গল্প

প্রকাশ বিশ্বাসের গল্প: আমাদের ইন্দ্রনাথ

প্রকাশ বিশ্বাস | ১৬ মে ২০১৮ ৮:৫৩ পূর্বাহ্ন

১.
গাবের ম্যাজেন্টা রংয়ের পাতা আর জামের পাতলা কিশলয়, বরুণ—বৈন্যা গাছের সাদা ফুলের ঝাড়, বান্দরনলা–সোনালু গুচ্ছের আবডাল থেকে ঝিরঝিরি বাতাস হঠাৎ বেগ পেয়ে বাউকুড়ানির রূপ নিয়ে ধেয়ে আসে। চৈত্রের এই সব দুপুরে রোদে জ্বলা দোআঁশ মাটির গ্রাম হালটের বুক পিঠে বাতাসের ঝাপটা এসে লাগে নাকে মুখে, খসে যাওয়া ঝরা পাতা আর ধুলার ঘূর্ণি পমেট, ট্যালকম পাউডারের মতো আমাদের সবার কাঁচা মুখগুলো ধূসরিত করে যায়।
আমাদের গ্রামগুলোতে সে মাসে দোল আসে, শিবের গাজন, আর দেল নামে, চড়ক পূজা হয় দূরের গ্রামে, আসে মুইখ্যা কাচ (মুখোস নৃত্য) খেলার বাহার।

অলংকরণ: ফাহমিদা জামান ফ্লোরা
আমরা তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ বেজায় দুরন্ত, কেউ আলাভোলা, কেউ বা পরিপাটী কেতা দুরস্ত ভালোছাত্র। কেউ স্কুলে যাওয়ার নাম করে ঘুড্ডি উড়িয়ে বেড়ায়, কেউ মার্বেল-ডাংগুলিতে আসক্ত, গরু চড়ানোর নড়ি দিয়ে ছ্যুল খেলা খেলে, আবার কেউ সন্ধ্যা রাত পর্যন্ত দাঁড়িয়াবান্ধা। (সম্পূর্ণ…)

থাকো ধরণীতে থাকো আকাশে

আকতার হোসেন | ২২ এপ্রিল ২০১৮ ৭:৩৭ অপরাহ্ন

তুমি ঢাকতে থাকো। ঢাকতে থাকো। ঢাকতে ঢাকতে আদিম মমি হয়ে যাও যেন নিজেকেই আর চিনতে পার না। পারলে চলন ঢাকো। বলন ঢাকো। প্রেমময় অনুভূতি ঢাকো।
তুমি স্বতন্ত্র ছিলে, আজ সেই স্বাতন্ত্র্য ঢাকো। তুমি মায়া ঢাকো, ছায়া ঢাকো, তুমি বিশালতাকে ঢেকে রাখো। অনিশ্চিত আক্রোশ কামনায় তুমি আবৃত কর মায়ার বাঁধন। অভিমানে, বিচ্ছেদের খেলা খেল। তুমি অন্তহীন নিজেকে আড়াল করে রাখো, তুমি ঢাকতে থাকো।
এখানে ঢাকো। ওখানে ঢাকো। দুই তিন কিংবা চারবার করে ঢাকো। ওটা ঢাকো, সেটা ঢাকো। সবদিক দিয়ে ঢেকে রাখো। জগতে ঢাকাঢাকি ছাড়া তোমার অন্য কোন কাজ নেই। যতোটুকু চিনি মেশালে পানি সরবত হয়ে যায়, তার থেকে বেশি ঢালতে থাকো। পানি আর চিনি একই পাত্রে অবস্থান তবুও ওরা পারবে না মিশতে। কারণ সে অতিরিক্ত। তুমি তেমনি অতিরিক্ত ঢাকতে থাকো নিজেকে।
আমিও ঢাকি। যতোটুকু যেখানে প্রয়োজন ততোটুকু মান্য করি। কাউকে অবিশ্বাস করে কিছু ঢাকি না। ঢাকি লজ্জা না পেতে। তোমার ঢাকাঢাকি আমাকে লজ্জা দেয়। আমি যতোটুকু ঢেকে রাখি, যে কারণে ঢাকি, তুমি তার থেকে অনেক বেশি ঢেকে রাখো। ভুলে যাও যে, আমি হাজার বার বলি, বারবার বলি এক সঙ্গে থাকবার প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছি আমরা। আমি পদে পদে তোমার লুপ্ত সম্মানের কথা বলি, বলি হারানো মর্যাদার কথা। বলি সমতার কথা। তবুও আমার আর তোমার মধ্যে একটা অবিশ্বাসী গিলাফ চড়িয়ে রাখো তুমি। তুমি নাকি তাতে শান্তি পাও।
তোমার ঢাকাঢাকি থেকে একদিন দূরে চলে যাব। জানি, তোমার তাতে কিছু আসে যায় না। কেননা তোমার সুখ ওই ঢাকাঢাকির মাঝে। অতএব, তুমি একাকী সুখে থাকো। আরও ঢাকতে থাকো। আমি কোথাও থাকবো না। এর চেয়ে বেশি অভয় কি করে দেবো? তুমি তোমার মধ্যে সুখ খুঁজে নাও। তুমি একাই থাকো। (সম্পূর্ণ…)

চক্করকাটা জটির অদৃশ্য হওয়ার আগে

মোজাফ্ফর হোসেন | ২০ মার্চ ২০১৮ ১১:৩২ পূর্বাহ্ন

উঠে দাঁড়িয়েই তিনটা চক্কর দিয়ে হাঁটা শুরু করলো মালতিপাড়ার দিকে। কোনো জায়গায় সে কিছুক্ষণ থেমে থাকলেই পুনরায় চলতে শুরু করার আগে একস্থানে দাঁড়িয়ে তিনটা চক্কর দেবে। কেনো দেবে তার সরল উত্তর ওর মাথায় সিট আছে। যার মাথায় সিট থাকে সে যা ইচ্ছা করার অধিকার রাখে। কোনো কার্য-কারণ তাকে কারো কাছে তুলে ধরতে হয় না। মাথায় সিট আছে শুনলে লোকজন তার প্রয়োজনও বোধ করে না। আমরা যারা ছোট ছিলাম তারা জটিকে থেমে থাকা দেখলে এটা-সেটা বলে বা অঙ্গভঙ্গি করে ফেউ দিতাম যেন সে চলতে শুরু করে। এর সরল কৈফিয়ত হলো, আমরা তার তিনটা চক্কর মারার দৃশ্য দেখে মজা পেতাম। যখন সে হাঁটতো তখন তার প্রতি আমাদের খেয়াল থাকতো না। কিন্তু বসে আছে বা থেমে আছে দেখলেই মনে হতো ওর চলাকে উসকে দেয়াটা দায়িত্বের ভেতর পড়ে। বড়রা আমাদের বকতেন বটে কিন্তু আশকারা দিতেন মুখ টিপে হেসে। (সম্পূর্ণ…)

আমি কেন দেশান্তরী

এম এল গনি | ৯ মার্চ ২০১৮ ১১:৩৩ পূর্বাহ্ন

ভিক্টর আমার নাম, বয়স ছাব্বিশ। ইউরোপের দেশ মলডোভা আমার জন্মভূমি। মলডোভা নদীর নামেই দেশটির নাম। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে রোমানিয়া আর ইউক্রেনের মাঝে লুকিয়ে থাকা মলডোভা ইউরোপের সবচেয়ে গরিব দেশগুলোর একটি; অনেকটা বাংলাদেশের মতোই। সবুজ গাছপালায় ভরা চমৎকার আবহাওয়া সত্ত্বেও নানা কারণে মলডোভায় পর্যটকরা তেমন আসেন না। অথচ, এই কিছুকাল আগেও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যুক্ত থাকতে কত ধনীই না ছিল এ দেশ। মলডোভার বাস্তবতা যাই হউক, সে যে আমার জন্মভূমি, আমার নিঃশ্বাস, আমার প্রাণ। কারণ, মলডোভার আলো বাতাসেই যে আমার বেড়ে উঠা! এ দেশের রাজধানী কিসিনাও শহরেই আমি বড়ো হয়েছি। মলডোভার সিংহভাগ মানুষ রক্ষণশীল খ্রিস্টান। আমাদের পরিবারও তাই।

আপনাদের যে কারো ভ্রাতা বা সন্তানের মতোই আমি রক্তমাংসে গড়া এক সাধারণ যুবক। সমাজের আর দশটি মানুষের মতো সুখ-দুঃখের অনুভূতি, ভালোবাসা, ঘৃণা, ক্রোধ আমাকেও সমান স্পর্শ করে – হাসায়, কাঁদায়। ভোরের শিশিরে ভেজা ঘাসে ফড়িংয়ের মুক্ত বিচরণ, কিংবা, সবুজ শ্যামল বনে বাস করা চেনা-অচেনা পাখির কলকাকলি সাধারণের মতো আমারও মন ছুঁয়ে যায়। ভোরের আলোতে নতুন দিনের স্বপ্ন আমিও দেখি। তারপরও, আমি ঠিক অন্য সবার মতো নই; আমি এক ব্যতিক্রমী মানুষ। টগবগে যুবক হয়েও নারীর প্রতি আমার মোহ বা আকর্ষণ নেই একটুও। পুরুষই আমার প্রেম। সোজা কথা, আমি একজন গে, বা, সমকামী পুরুষ। আমার আসল পরিচয় জেনে অনেকেই চমকে উঠে। কারণ, খুব কম সমকামী মানুষই সাহস করে তার এ গোপন পরিচয়টা অন্যের কাছে প্রকাশ করে। সমকামীরা নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখে লজ্জায়, অপমানে, সমাজের ভয়ে। (সম্পূর্ণ…)

মুজিব কোটের মেয়ে

ঝর্না রহমান | ৭ মার্চ ২০১৮ ১০:৩৫ পূর্বাহ্ন

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আহনাফ ডান হাতটি উঁচু করে তুলে ধরে। আবার নামিয়ে ফেলে। দেয়ালে ঝুলছে বঙ্গবন্ধুর একটা পোস্টার আর কয়েকটা ছবি। আহনাফের আম্মু ছবিগুলো ইন্টারনেট থেকে নামিয়ে প্রিন্ট করে দিয়েছেন। সেগুলো দেখে আহনাফ আবার হাত তোলে। ডান থেকে বাঁ দিকে স্লো মোশানে ঘুরিয়ে নেয়। কোনোটাই পছন্দ হয় না আহনাফের।
আম্মু, আম্মু, শুনে যাও তো!
আহনাফের আম্মুর কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। ও আরো চেঁচায়।
আম্মু, আসছো না কেন? বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ঠিক না হলে প্র্যাকটিস করবো কীভাবে?
কিন্তু আম্মু ব্যক্তিটির দেখা পাওয়া যায় না। অস্থির হয়ে ওঠে আহনাফ। আর একটু গলা চড়িয়ে ডাকে। আবার তাড়াতাড়ি গলা খাকারি দিয়ে খাদে নামায়। এখন খামাখা চিৎকার চেঁচামেচি করে ভোকাল কর্ডের বারোটা বাজানোর দরকার নেই। পরে ছোট খালার মতো ভয়েস কলাপস করলে আহনাফের মাথায় বাড়ি পড়বে। কম্পিটিশন আর করতে হবে না। শেষে ছোট খালার মতো গানের ফাইনাল কম্পিটিশানের দিনে প্যাঁচা-মুখ করে চুপচাপ ঘরের ভেতর বসে থাকতে হবে।
ছোট খালা শাম্মীর ঠাণ্ডার ধাত। এক ছটাক ঠাণ্ডা বাতাস তার গায়ে লাগলেই, গায়ে আর কোথায়, গলার আশেপাশে লাগলেই তার এক সিরিয়ালে সাতটা হাঁচ্চো, নাকের তলায় লাল টুকটুকে জ্বরঠোসা, স্বর ঘ্যারঘ্যারানি সব একসাথে মার্চ করে চলে আসে। তারপরের দিন দেখা যায়, ছোট খালা হাতে একটা কাগজ আর কলম নিয়ে ঘুরছে। কথা বলার প্রয়োজন হলে লিখে লাইনের পাশে একটা টিক দিয়ে এগিয়ে দিচ্ছে। তার মানে টিক দেয়া লাইনটা পড়ো। (সম্পূর্ণ…)

এল সাগুয়ারো: একটি ফনিমনসা ও একটি ক্যাকটাসের গল্প

আনিসুজ জামান | ২ মার্চ ২০১৮ ১১:২৪ অপরাহ্ন

ফনিমনসা গাছটা লজ্জায়, বিমর্ষতায় নুইয়ে পরছে কিন্তু ওর পড়শি এল্ সাগুয়ারো, আঠারো-হাতি দানবীয় চৌকো ক্যাকটাসটা রাগে ক্রোধে থরথরিয়ে কাঁপছে। ওদের পায়ের কাছে লুটিয়ে ইরমা, ফুঁপিয়ে কাঁদছে, অনবরত বলে চলছে “না, না, না” । ওর উপর পৃথিবীর আদিতম উম্মত্ততা, যাকে পশুত্ব বললে পশুকুলকে হেয় করা হয়। জায়গাটা নোগালেস, অ্যারিজনা প্রদেশ! বিকেল হেলে পরেছে! আকাশের লাল রঙের সাথে ইরমার নীচের ভেজা মরু-বালু একাকার। সব শেষ হওয়ার পরও নিথর শবাসনে শোয়া, শুধু দুই রানের কাঁপন থামাতে পারছিল না সে।

নোগালেস সনোরা প্রদেশ ও নোগালেস আরিজনা প্রদেশের বর্ডার পার হয়েছে ওরা গতকাল। বর্ডার পার করতে দালাল যা চেয়েছিল তা থেকে ওর কাছে কিছু কড়ি কম ছিল। তারপরও শুধু ওর বুকটা দেখার ও এক চুমুর বিনিময়ে বলেছিল বাকীটা লাগবে না। ও রাজী হয়ে পায়ে হেটেছে গত আঠারো ঘন্টা। মাঝে মাঝে দৌড়ুতে হয়েছে, মাঝে মাঝে শুয়ে থাকতে হয়েছে বালিয়াড়ির মাঝে, আশেপাশে ছড়ানো ছিটানো কাটা ঝোপ দানবীয় ক্যাকটাসের মাঝে। সাথের একমাত্র ব্যকপ্যাকে তেমন কিছুই নেই। কিছু শুকনো খাবার, দুটো টুনা মাছের টিনজাত ক্যান ও ব্যান্ডেজ। পরনের প্যান্ট, ব্রা ছড়ে যাওয়া, নীল জিন্সের প্যান্টের সাথে বালুর রংয়ের সাথে মেলানো ব্লাউজ আর এক জোড়া প্যান্টি ব্রা থাকলেও দানবটি চুমু দেবার সময়ই প্যান্টিটা নিয়ে নেয় আর ওর সামনেই ওটির গন্ধ শুঁকে শিহরিত হয়। (সম্পূর্ণ…)

প্রকাশ বিশ্বাসের অনুগল্প: কারাগার

প্রকাশ বিশ্বাস | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ৩:১৫ অপরাহ্ন

প্রিজন ভ্যানের কেবিনে কারাগার থেকে আদালতে বয়ে নেয়া বেশ কয়েকজন
বিচারপ্রার্থী লোক। আসামী হিসাবে অপেক্ষাকৃত ছোট শহরের কারাগার থেকে
রাজধানীর আদালতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাদের মামলার শুনানির তারিখে। এদের
মধ্যে নারী, পুরুষ এমনকি শিশুও রয়েছে।
রাতের শেষভাগ। ফাঁকা রাস্তায় ভ্যানটি চলছে দ্রুত লয়ে। গাড়ির যান্ত্রিক
শব্দ ছাড়া আর কোনো সচল শব্দ নেই। সরু জানালা বেয়ে বাইরে থেকে জ্যোৎস্নার
আলো ঠিকরে পড়ছে গাড়ির ভেতরে।
নতুন জেগে ওঠা নদী চরের ধান কাটা মামলার আসামী তারা। এদের মধ্যে কারো
কারো মুখে বেশ একটা ধারালো ভাব থাকলেও চোখে লেগে রয়েছে রাজ্যের বিষন্নতা।
এ সব লোকজনের মধ্যে অধিকাংশই এ মূহূর্তে বেঞ্চিতে বসে ঘুমে ঢুলছে যেন
মহাকাল থেকে সময় যন্ত্রে চড়ে এরা হঠাৎ জানালা ফুঁড়ে এই ভ্যানের ভেতরে এসে
জালে আটকানো মাছের মতো নিঃসাড় পড়ে আছে।
এদের মধ্যে এক যুবতী নারীর মাছের মতো চোখ, যেহেতু তার চোখের পাতা পড়ছে
না, লেগেও আসছে না। তার চোখ আসলে এমনই যে, যে কোন সময় এই চোখ থেকে
আশপাশের জঙ্গল আর শুকনো লতা পাতায় দাবানল লেগে যেতে পারে। (সম্পূর্ণ…)

মাসুদ পারভেজের গল্প: জানো না মন

মাসুদ পারভেজ | ৯ জানুয়ারি ২০১৮ ৯:৪৩ অপরাহ্ন

জিআরপি ক্যান্টিনের হেড বাবুর্চি তার আব্বার চাওয়া ছিল সে যেন রেলের টিকিট চেকার হয়। এই আশা জমা করে হেড বাবুর্চি তাকে মেট্রিক পাশ করায়। কিন্তু হেড বাবুর্চি আব্বার জানা ছিল না রেলের টিকিট চেকার হতে গেলে কী পাশ দেওয়া লাগে। আর তখন সেও মেট্রিক পাশ দেওয়ার পর লাইন থেকে সটকে পড়ে। সফেদ পোশাকআশাক গায়ে চাপিয়ে যাত্রীদের কাছে হাত পেতে টিকিট নেওয়ার চেয়ে খামচা মেরে নেওয়াটাই তার মগজ জুড়ে থাকে। ফলে রেলের টিকিটচেকার হওয়া তার আর হয় নাই। খামচা দিয়ে জিনিসপাতি নেওয়ার জন্য সে একটা দল বানিয়েছিল। ওরা দিনেরবেলা ট্রেনে তালাচাবি, সেফটিপিন, চিরুনি এইসব বেচার কাজ করতো আর রাতে করতো ডাকাতি।
তার শুরুটা হয় একটা লোকাল ইস্টিশন ঘিরে। যে-ইস্টিশনে ট্রেন আসার কোনো ঠিক ঠিকানা থাকে না। আন্তনগর থামে না। খানিক দূরে দু-তিনটা জংধরা বগি পড়ে থাকে নিম-ইতিহাস হওয়ার আশায়। এমন একটা ইস্টিশনে বসে ঝিমাতে ঝিমাতে পাঁচপাঁচটা সিগারেট শেষ করার পরও ট্রেন না এলে তার মাথাটা গরম হয়। এই গরমে তাল দেওয়ার জন্য ঝাঁঝাল রোদ তার সমস্ত শক্তি নিয়ে যখন নামে তখন মাথা ঠিক রাখা দায় হয়ে পড়ে। সেও তখন এমন একটা দশায় পড়লে খানিক দূরের জংধরা বগির দিকে যায়। কি-বা মনে করে বগির ভেতর ঢোকে। তখন অচেনা গুমোট বাতাস পাক খায় আর মস্তিষ্ক অসাড় হয়ে পড়ে। (সম্পূর্ণ…)

রওশন আরা মুক্তার গল্প: মেট্রোপলিটন আকাশ

রওশন আরা মুক্তা | ৩ জানুয়ারি ২০১৮ ৮:৪৮ অপরাহ্ন

intimate-coupleসিএনজিতে প্রায় একই বয়সী মুনা আর প্রয়াস বসা। যদিও মুনা তাকে মামুন নামে ডাকে। মুনার সাথে মামুনের সম্পর্ক হবে, বিয়ে হবে এটাই স্বাভাবিক। অক্ষরে অক্ষরেও মিল আছে। মুনা, মামুন। মুনা প্রয়াসকে মাঝে মাঝে মুন নামেও ডাকে। মুন থেকে মুনা। কিন্তু প্রয়াস কিছুটা বিরক্ত মুনার মামুন, মুন ডাকা নিয়ে। প্রয়াস কেন যেন মেনেই নিতে পারে না ওর নাম আব্দুল্লাহ আল মামুন।

কোথাকার কোন এক দাওয়াতখেকো আলেম মামুনের মাকে ছেলের নাম রাখতে বলেছিলেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিন বোনের পর একটিমাত্র ভাই এলো, আর মা সেই পোলাও-কোরমাপ্রিয় সেই আলেমের কথামতো শিশুটির নাম রাখলেন। কিন্তু প্রয়াস ক্লাস নাইনে উঠে নিজের নাম পরিবর্তন করে ফেললো। স্কুলের দেয়াল পত্রিকার জন্য রচনা লিখেছিল একটা। পত্রিকার নাম ছিলো দীপশিখা। সে পত্রিকায় আব্দুল্লাহ আল মামুন নামে লেখা যাক, সম্পাদক তা চায়নি। আর প্রয়াসের নিজেরও ভালো লাগেনি, এমন ব্যাকডেটেড নামে রচনা লিখতে। তখন সে নিজের নাম রাখে প্রয়াস প্রাচুর্য। এছাড়া টেলিভিশন-ফ্রিজ অপরিহার্যতামূলক এই বিজ্ঞানভিত্তিক জীবনে এমন ইসলামিক নাম বহন করার কোনোই মানে নেই, এটা প্রয়াস জানে। (সম্পূর্ণ…)

প্রকাশ বিশ্বাসের অনুগল্প: বনভূমি

প্রকাশ বিশ্বাস | ৩১ december ২০১৭ ১:১৮ অপরাহ্ন

bow-and-arrowবনভূমির ঠিক মধ্যিখানে অনেকগুলো আপেলগাছ হরেক রকমের গাছের সাথে মিলেমিশে দাঁড়িয়ে। সেখানে চোখবাঁধা অবস্থায় এই মাত্র একদল তীরন্দাজদের ধরে নিয়ে আসা হলো। তাদের বলা হলো তোমাদের সামনে ঐ যে বড় আপেলবৃক্ষ যা তোমরা দেখতে পাচ্ছোনা তাতে অসংখ্য লাল টুকটুকে পাকা আপেল ফল ঝুলে আছে। তোমরা প্রত্যেকেই তীর ছুঁড়ে সেগুলোকে ভূপাতিত করবে। আর তখন এক এক করে এই সব অন্ধ তীরন্দাজরা তাদের তীর ছুঁড়তে লাগলো। আর আশ্চর্য প্রত্যেক তীরের মাথাই সেগুলোকে বিদ্ধ করে নীচে ফেলে দিল এবং চারদিকের বাতাস মিষ্টি আপেলের গন্ধে দ্রবীভূত হয়ে গেল। (সম্পূর্ণ…)

গাজী তানজিয়ার গল্প: বিম্ব বদল

গাজী তানজিয়া | ২৩ december ২০১৭ ২:০৩ অপরাহ্ন

slave womanমেসেজটা আসার সাথে সাথে আমূল কেঁপে ওঠে ইরিনা। প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত এক তীব্র ্আতঙ্কের সাথে বসবাস তার। একবার ভেবেছিল ফোন আর ব্যাবহার করবে না। ফেসবুক বা ওই জাতীয় স্যোসাল মিডিয়া থেকে নিজের আইডেনটিটি প্রত্যাহার করে নেবে। কিন্তু তাও সম্ভব হয়নি। প্রতিদিন এক ভয়ঙ্কর কুৎসিত অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে ইটের পর ইট গাঁথার মতো এক একটা পরিকল্পনা সে জড়ো করে; আবার এর বিপরীত সম্ভাবনা এবং তার প্রয়োগের কথা ভেবে সবটাই ভেঙ্গে চুর চুর হয়ে যায়। মাঝে মাঝে মনে হয় সে যেন মধ্যযুগে বাস করছে। এই একবিংশ শতক, এই উন্নত প্রযুক্তির সর্বৈব ব্যাবহার, সর্বত্র আধুনিকতার ছোঁয়া! এই যে দৃশ্যত উদার নারী বান্ধব দুনিয়া এ সব কিছু যেন মিথ্যা। এক গভীর ষড়যন্ত্রের জালে সে জড়িয়ে যাচ্ছে। আর তলিয়ে যাচ্ছে গভীরে, আরো গভীর পুঁতিগন্ধময় এক গহ্বরে। বেশ কয়েকদিন ধরে মেসেজটা আসাছিল। ওরা ডাকছে। ঠিকানা দেয়া আছে, সেখানে যেতে বলছে। প্রথম দুএকদিন ইগনোর করে গেছে। কিন্তু সেই দিন! গোটা পৃথিবীটা যেন ধ্বসে গেছে ইরিনার চোখের সামনে। সেই ডকুফিল্মে দেখা হিরোশিমা-নাগাসাকিতে অ্যাটম বোমার আঘাতে যেভাবে ধ্বস নেমেছিল আভূমি দিগন্ত জুড়ে। সেভাবেই যেন ধ্বস নামলো তার গোটা অস্তিত্ব জুড়ে। মুহূর্তে বুঝতে পারে কত বড় ফাঁদে পড়েছে সে। (সম্পূর্ণ…)

সাব্বির জাদিদের গল্প: পড়শি

সাব্বির জাদিদ | ২০ december ২০১৭ ৪:৩৭ অপরাহ্ন

Fakirতোবারক আলির শরীর খারাপ। জ্বর আর গলার ভেতর খুশখুশানি কাশি। তার উপর বয়সের ভার। দুই সপ্তাহ যাবত বিছানায় শোয়া সে। চলাফেরার ক্ষমতা নেই। অথচ একটা সময় কত দাপটের সাথেই না সে সংসারের কাজকর্ম করে বেড়িয়েছে। মাঠে, গনগনে রোদে বসে গরুর ঘাস কেটেছে। ধান লাগিয়েছে। নদী সাঁতরে ওপার গেছে মাছ ধরতে। সে সব কথা আজ ভাবতে গেলেও হাত-পা অবশ হয়ে আসে।
তোবারক আলির মনে হচ্ছে এ-যাত্রা সে আর টিকবে না। এর আগেও সে কয়েকবার এমন সপ্তাব্যাপী বিছানায় পড়েছিল। বিছানা তাকে আটকে রাখতে পারেনি। বারবার গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে। মোষ যেভাবে দীর্ঘ সময় ধুলোয় শুয়ে থাকার পর হঠাৎ দাঁড়িয়ে গা ঝাড়া দেয়, তেমন। এবার আর সেই শক্তি নেই। অনেকে বলে, তোবারক আলি শুনেছে, কেউ কেউ নাকি মৃত্যুর আগে আজরাইলের গন্ধ পায়। তোবারক আলিও গন্ধ পাচ্ছে, তার সময় শেষ। কিন্তু চলে যেতে ইচ্ছে করছে না। কারই বা করে! তার মনে পড়ছে বড় ছেলের কথা। তালাক খাওয়া দুই মেয়ের মাকে বিয়ে করে বাড়ি উঠতে চেয়েছিল শরিফুল। তোবারক আলি মানেনি এই সম্বন্ধ। কী করে মানবে! সে গরিব হতে পারে, তাই বলে কি তার মানসম্মান জ্ঞান নেই! দুনিয়ায় কুমারী মেয়ের এতই আকাল পড়ল যে স্বামী খেদানো বুড়িকে তার বিয়ে করা লাগবে! শরিফুল বউ আর উপরি হিসেবে পাওয়া দুই মেয়েকে নিয়ে সেই যে গেল, আর ফেরেনি। কোথায় গেছে কেউ জানে না। ছোট ছেলে চোরাচালানির কেসে জেলে পচছে। ছেলেদুটোর একটাও যদি আজ পাশে থাকত, তোরাব আলি হয়ত এ-যাত্রায় বেঁচে যেত। না বাঁচুক, অন্তত দুই বোতল জ্বরের সিরাপ খেয়ে আরামে মরতে পারত। বিনা চিকিৎসায় মরা– এই লজ্জা থেকে রেহাই পেত।
(সম্পূর্ণ…)

পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com