সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ, যখন আমি… (কিস্তি ৪)

চঞ্চল আশরাফ | ৩ জুলাই ২০০৮ ১০:৫৮ অপরাহ্ন

কিস্তি:

humayun-a.jpg
সমুদ্রে হুমায়ুন আজাদ

১৯৯২ সালের খুব সম্ভবত মধ্য জানুয়ারির কোনও এক সকালে কলাভবনের সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শীতকালীন কবিতা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এর আয়োজক ছিলেন আবীর বাঙালী। তিনি তখন বাংলা বিভাগের স্নাতকোত্তর দ্বিতীয় পর্বের ছাত্র। করতেন ছাত্রদল, কিন্তু হুমায়ুন আজাদের প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল। সাপ্তাহিক পূর্বাভাস-এ খালেদা জিয়া সম্পর্কে গরিব গ্রহের রূপসী প্রধানমন্ত্রী নামে প্রকাশিত কলামটি তাঁকে আবার আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। এটি ১৯৯১ সালের ঘটনা। তখন ছাত্রদলের ক্যাডাররা হুমায়ুন আজাদের হাত কেটে ফেলবে ব’লে হুমকি দিলে তিনি সম্ভবত প্রথমবারের মতো সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। আবীর বাঙালী দলবল নিয়ে তাঁকে বাসা থেকে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসতেন এবং বাসায় পৌঁছে দিতেন বলে শুনেছি। যা-ই হোক, ওই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন হুমায়ুন আজাদ। বেশ উঁচু করে বানানো মঞ্চে তিনি কেডস খুলে উঠে বসেন। তাঁর পরনে নীল-শাদা-লাল কম্বিনেশনে হরাইজন্টাল স্ট্রাইপের সোয়েটার আর জিন্সের প্যান্ট। অনুষ্ঠানটি ছিল এলোমেলো; সভাপতির বক্তব্যের পরও কবিতা পাঠ চলেছিল দীর্ঘক্ষণ। মনে পড়ে, হুমায়ুন আজাদ বলেন, ‘এই অনুষ্ঠানে আমি আসতে চাই নি। মাইক এখন দালালি আর গালাগালির যন্ত্র; এই যন্ত্রের সামনে আমি দাঁড়াতে যন্ত্রণা বোধ করি। আবীর বাঙালী আমার ছাত্র, তার প্রবল পীড়নে আমাকে এখানে আসতে হয়েছে। আমি মনে করি, কবিদের মাইক আর মঞ্চ বর্জন করা উচিত। কারণ, এই দু’টি জিনিস কবিতার ক্ষতি করেছে সবচেয়ে বেশি। মাইক আর মঞ্চের কাছে কবিরা এখন অসহায়; এ-দু’টি জিনিসই নির্ধারণ করছে কবিতা কীভাবে লিখতে হবে।’

ওই অনুষ্ঠানে জেনিস মাহমুন তাঁর ‘ওম কবিতাম্মৃত’ কবিতাটি পড়েন। সত্যি বলতে কী, কবিতাটি উপস্থিত প্রায় সবাইকে প্রথমত চমকে দেয়, দ্বিতীয়ত মুহ্যমান করে। পরদিন হুমায়ুন আজাদ আমাকে বলেন, ‘কবিতাটি লেখা হয়েছে মঞ্চের জন্যে। কিন্তু মঞ্চের কবিতা এত ভালো হয় না। কবিকে একদিন আমার কাছে নিয়ে এসো।’ আন্ওয়ার আহমদের বাসায় এবং বাংলা একাডেমীর তরুণ লেখক প্রকল্পে রিসোর্স পার্সন হিসেবে জেনিসের কবিতাটির প্রশংসা করেন তিনি। ১৯৯২ সালে, একুশে ফেব্রুয়ারির সকালে বাংলা একাডেমীর মঞ্চে জেনিস কবিতাটি দ্বিতীয়বারের মতো পড়েন। সেখানেও শ্রোতারা আচ্ছন্ন হয়ে যান কিছুক্ষণের জন্য। কবিতা পড়া শেষ হলে নরেন বিশ্বাস ও সৈয়দ শামসুল হক তাঁকে খুঁজতে থাকেন; সেই বার্তা তাঁর কাছে পৌঁছনোর আগেই তিনি মঞ্চের পেছন দিয়ে সেদিনের জনস্রোতে মিশে যান। বলতে পারি, সেই সময়ের এবং এখনকার শ্রেষ্ঠ একটি কবিতা ‘ওম কবিতাম্মৃত’। (সম্পূর্ণ…)

একদিন আহমদ ছফার বাসায় আমরা

| ২ জুলাই ২০০৮ ২:১৫ পূর্বাহ্ন

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: আশীষ খন্দকার, ব্রাত্য রাইসু, শাহ্‌রীয়ার রাসেল

[১৯৯৬ সালে এক রাতে পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই এই সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়। তখন লেখক আহমদ ছফার বাংলামোটরের চারতলার ভাড়া বাসাটি ছিল তরুণ-প্রবীণ লেখকদের আড্ডাস্থল। ঢাকার শাহবাগের আজিজ মার্কেটের দুই তলায় আড্ডা দেওয়ার জন্য ছফা একটি sofa-nasir.jpg…….
আহমদ ছফা (৩০/৬/১৯৪৩ — ২৮/৭/২০০১)। ছবি. নাসির আলী মামুন
…….
দোকানও ভাড়া করেছিলেন। এর নাম ছিল উত্থানপর্ব। পাশেই তিনি গরীব বাচ্চাদের একটি স্কুলও খুলেছিলেন। বিকেলে ছফা শাহবাগে বসতেন। বিবিধ বন্ধু এবং চাকুরিহীন ও চাকুরি আছে এমন তরুণ কবি- সাহিত্যিকরা তখন তাঁর কাছে আসতেন। শাহবাগের আড্ডা শেষে প্রায়ই সে আড্ডার কেউ কেউ ছফার সঙ্গে বাসা পর্যন্ত হেঁটে এগিয়ে দিতেন তাঁকে। কোনোদিন তাঁর বাসায়ই আড্ডা বসতো। র চা ও পনির দিয়ে আপ্যায়ন করতেন ছফা। আমরা যারা তাঁর একটু ঘনিষ্ঠজন ছিলাম তাদেরকে তিনি কখনো-সখনো তাঁর জার্মান বান্ধবীর কল্যাণে প্রাপ্ত নেপোলিয়ন ব্যবহার করতে দিতেন। র চায়ে দুচামচ ব্র্যান্ডি আর পিরিচে কাটা পনির এটি ছিল সে সময়ের ডেলিকেসি।

প্রায় সব বিষয়ে ছফা মত দিতেন। সবার সঙ্গেই ভাল সম্পর্ক বজায় ছিল তাঁর। শোনা যায়, গোপনে কাউকে কাউকে অর্থসাহায্য করতেন। সাক্ষাৎকারটি শুরু হয় নাট্যকার ও অভিনেতা আশীষ খন্দকারের একটি প্রশ্ন দিয়ে। ক্যাসেটে সে প্রশ্ন ধারণ করা যায় নাই এবং অনেক পরে রেকর্ডার থেকে শুনে শুনে সাক্ষাৎকারটি লেখা হয়েছে বিধায় ছফার কথা দিয়েই সাক্ষাৎকারটি শুরু করা হলো। — ব্রাত্য রাইসু, ২/৭/২০০৮]

আহমদ ছফা: আরে না, আমি মুন্ত্রী হয়ে গেছি তো। আমি মুন্ত্রী তো, উল্টাপাল্টা প্রশ্নের জবাব দ্যাব না।

আশীষ খন্দকার : ছফা ভাইয়ের ওপর একটা ডকুমেন্টারি করে রাখতে চাই, ফিল্ম ডকুমেন্টারি।

ছফা: কর্নেল ফরহাদের (ফরহাদ মজহার) একটা ডকুমেন্টারি ইউনিট আছে।sofa-pakhi.jpg…….
আহমদ ছফা এক সময় কাঁধে পাখি নিয়ে চলাফেরা করতেন। ছবিটি আট খণ্ডে পূর্ণাঙ্গ আহমদ ছফা রচনাবলীর (প্রকাশক: খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি) দ্বিতীয় খণ্ড থেকে নেয়া হয়েছে।
…….
ফরহাদকে বললে যে কোনোদিন… প্রতিদিনই রিকোয়েস্ট করছে আমাকে, ওদের একটা ভিডিও ক্যামেরা আছে, ইত্যাদি আছে…কিন্তু এগুলোর করার একটা বিপদ আছে কী জানো, খুব তাড়াতাড়ি বোধহয় মরে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। (সম্পূর্ণ…)

কোষা

পাপড়ি রহমান | ১ জুলাই ২০০৮ ১:০৩ অপরাহ্ন

আমাদের বাড়িতে অন্ধকার নামতো সূর্য ডোবার ঢের আগে। ছোট-বড়-মাঝারি নানাজাতের গাছপালায় ঘেরা বলে রোদের মুখ দেখা যেতো কি যেত না। মাকড়সার জালের মতো ছড়ানো আলো ঈষৎ ঝিলিক মেরেই দ্রুত লুকিয়ে পড়তো ওই ঘিঞ্জি পাতা-লতার আড়ালে। ফলে প্রতিদিনই সন্ধ্যা নামার আগে-ভাগেই বাড়িটা ঝুপ করে কোনো গভীর কুয়ার ভেতর ঢুকে পড়তো। আর এই রকম হঠাৎ নামা অন্ধকারে আমাদেরও গা ছমছম করে উঠতো। প্রতিদিন সন্ধ্যার আগেই রাত হয়ে যাওয়া, আর এতে আমরা অভ্যস্তই বলা চলে — তবুও ভয় আমাদের জোঁকের মতো কামড়ে থাকতো। এই ভয় তাড়ানোর কোনো উপায়ও আমাদের জানা ছিল না। বাড়ির দক্ষিণ দিকে একেবারে পাতায় পাতাময় গাবগাছ — দিবা নাই নিশি নাই বিশাল ছাতার মতো নিজেকে ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাস, ঝড় এমনকি ঘূর্ণিঝড়েও কখনো একটা পলকা ডালও তার ভেঙে পড়ে নাই। ওই সবল গাছের দিকে আমরা মনের ভুলেও তাকাতাম না। আমরা জানতাম ওই গাবগাছই হলো ভূত-পেত্নীদের আখড়া। গাবগাছ পেলেই নাকি তেনারা নিরাপদে সংসার যাপন করেন। দক্ষিণ দিকে তেনাদের রাজত্ব — পশ্চিম দিকটা যে আমাদের তাওতো নয়। এইদিকে আছে একটা বড়সড় আষাইঢ়্যা আমের গাছ। উনিও হাত-পা মেলে এতটাই আয়েশ করে আছেন যে, উনার ড্রামের মতো মোটাসোটা ডালগুলো নেমে এসেছে ঠিক ঘরের চালের উপর পর্যন্ত। ফলে অন্ধকার হয়ে এলে পশ্চিমে তাকানোর সাহসও আমাদের ছিল না। দক্ষিণ-পশ্চিমকে নিষিদ্ধ এলাকা চিহ্নিত করে পুবের ফর্সা ফর্সা দিকটাতে আমরা বিচরণ করতে চাইতাম। কিন্তু এটাও আমাদের জন্য সহজ ছিল না। এই পূবদিক অতোটা অন্ধকার না হলেও মস্ত একটা ন্যাংগুইল্যা গাছ একেবারে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে শুয়ে আছে। আর এই পানি হলো আমাদের প্রাচীন পুকুরের পানি। গণ্ডা তিনেক আণ্ডা-বাচ্চাকে অকালে ডুবিয়ে মারার ইতিহাস নিয়ে এই পুকুর জল অথই করে দিব্যি বেচেবর্তে আছে! এই পুরানা পুকুর এখনো এতটাই গভীর যে, উইন্যার দিনেও থই পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়ে। বলা চলে আমাদের চারদিকেই গা ছমছম করা পরিবেশ। এই রকম দিনে-রাতে ভয় ভয় ধরা বাড়িতে হঠাৎ দুইজন ছুতার এলো। (সম্পূর্ণ…)

« আগের পাতা |

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com