পুনর্মুদ্রণ

প্রতিসন্দর্ভের স্মৃতি

মলয় রায়চৌধুরী | ২১ সেপ্টেম্বর ২০১০ ৮:১০ অপরাহ্ন

malay-palamu_bihar_1963.gif[১৯৬১ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে হাংরি আন্দোলন শুরু করেন মলয় রায়চৌধুরী, তার বন্ধু দেবী রায়, বড় ভাই সমীর রায়চৌধুরী ও কবি শক্তি চট্টোপ্যাধ্যায়। পরবর্তীকালে উৎপলকুমার বসু, বিনয় মজুমদার, সুবিমল বসাক, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, ফাল্গুনী রায়, ত্রিদিব মিত্র এবং তার বান্ধবী আলো মিত্র, সুভাষ ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত, শৈলেশ্বর ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরীসহ আরো অনেকে। ১৯৬৪ সালের হাংরি বুলেটিনে মলয় রায় চৌধুরী’র ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতা প্রকাশিত হয় এবং ‘হাংরি বুলেটিন ১৯৬৪’ প্রকাশের পরে পরে ভারতীয় আদালতে হাংরি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়।

১৯৬৪ সালের ২রা সেপ্টেম্বর হাংরি আন্দোলনকারীদের ১১ জনের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ড বিধির ১২০বি (রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ), ২৯২ (সাহিত্যে অশ্লীলতা ) ও ২৯৪ (তরুণদের বিপথগামী করা) ধারায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়; এর মধ্যে ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ১৯৬৫ সালের মে মাসে অন্য সবাইকে রেহাই দিয়ে কেবল মলয় রায় চৌধুরী’র বিরুদ্ধে ২৯২ ধারায় চার্জশীট দেয়া হয়। গ্রেফতারি পরোয়ানার দরুন উৎপলকুমার বসু অধ্যাপকের চাকরি থেকে বরখাস্ত হন। প্রদীপ চৌধুরী বিশ্বভারতী থেকে রাসটিকেট হন। সমীর রায়চৌধুরী সরকারি চাকরি থেকে সাসপেন্ড হন। সুবিমল বসাক ও দেবী রায়কে কলকাতা থেকে মফঃস্বলে বদলি করে দেয়া হয়।

গ্রেফতারের সময়ে মলয় রায় চৌধুরীকে হাতে হাতকড়া পরিয়ে, কোমরে দড়ি বেঁধে দুই কিলোমিটার হাঁটিয়ে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯৬৬ সালে ব্যাংকশাল কোর্ট মলয় রায় চৌধুরীকে দুশো টাকা জরিমানা, অনাদায়ে একমাসের কারাদন্ড দেয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে মলয় রায় চৌধুরী কলকাতা উচ্চ আদালতে আপিল করেন এবং ২৬ জুলাই ১৯৬৭ সালে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় নাকচ করে দেয়।

সেই সময়ে হাংরি আন্দোলন কী উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল এবং উপরোক্ত মামলায় ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটির কী ভূমিকা ছিলো–এই পুরো বিষয় নিয়ে দিল্লি’র দিগঙ্গন পত্রিকায় লিখেছেন মলয় রায়চৌধুরী। ২০০৪ সালে দিগঙ্গন উৎসব সংখ্যায় প্রকাশিত মলয় রায়চৌধুরী’র ‘প্রতিসন্দর্ভের স্মৃতি’ নামে লেখাটি আর্টস-এ পুনঃপ্রকাশিত হলো। বি. স.]

————–

প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার

মলয় রায়চৌধুরী

ওঃ মরে যাব মরে যাব মরে যাব
আমার চামড়ার লহমা জ্বলে যাচ্ছে অকাট্য তুরুপে
আমি কী কোর্বো কোথায় যাব ওঃ কিছুই ভাল্লাগছে না
সাহিত্য-ফাহিত্য লাথি মেরে চলে যাব শুভা
শুভা আমাকে তোমার তর্মুজ-আঙরাখার ভেতরে চলে যেতে দাও
চুর্মার অন্ধকারে জাফ্রান মশারির আলুলায়িত ছায়ায়
সমস্ত নোঙর তুলে নেবার পর শেষ নোঙর আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে
আর আমি পার্ছিনা, অজস্র কাঁচ ভেঙে যাচ্ছে কর্টেক্সে
আমি যানি শুভা, যোনি মেলে ধরো, শান্তি দাও
প্রতিটি শিরা অশ্রুস্রোত বয়ে নিয়ে যাচ্ছে হৃদয়াভিগর্ভে
শাশ্বত অসুস্থতায় পচে যাচ্ছে মগজের সংক্রামক স্ফুলিঙ্গ
মা, তুমি আমায় কঙ্কালরূপে ভূমিষ্ঠ করলে না কেন ? (সম্পূর্ণ…)

ইলিয়াসের গল্প, মেডিকেল তত্ত্ব ও টেকনোলজি সংক্রান্ত ভাষ্য

ফরহাদ মজহার | ২ সেপ্টেম্বর ২০১০ ৮:৪৮ অপরাহ্ন

elias_1.jpg……..
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১২/২/১৯৪৩ – ৪/১/১৯৯৭)
……..

১৯৪৩ সালে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা থানার গোটিয়া গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মেছিলেন। তাঁর বাবার বাড়ি বগুড়া জেলায়। বাবা বদিউজ্জামান মোহাম্মদ ইলিয়াস পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (১৯৪৭-১৯৫৩) এবং মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারী সেক্রেটারি ছিলেন। মা বেগম মরিয়ম ইলিয়াস। ইলিয়াসের ডাক নাম মঞ্জু। তিনি ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৬০ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স ও মাস্টার্স পাস করেন ১৯৬৪ সালে। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক পদে যোগদানের মাধ্যমে। এরপর তিনি মিউজিক কলেজের উপাধ্যক্ষ, প্রাইমারী শিক্ষা বোর্ডের উপ পরিচালক, ঢাকা কলেজের বাংলার প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মফিজউদ্দিন শিক্ষা কমিশনের সদস্য ছিলেন। ১৯৯৭ সালের ৪ জানুয়ারি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

ইলিয়াসের মৃত্যুর পরে ফরহাদ মজহারের এ লেখাটি বাংলাবাজার পত্রিকার ১৩ জানুয়ারি ১৯৯৭ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। প্রায় সাড়ে তের বছর পরে ফরহাদ মজহারের সৌজন্যে লেখাটি পুনঃপ্রকাশিত হলো। এ লেখায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের একটি গল্প ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’কে ঘিরে লেখকের আলোচনা অগ্রসর হয়েছে। তিনি সে সময়ে আলোড়ন তোলা ইলিয়াসের ‘ছোটগল্প’ বিষয়ক জনপ্রিয় ধারণাকে এ লেখায় চ্যালেঞ্জ করেছেন। বি. স.

 
আম্মার ঘরে আমরা কী ফেলে এসেছি?

খুবই কম লিখেছিলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। আমাদের জন্য এটা ভাল নাকি মন্দ বলা মুশকিল। তবে তাঁর খুব লোকশান হয়েছে কি? এত কম লিখে বাংলাসাহিত্যে নিজের জন্যে একটি জায়গা করে নিতে পারা দারুণ একটা ব্যাপার। ঈর্ষা করার মত। তবুও আমাদের সেই দোনামোনা থাকে না যে আখতার সবাইকে একটু চীট করেছেন। প্রতারণা। বোধ হয় তিনি আরো লিখতে পারতেন, লিখেন নি। তিনি আর লিখবেন না এটা মস্ত বড় লোকশান। আমরা ঠকেছি।

ইলিয়াস সম্পর্কে এত দ্রুত কিছু লিখতে বাধ্য হবো, এটা আমি কক্ষণোই ভাবি নি। ইলিয়াস সম্পর্কে লিখতে গিয়ে একবার তাঁর সব বইপত্র জোগাড় করে বসেছিলাম। তখনও ‘খোয়াবনামা’ হাতে আসে নি। পড়ে-টরে নিজেকে শুধালাম, আচ্ছা ইলিয়াস মশায়ের সবচেয়ে দারুণ গল্প কোনটি? তখন মাথা চুলকিয়ে থুতনি মুছে ঢের ভাবাভাবি করে মনে হোল, ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’। এই সিদ্ধান্তে নিজেই নিজের কাছে খুব অবাক হয়ে গেলাম। এই গল্পটি ইলিয়াসের প্রথম দিককার রচনা। ষাট দশকের দিকে আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, থাকি ঢাকা হলে, তখন আমি এই গল্পটি পড়েছি। সেই সময়েই গল্পটি আমার করোটির মধ্যে প্রবেশ করেছিল, এরপর আর বের হওয়ার দরোজা খুঁজে পায় নি। (সম্পূর্ণ…)

একুশে নিয়ে আর্টস থেকে কয়েকটি লেখা

| ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১০ ১২:৫৯ অপরাহ্ন

১.

মাহবুব উল আলম চৌধুরীর হারিয়ে যাওয়া কবিতা, কবিতার ভ্রান্তি নিরসন ও একটি সাক্ষাৎকার


১৯৫৩ সালে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে একুশে উদযাপন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করছেন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক মাহবুব উল আলম চৌধুরী

● কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি ।। মাহবুব উল আলম চৌধুরী
● সদয় অবগতির জন্য ।। চৌধুরী জহুরুল হক
● কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরীর সাক্ষাৎকার ।। ইলু ইলিয়াস

২.

একুশে ও বিশ্বমাতৃভাষা দিবস / রবিউল হুসাইন

“…হাজার বছর বিদেশী শাসনের অধীনে থেকে থেকে আমরা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি যে-সময়ে ভুলে যেতে বসেছিলাম, ঠিক সেই সময়ে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে বাংলাভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে এদেশের মৃত্যুঞ্জয়ী মানুষের আত্মাহুতি ও আত্মোৎসর্গের ঘটনা আমাদের সর্ব উৎস-মূলে আঘাত হেনে আমাদের নিস্তেজিত চেতনাকে টলমলিয়ে দেয়। সেখানে থেকেই শুরু হয় স্বাধীনতার অঙ্কুরোদ্গম।…”

৩.

আমাদের ভাষা আন্দোলনের গাজীউল হক / আহমাদ মাযহার

>

“…তাঁর সাহসিকতার পরিচয় কেবল ভাষা আন্দোলনের সময়ই দেখা যায় নি। পরবর্তী সকল অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলন, সাংস্কৃতিক ও জাতীয় সংগ্রামে গাজীউল হক অংশ নিয়েছেন। ১৯৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৪-র সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে প্রথমে স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠক হিসাবে ও পরে জাতীয় পর্যায়ের লেখক এবং সংগঠকের ভূমিকায় তাঁকে পাওয়া গেছে। তাঁকে পাওয়া গেছে ১৯৮০-র দশক জুড়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে।…”
(সম্পূর্ণ…)

সাঈদ আহমদের সাক্ষাৎকার, ১৯৯৯

ব্রাত্য রাইসু | ১ ফেব্রুয়ারি ২০১০ ৮:১৬ পূর্বাহ্ন

sayeed-ahmed1.jpg
সাঈদ আহমদ (১/১/১৯৩১ – ২১/১/২০১০)

[নাট্যকার সাঈদ আহমদের সঙ্গে আমার সদ্ভাবের শুরু ১৯৯২ সালে। সেই সময় চিত্রকর কালিদাস কর্মকারের বাংলা মোটরের বাড়িতে একটা পার্টির মধ্যে একদিন যাইচা তাঁর সঙ্গে পরিচিত হই আমি। বিশেষত অ্যাবসার্ড ড্রামা ব্যাপারে আমার তৎকালীন গভীর অনুরাগ তাঁর ব্যাপারে আমারে আগ্রহী করছিল। তিনি ফোন নম্বর দিয়া পরদিন তাঁর বাড়িতে যাইতে বলেন। আমি সকালে তাঁর লালমাটিয়ার বাসায় যাই। তিনি তাঁর সংগ্রহের বই, চিঠিপত্র আর কিছু নথি দেখান। এবং অতিথি আপ্যায়ন করেন। খাওয়ার পরে ফল খাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।

আঙুলের গিঁটে সমস্যা থাকায় লিখতে অসুবিধা হইত তাঁর। ওনার অনুরোধে কিছু লেখার ডিকটেশান নিতে রাজি হই আমি। বলা যাইতে পারে, তাঁর লেখ্য গদ্যরীতিটি আমার ভালো লাগতো না। একটা নাটক (নাটকটা তিনি আর শেষ করেন নাই) নিয়া দুই দিন বসার পরে আমি এই বিরক্তিকর কাজটা আর করি নাই। ওই বিরানব্বইয়ে কিছুদিন সাঈদ ভাইরে বেশ কাছ থিকা দেখার সুযোগ হয় আমার। সাঈদ ভাই নিঃসন্তান আছিলেন। এই নিয়া তাঁর কোনো আক্ষেপ আছে কিনা জিগাইলে জানায়ছিলেন বাচ্চাকাচ্চা ব্যাপারটা ভেজালের। এইটা ঠিক যে তাঁর মধ্যে আমি বাৎসল্য রসের ছিটাফোঁটা দেখি নাই।

ঢাকার সাংস্কৃতিক সমাবেশে তাঁর উপস্থিতি সব সময়ই নিতান্ত উজ্জ্বল ব্যাপার আছিল। বিবিধ অনুষ্ঠানে দেখা হইলে—এবং সব সময় পারভিন ভাবি সঙ্গে থাকতেন—সাঈদ ভাই সহাস্য স্নেহ সম্প্রদান করতেন (অন্য অনেকের মতো ওয়ান টু ওয়ান মৃদু হাসির অভ্যর্থনা তিনি করতেন না; যেটি দস্তুর)। সাঈদ আহমদের ব্যাপারে আমার বিবেচনা এই যে তিনি বৈঠক ইত্যাদিতে অনেক চিত্তাকর্ষক থাকতেন। তবে তাঁর ভাষা প্রায়ই ঢাকাইয়া থিকা শুদ্ধের দিকে চইলা যাইতে চাইত। আর তিনি ঘরের চাইতে বাইরে বেশি বন্ধুবৎসল আছিলেন। অর্থাৎ এক কালের এই সচিব ভদ্রলোকটি সমষ্টির মধ্যে বা সমাবেশগুলিতে তাঁর ব্যক্তিত্বের সবলতা ও সাফল্য উপলব্ধি করতেন।

১৯৯৯ সালে মুক্তকণ্ঠ পত্রিকার ‘খোলা জানালা’র জন্য এই সাক্ষাৎকার নেই আমি। ‘খোলা জানালা’র সম্পাদক আবু হাসান শাহরিয়ার সাক্ষাৎকারটার খোলামেলা ও লঘু চালের ব্যাপারটারে সাদরে গ্রহণ করছিলেন। এবং কোনো কর্তন-বর্জন ছাড়াই সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পরে সাঈদ ভাইরে একটা কপি দিয়া আসছিলাম। ইচ্ছা আছিল কখনো সাঈদ ভাইয়ের একটা বুক লেংথ ইন্টারভিউ নিব। সেইটা আর হইয়া উঠল না। তাঁর সাম্প্রতিক প্রয়াণে (২১/১/২০১০) আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করতেছি।—ব্রাত্য রাইসু]

sayeed-ahmed.jpg
১৯৯২ সালে নিউইয়র্কে তোলা ছবিতে সাঈদ আহমদ ও স্ত্রী পারভিন আহমদ; ছবি. নাসির আলী মামুন

আমি কত কথা কইতাম, কিন্ত এখন আফটার ব্রেইন হেমারেজ কথা কইতে পারি না। আর বড় কষ্ট কইরা কথা কইতে হয়। আস্তে আস্তে আস্তে আস্তে একটু ইমপ্রুভমেন্টের দিকে যাইতে আছি। আমার জীবনে একটা গণ্ডগোল হইয়া গেছে। বড় রকমের গণ্ডগোল। দুই বছর আড়াই বছর আগে আমারে কইলো যে তুমি দিল্লিতে আসো…

কে কইল?

গভর্ণমেন্ট অফ ইন্ডিয়া’র কালচারাল মিনিস্ট্রি। কইল যে তুমি দিল্লিতে আসো। তোমার সঙ্গে একটা বইয়ের পরামর্শ হবে। বই লেখার ব্যাপারে তারপরে আমি দিল্লি গেলাম। এই সব লিখো না।

ঠিক আছে অন্য প্রসঙ্গে যাই। শামসুর রাহমানের সঙ্গে আপনাদের সম্পর্ক নিয়া বলেন।

শামসুর রাহমানের বাবা আর আমার বাবা দুই পার্টনার ছিল। নরায়ণগঞ্জে ডায়মন্ড টকিজ করত। নাইনটিন থারটি নাইনের যুদ্ধের আগে।

তাইলে তো আপনেরা অনেকদিন থেকে কালচারের সঙ্গে, কালচারের ব্যাপারটা তাইলে পারিবারিক ভাবেই।

মোটামুটি। তো আমার বাবা আর শামসুর রাহমানের বাবা মোখলেছুর রহমান…

আর আপনের বাবার নাম ছিল—

মীর্জা ফকির মোহাম্মদ।

আপনার বড় ভাই?

বড় ভাই, নাছির ভাই বড় ছিলেন। আর নাজির ভাই মেজো আর থার্ড ব্রাদার হামিদুর রাহমান। আর আমি ফোর্থ ব্রাদার।

ব্রাদার তো আর না আপনি।

না ব্রাদার না, আমি ফোর্থ।

তাহলে ‘রাহমান’ শুধু হামিদুর রাহমানেরই ছিল। আর কারও না।

না। আর ওইটাও রাগ কইরা। ও স্কুলে পড়ার সময় ওর নাম রাখলো অ্যাহমাদ। কিন্তু মাস্টারের সঙ্গে রাগ কইরা কইল, যা শালা, এই নাম রাখুমই না। (সম্পূর্ণ…)

শততম জন্মদিনে শুভেচ্ছা

বিপ্লবী বিনোদবিহারী চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

| ১০ জানুয়ারি ২০১০ ৩:০৮ পূর্বাহ্ন

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে পরিচালিত ১৯৩০ সালের ‘চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ’-র কনিষ্ঠতম যোদ্ধাদের একজন বিনোদবিহারী চৌধুরী। ঐতিহাসিক অস্ত্রাগার লুণ্ঠন অভিযান ও জালালাবাদ যুদ্ধে সম্মুখসমরে অংশগ্রহণ করে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে অংশ নেওয়ার অপরাধে প্রায় ১২ বছর জেল খেটেছেন। জেলখানায় বসেই তিনি স্নাতক হন। কারাজীবনে কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান নেতাদের সংস্পর্শে আসেন। তারই জের ধরে কংগ্রেসের রাজনীতিতে নাম লেখান এবং ১৯৪৮ সালে পূর্ব-পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। সেই সুবাদে তাঁর সুযোগ ঘটে বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করার। পরবর্তীকালে ঊনসত্তুরের গণ-অভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তিনি। স্বাধীন বাংলাদেশে নানান সামাজিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক ও শিক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে আজ পর্যন্ত যুক্ত আছেন সক্রিয়ভাবে। ১৯১০ সালে জন্ম নেওয়া এ বিপ্লবীর শততম জন্মদিন পালিত হচ্ছে আজ ১০ই জানুয়ারি ২০১০ তারিখে। চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত মাসিক বিশদ সংবাদ-পত্রিকার জন্য আলম খোরশেদ ও এহসানুল কবিরের নেওয়া সাক্ষাৎকারটি এ-উপলক্ষে এখানে পুনঃপ্রকাশিত হল।

binodbihari1.jpg
বিনোদবিহারী চৌধুরী; ছবি: এহসানুল কবির

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলম খোরশেদএহসানুল কবির

আলম খোরশেদ: আপনার সম্পর্কে তো সবাই কমবেশি জানে। আপনি একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। কিন্তু আমাদের পত্রিকার পাঠকদেরকে আপনার সঙ্গে আরও অন্তরঙ্গভাবে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই। খুব বেশি প্রশ্ন করব না, আপনার কাছ থেকে সবিস্তারে আপনার জীবনের কাহিনী শুনব। শৈশবের কথা দিয়েই শুরু করুন।

বিনোদবিহারী চৌধুরী: আমার জন্ম ১৯১১ সালের ১০ই জানুয়ারি বোয়ালখালী থানার উত্তর ভূর্ষি গ্রামে। আমার বাবা স্বর্গীয় কামিনীকুমার চৌধুরী আর মা বামা দেবী। বাবা ছিলেন কমিটি পাশ উকিল। কমিটি পাশ বোঝেন তো? তখন ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে একটা পরীক্ষা দিয়ে মুন্সেফ কোর্টের উকিল হওয়া যেত। উনি ফটিকছড়ি মুন্সেফ কোর্টের উকিল ছিলেন। ছয় বছর বয়সে আমি আমার বাবার কাছে চলে যাই। ওখানে রাঙামাটি প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম। প্রত্যেক ক্লাশেই ফার্স্ট হতাম। ক্লাস ফোর পাশ করার পর বাবা বললেন, ‘এই স্কুলে ইংরেজিটা তোর ভালো শেখা হয় নাই, তোকে আরো ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেব। স্বভাবতই আমাকে ক্লাস ফাইভে বা কমপক্ষে ফোরে ভর্তি করানো উচিত ছিল। কিন্তু তিনি আমাকে ফটিকছড়ি করোনেশান এইচ ই স্কুলে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি করিয়ে দিলেন। ওখানে ক্লাস এইটে পড়ার সময় শিক্ষকেরা বললেন, ‘তুই শহরে গিয়ে কোনো একটা ভালো স্কুলে পড়। তুই স্কলারশিপ পাবি, ভালো রেজাল্ট করবি।’ আমি বাবাকে কথাটা বললাম। বাবা বললেন আমাকে শহরে রেখে পড়ানোর মতো আর্থিক সঙ্গতি তাঁর নেই, তেমন কোনো আত্মীয়-স্বজনও নেই যার কাছে রেখে আমাকে পড়াতে পারেন। তিনি একটা কঠিন শর্ত দিলেন। বললেন, ‘তোকে শহরে রেখে পড়াতে পারি এক শর্তে। ফার্স্ট তো তুই হবিই, কিন্তু সেকেন্ড বয়ের চেয়ে একশ নম্বর বেশি পেয়ে ফার্স্ট হতে হবে।’ আমি বললাম, ‘সেটা তো সম্ভব না। তবে, আমি কথা দিতে পারি আমি ফার্স্ট হব আর সব বিষয়ে আশির ওপরে নম্বর পাব।’ আমি তা-ই পেলাম। শহরে নয়, বাবা আমাকে বোয়ালখালী থানার পি সি সেন সারোয়াতলী স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। সেটা তখনকার দিনের খুব নামকরা স্কুল। প্রত্যেক বছর সেখান থেকে বেশ কিছু ছেলে স্কলারশিপ পেত। হেড মাস্টার ছিলেন যতীন্দ্রমোহন দস্তিদার। সমস্ত চিটাগাঙে তিনজন সেরা হেডমাস্টারের মধ্যে তিনি একজন ছিলেন। (সম্পূর্ণ…)

রোল্যান্ড শার্বাটকে

বিশ্বশ্রেষ্ঠ এক গিটার নির্মাতার সঙ্গে

সাগর সরওয়ার | ২৭ জুলাই ২০০৯ ১১:৩৯ পূর্বাহ্ন

roland-scharbatke3.jpg……
জার্মানির রোল্যান্ড শার্বাটকে (Roland Scharbatke); পৃথিবীশ্রেষ্ঠ তিন গিটার প্রস্তুতকারির একজন
……
অনেকেই বলেন ইসারলোন শহরের আবহাওয়ার নাকি কোনো চরিত্র বোঝা যায় না৷ ঠিক এমনটাই হলো সকালে যখন সেখানে পৌঁছলাম, তখন আকাশটা একটু মেঘলা ছিল৷ তারপর খটখটে রোদ্দুর৷ দুপুরের পর এক পশলা বৃষ্টিও হয়ে গেল৷

অদ্ভুত সুন্দর এক রোদের ছোঁয়া চারিদিকে৷ শান্ত এই শহরের সবচেয়ে পুরানো একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আমার প্রথমেই মনে হলো ভেঙে পড়বে না তো! দরজার খুঁজে তাতে টুং টাং শব্দের দরজাঘণ্টা বাজাতেই একজন এসে দাঁড়ালো৷ মুখে তাঁর হাসি৷ ‘গুটেন টাগ’ বা শুভ দিন বলে হাতটি বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “আমি রোল্যান্ড শার্বাটকে৷ আসুন ভিতরে আসুন।”

roland-scharbatke.jpg
কাজ করছেন শার্বাটকে

আমি একটু চমকালাম, আনন্দে৷ আমি রোল্যান্ড শার্বাটকের সামনে দাঁড়িয়ে আছি৷ বিশ্বের তিন শ্রেষ্ঠ গিটার প্রস্তুতকারীর একজন৷ শার্বাটকেকে বলা হয় গিটারের সুনিপুণ কারিগর৷ তাঁর গিটারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে৷ আর তা হলো বাজনা, একেবারে একশ ভাগ বাজবে, এতে কোনো রকম সমস্যা থাকবে না৷ প্রকৃতির বাজনা যেন উঠে আসতে পারে গিটারে তার সকল ব্যবস্থাই তিনি করছেন৷

সিঁড়িটা কাঠের৷ দেয়ালটা ভাঙাচোরা৷ এই আস্তানাই শার্বাটকের স্টুডিও, কারখানা, ভালোবাসার জায়গা৷ আমাকে দেয়ালটি দেখিয়ে বললেন, “বলুন তো কত হতে পারে এর বয়স?”

জানি না।

আন্দাজ করুন।

আর কত শ খানিক বছর হবে হয়তো!

না আরও বেশি৷ শ তিনেক বছর তো হবেই৷

গিটারের কাজ শুরু হলো কবে?

সাংবাদিকতা রাখুন না৷ বরঞ্চ একটু গল্প করি। …গান শুনতে আমার বেশ ভালো লাগতো৷ এখানে ওখানে গিয়ে গান শুনতাম৷ দারুণ লাগতো সুরের ছোঁয়া, বাজনা৷ কিন্তু জানেন অদ্ভুত এক ভালোবাসা আমাকে ধরে রাখতো সেই গানের মধ্যে থাকা নানা ধরনের যন্ত্রের বাজনা৷ আমার জন্ম ১৯৫২ সালে৷ এই জার্মানিরই গোটা শহরে (টুরিঙ্গিয়া রাজ্য)৷ (সম্পূর্ণ…)

রিপ্রেজেন্টেশন ও যোগাযোগ: যোগাযোগ পত্রিকায় ‘রেপ্রিজেন্টেশন’

এহসানুল কবির | ১ জুলাই ২০০৯ ৫:১০ অপরাহ্ন

আমাদের দেশে সাময়িক পত্রিকার দুটো বড় ধারা আছে—১. প্রথিতযশা পণ্ডিতবর্গের দুয়েকটা প্রবন্ধ আর সৃজনশীল সম্পাদকের আবেগী বন্ধুকৃত্যকে সম্বল করে বহমান সংকলনধর্মী লিটলম্যাগীয় ধারা; ২. বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষকগণের পদোন্নতির সোপানরূপে, প্রধানত আমজনতার চক্ষুর অন্তরালে, prochchhod_jogajog.jpg…….
যোগাযোগ; সংখ্যা ৮, ফেব্রুয়ারি ২০০৭; সম্পাদক: ফাহমিদুল হক, আ-আল মামুন; মূল্য: ১০০ টাকা; প্রচ্ছদ: শাহীনুর রহমান, দিয়াগো ভেলাসকেজের ‘লাস মেনিনাস’ পেইন্টিং অবলম্বনে।
……..
প্রকাশিত জার্নালীয় ধারা। এ-দুই বড় ধারার মাঝে আরেকটি ধারা ধীরে কিন্তু দৃঢ়ভাবে বয়ে যাচ্ছে এ-দুয়েরই ধনাত্মক সারবত্তাকে আত্মস্থ করে। যোগাযোগ সে-ধারারই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। যদিও সম্পাদক পত্রিকাটির পরিচয় দেওয়ার সময় বলে থাকেন ‘অ্যাকাডেমিক পত্রিকা’, যদিও পত্রিকাটির প্রতিটি লেখার মাথার ওপরে জার্নালীয় কায়দায় উল্লিখিত থাকে পত্রিকার নাম, সংখ্যা, প্রকাশের সাল (প্রবন্ধের পৃষ্ঠা নম্বরও দেওয়া থাকলে
—————————————————————–
যে-বৈশিষ্ট্যটি যোগাযোগকে স্বাতন্ত্র্য-ঋদ্ধ করেছে, তা হল এর উদ্দেশ্যের একমুখিনতা। বাংলাদেশের অধিকাংশ সাময়িক পত্রিকায় এর অভাব থাকার কারণে সামগ্রিকভাবে পত্রিকার কোনো চারিত্র দাঁড়ায় না।
—————————————————————-
জার্নালীয় ষোলকলা পূর্ণ হত), যদিও অ্যাকাডেমিক ও নন-অ্যাকাডেমিক লেখার জন্য পত্রিকাটিতে বরাদ্দ থাকে প্রায় ফিফ্‌টি-ফিফ্‌টি অংশ; তবুও পত্রিকাটির চারিত্র ওপরের ২ নম্বরি ধারায় পড়ে না। এখানেই যোগাযোগ-এর প্রতি আমার আন্তরিক পক্ষপাত। রাজনৈতিক ও দার্শনিক অবস্থানের সুস্পষ্টতার বিচারে এ-পত্রিকা এককথায় একমেবাদ্বিতীয়ম্। শুরুতেই তাই এর সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে আমার সাধুবাদ।

দুই
যোগাযোগ এ-সংখ্যার ১৮টি লেখার মধ্যে ১১টি অনূদিত, ২টি গ্রন্থালোচনাই মূলত অনূদিত গ্রন্থ-বিষয়ক, প্রধান প্রবন্ধটিও একটি অনূদিত প্রবন্ধ। সঙ্গতভাবেই, এ-আলোচনায় অনূদিত লেখাগুলোর দিকেই আমাদের মনোযোগ বেশি থাকবে। (সম্পূর্ণ…)

স্বাধীনতার সাঁতারু অরুণ নন্দীর সঙ্গে

আশীষ চক্রবর্ত্তী | ২১ নভেম্বর ২০০৮ ১১:২২ পূর্বাহ্ন

—————————————————————–
কতবার যে শরীরের যন্ত্রণায় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছি, তবু থামিনি। আসলে ওই সাঁতারটাকে আমি বাংলাদেশের মান-মর্যাদার সাথে এক করে দেখেছিলাম। সে জন্যই ব্যক্তিগত কষ্টের চিন্তা আমলে নিয়ে মাঝপথে থামবার কথা ভাবতেই পারিনি। একটানা ৯০ ঘন্টা ৫ মিনিট সাঁতার কেটে তবেই থেমেছি। আগের রেকর্ড তখন ৩৩ মিনিট পেছনে। পরবর্তীতে বহু পত্র-পত্রিকায়, আলাপ-আলোচনায় আমার ওই সাঁতারকে ‘স্বাধীনতার সাঁতার’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
—————————————————————-
arun-1.jpgগত ১৬ নভেম্বর চিরবিদায় নিয়েছেন সাঁতারু অরুণ নন্দী। শুধু সাঁতারু বললে অবশ্য কম বলা হয়, সদ্য প্রয়াত অরুণ নন্দী ছিলেন সাঁতারু মুক্তিযোদ্ধা। না, রণাঙ্গনে সশস্ত্র যুদ্ধ তিনি করেননি। একাত্তরে নেমেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার লড়াইয়ে। কলকাতার এক সুইমিং পুলকেই বেছে নিয়েছিলেন যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে। যুদ্ধে নেমে গড়েছিলেন দূরপাল্লার সাঁতারে নতুন বিশ্বরেকর্ড। নাতিদীর্ঘ সাক্ষাৎকারসহ সরল, নিরহঙ্কার আর সাঁতার-অন্তপ্রাণ মানুষটিকে নিয়ে আশীষ চক্রবর্ত্তীর এ লেখা পাক্ষিক শৈলীতে প্রকাশিত হয়েছিল ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৯৬ সালে। অরুণ নন্দীর বাস তখন আরামবাগ অগ্রণী ব্যাংক মাঠের পাশের কলোনির এক ১০ ফুট বাই ১২ ফুট কক্ষে। গত ১২ বছরে বেড়ে বেড়ে বয়স হয়েছিল ৬৭, জীবনের শেষ কয়েকটা বছর কাটিয়েছেন সেই ১০ ফুট বাই ১২ ফুটের মতোই হকি স্টেডিয়ামের দোতলার এক ছোট্ট ঘরে। পরিবর্তন বলতে এটুকুই। নইলে স্বাধীনতা যুদ্ধে নিজের অবদান নিয়ে অহঙ্কার, দেশের সাঁতারকে এগিয়ে নেয়ার স্বপ্ন, সুইমিং ইনস্টিটিউট গড়তে না পারার হতাশা — চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার আগ পর্যন্ত অরুণ নন্দী এসব জায়গায় একটুও বদলাননি। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে প্রকাশিত (কিছুটা সংক্ষেপিত) এই লেখা সে কারণেই এখনো বড় বেশি প্রাসঙ্গিক।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: আশীষ চক্রবর্ত্তী

পরিচয়পর্বেই সবাইকে বেশ আপন করে নিতে পারেন। কিন্তু তারপরও কারো সাথেই তাঁর ফারাকটা ঘোচে না। ওটা আসলে ঘুচবারও নয়। অরুণ নন্দী দূরপাল্লার সাঁতারে একটা বিশ্বরেকর্ড গড়ে সাধারণের চেয়ে অনেক অ-নে-ক উঁচুতে আসন গেড়েছিলেন ১২ অক্টোবর ১৯৭১-এ। একাত্তর বাংলাদেশের বিজয়ের বছর — আমাদের স্বাধীনতার বছর। অরুণ নন্দীর সমস্ত সত্তা সবসময় তাই বুঁদ হয়ে থাকে একাত্তরে।
arun-2.jpg
বিশ্ব রেকর্ড গড়ার পর ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলের সম্বর্ধনায় বক্তৃতা করছেন অরুণ নন্দী।

স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে অরুণ নন্দী’কে আরো জানবার-জানাবার প্রবল ইচ্ছে ছিল। সেই ইচ্ছের কথা শুনে হাঃ হাঃ হাঃ হাসিতে ফেটে পড়লেন অরুণ নন্দী। পরক্ষণেই অট্টহাসির কারণ অন্বেষণের চেষ্টায় ছেদ টানলেন এই ‘ইয়ংম্যান’-এর পিঠ চাপড়ে দিয়ে। তারপর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বাৎলে দিলেন তাঁর আবাসের ঠিকানা, বললেন, ‘কথা হবে সেখানেই’। (সম্পূর্ণ…)

রোদ্দুরের আয়োজনে কবিদের আড্ডা

| ১২ সেপ্টেম্বর ২০০৮ ৭:৪১ অপরাহ্ন

১৯৯৫ সালে ছোটপত্রিকা রোদ্দুর-এর সম্পাদক লতিফ সিদ্দিকী কয়েকজন কবিকে নিয়ে জুন মাসের এক
latif3.jpg……..
রোদ্দুরের সম্পাদক লতিফ সিদ্দিকী
…….
সকালবেলায় একটি আড্ডা বসিয়েছিলেন গ্রীন রোডের থিয়েটার সেন্টারে। “প্রজন্মান্তরে কবিতার বদল” — এই ছিল আড্ডার আলোচনার বিষয়। আড্ডার ধর্মানুসারে ফ্যামিলি প্ল্যানিং, আমলা কবি, কবিতার ক্ষতি, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব, আবুল হাসান, পঞ্চাশ, ষাট, কবিতার জনপ্রিয়তা কেন কমে যাচ্ছে… ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গ চলে আসে আলোচনায়। প্রবল বৃষ্টিপাতের মধ্যে টিনের চালের নিচে আড্ডা চলে দুপুর পর্যন্ত। উল্লেখ্য, সে আড্ডার তিনজন এখন আর নেই। লতিফ সিদ্দিকী মারা গিয়েছিলেন ক্যান্সারে। পরে কবি আবু কায়সার এবং কবি শামসুর রাহমানও মারা যান। তাঁদের স্মরণে রেখে আড্ডাটি পুনঃপ্রকাশিত হলো। শুরুতে লতিফ সিদ্দিকীর ভূমিকা।

অংশগ্রহণ: শামসুর রাহমান, আবু কায়সার, আলতাফ হোসেন, সাজ্জাদ শরিফ, আনিসুল হক, ব্রাত্য রাইসু, আদিত্য কবির, হুমায়ূন রেজা

সম্পাদক লতিফ সিদ্দিকীর ভূমিকা
ইংরেজি ১৬ জুন ছিল বাংলায় ২ আষাঢ়। সকাল থেকেই আকাশ অন্ধকার। গ্রীণ স্কোয়ারে থিয়েটার সেন্টারের মিলনায়তনে রোদ্দুরের আয়োজনে roddur.jpg
……..
রোদ্দুর, চতুর্থ সংখ্যা, জুলাই ১৯৯৫
………
কবিদের আড্ডা। রোদ্দুরের সম্পাদক হিসেবে আয়োজনের দায়িত্ব আমার। শান্তিনগর (বাসা) থেকে রিকশায় চেপে শিল্পকলা একাডেমী পর্যন্ত যেতেই শুরু হলো বৃষ্টি। শিশু পার্কের কাছাকাছি পৌছুতেই কানফাটানো শব্দে বাজ পড়লো কোথাও একটা। সেই সঙ্গে শুরু হলো প্রবল বর্ষণ। থিয়েটার সেন্টার যথারীতি তখনো কেউ আসেননি। এমন আবহাওয়ায় কেউ যে আসবেন সেরকম ভরসা পাই না। এসময় অলকদা (অলক গুপ্ত, নাট্যকর্মী, সাংবাদিক) আসেন। খানিক বাদে আসেন আলতাফ ভাই। আস্তে আস্তে সবাই আসেন, কেবল সিকদার আমিনুল হক ছাড়া। আড্ডায় সেদিন। যারা অংশ নিয়েছিলেন তাদের নাম ওপরে দেওয়া হলো। এরা ছাড়াও আড্ডায় যারা উপস্থিত ছিলেন কিন্তু আলোচনায় অংশ নেননি তারা হলেন। দিলওয়ার হাসান (গল্পকার), মুনির রানা (কবি, সাংবাদিক) ও আবেদীন চৌধুরী স্টিভ। আড্ডায় সূত্রধরের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে আমাকে।

●●●

লতিফ সিদ্দিকী: রাহমান ভাই বয়োজ্যেষ্ঠ। জীবিতদের মধ্যে প্রবীণতম সম্ভবত।

আবু কায়সার: উহু, আবুল হোসেন আছেন।

লতিফ: না, আবুল হোসেন ঠিক ততোটা সক্রিয় নন কবিতা রচনায়।

কায়সার: বলুন যে রাহমান ভাই হলেন প্রবীণদের মধ্যে সবচেয়ে গ্ল্যামারাস।

লতিফ: সে যাই হোক, রাহমান ভাইরা তাদের সময়ে যেভাবে লিখতেন, এখনকার কবিরা সেভাবে লেখেন না। কবিতার ধারার পরিবর্তন হয়েছে, কবিতা সম্পর্কে কবিদের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন হয়েছে।

ব্রাত্য রাইসু: এটা কি আপনি ধরে নিয়ে কথা বলছেন?

লতিফ: হ্যাঁ।

রাইসু: রাহমান ভাইদের সময়েও তো সবাই একরকম লিখতেন না।

লতিফ: যা হোক, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তো কবিতা বদলায়, কবিতার কাঠামো বদলায়, কবিতায় বলবার বিষয় বদলায়। আজকের মুক্ত আলোচনার বিষয় এটাই। এই পরিবর্তনটা। পরিবর্তনের ধরনটা — এক প্রজন্মের কবিতা আরেক প্রজন্মের চোখে, নিজেদের কবিতা নিজেদের চোখে।

সাজ্জাদ শরিফ: তাহলে শুরু করা যাক। রাহমান ভাইকে দিয়ে শুরু করুন। প্রশ্ন করুন তাঁকে।

লতিফ: সেই পঞ্চাশের দশক থেকে এখনও পর্যন্ত ক্লান্তিহীনভাবে লিখে চলছেন রাহমান ভাই। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে আপনার নিজের কবিতাও বদলেছে। সেই পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে বলুন। এখনকার কবিতাই বা কেমন ঠেকছে আপনার চোখে?

শামসুর রাহমান: প্রথমত, কবিতা সম্পর্কে কিছু বলা অত্যন্ত কঠিন। এ সম্পর্কে এতো কথা বলা হয়, কিন্তু এখনো ঠিক কবিতা কাকে বলা হয়, মানে এর এবিসিডি কখগঘঙ — আমি বলতে পারবো না। তবে কবিতা আসলে বোধের ব্যাপার। একে সংজ্ঞা দিয়ে বোঝানো মুশকিল। আরেকটা জিনিস আমি বিশ্বাস করি না — কবিদের দশকবন্দি করাটা, এই যেমন অমুক কবি এই দশকের। কবি যিনি, তিনি সব দশকেরই। রবীন্দ্রনাথকে আমরা কোন দশকের কবি বলবো? তেমনি ত্রিশের কবি আমরা যাদের বলি, তারা তো এখনো সক্রিয় কোনো না কোনোভাবে — এমনকি তাদের মৃত্যুর পরও। কাজেই দশকের ব্যাপারটা ঝুট-ঝামেলার। তবু সমালোচকদের সুবিধা হয় কারো গায়ে একটা লেবেল এঁটে দিতে পারলে। অনেক সময় বলা হয়, এরা এই ধারার কবি, এদের কবিতায় রিরংসা আছে, এদের কবিতায় বিপ্লব আছে। বিষ্ণু দেকে বলা হয় মার্ক্সিস্ট ধারার কবি। কিন্তু তিনি তো এমন অনেক কবিতাও লিখেছেন, যা মার্কসীয় ধারায় পড়ে না। তিনি প্রেমের কবিতা লিখেছেন, নিসর্গের কবিতা লিখেছেন, বিদ্রোহের কবিতাও লিখেছেন। (সম্পূর্ণ…)

শামসুর রাহমান-এর দুর্লভ সাক্ষাৎকার

| ১৭ আগস্ট ২০০৮ ৫:১২ অপরাহ্ন

rahman-02.jpg
শামসুর রাহমান, সাক্ষাৎকার গ্রহণের ৯ বছর পরে। ছবি: হাসান বিপুল ২০০৫

[১৯৯৬ সালে আমরা যখন এই সাক্ষাৎকার নিতে যাই শামসুর রাহমানের বাসায় তখন তার কবিতা লেখালেখির ৫০ বছর হয়ে গেছে। বাংলা একাডেমীর সভাপতি তিনি। বাংলাদেশের প্রধান কবি হিসাবে অনেক গুরুত্বের ভার বহন করতে হয়। লাজুক, বিনম্র এই কবি পূর্বপরিচয়ের সূত্র ধরে সাক্ষাৎকারে যাতে চপলতা না থাকে সে অনুরোধ করেছিলেন। বলা প্রয়োজন, তা রক্ষা করা যায় নাই।

কবিদের ভেদ বা তারতম্য তিনি মান্য করতেন। তাকে নিয়ে ভক্তদের অতিরিক্ত ভাব বন্দনাকে তিনি পরিস্থিতির নিরিখে দেখতে চাইতেন। একবার তাকে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবি অভিধায় ভূষিত করলে তিনি বলেছিলেন, “এগুলো তো বোগাস জিনিস। যে শতাব্দীতে রবীন্দ্রনাথ, যে শতাব্দীতে জীবনানন্দ দাশ ছিলেন, যে শতাব্দীতে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন সে শতাব্দীতে আমি কী করে বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ গুরুত্ব পাই?” নিরহংকারী শামসুর রাহমান সকলের কবিতা পড়তে পছন্দ করতেন। মনে করতেন, “তৃতীয় বিশ্বে”র দেশের কবিদের একটি সমস্যা হলো তারা ঘরে থাকতে চাইলেও ঘরে থাকতে পারে না। চারপাশের ডাকে তাদের সাড়া দিতে হয়। এবং বাইরে গেলে লোকে তাকে বাইরের কবিই ধরে নেয়।

সাক্ষাৎকারটিতে শামসুর রাহমান এমন নানা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন যা সচরাচর তাঁর লেখালেখি বা বক্তব্যের মধ্যে দেখা যায় না। দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায় সাহিত্য সাময়িকীতে ১৯৯৬ সালে এটি ছাপা হয়।

২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট এই কবি মৃত্যুবরণ করেন। শামসুর রাহমানের মৃত্যুবার্ষিকীকে স্মরণে রেখে দুর্লভ এ সাক্ষাৎকারটি এখানে পুনর্মুদ্রণ করা হলো।
— বি. স.]

swakat-shamsur.jpg
শওকত ওসমানের সঙ্গে শামসুর রাহমান। ছবি: ফিরোজ চৌধুরী

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: রাজু আলাউদ্দিনব্রাত্য রাইসু

ব্রাত্য রাইসু: রাহমান ভাই কি এখন সিরিয়াস হইয়া গেছেন?

শামসুর রাহমান: আমি সিরিয়াস হয়ে গেছি মানে?
—————————————————————–
অ্যারিস্টটলের মতো, প্লেটোর মতো, শেক্সপীয়রের মতো, দান্তের মতো, সফোক্লিসের মতো, টলস্টয়ের মতো, দস্তয়েভস্কির মতো, বোদলেয়ারের মতো — এইসব লোক মরে গেলো। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো। কলোশিয়াল ওয়েস্টেজ মনে হয় না? কোটি কোটি কোটি কোটি লোক। আমার জন্মের আগে হাজার হাজার বছর চলে গেছে, আমার মৃত্যুর পরেও হয়তো হাজার হাজার বছর যাবে, এটা ভাবলেই…
—————————————————————–
রাইসু: এই যে ফাজলামী করতে মানা করলেন।

রাহমান: করো তো, তুমি তো করো। ভাষা চেন্‌জ্ করে ফেললে তুমি। ওই ভাষায় কথা বলো? (সম্পূর্ণ…)

মাহমুদুল হকের সাক্ষাৎকার

আহমাদ মোস্তফা কামাল | ৩১ জুলাই ২০০৮ ৩:০২ অপরাহ্ন

mahmudul-haq-5.jpg
মাহমুদুল হক। ছবি: ওয়াসে আনসারী

দিনক্ষণ ঠিক করে, মিনি রেকর্ডার আর কাগজ-কলম নিয়ে কেতাদুরস্ত ভঙ্গিতে যেসব সাক্ষাৎকার নেয়া হয়, এটি সে ধরনের কোনো সাক্ষাৎকার নয়। মাহমুদুল হকের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে ২০০৪ সালের মার্চ মাসে। তার ২/৩ বছর আগেই তাঁর গল্প ও উপন্যাসের ওপর লেখা আমার দুটো প্রবন্ধ পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত আমার তৃতীয় গল্পগ্রন্থ অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না বলে আমি তাঁকে উৎসর্গ করি এই বলে “আমাদের সাহিত্যভুবন থেকে এই অসামান্য প্রতিভাবান মানুষটির স্বেচ্ছানির্বাসন আমাকে বিমর্ষ করে তোলে”। বইটি তাঁর কাছে নিজ হাতে তুলে দেবার জন্যই আমি প্রথম তাঁর জিগাতলার বাসায় যাই। তবে, এই যাওয়াটুকুও সম্ভব হতো না, যদি আমার অনুজপ্রতিম আরেফিন হাসানের নিরন্তর তাগাদা না থাকতো। এই তরুণটি গত প্রায় ১১ বছর ধরে একটানা মাহমুদুল হকের সঙ্গে কাটিয়েছেন। এই সুযোগে তার কাছেও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। যাহোক, প্রথম দেখা হওয়ার পর থেকেই আমাদের আড্ডা শুরু হয়। এই আড্ডা চলে বহুদিন পর্যন্ত। ঠিক দিন-তারিখের হিসাব রাখা সম্ভব হয়নি সঙ্গত কারণেই। সেইসব আড্ডার একটি সংক্ষিপ্ত লিখিত রূপ প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে, প্রথম আলো সাময়িকীতে। আরেকটি অংশ প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে ছোট কাগজ লোক-এ। এটি শেষোক্ত সাক্ষাৎকারের পুনর্মুদ্রণ। যেমনটি ছিলো তেমনটিই রাখা হলো, কোনো পরিবর্তন করা হলো না। — আ. মো. কা

●●●


“শিল্পীদের লোভ থাকতে নেই”

— মাহমুদুল হক

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: আহমাদ মোস্তফা কামাল

[মাহমুদুল হকের সাক্ষাৎকার নেয়ার ইচ্ছে আমার দীর্ঘদিনের, কিন্তু কাজটি সহজ ছিলো না। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এক রহস্যময় নীরবতা অবলম্বন করে চলেছেন। কিছু লেখেন না তো বটেই, এ সম্বন্ধে কোনো কথাবার্তাও বলেন না কারো সঙ্গে। সাক্ষাৎকার দেয়ার ব্যাপারে, পত্রপত্রিকার মুখোমুখি হওয়ার ব্যাপারে তার অনীহার কথা এখন সর্বজনবিদিত। এই নীরবতার দেয়াল ভেদ করে তাঁকে পাঠকের সামনে হাজির করতে হবে — এমন কোনো পরিকল্পনা থেকে অবশ্য সাক্ষাৎকার নেয়ার কথা ভাবি নি। তিনি আমাদের প্রধান লেখকদের একজন, তাঁর সঙ্গে কথা বলার একটা ইচ্ছে তো হতেই পারে, কিন্তু তারচেয়ে বড় ব্যাপার — তিনি এমন একজন লেখক, আমাদের লেখালেখির জগতে যাঁর প্রভাব এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। প্রধানত এই কারণেই কথা বলার আগ্রহ। এবং তিনি বলেনও প্রচুর — তবে শর্তসাপেক্ষে — এইসব কথাবার্তা ছাপা যাবে না। তাঁর সঙ্গে আমার বহুদিন কথা হয়েছে। জীবন ও জগতের বহু বহু প্রসঙ্গে তিনি অবিরাম কথা বলে গেছেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলার একটি মজার দিক হলো — তিনি শুধু মতামত দিয়েই ক্ষান্ত হন না, নানা বিষয়ে প্রশ্নকর্তার মতামত-ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণও জানতে চান এবং প্রয়োজনে দীর্ঘসময় ধরে মনোযোগ দিয়ে সেই ব্যাখ্যা শোনেন। তাঁর কাছে গেলে ৫/৬ ঘণ্টার আগে উঠে আসা যাবে না — এমনই তাঁর গল্পের স্রোত। এককালের তুখোড় আড্ডাবাজ ‘বটু ভাই’ এখনও আড্ডার আমেজটি সমানতালে ধরে রাখতে পারেন — সেই আগের মতো — শুরু হলে শেষ হওয়ার নাম নেই। কতো বিষয় নিয়ে যে কথা হয় তার সঙ্গে! বিশেষ করে তিনি যখন তাঁর লেখক জীবনের স্মৃতিচারণ করেন, তখন যেন ৫০/৬০/৭০ দশকের ঢাকা শহর, এর সাহিত্যিক পরিমণ্ডল আর সাহিত্যের মানুষগুলো একেবারে জীবন্ত হয়ে ওঠে। এখানে যে লেখাটি পত্রস্থ হলো তাতে সেসব কথাবার্তা প্রায় নেই বলতে গেলে — সেগুলো লিখতে গেলে একটা বিরাট উপন্যাস হয়ে যাবে! এখানে কেবল তাঁর লেখালেখি এবং জীবন দর্শন সম্বন্ধে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে। এর সব কথা একদিনে হয়নি, তাই কোনো তারিখ দেয়া হলো না।

জীবন আমার বোন, কালো বরফ, নিরাপদ তন্দ্রা, খেলাঘর, অনুর পাঠশালা, মাটির জাহাজ প্রভৃতি উপন্যাস আর ‘কালো মাফলার’, ‘প্রতিদিনি একটি রুমাল’, ‘হৈরব ও ভৈরব’ প্রভৃতি গল্পের অমর স্রষ্টা আমাদের বটু ভাই এখন বেশ খানিকটা বুড়িয়ে গেছেন বলে মনে হয়। শারীরিকভাবেও বেশ খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়েছেন। নিঃসঙ্গ একজন মানুষ — প্রায় সারাদিনরাত ঘরেই বসে থাকেন, কোথাও যান না, কারো সঙ্গে মেশেন না, একটি লাইনও লেখেননি বহু বছর। তবে কেউ তাঁর বাসায় গেলে আড্ডায় মেতে উঠতে পছন্দ করেন — যদি সুস্থ থাকেন। এখন তাঁর সময় কাটে বই পড়ে বা ব্যালকনিতে বসে রাস্তায় মানুষের স্রোত দেখতে দেখতে। আসুন প্রিয় পাঠক, তাঁর সঙ্গে আড্ডা শুরু করা যাক।]

আহমাদ মোস্তফা কামাল: আপনার লেখালেখির শুরু হলো কীভাবে?

মাহমুদুল হক: সেটা বলা বেশ মুশকিল। ছোটবেলায় দু-চারটে গল্প লিখলেও আমি ঠিক কখন থেকে পরিকল্পনামাফিক লিখতে শুরু করেছিলাম সেটা আর মনে পড়ে না। আমার মধ্যে সম্ভবত লেখক হওয়ার একটা আকাক্সক্ষা ছিল — কীভাবে যে সেটার জন্ম হয়েছিলো তা বলতে পারবো না। মনে পড়ে, ছোটবেলায় বাবার তাগিদে ঈদের জামাতে নামাজ পড়তে গেলে আমি নিয়মিতভাবে একটা প্রার্থনাই করতাম — হে আল্লাহ, আমাকে তুমি শরৎচন্দ্রের মতো লেখক বানিয়ে দাও। মানুষ তো আল্লাহর কাছে কত কিছুই চায়, কত কিছুই তো চাওয়ার আছে, আমি কেন যে লেখক হতে চাইতাম সেটা নিজেই ব্যাখ্যা করতে পারি না, আমি এমনিতে যে খুব আল্লাহভক্ত ছিলাম তা নয়, কিন্তু লেখক হওয়ার জন্য যখন প্রার্থনা করতাম তখন খুব মন-প্রাণ দিয়েই করতাম। (সম্পূর্ণ…)

হুমায়ুন আজাদ-এর সঙ্গে আলাপ (১৯৯৫)

| ২৮ এপ্রিল ২০০৮ ১০:১০ অপরাহ্ন

[১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ সরকার হুমায়ুন আজাদের নারী বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তার কিছুদিন পরে এ সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়। এটি দু পর্বে দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকার তখনকার সময়ের বিশেষ পাতা ‘সাক্ষাৎকার’-এ ছাপা হয়েছিল। হুমায়ুন আজাদ আরো পরে তাঁর দেয়া সাক্ষাৎকারের একটি সঙ্কলন আততায়ীদের সঙ্গে কথপোকথন প্রকাশ করেন, সেখানে প্রায় সব সাক্ষাৎকার সংযোজিত হলেও এটি তিনি সঙ্কলিত করেন নি। সাক্ষাৎকারে নিষিদ্ধ ঘোষিত বই নারী, তসলিমা নাসরিন, এরশাদ, আল মাহমুদ, সচিব, মন্ত্রী, রবীন্দ্রনাথ, প্রবচন ইত্যাদি বিবিধ প্রসঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন হুমায়ুন আজাদ। উল্লেখ্য ২০০০ সালে হাইকোর্টের রায়ে নারী বইয়ের নিষেধাজ্ঞা বাতিল ঘোষিত হয়। আজাদ সাক্ষাৎকারে আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বলেছিলেন, “এই বই আছে এবং থাকবে, বরং যারা নিষিদ্ধ করেছে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, বাতিল হয়ে যাবে, নিষিদ্ধ হয়ে যাবে।”

২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি গুপ্তঘাতকদের আক্রমণে মারাত্মক ভাবে আহত হন হুমায়ুন আজাদ। আরোগ্য লাভের পর একই বছরের আগস্ট মাসে জার্মান রোমান্টিক কবি হাইনরিখ হাইনের ওপর গবেষণা কাজে জার্মান যাত্রা করেন। সেখানে ১১ আগস্ট মিউনিখ শহরে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে আকস্মিক ভাবে মারা যান তিনি। অকালপ্রয়াত হুমায়ুন আজাদের একষট্টিতম জন্মদিন মনে রেখে দুর্লভ এ সাক্ষাৎকারটি পুনর্মুদ্রণ করা হলো।
— বি. স.]

humayun_azad.jpg
হুমায়ুন আজাদ (২৮/৪/১৯৪৭-১১/৮/২০০৪)

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: রাজু আলাউদ্দিনব্রাত্য রাইসু

ব্রাত্য রাইসু: আপনার নারী নিষিদ্ধ হয়েছে। এই মুহূর্তে আপনি কী ভাবছেন?

হুমায়ুন আজাদ: হ্যাঁ, বেশ অদ্ভুত হচ্ছে। তবে আমি বইটি নিষিদ্ধ হয়ে গেছে এটি মনে করছি না, বা মনেও হচ্ছে না।

রাইসু: প্রসিদ্ধ হলো বরং?

হুমায়ুন: প্রসিদ্ধ এটি আগেই ছিলো। আমার মনে হচ্ছে যে এই বই আছে এবং থাকবে, বরং যারা নিষিদ্ধ করেছে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, বাতিল হয়ে যাবে, নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। এ-বইকে কারো পক্ষে নিষিদ্ধ করে রাখা সম্ভব নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো বইকে নিষিদ্ধ করে রাখা যায় নি। (সম্পূর্ণ…)

« আগের পাতা | পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com