অনুবাদ কবিতা

সদ্যপ্রয়াত রুশ কবি ইয়েভগেনি ইয়াভতোশেঙ্কোর কবিতা: আমার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

আবদুস সেলিম | 3 Apr , 2017  

timeyevtushenkoসম্ভবত সত্তর দশকের মাঝামাঝি আমি তখনকার সাপ্তাহিক পত্রিকা, কবি বেলাল চৌধুরী সম্পাদিত “সন্ধানী”-তে ইয়েভগেনি ইয়াভতোশেঙ্কোকে (১৯৩২-২০১৭) নিয়ে লিখেছিলাম যে তিনি কানায়-কানায় পূর্ণ মস্কোর লুজনিকি স্টেডিয়ামে স্বরচিত কবিতা পাঠ করে শ্রোতাদের বাকরুদ্ধ করে রেখেছিলেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মধ্য-চল্লিশ। এর পর দীর্ঘ চল্লিশ বছর পার হয়ে। তাঁর মৃত্যুতে শোক ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করছি সদ্য অনূদিত তার এই আত্মউন্মোচনকারী কবিতাটি দিয়ে।–অনুবাদক

আমি শুধু অত্যুজ্জ্বল ফ্রেমে বাঁধা মানুষদের
কাছ থেকেই আমার শিক্ষা নিই নি,
বিবর্ণ পরিচয়হীন মানুষরাও
আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে।
টলস্টয়ের চেয়ে অন্ধ ভিখেরির কাছে অনেক শিখেছি।
সেই ভিখেরি যে কাউন্ট টলস্টয়ের
গান গেয়ে ট্রেনে-ট্রেনে ভিক্ষে করে খেত।
প্যাস্টারনাকের চেয়ে কুৎসিত বিদ্রুপই
আমাকে অনেককিছু শিখিয়েছে।
আর আমার কাব্যশৈলী হয়ে উঠেছে রগ-রগে আপন ভাষা।
যুদ্ধবাতিল পঙ্গুদের কাছ থেকে
স্ন্যাক খেতে-খেতে শুনেছি ইয়েসিনিন তত্ত্ব
সেই মানুষগুলো যারা টুটা-ফাটা
জামার ভেতর থেকে মুক্ত করেছে তাদের গুপ্ত-কথা!
মায়াকোভস্কির বিন্যস্ত কবিতাগুলো
দিতে পারে নি যা দিয়েছে
বাচ্চা ছেলেমেয়ের প্যান্টে ঘষ্টানো
মলিন সিড়ির চকচকে রেল।
স্বল্পবাক বৃদ্ধাদের কাছ থেকে জিমা জাংশনে জেনেছি
কাটা-ছেঁড়া জখমকে ভয় না পেতে।

টোকাই বেড়ালের গন্ধভরা কানা-গলি,
কিংবা বাঁক-খাওয়া রাস্তার
কাছ থেকে শিখেছি ছুরির বাঁকা ফলার চেয়েও আরও ধারালো হতে,
আবার নিজেকে পোড়া সিগারেটের
মতো নগন্য হতেও শিখেছি।
শূণ্য প্রান্তরই আমার চারণভুমি।
দীর্ঘ অপেক্ষা আমার মমতাময়ী মা।
Evgeny
ভয়ংকর তরুণরা আমাকে
শিখিয়েছে কি করে সহ্যসীমাকে বাড়াতে হয়।
বিধ্বস্ত পাংশুটে ভাড়া-খাটা লেখক
যাদের কবিতা মারাত্মক উপাদানে সমৃদ্ধ
অথচ বিষয়-বস্তর দারুণ সংকটে,
আমি তাদের কাছ থেকেও শিখেছি।
আমি চিলেকোঠার সেপাইদের কাছ থেকেও জেনেছি অনেক।
কিংবা দর্জি আলকার কাছ থেকে,
যে অন্ধকার এজমালি রান্নাঘরে আমাকে চুমু খেত বারবার।
আমি আমার জন্মভূমির ভূ-রেখা থেকে নির্বাসিত হয়ে,
অনেক হৃদয় ছেঁড়া ভূমি পার হয়ে,
দোলনা থকে গোরস্তান পেরিয়ে,
কুঁড়েঘর আর মন্দির অতিক্রম করে,
পৌঁছেছি এই এখানে।
আমার প্রথম পৃথিবী ছিল একটা ছেঁড়া কাপড়ের বল,
তাতে ছিল না কোনো বিদেশী সূতো,
সারা শরীর তার মোড়া ছিল ইটের সুরকিতে,
আর যখন সত্যিকার পৃথিবীতে পা দিলাম,
তখন স্পষ্ট দেখলাম পৃথিবীটাও বাতিল টুকরোতে বানানো,
সামান্য আঘাতেই যা ধ্বসে পড়ে।
প্রাণঘাতী ফুটবল খেলা তাই আমার পছন্দ নয়,
যে খেলা রেফারি আর আইন মানে না,
আর এই গ্রহের সামান্য ক্ষতিকে
আমার স্পর্শে পুষিয়ে দিতে পেরে আমি উল্লসিত!
আমি বিশ্ব ঘুরে দেখেছি
বিশ্বটা যেন সুবিশাল জিমা স্টেশন,
আমি বলিরেখায় ভরা বৃদ্ধার কাছ থেকে অনেক শিখেছি।
এদের কেউ ছিল ভিয়েতনামী, কেউ বা পেরুবাসী।
আমার লোক-জ্ঞান অর্জন হয়েছে দরিদ্র ভরঘুরেদের কাছ থেকে,
এস্কিমোদের কাছ থেকে শিখেছি চালের ঘ্রাণ নিতে,
ইতালিয়র কাছ থেকে শিখেছি অবিচল থাকতে।
হারলেম আমাকে শিখিয়েছে
দারিদ্র থেকে দরিদ্রের প্রভেদ,
যেমন কালো মানুষ তো আসলে সাদাই।
আমি বুঝে গেছি অধিকাংশ
মানুষই অন্যের মতে ঘাড় নাড়ে,
আর তাদের ঐ ঘাড়-নাড়ার ভাঁজে
লুকিয়ে থাকে প্রান্তজন, ঠিক যেমন ট্রেঞ্চের ভেতর।
আমাকে আটকে থাকতে হয় সংখ্যাগরিষ্ঠদের ভিড়ে।
আমিই হয়ে যাই তাদের খাবার, বাসস্থান।
নামহীন আমি হয়ে যাই সর্বনাম।
সব অলেখকের লেখক আমি।
আমি সেই লেখক যাকে সৃষ্টি করেছে পাঠকেরা,
আর পাঠকদের স্রষ্টা তো আমিই।
আমি ঋণ শোধ করেছি।
আমি হলাম তোমাদের স্রষ্টা এবং সৃষ্টি
তোমাদেরি সংকলন এক,
তোমাদের জীবনের দ্বিতীয় সংস্করণ।
আদমের চেয়েও বিবস্ত্র আমি,
অভিজাত দর্জির নেই কোন প্রয়োজন,
সে তো বানায় এক মেকি মানবসত্ত্বা,
আমার, তোমার, সবার।
আমারই ব্যর্থ ভালোবাসার ধ্বংসস্তূপে আমি দাড়িয়ে।
আমার আঙ্গুলের ভেতর দিয়ে
নিরুত্তাপ ঝরে পড়ে বন্ধুত্ব আর আশার ছাইভস্ম।
নিঃশব্দতায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে
দীর্ঘ লাইনের প্রান্তিক মানুষ হয়ে,
আমি মরতে চাই তোমাদের যে কারো জন্যে,
কারণ তোমরাতো প্রত্যেকেই আমার নিজ বাসভূমী।
ভালোবাসার প্রতিক্ষায় মরে যাই আমি
আর নেকড়ের মত যন্ত্রণায় আর্তনাদ করি।
তোমাদের যতটা ঘৃণা করি
তার চেয়েও অনেক বেশি ঘৃণা করি নিজেকে।
তোমাদের ছাড়া আমি ব্যর্থ।
আমার দিকে তোমাদের হাত বাড়িয়ে দাও,
অহংকার যেন আমাকে টেনে না নামায়,
স্বর্গের অতলে যেন ডুবে না যাই।
আমি এক বাজারের ব্যাগ
বিশ্বের সব ক্রেতাদের তাবৎ জিনিশে ঠাসা।
আমি সবার আলোকচিত্রি,
কুখ্যাত চিত্র-সাংবাদিক।
আমি তোমাদেরই সাদাসিধে প্রতিচ্ছবি,
অনেক-অনেক রং চড়াবার অপেক্ষায়।
তোমাদের মুখ আমার লুভ,
আমার একান্ত প্র্যাডো গাড়ি।
আমি যেন এক ভিডিও প্লেয়ার,
যার ক্যাসেটে জুড়ে রয়েছ শুধু তোমরা।
অন্যের রোজনামচায় আমি এক উদ্যোগ মাত্র
সারা বিশ্বের পত্রিকার সপ্রচেষ্টা।
আমার দাঁতে-কাটা কলমে
তোমারা নিজেরাই লিখেছ তোমাদের কথা।
তোমাদেরকে আমার কিছুই শেখাবার নেই।
তোমাদের কাছেই শিখতে চাই আমি।

(ইংরেজি অনুবাদ: আন্তোনিনা ডব্লু. বাউইস, অ্যালবার্ট সি. টড এবং ইয়াভতোশেঙ্কো। বাংলা অনুবাদটি ছন্দবদ্ধ নয়।)

Flag Counter


2 Responses

  1. afsan chowdhury says:

    Excellent translation of a marvelous poem. Congrats Selim bhai. The fierce fire within the poet is exposed by the open windows of his words. It sounds very authentic.

    Its also very Russian, very Soviet if you will propped by a certain degree of sentimental naivete But the poem moves a like a train creating a rhythmic music which is arresting. BTW, I like Andrei Voznesensky the most and even translated him once, probably in my earlier life editions.

    Our poets are closer to the Russians if only because the sophisticated urban angst of the Western sort is beyond them. Russians are historically rustic in literature barring a few pieces ; we are almost entirely peasants in our mind. A good point of convergence.

    Thanks

  2. Abdul's Selim says:

    Thanks a lot Afsan.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.