়ে হয় ক্রুদ্ধ। স্কুলে সামান্য লেখাপড়া শেখে সুলতানা এবং বড় হওয়া মাত্র বিবাহের জন্য তৈরি হবার আদেশ পায় সে পিতার কাছ থেকে। তার বড়ো দু’বোনের বিয়ে হয় পিতার পছন্দ ও মর্জিমতো, নিজেদের পছন্দ অপছন্দ কিচ্ছু জানাবার অধিকার তাদের থাকে না। তবে সুলতানা ভাগ্যবান, বিয়ের আগে সে সুযোগ পায় পাণিপ্রার্থী করিমের সঙ্গে পরিচিত হবার। লন্ডনের নামী দোকান হ্যারল্ড-থেকে বিয়ের পোশাক আশাক কেনে সুলতানা, সে খুব পছন্দ করে বলে তার জন্য হলুদ গোলাপ আসে শত শত বিলেত থেকে, পাষণ্ড বাবার টাকায়। সে বাবাকে বড়োই অপছন্দ করে, তবে গোলাপ তাকে উৎফুল্ল করে ভীষণ। বিবাহিত হয় সে, হানিমুনে যায় পশ্চিমা দেশে। জীবন মনে হতে থাকে পরম রমণীয় ও মনোহর। সংসার শুরু করার পর যদিও পায় সে বৈরী শাশুড়ির বিরুদ্ধতা, কিন্তু স্বামীর সঙ্গে নানা জটিলতা সত্ত্বেও সম্পর্ক ভালো যেতে থাকে তার। স্বামী আরো বিত্তবান হয়, তার আয়েস, ব্যসন, হাত খরচের টাকা প্রচুর থেকে প্রচুরতর হয়। পুত্রকন্যা, বিপুল অর্থ, পৃথিবীর নানা প্রধান শহরে ভিলা ও অ্যাপার্টমেন্ট, তিন-তিনটি নিজস্ব বিমান নিয়ে জীবন যখন রমরমা দশায়, তখন সে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং নষ্ট হয় তার সন্তান ধারুণ করার শক্তি। স্বামী তখন মনস্থ করে পুনর্বার বিবাহের, কারণ তার যে বিত্ত অর্থ – সেগুলো ভোগ করার জন্য তার আছে মাত্র তিনটি সন্তান – এক পুত্র দুই কন্যা। এতো অল্প জনসম্পদে নিজেকে দরিদ্র মনে হতে থাকে তার। তাই সে সিদ্ধান্ত নেয় পুনর্বিবাহের।

সুলতানার বিশ্বাস ও আশ্রয়ের পৃথিবী ধূলিস্মাৎ হয়ে যায় স্বামীর বিশ্বাসঘাতকতার এমন সংবাদ শোনামাত্র। তবে সে তার অন্য রাজকন্যা ভগিনীদের মতো নিরূপায় মেনে নেয় না আসন্ন দুর্ভাগ্য ও বিপন্নতাকে। সে কৌশলে পুত্রকন্যাসহ নিরুদ্দেশে পাড়ি জমায়। সুইস ব্যাংক থেকে তুলে নেয় পুত্রের নামে জমা রাখা মুদ্রার সবটা এবং আরো আরো টাকা। অনিশ্চিত ঘুরে বেড়ায় প্যারিস থেকে লন্ডন, লন্ডন থেকে ফ্রাঙ্কফুট। এবং স্বামীকে সামাজিকভাবে হেনস্থা করতে থাকে। ঢিট হতে থাকে স্বামীটা, আর সুলতানা তাতে সুখী হতে থাকে। এইভাবে সে বিপর্যস্ত স্বামীকে অবশেষে বাধ্য করে তার সঙ্গে তার মনমতো একটি চুক্তিতে আসতে। স্বামী যেহেতু কৌশলে সুলতানার সঙ্গে পেরে ওঠে না, অগত্যা ইজ্জত বাঁচানোর জন্য সে স্ত্রীর সঙ্গে চুক্তি করতে সহজেই রাজী হয়। চুক্তিতে সুলতানার একটি শর্ত থাকে যে, করিম, সুলতানার স্বামী, কখনোই পুনঃবিবাহিত হবে না, হলে সুলতানা তাকে তালাক দেবে ও করিমের অর্জিত সকল সম্পত্তির অর্ধেক অধিকারী হবে। সন্তানসহ সংসারে ফিরে আসে সুলতানা, জীবন যেতে থাকে। করিম বৈধ বিবাহ করে না বটে, তবে ক্রমে গভীরভাবে যেতে থাকে পতিতা সংস্রবে। প্রেমহীন দাম্পত্যের দিকে চেয়ে চেয়ে যতোটা অশ্র“পাত করে সুলতানা, তারো চেয়ে বেশি অশ্র“পাত করে তার কন্যাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। অশ্রুপাত করে রাজকন্যা, জীবন ভোগ করে অলস, মন্থর নির্ভাবনায়। কারণ জীবিকা নির্বাহের জন্য কোনো মুদ্রা আয়ের কিছুমাত্র চাপ বা প্রয়োজন তার নেই। মুদ্রার জোগানদাতা হয়ে আছে তার অপ্রেমের স্বামী প্রিন্স করিম। পরিশিষ্টে লেখক জানান যে, সুলতানা দর্শনে সর্বোচ্চ ডিগ্রিও অর্জন করে সংসারধর্ম পালন করতে করতে। তবে ওই ডিগ্রির কোনো কেজো প্রয়োগ তার পছন্দ নয় – কোনো চাকরিতে যোগ দেয়ার কথা সে ভাবতেই পারে না । দরকার নেই তো তার টাকা আয়ের কষ্টকর দুনিয়ায় যাবার! সে তার ডিগ্রিকে কাজে লাগাতে চায় তার স্বদেশী ভাগিনীদের কল্যাণ সাধনের কাজে। সেটা কেমন তা সুলতানা নির্দেশ করে না – সম্ভবত খুব রাজকীয় ও দিব্য কোনোকিছু সেটা । আয়েসী জীবনে বসে যার দিবাস্বপ্ন দেখতে পারে শুধু রাজকন্যারাই।পুরুষেরা খুব খারাপ, নষ্ট ও ভ্রষ্ট যে ওরা এটা বলতে বলতেই সুলতানার ক্রোধসকল ঠাণ্ডাপানি হয়ে যায়। আর কী করবে সুলতানা! টাকাপয়সা ওই নষ্টপুরুষদের যথেষ্ট আছে, বিরক্ত মন আর বিমুখ শরীর নিয়ে ওইগুলো দিয়ে কোনোরকমে জীবন পার করে যাবে সে আর কী!

সুলতানা আর শোভা দে-র মেয়েটির বড়ো কষ্ট। এই মূঢ় পুরুষগুলো যদি আরেকটু কোমল ও দয়ালু হতো, আরেকটু প্রেমিক ও বাধ্য হতো – নারীর জীবন তবে কী এতো কান্নায় ভরে! এমনটা হলেই তো নারী সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটিয়ে যেতে পারতো এদের সঙ্গে। পুরুষের আবেগ কোমলতা না পাওয়ার কষ্টে জরজর তারা! তাই আসল পরিস্থিতি চোখেই পড়ে না। ভাবনায়ই আসে না যে, তাদের চাই সবার আগে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন। নিজের ভার নিজে বইবার অবস্থা ও শক্তি ও সাহস। সেদিকে যায়ই না তারা। আরে ওই পথে চলতে কষ্টের সীমা আছে কোনো! ওই রাস্তায় কে যায়! তার চেয়ে এই পুরুষগুলো আরেকটু ভালোমানুষ হলেই তো হয়! আরেকটু অনুগামী, বিশ্বস্ত, অনুগত ও দয়ালু – তাহলেই তো মেয়েরা সুখেশান্তিতে থাকতে পারে. পুরুষের টাকায় চলতে পারে নির্বিঘ্নে! এই হচ্ছে এই দুই নারীর মনের কথা। বেশ কথা। এখন, পুরুষ এই নসিহত শুনবে কিনা? পুরুষ পাপেতাপে বোঝাই, ঠিক আছে। কিন্তু সে চলছে তার নিজের অর্থে, চালাচ্ছে দুনিয়া। ইতিমধ্যে তার জানা সারা যে, সে প্রভু। প্রভু চলবে অধীনের ইচ্ছেমতো? প্রভুর চলবে প্রভুর ইচ্ছেমতো। অধীন আশ্রিতের কাঙাল মিনতিতে তাকে কেন কর্ণপাত করতে হবে! যে নিজের জন্য নিজেকে দাঁড় করাতে প্রভ ূত অনিচ্ছুক, যে চলে অন্যের অর্থে সে তো অধীন দাস। তার সম্বল কপাল থাবড়ানো শুধু; আর প্রভুর গীবত গেয়ে গেয়ে অন্য লোকের নজর কাড়া; তাতে যদি কাজ হয়! এই ফন্দি মনে আছে তো! দুই নারী- কী দারুণ – সেটাই করেছে। একবারের জন্যও শক্তমতন তাদের দাঁড়ানো নেই – নিজের মুদ্রা নিজে আয়ের জন্য। পুরুষদের মতোই স্বাবলম্বী ও স্বনির্ভর হয়ে ওঠার তাগিদ নেই, পণ নেই, বদ্ধপরিকরতা নেই। শুধু পুরুষের নির্দয়তা নিয়ে আহাজারি আছে, নারী যে কতোরকমভাবে যন্ত্রণা পাচ্ছে তার কথা আছে, শরীরের বাসনা-কামনার খোলা বর্ণনা আছে। আর মনস্তাপ আছে- আহারে পুরুষ কেন আরো সংবেদনশীল হলো না!

আরে, অধীনের অপূর্ব বাসনা তো! প্রভুর কোন দায় আছে যে, অধীনের জন্য অধীনের মনমতো সংবেদনশীলতা সরবরাহ করবে! প্রভু চলবে তার নিজের মতো। এখানেও চলেছে। এই বই দুটো প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পায় ভীষণ পাঠকপ্রিয়তা, বহুকটি সংস্করণ হুড়হাড় বিক্রি হয়ে যায়। বিস্ময় নিয়ে গ্রন্থপাঠ শুরু করি, পাঠ শেষে স্পষ্ট হয়ে যায় কাটতির রহস্য। নারীর বোনা এই আখ্যানে নারী আবার নতুন করে জানতে পায় যে, পুরুষই নারীর পরম। তার ওপরই নারীর ভরসা।সে যদি আর একটু বুঝদার খালি হতো, তবেই আর অশ্র“ ঝরাতো না নারী। দেখো তো! কেন পুরুষ এই সামান্য বিষয়টা খেয়াল করে না! আর পুরুষচিত্ত সন্তুষ্ট হয় তারজন্য নারীর অশ্র“পাত দেখে। খুবই মানবিক করুণা বোধ করতে থাকে দুঃখিনী নারীর যাবতীয় দুর্দশায়। পুরুষের দয়াধর্মের প্রাণ না! দুঃখী হও ধন! আর কোনো দিকে চেয়ো না। ব্যস ! তোমার অধীন থাকা ঠেকায় কে!

দেখো নারীর অধীন থাকার আরো আরো কেকমন গোলকধাঁধা বানানো হয়েছে এখানে; গোলকধাঁধা ছিঁড়ে ফেঁড়ে বেরিয়ে আসার কিছুমাত্র দুষ্টবুদ্ধি কিছুতেই খেলবে না কোনো মেয়ের মগজে এই দুই গ্রন্থ পাঠ করে।

1. Shobha De: “Socialite Evenings’
Penguin Books, 1989
Reprinted: 1992

2. Jean P. Sasson: “Princess”
Bantam Books, London, Newyork
1992, reprinted 1994

akimunrahman@yahoo.com


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.