গল্প

‘মইরা গ্যালে ওজন থাহে না’

আফসান চৌধুরী | ৪ অক্টোবর ২০১৭ ১২:৪২ অপরাহ্ন

Shilpaguru Safiuddin ahmedমইরা যাওনের পর উপরে উইঠা হারান পোর্থমে জিগাইল, হের পাশে বহা বুড়াডারে। ‘এহানে রুটি-রুজির কী ব্যবস্থা?’
এমনে এমনে যে কেউ কাউরে খাওন দেয় না হেইডা সে বুজে। বুড়াডা একটা সিগরেট খাইতেছিল, হেইডা ফালাই দিয়া কইল, ‘ওইহানে কী কাম করতিস?’
‘তেমন কিছু না, এইডা-সেইডা করতাম।’
‘তাইলে ওইডাই হইব। মরছিস তো কী হইছে, জ্যাতা-মরায় তফাত নাই। হালায় আছিলি ফালতু, এহানেও ফালতু থাকবি।’ বুড়াডা ফালাই দেওয়া সিগরেটটা খোঁজে ময়লার ভেতরে। টোকাই টোকাই কয়েক টুকরা পায়, হ্যাতে আগুন দেয়, ধোঁয়া খায় বইয়া বইয়া।

দিন দুই পর হারান যেহানে উঠছে, হেই ক্যাম্পে লোক আইয়া হের লগে আলাপ করে। ‘কী কাম পার? পানির মিস্ত্রির কাম পার? মিস্ত্রিগো অনেক দাম, নিচে কী করতা? মাগির দালাল আছিলা?’ লোকটা হাইসা হাইসা কথা হয়।
‘না, কলের কাম পারি না, আর ওই হগল আকাম-কুমামও করি নাই কোনো দিন। তয় একবার লাশ টানছিলাম। খানকিটা মইরা গেছিল, কেউ মাটি দিতে চায় নাই। আমি কান্ধে লইছিলাম, হের পর গর্ত কইরা পুইতা দিছি টানার মাটিতে।’ (সম্পূর্ণ…)

ইকতিজা আহসানের গল্প: চন্দ্রকথা

ইকতিজা আহসান | ২ অক্টোবর ২০১৭ ৫:২৮ অপরাহ্ন

Mohammed Kibriaমহাকালের কোনো এক মাহেন্দ্রক্ষণে এই অপার পৃথিবীতে হয়ত কোনো চন্দ্রলগ্ন ছিল, আর তখন হয়ত তার নাম শোভন উচ্চারণ করেছিল। তার ধারণা ছিল না, চন্দ্রলগ্নে সেইসব নাম উচ্চারিত হয়, যারা জীবনে একটা লগ্ন তৈরি করে…এবং কুণ্ডলি পাকায়ে থাকে জীবনের পরতে পরতে। এই কুণ্ডলি একটা বৃত্তের মতো… চক্রের পর চক্র গড়ে দিগভ্রান্ত করে। চন্দ্রের সাথে চক্রের এই যোগ আজন্ম। চন্দ্রের আলোর নাম জ্যোৎস্না হলেও আদতে সে যে এক বিভ্রম এটা শোভন ভালভাবেই জানে। জানলেও চন্দ্রের আকর্ষণ সে এড়াতে চায়নি কোনোকালে। সে কোন ছার! খোদ সমুদ্র যেখানে জেগে ওঠে চন্দ্রের ডাকে! সেখানে সে কেন এড়াতে যাবে চন্দ্রের আকর্ষণ। দেখা যাক না কী ঘটে…. চন্দ্র কোথায় কতদূর ভাসাতে পারে! চিরকাল এই হচ্ছে শোভনের মনোভঙি।

তো এবারও শোভন নিজেকে ছেড়ে দিল। শোভন চেয়েছিল একটা কংক্রিট কোনোকিছুর দিকে যেতে। যদিও কংক্রিট নামের যে কাঠামোর নরোম আয়েশে সাধারণ গড়পরতা মানুষ নিজেকে বন্দি করে রাখতে পছন্দ করে; শোভন সে রকম ছেলে মোটেই নয়। সে জানে তথাকথিত অকংক্রিট বলে মনুষ্য সমাজে যা প্রচলিত তাও আসলে একটা কাঠামোর নামান্তর। তাদের গড়নে, আকারে পার্থক্য হয়ত আছে, কিন্তু দুটোতেই জীবন ঠিকঠাক চলে। জীবন তো একটা মুর্তি…তাকে পছন্দের ছাচে গড়ে নিতে হয়। আর পছন্দ তৈরি হতে লাগে দর্শন।মিডিয়ার তৈরি করা দর্শনে শোভন চলে না। নিজেকে সে গড়েছে প্রতিমুহূর্তে। ভেঙেছে প্রতিমুহূর্তে। সে জানে গড়তে হলে প্রথমে ভাঙতে হয়। (সম্পূর্ণ…)

ধূসর বর্ষণমুখর বিকেলে স্বপ্নার প্রত্যাবর্তন

আনিসুজ্জামান | ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ৮:৫৮ পূর্বাহ্ন

anisur.jpgখোকন একটি ম্যাচবাক্স বানিয়েছিল, দুফুট বাই তিনফুট, উইয়ে খাওয়া কাঠের জানালার মরচে পরা শিকগুলোর পিছনে বসে শ্রাবনের এক ধুসর বর্ষণমুখর বিকেলে। যেটিকে হাতে নিয়ে স্কুল ও ৯ বছর বয়সী ছেলেকে যৌনশিক্ষা দেবার অনুমতি দেবার ফর্ম সামনে নিয়ে বহু বছর পর সূদুর ক্যালিফোর্নিয়ার চুলা-ভিস্তায় আরেক বর্ষণমুখর দিনে চুপটি করে বসে থাকবে। প্রজাপতি মার্কা বাক্সটিতে কাঠির সংখ্যা ছয়, ছয়টি ছয় সাইজের। সবচেয়ে লম্বাটার মাথাটা ওটার থেকে অপেক্ষাকৃত খাটোটির চাইতে একটু ছোট। তার পরের চারটি লম্বায় বড়গুলোর চাইতে অনেক খাটো কিন্তু ওগুলোর মাথাগুলো একই আকারের হলেও সবগুলোই লম্বায় আলাদা। ওগুলোকে বলাকা ব্লেডের অর্ধেকটা দিয়ে কেটে বানাচ্ছিল আর দেখছিল মাঝে মাঝে মেঘ ফুঁড়ে আসা সামনের বিস্তীর্ণ মাঠের ওপারে সাততলার উপরে পরা এক ঝলক প্রায় সন্ধ্যের রোদের খেলা যেটি দেখে কাজের মেয়ে রুমা বলেছিল “এউগা বেটা বইয়্যা রইছে হচ্চিমদি” আর ওরা মাসহ তিন ভাইবোন মিলে খুব হেসেছিল তাই নিয়ে কারণ ছোটটির তখনও বোঝার বয়স হয় নি। খুব সম্ভবত ঢাকায় তখন ওটি ছিল সবচেয়ে লম্বা দালানগুলোর মধ্যে একটি আর এর জন্য খোকনের মনের ভিতরে ছিল একধরনের গর্ব। মাঠটির ডানদিকে ছিল একটি লম্বা খালের মত খাঁদ যেটাতে সকালে ময়লা ফেলত আর পানি জমলে কোত্থেকে যেন রাজ্যের ব্যাঙ এসে একটার উপর আরেকটা চড়ে গান জুড়ে দিত, সন্তানকে পিঠে করে বয়ে সাঁতরে বেড়াতে মা ব্যাঙের কোনো কষ্টই হতো না। খাঁদটার অন্যপাশে ছিল সরকারী পশু খামার । ম্যাচ বাক্সটি বানিয়ে একটি কাপড়ে মুড়িয়ে ওর জীবনের সবচেয়ে গোপন জায়গায় রেখে দিয়ে উঠে পরে চিংড়ির গন্ধওয়ালা চালের উপর থেকে পেরে নেওয়া পুঁইশাক ও পাতলা ডাল দিয়ে রেশনের চালের ভাত খেয়ে শুয়ে পরবে বলে। মা ভাত বেড়ে ডাকছে আর দেরি করলে এই কষ্ট করে জোগার করা শেষ হবে কেরোসিন পুড়ে। বাবার তখন বিকেলের শিফট, আসবে সাইকেল চালিয়ে। রাত এগারোটার দিকে যখন ও টের না পেলেও আরও পরে পাশের ঘড়ের অদ্ভুত কিছু শব্দে বুঝবে মা বাবা আবারও ঝগড়া করছে কি নিয়ে যেন। কিন্তু ও কিছু মনে করবে না কারণ পরদিন সকালে দেখতে পাবে মায়ের মুখটা আগের দিনের থেকেও হাস্যোজ্জ্বল। (সম্পূর্ণ…)

মিরাকেল চুরি

কিযী তাহনিন | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ৮:৩৬ অপরাহ্ন

Monirul Islamবাহ্, একেই কি বলে মিরাকেল? বাংলায় যাকে বলে অলৌকিক কোনো ঘটনা। তবে, এক্ষেত্রে আমার ইংরেজি শব্দটি বেশি ভালো লাগে। মিরাকেল, কেমন ছন্দ আছে, জাদুময়। মনে হয়, হলো বুঝি তেমন কিছু, যেমন আগে হয়নি, তেমন কিছু, যেমন ভাবি অনেক ভাবার মাঝে। এ জীবনে, তেমন মিরাকেল কিছু হয়নি। বা ঘটেছে। হয়তো ভুলে গেছি। আমরা দুঃখ পুষতে ভালোবাসি। কিন্তু আনন্দময় কিছু ঘটে যাবার পরে, অতি দ্রুত তার সুঘ্রাণটুকু হারিয়ে ফেলি। রয়ে যায় পুরোনো ঘটনার শুকনো রসহীন কুঁচকে যাওয়া চামড়া। আর তাকে ছুঁড়ে ফেলে আবার আবার নতুন কিছু খুঁজি। ভুলে যাই পুরোনো সুঘ্রাণ কেমন ছিল। খুঁজি নতুন মিরাকেল, অলৌকিক কিছু। পুরোনোটুকু ভুলে যাওয়াতেই তখন সুখ, নতুন খোঁজায় তখন সব ভালোলাগার ঘর-বাড়ি। তাই ঠিক মনে পড়ছেনা এ মুহূর্তে, মিরাকুলাস কিছু ঘটেছিলো কিনা।

যে মুহূর্তে কলিংবেলের আওয়াজ পেয়ে, ঘুম ঘুম চোখে সকালের প্রথম দরজা খুলছিলাম, ভাবিনি এমন কিছু ঘটবে। বুঝিনি দরজার সামনে বসে সে আমার অপেক্ষা করবে। দরজা খুলে প্রতিদিনের মতন, সদ্য ঘুমভাঙা এলোমেলো আমি, মেঝে থেকে আজকের পত্রিকাটি তুলে নিলাম। পত্রিকায় বিল গুঁজে গেছে করিম হকার। বিলটি হাতে নিয়ে দেখবো যখন, তখন দু তিন পলক এদিক সেদিন হতে হতেই দেখি তিনি বসে আছে। আসনপিঁড়ি হয়ে। ঘুম পালালো, কেঁপে উঠলাম আমি, যেন বেঁচেও উঠলাম। এক প্রতিদিনের একইরকম সকাল মুহূর্তে লন্ডভন্ড, আনন্দের কাঁচভাঙ্গা ঝনঝন – মিরাকেল একদম। সামনে বসা, চোখ বন্ধ, আসনপিঁড়ি, বাম হাত তাঁর গায়ে জড়ানো টেরাকোটা রঙের চাদরে লুকোনো, অন্য হাত ডান হাঁটুর উপরে, শান্ত তিনি, তাড়াহীন, আমার সামনে তিনি। পত্রিকাটি মাটিতে নামিয়ে রেখে, খুব আলতো করে দুহাতে দুলে নিলাম তাকে। (সম্পূর্ণ…)

অতঃপর, তিনি এলেন ছুটির নিমন্ত্রণে

অলভী সরকার | ৩১ জুলাই ২০১৭ ১২:৩১ অপরাহ্ন

Shilpaguru Safiuddin ahmedবেশ ভোরে আমার ঘুম ভেঙে গেল।

ঘর থেকে বেরিয়ে, লম্বা করিডোর ধরে এগোই, একেবারে শেষ মাথায় গ্রিল দেয়া বারান্দা। এখান থেকে তাকালে হলের মূল দরজা দেখা যায়। গার্ড মামা গেইট খোলেন নি এখনো। অত তাড়াও নেই, দরজা খোলার। গ্রীষ্মকালীন ছুটি চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনেকেই বাড়ি গিয়েছে। আমরা অল্প কজন থেকে গিয়েছি হলে। ছুটি শেষ হলেই মাস্টার্স পরীক্ষা।

সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। কেমন শীতের মতো ঠাণ্ডা। গাছের নরম পাতাগুলো ঝকঝক করছে। কামিনী, মধুমঞ্জরী, হাসনাহেনা- চারপাশে বিচিত্র সুঘ্রাণ। দক্ষিণদিকের এই বারান্দায় দাঁড়িয়ে বামে তাকালে পাশাপাশি দুটি নিমগাছ। পাঁচ বছর আগে, যখন হলে প্রথম সিট পাই, তখনও বর্ষাকাল। হল-সুপারকে বলে দুটো দেশি নিমের চারা বুনেছিলাম। ওঁরা অবশ্য বেশ খুশিই হয়েছিলেন। বসতির পুব দিকে নিম গাছ থাকা খুব ভাল এমন কথাও জানলাম সেদিন।
বিশ্বাস-অবিশ্বাস বা অভিজ্ঞতানির্ভর জ্ঞান- এত কিছু ভেবে অবশ্য কিছু করিনি আমি। নেহাত, ইচ্ছে হয়েছিল তাই। এখন গাছ দুটো তিনতলার চেয়েও উঁচু। আমার হাতে লাগানো গাছ, আমার চেয়ে বড় হয়ে গেল!
এমন হয় অবশ্য।
গাছেরও হয়; এমনকী মানুষেরও…

এইসব কল্পনাবিলাসের সময় এখন নেই। (সম্পূর্ণ…)

ফারুক মঈনউদ্দিনের গল্প: শারীরবৃত্তীয়

ফারুক মঈনউদ্দীন | ২৪ জুলাই ২০১৭ ৭:২২ পূর্বাহ্ন

Shakil-story
গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের মতো লম্বা টানা ভাড়া ঘরগুলোর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কালো ময়লা জলের নালাটা লাফ দিয়ে পার হওয়ার মুহূর্তে চারপাশের ছাড়া ছাড়া টিম টিম করে জ্বলতে থাকা হলদেটে আলোর বাতিগুলো নিভে যায়। আলকাতরার মতো কালো কাদায় পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নেয় রাজিয়া। কিছুক্ষণ আগে মাগরেবের আজান পড়ে গেছে, এ সময়টাতে চারপাশের সবকিছু কেমন যেন অদ্ভুত নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কেবল আশপাশের ঝোপঝাড় থেকে পতঙ্গের ডাক করাতের মতো শব্দ করে আধো অন্ধকারের ভেতর গেঁথে যেতে থাকে। দিনের আলো নিভে যাওয়ার পর পচা পানির নালা এবং ময়লার ডাঁই থেকে নিশাচর দুর্গন্ধ চোরের মতো চুপি চুপি বাতাসের সঙ্গে মিশে ছড়িয়ে ময়লা ভেজা কাপড়ের মতো ভারি হয়ে ঝুলে থাকে যেন। বিভিন্ন ফ্যাক্টরি থেকে উগড়ে দেওয়া মেয়েদের ক্লান্ত অবসন্ন মিছিল থেকে কিছু কিছু অংশ খসে পড়তে পড়তে এ দিকটায় পৌছে মিছিলটা মরা নদীর মতো মিলিয়ে যায়। রাজিয়াদের সঙ্গে একই বস্তিতে থাকা কয়েকটা মেয়ে স্যান্ডেল ঘষটাতে ঘষটাতে ওকে ছাড়িয়ে চলে গেলে চলার গতি বাড়িয়ে দেয় ও। একটা কুনো ব্যাঙ এ সময় ওর পায়ের পাতায় পেচ্ছাব করে দিয়ে লাফিয়ে সরে যায়। এসব উপেক্ষা করে দ্রুত ঘরে ফেরার তাগিদ অনুভব করলেও পা দুটো আর চলতে চায় না যেন। (সম্পূর্ণ…)

কোঁচ ও একটি নিপুণ শেষ-শিকার

সেজান মাহমুদ | ১৭ জুলাই ২০১৭ ৮:৩৬ পূর্বাহ্ন

হুড়াসাগর নদীর শুকনা, মরা-ঢোঁড়া-সাপের-মতন চেহারাখানা দেখলে নইমুদ্দির ছোটবেলায়-দেখা নাজির চাচার বুড়া বয়সের জিনিসপত্তরের কথা মনে পড়ে। কেন মনে পড়ে তা বুঝে উঠতে পারে না নইমুদ্দি। নাজির চাচা বেহুদার মতো লুঙ্গি কাছা মেরে ন্যাটা দিয়ে বসে থাকতেন আর কখন যে বেখায়ালে জিনিসপত্তর বের হতো তা হুশ করতেন না। ফাজিল পোলাপান গলা খাঁকারি দিয়ে জানান দিতো ‘চাচা, লুঙ্গি সামলায়া বইসেন।’ আর তখন পাছার ধুলা ময়লা ঝেড়ে নাজির চাচা লাফিয়ে উঠতেন, ভাবখানা যেন পোলাপানের বলাটা মহা দোষ হয়ে গেছে। বুড়া বয়সের ঝুলে-পড়া জিনিসপত্তর যেমন কোন কামের না, হুড়া সাগরের দশাও অনেকটা সেইরকম; কোন বান আসে না নদিতে, কোন কামের না। শুকনা চরগুলো মানুষজন যে যার ক্ষমতা দিয়ে দখল করে নিয়েছে। এখন নানান ফসলের চাষবাস আর গরু চড়ানো। কেউ কেউ আরেক ধাপ সরেস; এরা নদীর জমির মধ্যেই বাড়িঘর বানিয়ে সংসার পেতে বসেছে। কিন্তু ছোটবেলায় দেখা হুড়াসাগরের উথালি পাথালি রূপ মন থেকে সরাতে পারে না নইমুদ্দি।
Sezan

নইমুদ্দি এতোটুকু চিন্তা একসঙ্গে করতে পেরে খুব আমোদিত হয়। ফুরফুরে মন নিয়ে হাটখোলার দিকে এগিয়ে যায়। আজ হাটবার। আশেপাশের গ্রামগঞ্জ থেকে মানুষ আসা শুরু হয়েছে। হাটখোলার লাগোয়া মাঠের মধ্যে ঘাসের ওপরে পাটের ব্যাপারীরা চৌকশ গলায় সহজ-সরল কৃষকের কাছে থেকে পাট কিনতে নানান ফন্দিফিকিরের কাহিনি বলতে থাকে-
–‘কয়দিন হইলো মহাজনেরা পাটকল বন্ধ-থাকায় নদিতে আটকা পইড়া আছে জানো? দাম দিমু কি নিজের প্যাটে নাত্তি মাইরা?” (সম্পূর্ণ…)

মনিকা চক্রবর্তীর গল্প: ইদিপাস

মণিকা চক্রবর্তী | ৭ জুলাই ২০১৭ ৯:০৭ অপরাহ্ন

মাছ ধরার বঁড়শিতে কয়েকটা কেঁচো গেঁথে নিয়ে বাড়ির পাশের ডোবাটায় পা বাড়াতেই সদরুল বুঝে নেয় আম্মুর সাথে নানুর আবার ঝগড়া বেঁধেছে। কয়দিন পরপরই ঝগড়া বাঁধে। টাকা-পয়সা নিয়ে ঝগড়া। আম্মু শহর থেকে প্রতি সপ্তাহেই গ্রামে আসে। সদরুলের দেখাশোনার জন্য নানুর হাতে টাকা দিয়ে যায়। নানু কোনদিনই ঠিকঠাক টাকার হিসাব দিতে পারে না। এই নিয়ে প্রায় সময়ই ঝগড়া হয়। আম্মু বলতে থাকে,‘তোমার লোভ বেশি। কত করে কইলাম সদরুলরে স্কুলে ভর্তি করাও ! করাও নাই কেন? ওর পরনের কাপড় সবগুলা ছিঁড়া। নতুন জামাপ্যান্ট কিনার টাকা দিলাম। কই? আমার সব টাকা তুমি তোমার সংসারে লাগাইলা কেন?’
নানুও বলতে থাকে,‘আমার জমিই আছে একটুকরা। গত বছর থেইকা জমিডার লাইগা মামলা চালাই যাইতাছি। টাকাডা এর লাইগ্যাই খরছ হইয়া গেছে।’
বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে যেতে সদরুল শোনে তার আম্মু কাঁদতে কাঁদতে বলছে,‘এই যাবৎ গতর দিয়া যা কামাই করছি সব তুমি শেষ কইরা ফালাইলা। তোমার লোভ এত বেশি! একবারও ভাবলা না আমার কথা! আমার সদরুলের কথা! তারে আমি আমার কাছে রাখতে পারি না বইলা তুমি সুযোগ নিতাছ! দুইন্যায় সবাই সুযোগ নেয়। সদরুলের বাপে নিছে, বেবাক মাইনষে নিছে। এহন তুমিও নিতাছ!’
সদরুল এসব শুনতে শুনতে ডোবার দিকেই এগুতে থাকে। সেখানে অপেক্ষা করে আছে তারই সমবয়সি কয়েকটি ছেলে। বয়স আট দশের মতো। কড়া রোদ উঠেছে । জঙ্গলের উপর পড়ে আছে রোদের ফালি। সে ভাবছে ডোবার উপরে ভেসে থাকা শ্যাওলাগুলোর কথা। তার নীচে অনেক ছোট বড় মাছেরা খেলা করে। কিন্তু তার কানের ভিতর আম্মুর কান্না । আর লোভ শব্দটা কেবলই কানে বাজছে। আম্মু যে লোভ লোভ করতেছে, লোভ করা কী খারাপ! তারও অনেক লোভ আছে! আপাততঃ সে একটা বড় মাছ ধরার লোভ করছে। পাশের বাড়ির মইনুল সেদিন দেড় কেজি ওজনের একটা রুইমাছ ধরেছিল। কী সুন্দর মাছটা! অনেকক্ষণ বড়শি ফেলে রাখার পর কটাশ করে ধরেছিল। পাড়ে উঠানোর পর লেজের কী ঝাপটানি! রোদ পড়ছিল মাছটার পিঠে। ঝগড়ার সংলাপ কানে নিতে নিতেই সদরুল পৌঁছে যায় ডোবার কাছাকাছি। অদৃশ্য লোভের টানে। আহা! সেও যদি মইনুলের মতো একটা বড় মাছ মারতে পারত,তাহলে আজকের এই ঝগড়া থেমে যেত। নানু মাছটাকে সুন্দর করে ভাজত। কতদিন মাছ ভাজা দিয়া মরিচ ডইল্যা ভাত খায় না। ভাবতে ভাবতে তার জিভে জল আসে। অভাবের মধ্যেই থেকেছে ছোটবেলা থেকে। ভাল খাবার মোটেই জুটেনি। আজ যদি জুটে যায় একটা বড় রুই বা কাৎলা! একটা অসম্ভব উদ্বেগ নিয়ে সে পৌঁছে যায় ডোবার ধারে। (সম্পূর্ণ…)

জেমস জয়েসের গল্প: ঈভলিন

শাকিলা পারভীন বীথি | ২৫ জুন ২০১৭ ১:০৬ অপরাহ্ন

James-Joyceজেমস জয়েস ( ১৮৮২-১৯৪১ ) একজন আইরিশ উপন্যাসিক, গল্পকার এবং কবি। তাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী সাহিত্যিক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তার বিখ্যাত গ্রন্থ Ulysses( (১৯২২)’, A Portrait of an Artist as a Young Man ( ১৯১৬ ), Dubliners ( ১৯১৪ ) । ‘ঈভলিন’ ছোটগল্পটি Dubliners গল্পগ্রন্থের একটি গল্প যেখানে ডাবলিন শহর ও শহরবাসীদের জীবন যাত্রা ফুটে উঠেছে। লেখক বিশ্বাস করতেন ডাবলিনের আছে এক চিরায়ত বৈশ্বিক হৃদয়। ইংরেজি থেকে গল্পটি অনুবাদ করেছেন শাকিলা পারভীন বীথি। বি.স.

জানালায় বসে গলির কোলে আছড়ে পড়া সন্ধ্যা দেখছিল সে। জানালার পর্দায় এলিয়ে পড়েছে তাঁর মাথা, তার নাকে ধুলিময় স্যাঁতস্যাঁতে পর্দার গন্ধ । তখন ক্লান্ত সে ।

লোকজন ঘরে ফিরছে । গলির শেষ মাথার বাড়িটার লোকটাও ফিরে এলো । তার জানালার পাশের কংক্রিটের পথ ধরে লোকটা খট খট আওয়াজ তুলে যেতে যেতে এবার পা মেলে ধরল কয়লা বিছানো পথে । লোকটার পায়ের জুতার মচমচ শব্দ শুনতে পেল সে ।শব্দটির শেষ গন্তব্য গলির মাথার শেষ লাল বাড়িটায় । ওখানে এককালে বাড়ি ছিল না । একসময় বেলফাস্ট থেকে এলো এক ধনীর দুলাল, মাঠটি কিনে নিয়ে বাড়ি বানাল । —- না, তাদের বাদামি কুঁড়েঘরের মত বাড়ি নয় । লোকটা গড়ল ঝকঝকে ইটের – গড়া চকচকে ছাদের বাড়ি । গলির কত বাচ্চারা যে ওখানে খেলত ; ডিভাইন পরিবারের , ওয়াটার পরিবারের বাচ্চারা, খোঁড়া পা নিয়ে খেলতে আসতো ছোট্ট কেঁউ, আর খেলত সে ও তার ভাই -বোনেরা । তাদের বাবা প্রায়ই হাতে বেতের লাঠিটা নিয়ে তাদের খুঁজতে সেই মাঠে চলে যেত । যেহেতু ছোট্ট কেঁউ সাধারণত বসেই থাকতো, ওদের বাবাকে দেখা মাত্র সে সতর্ক করে দিত ।এত কিছুর পরেও তখন তারা সুখীই ছিল । বাবাকে এতটা খারাপ মনে হতো না ।তাছাড়া তার মা তখন জীবিত ছিল । এরপর কত কত দিন চলে গেল ; সে ও তার ভাই –বোনেরা বেড়ে উঠল ; তার মা মারা গেল । টীজি ড্যানও মারা গেল , ওয়াটার্স পরিবার চলে গেল ইংল্যান্ডে । সবকিছুই বদলে যায় । সেও এখন প্রহর গুনছে প্রস্থানের ; অন্যদের মতোই উদ্যত হয়েছে সে পিছে ফেলে যেতে তার আপন বাড়ি–ঘর । (সম্পূর্ণ…)

মরিবার হলো তার সাধ

সাব্বির জাদিদ | ৮ জুন ২০১৭ ১১:৩১ পূর্বাহ্ন

anisurবকুল গাছের নিচ দিয়ে পথ। সবুজ ঘন ঘাসের ভেতর লম্বা হয়ে শুয়ে আছে মেটে রঙের চিকন রেখা। হঠাৎ দেখলে চুলের সিঁথির কথা মনে পড়ে যায়। আব্দুল করিম সিঁথি মাড়িয়ে ফজরের নামাজ পড়তে যাচ্ছে। আবছা আলো আবছা আঁধারের মিশেল চারপাশে। কোথাও মোরগ ডাকছে। আব্দুল করিমের মাথায় পাঁচকুল্লি টুপি। হঠাৎ কী ভেবে সে টুপিটা খোলে। দুই হাতে টুপির দুই প্রান্ত ধরে মুখের সামনে এনে জোরসে ফু দেয়। বাতাস পেয়ে টুপির পেট ফুলে উঠলে সে নতুন উদ্যমে টুপিটা মাথায় বসায়। টুপিটা ঠিকঠাক মাথায় সেট করতে গিয়ে তার ঘাড় উঁচু হয় আর তখন তার চোখ আটকে যায় বকুল গাছের ডালে। হাফপ্যান্টপরা এক ছেলে ঝুলে আছে ডালে।

ছুটিপুরে কয়টা ছেলে হাফপ্যান্ট পরা? পরে অনেকেই। তবে এই মুহূর্তে মনে পড়ে যায় কায়েসের কথা। কারণ, গত সপ্তায় কায়েস একটা ফুলপ্যান্টের জন্য বায়না ধরেছিল বাপের কাছে। বাপ মসলেম উদ্দিন ফুলপ্যান্ট কিনে দিতে পারেনি। কিংবা বলা যায়, কিনে দেয়নি। কারণ হিসেবে অনুমান করা যায় অভাব। কায়েস অবশ্য এইসব অভাব টভাবের ব্যাপারগুলো বোঝে না। বোঝার কথাও না। নিতান্তই সে এক বালক এখন। ছুটিপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাশ ফোরে পড়ে। এতটাই অবোধ সে, হিসি করার পর প্রায় সময় তার প্যান্টের জানালায় খিল তুলতে ভুলে যায়। তার বাবার কোন জমিজিরেত নেই। গ্রামে ধনী আর গরিব বোঝার মাপকাঠি জমি। যার জমি বেশি, সে বেশি ধনী। যার জমি কম, সে কম ধনী। যার কিছু নেই সে গরিব। কায়েসের বাবার যেহেতু জমি নেই তাই সে গরিব। কায়েস গরিব বাবার একমাত্র ছেলে। এরপর আর কোনো ভাইবোন তার হবে কি না জানা নেই। আপাতত মসলেম উদ্দিনের সংসারে কায়েস একাই এক ছেলে। (সম্পূর্ণ…)

জেগে উঠবো কোন অন্ধকারে

প্রকাশ বিশ্বাস | ৬ জুন ২০১৭ ২:২২ অপরাহ্ন

Shilpaguru Safiuddin ahmedবসন্ত বাউরির বাতাসে কোন লেবুফুলের গন্ধ ভেসে আসে। ভেসে আসে আমের বোল আর কাঁঠাল মুচির সুবাস ।সবুজ নরম এই ঘাসের বন, আর বহু প্রাচীন, বুড়িয়ে যাওয়া ছাল বাকলের বৃকোদর আম,কড়ই, শিমূল, নারকেল বৃক্ষের সারি। পলাশ আর পারিজাত গাছও চেখে পড়লো। এর পাশে কাজল পড়া অতি শান্ত ধীর স্রোতস্বিনী। এ নদীর পাড়ে ভূট্টা, গম আর যবের ক্ষেতনীচ থেকে উপরে উঠে গেছে।
আমি কেন এখানে এই পরিপাটি করে সাজানো ঘাস আর লতা গাছের বাগানে পড়ে আছি? আমায় এখোনে নিয়ে এল কে? শেষ বিকেলের নরম রোদ। এই রোদে গাছপালার ছায়া পড়েছে তীর্যক আর লম্বা হয়ে।
জায়গাটি কোথায় আর কেনই বা আমি এখানে আমি জানি না। আর কে আমাকে কেন কিভাবে নিয়ে এসেছে তাও জানি না।
কিন্তু এ জায়গা যেন অমরাবতী অথবা ইডেন গার্ডেন।
একি একটি কাঠবেড়ালি আমার পাতলুনের পকেটে মুখ ঢুকিয়ে দিচ্ছে কেন? মনে পড়ছে যে আমার পকেটে রয়েছে চিনাবাদামামের ঠোঙ্গা। স্মৃতির আবছা অস্পষ্ট আলোছায়ায় মনে পড়ছে আমাকে যে ঘোড়ার গাড়িতে করে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে সেখানে এক সহযাত্রী আমাকে জল খাবারের জন্য এ ঠোঙ্গা উপহার দিয়েছিল।
মিহি বাতাসে ঘুঘুর ডাকে করুণ মূচ্ছর্ণা, হঠাৎ নারকেল গাছের শীর্ষদেশের পাতার আন্দোলনে চোখ আটকে গেল। সাদা ওড়না জাতীয় কাপড়ে মোড়ানো একটি আবছায় মূর্তি । ভালো করে দেখার পর মনে হলো ওটা আমার মনের ভুল। (সম্পূর্ণ…)

রুখসানা কাজলের গল্প : খোঁজ

রুখসানা কাজল | ২ জুন ২০১৭ ১১:২৮ অপরাহ্ন

Samarjit Roy Chowdhuryসার সার লোহার খাট। তাতে বসতেই “কেউউওও…উক” করে সমস্বরে মুচড়ে উঠল খাটগুলো। প্রজাপতিরমত তিনটে মেয়ে একে অপরের সাথে লেপ্টে বসে দেখে, ছয় সাতটা গ্রাম্য সরল মুখ ওদের দিকে তাকিয়ে হাসছে। প্রত্যেকের নাকেই একাধিক নাকফুল। প্রত্যেকেই কানে পরেছে অধিক প্রচলিত ডিজাইনের গ্রাম্য কারিগরের বানানো সোনার কানপাশা। কারো কারো মাথায় আধা ঘোমটা। কেউ কেউ আবার ওদের দেখে বয়সের ভারে ঝুলে পড়া বুকে একটুখানি শাড়ি টানতে গিয়ে থেমে যায়, তারারা দেহি আমরার নাতনি গো লাহান ! আইছগো বুনেরা, বোওহান তুমরারা।
একজন নীলফুল শাড়িপরা মহিলা সাইনির ঝাকড়া হলুদ কালো চুলে হাত দিয়ে অবাক হয়,হায় হায় ও ছেড়ি তোমরার চুল দেখতারি পাক ধরছুইন !সাইনি বিব্রত হাসিতে মাথা সরিয়ে নিতে চায়। চুলে কাউকে হাত ছোঁয়াতে দেয় না ও। হস্টেল খরচের টাকা দিয়ে চুলে হলুদ রঙ করেছে। কালো চুলে ঝিলিক দিচ্ছেগোছা গোছা হলুদ ডোরা দাগ। বন্ধুমহলে এমনকি ওর থিসিস পেপারের শিক্ষক পর্যন্ত ঈগল চোখে ঝাড়া দুই মিনিট তাকিয়ে থেকে রঙ্গনকে জিগ্যেস করেছিলেন, ওর মাথামুথো ঠিক আছে তো রে ? রঙ্গন মাথা নাড়তেই ম্যাম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে। শখের দাম লাখ টাকা। মানুষ যদি জন্তুর চেহারা চায় তো অন্য মানুষের কি! ল্যাপটপের চার্জার সুইচ করে সাইনির দিকে না তাকিয়ে ম্যাম বলেছিলেন, বাহ তোকে বেশ লাগছে ! মনে হচ্ছে একটা বাচ্চা জেব্রা আমার ক্লাশ করতে এসেছে !আয় বোস। (সম্পূর্ণ…)

পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com