পুনর্মুদ্রণ, সাক্ষাৎকার

বিষয় ‘‌‌বুদ্ধিজীবী’

আজফার হোসেনের সঙ্গে আলাপ

raisu | 19 Feb , 2008  

azfar.jpg
আজফার হোসেন, জন্ম. ১৯৬৫; ছবি: মমিনা জলিল

[নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক আজফার হোসেনের এ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছিল আজ থেকে ১৩ বছর আগে ১৯৯৫ সালে। আলাপচারিতায় সমাজে বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা অনুসন্ধান করা হয়েছিল। এখনো প্রাসঙ্গিক বিবেচনা করায় দুর্লভ এ সাক্ষাৎকারটি পুনর্মুদ্রণ করা গেল। – বি. স.]

ব্রাত্য রাইসু : আপনি তো নিজেকে বুদ্ধিজীবী ভাবেন, আপনার কী মনে হয়?

আজফার হোসেন : তা ঠিক না।

রাইসু : মানে ভাবাটা ঠিক না, আপনি যে ভাবেন এটা ঠিক না?

আজফার : বুদ্ধিজীবী যে ভাবাটা, সেটা ঠিক ভাবি নিজেকে তা ঠিক না। আর এভাবে ভাবতেই তো নিজের কষ্ট লাগে। কারণ বুদ্ধিজীবী যে এসোসিয়েশন বহন করে সেটা ঠিক পজেটিভ এসোসিয়েশন না। যদি নিজেকে কিছুটা ভালোবাসা যায় তাতে করেও তো নিজেকে বুদ্ধিজীবী ভাবার কোনো কারণ দেখি না। ‘বুদ্ধিজীবী’ একটা গাল হিসেবেই ব্যবহার করা হয়, তাই না? নিজেকে নিজে অনেক সময় অন্য ব্যাপারে গালি দেই, ‘বুদ্ধিজীবী’র চেয়েও বড় গালি আছে যেগুলো নিজেকে মাঝে মাঝে দেয়া হয়।

রাইসু : তাহলে আপনি বুদ্ধিজীবী নন?
—————————————————————–
এই শ্রেণীটা নিজেদের একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করে সব সময়। যে, “আমি আলাদা, দেখো তোমার থেকে আলাদা, উঁচু, আমি তোমার চেয়ে ভালো। আমার রুচি ভালো, আমি যা বলছি সেটাই ঠিক, আমি অনেক কিছু বুঝি।” মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে আগত বুদ্ধিজীবীদের একই সমস্যা।
—————————————————————–
আজফার : না, ঠিক বুদ্ধিজীবী বলতে যা বোঝানো হয় সেই অর্থে বোধহয় না।

রাইসু : সে ক্ষেত্রে আপনার যে লৈখিক এবং মৌখিক কর্মকাণ্ড এগুলোকে কী বলবেন?

আজফার : হ্যাঁ, আমি যেই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত সেই কাজটা আসলে অঙ্গীকারে বিশ্বাস করি। ‘অঙ্গীকারে বিশ্বাস’–এটি সাম্প্রতিক কালে কিছু বিভ্রান্ত উত্তরাধুনিকতাবাদীদের কাছে বেমানান ঠেকলে ঠেকতেও পারে।

রাইসু : উত্তরাধুনিকতাবাদীদের দিকে আমরা শেষের দিকে যাই?

আজফার : তাহলে আমরা কোন জায়গায় আছি সেই জায়গাতেই ফিরে আসি।

রাইসু : সেই জায়গাটা হচ্ছে কমিটমেন্ট–বাংলায় আপনি কী যেন বললেন?

আজফার : বাংলায় যেটাকে আমরা ‘অঙ্গীকার’ বলি।

রাইসু : অঙ্গীকার–অঙ্গীকারে আপনি বিশ্বাস করেন বললেন। ‘অঙ্গীকার করা’ মানেই কি ‘অঙ্গীকারে বিশ্বাস করা’?

আজফার : বটেই, অঙ্গীকার করা মানেই অঙ্গীকারে বিশ্বাস করা, বটেই।

রাইসু : বা অঙ্গীকার না করলেও চলে, বিশ্বাস করলেই অঙ্গীকার করা হয়ে গেলো?

আজফার : তা হতে পারে।

রাইসু : হতে পারে বললেন, আপনার মধ্যে দ্বৈধ কেন?

আজফার : আমরা কোন দিকে এগুচ্ছি বলে মনে হচ্ছে? এ পর্যন্ত তোমার সঙ্গে কথা বলে মনে হচ্ছে আমরা বেশ বাগবিস্তার করছি। এই বাগবিস্তার হচ্ছে আমাদের বর্তমান যে ক্রাইসিস সে ক্রাইসিসের একটা।

রাইসু : অর্থাৎ আমরা বর্তমান ক্রাইসিসের মধ্যেই আছি।

আজফার : বর্তমানে আমরা ক্রাইসিসের মধ্যে আছি।

রাইসু : সেক্ষেত্রে আমাদের কচকচানির মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের কমিটমেন্ট মানে অঙ্গীকার রক্ষা করে চলেছি।

আজফার : আমি ঠিক বুঝতে পারছি না এ-ধরনের আলোচনা কোথায় নিয়ে যাবে শেষপর্যন্ত।

রাইসু : ভাষাবিজ্ঞান ছাড়া আর কোনো দিকে না।

আজফার : আমরা ভাষাবিজ্ঞানেই থাকব কিনা?

রাইসু : ভাষাবিজ্ঞানে থাকাটা আমাদের জন্য ঠিক হবে না। আমরা বরং বুদ্ধিজীবীদের দিকে যাই। আপনি বুদ্ধিজীবী নন এটা বোঝা গেলো। বাংলার বুদ্ধিজীবী সমাজ বলতে আপনি এখন যাঁদের বোঝেন তাঁদের নিয়ে আলাপ করা যেতে পারে।

আজফার : হ্যাঁ, তাদের নিয়ে আলাপ করতে গেলে প্রথমে আমাকে বুঝতে হবে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে। আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বৈশিষ্ট্য salma.jpg……
কন্যা সালমার সঙ্গে আজফার হোসেন; ছবি: মেলিসা হোসেন
………
চমৎকার! চমৎকার এই অর্থে যে বিভিন্ন ধরনের সাইন এবং সিম্পটম আছে আর কি। একটু একটু করে সমস্ত কিছু চাখার–একটু ফিকশন, একটু রিয়ালিটি, একটু মার্ক্স, এক স্লাইস রবীন্দ্রনাথ–এই যে এই ব্যাপারটা, এগুলো করে বুদ্ধিজীবীরা অনেক জায়গায় দাঁড়াতে চায়, শেষপর্যন্ত কোনো জায়গায়ই দাঁড়াতে পারে না–মধ্যবিত্ত শ্রেণীর এই বুদ্ধিজীবীরা। এই বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর যে ইতিহাস–তাদের একটা লিখিত ইতিহাস আছে–সেই ইতিহাসে আমরা দেখি এই শ্রেণীর বেশ একটা গ্লোরিফিকেশন আছে। এই লিখিত ইতিহাসে বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর গ্লোরিফিকেশন এরকম যে, আমাদের সাংস্কৃতিক সংগ্রামে, রাজনৈতিক আন্দোলনে এবং অন্যান্য সামাজিক আন্দোলনে তাঁদের একটা উজ্জ্বল অংশগ্রহণ আছে। এইসব ব্যাপার নিয়ে তাদের বেশ একটা…ক্যানোনাইজেশন…।

রাইসু : বাংলায় বলেন, বাংলায় বলেন।

আজফার : মানে তাদের বেশ একটা…

রাইসু : কারণীকরণ…?

আজফার : কারণীকরণ!

রাইসু : বলবেন?

আজফার : শব্দটা তো তোমার। তো এই শ্রেণীটা আমাদের সংগ্রামগুলোকে যেমনি এগিয়েও নিয়েছে তেমনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে পিছিয়েও নিয়ে গেছে।

রাইসু : তার মানে রাজনৈতিকভাবে যদি দেখতে চাই তাহলে বুদ্ধিজীবীর অবদান বা নিরবদানটা হচ্ছে বিপ্লবের দিক থেকে, বা সংগ্রামের দিক থেকে। আমরা বুদ্ধিজীবীদের বিচার করবো সংগ্রামের দিক থেকে। মানে আপনি তাই করতে চান?

আজফার : হ্যাঁ, আমি তাই চাই। কারণ, ‘বুদ্ধিজীবী’ শব্দটার একটা তীব্র রাজনৈতিক ব্যাঞ্জনা আছে। সেটাকে আমি খুব সামনে আনতে চাই এ কারণে যে, রাজনৈতিক সংগ্রামে এবং সাংস্কৃতিক সংগ্রামে তাদের একটা অংশগ্রহণ বা ভূমিকা থাকে। এবং এজন্যেই তারা বুদ্ধিজীবী হন।

রাইসু : হ্যাঁ, নাহলে পণ্ডিত ব্যক্তিদের তো আর আমরা বুদ্ধিজীবী বলি না।

আজফার : না, পণ্ডিত ব্যক্তিদেরও আমরা অনেক সময় বুদ্ধিজীবী বলি। বুদ্ধিজীবীর সংজ্ঞার্থ তো বিচিত্রমাত্রিক, এবং কিছু নির্দিষ্ট সংজ্ঞার কবুতর খোপে তাকে আটকে ফেলাটা খুব দুষ্কর। যেটা করছি আমরা এ-মুহূর্তে আমাদের এই ডিসকোর্সে, সেটা হচ্ছে যে বুদ্ধিজীবীর একটা সংজ্ঞা আমাদের মতো করে…

রাইসু : সংজ্ঞাহীন বুদ্ধিজীবীদের? আচ্ছা, বুদ্ধিজীবীরা কেন সংজ্ঞাহীন?

আজফার : বুদ্ধিজীবীরা সংজ্ঞাহীন এ-কারণেই যে বুদ্ধিজীবীদের ইতিহাসে বিচিত্রমাফিক দুদোল্যমানতা এবং বিভিন্ন ধরনের পজিশান; এই কারণেই এক ধরনের সংজ্ঞার্থহীনতায় তারা আছেন। এবং কিছুটা ক্ষেত্রে সংজ্ঞাহীনতায়। সংজ্ঞাহীন বুদ্ধিজীবী আর সংজ্ঞার্থহীন বুদ্ধিজীবীর মধ্যে পার্থক্য আছে। যে-বুদ্ধিজীবী আসলে কোনো বুদ্ধিজীবী না, যার কোনো সংজ্ঞা নেই, বা জ্ঞান নেই, চেতনা নেই তিনি সংজ্ঞাহীন বুদ্ধিজীবী। এ-ধরনের বুদ্ধিজীবী আমরা লক্ষ্য করি।

রাইসু : আমাদের সময়কার বুদ্ধিজীবীরা কোন ধরনের?

আজফার : আমাদের সময়কার বুদ্ধিজীবী যারা তারা তো মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে আগত, আমাদের সময়ে তাদের ভূমিকা নেতিবাচক। এর আগে কিছুটা ইতিবাচক ভূমিকা লক্ষ্য করা গেছে–যাঁরা বুদ্ধিজীবী থেকেছে কিন্তু আবার ঠিক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীর যে পর্যায় সেটা অতিক্রম করে গেছে।

রাইসু : যারা ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছেন তাঁদের নামগুলো বলতে পারেন?

আজফার : আমি ঊনবিংশ শতাব্দীর কথা বলবো, এবং আমি বিদ্যাসাগরের কথা বলবো। আমি মাইকেল মধুসূদন দত্তের কথা বলবো। বিংশ শতাব্দীর কথা বললে আমি রবীন্দ্রনাথের কথা বলবো, এবং নজরুলের কথা বলবো। এবং আমি লালনের কথাও বলবো। যদিও লালনের অবস্থা এঁদের থেকে অনেক ডিফরেন্ট। ঊনবিংশ শতাব্দী এবং বিংশ শতাব্দীর ভেতর দিয়ে বুদ্ধিজীবীর যে-একটা সংগ্রাম তার ধারাবাহিকতা শনাক্ত করা যায়। এবং সংগ্রামে মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীর যে-অবদান সে-অবদানকে আমরা বেশ উজ্জ্বলও দেখি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এ-ও দেখি সেই একই ইতিহাসে মধ্যজীবীরা–মানে…

রাইসু : না, ‘মধ্যজীবীরা’–আপনি বলতে পারেন ‘মধ্যজীবী’। ইন্টেলেকচুয়ালের ভালো বাংলা বলা যায়–‘মধ্যজীবী’। এটা আমরা ব্যবহার করতে পারি। চালুও করতে পারি।

আজফার : হ্যাঁ, আমরা এটা চালু করতে পারি। তো এই মধ্যজীবীরা এক অর্থে এটাকে পেছনেও নিয়ে গেছেন। মানে আমি যেটা মনে করি, এই মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীরা বিভিন্ন ধরনের মধ্যস্বত্বভোগী এবং সে কারণেই বোধহয় এই মধ্যজীবী শব্দটিও এই মুহূর্তে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এলো এবং এটাকে ব্যবহার করা যায়।

রাইসু : এরপর থেকে আমরা বুদ্ধিজীবীর বদলে বলতে পারি মধ্যজীবী এবং বুদ্ধিজীবীদের বলবো তাঁরা যেন এটা গ্রহণ করেন।

আজফার : বুদ্ধিজীবীদের তো আবার সবকিছু গ্রহণ করানো মুশকিল। তাই না? বদ্ধিজীবীরা তো সবকিছু গ্রহণ করেন না।

রাইসু : ওনারা হচ্ছেন ব্যাগ্রহণশীল।

আজফার : সেটাই। এটি হলো একটি ব্যাপার। এবং সত্যিকার অর্থে আমরা যাকে বুদ্ধিজীবী শ্রেণী বলে শনাক্ত করতে শিখেছি–এবং তার একটা অ্যাকসেপটেন্স বা ব্যবহারযোগ্যতা সেই বুদ্ধিজীবী শ্রেণীকে ঠিক বুদ্ধিজীবী বলা যায় কিনা–কারণ বুদ্ধিজীবী হচ্ছে সে-ই যে বুদ্ধি দিয়ে সমাজে এবং সংস্কৃতিতে প্রভাব সৃষ্টি করে এবং সমাজ এবং সংস্কৃৃতিকে চলমান করে এবং পরিবর্তন করে। বুদ্ধিজীবীরা শুধু যে বলবে তাই না, সে বলার মতোই বলবে এবং বদলাবে। বলা এবং বদলানো–এ দুটোই একজন বুদ্ধিজীবীর মধ্যে থাকা দরকার। সব বলাই বুদ্ধিজীবীর বলা না। বুদ্ধিজীবীর ভান করে অনেক সময় অনেক কিছু বলা হয়।

রাইসু : আমাদের আলোচনার একটা কাজ তাহলে বুদ্ধিজীবী হিসেবে যাদের আমরা ভ্রমিতেছি তাদেরকে শনাক্ত করা। নাকি?

আজফার : হ্যাঁ, এ পার্ট অব আওয়ার ডিসকার্সন।

রাইসু : এখানে বুদ্ধিজীবী বলতে উদ্ধৃতিচিহ্নের (‘বুদ্ধিজীবী’) মধ্যকার বুদ্ধিজীবী।

আজফার : এবং তারা সবদিক থেকেই মধ্যমানের। এই বুদ্ধিজীবীর কাছ থেকে খুব বড় ধরনের সৃজনশীল কোনো কিছু আমরা পাচ্ছি না। সামাজিক ক্ষেত্রেও তাদের সৃজনশীল অবদান দেখছি না, তারপর সাংস্কৃৃতিক দিক থেকেও তাদের সৃজনশীল ভূমিকা আমরা লক্ষ্য করছি না।

রাইসু : তাদের ভূমিকাটা তাহলে কোন জায়গায়?

আজফার : তাদের ভূমিকাটা হচ্ছে ভান তৈরি করা এবং কীভাবে সমাজের বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধাগুলো নেয়া যায়।

রাইসু : এখানকার মধ্যজীবীরা মোটামুটি সুযোগগুলো নিচ্ছেন কোন কোন পজিশন থেকে, অবস্থান থেকে?

আজফার : যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের যারা বড় বড় পণ্ডিত বলে নিজেদের দাবি করেন, এঁরা, বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যজীবীরা, তারা বেশ মধ্যমানের। কিন্তু সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে তারা আবার খুব উঁচু এলিট–এঁরা।

রাইসু : আচ্ছা আমাদের ইন্টেলেকচুয়ালরা নাকি সবাই নিজেদেরকে এলিট ভাবেন, এটা কি ঠিক?

আজফার : হ্যাঁ, আমার মতো মনে হয় এলিটিজমের সঙ্গে আমাদের দেশের যে গড়ে-ওঠা পারভার্ট ইন্টেলেকচুয়ালস–বিকৃত যে ইন্টেলেকচুয়াল–তার একটা যোগাযোগ আছে। ইন্টেলেকচুয়ালিজমের সঙ্গে এলিটিজমের একটা যোগাযোগ। সো কলড্ ইন্টেলেকচুয়ালিজম–এই ইন্টেলেকচুয়ালিজমের দ্বারা এই শ্রেণীটা তাদের নিজেদের একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করে সব সময়। যে, “আমি আলাদা, দেখো তোমার থেকে আলাদা, উঁচু, আমি তোমার চেয়ে ভালো। আমার রুচি ভালো, আমি যা বলছি সেটাই ঠিক, আমি অনেক কিছু বুঝি”–এই যে ব্যাপারটা, এই ব্যাপারটার ভেতর দিয়ে তাদের নিজেদেরকে আলাদা করার, নিজেদেরকে এলিট ভাবার ব্যাপার আছে। আমাদের এখানে যে মধ্যবিত্ত শ্রেণীটা গড়ে উঠেছে সেই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভেতরই এই সমস্যাটা। মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে আগত বুদ্ধিজীবীদের একই সমস্যা। মধ্যবিত্ত শ্রেণীটা কীভাবে গড়ে উঠেছে? আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে উঠেছে বেশ ইন্টারেস্টিং ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায়। সেটা হচ্ছে, আমরা জানি ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ আমাদের এখানে যখন এলো তখন আমরা দেখেছি যে, উপনিবেশবাদের ফলে সামন্তবাদের ভাঙন–এবং ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের ভেতর দিয়ে পুঁজিবাদের কিছু কিছু মূল্যবোধ এসেছে। এবং আমরা দেখলাম যে মধ্যবিত্ত শ্রেণী একটা ওয়েস্টার্ন এজ্যুকেশন–সেক্যুলার এজ্যুকেশনের সঙ্গে তার একটা কনটাক্ট স্থাপিত হলো এই উপনিবেশবাদের সুবাদে। কিন্তু কনটাক্ট স্থাপিত হওয়ার পরও উপনিবেশবাদের যে জ্বীন তার আছড়টা তার ওপর থেকে গেলো। এবং এ অবস্থায় মধ্য দিয়েই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকশিত হওয়া শুরু হলো। সামন্তবাদী যে উৎপাদনসম্পর্ক সেটা তাদের বিলুপ্ত হলো, আবার সামন্তবাদী যে অবশেষ, সাংস্কৃৃতিক অবশেষ–সেগুলো থেকে গেলো, সেগুলোকে আঁকড়ে ধরে একটা জটিল অবস্থায়…

রাইসু : বাদুড়ের মতো। মাথা নিচের দিকে, পা উপরে?

আজফার : হ্যাঁ, একদম, বাদুড়ের মতো; জটিল অবস্থার মধ্যে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ শুরু হলো। ইউরোপের মধ্যবিত্তের বিকাশটা কিন্তু ছিলো পরিষ্কার।

রাইসু : বাদুড়ের এই অবস্থার সঙ্গে আমাদের মধ্যবিত্তকে ভালো মেলাতে পারি নানানভাবে। কারণ বাদুড় হচ্ছে না-পাখি না-পশু? না কী জিনিস? আসলে তো ধরা যায় না এটা কী জিনিস!

আজফার : এই বাদুড়ত্ব কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশের ভেতরে, তার ইতিহাসের ভেতরে…

রাইসু : ঝুলায়মানতার ভিতর?

আজফার : ঝুলায়মানতার ভিতরে। তার…

রাইসু : দোদুল্যমানতার ভিতরে…

আজফার : বিভিন্ন ভিতরে এই বাদুড়ত্ব থেকে গেছে। এবং এই বাদুড়ত্ব এখন আরো বেশি প্রকাশিত হচ্ছে। এই বাদুড়ত্ব–হাহ্্ হাঃ–বাদুড়ত্ব, সত্যি ইন্টারেস্টিং মেটাফর। এই মেটাফরকে আমার অনেক সম্ভাবনাময় মনে হয়।

রাইসু : এবং এই বাদুড়ত্ব থেকে শাব্দিক অনুষঙ্গে আমরা যেতে পারি বান্দরত্বের মধ্যে। মধ্যজীবীর যে বান্দরনেস…

আজফার : হাঃ হাঃ হাঃ। যার ফলে আমাদে বুদ্ধির যে বিকাশ তারচে বাদুড়ত্বের বিকাশটাই বড়।

রাইসু : সে অন্ধকারেই থাকতে পছন্দ করে। দিনের বেলা ঘুমায়। রাত্রে জাগে। বাদুড়দেরটা প্রাকৃতিক, মধ্যজীবীরটা আর্থসামাজিক। আচ্ছা, আমাদের মধ্যজীবীরা ঝুলে আছেন কোথায়?

আজফার : মাঝখানে ঝুলে রয়েছে।

রাইসু : কোথায়?

আজফার : ঝুলে আছে বিভিন্ন পয়েন্টে। পয়েন্টগুলো ধরো–বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় পোস্টের পয়েন্ট–এটা সিন্ডিকেটের মেম্বার হতে পারে। কিন্তু ইলেকট্রিক তারে বাদুড় যেভাবে ঝুলে থাকে সেভাবে না। ইলেকট্রিক তারে বাদুড় ঝোলে নাকি?

রাইসু : ঝলসানো বাদুড়।

আজফার : তারা ঠিক ঝলসানো নয়। তারা ঝুলে-থাকা। তারা বৈদেশিক ফার্মে ঝোলে, সাহায্যসংস্থাগুলোতে ঝোলে। তারা ঝুলে আছে আর কি। তো, বাদুড়ঝোলার একটা ইতিহাস কিন্তু আমাদের ঊনবিংশ শতাব্দী থেকেই আছে। এটাকে আমরা ‘বাদুড়ঝোলার ইতিহাস’ নাম দিতে পারি। এবং সেই ইতিহাস যদি আমরা ব্যাখ্যা করি, দেখতে পাবো আমাদের বুদ্ধিজীবী বা মধ্যজীবীর সমস্যাগুলো কোথায়, এবং তারা যে সামাজিক পরিবর্তনে কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না ভবিষ্যতে, এভাবে চললে, সেটা অনায়াসে বলা যায়। এই মধ্যজীবীদের কারণে আমরা আমাদের অনেক মূল্যবান অর্জনকে হেয় করতে শিখেছি। তবে এই মধ্যজীবীর সঙ্গে বুদ্ধিজীবীর পার্থক্য আছে। বুদ্ধিজীবী যেখানে সমাজবিকাশের ক্ষেত্রটাকে প্রশস্ত করে, সমাজবিকাশকে সাধিত করে, সেখানে সমাজবিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে মধ্যজীবী। তবে এই ক্ষতিগ্রস্ত করে যে-শ্রেণীটি তারা রিজেক্টেড হয়েছে। কিন্তু যে-শ্রেণীটি বুদ্ধির ভেতর দিয়ে সৃজনশীলতার ভেতর নিয়ে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে পারে সেই শ্রেণীটা আসলে বিকশিতই হয় নি।

রাইসু : বুদ্ধিজীবীদের ‘শ্রেণী’ বলবেন?

আজফার : বুদ্ধিজীবীর ক্ষেত্রে ‘শ্রেণী’ শব্দটা ঠিক হয় নি। লেট মি উইথড্র। বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় বা গোষ্ঠী বলা যায়। এই কারণেই গ্রামশীর কথা আমি বিশেষভাবে উল্লেখ করবো: দুই ধরনের ইন্টেলেকচুয়াল আছে। একটা হচ্ছে ট্র্যাডিশনাল ইন্টেলেকচুয়াল, আর একটা হচ্ছে অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল। ট্র্যাডিশনাল ইন্টেলেকচুয়ালদের আমরা গ্রামশীয় কায়দায় একটা পর্যন্ত ব্যবহার করে মধ্যজীবী নাম দিলাম। আর ট্র্যাডিশনাল ইন্টেলেকচুয়াল হচ্ছে সেই ইন্টেলেকচুয়াল যারা, ধরা যাক এ ধরনের: যে একই জিনিস বারবার করছে, একই কথা বারবার বলছে, ভারি ভারি কিছু শব্দ শিখেছে এবং সেগুলো বারবার ব্যবহার করছে। ব্যবহার করতে করতে শব্দগুলো অর্থশূন্য হয়ে পড়েছে। আর এক শ্রেণীর আছে যারা বড় বড় অংকের তত্ত্ব কপচায়, হাই অ্যাবস্ট্র্যাক্ট কপচায়। যার সঙ্গে জীবনের, মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার কোনো যোগাযোগ নেই। যোগাযোগ যে থাকতেই হবে এটার প্রশ্ন তুললে বলবো যে এটা একটা ব্যাপার–কিন্তু যোগাযোগ নেই। এবং তাদের কনফাইনটা খুব ন্যারো। সামাজিকভাবে তাদের কোনো অবস্থান নেই।

রাইসু : তাদের কি আমরা কূপমত্তুক বলবো?

আজফার : আমি তো তাদেরকে বলবো যে এক অর্থে কূপমত্তুক।

রাইসু : মানে কুয়ার ব্যাঙ?

আজফার : কুয়ার ব্যাঙ। নিজের কুয়ার ভেতরেই, নিজের কুয়ার ভেতরেই আটকে আছে।

রাইসু : নিজের কুয়ার ভেতরে নিজেরা নিজেদের চাষ করে?

আজফার : হাঃ হাঃ হ্যাহ হেঃ, কুয়োতে আটকে থাকা ব্যাঙ। আমরা যথেষ্ট মেটাফর ব্যবহার করছি এবং অ্যানিমেল কিংডম থেকে–প্রাণীজগত থেকে আমরা মেটাফর নিচ্ছি। অর্থাৎ পরিবেশবাদী একটা ব্যাপার আছে এর মধ্যে, আরেকটা হচ্ছে মানুষের চেয়ে প্রাণীর বেশ আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। আমরা প্রাণী হারাচ্ছি বলে দাপাদাপি করছি অন্যদিকে মানুষ প্রাণীতে রূপান্তরিত হচ্ছে। এদিকে প্রাণীর সংখ্যা বাড়ছে আর ওদিকে কমছে। প্রাণী যখন সত্যিকার অর্থে নেই তখন মানুষ প্রাণীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে। এটা কিন্তু এক ধরনের পরিবেশবাদী ভারসাম্য অর্জনের বাসনা হিসেবেও দেখা যায়। চারিদিকেই এখন যত না মানুষের উচ্চারণ, তার চেয়ে বেশি গোঁ গোঁ শুনতে পাই।

রাইসু : সেক্ষেত্রে দুই ধরনের মধ্যজীবী আমরা পেলাম। এক ধরনের হচ্ছে কুয়ার মধ্যে যারা নিজেদের চাষ করছেন, আর এক ধরন হচ্ছে বাদুড় হয়ে যারা ঝুলায়মান। একটা ভূদৃশ্য আমরা আঁকতে পারি যে–

আজফার : ওই ভূচিত্র আঁকার জন্যেই আমি দিচ্ছি পয়েন্ট।

রাইসু : একটা কুয়া আছে। নিচে ব্যাঙ একজন বসে আছেন। এবং পানি কম সেখানে বোধহয়। হাঁটু পানি–হাঁটু জল। এবং ওপরে তার গেছে একটা, সেখানে বাদুড় ঝুলে আছেন। এই বাদুড় যখন বুদ্ধিবৃত্তিতে পরিপুষ্ট হবেন তখন ঐ কুয়ার মধ্যে পড়ে যাবেন। এবং তিনি ব্যাঙ-এ রূপান্তরিত হবেন। এই হচ্ছে মধ্যজীবীর রূপান্তর। মেটামরফসিস অব এ মিডল্যাকচুয়াল।

আজফার : এবং কুয়াটাকে তাঁর পৃথিবী ভাববে। এবং ওখানে চাষ চলবে আর কি! ঐ সিলিন্ডার আকৃতির পৃথিবীটাকে সে সারা পৃথিবীর ওপর আরোপ করার চেষ্টা করবে।

রাইসু : এখন কথা হচ্ছে, আসল বুদ্ধিজীবীদের আমরা কীভাবে বুঝতে পারবো?

আজফার : আসল বুদ্ধিজীবী বেরিয়ে আসবে সমাজের নিম্নবর্গ শ্রেণী থেকে। লালন যেমন এসেছিলেন। যাকে আমি সত্যিকারের অর্থে আমাদের ইতিহাসের একজন অত্যন্ত বড় মাপের মানুষ হিসেবে দেখি। তাঁর ভাব তাঁর কাজ সমস্ত কিছু মিলিয়ে লালন একটা খুব বড় মাপের সাংস্কৃতিক সংগ্রামকে, নিম্নবর্গ শ্রেণীর সাংস্কৃৃতিক সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। এই সংগ্রামে তিনি যার বিরোধিতা করেছিলেন তা ছিলো উপনিবেশবাদ, সামন্তবাদ, সাম্রাজ্যবাদ। এগুলো হয়তো রেটরিক মনে হতে পারে, কিন্তু কতগুলো বাস্তবতা আছে সেগুলো ঘুরে-ফিরে আসতে বাধ্য। কেননা এসব বাস্তবতার বাইরে আমরা অবস্থান করছি না, সেহেতু আমাদের বাস্তবতার কথা বলতে গিয়ে এসব শব্দ ব্যবহার করতে হয়। এসব শব্দ মধ্যজীবীরাও ব্যবহার করে। কিন্তু মধ্যজীবীদের এইসব শব্দ ব্যবহারের সঙ্গে আমাদের এইসব শব্দ ব্যবহারে একটা পার্থক্য অবশ্যই আছে।

রাইসু : ওনারা মুখস্ত বলেন?

আজফার : হ্যাঁ, ওনারা মুখস্ত বলেন। এবং ওনারা যখন বলেন তখন ওটার মধ্যে পতিত হয়ে তারপর বলেন। যেমন আমি কিছুুদিন আগে দেখলাম একজন মধ্যজীবী, তিনি উপনিবেশবাদ এবং মধুসূদন এইসব বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলছিলেন। সেখানে দেখা যাচ্ছিল যে তিনি নিজেই উপনিবেশবাদের ভেতরে আটকে থেকে…

রাইসু : তিনি কোন ধরনের মধ্যজীবী?

আজফার : উনি বাদুড় হিসেবে ঝোলার পর গবেষণা-টবেষণা করে বাদুড় আর থাকতে পারেন নি, কুয়োতেই পড়েছেন। তো যে-কুয়ো থেকে কথা বলছিলেন তিনি সেটাই ছিলো একটা উপনিবেশ। Hollow । এবং সেখান থেকে প্রতিধ্বনি হয়। এবং আমি দেখছি ওপরে বসে সে কুয়া থেকে কে-একজন মত্ত দাদর মধুসূদন বিষয়ে বলছে। তো এ-ধরনের আছে। যে কথাটা আমি বলতে চাচ্ছিলাম যে লালন হচ্ছেন আমাদের অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল। গ্রামশী যাকে বলেছেন সেই অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়ালের এক অত্যন্ত উজ্জ্বল প্রমাণ। আমাদের অলিখিত নিম্নবর্গ শ্রেণীর ইতিহাসে একজন র‌্যাডিক্যাল বুদ্ধিজীবীর ভূমিকায় অবতীর্ণ। র‌্যাডিক্যাল এই অর্থে যে, সমাজের যে ক্লেদগুলো–কূপমণ্ডুকতা এবং সীমাবদ্ধতা, সংকীর্ণতা, ছোট ছোট বৃত্ত সমস্ত কিছুকে অতিক্রম করে গেছেন। তাঁর গানের ভেতর দিয়ে, তাঁর ভাবের ভেতর দিয়ে। তাঁর ভাবের বিশাল পৃথিবীর যে-শক্তি তার ভেতর দিয়ে। এবং সে ক্ষেত্রে লালন-এ একটা রাজনীতিও আছে অস্বীকার করা যায় না। তিনি যখন গান গান তখন একই সঙ্গে রাজনীতিও করেন। তাঁর গানের একটা অস্বাভাবিক রাজনৈতিক ক্ষমতা আছে। তাঁর রাজনৈতিক ক্ষমতা, তাঁর গান গাওয়ার ক্ষমতা, তাঁর ভাবের ক্ষমতা, সমস্ত কিছু তাঁকে যে সৃজনশীল বুদ্ধিজীবীর পর্যায়ে উন্নীত করেছে সেই বুদ্ধিজীবীর পর্যায়, বলাই বাহুল্য যে, আমাদের এই পর্যায় থেকে অনেক অনেক আলাদা। তো, আমাদের এখানে যতটা মধ্যজীবীদের কিাশ হয়েছে, পারভার্টেড ওয়েতে, ঠিক ততটা বুদ্ধিজীবীদের হয় নি। বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর বিকাশ, যে-অর্থে বুদ্ধিজীবী আমরা লালনকে বলবো, যে-অর্থে বিদ্যাসাগরকে বলবো, সেই অর্থে বুদ্ধিজীবীদের বিকাশ ঘটেছে তা বলা যাবে না। বরঞ্চ বুদ্ধিজীবীর নামে মধ্যজীবী সম্প্রদায়ের একটা বিকাশ ঘটেছে। অর্থাৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণীরই একটা বিকাশ ঘটেছে। এই বিকাশটা খুব পারভার্টেড বিকাশ। এবং এই বিকাশ এইভাবে ঘটার কারণে–ঐতিহাসিক কারণ–যে-কারণে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃৃতিক ক্ষেত্রে সৃজনশীল এবং ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন আমাদের ঘটে নি। আটকে আছে।

রাইসু : আপনি যে বললেন নিম্নবর্গ থেকে আসবে, এটা কীভাবে আসবে?

আজফার : নিম্নবর্গ শ্রেণীর যে জীবনবোধ, প্রকৃতির সঙ্গে তার যে সম্পর্ক, সাধারণ ইয়ের সঙ্গে তার যে সম্পর্ক, তার একটা ন্যাচারাল উইজডম থাকে। তো সেই উইজডমটা বিকশিত করার জন্য সেখান থেকে মেধাবী লোকরা বেরিয়ে আসতে পারে। যেমন, সাম্প্রতিককালে আমি আরেকজনের উদাহরণ দিতে পারি, তিনি হচ্ছেন আরজ আলী মাতুব্বর। আরজ আলী মাতুব্বরকে আমার রেনেসাঁস ম্যান মনে হয়। কিন্তু, আরজ আলী মাতুব্বর গ্রামের আমিন ছিলেন। লেখাপড়া নিজে নিজে করেছেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিলো না। অথচ তাঁর যে সত্যের সন্ধানে এটা পড়ে দেখলাম অসাধারণ, একটা অসাধারণ কাজ। আমাদের বস্তুবাদেরও যে বিকাশ ঘটেনি সেই শূন্যতাকে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন। আমাদের এখানে যে ভাববাদ এবং সেন্টিমেন্টের যে প্যাচপেচানি, দীর্ঘ সময় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভেতর দিয়ে আমরা যার চর্চা করেছি, সেখান থেকে অনেক দূরে তিনি। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর আগ্রহ। পেশায় একজন আমিন, কৃষকশ্রেণী থেকে আগত, কৃষকের সঙ্গে সারাজীবন মেলামেশা করেছেন। কিন্তু তাঁর যে উইজডম, তাঁর যে ইনসাইট এবং তাঁর যে আগ্রহের ক্ষেত্র–বিশাল, বিস্তৃত। তাঁর যে প্রভাব সে প্রভাবটা একটু একটু করে পড়তে শুরু করেছে, তরুণরা তাঁর ব্যাপারে আগ্রহী হচ্ছে।

রাইসু : এই আগ্রহের মধ্যে অনেকটা ফ্যাশনও আছে।

আজফার : ফ্যাশনের ক্ষেত্র হলেও একটা আগ্রহ তিনি তৈরি করতে পেরেছেন।

রাইসু : সেক্ষেত্রে ফ্যাশনের আপনি বিরুদ্ধে না?

আজফার : যে-ফ্যাশন আসলে মিনিংলেস–ফ্যাশনকে বোঝার দরকার। ফ্যাশন যেটা আসছে, কেন সে-ফ্যাশন আসছে, কী ধরনের ফ্যাশন আসছে–ফ্যাশন সম্পর্কে একটা ধারণার দরকার। কিন্তু আমি ফ্যাশনকে টোটালি রিজেক্ট করতে চাই না, যে, চোখ বন্ধ করে রাখলাম। ফ্যাশনকে বোঝার দরকার তার কারণকেও বোঝার দরকার। কিন্তু ফ্যাশন দ্বারা আক্রান্ত কিংবা চালিত হওয়া–সে ব্যাপারে আমার আপত্তি আছে।

রাইসু : আমাদের তরুণ যে বুদ্ধিজীবী সমাজটি গজিয়ে উঠছে, এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন?

আজফার : আমাদের তরুণ বুদ্ধিজীবী সমাজ গড়ে উঠছে নাকি?

রাইসু : গজিয়ে। গজিয়ে।

আজফার : গজিয়ে উঠছে বলে মনে হচ্ছে?

রাইসু : না, আপনার কী মনে হয়?

আজফার : তরুণরা মধ্যজীবী হওয়ার চেষ্টা করে অনেকেই, এবং তাদের ব্যাপারে আমার বক্তব্য হচ্ছে এই যে…

রাইসু : আপনি নিজেও তরুণ সমাজের একজন অংশীদার, মনে রাখবেন।

আজফার : হ্যাঁ, আমার নিজের পজিশানকেই আমি অনেক সময় ক্রিটিসাইজ করি। কেন করবো না?

রাইসু : হ্যাঁ, এই যে মধ্যবিত্ত তরুণ সমাজ আমরা–আমরা মধ্যবিত্ত তরুণ সমাজ তো?

আজফার : এটা তো একটা বলার ব্যাপার, সিগনিফায়ার, একটা চিহ্নায়ক। আমরা আলোচনার খাতিরে এই মুহূর্তে বললাম যে, হ্যাঁ আমরা মধ্যবিত্ত সমাজ। এ ছাড়াও তো আমরা আরো অনেক কিছু।

রাইসু : সেক্ষেত্রে আমাদের সামাজিক ভূমিকাটা কী হওয়া উচিত। লেখালেখির সঙ্গে আমরা যারা জড়িত। আমি আর আপনি অন্তত জড়িত; আলোচনার ক্ষেত্রেও এভাবে বলা যেতে পারে, আমাদের কাজটা কী হওয়া উচিত?

আজফার : আমি শুরুতে যে-প্রসঙ্গটা উল্লেখ করেছিলাম; আমাদের কমিটমেন্টটা জোরদার করা দরকার। আমরা যে লিখছি এই লেখার একটা অভিমুখ তৈরি করা দরকার। সেটির অভাবও অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা গেছে। অনেকেই বুঝতে পারছে না যে তারা কী নিয়ে লিখবে। এবং এই অঙ্গীকারটা একেজনের একেক পজিশান থেকে একেকভাবে আসে।

রাইসু : একধরনের বিভ্রান্তিমূলক অঙ্গীকার, ধরা যাক উত্তরআধুনিকতাবাদ নামে যে অঙ্গীকারটি এখন শোরগোল তুলছে, এটাকে আপনি কীভাবে দেখবেন?

আজফার : উত্তরআধুনিকতাবাদ সম্পর্কে আমার বক্তব্য পরিষ্কার করা দরকার। উত্তরাধুনিকতাবাদ নিয়ে আমি অনেকের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি। সবাই জিগ্যেস করে আমি উত্তরাধুনিকতাবাদী কিনা। আমি এরকম ঘোষণা কখনো দেই নি। আমার বক্তব্য হচ্ছে উত্তরাধুনিকতাবাদ এবং উত্তরাধুনিক-এর মধ্যে একটা তফাৎ রয়েছে। আধুনিকতাবাদ এবং আধুনিক এ দু’টো শব্দের মধ্যে যেমন তফাৎ রয়েছে। দেখা যাচ্ছে যে, শেক্সপীয়রের হ্যামলেট, যা ষোড়শ সপ্তদশ শতাব্দীতে রচিত, এখনও আমরা পড়ে এর সাম্প্রতিকতা, সমকালীনতাকে বুঝতে পারি, আমাদের অ্যাপিল করে, অন্তত আমার কাছে খুব অ্যাপিল করে।

রাইসু : মানে আপনি নৃ-তাত্ত্বিকভাবে এটা পড়ছেন না।

আজফার : হ্যাঁ, আমি নৃতাত্ত্বিকভাবে পড়ছি না। হোমারর ক্ষেত্রেও–হোমারের ইলিয়ড এইটথ সেঞ্চুরি বি.সি-তে রচিত; কিন্তু এই শতাব্দীর নব্বই-এর দশকে এসে আমি সেটা পড়ে অনেক কিছু খুঁজে পাচ্ছি। আমি রিলেট করতে পারছি তার সঙ্গে নিজেকে। কোনো কিছু কালোত্তীর্ণ হওয়া, শিল্পোত্তীর্ণ হওয়া এবং তার অ্যাপিলটা থাকার ভেতরে একটা আধুনিকতার ব্যাপার আছে। এবং সেই আধুনিকতা খুব পজেটিভ। আর আধুনিকতাবাদ বলে একটা জিনিস মুভমেন্ট হিসেবে এসেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে, এই বিংশ শতাব্দীতেও আমরা লক্ষ্য করি। এই মুভমেন্টটা যেভাবে তৈরি হয়েছে এবং সেই মুভমেন্টটার একটা অভিঘাত সাহিত্যে এবং সমাজে লক্ষ্য করি। একটা অনুকরণপ্রিয়তার ভেতর দিয়ে ঐ আধুনিকতাবাদের ঘোরের ভেতরে আমরা সাহিত্য চর্চা করি। এবং আমাদের একটা সাহিত্য আধুনিকতাবাদী সাহিত্য নাম নিয়েছে। সেই আধুনিকতাবাদ আমাদের যে বিশাল একটা ধারাবাহিক ইতিহাস আছে, ইতিহাসের যে পোটেনশিয়ালিটি আছে তার যে রাজনীতি আছে, তার যে সংস্কৃতি আছে তার থেকে আমাদের বিযুক্ত করেছে। বিযুক্ত করে একটা ‘নান্দনিক নয়া উপনিবেশ’ তৈরি করেছে। আমি এটাকে বলি ‘ইসথেটিক নিউ কলোনিয়ালিজম’–নান্দনিক উপনিবেশবাদ। এবং সেই উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে আমি যখন প্রশ্ন তুলি তখন কিন্তু আমি এমন একটা মুহূর্তকে ইনডিকেট এবং ইনিশিয়েট করি যেÑমুহূর্তকে আপেক্ষিকভাবে ‘উত্তরআধুনিকাবাদী মুহূর্ত’ বলা চলে। আমি যখন আধুনিকতাবাদ বলি এই আধুনিকতাবাদ কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে সত্য, আমাদের এখনে এই আধুনিকতাবাদ এসেছে, এই আধুনিকতাবাদ-এর বিকাশও ঘটেছে। আমাদের আধুনিকতাবাদ এনলাইটেনমেন্টের দোহাই পেড়েছে, এই আধুনিকতাবাদ তার নিজস্ব বলয় তৈরি করেছে, শক্তি তৈরি করেছে।এই আধুনিকতাবাদ আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন করেছে–আমাদের ইতিহাস থেকে সংস্কৃতি থেকে। এই আধুনিকতাবাদ ঐতিহাসিকভাবে সত্য। আমাদের ইতিহাসে যখন আমি এই আধুনিকতাবাদকে কোশ্চেন করি তখন একটা পোস্টমডার্নিস্ট মোমেন্ট, আমার পোস্টমডার্নিস্ট মোমেন্ট তৈরি হয়ে যায়। যদিও ‘পোস্টমডার্ন’ না, ‘পোস্টমডার্ন’ খুব হাস্যকর ব্যাপার মনে হয়। আমাদের তো সত্যিকার অর্থে অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক হওয়ারই বাকি। সেখানে উত্তরাধুনিক আমার কাছে খুব বিলাসী এবং অহেতুক একটা মিনিংলেস, হাস্যকর জিনিস মনে হয়। কিন্তু উত্তরাধুনিকতাবাদী মোমেন্ট’টা আমাদের ক্রিয়েটিভিটির স্বার্থেই জড়িত, এমনকি রাজনীতিক স্বার্থে। কারণ এই মডার্নিজম আমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বুদ্ধদেব বসু, সুধীন দত্ত এঁরা আমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। বুদ্ধদেব বসু, সুধীন দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে’র চেয়ে জীবনানন্দ অনেক এগিয়ে ছিলেন। তাঁর একটা বিশাল ইতিহাস তিনি ধারণ করতেন। ক্যানভাসটা অত্যন্ত বিস্তৃত। সেহেতু তিনি পেছনেও রিলেট করতে পারেন এবং এখনও আমাদের সঙ্গে রিলেট করতে পারেন। ঠিক মডার্নিস্ট না জীবনানন্দ দাশ। আমি খুব পরিষ্কারভাবে বলছি জীবনানন্দ দাশ মডার্নিস্টদের থেকে যেহেতু আগে অবস্থান করেন সেহেতু তিনি পোস্টমডার্নিস্ট; আবার যেহেতু তিনি এখনও অবস্থান করেন সেহেতু তিনি মডার্ন। মডার্ন এন্ড পোস্টমডার্ন, কিন্তু মডার্নিস্ট না। আমি আমাদের মডার্নিস্ট বলতে ঐ চারজনকে বোঝাবো এবং তাঁরা বিভিন্নভাবে ছোট ছোট বৃত্ত তৈরি করেছেন এবং এঁদের বিরুদ্ধে যখন আমরা কোশ্চেন করছি তখন কিন্তু আমাদের এই ভূ-খণ্ডে আমাদের নিজেদের যে পোস্টমডার্নিস্ট মোমেন্টগুলো ইনিশিয়েন্ট করছি এই মোমেন্টগুলো বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। কেউ ‘আমি উত্তরআধুনিকতাবাদী হবো’ বলে কবিতা লেখা শুরু করলো–এটা একটা হাস্যকর ব্যাপার।

রাইসু : সেক্ষেত্রে নিজেকে পোস্ট মডার্নিস্ট বলার কোনো কারণ নেই?

আজফার : মডার্নিজমকে কোশ্চেন করে নতুন কিছু যদি করার চেষ্টা করি তো সেটাতে একটা পোস্টমডার্নিস্ট মোমেন্ট আমরা ইনিশিয়েট করবো, পোস্টমডার্নিস্ট একটা রিয়েলাইজেশন আমরা আনছি সামনে। এই।

ঢাকা, ৩০/০৬/১৯৯৫

বাংলাবাজার পত্রিকার ৬/১০/১৯৯৫ সংখ্যা সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত

bratya.raisu@bdnews24.com

—-
ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters


2 Responses

  1. mansur aziz says:

    বারবার মধ্যজীবী আর বুদ্ধিজীবী বলে একটা প্যাচানো সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে। তবে এ কথার সাথে আমি একমত যে আমরা যেখানে এখনও আধুনিকতাটাকেই রপ্ত করতে পারিনি সেখানে উত্তরাধুনিক নিয়ে গোলকধাঁধা পাকানোর কোন মানে হয় না।

    তবে সমাজের জন্য যেখানে বুদ্ধিজীবীরা কল্যাণের বয়ান করবেন সেখানে তারা নিজেদের অপ্রচলিত জ্ঞানের সবক দিয়েই ক্ষ্যান্ত হন। তারা যদি সাধারণ মানুষের কথা শুনতেন আর বলতেন কম তবে হয়তো বা আমাদের নিরন্ন মানুষের জন্য ভাল কিছু বয়ে আনতে পারতো।

  2. কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর says:

    বুদ্ধিজীবীর উপর আলোকপাত করা সাক্ষাৎকারটি বেশ মজাদার, প্রয়োজনীয়, ভাবনাসঞ্চারী। সাক্ষাৎকার যে পরস্পর ব্যক্তিত্ব নির্মাণের এক প্রয়াস তা এতে বেশ জ্যান্ত ছিল। এতে সময় চেনা যায়, মধ্যবিত্তের সচল ভাবনা নিয়েও ভাবনায় পড়তে হয়। আজফার হোসেন আর ব্রাত্য রাইসু যে ভাবনায় কত আধুনিক আর প্রয়োজনীয় চৈতন্যের ধারক তাও বোঝা গেল। এধরনের বিষয়-আশয় আমরা আরও আশা করতে থাকব।

    কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর
    চট্টগ্রাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.