গল্প

শেখ সাহেব বাজার লেন

সাধনা আহমেদ | ১১ জুলাই ২০১৮ ৪:৪১ অপরাহ্ন

শেখ সাহেব বাজার লেনের সাতটি বাড়ির ১৯-এ হাফিজা ভিলার চারতলার ভাড়াটিয়া আব্দুল মজিদ বিচার চাইতে গেছে এলাকার বড়ভাইয়ের কছে। বড়ভাই, সমস্যা কী জানতে চাইলে আব্দুল মজিদ বললো– আমার বউরে। বড় ভাই জিজ্ঞাসা করলেন– তুমার বউরে কী? কিভাবে বলবে তা বুঝতে না পেরে আবদুল মজিদ তোতলাতে শুরু করলো। বড়ভাই আবারো জিজ্ঞাসা করলেন– আরে কউ না ক্যালা তুমার বউরে কী? আব্দুল মজিদ আবারো বললো– আমার বউরে। বড়ভাই রেগে বললো– আরে হালায় জাবর কাটতাচ ক্যালা, কইতাচ না ক্যালা, তুমার বউরে কী? এবার আব্দুল মজিদ একটানে বলে ফেলে– আমার বউরে বটি নিয়া মারবার আইচিল লিটন মিয়া। বড়ভাই এবার কৌতূহলী হয়ে মজিদের মুখের কাছে মুখ এনে বলে– কুন লিটন মিয়া? এবার আব্দুল মজিদ একটানে বলে– আমগো নিচতলার লিটন মিয়া। লিটন মিয়াগো আসল বাড়ি অইতাছে কুমিল্লার বাঞ্ছারামপুর থানা। লিটন মিয়ারা দুই ভাই এক বুন– লিটন, মিলটন আর লিমা।

অলংকরণ: ফাহমিদা জামান ফ্লোরার জলরং চিত্রকর্ম

হেগোর বাপ হাকিম মিয়া একটা ভাদাইম্যা, টাউট। কয় ঠিকাদারির ব্যাবসা করে, আসলে হালায় কিচুই করে না, মহল্লার সব দুকান থিক্যা বাকি খায়া রাখচে পয়সা দেয় না, অহন সবার থিক্যা পলায়া বেড়ায়, কারুর সামনে পরে না। ভোরবেলা ঘুম থিক্যা উঠ্যাই বাইরয়া যায়, আর দুকান সব বন্দ অইবার পর বাড়ি আহে। এসব ফিরিস্তি শুনে ধমক দিয়ে মজিদকে থামিয়ে বড়ভাই বললে, আরে মিয়া, লিটন মিয়ার চৌদ্দগুষ্টির ঠিকুজি হুনবার চাইচিনি তুমার কাচে। আছল কতা কউ, লিটন মিয়া তুমার বউরে মারবার আইচিল ক্যালা? বড় ভাইয়ের রাগ দেখে মজিদ খুকখুক করে কাশতে কাশতে বলে, ক্যাঠায় নাকি লিটন মিয়ার মায়রে কইচে যে আমার বউ নাকি হেরে গাইল পারচে। লিটন মিয়া ইস্কুল থিক্যা আইতেই হের মায় কাইন্দা বিচার দিয়া কইচে, আমারে গাইল পারে? আমারে গাইল পারে ওই খানকি মাগি, আইজ যদি অর বিচার না করচচ তয় আমারে মা কইয়া ডাকবি না। আর হেই কতা হুইন্যা আমি দোকানে থাকারসুম লিটন মিয়া বটি লয়া আইয়া আমার বউরে কাইট্যা হালাইব কইরা ধমক পাইরা গেচে। শুনে বড়ভাই তার ভুড়ি নাচিয়ে হাসতে হাসতে বলে, লিটন মিয়া ইস্কুলে পড়ে! ইস্কুলে পড়ে এক ছ্যামরায় তুমার বউরে বটি লয়া ধমকায়া গেচে আর তুমি আইচ আমার কাচে বিচার দিবার! তুমি হালায় মাইগ্যা নিহি? যাও, গিয়া আবার নিজের পেগাম্বরি করাও!

বড়ভাই মজিদকে আবার নিজের খৎনা করাতে বলেছেন। কথাটা শেখসাহেব বাজার লেনের একেবারে শেষ মাথার ছাপড়া মসজিদের সামনের সালাম ট্রেডার্স পর্যন্ত চাউর হয়ে যায়। আর ওই লেনের সবাই হাসির গুল্লোড় তুললে কথা গড়িয়ে যেতে থাকে বিভিন্ন দিকে– হুনচি আব্দুল মজিদের বউটা নিহি পরির লাহান ছুন্দর। একজনের কথার মাঝখানে আরেকজন ফোড়ন কেটে বলে, আব্দুল মজিদের বউটা ছুন্দরী বইল্যাই হের অত জ্বালা অইচে। হুনচি মজিদের দেখভাল নিহি ঠিক মতন করে না। দেমাগ দেখায়া সারাদিন বইয়া থাকে। অন্যজন আবার তা উড়িয়ে দিয়ে বলে, আরে না না, মজিদ সিক্ষিত মাইয়া সাদি করচে, বউ নাকি সারাদিন বইয়ের দিক চায়া থাকে। হের লিগ্যাই নিজে অসিক্ষিত অয়া সিক্ষিত মাইয়া সাদি করতে নাই। আরেকজন নিজের মত দিয়ে বলে, বউ অইতাচেগা ঘরের লক্ষ্মী, হের অত বই পড়নের কাম কি? মগর মজিদের বউ লিটন মিয়ার মায়েরে গাইল পারছে ক্যালা? (সম্পূর্ণ…)

কালো আর ধলো বাহিরে কেবল…

কিশোর বিশ্বাস | ২৬ জুন ২০১৮ ৮:৩৭ অপরাহ্ন

এই আগস্টের রাতেও নরম লেপ গায়ে শুয়ে আছে শিপন। আধা আঁধারির ঘরটায় এ.সি-র এল.ই.ডি নির্দেশিকায় চোখ পড়ছে বার বার। ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস । কয়েকবার খুঁজেও রিমোটটা না পাওয়ায় শেষমেশ লেপের তলে। এই কাজ সে আগেও করেছে । গরমে এসি ছেড়ে ঘরে কৃত্রিম শীত বানিয়ে পাতলা চাদর বা কাঁথা গায়ে ঘুম দেবার মজাই আলাদা। কিন্তু এদেশে সেই নকশা করার নকশি কাঁথা কই ? তবে অনেক দিন পর আজ একটা পূর্ণাঙ্গ স্বস্তির ঘুম ঘুমাবে সদ্য চীন প্রবাসী শিপন। অবশেষে তার স্বপ্ন সত্যি সত্যিই সত্যি হল। এখন আর কোন সন্দেহ বা দুশ্চিন্তা নেই । আলাদা কোন লাইন-ঘাট বা সিস্টেম করা ছাড়াও স্কলারশিপটা যে পেয়ে যাবে, এতদিন সে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারে নি। তাই প্রথম দিন বিদেশ বিভূঁইয়ে অনাগত অজানাকে পাড়ি দেওয়ার চিন্তা ছাপিয়ে তার মনের সবটা জুড়ে এখন প্রাপ্তির প্রশান্তি। শুয়ে শুয়ে মনের কোণে উদয় হয় ফেলে আসা দেশের কথা আর পথিমধ্যে ঘটে যাওয়া বিচিত্র সব কাহিনী:
— এস্কুজ মি, হয়ার ইজ দা টয়লেট ? (সম্পূর্ণ…)

লালাভ রোদের জিভ

ঝর্না রহমান | ১৫ জুন ২০১৮ ১১:১০ অপরাহ্ন


আমার ছায়াটা কোথায়? কোথায় উধাও হলো আমার ছায়াটা?
দারুণ ছায়াবাজি খেলতে খেলতে ফুটপাথ ধরে হাঁটছিলাম। পোষা পাখির মত ঝুপ ঝুপ নেমে আসছিল আমার ছায়া। হাত থেকে দানা খুঁটে খাচ্ছিল। আবার রোদের কারচুপিতে ঘুলঘুলিতে ফুড়ুৎ করে উড়ে যাচ্ছিল।
নতুন টাইলস বসানো ফুটপাথ। গোল গোল নকশা। ঘূর্ণিঝড়ের চোখের মতন ধারালো গোল। নকশা দেখতে সুন্দর। কিন্তু খানিকক্ষণ ঘূর্ণির চোখে চোখ রাখলে ধাঁধা লেগে যায়। ধাঁধার সমাধান করতে করতে আমি একবার ডান চোখ একবার বাঁ চোখ ছুঁয়ে যাই। আমার ভালো লাগে।
টাইলসের ওপর রোদ্দুরের ধাঁধা। গর্ত থেকে বেরিয়ে আসা গোখুরের মত ফণা তুলে জ্বলতে থাকে রোদ। তার ওপর আমার ছায়া। আমার ঢেউ তোলা দেহের ছায়া। আমার পনিটেল করা চুল– চরকিবাজি টাট্টুর লেজ। আমি টাট্টু লেজ দুলিয়ে ছুটকি চালে হাঁটি। আমার ছায়াও ছুটকি চালে হাঁটে। ঘুমু ঘুমু হাঁটা ভালো লাগে না আমার। ছুটকি ছুটকি হাঁটা ভালো লাগছে। বিকেলের রোদ্দুর ভালো লাগছে। রোদ্দুরে ছায়াবাজিও। শীতঘুম ভেঙে বেরিয়ে আসা গোখরার লালচে আভা– দারুণ লাগে!
ফুটপাথের একপাশে খাঁজকাটা সিঁড়ি। আমার শরীরের ছায়াটা খাঁজের ভেতর নেমে পড়ে। ওয়ান্ডারফুল! দারুণ ইসথেটিক! ধাপে ধাপে ঢেউয়ের ছন্দে নামতে থাকে আমার ছায়া। ততক্ষণে রোদ্দুর ছায়ার জন্য কামাতুর হয়ে উঠছে! কামরাঙা রঙ লেগেছে রোদে। ওরে রোদ, দেখছিস না, আমার গাল লাল হয়ে উঠছে! আমি ছায়ার রেণু দিয়ে রোদ্দুরের নাম লিখে দিলাম– পার্থ! (সম্পূর্ণ…)

নাহার মনিকার গল্প: রূপান্তর

নাহার মনিকা | ১৫ জুন ২০১৮ ১:১০ অপরাহ্ন


মতামতে এই লেখাটা আপলোড হয়েছে। হোমপেজে দিয়ে দিন।অলংকরণ: ফাহমিদা জামান ফ্লোরা।

ডিসকভারি চ্যানেলে একঝাঁক পাখি উড়ে যাওয়ার শব্দ চিড়ে মুহতারিমার স্বভাব-মৃদু কন্ঠ তীক্ষ্ণ হয়ে শোবার ঘরের বাতাস ফালা ফালা করে ভেসে আসছে- ‘আমি তো আগেই বলছি তোমার আম্মা আমাকে দেখতে পারে না, এখন বুঝছো?’
একটু পরে ইমন বেরিয়ে এসে থমথমে মুখ করে সোফায় বসে।
হামিদা বেগম টেলিভিশন দেখার চেষ্টা করছেন। মনের ভেতরের ঘূর্ণিঝড় বাইরে প্রকাশ না করার দক্ষতা আছে তার। শান্ত মুখে ছেলেকে বলেন- ‘ চলো তাহলে, আমাদেরকে বাসষ্ট্যান্ডে নামায় দিয়া আসো’।
-’আম্মা, ইতিকে নিয়া যাওয়া কি এতই জরুরী?’
এমন অনুনয় আসবে, জানতেন। জবাব না দিয়ে ইতিকে ডাক দেন হামিদা- ‘ ব্যাগগুলা উঠা, চল’।

এপ্রিল মাসের সকাল দ্রুত তেতে ওঠে! হামিদা বাসের জানালার পর্দ্দা টেনে দেন, ঢাকা-দিনাজপুর দূরপাল্লার এসি বাসগুলো এখন আরামদায়ক। ছেলে আর বৌমাকে খুশী রেখে ফিরছেন না, এটা কাঁটার মত বিঁধছে, কিন্তু ওরা যা করেছে তা মানা যায় না।

মাস দুই আগে ভোরের কুয়াশা ছিন্ন করে ইমন ফোন করেছিল। সকালবেলা ওদের ব্যস্ততার কথা জানেন হামিদা, কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ নিয়ে ফোন ধরেছিলেন।
‘আম্মা, একজনও পাওয়া গেল না?’- মীমকে নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে ইমন। সোয়াদকে নিয়ে মুহতারিমা অফিস কামাই দিচ্ছে। একদিন ইমন অফিস বাদ দেয় তো আরেকদিন বউমা। প্রায় মাসখানেক তাদের কাজের বুয়া বাড়ি গিয়ে আর ফিরছে না। খোঁজ তো হামিদা করছেনই, কতজনকে বলে রেখেছেন। ভালো বেতন, থাকা খাওয়া সব। কিন্তু কেউ রাজী হয় না।
হামিদার স্বভাব জেনেও ইমন বায়না করে-‘ আম্মা, তুমি চলে আসো। কি এমন রাজ্যপাট তোমার ঐখানে, এখানে নাতি নাতনীর সঙ্গে সময় কাটবে’। (সম্পূর্ণ…)

দিন আসে দিন ফুরায়

সাইফ বরকতুল্লাহ | ২ জুন ২০১৮ ৭:০৭ অপরাহ্ন


পেন্সিল ও প্যাস্টেলে আঁকা ফাহমিদা জামান ফ্লোরার চিত্রকর্ম

আকাশে আমাবস্যার চাঁদ। জানালার ফাঁক গলে মেঝেতে আলো ঝলমল করছে। শুটকি মাছের ভর্তা, মুলা শাক, ডাল ভর্তা দিয়ে রাতের খাবারটা শেষ করে শুয়ে সেকান্দার আলী বলছে, খাবার শেষ হয়নি? পায়ের গোড়ালিতে খুব ব্যাথা, টিপে দাও গো। কোনো কথা বলল না হাপ্পু বেগম। থালা, বাটি ধুঁয়ে পান বানিয়ে চাবাইতে চাবাইতে সেকান্দার আলীর পাশে এসে শুয়ে পড়ল সে।

টিনের ঘর। চারপাশ পাঠশোলা, ছনের তৈরি বেড়া দেওয়া। সামনে ও পিছনের দরজা বাঁশের ফালি দিয়ে লাগানো। ফাজিলপুর গ্রামের কামারপুর সড়কের পাশেই এই ঘরটিতে সেকান্দার আলী থাকেন। হাপ্পু বেগমের সঙ্গে তের বছরের সংসার। দুঃখ, বেদনা, যাতনা-এই ঘরটাতেই মিশে আছে বছরের পর বছর। এই তো তিনদিন আগেই দুইজনের মধ্যে তুমুল ঝগড়া হয়ে গেল। অবশ্য এই ঝগড়া বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। এরকম ঝগড়া, মান-অভিমান তাদের মধ্যে প্রায়ই হয়। কিন্তু সেদিনের ঝগড়াটা ছিল বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে।

আজ থেকে তের বছর আগে হাপ্পু বেগমকে বিয়ে করে ঘরে নিয়ে আসে সেকান্দার আলী। কিন্তু তাদের ঘরে কোনো সন্তান আসেনি। গ্রামের কত ডাক্তার, কবিরাজ, হুজুরের কাছে চিকিৎসা ও পানি পড়া নেওয়া হয়েছে সন্তান জন্মদানের জন্য- তার ইয়ত্তা নাই। কিন্তু কোনো ওষুধ কাজে আসেনি। (সম্পূর্ণ…)

প্রকাশ বিশ্বাসের গল্প: আমাদের ইন্দ্রনাথ

প্রকাশ বিশ্বাস | ১৬ মে ২০১৮ ৮:৫৩ পূর্বাহ্ন

১.
গাবের ম্যাজেন্টা রংয়ের পাতা আর জামের পাতলা কিশলয়, বরুণ—বৈন্যা গাছের সাদা ফুলের ঝাড়, বান্দরনলা–সোনালু গুচ্ছের আবডাল থেকে ঝিরঝিরি বাতাস হঠাৎ বেগ পেয়ে বাউকুড়ানির রূপ নিয়ে ধেয়ে আসে। চৈত্রের এই সব দুপুরে রোদে জ্বলা দোআঁশ মাটির গ্রাম হালটের বুক পিঠে বাতাসের ঝাপটা এসে লাগে নাকে মুখে, খসে যাওয়া ঝরা পাতা আর ধুলার ঘূর্ণি পমেট, ট্যালকম পাউডারের মতো আমাদের সবার কাঁচা মুখগুলো ধূসরিত করে যায়।
আমাদের গ্রামগুলোতে সে মাসে দোল আসে, শিবের গাজন, আর দেল নামে, চড়ক পূজা হয় দূরের গ্রামে, আসে মুইখ্যা কাচ (মুখোস নৃত্য) খেলার বাহার।

অলংকরণ: ফাহমিদা জামান ফ্লোরা
আমরা তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ বেজায় দুরন্ত, কেউ আলাভোলা, কেউ বা পরিপাটী কেতা দুরস্ত ভালোছাত্র। কেউ স্কুলে যাওয়ার নাম করে ঘুড্ডি উড়িয়ে বেড়ায়, কেউ মার্বেল-ডাংগুলিতে আসক্ত, গরু চড়ানোর নড়ি দিয়ে ছ্যুল খেলা খেলে, আবার কেউ সন্ধ্যা রাত পর্যন্ত দাঁড়িয়াবান্ধা। (সম্পূর্ণ…)

থাকো ধরণীতে থাকো আকাশে

আকতার হোসেন | ২২ এপ্রিল ২০১৮ ৭:৩৭ অপরাহ্ন

তুমি ঢাকতে থাকো। ঢাকতে থাকো। ঢাকতে ঢাকতে আদিম মমি হয়ে যাও যেন নিজেকেই আর চিনতে পার না। পারলে চলন ঢাকো। বলন ঢাকো। প্রেমময় অনুভূতি ঢাকো।
তুমি স্বতন্ত্র ছিলে, আজ সেই স্বাতন্ত্র্য ঢাকো। তুমি মায়া ঢাকো, ছায়া ঢাকো, তুমি বিশালতাকে ঢেকে রাখো। অনিশ্চিত আক্রোশ কামনায় তুমি আবৃত কর মায়ার বাঁধন। অভিমানে, বিচ্ছেদের খেলা খেল। তুমি অন্তহীন নিজেকে আড়াল করে রাখো, তুমি ঢাকতে থাকো।
এখানে ঢাকো। ওখানে ঢাকো। দুই তিন কিংবা চারবার করে ঢাকো। ওটা ঢাকো, সেটা ঢাকো। সবদিক দিয়ে ঢেকে রাখো। জগতে ঢাকাঢাকি ছাড়া তোমার অন্য কোন কাজ নেই। যতোটুকু চিনি মেশালে পানি সরবত হয়ে যায়, তার থেকে বেশি ঢালতে থাকো। পানি আর চিনি একই পাত্রে অবস্থান তবুও ওরা পারবে না মিশতে। কারণ সে অতিরিক্ত। তুমি তেমনি অতিরিক্ত ঢাকতে থাকো নিজেকে।
আমিও ঢাকি। যতোটুকু যেখানে প্রয়োজন ততোটুকু মান্য করি। কাউকে অবিশ্বাস করে কিছু ঢাকি না। ঢাকি লজ্জা না পেতে। তোমার ঢাকাঢাকি আমাকে লজ্জা দেয়। আমি যতোটুকু ঢেকে রাখি, যে কারণে ঢাকি, তুমি তার থেকে অনেক বেশি ঢেকে রাখো। ভুলে যাও যে, আমি হাজার বার বলি, বারবার বলি এক সঙ্গে থাকবার প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছি আমরা। আমি পদে পদে তোমার লুপ্ত সম্মানের কথা বলি, বলি হারানো মর্যাদার কথা। বলি সমতার কথা। তবুও আমার আর তোমার মধ্যে একটা অবিশ্বাসী গিলাফ চড়িয়ে রাখো তুমি। তুমি নাকি তাতে শান্তি পাও।
তোমার ঢাকাঢাকি থেকে একদিন দূরে চলে যাব। জানি, তোমার তাতে কিছু আসে যায় না। কেননা তোমার সুখ ওই ঢাকাঢাকির মাঝে। অতএব, তুমি একাকী সুখে থাকো। আরও ঢাকতে থাকো। আমি কোথাও থাকবো না। এর চেয়ে বেশি অভয় কি করে দেবো? তুমি তোমার মধ্যে সুখ খুঁজে নাও। তুমি একাই থাকো। (সম্পূর্ণ…)

চক্করকাটা জটির অদৃশ্য হওয়ার আগে

মোজাফ্ফর হোসেন | ২০ মার্চ ২০১৮ ১১:৩২ পূর্বাহ্ন

উঠে দাঁড়িয়েই তিনটা চক্কর দিয়ে হাঁটা শুরু করলো মালতিপাড়ার দিকে। কোনো জায়গায় সে কিছুক্ষণ থেমে থাকলেই পুনরায় চলতে শুরু করার আগে একস্থানে দাঁড়িয়ে তিনটা চক্কর দেবে। কেনো দেবে তার সরল উত্তর ওর মাথায় সিট আছে। যার মাথায় সিট থাকে সে যা ইচ্ছা করার অধিকার রাখে। কোনো কার্য-কারণ তাকে কারো কাছে তুলে ধরতে হয় না। মাথায় সিট আছে শুনলে লোকজন তার প্রয়োজনও বোধ করে না। আমরা যারা ছোট ছিলাম তারা জটিকে থেমে থাকা দেখলে এটা-সেটা বলে বা অঙ্গভঙ্গি করে ফেউ দিতাম যেন সে চলতে শুরু করে। এর সরল কৈফিয়ত হলো, আমরা তার তিনটা চক্কর মারার দৃশ্য দেখে মজা পেতাম। যখন সে হাঁটতো তখন তার প্রতি আমাদের খেয়াল থাকতো না। কিন্তু বসে আছে বা থেমে আছে দেখলেই মনে হতো ওর চলাকে উসকে দেয়াটা দায়িত্বের ভেতর পড়ে। বড়রা আমাদের বকতেন বটে কিন্তু আশকারা দিতেন মুখ টিপে হেসে। (সম্পূর্ণ…)

আমি কেন দেশান্তরী

এম এল গনি | ৯ মার্চ ২০১৮ ১১:৩৩ পূর্বাহ্ন

ভিক্টর আমার নাম, বয়স ছাব্বিশ। ইউরোপের দেশ মলডোভা আমার জন্মভূমি। মলডোভা নদীর নামেই দেশটির নাম। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে রোমানিয়া আর ইউক্রেনের মাঝে লুকিয়ে থাকা মলডোভা ইউরোপের সবচেয়ে গরিব দেশগুলোর একটি; অনেকটা বাংলাদেশের মতোই। সবুজ গাছপালায় ভরা চমৎকার আবহাওয়া সত্ত্বেও নানা কারণে মলডোভায় পর্যটকরা তেমন আসেন না। অথচ, এই কিছুকাল আগেও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যুক্ত থাকতে কত ধনীই না ছিল এ দেশ। মলডোভার বাস্তবতা যাই হউক, সে যে আমার জন্মভূমি, আমার নিঃশ্বাস, আমার প্রাণ। কারণ, মলডোভার আলো বাতাসেই যে আমার বেড়ে উঠা! এ দেশের রাজধানী কিসিনাও শহরেই আমি বড়ো হয়েছি। মলডোভার সিংহভাগ মানুষ রক্ষণশীল খ্রিস্টান। আমাদের পরিবারও তাই।

আপনাদের যে কারো ভ্রাতা বা সন্তানের মতোই আমি রক্তমাংসে গড়া এক সাধারণ যুবক। সমাজের আর দশটি মানুষের মতো সুখ-দুঃখের অনুভূতি, ভালোবাসা, ঘৃণা, ক্রোধ আমাকেও সমান স্পর্শ করে – হাসায়, কাঁদায়। ভোরের শিশিরে ভেজা ঘাসে ফড়িংয়ের মুক্ত বিচরণ, কিংবা, সবুজ শ্যামল বনে বাস করা চেনা-অচেনা পাখির কলকাকলি সাধারণের মতো আমারও মন ছুঁয়ে যায়। ভোরের আলোতে নতুন দিনের স্বপ্ন আমিও দেখি। তারপরও, আমি ঠিক অন্য সবার মতো নই; আমি এক ব্যতিক্রমী মানুষ। টগবগে যুবক হয়েও নারীর প্রতি আমার মোহ বা আকর্ষণ নেই একটুও। পুরুষই আমার প্রেম। সোজা কথা, আমি একজন গে, বা, সমকামী পুরুষ। আমার আসল পরিচয় জেনে অনেকেই চমকে উঠে। কারণ, খুব কম সমকামী মানুষই সাহস করে তার এ গোপন পরিচয়টা অন্যের কাছে প্রকাশ করে। সমকামীরা নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখে লজ্জায়, অপমানে, সমাজের ভয়ে। (সম্পূর্ণ…)

মুজিব কোটের মেয়ে

ঝর্না রহমান | ৭ মার্চ ২০১৮ ১০:৩৫ পূর্বাহ্ন

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আহনাফ ডান হাতটি উঁচু করে তুলে ধরে। আবার নামিয়ে ফেলে। দেয়ালে ঝুলছে বঙ্গবন্ধুর একটা পোস্টার আর কয়েকটা ছবি। আহনাফের আম্মু ছবিগুলো ইন্টারনেট থেকে নামিয়ে প্রিন্ট করে দিয়েছেন। সেগুলো দেখে আহনাফ আবার হাত তোলে। ডান থেকে বাঁ দিকে স্লো মোশানে ঘুরিয়ে নেয়। কোনোটাই পছন্দ হয় না আহনাফের।
আম্মু, আম্মু, শুনে যাও তো!
আহনাফের আম্মুর কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। ও আরো চেঁচায়।
আম্মু, আসছো না কেন? বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ঠিক না হলে প্র্যাকটিস করবো কীভাবে?
কিন্তু আম্মু ব্যক্তিটির দেখা পাওয়া যায় না। অস্থির হয়ে ওঠে আহনাফ। আর একটু গলা চড়িয়ে ডাকে। আবার তাড়াতাড়ি গলা খাকারি দিয়ে খাদে নামায়। এখন খামাখা চিৎকার চেঁচামেচি করে ভোকাল কর্ডের বারোটা বাজানোর দরকার নেই। পরে ছোট খালার মতো ভয়েস কলাপস করলে আহনাফের মাথায় বাড়ি পড়বে। কম্পিটিশন আর করতে হবে না। শেষে ছোট খালার মতো গানের ফাইনাল কম্পিটিশানের দিনে প্যাঁচা-মুখ করে চুপচাপ ঘরের ভেতর বসে থাকতে হবে।
ছোট খালা শাম্মীর ঠাণ্ডার ধাত। এক ছটাক ঠাণ্ডা বাতাস তার গায়ে লাগলেই, গায়ে আর কোথায়, গলার আশেপাশে লাগলেই তার এক সিরিয়ালে সাতটা হাঁচ্চো, নাকের তলায় লাল টুকটুকে জ্বরঠোসা, স্বর ঘ্যারঘ্যারানি সব একসাথে মার্চ করে চলে আসে। তারপরের দিন দেখা যায়, ছোট খালা হাতে একটা কাগজ আর কলম নিয়ে ঘুরছে। কথা বলার প্রয়োজন হলে লিখে লাইনের পাশে একটা টিক দিয়ে এগিয়ে দিচ্ছে। তার মানে টিক দেয়া লাইনটা পড়ো। (সম্পূর্ণ…)

এল সাগুয়ারো: একটি ফনিমনসা ও একটি ক্যাকটাসের গল্প

আনিসুজ জামান | ২ মার্চ ২০১৮ ১১:২৪ অপরাহ্ন

ফনিমনসা গাছটা লজ্জায়, বিমর্ষতায় নুইয়ে পরছে কিন্তু ওর পড়শি এল্ সাগুয়ারো, আঠারো-হাতি দানবীয় চৌকো ক্যাকটাসটা রাগে ক্রোধে থরথরিয়ে কাঁপছে। ওদের পায়ের কাছে লুটিয়ে ইরমা, ফুঁপিয়ে কাঁদছে, অনবরত বলে চলছে “না, না, না” । ওর উপর পৃথিবীর আদিতম উম্মত্ততা, যাকে পশুত্ব বললে পশুকুলকে হেয় করা হয়। জায়গাটা নোগালেস, অ্যারিজনা প্রদেশ! বিকেল হেলে পরেছে! আকাশের লাল রঙের সাথে ইরমার নীচের ভেজা মরু-বালু একাকার। সব শেষ হওয়ার পরও নিথর শবাসনে শোয়া, শুধু দুই রানের কাঁপন থামাতে পারছিল না সে।

নোগালেস সনোরা প্রদেশ ও নোগালেস আরিজনা প্রদেশের বর্ডার পার হয়েছে ওরা গতকাল। বর্ডার পার করতে দালাল যা চেয়েছিল তা থেকে ওর কাছে কিছু কড়ি কম ছিল। তারপরও শুধু ওর বুকটা দেখার ও এক চুমুর বিনিময়ে বলেছিল বাকীটা লাগবে না। ও রাজী হয়ে পায়ে হেটেছে গত আঠারো ঘন্টা। মাঝে মাঝে দৌড়ুতে হয়েছে, মাঝে মাঝে শুয়ে থাকতে হয়েছে বালিয়াড়ির মাঝে, আশেপাশে ছড়ানো ছিটানো কাটা ঝোপ দানবীয় ক্যাকটাসের মাঝে। সাথের একমাত্র ব্যকপ্যাকে তেমন কিছুই নেই। কিছু শুকনো খাবার, দুটো টুনা মাছের টিনজাত ক্যান ও ব্যান্ডেজ। পরনের প্যান্ট, ব্রা ছড়ে যাওয়া, নীল জিন্সের প্যান্টের সাথে বালুর রংয়ের সাথে মেলানো ব্লাউজ আর এক জোড়া প্যান্টি ব্রা থাকলেও দানবটি চুমু দেবার সময়ই প্যান্টিটা নিয়ে নেয় আর ওর সামনেই ওটির গন্ধ শুঁকে শিহরিত হয়। (সম্পূর্ণ…)

প্রকাশ বিশ্বাসের অনুগল্প: কারাগার

প্রকাশ বিশ্বাস | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ৩:১৫ অপরাহ্ন

প্রিজন ভ্যানের কেবিনে কারাগার থেকে আদালতে বয়ে নেয়া বেশ কয়েকজন
বিচারপ্রার্থী লোক। আসামী হিসাবে অপেক্ষাকৃত ছোট শহরের কারাগার থেকে
রাজধানীর আদালতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাদের মামলার শুনানির তারিখে। এদের
মধ্যে নারী, পুরুষ এমনকি শিশুও রয়েছে।
রাতের শেষভাগ। ফাঁকা রাস্তায় ভ্যানটি চলছে দ্রুত লয়ে। গাড়ির যান্ত্রিক
শব্দ ছাড়া আর কোনো সচল শব্দ নেই। সরু জানালা বেয়ে বাইরে থেকে জ্যোৎস্নার
আলো ঠিকরে পড়ছে গাড়ির ভেতরে।
নতুন জেগে ওঠা নদী চরের ধান কাটা মামলার আসামী তারা। এদের মধ্যে কারো
কারো মুখে বেশ একটা ধারালো ভাব থাকলেও চোখে লেগে রয়েছে রাজ্যের বিষন্নতা।
এ সব লোকজনের মধ্যে অধিকাংশই এ মূহূর্তে বেঞ্চিতে বসে ঘুমে ঢুলছে যেন
মহাকাল থেকে সময় যন্ত্রে চড়ে এরা হঠাৎ জানালা ফুঁড়ে এই ভ্যানের ভেতরে এসে
জালে আটকানো মাছের মতো নিঃসাড় পড়ে আছে।
এদের মধ্যে এক যুবতী নারীর মাছের মতো চোখ, যেহেতু তার চোখের পাতা পড়ছে
না, লেগেও আসছে না। তার চোখ আসলে এমনই যে, যে কোন সময় এই চোখ থেকে
আশপাশের জঙ্গল আর শুকনো লতা পাতায় দাবানল লেগে যেতে পারে। (সম্পূর্ণ…)

পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com