জার্নাল

সংযোজন

(আমার) রবিভাব… ভাব ও অভাব

মানস চৌধুরী | ৬ জুন ২০১০ ৮:৩০ অপরাহ্ন

পূর্বকথা এবং পূর্বরাগ

“তুমি কেমন করে গান কর হে গুণী…”

স্কুলে থাকাকালীন, নেহায়েৎ নিজেরই লব্ধানুশীলনে, নানান রকমের বইপত্র ইঁদুরের মতো কামড়ে কামড়ে দেখি যখন, তখন সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবনীকিতাব থেকে জানতে পারি যে তিনি কৈশোরে প্রায় শ’ পাঁচেক tagore_mc.jpgরবীন্দ্রসঙ্গীত মুখস্ত করে ফেলেছিলেন। আমৃত্যু সেই দক্ষতাটা তিনি ধরে রেখেছিলেন। এই ঘটনা জেনে আমার দুটো প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। আমারই সমবয়সী দূরবর্তী একটা ছেলের অর্জিত দক্ষতা ও রবীন্দ্রপ্রেমে আমি ঈর্ষান্বিত বোধ করি। এবং দ্বিতীয়ত, একটা জিদ দেখা দিয়েছিল ঠিক একই ভাবে রবীন্দ্রপ্রেমের প্রমাণ দিতে। কিন্তু ঘন তদন্তে আবিষ্কার করা সম্ভব, অন্ততঃ এতটা কাল পর যখন অনেক খতিয়ে বিষয়টাকে দেখা যায় বলে আমার মনে হচ্ছে, ওই জিদটা আসলে এক প্রগাঢ় অহংকার এবং অহংকারটা সাংস্কৃতিক উচ্চম্মন্যতার। রবীন্দ্রনাথ সেখানে নিমিত্ত বটে, কারণও বটে। গন্তব্য যেমন, বাহনও তেমনি। এই ঘোরতর পরিস্থিতি বাংলা অঞ্চলের ইতিহাসেই প্রোথিত। কিন্তু আমি সংকল্প করেছি আমি আমার কাহিনীই আজ বলব।


গান করছেন মানস চৌধুরী

পরিস্থিতিটা আরও জটিল হয়ে গেছিল স্থানীয় এক গায়কের কারণে। তাঁর সঙ্গীতসুধা এবং উপস্থিতি আমার জন্য এক অনির্বচনীয় ফলাফল বয়ে আনত। তাঁকে গাইতে শুনলে আমার কণ্ঠনালী ফেঁপে ফেঁপে উঠত, গলা নিশপিশ করত। কোনো মঞ্চে তাঁকে উঠতে দেখলে আমার হাত-পা কেঁপে কেঁপে উঠত। তাঁর দৃষ্টিসুধা কোনোভাবে আমার উপর নিপতিত হলে, এমনকি ডাক্তার না-দেখিয়েই আমি টের পেতাম আমার নাড়ির গতি বেড়ে যেত, আসে যায় না তা সেই দৃষ্টিপাত ইচ্ছাকৃত নাকি অকস্মাৎ ইচ্ছা-নিরপেক্ষ নিপতন। তিনি কোনো কারণে গাণের কোনো চরণ আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে গাইলে আমার ইচ্ছা করত তাঁর চরণ বুকে করে রাখি, শিব যেমনটা রেখেছিলেন। যেহেতু তিনি নারী ছিলেন এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন, খুব জটিলভাবে আমি নিজেকে একজন গুরুত্বপূর্ণ গাইয়ে হিসেবে স্বপ্নরচনা করতে থাকি—অন্তত ততখানি যতখানি হলে আমাদের বিচরণ-এলাকায় দুজন একই পঙ্‌ক্তিতে উচ্চারিত ও বিবেচিত হই। বড় জটিল সেই কামনা। আমি তাঁকে নারী বলছি বটে, কিন্তু স্থানীয় মুরুব্বিদের বিবেচনায় তিনি বড়জোর কিশোরী ছিলেন। (সম্পূর্ণ…)

রবীন্দ্রজন্মের দেড়শ বছর

অশেষ রবীন্দ্র প্রীতি

সাইমন জাকারিয়া | ৭ মে ২০১০ ৮:৪৪ অপরাহ্ন

dakghar_rabindranath.jpg
ডাকঘর নাটকে ফকিরের সাজে রবীন্দ্রনাথ, ১৯১৭

কেন যেন কী হয়, রবীন্দ্রনাথকে ভাবতে গেলে ভক্তি এসে অন্তরে জমা হয়। আর এমনই এক ভক্তি আচ্ছন্নতার মধ্যে একবার এক কবিগানের আসরে ঋষি কবি রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাত পেয়েছিলাম, তখন কবিয়াল নারায়ণ বালা ঋষি কবি রবীন্দ্রনাথের দোহাই দিয়ে প্রেমের সংজ্ঞা দিচ্ছিলেন। তার আগে কোনোদিন রবীন্দ্রনাথকে ঋষি ভাবিনি, তাঁকে কবি নাট্যকার গল্পকার উপন্যাসিক অভিনেতা নাট্যনির্দেশক চিত্রকর গায়ক ভাবুক দার্শনিক এমনকি ফোকলোরবিদ হিসেবেও দেখেছি, বড়ো জোর একজন বাউল হিসেবে ভেবেছি। কিন্তু তিনি যে ঋষি কবি হতে পারেন তা স্বপ্নেও কোনোদিন ভাবিনি, চিন্তা করিনি, সেদিন কবিগানের আসরে বসে প্রথম জানতে পারি গ্রামের কবিয়ালরা তাঁকে ঋষি কবির মর্যাদা দিয়ে থাকেন এবং তাঁর কথা-বাণী-গান ও জীবনের দোহাই দিয়ে ভক্তি ও যুক্তির অপূর্ব ইন্দ্রজাল তৈরি করেন। সে রকমই একটি আসরে বসে ঋষি কবি রবীন্দ্রনাথের গুণগান শুনতে শুনতে হঠাৎ দর্শকদের মাঝখানে তাকিয়ে দেখি বহু দর্শক-ভক্তদের মাঝখানে ধ্যানমগ্ন হয়ে কবিগানের আসর উপভোগ করছেন যেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, এটা কি আমার চোখের বিভ্রম না-কি সত্য তা যাচাই করে নেবার জন্য পাশে বসা বান্ধবকে ডেকে বলি, ‘ওই দ্যাখ কে এসেছেন? মনে হচ্ছে উনি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ!’ জানি আমার এ দেখা তেমনই মিথ্যে নয় যেমন মিথ্যে নয় কুষ্টিয়া ও কুমারখালীতে আমার জন্ম বলয়ের মধ্যে এসে রবীন্দ্রনাথ পেয়েছিলেন আত্ম-উদ্বোধনের চূড়ান্ত ইশারা। আচ্ছা, লালন সাঁইজির সঙ্গে কোনোদিন কি দেখা হয়েছিল তাঁর? এই প্রশ্নটার সুরাহা তিনি দিয়ে যাননি কোনোদিন, এমনকি কোনো ইশারাও রাখেননি এই প্রশ্নের উত্তরের। আমরাও তাই ভেবে মরি রবীন্দ্রনাথের রহস্যময়তা নিয়ে। তাহলে কি আমার সাথেও সত্যি সত্যি রবীন্দ্রনাথের দেখা হয়েছে কোনোদিন? কী করে বলি—তা হয়নি, তা সম্ভবও নয়? (সম্পূর্ণ…)

ভাষার শুদ্ধতা কেন আলোচ্য

এস এম রেজাউল করিম | ১৪ এপ্রিল ২০১০ ৩:৪৫ অপরাহ্ন

ba.jpg
বাংলা একাডেমী, ছবি. উইকিপিডিয়া

বাংলাভাষার শুদ্ধতা নিয়া একটা গুরু চিন্তা করতেছেন এই সময়ের সরকার, বাংলা একাডেমী, বুদ্ধিজীবীগণ। আইন পাশ হইতেছে সংসদে, বাংলা একাডেমী বাংলাভাষার দেখভালের, ভরণপোষণের দায়িত্ব পাইতেছে শুনতেছি। বাংলাভাষার দুরবস্থা নিয়া দেশে বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা চলতেছে। যেইটারে দুরবস্থা বলা হইতেছে সেইটা যে দুরবস্থ—এই ব্যাপারে বাঙালী জাতীয়তাবাদীগণে ঐকমত্যে পৌঁছাইছেন। দুরবস্থা মনে না করা বুদ্ধিবৃত্তিক কিছু তৎপরতাও আছে, এই ভাবনাও যে আছে তা বেশ খোঁজখবর না নিলে টের পাওয়া যায় না, অধিপতি মিডিয়ায় তাদের জায়গা কম।
—————————————————————–
এইগুলা বিকৃত হইলে ‘প্রকৃত’ বাংলা একাডেমী কই পাইলো সেই ব্যাপারে একাডেমীর কোনো ব্যাখ্যা থাকার কথা, ব্যাখ্যাটা পাই নাই, ভরসা করি হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী বাংলা জাতীয় কিছু হইবে সেইটা। এর অর্থ কাহ্নপার লেখা বা উচ্চারণ হইতে পারে, চণ্ডীদাস বা মঙ্গলকাব্যও হইতে পারার কথা, কিন্তু তা হবে না, তাইলে বাংলা একাডেমী সেইসব ভাষায়/উচ্চারণে বিবৃতি দিতো, বাংলা একাডেমী তা দেয় না। বরং উনিশ/বিশ শতকের ঔপনিবেশিক আমলের কলিকাতায় শিক্ষিত বাঙালীর ভাষাই প্রকৃত বাংলা বইলা চেনে বা চেনায় বাংলা একাডেমী
—————————————————————-
আমার চোখে পড়া আলোচনাগুলায় দেখতেছি—আলাপটা লেখা নিয়াই প্রায়। কিন্তু বাংলা একাডেমীর ভাষ্য যতটা জানি তাতে বাংলা উচ্চারণ তার একটা প্রধান চিন্তা—এফএম রেডিওগুলা, ইংরাজি মাধ্যমে পড়ুয়াদের বাংলা উচ্চারণ নিয়া চিন্তা কেবল বাংলা একাডেমী না পরিচিত অনেকের মধ্যে দেখতেছি। বাংলা একাডেমী এইটারে বিকৃতি মনে করে, এইটা ঠেকানোর জন্যও আইন করতেছে শুনতেছি। (সম্পূর্ণ…)

বোর্হেসের প্রতি চিঠি

সুজান সন্টাগ

| ২৬ জানুয়ারি ২০১০ ১:৩১ অপরাহ্ন

borges2.jpg
হোর্হে লুইস বোর্হেস (২৪/৮/১৮৯৯ – ১৪/৬/১৯৮৬)

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান খান

[১৯৯৬ সালে এ চিঠি মার্কিন সাহিত্য সমালোচক এবং ঔপন্যাসিক সুজান সন্টাগ লিখেছিলেন প্রায় এক যুগ আগে প্রয়াত লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেসকে উদ্দেশ্য করে। চিঠিটি সন্টাগের বই Where the Stress Falls-এ সংকলিত হয়েছে। অনুবাদক লেখাটি অনুবাদ করেছেন ক্লাউদিয়া মার্তিনেসের স্প্যানিশ অনুবাদ থেকে।—বি. স.]

borges_care21.jpg

১৩ জুন ১৯৯৬ নিউ ইয়র্ক

প্রিয় বোর্হেস,

যদিও আপনার সাহিত্য সব সময়ই চিরন্তরের অন্তর্ভুক্ত তবুও আপনাকে একটা চিঠি লেখা মনে হয় না খুব একটা বিস্ময়কর হবে। (বোর্হেস, দশ বছর হয়ে গেছে!) যদি কোনো সমসাময়িক সাহিত্যিককে অমরতার অভিমুখী মনে হয়, সে হচ্ছেন আপনি। যদিও আপনি ছিলেন আপনার সময় এবং সংস্কৃতির এক বিশাল সৃষ্টি, তারপরও আপনি জানতেন কীভাবে আপনার সময় এবং সংস্কৃতিকে অতিক্রম করতে হয় আর এর ফলাফল ছিলো জাদুকরী। আপনার মনোযোগের ব্যাপ্তি এবং উদারতাই হচ্ছে এর বিশেষ কারণ। লেখকদের মধ্যে আপনি ছিলেন অপেক্ষাকৃত কম স্বকেন্দ্রিক এবং স্বচ্ছ, একই ভাবে সবচেয়ে শৈল্পিক। আত্মার প্রাকৃতিক বিশুদ্ধতাও এর এক বিশেষ কারণ। আমাদের মধ্যে আপনি বেশ দীর্ঘ সময় বেঁচে ছিলেন। ধ্বংসের এবং উদাসীনতার চর্চাকে আপনি এমন এক পূর্ণতায় নিয়ে গেছেন যা আপনাকে অন্য যুগের মানসিক পরিব্রাজকে রূপান্তরিত করেছে। আপনার কালচেতনা ছিলো অন্যদের চেয়ে আলাদা; অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত সম্পর্কে সাধারণ ধারণাগুলো আপনার কাছে তুচ্ছ মনে হয়েছিলো। আপনি বলতে ভালোবাসতেন এই কথা যে প্রতিটি মুহূর্তের মধ্যে অতীত ও ভবিষ্যৎ হাজির রয়েছে। (সম্পূর্ণ…)

ঢাকা ক্লাব ও লুঙ্গি বিতর্ক

ঢাকা ক্লাব ও বাংলাদেশে ঔপনিবেশিক ঘৃণা চর্চা

ফরিদা আখতার | ৮ অক্টোবর ২০০৯ ১১:৫৫ অপরাহ্ন

কিছুদিন আগে ঢাকার শাহবাগে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী রোডে অবস্থিত ঢাকা ক্লাবে ঢোকার সময় প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তা রক্ষীদের বাধার সম্মুখীন হন কবি ও বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার। লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় ঢাকা ক্লাবে প্রবেশ করা যাবে না এমন আপত্তির মুখে তিনি এর প্রতিবাদ করেন। পরবর্তীতে ঘটনাটি বহুদূর গড়ায় এবং ক্লাবের উচ্চপদস্থ একজন কর্তার সঙ্গে ফরহাদ মজহারের বিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। এখানে লেখক ও নারী আন্দোলন কর্মী ফরিদা আখতার ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছিল তা বর্ণনা করেছেন। এ লেখায় তিনি ঢাকা ক্লাবের ব্যাপারে ‘ঘৃণা চর্চা’র অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। আর্টস-এ এ বিষয়ে আগ্রহীরা তাদের মতামত জানাতে পারেন। উল্লেখ্য ঢাকা ক্লাব নির্মিত হয় ১৯১১ সালের ১৯ আগস্ট। ঢাকার নওয়াব পরিবার ঢাকা ক্লাবকে ভূমি লিজ দিয়েছিল। বি. স.

ঢাকা ক্লাবের ঘটনা এখন নানাভাবে আলোচিত হচ্ছে। সেদিন ছিল ২রা অক্টোবর। সেই ঘটনার সময় আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। ঢাকা ক্লাবে আমরা পারিবারিকভাবে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম আমাদের ভাতিজি, কেয়া ফারহানার মেয়ে সাফায়রার প্রথম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে। কেয়া যখন আমন্ত্রণ
—————————————————————–
ফরহাদ মজহার বাড়াবাড়ি করেছেন, ইচ্ছে করে ঘটনা ঘটিয়েছেন এমন কথা হচ্ছে কয়েকটি পত্রিকায় এবং ঘটনার কয়েকদিন পরে।… একটি স্বাধীন দেশে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যে-পোশাক পরে, যে-পোশাক আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেই পোশাক পরার ক্ষেত্রে বাধানিষেধ জারি রাখার বিধান বহাল রাখার ঔপনিবেশিক ‘নিয়ম’ বা ঔদ্ধত্য কোন প্রতিষ্ঠানের থাকতে পারে কি না। ব্যক্তি, ক্লাব, প্রাইভেট প্রপার্টি, সংগঠন, সমিতি যাই বলি না কেন তারা কি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের বাইরে? সংবিধানের বিরোধী বা সংবিধানের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ কোন ‘কোড’, ‘আইন’, বা ‘বিধান’ বহাল রাখতে পারে কি কেউ?
—————————————————————-
জানাবার জন্যে ফোন করে, অনুষ্ঠানের স্থান ঢাকা ক্লাবের কথা শুনেই ফরহাদ মজহার বলেছিলেন ‘ওখানে আয়োজন করেছিস? আমি তো লুঙ্গি পরে চলি…।’ কেয়া শুনে মন খারাপ করেছিল। ভেবেছে কাকা বুঝি আসতে চাইছে না। তার স্বামী তখন তার কাকা যেন আসতে পারে তার জন্য নিজস্ব উদ্যোগ গ্রহণ করে। কাকা আসতে যেন কোন অসুবিধা না হয় সেই জন্য বিশেষ ভাবে বলা থাকবে রিসেপশনে, এই কথা জানানো হোল সেদিন বিকেল ৫টার দিকে। (কেয়ার স্বামীর চাচা আবু জাফর আজাদ সদস্য বলে জন্মদিনের ভেন্যু হিসেবে হল ব্যবহারের সুযোগটি পেয়েছে)। ফলে ভাতিজির মন রক্ষা করার জন্যে, তার মেয়ের জন্মদিনে তাকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্যই সেদিন ফরহাদ মজহারের ঢাকা ক্লাবে যাওয়া। কেয়ার মা নেই, তার দাদীর বিশেষ আদরের নাতনী কেয়া—তাকে কষ্ট দিতে চাননি তার কাকা ফরহাদ মজহার।

fmazhar.jpg……
ফরহাদ মজহার (জন্ম. নোয়াখালী, ১৯৪৮)
…….
অনুষ্ঠানটি ছিল রাত ৮টায়, ক্লাবের গেস্ট হাউজের নীচতলার হল রুমে। যেটা তারা বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দিয়ে থাকে। আমরা গাড়ি নিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। গাড়ি থেকে নামতেই ওদের সামনে পেলাম। রিসেপসনের সামনে দিয়ে বাঁ দিকে হল রুমের দিকে ঘুরতেই রিসেপসন কাউন্টারের একজন তরুণ বয়সের কর্মচারী বললেন, ‘এক্সকিউজ মী, লুঙ্গি এখানে এলাউড নয়।’ বলাটা এমন ছিল যে যদি আর এক কদম এগিয়ে যাওয়া হয় তাহলে তারা আটকাবে। সাথে সাথেই ফরহাদ মজহার ঘুরে রিসেপশন কাউন্টারের সামনে এসে দাঁড়ালেন। (সম্পূর্ণ…)

কবি ও সরস্বতী

ফরহাদ মজহার | ১৭ আগস্ট ২০০৯ ২:৩৭ পূর্বাহ্ন

saraswati.jpg
ইন্দোনেশিয়ার বালিতে দেবী সরস্বতীর মূর্তি। উল্লেখ্য বালিতে জ্ঞানের দেবী হিসাবে সরস্বতীর মূর্তি প্রায় সব স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শোভা পেয়ে থাকে।

গাজী রকিব আমাকে দুটো প্রশ্ন করেছেন। খুবই কঠিন প্রশ্ন। কবিতায় বিবর্তন কী? আমি কী করে জানি? প্রশ্ন করেছেন নিজের কবিতায় আমি যেভাবে বিবর্তিত হই সেই সব কথা যেন বলি। হই কি? কে জানে? আমি উত্তর দেবার ভয়ে দীর্ঘদিন পালিয়ে বেড়িয়েছি। কিন্তু রকিবের প্রশংসা না করে উপায় নাই। আমার জীবনে লেখা আদায় করবার জন্য হাজার বার টেলিফোনের স্মৃতি ভুলবার নয়। আমি এখানে কি আসলে তার প্রশ্নের উত্তর দিলাম? নাকি শুধু টেলিফোনের সাড়া দিয়েছি মাত্র? কিন্তু কিছু যদি এখন লিখে থাকি উত্তর দিয়েছি আন্তরিকভাবেই। কোনো ভনিতা না করে।

প্রশ্ন, ‘কবিতায় বিবর্তন কী?’ খুবই গুরুগম্ভীর প্রশ্ন। মাথা চুলকিয়ে আমি ভাবছিলাম আমি কি ‘কবি’ হিশাবে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেব, নাকি কাব্যতত্ত্বের জায়গা থেকে? কাব্যতত্ত্ব কবিতা বানায় না কবিতাকে কবিতা
—————————————————————–
কবি ভাষা ব্যবহার করে—আর দশজন যে-বাংলা ব্যবহার করে—শিক্ষিত, নিরক্ষর, জ্ঞানী অজ্ঞানী কবি বা অকবি—সেই সামাজিক ভাষাটাই কবি ব্যবহার করে, কিন্তু একই সঙ্গে কবিতা মানে সেই ভাষাকে নাকচ করে দেওয়া। অথচ কবির ট্রাজেডি হচ্ছে ওখানে যে বিদ্যমান ভাষা বা অন্য সব কবিরা যে ভাষায় লেখেন সেই ভাষার ইতিহাসের মধ্যে দাঁড়িয়েই কাব্যভাষা কোনো একটা অর্থ, প্রতিক্রিয়া বা ইংরেজিতে যাকে বলে ইফেক্ট—সেটা তৈরি করে। ভাষার মধ্যে থেকেও কাব্য ভাষার বাইরে কী যেন একটা ব্যাপার হয়ে যতটুকু হাজির থাকতে সক্ষম হয় ততটুকুই কাব্য।
—————————————————————-
হিশাবে বুঝতে সাহায্যও করে না, তবে কবিতার সমাজতত্ত্ব, অর্থনীতি, কবিতার গঠনবর্ণনা ইত্যাদি বুঝতে সহায়ক হয়। পদ্যের পয়দা হওয়ার কারণ অন্যত্র। কিছু কিছু জীব আছে সমাজে, যারা সমাজে বাস করে অবশ্যই, কিন্তু আবার ঠিক সমাজে ‘বাস’ করে না। বরং বাস করে জর্মন দার্শনিক হেইডেগার যেমন বলেছিলন—ভাষার মধ্যে। চিহ্নব্যবস্থায়। অবশ্য মানুষ আদৌ ভাষার বাইরে ‘বাস’ করতে পারে কিনা সেটা দর্শনের জগতে একটা বড়সড় তর্ক হয়ে রয়েছে। সমাজের মধ্যে থেকে সেই জীব ইন্দ্রিয়পরায়ণ জগতের মধ্যে নিজেকে নিজে রক্তমাংসের ফাঁদ বানিয়ে বসে থাকে, বড়ই বিচিত্র এই প্রাণী। তার সাধ এখনও যেসব নিরাকার বিষয়াদি শব্দ, অক্ষর বাক্য ইত্যাদিতে ধরা পড়ে নি, সে সেই অধরাকে ভাষায় বা কোনো না কোনো চিহ্নে, দাগে, বর্ণে, বিন্যাসে ধরবে। এই প্রাণীকুলেরই সাধারণ নাম ‘কবি’। (সম্পূর্ণ…)

বেযোগাযোগ: কী ফারাক বন্ধু কিংবা প্রতিবন্ধুতে?

মানস চৌধুরী | ২৯ মার্চ ২০০৯ ১২:৪১ পূর্বাহ্ন

প্রথম উপলব্ধি দ্বিতীয় মৃত্যুর পর!
বিপুল যখন মারা যায় তখন আমি পাঁচের কাছাকাছি। বড়দের কাছে শুনেছি ও গোদ রোগে মারা গেছিল। কেউ একজন মরে গেলে তার বা আশপাশের মানুষের কী হয় সে বিষয়ে বাস্তবে কোনোরকম ভাবনা গড়ে ওঠেনি।
—————————————————————–
অসতর্ক থাকলেই মনে হতে পারে বার্ধক্য নৈঃসঙ্গের সাথে সম্পর্কিত। তা তো নয়। নিরন্তর সঙ্গপিপাসু মানুষ সঙ্গপিপাসার ভাষা হাতড়াতে থাকেন। আর পান না। আবার ভাষা যখন পান, তখন ভাষা বিনিময়ের কোথাও কোনো সুড়ঙ্গ থাকে না। তারপর কেবল খাবারের একটা পোঁটলা হাতে ‘গৃহে’ ফেরেন মানুষ। ‘গৃহ’—যেখানে মানুষে ঘুমায়, যেখানে ঘুম থেকে উঠে সকালের আলো দেখে। এই সংজ্ঞাতেই কেবল সকলের গৃহ থাকে, এমন একটা পরিসর যেখানে মানুষ ‘ফিরতে’ পারেন।
—————————————————————-
মানুষজনের থমথমে মুখ দেখেছি। তাছাড়া পরে বিপুলকে আর দেখতে পাইনি কখনো। শোক বলে যে অনুভূতিমালার কথা বলা হয়ে থাকে সেই অনুভূতির কিছুমাত্র আমার ছিল বলে মনে করতে পারি না। বরং ছিল বিহ্বলতা। সেই বিহ্বলতার খানিকটা নিশ্চয় পরের দিনগুলোতে বিপুলকে আর দেখতে না পাবার কারণে, কিন্তু আমি প্রায় নিশ্চিত সেটা এই কারণেও যে একটা সঠিক অনুভূতির জন্য হাতড়াচ্ছিলাম। হাতড়ানিকে বিহ্বলতা ছাড়া আর কী নামে ডাকা যায়! গভীরভাবে ভাবতে বসলে আমার এমনকি, ইদানীং, এও মনে হয় যে অন্যের মৃত্যুর পর কী কী ধরনের বহিঃপ্রকাশ থাকতে হয় সেটার একটা শক্তপোক্ত বিধিমালা আছে চারপাশে। হতে পারে বিপুলের মারা-যাওয়ার অভিজ্ঞতা, আনকোরা বলে, কোনো বিধিনিষেধ শিখে না-উঠবার বিহ্বলতায় পড়েছে। হতে পারে।

কিন্তু যখন কায়েদুরের ছোটবোন তিনদিনের জ্বরেই মারা গেল তখন এই বিচ্ছেদের অর্থ মালুম করতে আমার বেশি কসরৎ করতে হয়নি। (সম্পূর্ণ…)

একুশে ও বিশ্বমাতৃভাষা দিবস

রবিউল হুসাইন | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ ৬:৫৭ পূর্বাহ্ন

shahid-minar-1963.jpg
১৯৬৩ সালে সমাপ্ত দ্বিতীয় শহীদ মিনার। সূত্র: উইকিপিডিয়া

বিশ্বসভার অন্যতম সংস্থা ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত হয়েছে আমাদের বাংলা ভাষার গৌরবময় সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৯৯ সালে এই অপূর্ব ঘটনাটি ঘটেছে। বিশ্বের ১৮৮টি দেশের ৬০০ কোটি মানুষ আজ ২১শে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করছে। এই ঘটনাটি বাংলা ভাষার জন্য অভূতপূর্ব সম্মানের এবং বাঙালি জাতি তথা বাংলা ভাষা-ভাষী মানুষদের জন্যে এটি একটি বিশাল ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। জাতিসংঘের বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো এই দিবসটি পালনের সূত্রপাত করায় বিশ্বের প্রায় চার থেকে ছয় হাজার মাতৃভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর প্যারিসে ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ সম্মেলনের কমিশন-২ এর অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে এই প্রস্তাব গৃহীত হয়। এই সঙ্গে সব দেশের মাতৃভাষার অধিকারকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ গ্রহণ করার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠীর মাতৃভাষা ব্যবহার, সংরক্ষণ ও স্বীকৃতির পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
—————————————————————–
হাজার বছর বিদেশী শাসনের অধীনে থেকে থেকে আমরা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি যে-সময়ে ভুলে যেতে বসেছিলাম, ঠিক সেই সময়ে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে বাংলাভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে এদেশের মৃত্যুঞ্জয়ী মানুষের আত্মাহুতি ও আত্মোৎসর্গের ঘটনা আমাদের সর্ব উৎস-মূলে আঘাত হেনে আমাদের নিস্তেজিত চেতনাকে টলমলিয়ে দেয়। সেখানে থেকেই শুরু হয় স্বাধীনতার অঙ্কুরোদ্গম।

—————————————————————-
যদ্দুর জানা যায় গফরগাঁয়ে শহীদ দিবস উপলক্ষে একটি ছোট ম্যাগাজিন স্ফুলিঙ্গতে প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে এই ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করার একটি প্রস্তাব সর্ব প্রথম করা হয়েছিল। ঘটনাটি খুব অবাক করে এই মর্মে যে এই অসামান্য প্রস্তাবটি রাজধানী ঢাকার কোনও কবি-সাহিত্যিক, রাজনীতিক, সংস্কৃতিকর্মী, বুদ্ধিজীবী, ভাষা-সৈনিক কারও দ্বারা প্রস্তাবিত হয়নি এবং কারও মনে ঘুণাক্ষরেও উদয় হয়নি, হয়েছে সুদূর মফঃস্বলের নিবেদিতপ্রাণ বাংলাভাষার একান্ত প্রেমিক কতিপয় সংস্কৃতিকর্মীর অসামান্য কল্পনা ও স্বপ্নে। আলেখ্যটি খুব প্রণিধানযোগ্য। রাজধানীকেন্দ্রিক সৃষ্টিশীল চিন্তা ও চিন্তকের শ্রেণীমূল্যই যে সবসময় শ্রেষ্ঠ বলে গৃহীত হবে এর কোনো নিশ্চয়তা নেই বরং যে কোনও মানুষই যে কোনও মানুষের সঙ্গে তুল্যমূল্যে এক ও অভিন্ন এবং সমগোত্রীয় — এই কথাই প্রমাণিত হয়। (সম্পূর্ণ…)

অনুবাদ, আদর্শ ও অবহেলা

রাজু আলাউদ্দিন | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ ৬:১৪ অপরাহ্ন

মোগল সম্রাট শাহজাহানের বড় ছেলে দারাশুকো সংস্কৃত এক পণ্ডিতের সাহায্য নিয়ে ১৬৫৭ সালে ফার্সী ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন উপনিষদের। এরও প্রায় দেড়শ’ বছর পর প্রাচ্যবিদ ফরাসী এক পরিব্রাজক আকেতিল দ্যু পেরোঁ (Anquetil Du peron) এই ফার্সী অনুবাদের ভিত্তিতে লাতিনে তা অনুবাদ করেন। ইউরোপে উপনিষদের ওটাই প্রথম অনুবাদ। দারাশুকো যদি এই অনুবাদ না করতেন তাহলে ইউরোপকে হয়তো আরো বহু বছর অপেক্ষা করতে হতো উপনিষদের আলোয় মানবজীবনের তাৎপর্য ও গভীরতা অবলোকনের।

দারাশুকোর এই ফার্সী অনুবাদের প্রভাব কতটা গভীর ছিলো পশ্চিমের মননশীল জগতে তা ছোট্ট একটি উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে। ১৮০১ ও ১৮০২ সালে (দুই খণ্ডে) আকেতিল কর্তৃক অনূদিত উপনিষদের একটি কপি পৌঁছেছিলো জার্মান দার্শনিক শোপেনহাওয়ারের হাতে। তাঁর বাকি জীবন কেটেছিলো এই ভারতীয় দর্শনের আত্মার উষ্ণতায়। জীবনের প্রশান্তি হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন উপনিষদের উক্তিসমূহ। শুধু শোপেনহাওয়ারই নন, উপনিষদের প্রভাব পড়েছিলো আরেক জার্মান দার্শনিক ফ্রেডারিখ নীটশের উপরেও। দার্শনিক গভীরতায় আচ্ছন্ন মার্কিন লেখক এমার্সনের লেখায়ও আমরা প্রাচ্যের এই মহৎ সৃষ্টির ছায়া দেখতে পাবো। এসবই সম্ভব হয়েছিলো অনুবাদের কারণে। এই মুহূর্তে আমাদের মনে পড়বে স্পেনের সেই আরব লেখক-অনুবাদকদের কথা যারা পশ্চিমের দার্শনিক ধারার সূত্র গ্রীক দর্শনকে সম্ভাব্য বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন আরবী ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে।

আজ গোটা মুসলিম বিশ্বে চিন্তা এবং মননশীলতার ক্ষেত্রে সীমাহীন দেউলিয়াত্ব দেখে এটা কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব যে আট থেকে পনের শতকের আগে পর্যন্ত স্পেনে মুসলিম বুদ্ধিজীবিরা জ্ঞানের প্রায় সব শাখাতেই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পৃথিবীর যে কোনো জাতির তুলনায় দীর্ঘতম সময়। এই দীর্ঘ সময় জ্ঞানচর্চার ফলে আমরা তাঁদের কাছ থেকে চিকিৎসা জ্যোতির্বিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে অসাধারণ সব মৌলিক চিন্তা ও আবিষ্কার যেমন পেয়েছি, তেমনি পেয়েছি গ্রীক দর্শন ও বিজ্ঞানের অমূল্য সব গ্রন্থের অনুবাদ। (সম্পূর্ণ…)

যেভাবে কবিতা পাঠ আর আলোচনা ঠিক নয়

চঞ্চল আশরাফ | ১ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ ১০:৪২ পূর্বাহ্ন

স্কুলের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক যখন আমাদের কবিতা পড়ান, তখন তিনি প্রথমে সেটি শব্দ করে পড়ে শোনান, তারপর তা বোঝাতে গিয়ে বারবার ‘কবি বলেছেন’ কথাটি বলেন। পঙ্‌ক্তির পর পঙ্‌ক্তি তিনি ব্যাখ্যা করে, শেষে কবিতার মূল কথাটি জানিয়ে দেন বা সেই চেষ্টা করেন। এতেও তার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; কবিতার কোন অংশটি গুরুত্বপূর্ণ, তিনি দেখিয়ে দেন এবং কোন প্রশ্ন ও কোন অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা পরীক্ষায় আসতে পারে, এলে উত্তরটি কেমন হবে — তা-ও বাতলে দেন। আমরাও বিনা প্রশ্নে তা গ্রহণ করি; কারণ, আমাদের তো পরীক্ষা দিতে হবে, সন্তুষ্ট করতে হবে শিক্ষককে। ফলে, আমাদের কবিতা বোঝা-না-বোঝা একান্তই পরীক্ষাকেন্দ্রিক এবং এই অবস্থা থেকে অধিকাংশ শিক্ষার্থী মুক্ত হতে পারে না বা তাদের উত্তরণ ঘটে না; সেই লক্ষ্য বা সচেতনতা তাদের থাকে না। যাদের থাকে না, কবিতা সম্পর্কে তাদের ধারণার পরিবর্তনও ঘটে না। তা না-ঘটুক, শ্রেণিকক্ষে শব্দ করে যা পড়ান শিক্ষক, তা ‘কবিতা’ কি-না, তা বুঝে ওঠার আগেই আমাদের সামনে তিনি এর ব্যাখ্যায়, শব্দার্থে, সারমর্মে মনোযোগী করে তোলেন। পাঠ্যপুস্তকের ওই রচনাটি ‘কবিতা’ কি-না, তা জানার অবশ্য উপায়ও তখন থাকে না। কারণ, শিক্ষকই তো পূর্বনির্ধারিতভাবে, বা, নিয়তির মতোই আমাদের সামনে একে ‘কবিতা’ জেনেই উপস্থিত হয়েছেন। অথবা, তিনি হয়ত ভাবেনও নি ওটা ‘কবিতা’ কি-না, হলে কী-কী শর্ত তাতে রয়েছে। না-ভাবার কারণ হল, পাঠ্যপুস্তক-প্রণেতারাই স্থিরনিশ্চিত করে দিয়েছেন — যা পড়ানো হবে তা-ই কবিতা; এতে কোনও প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।
—————————————————————–
রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়াতে গিয়ে শিক্ষকদের বেশ ‘উহু-আহা’ করতে দেখেছি। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এর সঞ্চার ঘটলে এবং পাঠ-বিশ্লেষণের কোনও পদ্ধতি জানা না-থাকলে সেই ধ্বনি-প্রতিধ্বনির বিস্তার ঘটাই স্বাভাবিক। ফলে, কবিতার সমালোচনায় ‘লাইনটি চমৎকার’, ‘উপমাটি অতুলনীয়’, ‘কবিতাটি অসাধারণ’, ‘হয়ে ওঠে নি’, ‘ছুঁয়ে যায়’ ইত্যাদি উল্লেখের বিচিত্র গৎ তৈরি হয়েছে। বিশেষণ ব্যবহার তো রয়েছে বেশ আগে থেকেই।… বুঝতে পারি, বাংলা সাহিত্য-সমালোচনার একটা বড় অর্জন হল কবিদের জন্যে বিশেষণ আবিষ্কার করতে পারা; বুদ্ধদেব বসু এই পথ প্রথমে দেখান, শুদ্ধতম কবি সেটি চওড়া ও লম্বা করেছে।
—————————————————————-
‘কবি বলেছেন’ কথাটা স্কুল-কলেজ পার হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্যের শ্রেণীকক্ষে পর্যন্ত আছড়ে পড়েছে। এটি শিক্ষকদের মুদ্রাদোষ হয়ে উঠল কেন? তারা কি জানেন না যে, কবিতার মধ্যেই কবির কথা বলা হয়ে আছে, ‘শ্রেণিকক্ষের কবিতা’য় অন্তত কবির কথা সম্পর্কে কারও দ্বিমত হওয়ার কথা নয়। আমরা এটা কখনও দেখি না, ‘কবিতা’টি সম্পর্কে শিক্ষক নিজের ধারণা ও ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হয়েছেন। তো, সবই যখন ‘কবি বলেন’ তখন আমরা অসহায় বোধ করি অথবা করি না; কারণ আমরা এই মর্মে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি — শ্রেণিকক্ষে কবিতার বক্তব্য নিয়ে শিক্ষকের কিছু বলার নেই, কবিই সব বলবেন; বছরের পর বছর একই কথা বলবেন; শিক্ষকের কাজ কেবল তার স্বরযন্ত্রটি ব্যবহার করা। কিন্তু কবিতা সম্পর্কে আগ্রহী পাঠক এক সময় জানতে বা বুঝতে পারে, শ্রেণিকক্ষে যে রচনা নিয়ে (সব) শিক্ষক একই কথা বলেন বছরের পর বছর, তা আসলে কবিতাই নয়। কারণ, সেটিই কবিতা, যার ব্যাখ্যা পরিবর্তনশীল এবং পাঠকভেদে ভিন্ন। পাঠ্যবইয়ে স্থান-পাওয়া ‘কবিতা’গুলো ব্যর্থ, কারণ, যে-ব্যাখ্যা নির্ধারণ করা হয় এগুলোর জন্যে, তার বাইরে যাওয়ার যোগ্যতা বা সামর্থ্য এরা বহু আগেই হারিয়ে ফেলেছে। নিশ্চিতভাবেই, রচনাটি বরণ করেছে পদ্যত্ব — কেননা, তার ভাষার মৃত্যু ঘটেছে, বেঁচে আছে কেবল সাহিত্যের ইতিহাসের খুব ক্ষুদ্র ও নিরীহ ইউনিট হিসেবে; যদিও শ্রেণিকক্ষে এর দাপটের সীমা নেই। আমরা ধরে নিতে পারি, একসময় কবিতা হিসেবে এগুলোর প্রকাশ ঘটেছিল, হয়তো এগুলোর ছিল অনেকান্ত পাঠ ও ব্যাখ্যা; ভাষার গতিশীলতার সঙ্গে টিকে থাকতে না-পারায় আজ এই দশা হয়েছে: একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যায় এটি স্থির হয়ে গেছে, সারমর্ম বলে যা বোঝানো হয়, তাতেই থমকে আছে; এমন অবস্থা হয়েছে, ব্যাখ্যা বা সারমর্ম পড়লে কবিতাটি পড়ার আর দরকার হয় না; কবিতাটি একবার পড়লে প্রয়োজনই হয় না এর ব্যাখ্যা বা সারমর্ম খুঁজতে যাওয়ার, কেননা, সবই চূড়ান্ত হয়ে আছে ওই রচনায়, তাতে পাঠকের অংশগ্রহণের যে জায়গাটুকু শুরুতে ছিল, সময় তা কেড়ে নিয়েছে। (সম্পূর্ণ…)

কবি শামসুর রাহমানকে মনে করে

আলতাফ হোসেন | ১৭ আগস্ট ২০০৮ ১২:৩০ অপরাহ্ন

rahman-01.jpg
শামসুর রাহমান (২৩/১০/১৯২৯ — ১৭/৮/২০০৬), ছবি: হাসান বিপুল, ২০০৫

দু’বছর আগে আজকের দিনে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন কবি শামসুর রাহমান। গতকাল কাগজে তাঁর ছবিসহ সে খবরটা দেখে তাকিয়ে থাকি সেদিকে অনেকক্ষণ। সবে এই দু-লাইন লিখেছি আমার ডায়েরিতে, নিজেরই জন্য লেখা, রাত সাড়ে দশটা যখন, তারিখ ১৬ আগস্ট, ০৮, আর্টস সম্পাদকের ফোন। দু’এক কথার পরেই বললেন, ‘শামসুর রাহমান সম্পর্কে একটা লেখা দিন, কাল সকালের মধ্যে।’ বললাম, ‘আমি তো এ ধরনের
—————————————————————–
ভাষার বদল হয়েছে, ছন্দের কুশলতা বেড়েছে, কবিতা হয়েছে মুখের ভাষার আরও কাছাকাছি, বিষয়ে এসেছে কতই না বৈচিত্র্য। এবং এসবই বিবর্তিত হয়েই চলেছে। আমাদের দেশে এ বিবর্তনের ছাপ কবিতায় যতটা পড়ার কথা ততটা কিন্তু পড়েনি। এ কথা মনে হলে আমাদের প্রধান কবিদের কথাই মনে পড়ে। তরুণ কবিরা তো অগ্রগামীদের দ্বারাই প্রভাবিত হন।
—————————————————————–
লেখা লিখতে পারি না। তা ছাড়া তাঁর সম্পর্কে লেখার উপযুক্ত লোক বোধহয় আমি নই। জানি খুব কম।’ ছাড়লেন না আমাকে। বললেন, ‘স্মৃতিচারণামূলক কিছু লিখুন, জার্নাল ধরনের কিছু।’ ‘জার্নাল’ শুনতেই দুর্বল হয়ে গেলাম। আর কিছু না পারি, জার্নাল পারি। মানে, আমি-আমি করে লেখা লিখতে পারি, যতই কেননা অপছন্দ করি এমন নির্লজ্জতা। গুরুগম্ভীর, অ্যাকাডেমিক/গবেষণাধর্মী লেখা যেমন পড়তে ইচ্ছা করে না, লিখতেও নয়। ষাটের একজন প্রধান লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দ লিখছেন আজকাল স্মৃতিচর্যা-ধরনের লেখা। বেশ লাগছে পড়তে। যা হোক, জার্নালকেই তবে এগিয়ে নিয়ে যাই যতটা পারি।

তাঁর ছবি দেখতে পেলাম আবার অনেকদিন পর। আগে মাঝে মাঝেই দেখা হত, হয় তাঁকে নয়তো তাঁর ছবি। দেখলেই মন প্রসন্ন হয়ে যেত। সুদর্শন মুখ জুড়ে থাকত হাসি, পরার্থিতা। আর লাগত তাঁকে বাংলাদেশের লেখকদের, বিশেষত কবিদের অভিভাবকের মতো। কাগজে যেমন তাঁর কবিতা থাকত সকল কবিতার মাথার উপরে, বাস্তবেও ছিলেন তিনি ঊর্ধ্বেই সবার। (সম্পূর্ণ…)

রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল: বাঙালিত্বের সম্পন্নতা

আহমাদ মাযহার | ৬ আগস্ট ২০০৮ ৯:৪০ অপরাহ্ন

রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল এই দুই মহৎ প্রতিভারই সৃষ্টিশীলতা ছিল বিপুল। শুধু তাই নয়, আধুনিক মধ্যবিত্ত বাঙালির মনস্তত্ত্বে তাঁদের উভয়েরই সামগ্রিক প্রভাব এতটাই গভীর যে এর তুলনা খুঁজে পাওয়া যাবে না। তা সম্ভব হয়েছিল তাঁদের উভয়েরই ব্যক্তিত্বে নানা গুণের সমন্বয় ঘটেছিল বলে। জীবন ও সৃষ্টিকর্ম — এই উভয় দিক থেকে আমাদের জাতীয় জীবনকে তাঁদের মতো করে এমন সুগভীর আর সুদূরপ্রসারী ভাবে আর কেউ প্রভাবিত করতে পারেন নি।

rabi-tokyo-1.jpg
জাপানের টোকিও শহরে রবীন্দ্রনাথ

—————————————————————–

হিন্দু সমাজে জন্ম ও বিকাশ বলে মুসলিম ঐতিহ্যের অনেক কিছুকে রবীন্দ্রনাথের পক্ষে আত্মস্থ করা সম্ভব হয় নি। এই সচেতনতাও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে ছিল। সে-জন্যই হয়তো তিনি বলেছিলেন যে তাঁর প্রতিভা ‘বিচিত্রগামী’ হলেও ‘সর্বত্রগামী’ হতে পারে নি। ফলে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের জাতীয় জীবন-বৈশিষ্ট্যের সমগ্র-প্রবণ হয়েও সমগ্রস্পর্শী হতে পারেন নি।

—————————————————————–

রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ছিলেন কবি। বাংলাদেশের মানুষ এই অনুভবের দীপশিখা তাঁদের কবিসত্তাকে আলোকিত করেছিল। ফলে কবিসাফল্যের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে তাঁদের স্বদেশমনস্কতা আর মাতৃভাষাপ্রীতি। এই দেশপ্রেম ও ভাষাপ্রীতির আলো তাঁদের জাতির সমকালকে যেভাবে আন্দোলিত করে তুলেছিল সেভাবে অন্য কোনও জাতির ওপর সে-জাতির কোনও কবির এমন প্রভাব ঘটেছিল বলে মনে হয় না। (সম্পূর্ণ…)

« আগের পাতা | পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com