গল্প

কানা ফকিরের বেটা, গোরস্তানের দারোয়ান, বেটার মা…

আফসান চৌধুরী | ১৪ মে ২০১৭ ৮:৪৫ অপরাহ্ন

Fakir
কানা ফকির: ফকিরের পোলাটা বড় একটা কালো গাড়ির ধাক্কায় মাথা থ্যাতলাইয়া মইরা গেল। কেউ কাছে পৌছানোর আগেই গাড়ি হাওয়া। পোলাটার কিচ্ছু আস্ত আছিল না। বস্তার মধ্যে ঢোকায় ঢোকায় পোলাটার হাত,পা, মাথা ভইরা দিল। ফকিরেও কইল সরকারি গোরস্তানে যাইতে। সঙ্গে গেছিল মজনু। হের কাম আছিল না। হের ধান্দা রাতে।

গোরস্তানের দারোয়ান: গুলশান লেকের মধ্যে ময়লা ফালাইয়া সরকার এক্ষাণ গোরস্তান বানাইছে ফুটপাতের মানুষের লাইগা। মইরা গেছে যাগ দেশে যাওনের পয়সা নাই। কবরস্তানের পাশে ছোট একটা চঙ্গের দোকান। এতে পুরান কাফন, আগড়বাতি, জিলাপি পাওয়া যায়। মাটিতে ছোট ছোট গর্ত করা। এর মধ্যে মাইনসে মূর্দা গাইরা দেয়, পয়সা দিতে হয় না। রাতে কুত্তা আইয়া চিল্লা-বিল্লা করে। কানা ফকির পোলাটারে বস্তাসহই ভইরা দিল গর্তে। কেমল লাগতাছে দোস্ত। ভালোই তে কাম করলি, সাব্বাস। এইটা কইয়া মজনু তার পিঠে থাপ্পর দেয়। দারোয়ানটা ৫০০ টাকা লয়, কয় রশিদ দিতে পারুম না। ৫০ টাকার জিলাপি কিনা দুইজনে চইলা আসে। (সম্পূর্ণ…)

ইশরাত তানিয়ার গল্প: মৈত্রী এক্সপ্রেস

ইশরাত তানিয়া | ৩ মে ২০১৭ ৮:০০ পূর্বাহ্ন

Isratকিছু ট্রেন আছে। জীবনে কখনও ধোঁয়া উড়িয়ে এমন ট্রেন এলে, চোখ মুছতে হয়। গন্তব্য মোহাম্মদপুর থেকে কৃষ্ণপুর ভায়া নিঝুমপুর। নিঝুমপুরের গল্পবলা গাঁওবুড়ো উঠে পড়েছিল সে ট্রেনে। মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়েছিলে তুমি। হাতে লাল-নীল বেলুন। দুপাশে মাসকলাইয়ের ক্ষেতে সামান্য হাওয়া এলেই শিহরণ। সেদিন আর মটরশুঁটি গাছের তলে শুয়ে চিকন পাতার ফাঁকে আকাশ দেখতে ইচ্ছে করে না। শুধু বিকেলের দিগন্তে অপসৃয়মাণ ট্রেন জানিয়ে দিয়েছিল কত সহজ চলে যাওয়া।

অনাড়ম্বর অথচ গম্ভীর। একটু কেশে ধীরে ধীরে ট্রেন একপা দুপা ফেলে এগিয়ে যায়। এই ক্রমশ অস্তিত্ব মুছে যাওয়া, ছোট্ট দুটি হাতে কি করে থামাবে তুমি? কি বিশাল লোহার শরীর! তুমি তো আটকাতে পারোনি ওই সূর্য ডুবে যাওয়াও। তাই এত অ-সুখের হিম ঝরে সন্ধ্যের ঘাটে। আর অসুখ এলেই তোমার মনে পড়ে এক ওষুধের নাম।

হুইটম্যান পড়ছিল হিমিকা, বলল- “অল দিজ সেপারেশান্স এন্ড গ্যাপস শ্যাল বি টেকেন আপ এন্ড হুকড এন্ড লিঙ্কড টুগেদার।”

“সুরভী আছে গাড়িতে। কল কেটে দিচ্ছি। প্লিজ।” টেক্সট পাঠিয়ে ফোনটা চিবুকে চেপে সুরভীর দিকে তাকিয়ে হাসলে তুমি। (সম্পূর্ণ…)

একজন ভাত ব্যবসায়ীর সাথে ঘটে যাওয়া কিছু খণ্ড দৃশ্য

আশরাফ জুয়েল | ২৩ এপ্রিল ২০১৭ ৬:০৩ অপরাহ্ন

“ঐ চুতমারানির পোলা, কি অয়ছে? আমি কি তর বাপের লগে শুইতে গেচি? ভাগ খানকির পোলা, রাস্তা মাপ। এই সক্কাল রাইতে ভজর ভজর চোদাইতে আইচে, ফাল পাড়বি তো গুয়ার ভিত্রে…”-

(এই ধরণের উপভাষা দিয়ে যখন একটা গল্প আরম্ভ হয় তখন সেই গল্পের গতিবিধি, এমন কি এর অন্তিম পরিণতি কি তা অনুমান করা কিছুটা সহজ হয়ে যায়। গল্পের এমন একটা অবস্থায় পাঠকের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকে তিনি কোন ধরণের সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যাবেন- এক্ষেত্রে পাঠকের সম্ভাব্য সিদ্ধান্তসমূহ জেনে নেবার চেষ্টা করা যেতে পারে-

ক। অশ্লীল শব্দ ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে গল্প পাঠে বিরত থাকা।
খ।
গ।
ঘ। শত অনিচ্ছা স্বত্বেও গল্পটার সাথে খানিকটা এগিয়ে যাওয়া।

একজন লেখক সব সময় আশাবাদী মানুষ, তাই ‘ঘ’-কে পাঠকের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত ধরে নিয়ে সম্মানিত পাঠক এবং গল্পটির সাথে এগিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। )

Monirul Islamশাহবাগ মোড়ে দাঁড়িয়ে টি এস সি-এর দিকে তাকালে প্রথমে কি কি চোখে আসে? বামে তাকালে ফুল মার্কেট, ডানে যাদুঘরের গেট। আরেকটু এগোলে ডানে পাবলিক লাইব্রেরী, বামে শাহবাগ থানা, আর খানিকটা এগোলে বামে ময়লা ফেলার ভাগাড় ডানে চারুকলা, দৃষ্টিকে আরও খানিকটা দূরে ছুঁড়ে মারলে বামে ছবির হাট, ডানে কবি কাজী নজরুল ইসলামের সামাধিস্থল। কি অদ্ভুত? ফুল মার্কেট, যাদুঘর, পাবলিক লাইব্রেরী, থানা, চারুকলা, ময়লা ফেলার জায়গা, ছবির হাট, নজরুল ইসলামের সামাধিস্থল! কারো সঙ্গে কারুরই কোন সামঞ্জস্য নেই তবু এরা নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে, মানিয়ে নেয়া শিখেছে, শিখে নিতে হয়েছে। এই গল্পের প্লট টি এস সিমুখী নয়। বরং আজিজ’কে পেছন করে দাঁড়িয়ে সামনে এগিয়ে যেতে থাকলে যা যা চোখে পড়বে- তাদের পাশ কাটিয়ে আরও খানিকটা এগিয়ে মৎস্য ভবনের দিকে। শিশু পার্কের বিপরীতে ঢাকা ক্লাব! এক পা দুই পা করে আরও খানিক এগিয়ে গেলে দেখা যায়- হ্যাঁ এই জায়গাটাতে রমনা পার্ক-সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, পরস্পরকে চুমু দেয়ার ভঙ্গিতে ঠোঁট বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু চুমু দেয়া হচ্ছে না। ঠোঁটের মাঝ বরাবর পিচ ঢালা ঢাকার নৃশংস রাজপথ। এই- এই জায়গাটা হচ্ছে এই গল্পের প্লট। সোহরাওয়ার্দীর দিকে মুখ হা করে দাঁড়িয়ে থাকা ফুটপাত, মানে রমনা’র গা ঘেঁষে আছে যে ফুটপাত তাঁকে আশ্রয় করে গড়ে উঠেছে একটা খুপরি। খুপরিটাকে কেন্দ্র করে একটা সংসার ঘুরপাক খায়। সদস্য- সখিনা সঙ্গে পাঁচ ছয় জন বাচ্চা, একটা লালা, লালার বাচ্চারা, আর অসংখ্য খদ্দের, ভাতের খদ্দের। (সম্পূর্ণ…)

কদম মোবারকের কাছে এক দুপুর

কাজল শাহনেওয়াজ | ২১ এপ্রিল ২০১৭ ১০:৫৫ পূর্বাহ্ন

Rashid Chowdhuryনারায়নগঞ্জের নানাভাইয়া নবীগঞ্জে নিয়ে গেলেন পাথরে খোদানো নবীজির চরণ মোবারক কদমবুছি করাইতে। মাসুম কাবুলি নামের এক আফগান যোদ্ধা এটা কিনেছিলেন আরব ব্যবসায়িদের কাছ থেকে। এই ভদ্রলোক ঈশা খা’র সাথে মিলে আকবর বাদশাহর ফৌজের সাথে যুদ্ধ করে বাংলার একাংশকে কিছুদিন স্বাধীন রেখেছিলেন। শেষ রক্ষা করতে পারেন নাই যদিও।

নবীগঞ্জ ছিল পাটের শহর। গুদামের। বৃটিশ কম্পানির কলোনিয়াল ছাপ এর অলিতে গলিতে। পূরানা আমলের চিকন চিকন রাস্তা। উইলসন রোডে নানার বাবার বাড়ি।

‘মাম তুমি বুঝতে পারছো না, এইটা ট্রায়াঙ্গুলার না, সার্কুলার। সম্পর্ক এরকমই হয়।’ প্রিণন ওর মাকে বলছে।

‘আচ্ছা এখানে কলাগাছিয়া কই?’
নানাভাই অবাক হন, ‘কলাগাইচ্ছা? তুমি এই নাম জানলা কেমনে ভাইয়া?।
‘এইখানে ধলেশ্বরির সাথে শীতলক্ষ্যা মিলেছে না? তারপর মেঘনার সাথে?’

প্রিণন হাতের ট্যাবে মাথা ঝুকাইয়া থাকে।
ওর চোখ গুগল ম্যাপে। কিন্তু নানাভাই ভাবছে এত কিছুর ভিত্রে এই বালক নদী খুজছে ক্যান?

নারায়নগঞ্জ থেকে নবীগনঞ্জ বড় জোর ৩০০ গজ নদীর এপাড় ওপাড়। কিন্তু কোন ব্রীজ নাই। খেয়া নৌকায় হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন যাতায়াত করে। সড়ক ব্যবস্থার নিদারুণ হাস্যকর প্রহসন। পাটের জমানায় কলকাতার ব্যাংক থেকে মাস পয়লা বেতনের টাকা নিয়া সি-প্লেন নামতো, আর নবীগঞ্জের ইংরেজ ক্যাসিয়ারই সেই টাকা রিসিভ করতো। নারায়নগঞ্জ তখন কেবল স্টিমার ঘাট আর রেল স্টেশন! ঢাকা-নারায়নগঞ্জ-গোয়ালন্দ-কলকাতা। শহর বলতে নবীগঞ্জ। পাটগুদাম, চিকন রাস্তা, গ্যাসের স্ট্রিট লাইট আর কদম রসুল। পাট শ্রমিকদের দরগা। রসুলের পায়ের ছাপের পাথর টুকরা! কদম রসুল। (সম্পূর্ণ…)

শারমিন শামসের গল্প: ক্যারাভান

শারমিন শামস্ | ১২ এপ্রিল ২০১৭ ১২:৪৩ অপরাহ্ন


– একটা উঁচু পাহাড়ঘেরা শান্ত ছিমছাম শহর, সেইখানে এসে দাঁড়াবে আমার ক্যারাভান
– ক্যারাভান থাকবে?
– উমম নাও থাকতে পারে। আচ্ছা ধরে নিলাম থাকবে নাহ
– হুম
-একটা রাকস্যাক নিয়ে আমি এসে থামবো ওই শহরে। তারপরে সেখানেই থাকবো যতদিন মন চায়
– তারপর
– তারপর আর কি? তারপর নতুন শহর নতুন গ্রাম নতুন কোন দেশ ডাক দেবে। আমি চলে যাব
– হুম
– আই নিড মানি। আই নিড এ ওয়ে অফ আর্নিং এন্ড ট্রাভেলিং অ্যাট দ্য সেইম টাইম
– হাও?
– আই ডোন্নো
– হুম
কথাবার্তা এই পর্যন্ত এগোয়। তারপর থেমে যায়। পরের সাত আটদিন কোনভাবেই মিঠু নামের মেয়েটার কাছে পৌঁছুতে পারেন না তৌফিক। না ফোনে না চ্যাটবক্স। তারপর হুট করে একদিন তার অফিসে এসে হাজির মিঠু। তৌফিক তখন কেবল বোর্ড মিটিং শেষ করে নিজের ঘরে এসে লাঞ্চের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পিএ লাবনী জানায়, মিঠু নামের একটা মেয়ে দেখা করতে চায়। আধাঘণ্টা হলো এসে বসে আছে।
মিঠুর আসা অবাক হবার মত কিছু না। মিঠু কখন কী করবে তা এই মেয়ে নিজেও বলতে পারবে না। তবু তৌফিক কিছুটা অবাক হন।
Caravan
– অফিস চিনলে কীভাবে?
– এইটা কোন ব্যাপার হলো! তোমার এত্ত বিখ্যাত অফিস।
– হুম তাই!
মিঠু মিষ্টি করে হাসে। (সম্পূর্ণ…)

জীবন্ত মানুষ এবং আটপৌরে ঘ্রাণের আখ্যান

অলভী সরকার | ২৯ মার্চ ২০১৭ ৮:০৭ পূর্বাহ্ন

ঠাকুমা মারা গেছেন!!!
যার শরীর জুড়ে ‘রতন’ জর্দার মাতাল করা ঘ্রাণ, সেই ঠাকুমা মারা গেছেন।

দিব্যি সুস্থ মানুষ। লোকে বলে, অকারণে ছটফট করে, অবশেষে ততোধিক শান্ত হয়ে মারা গেছেন। সকালবেলা খালি পেটে খুব করে রতন জর্দা দিয়ে পান খেয়েছিলেন। যাতে প্রেম, তাতেই মৃত্যু। যে, মানুষের সবচেয়ে আপনজন, তারই তো সুযোগ থাকে ঘাতক হবার!

ঠাকুমা কেন ‘রতন’ জর্দা খেতেন, আমি ঠিক জানি না; এখন জানার কোনো উপায়ও নেই। অবশ্য নৃ-তাত্ত্বিক গবেষণার পথ বেছে নিলে ভিন্ন ব্যাপার। কিন্তু, গবেষণায় সবসময় সত্যিকারের তথ্য পাওয়া যায় কি? সে যাই হোক, শুধু মনে পড়ে, গ্রামের বাড়িতে গেলে খুব ঘটা করে বাবা ‘রতন জর্দা’ কিনতেন। কোনো ব্র্যান্ডিং- এর ব্যাপারস্যাপার ছিল বোধহয়; এখনকার আরো অনেক কিছুর মতোই। মানুষ ভোগ্যদ্রব্যের দাসত্ব কত আগে থেকেই করতো, কে জানে!

old-womanপূর্বপুরুষের ভূমি থেকে আড়াইশো কিলোমিটার দূরে, যে জায়গাটিতে আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে, তাকে আমি বলি স্বয়ংসম্পূর্ণ জেলখানা। এর উঁচু প্রাচীরের ঘের দেয়া আওতার ভেতর সব ছিল- স্কুল, কলেজ, কিন্ডারগার্টেন, হাসপাতাল, বাজার, আবর্জনা, নর্দমা- সবকিছু। যা ছিল না, তা হল,বাইরে যাবার সুযোগ এবং মানসিকতা। আর, প্রয়োজনই বা কী? মানুষ স্বভাবতই আরামপ্রিয়। ‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে?’- বস্তুত, হৃদয়-শরীর- কোনোটা খুঁড়েই মানুষ বেদনা জাগাতে চায় না। আমার কৈশোরও সীমাবদ্ধ ছিল কিছু নির্দিষ্ট মানুষের চেনা চাহনি, হাসি, কথা, খেলাধুলা, হাঁটার ভেতর।

নিজের একটা জগৎ তৈরি করেছিলাম আমি। স্কুল থেকে ঠিকঠাকমতো হেঁটে এলে বাসায় পৌঁছতে সময় লাগতো পাঁচ মিনিট। আমি রাস্তার বাম-ডান এবং ডান-বামে কোনাকোনি হেঁটে আসতাম, যাতে সময় বেশি লাগে। চেনা মানুষের গণ্ডির বাইরেও দু’একটি মানুষ আমার জীবনে জায়গা করে নিল। ওরা আসতো আশে পাশের গ্রাম থেকে- কেউ ভিক্ষা করতে, কেউ দুধ বিক্রি করতো, ছিল ছাই-বিক্রেতা, এলাকার শাক নিয়ে আসতে অনেকে। (সম্পূর্ণ…)

একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ: ওরা কারা

রুখসানা কাজল | ২৬ মার্চ ২০১৭ ১০:০১ পূর্বাহ্ন

তালিয়া
গার্লস ইশকুলের রাস্তা দিয়ে যতবার গাড়ি যায়, তালিয়া ততবার ইশকুলের গেটটা দেখে শিউরে ওঠে। পাশে বসা সহকর্মী বা অন্য কাউকে অবশ্য বুঝতে দেয় না। এমনিতে পাথরের মত মুখ করে থাকে। দরকারের বাইরে বাড়তি কথা খরচ করে না। প্রয়োজনের অতিরিক্ত হাসে না। স্থানীয় কেউ কথা বলতে গেলে দূরত্বের কঠিন গন্ধ পায়। ফলে স্থানীয় কারো সাথেই কাজের বাইরে কোন সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি তালিয়ার। স্বামী রায়হান ইউএনডিবির চাকুরে। আজ এদেশ কাল ওদেশ। একমাত্র ছেলে স্বাগত সিডনি। কম্যুনিকেশন এবং জার্ণালিজমে পড়াশুনা করছে। ছেলের খুব ইচ্ছে এদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে পরিবর্তনশীল সাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে লেখালেখি এবং ফিল্ম বানানোর।
মুক্তিযুদ্ধে রায়হানের বাবাকে মেরে ফেলেছে স্থানীয় রাজাকাররা। রায়হান বাবাকে পেয়েছিল মাত্র আট মাস। বাবার সাথে কিছু ছবি ছাড়া আর কোনো স্মৃতি নেই ওর। মামারা অল্পবয়সি মাকে বেশিদিন একা থাকতে দেয়নি। দ্বিতীয় বিয়ের ফলে মা হয়ে যায় প্রবাসি। একলা পড়ে যায় রায়হান। একবার দাদাবাড়ি একবার মামাবাড়ি। শেষ পর্যন্ত ক্যাডেট ইশকুল এন্ড কলেজ পেরিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং। কি যে নেশা রায়হানের যেখানেই একাত্তরের কিছু হয় ও পাগলের মত ছুটে যায়। ছেলে স্বাগতের তখনো কথা ফোটেনি ভাল করে সেও বাবার সাথে মাথা দোলায়, আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসিইইইই –
রায়হান কতবার ডেকেছে, হাত ধরে টেনে নিয়েছে, তালিয়া একবার গলা মেলাও, প্লিজ! ছেলে চোখে, মুখে, চিবুকে চুমু খেয়ে বলেছে, গাও মা গাও—তালিয়া কখনো গায় নি। ওর মা জেলা শহরের গার্লস ইশকুলের হেডমিস্ট্রেস ছিল। মার কাছে গল্প শুনেছে সদ্যস্বাধীন দেশে নাকি নিয়ম করে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হত। এসেম্বলীতে সব ধর্মের ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে ধর্মপাঠও করানো হত। এমনকি এক ধর্মের ছাত্রি অন্য ধর্মের আয়াত, শ্লোক, বাণী পাঠ করলেও কেউ কিছু মনে করত না। সম্প্রীতির সহবস্থান ছিল, মায়া মমতা ছিল, ভালোবাসা ছিল। তালিয়ার সময় এগুলো আর হয়নি। এসেম্বলিই হত না নিয়মিত। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার সাথে সাথে সম্প্রীতি, সদ্ভাব উবে গিয়ে দেখা গেলো নিজস্ব সংস্কৃতি ভুলে বাঙালীরা দ্রুত খাঁটি মুসলিম হতে উঠে পড়ে লেগে গেছে। এমনকি কেউ কেউ বলেও ফেলেছে, হিন্দুর লেখা গান কেনো বাঙালি মুসলিমদের জাতীয় সংগীত হবে?
three-girlsমা ছিল জয়বাংলার কট্টর সমর্থক। বাবা নামের লোকটা যুদ্ধের পর পর পালিয়ে চলে যায় ইংল্যান্ড। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর একবার এসেছিল। পাকিস্তানের সমর্থনে আর বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে ছেলেমেয়েদের আজেবাজে কথা শেখানোর পাশে পাক সার জমিন নামে একটা গানও শেখাতে শুরু করে। মা প্রচুর আপত্তি করে। আপত্তি থেকে ঝগড়া আর ঝগড়া থেকে ছেলেকে নিয়ে চলে যাওয়ার হুমকি দিলে মা কি সব কাগজপত্র বের করে বলে, এক্ষুণি বেরিয়ে না গেলে পুলিশের কাছে যাবে। আর আসেনি লোকটা। শুনেছে পাকিস্তানী কোন মহিলাকে বিয়ে করে ইংল্যান্ডে ভালই আছে। বাবা চলে যাওয়ায় মা বা ওরা কেউ দুঃখ পায়নি। বরং যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল। তালিয়া বেশি খুশি হয়েছিল কারণ বাবাটা সুযোগ পেলেই তালিয়ার পিঠ খামচে দিয়ে বলত, তোর জন্যে পাক সার জমিন। তু তো হাফ পাকিস্তানি হ্যায়। (সম্পূর্ণ…)

সাগুফতা শারমীন তানিয়ার গল্প: অপ্রাপনীয়া

সাগুফতা শারমীন তানিয়া | ২০ মার্চ ২০১৭ ৬:০৬ অপরাহ্ন

-“জানো তো, ‘অন্যায় অবিচার’ সিনেমায় আমার এক রাঙাদাদা মিঠুন চক্রবর্তীর স্যাঙাতদের একজন হয়ে নেচেছিল।”
পোড়া হাতরুটির ফোস্কা ফুটো করে তাতে মিষ্টিকুমড়োর ঘ্যাঁট মাখিয়ে খেতে খেতে বলি আমি। হঠাৎ করেই। যেন এমন দাদার ছোটভাইকে এ’রকম পোড়া রুটি আর ঘ্যাঁট খেতে দিতে নেই। যাকে উদ্দেশ্য করে বলা, কাচা চাদরটা তারে মেলে দিতে দিতে সেই কাজরীর খোঁপায় লতিয়ে থাকা গামছাটা খুলে এলো। পেছন থেকে তার গলা-বুক-মুখের শ্বেতীর সামান্য ছোপগুলি দেখা যায় না আর তাকে টনটনে সুন্দর দেখায়। কাজের ঝি লতিকা জলে এক ছিপি কেরোসিন মিশিয়ে সেটা দিয়ে মুছে চকচকে করে দিয়ে গেছে পেটেন্ট স্টোনের মেঝে, সারা ঘরে মাথা ধরানো কেরোসিনের গন্ধ আর একটা চটচটে আর্দ্রতা বাতাসে। কাজরী আমার কথা গ্রাহ্যই করলো না, ওকে দেখলে মনে হবে ও এমনকি কোনো মানুষ কথা বলছে এমনটিও কানে শুনতে পায়নি। ক’দিন ধরে খুব বাড়িঘর সাফ করছে কাজরী, সব পুরনো ড্রয়ার, সিন্দুক নাড়াচাড়া দিয়ে- জিনিসপত্র বের করে বাড়িটা গোডাউন বানিয়ে ফেলেছে। বালতির বাকি কাপড় শুকোতে দিয়ে সে চটি ফটাফট করে চলে গেল আর আমার মনে হলো- কতদিন ‘হ্যাপিনেস’ শব্দটা কোথাও লেখাও দেখি না। কতদিন ধরে পোড়া হাতরুটির ফোসকা ফুটো করে মিষ্টিকুমড়োর ঘ্যাঁট মাখিয়ে খেতে খেতে আমি এই শেতলতলা, কচ্ছপখোলা- বারাসাতের একটা একতলা বাড়ির সামনের পানাপুকুর পাহারা দিয়ে যাচ্ছি। পুকুরটার জলে একরকমের শাদা শাদা ফুল হয়, তার বাংলা নাম ‘চাঁদমালা’।
tania-painting
ইটের রাস্তার ওপারে কলাবতীর ঝাড়ের পাশে কলতলায় ঝপঝপ শব্দে স্নান সারছে মেনকা সোরেন। দূরদর্শনের সকালের অনুষ্ঠানে কে ঝুমুর গাইছে ‘মন দে যৈবন দে, দুইঠো ডানাই লাগাই দে’। সাধ কত! স্নানের শব্দে আমার মনে পড়ে গেল শোভনের নানাজান গুনগুন করতে করতে ঝপঝপিয়ে তোলা জলে স্নান করতেন- ‘যাব নূতন শ্বশুরবাড়ি/ আহ্লাদে যাই গড়াগড়ি/ সাবান মেখে ফর্সা হবো/ কাটবো মাথায় লম্বা টেরি…’, মরচে লাল সিমেন্টের মেঝে স্নানের ঘরে- শোলমাছরঙা লোহার বালতি আর মগ। বের হবেন যতক্ষণে- ততক্ষণে বুক আর পিঠ গামছার লালে নাকি রগড়ানিতে গোলাপি লাল। অম্লানবদনে বলে ফেলতেন- “ওরে আমরা জোলার জাত। কাজীবাড়ির ধার দিয়া হাঁটতে দিত না আমাদের, অথচ ভক্ত কবীররে দত্তক নিছিল এক জোলা। কাজীবাড়ির কেহ ভক্ত কবীরের নাম জানে না অবশ্যি।” (আমার ওঁর মতো করে বলতে ইচ্ছে করে, মেনকা সোরেনের বাড়ির কেহ একলব্যের নাম জানে না অবশ্যি।)আমরা শোভনদের গ্রামের বাড়িতে থেকেছিলাম মুক্তিযুদ্ধের সময়। আমার দাদা মেঘালয়েপাহাড়ঘেরা জাওয়াই উপত্যকার ‘ইকো-১’ নামের একটা ট্রেনিং সেন্টারে চলে গেছিল, পরে ফিরে এসে খুব যুদ্ধ করেছিল দাদা- আমরা ভেবেছিলাম দাদাকে ‘বীরপ্রতীক’ উপাধি দেয়া হবে। আর কাজরী কি না আমাকে কালো রুটি আর ডেলাপাকানো ঘ্যাঁট খাওয়াচ্ছে। (সম্পূর্ণ…)

দাঁড়াও পথিক

আকতার হোসেন | ২০ মার্চ ২০১৭ ১১:৩২ পূর্বাহ্ন

ভ্রূণের মধ্যে আটকে আছি শত বছর ধরে। জঠর থেকে জঠরে হস্তান্তরিত হয়েছি, পেয়েছি শত মায়ের আদর। ভাবছি এবার গ্রিন সিগনাল দেব। বেরিয়ে আসবো অন্ধকার থেকে। পাশে দাঁড়াবো আতঙ্কগ্রস্থ পিতার। হাত ধরবো প্রিয়ভাষিণীর। ভয়ানক অশান্ত হতে যাচ্ছে তোমাদের শহর বন্দর গ্রাম। আমি প্রস্তুত। খুলে দাও কপিকল। সীমান্ত সীমানায় তাঁর হুকুমের অপেক্ষায় আমি।

Afsanপ্রথমে যাবো টুঙ্গিপাড়া করবো সেলাম গেমাডাঙ্গা স্কুল। মধুমতীতে সাঁতার কেটে খুঁজবো শেখ মুজিবের গাঁয়ের গন্ধ। তারপর শিলাইদহ কুঠি বাড়ি থেকে সরাসরি যাব সীতাকুণ্ড। অমিত পুরুষ নুরালদীনের রংপুরে রাখবো পা। সেন্ট মার্টিনের পানি থেকে নামাবো বিষ। খাঁচায় পুষে রাখা অচিন পাখীর কণ্ঠ শুনে আসবো। বাংলাদেশ না হলে অন্য কোথাও নামবো না, অন্য গ্রহ নক্ষত্র করবো না স্পর্শ।
ফিরে আসবো সেই বাংলাদেশ থেকে যতদিন দেখতে পারি দেখব তাল বেল সুপারির দেশ। রহিমুদ্দিনের ছোট্ট বাড়ি যাব মুড়কি খেতে। পড়ে থাকা রাইফেল তুলে নিয়ে ট্রিগারে টিপ দিব। মরুক শালার আশি বছরের শত্রু -তাতে কি। বয়স মানে না শত্রু মিত্র খেলা। শুধু ভালোবাসার বয়স নির্ধারিত। আজন্ম তার সীমানা। বাকি সব সুতোয় বাঁধা গুটি গুটি তসবি চিহ্ন।

জন্ম নিয়েই সেই স্কুল পড়ুয়া কিশোর হব। তারপর সুপ্রিমকোর্টের ভাস্কর্য নিয়ে বিভ্রান্তি মেটাবো। মুছে দিব সংখ্যালঘু শব্দটি। হেলতে দুলতে থাকা চব্বিশ হাজার নত শিরকে ইস্পাতসম কঠিন করে তুলবো। ওরাও হবে বাংলাদেশের অংশ। ফিরে এলে ফিরিয়ে নেব, না হলে কচুকাটা করবো আগাছার মত। ফাঁসি দিলে বলবো রশি বদলাও। ক্ষুদিরামের দড়িতে পিচ্ছিল মোম লাগাও সেই দড়িতে মরবো। (সম্পূর্ণ…)

মণীশ রায়ের গল্প: টিয়া

মণীশ রায় | ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ১২:৪৯ অপরাহ্ন

1229055-7ইলিয়াছ আজ রোমান্টিক হতে চায়।
কৈশোরে সে এক আঁতেল বন্ধুকে এর মানে জিজ্ঞাসা করেছিল।
সে রবীন্দ্রনাথের ফটিকের মতো নিঃসীম আকাশে চোখ ফেলে উত্তর দিয়েছিল,‘ওড়াওড়ি।’
কমবয়সের শব্দ তো; সঙ্গে সঙ্গে গেঁথে রইল অন্তরে।
এখনো শব্দটা কোথাও উচ্চারিত হলে হাসানের সেই স্মৃতিটা মনে পড়ে যায়। ওড়াওড়ি ওর জন্য শব্দ নয় কেবল; বন্ধু হাসানের মুখ থেকে শোনা স্মৃতিময় এক চিত্রকল্প।
আজ সে রোমান্টিক ওড়াওড়িতে নিজেকে জড়াবে; এজন্য দুমাস আগে থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ছুটির দিনে ঘুরে-ঘুরে লাল পাঞ্জাবী কিনেছে। ক্রেডিট-কার্ডের ১০% সুবিধা ভাঙিয়ে কান্তার জন্যে উপহার হিসাবে পারফিউমের সেট নিয়েছে।
ইটালিয়ান জুতো কেনার শখ থাকলেও দরদামে বনিবনা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত মধ্যবিত্ত-জনপ্রিয় টেকসই বাটার স্যান্ডেল জোড়াই পায়ে গলাতে হয়েছে।
ব্যাংকের কর্মকর্তা সে। বছর চারেকের চাকরি জীবন; এরই মাঝে সে একটি পদোন্নতিও বাগিয়ে ফেলায় মনে মনে সে খুব গর্বিত। সম পদমর্যাদার বয়স্ক সহকর্মীদের দিকে তাকিয়ে প্রায়ই ওর কেন যেন হাসি পায়। কান্তার মন জয় করার মতো পদোন্নতিও ছিনিয়ে নিতে পারায় ওর মেজাজ-মর্জি নিমহাওয়ার মতো স্বাস্থ্যকর ও ফুরফুরে।
এরকম মন নিয়ে ইলিয়াছ আকদ হওয়া স্ত্রী কান্তার সঙ্গে দেখা করতে চলেছে আজ।
এজন্য এক সপ্তাহ আগেই বসের কাছ থেকে একদিনের নৈমিত্তিক ছুটির অনুমোদন পেয়েছে। (সম্পূর্ণ…)

মাহী ফ্লোরার গল্প: ঝোঁক

মাহী ফ্লোরা | ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ৪:০৬ অপরাহ্ন

কল ছাড়ার শব্দ পেতেই দেবব্রত চঞ্চল হয়ে ওঠে। হাতের পত্রিকাটা আস্তে করে নামিয়ে রাখে পাশে। সাড়ে সাতটা বাজতে ঠিক পাঁচ মিনিট বাকি। মিনতি এ সময় খুব দ্রুত হাতে সকালের নাস্তার জন্য লুচির আটা মাখে। তার শাখা নোয়ার সাথে পিতলের বাসনে ঠোকার আওয়াজ বড্ড মধুর লাগে। স্টোভের শোঁ শোঁ শব্দ প্রেসার কুকারের সিঁটি সব ছাপিয়েও কল ছাড়ার শব্দটা দেবব্রতকে টানে। পা টিপে টিপে দরজার কাছে এসে দাঁড়ায় সে। বাম দিকে তাকালে মিনতির উবু হয়ে বসে থাকা নজরে আসে। বুবুন হবার পর মিনতির পিঠে ব্লাউজের ভেতর থেকে যেন বেরিয়ে আসতে চায় বাড়াবাড়ি রকমের মাংসল ভাঁজ। খোলা পিঠে ছড়িয়ে থাকা চুলের ভেতর দেবব্রত মনটাকে আটকে ফেলতে পারতো হয়ত। কিন্তু এ সময়টা ঠিক এ সময়টাতে তার আনচান লাগে।

paintings-16-728ডান দিকে কলতলার একটা অংশ ঘিরে চান করার ব্যাবস্থা। টিনের খাটো দরজা ছাদ খোলা। দরজার উপর দিয়ে সাদা ছোট পাড়ের শাড়ি আর বাদাম রং এর একটা ছায়া ঝুলছে। দরজার নিচ দিয়ে একজোড়া ধবধবে সাদা পা তাকে টানতে থাকে। দেবব্রত জুলজুল করে তাকিয়ে থাকে।
মিনতির বাবা মারা গেলেন গত পৌষ মাসে। মা তার পর থেকেই এ বাড়িতে আছে। শ্বশুরের একটাই মেয়ে হওয়ায় সব কিছু দেবব্রতকেই দেখাশোনা করতে হত। গ্রামের ছোট্ট বাড়ি আর অল্প কিছু জায়গা জমি সব বেঁচে দিয়ে দেবব্রতই নিয়ে এসেছেন তাঁকে। এখানে একটা কোনো রকম মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়ে গেছে ওই টাকায়। জায়গাটায় একটু মফস্বল মফস্বল ভাব আছে, তবু মন্দ না। (সম্পূর্ণ…)

রবিউল করিমের গল্প: মধুচক্র

রবিউল করিম | ২৭ জানুয়ারি ২০১৭ ৫:০৫ অপরাহ্ন

এই মধুচক্র কীভাবে, কোথায় শুরু হয়েছিল জানি না। কিছু দৃশ্য শুধু স্মৃতির কোঠরে লেপটে আছে। সেই লেপটে থাকা কুয়াশার পরতের তুলো একটু একটু করে সযতনে সরতে থাকলে আমি দেখি, শৈশবের মধু দৌড়াচ্ছে।
বাপ আমাকে আদর করে মধু পাগলা ডাকতেন। সেই নামের পেছনের ইতিহাসটা বড় গোলমেলে। কিন্তু আমি জানি, জন্মের পর আমার মুখে প্রথম মধুই তুলে দেয়া হয়েছিল। আর এ কথা আমাকে বলেছিল মা। মা তো মিথ্যে বলতে পারে না। যে শিশুটি পৃথিবীর প্রথম স্বাদ গ্রহণ করেছিল মধুর; সে যে ভাবিকালে মধু পাগলা হবে এতে আশ্চর্যের কী আছে?
modhu
মনে পড়ে, তখন ক্লাস টু কী থ্রিতে পড়ি। বাড়ি থেকে স্কুল প্রায় দু ক্রোশ দূরে। হেঁটেই যাই আসি। আমার সাথে যায় আমারই সহপাঠি গোল্লা, নারায়ণ, বাসেত, রমেশ, শুকবর। রমেশের বাড়ি আমাদের বাড়ির লাগোয়া। সে এসে ডাক দিলেই মা তড়িঘড়ি করে আমার চুলে তেল দিতে লাগতেন। আমি যতই বলি, হেছ তো, স্কুলত দেরি হয়্যা য্যাবিনি। ততই তিনি সরিষার তেল মাখানো আঙুল চুলের ভেতরে নিয়ে মালিশ করতে করতে ধমক দিয়ে বলতেন, থাম ছোড়া, চুলগুলার কি অবস্থা কর‌্যা রাখিছু! ইংক্যা করা স্কুলোত যায়। মাস্টার কি কবেনি? চুলেত ত্যাল দিলে মাথা ঠান্ডা থাকে। পড়াত তো আর মন নাই, খালি ছটফট। তারপর চিকন দাঁতের চিরুনি দিয়ে থুতনিটা শক্ত করে ধরে চুল আঁচড়িয়ে দিতেন। ততক্ষণে রমেশ বার কয়েক ডেকে বাইরে অস্থির। নিত্যদিন এইসব হ্যাপা সামলিয়ে যখন পড়ার বইগুলো বুকে চেপে ধরে দৌড় দিতাম; তখনো মা চেঁচিয়ে বলতেন, দেখিছু দেখিছু, এই ছোড়া পড়্যা যাবু তো। কিন্তু কোনোদিনই পড়ে যাওয়ার বিপত্তি না ঘটিয়ে দু বন্ধু ছুটে যেতাম স্কুলে। পথে সঙ্গি হতো ওরা চার জন। এই ছয়জন মিলে সেই দু ক্রোশ পথ পাড়ি দেয়া ছিল এক রোমাঞ্চকর ভ্রমণ। কখনো বাসেতদের শবরিগাছে ঢেলা দিয়ে শবরি খাওয়া, কখনো গাবলের গাছে চড়ে ঘুঘুর ডিম পেড়ে আনা, কত কী। হরিশপুরের শেষ মাথা থেকে আতাইকুলার রাধারমন প্রাইমেরি স্কুল পর্যন্ত পথে পথে ছড়িয়ে থাকত আমাদের দুষ্টামি। (সম্পূর্ণ…)

« আগের পাতা | পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com