দর্শন

জাক লাকাঁ কথিত ‘অন্তর্জগতে যাহা না মিশিলে কোন সহজই জন্মায় না সেই পরকীয়া বা গঠনের কথা’

সলিমুল্লাহ খান | ১২ জানুয়ারি ২০০৮ ৪:৫৭ অপরাহ্ন

lacan-1932.jpg
১৯৩২ সালে জাক লাঁকা, বামে বসে থাকা জন

ভাষা, গঠনতন্ত্র ও সহজ মানুষ : লাঁকা পড়ার ভূমিকা

সলিমুল্লাহ খান

১৯৬৬ সালের অক্টোবর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্গত মেরিল্যান্ড রাজ্যের অন্তঃপাতী বল্টিমোর শহরে ফরাসি-মার্কিন বুদ্ধিজীবীদের এক বিশেষ সভা বসিয়াছিল। আমাদের এই আলোচনার বিষয়ের সহিত ঐ সভার আলোচ্য বিষয়ের বিশেষ মিল আছে। ফরাসিদেশের বুদ্ধিজীবী মহলে ততদিনে তত্ত্বজ্ঞানের প্রস্থানস্বরূপ ‘গঠনতন্ত্র’ [structuralism] নামক নতুন প্রস্তাব লইয়া আলোচনা জমিয়া উঠিয়াছে। আর মার্কিনদেশেও ইহার প্রভাব ছড়াইয়া গিয়াছে। তাই ১৯৬৬ সালের এই বল্টিমোর সভার বিষয় ঠিক হইয়াছিল ‘গঠনতন্ত্র’।

ঐ সভায় যাঁহারা হাজির হইয়াছিলেন তাঁহাদের মধ্যে ছিলেন রলাঁ বার্থ [Roland Barthes], জাক লাকাঁ [Jacques Lacan], জাক দেরিদা [Jacques Derrida], লুসিয়ঁ গোল্ডমান [Lucien Goldmann], জঁ-পল ভেরনা [Jean-Paul Vernant] এবং ত্রিস্তান তোদোরব [Tristan Todorov] প্রমুখ নামজাদা বিদ্বান ও বুদ্ধিজীবী। অন্য এক নামজাদা বুদ্ধিজীবী জঁ ইপ্পোলিত [Jean Hyppolite] ফরাসি তরফে এই সভা আঞ্জাম করিয়াছিলেন। বলা হয়তো নিষ্প্রয়োজন নয় এই জঁ ইপ্পোলিত জার্মান হেগেলের ফরাসি অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করিয়া বিশেষ নাম কুড়াইয়াছিলেন। তিনি চাহিলে জাক লাকাঁর বিশেষ বন্ধু ও জাক দেরিদার প্রধান শিক্ষক হিসাবেও পরিচিত হইতে পারিতেন। দুর্ভাগ্যবশত মহাত্মা ইপ্পোলিত ১৯৬৮ সালে–নিতান্ত অপরিণত বয়সে–এন্তেকাল করিয়া সকলকে শোকসাগরে ভাসাইলেন।

কারণ যাহাই হউক অনেক দেরি করিয়া ১৯৬৬ সালের ঐ সম্মেলনের কার্যবিবরণী প্রথম ছাপা হয় ১৯৭০ সাল নাগাদ। ইহার দুই বছর পর তাহার পুণর্মুদ্রণও হয়। পুনর্মুদ্রণের অজুহাতে বইয়ের নামেরও কিছু পরিবর্তন
roland_barthes.jpg…….
রলাঁ বার্থ (১৯১৫—১৯৮০)
………
ঘটান হয়। ১৯৭০ সালের সংস্কার অনুসারে বইয়ের আসল নাম রাখা হইয়াছিল ‘বিচারশাস্ত্রের ভাষা ও মনুষ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান : গঠনতন্ত্র বিসম্বাদ’। ১৯৭২ সালের সংস্কার অনুসারে উহার নাম পাল্টাইয়া রাখা হইল ‘গঠনতন্ত্র বিসম্বাদ: বিচারশাস্ত্রের ভাষা ও মনুষ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান’। ইহার মানে বড় নাম ছোট হইল, ছোট নাম বড় হইল। পাঠিকারা ইহাতেই বুঝিবেন জ্ঞানের জগতে ‘গঠন’ [structure] নামে নতুন কোন ঘটনা ঘটিয়াছে। ইহাতে প্রমাণ এয়ুরোপের মনে মনে ‘গঠনতন্ত্র’ বড় আকারের ফটিক হইয়া উঠিয়াছে। ১৯৬৬ সালে ঠিক ইহাই অনুমান করিয়াছিলেন মহাত্মা জাক লাকাঁ। তাঁহার বল্টিমোর বক্তৃতায় সেই কথার প্রমাণ আছে। (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ৩)

অদিতি ফাল্গুনী | ৭ জানুয়ারি ২০০৮ ১:৩৯ পূর্বাহ্ন

কিস্তি:

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

(গত সংখ্যার পর)

খণ্ড ১ : নির্যাতন

দ্বিতীয় অধ্যায়: বধ্যমঞ্চের জমকালো প্রদর্শনী

মোটামুটি ভাবে ১৭৬০ সালের আইন গ্রন্থই ফরাসী বিপ্লব পর্যন্ত সেদেশের দণ্ডবিধি আইনের সাধারণ আঙ্গিক নিয়ন্ত্রণ করেছে। সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্ন
sedia2.jpg……..
ইনকুইজিশনাল চেয়ার। জার্মানিতে এ ধরনের চেয়ার ব্যবহার করা হয়েছে ১৯ শতক পর্যন্ত। ইতালি ও স্পেনে ১৭০০ সাল পর্যণ্ত। ফ্রান্স ও মধ্য ইউরোপের দেশগুলিতে ১৮ শতক পর্যন্ত এই চেয়ার ব্যবহৃত হয়েছে।
……….
দণ্ডের ক্ষেত্রে নিচের পরম্পরা চালু ছিল: “মৃত্যু, প্রমাণের বিষয়টি অমীমাংসিত বা মূলতবি থাকলে বিচারাগারে শাস্তি, সশ্রম কারাদণ্ড, চাবুক বা বেত্রাঘাত, অ্যামেন্ডে অনাহাবল, নির্বাসন।” দেশের প্রচলিত নানা প্রথা, অপরাধের প্রকৃতি এবং অভিযুক্তের সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী শাস্তির নানা প্রকরণ প্রচলিত ছিল। “মৃত্যুদণ্ডের আওতায় রয়েছে নানা প্রকারের মৃত্যু: কিছু কয়েদিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যার আদেশ দেওয়া হতো, কারো কারো শিরচ্ছেদের আদেশ হতো, কারো আবার হাত কাটা বা জিহ্বা কাটার পর কি বিদ্ধ করার পর ফাঁসিতে ঝোলানোর আদেশ দেওয়া হতো; অনেকের আবার, অপরাধের মাত্রা বেশি গুরুতর হলে, চাকায় বেঁধে
head-foucault.jpg……..
মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪)
………

শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করার পর হত্যা; কারো কারো ক্ষেত্রে শরীর ভেঙে দেওয়ার দণ্ড দেওয়া হতো যতক্ষণ না তাদের মৃত্যু হয়, অনেকের আবার শ্বাসরোধ করবার পর হত্যা এবং শরীর ভেঙে দেওয়া, অনেককে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা, অনেককে শ্বাসরুদ্ধ করার পর পুড়িয়ে মারা; অনেককে চারটা ঘোড়া দিয়ে টেনে নিয়ে টুকরো করা, অনেকের মাথা কেটে ফেলা এবং আরো অনেকের মাথা ভেঙে দেওয়া প্রভৃতি নানা ধরনের মৃত্যুদণ্ড প্রচলিত ছিল (স্যুলাতজে, ১৬৯-৭১)।” এবং স্যুলাতজে আরো যোগ করেন যে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি নানা ধরনের তুলনামূলক হাল্কা দণ্ডও ছিল যা অবশ্য ১৭৬০ সালের আইনে উল্লেখ করা হয় নি: মামলার ক্ষতিগ্রস্থ পক্ষের সন্তোষ সাধন, অভিযুক্তকে হুমকি বা ভীতি প্রদর্শনী, কঠোর তিরষ্কার, সংক্ষিপ্ত সময়ের কারাদণ্ড, কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় প্রবেশে বাধা এবং শেষতঃ আর্থিক দণ্ড অর্থাৎ জরিমানা বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার প্রচলন ছিল।

তবে, আমাদের বিভ্রান্ত হওয়া উচিত হবে না। ভীতির এই অস্ত্রাগার এবং প্রতিদিনের দণ্ড অনুশীলনের ভেতর কিছু উল্লেখযাগ্য ব্যবধান ছিল। এমন নয় যে সে সময়ের দণ্ড আইন অনুযায়ী বন্দিকে প্রকাশ্য নির্যাতন করা বা মৃত্যুদণ্ড দেওয়াই শাস্তির সবচেয়ে বেশি চর্চিত প্রকরণ ছিল। ধ্রুপদী যুগে প্রদত্ত মৃত্যুদণ্ডের পরিমাণ আজকের আমাদের চোখে খুব বেশি মনে হতে পারে: ১৭৫৫-৮৫ সাল নাগাদ শাতেলেতে বিচারকদের দেওয়া রায়ের শতকরা দশ ভাগই ছিল মৃত্যুদণ্ডের বিধান: চাকা, ফাঁসিকাঠ অথবা অপরাধীকে পুড়িয়ে মারার জন্য খুঁটিতে বাঁধার রায় (পেত্রোভিচ, ২২৬); ১৭২১-১৭৩০ সালের ভেতর ফ্লেন্ডার্সের সংসদ মোট ২৬০ টি মামলার রায় প্রদান করে যার ৩৯টিই ছিল মৃত্যুদণ্ড (১৭৮১-১৭৯০ সাল নাগাদ ৫০০টি মামলার রায়ের ভেতর মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা ছিল ২৬–দ্যোত্রিকোর্ট)। কিন্তু, এ কথাও ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে এসব আদালত দণ্ড ব্যবস্থার কড়াকড়ি শিথিল করার নানা পথ খুঁজে বের করেছে। কখনো কখনো সে জাতীয় অপরাধের জন্য মামলা রুজু করতে চায় নি যেগুলোর জন্য খুব কঠোর শাস্তির বিধান ছিল। (সম্পূর্ণ…)

দ্য ম্যাট্রিক্স মুভি নিয়ে জ্যাঁ বদ্রিয়াঁর সাথে আলাপ

সুমন রহমান | ৩ জানুয়ারি ২০০৮ ১১:৩৫ অপরাহ্ন

neo_bullets.jpg

অদে ল্যান্সেলিন

ভাষান্তর: সুমন রহমান

baudrillardjean1.jpg
জ্যাঁ বদ্রিয়াঁ (১৯২৯-২০০৭)

দ্য ম্যাট্রিক্স (১৯৯৯) হলিউডের একটি ব্লকবাস্টার সাইন্স ফিকশন মুভি। ওয়াচোস্কি ভাইদের বানানো সেই মুভিতে নিও নামের এক কম্পিউটার হ্যাকারের সাথে মরফিউস নামে আরেক প্রবাদতুল্য হ্যাকারের দেখা হয় এবং সে তাকে ২০০ বছর পরের পৃথিবীতে নিয়ে যায় যেখানে সাইবার ইন্টেলিজেন্স দুনিয়াকে শাসন করছে। সেখানে এক যন্ত্রগোষ্ঠী মানুষের মধ্যে প্রভূত প্রভাব বিস্তার করে তাদের হৃদয়কে “ম্যাট্রিক্স” নামক একটি গাণিতিক বাস্তবতার মধ্যে বন্দী করে রাখছে। নিও, মরফিউস এবং ট্রিনিটি ম্যাট্রিক্সকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়।

জ্যাঁ বদ্রিঁয়া (১৯২৯-২০০৭) বর্তমান বিশ্বের নেতৃস্থানীয় দার্শনিকদের একজন যার হাত ধরে উত্তরাধুনিকতাবাদের বিকাশ হয়েছে। জনপ্রিয় ও স্মরণীয় ইভেন্ট, সেলিব্রিটি এবং সংস্কৃতি নিয়ে তার অনেক চিন্তাজাগানিয়া রচনা আছে। “সিমুলেশন ও সিমুলাক্রা” তাঁর অসংখ্য রচনার একটি, যার উদ্ধৃতি এই সাক্ষাৎকারে আছে। ”সিমুলেশন” বলতে তিনি বোঝান সেই বানিয়ে তোলা বাস্তবতা বা ভার্চুয়াল-এর বর্ণন যা “সত্যিকারের” বাস্তবতা থেকেও সত্য ও শ্রেয়তর হতে আরম্ভ করে।

matrix_revolutions_hallway.jpg……
দ্য ম্যাট্রিক্স ছবির দৃশ্য
…….
অদে ল্যান্সেলিন: ভার্চুয়াল ও বাস্তব নিয়ে তোমার ধারণাগুলোকে দ্য ম্যাট্রিক্স মুভির মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখা গেছে। ম্যাট্রিক্সের প্রথম পর্বটি তো একেবারে সরাসরি সেরকম ইঙ্গিত দিয়েছে। মনে হয়েছে “সিমুলাক্রা ও সিমুলেশন”-এর প্রচ্ছদ যেন রুপালী পর্দায়! অবাক হয়েছো?

wachowski_broth.jpg……..
দুই ওয়াচোস্কি
……….
জ্যাঁ বদ্রিয়াঁ: এখানে নিশ্চিতভাবেই একটা ভুল বোঝাবুঝি আছে, যে কারণে আমি এখনও দ্য ম্যাট্রিক্স নিয়ে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। দ্য ম্যাট্রিক্স-এর প্রথম পর্ব মুক্তি পাবার পর ওয়াচোস্কি ভাইদের তরফ থেকে আমার সাথে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তাদের প্রত্যাশা ছিল পরের পর্বগুলোয় তারা আমার সঙ্গে কাজ করবেন। কিন্তু এরকম হবার প্রশ্নই ওঠে না (হাসি)। ১৯৮০ সালেও এরকম একবার হয়েছিল যখন ন্যু-ইয়র্কের সিমুলেশনবাদী চিত্রশিল্পীরা আমার সাথে দেখা করলেন। (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ২)

অদিতি ফাল্গুনী | ২৯ december ২০০৭ ৯:৫৬ পূর্বাহ্ন

কিস্তি:

fk.jpg
মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪)

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

(গত সংখ্যার পর)

খণ্ড ১ : নির্যাতন

প্রথম অধ্যায়: অভিযুক্তের দেহ

গত দু’শো বছরে শাস্তির তীব্রতা কমে আসার সাথে আইনের ইতিহাসবিদরা ভাল ভাবেই পরিচিত। দীর্ঘ সময়ের জন্য এই বিষয়টি কম নিষ্ঠুরতা, কম যন্ত্রণা, অধিকতর দয়া, অধিকতর সম্মান, অধিকতর ‘মানবতা’ এমন পরিমাণগত প্রপঞ্চ হিসেবে থেকেছে। আসলে এই পরিবর্তনগুলো শাস্তি পরিচালনার উদ্দেশ্যর ক্ষেত্রে এক ধরনের স্থানচ্যুতির প্রভাবে প্রভাবিত। এভাবে শাস্তির তীব্রতা কমেছে কি? হয়তো কমেছে। যেহেতু উদ্দেশ্যের কিছু পরিবর্তন সেখানে ঘটেছে।

শাস্তি তার তীব্রতম রূপেও শরীরকে আর লক্ষ্য না করলে কীসের উপর সে তার প্রভাব রাখবে?

boi_f.jpgতাত্ত্বিকদের অত্যন্ত সরল ও প্রায় প্রত্যক্ষ উত্তর হলো, ১৭৬০ সালের দিকে এক নতুন যুগের সূচনা করা হয়েছিল যা আজো শেষ হয়নি। এ প্রশ্নের উত্তর অবশ্য প্রশ্নেই নিহিত: শাস্তির লক্ষ্য আজ আর কোনোক্রমেই অপরাধীর শরীর নয়। লক্ষ্য তার আত্মা। অতীতে শাস্তি অপরাধীর শরীরকে লক্ষ্য করে দেওয়া হতো, আজ তা হৃদয়ের গভীরতাকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া হবে। চিন্তা, ইচ্ছা ও প্রবণতাকে উদ্দেশ্য করে এই নতুন যুগের শাস্তি দেওয়া হয়ে থাকে। মেবলি এই নীতিকে একদা সবার জন্য প্রণয়ন করেছিলেন: “ আমি শাস্তি প্রদান করলে তা’ দেহ নয় বরং আত্মাকে আঘাত করবে। (মেবলি, ৩২৬ পৃ.)।”

এ ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। দেহ ও রক্ত, শাস্তির বধ্যমঞ্চের দুই পুরনো অংশীদার, সেই পথ ছেড়ে দিয়েছে। মুখোশপরা এক নতুন চরিত্র দৃশ্যে প্রবেশ করেছে। যেন কোনো বিয়োগান্তক কাহিনীর শেষ। ছায়া অভিনয়, মুখহীন কণ্ঠস্বর, স্পর্শাতীত যত সত্তা নিয়ে কমেডি শুরু হলো। শাস্তিমূলক বিচারের যন্ত্রপাতি এই অশরীরী বাস্তবতায় এখন নির্ঘাত কামড় বসাবে। (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম

অদিতি ফাল্গুনী | ১৬ december ২০০৭ ৫:১৩ অপরাহ্ন

foucault
মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪)

[আর্টস-এর পাতায় এ সংখ্যা থেকে শুরু হচ্ছে ফরাসি লেখক-বুদ্ধিজীবী মিশেল ফুকোর (Michel Foucault, ১৯২৬-১৯৮৪) শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (১৯৭৫)বইটির ধারাবাহিক অনুবাদ। বইটি ফরাসি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন Alan Sheridan। ইংরেজিতে বইয়ের নাম Discipline and Punish: The Birth of the Prison। ইংরেজি থেকে বাংলায় বইটি অনুবাদ করছেন অদিতি ফাল্গুনী। নিচে অনুবাদ অংশের আগে অনুবাদকের ভূমিকা যুক্ত হলো। –বি. স.]

অনুবাদকের ভূমিকা
সমকালীন বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী চিন্তাবিদদের মধ্যে মিশেল ফুকো অন্যতম। ১৯২৬ সালের ১৫ অক্টোবর ফ্রান্সের পইতিয়েহতে জন্ম ফুকোর। দার্শনিক, সমাজ বিজ্ঞানী, সমালোচক এবং ভাবনার ইতিহাসবিদ ফুকো ছিলেন কলেজ দ্যু ফ্রাঁসের চিন্তা পদ্ধতির ইতিহাসের শিক্ষক। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলেতেও শিক্ষকতা করেছেন। ফরাসী কাগজ এবং রিভিয়্যু জার্নালে নিয়মিত লিখতেন। তিনি ক্রিটিক সম্পাদনা করেছেন।

বিবিধ সামাজিক প্রতিষ্ঠান বিষয়ে সমালোচনামূলক আলোচনার কারণে মিশেল ফুকো বিখ্যাত। মনস্তত্ত্ব, চিকিৎসাবিদ্যা, মানবিক বিজ্ঞানসমূহ ও কারাগার ব্যবস্থার তিনি সমালোচনা করেছেন। মানবীয় যৌনতা নিয়ে তাঁর কাজও গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতা ও ক্ষমতার ভেতরকার আন্তঃসম্পর্ক, জ্ঞান ও ডিসকোর্সের নানা বিষয়ে তাঁর রচনা আলোচিত ও প্রয়োগকৃত হয়েছে। কখনো উত্তরাধুনিক (Postmodernist) বা উত্তর-কাঠামোবাদী (post-structuaralist) হিসেবে পরিচিতি পেলেও ১৯৬০-এর দশকে তিনি বরং কাঠামোবাদী (structuaralist) আন্দোলনে বেশি জড়িত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ফুকো নিজেকে কাঠামোবাদ থেকে দূরে সরিয়ে নেন এবং উত্তর- কাঠামোবাদী বা উত্তরাধুনিকতাবাদীর তকমা বর্জন করেন।

২.
১৯৬৮ সালে প্রচুর সাধারণ ধর্মঘট ও ছাত্র আন্দোলনের কারণে ফ্রান্সে দ্যগল সরকারের পতন ঘটে। এ সময়ে বিক্ষোভকারীদের অধিকাংশই বামপন্থী ভাবাদর্শ গ্রহণ করেন, যদিও প্রতিষ্ঠিত বাম প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিক ইউনয়িনগুলি এই আন্দোলন থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখছিল।
may_68_poster_1.jpg………
১৯৬৮-র ফরাসি ছাত্র বিক্ষোভের সময়ের পোস্টার: ‘তরুণ হও এবং চুপ থাকো’
………
এ আন্দোলনকে অনেকেই দেখে থাকেন শিক্ষা ও কর্মসংস্থানসহ সামাজিক নানা প্রশ্নে পুরোনো নৈতিকতার অচলায়তনকে ঝাঁকুনি দেওয়ার একটি সুযোগ হিসাবে। এ ঘটনার পরে ফরাসী সরকার ভিনসেন্নেসে একটি নতুন নিরীক্ষাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয় প্যারিস অষ্টম প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রথম বিভাগীয় প্রধান হিসেবে মিশেল ফুকো জুডিথ মিলারসহ এমন সব তরুণ ও বামপন্থী শিক্ষকদের নিয়োগ দিতে থাকেন যাদের বিপ্লবীয়ানা শিক্ষামন্ত্রণালয়কে উদ্বুদ্ধ করে দর্শন বিভাগের সরকারী স্বীকৃতি বাতিল করতে। (সম্পূর্ণ…)

মিশেল ফুকোর বাতি জ্বালানি

সলিমুল্লাহ খান | ১৫ নভেম্বর ২০০৭ ১১:৩০ অপরাহ্ন

foucault1.jpg
মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪)

~ মিশেল ফুকো বিষয়ে সলিমুল্লাহ খানের সেমিনার ~

মুখবন্ধ

নিচের প্রবন্ধটি বর্তমান লেখকের বলা একটি বক্তৃতার লিখিত ভাষ্য। ফিতার রেকর্ড থেকে অক্ষরে লিখে নেওয়ার মেহনতটুকু করেছেন আমার বন্ধু জামিল আহমদ। তিনি আমার কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করুন। এই বক্তৃতা কয় তারিখে দিয়েছিলাম রেকর্ডে তার নিদর্শন নাই। আমার ধারণা তারিখটা হয়ত মার্চ কি এপ্রিল মাসের কোন শুক্রবার হবে। যতদূর মনে পড়ে এই বক্তৃতামালা শেষ করেছিলাম মোট আট দিনে। বর্তমান লেখাটি দ্বিতীয় দিনের রেকর্ড থেকে তৈরি করা বলে মনে হয়। প্রথম দিনের বক্তৃতা যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে সঠিক রেকর্ড হয় নাই।

জানিয়ে রাখা যায় আমাদের বিজ্ঞাপিত সমাজের সামান্য নাম ছিল ‘জাক লাঁকা বিদ্যালয়’ আর ঐবারের বিশেষ বক্তৃতামালা প্রচারিত হয়েছিল ‘মিশেল ফুকো বোধিনী’ নামে। মিশেল ফুকো তাঁর দেশের অপর প্রভাবশালী তত্ত্বজ্ঞানী জাক লাকাঁর ঋণ বিশেষ স্বীকার করেন নাই। তবে লাকাঁর ঋণ তিনি দুই হাতেই নিয়েছেন।

তত্ত্বজ্ঞানী জাক দেরিদার সঙ্গে ফুকোর মতভেদ প্রকৃত প্রস্তাবে মহাত্মা লাঁকার শিক্ষার দুই দিক নিয়ে টানাটানির অধিক নয়। জাক লাকাঁ ভাষার বা পদের একাধিপত্য বলে যে উপপাদ্য প্রচার করেন, দেরিদা সেই বক্তব্যই নিজের বলে জাহির করেছিলেন। ‘লেখার বাহিরে কিছু নাহিরে’ বলে তিনি বেশ বাড়াবাড়ি করেছিলেন বৈ কি ।

মিশেল ফুকো আঁকড়ে ধরেন জাক লাকাঁর অপর একটি উপপাদ্য। এই উপপাদ্য অনুসারে মানুষের ইতিহাসে ভাষাই শেষ কথা নয়, শেষ কথা ‘সহজ মানুষ’ বা সাবজেক্ট। যে ইতিহাসে অর্থ তৈরি করে থাকে তাকেই সহজ মানুষ বলে। জীবনের শেষদিকে ফুকো প্রকারান্তরে সেই সত্য স্বীকার করেছিলেন। বাতি জ্বালানি বা এনলাইটেনমেন্ট বিষয়ে মহাত্মা ফুকোর বক্তব্যে সেই অঙ্গীকারের পুবাল হাওয়ার ছোঁওয়া পাওয়া যায়।

সকলেই জানেন মনীষী মিশেল ফুকো ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৮৪ (অর্থাৎ তাঁহার অকাল মৃত্যুর পূর্ব) পর্যন্ত ফরাসি দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যালয় কলেজ দহ ফঁসের অধ্যাপক ছিলেন। অনেকেই জানেন তিনি ঐ বিদ্যালয়ে যে অধ্যাপনার পদ অলংকৃত করতেন তার নাম ছিল ‘চিন্তাজগতের ইতিহাস’। ইতিহাস বিচারে প্রতিষ্ঠালব্ধ ফরাসি মনীষী ফেরনঁ ব্রদেল (Fernand Braudel) প্রস্তাবিত পদ্ধতির বিরুদ্ধাচরণ করেন তিনি। ব্রদেল যেখানে এক যুগের সহিত অন্য যুগের যোগধর্ম বা ‘কনটনুয়িটি’ আবিষ্কার করার দিকে মন সংযোগ করতেন সেখানে ফুকো যুগান্তর বা এক যুগের সহিত অন্য যুগের বিয়োগধর্ম অথবা ‘ডিস্কনটনুয়িটি’র জয় ঘোষণা করতে বিস্তর দিনক্ষণ ব্যয় করেছিলেন। (দান্তো ১৯৯৮: ১৮১-৮২) (সম্পূর্ণ…)

« আগের পাতা |

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com