১৯৭১, স্মৃতি

পদ্মাপারের কড়চা

মীর ওয়ালীউজ্জামান | 28 Feb , 2008  

মার্চের শেষ, ১৯৭১। লাগাতার কার্ফিউ চলছে। শিমূল পান্নুভাইয়ের আস্তানা থেকে নড়েনি। এরি মাঝে খবর এসেছে, ওদের ওয়ারির বাড়িতে তালা দিয়ে সবাই নানাবাড়ি চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কারণ, কার্ফিউ বিরতি বাদ দিয়ে বাকি সময় তখন ঢাকাবাসী যার যার কন্দরে অন্তরীণ, পাড়ায় পাড়ায় রেইড হচ্ছে। ফাঁদে পড়া ইঁদুরের মতো ঢাকাবাসীকে ওরা পছন্দমাফিক তুলে নিয়ে যাচ্ছে।

অপরিসীম আতংক সর্বত্র। যুক্তি, বুদ্ধি কাজ করছে না। শিমূলের অবাক অবাক লাগে, শহরটা অচেনা হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। নিরাপত্তার কোন বোধই যেন আর চেনা নয়। বিশেষ করে ওদের মতো ইউনিভার্সিটির শেষ পরীক্ষা দিয়ে বসে থাকা তরুণেরা তখন অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় পড়েছে, রাতগুলো দুঃস্বপ্নের দখলে।

সায়েন্স ল্যাবে পান্নুভাইদের সেকশনে, ড. আমিনউদ্দীনের গবেষণাগারে আর কতক্ষণ কাটানো যায় ! মায়ের সঙ্গে কথা হল। ওরা চলে যাবেন যে-কোন দিন। কবে আবার আরিচা-গোয়ালন্দ ফেরি বন্ধ হয়ে যায়, সে শংকাও রয়েছে।

পাকিরা বড় বড় শহরে ওদের অবস্থান শক্ত করে নিয়ে দিন সাতেকের মধ্যে ক্রমশঃ বাইরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। আর, চারদিক থেকে তখন অবাঙালি মানুষজন ঢাকায় এসে নামছে, বাঙালিদের ছেড়ে যাওয়া বাড়িঘর দখল করে নিচ্ছে, এরকম কথাও কানে আসছে। ঢাকা কলেজের প্রধান ফটকের উল্টো ফুটে চিটাগাং রেস্টোর‌্যান্টে চা খেতে বসে শিমূল শুনল, ময়মনসিংহ থেকে আসা বিহারিদের একটি দল নাকি ওয়ারি এলাকার বাড়িঘরে উঠে পড়েছে।

পান্নুভাইয়ের সঙ্গে একদিন সকালে আড়ষ্ট শিমূল কাপ্তানবাজার, ঠাটারিবাজার, বনগ্রাম রোডের অবাঙালি অধ্যুষিত এলাকা পেরিয়ে অনধিকারীর মতো, অত্যন্ত নিরীহমুখ অবস্থায় বাড়ি পৌঁছল। সদর খোলা। দরোজার দুটো পাল্লা ভেতরদিকে। উঠোন পেরিয়ে, বারান্দায় চোখ চালিয়ে, অচেনা মানুষজন দেখে শিমূলের সেই রোদেলা সকালেও গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। পান্নুভাই থমকে দাঁড়িয়ে দেখলেন এবং ফিসফিসিয়ে উচ্চারণ করলেন, কি করবে ভাবছো? এভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটা সন্দেহের কারণ হতে পারে। হ্যাঁ, শিমূল আমি ভেতরে যাচ্ছি বলে সে বাড়িতে ঢোকে। অচেনা নারী-পুরুষ-শিশু ওদের বাড়িতে রীতিমতো ঘরকন্না পেতেছে! ও সসঙ্কোচে বারান্দার নিচে উঠোনে দাঁড়িয়ে কোনমতে উচ্চারণ করল, আচ্ছা, ভাই… হাঁ কাহিয়ে, কিসকো চাহিয়ে? সকল অনুমান মুহূর্তে ঘুচল, সেও কেঠো উর্দুতে কথা শুরু করল। মেরা দোস্ত সিমূল ইহাঁ রহতে থে। উওলোগ কিধার গিয়া, মালুম হ্যায় ? হাম তো পারসোই ইধার আয়া, আর্মিকা সাথ। উয়োলোগ বোলা কে হাম ইধার ঠাহার সাক্তে হ্যায়। তো হাম বিবিবাচ্চা লেকে ঘর বাসা লিয়া। আপকা তারিফ? শিমূল হুড়মুড়িয়ে বলে, মেরা এক কেতাব থা মেরা দোস্ত কা পাস, ওহি লেনে আয়ে থে, ব্যস। উয়োলোগকা সামান-উমান কিধার হ্যায়? হ্যায় কুছ? নেহি, নেহি, দেখিয়ে না। আন্দার আইয়ে, মালামাল তো সাব লুটহো গিয়া। এহিঁকা বিহারিওঁনে সব লে গিয়া। ওরা নির্বাক তাকিয়ে দ্যাখে আর শোনে। শিমূলের কান্না পায় দমকে দমকে। ওর অতগুলো নতুন বই, পরীক্ষার পর পড়তে বলে এতদিন ধরে কিনে জমিয়ে রেখেছে। মায়ের অত যতেœর গেরস্থালিসব লুঠ? বিশ্বাস হতে চায়না। বিদ্যুতের ওয়্যারিং পর্যন্ত খুলে নিয়েছে, আব্বা নিজহাতে সারাবাড়ির ওয়্যারিং করেছিলেন। বহুদিন বাদে ছন্নছাড়া শিমূল অস্তিত্বের গভীরে মা-বাবার কথা ভেবে কষ্ট পেল। বেরিয়ে এসে রিকশায় উঠে পান্নুভাই বললেন, চল, চৌগাছি যাব। কবে? মানসিক প্রস্তুতি শিমূলের ইতিমধ্যে নেয়া হয়ে গেছে। চল, অফিসে গিয়ে আমিন সাহেবকে বলি, একটা দরখাস্ত ফেলে চল ঢাকা ছাড়ি।

যথারীতি পরদিন সকালে দু’ভাই দুটো হাত ব্যাগে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিসপত্র নিয়ে আলির ভরসায় সংসার, বইপত্র রেখে নিউমার্কেট থেকে আরিচার বাসে চাপল। পান্নুভাইয়ের বাসায় শিমূলের বেশ ক’প্রস্থ শার্টপ্যান্ট, পাজামা পাঞ্জাবি ছিল। আলি সেগুলো রাতেই ইস্ত্রি করে ব্যাগে ভরে দিয়েছে। শিমূলের মাথাটা হালকা লাগছে। একেবারে চিন্তাশূন্য। আচ্ছা, হাসানটার কোন খোঁজখবর নেই কদিন। তুমি কি ওর লেইটেস্ট অবস্থান সম্পর্কে কিছু জান? পান্নুভাই ক্যাপস্ট্যান ধরিয়ে টান দিতে দিতে জিজ্ঞেস করেন। হ্যাঁ, ও শান্তিনগরে শাহজাদ ফরদাউসের পুকুরওলা কটেজে উঠেছে। অপেক্ষাকৃত শান্ত এলাকা ওটা এখন। ফিরে এসে ভাবছি কাঁঠালবাগানে মেজ মামার বাংলোটা আমরা ভাড়া নেব। দেবেন তো মামা? শিমূলও দেখাদেখি সিগ্রেট ধরিয়ে বলে। তোমাকে মামা রিফিউজ করবেনা বোধহয়। বাড়িটা তো খালি পড়ে রয়েছে কয়েক মাস। বর্তমান অবস্থায় তুমি চাইলে হয়তো দিয়ে দেবেন পান্নুভাইয়ের কন্ঠে নিরাসক্তি।

মামার সঙ্গে পান্নুভাইয়ের সম্পর্ক অনেকদিন যাবতই একটু টানটান। ঐযে পান্নুভাই গ্র্যাজুয়েট হতে অনাগ্রহী আর মামা ভাগ্নেকে গ্র্যাজুয়েট হিসেবে দেখতে চান দ্বন্দ্বই সেই সাধ-অসাধের দ্বন্দ্বই এর কারণ। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের বেতন থেকে টাকা বাঁচিয়ে অর্থাৎ হুইস্কি সেবনাদি কাট্ করে শিমূলও পান্নুভাইয়ের পরীক্ষার ফিজ জমা দিয়েছে একবার। উনি শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় বসেননি। মানিকগঞ্জ বাস্ স্টপে নেমে শিমূল গরম-লাল্চে ভাজা সিঙাড়া কিনল এক ধোঙা। বাসে যেতে যেতে খাবে। কন্ডাকটর এবং নিত্যাযাত্রীদের সঙ্গে ইতোমধ্যে আলাপ জুড়েছেন পান্নুভাই। আরিচা ঘাটের কি অবস্থা। আর্মি এপথে সাভার পেরিয়ে কবে নাগাদ আসতে পারে। ফেরি না পেলে কিভাবে পদ্মা পার হওয়া–এইসব বিষয়ে প্রশ্ন করছে নির্দোষভাবে, জানার জন্য কেবল। ওদের যেহেতু কোন পরিকল্পনা নেই এযাত্রায়–একটি বিষয়ে দু’ভাই একমত হয়েছে গতরাতে পাঁচমিনিট সিরিয়াসলি ভেবে। চৌগাছি যাবার পথে তারা যতগুলি সম্ভব আত্মীয়বন্ধুর বাড়ি ঘুরে যাবে। মোটামুটি ছক যেটা দাঁড়িয়েছে, তা হল–নদী পেরিয়ে রাজবাড়ি, তারপর কালুখালি, সেখান থেকে বালিয়াকান্দি, নাড়–য়া হয়ে গড়াই গাঙ পেরিয়ে চৌগাছি পৌঁছনো হবে।

আরিচা পৌঁছেছিল ওরা দুপুরের পর। বেশ খিদে পেয়েছে তখন। পান্নুভাই খাবারের দোকানগুলো দ্রুত সার্ভে করে নিয়ে সন্দিহান গলায় বললেন, এইসব খাওয়া যাবে? খুউব যাবে। বলে শিমূল ফাঁকা দেখে একটির দিকে এগোল। পান্নুভাই অগত্যা পিছু-পিছু। দুজনেরই ব্যাগকাঁধে। দোকানদার এগিয়ে এলো, আসেন, পদ্মার তাজা ইলিশের ঝোল, খাসির মাংস…লাউঘন্ট ইত্যাদি ইত্যাদি। শিমূল বসে পড়ে লম্বা বেঞ্চে। সিগ্রেট ধরায়। পানি খায় একগ্লাস। তখনকার দিনে যেখানে-সেখানে পানি খাওয়া যেত। এতরকম সংক্রমণের ভয় ছিল না। গরম ইলিশের ঝোল, ধোঁয়াওঠা মোটাচালের ভাত, উচ্ছেভাজার সাথে মাসকলাইয়ের ডাল দাও দুজনকে, শিমূল বলে যায় আর কাঠের পাটাতনের নিচে পদ্মা-যমুনার মিলিত ছলাৎ ছলাৎ শব্দ শোনে। দোকানের ছেলেটা ঠিকঠাক খাবার সাজিয়ে দিয়ে দাঁড়ায়, কিছু লাগলে বলবেন। অবশ্যই, বলে শিমূল ভাতের থালা টেনে নেয়, আচ্ছা মহাজন সাহেব, ফেরি-টেরি তো কিছু দেখছি না এপারে। আমরা বাড়ি যাবো ক্যাম্বা? কেন, নৌকায় যাবেন, তবে আজ আর হবে না, এই বিকেলে আর এই ঝড়ের মতো বাতাসের মদ্যি আর নৌকো ছাড়বেনানে। কাল সকালে যাবেন। দোকান মালিকের নিশ্চিন্ত উত্তর। মাছটা টাটকা, পান্নুভাই মন দিয়ে খেতে খেতে বলেন। আর রান্নাটাও চমৎকার, বলে শিমূল আবার মহাজনকে জিজ্ঞেস করে থাকবো কোথায়? এখানে তো হোটেল-ফোটেল দেখছি না। কেন? আমার এখানেই থাকবেন, পিছন দিকে রুম আছে। স্মার্ট উত্তর শুনে শিমূল আঁতকে ওঠে, নদীর ওপর? সারারাত ঢেউভাঙা শুনবো? ঘুম হবে না আমার। হবে, হবে, আমরা গুমাই না? নিশ্চিন্ত থাকেন, সকালে উঠাইয়া নাশতা বানাইয়া খাওয়াইয়া নৌকা ধরাইয়া দিমুনে। আর আপনাগো নাক ডাকলেই ব্যাগ আর টাকা পয়সা হাতাইয়া, গলা কাইট্রা, নদীতে জলাঞ্জলি দিমু টাপুস্ আর টুপুস্ শব্দে ছলাৎ ছলাৎ জলে ভাইসা যাইবেন, টেরও পাইবেনা না, পান্নুভাইয়ের নিচুগলার উচ্চারণ। দূর, আপনিও একজন কল্পনাপ্রবণ মহাজন বটেন। এই এগারো বছর বৈজ্ঞানিক গবেষণা করে কি লাভ হল ? শিমূল উচ্চস্বরে হতাশা নিবেদন করে, হাত ধুতে উঠে পড়ে। ফিরে এসে বসতেই পান্নুভাইয়ের প্রশ্নাঘাতমনে হচ্ছে তুমি কুড়িতেই বুড়ো হয়ে গেছ মানবজমিন চষে চষে, নাকি? তা খানিকটা বলতেই পারেন, শিমূল আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে খানিকটা দাবির সুরেই বলে, ছোটবেলা থেকেই যতটা একা-একা ঘোরা ফেরা করতে পেরেছি আর বিশেষ করে, গত চার-পাঁচ বছরে ইউনিভার্সিটি হলে আবাসিক থেকে আর বাউন্ডুলে বন্ধুদের সঙ্গে যখন যেখানে ইচ্ছে সফর করে, দুর্যোগে ত্রাণ বিলিয়ে, কিছু মানুষ তো দেখা হয়েছে। তাহলে, ঢাকা ফিরবে না আপাতত:। তাই তো ঠিক করলে? প্রশ্নই ওঠে না পিছু ফেরার, শিমূল বলে, আর বাধা পেয়ে এখন আরও বেশি যেতে ইচ্ছে করছে পদ্মা পেরিয়ে জানা-অজানায়। ঠিক আছে, ভাইজান। দোকানদারকে বলেন পান্নুভাই, আমাদের ঝোলাঝুলি আপনার খবরদারিতে থাকুক, আমরা ঘুরে ফিরে দেখি চারদিকটা।

আরিচায় কখনো এরকম একবেলা বসে থাকার সুযোগ তো ঘটেনি আগে। শিমূল সাঁতার জানেনা মোটেও। তাই বড় নদী দেখলে ওর শরীর ছ্মছ্ম করে। মনে হয় ওই প্রবল, বিশাল, অস্থির জলসম্ভারের আছে সকল কিছু ভাসিয়ে নেবার, নাকানি চুবানি খাওয়ানোর সুপ্ত পেশল শক্তি। কিন্তু নদনদী বোধ হয় মানুষের অসহায়তা বিষয়ে জেনে গেছে, তাই ওরা প্রায়শই মঙ্গলময় এক বিস্ময়, এক সহায়তাকারীর ভূমিকাই পালন করে কেবল। মনে মনে পদ্মার বিশালতা আর শক্তির সম্মুখে প্রণত হয় সে।

ঘোরাফেরা শেষে, সন্ধ্যের পর বাতি জ্বালা হলে, দু’ভাই বইখাতাকলম নিয়ে দু’টো বেশ্চির দখল নেয়। ডায়রি লেখা, ‘দেশ’ পত্রিকা পড়া আর ফাঁকে ফাঁকে চা খেয়ে গল্পগাছা করে কখন দশটা বেজেছে, ওরা টের পায়নি। এরমাঝে দু’চারজন নিত্যখদ্দের এসে খেয়ে গেছে কোন ফাঁকে। শিমূল ওদের জলে ভাসা শোবার ঘর দেখে এসেছে ইতোমধ্যে। টয়লেট যেমন এলেবেলে ভেবেছিল, তারচেয়ে শক্তর্পেক্তি ও গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা। ওরা যথারীতি খেয়ে উঠে পেছনের ঘরে চলে যায়। সামনে দোকানমালিক তখনো জেগে বসে আড্ডা দিচ্ছে পাশের দোকানির সঙ্গে হেঁকে-হেঁকে, এদোকান-ওদোকান। কাঠের চৌকিতে চিত হবার পর দোকানের ছেলেটি মশারি টানিয়ে গুঁজে দিল, জিজ্ঞেস করল, সকালে কয়টায় উঠবেন? নাশতা দিমু কহন? যখন উঠি, তখন, কোন তাড়াহুড়ো তো নেই, পান্নুভাই বলেন, নাকি নৌকো ছেড়ে দেবে আমাদের না নিয়েই? আমি কই, স্যার সকাল-সকাল উইট্যা নাস্তাপানি খাইয়া রেডি অইয়া থাকবেন। নৌকা ছাড়বো আমাগো দোকানের পাশ থিকাই। বাত্তিডা নিবাইয়া দিমু? না না, শিমূল বলল, বাততি জ্বলুক। আমি অন্ধকারে ভয় পাই, আর এখানে তো আবার পদ্মা নদীর ছলছলাৎ এই বিছানার নিচেই। থাক্, আলো আমি নিবিয়ে দেব পরে। দরজা টেনে ভেজিয়ে দিয়ে ছেলেটি চলে গেল।

সকালে প্রাতঃকৃত্য সেরে নাশতা খেয়ে নৌকোয় উঠতে সাড়ে আটটা বাজল। যাত্রী একশোর মতো। মস্তোবড় পাল তোলা হল। হাল ধরে বসে আছে দু’জন। এরতরিয়ে নৌকো কোনাকুনি নদী পাড়ি দেয়ে গোয়ালন্দ পৌঁছে গেল।

নদীর বাতাসে নাশতা হজম, চলো গোয়ালন্দের এগরোল-চা খেয়ে একটা রিকশা নেব, বলে পান্নুভাই ঘাটের খাবার দোকানের ভেতরে ঢুকে যান। শিমূল অনুসরণ করে। প্রস্তাবটি তারও মনমতো বটে। খাওয়া হল ভাল রিকশা পেতে তেমন কষ্ট হল না। শিমূল কেবল একবার হেঁকে জিজ্ঞেস করল, রাজবাড়ি বাড়ি কার? রাজবাড়ির রিকশা কুন্ডা? স্ট্যান্ডের দু’তিন জন সমস্বরে বেজে উঠল, আসেন, রাজবাড়ির গাড়ি এইডে, যাবেন কনে, আমি রাজবাড়ির ইত্যাদি ভরসাবাণী উচ্চারণ করে। মজবুত দেখে বেছে নিয়ে একটিতে শিমূল উঠে বসল। দরদাম করলে না? পান্নুভাই নিচুকন্ঠে জিজ্ঞেস করেন উঠতে উঠতে। কি হবে, দু’পাঁচ টাকা বেশি দেব অথবা ও কম নেবে, এই তো? শিমূল এরিনমোরের র্কৌটো খুলে ইতোমধ্যে বড়োতামাকের বিড়ি ধরিয়েছে। লম্বা টানে ফুসফুস ভরে ধোঁয়া টেনে নিয়ে, দম আটকে মিনিট দুই কাটিয়ে দিল। চারিদিক নিঃশব্দপ্রায়। শুধু প্লাডেল মারার ক্যাঁচকোঁচ। তামাকসেবন শেষ না হতেই শিমূলের বেশ মাতোয়ারা দশা। সে রিকশাওয়ালার সঙ্গে আলাপ জুড়ল। নাম জামাল। স্টেশন রোডে বাড়ি। সেই বিহারি চমচমওয়ালা আছে তো, জামাল? শিমূলের প্রশ্ন শুনে জামাল ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। ও অবাক হয়েছে। জি স্যর, আপনি বিহারির চমচম খাইছেন ? ক-অ-অ-তো। আউয়াল মামার বাড়ি আলিই তো খাওয়া পড়ে। শিমুলের ঝটিতি জবাব। চেন আউয়াল ডাক্তাররে? আমাগের মামা হন। চিনিনে আবার, জামাল বলে, আমাগের বাড়ির কারো জ্বরজারি হলি তো ওই আউওল ডাক্তারের কাছেই যাই। খুব বালো ডাক্তার। মদ্যি মদ্যি টাকাপয়সাও দিয়ে ওঠা হয় না। হাতে না থাকলি আর কি । কিন্তু ওষুদ ডাক্তার দেবেই। শিমূল, পান্নু দুজনেই মনে মনে প্রীত।

আউয়াল মামাকে ওরা ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছে তো, মনে হচ্ছে, সেই আগের মতোই দিলখোলা, সেবাপরায়ণ আর খেয়ালি রয়ে গেছেন মানুষটা। তবে এসেনশিয়ালি মফস্বলের মানুষ। আবার সফিসটিকেশনও মামাকে ছোঁয়, যখন তাঁর উপন্যাসে উনি এংলো-ইন্ডিয়ান নায়িকা আর মুসলমান যুবকের রোমান্স বিষয়ে কলম চালান। লেখার বাতিক মামার বহুদিনের। শিমূল বাবার কাছে গল্প শুনেছে, দেশভাগের আগে চল্লিশ দশকের শুরুতে, আউয়াল মামা, তার পিঠোপিঠি ছোটভাই ওয়াহাবশিমূলদের মেজ মামা, ছোট ভাই আতর মামা আর শিমূলের বাবা মীর আমজাদ আলী কোলকাতায় পার্ক সার্কাসে বসবাস করতেন। আমজাদ কাজ করতেন বাটা শ্যূ কম্পানিতে, আউয়াল ও আতোয়ার (শিমূলদের আতর মামা) কাশীপুর গানসেল ফ্যাকট্রিতে আর ওয়াহাব ওরিয়েন্ট এয়ারলাইন্সে। তিনভাই ও হবু ভগ্নিপতি (আমজাদ যুদ্ধের পরে শিমূলের মা বকুলকে বিয়ে করেন ১৯৪৬ সালে) মিলেমিশে প্রথম দিকে মেস করে থাকতেন। বিয়ে করে একেকজন আলাদা বাসা ভাড়া করে উঠে যান। আমজাদ সবার শেষে বিয়ে করেন। তবে চার পরিবারের মধ্যে দহরম-মহরম ক্রমশ: বেড়েছে বৈ কমেনি।

রাজবাড়ি শহরে পৌঁছে ওরা সামনে পেল সেলিম মামার বাড়ি, আউয়াল মামার বাড়ি পৌঁছনোর আগেই। দেখি কি হয়, বলে শিমূল লাফিয়ে রিকশা থেকে নেমে মামাবাড়ির সদরে করা নাড়ে। এক মহিলা দরজা খুলে দিয়ে জড়োসড়ো হয়ে একপাশে সরে দাঁড়ালেন, অমনি বারান্দায় সেলিম মামার নেয়াপাতি ভূঁড়িটি ভাসছে আর ঢেউ তুলে তুলে ডাকছে, শিমূলের মনে হল। পেছনে না ফিরে, পান্নুভাইকে সে চেঁচিয়ে ডেকে ভেতরে ঢুকে গেল। দেখল, ঠিকই মামার লুঙি ভুঁড়ির নিচে বাঁধা, আর মামা হাসছেন হা হা করে। আয়, আয়, সঙ্গে পান্নু বুঝি, বেশ বেশ, তা বু কেমন আছেন? দুলাভাই? রবুরা সব ভাল তো? অত প্রশ্নের উত্তর দেব কিভাবে? আগে চা-টা খাই, মামা, তারপর ধীরে সুস্থে বলছি, শিমূল মামাকে থামায় আপাতত। ও হ্যাঁ, বুয়া, আমার ভাগ্নেদের চা-নাস্তা দাও জলদি। পান্নু, মামা, এসো, এসো, বোসো, তোমাদের মামী আবার গেছেন ঢাকায়। এই দুর্যোগে ঢাকায়? মামী? কবে গেলেন? কি ভাবে? শিমুলের অনুসন্ধিৎসা হঠাৎ প্রবল হয়। না, না, সে গেছে, মা হবে তো, তাই মাসখানেক আগে আমিই রেখে এসেছি। তোমাদের তা বলে কোন অসুবিধে হবে না, বুয়া চমৎকার রাঁধে। তোমাদের মামী থাকলেও ওই রাঁধতো। সেলিম মামার বরাভয় শিমূলের অস্থিরতা কমাতে মোটেই সহায়ক হয় না। আমরা কি কেবল আপনার বাসায় শুয়ে, বসে আর খেয়ে এবছর কাটিয়ে দেব ভেবেছেন নাকি? পদ্মার এপারে যত আত্মীয়কুটুম রয়েছে আমাদের, মানে ছোটবেলা থেকে যাদের গল্প শুনে এসেছি, এবার ইচ্ছেমতো সব জায়গায় যাব, দেখব, চিনব সকলকে। শিমূল থামে। চায়ের কাপ তুলে চুমুক দেয় আর গরম পেঁয়াজুতে কামড় বসায়। পান্নুভাই চুপচাপ চা খান, সিগ্রেট ধরান। শিমূল প্যাকেট খুলে মামার সামনে এগিয়ে দিলে উনি রীতিমত আহতমুখে বলেন, তুমিও ধরেছো? পরক্ষণেই পান্নুভাইয়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্রয়ের সুরে বলেন, তোমারই কাজ এটা, বুঝতে পেরেছি। না বাপু, আমি ছেড়ে দিয়েছি। তারপর থেকে ভাত খাওয়া বেড়ে গিয়েছে, দেখছনা ভুঁড়ি? সেলিম মামা ভুঁড়িতে আদর বুলোতে থাকেন। আরও একটা কি যেন বেশি বেশি খাচ্ছেন আপনি শুনেছি, পান্নুভাই মুখ খোলেন। সেটা আবার কি, বাবা, মামা মধুরকণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন। ঘু-উ-উ-ষ । পান্নুর নির্ঘোষ শুনে মামা ভুড়ি সামলে দ্রুত উঠে টয়লেটে গেলেন।

নেহাৎ তুমি চেঁচিয়ে ডেকে নামালে, নইলে এখানে আমার আসার ইচ্ছে ছিল না, বড়মামার ওখানেই যেতাম সোজা। পান্নুভাইয়ের ভাবলেশহীন মুখাবয়ব দেখেই শিমূল সেটা বুঝতে পারছিল। ঠিক আছে, আজকের দিনটাই তো, কেটে যাবে, কাল সকালে সেলিম মামা অফিসে যাবে, আমরাও বেরোব। মামা টয়লেট থেকে ফিরলে ওরা উঠল, স্নান সারল, খেল, দিনদুপুরে ঘুমোল। উঠে চা খেয়ে মামার ঘরে উঁকি দিয়ে, নিদ্রিত মামাকে রেখে রাস্তায় পা দিল। তাজা বাতাস সেবন ও জোর কদমে হাঁটা হল ঘন্টা আধেক। টুক্ করে একফাঁকে শিমূলের বন্ধু হালিমের বাড়িতে ঢুকে পড়াও গেল। একটু দূরেই আউয়াল মামার বাড়ি।

হালিম সৌখিন ফোটোগ্রাফার। ওদের বসার ঘরে ফ্রেমে বাঁধানো হালিমের তোলা দারুন সব ল্যান্ডস্কেপ আর পোট্রেট। মুগ্ধ হয়ে দেখছিল ওরা। হালিম এলো, শিমূলের সঙ্গে কোলাকুলি করে পান্নু ভাইয়ের করমর্দন করল। আচ্ছা, হালিম, আউয়াল মামা কি শহরে? নাকি বালিয়াকান্দিতে গেছেন? একটু ডিসক্রিটলি খবর নিবি? শিমূলের অতগুলো প্রশ্নের জবাবে হালিম শুধু বলল, দশ মিনিট সময় দে আমাকে। বলে ভেতরবাড়িতে ঢুকে একটু পর ট্রে হাতে ঢুকল আবার। কাচের বাটিতে মুড়ি আর পানির গ্লাস। তুই আবার মুড়ি-ফুড়ি আনলি কেন? আমরা আধঘন্টা আগেই একদফা জলযোগ সেরে বেরিয়েছি ফুড কন্ট্রোলারের বাড়ি থেকে, শিমূল নিবেদন করল। আরে খা, খা, ভাই আপনি নেন। ওর কথা বাদ। না দেখেই সাত কাহন, বলে হালিম ওদের হাতে মুড়ির বাটি তুলে দিল, সেও নিল।

শিমূল চামচ চালাতে গিয়ে বুঝল, আটকে যাচ্ছে মুড়ির বাটিতে। মুড়ির নিচে কি রে, হালিম? এহ্ হে যা ভেবেছি, এরকম বটের আঠার মতো খাদ্য দুধকদু না হয়ে যায় না, বলে শিমূল এক চামচ অমৃত-মুড়ি মুখে চালান করে চোখ বুঁজল। এরকম গোলাপজল গন্ধের দুধকদু কেবল মা রাঁধে আর চৌগাছি গেলে খেতে পাই, আহ্। হালিমের মা চা নিয়ে আসেন ওই সময়। কথা না বলে খাও বাবা, আর এক বাটি দেব তোমাকে? খালাম্মার অফার শিমূল সাথে-সাথে লুফে নেয়। বলে, পান্নু ভাইয়ের কথা জানিনা। আমার জন্য তো সারাবাংলায় মায়েরা বসে থাকেন, কখন শিমূল আসবে আর পাত পাড়বে। এই যেমন এখানে জুটছে। প্লিজ রিফিল, খালাম্মা বলে সে শূন্য বাটি এগিয়ে দেয় হালিমের মায়ের দিকে। উনিও ঝটিতি ভেতরে গিয়ে আরো বড় বাটিতে দুধকদু আর মুড়ি এনে সেন্টার টেবিলে রাখেন। চামচ শিমূলের হাতে দিয়ে চলেন, তোমরা যার যেমন ইচ্ছে এবারে এই বাটি থেকে নিয়ে খাও, আমি দেখি। অগত্যা পান্নুভাইও চা শেষ করে আরেক চামচ খাবার মুখস্থ করেন। ইতোমধ্যে কুসুমহালিমের ছোট বোন আউয়াল মামার বাড়ী ঘুরে এসেছে। খবর দিল, ডাক্তার কাকা তার ডিসপেন্সারি পরিদর্শনে বালিয়াকান্দি গেছেন। মেয়ে লিলিও সঙ্গে গেছে। খেতে খেতেই শিমূল মনে মনে ছক কষে। কাল সকালের ট্রেনে কালুখালি যাবে। সেখানে একদিন থেকে বালিয়াকান্দি রওনা হবে।

ভারী নাশতা হয়েছে। অতএব আবার হাঁটতে হবে। নইলে সেলিম মামার রাঁধুনির কেরামতি তো মাঠে মারা যাবে। তা হবার নয়। খালাম্মার পায়ে চুমু খেয়ে শিমূল বিদায় নেয়। হালিমও ওদের সঙ্গী হয়। এদিক-ওদিক আরও ঘন্টাখানেক ঘুরেফিরে ওরা বাড়িমুখো হয়। রাত হচ্ছে। হালিম বুকে বুক মিলিয়ে নির্জন রাস্তায় টিমটিমে হলদে আলোর নিচে হেঁটে চলে একা নতমস্তকে।

শিমূল একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে মাঝে-মাঝে দেখা হওয়া স্বভাব-ফোটোগ্রাফার বন্ধুর চলন দেখল। তারপর পা চালিয়ে পান্নুভাইয়ের পার্শ্ববর্তী হল। চৈত্রের মাঝামাঝি সময়। পথের পাশে পুকুর-ডোবার ওপরে হালকা কুয়াশার পর্দা নামতে দেখে অবাক পান্নুভাই উদাত্ত গলায় রূপসী বাংলার কবিতা একের পর এক আবৃত্তি করে চলেন।

সেলিম মামা বসে ছিলেন ওদের অপেক্ষায়। ওদের খিদে নেই মোটেও। কিন্তু খেতে বসতে হল। খাচ্ছিস না তোরা যে মোটে। ব্যাপার কি? কোথায় যাওয়া হয়েছিল ? মামার প্রশ্নের উত্তরে শিমূল বলল, হালিমদের পাড়ায়। ওর মা আবার দুধ-কদু খাওয়ালেন জোর করে। একটু বেশিই খেয়েছি আমি। পান্নুভাই খোঁচালেন, না মামা, ও চেয়ে নিয়ে দু’বাটি সাবাড় করেছে। এদিকে যে আপনি ভাত বেড়ে বসে আছেন, সেকথা ভাবলো না একবার। আর আমি দেখেন না মাংস খেলাম কতখানি! যা রেঁধেছে আমাদের মাসী। আহ, বলে ঢেঁকুর তোলেন লম্বা।

খেয়ে, অল্পক্ষণ আড্ডা চলল। সকালে মামা অফিস যাবেন। ওরাও বালিয়াকান্দি রওনা হবে। বিদায় নেয়া থাকল। সকালে উঠে, স্নানাহার সেরে তৈরি হতে সাড়ে ন’টা বাজল। ওরা ঠিক করল, রাজবাড়ি রেলস্টেশনে গিয়ে বসে থাকবে। কালুখালি যাবার ট্রেন সামনে এলেই উঠে বসবে। স্টেশনে পৌঁছে শুনল, যে ট্রেনটা দাঁড়িয়ে প্ল্যাটফমের্, সেটাই ওদিকে যদ্দূর সম্ভব, যাবে। টিকিট কাটতে গেছে শিমূল, টিকিটবাবু ভদ্রলোকটি হাসতে হাসতে বলেন, তখন তো আর কেউ টিকিট কাটে না। স্বাধীন বাংলা কিনা, হা-হা-হ। তবুও আপনার টিকিট চাই? এই নিন কালু খালির দু’টো টিকিট, সেকেন্ড ক্লাসের দিলাম। দাম কিন্তু ইন্টারক্লাসের রেখেছি। হা-হা-হা। শিমূলও হাসতে হাসতে ফিরে, পান্নুভাইকে বলে, চলেন উঠি গাড়িতে। স্বাধীন বাংলায় এসে পড়েছি আমরা।

ট্রেন ছেড়ে দেয়। শিমূলের মনে পড়ে, দশ-বারো বছর আগে যখন প্রতিবছর মা ওদের নিয়ে মামাবাড়ি আসতেন, তখন গোয়ালন্দের পর থেকে সব রেলস্টেশনের নাম মুখস্থ বলতে পারত। বেলগাছি, সূর্যনগর … আবার কালুখালি জংশনে গাড়ি বদলে ব্রাঞ্চ লাইনে রামদিয়ার রামের মট্কা খেতে খেতে যাওয়া হত। ওদিকে কুষ্টিয়া বড়খালার বাড়ি যেতে পাংশা, খোক্সা, মাছপাড়া, কুমারখালি..। খোকসা কিংবা মাছপাড়ায় নেমে ঘোড়গাড়ি চেপে জানিপুর ঘাটে নৌকায় ওঠা হত কোনবার হয়তোনানাভাবে নানাবাড়ি যাওয়া আসা হত সেকালেশিমূলের মায়ের চলনদার অর্থাৎ মামা বা খালু যেভাবে সুবিধে মনে করতেন, সেভাবেই ভ্রমণ করা সঙ্গত ছিল। সব পথই ওদের জন্য সমান উত্তেজনা ও রোমাঞ্চ বয়ে আনত।

কি ভাবছো অত? পান্নুভাইয়ের প্রশ্নে শিমূল নড়েচড়ে বসে। এই পথের কথাই ভাবছিলাম, ছোটবেলা থেকে তো আমাদের যাওয়া-আসা এপথে। দেখলেই চেনা চেনা মনে হয় সবকিছু। পুরনো মহীরুহ অব্দি। ঠিকই বলেছো তুমি, ওই বড় প্রাচীন গাছগুলো দেখবে ভূমি জরীপ ম্যাপে সেই কবে থেকে চিহ্নিত হয়ে আসছে। কেউ কেটে না ফেলা পর্যন্ত থাকবে, পান্নুভাই কথা বলতে বলতে সিগ্রেট ধরান। শিমূল জানালায় চিবুক রেখে দূরে তাকিয়ে থাকে। অপু-দুর্গার ট্রেনের সমান্তরালে ছোটা দৃশ্য মনে পড়ে। অপুর কচি মুখ মনশ্চক্ষে দেখে, দুর্গার কথা মনে করলে চোখ ভিজে আসে, দৃষ্টি ঝাপসা হয়। পঞ্চাশ দশকের শেষ দিকে ‘পথের পাঁচালী’ সরকারের তথ্য দপ্তর স্কুলে স্কুলে পর্দা টানিয়ে দেখিয়ে বেড়াত।

শিমূল তখন পাতলা খান লেইনে থাকত। গলির মাথায় নর্থব্র“ক হল রোডে পড়বার আগেই ডানদিকে মুসলিম হাই স্কুলের টানা উঁচু পাঁচিল। বাঁয়ে পাতি রেস্তোঁরা, মুদি দোকান আর র‌্যাশান দোকান। পাড়ার ডানপিটেদের সঙ্গে মিলে এক সন্ধ্যায় স্কুলের পাঁচিল ডিঙিয়ে মাঠে লাফিয়ে পড়ে, অন্ধকারে মিশ্র জনতার সঙ্গে ঘাসের কার্পেটে বসে সত্যজিত রায়ের প্রথম ছবিটি প্রথমবার দেখা ঘটেছিল। অনেকরাতে বাড়ি ফিরে মায়ের পিটুনি খাওয়া নিশ্চিত জেনেও শেষ দৃশ্য অব্দি দেখে ভারাক্রান্ত মনে বন্ধু মিহিরের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে ফিরেছিল।

কালুখালি। কালুখালি কুলিদের হাঁক শুনে ওরা দু’ভাই ট্রেন থেকে প্ল্যাটফর্মে নামল। নীলু দুলাভাইয়ের বাড়ি স্টেশনের পাশেই। ইন ফ্যাক্ট ওই পরিবারের জমিতেই বৃটিশ আমলে কালুখালি রেল জংশনের যাবতীয় স্থাপনা বসানো হয়েছিল। এদিক-ওদিক রেলপথের বেশ খানিকটাশুদ্ধ সবই চৌধুরিদের জমি ছিল। স্টেশনের একপাশে চৌধুরিদের বসতবাড়ি, অন্যধারে রতনদিয়া বাজার। ওই বাজারও চৌধুরিদের জমির ওপরে। নীলু চৌধুরির দাদা, বাবা সবাই বৃটিশ ভারত এবং ভারত বিভাগোত্তর পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে জড়িত থেকেছেন, মোটামুটি নামডাকও রয়েছে। শিমূল ওর মায়ের কাছে আশৈশব শুনে এসেছে, জানুখালা এবং পুলিশ অফিসার আলীম খালুর বড় মেয়ে চাঁপা অর্থাৎ পান্নুভাইয়ের সহোদরার বিয়ে হয়েছে রতনদিয়ার চৌধুরিদের ফুটবল খেলোয়াড় ছেলের সঙ্গে। নীলু দুলাভাই অবশ্য ঢাকায় ওদের বাসায় অনেকবার গেছেন, তাই তার সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে।

পান্নুভাইয়ের পিছু পিছু ওভারব্রীজে উঠে, ডানদিকে নেমেই ওরা চৌধুরিবাড়ির ফটকের মুখোমুখি। বাড়ি আর রেলস্টেশনে এত ঘনিষ্ঠ মাখামাখি–শিমুলের খুব মজা লাগল। ভাবল, সিগ্রেট খেতে ইচ্ছে করলেই স্টেশনে চলে যাবে, প্ল্যাটফর্মে সিমেন্ট বাঁধানো বেঞ্চে বসে যাত্রীদের আনাগোনা দেখবে, বেশ হবে।

অন্দরে ঢুকে পান্নুভাই একটি ছোট খাটো মহিলার পা ছুঁলেন, দেখাদেখি শিমূলও। পান্নুভাই শিমূলের বিব্রত মুখের পানে তাকিয়ে হাসলেন, এই আমাদের সেই আপা আর তোমাদের ছোটবেলা থেকে শোনা চাঁপাবু’। বুঝতে পেরেছি, তা’ চাঁপাবু’, শিমূল সহজভাবে বলল, বাড়ীর চারদিকেই ঘর দেখতে পাচ্ছি। আমাদের ব্যাগগুলো কোথায় রাখব, যদি বলেন। হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমরা এখনো উঠোনে দাঁড়িয়ে আর আমি পান্নুকে দুনিয়ার খবর জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছি। ঐ যে ওই সব্জে রং দরোজা ঐঘরে তোমরা ওঠ। তারপর তোমার দুলাভাই আসুক, শোবার ব্যবস্থা রাতে দেখা যাবে। কোথায় উনি? পান্নুভাই হাঁটতে হাঁটতে শুধোন। মুক্তিযোদ্ধাদের বন্দুকবাজির ট্রেনিং চলছে স্কুলের মাঠে, ওখানেই সারাদিন ব্যস্ত গত কদিন থেকে, বলে আপা বাড়ির পেছনে রান্নাবাড়ির পানে এগোন। যেতে যেতে দাঁড়িয়ে পড়েন, শিমূল, তোমরা কাপড় ছেড়ে গোসল করবে এসো। গোসলের ব্যবস্থা কোথায় শিমূল জানতে চায় আর ভাবে, গোসলখানা নিশ্চয়ই আছে, পুরনো মুসলিম জমিদার’ বাড়ি যখন। গোসলখানা, কূয়ো, পুকুর যেখানে খুশি যাও, আগে। খিড়কি পুকুরটা দেখে এসো একবার। আমাদের বাড়ি যারা বেড়াতে আসে, ওই পুকুর দেখার পর তারা আর বাথরুম খোঁজেনা, বলে মিটি মিটি হেসে বু’ চোখের আড়াল হন।

লুঙি পরে, আরেকটা লুঙি আর গামছা ঘাড়ে ফেলে ওরা বাড়ির পেছনদিকে পা বাড়ায়। রান্নাবাড়ির দালানে কয়েকজন গ্রামীন মহিলা নানা কাজ সারছেন। কলাগাছের সারি পেরোতেই দৃষ্টিনন্দন এক ফুলবাগান, তার মাঝখান দিয়ে হাঁটাপথ। তারপর নারকেলবীথির মধ্যমনি এক টলটলে জলেভরা মাঝারি মাঝারি আকারের পুকুর। পুকুরের চারধার ঘিরে নারকেল গাছের সারি। ঝক্ঝকে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। নিয়মিত ঝাঁটপাট হয়, বোঝা যায়। উত্তর-দক্ষিণ দুই পাড়ে চওড়া বাঁধানো ঘাট। সিমেন্ট বাঁধানো হেলান দিয়ে বসে আড্ডা দেবার উপযোগী আসন ঘাটের তিনদিকে, মাঝে জলে নামার পথ। শিমূল চমৎকৃত হয়, ঘাটের হেলানো টানা চেয়ারে টানটান শুয়ে পড়ে। এপ্রিলের নীল আকাশ, চিল চক্রাকারে ওড়ে বহু ওপরে। আকাশভরা, সূর্যতারা, বিশ্বভরা প্রাণ, ওর খোলা গলায় রবীন্দ্রনাথের মেসেজ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। পান্নুভাই সিগ্রেট ধরিয়ে বসে চুপচাপ শুনে যান। গান গাইতে গাইতে স্বস্তিতে, আরামে শিমূলের চোখ বুঁজে গিয়েছিল।

হাততালির শব্দে ও চোখ মেলে। দ্যাখে, দুলাভাই ওর শিয়রে দাঁড়িয়ে। হাস্যোজ্জ্বল মুখ, টাওয়ারের মতো দীর্ঘ খাড়া শরীর, পরনে ব্রীচেজ, বুট, সায়েবদের মতো বুশশার্ট, মাথায় ফেল্ট টুপি, হাতে দো’নলা বন্দুক। তড়াক্ করে লাফিয়ে উঠে সে নীলু চৌধুরিকে আগাপাশতলা অবলোকন করে, তারপর মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করে, ওয়েল, হান্টার, হোয়াট উড ইউ লাইক টু কিল? হোয়াই, দ্য পাকিস্তানী অকিউপেশান আর্মি? হোয়াট এলস? আড়াল থেকে চাঁপাবু বেরিয়ে আসেন, ঠোঁট বেকিয়ে বলেন, তা’লেই হয়েছে। তোমরা এবার পাকিস্তানীদের ধরে-পাকড়ে ওর সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দাও, কেবল দাঁড় করলেই তো হবেনা, যদি দৌড়ে পালায়? হাত পা বেঁধে নারকেল গাছের গোড়ায় পেঁচিয়ে বেঁধে দিলে যদি উনি বন্দুক তাক করেন–এপর্যন্ত বলেই বু’ বাঁধভাঙা হাসিতে নু’য়ে পড়েন। একই সঙ্গে ওরা তিনজন অট্টহাসির কোরাসে বেজে ওঠে। প্রাকৃতিক নৈঃশব্দ ভেঙে খান্‌খান্। চলো এবারে, ওরা গোসল সারবে, বলে বু’ দুলাভাইকে নিয়ে বাড়িমুখো হন।

খাওয়ার পর একটু গড়িয়ে নিয়ে ওরা উঠে পড়ে। চা খেয়ে পান্নুভাই বোনকে বলেন, আপা, ভাগ্নেরা কোথায় ? কোথায় আবার? টিটো-রিটো ফরিদপুরে। চাচার বাড়ি গেছে। স্কুল বন্ধ যে। আর মিটো-কুটো রতনদিয়া হাইস্কুলের মাঠে ঐ যে বন্দুকছোঁড়ার প্রশিক্ষণ চলছে–ওখানেই আছে নিশ্চয়। বাবার কান্ড দেখতে হবে না? তোমরা যাবে? যাওনা। সঙ্গে লেঠেল দেব একজনা? নাকি চিনে যেতে পারবে? আমরাই পারবো বু’ আবার লেঠেল কেন? গাঁয়ের মানুষ আমাদের ‘নূতনদা এয়েছে রে’ বলে দুয়ো দিক্ আর কি। বলে শিমূল পান্নুভাইয়ের ডানা ধরে টেনে নিয়ে চলে। এত তাড়াহুড়োর কি আছে? চলো যাচ্ছি, আপা আসছি। আপা দরজা ধরে ভাইদের গমনপথের দিকে সস্নেহে তাকিয়ে থাকেন। নিজের ভাইটা ছোটবেলা থেকেই বারমুখো। আবার ওই বকুলখালার ছেলে শিমূলও নাকি বাউন্ডুলে স্বভাবের। শোনা কথা অবশ্য। এই প্রথম দেখা ওর সাথে। মায়ের কাছে শুনেছেন, বকুলখালা শিমূলের জন্মের আগে আগেই কলকাতা থেকে চৌগাছি বাপের বাড়ি চলে এসেছিলেন। শিমূলের জন্ম ওর নানাবাড়িতেই। বকুলখালা খুব অসুস্থ হয়ে পড়ায় শিমূল নানির স্তনপান করে প্রাণরক্ষা করেছিল জীবনের প্রথম ক’দিন। এমএ দিয়েছে এই কচি বয়সেই। কি চমৎকার গানের গলা। তবে নীলু বলছিলেন, ও বোধকরি দেবব্রত বিশ্বাসের একনিষ্ঠ ভক্ত। সে যাকগে, দু’ভাইয়ের সমঝোতা বেশ।

রেললাইন পেরিয়ে রতনদিয়া বাজার হয়ে মিনিট পাঁচেক হেঁটেই ওরা সামনে দেখল রতনদিয়া আজফার হোসেন চৌধুরি হাইস্কুলের দোতলা দালান। বিল্ডিং-এর মাথায় প্রতিষ্ঠাতার নাম বড় বড় অক্ষরে স্থায়ীভাবে উৎকীর্ণ। সামনে-পেছনে দু’টো মাঠ। ছেলেদের হস্টেল। পুকুর। সব্জি বাগান। হস্টেলের ছেলেরা করেছে। প্রশংসনীয়, শিমূল ভাবে। বাইরে কাউকে না দেখে ওরা একটু ধন্দে পড়ে যায়। ভেতরে ঢুকে সব্জি বাগানে দু’জন ছাত্রকে দেখে শিমূল এগিয়ে যায়। এই যে ভাই, শোন। ডাক শুনে নিড়ানি হাতে একজন উঠে দাঁড়ায়। কাকে চান আপনারা ? নীলু চৌধুরিকে। চেয়ারম্যান সাহেব তো ভেতরে ক্লাস নিচ্ছেন! ওরা একটু বিস্মিত হয়। কীসের ক্লাস? ওই গেরিলা যুদ্ধের বিষয়ে হানাদার পাকিস্তানীরা পদ্মা পেরোতে এলেই আমরা যে কৌশলে তাদের ঠেকাবোতারই ওপর উনি আমাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। আমরা দু’জন গতকাল বিকেলে ক্লাস করেছি, তাই আজ বাগানে কাজ করছি। যান্না, ঐ নিচের বড় হলে ঢুকলেই দেখতে পাবেন। ছেলেটি আবার উবু হয়ে বসে নিড়ানি চালাতে থাকে।

শিমূল, পান্নু মুগ্ধ। ওরা ঠিক করে, ক্লাস ডিসটার্ব করা চলবে না। তারচে’ এই মাঠে পায়চারি করা যাক। ব্যায়ামও হবে। সময়টা ভাল কাটবে। ক্লাস শেষ হতে ছাত্রদের সঙ্গে প্রশিক্ষক বেরিয়ে আসেন। সেই শিকারীর পোশাক। হাতে বন্দুক। ওদের সঙ্গে হাঁটলেন মাঠের এমাথা থেকে ওমাথা আরও বারবিশেক। শিমূলদের ঘাম ছুটে গেছে। অতঃপর মার্চ করে বাড়ি ফেরার পালা। রতনদিয়া বাজারের ততক্ষণে ঘুম টুটেছে। আলো জ্বালছে দোকানিরা। নীলু চোধুরি তেলেভাজার দোকানের সামনে দাঁড়ালেন। চল্বে নাকি শালাবাবুদের আমাদের এই ছোলা, পেঁয়াজু, চপ, ফুলুরির জলযোগ? তোমাদের আপার আবার খুব পছন্দ এসব, বলে শালাদের মতামতের তোয়াক্কা না করে উনি দোকানিকে বিপুল পরিমাণ ভাজাভুজি তৈরির হুকুম দিলেন, বেশি করে ঠিক বিট লবণ আর গোলমরিচের গুঁড়ো দিতে বললেন, তারপর বললেন, তা’ কত হল তোর? কুটুমগের নয় একদিন আমিই খাওয়ালাম, হুজুর, দোকানি সাহস করে বলে ফেলে দু’হাত কচ্লায়। কুটুম সঙ্গে আছে দেখে তো আরও বেশি করে চাবি রে, বুকা, তা’ না’, কত হল বল্? দেন দু’ডো টাকা। চোপ্, এই নে, বলে দুলাভাই ওকে একটি পাঁচটাকার নোট দেন। ভাংতি নে’ যান, হুজুর। তুই রেখে দে, খুশি হয়ে দেলাম। চল, শালারা।

ওরা রেলসড়ক পেরিয়ে বাড়ি ঢুকে দেখতে পায়, চাঁপাবু’ উঠোনে টেবিল পেতে তেলেভাজা মুড়ি সাজাচ্ছেন। কে, কখন দিয়ে গেল ওগুলো ? শিমূল অবাক। সন্ধ্যে ঘনিয়েছে। চারদিকে বারান্দায় অনেকগুলো হারিকেন আলো দিচ্ছে। উঠোন তাতেই আলোকিত। পরিচারকদের একজন পেট্রোম্যাক্স পাম্প করছে। শিমূল মোড়া টেনে বসতে বসতে বলে, এতগুলো আলো জ্বলছে, আবার হ্যাজাক বাতি কেন ? তোমরা এসেছ যে, তোমার দুলাভাইয়ের হুকুম। ওদিকে পদ্মায় লোক পাঠানো হয়েছে, বু’ তেলেভাজামুড়ির বাটি এগিয়ে দিতে দিতে বলেন। কেন, পদ্মায় কেন ? এই, পাখপাখালি, মাছবিশেষ কিছু যদি মেলে আমার ভাইদের যে বিশেষ খাতির যত্ন হচ্ছেনা! দেশে দুর্দিন চলছে, কী আর করা। কে বলছে এসব কথা, পান্নুভাই সহাস্যে শুধোন। চৌধুরি সাহেব, আবার কে? বু’ খুব উপভোগ করছেন, বোঝা গেল। বাপের বাড়ির লোকজনকে স্বামীর বাড়িতে আপ্যায়নে মেয়েরা স্বভাবত সঙ্কোচবোধ করে থাকে, যা কিনা মৌলিক ভদ্রতাবোধ থেকেই সঞ্চারিত হয়ে থাকে। কাজেই, এ বাড়িতে সেদিন যা ঘটছিল তাতে চাঁপাবু’র প্রীতবোধ করাও স্বাভাবিক।

হারিকেন হাতে ওরা খিড়কি পুকুরের পাড়ে চলে গেল। পান্নুভাই তার বোনকে বল্লেন, খাবার সময় হলে, অর্থাৎ দুলাভাই কাচারির দরবার থেকে ফিরে খেতে চাইলেই আমরা এসে যাব। পুকুর পাড়ে পৌঁছে আলো কমিয়ে দিয়ে ওরা বসল। পা তুলে, আরামসে হেলান দিয়ে শিমূল বড় তামাকের বিড়ি পাকালো গোটা দুই। একটি পকেটে রেখে অন্যটি ধরিয়ে ব্রহ্মতালু ছোঁয়া টান দিল। দম ধরে রইল যতক্ষণ পারল, তারপর দম ছাড়তেই তূষ্ণীভাব এসে গেল। আরো পরে গান ধরল শুয়ে পড়ে, চাঁদের পানে তাকিয়ে। গোধূলি গগনে মেঘে ঢেকেছিল তারা, আমার যা কথা ছিল, হয়ে গেল সারা…। চোখ না খুলেই একের পর আর, গান চলল। মাঝে মাঝে পান্নুভাই আলতো গলা মেলাচ্ছিলেন।

চলো, শিমূল ওঠ, গান গেয়ে তোমার আরো বেশি খিদে পাওয়ার কথা। ওয়াহ্, শালা আমার গান গাইলেই তো পারো। বুঝলাম না দুলাভাই, শিমূল প্রসঙ্গ দীর্ঘায়িত করে, মাঝে-মাঝে তো আসরেও গেয়ে থাকি। আমি বলছিলাম তোমার চাঁপাবু’কে দুপুরে, ওই-যে তোমার ওই দেবব্রত বিশ্বাসী গায়কী আমার খুব ভাল লেগেছে। লেগে থাকলে হবে। কোলকাতায় চলে যাবে, জর্জদাকে পটিয়ে শিষ্য বনে যেতে পার যদি একবার, তোমায় আর কে ঠেকায় ! নীলু চৌধুরী উঠোনে পাতা বড় টেবিলে বসতে বসতে বলেন। তা মন্দ বলেননি, দুলাভাই, পাশ করে মাস্টারি করব, গান করব আর লিখে-লিখে হাত মক্শো করব। শিমূল দোহারের কাজ চালিয়ে যায় মজা করে।

খেতে খেতে মূল গায়েন আবার সূত্র ধরেন, তোমার আরেক বন্ধু তো চিম্ময়ের গানের পুনর্গায়ন করেই দিন কাটাবে বোধ করি। চিংড়ির মুচমুচে মুড়ো চিবোতে চিবোতে শিমূল ধরতাই ধরে নির্ভুল, লতার কথা আর বলবেন না, ও চিম্ময়ের আবেগকম্প্রিত কন্ঠের আবেদন পাশ কাটিয়ে এদিক-সেদিক মিস্এডভেঞ্চারের কথা ভাবতেই পারেনা। পঙ্কজ মল্লিকের গান শুনলে নাকি ওর গা শিউরে ওঠে। কি যে বল, বর্ষার কয়েকটি গান তো পি মল্লিকের কন্ঠে গীত হবার জন্যই রচিত, আমার মনে হয়, রবি ঠাকুরের গানের সহজিয়া শ্রোতা-বোদ্ধা চৌধুরি অকপটে বলেন আর দইয়ের বাটি টেনে নেন হৃষ্টমুখে।

২৫ মার্চের পর কি হল, জাম? রাজবাড়িতে কয়েকঘর বিহারির বাস, সেই হিন্দুস্তান-পাকিস্তান ভাগের পর ওরা কোলকাতা থেকে পূর্বে ভাসতে-ভাসতে এখানে এসে ঠেকেছিল। সব ধোপা, নাপিত, জুতো সারাইওয়ালা, মিষ্টি কারিগরবল, এদের ওপর জুলুম করার কোন অর্থ হয়? ওরা কি কখনো নিজেদের পাকিস্তানের শাসক বা মালিক ভাবতে গেছে নাকি? আরে, ওরা যে কাজগুলো করে বাঁচে, ওই কাজ বাঙালি মুসলমান-হিন্দুরা পারে? না করেছে কোনদিন? নীলু চৌধুরির ক্ষোভ অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠছিল ক্রমশঃ। শিমূল ভাবছিল, এই মফস্বলের মানুষজনও আজকাল অমন সুযোগ সন্ধানী মরশুমি শিকারির মতো মতলবী হয়ে উঠেছে? দেশকাল বিষয়ে ও কিছুই জানেনি, শেখেনি এখন। বোঝাই যাচ্ছে।

তারপর? হ্যাঁ, বলছি। একটা সিগ্রেট দাও দেখি তোমার গোল্ডলিফের প্যাকেট থেকে। ধীরে সুস্থে ধোঁয়া টেনে, ছেড়ে চৌধুরি বলেন, চমচম-বিহারিকে বাঁচাতেই তো আমি বন্দুক নিয়ে ট্রেনে চড়ে তখনি চলে গেলাম। গরম বক্তৃতা দিয়ে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যে ক’ঘর তখনো আক্রান্ত হয়নি। তাদের প্রোকেটশ্যনের ব্যবস্থা করলাম। পাড়ায় সংগ্রাম কমিটি করে দিয়ে এসেছি। তারপর এইতো এখানকার তরুণদের নিয়ে পড়েছি। এবাড়ির মানুষদের ওপর এলাকার লোকজনের বেশ ভরসা করে, মান্যি করে এখনো, সেটা বোঝা যায়। পান্নুভাই দুলাভাইকে উৎসাহিত করেন। হাঃ হাঃ হাঃ, তোমরা গ্রামের মানুষ চেননা। দীর্ঘদিন প্রজন্ম পরস্পরায় পাশাপাশি বাস করলে তবেই মানুষকে চেনা যায়, বুঝলে? এককভাবে দেখলে এদের মানুষ বলেই তুমি গুনবেনা হয়তো, কিন্তু তোমার পেছনে কাটি দেবার বেলায় দেখতে পারে অনেকেই একজোট হয়েছে। ওদের এই গরীবী সলিড্যারিটি কোন সৎকাজে লাগাতে পারলে অনেক কিছু করা সম্ভব। সরকার জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করে দেশের জমিজমার কন্ট্রোল ঠিকই কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু তার আগে রাজা-প্রজার যে একটা কাজের সম্পর্ক ছিল, সেটা রিভাইভ করতে, রিনিউ করার কোন প্রক্রিয়া চালু করতে পারেনি। বুঝলে শালারা? চৌধুরি এপর্যন্ত বলে ‘মফিজ’ বলে হাঁক দেন।

মফিজ নিঃশব্দে সামনে এসে দাঁড়ালে বলে উঠেন, কাচারি ঘরে শোব আমি, বিছানা রেডি কর। তুই সামনের বারান্দার খোপে শু’বি, বুঝলি? নীরবে মাথা কাত করে মফিজ অদৃশ্য হয়। রাতে একটু সাবধানে ক’টাদিন থাকা ভাল। বলা তো যায়না, কার মাথায় কি চিন্তা, কোন কিফির কাজ করছে। আচ্ছা দুলাভাই, বাড়ির ভেতরে আমাদের রেখে আপনি ওই বাইরের বৈঠক খানায় ঘুমোতে যাবেন কেন? শিমূল বিজলিবাহি বিহীন এই বিশাল, ছড়ানো বাড়ির এককোনে রাত্রিবাসের সম্ভাবনায় রোমাঞ্চিত হচ্ছিল, তবে নেগ্যটিভ্লি। সেকারণেই দুলাভাই এবং তার বন্দুকের নৈকট্য সে চাইছিল খুবই, ভেতরে ভেতরে। কোন চিন্তা নেই, আমি নিজে টর্চ নিয়ে সারাবাড়ি চেক্ করে, সবগুলো দরজায় তালাবন্ধ করে, তারপর বাইরে গিয়ে শোব। কোথাও কিছু হলেই তো ছুটে আসবে এখানে। তাই আজ থেকে আমি কাবারি বাড়িতেই রাত কাটাবো, ঠিক আছে ? চূড়ান্ত এবং তার কারণ ব্যাখ্যা হলে চৌধুরি উঠেলেন, বোল ওয়ালা কাঠের খড়ম পায়ে খটাস্ সটাস্ শব্দ তুলে হেঁটে শোবার ঘরে ঢুকলেন, বন্দুক আর টর্চ হাতে বেরিয়ে এলেন।

পানু, শিমূল, তোমরাও শুয়ে পড়ো এবার। সকালে আমার সঙ্গে হাঁটতে যাবে তো? ডাকব? দুলাভাইয়ের প্রশ্নের জবাবে পান্নুভাই ম্রিয়মান কন্ঠে জানান, ঠিক আছে, ডাকবেন। আপা, ভেতরবাড়ির কলঘরটা যেন কোথায়? চাঁপাবু’ হাত তুলে দেখান, ঐযে দক্ষিণ-পশ্চিম কোনে। ওঠ যদি, বারান্দায় হারিকেন জ্বলবে, কোন অসুবিধে হবে না। কলঘরেও বাতি ডিম করা থাকবে। যাও তোমরা, শোও গিয়ে, বলে বু’ চটি ফট্ফট্ করতে করতে বলে যান ঐ কলঘরের দিকেই।

ভেজানো দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে শিমূল পানি খেল দু’গ্লাস। তারপর প্যান্ট বদলে লুঙি পড়ে চিৎ হয়ে শুয়ে সিগ্রেট করাল। মস্তবড় ডবল খাট। উঁচু গদির ওপর পাতা বিছানা শিমূলের মনে পড়লো, কেবল পাবনার বাড়িতে এরকম উঁচু বিছানায় শোবার অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। দাদির সঙ্গে যখন আট-ন’বছরের ছেলেটি শীতে কাঁপতে কাঁপতে দরজায় হুড়কো তুলে বন্ধ করে, লাফিয়ে সিঁড়ি বেয়ে খাটে উঠত। তখন কোন রকমে কেবল লেপের নিচে ঢুকে পড়ার জন্য তার শীতকাতুরে ছোট্ট প্রাণ আঁকুপাকু করতো। এখন মনে পড়তে তার হাসি পেল, হেসে ফেলল। হাসছো যে, আবার কি হল ? পান্নুভাই কাপড় বদলে আরাম কোরারায় গা এলিয়ে দেন। এই খাট দেখে মনে পড়ল, ছোটবেলায় দাদির খাটে উঠতে সিঁড়ি বাইতে হত পা’দানি আরকি বুঝলেন না ? শিমূল ভুলে গেল, পাবনার বাড়িতে পান্নুভাই কুষ্টিয়া থেকে বেশ কয়েকবার যাতাযাত করেছেন, নান্নুভাইয়ের সঙ্গে। কি যে বল তুমি শিমূল। তোমার চে’ আমি ছয় বছরের বড়ো। কাজেই তোমার আগে-আগেই আমার প্রচুর অভিজ্ঞতা হবার কথা। তারমধ্যে ওই পাবনার নানিবাড়ির শোবার ঘরের সিঁড়ি লাগানো খাট দেখার সৌভাগ্যও আমারই আগে ঘটেছিল। রোকন মামা, খোকা মামা কেউ পাবনা থেকে ঢাকায় তোমাদের বাড়ি গেলেই তো তুমি নাকি ওদের সঙ্গে পাবনা যাবার বায়না ধরতে শুনেছি।

হ্যাঁ, সেই সব দিন, মনে হয়, এইতো সেদিন পচাকাকার সঙ্গে পাবনা গেলাম। ফুলবাড়িয়া স্টেশনে রাতে ট্রেনে উঠে, ভোর-ভোর জামালপুর-সরিষাবাড়ি পেরিয়ে জগন্নাথগঞ্জ ঘাট। যমুনা পারাপারের ফেরি স্টীমারে উঠে ব্রেইক ফাস্ট করা। শিমূলের মন ডুব যমুনায় ডুব দিয়ে কখন ওপারে চলে যায়। সিরাজগঞ্জ ঘাট, বাজার, বাহিরদিয়া ইত্যাদি তিন-চারটে রেলস্টেশন তখন সিরাজগঞ্জ শহর ও শহরতলী এলাকায়। পরে যমুনার ভাঙনে শহর নদীর পাড় থেকে ক্রমশঃ পিছনে সরে গেছে। নদী পেরিয়ে সিরাজগঞ্জে ট্রেনে উঠলেই হকাররা রাখবসাই বা ভুল উচ্চারণে রাভোক্শাই সন্দেশ ফেরি করে বিক্রি করতো। ট্রেন চলতো ঘটাং ঘট্, একে একে ভাঙ্গুরা, চাটমোহর, মুলাডুলি স্টেশন পেরিয়ে যেত। জানালা দিয়ে সবুজ গ্রাম, ঝিল, বিল, টেলিগ্রাফের তারে লেজঝোলা দেখা আর ঝালমুড়ি, চানাচুর এটা-সেটা কুড়মুড়িয়ে সময় কেটে যেত।

এক সময় ঈশ্বরদি জংশনে ট্রেন ঢুকে যেত। শিমূলরা নেমে ওভারব্রীজ থেকে নেমে পাবনার বাসে উঠত। লজ্ঝড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিত্যক্ত ফোর্ড এবং সেভ্রলে মোটর কোম্পানির লরি কেটে বিশ্বাস অটো এজিন্সির তৈরি করা বাসের ফ্লিট। পাবনা-ঈশ্বরদি বাসরুটে বিশ্বাসদের একচেটে ব্যবসা ছিল। বাসে তখন ফার্স্ট ক্লাস আসন ছিল ড্রাইভারের পাশে একেবারে সামনে দু’তিনটি এবং তারার এক সারি। তার দরোজা বাসের গায় কেটে আলাদা বসানো। ওই বয়সেও শিমূলের অতিস্বাস্থ্য শরীর ওই ফার্স্টক্লাস খাঁচায় স্বস্তি পেতনা, এটা মনে আছে। এর পেছনে সেকেন্ড ক্লাসের এক খালি খাঁচা, দরোজা আলাদা। অত্যন্ত সংকীর্ণ ওই দুই উঁচু ক্লাসের মধ্যে ওফাৎ ছিল যেটুকু, তা’হল ফার্স্ট ক্লাসে ছেঁড়া, জীর্ণ, পাতলা, অসমতল গদির আস্তরণ আর দ্বিতীয় খাঁচায় গদিবিহীন মসৃণ কাঠের লম্বা বেঞ্চ। তৃতীয় শ্রেণী ছিল তুলনা মূলকভাবে সুপরিসর, যদি না সেখানে সার্ভিসঠাসার মতো অনবরত যাত্রী না ওঠানো হত। কিন্তু সেরকমটি কি হবার জো ছিল ? সেই পঞ্চাশের দশকে শিমূল স্কুলে নিচের ক্লাসের বইয়ে পড়ত, পূর্ব পাকিস্তান অত্যন্ত ঘনবসতির দেশ, যেখানে প্রতি বর্গমাইলে ৭৫০ জনের বাস…।

চাচাদের কারো পাবনা যাওয়ার সুযোগ হলে অবশ্য ভ্রমণসঙ্গীকে পটিয়ে ঈশ্বরদি পাবনার বাসে তৃতীয় শ্রেণীতে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শিমূলের একাধিকবার হয়েছে। তারই মধ্যে দুরন্ত শীতে আর বৃষ্টিতে যখন রাস্তাঘাটে যাত্রী এমনিতেই কম থাকে, সেরকম দিনে ঐ লক্কড়মার্কা বাসের পেছনে হাতপা ছড়িয়ে ঐ আঠারো মাইল দু’ঘন্টায় পাড়ি দেবার দুর্লভ সুযোগও ঘটেছে। সাত-পাঁচ শিবের গীত গাইতে গাইতে কখন ঘুমে চোখ জড়িয়ে এল…।

সকালে ঠিকই দুলাভাই ওদের ডেকেছিলেন। কাকভোরে পান্নুভাই ওঠেননি। নীলু চৌধুরির সঙ্গে তাল রেখে হাঁটতে শিমূলের ভাল লাগছিল। খোলা রাস্তায় ঠান্ডা হাওয়া গায়ে জড়িয়ে দু’হাত দুলিয়ে সোজা হেঁটে যাওয়া। অশেষ নির্জনতার সুবাদে গা বাঁচিয়ে চলার সঙ্কোচ নেই। ইচ্ছে করেই শিমূল আধঘন্টা পার করেও থামলো না বা ফেরার কথা ভুলে গেল। প্রথমদিকে একটু ঢিলেঢালা হাঁটা আর গল্প হচ্ছিল। হাঁটার বেগবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গল্প কমতে কমতে বাক্রোধ হয়ে গেল একসময়। ফেরার পথে ওরা গতি কমাল ধীরে, কথা বলতে শুরু করল। ভাল ব্যায়াম হল, এবার চলো ভালোরকম খাওয়া-দাওয়া করবে। শরীরের ক্ষয়পূরণ ও বৃদ্ধিদু’টোই এনশিওর করতে হবে তো? দুলাভাইয়ের কথায় শিমূল হেসে ওঠে, বলে, বেশি খেলে ঘুম পাবে আর আমাদের বেরোনো হবে না আজ। মানে? আজ কোথায় যাচ্ছ তোমরা? দুলাভাইয়ের বলার ভঙ্গিতে শিমূল বুঝল, ভাবীকে এখনি ভুলিয়ে একেবারে পেড়ে না ফেললে এখান থেকে ঠাঁইনাড়া হওয়া যাবেনা। দুলাভাই, ঢাকায় কয়েকটা জরুরি কাজে হাত দিয়েছি তো, পরীক্ষার পরপরই। তাই উঠেপড়ে লাগবার আগে ভাবলাম, দেশেও অশান্তি চলছে, ক’দিন পদ্মার ওপার থেকে ঘুরে আসা যাক্। আর, আপনার বড় শালার তো জরুরি গবেষণার কাজ সম্বৎসর চলছে। ওর এক হপ্তা ছুটির তো আর বাকি নেই বিশেষ। আমরা আজ এখান থেকে বেরিয়ে যশোর যাব। ওখানে এক-দু’দিন থেকে পিআইএ-র ফ্লাইটে সোজা ঢাকা ফেরত যাব। এখানে দেরি করে ফেললে আবার যশোর-ঢাকা টিকিট পাবেনা। আপনি তো বুঝেছেন, চাঁপাবু’কে একটু সামলে নেবেন আপনিই। প্লিজ দুলাভাই, শিমূল কথা বলছিল আর ভেতরে ভেতরে চমৎকৃত হয়ে যাচ্ছিল এই ভেবে যে, এত ফাল্তু যুক্তি সে অত দৃঢ়তার সঙ্গে সহজে দিয়ে যাচ্ছিল কি মসৃণ, আর দুলাভাইও অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে শুনছিলেন আর মাথা ঝাঁকাচ্ছিলেন।

তা, থাকবেই না যখন আরও দু’চারদিন, বলছো জরুরি কাজ রেখে এসেছ, তখন তো আট্কাবার মানে হয় না। ঠিক আছে, তোমার বু’কে সামলাবো আমি। এখন গিয়ে চলো গোসল সেরে ফেলি। তারপর গরম গরম চারটে ডাল-ভাত খেয়ে একটু জিরিয়ে নিয়ে যাবে’ খন। বাড়ীর সামনে এসে স্টেশনের দিকে তাকিয়ে শিমূলের মনে পড়লো, গতকাল তো ট্রেন এখানে পৌঁছেছিল দুপুরে, তাহলে তো যাবার সময় হতে এখনো ঢের দেরি। তবুও জানতে ইচ্ছে হলো, আরও আগে কি কোন ট্রেন যাবে খুলনার দিকে? অবশ্যই, দুলাভাই সোৎসাহে বলেন, আটটায় রাজবাড়ি ছেড়ে ঘন্টা দেড়েকে প্রথম ট্রেনটা কালুখালি টাচ্ করে সাড়ে ন’টা থেকে দশটা নাগাদ। তোমার চিন্তা নেই কোন, আমার শালাদের না নিয়ে ট্রেন এখান থেকে নড়বেনা, এই বলে দিলাম। এখন যাবার আগের কাজগুলো সারো, তোমাদের বোন-ভাগ্নেদের সঙ্গে একটু কথাটথা বল, তারপর দেখা যাবে।

ঘরে ঢুকে শিমূল দেখে, পান্নুভাই কাঁথামুড়ি দিয়ে তখনো শুয়ে। ও পান্নুভাই সাতটা বেজে গেছে, আমরা ওদিকে মাইল দশেক টানা হেঁটে ফিরলাম, আর আপনি কেবলি স্বপনো, করিছেন বপনো এখনো তুমুল? ওঠেন, উঠে পড়েন। আমরা আজই যশোর যাব। ওখান থেকে প্লেনে ঢাকা পৌঁছব, অনেক কাজ ফেলে এসেছি কিনা ! পান্নুভাই কাঁথার ঘোমটা সরান এবার, ভালই তো গাইছিলে রবিঠাকুরের গানে ভেজাল মিশিয়ে, থামলে কেন? ট্রেন ক’টায়? ফার্স্ট ট্রেন আর ঘন্টা দুই পরে, শিমূল গামছা ঘাড়ে ফেলে গোসলে যেতে যেতে বলে, আপনি তৈরি না হলে কিন্তু ওই আফটারনুন ট্রেনই কপালে নাচ্ছে। আসলে তো আমরা যাব এক কি দুই স্টেশন, যাব তো সেই বালিয়াকান্দি,
রাস্তায় পড়বে হাট গোপালপুর। গ্রামের পথঘাট আমরা তো কিছুই চিনিনা, জিজ্ঞেস করে করে এগোব। সকাল-সকাল বেরোতে চাই এখন থেকে, এই মায়ার বাঁধন কেটে, শিমূল বলে। গুনগুনিয়ে ‘তোরা যে যা বলিস ভাই’ গাইতে গাইতে উঠোন পেরিয়ে খিড়কি পুকুরমুখো হল।

পুকুরে দুটো ডুব দিয়ে ফিরে এসে দেখল, উঠোনে টেবিলে খাবার সাজাচ্ছেন চাঁপাবু’। দুই ভাগ্নে মায়ের সঙ্গে সঙ্গে একবার রান্নাবাড়ি যাচ্ছে, আবার ঘুরঘুর করতে করতে উঠোনে দেখে মন অকারণেই প্রসন্ন হয়ে উঠল। একেই বলে নিটোল, সুখী পরিবার। ঘরে ঢুকে চুল আঁচড়ে, মুখে সামান্য কোল্ডক্রীম ঘষে চলে এল আবার উঠোনে। নাদুস-নুদুস ভাগ্নে দু’টোকে জড়িয়ে ধরে আদর করল। ওরা পালাল। দুলাভাই আগেই গোসল সেরেছেন। বাইরে যাবার পোশাক, অর্থাৎ সেই শিকারীর লেবাস পরে একবারে টেবিলে এলেন। দু’টো লাল আটার রুটি, পাঁচমিশেলি তরকারি তুলে নিলেন প্লেটে। খেতে শুরু করলেন। আর এগুলো কে খাবে ? শিমূলের প্রশ্নে দুলাভাই মুখ তুললেন, বললেন সহাস্যে, আপরুচি খানা পররুচি পহ্নেনা, বুঝেছ ? এবাড়িতে সকাল-দুপুর নানাজাতের, রুচির বিশ-পঁচিশ জন মানুষের পাত পড়ে এখনো, তাই এই রুটি, পরোটা, গরম ভাত, খিচুড়ির সমাহার। আব্বা বেঁচে থাকতে তো বড় বড় তামার ডেগচিতে রান্না হত, কত মানুষ যে খেত আমাদের বাড়িতে। আর সে কত রকমের খানা, আহ্ মনে পড়লে আই কান্ট হেল্প ফিলিং স্যাড। যাবো সেসব কথা, ওইযে বড়শালাবাবু এসে গেছেন। খাও তোমরা, ভাল করে পেট পুরে খাবে, নইলে আজ যাওয়া হবে না।

মানে? শিমূল চম্কে তাকায় প্লেটের খিচুড়িতে ঘি-ভর্তি চামচ ডোবাতে ডোবাতে, বললাম না দুলাভাই…হ্যাঁ, হ্যাঁ, তোমাদের বহু কাজ পড়ে রয়েছে ঢাকায়, সবই বলেছি তোমাদের বোনকে। এরিমধ্যে এক রাউন্ড কাঁদাকাটি হয়েও গেছে। এখন তোমরা যা সহজে করতে পার, সেটি হলসামনে খাবার যা দেয়া হয়েছে, তার যথাসাধ্য সদ্ব্যবহার করো, যদি দেবী তাতে কিঞ্চিৎ হৃষ্ট হন, তাহলে স্থানত্যাগের বাসনা তোমাদের মিটতেও পারে। দুলাভাই বরাভয়ের ভঙ্গিতে ওদের মাথায় ওপরে হাত তুলে নাৎসী স্যালুটের ভঙ্গি করেন। বলেন, আমি স্কুলে ওদের একটু প্যারেড করিয়ে ফিরে আসব, তোমাদের ট্রেনে তুলে দেব। নিশ্চিন্তে খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নাও, গল্প করো, লুডো খেল। আমি আসছি, বলে মার্চ করার ভঙ্গিতে সোজা হেঁটে বেরিয়ে গেলেন বন্দুক হাতে।

চাঁপাবু’ এবারে মাঠের দখল নিলেন। কোন বারণ না মেনে ভাইদের পাতে খাবার তুলে দিতে দিতে কৃত্রিম রোষে বলে উঠলেন, এসব কি শুনছি রাত না পোয়াতেই একি অসৈরণ কান্ড রে ভাই ? পান্নু তোরা নাকি আজ চলে যাবি ? দু’দিন থেকে যা’ না। আর কোনদিন কি তোদের এবাড়িতে পাব? ইত্যাকার বিলাপ আর আত্মকথনের মাঝে ওদের খাবারের প্লেট বোঝাই হয়ে চল্ল। শিমূল এক পর্যায়ে টেবিল ছেড়ে উঠে যাওয়ার ভয় দেখালে উনি ক্ষান্ত হলেন বটে, কিন্তু পরক্ষণেই তালপাতার পাখা হাতে দু’ভাইকে ব্যজনে ব্যাপৃত বলেন। পান্নুভাই নীরবে খেয়ে পাত পরিষ্কার করলেন এক সময়। কিন্তু শিমূল পারল না, বলল, সকালে আমি পেটপুরে খাই সত্যি, তবে এতরকমের খাবার এই পরিমাণে কখনো নয়। চাঁপাবু, আমার প্লেটের খাবার কৌটোয় ভ’রে আমি নিয়ে যাব ঠিকই, খাবার নষ্ট করা আমার সয়না। মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বু’ টেবিল পরিষ্কার করতে করতেই বলেন, সে যদি চৌধুরী সাহেব তোমাদের শেষ পর্যন্ত যেতে দেন, তখন পথের খাবার তো আমাকে প্যাক করতেই হবে। উনি না বললে তো স্টেশনের কারো সাধ্য নেই যে, ট্রেন ছেড়ে দেবে। অমন আগেও হয়েছে, লোকাল খবর কাগজের দুষ্টু সাংবাদিকেরা সেসংক্রান্ত, খবরও ছেপে দিয়েছে। তারপর? শিমূল সোৎসাহে নীলু চৌধুরীর প্রতিক্রিয়া কি হয়েছিল, জানতে চায়। কি হবে, উনি সম্পাদকের কান মুলে দিয়েছেন, সম্পাদক রিপোর্টারের, ব্যস। হয়ে গেল।

চৌধুরী ঠিকই ফিরে এলেন যথাসময়ে এবং আসার পথে স্টেশন থেকে সর্বশেষ খবর নিয়ে। দেরি নেই আর শালারা, আজ ট্রেন রাইট টাইমে ছেড়েছে ওদিক থেকে। তোমরা বরং তৈরি হয়ে নাও, দুলাভাইয়ের কথা শেষ হতে না হতেই পান্নুভাই ফুট কাটেন, আমরা তৈরি। তুমি তো শালা এখনো ঘুম থেকেই ওঠোনি, গা ধুয়েছ? পান্নুভাই ধীর উচ্চারণে হতাশভাবে বলেন, আর গোসল। যা একখানা খ্যাঁটন হল নাআপনাদের কর্তা-গিন্নীর জবরদস্তির ফেরে পড়ে গিয়েশিমূল আবার না জানি কোন গাড্ডায় নিয়ে ফ্যালে। সকাল-সকাল বেরোনো দরকার। কপালে যাই থাক, দিনমানে ঘটলেই হয়। কেন, শালাবাবু আমার রাতকানা হলেন কবে থেকে ? দুলাভাই শুধোন শিমূলকে রহস্যভরে। আপনি ঠাট্রা করছেন? শিমূল সিরিয়াস হয়, চোখের ডাক্তার ওয়াদুদ তো জবাব দিয়েছেন। প্রচুর পরিমানে দুধ ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খানা এবং পিনা ধারাবাহিকভাবে চালালে ক্রমশ: উনি ফিরে পেতে পারেন হারানো দর্শন। যাব্বাবা, এরমধ্যে দর্শন এলো কোথ্থেকে ? দুলাভাই সমানে দোয়ারকি ধরেন। চাঁপাবু’ প্রথমে শঙ্কিত, কথা শুনতে শুনতে ক্রমশঃ কুঞ্চিতভ্রু তাঁর সরলরেখা হয়, সবশেষে নিচিন্তর হাসি হেসে উঠে যান রান্নাঘরের দিকে। শিমূল ডাকে। বু’, বসেননা আমাদের এখানে, আধঘন্টা গল্প গুজব হোক। তোমরা আড্ডা মারো, আমার টিফিন প্যাকিং বাকি এখনো, বলে আবার মুখভার করে বুবু অন্তর্হিত হন।

দর্শন মানে আমি দৃষ্টির ব্যাপারে বলছিলাম। এসব কিছুই আপনাদের আতিথ্যের জুলুম থেকে বাঁচবার জন্য শুধু। হাসি পাচ্ছে তো আপনার, দুলাভাই ? শিমূল গা এলিয়ে বসা পান্নুভাইকে দেখিয়ে বলে, আপনার জ্যেষ্ঠ শ্যালকটি ফাঁসির খাওয়া খেয়ে এখন হাঁসফাঁস করছেন। চৌধুরী বলেন, ট্রেন স্টেশনে ইন্ করলে স্টেশনমাষ্টার লোক পাঠাবেন। আমি নিজে গিয়ে তোমাদের পোটলাপুঁটলি তুলে দিয়ে আসব, ভেবনা। পান্নু ট্রেনে উঠে লম্বা হয়ে শুয়ে একটা ঘুম দেবে।

উঠে দেখবে, খিদেয় শরীর চন্মন্ করছে। আবার খাওয়ার প্রসঙ্গ ওঠায় পান্নুভাই বিরক্ত হয়ে কথা ঘোরাতে বলেন, দুলাভাই আপনাদের চরদখলের কাজিয়া আজকাল কি একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে? একবারে বন্ধ হয়নি, তবে আমাদের ফ্যামিলির সরাসরি ইনভলভ্মেন্ট এখন প্রায় নেই-ই। ঐযে চক্চকে আলকাতরা রঙের দরোজা দেখছ, তালাবন্ধওটা বোঝাই লাঠি-সড়কি-বল্লম আর পুরনো জংধরা তলোয়ার ক’খানা। শিমূল মজা পেয়েছে, পান্নুভাইয়ের উদ্দেশ্য সফল। চৌধুরির গল্পের ঝোলার মুখ আলগা করা গেছে।

পান্নুভাইয়ের প্যাকেট থেকে সিগ্রেট নিয়ে ধরিয়ে লম্বা টান দিয়ে নীলু চোখ বুঁজলেন, ধীরে-ধীরে উচ্চারণ করলেন, ঐ-যে বললাম লাঠালাঠি কমেছে, সেও প্রায় বছর কুড়ি হয়ে এল। আমাদের চর দখলের মূল বিবাদটা ছিল শিমূলের পূর্বপুরুষদের সঙ্গে। ওপারে ওদের জোতজমা, পদ্মার এপারে আমাদের। রাক্ষুসী পদ্মা এবছর আমাদের জমি গ্রাস করল তো পরের বছর ওপারে মস্ত চর জাগল, ওরা দখল নিয়ে নিল সঙ্গে সঙ্গে। আমরা এপার থেকে ভূঁইহারাদের নেতৃত্ব দিয়ে কাজিয়ার জন্য তৈরি হয়ে ওদের চিঠি পাঠাতাম। শিমূলের পরদাদা অর্থাৎ দাদার বাবা মীরজী হুজুর তার দোয়াসুদ্ধ রীতি মাফিক লোক পাঠাতেন এপারে চৌধুরি বাড়িতে। সেই দূত বড় পানশী ভর্তি করে ভেট নিয়ে আমাদের বাড়িতে মেহমানখানায় এসে উঠতো। ঐ ভেটের মহিমা কি আপনার জানা, দুলাভাই? শিমূলের সময়মতো করা প্রশ্নাঘাতে নীলু খুশি হন। ভেট অর্থ প্রীতি উপহারঅন্তত আমরা তখন সেটাই মনে করতাম। শিমূলদের পীরের ফ্যামিলিওর দাদাও গন্দীনশীন ছিলেন বহু বছর। তো সেই মীরজী হুজুর সেকালে সম্বৎসর অঢেল উপহার আর সালামী পেতেন তার মুরীদদের সুবাদে, যা নাকি ওদের বাড়ির মেয়েদের নামাজের ঘরে একপাশে সংগৃহীত থাকতো। মানে চাল-ডাল-সবজি-মিষ্টি সব? শিমূলের বোকা প্রশ্নে চৌধুরী নাখোশ হননা মোটেই।

জবাব দিতে যাবেন, লক্ষ্য করেন, চৌধুরানিও কখন যেন হাতের কাজ সেরে এসে দু’ভাইয়ের মাঝে সমাসীন হয়েছেন। ওদের টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি করা, রান্না-সব সাঙ্গ আমারএখন গল্প শুনি খানিক, বলে নিশ্চিন্তমুখে বূ’ লবঙ্গগাঁথা পানের খিলি গোঁজেন। হ্যাঁ, হৃষ্ট চৌধুরি আসরের নতুন শ্রোতার পানে তাকিয়ে শিমূলকে বলেন, শোন, আমি তো আব্বার সঙ্গে তোমাদের বাড়িতে দেছি বিয়ের আগেওকখনো পরের বাড়ি মনে হত নাএত নিবিড় ছিল সেসময়ের মেহমানদারি, বুঝলে? কথার খেই হারাচ্ছেন, দুলাভাই, পান্নু সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন। না, হারাইনি, শিমূলের প্রশ্ন ছিল, মুরীদদের ভেট সবই কি নামাজের ঘরে রাখা হত? উত্তর হচ্ছে, না, খাবার-দাবার, শস্যদানা-সব যথাযথ ভাঁড়ারেকেবল মূল্যবান তৈজস, সোনারূপো, টাকাইত্যাদি অন্দরমহলের গর্ভে ঐ সুরক্ষিত কক্ষে রাখা হত। কাজিয়ার কথা কিন্তু এগোচ্ছে না, পান্নুভাই আবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

হ্যাঁ, হ্যাঁ হচ্ছে তো ঐ ভেটের প্রতিদানে আবার এবাড়ি থেকে যেত মরশুম বুঝে মান রাখার উপযোগী ভেটশীতে হয়তো খাঁচাভর্তি বাঁলিহাস, একমণী পাঙাশ গোটাকতক, বর্ষায় ইলিশের খাঁচা, মাটির বড় মট্কা বোঝাই রাজবাড়ির ক্ষীরের চম্চম্ এইসব আরকি। বেশ ভালোই তো, কাজিয়ার সুযোগটা তাহলে রইল কোথায়, শিমূলের স্বগত সংলাপ। হো হো হেসে নীলু বললেন, কাজিয়া আর ভেট আদান-প্রদান এর সবটাই উপলক্ষ্য মাত্র, লক্ষ্য ছিল দু’পক্ষেরই একসে হল জমি বাড়ানো অর্থাৎ প্রভাব, প্রতিপত্তি, দাপটের মাত্রা কেবলই বৃদ্ধি করা। আরে পাগল, ঐ ভেটবাহী দূতের হাত দিয়েই তো কাজিয়ার স্থান, কাল ঠিক করা হত দু’পক্ষের সুবিধা অনুযায়ীযাতে দু’দলই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে লড়াইয়ে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে পারে। তারপর হারজিত তো থাকবেই খেলতে নামলে এরকম একটা খেলোয়ারি স্পিরিট তখন খুব কাজ করত।

শিমূল, পান্নু হতবাক। চৌধুরী বিষন্ন, দু’চোখ স্মৃতিভারে মেদুর। এই শতাব্দীরই প্রথমার্ধে এই কালুখালি, ওই পদ্মাপারের পাবনায় এরকম অর্থহীন কাজিয়া লড়ত সরল গ্রাম্য মানুষ, দু’চারজন ভূস্বামীর অঙ্গুলি হেলনে, নির্দ্বিধায় প্রাণ দিত কেউ, বাকি জীবনে দু’পায়ে উঠে দাঁড়াত না অনেকেই, তবুও যেত। কাজিয়ার নেশা নাকি ছিল অদম্য। লেঠেল সর্দারদের হাতপা নিশপিশ করত, মারপিট ছাড়া সময় কাটতো না তাদের। ১৯৬০ সালে জমিদারি উচ্ছেদ হবার পর অনেক প্রাক্তন লেঠেল দুর্বলের জমি কেড়ে নিয়ে নব্য ভূস্বামী বনে গেছে, চৌধুরি জানালেন। শিমূলদের পরিবারের সঙ্গে আপনাদের বিরোধ আপনার বিয়ের পরই মিটে গেছে বলছিলেন, সেটা কতটুকু সত্যি? পুরোপুরি, পান্নুভাইয়ের প্রশ্নের উত্তরে নীলু বললেন, তোমার আপাই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল যে, আত্মীয়ের সঙ্গে জমির দখল নিয়ে বর্বর লড়াই, তাও আবার তোমার ওপর নির্ভরশীল প্রজা-রাইয়তদের প্রাণের ঝুঁকিই সেখানে বেশিসেই ঝগড়ায় কোন গৌরব, বীরত্ব, বাহাদুরিকিছুই নেই। আব্বা বুঝলেন, হজ্ব করে এসে তো ফকিরের জীবন যাপন করেছেন শেষের ক’বছর।

চাঁপাবু’ ওদের তাড়া দিলেন, হাত ধুয়ে এস তোমরা। নাকি এখানেই চিলম্চি আনতে বলব? আনু, তোর মামাদের হাত ধুইয়ে দিবি আয়। উরেব্বাস, বলে দু’হাত ওপরে তুলে শিমূল লাফিয়ে ওঠে, বলে, হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে, এক্ষুনি, আর একরাত্তির এবাড়িতে কাটালে আর দেখতে হবেনা। আর যদি বু’র কথামতো তেরাত্তির পার করি কোনক্রমে, তা’লে চতুর্থ দিবস প্রত্যূষেই নীলু চৌধুরিকে পূর্বপুরুষদের শক্রতার জের ধরে ডুয়েল লড়ার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতেও হয়তো দ্বিধা করব না। হাঃ হাঃ হাঃ। কি হল, দুলাভাইয়ের গল্প শুনে এরিমধ্যে সামন্ত সত্তা মাথাচাড়া দিচ্ছে নাকি? চাঁপাবু’র ঠাট্টা গায়ে না মেখে কলঘর থেকে হাত মুখ ধুয়ে এসে টেবিলে বসল। পড়েছ খানদানি যবনের হাতে, পান্নুভাই এপর্যন্ত বলতে না বলতেই শিমূল পছন্দ মাফিক পাদপূরণ করে ঝটিতি, বড়খানা খাবে সাথে। স্বাভাবিকভাবেই সে খাওয়া কেবল নম-নমো করে সারা হল। পেটে স্থানাভাব। খবর এল, ট্রেন এসেছে।

অতঃপর চৌধুরিবাড়ির পাট ওঠানোর পালা। দু’ভাই ওদের বোনের পদচুম্বন করল, ভাগ্নেদের গালে চুমো খেল এবং হাঁটা দিল। সঙ্গ নিলেন নীলু চৌধুরি আর তিন তল্পিবাহক। ওদের হাতে ব্যাগ আর খাবার। সদর পেরিয়ে বাঁক ঘোরার আগে শিমূল ফিরে দেখল একবার। চাঁপাবু’ চোখে আঁচল চাপছেন। ও আর তাকাল না পিছনে। চরৈবেতি চরৈবেতি। কয়লার ইঞ্জিন ফোঁসফোঁস করছে। স্টেশনমাস্টার প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করছিলেন। যাত্রীরা যে যার মতো উঠে গেছে ট্রেনে। চারদিক ফাঁকা ফাঁকা লাগে। কোন কম্পার্টমেন্টেই তেমন যাত্রীর ভিড় নেই। প্রথম শ্রেণীর কামরা খালি একেবারে। ওরাই শুধু যাত্রী। শিমূল অনুনয়ের সুরে বলে, দুলাভাই, এবার আপনি নেমে যান। মাস্টারমশাই সিগন্যাল না দিলে ওদিকে গার্ডও তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন। তথাস্তু, নেমে যাচ্ছি। যশোর পৌঁছে টেলিগ্রাম করে দিও। ঢাকায় পৌঁছে আরেকটা, কেমন? নীলু চৌধুরি নেমে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ান। ট্রেন হুইস্ল বাজিয়ে হূশ-হূশ স্টিম ছেড়ে চাকা গড়িয়ে দেয়। ওরা জানালার পাশে বসে হাত নাড়ে হাসিমুখে।

হ্যাঁ, মনে রাখার মতো মানুষ বটে আপনার ভগ্নিপতিটি, শিমূল বলে আর জুতোর ফিতে খোলে। পান্নুভাই বলেন, যা বলেছ, তুমি লম্বা হচ্ছ কেন ? শোবার প্রেসক্রিপশ্যন তো আমার জন্য। দু’ভাই গলা মিলিয়ে ‘অট্ট অট্ট হাসিল’। কোন্ স্টেশনে নামতে হবে আমাদের? আসলে আমরা যাব কোথায়, ঠিক করেছে? আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন, শিমূল বলে, পাংশায় নামি চলেন। পাংশায় কেন? পাংশায় নিরুখালার বর স্যানিটারি ইনস্পেক্টর সাহেবের বাসা। ওখানে বসে হাটগোপালপুর আর বালিয়াকান্দি যাবার সুলুকসন্ধান মোটামুটি জেনে নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়া, ব্যস, বলে শিমূল আবার চোখ বোঁজে আর গুনগুন করে সুর ভাঁজে।

পাংশা। পাংশা। কুলিদের হাঁকডাকে ওদের তন্দ্রা টুটে যায়। লাফিয়ে উঠে বসে, জুতো পায়ে গলায়, ঝোলাঝুলি নিয়ে প্ল্যাটফর্মে নেমে পড়ে, উবু হয়ে বসে জুতোর ফিতে বাঁধে। টিকিট কালেক্টরকে টিকিট দুটো গছিয়ে দিয়ে ওরা নিচে রাস্তায় নামতে সিঁড়ি ভাঙে। এই যে ভাই, স্যর, আপনাদের তো যশোরের টিকিট। এখানে নামলেন কেন ? কোথায় যাবেন ? টিকিটবাবুর অতগুলো প্রশ্নের জবাবে শিমূল একবার ফিরে তাকায়, চেঁচিয়ে বলে, ঠিক আছে। মোটামুটি পরিচ্ছন্ন দেখে একটি দোকানে ওরা চা খেতে ঢুকল। কড়াইতে মৃদু আঁচে দুধ জ্বাল হচ্ছে। ওপরে মোটা ঘিয়ে রং সর তৈরি হয়েছে। সরের পর্দা ফুটো করে বাষ্প ঠেলে ঠেলে উঠছে বুদ্বুদের আকারে। সরটা ক্রমশই লোভনীয় চেহারা নিচ্ছে। নতুন চা-পাতা দিয়ে কড়া লিকারের চা দাও তো দু’কাপ। পান্নুভাই চায়ের ফরমাশ দিয়ে সিগ্রেট ধরান। কাপ নাই, গিলাসে দেব ? দোকানি ছেলেটি সপ্রশ্ন তাকিয়ে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, দাও।

আরে কাপ আর গিলাস তো একই, নাকি বল ? শিমূল আঞ্চলিক উচ্চারণে আলাপ জোড়ে ছেলেটির সঙ্গে। না, এক না, সায়েবরা গিলাসে অনেক সুমায় খাতি চায় না, তাই আমি আগেই কয়ে দেই। তুমি খুব সৎ ছাওয়াল, বুজতি পারছি। দ্যাও, চা, দ্যাও। পাংশার সেনিটারি ইনিসপেক্টার সাহেবের অফিস-বাসা, এসব কনে, কোনদিক্, কওতো মণি ? ও-ই, ছেলেটি তুলে আঙুল-নির্দেশে দেখায়, যে মসজিদ দেখতেছেন, ওর পিছনে মাট, ওই মাটের ডাইন দিক সেনিটারি অফিসারের বাসা আর অপিশ। সাবাশ ছেলে, শিমূল খুশি হয়ে বলে ওঠে। স্যর, ওই মুটা সর ইট্টু দেব আপনারে, খাবেন বিস্কুট দিয়ে? হেসে উঠে শিমূল ছেলেটির নাম জানতে চায়, তুমার নাম কি মণি ? মোজিবর, বলে সে আবার শুধোয়, দেব বিস্কুটির উপর মুটা করে সর আর চিনি দে?

একশোবার দিবা, দ্যাও, খাই, বলে শিমূল একটি বড়োতামাকের বিড়ি ধরায়। পান্নুভাই তার পকেট রেডিও কানে লাগিয়ে দিয়ে কি যেন শোনেন আর আঙুল দিয়ে হাঁটুতে তাল ঠোকেন। তাকেও সর-বিস্কুট দেবে কিনা, ইশারায় জিজ্ঞেস করাতে উনি বারণ করলেন। মুখে বললেন, তুমি চালিয়ে যাও। পিরিচে টোস্টের ওপর মোটা সরের পরত, তাতে ছড়ানো মোটা দানার লাল চিনি। শিমূল বিস্কিট খেতে খেতে ওই খাবারের সঙ্গে আরেকরকম টোস্ট ‘হিলসা অন টোস্ট’-এর স্বাদ মিলিয়ে দেখছিল। মজিবরের টোস্টের টেইসট অনবদ্য বটে। মজিবরকে যথেষ্ট খুশি করে রেখে ওরা ওদের বোঝা পিঠে ফেলে, হাতে ঝুলিয়ে হেঁটে মিনিট পাঁচেকের মধ্যে থানা পরিচ্ছন্নতা পরিদর্শকের কোয়ার্টার্সের দরজায় পৌঁছে কড়া’নাড়া দিল।

দরজার কপাট মেলে দাঁড়ালেন নিরুখালা। আটপৌরে শাড়ির আঁচলে হলুদ-মরিচবাটার দাগ। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোঁটা। রক্তবর্ণ, গোল টিপটা অক্ষত। গৌরী নিরুখালা সেই পনের বছর আগের ছিপছিপে টিনএজার নিরুই রয়ে গেছেন। চোখে, ঠোঁটে বিস্ময়ের কুঞ্চন, বক্রতা। এককথায় ইনচ্যান্টিং। পানু, শিমূল, এসো, এসো। ওরা ভেতরে ঢুকলে খালা সদর বন্ধ করে উঠোন পেরিয়ে ইংরেজি ‘এল’ অক্ষরের আদলে তৈরি একতলা বাংলোর একপ্রান্তে রান্নাঘরে যেতে যেতে বললেন, তোমরা ব্যাগ রেখে বারান্দায় বস। হাওয়া দিচ্ছে বেশ। গা ঠান্ডা কর। আমি রান্না সারতে সারতে তোমরা গোসল সেরে নেবে, কেমন? আরে মাসী ওগো, আর দু’মুঠো চাল তুলে দাও হাঁড়িতে, ভাগ্নে দু’জন এলো বাড়িতে, ও মাসী গো, ভাগ্নে দু’জন এলো বাড়িতে…শিমূলের ইমপ্রোভাইজ্ড পল্লীগীতি শুনে নিরুখালা, পান্নুভাই হেসে সারা। তুই শিমূল আর কবে বড় হবি? খালা প্রশ্ন করেন গুয়োমৌরী হাসি মুখে মেখে, তুই না এবার এমএ দিয়েছিস? তোমাদের কাছে আমি সেই পাতলা খান লেইনের শিমূল-ই থেকে যেতে চাই, তুমিও তো আমার সেই আটান্ন সালের বালিকা খালাটিই আছো, গান-টান গাও তো? কড়ায় হাতা নাড়তে নাড়তে নিরু মিষ্টি হাসেন, তোমার খালু গান ভালবাসেন। প্রকৃতিপ্রেমী শান্ত মানুষ, অবসরে সঙ্গীতচর্চা করেন। আমি আগের মতোই গান শুনি, শুনতে শুনতে গাই।

ভালোই চলছে তাহলে তোমার সংসারযাত্রা, বলে শিমূল কেজো গলায় জিজ্ঞেস করে, খালু সাহেবটি কখন ফিরবেন? উনি তো রাজবাড়ি গেছেন গতকাল, অফিসের কাজে। হয়তো কাল ফিরবেন কাজ সেরে। না, মানে, আমরাসত্যি কথা বলতে কি, তোমার এখানে আসার ভাবনা আজ সকালেই মাথায় চাপল, তাই মাছপাড়া না নেমে পাংশা স্টেশনে নেমে পড়া। উদ্দেশ্য, তোমাদের সঙ্গে দেখাও হবে আর পথের হদিস জেনে নেবো একই সঙ্গে। রথদেখা কলাবেচা তোমাদের হবে, তবে রথ ভাল করে না দেখে কলা বেচতে যেতে পারবে না, নিরু খালা বলে উঠলেন, যাও এবারে গোসল সার। তোমাদের হলে আমি ভাত বেড়ে দিয়ে বাথরুমে ঢুকব। নইলে খেতে খেতে বিকেল হবে। যাও, ওঠো।

অতঃপর শিমূল ওগো মুসাফির, বাঁধ গাঠরি’ আপ্তবাক্য শিকেয় তুলে রেখে উঠল। ঘরে ঢুকে দেখল, খাটে পান্নুভাই চিত হয়ে শুয়ে। ফুরফুর করে হাল্কা নাকও ডাকছে। ঘুমোলেন নাকি, ও পান্নুভাই, ওঠেন, নিরুখালার রান্না শেষ। আরেকবার গোসল আমি করব না, আপনি? আমিও না। খালাকে গোসল সেরে আসতে বল, একসঙ্গে খেতে বসব, বলে পান্নুভাই পাশ ফিরে শোন। ও নিরুখালা, তুমি গোসল কর জলদি, তারপর খেতে বসব সবাই, পান্নুভাই বললেন। এই গরমে তোরা গায়ে পানি না ঢেলে খেতে পারবি, নিরুখালার অভিব্যক্তিতে সরল অবিশ্বাস বাক্সময়। আমরা সকালে কালুখালি চৌধুরি-বাড়িতে পুকুরে ডুব দিয়ে অবগাহন স্নান সেরেছি। কাজেই, এখন দেখা যাচ্ছে কেবল তুমিই অস্নাত। রান্না গুছিয়ে রেখে খালা ওঠেন, হ্যাঁ, তোর খালুর পিওনটা এখনি এসে বলবে, চাচীমা, খাবার দ্যান। নিরু নিজের ঘরে ঢোকার আগে গেস্টরুমে উঁকি দেন এহ্, পান্নু তো ঘুমিয়ে কাদা, আমি আসছি, বলে তড়িঘড়ি পাশের ঘরে ঢুকে তোয়ালে-শাড়ি নিয়ে বেরিয়ে আসেন। বাথরুমের দরজা বন্ধ হলে পান্নুভাইয়ের ঘুম ভাঙে, উঠে বসেন।

পান্নুভাইয়ের কথামতো দু’ভাই মিলে রান্নাঘরের সামনে বারান্দায় মাদুর পেতে কালুখালি থেকে আনা খাবার বের করে সাজিয়ে ফেলে। এখনো লুচি ঈষদুষ্ণ, খাসির ভুনা মাংস সুগন্ধ ছড়ায়, হাঁসের মাংস আর নারকেলের টুকরোয় মাখামাখি, খিচুড়িটা গরম করলে ভাল হয়, আলুর দমে গোলমরিচের গুঁড়ো এখনো দৃশ্যমান। একিরে, শিমূল, তোরা কি হূডিনি আর পিসি সরকার নাকি? এসব পেলি কোথায়? আমি তো শিং মাছের চচ্চড়ি রেঁধেছি উচ্ছে দিয়ে, নিরুখালা এই পর্যন্ত বলে মুখ টিপে হাসেন। শিমূলের ভ্রু কোঁচকানো দেখে মজা পেয়েছেন। আরও রেঁধেছি রে, তোর প্রিয় লালভাত, আলু ভাজা আর পান্নুর জন্য পেঁপের ডালনা, হবে না? খুব হবে, তুমি এসে বসতো আগে, আজ আমরা তোমাকে একটু বেড়ে খাওয়াই, আলুভাজা খেতে ওর তর সইছে না। তিনজনে বসে খুব হৈচৈ করে খেল। এরিমাঝে পিওন এসে হাজির। ওর খাবারটা তুলে রাখা ছিল। অভ্যাসমতো রান্নাঘরে পিঁড়ি পেতে খেতে বসতে যাবে, ওকে নিরুখালা ডাকলেন, তুলসী, শোন এদিকে, মিটসেফ থেকে একটা ধোয়া প্লেট নিয়ে এস। সসঙ্কোচে তুলসী প্লেট সামনে ধরতে খালা দু’রকম মাংস, লুচি, খিচুড়ি তুলে ওর প্লেট ভর্তি করে দিলেন। বললেন, এবারে গিয়ে বসে তোমার যেটা যতটুকু ভাল লাগবে, খাবে আর বাকিটা গুছিয়ে সব ভোলার জন্য নিয়ে যাবে, ঠিক আছে ? ভোলা ওদের অফিসের পোষা কুকুর, খালা বলেন।

খাওয়া শেষে নিরুখালা পানের বাটা নিয়ে ওদের ঘরে এসে খাটে উঠে বসলেন। তুমি পান খাও নাকি? শিমূলের অবাক প্রশ্নে খালা হাসলেন, গজদাঁতের সামান্য আভাস দেখা দিয়ে অদৃশ্য হল। নারে, মাংস-টাংস খেলে মুখশুদ্ধি হিসেবে খাই, তোরা নিবি? দাও, শুধু পান পাতা আর চুনের ছোঁয়া একটু। আমার দরকার নেই, বলে পান্নুভাই…।

জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে সিগ্রেটের ধোঁয়া ছাড়েন। পান মুখে দিয়ে খালা জিজ্ঞেস করেন, তোরা চৌধুরী জামাইয়ের বাড়ি থেকে এলি, বুঝলাম। বলছিলি আরও কোথায় কোথায় যেন এদিকে যাবার ইচ্ছে তোদের।…হ্যাঁ, শিমূল বলে, যাব আউয়াল মামার সরকারী ডিসপেন্সারি আর আতর মামার ঠিকানা ছুঁয়ে নাড়–য়া ঘাটে। সেখান থেকে গড়াই পার হয়ে চৌগাছি, নানার বাড়ি। পান্নুভাই আবার ঘুমিয়ে পড়েছেন বা চোখ বুঁজে নিজের ভাবনায় ডুবে গেছেন।

যাবি কিভাবে? খালা চিন্তিত মুখে বলেন, এখানে থানা অফিসাররা সবাই সাইকেলে ট্যুর করে। আর পেতে পার ঘোড়ার গাড়ি। বাহ্, তাহলে তো বেশ হয়, পান্নুভাই জেগে উঠে জায়গা মতো তার মতামত দেন। এখান থেকে নাড়–য়ার পথে প্রথমে পড়বে আউয়াল ভাইয়ের ডাক্তারখানা, নিরুখালা আবার চিন্তামগ্ন হন, কিন্তু তাকে তো সব সময় বালিয়াকান্দিতে পাবে না। সাতদিন এখানে তো পরের সপ্তাহে রাজবাড়িএই তার রুটিন। ওখান থেকে অল্পদূরেই আতরভাইয়ের স্কুল, থাকেন উনি হাটগোপালপুরে। বেশত’, আমরা তোমার বাসায় রাত কাটিয়ে, সকালে গোসল-নাস্তার পাট চুকিয়ে এখান থেকে বালিয়াকান্দির পথে রওনা হব, শিমূল খালাকে নিশ্চিত করে। নিরু হাসিমুখে মৃদু গলায় রিন্রিন্ বাজেন, তোদের তো আসলে কোন কাজ নেই, তোর খালু এলে তারপর যাস, কেমন? না, খালা, শিমূল একজায়গায় বেশিক্ষণ টিকতে পারেনা, ওর পায়ের তলায় নাকি সর্ষে র্সর্স করে। আর তে’রাত্তির পার করলে তো হাড়ে দুব্বোঘাস গজাবে, তাই কাল সকালেই দেখা যাবে সবার আগে ওই লোটাকম্বল লাঠির মাথায় বেঁধে তৈরি। কথা শেষ করে পান্নুভাই আবার জানালার ধারে সরে গিয়ে সিগ্রেট ধরান।

আয়, শিমূল আমরা পুরনো দিনের গল্পগুলো ঝালাই করি। খালার ডাকে শিমূল উঠে বসে, বালিশ কোলে টেনে নিয়ে তাতে কনুই ভর দিয়ে ‘দ্য থিঙ্কার’ হয়ে বসে বলে, তুমি যে আমাদের সঙ্গে ছাদে আড্ডায় যোগ দিতে, কাজের ফাঁকে সময় পেলেই আর গান গাইতে মনে আছে? নেই আবার? তোমার খালুও জানেন সব কাহিনী। ঐটে বলেছ? ঐযে তবিব খালুর সঙ্গে মুকুল সিনেমায় ‘শেষ পরিচয়’ দেখেছিলাম আমরা? শিমূলের প্রশ্নে খালা নড়েচড়ে বসেন, তোর তো এখনো সবই মনে আছে দেখছি, নিরু ঠোঁট টিপে নিঃশব্দে হাসেন, বলতো শুনি? বলছি। একটা সিগ্রেট ধরিয়ে নি’ আগে। ধোঁয়া ছেড়ে শিমূল খালার উৎসুক নির্মল হাসিমুখের পানে ফিরল, বলল, আমার বিশেষ করে মনে আছে যে, আমাকে মা যেতে দিতে চাইছিলেন না। তোমার অনুরোধ সত্ত্বেও শেষে বড়খালার আদেশে নিমরাজি হয়েছিলেন বলেই আমার যাওয়া ঘটেছিল শেষ পর্যন্ত। মনে নেই আবার? প্রচুর আলুচিপ্স আর মরিচগুঁড়ো মাখা বাদাম-চানাচুর খাওয়া হয়েছিল সেদিন ঘন্টা তিনেক জুড়ে। আর ইন্টারমিশনে যে আইসক্রিম খেয়েছিলাম আমরা, ভুলে গেছ খালা? নারে, কি ফ্লেভারের ছিল বলতো? শিমূলকে চোখ বুঁজতে দেখে খালা শুধোন হাসিমুখে। পিস্টাচিত্ত, শিমূল চেঁচিয়ে উঠলো, মানে পেস্তা রংয়ের তো বটেই, তাতে আবার পেস্তার টুকরো বেঁধানো ছিল। অপূর্ব স্বাদ। হুঁ-উ-উ। পেস্তার সুগন্ধ আর ক্রিমে মাখামাখি ম’ম’ অবস্থা একেবারে। গিয়েছিলাম কে কে বলবো? তুমি, আমি, খালু আর খুবরূ।

মানে মাহমুদ তো? খুবরূ নামে তো ওকে আর কেউ ডাকিনা আমরা, খালা বলেন সতর্কতার সঙ্গে, আউয়াল ভাইয়ের ঐ ছেলেকে দত্তক নেয়ার পরই তো বড়বু’ ওর ছেলেবেলায় রাখা ডাকনাম খুবরূ ছেঁটে ফেলে পোষাকী নামের লেজটুকু-শুধু ‘মাহমুদ’ ডাকনাম হিসেবে চালু করে দিয়েছিলেন। হ্যাঁ, শিমূল আনমনে বলে, তো কাল আমরা সেই মাহমুদের বাবা আর বড়বোনের অতিথি হতে যাচ্ছি। মানুষের জীবন কি বিচিত্র সব খাতে বয়ে চলে। কোথাকার মানুষ কোথায় ভেসে যায়। বলো ? আচ্ছা, আমরা পাতলা খান লেইনে ফেরত যাই আবার, কেমন? অগ্নিপরীক্ষা, মা ও ছেলে, ছেলে কারএসব ছবির কথা তোমার মনে নেই, নিরুখালা? পুরনো ছবির গানই আমরা বেশি শুনি, খালা বলেন, ঐ যাঃ, গল্পে গল্পে দুপুর আড়াইটের অনুরোধের আসর যে মিস্ করে গেলাম? দাঁড়া, ওঘরে গিয়ে রেডিও চালু করে দিয়ে আসছি। চা খাবি তো? পান্নু? অবশ্যই, খাবে, তুমি চায়ের পানি চাপিয়ে দিয়ে এস, বলে শিমূল উঠে গিয়ে টেবিলে রাখা জগ থেকে গেলাসে পানি ঢালে, খায়, তারপর চটি ফট্ফটিয়ে টয়লেটে যায়। ও ঘর থেকে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের গাওয়া ‘মাটিতে জন্ম নিলাম, মাটি তাই রক্তে মিশেছে’ গান ভেসে আসে। কি গমগমে গলা! পান্নুভাই চোখ মেলে বলেন। তাকিয়ে দেখেন, ঘর খালি। গেল কোথায় সব?

এইতো, নিরু বলে ওঠেন ঘরে ঢুকে, তোমাদের জন্য চায়ের পানি ফুটতে দিয়ে এলাম। শিমূল এল ধনঞ্জয়ের সঙ্গে গাইতে গাইতে। এখনো সব গানের কথা মনে রাখতে পারিস তুই? আগের মতোই? নিরুখালা চেয়ারে বসে রাইটিং টেবিলে আঙুল ঠুকে তবলা সঙ্গত করতে করতে শুধোন। রেডিওতে ততক্ষণে ‘এক বৈশাখে দেখা হল দু’জনার, জ্যৈষ্ঠতে হল পরিচয়’ গান বাজছে। আসছে আষাঢ় মাস, শিমূল হেসে গলা মিলিয়েছে, মন তাই ভাবছে…মাথা দুলিয়ে শেষতক গেয়ে গেল গায়িকার সঙ্গে। চমৎকার ডুয়েট হ’ল, নিরু হেসে উঠে হাততালি দিলেন। খালা, হাততালি পরে হবে, তুমি না চায়ের পানি চুলোয় চড়িয়ে এসেছিলে? শিমূলের সাবধানবানী শুনে নিরু ওহ্হো, আমি আসছি রে নইলে আবার তোদের চায়ের বদলে গজ খেতে হতে পারে, তাই না? বলে চপলা হরিণীর মতো রান্নাঘরে উড়ে যান যেন। শিমূল ওঘরে ঢুকে রেডিওর টিউনিং নব ঘুরিয়ে কাউন্ট ডাউনে সেট করে রেখে এল। ভল্যুম ও বাড়িয়ে দিয়েছে।

নিরুখালা ট্রেতে তিন কাপ চা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। শিমূল হাত বাড়িয়ে ট্রেটা নিয়ে সন্তর্পণে বিছানার ওপর নামাল। পান্নুভাই খুশি হয়ে আধশোয়া হলেন, দাও আমারটা দাও, একচামচ চিনি নেড়ে দাও। পান্নুভাইকে চা এগিয়ে দিয়ে শিমূল নিরুখালাকে জিজ্ঞেস করে, তোমার? আমিও এক চামচ, বলে খালা এসে খাটের বাজুতে হেলান দিয়ে বসেন পা ঝুলিয়ে। বাচ্চা মেয়ের মতো পা দোলান। সবাই চুপচাপ। চায়ে চুমুক চলছে। এঙ্গেলবার্ট হাম্পারডিঙ্কের কন্ঠে গীত রেইনড্রপ্স কিপ ফলিং অন মাই হেড…গানের সুর ভেসে আসে রেডিও অস্ট্রেলিয়া থেকে। উদাস, ঘুম-ঘুম ঘু-ঘু-ঘু-উ-উ-ঘু-উ-উ ডাক ভেসে আসে জানালার বাইরে আমগাছের মগডাল থেকে। এরিমধ্যে সামনের মস্ত মাঠের এখানে-সেখানে ছেলের দল খেলতে এসে গেছে। ওদের হৈ-হুল্লোড়ের শব্দ দূর থেকে পাখির কিচিরমিচির যেন। কাউন্টডাউনে এবার বাজছে ফ্র্যাঙ্ক সিনাত্রা। শিমূল, তোদের কলেজে যে একটা ব্যান্ড ছিল, কি নাম যেন ? নিরু খালার প্রশ্নে ওর গুন্গুন্ থেমে যায়, বলে, হ্যাঁ, ‘দ্য আয়োলাইট্স’। আমাদের ক্লাসের ইখতিয়ার ওমর বিটল্সদের সব লেইটেস্ট নাম্বার গাইত নটর-ডেইম ডে-তে। এই তো ছ’সাত বছর আগের কথা সব। অথচ কত দূরে সরে গেছে দিনগুলো এরিমধ্যে। নিরুখালা উঠে রান্নাঘরে যান। যেতে যেতে বলেন, শিমূল, তোরা ক্যারম বা লুডো খেললে ওঘর থেকে নিয়ে আয়, আমি মুড়ি ভেজে নিয়ে আসছি। পান্নুভাই বলে ওঠেন, মুড়িভাজার সঙ্গে আমার একটু আদাকুচি চাই।

শিমূল খেলার সরঞ্জাম আনতে বারান্দায় পা দিয়ে শুনল, সদরে কড়া নাড়ছে কেউ। আমি যাচ্ছি, বলে একলাফে উঠোনে নেমে প্রায় দৌড়ে গিয়ে দরজা খোলে। তুলসী পিওন, মাথায় রান্নায় খড়ি একবোঝা। বারান্দায় উঠে রান্নাঘরের লাগোয়া ভাঁড়ারে ঢুকে মাথার বোঝা নামায় সে। গামছায় ঘাম মুছতে মুছতে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়ায়। চাচীমা, খড়ি নিয়ে আইছি। হ্যাঁ, তুলসী, তুমি মোড়া টেনে বস। চা-মুড়িভাজা দিচ্ছি। শিমূল ঘরে ঢুকে মাদুর চিছিয়ে ক্যারম খেলার জায়গা ঠিক করে বোর্ড-গুটি-বরিক পাউডারের কৌটো নিয়ে এসে গুছিয়ে বসল। কয়েক দানা পাউডার বোর্ডে ফেলে স্ট্রাইকার দিয়ে ঘষে ঘষে বোর্ড পিচ্ছিল করে তুলল। তারপর গুটি সাজিয়ে খেলার জন্য তৈরি হয়ে পান্নুভাইকে ডাকলো, নিরুখালা আসতে আসতে আমরা একটু প্র্যাকটিস করে নিই, আসেন। পান্নুভাই খাট থেকে নেমে এঘর-ওঘর আঁতিপাঁতি করে খুঁজে ছাইদান নিয়ে এসে বসলেন। শিমূল স্ট্রাইকার এগিয়ে দিল পান্নুভাইয়ের দিকে, আপনার হিট। তথাস্তু, বলে পান্নু গুটির চাকে আঘাত করেন। দুর্বল হিটে চাকের মধু মোটামুটি আগের মতোই জমাট থেকে গেল। সুযোগ পেয়ে শিমূল রিবাউন্ড শট্ নিয়ে চাক ছত্রখান করে দিল। হিটের প্রচন্ড ইমপ্যাক্টে এদিক-ওদিক দিশেহারার মতো ছুটোছুটি করে কালো গুটি একটি ওর বাঁ পকেটে এসে ঢুকলো। পান্নুভাই হতাশভাবে বললেন, হয়ে গেল, তুমি যা একটা কান্ড করলে, আর কি আমি সুযোগ পাব ?

পাবে, পাবে বলতে বলতে নিরু ট্রে নিয়ে এসে বসলেন, শিমূল, এই তোমার ভাজা মুড়ি, ওপরে ছোলার ঘুঘনি ছড়িয়ে দিয়েছি। কাঁচা মরিচ, লেবু, আদাকুচি যে-যার রুচিমতো নিয়ে নাও। ঘুঘনি আর লেবুর রসের মিশ্র সুগন্ধ শিমূলের নাকে পৌঁছতেই ও গোটা দুই কালো গুটি বোর্ডে রেখে স্ট্রাইকার ছেড়ে দিল পান্নুভাইকে। মুড়ির বাটি তুলে তাতে চামচ চালালো, মুখে পুরলো দু’চামচ, চিবিয়ে বুঝতে চাইলো, ওতে আরও কি যোগ করে ভ্যালু এ্যাডিশান করণীয়। তারপর মুড়ির ওপর আদাকুচি আর কাঁচা ঝালের কুচি ছড়িয়ে, উদারভাবে লেবুর রস যোগ করে খাবার গার্নিশিং-এর পাট চোকাল। খালা বলে উঠলেন, তুই খাদক বটিস্রে একজনা। পান্নুভাই ওদিকে লাল গুটি বোর্ডে না থাকার অজুহাতে গোটা দুই সাদা পকেটস্থ করেই ক্ষান্ত হিলেন। শিমূল ধীরেসুস্থে কনফিডেন্টলি কালো গুটি দু’টো পকেটে নামিয়ে দিয়ে পয়েন্টস গুণললাল গুটির দরুন পাঁচ আর বোর্ডে দৃশ্যমান সাত সাদা গুটির সাতমোট বারো পয়েন্ট ওর ঝোলায় জমা হল।

সবাই মুড়ি খাওয়ায় মন দিয়েছে। এত মজার মিশেল দেয়া মুড়িভাজা এক সিটিং-এ সাধারণত জোটে না। চোখের জল, নাকের ঝোলমিলেমিশে একাকার। মুড়ি শেষ করে শিমূল উঠে গিয়ে বারান্দায় ধারে, উবু হয়ে বসে মুখ হাঁ করে লালা ফেলতে লাগল অনর্গল। মিনিট খানেকের মধ্যে জিভের জ্বালা কমে এল। ভেতরে এসে একঢোঁক করে পানি মুখে নিয়ে খানিকক্ষণ রেখে মুখবিবর শীতল হলে গিলে ফেলাএই প্রক্রিয়ায় ক্রমশঃ দেহমনের আক্ষেপ-বিক্ষেপ কমে এল। নতুন করে গুটি সাজিয়ে খেলা শুরু হল। এবারে শিমূল একদিকে এবং পান্নুভাই-নিরুখালা আরেকপক্ষ। অতিরিক্ত শিভ্যালরি দেখাতে ও প্রস্তাব দিল, অনুপস্থিত চতুর্থ খেলোয়ারের দানও সে খেলবে না অর্থাৎ সত্যিই সে দু’জনের বিরুদ্ধে একাই খেলবে। পান্নুভাই কিছু না বললেও নিরুখালার তাতে প্রবল আপত্তি, কেন রে পান্নু, ও যে দেখছি আমাদের খেলোয়ার হিসেবে মিনিমাম সৌজন্যও দেখাচ্ছে না, ওর এত বড়ো সাহস ? সাহসের কি আছে, শিমূল মিটমিট করে হেসে বলে, যদিও তুমি আজকাল কেমন খেলছ, আমি জানিনা, তাও সাহসে ভর করে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলাম। নিরু বলেন, যদি নিলগেম খেয়ে যাস, তাহলে কি হবে? নিল-এ হারলে আর খেলব না আজ, আড্ডা হবে ম্যারাথন। শিমূলের সরল উচ্চারণে তিনজনেই হো-হো হাসল প্রাণ খুলে। আহ্, কি বিশুদ্ধ আনন্দ। জীবন এত ছোট কেনে, ঠাকুরঝি?

শিমূলের উপর্যুপরি কুইপ শুনে সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ে। তোর এতও মনে থাকে রে, শিমূল, হাসতে-হাসতে নিরুখালা সস্নেহে ওর লম্বা চুলে সরু আঙুল চালিয়ে স্ক্যাল্প মাসাজ করে দেন। শিমূল প্রশ্রয়ে খালার কোলে মাথা পেতে শুয়ে পড়ে বলে, ভাল করে আরাম দাও। পান্নুভাই উঠে ক্যারম বোর্ড, গুটি গোছগাছ করে একপাশে সরিয়ে দেন। পায়ে চটি গলিয়ে বারান্দায় যান পায়চারি করতে। পান্নুকে বিয়ে-টিয়ে করতে বল্ এবার, নিরুখালা পরামর্শ দেন। হুম্, শিমূল বলে, আর তো খেয়েদেয়ে কাজ নেই আমার। বিএ পরীক্ষাটাই দেওয়াতে পারলাম না এই ন’ বছরে। ওর বন্ধুরা সবাই ডিগ্রী, মাস্টার্স করে, চাকরিতে প্রমোশন নিয়ে, সংসারী বনে গেছে, রসেবশে আছে সবাই। আর পান্নু বৈরাগীকে দেখ। আমি ওর সঙ্গে মিশি শুধু একটাই কারণে, বলতো কি সেটা? নিরুখালা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে গিয়ে চেপে যান, বলেন, জানি, দু’জনেই তোরা সেই ছোট্টটি থেকেই বুকওয়ার্ম। আমারই কেবল লেখাপড়া হলনা। শিমূলের ঘুম এসে যাচ্ছিল আরামে, তড়াক্ করে উঠে বসে বলল, এই আফসোস আমি শুনবোনা, খালু সেই কবেকার এমএ পাস দেয়া ভদ্রলোক, সঙ্গীত রসিকও বটেন, তাহলে তোমার বিদ্যার্জন আটকাচ্ছে কোথায়? সেসব কিছুনা, পরিবেশ, পারিবারিক সমর্থন কিছুরই কমতি ছিল না। আসলে আমারই গড়িমসির কারণে নিয়মিত লেখাপড়া আর পরীক্ষায় বসা হয়নি।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। পান্নুভাই পায়চারি করেই যাচ্ছেন। চলো, আমরা সামনের মাঠে আধঘন্টা দ্রুত হেঁটে আসি, বলে শিমূল উঠে পড়ে। আমি? এই চটি তো ছিঁড়ে যাবেরে জোরে হাঁটলে, খালার কন্ঠ মিয়োনো, শরীরও কেমন এলিয়ে পড়েছে। তোমার জুতো নেই? কাপড়ের জুতো? শিমূলের মুহুর্মুহু প্রশ্নে খালা বিব্রত হয়ে উঠে পাশের ঘরে গিয়ে বাটার ক্যানভাস শূবের করে পরে নেন।

কোমরে শাড়ি পেঁচিয়ে যুদ্ধংদেহি ভঙ্গিতে বলেন, চল্ দেখি তোর দ্রুত হাঁটা কাকে বলে একবার দেখে আসি। পান্নুর মুখ নিঃশব্দ হাসিতে ভাঙে, আমি আছি, শিমূল, তোমরা ব্যায়াম সেরে এস। দাঁড়া, খালা বলেন, তুলসী বাতিগুলো পরিষ্কার করে রেখে গেছে, জেলে দিয়ে যাই।

হারিকেন জ্বেলে ঘরে, বারান্দায় রেখে ওরা বাইরের মাঠে ঝকঝকে তারাখচিত আকাশের নিচে পাতলা আঁধারে হাত ধরাধরি করে হাঁটতে লাগল। শিমূল খালার হাত ধরে নিল প্রথমেই, নইলে ওকে হাঁটানো যাবেনা; হাঁটা হবে না ওর। মিনিট দশেক হাঁটতেই বিন্বিনে ঘাস ফুটে উঠল শিমূলের মাথায়, ঘাড়ে, মুখে, হাতে। একটু আস্তে হাঁট্ না, খালার কব্জিতে এটেঁ বসা ওর হাতের তালু ঘেমে চট্চট্ করছে, টের পেল। ছাড়ার পাত্র নয় সে, আধঘন্টা হতে ঢের দেরি। কাজেই, কথা কম, কাজ বেশি আপ্তবাক্য শিরোধার্য করে শিমূল নিরুখালাকে প্রায় তাড়িয়ে নিয়ে চল্ল, মাঠের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত, আবার ফেরত আসা, আবার…। শিমূলের পরিশ্রম একটু বেশি হচ্ছিল, কিন্তু নিরুখালার হালকা শরীর প্রায় উড্ডীন পরিক্রমা করে চলছিল। অবশেষে পঁচিশ মিনিটের মাথায় ওরা ধীরে ধীরে হাঁটার বেগ কমাতে লাগল। হাত ছেড়ে দিয়ে শিমূল ফ্রিহ্যান্ড ব্যায়াম করল মিনিট কয়েক। তারপর ওদের বাসার দরজার সামনে ঘাসের গালিচায় বসে পড়ে জিরোতে লাগল। খালা আঁচলে মুখ মুছে আকাশপানে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, বহুদিন পর হাঁটলাম আজ। হাঁটার মতন হাঁটাই বটে। তোমার কাফ মাসল একটু মাসাজ করো, নইলে দড়কচ্চা মেরে গেলে কষ্ট পাবে পরে, বলে শিমূল নিজের পা মাসাজ করতে লাগল হালকাভাবে।

আগে বলিসনি কেন? এত কষ্ট করে হাঁটা, তারপর এখন আবার মালিশ করো, আমার দ্বারা ও হবেনা, একটু আরাম করে বসতে দে আগে। নিরুখালার কথা শুনে শিমূল হাসে, ওর হাসি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উচ্চগ্রামে ফেটে পড়ে। আরে মালিশ নয়, তোমার হাঁটুর নিচের মাসলে হাত দিয়ে দেখ। দেখবে কেমন দলা-দলা শক্ত হয়ে আছে। ওই মাংসপেশিকে একটু নেড়েনেড়ে ঢিলে করে নেয়াই মাসাজের উদ্দেশ্য। বলে শিমূল শাড়ির ওপর দিয়েই খালার কাফ মাসল আস্তে আস্তে টিপে নরম করে দিতে থাকে। নিরু দু’হাতে পেছনের ঘাসে শরীরের ভর রেখে দু’পা সামনে ছড়িয়ে দেন। মাথা পেছনে হেলানো, আকাশ দেখছেন। ওরা খেয়াল করেনি কখন পান্নুভাই এসে খালার পেছনে দাঁড়িয়েছেন। শিমূলের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ওকে সজাগ হতে বলায় ও মুখ ঘুরিয়ে পান্নুভাইকে দেখে বলে, এতক্ষণ খালাকে হাঁটিয়েছি, এখন মাসাজ করে দিচ্ছি, নইলে তো কাল সকালে ঘরের দরোজা খুলতে পারবে না। পান্নুভাই হেসে ফেলেন ঘাসে বসতে বসতে, আস্তে আস্তে হাঁটলেও তো হত, তাইনা? না, শিমূল জেদি গলায় কেটে কেটে বলে, তাহলে এর সবটাই খালা ভুলে যেত দু’দিনে।

আর এখন যে আমাকে হাঁটার নেশা ধরিয়ে দিলি, তার কি হবে? পা গুটিয়ে বসে, দু’হাঁটু জুড়ে, তার ওপর থুতনি রেখে নিরুখালার সকৌতুক প্রশ্ন। কি আবার হবে, প্রতি সন্ধ্যায় মাঠ ফাঁকা হয়ে গেলে তুমি আর খালু হাঁটবে, তারপর বসে জিরোবে, পা মাসাজ করে নেবে একটু, ব্যস, শিমূল থামে না, তারপর ঘরে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসবে, খালু দেখেশুনে দেবেন কোথাও আটকে গেলে। জ্ঞানার্জন করবে শরীর চর্চার সাথে, দেখবে অবসাদ, ক্লান্তি সব দূর হয়ে যাবে। তুলসীকে আবার তুমি পড়াবে রোজ আধঘন্টা, একফাঁকে। বিদ্যাদান যত করবে, ততই তোমার বাড়বে, বুঝলে? কে বললো তোকে? নিরুখালার চোখ হাসছে, শিমূল দেখতে পায় আলো-আঁধারি ঐ নির্জন মাঠের প্রান্তে বসে। আমার নানাচৌগাছির বড় কাজী আনসার উদ্দিনের মুখে আরও কতশত ওরকম শুনেছি। আমি মনে মনে ওগুলো আওড়াই মাঝে-মাঝে, আবার প্রয়োগও করি। চল্ এবার, খাওয়াদাওয়া করে আরেক রাউন্ড চা খেয়ে, গল্পগাছা করে শুয়ে পড়বি সকাল-সকাল।

দুপুরে গোসল না করলেও এখন শিমূল ভেজা গামছায় তপ্ত শরীর মুছে আরাম পেল খুব। এরিমাঝে তুলসী এসে গেছে। নিরুখালা পরিষ্কার হয়ে ওকে আগে খেতে দেন। শিমূল-পান্নু ততক্ষণে লুডোর বোর্ড নিয়ে সাপলুডো খেলায় মেতেছে। নিরুখালা রান্নাবান্নার ফাঁকে ফাঁকে এসে ওদের সঙ্গে একটু করে আড্ডা দিয়ে আবার গিয়ে সংসারের কাজ গুছোচ্ছেন। ওরা চা আর কুচো নিমকি পেয়েছে ইতোমধ্যে। ঘরে তোলা ঘিয়ে ভাজা সে নিমকপারার (শিমূলের উর্দুবলা বন্ধুরা কুচো নিমকিকে ওই নামে ডাকতো) স্বাদ শিমূলের পছন্দের মালাই-চা সহযোগে জিভে-দাঁতে নাছোড় লেগে থাকছে। সাপলুডোর আছাড়গুলো শিমূলের মন্দ লাগেনা। সাতানব্বুই থেকে ব্যথাহীন আছাড় খেয়ে তিনে নেমে সে মনে মনে মালাকোচা মেরে আবার ওপরে ওঠার মইয়ে চড়তে মোটেই ক্লান্তিবোধ করে না। তুলসীর খাওয়া শেষ, নিরুখালা এবারে এসে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বলেন, আমাকে খেলতে নেবেনা তোমরা? অবশ্যই, পান্নুভাই বলেন, বাড়ির মালিক বলে কথা ! শিমূল ওঘর থেকে চেয়ার এনে নিরুখালার পেছনে নামিয়ে দিল। খালা বোর্ড উল্টে ঘরলুডোর ছক দেখিয়ে বললেন, আমি একাদুই হাত খেলি? আমরা যেহেতু মানুষ তিনজন…নিরুখালাকে থামিয়ে দিয়ে শিমূল বলে ওঠে, বুঝেছি। তোমার ধারণা লুডোতে তুমি হারোনা, অতএব…ঠিক আছে, খেল, তবে ডাইনে-বাঁয়ে করা চলবেনা, বলে রাখছি। খালা হেসে ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালেন।

খেলা চলল। পান্নুভাই অত্যন্ত নিরাসক্তভাবে চাল দিলেও প্রয়োজনীয় দানগুলো পেয়ে যেতে লাগলেন অনায়াসে এবং সহজেই অল্প সময়ে উনি নিজের তিনটে গুটি বাড়িতে তুলে দিলেন নিরাপদে। একগুটি তো লাফিয়ে লাফিয়ে পার হয়ে যাবে, ও নিরু খালা, ধরো, ধরো, ঘিরে ফেল ওকে তোমার আটগুটির ব্যূহজালে, শিমূলের উৎসাহে খালা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পান্নুভাইয়ের একা গুটিকে হত্যা করে কাঁচা করে দিলেন। শিমূলও তার বাইরে থাকা দুই গুটি নিয়ে খাবি খেতে লাগলো। নিরুখালা এদিকে জোড়গুটির ব্যারিকেড তুলে আর উপর্যুপরি মার দিয়ে নিজের পাঁচ-পাঁচটা গুটি বাড়িতে তুলে দিল। বাকি তিনটে আগুপিছু কাছাকাছি রেখে চালাতে লাগল, কখনো প্রয়োজনে দু’টো জোড়া করে ওদের গুটি আটকে মেরে দেন। আসলে ঘরলুডোতে মেয়েদের মাথা ভাল খেলে, শিমূলের বাবাও তাই বলতেন শালীদের সঙ্গে খেলতে বসলে। তাকে হাসতে দেখে নিরু বললেন, হাস্ছিস যে বড়ো, হারু-হারু…সুর করে ওকে খেপিয়ে তোলার চেষ্টা আরকি। শিমূল তাতে দমে যায়না মোটেই। বলে, আর তুমি যে বলেছিলে, রোকনপুরের নূতন সংঘ লাইব্রেরি থেকে কৃষ্ণকান্তের উহল এনে দিতে ? বুঝলেন পান্নুভাই, নিরুখালা তখন কেবল আমদানি হয়ে এসেছেন গড়াইপাড়ের কামারখালি থেকে ঢাকায়। আড়চোখে দেখল, খালার মুখ লাল এবং গম্ভীর, চোখ নিচের বোর্ডে। মা তো আমাকে দিয়ে নূতন সংঘ থেকে বই এনে পড়তেন, খালাও তাই আমাকে…।

হ্যাঁ, পান্নুভাই সাড়া দেন, খালা মানে তোমার মা গুচ্ছের উপন্যাস পড়তেন আমি ঢাকায় বেড়াতে এলে নিচের তলায় নেমে খালার টেবিল খুঁজে পেতে বই ধার করতাম। তুমিও তো গোগ্রাসে গল্প-উপন্যাস গিলতেকখনো চুরি করে। হ্যাঁ, মা যেগুলো পড়তে বারণ করতেন, শিমূল বলে, মা যখন ওপরে খুরূদের বাসায় আড্ডা দিতে যেতেন, সেই ফাঁকে হুড়মুড় করে পাতা ওল্টাতাম কেবল। ছোটদের কেউ ধারেকাছে থাকলে হুঁশিয়ার করে দিতে বলতাম। নীহাররঞ্জনের হসপিটাল, মনোজ বসুর নিশিকুটুম্ব ওইভাবে পড়া হয়েছিল আমার। এখন ভাবলে হাসি পায়। হুঁঃ, এখন তো তুমি ইংরেজি সাহিত্যে দু’টো পাশ দিয়েছ্ োকি দাওনি, তাতেই মনে হচ্ছে, সাপের পাঁচপা দেখেছো, খালা রাগতস্বরে বলে উঠলেন, নারে পান্নু, বঙ্কিমবাবুর উপন্যাসটার বাঁধানো মলাটে ছাপানো মোটা অক্ষরে উইলের হ্রস্ব-ই অক্ষরের ওপরের অংশ পড়–য়াদের আঙুলের ঘষটানিতে নিশ্চয় মুছে গিয়েছিল, তাই আমি ভুল করে ‘উহল’ বলেছিলাম। তাতে অত লজ্জা দেবার মতো কি ব্যাপার হল, বলতো? আমি দেখছি, তুমি এখনো একইরকম ছেলেমানুষ রয়ে গেছ, খালা, মনে আছে, তুমি কেঁদেকেটে এসে মাকে বলে আমাকে মার খাইয়েছিলে? আমি কিন্তু ভুলিনি, বলে শিমূলও মুখভার করে বলে, আমি আর খেলবো না, হেরে গেছি।

পান্নুভাই দু’হাত উপরে তুলে হতাশভাবে উচ্চারণ করলেন, হা হতোহস্মি! খালা নিঃশব্দে উঠে গেলেন। তুলসী তুই শুয়ে পড় এবার। আমি ওদের খেতে দেব এখন, খালার কন্ঠ শোনা গেল রান্নাঘরের ওদিক থেকে। শিমূল ক্লান্তবোধ করে হঠাৎ। খাটে উঠে চিত হয়ে শবাসনে পড়ে থাকে চুপচাপ কিছুক্ষণ। শুয়ে কেন রে? ওঠ্ জলদি। হার স্বীকার করলেই আমি ছেড়ে দেব ভাবলি কি করে? খালার ডাকাডাকিতে শিমূল উঠে বসে। নিরুখালার হাসিমুখ দেখে ও হেসে ফেলে, স্যরি নিরুখালা, আর ক্ষ্যাপাবো না। তোকে হারানোর আগেই ‘হারু’ বলা ঠিক হয়নি আমারও। খালা বিব্রতমুখ। পান্নুভাই এবারে কথা বলেন, আমার মনে হয় আমিই জিতে গেছি। এখন খেয়েদেয়ে নিই, তারপর দ্বিতীয় পর্বে আবার দেখা যাবেখন। বারান্দায় গিয়ে দেখা গেল, খালা খাবার রেডি করেই ওদের ডাকাতে গিয়েছিলেন। সবাই চুপচাপ বসে খেয়ে নিল। শেষপাতে খালা দু’চামচ করে রাবড়ি দিলেন। ওদের চেটেপুটে খেতে দেখে আরও দিলেন, সেটাও মজা করে খেতে খেতে শিমূল বলে উঠল, হাপুস হুপুস শব্দ, চারিদিক নিঃশব্দ, তারপর বলতো কি ? নিরু হাসতে হাসতে বললেন, পিঁপিড়া কাঁদিয়া যায় পাতে। কে শিখিয়েছিল বল্। এই যে, পান্নু, গুরু, অলসো নোউন অ্যাজ শামসুল আলম, বলে শিমূল রাবড়ি মাখা আঙুল তুলে পান্নুভাইয়ের কপালে তিলক এঁকে দেয়। শিব্রাম্ চক্কোত্তি দেখলে হ্লাদিত হতেন রাবড়িতিলক বলে কথা !

কাল সকালে উঠে তুলসীকে বলব, আমাদের একটা এক্কাগাড়ী ধরে দাও। সোজা গড়াইপাড়ে নারুয়া চলে যাব, তারপর নদী পেরোলেই নানাবাড়ি চৌগাছি। রাজি? বলে শিমূল পান্নুভাইয়ের সম্মতি চায়। যথা ইচ্ছা তব, আমি সঙ্গে যাব শুধু, ভদ্র। পান্নুভাইয়ের নির্লিপ্ত জবাব শুনে নিরুখালা হাঁড়িকুঁড়ি গুছিয়ে রাখতে রাখতে বললেন, আচ্ছা পান্নু, অনেক রকম পড়াশুনো করতে করতে শেষে মিসৌউিজিনিস্ট না কি বলে, তাই হয়ে গেলে নাকি তুমি? খালার কন্ঠে বিশুদ্ধ সরল ঔৎসুক্য ছাড়া কোন উপহাস তো বাজেনি আবার? শিমূল সতর্ক হয়েও তেমন কিছু টের পেল না। অতএব, সেও থালায় হাত ধুতে ধুতে, ওটা যেন শুধুই কথার পিঠে কথা ছিল, এমনি ভাব করে লুঙিতে হাত মুছতে মুছতে উঠল। কিন্তু পান্নুভাই স্থাণুবৎ বসে। কেউ কিছু বলছে না দেখে উনি অবশেষে বলতে বাধ্য হলেন, সোজাসুজি বাংলায় জিজ্ঞেস করলে কি আর আমার জবাব দিতে বাধতো? যাক্গে, না, আমি আদৌ তা নই, কারণ ঐ বিশেষ প্রজাতির জীবদের নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় আমার হয়নি এতদিন। এবার থেকে মনোযোগী হবার চেষ্টা করব, কথা দিচ্ছি। আমরা কি আশা করতে পারি, শীগ্গিরই তুমি একটি রমণীরত্নকে উদ্ধার করবে ? খালার প্রশ্ন শুনে আচমন শেষে উঠে পড়তে পড়তে পান্নুভাই মুচকি হাসেন, একটি কেন, বিলম্বে জরিমানা দিতে একাধিকেও যদি অরুচি না ঘটে?

নিরুখালার সঙ্গে শিমূল এঁটো থালাবাটি নিয়ে রান্নাঘরে কলের নিচে রাখে। বেরিয়ে এসে রান্নাঘরের কপাট টেনে শেকল তুলে দেয়। পান্নুর পেটে পেটে এত যে ছিল, দেখলি, আমি খোঁচা দেয়াতে কিভাবে রিঅ্যাকট্ করল? নিরুখালার গলা জড়িয়ে ধরে এগোতে এগোতে শিমূল বলল, আমি কিন্তু অবাক হইনি মোটেও। এধরণের কথা বা সিদ্ধান্ত ঘোষণা খুবই মানবিক, তাই আমাকে ইত্যাকার প্রপঞ্চ মোটেই আন্দোলিত করেনা আজকাল। কিন্তু তুমি ঐযে মিসৌজিনিস্ট বললে আমার গুরুকে, ওই গালমন্দ শিখলে কার কাছে? তুই কি আর সেই ছ্ট্টো শিমূল আছিস যে, আমার গলা ধরে ঝুলবি? আমি তোর শরীরের ভার নিতে পারি ? বলছি ছাড়, পানের বাটা নিয়ে আসছি ওঘরে। শিমূল প্রায় গড়িয়ে গড়িয়ে হেঁটে ঘরে দিয়ে বিছানায় চিত হয়। খালা এসে খাটে উঠে বসেন, পান সেজে মুখে দেন আর শুধু পানে চুন ছুঁইয়ে শিমূলকে দেন, খা, একটু বেশিই খেয়েছিস রাতে, পানের রসটা হজমে সাহায্য করে। ওহ্, তারপর আবার দেলখোস কেবিনের রাবড়ির সঙ্গে তুলনীয় অমৃত। ইস্, শিব্রামবাবুকে যদি তোমার এই রাবড়ি খাওয়াতে পারতাম, শিমূলের অক্ষেপ পান্নুভাইকেও ছোঁয়। টেবিলে বসে উনি ধূমপান সহযোগে কিছু পড়ছিলেন। ঠিকই বলেছ। চক্রব্রতির লেখা পড়ে পড়ে আমরা সেই কবে থেকে মিনিমাগনার ভোজ খেয়ে আসছি, তাইনা?

ওসব কথা থাক্, পান্নুভাই, এখন শোনা যাক নিরু খালা ওরফে আমাদের বেগম রোকেয়া কি করে ঐ মি-মি-মিসৌজিনিস্টের মতো কঠিন তত্ত্বের সন্ধান পেলেন, কোথায় এর উৎস। শিমূলের ইয়ার্কি শুনতে শুনতে খালা ওর মাথায় আলতো চাঁটি মারলেন, বললেন, তোর খালুও যে তোর মতো ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ সেটা জানতে পারলাম উনি যখন আমাকে ওঁর পছন্দের বই থেকে পড়ে শোনাতে আরম্ভ করলেন বছর চারেক আগে। ঠিক বলিনি? বেগম রোকেয়া? নিশ্চয় সংসারের কাজ সেরে রাতে দরজা বন্ধ করে খাটের ওপর হারিকেনের আলোয় তোমাদের বিদ্যাচর্চা হয়ে আসছে? শিমূল প্রশ্ন করা বন্ধ করলে খালা মাথা ঝঁকিয়ে সম্মতি জানান, তুই তো পীরের গুষ্ঠির ছেলে, তাই সবই আগে আগে জেনে যাস, তাই নারে? নিরুখালা বলতে থাকেন। জোনাথন সুইফ্ট নামের এক ইংরেজ লেখকের রচনা গালিভার্স ট্র্যাভেল্সতার আবার অনেকগুলো খন্ড ক্ষুদেদের দেশে, দৈত্যদের দেশে, লাপুটা আর হুইনিমদের দেশে ভ্রমণের কাহিনী। আসলে ওগুলো নাকি রূপক, তার আবার কয়েক স্তরে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য সব ভারী ভারীমানুষের নীচতা, লোভ, প্রভুত্ব করার মোহ এইসব বদগুণের নিন্দা আর মানবেতর প্রাণীদের তুলনামূলক উৎকর্ষ এইসব তত্ত্বই নাকি ওইসব কাহিনীর আড়ালের বক্তব্য। একটানা ভারী ভারী কথা বলে খালা হাঁপাচ্ছিলেন। শিমূল-পান্নু অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়েছিল।

অবশেষে পান্নুভাই বললেন, সুইফট্ যে নারীবিদ্বেষী ছিলেন ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে খালা বললেন, আমি তাও শুনেছি তোমার খালুর মুখেলেখকের জীবনকথা আলোচনার ফাঁকে। এবার সাফাই গাইবার পালা আপনার, শিমূল পান্নুভাইকে খেই ধরিয়ে দেয়। না, আমার তেমন কোন ডিফেন্স নেই। ছোট্ট একটু হৃদয়ঘটিত ব্যাপার যে ছিল, শিমূল জানে ব্যাপারটা, সেটা আসলে অত্যন্ত ঘোলাটে হয়ে আছে। আমি বুঝতে পারছি না, কি করব এগোব, না ভুলে যাব পান্নুভাই হতাশভাবে মাথার লম্বা, কোঁকড়ানো চুল দুই মুঠোয় ধরে ঝাঁকান। নিরুখালা নিরুত্তেজ গলায় বলেন, ও আমি যা বুঝেছি, তোমাকে নতুন করে শুরু করতে হবে। আমরা, মানে আমি আর শিমূল তোমার বন্ধুর মতো, অন্য সম্পর্কের কথা যদি বাদ দাও আমরা তোমার ভাল অবশ্যই চাই এবং সেকারণেই পরামর্শটা দেয়া। পান্নুভাই ওদের দু’জনের মুখে নির্লিপ্তির নিখাদ ছবির পাশাপাশি সমমর্মিতার নরম ও মলিন আলোর খেলা দেখেন। তারপর বলেন, ঠিক আছে, তাহলে কিন্তু আমাদের কাল হাটগোপালপুর হয়ে যেতে হবে।

যাব, শিমূলও গম্ভীর হয়। বলে, আমি সত্যিই মনে করি, কোন বলিষ্ঠ মানুষীর সঙ্গ বেছে নিয়ে তরতাজা জীবনে ফিরে যাওয়াই আপনার জন্য ঠিক কাজ হবে। নিরু খালা একঝলক শুদ্ধহাসি উপহার দিয়ে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ান, বলেন, শিমূল, মশারিটা কেবল টেনে নামিয়ে একটু গুঁজে নিতে পারবি না? খুউব, তুমি যাও, ঘুমোও। সকাল থেকেই তো আবার লেগে যাবে হেঁশেল ঠেলতে, বলে শিমূূলও নেমে বাথরুমে যায়। ঘুরে এসে দরজা বন্ধ করে মশারি টেনে নামায়, চারধারে ঘুরে ঘুরে গোঁজে, তারপর ঘেরাটোপে ঢোকা আর ঘুমিয়ে পড়া শুধু।

যথারীতি ভোরে উঠে প্রাতঃকৃত্য সেরে শিমূল সামনের মাঠে পায়চারি করতে গেল। নিরুখালা রান্নাঘরে ব্যস্ত। তুলসীকে পাঠানো হয়েছে কিছু মাছতরকারি কিনতে আর এক্কাওয়ালার সঙ্গে কথাবার্তা বলে আসতে। মিনিট পয়ঁতাল্লিশ হাঁটতে ঘাম বের হ’ল, তারপর শরীর জুড়িয়ে শীতল হলে ফেরা। স্নান, দাড়ি কামানো সাঙ্গ হতে হতে খালার নাশতা রেডি। বারান্দায় মাদুর পেতে বসা হল। পান্নুভাই চোখমুখে পানি দিয়ে এসে খেতে বসলেন। লাল আটার হাতরুটি, মিশ্র সবজি, ঘিয়ের সুবাস ওড়ানো সুজির মোহনভোগ। চমৎকার, শিমূল বলল। ধরা যাক, স্যরি, খাওয়া যাক খাতা কয় রুটিকা এবার, পান্নুভাই প্রসন্নমুখে পাদপূরণ করেন। তোমরা যে বড় লেখকদের লেখা কবিতা,গানের ইচ্ছেমতো প্যারডি করো, তাতে কোনরকম খারাপবোধ করনা? নিরু খালার সরল প্রশ্নে শিমূল একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলে, ভাবলে বোধহয় খারাপ লাগবে আমারও। পান্নুভাই গম্ভীরভাবে খেয়ে যান। খালা চা তৈরি করে এগিয়ে দেন। তুমি খাচ্ছ না কেন? বলে একটা থালায় শিমূল রুটি, সবজি তুলে খালার হাতে ধরিয়ে দেয়। আমিই তো নিচ্ছিলাম রে, বাপু, বলে নিরু খুশিমুখে খেতে আরম্ভ করেন।

পান্নুভাই স্নানাদি সারতে গেলে শিমূল তার ব্যাগ গুছিয়ে রেখে রান্নাঘরের সামনে বারান্দায় মোড়া টেনে বসল। আজ তোরা তাহলে আতর ভাইয়ের ওখানে থাকবি মনে হচ্ছে, ডালে বম্ভার দিতে ব্যস্ত নিরুখালা নিচুগলায় বললেন। দেখা যাক্, সেটা নির্ভর করবে আমার বোনটির উপস্থিতি ঘিরে, শিমূল সন্তর্পনে উচ্চারণ করে। কণা না থাকলে আমরা সোজা চৌগাছি চলে যাব গড়াই পেরিয়ে, বুঝলে তো ? হ্যাঁ, পান্নুর নজর ঢাকা থেকে এদিকে ঘুরিয়ে দেয়া গেলে দু’কূলই বাঁচে এখন, খালা দীর্ঘশ্বাস চাপেন। আমার বড়বু’টি যে কি মানুষ, সে তো আমিও জানি বেশ কিছুটা, বলে আঁচলে কপালের ঘাম মোছেন। হ্যাঁ, পাতলা খান লেইনের ৮৩ নম্বর বাড়ির কথাটা ভাব শিমূল উদাসভাবে রান্নাঘরের জানালা দিয়ে নজর চালিয়ে দেয় সামনের মাঠে এক মিলনমেলাই ছিল বটে ঠিকানাটি, এই তোমার, আমার, পান্নুভাইয়ের কথাই ধরো, ওই বাড়িতেই কিন্তু আমাদের সবারই সেই আমার ছোট্ট বেলায় কাছাকাছি আসা। আমাদের ছাদের সেই ক্লাবঘর ? নিরুখালা বলে উঠলেন কথার মাঝে, যার যখন মন খারাপ হত, তাকে ঐ ছাদের ঘরেই পাওয়া যেত নির্ঘাৎ, তাইনা? হ্যাঁ, মায়েরাও জানতেন, শিমূল বলে আর হাসে, তবে রাতে কিন্তু আমরা কেউ একা ছাদে যেতাম না, কেন বলতো? কেন আবার? ঐযে ‘ফ্যাব্রিক হাউস’ বাড়ির রিনার নানির আত্মা ওই ছাদের ঘরে এসে উঠতো না রাতে? তখন অন্তত ঐরকমই আমরা ভেবে নিয়ে, ভয়ে শিহরিত হতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম, বলে শিমূল উঠে সদর দরজা খুলে দেয়।

কি তুলসী, ঘোড়গাড়ি মিলল? পান্নুভাই হাল্কা গলায় জিজ্ঞেস করলেন। পাওয়া গেছে স্যর, আপনাগের কপাল বালো, তুলসী নিশ্চিন্ত করে, নয়টায় আস্ফি। আপনারা রেডি হন। আমরা রেডি, শিমূল বলে। দাঁড়া, আমার এখনো কাজ বাকি, বলে নিরুখালা রান্নাঘরে ঢোকেন শশব্যস্ত হয়ে। বোঝা গেল, কালুখালি থেকে আসা খাবারের পাত্রগুলো এখানে খালি হয়েছিল, আবার ভর্তি হয়ে ওদের কাঁধে চাপবে এবার। আপনমনে হাসতে হাসতে শিমূল টয়লেটে গেল। গাড়ি এসে গেল। হ্রেষারব শুনে শিমূল বেরিয়ে দেখল, ঘোড়াটা মাঝারি মাপের, তবে বেশ তাগড়া, চনমনে দেখাচ্ছে। খালাও এসে বাচ্চাদের মতো ঘোড়া দেখে গেলেন।একেবারে তুলসী ওদের ব্যাগগুলো গাড়িতে তুলে বেঁধে দিল, খাবার ভর্তি ঝোলাঝুলিও বাঁধা হল একধারে ঝুলিয়ে দিয়ে। এত বাঁধাছাঁদা কিসের, রেখে দাওনা তুলসী অমনি একধারে, আমরা দু’ভাই তো মোট যাত্রী। শিমূলের কথা শুনে তুলসী হেসে বলে, সে আপনি যাত্রা করলিই টের পাবানে বাঁধার কি দরকার। রাস্তা তো আপনার সমান না, খানাখন্দ, খালবিল পারায়ে যাওয়া তো, বাঁধা থাকাই ভাল, নাকি কও গাড়োয়ান? তা তো বটেই, তবে আমিই কি আর উনাগের গায় ব্যাতা দিয়ে চালাবানে গাড়ি? তুইউ যেমন তুলসী। তুরা গাড়িতি উটলি এক নহম, বাবুভেয়েরা উটলি আরেক নহম, বুঝলি? তবে কি, কথায় বলে না, সাবধানের মার নেই।

নিরুখালার সঙ্গে করমর্দন করে ওরা বিদায় নিল। শিমূল আর পান্নু পেছনে পা ঝুলিয়ে বসেছে, গাড়োয়ানের সঙ্গে পিঠোপিঠি। ফলে, ওর সঙ্গে আলাপচারিতায় একটু অসুবিধে যা হচ্ছিল, সেটা হলচেঁচিয়ে কথা বলা। তা শিমূলের ভালই লাগছিল চেঁচিয়ে কথা বলতে, মাঝে মাঝে, পরিবেশের অখন্ড নীরবতা ভেঙে ভেঙে। তুলসীর কথা ঠিক। শিমূল খেয়াল করল, মাঝে মাঝে গাড়ি পথ হারিয়ে খানায় পড়ছিল, বিপজ্জনকভাবে কাত হয়ে যাচ্ছিল, সঙ্গে ওরাও, আবার সোজা হয়ে পথে এসে পড়ছিল। গ্রাম ছাড়িয়ে ওরা একসময় ধূ-ধূ মাঠে নেমে গেল। ওটা নাকি বর্ষাকালে এক দিগন্তবিস্তারী বিলের চেহারা নেয়। ওপথে বড় গাছ বিশেষ নেই। রোদ চড়ার সঙ্গে গরমবোধ হচ্ছিল। ফুলহাতা শার্ট খুলে শিমূল হাওয়াই শার্ট পরে নেয়, আরাম হয় কিছুটা। চারদিকে দেখে আর ছোটবেলায় পড়া বিলের সংজ্ঞা মিলিয়ে সে কিছু কিছু ভৌগোলিক প্রমাণও পেতে লাগল। বিলের এখানে সেখানে কাঁটাবাবলার ঝোপ। কোথাও গত বর্ষার কচুরিপানা শুকিয়ে জড়ো হয়ে আছে। বিলের মাঝখানে এক প্রকান্ড ছত্রধারী কদম গাছের নিচে গাড়োয়ান গাড়ি থামাল। ঘোড়াকে গাড়ির নিচে বাঁধা বিচালি টেনে বের করে চিবুতে দিল। তেমনিভাবে ঝোলানো বালতি খুলে নিয়ে কাছাকাছি এক ডোবা বা ‘কুয়ো’ থেকে তাতে ঘোলাটে পানি ভরে নিয়ে এসে ঘোড়ার সামনে ধরে দিয়ে নিজে বিড়ি ধরাল।

কদমের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে শিমূল-পান্নু ভাবল, পথের খোঁজখবর নিয়ে খালার দেয়া খাবারের কিঞ্চিৎ সদ্ব্যবহার করা বিধেয়। গাড়োয়ান যা বলল, তাতে বোঝা গেল, ওদের কীর্তিমান মামা আতোয়ার মাস্টেরকে এলাকার তাবৎ মানুষই চেনে এবং কিছুটা ছিটেল টাইপের মানুষ বলে সমীহও করে যাকেদূর থেকে। তো, তার বাড়িতে ওদের পৌঁছতে আরও ঘন্টাদুই সময় লাগবে। অতএব খাওয়াদাওয়া সারা গেল। রওনা হয়ে গাড়ির চাকা আরও গড়ালে বিলের ধার দিয়ে চলার পথে হিজলের ছায়া ওদের শরীরে আরাম দিচ্ছিল মাঝে-মাঝে। শিমূলের নানাবাড়ি চৌগাছির পুরনো বাড়ির নিচে ফসলের মাঠ শুরু হওয়ার আগেই প্রকান্ড এক হিজল পুকুর। প্রাচীন জলাশয়ের চারপাড় ঘিরে অত্যন্ত ঘন হিজলের সমারোহের কারণে ওই নামের উৎপত্তি। বছর দশেক আগেও তো বর্ষাশেষে চৌগাছি বেড়াতে গেলে ওরা হিজল পুকুরের পাড়ে দিনে বেশ ক’ঘন্টা কাটিয়ে দিত। ওই পুকুরের জল, কেন জানা নেই, অত্যন্ত পুরুষ্টু কচুরিপানার ঢাকনায় ঢাকা থাকত। ওই হিমশীতল জলে কেউ নামত না। শিমূলরা দু’চারজন দুষ্টু কিশোর দুপুরে স্নানের আগে গামছা পরে সাবধানে কোমরজলে নেমে ঐ কালচে সবুজ ডাঁটো কচুরিপানার দঙ্গল দড়ি দিয়ে ঘিরে হেঁইও-হেঁইও করে পাড়ে টেনে তোলার আগেই ডজন-ডজন কই-শিং লাফিয়ে উঠে পালাতে চাইত। তখন পাড়ে তৎপর ভাইবোনেরা খপ্ করে একেকটা ধরে এলুমিনিয়ামের ঢাকনাও’লা ডেক্চিতে পুরে ফেলত। শিমূলরা পাশের পুকুরে আবাহন স্নান সেরে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ওই মাছের ভাজা অথবা চচ্চড়ি রান্না হয়ে যেত।

পান্নুভাইকে হিজল পুকুরের আরো গল্প শোনাতে শোনাতে বিলের পথ শেষ হয়ে এল। গাড়ি গাঁয়ে ঢুকলো। আইসে গ্যালাম আপনাগের হাট গোপালপুরি। মাস্টের সায়েবের বাড়ি অবশ্য গিরামের ওই মাথায়। আস্তে আস্তে যাই। মধ্যিখানে আবার বাজার পড়বেনে। এই এতখানি পথ আলাম, পাংশা বাজার ছাড়ার পর আরেট্টা গাড়ি কি মনিষ্যি দ্যাখলেন, বলেন? না, সেটা শিমূলও লক্ষ্য করেছে। পুরো পথটাই কেমন পরাবাস্তবিক এক ভূগোলের ক্লাস মনে হয়েছে ওর। কোন ভূতে পাওয়া ফিল্মের দৃশ্যকাব্য যেন। পান্নুভাই কেমন চুপচাপ হয়ে গেছেন। ভেতরে বড়রকমের ভাংচুর চলছে, শিমূল বুঝতে পারে। পান্নুভাই, আপনার কোনরকম আপত্তি থাকলে আমরা কিন্তু এঘাট না ছুঁয়েও চলে যেতে পারি অনায়াসে, শিমূল শেষবারের মতো পাশ কাটানোর চেষ্টা করে। পান্নুভাই বাবড়ি চুল ঝাঁকিয়ে বলেন, না, না, যাব যখন বলেছি আমি, চল একূল দেখেই ওকূলে যাই। গুরুর চোখে লালের ছটা দেখে শিমূল ওর কপালে হাত দিয়ে বিস্মিত প্রশ্ন করে, জ্বর এলো কখন আপনার? এতো এহাবারে দ্যাবদাশ উপাখ্যানের চেহারা নিতাছে, ও পারু-উ-উ…শিমূলের এক্টো দেখে পান্নুভাই কষ্টে হাসেন, চল, বাজারে গাড়ি থামিয়ে একটা স্যারিডন খাই চা দিয়ে, মাথাটা ধরেছে বেশ। হুঁ, এতটা পথ রোদ্দূর মাথায় করে আসা, সত্যি-সত্যি জ্বর না এলেই হয় এখন, শিমূল দুঃশ্চিন্তায় পড়ে। গাড়োয়ানকেও চিন্তান্বিত দেখায়। সে বলে, আমার কলিই তো ছই লাগায়ে দিতাম উপরে। গাড়ির নিচেই তো বাঁদা ছিল। যাইক্গে, এহন চা খাইয়ে নেন আগে, বলে সে বাজারের শেষে বটগাছের নিচে গাড়ি থামায়।

শিমূল লাফিয়ে নেমে জায়গায় দাঁড়িয়ে মিনিট খানেক দৌড়ায়। তারপর পাশের চা-দোকানিকে কড়া করে তিন গেলাস চা দিতে বলে। গাড়োয়ান খুশি হয়ে বলে, চা আমিউ খাই মাঝে-মাঝে। আপনাগের মতো টাউনির পেশেন্ডাররাই খাওয়ায়, হেঃ হেঃ। চা খেতে খেতে শিমূল দূরের মাঠে নজর চালিয়ে দেখল, আতর মামার মতোই শশব্যস্ত ভঙ্গিতে ছাতা মাথায় কেউ একজন আসছে গোপাট ধরে। মানুষটা আরো এগিয়ে এলে সে চিনতে পারল, পথিক আতরমামাই বটেন। সম্ভবত স্কুল থেকে ফিরছেন। শিমূল ভাইকে বলে, ঐ যে আসছেন আপনার বকাবাজ মেজমামা। কড়া চায়ের সঙ্গে স্যারিডন খেয়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চাঙ্গাবোধ করছেন পান্নুভাই, মৃদু হেসে বলেন, আর তোমার গন্ধমামা। সুগন্ধ মামা, শিমূল সংশোধন করে। মাঠের রাস্তা ধরে এগিয়ে এসে আতরমামা ঐ গাছতলাতে ওদের গাড়ী দেখে, ডাইনে না ঘুরে সোজা আসতে থাকেন। ছাতা মুড়ে, চশমার আড়ালে চোখ কুঁচকে ফোকাস ঠিক করে ভাগ্নেদের চিনতে পারেন। মামার উত্তেজনার পারা চড়তে থাকে সঙ্গে সঙ্গে।

আরে শিমূল না, পান্নুওবেশ, বেশ, তা মানিকজোড় এখানে কি করছো, ঘোড়গাড়ি পেলে কোথায়? যাচ্ছ কোথায়? নাকি নিরুদ্দেশে ঘোরাঘুরি শুধু? আপাতত: মামা আপনার ওখানে থানা গাড়ব আজ, এক্ষুনি, শিমূল মামাকে থামায়। তারপর ধীরে ধীরে সব বলছি। চলেন, এখন বাড়ি যাই, পান্নুভাইয়ের শরীর খারাপ হয়েছে। এই সায়েবদের তুলেছিস কোত্থেকে রে, হারামজাদা, আমাকে চিনিস না তুই ? বলিস নি কেন এতক্ষণ ? মামা এবার গাড়োয়ান বেচারির ওপর চড়াও হন। পাংশার সেনিটারি নেসপেক্টারের বাসাত্তে তুললাম তো ইনাগের সকালে, তারপর ঐ গাজনার বিলে ঠা-ঠা রোদ খাইয়ে এই অবস্থা, তা আমার বল্লিই তো আমি ছই বাইর করে ফিট্ করে দিতাম। ভদ্দরনোক মানুষ তো, উনিউ বোজেন নাই, আমিউ না। যাক্, যাক্, আর সাফাই গাওয়া লাগবে না তোমার, তাড়াতাড়ি গে’ নামা এদের, যা, বলে ভাগ্নেদের ঠেলে গাড়িতে তুলে দিয়ে, নিজে ছাতা খুলে হন্হন্ হেঁটে চলেন বাড়িমুখো। ভাগ্নেরা রা’ কাড়ে না, গাড়িতে উঠতেও বলে না মামাকে, বলে লাভ হবে না কিছু, জানে।

ঐ বটগাছ থেকে জোর পাঁচশ’ কদম যেতেই একটা বাঁক ঘুরে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল। এদিক-ওদিক তাকাতেই ছ্যাঁচাবেড়ার গায়ে কাটা দরজায় বাবার অপেক্ষায় কপাট ধরে দাঁড়িয়ে থাকা বোনটি ওদের দেখে খুশিতে হেসে ফেলল, হাত নাড়ল। শিমূলও চেঁচাল, কিরে কণা, ভাল আছিস তো বুন্ডি আমার ? হাঃ হাঃ হাঃ, বলে উদারভাবে প্রাণ খুলে হাসতে লাগল। মামাও পৌঁছে গেছেন। হাঁকডাক শুরু হল। এই কণা, তোর পান্নুভাইকে ধর, ধরে নামা, ঘরে নিয়ে শুইয়ে দিবি। গাজনার বিলে রোদ তাপিয়ে জ্বর বাধিয়ে এসেছে, কণাও, এবারে সেবা করো মহাপ্রভুরবলে গজগজ করে অকৃত্রিম বিরক্তি প্রকাশ বাড়িতে ঢুকে যান। শিমূল দেখছিল, ঘনসবুজ পরিবেশে চক্চকে স্বাস্থ্যল শ্যামলা বোনটি তার অপার মায়ায় হালকা-পাতলা পান্নুভাইকে প্রায় তুলেই নিয়ে গেল ভেতরে। একটি ছেলে বেরিয়ে এসে ওদের ব্যাগ-বোঁচকা-বুঁচকি নামিয়ে নিল। শিমূল গাড়িভাড়া মিটিয়ে দিল। গাড়োয়ান গাড়ি ঘোরাচ্ছে, এমন সময় কণা আবার বেরিয়ে এসে বলল, শিমূলভাই, গাড়োয়ান এখানে খেয়ে যাবে, আব্বুর হুকুম।

শিমূল ভেতরে-ভেতরে খুশিতে বাগ্বাগ্, কিন্তু শেয়ার করবে কার সাথে ? কোথায় রইল নিরুখালা পড়ে এই মাহেন্দ্রক্ষণে? কণা, মামার জন্য মেসেজ: আমি এখানে ঘাসে বসে আরামে একটু ধূমপান করব। দাঁড়াও, মেসেজ পৌঁছে দিচ্ছি আব্বুকে আর তারপর হেডমাস্টার সাহেবের এক নম্বর বেতটা ‘চাহিবামাত্র হাতে দিয়া দিব’, বলে মুচকি হেসে কণা ভেতরবাড়িতে অদৃশ্য হল। কইছিলাম না আপনারে, মাস্টেরের দয়ার শরীল, দ্যাকলেন, ভরদুপুরি না খাইয়ে যাতি দেলেন না। রোজ এইরম এট্টা কইরে পেসেন্ডার পালিই তো আমার সুক দেইকতো কিডাবলে গাড়োয়ান পাশের পুকুরে হাতমুখ ধুতে যায়। শিমূলও বাড়িতে ঢুকে দরজা ভেজিয়ে দেয়। উঠোনের তিনদিকে ঘোরানো ঘর, একদিকে ছোট্ট সব্জি বাগান। বাগান পেরিয়ে সদর দরজা। শিমূল বারান্দায় উঠে মামার পাশে বসে। বড়োতামাকের ধোঁয়া টেনে সে তখন বেশ রিল্যাক্স্ডতাছাড়া, পান্নুভাইয়ের অসুস্থতা মনে হচ্ছে শাপে বর হয়েই দেখা দিয়েছে। কণা রান্নাঘরে খুট্খাট শব্দ তুলে ওদের খাবার দাবার গুছিয়ে এনে বারান্দার টেবিলে সাজাচ্ছে।

তোর বাবা ভাল আছেন? মামার আচমকা প্রশ্নে শিমূলের আচ্ছন্ন ভাব কেটে যায়। জ্বী, মামা, আব্বা-মা-ভাইবোন সবাই তো চৌগাছি। বলিস কিরে? আমাদের গ্রামে? তোর বাবা তো সেই ’৪৭ সালে বিয়ে করে যাবার পর এই বোধহয় প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি এল। যাক, তাও তো আসা হল তার। মামা যেন বেশ স্বস্থ এখবরে। শিমূল খবর দেয়, হ্যাঁ কুটিখালা-খালুও পাবনা থেকে চলে এসেছেন বোধহয়। বড়খালাও কুষ্টিয়া থেকে… তাহলে চৌগাছিতে এখন অনেক মৌমাছির ভিড় বল্? তা তোরাও বুঝি এদিক-সেদিক ঘুরে শেষে ওইমুখো হবি, নাকি ? মামার প্রশ্ন শুনে শিমূল মাথা চুলকায়, পান্নুভাইয়ের তো আবার জ্বর এসে গেল, উনি না গেলে আমি একাই এখান থেকে চৌগাছি যাব, ওখানে ক’দিন থেকে, যশোর হয়ে ঢাকায় ফিরব। কণা টেবিলে ভাত বেড়ে ওদের খেতে ডেকেছে ইতিমধ্যে। চল্, চল্, আরো দেরিতে খেলে আবার চোঁয়া ঢেঁকুর উঠবে, জমে অসুবিধে হবে আমার, মামা উঠে গিয়ে হাত ধুয়ে খেতে বসেন। শিমূল কণাকে ডাকে, তুইও আমাদের সঙ্গে বসে পড়। কনা মুখ ঝামটা দেয়, ওদিকে তোমার গুরু ঝাম্টা জ্বরে অনাহারে, ভাজা-ভাজা হচ্ছেন, আর আমি বাড়ির মেয়ে আগেভাগে খেয়েদেয়ে বসে থাকি ! আরে আমি ভেবেছি, পান্নুভাই বার্লি-টার্লি কিছু পথ্য পেয়েই বিশ্রামে আছেন, শিমূল জিভ কাটে। সময়টা পেলাম কোথায় বল, তোমাদের খেতে দিয়ে যাই পান্নুভাইকে কিছু খাওয়াই, তারপর আমার খাওয়া।

শিমূল খায় আনমনে আর ভাবে, শরৎবাবুকে দুষে কি হবে। রাজলক্ষ্মীরা সবসময়েই ছিল, আছেসব দেশে, সব সমাজে। কণার মতো চঞ্চলা কিশোরী কি অনায়াসে ভগিনী নিবেদিতার ভূমিকায় মানিয়ে যায় পরিস্থিতির টাল সামলেআশ্চর্য ক্যাপাসিটি ! কণা ব্যস্তভাবে রান্নাঘর থেকে রোগীর ঘরে ছুটোছুটির ফাঁকে বলে গেল, জ্বর মনে হয় বেড়েছে, জাউ খাইয়ে মাথা ধুইয়ে দেব। ওরা চুপচাপ খেয়ে উঠল। মেয়ে বাবার সামনে পানের বাটা রেখে গেল। মামা মন দিয়ে পান সেজে মুখে দিলেন। কিছুক্ষণ চুপচাপ পান চিবিয়ে বলে উঠলেন, কণা মেয়েটার লেখাপড়া হলনা। তোর মামীরা তো মাগুরায়। আমি আজ এখানে তো কাল ওখানে। পাঁচ-পাঁচটা হাইস্কুল গড়ে তুললাম এই জেলায়, কিন্তু নিজের ছেলেপুলের শিক্ষাদীক্ষা ঠিকঠাক হচ্ছে না, বুঝি। কিছু মানুষের তো এরকম হয়, মামা, এতে অত দুঃখ পাওয়ার কিছু নেই। শিমূলের সৎ উচ্চারণ শুনে আতরমামা পানির গ্লাস হাতে উঠে বারান্দার ধারে গিয়ে কুলকুচো করে পানের ছিবড়ে ফেলে দেন। ফিরে এসে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বলেন, তুই আমার কাজ-কর্মে দোষ দেবার মতো কিছু পাস না? ঠিক করে বলবি। না মামা, তোমার কাজের বিচার আমি করব কোন্ স্পর্ধায়? আমি কি জীবনে একটাও স্কুল বসাতে পারব কোন অজ পাড়াগাঁয়ে? তুমি তো একজন বীর, যোদ্ধা। পাঁচটার মধ্যে তিনটে স্কুলও যদি স্থানীয় মানুষ চালাতে পারে, প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ না হয়ে যায়, তাহলে পঞ্চাশ বছর পরে তুমি যখন হয়তো পরপারে, তখন মানুষ তোমাকে প্রণাম জানাবে, আমি নিশ্চিত।

আহ্, আতরমামা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ক্ষীণ হাসলেন, তোর কথা শুনে বুকটা ফুলে উঠল। তুইও এরকম কাজের হবি, আমি বলতে পারি। আর যদি তোর মায়ের ইচ্ছে পূরণ করিস, বড় আমলা হোস কখনো, তখনও আমার মতো সংগ্রামী মানুষেরা তোর টেবিলের ওধারে মানুষের জন্য প্রার্থী হয়ে আসবেতাদের ফেরাবি না, যথাসাধ্য করিস, তাহলেই হবে। দেখি, পান্নুভাইয়ের জ্বরের গতি প্রকৃতি কিরকম, বলে শিমূল উঠে রোগীর ঘরে যায়। বেশ বড় ঘর। দু’পাশে দু’টো খাট। পান্নুভাই শুয়ে আছেন চোখ বুঁজে। খাটে আড়াআড়ি শুইয়ে রোগীর মাথায় পানি ঢেলে যাচ্ছে কণানিরলস আর মাঝে-মাঝে কপালে হাতের ভেজা তালু রেখে তাপ কমলো কিনা আঁচ করছে। জ্বর দেখেছো, কণা? কত? ডাগর চোখের মেয়ে মুখ তুলল, মলিন মুখে বললো, দেখেছি। একশো তিন। বল কি? বলে শিমূল ওকে হাত ধরে টেনে মোড়া থেকে তুলে দিল, নিজে মোড়ার দখল নিল, তুমি কিছু খেয়ে এস, আমি মাথায় পানি দিই, আর মামাকে খবরটা বল। ঠিক আছে, কণা বালতিটা তুলে নিল, বলল, পানিটা গরম হয়ে গেছে, বদলে তাজা পানি দিয়ে যাই তোমাকে। সাবাশ, মাই সিস্টার, তোকে অর্ডার অব সেইন্ট নাইটিংগেল না দিলে তাবৎ পুরস্কারের অবমাননা করা হবে, শিমূল চেঁচিয়ে বলে ওঠে।

মামা ঢোকেন পানির বালতি নিয়ে ব্যস্তসমস্ত ভাবে ওর অত জ্বর নাকি রে শিমূল ? শেষে ওই হিটস্ট্রোক নাকি বলিস তোরা, তাই হল নাকি? আমি বলাইবাবুকে কল দিয়েছি, মামা গড়গড়িয়ে রিপোর্ট করেন। বলাইবাবু কি ডাক্তার? নাকি শিমূলের সংশয় মামা উড়িয়ে দেন, খুব হাতযশ, বৃটিশ আমলের ক্যাম্বেল পাশ, আমাদের অসুখ-বিসুখে তো ওই বলাইবাবুই ধন্বন্তরি! শিমূল পান্নুর মাথায় পানি ঢালতে শুরু করে। মামা অস্থিরভাবে পায়চারি করেন। কণা ফিরে এসে চুপ্টি করে খাটের বাজুতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে। শিমূল একটু কাঁচুমাচু হয়ে বলে, আমরা এভাবে এসে তোদের কি ঝামেলায় ফেলে দিলাম, না রে কণা? চুপ করো তো, কনা শাসনের গলায় বলে ওঠে, মানুষটাকে সুস্থ হতে দাও আগে, তারপর তোমাদের ভবঘুরে লাইফস্টাইলের এসপার-ওসপার না দেখে এবার ছাড়ছি নে, ভেবেছো কি তোমরা? আতরমামা হস্তক্ষেপ করেন, আচ্ছা, আচ্ছা, আমার পাগলি মাকে আর খেপাস্ নে শিমূল। কেউ কষ্টে থাকলে কনা মার সহ্য হয়না সেটা, ও যা পারে, যতটুকু পারে, ততটুকু করে তবে ওর ক্ষান্তি।

বলাইবাবু এসে ওদিকে হাঁকডাক করছেন, কোথায় কণা মা আমার, তোর বুড়ো ছেলে এসেছে, কোথায় রোগী, কোন্ ঘরে? বলতে বলতেই কণা ছুটে গিয়ে উঠোন থেকে ডাক্তারবাবুর হাত ধরে টেনে এঘরে নিয়ে আসে। ধুতিপাঞ্জাবি পরনে, মাথায় গান্ধী টুপি, হাতে ছাতা আর ‘ডাক্তার’ লেখা ব্যাগ। বাইরের কেউ এসেছে, অনুমান করে পান্নুভাই একবার চোখ মেলে দেখলেন, জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটলেন। কণা চামচে করে গ্লুকোজের শরবত মুখে দিল। বলাইবাবু রোগী পরীক্ষা করলেন মন দিয়ে, থার্মোমিটার বগলে স্টেথোস্কোপ বুকে পিঠে লাগিয়ে, হাঁটুতে ছোট্ট হাতুড়ি ঠুকেতারপর শিমূলের মুখের দিকে ডাকিয়ে মামাকে প্রশ্ন করলেন, এরা কারা? কি হয়েছিল? রোগী আমার ভাগ্নে পান্নু আর এ-ও ভাগ্নে, ওর নাম শিমূল। হবে আর কি, পাংশা থেকে চড়া রোদে গাজনার বিল পেরিয়ে এখানে আসতে আসতে গরম লেগে জ্বর এসেছে ওর। জ্বর দেখলাম কমছে ধীরে ধীরে, কমে যাবে আশা করি। কাল সকাল নাগাদ রেমিশন হয়ে যাবে। কিন্তু ওর নাড়ি অত্যন্ত দুর্বল। কণামা বুদ্ধি করে সময়মতো মাথায় পানি ঢালাতে এযাত্রা বেঁচে গেল, মনে করুন। তবে পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে কমপক্ষে ৩ দিন, হপ্তাখানেকে পূর্ণশক্তি ফিরে পারে। ছানা, পাতলা দুধ, স্যুপ খাবে, মশলাপাতি একদম না। পারলে একবার সারাশরীর ঠান্ডা স্পঞ্জ করে দাও, মা।

ডাক্তারবাবু বিদায় নিলে, শিমূল আর কণা দুভাইবোনে মিলে পান্নুভাইয়ের শরীর যত্ন করে মুছিয়ে দিল। বারকয়েক পানি বদলে ঠান্ডা পানিতে গামছা ভিজিয়ে যেন রোগীর শরীরের অতিরিক্ত সব তাপ ওরা ইচ্ছেমতো শুষে নিল। যাদুর মতো জ্বর কমে আটানব্বুই-এ নেমে এল। শিমূল-কণা দুজনেই খুশি। পান্নু চোখ মেলেছেন। চোখের লালিমা কেটে যাচ্ছে। কণা ছানা-স্যূপ তৈরি করতে গেছে নিশ্চিন্তে। পান্নুভাই, শিমূল ষড়যন্ত্রের সুরে বলে, আমি কাল সকালে চৌগাছি চলে যাব। আপনি সাতদিন থেকে শরীর সারিয়ে, মন বাঁধা রেখে, তারপর যেখানে খুশীহয় চৌগাছি, নয় সোজা ঢাকা যাবেন। ঠিক আছে তো? তুমি যা বল, তাই হবে, তাই তো হচ্ছে, দেখ না, অত্যন্ত দুর্বল ক্ষীণকন্ঠে উচ্চারণ করে পান্নু আবার চোখ বুঁজলেন। আপনি বিশ্রাম নিন। আমি কণাকে সঙ্গ দিইগে। বাহাদুর মেয়ে চটে ! আমার-আপনার সঙ্গে তাল মেলাতে হলে এমন শক্তপোক্ত দুর্গেশনন্দিনীই চাই।

মামা বারান্দায় বসে হারিকেনের আলোয় পরীক্ষার খাতা দেখছেন। দেখে দেব নাকি মামা দু’চারটে খাতা? শিমূলের প্রস্তাব শুনে হেডমাস্টার মশাই তার খাতার বান্ডিল নিজের কাছে টেনে নেন, আমানত যেন কেউ কেড়ে নিতে চাইছেএমনি সন্ত্রস্ত দেখায় তাকে। না, না, ও একহাতে নম্বর দেয়াই ভাল, বুঝলি? তুই যখন পড়াবি, বুঝতে পারবি, এ বড় দায়িত্বের কাজ, ফাঁকির জায়গা নেই এখানে। পান্নু বুঝি শান্ত হয়েছে ? তুই বরং কণার সঙ্গে গল্প কর গিয়ে, মা আমার এত ভাল আর এত একামামা দীর্ঘশ্বাস চাপেন।

রান্নাঘরটাও বেশ বড়। গ্রামের বাড়িতে আসলে সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাস করতে ভালবাসেন। টুল টেনে কণার পাশে বসে শিমূল বোনের আঁচল টেনে ঘাড়-মুখের স্বেদবিন্দু মুছে দেয় পরম মমতায়। কণা চোখ বুঁজে থাকে। সুযোগ পেয়ে শিমূল ওর কপালে চুমকুড়ি খায় আলতো এই কি হচ্ছে, চমকে উঠে চোখ মেলে কণা, শাসায়, শিমূলভাই, তুমি কাল সকালে যে চলে যাবে বললে, বাবাকে বলেছো সেকথা? দেবো আমি আট্কে? আরে না, আমি তো নানাবাড়িই যাচ্ছি, পান্নুভাইয়ের আগ্রহেই তো তোদের মানে তোকে দেখতে আসা। জানিস, পান্নুভাই বলেন, তোকে রাইকমলের কাবেরী বসুর মতো নাকি দেখতেযাহ্, তুমি মিছেমিছি আমাকে স্তোক দিচ্ছ, শ্যামলী মেয়ের গন্ডে রক্তিমাভার ঝলক উনুনের আগুনে উদ্ভাসিত। শিমূল অট্ট অট্ট হাসে আর চাপাস্বরে বলে, এবার তোমার একাকিত্ব ঘুচলো বলে।

ন’টা নাগাদ খেয়ে সবাই শুয়ে পড়ে। স্যূপ আর ছানা-মুড়ি খেয়ে পান্নুভাই বিভোর হয়ে ঘুমোচ্ছেন। পাশের ঘরে কনা আর মামা। রাতে বেচাল কিছু দেখলে আমাকে ডেকে তুলে দেবে, শিমূলভাই, কড়া নির্দেশ জারি করে, ওদের দু’ভাইয়ের বিছানায় মশারি খাটিয়ে দিয়ে কণা নিজেদের ঘরে খিল তুলেছে। টর্চ জেলে, কলঘর ঘুরে এসে খাটের নিচে, আলমারীর কোণে ভাল করে দেখেশুনে দরজা বন্ধ করে শিমূল শুয়ে পড়ল। রাজ্যের ঘুম যেন তেড়ে এসে ওর দু’চোখ জুড়ে দিল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে।

আলসেমি করে ভোরে না উঠে শিমূল সাতটা নাগাদ উঠল। টয়লেট সেরে, স্নানাদি, শেভ ইত্যাদিতে ঘন্টা খানেক পার করে নাশতার টেবিলে মামার সঙ্গে দেখা। গুড মর্নিং, মামা। সুপ্রভাত, মাই ডিয়ার। তুই চলে যাবি শুনে আমি ভোর-ভোর আজ বেরোলাম না। চল্ একসঙ্গেই যাব। আমার ইস্কুল থেকে তো গড়াই নদী দেখা যায় রে, ব্যস, নদী পেরোলেই চৌগাছিআমার জন্মভূমি আর তোর, হ্যাঁ, তোরও জন্মস্থান বটে। তোর ছোটটামানে রবুর জন্মও ওখানে, বাকিরা ঢাকাইয়া। আয়, আমরা নাশতা সেরে নিই, পান্নু যখন ওঠে, তখন খাবে। কণাও ওদের সঙ্গে বসে। আজ মেয়েটি তেমন ছটফট করছে না আর। মুখে চোখে প্রশান্তির কাজল প্রলেপ। শিমূলেরও মন ভাল। নিজেই পান্নুভাই উঠে, দুর্বল পায়ে আস্তে আস্তে বারান্দায় এসে বসলেন। হাই তুলছেন।

যথাসময়ে ব্যাগ কাঁধে শিমূল পান্নুভাই আর কণার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মামার পিছু পিছু হাঁটা দেয়। পান্নুভাই বলেন, তুমি চৌগাছি পৌঁছে ডঃ আমিনউদ্দিনকে একটা টেলিগ্রাম পাঠিয়ে অসুস্থতার সংবাদ দিও। আমি দিন সাতেক পরেই ঢাকায় যাব। অলরাইট, বলে শিমূল গান ধরে, কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে, তুমি ধরায় আসো… পুরো গানটা শুনিয়ে যাও, শিমূলভাই, কণার আবদার শুনে সে সুরে বলে, এই জীবনে আর কি হবে সাধা, ওগো রাধা…। বাইরে থেকে মামার ডাক ভেসে আসে, কইরে, শিমূল, তুই না হয় আজ থেকেই যা। শুধুমুদু আমার স্কুলে যেতে দেরি হোল। শিমূল হেসে, হাত নেড়ে দৌড়ে বেরিয়ে গিয়ে মামার ছত্রবর্তী হয়ে ছাতাটা নিজের হাতে নিয়ে নেয়। চল্ একেলা, চল্ একেলা, চল্ একেলা।

পুনশ্চ: চৌগাছি পর্ব আগামীবারের জন্য তোলা রইল।

mir.waliuzzaman@bdnews24.com

—-
ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters


3 Responses

  1. আমার মতো যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি তাদের কাছে এসব ইতিহাস অমূল্য হয়ে থাকে।

    এভাবেই ইতিহাস জানতে হবে যারা যুদ্ধ দেখেছেন, যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। আশা করি এভাবেই বর্তমান প্রজন্ম জানতে পারবে, উপলব্ধি করতে পারবে সব কিছু। ধন্যবাদ।

    – মাহবুব

  2. Md. Rasheduzzaman says:

    অসাধারন লাগলো ! পরবতী খন্ড কবে পাব?

  3. Md. Rasheduzzaman says:

    এখনও অপেক্ষায় আছি ২য় খন্ড পড়ার জন্য………কবে পাব ভাই…জানাবেন দয়াকরে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.