কবিতা, পত্রসাহিত্য

এজরা পাউন্ড – হ্যারিয়েট মনরো পত্রবিনিময়

আলম খোরশেদ | 1 Mar , 2008  

ভূমিকা
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহর থেকে প্রকাশিত পোয়েট্রি পত্রিকাটি পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইংরেজি কবিতার কাগজ হিসাবে প্রশ্নাতীতভাবে pound.jpg…..
এজরা পাউন্ড (১৮৮৫-১৯৭২)
……..
স্বীকৃত। ১৯১২ সালে শিকাগো ট্রিবিউন পত্রিকার চিত্রসমালোচক হ্যারিয়েট মনরো কালজয়ী এ-পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন। টি এস এলিয়ট-এর বিখ্যাত কবিতা ‘দ্য লাভ সং অভ জে. আলফ্রেড প্রুফক’ এই পত্রিকাতেই প্রথম প্রকাশিত হয়। এজরা পাউণ্ড, ডব্লিউ বি ইয়েটস্, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস, কার্ল স্যান্ডবার্গ, মারিয়ান মুর, জন অ্যাশবেরি প্রমুখ বিশ্বখ্যাত কবির কবিতা এ-কাগজে নিয়মিত ছাপা হত। পোয়েট্রি প্রকাশের অব্যবহিত আগে হ্যারিয়েট মনরো প্রবাসী মার্কিন কবি এজরা পাউণ্ড-এর সঙ্গে যেসব পত্রবিনিময় করেন, সেখান থেকে প্রথম দুটো এখানে পত্রস্থ হল।
-অনুবাদক

অনুবাদ: আলম খোরশেদ

এজরা পাউন্ডকে হ্যারিয়েট মনরো

মহাশয়,
এলকিন ম্যাথিউস তার লন্ডন অফিসে আপনার কবিতার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর থেকে তা আমাকে বিশেষ আনন্দ দিয়েছে, harriate-monroe.jpg…..
হ্যারিয়েট মন্রো (১৮৬০-১৯৩৬)
…….
যার কথা আমি পোয়েট্রি রিভিউ পত্রিকায় মার্কিন কবিতার ওপরে লেখা আমার একটি নিবন্ধে উল্লেখ করতে যাচ্ছি।

আমার প্রবল প্রত্যাশা, আপনি কবিতা বিষয়ক একটি পত্রিকার প্রকল্পে আগ্রহী হবেন এবং তাতে দ্রুত প্রকাশের জন্য আপনার একগুচ্ছ কবিতা পাঠাতেও ইচ্ছুক হবেন।

আপনার একান্ত বিশ্বস্ত,
হ্যারিয়েট মনরো

হ্যারিয়েট মনরোকে এজরা পাউন্ড

মহাশয়া,
আমি আগ্রহী এবং আপনার প্রকল্পটি, আমি যতটা বুঝতে পেরেছি, শুধু সঠিকই নয়, সম্ভাব্য একমাত্র উপায়। আমেরিকায় এমন কোনো পত্রিকা নেই, যা সৎ শিল্পী ও তার শিল্পের প্রতি অপমানস্বরূপ নয় ।

কিন্তু আপনি কি মার্কিন কবিদের শেখাতে পারবেন যে, কবিতা একটি শিল্প, যে-শিল্পের রয়েছে নিজস্ব ভাষা ও ভঙ্গি, যে-শিল্প নিয়ত পরিবর্তনশীল, এবং যাকে টিকে থাকতে হলে ক্রমাগত তার ভঙ্গিকে বদলে নিতে হয়? আপনি কি তাদের বোঝাতে পারবেন যে, এটি গত বছরের পত্রিকায় ছাপা হওয়া সমাজতাত্ত্বিক সন্দর্ভের পঞ্চমাত্রিক প্রতিধ্বনি নয়? হয়তবা। সে যাক, আপনার সামনে অনেক কাজ রয়েছে।

আমি হয়ত চোখে কম দেখি, কিন্তু আমেরিকায় আমার বিগত তিক্ত ভ্রমণে আমি মাত্র একজন সমালোচক ছাড়া আর কোনো লেখককে দেখি নি, যার কবিতা নামক শিল্পটি বিষয়ে উল্লেখ করার মতো কোনো বোধ রয়েছে। যাই হোক, এইসব কটুকথা শুনিয়ে আপনাকে আর ক্লান্ত করা উচিত নয় আমার ।

আপনি অন্তত সেইসব ‘নান্দনিক পত্রিকার’ মতো হবেন না, যারা তথাকথিত ‘জনপ্রিয়’ কাগজগুলোর চাইতেও অধম, কেননা এই নান্দনিক পত্রিকাগুলো আশা করে, লেখকরা সব কষ্ট করবে, অথচ তারা তাদেরকে কোনো সম্মানী তো দেবেই না, উল্টো তাদের দায়বদ্ধতার প্রতি প্রশ্ন তুলে তাদের কৃতিত্বকে খাটো করে দেখাবে।

আমার কথা হল, আপনি যদি কবিতাকে একটি প্রাণবান মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেন, চিত্রকলা, ভাস্কর্য কিংবা সঙ্গীতের মতো, তা হলে আপনি ঘোষণা করে দিতে পারেন যে, এখন থেকে আমেরিকায় আমার যত কবিতা ছাপা হবে (আমার নিজের বইগুলো ছাড়া) সেগুলো কেবল আপনার পত্রিকাতেই প্রকাশিত হবে, অবশ্য তাতে যদি আপনার কোনো উপকার হয়। আমার মনে হয়, আপনি সহজেই পারবেন এদেশের সকল সৎ লেখককে বাকি সব কাগজকে প্রত্যাখ্যান করায় উদ্বুদ্ধ করতে।

আপনি কি ‘আমেরিকান কবিতা’র পক্ষে, না শুধু ‘কবিতা’র পক্ষে? দ্বিতীয়টাই বেশি জরুরি। তবে এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে, আমেরিকা প্রথমটিকেও চাঙ্গা করবে, অবশ্য শিল্পের প্রতি কোনোপ্রকার অন্ধত্ব না দেখিয়ে। কোনো জাতির গৌরব নিহিত এমন শিল্প নির্মাণে, যাকে সে তার উৎসভূমিকে অমর্যাদা না করেই অন্যত্র প্রচার করতে পারবে।

আমি এটা জিজ্ঞেস করছি এই জন্য যে, যদি আপনি অন্য উৎস থেকেও কবিতা পেতে চান, তা হলে আমি হয়ত আপনার কাজে লাগতে পারব। আমার মনে হয়, নিজের কবিতা প্রচারের কাজ লেখকের নয়। তারপরেও আমি প্রলুব্ধ হয়েছিলাম, এতটাই যে, নিজেই একটা ত্রৈমাসিক পত্রিকা শুরু করতে যাচ্ছিলাম। এটা বিপুল স্বস্তির বিষয় যে, আপনার কাগজ ঠিক সেটাই করতে সক্ষম হবে, আমি যা আর্থিক সঙ্গতি ছাড়া একাই করার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছিলাম।

আমার মনে হয় না, আমাদের সেই ফরাসি চরমে যাওয়ার কোনো দরকার আছে, যেখানে একটি কবিতার চারটি ভূমিকা থাকে, আর প্রতি ডজন কবিতার জন্য আটটি করে ধারা তৈরি হয়, যদিও আপনাকে ‘পারি’র প্রতিও নজর রাখতে হবে। যাক, আশা করি আপনার শ্লোগান ‘বেশি কবিতা’ নয়, বরং ‘আরো আকর্ষণীয় ও দক্ষতাপূর্ণ কবিতা’।

এখানে কিংবা ‘পারি’তে শিল্পচেতনায় সবচেয়ে গতিময় মানুষগুলোর সঙ্গে আপনার পত্রিকার সম্পর্ক গড়ে তোলায় যতটা আমার পক্ষে সম্ভব, তবে গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সকলের সঙ্গেই আমার দেখাসাক্ষাৎ আছে যদি কোনো ভূমিকা রাখতে পারি, তবে তা আনন্দের সঙ্গেই করতে সম্মত আছি।

আমার টেবিলে এখন যত লেখা আছে, তার সবই আপনাকে পাঠাচ্ছি–একটি অতিবিশদ ব্রাউনিং-উত্তর ‘প্রতীকবাদী’ কাজ এবং হুইসলার-এর প্রদর্শনীর ওপর একটি আলোচনা, আমি তাকে আমাদের একমাত্র মহৎ শিল্পী বলে গণ্য করি। তাঁর প্রতি আমার এই অনানুষ্ঠানিক কুর্ণিশ, তা যত উচ্চকিতই হোক না কেন, আপনার এই মহতী উদ্যোগের যাত্রামুহূর্তে হয়ত বেখাপ্পা ঠেকবে না। কেননা আমি আশা করি তা আমেরিকার কবিতায় একই ধরনের প্রাণ ও শক্তি সঞ্চার করবে, যেমনটি করেছিলেন তিনি আমেরিকার চিত্রকলায়।

আপনার বিশ্বস্ত,
এজরা পাউন্ড

পুনশ্চ: যে আত্মপীড়ন–এক পর্যায়ে যা অবধারিত বলেই আমার মনে হয়–আমাদের এই মার্কিন পুনরুজ্জীবনকে ত্বরান্বিত করবে, যা আমার কাম্য। এই জাগরণের কাছে ইতালীয় রেনেসাঁকে চায়ের কাপে ঝড় বলে মনে হবে। আমাদের শক্তি ও তাড়না রয়েছে, কিন্তু সেই শক্তি প্রয়োগের উপযুক্ত ক্ষেত্র ও বিচারবোধ অর্জনের জন্য অপেক্ষার পাশাপাশি প্রচেষ্টাও চালিয়ে যেতে হবে।

purbapashchim@yahoo.com


3 Responses

  1. সেলিনা শিরীন শিকদার says:

    ভাল লাগা জানাই।

    সেলিনা শিরীন শিকদার

  2. ভালো লাগলো, আমাকে আগ্রহী করে তুলল; এ ধরনের পত্রবিনিময় আরও অনূদিত হলে উপকৃত হব।

    – অস্ট্রিক আর্যু
    বাঙলায়ন

  3. Md. Ismail says:

    পত্রসাহিত্যে আমাদের নজরুল কম যান না। ব্যাথার দান বা মৃত্যুক্ষুধায় তার ভুরি ভুরি প্রমান মেলে। ঐ পত্রগুলো পেলে ভাল লাগত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.