অনুবাদ, স্মৃতি

লুসি কালানিথি: বৈধব্য আমার যুগল জীবনের সমাপ্তি টানেনি

reshmi_nandi | 1 Mar , 2017  

paulপল কালানিথি, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির নিউরোসার্জিকাল বিভাগে। ২০১৩ সালের মে মাসে তাঁর ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়ে। বেঁচে ছিলেন আরো বছর দুয়েক। ২০১৫ সালে মার্চ মাসে মারা যাবার আগ পর্যন্ত একজন রোগী হিসেবে এই চিকিৎসক মৃত্যুর দিকে তাঁর যাত্রা অভিজ্ঞতার কথা লিখে গেছেন যা তাঁর মৃত্যুর পর “When Breath Becomes Air” নামে প্রকাশিত হয়। তাঁর স্ত্রী লুসি কালানিথি, যিনি নিজেও একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লিনিকাল একসিলেন্স রিসার্চ সেন্টারে কর্মরত, বইটির পরিশেষ অংশে লেখেন তাঁর প্রিয় হারানোর বেদনা আর মৃত পলের হাত ধরে জীবনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা। লেখাটি অনুবাদ করেছেন রেশমী নন্দী।

গত মার্চে (মার্চ, ২০১৫) মাত্র ৩৭ বছর বয়সে আমার বর মারা যাওয়ার পর আমি শোকে এতটাই মূহ্যমান পড়েছিলাম যে দিনের পর দিন ঘুমাতে পারতাম না। সান্তাক্রুজ পাহাড়ের উঁচু মাঠে ওর যেখান সমাধি, একদিন বিকেলে সেখানে গেলাম। প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে ঘুরেও না তাকিয়ে শুয়ে পড়লাম ওর সমাধির উপর। অনেকদিন পর গভীর ঘুমে ঢলে পড়লাম। চারপাশের প্রকৃতি নয়, অশান্ত আমাকে শান্ত করেছিল পল যে ওখানেই ছিল, মাটির নীচে। ওর শরীরকে কত সহজে মনে করতে পারছি- রাতের বেলা ওকে ছুঁয়ে শুয়ে থাকা, আমার মেয়ের জন্মের সময় ওর যে নরম হাতগুলো জোরে চেপে ধরেছিলাম সেগুলো, ক্যান্সারে শুকিয়ে যাওয়ার পরও মুখের উপর ওর তীক্ষ্ন চোখ — তবুও কি কঠিন ওকে ছোঁয়া। তার বদলে মাটিতে গাল লাগিয়ে আমি ঘাসের উপর শুয়েছিলাম।
ওর সাথে পরিচয়ের পর থেকেই আমি ওকে ভালবাসতাম। ২০০৩ সালে আমরা তখন মেডিকেলের শিক্ষার্থী। ও ছিল এমন একজন যে সত্যিকার অর্থেই মানুষকে হাসাতে পারতো ( স্নাতক পড়াকালীন গরিলার পোষাক গায়ে দিয়ে ও লন্ডনে ঘুরে বেড়িয়েছিল, বাকিংহাম প্যালেসে গিয়ে ছবি তুলেছিল, টিউবে চড়েছিল)। কিন্তু একই সাথে ও ছিল গভীর প্রজ্ঞার অধিকারী। ওর পরিকল্পনা ছিল ইংরেজী সাহিত্যে স্নাতোকত্তর শেষ করে পিএইচডি করবে, কিন্তু তার বদলে ও মেডিকেল স্কুলে যোগ দিল গভীর এক আকাঙ্খা নিয়ে। পরে ও লিখেছিল- “ এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যা বইয়ে লেখা নেই … এমন প্রশ্নের পিছনে ধাওয়া করতে যার জবাবে মিলবে মৃত্যু ও নিঃশেষের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও মানুষের জীবনের অর্থময়তার উৎস।”

মেডিকেল রেসিডেন্সি শুরু করার আগে লং আইল্যান্ড সাউন্ডের তীরে আমরা বিয়ে করেছিলাম। হাসপাতালে সপ্তাহে ৮০ ঘন্টা কাজ করতে হতো আমাদের। এর বাইরে আমরা আমাদের ক্যালিফোর্নিয়ার বাসার কাছেই দীর্ঘ পথ হাঁটতাম, হাতে হাত রেখে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতে করতে।
তারপর, আমাদের দেখা হওয়ার ১০ বছর পর, স্ট্যানফোর্ডে আমরা যখন আমাদের প্রশিক্ষণের শেষ পর্যায়ে, তখন পলের শরীর ভাঙ্গতে শুরু করে। পরীক্ষা নিরীক্ষার পর জানা যায় ওর পেছনের ব্যাথা আর ওজন কমে যাওয়া অতিরিক্তের পরিশ্রমের কারণে নয়, ওর মেটাস্টিক লাংস ক্যান্সার হয়েছে। এবার নশ্বরতার মুখোমুখি হবার সময় আমাদের এবং আগের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন জীবন কিসে অর্থময় হয়, এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা।
আমরা সবসময় পরিকল্পনা করতাম যেখানে আমরা আমাদের মধুচন্দ্রিমা পালন করেছিলাম, সেই পর্তুগালে আমাদের ২০তম বিবাহ বার্ষিকী উদযাপন করবো; পলের রোগটা ধরা পড়ার পর আমরা সে ভ্রমণটা তাড়াতাড়ি সেরে ফেলার পরিকল্পনা করলাম। পরষ্পরের সঙ্গ আর ওয়াইন সবই আমরা তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করেছিলাম। ফিরে এসে চিকিৎসক হিসেবে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করে গিয়েছি যতদিন পর্যন্ত পলের শরীর সায় দিয়েছিল। খুব খোলাখুলিভাবেই ওর সুস্থতার সম্ভাবনাগুলো নিয়ে আমরা কথা বলতাম। ওর মনের ভার কমাতে প্রতিদিন সকালে বিদায়ী চুমুর সময় ওর পকেটে ভরে দিতাম ১৫টারও বেশি ওষুধ, বমিরোধক ঘুমের বড়ি। ব্যাথা যখন ওর শরীরে চেপে বসতো, হট-বাথের ব্যবস্থা করে দিতাম, ওর শরীর হাত বুলিয়ে দিতাম আর জ্বালা কমানোর ওষুধ দিয়ে গান চালিয়ে চুপচাপ ওর দিকে তাকিয়ে থাকতাম।
পারস্পরিক বিশ্বাস আর আস্থার নতুন গভীরতা খুঁজে পেলাম আমরা- আগে সঙ্গী আর এখন রোগী হিসেবে, আগে স্ত্রী আর এখন সুশ্রুষাকারী হিসেবে এবং খুব শীঘ্রি সন্তানের মা-বাবা হিসেবে। পল সপ্তাহেরও বেশি সময় হাসপাতালে কাটিয়ে আসার পর আমরা খুব আনন্দের সাথেই আমাদের মেয়েকে পৃথিবীতে অর্ভ্যথনা জানিয়েছিলাম।
পল লিখতে শুরু করলো। প্রথমে একটা প্রবন্ধ-নিউরোসার্জন হিসেবে ওর প্রশিক্ষনের অভিজ্ঞতা এবং তারপর এটা জানা যে, ওর বেঁচে থাকার মেয়াদ আর এক কি দুই বছর- পরে বই লেখার প্রস্তাব আসে। কেমোথেরাপীর প্রভাব যখন ওর চামড়ায় পড়তে শুরু করে, টাইপ করাটা খুব কষ্টকর হয়ে যায় ওর জন্য। আমি ওকে রুপালী ধরনের একজোড়া গ্লাভস কিনে দেই যাতে ওর বিধ্বস্থ আঙ্গুলের ডগা রক্ষা পায় আর শুয়ে শুয়ে ল্যাপটপে ও লেখা চালাতে পারে।
বেশি অসুস্থ হবার আগ পর্যন্ত ও অপারেশন থিয়েটারে ওর কাজ চালিয়েছে, উন্মত্তের মতো লিখে গেছে ওর যুদ্ধের কথা- চিকিৎসক হিসেবে, সাহিত্যপ্রেমী হিসেবে এবং একজন ভয়াবহ অসুস্থ রোগী হিসেবে- ক্রমাগত খুঁজে গেছে নিজের মূল্যবোধ, বাঁচতে চেয়েছে তাকে সঙ্গী করে। লেখালেখির জগতে ফিরে আসা ওকে সাহায্য করেছে অন্যের কাজে লাগতে, ওকে সাহায্য করেছে ভালো থাকতে। আমি বিশ্বাস করি ও পূর্ণতার অনূভুতি নিয়ে পৃথিবী ছেড়েছে-ওর মনে হয় নি যে ও যা চেয়েছে তার সবকিছু পিছনে ফেলে ও চলে যাচ্ছে, বরং ওর যা চায়, সবই ও পেয়েছে।
ওর জীবনের শেষ সময়টুকুতে আমি ওকে স্পর্শ করে ছিলাম। ওর সাথে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ছিলাম, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওকে আমি গুনগুন করে গান শুনিয়েছিলাম। শেষতম ব্যক্তি হিসেবে আমি ওর মাথা আমার হাতে তুলে নিয়ে তাতে এঁকে দেই ভালবাসার চুমু। স্বাভাবিক থাকতে থাকতে পর্দা টেনে দেবার পরই আমি ব্যাকুল হয়ে উঠলাম।
কেঁদে উঠে ওর বোনকে বলেছিলাম, ” আমি ওকে একা ছেড়ে দিতে পারবো না”।
“ও এখানে নেই” আমাকে বারবার বলা হচ্ছিল, “তুমি ওকে ছেড়ে যাচ্ছো না” বলতে বলতে আমাকে বের করে আনা হয়, বাইরে তখন রাত।
বিবাহিত থেকে প্রিয়হারা শোকের এ যাত্রাপথ আমার অচেনা। শুরুর দিকে বৈধব্যের উপলব্ধি আমার আসেনি; মৃত্যুর পরও পলকে কিভাবে ভালো রাখা যায় তা নিয়েই আমার তখন যত ব্যস্ততা। ওকে সমাধিস্থ করতে যখন কাপড় চাওয়া হলো আমার কাছে, আমি সেই কাপড় আগে নিজে পড়েছিলাম, ভাবছিলাম কি করে কাপড়গুলোকে উষ্ণ করে তোলা যায়, ওগুলোতে কি করে লাগিয়ে দেয়া যায় আমাদের স্পর্শ। আমি ওর প্যান্টের পকেটে আমাদের মেয়ের একজোড়া মোজা ঢুকিয়ে দেই। ওকে যেদিন সমাধিস্থ করা হলো, আমি হাঁটতে থাকা মানুষের সারি থেকে বেরিয়ে এসে সামনে সামনে এগুচ্ছিলাম, ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম পাহাড়ের দিকে। আমি তোমাকে হাত ধরে নিয়ে যেতে পারছি না কিন্তু আমি তোমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবো; তুমি একা যাবে না। যে বালিশে মাথা রেখে ও মারা গিয়েছিল, বেশ কয়েক মাস আমি ঐ বালিশ মাথায় দিয়ে ঘুমাতাম, ওর ওষুধগুলো রেখে দিয়েছিলাম ড্রয়ারে, ঘুমাতে যেতাম ওর কাপড় পরে। এখনও পর্যন্ত, ওর মৃত্যুর এত মাস পরেও, আমি ওর সমাধিতে গিয়ে আনমনে সেখানকার ঘাসে হাত বুলিয়ে দিতে থাকি যেন ওগুলো পলের চুল, যে নাম ধরে ডাকলে ও-ই কেবল বুঝতো সেই ডাকনাম ধরে ডেকে ডেকে ওর সাথে কথা বলি।
কিছুদিন আগে এক রাতে, বিছানায় একা শুয়ে আমি সি এস লুইসের “A Grief Observed” বইটা পড়ছিলাম। সেখানে এক জায়গায় লেখা আছে, “ প্রিয়-বিয়োগ যুগল জীবনকে সংক্ষিপ্ত করে না বরং এ-ও এর এক পর্যায়।”। তিনি লিখেছেন “ এই সময়টুকুতেও যাতে যুগল-যাপিত জীবন বিশ্বাসের উপর ভর করে ভালভাবে কাটে, সেটাই আমাদের কাম্য।” ঠিক। কেবল সঙ্গীর কাছ থেকে আলাদা থাকার থেকে অন্যরকম কিছু এই বিচ্ছেদ বেদনা। যদিও আমি এখন আর পলের জন্য কিছু করতে পারি না, আমাদের বিয়ের দিন যে শপথ আমরা নিয়েছিলাম- পরষ্পরকে ভালবাসার, সম্মান জানানোর আর সঙ্গে থাকার — মৃত্যুর পরও তা অটুট রয়েছে। সেই প্রতিজ্ঞা আর বিশ্বস্ততা, ওর প্রতি সৎ থাকার ইচ্ছা, বিশেষ করে আমাদের মেয়েকে বড় করে তোলার ক্ষেত্রে, কখনোই ফুরাবে না। আমি শেষ আরেকটি প্রতিশ্রুতি পূরণ করছি।
মৃত্যুর আগে পল আমাকে বলেছিল ওর লেখা পান্ডুলিপি প্রকাশের ব্যবস্থা করতে। তা করতে গিয়ে গত কয়েক মাস আমি অনুভব করেছি যে আমি পলকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করছি, আমাদের মেয়ের হাতে তুলে দিতে যাচ্ছি এক উপহার।
আর এখন, আমি যখন পলের কাজকে জীবন পেতে দেখছি, মনে হচ্ছে যেন আমি আমার নিজের জীবন ফিরে পাচ্ছি। আমাদের বাসা এখন আমার আর আমাদের সন্তানের। পলের প্রিয় পোষাক, বই আমি রেখে দিয়েছি, তবে, ওর মোজা রাখার ড্রয়ার কিংবা নিজস্ব বইয়ের শেলফটা নেই। নতুন একটা বিছানা কিনে এনেছি। কাজে যাচ্ছি। পলের মৃত্যুর ছ’মাস পর আমি আমাদের বিয়ের আংটিটা খুলে ফেলি কারণ সেটাই সে মূহুর্তে আমার ঠিক মনে হয়েছিল; কিছু মূহুর্ত আগেও মনে হলো, আমি হয়তো এখনো মনস্থির করতে পারিনি। আমি শিখেছি যে এই শোকের সময়- সম্ভবত প্রেমের পড়ার সেই শুরুর মূহুর্তের মতোই- একেবারে অনিশ্চিত।
ছোটবেলা থেকেই আমাকে শেখানো হয়েছে, সমাধির চারপাশটা উঁচু হওয়া উচিৎ, জানানো হয়েছিল কেবল ফুল এর স্পর্শ পেতে পারে। পলের ক্ষেত্রে উল্টোটা ঘটেছে। ওর মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পর সেই বসন্তের বিকেলে ওর সাথে শুয়ে থাকাটা যেমন ঠিক মনে হয়েছিল, এখন তেমনই ঠিক মনে হয় বন্ধুদের সেখানে নিয়ে যাওয়া, পাশে বসে সুর্যাস্ত দেখতে দেখতে ওর জন্য বিয়ার ঢালা। যখন আমার উজ্জ্বল চোখের এক বছরের মেয়ে ওর সমাধিতে আমার দেয়া ফুলের উপর হামাগুড়ি দেয়, আমার মনে হয় সব ঠিকই আছে। জায়গাটাকে আমরা পল এবং আমাদের মতো করে তুলেছি।

Flag Counter


4 Responses

  1. JABIN TAHMINA HAQUE says:

    khub e valo laglo.real tragedy……

    thanks reshmi apu for nice ,touchy translation.

  2. poliar wahid says:

    চোখে জল চলে এলো। সুন্দর ঝরঝরে অনুবাদ। যেন মূল লেখকের লেখা পড়ছি বলে ভ্রম হয়। আহা প্রিয়-বিয়োগ তুমি দূরে নও বরং কাঠে টেনে আনো। ধন্যবাদ রেশমী নন্দীকে এমন নরম একটা লেখা পড়নোর জন্য।

  3. Jude Quiah says:

    খুব…খুব….ভালো লাগলো। মূল প্রবন্ধটা পড়ার লোভ জাগছে। পাবার উপায়টা বাতলে দিলে খুব ভালো হয়।
    অনেক অনেক ধন্যবাদ সুন্দর এবং সাবলীল অনুবাদের জন্য।

  4. সুপ্তা says:

    এত গভীরভাবে ভালবাসা যায় – হয়তো জানাই হয় না এক জীবনে।

    এত ছুঁয়ে যাওয়া অনুবাদের জন্য রেশমী নন্দীকে অনেক ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.