গদ্য

অনিল বাগচীর একদিন: মোনোক্রোম সময়ে বর্ণিল বেদনার গাথা

মাহমুদুল হোসেন | ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ৯:৩৮ অপরাহ্ন

anil-bagchi.jpgঅনিল বাগচীর একদিন একটি লিরিক্যাল দৃশ্যমান প্রবাহ যা আবেগের উঁচু তার ছুঁয়ে চলে। যখন শুনি ছবির চরিত্রের মুখে যে, “প্রকৃতির মাঝে এমন কিছু সৌন্দর্য লুকানো থাকে যা শুধু হৃদয়ে ধারণ করতে হয়, অন্য কোনোভাবেই ধরে রাখা যায় না”, তখনই যেন এই ছবির ভবিতব্য নির্ধারিত হয়ে যায়। জ্যোৎসনা রাতে স্থির জলের সৌন্দর্য, বর্ষার মেদুরতা অথবা ভীষণ সবুজের অবারিত ল্যান্ডস্কেপ—মুক্তিযুদ্ধের দুষ্কালের দিবানিশিতে প্রেরিত করেছিল আমাদের অথবা পিপাসিত করেছিল সেই মোনোক্রোম, ডেজোলেট সময়ে ওই সৌন্দর্যকে পুনরাবিষ্কারের। এই ছবি, তার গল্প ও ইমেজ, সেই সুন্দরের প্রতি এক আবেগ থরথর নিবেদন।

মোরশেদুল ইসলামকে অনেকদিন আগে জাতীয় চলচ্চিত্রবিষয়ক এক লেখায় বাংলাদেশের জন ফোর্ড বলে আখ্যায়িত করা গিয়েছিল। এদেশের মানুষ, তাদের জীবন, সংগ্রাম, আনন্দ-বেদনাকে তিনদশক ধরে তিনি এক ঘোর লাগা চোখে আমাদের দেখিয়ে চলেছেন তার সিনেমায়। সেখানে যুক্তির চেয়ে বড়ো হয়ে উঠেছে আবেগ, বুদ্ধির মাপ হেরে গেছে ভালোবাসার উচ্ছ্বাসে। তার এই নতুন ছবি নিয়ে তিনি নিজেই বলছেন, একটি সহজ, সরল গল্প তিনি বলতে চেয়েছেন, কোনো কায়দা বা মারপ্যাঁচ দেখানো তার উদ্দেশ্য ছিল না। আর এই সহজ, সরল গল্পটি লিখেছেন হুমায়ূন আহমেদ—যার চরিত্ররা জীবনের নিস্তরঙ্গ পুকুরে ঢিল ছুঁড়ে যে কাঁপন তোলে তারা সঞ্চারিত হয় জন থেকে জনে; ক্রমান্বয়ে জনমনে। সেই মেজাজেই এগিয়েছে চলচ্চিত্র অনিল বাগচীর একদিন। কিন্তু যেমনটি বলেছেন মোরশেদ ঠিক ততখানি সরল একরৈখিক ভঙ্গিতে এগোয় নি সিনেমার গল্প। সময়ের ভাঙচুর আছে, জীবন ও স্বপ্নের মধ্যে যাতায়াত আছে, বর্ণ ও বর্ণহীনতার বৈপরীত্য আছে, বলা না বলার লুকোচুরি আছে। আর আশ্চর্য যে, এ এমন এক গল্প যা সরল কিন্তু ধ্রুপদী ন্যারেটিভের ধার ধারে না সে। গল্পের, এখানে সিনেমার, শুরুতেই অনিল বাগচীর এই একটি দিন কীভাবে শেষ হবে, তা আমরা, দর্শকেরা যেন জানি। ক্লাইমেক্স আমাদের উজ্জীবিত, আতঙ্কিত, হতাশ করে না—একটি বিষন্ন, বেদনাহত নিয়তি নির্দিষ্ট সময়ের যাপন এই চলচ্চিত্র; একই সাথে প্রিয় স্বদেশের প্রকৃতির উদযাপন এবং কিছু ঐশ্বর্যময় পংক্তিমালার উপভোগ। চলচ্চিত্র হিসেবে বেশ কিছু ঋণাত্বক বৈশিষ্ট্য নিয়েও এভাবেই অনিল বাগচীর একদিন একটি নতুন সিনেমা, একটি উল্লেখযোগ্য যোগ আমাদের চলচ্চিত্রের সীমিত ভাণ্ডারে। (সম্পূর্ণ…)

বাঙালির ইবসেন

আনিসুর রহমান | ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ১০:০১ অপরাহ্ন

henrik-ibsen.jpg

বাঙালির ইবসেন

নরওয়ের নাট্যকার ও কবি হেনরিক ইবসেন (১৮২৮-১৯০৬)। যাকে উত্তর মেরু অঞ্চলীয় দেশটির রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১-১৯৪১) মনে করা যায়। রবীন্দ্রনাথকে বাংলা সাহিত্যের ঠিকানা মনে করা হয়। তেমনিভাবে ইবসেনও নরওয়েজীয় সাহিত্যের ঠিকানা। আমরা বাংলা ভাষাভাষী পাঠকরা নরওয়ের ইবসেনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি থেকে শুরু করে পত্রপত্রিকা ও নাটকের জগতে যতটা পঠনপাঠন, চর্চা, অনুবাদ, আলোচনা করে থাকি; সে তুলনায় প্রায় অর্ধকোটি জনসংখ্যার নরওয়ে নামক দেশটিতে বাঙালি প্রতিভা রবীন্দ্রনাথকে জানার ও তাঁর থেকে নেবার দৃষ্টান্ত খুব একটা নেই। সেটা ওদের ব্যাপার; এ নিয়ে আমাদের মাথাব্যাথার কারণ নেই। ইবসেন থেকে আমরা নিই এবং শিখি সেটা আমাদের প্রয়োজনেই। এটা যেমন সত্য, তেমনই ইবসেনকে রপ্তানি করার নওয়ের সরকারের তোড়জোড়কেও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আর এই রপ্তানিটা হয়ে থাকে নরওয়ের আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা নোরাড-এর অর্থায়নে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর নানা দেশে ইবসেনচর্চা প্রসারিত হয়েছে, বিশেষ করে ইবসেন-নাট্যকর্মের অনুবাদ ও প্রযোজনার ক্ষেত্র প্রসারিত হয়েছে। যদিও সেইসব খুব একটা লাগসই হয়নি। তবে এখানে বলে রাখা ভালো যে নরওয়ের সরকার ইবসেন রপ্তানির উগ্যোগ না নিলেও আন্তর্জাতিক নাট্যজগতে এমনকি খোদ বাংলাদেশেও ইবসেন-এর মর্যাদার কোনো হেরফের হতো না। নরওয়ের তেলের খনি আবিস্কারের পূর্বেই আধুনিক নাটকের পথিকৃত হিসেবে ইবসেন স্বীকৃতি পেয়ে গেছেন। সারা দুনিয়া জুড়েই শেক্সপিয়রের পরেই নাটক মঞ্চায়নের সংখ্যা বিচারে ইবসেনের অবস্থান। নাট্যকার হিসেবে ইবসেনের প্রাসঙ্গিকতা এবং আবশ্যিকতা অনিবার্য। বাংলা ভাষাভাষী জগতে নাটকের বাইরে সিনেমা জগতেও ইবসেনের ধ্রুপদি অবস্থান। কিংবদন্তী চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় তাঁর গণশত্রু নাটক নিয়ে গণশত্রু নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। ইবসেন সৃষ্টিকর্মের সাথে রবীন্দ্রনাথেরও পরিচয় ঘটেছিল। ইবসেনের মৃত্যুর শত বৎসরের অধিক সময় পার হয়ে গেছে। নরওয়ের ইবসেন নরওয়ের চৌহদ্দী অতিক্রম করে নানা দেশের, নানা ভাষার ইবসেন হয়ে গেছেন। এইভাবে ইবসেন আজ বাঙালিরও। (সম্পূর্ণ…)

আমার শিক্ষক প্রফেসর এ কে নাজমুল করিম

অনুপম সেন | ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ৭:৫৫ অপরাহ্ন

nazmul_karim.jpg১৯৫৯ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হই। আমি বাংলা পড়তে চেয়েছিলাম। তৎকালীন বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের প্রধান ড. আবদুল হাই আমাকে সংস্কৃত পড়ার জন্য বলেন। আমি সংস্কৃত পড়তে চাইনি। আমাকে সমাজতত্ত্ব পড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিলেন আমার দৃষ্টিতে আরেকজন মহাপ্রাণ লোক অধ্যক্ষ আবদুস সোবহান খান চৌধুরী, যার হাতে চট্টগ্রাম কমার্স কলেজ গড়ে উঠেছিল। তিনি ইন্ডিয়ান সিনিয়র এডুকেশন সার্ভিসের লোক ছিলেন। এই সার্ভিসে স্থান পাওয়া লোকের সংখ্যা সেসময় খুবই কম ছিল। তিনিও প্রকৃত অর্থে একজন অসাধারণ পন্ডিত লোক ছিলেন। দেখতে যেমন ছিলেন অসাধারণ সৌম্যকান্তি তেমনি মানুষ হিসেবেও তুলনাহীন মানবিক। তিনি আমাকে বলেছিলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজতত্ত্ব নতুন বিভাগ। খুলেছে ইউনেস্কো। শিক্ষকরা বেশির ভাগই বিদেশী পন্ডিত। এই বিভাগে পড়লে তুমি অনেক কিছু জানতে পারবে। তাঁর কথায় অনুপ্রাণিত হয়েই আমি সমাজতত্ত্ব পড়ি। আমি যখন ভর্তি হই তখন বিভাগীয় প্রধান ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ ফরাসি নৃতত্ত্ববিদ পিআরই বেসাইনেট। আমরা তাকে নয় মাস পেয়েছিলাম। তিনি দেশে ফিরে যাওয়ার পর বিভাগীয় প্রধান হন এ কে নাজমুল করিম স্যার। যদিও বিভাগে অনেক বিদেশী শিক্ষক ছিলেন।
স্যারের উৎসাহে ও অনুপ্রেরণায় বিভাগে অনেক অনুষ্ঠান হত- ডিবেট, বক্তৃতা প্রতিযোগিতা, কবিতা পাঠ, নাটক ইত্যাদি। এসব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার ফলে আমাকে তিনি চেনেন। আমি তাঁর কাছে যাওয়ার সৌভাগ্য ও সুযোগ পাই। বিভিন্ন বিষয়ে উৎসাহ থাকায় আমি ধীরে ধীরে তাঁর স্নেহ পেতে শুরু করি। অবশ্য আমার বন্ধু ও অন্যান্য সহপাঠীরাও তাঁর স্নেহধন্য। সেসময়ে আমরা একটি ক্লাসে ত্রিশ জনের বেশি ছাত্র ছিলাম না। তাই শিক্ষকরা প্রায় সবাইকে চিনতেন। তাঁর স্নেহধন্য হওয়ার ফলে পরবর্তীকালে আমি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার ও পড়ার সুযোগ পাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আমি তাঁর সহকর্মী যতটুকু না ছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি ছিলাম উৎসুক ছাত্র। ফলে তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি, জেনেছি। (সম্পূর্ণ…)

আবদুল মান্নান সৈয়দের অনন্যতা

মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ | ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ৯:৫৯ অপরাহ্ন

a-m-syed.jpgনর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে একটি সকাল। আমার হাতে এক গোছা অর্কিড। হঠাৎ মান্নাান এলো আমার ঘরে। ফুল দেখে সে উল্লসিত। এত সুন্দর ফুল। কোথায় পেলেন। বললাম সামনের রাস্তার পাশে একটা দোকান থেকে কিনেছি। আমিও কিনবো। হারুন ভাই আমাকে নিয়ে চলুন।
মান্নান তিন গোছা ফুল কিনলো। তিন গোছার এক গোছা আমার হাতে দিয়ে বললো, হারুন ভাই এটা আপনার জন্য। আর এ দুটো রানু আর জিনানের জন্য।
আবদুল মান্নান মৈয়দ তখন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে স্কলার ইন রেসিডেন্স। তার নিজস্ব শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে কাজ করে। সময় পেলেই আমার ঘরে চলে আসে। গল্প করে। হো হো করে প্রাণখোলা হাসি হাসে।
এ বিশ্ববিদ্যালয় তাকে যে সম্মান দিয়েছে তা ছিলো তার আশাতীত। তাকে প্রফেসর-এর মর্যাদায় স্কলার ইন রেসিডেন্স করা হয়েছে। এটা নিয়ে তার গর্বের অন্ত নাই। ওর সারাজীবনের একটা অভিমান যেন মিটে গেছে।
মান্নান চুক্তি মোতাবেক নজরুলের উপর তিনটে উন্মুক্ত বক্তৃতা দিয়েছিলো। পরে এ তিনটে বক্তৃতা দিয়ে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি একটি বই প্রকাশ করে। নাম কাজী নজরুল ইসলাম : তিন অধ্যায়। বলাবাহুল্য এ বক্তৃতাগুলো নজরুল জীবনের এমন কতগুলো দিক উন্মোচিত করেছে যা ইতিপূর্রে আমরা কোথায় পাইনি। (সম্পূর্ণ…)

আমার বন্ধু আবদুল মান্নান সৈয়দ

আবদুস সেলিম | ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ৮:৪৪ অপরাহ্ন

mannan-syed.jpgসমমনা মানুষদের সাথে ঘনিষ্ট হতে সময় নেয় না। সেই সাথে তাদের সঙ্গও হয় স্বর্গস্পর্শি। তেমনটাই হয়েছিল মান্নান অর্থাৎ আবদুল মান্নান সৈয়দ-এর সাথে আমার।
এই নামটির সাথে পরিচয় ছিল আগে থেকেই – যেকথা আমি অনেকবার উচ্চারণ করেছি, লিখেছিও। সেটা হয়েছিল তার ছোটগল্প সঞ্চলন “সত্যের মত বদমাশ” গ্রন্থের মাধ্যমে যেটি তদানিন্তন পাকিস্তান সরকার নিষিদ্ধ করেছিল।
এই মানুষটিকে দেখার এবং তারসাথে পরিচিত হবার ইচ্ছা ছিল বইটি পড়ার পর থেকেই । কিন্তু তখন আমি সখের লেখালেখি করতাম এখনও তাই করি- কিন্তু বর্তমানে কিছু লোক অন্তত আমার পরিচিতি জানে, তখন কেউই জানত না।
সুযোগ এলো সিলেট এম.সি.কলেজে অধ্যাপনার জন্য যোগদানের মাধ্যমে। এই বিষয়টি নিয়ে মান্নান তার নির্বাচিত প্রবন্ধ গ্রন্থ আমাকে প্রতিপাদ্য করে একটি প্রবন্ধও লিখেছে।
প্রসঙ্গত মনে পড়ছে সাহিত্য জগতে আমার পরিচিতি মান্নানের মাধ্যমেই। সুযোগ পেলেই মান্নান তার লেখায় আমার কথা লিখত এবং আমার সাথে দেখা হলে অভিযোগ করত “আপনি কিন্তু আমাকে নিয়ে তেমন লেখেন না”। সত্যি বলতে কি আমি নিজেকে লেখকই মনে করতাম না-আর ঠিক এ কারনেই মান্নানকে নিয়ে কিছু লেখার ব্যাপারে আমার গভীর দ্বিধা ছিল।
মনে পড়ছে যখন জীবনের এই প্রান্তসীমায় আবার আমরা মান্নান, সেলিম সারোযার, খালিকুজ্জামান ইলিয়াস, আজফার হোসেন এবং আমি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সির্টিতে একত্রে কর্মরত ছিলাম তখন প্রায়শঃ তার অফিস ঘরে কিবা বনানীর ক্যাম্পাসের দোতলার খোলা বারান্ডায় বসে আড্ডা দিতাম আর সেই স্বর্গস্পর্মীসুখ বয়ে যেত মনের গভীরে । (সম্পূর্ণ…)

আবদুল মান্নান সৈয়দ ও তাঁর স্বাতন্ত্র্য

পুলক হাসান | ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ১:২২ অপরাহ্ন

196.JPGশুরুটাই ছিল তাঁর স্বতন্ত্র, শেষবধি বজায় রেখেছিলেন এই স্বাতন্ত্র্য। কবিতায়, কথাসাহিত্য, প্রবন্ধ, গবেষণা ও সমালোচনাসহ বিপুল তাঁর সাহিত্যকর্মযজ্ঞের সকল ক্ষেত্রেই ছিল তাঁর এ স্বতন্ত্র প্রয়াস। সাহিত্য যদি হয় সত্য ও সুন্দরের পাথেয়, তবে তিনি ছিলেন মৌলিক পথেই। সৌন্দর্যচেতনা লালনে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন শতভাগ। পশ্চিমী প্রভাব ছিল কিন্তু চিন্তা-চেতনায় ছিলেন কালোত্তর। বরং নিজেকে ভাবতেন ত্রিশোত্তর একজন অতি-আধুনিক। এই আধুনিক চেতনা থেকেই নিজের সাহিত্যে তৈরি করেছিলেন যেখানে প্রেম ও যৌনতাকে নাগরিক চেতনার গভীরতম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গণ্য করেন। এই নাগরিক সত্তার বিচিত্র অনুভূতি নিয়েই তিনি বর্তমান ও ভবিষ্যতের আনন্দ-বেদনাকে জারিত করেন তাঁর শিল্পরসে, তাতে নাগরিক বোধের যে তৃষ্ণা হেরমান হেসের মতে, তার প্রকৃত সৌন্দর্য নগ্নতার মধ্যেই। শিল্প ও সাহিত্যে তিনি তাই যা কিছু করেছেন এই নাগরিক বোধ ও বিবেচনা থেকেই করেছেন। শব্দ, বাক্য ও উপমার ইন্দ্রজালে বুনে গেছেন বয়ে যাওয়া জীবনেরই ভেতর বাহির, তার রক্ত-মাংসের শীৎকার, হাহাকার। শরীর ও চেতনার মধ্যদিয়ে তিনি এসবের মধ্যে খুঁজেছিলেন এক ভাষা, মেলে ধরেছিলেন তাঁর দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গী এবং তৈরি করেছিলেন আপাত জটিল আলাদা এক মনোজগৎ। তিনি আধুনিক বাংলা গদ্য-সাহিত্যেরও নতুন রূপকার। (সম্পূর্ণ…)

পথে, প্রদেশে (পর্ব-৬)

মাসুদ খান | ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ১:৪২ অপরাহ্ন

(পূর্ব-প্রকাশিতের পর)

ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের যৌথবাহিনী

বহুদিন ধরে হকসেদের জ্ঞানকাণ্ডীয় উৎপাতে অতিষ্ঠ ও অপমানিত এলাকার মাতব্বর- ও পণ্ডিতকুল। তারা ঠিক করেছে আজ ঠ্যাক দেবে হকসেদকে। ঠ্যাঙানিও দেবে ভাবমতন। এ কাজে যুব-সিন্ডিকেটের কয়েকজন মাস্তানও জোগাড় করা হয়েছে চুক্তি ভিত্তিতে। সবাই মিলে যুক্তি করে ওঁৎ পেতে বসে আছে হকসেদের প্রস্থানপথের পাশে।
নেতা-গোছের যে, তার নাম ফয়সাল করিম, লোকে ডাকে ‘ফয়সালা করুম’। সে একইসঙ্গে হাঁটুভাঙ্গা বহুমুখী ভুবনবিদ্যায়তনের পণ্ডিতসংঘের সভাপতি, আবার নাম্বার-ওয়ান লোকাল মাতবর, আবার তেল ও ভুসিমাল ব্যবসায়ী সমিতির সম্মানী উপদেষ্টাও। খুব রাগ আর খালি প্যাঁচ আর পলিটিকস। চলাফেরা ক্ষমতাকাঠামোর আশেপাশে। এক অসাধারণ গিরগিটি-প্রতিভার অধিকারী, ক্ষমতার রং বদলে গেলে তালে-তালে নিজের রঙও বদলে ফেলতে পারে দ্রুত। সবসময় পাওয়ারের লোকজনদের সঙ্গে তার ওঠাবসা, আশনাই ও মিথোজীবিতা।

তো, সেই নেতা-ফয়সাল কয়েকজন চ্যালাসহ ঠ্যাক-বাহিনীর অগ্রবর্তী মারমুখী দল হিসাবে ধেয়ে আসে হকসেদের দিকে। অবস্থা বেগতিক আঁচ ক’রে সামনে ওঁৎ-পেতে-থাকা ঠ্যাক-ও-ঠ্যাঙানি-পার্টিতে আগাম ভীতিসঞ্চারের উদ্দেশ্যে হকসেদও তেড়ে যায় কয়েক কদম, বেশ আগ্রাসী ভঙ্গিতে।

হাউৎ করে ওঠে হকসেদ, “এই! ব্যাটা ফাউল ফয়সাল! হটাৎ গর্মা জাগো দিছে দেখতাছি, আয় দেহি ফয়সালা করি তোর।” বলেই থাবড়া দিয়ে ধরে ফেলে ফয়সালের চকরাবকরা গিরগিটি-আঁকা শার্টের কলার। ধরেই ঠাসঠাস করে দেয় কয়েকটা কানসা বরাবর। জোরে জোরে বলতে থাকে,
“পাওয়ারের আশেপাশে মেনি বিলাইয়ের মতন ঘুরঘুর করোস, উটাকাঁটা যা ছিটায় তা-ই খাস আর ভাব দেখাস চরম বুদ্ধিজীবী, না? চুরিদারি টাউটারি ছাইড়া দিয়া অটো-সাইজ হয়া যা কইলাম। নাইলে কিন্তুক খবর আছে, হুঁ! জব্বর খবর!” (সম্পূর্ণ…)

রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস | ৭ আগস্ট ২০১৫ ১২:২১ পূর্বাহ্ন

rt.gifঅনুবাদ একটি স্বতন্ত্র শিল্পমাধ্যম। কবিতা নাটক উপন্যাস প্রবন্ধ ইত্যাদির মতো এরও রয়েছে একটি স্বতন্ত্র এলাকা যা ওইসব মাধ্যমের মতোই নানা উপকরণ ও বৈশিষ্ট্যে পূর্ণ। যদিও অনুবাদ বিপুলাংশে স্থাপিত হয় কোনো একটি উৎস মাধ্যমের ওপরই, এবং সেই উৎসকে একটি লক্ষ্যভাষায় রূপান্তরিত করাই অনুবাদের কাজ, তবু অনুবাদও বিবেচিত হয় একটি সৃজনশীল শিল্পমাধ্যম হিসেবে। মূলের কতটা অনূগামী হলে শিল্প হিসেবে অনুবাদ উতরে যাবে বা ব্যর্থ হবে সেই নির্বাচন ক্ষমতার ওপরই প্রকাশ পায় অনুবাদের সৃজনশীলতা।
রবীন্দ্রনাথ মূলত একজন কবি; বস্তুত তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন বহুমাত্রিক সৃজনশীল প্রতিভা হিসেবে অনন্য। এই সাহিত্যের সব শাখা তাঁর প্রতিভার স্পর্শে দারুণভাবে আন্দোলিত হয়েছে। মূল ইংরেজি ভাষায় তাঁর লেখা নেহায়েত স্বল্প নয়। আবার বাংলা থেকে ইংরেজিতে এবং ইংরেজি, ফরাসী, জার্মান থেকে বাংলায় অনুবাদের কাজেও তিনি যথেষ্ট সময় দেন। সৃজনশীল সাহিত্যিক অনুবাদকর্মে নিয়োজিত হলে সাধারণত ব্যর্থই হন কারণ অনুবাদ করতে গিয়ে নিজের কল্পনা ও মনের মাধুরি মেশানোর প্রবণতা তাঁকে মূল থেকে ক্রমে বহু দূরে সরিয়ে নেয়। তখন অনূদিত কর্মটিকে অনুবাদ না বলে তাঁর নিজস্ব রচনা বললেই যথার্থ হয়। উদাহরণ দেওয়া যায় শেক্সপীয়র, ড্রাইডেন, পোপ থেকে। উৎস কাহিনীতে ভর করে শেক্সপীয়র তাঁর নাটকগুলোয় কি দারুণ সব কান্ডই না করে বসেছেন। অন্যদিকে ড্রাইডেন, পোপ–এঁরাও হোমার, ভার্জিল অনুবাদ করতে গিয়ে এমন কর্ম উপস্থাপন করলেন যে সেখানে গ্রীস ও ইতালির হতভাগ্য কবিদের আর চেনাই যায় না। বেশি সৃজনশীল কবি সাহিত্যিকের পক্ষে তাই সার্থক অনুবাদ অর্থাৎ যাতে মূলও বজায়ে থাকবে আবার নতুন একটি শিল্পকর্মও রচিত হবে-এমন ঘটনা কমই ঘটে থাকে। (সম্পূর্ণ…)

বোর্হেস নিয়ে মান্নান সৈয়দের একটি অপ্রকাশিত লেখা

রাজু আলাউদ্দিন | ৫ আগস্ট ২০১৫ ১:৪৪ অপরাহ্ন

with-mannan-bhai_n.jpgবিদেশের পাঠ চুকিয়ে আমি দেশে ফিরেছিলাম ২০০৯ সালের নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে। বহু প্রতীক্ষিত আমার ‘বোর্হেস’ প্রকল্পের অপ্রকাশের ভারে যতটা না নুব্জ ছিলাম, তার চেয়ে বেশি লজ্জিত ও কুণ্ঠিত ছিলাম অন্তর্ভুক্ত নবীন প্রবীণ অনুবাদকদের পাশাপাশি বোর্হেস-প্রেমিক শুভানুধ্যায়ী বন্ধুদের প্রশ্নে: বইটি কবে বেরুবে? কী করে বুঝাই যে প্রবাসে থেকে বইটির প্রকাশনার তদারকি করা প্রায় অসম্ভব ছিল। তদারকির প্রশ্নটাও পরের কথা, আমিতো তখন কোনো যুৎসই প্রকাশকই পাচ্ছিলাম না ওখান থেকে। প্রকাশক পাওয়া না পাওয়া নিয়ে সে এক অন্য কাহন, বাঘা বাঘা কত মগাদের অবহেলা আর অজ্ঞতা পোহাতে হয়েছে, সেখানেও যে আমার কত সময় পুড়ে ছাই হয়ে গেছে সেসব আলাদা করে অন্য কোথাও বলা যাবে।

যাইহোক, দেশে ফিরে আসার পরপরই বোর্হেস প্রকাশে উৎসাহী ঐতিহ্য প্রকাশনীর কর্ণধার আরিফুর রহমান নাঈমের সাথে আমার যোগাযোগ হলো। নাঈমের খুব উৎসাহ আর আগ্রহ দেখে আমি সত্যি সত্যিই খুব মুগ্ধ হয়ে গেলাম। এদিকে নরম্যান টমাস ডি জিওভান্নির সঙ্গে পাণ্ডুলিপি নিয়ে আলাপের ফলে আমার পরিকল্পনাও খানিকটা বদলে যায়। প্রথমে আমার ইচ্ছা ছিল এক খন্ডে বের করার, কিন্তু তিনি বললেন পাঁচ খন্ডে আলাদা আলাদাভাবে বের করার জন্য। ফলে আমার কাজ গেল বেড়ে। নাঈমের ঘাড়েও এই বাড়তি চাপ পরলো। সে যেমন তার লোকজনকে খাটিয়েছে তেমনি আমাকেও খুব খাটিয়ে ছিল এই কারণে যে প্রায় আটশ পৃষ্ঠার পান্ডুলিপিটি ছিল নানান জনের হাতে লেখা। সুতরাং পাঠোদ্ধার, কম্পোজ এবং সবশেষে প্রুফ– থাক সেসব কাহিনী। মান্নান ভাই কিভাবে বোর্হেসের সাথে যুক্ত হলেন সে কথাই বরং স্মৃতি থেকে উদ্ধারের চেষ্টা করি। (সম্পূর্ণ…)

প্রবন্ধ

| ২৩ জুলাই ২০১৫ ৩:০০ অপরাহ্ন


সংগীতের মুক্তি ও বন্ধন : রবীন্দ্রনাথ


ওমর শামস

tagore.jpgরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সংগীত সম্বন্ধে যা ভেবেছেন– বক্তৃতা, প্রবন্ধ, চিঠিপত্র, সংলাপ – এ সবই সংগৃহীত হয়েছে বিশ্বভারতী প্রকাশিত তাঁর সংগীতচিন্তা, ১৩৭৩ নামক গ্রন্থে।১ আমার আলোচ্য এই গ্রন্থের একটি প্রবন্ধ, সংগীতের মুক্তি, – বরং এই নিবন্ধে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন বক্তব্যের একটি বিশেষ বিষয় – কাব্যের ছন্দ-লয় এবং সংগীতের ছন্দ-লয়, এই দুই ক্ষেত্রের মধ্যে একতা এবং বৈষম্য। আমার বিচার এবং মতামত জানানোর আগে রবীন্দ্রনাথের প্রস্তাব-চিন্তা-বক্তব্য শুনতে এবং বুঝতে হবে। অতএব দীর্ঘ হলেও ঐ প্রবন্ধের কিছু অংশ নিচে পুনর্মুদ্রিত হলো।
‘কাব্যে ছন্দের যে কাজ, গানে তালের সেই কাজ। অতএব ছন্দ যে নিয়মে কবিতায় চলে তাল সেই নিয়মে গানে চলিবে এই ভরসা করিয়া গান বাঁধিতে চাহিলাম। তাহাতে কী উৎপাত ঘটিল একটা দৃষ্টান্ত দিই। মনে করা যাক আমার গানের কথাটি (সম্পূর্ণ…)

ফ্রিদা কালো: বেদনার্ত রংয়ের সম্রাজ্ঞী

লুতফুন নাহার লতা | ৬ জুলাই ২০১৫ ১২:১৭ অপরাহ্ন

frida-kahlo.jpgআজ তার জন্মদিন । শুভ জন্মদিন ফ্রিদা কালো !

আমার নিজের জীবনের পরতে পরতে যে শিল্পীর বেদনাঘন জীবন এসে ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেছে বারবার সেই প্রিয় শিল্পী ফ্রিদা কালোকে নিয়ে লিখতে চেয়েছি অনেক আগেই। জানার স্বল্পতাকে অতিক্রম করে আরো বেশী জানতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় কেটে গেছে অনেকটা সময়! লেখা আর হয় নি ।

ফ্রিদা কালোকে বলা হয় বিংশ শতাব্দির সবচেয়ে বেদনালীন এক শিল্পী যিনি সৃষ্টি করেছেন এক জীবনমথিত বেদনাগাঁথার ধারাবাহিক ক্যানভাস। যাতে ঠাঁই পেয়েছে তার ছোট্ট বেলার নীল বাড়ী। জন্মের পরে কঠিন ব্যাধি পলিও। ১৮ বছর বয়সে স্কুল বাসে ভয়াবহ এক্সিডেন্ট। হাসপাতাল, নার্স, তীব্র ব্যথা, সমস্ত শরীর জুড়ে বেদনার দুঃসহ নীল নির্যাস। মেক্সিকান বিপ্লব, মেক্সিকান শিল্প, প্রাচীন সভ্যতা,স্বামী দিয়েগো রিভেরা, সম্পর্কের টানাপোড়ন, প্রেম, বানর, গাছপালা , কন্টক, শেকড়বাকড়, রিবন, রঙিন গাউন, ফুল, লতাপাতা সর্বোপরি সন্তান ধারণের অক্ষমতার হতাশা ও অশ্রু। এর সকল কিছুই তাঁর ছবির প্রধান উপজীব্য।

ফ্রিদা কালো বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সবার চেয়ে আলাদা এক অপরূপ সৌন্দর্য মাখা মুখাবয়ব, এক তড়িত আলোক শিখা। যার পরনে উজ্জ্বল রঙের দীর্ঘ ঘাগরা, নীচে রিবনের কারুকাজ। গলায় ঝোলান রঙিন উত্তরীয় আর তাঁর মাথায় সাজানো ফুলের পশরা, যেন এক অভূতপূর্ব ফুলদানী। লম্বা কালো চুলে দুদিক দিয়ে কলাবেনী গেঁথে তাতে তাজা ফুল দিয়ে সাজানো। যেন অনন্যসাধারণ এক পুষ্প প্রদর্শনী। কত যে সহজ কত যে মনোহর। (সম্পূর্ণ…)

আন্তোনিও মাচাদোর কয়েকটি কবিতা

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস | ৫ জুলাই ২০১৫ ১০:৫৫ অপরাহ্ন

machado_picasso-ii.jpg
আন্তোনিও মাচাদোর প্রতিকৃতি: পাবলো পিকাসো
স্প্যানিশ সাহিত্যের আধুনিক পর্বের শ্রেষ্ঠ কবিদের মধ্যে অগ্রগণ্য আন্তোনিও মাচাদো। এ যুগের কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোর্কা ও হুয়ান রামোন হিমেনেথ বাংলাভাষায় যতটা অনূদিত ও পরিচিত, ততটা পরিচিতি পাননি এই অসামান্য স্প্যানিশ কবি। বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ অনুবাদকদের একজন খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের মূলোপম তর্জমা, গদ্যভাষ্য ও কন্ঠে আর্টসের পাঠকদের জন্য প্রথমবারের মতো ত্রিতল বিন্যাসে উপস্থাপিত হলো স্প্যানিশ ভাষার জীবনানন্দ দাশ আন্তোনিও মাচাদো। বি.স. (সম্পূর্ণ…)

« আগের পাতা | পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com