জ্যঁ ফ্রাসোয়া লিওতার

উত্তরাধুনিক অবস্থা*

আহমেদ জাভেদ চৌধুরী রনি | ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ ৬:৪৭ অপরাহ্ন

অনুবাদ : আহমেদ জাভেদ চৌধুরী রনি

আমার লেখার উদ্দেশ্য হলো সবচেয়ে উন্নত সমাজের জ্ঞানের অবস্থা পর্যালোচনা করা। ‘উত্তরাধুনিক’ কথাটা আমি ব্যবহার করবো অবস্থাটিকে ব্যাখ্যা করার জন্যে। শব্দটি মার্কিন মুল্লুকের সমাজবিজ্ঞানী ও সমালোচকরা lyotard.jpg……..
জ্যঁ ফ্রাসোয়া লিওতার (১৯২৪-১৯৯৮)
…….
আকছার ব্যবহার করেন। এটি ব্যবহার করা হয় আমাদের সংস্কৃতির সেসব পরিবর্তন বোঝাতে যেগুলো উনবিংশ শতাব্দির শেষভাগ থেকে বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শিল্পকলার মূল-নিয়ন্ত্রক সূত্রগুলো (Game rules) পাল্টে দিয়েছে। আমার লক্ষ্য হলো এ-পরিবর্তনগুলোকে আখ্যান (Narratives) রচনার সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করা।

বিজ্ঞানের সঙ্গে আখ্যানের সবসময়ই দ্বন্দ্ব চলছে। বিজ্ঞানের মাপকাঠি দিয়ে বিচার করলে অধিকাংশ আখ্যানই রূপকথায় পরিণত হবে। কিন্তু যখন বিজ্ঞান কেবলমাত্র প্রয়োজনীয় নিয়ম-কানুনগুলো উল্লেখ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না-থেকে সত্যের খোঁজ করে, তখন নিজের নিয়ম-কানুনগুলোকে (game rules) সে বৈধতা দেয়ার বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়ে। ফলে তার অবস্থানকে বৈধতা দেয়ার জন্যে একটি প্রতর্কের (Discourse) জন্ম দেয় যার নাম ‘দর্শন’। ‘আধুনিক’ কথাটাকে আমি ব্যবহার করবো সেইসব বিজ্ঞানকে বোঝাতে, যারা অন্য একটা মেটাডিসকোর্স/‘বড়-গল্পে’র (Metadiscourse) মধ্যে দিয়ে নিজের অবস্থানকে বৈধতা দেয়। মেটাডিসকোর্সগুলো কোনো না কোনো ধরনের মহা-আখ্যানের (Grand Narrative) দোহাই দিয়ে এসব বিজ্ঞানের বৈধতায় মদদ দেয়। যেমন, দ্বান্দ্বিক-যুক্তিবাদ (Dialectics of Reason), শব্দার্থের তাফসীর (Hermeneutics of Meaning), যুক্তিবাদী কিংবা পেশাধারী প্রজার (Working Subject) মুক্তির স্বপ্ন অথবা সম্পদ-সৃষ্টির মহা-আখ্যানগুলোর দোহাই প্রায়ই দেয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, কোন বক্তব্য লেখার ক্ষেত্রে প্রেরক ও প্রাপকের মধ্যে সত্যাসত্য নিয়ে ঐকমত্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় যখন দুজনই যুক্তি-বুদ্ধি সম্পন্ন; এটি হলো একটি এনলাইটেনমেন্টের আখ্যান। যেখানে জ্ঞানের নায়ক কাজ করে একটি সু-নীতি ও সু-রাজনীতির পক্ষে, বিশ্ব শান্তির লক্ষ্যে। উল্লিখিত নমুনা থেকে সহজেই বোঝা যায়, এমন মহা-আখ্যান যদি ইতিহাস চিন্তায় আরোপিত হয়ে জ্ঞানকে জায়েয করার কাজ করে, তখন সামাজিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থানের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এগুলোকে অবশ্যই বৈধ হতে হবে। এভাবেই মহা-আখ্যানের কাছে সত্যের মতো ন্যায় বিচারও হাত-পা বাধা।

সোজাভাবে বললে, ‘উত্তরাধুনিকতা’কে এক কথায় মহা-আখ্যানের (Metanarratives) বৈধতার বিষয়ে সন্দেহ বলা চলে। নিঃসন্দেহে এ প্রশ্ন বিজ্ঞানের প্রগতিরই একটি ফল, তবে এ-প্রগতিও কিন্তু নিজেকে স্বতঃসিদ্ধ মনে করে। বৈধতা প্রতিষ্ঠার মহাবয়ানের কল-কব্জাগুলো (Apparatus) লক্ষণীয়ভাবে অধিবিদ্যক-দর্শন ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর আস্থা রেখেছিলো অনেক আগে থেকেই। আর তখন আখ্যান-কর্ম তার কামলাদের হারাতে শুরু করেছে; মহা সব নায়ক, সংকট, অভিযান, লক্ষ্য–এর সব কিছুকেই। প্রতিটি আখ্যানের ভাষার মেঘমালায় এরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে–আখ্যানমূলক অথচ প্রতীকী, বিধানসমেত ও বর্ণনামূলক। যে স্তরগুলো নানান চাহিদাকে সামাল দেয়ার জন্যেই তৈরি হয়েছে। আমরা এগুলোর ছেদবিন্দুতে বসবাস করি। যাই হোক, আমরা ভাষা ও সম্পদের (মেকী) ভারসাম্য রক্ষা করতে চাই না।

এভাবেই ভাবি সমাজ নিউটনীয় নৃবিজ্ঞানের (যেমন কাঠামোবাদ অথবা বিষয়ভিত্তিক তত্ত্ব) চেয়ে বরং ভাষার প্রয়োগতত্ত্বের দিকেই বেশি ঝুঁকে আছে। ভাষার নানা খেলার (Game) মধ্যে পরস্পরবিরোধী উপাদান বিদ্যমান। এরাও প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়, তবে বিক্ষিপ্তভাবে–স্থানিকতায় বা লোকাল ডিটারমিনিজমের মধ্যে।

সমাজপতিরা কিন্তু সমাজায়নের মেঘগুলোকে দেয়া-পাওয়ার ছকে সামলাতে চান, তারা ভাবেন, তাদের চিন্তা ও যুক্তি সমগ্রকে ধারণ করতে সক্ষম। এরাই আমাদের জীবনের গতিপথ ঠিক করে দেয়, তাতে ক্ষমতার জাল বিস্তারে সুবিধা হয়। সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা ও বৈজ্ঞানিক সত্য উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষমতার বৈধকরণের রাস্তা কিন্তু একই। প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ও সুনিপুণ ব্যবহার, প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা। এ ক্রীড়ার প্রয়োগে খানিকটা সন্ত্রাসেরও প্রয়োজন পড়ে–কঠোর বা নরম, প্রকাশ্যে বা গোপনে। সর্বোচ্চ কর্মদক্ষতার যুক্তি নিঃসন্দেহে নানান দিক থেকে অসঙ্গতিপূর্ণ, বিশেষ করে আর্থ-সামাজিকতার পরস্পরবিরোধী প্রেক্ষাপটে, যখন সে বেশি বেশি কাজ দাবি করে অথচ সময় দেয় কম।

এ ধরনের অসামঞ্জস্যের মধ্যে আমরা মুক্তি আশা করতে পারি না, যেমনটা মার্কস করেছিলেন। সন্দেহ বলতে এটাই বোঝাতে চাচ্ছি।

এখনও উত্তরাধুনিক দুনিয়া (Postmodern Condition) নির্মোহ আগন্তুকের মতো সবকিছু বাতিল করার মূঢ়তা দেখায় না, কিংবা অ-বৈধকরণের (Delegitimation) প্রক্রিয়ার ব্যাপারেও গোড়া নয়। তাছাড়া মহা-আখ্যানগুলোর পর বৈধতার জন্যে আর খালি জায়গা কই? দৈনন্দিন কার্য-প্রণালী কৃৎকৌশলের ব্যাপার মাত্র, যার সাথে ন্যায্যতা ও সত্যাসত্য বিচারের কোনো যোগ নাই। বৈধতা কি শুধুমাত্র আলাপ-আলোচনার ঐকমত্যের মধ্যেই পাওয়া যাবে; যেমনটা য়ূরগেন হাবেরমাস (Jürgen Habermas) ভাবেন? এমন মতৈক্য ভাষার পরস্পরবিরোধী খেলাকে স্তব্ধ করে দেয়। আর তর্ক ছাড়া কোনো আবিষ্কার আবিষ্কার হয় না। উত্তরাধুনিক জ্ঞান কোনো ক্ষমতাবানের (Authorities) হাতিয়ার নয়। বরং পার্থক্যগুলোকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য করে, কাজেই ভিন্নতার প্রতি আমাদের সহনশীল হতে বলে। তাই আমাদের মূলনীতি গবেষকদের সমরূপতায় নয় বরং তাদের বিচিত্রতায় নিহিত।

তাহলে প্রশ্ন হলো : সামাজিক বন্ধন কিংবা ন্যায্য সমাজ প্রতিষ্ঠা কি পরস্পর বিরোধী বৈজ্ঞানিক ক্রিয়াকলাপের মধ্যে সম্ভব? তাহলে এ ধরনের অসামঞ্জস্যের কী হতে পারে?…

উনবিংশ শতাব্দির শেষভাগে যেসকল চিহ্নের মাধ্যমে বিজ্ঞান-নির্ভর-জ্ঞানের ‘সংকট’ ধরা পড়েছে, সেগুলো কিন্তু তার বুদ্ধির কারণে ধরা পড়েনি বরং কৃৎকৌশল ও পুঁজিতন্ত্রের বিস্তারের কারণেই তা হয়েছে। এটি জ্ঞানের বৈধতার জমিনে অন্তর্গত ক্ষয়কেই প্রকাশ করে। ভাবনামূলক ক্রীড়ার (speculative game) একেবারে অন্দরমহলেই পচন। তার প্রতিটি খোপের ঠাঁস বুনটের জাল উত্তরাধুনিকতা হালকা করে দেয়।

ধ্রুপদী বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রের ভেদরেখা নিয়ে তাই প্রশ্ন উঠেছে। ক্ষেত্রগুলোর সীমানা ভাঙতে শুরু করেছে, সীমানাগুলো একাকার হয়েছে, ফলে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। শিক্ষার প্রাধান্য পরম্পরা (Hierarchy) ভেঙে চোখের সামনে ‘সমতল’ পরিসরকে উন্মুক্ত করে। অথচ প্রতিটি খোপ নিয়তই আবর্তনশীল। পুরোনো ‘জ্ঞানের অনুষদগুলো’ টুকরো টুকরো হয়ে নানান প্রাতিষ্ঠানিক কাজে লেগে গেছে আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভাবনামূলক জ্ঞানের বৈধতা হারিয়েছে। দায়িত্বজ্ঞানহীন নির্লজ্জ গবেষণা (যা ভাবনামূলক-আখ্যানের সঙ্গে যুক্ত) নিজেকে প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানের ধারার কাছে সঁপে দিয়েছে। আর শেখানোর ছলে চিন্তাশীল-গবেষক তৈরির বদলে বক্তৃতাবাজ প্রফেসরদের প্রতিকৃতি তৈরি নিশ্চিত করেছে। এ ব্যাপারটিকেই নিৎশে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন ও নিন্দা করেছেন।

বৈধকরণের অন্য একটা ক্ষয়িষ্ণু জায়গা হলো, মুক্তির হাতিয়ার প্রশ্নে এনলাইটেনমেন্ট ভাবনামূলক প্রতর্কের (speculative discourse) সাথে বড় কোনো তফাৎ দেখাতে পারেনি। যদিও নানা দিকে সে দৃষ্টি দিয়েছে। সামাজিক, নৈতিক ও রাজনীতির অনুষদগুলোর বিচিত্র সংলাপের ভেতর বিজ্ঞান তার সত্যতার বৈধতা খুঁজে পায়। বৈধতার এ-ধরনের বিন্যাসের ঘূর্ণায়মান বিপদ সম্পর্কে একটু আগেই আমাদের ধারণা হয়েছে যে, সংখ্যা দিয়ে লেখা কোন সমীকরণ ও যুৎসই কোনো বাক্যের মধ্যে সম্পর্ক আছে। ফলে তারা পরস্পর তুলনাযোগ্য। যদি একটি বাক্য বাস্তব অবস্থাকে বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে আনে সেখানে নিতান্তই পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রতিফলন থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। এমন হলে বাড়তি আর কী প্রমাণের দরকার পড়ে?

উদাহরণস্বরূপ, একটা বন্ধ দরজার কথা বলা যায়। যুক্তিমতে ‘কপাট বন্ধ’ ও ‘কপাট খোলা’–এ দু’টি কথার মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক নাই। বাক্য দুটো স্বতন্ত্র ধারাবিধির মধ্যে পড়ে যার প্রাসঙ্গিকতা ভিন্ন রকমের। এখানে একদিকে তাত্ত্বিক ও অন্যদিকে ব্যবহারিক যুক্তি–এ দুটো ভাগের ফলে বৈধতার বৈজ্ঞানিক প্রতর্ক প্রশ্নের মুখোমুখি হলো। সরাসরি নয় বরং ঘুরতি পথে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, পুরো বিষয়টা নিয়ম-কানুন সমেত ভাষার খেলা। যেমন, এক ঝলকে কান্টের আদিশর্তের (a priori) ধারণা। বাস্তব জীবন-যাপন পরিচালনার জন্য বিজ্ঞানের বিশেষ কোনো কেরামতি নাই। সুতরাং বিজ্ঞানের নিয়ম-কানুনও অন্য সবার সাথে একই কাতারে দাড়িয়ে আছে।

অ-বৈধকরণের (Delegitimation) প্রক্রিয়াটি যদি অল্প-বিস্তর চালানো যায় তবে উত্তরাধুনিকতার সম্ভাবনাময় দুয়ার উন্মুক্ত হয় (যেমনটি হ্বিটগেনস্টাইন তার মতো করেছেন, আর মার্টিন বুবার ও ইমানুয়েল লেভিনাদের মতো চিন্তাশীলরা যা করে গেছেন) । বিজ্ঞান তার ছক কাটা খেলাই খেলছে; অন্য সব ভাষার ক্রীড়াকে বৈধতা দিতে সে অপারগ। অন্তত অন্যের প্রতি নির্দেশমালা তো কিছুতেই তার নিয়ম-কানুনের মধ্যে পড়ে না। সবচেয়ে বড় কথা হলো সে তার নিজেকে বৈধতা দানে অক্ষম। যদিও ‘দার্শনিক’ ভাবনাগুলো তা-ই মনে করে।

সমাজের প্রজারা ভাষার ক্রীড়ার ব্যবচ্ছেদের মধ্যে নিজেকে গুলিয়ে ফেলে। সামাজিক বন্ধন মানেই ভাষার কারবার, কিছুতেই একটি মাত্র যোগসূত্রের বিষয় নয়। চাদরটা তৈরিতে কমপক্ষে দুটো (আসলে বাস্তবে অগুনতি) আলাদা ধরনের নিয়ম-কানুনের ভাষা দরকার। হ্বিট্গেনস্টাইনের লেখায় : ‘আমাদের ভাষাকে পুরোনো শহরের মতো দেখায়। যেখানে সাদা-কালো, সরু রাস্তা ও চক্কর রয়েছে। রাস্তার দু’ধার দিয়ে নতুন ও পুরাতন মিলিয়ে কয়েক’শ বছরের চিহ্ন এবং পাশাপাশি নতুন ঝকঝকে প্রশস্ত রাস্তা এবং আবাসিক এলাকাও আছে’। তাহলে সবকিছু সমন্বিতকরণের কিংবা জ্ঞানের মেটাডিসকোর্সের আওতায় এসবের সমন্বয় অসম্ভব। তিনি ‘শহর’কে কর্তা হিসাবে বাক্যটা লিখে উল্টো প্রশ্ন করছেন : ‘কতোটা রাস্তাঘাট দালানকোঠা হলে নগরকে নগর বলা চলে?’

পুরোনো ভাষার গায়ে নতুন শব্দ যোগ হয়ে পুরোনো এলাকা শহরতলীতে রূপ নিচ্ছে : ‘রসায়নের প্রতীক এবং ক্যালকুলাসের অসীম চিহ্নের মতো’। আজ পয়ত্রিশ বছর পর এই তালিকায় যোগ করতে পারি: যন্ত্রের ভাষা, নিয়ম-কানুনের তাত্ত্বিক মেট্রিক্স, সঙ্গীতের নতুন নোট, যুক্তি অনির্দেশক চিহ্ন ব্যবস্থা, জীনতত্ত্বের কোড, উচ্চারণ কাঠামোর গ্রাফ ইত্যাদি।

এ ধরনের খুচরা মন্তব্যে আমাদের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হতে পারে। এসব ভাষা নিয়ে কেউ কোনো আওয়াজ দিচ্ছেন না, বলছেন না যে সার্বজনীন মহা-ভাষা (Metalanguage) বলে আসলে কিছুই নেই। নিরপেক্ষ কর্তা-ব্যবস্থা (System-Subject) মুখ থুবড়ে পড়েছে, মুক্তির লক্ষ্যের সাথে বিজ্ঞানের কোন সম্পর্ক নাই। আমরা সবাই ইতিবাচকতার ফাঁদে আটকে গেছি। শিক্ষার খোপীকরণ ও এলেমদাররা যেখানে নিজেদের বিজ্ঞানী ফলাচ্ছেন, গবেষণার কাজ বাক্সবন্দি হয়ে মুখ থুবড়ে ছিটকে পড়েছে ও এমনভাবে ভাগ হয়ে গেছে যে কোনো একজনের পক্ষে সবগুলোর আত্তীকরণ একেবারেই অসম্ভব।ভাবনামূলক কিংবা মানবিক দর্শনকে বৈধতার কাজ থেকে সরে আসতে বাধ্য করা হয়েছে। কাজেই দর্শন সংকটের মধ্যে পড়েছে। যখনই সে বৈধতার কাজটা করতে গেছে তখনই তাকে কান ধরে যুক্তিবাদ কিংবা চিন্তার ইতিহাসের ফাঁক-ফোকড় খোঁজার কাজে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে, ফলে তার আত্মসমর্পণ খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।

গেল শতাব্দির গোড়া থেকে ভিয়েনা সার্কেল এসব নেতিবাচকতার ফাঁদ সম্পর্কে সতর্ক ছিলো। শুধু মুজেল, ক্রাউস, হফম্যানস্থাল, লুস, সোয়েনবার্গ ও ব্রোচরাই নন, মাখ আর হ্বিটগেনস্টাইনের মতো দার্শনিকরাও এই কাতারে ছিলেন।১০ তারা তাত্ত্বিক ও শৈল্পিকভাবে অ-বৈধকরণের কাজটিকে যতদূর সম্ভব টেনে নিয়ে গেছেন। এ মুহূর্তে আমরা বলতে পারি (মৃত বৈধতার) শেষকৃত্যানুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। তাকে আর কবর থেকে তুলে আনার দরকার কী? হ্বিটগেনস্টাইনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো তিনি ভিয়েনা সার্কেলের তৈরী প্রত্যক্ষবাদের (Positivism) দিকে মুখিয়ে থাকেননি।১১ বরঞ্চ অনুসন্ধান করে দেখিয়েছেন ভাষার নিয়ম-কানুনগুলোর বৈধতা তার ক্রিয়াকলাপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়নি। উত্তরাধুনিক দুনিয়া এটাই বলতে চাচ্ছে। অধিকাংশ মানুষেরই অবশ্য আখ্যান-স্মৃতিকাতরতার বাতিক আছে। তার মানে এই নয় যে, তারা কোনো না কোনোভাবে বর্বরতার মধ্যে পড়েন। তাদের নিজস্ব আলাপ-আলোচনা, তর্ক ও চর্চার উপলব্ধিগত জ্ঞান তাদের বাঁচিয়ে দিবে। এখান থেকেই কেবল বৈধতার প্রশ্ন উঠে আসতে পারে। বিজ্ঞান অন্যসব বিশ্বাসগুলোর দিকে তাকিয়ে ‘শ্মশ্রুমণ্ডিত মুচকি হেসে’ বাস্তবতার খট্খটে জমিন সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করে তুলেছে।১২

* লেখাটি Jean-Francois Lyotard-এর The Postmordern Condition (University of Minnesota Press, 1984) বইয়ের অংশরূপ।

তথ্যনির্দেশ

১. মহা-আখ্যান (Grand Narrative/Metanarrative) : খৃষ্টবাদ, মার্কসবাদ, হেগেলবাদ–এসবই গল্প। আমরা যেমন বলি ‘তুমি আমাকে দারুণ ‘গল্প’ শোনালে’–অনেকটা এই অর্থে গল্প। যেমন খৃষ্টবাদের ‘গল্প’টি কী? আদম-হাওয়া স্বর্গচ্যুত হলেন ‘পাপ’ করে। অতএব পৃথিবীতে পাঠানো হলো ভালো কাজ করে, অনুশোচনা করে, পাপমোচন পর্ব পার হয়ে শেষমেশ স্বর্গ পুনরুদ্ধার হবে। লিওতার বলছেন, এমনিভাবে ‘এনলাইটেনমেন্ট’ও একটি ‘গল্প’–সবাই যুক্তি মেনে কাজ-কর্ম করবেন, ফলে সমগ্র বিশ্বে শান্তির সু-বাতাস বইবে। –অনুবাদক।

২. ফ্রেডরিখ নিৎশে (Friedrich Nietzsche), রচনাসমগ্র, ‘অন দি ফিউচার অফ আওয়ার এডুকেশানাল ইন্স্টিটিউশানস’ (‘On the Future of our Educational Institutions’) তৃতীয় খণ্ড, ক্রম ৩৫।

৩. মার্টিন বুভার (Martin Buber), ‘ইখ্ উন্ড ডু’ (Ich und Du) বার্লিন : শকেন ফেরলাগ, ১৯২২ (Berlin: Schocken verlag, 1922) এর ইংরেজী অনুবাদ- রোনাল্ড জি স্মিথ [Ronald G. Smith], ‘আই এন্ড দাও’ (I and Thou) (New York: Charles Scribner’s Son’s,1937)], ইমানুয়েল লেভিনা (Emmanuel Levinas), ‘তোতালিত এ এফিনিত’ (Totalite et Infinite) (The Hagie: Niihoff, 1961) ‘মাখ্তিন বুভার উন্ড ডি এরকেন্টনিসথেওরি’ (‘Martin Buber und die Erkenntnistheorie’) (১৯৫৮), ‘ফিলোসোফেন ডেস্ ২০, ইয়ারহুন্ডার্টস্’ (Philosophen des 20. Jahrhunderts)কোলহামার (Kohlhammer), ১৯৬৩, ফরাসী অনুবাদ, ‘মাখ্তিন বুভার এ লা তেওরি দো লা কনেসন্স’ (‘Martin Buber et la theorie de la connaissance’), ‘নম প্রোপ’ (‘Noms Propres), ‘মতো পেইয়ে: ফাতা মখগানা’ (Montpellier: Fata Morgana), ১৯৭৬.

৪. লাড্ভিগ হ্বিট্গেনস্টাইন (Ludwig Wittgenstein), ‘ফিলোসফিকাল ইনভেস্টিগেশানস’ (‘Philosophical Investigations’), অনুচ্ছেদ ১৮, পৃ: ৮।

৫. প্রাগুক্ত ।

৬. প্রাগুক্ত।

৭. দেখুন, ‘লা তাইলোহিজাসিঁও দো লা হোশ্যাকস’ (‘La taylorisation de la recherche’) ক্রিতিক দো লা সিওন্স (critique de la science) ক্রম ২৬, পৃষ্ঠা-২৯১-৯৩। বিশেষত : ডি জে দো সোলা প্রাইস (D. J. de Solla Price) এর ‘লিটল সাইন্স, বিগ সাইন্স’ (Little Science, Big Science) নিউ ইয়র্ক, কলাম্বিয়া ইউনিভাসিটি প্রেস, ১৯৬৩। বইটিতে জোর দিয়ে লেখক বলেছেন, অল্প সংখ্যক গবেষক নিয়ে তৈরী ছোট্ট অথচ দক্ষ-গবেষকদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বড় কিন্তু কম-দক্ষ দলটির (দক্ষ/কম-দক্ষের হিসাব পাবলিকেশানের ভিত্তিতে করা) সদস্য সংখ্যা আগের দলটির দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর দক্ষ-দলটির সংখ্যা বেড়েছে, তবে প্রতি ২০ বছর পর। দেখুন, পৃ: ৫৯। প্রাইস বলছেন, একজন ‘নিবেদিত প্রাণ সত্যিকারের বিজ্ঞানী’ সাধারণ মানের বিজ্ঞানীর চেয়ে ১০০ বছর এগিয়ে থাকেন। পৃ. ৫৬।

৮. জে টি দেশান্তি (J. T. Desanti), ‘ছুখ লো হাপোকত্ ত্রাডিসিওনেল দে সিওন্স এ দো লা ফিলোজফি’ (Sur le rapport traditionnel des sciences et de la philosophie) ‘লা ফিলোজফি সিলন্তিউজ উ ক্রিতিক দে ফিলোজফি দো লা সিওন্স’ (La Philosophie silentieuse, ou critique des philosophies de la science) (Paris: Seuil, ১৯৭৫).

৯. মানবিক বিজ্ঞানের শাখা হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক দর্শনের পুনঃ শ্রেণিকরণের প্রভাব শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠানের গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আমার মনে হয় না বৈধকরণ-দোষের ফাঁদে ফেলে দর্শনকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া সম্ভব। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে এর বন্ধনের জায়গাগুলো চিহ্নিত না করে কিংবা সংযোগস্থলগুলো খুটিয়ে না দেখে কিংবা নিজেকে নতুন করে না সাজালে কোনোভাবেই এগোতে পারবে না। এ বিষয়ে দেখুন, ‘প্রোজে দ্যাঁ এস্তিতুত পলিতেকনিক দো ফিলোজফি’ (Project d’un institut polytechnique de philosophie ) দোপাক্তমো দো ফিলোজফি, ইউনিভাকছিতি দো পাখি, (VIII) (উইত) (Department de philosophic, University de Paris ) ১৯৭৯.

১০. দেখুন, এ্যালেন জানিক (Allan Janik) ও স্টিফেন টলমিন (Stephan Toulmin) , ‘হ্বিটগেনস্টাইনস ভিয়েনা’ (‘Wittgenstein’s Vienna ’) নিউইয়র্ক ১৯৭৩, এবং জে পিয়েল(J. Piel), সম্পাদিত ‘ভিয়েন দেবু দ্যাঁ সিয়েকেল’, “Vienne début d’un siécle,” ক্রিতিক (Critique) (১৯৭৫), পৃ: ৩৩৯-৪০।

১১. দেখুন, য়ুরগেন হাবেরমাস (Jurgen Habermas), ডগমাটিসমুস, ফারনূনফ্ট উন্ড এন্টশাইডুঙ-ৎসু থেওরি উন্ড প্রাক্সিস ইন ডেয়ার ফেরভিসেনশাফ্টলিখেন সিভিলিজাৎসিওন’ (Dogmatismus. Vernunft und Entscheidung – Z u Theorie und Praxis in der verwissenschaftlichen Zivilisation) ১৯৬৩, ‘থেওরি উন্ড প্রাক্সিস’ (Theorie und Praxis) বেকন প্রেস, বোস্টন, ১৯৭১।

১২. ‘এরিস্টটল ইন এনালিটিক্স’ (c.330 BC), দেকার্ত, (Regulae ad directionem ingenii) ১৬৪১ প্রিনসিপ দো লা ফিলোজফি (Principes de la philosophie) (১৬৪৪). জন স্টুয়ার্ট মিল (John Stuart Mill) ‘সিস্টেম অফ লজিক’ (System of Logic) (১৮৪৩)

ronieleo@gmail.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অদিতি ফাল্গুনী — ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০০৮ @ ১:৩১ অপরাহ্ন

      জাভেদকে অনেক ধন্যবাদ এই জরুরি বইটির অংশ বিশেষ হলেও বাংলা ভাষায় অনুবাদ করার জন্য। অনুবাদ প্রাঞ্জল ও চিত্তাকর্ষক হয়েছে। গোটা বইটি অনুবাদের একটি প্রয়াস সাহস করে নিয়ে ফেললে বাংলা ভাষার পাঠকেরা আপনার কাছ হতে খুব উপকৃত হবে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফেরদৌস আলম তাজ — অক্টোবর ৮, ২০১০ @ ১২:৫৬ পূর্বাহ্ন

      লেখ্ককে ধন্যবাদ।
      http://www.marxists.org/ এর বাংলা বিভাগে যোগ করার কথা ভাবতে পারেন। মূল রচনার অংশ বিশেষ ইংরেজিতে ঐখানে আছে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com