প্রাচীনতম সভ্যতা, চিরন্তন সম্প্রীতি এবং (প্রত্ন)সম্পদের জন্য ব্যাকুল কামনা!

স্বাধীন সেন | ২২ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ ৫:৪৬ অপরাহ্ন

বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্বের দাপুটে ধারণা ও অনুশীলনের জমিতে একটি অনুসন্ধানমূলক খনন

4.jpg
প্রত্ন-ঢিবি ও মন্দিরকে কেন্দ্র করে চৈত্র সংক্রান্তির মেলা

প্রথম শ্রমিক : এই দালানের ভিতগুলান তো সীতার কোটের মতন বড়।

দ্বিতীয় শ্রমিক : আরে, সীতারকোটে তো সীতার বনবাস হইছিল। ওইহানে তো একটা হীরার বাইস পাওয়া গেছিল। পরে সরকারে নিয়া নেছে।

তৃতীয় শ্রমিক : তোরা তো জানস না যে সীতারকোট পুরাডা এক রাইতের মধ্যে বানাইন্যা হইছিল।

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রমিক : হ, সবই আল্লাহর কুদরত।

[দিনাজপুরে নবাবগঞ্জের দোমাইলে এটি বৌদ্ধবিহার উন্মোচনকালীন সময়ে পাশ্ববর্তী ইটভাটার কয়েকজন শ্রমিকের মধ্যে সংঘটিত সংলাপ। সীতারকোট হচ্ছে একই থানায় অবস্থিত সীতাকোট বৌদ্ধ বিহার।]
—-

টকশোর সঞ্চালক : আচ্ছা, আপনাদের কী মনে হয়। বাংলাদেশের প্রত্নম্পদগুলো যে নষ্ট বা পাচার হয়ে যাচ্ছে তার কারণগুলো কী?
প্রথম বিশেষজ্ঞ : অনেকগুলো কারণই আছে। সরকারের উদাসীনতা, সঠিক ও যথাযথ আইনের অভাব, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত না নেয়া, ইত্যাদি।

দ্বিতীয় বিশেষজ্ঞ : আমার মনে হয় সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আমাদের দেশের মানুষ তাদের গৌরবময় ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন নন। আসলে, অতীতের সমৃদ্ধি, গৌরব আর স্বর্ণযুগ নিয়ে আমাদের নিরক্ষর ও অজ্ঞ সাধারণ মানুষের কোনো ভাবনা নাই।

তৃতীয় বিশেষজ্ঞ : দেখেন, আমরা এই দেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, মুসলমান–সব ধর্মের প্রত্ননিদর্শন পাচ্ছি। এটা তো প্রমাণ করে যে আমাদের দেশে সব ধর্মের মানুষ সুদুর অতীত থেকেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করছে। এই অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য সম্পর্কে মানুষ সচেতন নয়।

টকশোর সঞ্চালক : ঠিক বলেছেন, আগে ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে সবাইকে। যে-জাতি নিজের ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন নয় সেই জাতি সত্যিকার অর্থে জাতি হিসাবে বিবেচিত হতে পারে না। আসুন, আমরা সবাই আমাদের সমৃদ্ধ অতীত ও গৌরবময় ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠি।

[উপরের সংলাপটি আংশিক কাল্পনিক হলেও বক্তব্যগুলো টিভি চ্যানেলগুলোর সাম্প্রতিক টকশোগুলোর কয়েকটি থেকে নেয়া হয়েছে]

●●●

বন্ধনীযুক্ত কোনো টিকা যদি নাও থাকত তারপরেও উপরে উল্লিখিত দুটি সংলাপ পাঠ করলে বেশিরভাগ মানুষই ধরে নেবেন যে প্রথম সংলাপটি ‘অজ্ঞ’, ‘অসচেতন’, ‘নিরক্ষর’ মানুষজনার আলাপচারিতা আর দ্বিতীয় সংলাপটি ‘শিক্ষিত’, ‘সচেতন’ ও বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী কয়েকজন মানুষের কথোপকথন। ঐতিহ্য ও প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে উচ্চবর্গের এলিট নাগরিকদিগের মধ্যে যে-ধারণাগুলো প্রতিষ্ঠিত ও ধরে-নেয়া, সেগুলোর নিরিখে বিচার করলে সংলাপ দুটোর মধ্যে প্রত্যক্ষ ভাবে প্রকাশিত ও পরোক্ষভাবে দ্যোতিত বিভিন্ন ডিসকোর্স ক্রিয়াশীল হিসাবে শনাক্ত করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, প্রথম দৃশ্যের সংলাপকারীগণ লোককাহিনী ও কিংবদন্তীর মাধ্যমে দুটি বৌদ্ধবিহারের নির্মাণ প্রক্রিয়াকে বয়ান করেছেন। তারা, অধিকন্তু, পরবর্তী ঘটনাবলীকেও (হীরার বাইস পাওয়ার ঘটনা) ওই লোককাহিনীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেছেন এবং সর্বোপরি, অপার্থিব শক্তির কুদরত হিসাবে বৌদ্ধবিহার দুটোর সৃষ্টি-রহস্য ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। আধুনিক, সেক্যুলার ও যুক্তিবাদী আখ্যান অনুসারে বয়ান নির্মাণের এই পদ্ধতি মিথিকাল, এই বয়ান মিথ/অতিকথন। আধুনিকীকরণ প্রকল্প ও তার সঙ্গে বিজড়িত সেক্যুলারকরণের ক্ষমতার পরিসরে ‘মিথের’ (এবং বিপরীত অর্থবোধক হিসাবে সংজ্ঞায়িত সত্য/ফ্যাক্ট নির্ভর ইতিহাসের) ধারণায়নে যে বদল ঘটেছে তার প্রেক্ষিতে রূপান্তরিত ও পুনর্গঠিত এই মিথ তার নতুন সংজ্ঞায়ন মাফিক এখন নিদেনপক্ষে প্রতীকগত ও অন্তর্নিহিত কোড বিশ্লেষণের বিষয় হতে পারে; কিন্তু কখনো সত্য/ফ্যাক্ট হিসাবে পরিগণিত হতে পারে না। ফ্যাক্টের সঙ্গে তুলনায় এগুলো হলো কল্পকাহিনী/ফিকশন। অন্যদিকে, দ্বিতীয় দৃশ্য যেটি কিনা প্রচারিত ও রেপ্রিজেন্টেড হচ্ছে প্রচারমাধ্যমে, প্রশ্নাতীত ও স্বতঃসিদ্ধভাবেই সত্য ও বাস্তব হিসাবে বিবেচিত হবে। কেননা আলাপচারীতার বিষয় ও বক্তব্য এবং তার মধ্যে প্রচ্ছন্ন ধারণাগুলো সর্বজনস্বীকৃত, যৌক্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত হিসাবে চিহ্নিত ও সংজ্ঞায়িত হয়। বেশিরভাগ দর্শক-শ্রোতারই মনে হবে যে, আসলেই তো, বক্তারা ঠিক কথাই বলছেন।

আলোচ্য দুইটি সংলাপকে ভিত্তি করে আমি আমাদের দেশে ও সমাজে ‘সচেতন এলিট’ সম্প্রদায়ের চিন্তা-ভাবনা-কথনে প্রচলিত, ধরে-নেয়া, স্বাভাবিক ও স্বতঃসিদ্ধ বলে বিবেচিত-স্বীকৃত-গৃহীত প্রত্নতত্ত্ব ও প্রত্নতত্ত্ব সম্পর্কিত কয়েকটি বয়ানকে এবং কিছু ধারণা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই। এই বয়ান ও ধারণাগুলোকে আমি এই লেখায় দাপুটে বলে চিহ্নিত করছি। এই প্রশ্নউত্থাপনে মূল ধারণা হিসাবে আমি ‘ফ্যাক্ট’ ও ‘ফিকশনের’ বদলে যাওয়া ধারণায়নের ইতিহাসের প্রেক্ষিতে সম্পর্কিত আরো অন্যান্য ধারণাও বিবেচনা করব। স্পষ্টতই, আধুনিক ও সেক্যুলার ক্ষমতার প্রয়োগে, হস্তক্ষেপে ও নির্বাচিত অর্থ নির্মাণের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে আমি মনে করি যে এই দাপুটে ধারণা-শব্দ-বয়ান-রেপ্রিজেনটেশনগুলো সমস্যাজনক ও বিপজ্জনক। অর্থাৎ আমি দেখাতে চাই যে, এই দাপুটে ধারণা ও অনুশীলণকে যেমন ভাবে স্বতঃসিদ্ধ, সর্বজনীন ও স্বাভাবিক জ্ঞান হিসাবে দেখানো হয় এবং আমরা দেখি, আসলে ব্যাপারটা তেমন প্রশ্নাতীত এবং সমস্যাহীন নয়। সে-হিসাবে আমার এই লেখার উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের অতীত সম্পর্কে প্রত্নতত্ত্বে-ইতিহাসে প্রচলিত, প্রচারিত ও গৃহিত ধরে-নেয়া বেশ কিছু ধারণা ও অনুশীলনকে সমস্যাগ্রস্ত করা; যে-বুদ্ধিবৃত্তিক আরাম আমাদের জীবনাযাপনকে আচ্ছাদিত করে রেখেছে তাকে একটু হলেও নষ্ট করা।

স্বাভাবিক হিসাবে প্রচলিত মিথ ও প্রত্নতাত্ত্বিক-ঐতিহাসিক ফ্যাক্ট কিংবা ফ্যাক্ট ও ফিকশনের বৈপরীত্য এই দাপুটে বয়ানের অন্তর্ভুক্ত ঐতিহ্যের ও ইতিহাসের আখ্যানের মধ্যে প্রোথিত। প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসশাস্ত্র স্বীকৃত কোন কোন ঐতিহ্যের আখ্যান যথার্থ, আধুনিক এবং সঠিক, আর কোন কোনটি ঠিক উল্টো তা নির্ধারণ করার মানদণ্ড হিসাবে এই ফ্যাক্ট ও ফিকশনের বৈশিষ্ট্যাবলী ও ফারাকের সীমারেখাকে বিবেচনা করা হয়ে থাকে প্রকট বা প্রচ্ছন্নভাবে। প্রত্নতত্ত্বে ফ্যাক্ট হচ্ছে বস্তুগত নিদর্শন বা সাক্ষ্য যা অবজেকটিভলি ব্যাখ্যা করা সম্ভব বলে মনে করা হয় এই বয়ানে। অর্থাৎ মনে করা হয় যে ইচ্ছা করলে গবেষক অধিপতিশীল রাষ্ট্রীয় ও জাতিগত মতাদর্শ ও ক্রিয়াশীল অসম ক্ষমতাসম্পর্কের বাইরে অবস্থান করতে পারেন। তিনি তার দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা মতাদর্শ বা জ্ঞানের সীমানার বাইরে থেকে আলামত হিসাবে এই ফ্যাক্টসমূহ বিশ্লেষণ করে অতীত সম্পর্কে বিভিন্ন উপাত্ত ও তথ্য হাজির করেন বা করতে পারেন বলে এই বয়ান রেপ্রিজেন্ট করে। অর্থাৎ এই মোতাবেক ফ্যাক্ট হচ্ছে নৈব্যাক্তিক এবং সর্বজনীন; স্বাধীন ও সার্বভৌম মানুষ এই ফ্যাক্টকে নির্মাণ করে বা বিশ্লেষণ করেন। কিন্তু বিশ্লেষিত হবার সময় ফ্যাক্ট নিজে একটি স্বশাসিত সত্তা নিয়ে বিরাজ করে। অন্যদিকে, ফিকশন হলো কাল্পনিক, বাস্তবতা বিবর্জিত অথবা বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত, বাস্তবতার বিকৃতি। এও স্বশাসিত মানুষের নির্মাণ বলে মনে করা হয়। মিথের কাঠামোতে যেমন এক অপার্থিব বা অতিলোকিক কর্তা/কর্ত্রী সকল ঘটনা-ইতিহাসের নিয়ন্তা অথবা প্রভাবক, সময়ের ধারণা যেমন আধুনিক রৈখিকতা অনুসরণ করে না, বিবরণী যেমন আধুনিক ও সেক্যুলার পরম্পরা কিংবা কার্য-কারণ সম্পর্ক মেনে চলে না, ফ্যাক্টে তেমন নয়। উভয়ে উভয়ের সীমানা ও সংজ্ঞা নির্ধারণ করে পরস্পরের সঙ্গে তুলনামূলক ও বৈপরীত্যমূলক সম্পর্কের কাঠামোর মধ্যে।

প্রত্নতত্ত্ব যে ইতিহাস পুণর্গঠন করে সেই ইতিহাস যেহেতু বস্তু নির্ভর সেহেতু তা বাস্তব ও সত্য–এমনটাই মনে করা হয় দাপুটে জ্ঞান ও অনুশীলনে। সেই বিবরণ-ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের সত্যতা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হতে পারে। তবে তর্ক-বিতর্ককে অবশ্যই বস্তুনির্ভর হতে হবে। শাস্ত্র হিসাবে প্রত্নতত্ত্বের এই বস্তুনির্ভরতা নিয়ে কোনো আপত্তি উত্থাপন করা আমার লক্ষ্য নয়। আমার লক্ষ্য হলো ‘বস্তুই নিরপেক্ষভাবে ও অধিপতিশীল ক্ষমতা সম্পর্কের শর্তসমূহর বাইরে থেকে অতীত সম্পর্কে সত্য ইতিহাস উৎপাদন করে’–এমন ধারণার বিপদের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা। এখানে আমার প্রধান আর্গুমেন্ট হলো ফ্যাক্ট ও ফিকশনের ভেদরেখাকে যেভাবে প্রচলিত ডিসকোর্সসমূহে বিবেচনা করা হয় সেটাকে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব। ফ্যাক্টও ফিকশনাস হয়ে উঠতে পারে অথবা ফিকশন কখনো কখনো ফ্যাক্টকে সত্যতার দিক থেকে ছাড়িয়ে যায় এমন যুক্তি উপস্থাপন করা আমার আগ্রহের জায়গা না। বরং আমি বলতে চাই যে প্রত্নতত্ত্ব ও ঐতিহ্য সম্পর্কিত দাপুটে ভাবনা ও বয়ানগুলোতে অতীতের ফ্যাক্টনির্ভর যে-সব আখ্যান চালু আছে সে-গুলো ফিকশনের সঙ্গে সতত অংশীদারিত্বমূলক। ফ্যাক্ট ও ফিকশন কিংবা ফ্যাক্ট ও মিথকে দাপুটে ধারণায়ন যেভাবে স্বতঃসিদ্ধ ও স্বাভাবিক এবং ইতিহাস-পরিবর্তন-পরিমার্জন অনপেক্ষ বলে ধরে-নেয় ব্যাপারগুলো তেমন নয়। এই ধারণাগুলোর বর্তমান কর্ত্তৃত্ব ও অধিপতিশীল মর্যাদা, স্বাভাবিকতা অর্জনের ইতিহাস আছে। এই ইতিহাসে ঔপনিবেশিক (ও উত্তর ঔপনিবেশিক) আধুনিকীকরণ ও সেক্যুলারকরণ প্রকল্পের ইতিহাসের সঙ্গে উপনিবেশকালীন ও পরবর্তী জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের আকাঙ্খাগুলোর সম্পর্ক ওতপ্রোত ও অবিচ্ছেদ্য। অর্থাৎ প্রত্নতত্ত্ব সম্পর্কিত দাপুটে ভাবনা ও বয়ানগুলোর কতৃত্ব ও প্রামাণিকতাকে চ্যালেঞ্জ করে আমি দেখাতে চাই যে বিভিন্ন পরিসরে ক্রিয়াশীল ক্ষমতা সম্পর্কের বাইরে কোনো বস্তুনিরপেক্ষ ফ্যাক্ট চলতি ঐতিহ্যের বিবিধ আখ্যানকে প্রামাণিকতা দিতে ব্যর্থ হয়। কারণ, চলতি ঐতিহ্যের আখ্যানগুলো আমাদের প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাস-শাস্ত্রের ঐতিহাসিকতা ও তাকে গঠন করা বিভিন্ন শর্ত সাপেক্ষে নিবার্চিত হয়েছে, নির্মিত হয়েছে বলে আমি মনে করি।

জাতীয়তাবাদ, ট্রাডিশন/হেরিটেজ আর সভ্যতা খুঁজে ফেরার আকুল কামনা : ফ্যাক্ট ও ফিকশনের পুনর্গঠিত ও অংশীদারিত্বমূলক ভেদরেখার ইতিহাস

দাপুটে আখ্যানে স্বীকার করা না হলেও, ঐতিহাসিকতা বিচার করলে আমরা দেখতে পাই যে প্রত্নতত্ত্ব শাস্ত্রটির জন্ম হয়েছে ঔপনিবেশিক আধুনিকীকরণ প্রকল্পের অংশ হিসাবে। কিন্তু আমার উদ্দেশ্য এ-কথা বলা নয় যে প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাস-বিদ্যা ঔপনিবেশিক শাসনের হাতের পুতুল ছিল। বরং উভয়ের সম্পর্ক অনেক বেশী জটিল, আঁকা-বাঁকা পথে হাঁটা এবং কখনো কখনো প্রবলভাবে প্রচ্ছন্ন। বিভিন্ন ধারণাগত সাদৃশ্য, ক্ষণস্থায়ী বৈসাদৃশ্য ও অংশীদারিত্বর ভিত্তিতে এই সম্পর্ককে বুঝতে চেষ্টা করতে হয়। এ-কারণে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রত্নতত্ত্ব-ইতিহাস চর্চাকে এবং সেই চর্চার পাটাতন হিসাবে কাজ করা দাপুটে ধারণাগুলোকে বুঝতে চেষ্টা করতে হবে অবিভক্ত ভারতবর্ষের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের পরিসরে রেখে। এই পরিসর আধুনিক ও সেক্যুলার ক্ষমতার অসম সম্পকের্র মধ্যে বিবিধ ও বিচিত্ররূপে ধবংসপ্রাপ্ত ও পুনর্গঠিত হয়েছে।

একদিকে ছিল উপনিবেশিত মানুষজন ও সংস্কৃতির অতীত নিয়ে তৎকালীন পশ্চিমা বিদ্যজগতে ক্ষমতা ও মর্যাদাদায়ী প্রাচ্যবাদী রোমান্টিকতা। পাশাপাশি, ছিল বিশ্বব্যাপী ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের বিস্তারের সঙ্গে লেপ্টালেপ্টি করে থাকা আধুনিক ক্ষমতার সঙ্গে বিজড়িত অপরের/অন্যতার অতীত অধ্যয়নের ও জ্ঞান উৎপাদনের আকাঙ্খা ও প্রক্রিয়া যার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট মানদণ্ডমোতাবেক অপরের (এক্ষেত্রে, ভারত ও ভারতীয় হিসাবে চিহ্নিত ও পুনর্গঠিত ভূখণ্ডর ও জনসমষ্টির) অতীতকে ও তার মাধ্যমে বিবর্তনের রূপরেখায় ফেলে বর্তমানকে বোঝার প্রবল প্রাচ্যবাদী আকাঙ্খা ও কর্মকাণ্ড । আরো ছিল উপনিবেশ বিস্তারের কারণে অপরের মুখোমুখি হওয়ার ফলে তৈরি হওয়া বিরাট অভিঘাত সামাল দেয়ার প্রয়োজন ও শর্ত নির্ধারিত ইউরোপীয় নিজ-সত্তা/পরিচয় নির্মাণের ও পুনর্গঠনের শর্তসমূহ, যেগুলো অপরের বিবিধতাকে অতীতের ভিত্তিতে বোঝার-ব্যাখ্যা করার প্রাচ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক জ্ঞান উৎপাদনের সক্রিয়তা তৈরি হওয়ার শর্ত গঠন করছিল। অন্যদিকে ছিল উপনিবেশের ও ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের শাসনের, নিয়ন্ত্রনের ও নিপীড়নের ক্ষমতাকে হেজিমোনিক বৈধতা দেয়ার জন্য অতীত থেকে বৈধতা ও ন্যাজ্যতা খুঁজে বের করার প্রয়োজন। এই জটিল জ্ঞান/আধুনিক ক্ষমতার সতত পরিবর্তনশীল বাক্সময় পরিসরে আর ঔপনিবেশিক আধুনিক রাষ্ট্রে উপনিবেশিক ও উপনিবেশিত-এর অসম সম্পর্কের কাঠামো ও প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রত্নতত্ত্ব শাস্ত্রটির (ও আধুনিক ইতিহাস শাস্ত্রের) গঠন, অধ্যয়ন ও চর্চা আরম্ভ হয় ঔপনিবেশিক ভারতে। এতে করে অতীত হয়ে উঠল আধুনিক ক্ষমতার একটি অন্যতম প্রয়োগবিন্দু। প্রাচ্যবাদী প্রত্নতত্ত্ব চর্চা এবং ঔপনিবেশিক অতীত অধ্যয়নের মধ্যে অনেক সময় প্রত্যক্ষ সম্পর্ক না থাকলেও এবং কখনো কখনো উভয় জ্ঞানের মধ্যে বৈরিতা থাকলেও, সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে উভয় জ্ঞানই ঔপনিবেশিক শাসন, নজরদারী ও নিয়ন্ত্রনের কৃৎকৌশলের/টেকনোলজির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। অতীত সম্পর্কে অর্জিত জ্ঞান একদিকে পশ্চিমের ক্ষমতা বিস্তার ও পোক্ত করার কৌশলের যেমন অনিবার্য অংশ ছিল, একইভাবে ঔপনিবেশিক ক্ষমতাই এমন জ্ঞান অর্জনের পথকে প্রশস্ত করেছিল। কিন্তু অতীত বিষয়ক যে-বিপুল জ্ঞান প্রাচ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক প্রকল্পের বাস্তবায়নের জন্য এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে নির্মিত ও রেপ্রিজেন্টেড হচ্ছিল তাদের মধ্যে সাদৃশ্য যেমন ছিল, তেমনই বৈসাদৃশ্যও ছিল।

সংক্ষেপে বলতে গেলে বলা যায় যে, প্রাচ্যবাদী আখ্যান প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার এক স্বর্ণময়, সমৃদ্ধ ও গৌরবময় ঐতিহ্যকে নির্বাচিত নির্মাণ করছিল, অন্যদিকে ঔপনিবেশিক নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল প্রাচীন ভারতের এক ক্ষয়িষ্ণু ও কদর্য ইতিহাস উৎপাদন করা। পশ্চিমা মানদণ্ড অনুয়ায়ী ‘সভ্যতার’ ধারণাকে ব্যবহার করে উভয় প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত জ্ঞানই ক্রমান্বয়ে ক্ষয়িষ্ণু (যা স্বীকৃত বিবর্তনের তত্ত্বের উল্টো) বর্তমানের দিকে আসা ইতিহাসকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। যেমন : প্রাচ্যবাদী ডিসকোর্স মোতাবেক প্রাচীন ভারত যে সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল সেটা মুসলমান শাসনের অধীনে লোপ পেতে থাকে। প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার সবচাইতে গৌরবময় পর্বগুলেতে বর্হিভারতীয় সভ্যতাসমূহের সঙ্গে যোগাযোগ ও লেনদেন তাৎপর্যময় ভূমিকা রাখে। এই জ্ঞানের একটি অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল একথা প্রমাণ করা যে ভারত তখনই উন্নত ছিল যখন ভারতের সঙ্গে পশ্চিমের সভ্যতার কেন্দ্রগুলোর সম্পর্ক ছিল। ঔপনিবেশিক জ্ঞান দেখানোর চেষ্টা করেছে যে ভারতীয় সমাজ ও সভ্যতা প্রাচীন কাল থেকেই এক ধরনের স্থিতাবস্থায় রয়েছে, অথবা এর মধ্যে কোনো পরিবর্তন হলেও সেটা হয়েছে ক্ষয় ও অবনমন। মুসলমানদের শাসন এই অবনমনকে ত্বরান্বিত করেছিল। উভয় জ্ঞানই ভারতীয় ইতিহাসের এমন এক রেপ্রিজন্টেশন ব্যবস্থা উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করেছে যা একদিকে এই ধারণাকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করেছে যে ভারতীয়রা নিজেরা নিজেদের উন্নতি ঘটাতে অসমর্থ। কেবলমাত্র পশ্চিমা শাসনে ও সহায়তাই তাদের উন্নতি ও প্রগতির নিশ্চয়তা দিতে পারে। অন্যদিকে, ভারতীয় হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যকার দুরত্ব ও সংঘাতকে নতুন ধারণা ও কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করার যৌক্তিকতা অতীত থেকে আবিষ্কার করা হতে থাকে। আশ্চর্যজনকভাবে হলেও, এখানকার উপনিবেশ বিরোধী জাতীয়তাবাদ এমন এক অতীতকে সামনে নিয়ে এল যা বিবরণে উপর্যুক্ত দুই ধারা থেকে ভিন্ন হলেও, উভয়ধারা থেকেই অন্তর্নিহিত থিমের দিক থেকে বিভিন্ন প্রধান ধারণা গ্রহণ করেছিল। তবে কিছু বিচ্ছিন্ন ও ক্ষণস্থায়ী আখ্যানও তৈরি হয়ে উঠেছিল, যেগুলো ক্যাটেগরিকালি ঔপনিবেশিক অতীত-বিদ্যাসমূহকে চ্যালেঞ্জ করতে চেয়েছিল।

হালের জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিভিন্ন পর্যালোচনায় দেখানো হয়েছে যে, যে-কোনো জাতীয়তাবাদী ধারণার প্রতিষ্ঠিত, গ্রহণযোগ্য ও সর্বজনীন হওয়ার ক্ষেত্রে অতীতমুখী হতেই হয়। জাতি হচ্ছে, এইসব বিশ্লেষণ অনুসারে, এমন এক কাল্পনিক জনসমষ্টি যাতে জাতিগত, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং কখনো কখনো ভাষাগত ভিন্নতাকে সমরূপ করতে হয় এমন এক ভ্রাতৃত্বের (যাতে লিঙ্গীয় আধিপত্য সুষ্পষ্ট) ও ঐক্যের আখ্যানের মাধ্যমে যাতে দেখাতে হয় যে সুদুর অতীত থেকেই এই (নতুন ও কাল্পনিক) সমষ্টি সকল ভিন্নতা সত্ত্বেও সারবত্তাগতভাবে কিছু বৈশিষ্ট্যের অংশীদারী। এখানে মনে করিয়ে দিতে চাই যে, এই ব্যাখ্যা অনুসারে জাতির সৃষ্টি ও বিকাশের আখ্যান কিন্তু মিথিকাল; তবে তার রেপ্রিজেনটেশন ফ্যাক্ট-এর মতন। যেমন: যখন বলা হয় যে বাঙালি জাতির ঐতিহ্য হাজার বছরের প্রাচীন তখন কিন্তু হাজার বছরের পরিসরে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে জনসমষ্টির মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও বৈচিত্রকে ধ্বংস করে নির্বাচিতভাবে সমরূপ করে পুনর্গঠিত করা হয়। যে-যে বৈশিষ্ট্য জাতীয়তাবাদী আকাঙ্খার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সেগুলোকে বাদ দিয়ে খারিজ করে দেয়া হয়, আর যে-গুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ সেগুলোকে গ্রহণ করা হয়, ঈষৎ রূপান্তর করা হয় কিংবা বর্তমানের আকাঙ্খা ও শর্ত অনুযায়ি নির্মাণ করা হয়। বাঙালি কিংবা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে অতীত থেকে বর্তমান বৈধতা ও ভবিষ্যত নিয়ে রাষ্ট্র ও শক্তিশালী বর্গগুলোর আকাঙ্খার ন্যায্যতা বিধানের জন্য প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসের জ্ঞানের আবশ্যকীয়তা তাই ঐতিহাসিকভাবেই প্রকট হয়ে পড়েছিল। বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্বরূপ সন্ধান করতে গিয়ে অনেক চিন্তকই দেখিয়েছেন যে, এই জাতীয়তাবাদ যে ঔপনিবেশিক শাসন ও অতীত বিষয়ক জ্ঞানের বিরোধীতা ও প্রতিরোধ করতে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল, অতীত নিয়ে জ্ঞান উৎপাদনের ক্ষেত্রে সেটাই ঔপনিবেশিক ও প্রাচ্যবাদী জ্ঞানকাণ্ডগুলো বৈধতা-ন্যায্যতা-প্রতিষ্ঠা পাওয়ার নিজ কামনা ও প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী বাছাই গ্রহণ করেছিল। বিষয়টি আপাত দৃষ্টিতে পরিহাসের হলেও, ঔপনিবেশিক ও জাতীয়তাবাদী জ্ঞানের পারস্পরিক এই গ্রহণ (ও বর্জন) পারস্পরিক অসম সম্পর্কর অংশীদারিত্বের পরিসরে অনিবার্য ছিল বলেই এ-সব সাম্প্রতিক তত্ত্ব-তালাশে দেখা যায়। কারণ, উভয় জ্ঞানই আধুনিকীকরণ প্রকল্পকে অথাৎ প্রগতিশীল, আধুনিক, উন্নত, বৈজ্ঞানিক ও উদারনৈতিক (জাতি-রাষ্ট্র ও সমাজ) হওয়ার পশ্চিমা জ্ঞান ও মানদণ্ডগুলোকে তাদের পরম লক্ষ ও শর্ত হিসাবে প্রশ্নাতীত ভাবেই স্বীকার করে নিয়েছিল। তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে ঔপনিবেশিক জ্ঞানের সঙ্গে জাতীয়তাবাদীদের কোনো কোনো ধরনের ক্ষেত্রে বিশেষ বিশেষ পরিসরে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের সম্পর্কও ছিল সেকথা এখানে অস্বীকার করছি না। উদাহরণহিসাবে, মহাত্মা গান্ধীর জাতীয়তাবাদী আখ্যান কিংবা রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদী ধারণার বেশ কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা যায়। কিন্তু, ওই ধারণা বা স্রোতধারাগুলো দুর্বল ছিল, দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং পরবর্তীতে মূলধারার জাতীয়তাবাদী কামনার দাপটের মধ্যে আত্মসাৎকৃত হয়েছিল। এই দুর্বল ধারাগুলো দাপুটে প্রত্নতাত্ত্বিক জ্ঞান উৎপাদনে নির্বাচিত হয় নাই বললেই চলে। তাই আমি এই লেখায় এ-প্রসঙ্গে বিশদ বৃত্তান্ত পেশ করলাম না।

একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি বুঝতে হয়ত সুবিধা হবে। ঔপনিবেশিক পণ্ডিতরা বলেছিলেন যে ভারতীয়রা ঐতিহাসিকভাবে অসভ্য, বর্বর বা আদিম সামাজিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। হরপ্পা (বা ভুল নামককরণ–সিন্ধু) সভ্যতার আবিষ্কারের পরে তারা এই মতামত একটু পাল্টে বললেন যে প্রাচীন ‘ভারতীয়রা’ সভ্যতার বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হলেও, সেই সভ্যতার পতন ঘটেছিল আর্যদের কারণে। আর্যরা (অর্থাৎ পশ্চিমা সাদা মানুষদের পূর্বপ্রজন্ম) এতটাই বীর ও বুদ্ধিমান ছিল যে সভ্য ভারতীয়রা তাদের কাছে হেরে গিয়েছিল। প্রাচ্যবাদীরা দেখালেন যে, ভারতে দ্বিতীয় সভ্যতা (বা অন্যভাবে বলা হয়, দ্বিতীয় নগরায়ন) গড়ে তুলেছিল এই আর্যরাই। আর্যদের শ্রেষ্ঠত্ব তাই প্রশ্নাতীত। অত্যন্ত সুকৌশলে ভারতের উচ্চ জাতিবর্ণের পরিচয় বহনকারী ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় শ্রেণীর পুরানো সত্তাকে ধ্বংস করে, সভ্যতার আলোকবর্তিকাবাহক হিসাবে সংজ্ঞায়িত আর্যদের রক্তবাহী হিসাবে তাদের নতুন পরিচয় দেয়া হলো। লক্ষ করুন, জাতিবর্ণ ভিত্তিক বিভাজন উপনিবেশপূর্ব ভারতীয় সমাজের একটি বৈশিষ্ট্য হলেও এবং সেখানে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় শ্রেণীর দাপট অব্যহত থাকলেও, এই ঐতিহাসিক পরিচয়প্রদানের মাধ্যমে তাদের নতুন বর্গীকরণ সম্ভবপর হয়ে উঠেছিল। এই বর্গীকরণ উপনিবেশিক রাষ্ট্র শাসন ও আধুনিকীকরণ প্রকল্পের বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। প্রাচ্যবাদীগণ ‘প্রাচীন’ ভারতের বিভিন্ন সংস্কৃত টেক্সট ভাষান্তরকরণ, স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের বিশদ নথিভুক্তকরণ ও বিশ্লেষণ, বৃহৎ জরিপপ্রকল্পের মাধ্যমে এক একটি স্বর্ণযুগের সন্ধান বের করলেন। যে-যে মাপকাঠিতে এই ‘স্বর্ণযুগ’ বর্গটি/ক্যাটেগরিটি নির্মিত হলো সেগুলো পশ্চিমা ঐতিহাসিক পরিসর থেকে বাছাই করে গৃহিত; যেমন: কেন্দ্রীয় কর্ত্তৃত্বভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, নগর নির্ভর শাসন ও ব্যবসা কেন্দ্র, নিবার্চিত শিল্পবস্তুকে সমৃদ্ধির চিহ্ন হিসাবে বিবেচনা, ইত্যাদি। জাতীয়তাবাদীদের একটা অংশ যারা পশ্চিমা আধুনিকতাকে জাতীয় আকাঙ্খার চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসাবে গ্রহণ করলেন তারা কিন্তু সভ্যতার ধারণাকে বর্জন করলেন না। বরং তারা অতীত থেকে বিভিন্ন সূত্র নির্বাচন করে দেখাতে চেষ্টা করলেন যে ভারতীয়রাও (এবং বাঙালিরাও) [এইক্ষেত্রে সমীকৃত করা হলেও খেয়াল রাখবেন যে ভারতীয় ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারণার কল্পনা, গঠন ও বিকাশের সময়কালে উভয়ের মধ্যে ধারণাগত সাদৃশ্য ও বিনিময়ের পাশাপাশি বিচূতি ও প্রতিরুদ্ধ সম্পর্কও অস্তিত্ত্ববান ছিল] অতীতে ইউরোপীয়দের মতন বা তাদের চাইতেও বেশি সভ্য ছিলেন। তারা দাবি করলেন যে যখন পশ্চিমারা অন্ধকারে তখন ভারতীয়রা সভ্যতার আলোকে উদ্ভাসিত। আবার যারা সেক্যুলার জাতীয়তাবাদী তারা দেখালেন যে মুসলমান শাসনামলেও কোনো কোনো কালপর্বকে স্বর্ণযুগ হিসাবে বিবেচনা করা যায় (অর্থাৎ স্বর্ণযুগের মাপকাঠিগুলোকে চ্যালেঞ্জ না করে প্রমাণ করার চেষ্টা চলতে থাকলো যে নিজেদের অতীতকে কতটা স্বর্ণযুগআকীর্ণ করে তোলা যায়।); সমৃদ্ধিময়, গৌরবময় ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি –ঐক্যময় অতীতের নির্দিষ্ট একটি চেহারার পিছনে এই নিরন্তর ছুটে চলা এবং যে-কোনো জ্ঞানের দাবিকে এই ছুটে চলার থিম ও ক্ষমতা দিয়ে ন্যাজতা দেয়া, যাকে সম্প্রতি একজন ঐতিহাসিক স্বর্ণযুগ বিভ্রম হিসাবে চিহ্নিত করেছেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদী প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাস চর্চার সারবত্তা। এই জ্ঞান ও জ্ঞানের দাবিকে বিশিষ্টজনদের ভাষায় বলা হয় ঐতিহ্য।

আবার সাম্প্রতিক ভারতে যেমন দেখা যায় যে হিন্দত্ববাদী জাতীয়তাবাদীরা আর্য শ্রেষ্ঠত্বের এবং আর্যরাই যে ভারতীয় সভ্যতার প্রধান নির্মাতা এমন বয়ানকে গ্রহণ ও প্রচার করছেন। তারা আরো আগ বাড়িয়ে দাবি করার চেষ্টা করেন যে আর্যরা আসলে বহির্ভারতীয় নয়, তারাই ভারতীয়। অদ্ভূতভাবেই, তাদের বিরোধীতাকারী পণ্ডিতদের সংখ্যাগড়িষ্ট অংশ সভ্যতা ও স্বর্ণযুগের মানদণ্ডগুলোকে প্রশ্ন না করে হয় বলতে চেষ্টা করেন যে আর্যরা বহির্ভারতীয় হলেও তারা সভ্যতার ধারণা ভারতীয় অনার্যদের কাছ থেকেই পেয়েছিল এবং আর্য-অনার্যদের পাস্পরিক বিনিময় নির্ভর প্রয়াসই ‘প্রাচীন’ ভারতীয় সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল। আমাদের দেশে বাঙালি ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদীদের ঐতিহ্য নিয়ে বিভিন্নমুখী তর্কবিতর্কের প্রধান ধারণাগত পাটাতন উপরের বিতর্কেরই ধারাবাহিকতা বলা যায়। এটা দুই পক্ষের ঐতিহ্য সন্ধানের মূল স্বর ও ঐতিহ্যর বয়ানগুলোতে প্রচ্ছন্ন ও প্রকটভাবে প্রতিভাত হয়। উভয়পক্ষের মতামতেই প্রচুর-প্রচুর ফ্যাক্ট নির্ভর সূত্র ও আলামত (যেমন: কোনো বিশেষ ধরনের ‘ট্রেড-মার্ক’ প্রত্নবস্তু ) ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আমি মনে করি যে, সকল পক্ষের দাবিতেই ফ্যাক্ট ও ফিকশনের সীমারেখা অস্পষ্ট। ফ্যাকটের জাতীয়তাবাদী শর্তসাপেক্ষ পুনর্গঠিত ব্যাখ্যাগুলো (যা, সাপেক্ষিক ও পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ভর, নিরপেক্ষ বা অনপেক্ষ নয়) এক ফিকশনাল অতীত নির্মাণ করছে অধিপতিশীল বর্গগুলোর (শ্রেণীগত, জাতিগত, লিঙ্গীয়, মতাদর্শিক, ইত্যাদি) আকাঙ্খা ও কামনা দ্বারা অন্য বা অপর বর্গগুলোর সঙ্গে অসম ক্ষমতা সম্পর্কের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, একটি প্রশ্নাতীত মর্যাদা ও অবস্থানে উত্থিত হচ্ছে এবং ওই বর্গগুলোর নিয়ন্ত্রনাধীন প্রচারযন্ত্র, শিক্ষণ কৃৎকৌশল ও পুঁজির মাধ্যমে স্বাভাবিক হিসাবে পরগণিত হচ্ছে।

‘সভ্যতাকে’ ব্যাকুলভাবে কামনা করার এই আধুনিক প্রপঞ্চ এমন এক ঐতিহ্যর ধারণা যা, বিভিন্ন চিন্তক দেখিয়েছেন, পশ্চিমের সঙ্গে অপশ্চিমের সমাজ, জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতিগুলোর উপনিবেশকালীন ও চলমান অসম ক্ষমতা সম্পর্কের কাঠামো ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নির্বাচিত, নির্মিত ও/বা পুনর্গঠিত হয়েছে/হচ্ছে। আমি মনে করি, কোনো ঐত্যিহ্যের ধারণা স্বতঃসিদ্ধ নয়, কোনো ঐতিহ্যর ধারণাই স্থান-কাল-পাত্র নিরপেক্ষ নয়। উপরের সংক্ষিপ্ত আলোচনা প্রমাণ করে যে, কোন ঐতিহ্যের ধারণা শক্তিশালী ও স্বাভাবিক হয়ে উঠবে সেটা নির্ভর করে অসম ক্ষমতা সম্পর্কের মধ্যে অধিপতিশীল ক্ষমতাকাঠামোগুলো অতীতের কোন জ্ঞানগুলোকে ও অনুশীলনগুলোকে ঐতিহ্য হিসাবে নির্বাচন করছে, নির্মাণ করছে, পুনর্গঠন করছে, আর কোনগুলোকে ধ্বংস করে খারিজ করে দিচ্ছে তার উপরে। আমার দাবি হলো, সময়ের আধুনিক ধারণা এই নির্মাণের (ও ধ্বংসের) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও পরিসর।

হালের বাংলাদেশের পাবলিক পরিসরের নাগরিক আলাপ-আলোচনায় ঐতিহ্য শব্দটি বহুল প্রচলিত হয়ে উঠেছে। সেটা অতীত সম্পর্কে নির্দিষ্ট কতগুলো বিবরণী, অতীতের নির্দিষ্ট কতগুলো পরিচয়কে অন্যান্য বিবরণী ও পরিচয়ের তুলনায় অধিকতর গ্রহণযোগ্য ও যথার্থ হিসাবে রেপ্রিজেন্ট করে। ঐতিহ্য এসব ক্ষেত্রে ট্্রাডিশন ও হেরিটেজ উভয় অর্থে ব্যবহৃত হয়। এই দুটি ইংরেজি শব্দের মধ্যে সম্পর্ক থাকলেও আমি আগের একটি লেখায় দেখিয়েছি যে দুটি শব্দের মধ্যে ধারণাগত পার্থক্য বিদ্যমান এবং এই পার্থক্য বাংলাদেশের আলাপ-আলোচনায়ও উপস্থিত। হেরিটেজের ধারণাও সম্প্রতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে আমাদের ও আরো অনেকের লেখার মাধ্যমে। বাংলাদেশের দাপুটে অনুশীলনে ঐতিহ্য/ট্রাডিশনের দুই ধরনের ধারণা সক্রিয় আছে। একটি ধারণায় ঐতিহ্যকে রৈখিক সময়ের বিবর্তনের ধারায় অতীতের একটি নির্দিষ্ট কালপর্ব হিসাবে বিবেচনা করে যেটি পুরনো হয়ে গেছে, যেটি কালিকভাবে স্থির এবং যেটি আধুনিকতার বিপরীত অর্থাৎ অযৌক্তিক, তর্ক-বিতর্কের পরিসর বিহীন, ইত্যাদি। অন্যদিকে, আরেকটি ধারায় ঐতিহ্যকে (কিংবা অতীতের নির্দিষ্ট একটি ডিসকোর্সকে) কোনো কোনো মাত্রায় আধুনিকতার পরিপূরক হিসাবে ধরা হয়। এ-ক্ষেত্রে মনে করা হয় যে, কোনো কোনো ঐতিহ্য আধুনিকতা ও প্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেক্যুলার জীবনযাপনের জন্য সঙ্গতিপূর্ণ; কোনো কোনোটি নয়। আরো মনে করা হয় যে, ঐতিহ্যকে বোঝা ও সন্ধান করা প্রয়োজন কেবল ঐতিহ্যকে আধুনিকতার মধ্যে গ্রহণ করার জন্য নয়; পাশাপাশি অযৌক্তিকতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতা থেকে যৌক্তিকতা ও প্রগতিশীলতায় বিবর্তনের প্রামাণ্য হিসাবে ঐতিহ্য অতীতের একটি মানদণ্ড আমাদের সামনে খাড়া করতে পারে। এই মানদণ্ডের ভিত্তিতে পরিমাপ করা যাবে কে কতটা এগিয়েছে কিংবা পিছিয়েছে। ঐতিহ্যের উপরের উল্লিখিত ধারণাগুলোতে যে-বৈশিষ্ট্যাবলি সুস্পষ্ট সেগুলো হলো: এক. ঐতিহ্য রৈখিক ও নৈর্ব্যক্তিক, নির্গুণ সময়ের রৈখিক ধারাবাহিকতারই কোনো একটি পর্ব। ঐতিহ্য একরূপ, হয় ইতিবাচক নয়ত নেতিবাচক। ঐতিহ্য তখনই গুরুত্বপূর্ণ যখন তা আধুনিকতার ও সেক্যুলার জীবনযাপনের শর্তগুলো ও আকাঙ্খাগুলো মোতাবেক সামঞ্জস্যপূর্ণ কিংবা অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। দুই. ঐতিহ্য যে বিবিধতাকে ধারণ করতে পারে, তার মতো করে তর্ক-বিতর্ককে ধারণ করতে পারে, বিবিধ অর্থ প্রকাশের শর্তসমূহ অনুসন্ধানে কাজে আসতে পারে এবং সর্বোপরি ঐতিহাসিকতার বিবিধার্থক ব্যঞ্জনা দ্যোতিত করতে পারে যেখানে শরীর, চিন্তা, স্বপ্ন ও আচরণের বিবিধ ও ভিন্ন ব্যাখ্যা সৃষ্টির অনুশাসনও অন্তঃপ্রবিষ্ট থাকতে পারে তা এই আখ্যানে অনুপস্থিত। তিন. সর্বোপরি, সমরূপ, রেখিক, নির্গুণ আধুনিক সময়ের ধারণার সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে অতীতের কিছু পঠন ও পুনর্গঠন ভিত্তিক জ্ঞানকে ঐতিহ্য হিসাবে নির্বাচন করা হয়; কিছু জ্ঞানকে (ও জ্ঞান অর্জনের তরিকাকে) বাদ দেয়া হয়, না-জায়েজ ঘোষণা করা হয়। উদারনৈতিক জাতি-রাষ্ট্রর শাসনের (যা একইসঙ্গে নিপীড়নমূলক, হেজিমোনিক, অহিংস হয়ে থাকে) উপযোগীকরণ ও জাতীয়তাবাদী আকাঙ্খা পূরণ এই নিবার্চনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসাবে কাজ করে।

আরেকদিকে, ঐতিহ্য/হেরিটেজ-এর ধারণা অনেক বেশি প্রত্নতত্ত্ব কেন্দ্রীক, অন্ততপক্ষে বাংলাদেশের দাপুটে অনুশীলনে যেমনটি মনে হয়। যদিও প্রত্নতত্ত্ব ও সংরক্ষণ শাস্ত্রে অস্পর্শনীয়/ইনট্যানজিবল হেরিটেজের ধারণাসমূহ অন্তর্ভুক্ত আছে, কিন্তু এ-দেশের পাবলিক পরিসরের অধিপতিশীল আলাপ-আলোচনায় প্রধান স্বর হেরিটেজকে প্রত্নতাত্ত্বিক-ঐতিহ্য হিসাবেই নির্মাণ করে। আমার বিশ্লেষণ হচ্ছে, ট্রাডিশনের ক্ষমতাকাঠামো যেখানে উদারনৈতিক রাজনৈতিক শাসনের প্রাইভেট ও পাবলিক পরিসরের গণ্ডি অনেক সময় ভেঙে ফেলে ও ছাপিয়ে যায়, হেরিটেজ তখন অনেক বেশি পাবলিক পরিসর কেন্দ্রীক এবং সেক্যুলার। যখন সাংস্কৃতিক হেরিটেজ সংরক্ষণের দাবি তোলা হয় তখন এই সাংস্কৃতিক হেরিটেজ ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন একই বলে মনে হতে থাকে। তবে পষ্ট করে বলা দরকার, সাংস্কৃতিক হেরিটেজের মধ্যে অন্যান্য উপাদান, যেমন: সঙ্গীত, শিল্পকলা, সাহিত্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও, আমি এখানে কোন উপাদানটি সাম্প্রতিক কালে দাপুটে হয়ে উঠেছে সেটি শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। এসব বয়ানে যখন হেরিটেজকে বিভিন্নভাবে পেশ করা হয় তখন মনে হতে থাকে যে পেশকৃত হেরিটেজগুলো যুগ যুগ ধরে একই রকম আছে এবং সেগুলো এখন ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। পেশকৃত হেরিটেজগুলো, আমি বলতে চাই, দাপুটে ট্রাডিশনের ধারণার মতই নির্বাচিত, পুনর্গঠিত ও পুনরুৎপাদিত হয়েছে একই ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে। হালে দুনিয়ায় ট্রাডিশনের তুলনায় হেরিটেজ ধারণাটি অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে পাবলিক ও বিদ্যায়তনিক পরিসরে। প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাস শাস্ত্রে আলাদা আলাদা উপ-শাস্ত্র হিসাবে হেরিটেজ ও হেরিটেজ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পঠনপাঠনের মাত্রা বৃদ্ধি এবং এই ক্ষেত্রে ইউনেস্কোর মত আন্তুর্জাতিক সংস্থার ব্যপক পুঁজি লগ্নি হেরিটেজের ধারণা ও প্রত্যয়নকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রেখেছে। সেক্ষেত্রে, উল্লেখ করা জরুরী যে, ক্ষমতা/জ্ঞানের আন্তঃরাষ্ট্রীয় সঞ্চালন এবং উন্নয়নের ও পুঁজির দাপটের বিশ্বায়ন হেরিটেজ প্রত্যয়টিকে অনেক বেশি সর্বজনীন, দেশ-সংস্কৃতি নিরপেক্ষ হিসোবে পুনর্গঠন করতে সমর্থ হয়েছে। ট’্রাডিশন প্রত্যয়টি যেখানে স্থানিকতা ও আঞ্চলিকতা দোষে দুষ্ট হতে পারে, হেরিটেজ প্রত্যয়টি সেই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারে বলেই মনে করেন বিদ্যায়তন ও আন্তর্জাতিক কর্তৃত্বকারী সংস্থা ও সংগঠনের কনভেনশন ও পঠন-পাঠন। বিশ্ব ঐতিহ্য/ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের মতো ধারণা এখন অসম্ভব জনপ্রিয় উঠেছে। যদিও, বিশ্ব ঐতিহ্য হিসাবে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন নিদর্শন নিবার্চনে বিশ্বজনীন মূল্য ও মানব সভ্যতায় অবদানের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে, কিন্তু অনেক চিন্তকই দেখিয়েছেন যে এই নির্বাচনও ইউরোপকেন্দ্রƒীক এবং প্রাচ্যবাদী ডিসকোর্স দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও নির্ধারিত।যে-মানদণ্ডগুলোর ভিত্তিতে এই নির্বাচন (এবং খারিজ) করা হয় সেগুলোও, পণ্ডিতরা দেখিয়েছেন, যে পশ্চিম-অপশ্চিমের মধ্যের ঐতিহাসিক ও চলমান অসম ক্ষমতা সম্পর্কের মধ্যে নির্মিত হয়েছে। অথচ, আমাদের দেশেও ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসাবে বিভিন্ন প্রত্নস্থানের অন্তর্ভুক্তির দাবিকে জাতীয় আকাঙ্খার বিষয়ে পরিনত করা হয়েছে, যদিও বিশ্ব ঐতিহ্য হিসাবে ইতোমধ্যেই স্বীকৃত এবং পুঁজি লগ্নীকৃত প্রত্নস্থানগুলো (যেমন : পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার ও ষাট গম্বুজ মসজিদ) স্বীকৃত আধুনিক সংরক্ষণ শাস্ত্র মোতাবেকই স্বীকৃতির পরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি বলে বিশেষজ্ঞরা দেখিয়েছেন। লক্ষ করুন আমি এখানে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসাবে নির্বাচন ঠিক না বেঠিক সেকথা আলোচনা করছি না। হেরিটেজের এবং ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের ধারণাগুলো যে দাপুটে ক্ষমতা সম্পর্ককেই বৈধতা দিচ্ছে এবং শক্তিশালী করছে সেই সত্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছি।

‘সভ্যতা’, ‘ট্রাডিশন’, ‘হেরিটেজ’, ‘স্বর্ণযুগ’-এর মত যে প্রত্যয়গুলো নিয়ে এতক্ষণ আলোচনা করলাম সেগুলোর শক্তিশালী ও প্রশ্নাতীত অবস্থান প্রাপ্তি এবং প্রামাণ্য জ্ঞান মর্যাদা ও স্বীকৃতি অর্জন, আমি দেখানোর চেষ্টা করছি, ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে প্রচ্ছন্নভাবে এবং ওতপ্রোতভাবে বিজড়িত ছিল অ-পশ্চিমা সমাজ, জাতি, সংস্কৃতি, ধর্মগুলোর সুনির্দিষ্ট রেপ্রিজেনটেশন ও ইমেজ নির্মাণ ও পুনর্গঠনের জ্ঞান উৎপাদনের ঐতিহাসিক পরিসরে। আমি আরো চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি যে, এই প্রত্যয়গুলো আধুনিক ও সেক্যুলার পরিচয় অর্জনেরও অন্যতম পূর্বশর্ত হয়ে উঠেছে। এ-ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক আধুনিকতাবাদী প্রকল্পগুলো যে-যে পরিসরগুলোকে তাদের ক্ষমতাপ্রয়োগ ও পুনর্গঠনের টার্গেট করেছিল আর পুনর্গঠিত করেছিল সেগুলোর মধ্যে সময় ও সময়ের ধারণা হচ্ছে অন্যতম। পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদী ধারণাগুলো ও জাতি-রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের দাপুটে মতাদর্শগুলো এই পুনর্গঠিত সময়ের ধারণার অংশীদারী হয়ে উল্লিখিত প্রত্যয়গুলো যেগুলো এই পুনর্গঠিত সময়ের ধারণার পাটাতনের উপরে দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলোকেই গ্রহণ করেছে।

রৈখিক, বিমূর্ত ও নির্গুণ সময়ের তীরের সঙ্গে নিয়ত ধাবমান ও দ্বন্দ্বরত অতীত, এবং প্রত্নতত্ত্ব

এ-কথা পরিস্কার ভাবেই বলে নেয়া দরকার যে এই আলোচনার উদ্দেশ্য এ-বিষয়টি প্রমাণ করা নয় যে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রত্নতত্ত্ব-ইতিহাস বিষয়ক সকল ধারণা পশ্চিমী ধারণাসমূহের অনুকরণে নির্মিত হয়েছে অথবা সকল ধারণাই ঔপনিবেশিক শর্ত দ্বারা নির্মিত হয়েছে। প্রতিরোধী, বিকল্প চিন্তা-ভাবনার অস্তিত্ব সকল সময়ই ছিল। সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন ধারার ইতিহাসবিদগণ এইসব ধারাকে শনাক্ত করার চেষ্টা করেছেন।১০ আবার, উপনিবেশ-পূর্ব ধারণাগুলোর সবগুলোকে বা সকল বিবিধতার ধরন ও ধারাবাহিকতাকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে ব্রিটিশ উপনিবেশ – এমন সোজাসাপ্টা ব্যাখ্যাকেও আমি ঠিক বলে মনে করি না। বরং উপনিবেশ-পূর্ব ও ঔপনিবেশিক পরিসরের মধ্যে সম্পর্ক অনেক বেশী বাক্সময়/ডিসকার্সিভ, জটিল এবং প্রচ্ছন্ন। ঔপনিবেশিক আধুনিক ক্ষমতার প্রয়োগবিন্দু হিসাবে অতীত ও উপনিবেশিক ও উপনিবেশিতর অসম ক্ষমতা সম্পর্কের প্রক্রিয়া ও কাঠামোর মধ্যে উৎপাদিত ও পুনর্গঠিত বিভিন্ন ডিসকোর্স, পুরানো বর্গ/ক্যাটেগরি ভেঙে পুনর্নিমিত নতুন ও আধুনিক বর্গ ও পরিসর আমাদের বিশ্লেষণে ও চিন্তনে সতত উপস্থিত রাখা জরুরী। তবে আমার আলোচনার জন্য সেগুলো বিশদভাবে উল্লেখ করাকে জরুরী মনে করছি না। কেননা লেখার এই অংশে আমার লক্ষ হচ্ছে সময়ের নির্দিষ্ট একটি ধারণা কীভাবে শক্তিশালী ও স্বাভাবিক প্রত্যয় হয়ে উঠল আমাদের বিদ্যাজাগতিক ও অ-বিদ্যাজাগতিক অনুশীলনে তা খোঁজা ও কোন কোন ঐতিহাসিক শর্তের উপস্থিতিতে এমনটি হল তা পর্যালোচনা করা। অধিপতিশীল আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসের ধারণার সারবত্তাগত বৈশিষ্ট্য হিসাবে আমরা কতগুলো বিষয়কে চিহ্নিত করতে পারি :

ক. ফ্যাকট ও ফিকশনের ধারণায়নের কথা আমি আগেই উল্লেখ করেছি তা পশ্চিমা দৃষ্টবাদী ও প্রত্যক্ষণবাদী চিন্তার প্রভাবে ইতিহাস বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষভাবে রচনা করা যায় এমন বিবেচনা করার অনুশীলন থেকে উদ্ভূত। মনে করা হয় যে ইতিহাস হচ্ছে সত্য/ফ্যাক্ট বা অসংখ্য সত্যের/ফ্যাক্টের প্রতিফলন। আমরা সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশে ’ইতিহাস বিকৃতি বিষয়ে’ পণ্ডিতমহলে যে তর্ক-বিতর্ক লক্ষ করি সেগুলো আধুনিক ইতিহাসের এই ব্যঞ্জনা বহন করে যে, অ-বিকৃত (বা বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ) ইতিহাস রচনা করা সম্ভব। এক্ষেত্রে মনে করা হয় যে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি, যা অবশ্যই প্রত্যক্ষণবাদী, অনুসরণ করে অতীতের নৈর্ব্যক্তিক, বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ পুনর্গঠন সম্ভব।

খ. আধুনিক ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব কালনির্দেশকরণ ছাড়া অসম্ভব। কালিকতা/টেমপোরালিটি হচ্ছে শাস্ত্র হিসাবে ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের সারবত্তা। বিশেষ ধরনে ও করণে সময়কালের নির্দেশ ছাড়া প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসকে অস্বাভাবিক বলে মনে করা হয়। আধুনিক কালিকতা নির্দেশ করা হয় একটি রৈখিক কাঠামো অনুসরণ করে যেখানে সময়কে ‘সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া’, বিমূর্ত, সংখ্যার মাধ্যমে মাপনযোগ্য ও প্রকাশযোগ্য ও নির্গুণ একটি সেক্যুলার প্রপঞ্চ হিসাবে মনে করা হয়। প্রত্নতত্ত্বে ও ইতিহাসে কালিকতার এই ধারণার সঙ্গে ‘সভ্যতার’ ও ‘ট্রাডিশন/হেরিটেজের’ ধারণার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে যা আমি পূর্ববর্তী অংশে উল্লেখ করেছি। অধিপতিশীল ইতিহাস ও প্রত্নবিদ্যার আলাপচারীতায় বিভিন্নভাবেই সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত উপর্যুক্ত ধারণাগুলোর রেপ্রিজেনটেশন পাওয়া যায়। যেমন: কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বা প্রত্নস্থান কতটা পুরনো (বা ক্যালেন্ডারের সময়গণনার পদ্ধতিতে কত বেশি সংখ্যায় প্রকাশ করা যায়) সেটা প্রত্নতাত্ত্বিক জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্বের একটি অন্যতম মানদণ্ড হিসাবে বিবেচিত হয়। ফলে, ‘আড়াই হাজার বছরের পুরনো রাস্তা’ বা ‘সবচেয়ে পুরনো বা প্রাচীনতম নগরী’ আবিষ্কার নিয়ে আলোড়ন প্রত্নবিদ্যার সাম্প্রতিক পর্যালোচনাগত ও পদ্ধতিগত মানদণ্ডে ভ্রান্ত হলেও, প্রচারমাধ্যমের কাছে, প্রতিষ্ঠানের চর্চায়, এলিটিয় চৈতন্যে সেটি চমক তৈরি করে এবং সহজে বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা পায়। তবে, এই সহজেই গৃহিত হওয়ার ক্ষেত্রে পূর্বে উল্লিখিত (ঔপনিবেশিক) আধুনিক ক্ষমতার প্রয়োগবিন্দু নির্বাচন এবং ক্ষমতার সম্পর্ক ও সক্রিয়তা কীভাবে অধীনস্ত মানুষজনার প্রতিক্রিয়াকেও নির্ধারণ করে দেয় সেকথা মনে করতে হবে।

গ. আধুনিক ইতিহাসের ধারণার আরেকটি সারবত্তাগত বৈশিষ্ট্য হলো ‘স্বাধীন, ইচ্ছামাফিক সক্রিয়তার’ ধারণা। ‘আমার ইতিহাস নির্মাণ করতে পারি বা করেছিলাম’–এই বিবৃতির গুঢ় ব্যঞ্জনা হলো যে, মানুষ ব্যক্তি ও সমষ্টি হিসাবে স্বয়ংশাসিত ও স্বগঠিত, স্বাধীন ইচ্ছামাফিক তার/তাদের সক্রিয়তা (ও নিষ্ক্রিয়তা, কারণ নিষ্ক্রিয় থাকাও এক ধরনের সক্রিয়তা) সে/তারা নির্ধারণ করতে পারে। ফলে ‘অতীত’ সম্পর্কিত আখ্যান হয়েও ইতিহাস হয়ে ওঠে ‘বর্তমানকে’ ‘সচেতন সক্রিয়তার’ মাধ্যমে পরিবর্তন করে ‘ভবিষ্যতকে’ পূর্বাভাসযোগ্য মনে করার পরিসর। এখানে ভবিষ্যত হচ্ছে নতুন ও উন্নততর কোনো সময়কালের ইঙ্গিতবাহী কাল। এই আখ্যানের একটি দাবি দাঁড়ায় এরকম–অতীতের গৌরব ও উন্নতি হারিয়ে গেছে। ওই হৃত গৌরবকে, উন্নতিকে পুনরায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব যদি সচেতন সক্রিয়তার মাধ্যমে বর্তমানকে পরিবর্তন করা যায়। সক্রিয়তা এবং ইতিহাসের এই আধুনিক সংশ্লেষণ বিভিন্ন জাতি-রাষ্ট্রের ধারণাকে বাস্তব রূপ দিতে যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তেমনি নতুন নতুন জাতি-রাষ্ট্রের শর্তাধীনে এই জ্ঞানই জাতি-রাষ্ট্রের এবং দাপুটে ডিসকোর্সের অবিভাজ্যতা ও আধিপত্যকে শক্তিশালী করে তুলেছে।

পরবর্তী অংশে আমি কালিকতার ধারণার সঙ্গে আমাদের এখানে প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাস বিষয়ক আলাপচারিতায় অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে চলতি এবং অধিপতিশীল ক্ষমতা কাঠামোয় নিতান্ত কাণ্ডজ্ঞানের ধারণা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত ও প্রচলিত হয়ে ওঠা কয়েকটি প্রত্যয়কে সম্পর্কিত করে আলোচনা করার চেষ্টা করব। আমার আর্গুমেন্টের প্রধান লক্ষ হলো এই প্রত্যয়গুলো যে ভুল সেটা প্রমাণ করা নয়। কোনো বিকল্প প্রস্তাব করাও আমার পরামর্শ বা দাবি নয়। বরং এই কালজ্ঞাপক প্রত্যয়গুলো অতীত বিষয়ক জ্ঞান উৎপাদনকারী শাস্ত্রগুলোতে (যেমন : প্রত্নতত্ত্ব, ইতিহাস, হেরিটেজ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি) কীভাবে প্রশ্নতীত অবস্থান ও মর্যাদা অর্জন করল এবং নিতান্ত কাণ্ডজ্ঞানের বিষয় হিসাবে গঠিত হলো সেটা পর্যালোচনা করার চেষ্টা করাকে আমি অধিকতর দরকারী বলে মনে করছি।

‘জানা যাবে অথচ অদ্ভূতভাবেই বিচ্ছিন্ন’ অতীত আর ‘অজানা হলেও কামনা ও পূর্বধারণা করার যোগ্য’ ভবিষ্যতের মধ্যে বিরোধ ও আপোষ আধুনিক কালিকতার একটি মৌলিক ও ভিত্তিপ্রদানকারী বৈশিষ্ট্য। যে-রৈখিকতা ও নির্গুণতা এবং তীরের মতো সর্বদা প্রগতির দিকে ধাবমানতা দিয়ে আধুনিক কালিকতা বিশিষ্টায়িত সেই কালিকতার জন্ম ও গঠন হয়েছে ইউরোপে। এই পুনর্গঠন ও তার ইতিহাস নিয়ে যে-সব চিন্তক খুবই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন তাদের একজন হলেন রেইনহার্ট কোসেলেক১১। তিনি দেখিয়েছেন যে, ১৭৫০ থেকে ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপে কালিকতার ধারণায়ন ও প্রত্যয়নে ব্যাপক বদল সংঘটিত হয়। একটি বিশেষ কালিকতা একটি নতুন যুগের সূচনা ঘটিয়েছিল এবং সময়ের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক বদল ঘটিয়েছিল। কোসেলেক এই কালিকতার নাম দিয়েছেন ‘ঐতিহাসিক সময়’। এই নতুন কালিকতায় সময় আর কেবল সকল ইতিহাস সংঘটিত হওয়ার একটি মাধ্যম থাকল না। সেটি ঐতিহাসিক গুণ অর্জন করল। পরিনামে, ইতিহাস আর সময়ের মধ্যে সংগঠিত হিসাবে বিবেচিত না হয়ে সময়ের মাধ্যমে সংঘটিত বলে বিবেচিত হওয়া শুরু করল। সময় তখন নিজে একটি গতিময়, ঐতিহাসিক শক্তি হিসাবে পুনর্গঠিত হলো। কোসেলেক বলেন যে, এ-কথার অর্থ এই নয় যে বর্তমানের জন্য এবং ভীষণভাবে আলাদা (হিসাবে কাম্য) ভবিষ্যতের জন্য সময় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ল। বরং, এখন অতীত সম্পর্কিত সকল জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কার্যকর ও প্রয়োজনীয় হিসাবে বিবেচনা করা হল না। কেননা, অতীত থেকে নেমে আসা সকল ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাকে সরাসরি ভবিষ্যতে টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করা হলো। কালিকতার ধারণায়নে এই সত্তাতাত্ত্বিক/অনটোলজিকাল বদলের প্রভাব হলো সুদুরপ্রসারী। ঔপনিবেশিক ক্ষমতা সম্পর্কের মধ্যে অপশ্চিমের বৈচিত্রময় ও পরিবর্তনশীল সময়ের বিবিধ ধারণার বদলে সময় হয়ে দাড়ালো বিশ্বজনীন, একরৈখিক ও সর্বদা প্রগতির দিকে ধাবমান। যেমন: ভারতবর্ষের ব্রাহ্মন্যধর্মীয় চক্রাকার ও নির্দিষ্ট গুণনির্ভর পুনরাবৃত্তিমূলক সময়ের ধারণার জায়গায় আবশ্যিক ও স্বাভাবিক করে তোলা হলো বিজ্ঞানসম্মত সংখ্যা কেন্দ্রীক বিমূর্ত ও রৈখিক সময়। এখানে ‘সমাপ্তি কিন্তু আর শুরু নয়’, এটি অন্য কিছু সময়ের রৈখিক উপলব্ধি এবং একটি এ-অব্দি অজানা ভবিষ্যতে সেটির মোড় পরিবর্তন। আমি একটু যোগ করে বলতে চাই যে, পূর্ব নির্ধারিত উন্নত ভবিষ্যতের ঘোষণা দেওয়া ও সেই অনুযায়ী বিভিন্ন সংস্কারমূলক, উন্নয়নমূলক, নিয়ন্ত্রনমূলক ও নিপীড়নমূলক জাতি-রাষ্ট্রীয় ও মতাদর্শিক কার্যক্রম পরিচালনা করার সভ্যকরণ প্রকল্পের ন্যায্যতা প্রতিবিধানে কালিকতার এই রৈখিক ধারণা ছিল অন্যতম শর্ত ও উপায়।

এই মতের সমর্থনে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ দুইজন চিন্তককে উদ্ধৃত করতে চাই। একদিকে বেনিডিক্ট এন্ডারসন দেখিয়েছেন যে সময়ের এই রৈখিক ধারণা কতগুলো ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের (জাতি, সংস্কৃতি, লিঙ্গ, শ্রেণী, মতাদর্শ, ধর্মের দিক থেকে) মানুষকে সমরূপ করে জাতি ও জাতীয়তাবাদের কল্পনাকে পোক্ত করতে ভূমিকা রেখেছিল।১২ অন্যদিকে, তালাল আসাদ বলেছেন যে, ‘মধ্য যুগের’ ইউরোপের মুক্তিদায়ী/স্যালভেশনাল (লক্ষ করুন, স্যালভেশন শব্দটির একটি খ্রিস্ট ধর্মীয় ব্যঞ্জনা রয়েছে) সময়ের ধারণার বদলে সমরূপ, মাপনউপযোগী এবং পূর্বাভাসপ্রদানযোগ্য [ ভবিষ্যত ও জানার যোগ্য অতীত] রৈখিক সময়ের ধারণা আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের ন্যায্যতা বিধানের জন্য, জাতি-রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার জন্য অত্যাবশ্যকীয় হয়ে উঠেছিল।১৩

বিশ্বজনীনকৃত প্রগতিকে (এবং আধুনিক কালিকতাকে) মতাদর্শিক শক্তিমত্তা দেয়ায় অন্য আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিক্ষেত্র হলো ধর্ম (ও সেক্যুলার) ধারণার বিবিধ মাত্রিক পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক পরিসর যেখানে আধুনিক পরিচয়ের সঙ্গে সেক্যুলার পরিচয় অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠেছে। সেক্যুলার ধারণাটি আধুনিক জীবনযাপনের অনুশীলন, আকাঙ্খা, সংবেদনশীলতাকে রেপ্রিজেন্ট করে এমনভাবে যে একে সরাসরি অনেক সময় বোঝা যায় না, পর্যালোচনা করা যায় না। আবার, পর্যালোচনা করার আকাঙ্খাকে অনাধুনিক ও প্রতিক্রিয়াশীল হিসাবে বিবেচনা করা হয়। সেই ঝুঁকি আমি নিচ্ছি তা বলাই বাহুল্য।

অন্যভাবে বলা যেতে পারে, আধুনিক কালিকতা সম্পর্কিত রাষ্ট্র থেকে, রাজনীতি থেকে ধর্মের পৃথকীকরণের, পাবলিক পরিসর থেকে ধর্মকে প্রাইভেট পরিসরে সীমায়িতকরণের সঙ্গে, যা সেক্যুলারকরণ নামে পরিচিত (প্রচলিত অর্থে সেক্যুলার শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ধর্মনিরপেক্ষতা বা ইহজাগতিকতা করা হলেও এ-প্রতিশব্দকরণের মাধ্যমে, আমি মনে করি, সেক্যুলার শব্দের প্রেক্ষিতগত ঐতিহাসিক পাটাতনকে বোঝা সম্ভব নয়)। আগের আলোচনার কথা মাথায় রেখে বলা চলে যে, ‘কুসংস্কার’, ‘অসভ্যতা’ ও ‘পশ্চাদপদতা’ থেকে মুক্ত হয়ে ‘যুক্তিশীল’ ও ‘আধুনিক’ হয়ে ওঠার আধুনিকীকরণ প্রকল্পে রাষ্ট্র ও বিজ্ঞান থেকে ধর্মকে বিযুক্তিকরণের চেষ্টা করা ও প্রত্যয় ব্যক্ত করাকে আধুনিক যুগের রৈখিক ইতিহাসের ধারণার অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ চিহ্ন হিসেবে শনাক্ত করা হয়ে থাকে। মনে রাখা দরকার, তালাল আসাদের মতে, সেক্যুলারকরণের এ-প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র বা রাজনীতি শুধু নয়, আমরা মনে করি যে, ধর্ম নিজেও পার্থিব আকাক্সক্ষার সংক্রামক দূষণ থেকে মুক্ত হয়ে উঠবে।১৪

প্রাসঙ্গিক বিবেচনা করে এ-প্রসঙ্গে সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করা দরকার বলে মনে করছি। আধুনিক ধর্ম ও সেক্যুলার সংস্কৃতি ইউরোপের ইতিহাসে পরস্পর পরস্পরকে সম্পর্কিত করে গড়ে উঠেছিল এবং সম্পর্কিত হয়ে ওঠার প্রধান পরিসর ছিল লিবেরাল রাষ্ট্র। তালাল আসাদ দেখিয়েছেন যে, খ্রিস্টীয় ধর্মমতের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং ইউরোপের উপনিবেশ দখলের সময়ে ধর্মের একটি বিশ্বজনীন সংজ্ঞা গড়ে উঠেছিল, যা স্বাভাবিক/ন্যাচারাল ধর্ম নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিল, এটি সেক্যুলার ধর্মের আদিরূপ। সেক্যুলার ধর্মের এই সারবত্তাকরণ ও ধারণায়নের সঙ্গে খ্রিষ্ট ধর্মের আলোকায়ন-পরবর্তী ইতিহাস ও খ্রিস্টধর্ম স্বয়ং ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত।১৫ এ সংজ্ঞা গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় ধর্ম কেবল সর্বত্র সারসত্তার দিক থেকে সদৃশ বলেই চিহ্নিত হলো না, বরং আধুনিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও বিধিব্যববস্থার মতো বা আধুনিক বিজ্ঞানের জ্ঞান ও চর্চার মতই এই আধুনিক ধর্ম এখন আর পূর্বের মত রইলো না। রাজনীতি বিচ্ছিন্ন ধর্ম আধুনিক রাষ্ট্রে অনেক কম নিপীড়নমূলক ও সহনশীল, যৌক্তিক বলে চিহ্নিত হলো।

ধর্মের এই আধুনিক রূপকে দাপুটে ধারণায় স্বতঃসিদ্ধ ও স্বাভাবিক বলে মনে করা হলেও ধর্মের এই সেক্যুলারকরণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত বিবেচনা করলে আমরা ভিন্ন ধারণা পেতে পারি। ‘ধর্ম হচ্ছে সারসত্তাগতভাবে সাধারণ ক্রমিক (ধর্মীয় কৃত্যানুষ্ঠান, ভাবানুভূতি ও ধর্মীয় মতবাদের মধ্যে প্রকাশিত) ধারণার সঙ্গে সংযুক্ত অর্থসমূহের একটি বিষয় এবং এর বৈশ্বিক ভূমিকা রয়েছে’–এ-প্রত্যয়ন খ্রিস্টীয় ইতিহাসে একটি বিশেষ (সংস্কার পরবর্তী) দৃষ্টিভঙ্গি। একসময় যা ছিল বাইবেলিয় ব্যাখ্যার বিশেষ ঐতিহ্যের দ্বারা অধিকার প্রদত্ত নিয়ম, অনুশীলন ও মনোভঙ্গির একটি বাস্তব বিন্যাস, তা বিমূর্তায়িত ও বিশ্বজনীনীকৃত হলো ঠিক যেমন ইউরোপীয় রাষ্ট্র ও দর্শন ক্রমান্বয়ে নিয়মানুগ, উচ্চাকাক্সক্ষী ও বিশ্বায়িত হচ্ছিল। আধুনিক ক্ষমতা জ্ঞান ও নৈতিকতাকে গঠিত করা বি¯তৃত ঐতিহাসিক পরিবর্তনগুলোর অংশ হিসেবে এভাবেই একটি প্রত্যয় ও এর সঙ্গে সম্পর্কিত অনুশীলনগুলো গঠিত ও পুনগর্ঠিত হয়েছিল।১৬

খ্রিস্টীয় ধর্মাদর্শের সাথে সম্পর্কিত সেক্যুলারকরণ তত্ত্ব নির্মিত হয়েছিল গ্রহণ ও বর্জনের, রূপান্তর ও পরিমার্জনের ক্ষমতা সম্পর্কের প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে ইউরোপের সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও সেক্যুলার রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের প্রেক্ষাপটে আধুনিক সুশীল সমাজের পণ্ডিতবর্গ যৌক্তিক ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের তুলনায় অযৌক্তিক অসহিষ্ণুতার ভয়াবহতার বিষয়ে অধিক অনুভূতিপ্রবন ছিলেন। রাষ্ট্রের অখণ্ডতার প্রতি হুমকি স্বরূপ ক্যাথলিক ও নাস্তিকদের বর্জনের কথা উদারনৈতিক/লিবেরাল দর্শনের প্রাণপুরুষ জন লক বলেছেন, কারণ তার মতে, এরা রাষ্ট্রের শান্তির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক।১৭ এ-হিসেবের ভিত্তিতে তাই বলতে পারি আধুনিক রাষ্ট্র ও সেক্যুলার ধর্ম ঐতিহাসিক গ্রহণ-বর্জনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নির্মিত ঔপনিবেশিক আধিপত্য বিস্তারের এবং ইউরোপীয় সত্তা নির্মাণের সঙ্গে ওতোপ্রতভাবে সম্পর্কিত আধুনিক ক্ষমতার দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসর।

সেক্যুলারবাদীদের বারংবার নিশ্চয়তাপ্রদান ও প্রতিশ্্রুতিসত্ত্বেও, সম্প্রতি সারা দুনিয়ায় রাষ্ট্রে, জাতীয়তাবাদে, জাতিগত সংঘাতে, আত্মপরিচয়ের সংগ্রামে ও পাবলিক পরিসরে জীবনযাপনের শর্তে ধর্মের বিভিন্ন মাত্রিক প্রকাশ ঘটছে। এই পরিস্থিতিতে পর্যালোচকগণ দেখিয়েছেন যে, সেক্যুলারবাদ একই সঙ্গে একটি বিশ্লেষণের ভঙ্গী এবং হস্তক্ষেপের একটি রাজনৈতিক ক্ষেত্র হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। যেমনটি সাধারণত চিত্রিত হয়, সেক্যুলারবাদ কোনো ভাবেই তেমনভাবে ধর্মের শিথিলীকরণ কিংবা নিরপেক্ষকরণ নয়। বরং সেক্যুলারবাদ হলো ধর্মের পুনর্গঠন ও পুনর্ব্যবস্থায়ন যাতে করে ধর্ম উদারনৈতিক রাজনৈতিক শাসনের অনুশীলন ও যৌক্তিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।১৮সেক্যুলার, সেক্যুলারকরণ ও সেক্যুলারবাদের এই পাটাতনে রেখে আমি বাংলাদেশের (এবং ভারতীয়) অতীতবিদ্যাগুলোতে (যেমন: প্রত্নতত্ত্ব, ইতিহাস, ইত্যাদি) কালিকতার গড়নকে বোঝার চেষ্টা করতে চাই।

ভারতের প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসে সময়কে ‘প্রাচীন’, ‘মধ্য’ ও ‘আধুনিক’ কালপর্বে বিভাজিত করা হয়। এই বিভাজন বা কালপর্বীকরণের সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন ঔপনিবেশিক ঐতিহাসিক জেমস মিল। আমাদের প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাস চর্চায় প্রচলিত ‘প্রাচীন’, ‘মধ্য’ ও ‘আধুনিক’–এই পর্ব বিভাজনকে আমি উপর্যুক্ত সেক্যুলারকরণ প্রকল্পের ধারণা ও প্রক্রিয়াগুলোর, যেগুলোর সক্রিয়তার অন্যতম প্রধান দুটি ক্ষেত্র হলো আধুনিকায়ন পরিচালনাকারী রাষ্ট্র ও পুঁজিবাদী তৎপরতা, সঙ্গে এবং আধুনিক ঐতিহাসিক কালিকতার সঙ্গে বিজড়িত হিসাবে বিবেচনা করতে চাই। অনেক সেক্যুলার ঐতিহাসিক-প্রত্নতাত্ত্বিকই মিলে’র ত্রিযুগীয় বর্গীকরনকে ঔপনিবেশিক পণ্ডিতবর্গ কর্তৃক ভারতের ইতিহাসের ধর্মীয়করণ বলে চিহ্নিত করেছেন (যেমন সুমিত সরকার)।১৯ সেক্যুলারবাদী ডিসকোর্সের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ধর্মের এ-ধরনের ব্যবহারকে তিনিসহ আরো অনেকেই (পূর্বোক্ত পাঠসূত্র দেখুন) মূলত ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বলে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। সেক্যুলারের যে-বিশ্লেষণ আগে উল্লেখ করেছি তাতে করে বলতে চাই যে আমি তাদের সঙ্গে একমত নই।

‘প্রাচীন’ ও ‘মধ্য’ যুগকে হিন্দু-বৌদ্ধ ও ইসলাম ধর্মের সঙ্গে সমীকৃত করেছিলেন মিল। এখনো পর্যন্ত এই পর্বীকরণ ও সমীকরণ মোটামুটি সর্বজনীন। ভারতবর্ষের ‘সংখ্যাগুরু’ হিন্দুদের সেক্যুলারকৃত আধুনিক সত্তা নির্মাণে এবং কেন্দ্রীভূত ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিভাজিত শাসনব্যবস্থা বিশিষ্ট আধুনিক রাষ্ট্র ও তার ঐতিহাসিক বৈধতা প্রতিবিধানে এই ত্রি-পর্বীয় বিভাজন ভূমিকা রেখেছিল। ঐতিহাসিকগণ দেখিয়েছেন যে পুরুষালী ব্রাহ্মণ্যবাদী এ-প্রকল্পে নারী, অন্যজাতিবর্ণ, ও মুসলমানসহ অন্যান্য অসংখ্য সমষ্টিকে বর্জন করে বা রূপান্তরিত করে, বিভাজিত করে গ্রহণ করে এই আধুনিক ভারতীয় সত্তা নির্মিত হচ্ছিল। যেমন: আধুনিক বর্তমানের কাছে মধ্যযুগ ‘বর্বর’ ও ‘মৌলবাদী’ হিসেবে পরিবেশিত হয়েছিল; জেমস মিলসহ বিভিন্ন ঔপনিবেশিক ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক এবং সামপ্রতিক হিন্দুত্ববাদী প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিকদের কাছে মধ্যযুগ হলো মুসলমানদের ধ্বংসাত্মক ও প্রতিক্রিয়াশীল ক্রিয়াকলাপের সময়কাল।২০ সেক্যুলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যবিদ্যা মুসলমানদের উপর্যুক্ত রেপ্রিজেনটেশনকে বাদ দিলেও, ত্রি-পর্বীয় ধর্মভিত্তিক অথচ সেক্যুলারকৃত কালপর্বীকরণকে স্বীকার করে নিয়েছে। বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকে এবং চর্চায় এই কালপর্বীকরণই অনুসরণ করা হয়। সেক্যুলারকরণ তত্ত্ব ও রৈখিক সময়ের ধারণার আধুনিক ক্ষমতার পরিসরে এই কালপর্বীকরণ উপমহাদেশের সামষ্টিক সত্তার সঙ্গে ধর্মের বৈচিত্রময় সম্পর্কের ধারণাগুলোকে সমরূপ করে তুলেছে।

পরবর্তীতে ভিন্ন ক্ষমতা সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ডিসকোর্স মধ্যযুগের অর্থাৎ মুসলমানদের গরিমাকে পুনরুৎপাদিত করলেও ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ইতিহাসে ও প্রত্নতাত্ত্বিক জ্ঞানের পরিবেশনে মুসলমানরা সবসময়ই প্রান্তিক। ‘সংখ্যাগুরু’ ও ‘সংখ্যালঘু’র নির্বাচন ও ভোট নির্ভর আধুনিক বিভাজন আধুনিক রাষ্ট্রের সেক্যুলার জনপ্রতিনিধিত্বশীল রূপকে উপস্থাপন করলেও জাতীয়তাবাদী ডিসকোর্স সবসময়ই হয়ে ওঠে সংখ্যাগুরুর ডিসকোর্স, প্রত্নতাত্ত্বিক জ্ঞানের সাহায্যে নির্মিত জাতীয় ইতিহাস হয়ে দাঁড়ায় সংখ্যাগুরুর আখ্যান।২১ ঐতিহাসিক আখ্যানের নতুন শ্রেণীকরণ ও বর্গীকরণের প্রক্রিয়ায় জনসংখ্যা সমীক্ষার মাধ্যমে ধর্মীয় সমষ্টিগুলোর মধ্যের নির্দিষ্ট সীমা অঙ্কণ, ঐতিহ্য (শরীর ও তার অনুশীলনসহ), বিশ্বাস ও অনুশীলনের সংস্কার ও সেই অনুযায়ী আইন প্রণয়ন আধুনিকীকরণ প্রকল্পজাত সেক্যুলার ও উদার রাষ্ট্রের ও তার পাবলিক ডিসকোর্সের আনুগত্যের নিশ্চিতকরণের ক্ষমতার প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বাংলাদেশের আধুনিক ও সেক্যুলার অতীত : সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি–প্রাচীনতম সভ্যতা(নগর)–(প্রত্ন)বস্তুকাম

বাংলাদেশের দাপুটে ইতিহাস ও ঐতিহ্য পুনর্গঠনকারী প্রত্নতত্ত্বচর্চায় উপর্যোক্ত কালপর্বীকরণ ও তার মূল ধারণায়নকে প্রশ্নাতীতভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। এই প্রত্নতত্ত্বচর্চায় যে-সকল ঐতিহাসিক আখ্যান নির্মিত হয়েছে ও হচ্ছে সে-গুলো এমন এক ঐতিহ্যের/হেরিটেজের ইমেজ ‘ফ্যাক্ট’ হিসাবে পরিবেশন করছে যেটি কোনোভাবেই মিথ/অতিকথনের চেয়ে ধারণাগতভাবে আলাদা নয়। দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে রচয়িতাদের ক্ষমতাসম্পর্কগত অবস্থানে। মিথকেন্দ্রিক ইতিহাসচর্চাকে অজ্ঞ, নিরক্ষর নিম্নবর্গের মানুষের আওতাধীন হিসাবে চিহ্নিত করা হলেও এইসব আধুনিক, সভ্য ও সেক্যুলার শর্ত ও আকাঙ্খার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং রৈখিক কালিকতার কাঠামোতে এঁটে যাওয়া আখ্যান উচ্চবর্গের বিদ্যায়তন, প্রচারমাধ্যম ও জ্ঞানের অংশ। আমি এখানে সুনির্দিষ্টভাবে একটি আখ্যানকে উদাহরণ হিসাবে পেশ করতে চাই।

পণ্ডিতগণ বলে থাকেন যে, বাংলাদেশে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানগন যুগ যুগ ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্যে বসবাস করে আসছেন। এই আখ্যানের সপক্ষে বস্তুগত প্রমাণও হাজির করা হয় বিভিন্নভাবে। যেমন : এক. ‘সুলতানি’ আমলের বিভিন্ন মসজিদে হিন্দু-বৌদ্ধ দেব-দেবীদের মূর্তিখোদিত পাথরের টুকরো ও পোড়ামাটির চিত্রফলক ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রের মূর্তিখোদিত পৃষ্ঠ/দিকটি দেয়ালের ভিতরের দিকে মুখ করে রাখা অবস্থায় পাওয়া যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রেই মূর্তিগুলো নষ্ট করে দেয়া অবস্থায় থাকে। মূর্তিখোদিত পাথরের টুকরোকে মসজিদে ব্যবহার করার উদাহরণকে মুসলমান নির্মাতাদের উদারতা ও সাম্প্রদায়িক সহিষ্ণুতার প্রমাণ হিসাবে দেখিয়ে অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের পক্ষে অতীত থেকে ন্যাজ্যতা দেয়ার চেষ্টা করেন অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক-ঐতিহাসিক। দুই. বিশ্ব ঐতিহ্য হিসাবে ঘোষিত পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের কেন্দ্রীয় মন্দিরের ভিত্তির উপরে স্থাপিত বিভিন্ন হিন্দু দেব-দেবীর পাথরের ভাস্কর্যকে ‘পাল’ যুগে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বিদের মধ্যে সম্প্রীতির প্রমাণ হিসাবে হাজির করা হয়ে থাকে। তিন. বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রচুর সংখ্যায় হিন্দু ও বৌদ্ধ ভাস্কর্য পাওয়া যায়। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন হিন্দু ও বৌদ্ধ স্থাপত্য। এই আলামতগুলোর উপর ভিত্তি করে অধিপতিশীল মতাদর্শধারণকারী অনেক বিশেষজ্ঞ বলে থাকেন যে, এত বিপুল সংখ্যক হিন্দু-বৌদ্ধ নিদর্শন প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে সুদূর অতীত থেকেই বিভিন্ন ধর্মের মানুষজন পাশাপাশি সম্প্রীতির মধ্যে বসবাস করে আসছেন। চার. এদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাওয়া তাম্রলিপিগুলোতে হিন্দু ধর্মাবলম্বী রাজা কর্ত্তৃক বৌদ্ধ মন্দির/ধর্মীয় স্থাপনার জন্য কিংবা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী শাসক কর্তৃক হিন্দু ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর জন্য জমি দান করার উদাহরণ পাওয়া যায়। এই প্রমাণকে ব্যাখ্যা করা হয় শাসকদের পরধর্মমত সহিষ্ণুতা ও পরধর্মের প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা হিসাবে। অধিকন্তু, শাসকদের এই বৈশিষ্ট্যকে সমগ্রসমাজের উপর আরোপ করা হয় যেন শাসকের ধর্ম আর সমাজের ধর্ম একই এবং সমাজের ধর্ম সমরূপ। ফ্যাক্টটের উপর ভিত্তি করে রচিত এমন দাবি নির্ভর এসব ধর্মীয় সম্প্রীতির আখ্যান, আমি মনে করি, ‘বর্তমান’-এর দাপুটে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক শর্ত ও আকাঙ্খা দ্বারা নির্ধারিত হচ্ছে। এই আখ্যান অতি সরল, স্টিরিওটাইপড, সাধারণীকৃত এবং রৈখিক কালিকতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

ভারত ও বাংলাদেশে সেক্যুলার জাতীয়তাবাদী ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব চর্চার শক্তিশালী ধরনগুলোর পুনর্গঠন ও পুনরুৎপাদন বিষয়ে এই লেখায় আগের অংশগুলোতে যে আলোচনা করা হয়েছে সেটি মাথায় রেখে আমি দাবি করতে চাই যে তর্করত বিবিধ ধর্মমত ও ধর্মীয় অনুশীলনের ঐতিহ্য যে-অঞ্চলে রয়েছে সেখানে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলো সবসময় সম্প্রীতির মধ্যেই অতীতে বসবাস করেছে এমন দাবি কেবল মিথ্যাই নয়, বরং সেটা পরিহাসমূলক ও সেক্যুলার; এই আখ্যান উদার রাজনৈতিক শাসন ও পাবলিক পরিসরের সঙ্গে সঙ্গতিপুর্ণ। বিশেষভাবে, সাম্প্রতিক বাংলাদেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের উপরে বিভিন্ন পরিসরের নিপীড়ন অন্য/অপর যে-কোনো আখ্যানকে সেক্যুলার কামনা ও জীবনযাপনের শর্তের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ হিসাবে না-জায়েজ করে তোলে। বৌদ্ধ মন্দির ভেঙে হিন্দু মন্দির তৈরি করা কিংবা এক সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্থাপনা ধবংস করে সেই স্থাপনারই উপকরণ দিয়ে নতুন ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণের প্রত্নতাত্ত্বিক আলামত ও ফ্যাক্ট ভারতে ও অবিভক্ত বাংলায় যথেষ্ট পরিমানেই পাওয়া যায়। তবে, সেগুলোকে হয় উল্লেখ করা হয় না, নয়ত অধিপতিশীল সভ্যতার ও প্রগতির আকাঙ্খার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ব্যাখ্যা করা হয়। এ-হিসাবে উপরের উল্লিখিত উদাহরণগুলোকে আমি বিভিন্ন সম্ভাবনার আলোকে ব্যাখ্যা করতে পারি। যেমন:

এক. এক ধর্মের সত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত ধর্মীয় স্থান/স্থাপনা ভাঙ্গার প্রতীকী ও রাজনৈতিক ব্যঞ্জনা আছে। একটি নতুন ধর্ম যখন নতুন একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে প্রবেশ করতে চায় ও সংহত হতে চায় প্রধানত ধর্মান্তরকরণের মাধ্যমে তখন নিজ-ধর্মের ক্ষমতা প্রদর্শন এবং অন্য-ধর্মের অ-ক্ষমতা প্রদর্শনের খুব বড় প্রতীক হতে পারে ধর্মীয় স্থাপনা ও প্রতীকগুলোকে আঘাত করা, ভেঙ্গে ফেলা এবং আত্মসাত করা। ধর্মীয় প্রতীকের আত্মসাত একই সঙ্গে নিজকে ক্ষমতাবান হিসাবে পেশ করার এবং উদার হিসাবে পেশ করার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কৌশলও হতে পারে। যে-কৌশল নিজের ক্ষমতা, আধিপত্য, শাসন বজায় রাখা, পোক্ত করা এবং বাড়ানোর সঙ্গে সম্পর্কিত।

দুই. উল্টোটিও ঘটতে পারে। শাসক/উচ্চবর্গ, যারা ধর্মীয় স্থাপনাগুলো নির্মাণ, ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য অর্থায়ন করতেন তারা যদি তৎকালীন (অর্থাৎ সেই বিশেষ মুহূর্তে) কোনো কারণে দুর্বল হয়ে পড়েন বা সংখ্যালঘু ধর্মমতের অনুসারী হন তাহলে তিনি/তারা কৌশলগত কারণেই শক্তিশালী ধর্মমতগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করবেন। এটা রাজনৈতিক কৌশলের অংশ, উদারতার পরিচায়ক নয়।

তিন. সংখ্যার দিক থেকে বেশি পরিমান ধর্মীয় নিদর্শন পাওয়া প্রমাণ করে না যে, যে-ধর্মগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে সেগুলো অতীতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আলমত বহন করে। নিদর্শনগুলো কী-ভাবে বা কোন অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে সেটি ওই সময়কালকে বোঝার জন্য সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যেমন: উত্তরাঞ্চলে বেশির ভাগ মূর্তিই পুরনো পুকুরগুলো/জলাশয়গুলো থেকে পাওয়া গেছে। যদি ধর্মীয় সম্প্রীতির ইতিহাসই সঠিক হয় তাহলে এই নিদর্শনগুলো পুকুরে গেল কীভাবে?–এই জিজ্ঞাসা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। নিদর্শনগুলোর প্রাপ্তিস্থান (ও প্রেক্ষিত) বিবেচনায় নিয়ে এমন ব্যাখ্যা সঙ্গত হয়ে উঠতে পারে যে হিন্দু বা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীগণ এমন পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন যাতে ধর্মস্থানসমূহ, যেখানে এই মূর্তিগুলো উপাসিত হতো, সেগুলো পরিত্যাগে তারা বাধ্য হয়েছিলেন এবং তাদের ইস্টদেবতাকে রক্ষার একমাত্র উপায় ছিল বিসর্জন। একইসঙ্গে, ফিরে আসলে মূর্তিগুলো উদ্ধারকরে পুনরায় ব্যবহার করার সম্ভাবনাও এতে বজায় থাকত। তবে, আমি এগুলোকে সম্ভাব্য বিকল্প ব্যাখ্যা হিসাবে উল্লেখ করছি এবং প্রস্তাব করছি যেগুলো প্রচলিত দাপুটে ফ্যাক্টনির্ভর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহাসিকতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। এ-ব্যাখ্যাগুলোকে নিরিখ করার মতো আলামত এবং আলামতের খোঁজ দাপুটে ধারণা ও অনুশীলনের জমিতে অনুপস্থিত।

এই লেখার প্রথমে উল্লিখিত দৃশ্য-সংলাপ দুটোর সঙ্গে ধারণাগতভাবে তুলনা ও সম্পর্কিত করে পাঠকই এখন নির্ধারণ করুন ফ্যাক্ট এবং ফিকশনের ভেদরেখা। পাশাপাশি, পাঠকদের দিকে আমি একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে চাই। বাংলাদেশে যে-পরিমাণে বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে এবং বিভিন্ন নথি (যেমন: হিউ এন সাং-এর বিবরণী) যে সাক্ষ্য দেয় তার উপর ভিত্তি করে এ-ধারণা করা অসঙ্গত হবে না যে এই অঞ্চলে একটা সময়ে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা নগণ্য ছিল না। যদি সম্প্রীতিময় অবস্থানের ঐতিহ্য ও ইতিহাসই সঠিক হয় তাহলে এই জিজ্ঞাসা তৈরি হওয়া অমূলক নয় যে, ওই বিপুল সংখ্যক বৌদ্ধগণ কোথায় গেলেন? কেন গেলেন?

আমি মনে করি–যুগ যুগ ধরে আমরা সুখে-শান্তিতে-সম্প্রীতির মধ্যে বসবাস করছি–এই ইতিহাস-প্রত্নতত্ত্ব আধুনিক ঐতিহাসিক কালিকতার সেই আখ্যানের ও যুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত যা বর্তমানের ন্যাজ্যতা বিধান করা এবং অতীতের উপর ভিত্তি করে বর্তমানের অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতিকে অন্যাজ্য ও অসঙ্গত হিসাবে আর সুখ-শান্তিময় ভবিষ্যতকে নিকটবর্তী ও অর্জনযোগ্য হিসাবে পরিবেশন করার প্রয়োজন থেকে সৃষ্ট। ‘ধর্ম ও সঠিক ধার্মিক সাব্জেক্টকে এই সেক্যুলারবাদী কল্পনায় বোঝা হয় এমন কিছু প্রতীকের সমষ্টি হিসাবে যা সহজ ও যেমন-ইচ্ছা-তেমন ভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে উদার সেক্যুলার শাসনের আদেশ অনুসারে’২২–এই ধারণাটি বিবেচনায় রাখলে সেক্যুলার জাতীয়তাবাদী কামনা ও স্বপ্নতাড়িত পুনর্গঠিত স্বর্ণযুগআকীর্ণ সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে বুঝতে সুবিধা হয়। টিকা হিসাবে আরো বলতে চাই যে, এই ধরনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সরল ইতিহাস সেক্যুলার পরিসরে সাম্প্রদায়িকতার বহুমাত্রিক দ্যোতনা ও ব্যঞ্জনাকে পাশ কাটিয়ে যায় এবং ধরে নেয় যে সাম্প্রদায়িকতা একটি স্থির, অনৈতিহাসিক ও সমরূপ প্রপঞ্চ এবং অসাম্প্রদায়িতা ও সেক্যুলারবাদ সমতূল্য ও একে-অপরের পরিপূরক। এর পরিনতিতে, আমার দাবি হলো, হালের বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদী পরিসরে বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান জাতিগত, ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক সাম্প্রদায়িকতা মোকাবেলা ও প্রতিরোধের শর্ত ও সক্রিয়তা যেমনটি হয়েছে তেমনই দুর্বল ও অন্তঃসারশূণ্য হয়ে পড়ে।

প্রত্নতত্ত্বে ও ইতিহাসে রৈখিক কালিকতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কালপর্বীকরণের/পিরিওডাইজেশনের আরেকটি চেহারা হলো শাসকদের নামানুসারে সময়কে ভাগ করা। আমাদের ইতিহাসকে গুপ্তযুগ, পালযুগ, মৌর্যযুগ, সেনযুগ, সুলতানি আমল, মোগল আমল–এমন পর্বে শ্রেণীবিন্যস্ত করা হয়েছে। এই পর্ববিভাজনও ইউরোপীয় পর্ববিভাজনের রীতির অনুসারী। এই পর্ববিভাজনের সমস্যাগুলো হলো: প্রথমত, একটি রাজবংশের শাসনামলকে নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক পর্ব হিসাবে ধরা হয় যাতে করে রাজবংশের আমল সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে (বা এই বৈশিষ্ট্যাবলির পরিবর্তনের সঙ্গে) এক করে ফেলে সারবত্তাকরণ/এসেনশিয়ালাইজেশন ও সমরূপীকরণ করা হয়। সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যাবলির বদল (বা ধারাবাহিকতা) বিবিধ শর্তদ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। কেবল শাসন সেটা নিয়ন্ত্রন করবে তা প্রাক-ঔপনিবেশিক আমলে যখন জাতি-রাষ্ট্রর ধারণা ভারতে অনূদিত হয় নি, তখনকার জন্যও আরো বেশি অ-প্রযোজ্য ছিল। দ্বিতীয়ত, বিশেষ শাসনামলের সঙ্গে বিশেষ বিশেষ সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক অবস্থান বা মর্যাদা যোগ করা হয়। গুপ্তযুগকে শনাক্ত করা হয় স্বর্ণযুগ হিসাবে। বলা হয়ে থাকে যে, ওই সময় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রনযুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থার উত্থান সমৃদ্ধি ও উন্নতিতে ভূমিকা রেখেছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসাবে মূদ্রা, ভাস্কর্য, স্থাপত্যসহ বিভিন্ন বস্তুর সংখ্যা ও শিল্পমূল্যকে (যা নির্দিষ্ট ধারা/ক্যানন অনুসারে বিশ্লেষিত হয়েছে) এই সমৃদ্ধির প্রমাণ হিসাবে হাজির করা হয়ে থাকে। এই ব্যাখ্যার ভিত্তিপ্রদানকারী থিম হলো এই পূর্বধারণা যে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রনযুক্ত শাসব্যবস্থা কোনো অঞ্চলে শান্তি, সৌহার্দ্য ও সমৃদ্ধির উন্মেষ ঘটাতে পারে যা প্রকারান্তরে শিল্প সৃষ্টিতে ও বিকাশে রাজকীয় আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করে। এই ধরনের ধরে-নেয়া ধারণার সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, ওই সময়ের সমাজকে আধুনিক বর্গ/ক্যাটেগরি দিয়ে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। পাশাপাশি, ওই সময়ের উপযোগী পদাবলীর মাধ্যমে কালিকতা ও ফ্যাক্টকে ব্যাখ্যা না করে তখনকার বিবিধতা, দ্বান্দ্বিকতা, সংঘাত ও জটিলতাকে বহির্গত/এক্সক্লুড করা হয়। এই লেখার প্রথম অংশর আলোচনায় অতীতে স্বর্ণযুগ খুঁজে ফেরার মধ্যে বর্তমান রোমান্টিক জাতীয়তাবাদী আকাঙ্খার প্রধান ভূমিকাকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছি। তৃতীয়ত, কালিকতার মধ্যে যে বিবিধতা ও বহুস্তরায়ন একইসঙ্গে একে অপরকে আবৃত-করে-ছাড়িয়ে-যেতে চেষ্টা/ওভারল্যাপ করে সেটা এই ধরনের কালপর্বায়ন অস্বীকার করে। গুপ্তযুগের শেষ হওয়ার অর্থ এই নয় যে ওই সময়ে যদি কোনো নির্দিষ্ট ধারা সৃষ্টি হলেও পরে পালযুগের সূত্রপাতের সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারা শেষ হয়ে নতুন ধারার (পূর্বের ধারার রূপান্তর হয়েও) সূত্রপাত ঘটেছিল।

এ-ধরনের অসংখ্য আখ্যান ‘ফ্যাক্ট’ হিসাবে বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্বে ও ইতিহাসের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সঞ্চালিত ও বিজড়িত হয়ে গেছে। ‘আড়াই হাজার বছর আগের সভ্যতা আবিষ্কারের’ কেচ্ছা প্রচারমাধ্যমে মাতম সৃষ্টি করে যদি সেটা প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা পদ্ধতির নিরিখে কপট প্রত্নতত্ত্ব/সিউডোআর্কিওলজি হিসাবে বিবেচিত হয় তাহলেও। প্রচারমাধ্যম ও মধ্যবিত্ত চৈতন্য সবচেয়ে প্রাচীনতম সভ্যতা ও নগরের ফ্যাক্ট ও ফিকশনের মিশ্রিত বয়ানে আবিষ্ট হয়ে যায় কেননা ঔপনিবেশিক চিন্তা ও কালিকতার ইতিহাসের সাপেক্ষে সেগুলো নিজকে অব্যহতভাবে ন্যাজ্যতা দেয়ার জাতীয়তাবাদী ব্যাকুল কামনা পূরণ করে। ভিন্নমত যা কীনা এই সব ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে তা প্রচারমাধ্যম সেন্সর করে, কারণ ভিন্নমত একদিকে (প্রাচীনতম) সভ্যতা হয়ে ওঠার ও হাজার বছর ধরে অসাম্প্র্রদায়িক হয়ে ওঠার জাতীয়তাবাদী কামনাকে চ্যালেঞ্জ করে, আর অন্যদিকে চমক সৃষ্টি করে মিডিয়ার মতাদর্শিক আধিপত্য ও মুনাফা তৈরির ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এমন ঘটনা সাম্প্রতিক বাংলাদেশেই উয়ারি-বটেশ্বরকেন্দ্রীক (কপট) প্রত্নতত্ত্ব চর্চা ও তার ব্যাপক প্রচারে স্পষ্ট হয়ে পড়ে।

যারা বাংলাদেশের ‘প্রত্নসম্পদ’ বা ‘প্রত্নতাত্ত্বিক ঐশ্বর্য/ট্রেজার’ ধ্বংসের জন্য মানুষের সচেতনতার অভাবকে প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত করেন তারাই এই ফিকটিয়াস/কেচ্ছাভিত্তিক অতীতের আখ্যানকে বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞানে উপাসনা করেন। আমি মনে করি খোদ ‘প্রত্নসম্পদ’ ও ‘ঐশ্বর্য’ শব্দ দুটো সমস্যাগ্রস্ত। শব্দ/প্রত্যয়ের ঐতিহাসিকভাবে অর্থ উৎপাদনের নানামুখী বদলের কথা খেয়াল করে বলা যায় যে, কোনো বস্তুকে ‘সম্পদ’ বা ‘ঐশ্বর্য’ হিসাবে চিহ্নিত করার আধুনিক ও সেক্যুলার দ্যোতনা ও গূঢ়ার্থ হচ্ছে–ওই বস্তুকে বিভিন্ন পরিসরে ও প্রয়োজনে ব্যবহার (বা অপব্যবহার) করা যেতে পারে। এছাড়াও, আধুনিক পুঁজিভিত্তিক পরিসরে সম্পদকে আর্থিক মূল্যমানে রূপান্তর ও বিনিময়যোগ্য ভাবার যথেষ্ট অবকাশ থাকে। যে-সকল কারণে বাংলাদেশে প্রত্নবস্তুসমূহ ক্ষতিগ্রস্ত ও ধবংসপ্রাপ্ত হচ্ছে সে-কারণগুলো স্থানিক ও আন্তর্জাতিক পুঁজির ব্যাকরণদ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সেই হিসাবে প্রত্নবস্তুকে সম্পদ বা ঐশ্বর্য হিসাবে চিহ্নিত করার অর্থ হচ্ছে এর সংরক্ষণের সাথে সাথে এর ধ্বংসের শর্তগুলোকেও সৃষ্টি করা এবং অনুমোদন দেয়া।

যাদের অজ্ঞতাকে ও অসচেতনতাকে প্রত্ননিদর্শন ধ্বংসের জন্য দায়ী করা হয় তারা–আমরা জনপ্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখিয়েছি২৩–ভিন্নভাবে প্রত্নবস্তুসমূহ সংরক্ষণ ও রক্ষার শর্তাধীনে কাজ করেন। তাদের চৈতন্যে 1.jpg…….
একটি প্রত্ন-ঢিবির উপরে বর্তমান মাজার (চৌকিয়াপাড়া, ফুলবাড়ি থানা, দিনাজপুর)
……..
কালিকতার ভিন্ন ধারণায়ন রয়েছে। প্রথম দৃশ্যের সংলাপে এক রাতের মধ্যে বিহার নির্মাণের বয়ানের কথা মনে করলে এবং সময়কে রূপকঅর্থে গুণআরোপ করে ব্যাখ্যা করার আমাদের স্থানিক ঐতিহ্যসমূহের কথা মাথায় রাখলে এই বিকল্প সংরক্ষণ ডিসকোর্স স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। এই ‘অসচেতন’ মানুষজনই দাপুটে বয়ানের বিপরীতে ভিন্ন শর্ত ও ধর্মীয় অনুশীলনের পরিসরে এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে অন্তঃপ্রবিষ্ট আচারের মাধ্যমে কীভাবে এখনো ভূমিদস্যুদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে উত্তরাঞ্চলে ও দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রত্নস্থান (বিশেষকরে, স্থাপত্যকাঠামোবিশিষ্ট ঢিবি) বাঁচিয়ে রেখেছেন তার উদাহরণ আমি/আমরা দিয়েছি। পাশাপাশি, অতীত ও প্রত্নস্থান একে অপরের সঙ্গে বিচিত্র সম্পর্কের মাধ্যমে স্মৃতি ও আখ্যান নির্মাণ করে যা আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার শর্ত হতে পারে সে-বিষয়টিও ফুলবাড়ী কয়লা খনি বিরোধী আন্দোলনের ও প্রতিরোধের প্রেক্ষিতে আমি আলোচনা করেছি।২৪ কিন্তু এখানে অবশ্যই বলা দরকার যে, এই-সব মানুষজনা যে প্রত্নস্থানের ও প্রত্নবস্তুর ক্ষতিসাধন ও লুন্ঠন করছে না তা-নয়। কিন্তু সেই কর্মকাণ্ডকে কোনোভাবেই ‘অসচেতনতা’ বলা যাবে না। কারণ, তাদের এই (ধবংসাত্মক) সক্রিয়তা আধুনিক ও সেক্যুলার বিভিন্ন শর্ত দ্বারা নির্ধারিত হচ্ছে। যেমন : বাংলাদেশের অর্পিত সম্পত্তি আইনের (পূর্বনাম, শত্রু সম্পত্তি আইন) এবং ঔপনিবেশিক শর্তাধীনে পুনর্গঠিত সম্পত্তি বিষয়ক নানা বিচিত্র আধুনিক কানুনী ব্যবস্থাধীনে অধিকাংশ স্থাপত্য ও কাঠামো বিশিষ্ট ঢিবি ক্ষমতাবান ও সংখ্যাগুরু শ্রেণী ও সম্প্রদায়ের লোকজন জাল দলিল করার মাধ্যমে দখল করে নিয়েছে।

3.jpg
চৈত্র সংক্রান্তির মেলা চলাকালীন ঢিবির উপরে পড়ে থাকা পূর্ববর্তী স্থাপত্যকাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত পাথরের টুকরা ও বৃক্ষকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় অনুশীলন।

আমরা আরো শনাক্ত করেছি যে, অনেক ঢিবি ও পুরানো পুকুরের উঁচু পাড়ের মাটি কোথাও কোথাও সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে কম দামে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে ও হচ্ছে। বেশকিছু ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু জাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষজন সেক্যুলার রাষ্ট্রের আইনের সঙ্গে সঙ্গতি বজায় রেখে এই দখল প্রতিরোধের কৌশল অবলম্বন করেছেন ওই স্থানে মন্দির নির্মাণ করে বা উপাসনা (যেমন : শীতলা ও কালী পূজা) শুরু করে দিয়ে। আবার, বাংলাদেশের প্রচারমাধ্যম যেভাবে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও জরীপকে ‘প্রাচীন সভ্যতার’ গুপ্তধনের সন্ধানের রোমান্টিক এ্যাডভেঞ্চারের মতো রেপ্রিজেন্ট করছে, সেই প্রচারণাও উচ্চবর্গের মতো, নিম্নবর্গের মানুষজনার প্রতিক্রিয়াকে গড়ে দিচ্ছে। যখন পত্রিকায় ‘১০ লক্ষ টাকা মূল্যের কস্টিপাথরের’ মূর্তি পাওয়া যাওয়ার ভ্রান্ত খবর প্রকাশিত হয় বা টিভি চ্যানেলে সম্প্রচারিত হয়, তখন সেই খবর মানুষকে ‘দামী’ ‘সম্পদ’ বা ঐশ্বর্য’ খুঁজতে উৎসাহী করে তোলে। আমি ভ্রান্ত খবর বলছি তার কারণ হচ্ছে কোনো প্রত্নবস্তুর দাম টাকার অংকে নির্ধারণ করা সম্ভব নয় এবং বাংলাদেশে প্রাপ্ত অনেক মূর্তিই কস্টি পাথর/ব্লাক ব্যাসাল্টে খোদিত নয়। মহাস্থানগড়সহ বিভিন্ন জায়গায় কাজ করার অভিজ্ঞতায় বিভিন্ন স্থানীয় সূত্রে ও জাতিতাত্ত্বিক গবেষণার সাক্ষাৎকারে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা জানতে পেরেছি যে, টাকার মূল্যে প্রত্নবস্তুকে বিচার করেন একমাত্র প্রত্নবস্তু পাচারকারী/চোরাকারবারীগণ। সেখানেও নাকি জাতীয় থেকে আন্তজার্তিক বিভিন্ন স্তর আছে এবং সেই স্তর অনুযায়ী দাম বাড়ে বা কমে। অন্যদিকে, কস্টিপাথরে তৈরি হিসাবে চিহ্নিত অনেক ভাস্কর্যই ডলেরাইটিক ব্যাসাল্ট এবং এমনকি বেলেপাথরে খোদিত। যেখানে ‘সচেতন’ বিশিষ্টজনেরা প্রত্নবস্তুর ‘মূল্য’ ও প্রকৃতি বিষয়ে অবগত না-হয়ে (প্রত্ন)‘সম্পদ’/‘ঐশ্বর্য’ রক্ষার জন্য প্রচারমাধ্যমে কত-কথা-বলে-যান এই ভ্রান্ত ধারণায়ন, প্রত্যয় ও তথ্য অবলম্বন করে, সেখানে ‘সাধারণ’ মানুষকে ‘অসচেতন’ আখ্যায়িত করে দায়ভারের সিংহভাগ তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া কী-ভাবে ন্যায্য ও বৈধ হয়ে যায়? জ্ঞান/ক্ষমতার সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্কের কাঠামোয় আধুনিক প্রচারমাধ্যমের অবস্থান পুনর্বিবেচনা ছাড়া এ-প্রশ্নের উত্তর দেয়া সম্ভব নয়।

2.jpg
দিনাজপুরের বিরামপুরে জম্বুলেশ্বর মণ্ডব ঢিবি যেখানে খ্রি. ১৩ শতক পূর্ববর্তী স্থাপত্য-কাঠামো বিশিষ্ট একটি প্রত্ন-ঢিবির উপরে গড়ে উঠেছে ১৮ শতকের একটি শিব মন্দির।

দিনাজপুর অঞ্চল থেকে সংগৃহিত বহু ভাস্কর্য আমরা দিনাজপুর জাদুঘরে নথিভুক্ত করেছি। সেখানে, অনেকগুলো মূর্তির গায়ে এখনো সিঁদুরের দাগ রয়ে গেছে। এই দাগগুলো মূর্তিগুলোর মূল ব্যবহারের অনেক পরবর্তীকালে পুনরায় স্থানীয় সংখ্যালঘু জাতিগত ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষজন পূজা করে আসছিল কোনো বট গাছের নীচে কিংবা ভাঙা মন্দিরে।

জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের তাড়নায় এই মূর্তিগুলো তুলনামূলকভাবে অনিরাপদ এবং অসংরক্ষিত অবস্থা থেকে সংগ্রহ করে জাদুঘরে নিয়ে আসা হয়েছে। আপাতদৃষ্টি, কাজটি অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু, সংস্কৃতির অব্যাহত
5.jpg…..
দিনাজপুর মিউজিয়ামে প্রদর্শিত গনেশ-এর ভাস্কর্যে সিঁদুরের দাগ
………

ব্যবহারিক ও ধর্মীয় অনুশীলন থেকে বিচ্ছিন্ন করে মূর্তিগুলোর সংগ্রহ ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়া কি দুর্বল ও অধস্তন ধর্মসম্প্রদায় ও জাতিগুলোর প্রতি আক্রান্তকারী ও নিপীড়নমূলক নয়? অথচ, জাদুঘরের সেক্যুলার পরিসরে এই মূর্তিগুলোই হাজার বছর ধরে বাংলাদেশে বিভিন্ন জাতি-ধর্মের সম্প্রীতিমূলক সহাবস্থানের আখ্যান উৎপাদনের বস্তুগত ও নিরপেক্ষ আলামত হয়ে ওঠে। জাতীয়তাবাদী অনুশীলনে ও আকাঙ্খায় এমন অসঙ্গতি ও স্ববিরোধীতা নতুন তো নয়ই, বরং স্ববিরোধীতা এর সঙ্গে বিজড়িত হয়ে লেপ্টে থাকে। লক্ষণীয় হলো, নিম্নবর্গের ও সংখ্যালঘু জাতি ও সম্প্রদায়ের এমত বহুবিধ আখ্যানকে মূলধারার অধিপতি বিশেষজ্ঞগণ কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রতিক্রিয়াশীলতা ও মিথিকাল বয়ান হিসাবে শনাক্ত করে থাকেন।

6.jpg…….
দিনাজপুর মিউজিয়ামে প্রদর্শিত বিষ্ণু ভাস্কর্য, সিঁদুরের দাগ রয়েছে এতেও
………
প্রচারমাধ্যম ও বিদ্যায়তনের শক্তিশালী জ্ঞান উৎপাদনের অনুশীলনে যতই নিশ্চিত ভাবে ধরে-নেয়া ও দাবি করা হোক না কেন ফ্যাক্ট ও ফিকশনের ভেদাভেদ অস্পষ্ট হয়ে পড়ে ফ্যাক্ট হিসাবে দাবি করা প্রত্নতাত্ত্বিক-ঐতিহাসিক আখ্যানের মধ্যে। কারণ ফ্যাক্ট ও ফিকশনের, ফ্যাক্ট ও মিথের ধারণায়ন ও সংজ্ঞায়নের ইতিহাস রয়েছে এবং এই সংজ্ঞা ও সীমারেখা স্বশাসিত ব্যাক্তিমানুষ (বা বিশেষজ্ঞগণ) নির্ধারণ করেন না। এটা নির্ধারিত-নির্বাচিত-ধবংসপ্রাপ্ত- পুনর্গঠিত-হেজিমনিক হয়ে ওঠে জ্ঞান উৎপাদন-নিয়ন্ত্রণ-বন্টনে অসম ক্ষমতার সম্পর্কের কাঠামোর মধ্যে দাপুটে রাষ্ট্রীয়-প্রচারমাধ্যমীয়-বিদ্যায়তনিক মতাদর্শ, রাষ্ট্রীয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের জ্ঞান ও অনুশীলন, রোমান্টিক, এ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় উচ্চবর্গীয় কামনার জটিল কর্মকাণ্ড ও সক্রিয়তায় (ও নিষ্ক্রিয়তায়)। একমুখী, নির্গুন ও বিমূর্ত রৈখিক কালিকতা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সৌভাগ্যজনকভাবে, মানুষজন এখনো আল্লাহর কুদরত হিসাবে এই-তো-সেইদিন একরাতের মধ্যে কোনো বিহার বা মন্দির বা মসজিদ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন অথবা মাজার হিসাবে, দরগা বা থান হিসাবে কোনো স্থাপত্য ও ঢিবিকে ধর্মীয় অনুশীলনের অবজেক্টে পরিণত করে টিকিয়ে রাখেন। না-হলে
7.jpg…….
দিনাজপুর মিউজিয়ামে প্রদর্শিত আরও একটি বিষ্ণু ভাস্কর্য, এতেও সিঁদুরের দাগ রয়েছে
……..
বাংলাদেশে চলমান আধিপত্যবাদী (প্রত্ন)বস্তুকামী প্রত্নতাত্ত্বিক অতীত- বিষয়- ধারণা ও অনুশীলন হয়ত সব জায়গা খুঁড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক পরিপ্রেক্ষিত /আর্কিওলজিকাল কনটেক্সট ধবংস করে সব মূর্তি ও নিদর্শনকে নিয়ে এসে জাদুঘরে প্রদর্শন ও সংরক্ষণ করত। দল হিসাবে অতীতগুলো ক্রমবর্ধিষ্ণুভাবে জাদুঘরগুলোর, প্রদর্শনদ্রব্যাদি, আর সংগ্রহগুলোর অংশ হয়ে উঠেছে, জাতীয় ও জাতি-অতিক্রমী/ট্রান্সন্যাশনাল মহাপ্রদর্শনী উভয় ক্ষেত্রে, সংস্কৃতি হয়ে উঠছে ক্ষীণ যাকে পিয়েখ্ বোখদো বলতেন একটি হ্যাবিটাস (পুনুরুৎপাদনযোগ্য অনুশীলন ও বিন্যাসের একটি মৌন পরিক্ষেত্র) এবং আরো ব্যাখ্যা করে সচেতন পছন্দ, ন্যায্যতাবিধান এবং রেপ্রিজেনটেশনের একটি এলাকা, পরেরটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিবিধ ও স্থানিকভাবে বিচ্যূত দর্শকদের কাছে’২৫ –জাদুঘরের এই ধারণায়নের পরিসরে হালের জাদুঘরের যে-বিপুল ক্ষমতার হদিস আমরা পাই সেখানে উপর্যোক্ত আশঙ্কা সত্যি হয়ে উঠতে পারে যে-কোনো দিন, যে-কোনো জাতীয়তাবাদী (ও তার সঙ্গে সম্পর্কিত জাতি-অতিক্রমী) শর্তে । তাই বলে নিম্নবর্গের উল্লিখিত ধারণায়ন যে সঠিক অথবা সেগুলোকে সমর্থন করতে হবে, তা কিন্তু আমি বলছি না। কিন্তু, মিথিকাল ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিসাবে আখ্যায়িত এসব ধারণায়ণ ও আখ্যানকে সেক্যুলার ও আধুনিক পঠন-পাঠনের বাইরে গিয়ে পাঠ করার চেষ্টা হিসাবে এবং দাপটের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শর্ত তৈরির উপাদান হিসাবে শনাক্ত করার চেষ্টা হিসাবে এই লেখাটিকে বিবেচনা করা যেতে পারে বলে আমার মনে হয়।


পাঠসূত্র

১. মিথ শব্দটির অর্থ ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন বদলের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। মিথের ধারণায়নের এই রূপান্তর ও পুনর্গঠন বোঝার জন্য দেখুন ব্রুস লিংকন, থিওরাইজিং মিথ : ন্যারেটিভ, ইডিওলজি, স্কলারশিপ, ইউনিভার্সিটি অব চিকাগো প্রেস, চিকাগো, ১৯৯৯। মিথ ও সেক্যুলারের সম্পর্ক এবং মিথের অর্থের বদল নিয়ে চিন্তাউদ্রেককারী আলোচনা রয়েছে তালাল আসাদ, ফরমেশনস অব দি সেক্যুলার: ক্রিসটিয়ানিটি, ইসলাম, মডার্নিটি, স্টানফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০৩ – বইয়ে।

২. রেপ্রিজেনটেশন শব্দটি এখানে পর্যালোচনামূলক এবং ঐতিহাসিকভাবে গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যে যাওয়া একটি প্রত্যয় হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। বিশদ আলোচনার জন্য দেখুন, রেহনুমা আহমেদ, রেপ্রিজেনটেশনস (ও বাস্তবতা) : কিছু পরিসর, কিছু প্রসঙ্গ, কাউন্টার ফটো, ১ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, ২০০৪।

৩. বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি অসংখ্য লেখা প্রকাশিত হয়েছ্।ে সেগুলোর মধ্যে দেখুন, তপতী গুহঠাকুরতা, মনুমেন্টস, অবজেক্টস, হিস্টোরিস : ইনস্টিটিউসনস অব আর্ট ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া, কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস, নিউ ইয়র্ক, ২০০৪। আরো দেখতে পারেন, দিলীপ কুমার চক্রবর্তী, কলোনিয়াল ইন্ডোলজি: সোসিওপলিটিকস অব দি এনসিয়েন্ট ইনডিয়ান পাস্ট, মুনশিরাম মনোহরিলাল পাবলিসার্স, দিল্লী, ১৯৯৭; নয়ানজোৎ লাহিড়ী, আর্কিওলজি এন্ড আইডেনটিটি ইন কলোনিয়াল ইনডিয়া, এনটিকুইটি, খণ্ড নং ৭৪, ২০০০। আর. কনিংহাম ও এস. লিউয়ার, আর্কিওলজি এন্ড আইডেনটিটি ইন ষাউথ এশিয়া : ইন্টারপ্রিটেশনস এন্ড কনসিকোয়েনসেস, এনটিকুইটি, খণ্ড নং ৭৪, ২০০০। সুদীপ্ত কবিরাজ, পলিটিকস ইন ইনডিয়া, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, নিউ দিল্লী, ১৯৯৭। বার্নার্ড এস. কোহ্ন, কলোনিয়ালিজম এন্ড ইটস ফর্মস অব নলেজ: দি ব্রিটিশ ইন ইনডিয়া, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, প্রিন্সটন, ১৯৯৬। অলুন ডেভিড, স্যার উইলিয়াম জোনস: বিবলিকাল অরিয়েন্টালিজম এন্ড ইনডিয়ান স্কলারশিপ, মডার্ন এশিয়ান স্টাডিজ, খণ্ড ৩০; নং ১। রোলান্ড ইনডেন, ইমাজিনিং ইনডিয়া, ইনডিয়ানা ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০১। নিকোল বোভাঁ, অরিয়েনটালিজম, ইডিওলাজি এন্ড আইডেনটিটি: এক্সামিনিং কাস্ট ইন সাউথ এশিয়ান আর্কিওলজি, জার্নাল অব সোসাল আর্কিওলজি, খণ্ড ৫, ২০০৫। হিমানি ব্যানার্জী, রাইটিং ইনডিয়া, ডুইং ইডিওলজি: উইলিয়াম জোন্সেস কনস্ট্রাকশন অব ইনডিয়া এজ এন ইডিওলাজিকাল ক্যাটেগরি (https://www.library.yorku.ca/ojs/index.php/lh/article/view/5289/4485) নিকোলাস ডার্ক, কাস্টস অব মাইন্ড: কলোনিয়ালিজম এন্ড দি মেকিং অব মডার্ন ইনডিয়া, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০১।

৪. তপতী গুহঠাকুরতা তার টেলস অব দি ভারহুত স্টুপা: আর্কিওলজি ইন দি কলোনিয়াল এন্ড ন্যাশনালিস্ট ইমাজিনেশন প্রবন্ধে ঔপনিবেশিক ‘ফ্যাক্ট’ নির্ভর আখ্যানের বিপরীতে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় লিখিত ‘পাষানের কথা’ লেখাটির আখ্যানের কথা উল্লেখ করেছেন। এই আখ্যান ফিকশনের পাটাতনের উপরে গড়ে উঠেছিল। রাখালদাসের এই লেখা দাপুটে ঔপনিবেশিক ও আধুনিক জাতীয়তাবাদী আখ্যান রচনার শর্ত ও ভঙ্গী থেকে স্পষ্টতই এক বিচ্যূতিকে নির্দেশ করে। লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে জি. এইচ. আর টিল্লোটসন সম্পাদিত প্যারাডিমস অব ইনডিয়ান আর্কিটেকচার: স্পেস এন্ড টাইম রেপ্রিজেনটেশন এন্ড ডিজাইন, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৮, বইয়ে।

৫. অতীত জাতীয়তাবাদী বিভিন্ন ডিসকোর্স নির্মাণ ও পুনর্গঠনে অত্যন্ত ঘনিষ্ট ভাবে বিজড়িত। জাতীয়তাবাদেন উত্থান ও এর সঙ্গে প্রত্নতা্িত্ত্বক আখ্যানের সম্পর্ক বিষয়ে দেখতে পারেন ব্র“স ট্রিগার, দি হিস্টোরি অব আর্কিওলাজিকাল থট, কেমব্রিজ ইউনিবার্সিটি প্রেস, ১৯৮৯। আরো দেখুন ফিলিপ কোহ্ল এবং ক্লেয়ার ফসেট সম্পাদিত ন্যাশনালিজম, পলিটিকস এন্ড প্রাকটিস অব আর্কিওলজি, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৫। লিন মেসকেল সম্পাদিত আর্কিওলজি আন্ডার ফায়ার: ন্যাশনালিজম, পলিটিকস এন্ড হেরিটেজ ইন দি ইস্টার্ন মেডিটেরানিয়ান এন্ড মিডল ইস্ট, রুটলেজ, ১৯৯৮।

৬. পার্থ চট্টোপাধ্যায়, দি নেশন এন্ড ইটস ফ্রাগমেন্টস : কলোনিয়াল এন্ড পোস্ট কলোনিয়াল হিস্টোরিস, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৩। পার্থর ধারণার আগ্রহোদ্দীপক পর্যালোচনার জন্য দেখতে পারেন ডেভিড স্কট, রিফ্যাশনিং ফিউচারস: ক্রিটিসিজম আফটার পোস্ট কলোনিয়ালিটি, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৯। আরো দেখতে পারেন সুমিত সরকার, বিইয়োন্ড ন্যাশনালিস্ট ফ্রেমস: রিলোকেটিং পোস্ট মডার্নিজম, হিন্দুত্ব এন্ড হিস্টোরি, পারমানেন্ট ব্লাক, ২০০৩।

৭. সঞ্জয় সুব্রামন্যম, গোল্ডেন এজ হ্যালুসিনেসনস: ইনডিয়ান সিভিলাইজেশন ডিরাইভস ফ্রম নো ইউটোপিয়ান আইডিয়াল; ইট ওয়াজ ফাউন্ডেড অন ক্রস রোডস, আউটলুক ম্যাগাজিন, ২০ আগস্ট, ২০০১ [http://www.outlookindia.com/full.asp?fodname=20010820&fname=Sanjay+%28F%29&sid=1]

৮. স্বাধীন সেন, মাসউদ ইমরান, আফরোজা খান, মাজেদা রহমান, নুরুল কবির, সাইফুর রহমান, নাজমুস সাকিব, খন্দকার মেহবুবুল ইসলাম ও আরিফুর রহমান, উই ক্যান প্রোটেক্ট আওয়ার পাস্ট? রি-থিকিং দি ডমিনেটিং প্যারাডিম অব প্রিজারভেশন এন্ড কনজারভেশন উইথ রেফারেন্স টু দি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট অব সোমপুর মহাবিহার, বাংলাদেশ, জার্নাল অব সোসাল আর্কিওলজি, খণ্ড ৬; নং ১, ২০০৬। আরো দেখুন, স্বাধীন সেন, এসেনশিয়াল ডিলেমা ইন দি লিবেরাল আনডারস্টানডিং অব হেরিটেজ : অন রিসেন্ট লুটিং এন্ড ডেসট্রাকশন অব মিউজিয়ামস ইন ইরাক এন্ড ইটস রিঅ্যাকশনস, মেঘবার্তা, ২০০৩ ২০০৪
[http://www.meghbarta.org/nws/nw_main_p022b.php?issueId=15&sectionId=
14&articleId=216
এবং http://www.meghbarta.org/nws/nw_main_p022b.php?issueId=
11&sectionId=26&articleId=189] হেরিটেজ ধারণার পর্যালোচনার জন্য দেখুন লিন মেসকেল, নেগেটিভ হেরিটেজ এন্ড পাস্ট মাস্টারিং ইন আর্কিওলজি, এনথ্রোপোলজিকাল কোয়ার্টারলি, খণ্ড ৭৫ নং ৩, ২০০২।

৯. এইচ. ক্লেয়ার, দি আনইজি বেডফেলোস:ইউনিভার্সালিটি এন্ড কালচারাল হেরিটেজ। লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে আর. লেইটন, পি. জি. স্টোন ও জে. থমাস সম্পাদিত ডেসট্রাকশন এন্ড কনজারভেশন অব কালচারাল প্রোপার্টি, রুটলেজ, ২০০১। ব্র“স ম্যাককয় ওয়েন, মনুমেন্টালিটি, আইডেনটিটি এন্ড দি স্টেট: লোকাল প্রাকটিস, হেরিটেজ এন্ড হেটেরোটোপিয়া ইন স্বয়ংম্ভু, নেপাল, এ্যানথ্রোপলজিকাল কোয়ার্টারলি, খণ্ড ৭৫; নং ২, ২০০২।

১০. শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিজিৎ দাশগুপ্ত (সম্পা.) জাতি, বর্ণ ও বাঙালি সমাজ, নয়াউদ্যোগ, ১৯৯৮। সাবআলর্টান স্টাডিজ জার্নালের বিভিন্ন খণ্ডে উপনিবেশবাদ ও জাতীয়তাবাদের সঙ্গে প্রতিরোধের ও আপোষের সম্পর্কে গঠিত বিভিন্ন ধরন ও ভঙ্গী সম্পর্কে আলোচনা আছে।

১১. রেইনহার্ট কোসেলেক, ফিউচারস পাস্ট: অন দি সেমানটিকস অব হিস্টোরিকাল টাইম (কেনেথ ট্রাইব কর্তৃক অনূদিত), এমআইটি প্রেস, ১৯৮৫ এবং দি প্রাকটিস অব কনসেপচুয়াল হিস্টোরি: টাইমিং হিস্টোরি, স্পেসিং কনসেপ্টস (টড স্যামুয়েল প্রেসনার ও অন্যান্য কর্তৃক অনূদিত), স্টানফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০২। জন যামিটো, কোসেলেকস ফিলোসফি অব হিস্টোরিকাল টাইমস এন্ড দি প্রাকটিস অব হিস্টোরি, হিস্টোরি এন্ড থিয়োরি, খণ্ড ৪৩, ২০০৪-এ উল্লিখিত।

১২. বেনেডিক্ট এন্ডারসন, ইমাজিনড কমিউনিটিস: রিফ্লেকশনস অন দি অরিজিন এন্ড ¯েপ্রড অব ন্যাশনালিজম, ভার্সো, ১৯৮৩।

১৩. তালাল আসাদ, জিনিয়ালজিজ অব রিলিজিয়ন: ডিসিপ্লিন এন্ড রিজনস অব পাওয়ার ইন ক্রিস্টিয়ানিটি এন্ড ইসলাম, দি জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৩।

১৪. তালাল আসাদ, রিলিজিয়ন এন্ড পলিটিকস: এ্যান ইনট্রোডাকশন, সোসাল রিসার্চ, খণ্ড ৫৯, নং ১, ১৯৯২। এছাড়াও দেখুন, তালাল আসাদ, ফরমেশনস অব দি সেক্যুলার: ক্রিসটিয়ানিটি, ইসলাম, মডার্নিটি, স্টানফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০৩।

১৫. খ্রিস্টিয়ধর্ম, প্রাচ্যবাদ ও সেক্যুলারবাদের মধ্যের সম্পর্ক বোঝার জন্য দেখুন গিল আনিদজার, সেক্যুলারিজম, ক্রিটিকাল ইনকোয়ারি, খণ্ড ৩৩, ২০০৬। এছাড়াও দেখুন তালাল আসাদ, ২০০৩। এছাড়াও সেক্যুলারিজম সম্পর্কিত সাম্প্রতিকতম বাহাসগুলো বোঝার জন্য দেখুন http://programs.ssrc.org/religion/secularism/ এবং http://www.ssrc.org/blogs/immanent_frame/

১৬. দেখুন তালাল আসাদ, ১৯৯২, ১৯৯৩ ও ২০০৩।

১৭. তালাল আসাদ, ১৯৯২-এ উল্লিখিত।

১৮. সাবা মাহমুদ, সেক্যুলারিজম, হারমেনিউটিকস, এন্ড এমপায়ার: দি পলিটিকস অব ইসলামিক রিফরমেশন, পাবলিক কালচার, খণ্ড ১৮: নং ২, ২০০৬।

১৯. দেখুন মেনি ওয়ার্ল্ডস অব ইনডিয়ান হিস্টোরি, সুমিত সরকারের ‘রাইটিং সোস্যাল হিস্টোরি’, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৭-এ অন্তর্ভুক্ত প্রবন্ধ।

২০. প্রাগুক্ত সুমিত সরকার ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়-য়ে উল্লিখিত।

২১. দেখুন জ্ঞানেন্দ্র পান্ডে, ক্যান এ মুসলিম বি এন ইনডিয়ান, কমপারেটিভ স্টাডিজ ইন সোসাইটি এন্ড হিস্টোরি, খণ্ড ৪১, নং ৪, ১৯৯৯।

২২. সাবা মাহমুদ, প্রাগুক্ত।

২৩. স্বাধীন সেন, কমিউনিটি বাউন্ডারি, সেক্যুলারাইজড রিলিজিয়ন এন্ড ইমাজিনড পাস্ট ইন বাংলাদেশ: হিস্টোরিওগ্রাফি এন্ড আর্কিওলজি অব আনইকুয়াল এনকাউনটার, ওয়ার্ল্ড আর্কিওলজি, খণ্ড ৩৪; নং ২, ২০০২। আরো দেখুন স্বাধীন সেন ও অন্যান্য ২০০৬।

২৪. স্বাধীন সেন, ইজ ইট অনলি সারভাইবাল? ইজ ইট পলিটিকস উইদাউট সায়েন্স? মেঘবার্তা, ২০০৬ {http://www.meghbarta.org/nws/nw_main_p01b.php?issueId=6&sectionId=20&articleId=161}

২৫. . অর্জুন অপ্পাদূরাই, মডার্নিটি এ্যাট লার্জ : কালচারাল ডাইমেনশনস অব গ্লোবালাইজেশন, ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটা, ১৯৯৬। ওয়েন, ২০০২-এ উল্লিখিত।

swadhinsen@hotmail.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সেলিনা শিরীন শিকদার — অক্টোবর ৩১, ২০০৮ @ ৮:১১ পূর্বাহ্ন

      অসাধারণ! আশা করি স্বাধীন সেন-এর কাছ থেকে এমন সমৃদ্ধ আরো লেখা পড়ার সুযোগ হবে।

      – সেলিনা

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com