ইতিহাস

রেখো মা দাসেরে মনে…

ইমতিয়ার শামীম | ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ ১১:৩৫ অপরাহ্ন

slaves.jpg…….
দাস হিসেবে বিক্রির জন্যে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আফ্রিকার লোকদের, উনিশ শতকের খোদাই ছবি।

অন্ধকার আর হিংস্রতায়, অবমাননা আর নিষ্ঠুরতায় ডুবুডুবু ভিক্টোরীয় যুগের ইংল্যান্ডকে চার্লস ডিকেন্সের চেয়ে ভালো করে আর কে চিনেছিল? অথচ এতদিন পর জানলাম, আরও এক চেহারা রয়েছে আমাদের এই প্রিয় লেখকের। কুখ্যাত জ্যামাইকান গভর্নর এডওয়ার্ড আয়ারের সাফাইকারী ছিলেন তিনি!
boulanger_gustave_clarence_.jpg
ফরাসি চিত্রশিল্পী গুস্তাভ বুলাংগারের ছবি ‘দি স্লেভ মার্কেট’ (১৮৮৮)।

জ্যামাইকার দ্বীপ মোরান্ট বে’র ক্রীতদাসরা মুক্ত হওয়ার পর নিমজ্জিত হয় প্রচণ্ড দারিদ্রে। ক্ষতিপূরণ দেয়া দূরে থাক, ভোটার হওয়ার জন্যে নতুন ফি আরোপ করা হয় তাদের ওপর। বিভিন্ন অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধে এইসব মুক্ত দাস কৃষকরা বিক্ষোভ ও বিদ্রোহে ফেটে পড়ে ১৮৬৫ সালে। গভর্নর আয়ার তাদের প্রতিবাদের প্রতিত্তর দেন নিষ্ঠুর খুন ও সন্ত্রাস চালিয়ে। আয়ারের নির্বিচার খুন ও সন্ত্রাস অব্যাহত ছিল টানা এক মাস। তার সেনাদল হত্যা করে কমপক্ষে ৪০০ মানুষ। শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীও ছিল এদের (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ৬)

অদিতি ফাল্গুনী | ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ ১১:৪৭ পূর্বাহ্ন

কিস্তি:

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

(গত সংখ্যার পর)

খণ্ড ২ : শাস্তি

১ম অধ্যায়: সাধারণীকৃত শাস্তি

‘শাস্তিকে নিয়ন্ত্রিত এবং অপরাধের সাথে সমানুপাতিক হতে দাও, শুধুমাত্র খুনের আসামীদেরই মৃত্যুদণ্ড পেতে দাও এবং মানবতাবিরোধী নির্যাতনগুলো লুপ্ত হতে দাও।’ এভাবেই, ১৭৮৯ সালের ফরাসী আদালত কর্তৃপক্ষের কাছে প্রদত্ত নির্যাতন এবং মৃত্যুদণ্ড সংক্রান্ত আবেদনপত্রগুলোর সাধারণ অবস্থানটির সারসংক্ষেপ করে (সেলিগম্যান এবং দেসজাহদা, ১৩-২০)। আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সংখ্যা ব্যাপকতর হারে বেড়ে যায়।আইনের দার্শনিক এবং তাত্ত্বিকদের ভেতর, foucault.jpg
মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪)

আইনজীবী এবং সাংসদদের ভেতর, জনপ্রিয় আবেদনপত্র এবং সংসদের আইনপ্রণেতাদের ভেতর মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সংখ্যা বাড়তেই থাকে। এক নতুন ধরনের শাস্তির প্রয়োজন দেখা দেয়। সার্বভৌম সম্রাট এবং অভিযুক্তের মধ্যকার শারীরিক দ্বন্দ্ব সমাপ্ত হতে হবে; রাজার প্রতিশোধস্পৃহা এবং জনতার মনে সঞ্চিত ক্রোধের ভেতরকার এই হাতাহাতি যুদ্ধ শেষ হতে হবে। হত্যাদণ্ড পাওয়া ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি এবং জল্লাদের ভেতরে মধ্যস্থতার মাধ্যমে এই হাতাহাতি যুদ্ধ শেষ হতে হবে। খুব দ্রুতই প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রদান অনুষ্ঠান মানুষের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠলো। ক্ষমতার দিক থেকে দেখলে, যেখানেই ক্ষমতা প্রতারণা করেছে স্বৈরাচার, ক্ষমতার অতিরেক, প্রতিশোধস্পৃহা এবং ‘শাস্তি প্রদানে পাওয়া নিষ্ঠুর আনন্দ’ (পিশন দ্যু ভিলেন্যোভ, ৬৪১)-র সাথে, সেখানেই বিপ্লব ঘটেছে। অথচ, হতাশায় ডুবে যাওয়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীর সম্পর্কে আশা করা হতো যে সে ‘তাকে (ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে) পরিত্যাগকারী স্বর্গ এবং বিচারকদের জন্য আশীর্বাদ করবে।’ (ব্যুশেহ দ্য’অর্গিস, ১৭৮১,১২৫)। এটা ছিল রীতিমতো লজ্জাজনক। প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রদান একদিক থেকে বিপজ্জনকও ছিল। যেহেতু এই দণ্ড প্রদান অনুষ্ঠান সম্রাটের সন্ত্রাস এবং সাধারণ জনতার সন্ত্রাসের ভেতরে সংঘাত সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করে দিত। প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রদানের মাধ্যমে নিষ্ঠুরতায় অপরাধীর সমকক্ষ হবার মহড়ায় সম্রাট যেন দেখতে পেতেন না যে তিনি নিজেই একটি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছেন সাধারণ মানুষের দিকে যে চ্যালেঞ্জ যে কেউ একদিন গ্রহণ করতে পারে। (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ৫)

অদিতি ফাল্গুনী | ২৪ জানুয়ারি ২০০৮ ১১:১৫ অপরাহ্ন

কিস্তি:


শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম

মিশেল ফুকো

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

খণ্ড ১ : নির্যাতন

দ্বিতীয় অধ্যায়: বধ্যমঞ্চের জমকালো প্রদর্শনী

(গত সংখ্যার পর)

এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে প্রকাশ্য নির্যাতন ও মৃত্যুদণ্ড প্রদানের অস্তিত্ব শাস্তির অভ্যন্তরীন প্রতিষ্ঠানের বদলে অন্য কিছুর সাথে জড়িত ছিল। রুশ্চে (Rusche) এবং কির্শহেইমার (Kirchheimer) এই বিষয়টিকে যথার্থই এমন এক উৎপাদন ব্যবস্থার প্রভাব হিসেবে দেখেন যাতে শ্রম ক্ষমতা এবং মানব শরীরের না আছে কোন উপযোগ না কোন বাণিজ্য মূল্য।foucault-shiri.jpg……
মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪)
……..
শিল্পায়ন অর্থনীতিই তাদের উপর এই উৎপাদন ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়েছে। উপরন্তু, প্রকাশ্য নির্যাতনে মানব শরীরের প্রতি সাধিত ‘অবমাননা’ মৃত্যুর প্রতি সাধারণ ভাবে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সম্পর্কযুক্ত। এবং এমন এক দৃষ্টিভঙ্গিতে কেউ যে শুধু যথার্থ খ্রিষ্টিয় মূল্যবোধই শণাক্ত করবেন তা’ নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে আরো রয়েছে জৈবিক অবস্থান: অসুস্থতা ও ক্ষুধার ধ্বংস, মন্বন্তরের কালিক যত সংহার, পরিতাপযোগ্য শিশুমৃত্যুর হার, জৈব-আর্থনীতিক ভারসাম্যের অনিশ্চয়তা প্রভৃতি। এসকল উপাদান মৃত্যুকে আরো পরিচিত করেছে। সৃষ্টি করেছে এমন সব আনুষ্ঠানিকতার যা মৃত্যুকে অন্তর্ভুক্ত ও গ্রহণযোগ্য করা এবং মৃত্যুর আগ্রাসনকে চিরকালীন অর্থ প্রদানের প্রয়াস চালায়। কিন্তু, কেন প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রথা এত দীর্ঘ সময় ধরে চালু ছিল, তা’ বিশ্লেষণ করতে হলে ঐতিহাসিক সঙ্কটমুহূর্তগুলো লক্ষ্য করা প্রয়োজন। একথা ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না যে ১৭৬০ সালের অধ্যাদেশ কোন কোন ক্ষেত্রে পুরনো আইনগ্রন্থগুলোর কঠোরতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল। অথচ, এই অধ্যাদেশই ফরাসী বিপ্লবের সময় অবধি অপরাধ বিচারকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। পুসোর্ট, কমিশনারদের ভেতর যার দায়িত্ব ছিল বিভিন্ন নথিপত্র প্রস্তুত করা, মূলতঃ রাজার ইচ্ছার প্রতিনিধিত্ব করতেন। পুরনো আইনগ্রন্থের কঠোরতা বাড়ানোর জন্য তিনিই দায়ী ছিলেন, যদিও লামোইগনের মতো ম্যাজিস্ট্রেটরা এই কঠোরতা বাড়ানোর বিরোধী ছিলেন। ধ্রুপদী যুগে সম্রাট-বিরোধী বিক্ষোভের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, গৃহযুদ্ধের সময় বিক্ষোভ কমে আসা, সংসদ ভেঙে দিয়ে রাজার ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা ইত্যাদি সব কারণ মিলেই এত কঠোর একটি দণ্ড আইনের দীর্ঘকাল টিঁকে থাকার কারণ। (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ৪)

অদিতি ফাল্গুনী | ১৩ জানুয়ারি ২০০৮ ২:৪৭ অপরাহ্ন

কিস্তি:

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

(গত সংখ্যার পর)

খণ্ড ১ : নির্যাতন

দ্বিতীয় অধ্যায়: বধ্যমঞ্চের জমকালো প্রদর্শনী

প্রকৃতপক্ষে অপরাধীর শরীরে নির্যাতনের মাধ্যমে যে তদন্ত হতো, তাই শাস্তির প্রয়োগবিন্দু গঠন করতো। গঠন করতো জোর করে সত্য আদায়ের সঠিক স্থান। যেহেতু পূর্বানুমান ছিল তদন্তের একটি অবিভাজ্য উপকরণ এবং অপরাধের অংশ বিশেষ, সেহেতু মামলার তদন্তকালীন নির্যাতনে অপরাধীকে যে নিয়ন্ত্রিত মাত্রার ব্যথা দেওয়া হতো, তা’ ছিল একই সাথে শাস্তি প্রয়োগ এবং তদন্তের একটি মাধ্যম।

এখন, বেশ কৌতূহলোদ্দীপকভাবেই, অপরাধীর শরীরের মাধ্যমে শাস্তি ও তদন্ত–এই দুই আনুষ্ঠানিকতার সংমিশ্রণ অব্যাহত থাকতো। সাক্ষ্য জোরদার হলে মামলার সাজা প্রদান করা হতো।
inquisition.jpg………
স্প্যানিশ ইনকুইজিশন
……….
দণ্ডের প্রকৃত প্রয়োগ সম্ভবপর হতো এভাবেই। এবং, প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রদানের অনুষ্ঠানে অভিযুক্তের দেহ আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে গণ্য হতো। অপরাধী ব্যক্তির কাজ ছিল প্রকাশ্যে নিজের নিন্দা বয়ে বেড়ানো। তার কাজ ছিল স্বকৃত অপরাধের সত্য প্রকাশ্যে বহন করা। জনতার প্রকাশ্য মিছিলে প্রদর্শিত তার শরীর মামলার আলো-আঁধারিতে ঢাকা প্রক্রিয়াকে জনতার কাছে সহজবোধ্য করে তোলার সহায় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ব্যবহৃত হতো তার উপর প্রণীত শাস্তিদণ্ডকে সবার কাছে স্পষ্ট করে তুলবার কাজেও। আঠারো শতকে শাস্তির প্রকাশ্য প্রয়োগের মাধ্যমে সত্যের এই প্রত্যক্ষ ও চমক লাগানো প্রকাশের কিছু দিক ছিল।

১. এর মাধ্যমে অপরাধী ব্যক্তি নিজেই নিজের নিন্দার বার্তাবাহক হতো। এক অর্থে বলতে গেলে তাকে আত্ম-নিন্দা ঘোষণা করার কাজ দেওয়া হতো যার মাধ্যমে স্বকৃত অপরাধের সত্যতাকে প্রত্যয়ন করা হতো। রাস্তায় জনতার মিছিলের ভেতর দিয়ে যাবার সময়, তার (অভিযুক্তের) পিঠে, বুকে বা মাথায় বেঁধে দেওয়া ব্যানার যা তাকে দেওয়া দণ্ডাজ্ঞা মনে করিয়ে দিতো। বিভিন্ন রাস্তার সংযোগস্থলে থামার সময় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ঘোষিত দণ্ড পাঠ করা হতো, গির্জার দরজায় এ্যামেণ্ডে অনারেবল সম্পন্ন হতো, যেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তি চারপাশের ভাবগম্ভীর পরিবেশের ভেতর নিজের অপরাধ স্বীকার করতো। ‘নগ্নপদ, একটি শার্ট পরনে, হাতে একটি মশাল, হাঁটু গেঁড়ে বসে অপরাধীকে বলতে হতো, ঘোষণা করতে হতো যে মন্দভাবে, ভয়ঙ্করভাবে, প্রতারকের মতো সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ সে করেছে।’ (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ৩)

অদিতি ফাল্গুনী | ৭ জানুয়ারি ২০০৮ ১:৩৯ পূর্বাহ্ন

কিস্তি:

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

(গত সংখ্যার পর)

খণ্ড ১ : নির্যাতন

দ্বিতীয় অধ্যায়: বধ্যমঞ্চের জমকালো প্রদর্শনী

মোটামুটি ভাবে ১৭৬০ সালের আইন গ্রন্থই ফরাসী বিপ্লব পর্যন্ত সেদেশের দণ্ডবিধি আইনের সাধারণ আঙ্গিক নিয়ন্ত্রণ করেছে। সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্ন
sedia2.jpg……..
ইনকুইজিশনাল চেয়ার। জার্মানিতে এ ধরনের চেয়ার ব্যবহার করা হয়েছে ১৯ শতক পর্যন্ত। ইতালি ও স্পেনে ১৭০০ সাল পর্যণ্ত। ফ্রান্স ও মধ্য ইউরোপের দেশগুলিতে ১৮ শতক পর্যন্ত এই চেয়ার ব্যবহৃত হয়েছে।
……….
দণ্ডের ক্ষেত্রে নিচের পরম্পরা চালু ছিল: “মৃত্যু, প্রমাণের বিষয়টি অমীমাংসিত বা মূলতবি থাকলে বিচারাগারে শাস্তি, সশ্রম কারাদণ্ড, চাবুক বা বেত্রাঘাত, অ্যামেন্ডে অনাহাবল, নির্বাসন।” দেশের প্রচলিত নানা প্রথা, অপরাধের প্রকৃতি এবং অভিযুক্তের সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী শাস্তির নানা প্রকরণ প্রচলিত ছিল। “মৃত্যুদণ্ডের আওতায় রয়েছে নানা প্রকারের মৃত্যু: কিছু কয়েদিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যার আদেশ দেওয়া হতো, কারো কারো শিরচ্ছেদের আদেশ হতো, কারো আবার হাত কাটা বা জিহ্বা কাটার পর কি বিদ্ধ করার পর ফাঁসিতে ঝোলানোর আদেশ দেওয়া হতো; অনেকের আবার, অপরাধের মাত্রা বেশি গুরুতর হলে, চাকায় বেঁধে
head-foucault.jpg……..
মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪)
………

শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করার পর হত্যা; কারো কারো ক্ষেত্রে শরীর ভেঙে দেওয়ার দণ্ড দেওয়া হতো যতক্ষণ না তাদের মৃত্যু হয়, অনেকের আবার শ্বাসরোধ করবার পর হত্যা এবং শরীর ভেঙে দেওয়া, অনেককে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা, অনেককে শ্বাসরুদ্ধ করার পর পুড়িয়ে মারা; অনেককে চারটা ঘোড়া দিয়ে টেনে নিয়ে টুকরো করা, অনেকের মাথা কেটে ফেলা এবং আরো অনেকের মাথা ভেঙে দেওয়া প্রভৃতি নানা ধরনের মৃত্যুদণ্ড প্রচলিত ছিল (স্যুলাতজে, ১৬৯-৭১)।” এবং স্যুলাতজে আরো যোগ করেন যে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি নানা ধরনের তুলনামূলক হাল্কা দণ্ডও ছিল যা অবশ্য ১৭৬০ সালের আইনে উল্লেখ করা হয় নি: মামলার ক্ষতিগ্রস্থ পক্ষের সন্তোষ সাধন, অভিযুক্তকে হুমকি বা ভীতি প্রদর্শনী, কঠোর তিরষ্কার, সংক্ষিপ্ত সময়ের কারাদণ্ড, কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় প্রবেশে বাধা এবং শেষতঃ আর্থিক দণ্ড অর্থাৎ জরিমানা বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার প্রচলন ছিল।

তবে, আমাদের বিভ্রান্ত হওয়া উচিত হবে না। ভীতির এই অস্ত্রাগার এবং প্রতিদিনের দণ্ড অনুশীলনের ভেতর কিছু উল্লেখযাগ্য ব্যবধান ছিল। এমন নয় যে সে সময়ের দণ্ড আইন অনুযায়ী বন্দিকে প্রকাশ্য নির্যাতন করা বা মৃত্যুদণ্ড দেওয়াই শাস্তির সবচেয়ে বেশি চর্চিত প্রকরণ ছিল। ধ্রুপদী যুগে প্রদত্ত মৃত্যুদণ্ডের পরিমাণ আজকের আমাদের চোখে খুব বেশি মনে হতে পারে: ১৭৫৫-৮৫ সাল নাগাদ শাতেলেতে বিচারকদের দেওয়া রায়ের শতকরা দশ ভাগই ছিল মৃত্যুদণ্ডের বিধান: চাকা, ফাঁসিকাঠ অথবা অপরাধীকে পুড়িয়ে মারার জন্য খুঁটিতে বাঁধার রায় (পেত্রোভিচ, ২২৬); ১৭২১-১৭৩০ সালের ভেতর ফ্লেন্ডার্সের সংসদ মোট ২৬০ টি মামলার রায় প্রদান করে যার ৩৯টিই ছিল মৃত্যুদণ্ড (১৭৮১-১৭৯০ সাল নাগাদ ৫০০টি মামলার রায়ের ভেতর মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা ছিল ২৬–দ্যোত্রিকোর্ট)। কিন্তু, এ কথাও ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে এসব আদালত দণ্ড ব্যবস্থার কড়াকড়ি শিথিল করার নানা পথ খুঁজে বের করেছে। কখনো কখনো সে জাতীয় অপরাধের জন্য মামলা রুজু করতে চায় নি যেগুলোর জন্য খুব কঠোর শাস্তির বিধান ছিল। (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ২)

অদিতি ফাল্গুনী | ২৯ december ২০০৭ ৯:৫৬ পূর্বাহ্ন

কিস্তি:

fk.jpg
মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪)

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

(গত সংখ্যার পর)

খণ্ড ১ : নির্যাতন

প্রথম অধ্যায়: অভিযুক্তের দেহ

গত দু’শো বছরে শাস্তির তীব্রতা কমে আসার সাথে আইনের ইতিহাসবিদরা ভাল ভাবেই পরিচিত। দীর্ঘ সময়ের জন্য এই বিষয়টি কম নিষ্ঠুরতা, কম যন্ত্রণা, অধিকতর দয়া, অধিকতর সম্মান, অধিকতর ‘মানবতা’ এমন পরিমাণগত প্রপঞ্চ হিসেবে থেকেছে। আসলে এই পরিবর্তনগুলো শাস্তি পরিচালনার উদ্দেশ্যর ক্ষেত্রে এক ধরনের স্থানচ্যুতির প্রভাবে প্রভাবিত। এভাবে শাস্তির তীব্রতা কমেছে কি? হয়তো কমেছে। যেহেতু উদ্দেশ্যের কিছু পরিবর্তন সেখানে ঘটেছে।

শাস্তি তার তীব্রতম রূপেও শরীরকে আর লক্ষ্য না করলে কীসের উপর সে তার প্রভাব রাখবে?

boi_f.jpgতাত্ত্বিকদের অত্যন্ত সরল ও প্রায় প্রত্যক্ষ উত্তর হলো, ১৭৬০ সালের দিকে এক নতুন যুগের সূচনা করা হয়েছিল যা আজো শেষ হয়নি। এ প্রশ্নের উত্তর অবশ্য প্রশ্নেই নিহিত: শাস্তির লক্ষ্য আজ আর কোনোক্রমেই অপরাধীর শরীর নয়। লক্ষ্য তার আত্মা। অতীতে শাস্তি অপরাধীর শরীরকে লক্ষ্য করে দেওয়া হতো, আজ তা হৃদয়ের গভীরতাকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া হবে। চিন্তা, ইচ্ছা ও প্রবণতাকে উদ্দেশ্য করে এই নতুন যুগের শাস্তি দেওয়া হয়ে থাকে। মেবলি এই নীতিকে একদা সবার জন্য প্রণয়ন করেছিলেন: “ আমি শাস্তি প্রদান করলে তা’ দেহ নয় বরং আত্মাকে আঘাত করবে। (মেবলি, ৩২৬ পৃ.)।”

এ ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। দেহ ও রক্ত, শাস্তির বধ্যমঞ্চের দুই পুরনো অংশীদার, সেই পথ ছেড়ে দিয়েছে। মুখোশপরা এক নতুন চরিত্র দৃশ্যে প্রবেশ করেছে। যেন কোনো বিয়োগান্তক কাহিনীর শেষ। ছায়া অভিনয়, মুখহীন কণ্ঠস্বর, স্পর্শাতীত যত সত্তা নিয়ে কমেডি শুরু হলো। শাস্তিমূলক বিচারের যন্ত্রপাতি এই অশরীরী বাস্তবতায় এখন নির্ঘাত কামড় বসাবে। (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম

অদিতি ফাল্গুনী | ১৬ december ২০০৭ ৫:১৩ অপরাহ্ন

foucault
মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪)

[আর্টস-এর পাতায় এ সংখ্যা থেকে শুরু হচ্ছে ফরাসি লেখক-বুদ্ধিজীবী মিশেল ফুকোর (Michel Foucault, ১৯২৬-১৯৮৪) শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (১৯৭৫)বইটির ধারাবাহিক অনুবাদ। বইটি ফরাসি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন Alan Sheridan। ইংরেজিতে বইয়ের নাম Discipline and Punish: The Birth of the Prison। ইংরেজি থেকে বাংলায় বইটি অনুবাদ করছেন অদিতি ফাল্গুনী। নিচে অনুবাদ অংশের আগে অনুবাদকের ভূমিকা যুক্ত হলো। –বি. স.]

অনুবাদকের ভূমিকা
সমকালীন বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী চিন্তাবিদদের মধ্যে মিশেল ফুকো অন্যতম। ১৯২৬ সালের ১৫ অক্টোবর ফ্রান্সের পইতিয়েহতে জন্ম ফুকোর। দার্শনিক, সমাজ বিজ্ঞানী, সমালোচক এবং ভাবনার ইতিহাসবিদ ফুকো ছিলেন কলেজ দ্যু ফ্রাঁসের চিন্তা পদ্ধতির ইতিহাসের শিক্ষক। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলেতেও শিক্ষকতা করেছেন। ফরাসী কাগজ এবং রিভিয়্যু জার্নালে নিয়মিত লিখতেন। তিনি ক্রিটিক সম্পাদনা করেছেন।

বিবিধ সামাজিক প্রতিষ্ঠান বিষয়ে সমালোচনামূলক আলোচনার কারণে মিশেল ফুকো বিখ্যাত। মনস্তত্ত্ব, চিকিৎসাবিদ্যা, মানবিক বিজ্ঞানসমূহ ও কারাগার ব্যবস্থার তিনি সমালোচনা করেছেন। মানবীয় যৌনতা নিয়ে তাঁর কাজও গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতা ও ক্ষমতার ভেতরকার আন্তঃসম্পর্ক, জ্ঞান ও ডিসকোর্সের নানা বিষয়ে তাঁর রচনা আলোচিত ও প্রয়োগকৃত হয়েছে। কখনো উত্তরাধুনিক (Postmodernist) বা উত্তর-কাঠামোবাদী (post-structuaralist) হিসেবে পরিচিতি পেলেও ১৯৬০-এর দশকে তিনি বরং কাঠামোবাদী (structuaralist) আন্দোলনে বেশি জড়িত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ফুকো নিজেকে কাঠামোবাদ থেকে দূরে সরিয়ে নেন এবং উত্তর- কাঠামোবাদী বা উত্তরাধুনিকতাবাদীর তকমা বর্জন করেন।

২.
১৯৬৮ সালে প্রচুর সাধারণ ধর্মঘট ও ছাত্র আন্দোলনের কারণে ফ্রান্সে দ্যগল সরকারের পতন ঘটে। এ সময়ে বিক্ষোভকারীদের অধিকাংশই বামপন্থী ভাবাদর্শ গ্রহণ করেন, যদিও প্রতিষ্ঠিত বাম প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিক ইউনয়িনগুলি এই আন্দোলন থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখছিল।
may_68_poster_1.jpg………
১৯৬৮-র ফরাসি ছাত্র বিক্ষোভের সময়ের পোস্টার: ‘তরুণ হও এবং চুপ থাকো’
………
এ আন্দোলনকে অনেকেই দেখে থাকেন শিক্ষা ও কর্মসংস্থানসহ সামাজিক নানা প্রশ্নে পুরোনো নৈতিকতার অচলায়তনকে ঝাঁকুনি দেওয়ার একটি সুযোগ হিসাবে। এ ঘটনার পরে ফরাসী সরকার ভিনসেন্নেসে একটি নতুন নিরীক্ষাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয় প্যারিস অষ্টম প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রথম বিভাগীয় প্রধান হিসেবে মিশেল ফুকো জুডিথ মিলারসহ এমন সব তরুণ ও বামপন্থী শিক্ষকদের নিয়োগ দিতে থাকেন যাদের বিপ্লবীয়ানা শিক্ষামন্ত্রণালয়কে উদ্বুদ্ধ করে দর্শন বিভাগের সরকারী স্বীকৃতি বাতিল করতে। (সম্পূর্ণ…)

« আগের পাতা |

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com