স্মৃতি

কবি শহীদ কাদরী: আড্ডার উজ্জ্বল পুরুষ ও কবিতার মুহূর্ত

ফারুক আলমগীর | ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ১১:৪০ পূর্বাহ্ন

border=0উনিশো বাষট্টির প্রারম্ভে আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম পাঠ গ্রহণের দিনগুলো ছিলো মিছিলে মুখরিত, অতিশয় অগ্নিগর্ভ। আইয়ুবের দুঃসহ সামরিক শাসনের সঙ্গে যোগ হয়েছে শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্র-সমাজের তুমুল বিক্ষোভ। সেই এক অস্থির সময়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড স্তব্ধ হয়ে থাকেনি। তুমুল আন্দোলনের মুখে বছরের শেষে সরকার শিক্ষানীতি বাতিল করতে বাধ্য হয়। আন্দোলন স্তিমিত হয়ে কিছুটা শান্তি ফিরে এলে তেষট্টির প্রারম্ভ থেকে পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয় ভবনের শ্যাওলা-জমা দেয়ালগুলো নতুনতর স্পর্শে জেগে ওঠে। একদিকে সংস্কৃতি সংসদের উদ্যোগে কবিতার বাণীতে আর আকর্ষণীয় ভাষায় বিস্ময়কর পোস্টারগুলো যেমন নবীনদের মধ্যে প্রেরণার সৃষ্টি করে, অন্যদিকে নতুন ও ব্যতিক্রমী ধরনের সাহিত্য সংকলন গোটা বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে নবতরঙ্গের যবনিকা উন্মোচন করে।

অগ্রজ কবি শহীদ কাদরীর সঙ্গে আমার এবং আমাদের ষাট দশকের নতুন ধারার ব্যতিক্রমী সাহিত্য আন্দোলনের সতীর্থদের কখন প্রথম সাক্ষাৎ ঘটেছিলো মনে নেই। দুর্বল-চিত্ত স্মৃতির কারণে তথাপি সমাচ্ছন্ন নয় এমন অনেক ঘটনা এখনো আমাকে তাড়িত করে। ‘বহুব্রীহি’, ‘প্রতিধ্বনি’, ‘স্বাক্ষর’, ‘সাম্প্রতিক’, ‘কালবেলা’ ও ‘কণ্ঠস্বর’-এর জয়যাত্রা এবং আলোচিত সমালোচিত কালের একটা সময় জুড়ে শহীদ কাদরীই ছিলেন আমাদের একজন অনন্য প্রাতিস্বিক ব্যক্তিত্ব। আমাদের সাহিত্য আন্দোলনের পালের গোদা (কবি রফিক আজাদের দেয়া অভিধা) অগ্রজ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সমবয়সী হলেও আমাদের সম্পর্ক ছিলো অন্যরকমের যা একটা স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যের দাবীদার। সায়ীদ ভাই-এর সঙ্গে আমাদের ভালোবাসা, কঠিন তাত্ত্বিক আলোচনা, কথোপকথনে হাসি-মশকরার মধ্যে একটা সিরিয়াসনেসের দেয়াল ছিলো; শহীদ কাদরী আর আমাদের মাঝে কোন দেয়াল ছিলো না। প্রাচীরবিহীন সম্পর্কে সমতল প্রত্যক্ষ করা যায় দিগন্তের কোল পর্যন্ত, শহীদ কাদরী আর আমাদের সম্পর্ক তাই দিগন্ত ছুঁয়েছিলো।

‘স্বাক্ষর’, ‘কণ্ঠস্বর’-এর কবিদের সঙ্গে শহীদ কাদরীর নিত্য উঠা-বাসা থাকলেও ‘স্বাক্ষর’-এ তাঁর কোন স্বাক্ষর ছিলো না অথচ ‘স্বাক্ষর’ ও ‘কণ্ঠস্বর’-এর করিবাই ছিলো তাঁর সবচাইতে কাছের মানুষ, যেমন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আবদুল মান্নান সৈয়দ রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, সিকদার আমিনুল হক, শহীদুর রহমান, ইমরুল চৌধুরী, প্রশান্ত ঘোষাল, রণজিৎ পাল চৌধুরী– সকলেই তাঁর অনুজ ও প্রিয়ভাজন ছিলেন। তবে স্বাক্ষর গোষ্ঠি ও কণ্ঠস্বর-এর এতগুলো সৃজনশীল মানুষের সঙ্গে সখ্য ও ভালোবাসা থাকলেও কবি শহীদ কাদরী বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে, মধুর ক্যান্টিনে কোনদিন আড্ডা দেননি, যদিও তাঁকে কদাচিৎ শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে দেখা গিয়েছিলো। তাও আবার তাঁর পুরোনো ঢাকার আড্ডার একজন প্রিয় অনুজ মাহবুব আলম জিনুর সন্ধ্যানে এসেছিলেন বলে। এই মাহবুব আলম জিনু জগন্নাথ কলেজে একদা সেকদার আমিনুল হকের সতীর্থ ছিলো এবং জিনুর মাধ্যমেই বিশেষ করে আমার শহীদ কাদরীর সঙ্গে প্রগাঢ় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। (সম্পূর্ণ…)

‘তোমার অভিসারে যাব অগম পারে’– কবি শহীদ কাদরীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

লুতফুন নাহার লতা | ১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ৩:৪৬ অপরাহ্ন

Shahid-Lataনিকটজন কেউ মারা গেলে চট করে তাঁকে নিয়ে কিছু লেখা প্রায় অসম্ভব কাজ। বিশেষ করে আমার জন্যে। আমি তখন কেমন তলিয়ে যাই নানান রকম স্মৃতির ভেতর। ঠিক কোথা থেকে কি দিয়ে শুরু করব তা বুঝতে পারি না। ২৮ আগস্ট কবি শহীদ কাদরী চলে গেলেন। আমার সেই একই বাণী-প্রতিবন্দী দশা।
ভেকেশানে ছিলাম কানাডার টরন্টোতে। সেখানে থেকেই জানলাম কবি শহীদ কাদরী আবার হাসপাতালে। মন খারাপ হয়ে গেল। ফেসবুকে খুটিয়ে খুটিয়ে নিউজগুলো পড়লাম। রক্তে ইনফেকশান। জ্বর। তাঁর শরীর ডায়ালিসিস আর নিতে পারছে না। মন বলল এমন তো অনেকবারই হয়েছে। ঠিক হয়ে যাবে। টরন্টোর ভেকেশান শেষে ফিরে এসেছি নিউইয়র্কে। কবির শরীর আগের চেয়ে ভাল জেনেছি। কারা কবির পাশে আছেন কেমন আছেন খোঁজ নিয়ে জেনেছি। কবি দু’চার দিনের মধ্যে নীরা ভাবীর জামাইকার পারসন্স বুলোভার্ডের বাসায় ফিরবেন তাও জেনেছি। মন শান্ত হয়েছে জেনে যে তিনি ভাল আছেন, কথাবার্তা বলছেন।
২৮ তারিখ সকালে হাঁটাহাটি শেষে ঘরে ফিরব বলে পা বাড়াতেই পকেটে বেজে উঠল ফোন। উডসাইডের বাসা থেকে ফোন করেছে দিঠি হাসনাত। কালি ও কলমের সম্পাদক আবুল হাসনাত ভাইয়ের মেয়ে দিঠি বেশ কিছুদিন হল আছে এই শহরে। ওর ফোনে জানলাম শহীদ কাদরী এই ভোরেই মারা গেছেন। ঢাকা থেকে হাসনাত ভাই তাকে জানিয়েছে। কাকে ফোন করলে সব খবর পাওয়া যাবে জানতে চাইলে হাসান ফেরদৌসকে কল করতে বললাম এবং জানলাম ওরা তখনো হাসপাতালে পৌঁছায়নি, পথে আছে। মুহূর্তেই আমার সারা আকাশ অসম্ভব নীলের চাঁদোয়ায় নিজেকে ঢেকে বোঁ বোঁ করে ঘুরতে লাগল। সারা আকাশ জুড়ে যেন নৃত্যের শেষ ঘূর্ণিচক্রের শেষে, নর্তকীর ঘাগরায় অলস বাতাসের ঝিমধরা ঘূর্ণন। আমি টলতে টলতে ঘরে এসে বসলাম। মন শুধু বলছে ‘অসম্ভব, এ অসম্ভব।’ (সম্পূর্ণ…)

মৃত্যুতে থামে না কোন কবির জীবন

আলফ্রেড খোকন | ৩০ আগস্ট ২০১৬ ১:১২ অপরাহ্ন

shahid-alfredপ্রথমে স্বেচ্ছানির্বাসনে বিদেশ-বিভূঁইয়ে, তারপর দেশে ফেরার তীব্র আকুতি থাকা সত্ত্বেও শারীরিক অসুস্থতার কারনে ফিরতে না পারার একবুক বেদনা নিয়ে সুদীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর প্রবাস জীবন পাড়ি দিয়েছেন তিনি! আশির দশকে বন্ধুদের প্রতি অভিমান করে (তাঁর ভাষায়) দেশ ছেড়েছিলেন। ২০১৪ সালে আমেরিকার জ্যামাইকায় কবির ফ্লাটে বসে কয়েক ঘন্টা আড্ডা হল। এই আড্ডাইটাই আমার সঙ্গে তার প্রথম ও শেষ দেখা। দুজনেরই জরুরী কাজ থাকা সত্ত্বেও কাজের কর্মসূচী কেড়ে নিতে পারল না আমাদের এই আড্ডার সময়। মাত্র ঘন্টা চারেক। তবু মনে হল চার ঘন্টা যেন চার মিনেটেই শেষ হয়ে হাওয়ার মত উড়ে গেল। আর মনে হল কত যুগের পরিচিত আমরা দুজন! বড় ভাই আর ছোট ভাই মিলেমিশে বসে আছি বাংলা কবিতার বাড়িতে।
শহীদ কাদরীর সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার ঘটনাটা বলি। কাজের প্রশ্নে আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যে ব্যস্ততম ১৮ দিন কাটিয়ে নিউইয়র্কে ফিরলাম ১৮ সেপ্টেম্বর। ২৩ তারিখ ফিরব দেশে। সম্ভবত ওইদিনই অস্টরিয়ার একটি গেস্ট হাউসে প্রেস কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন বাংলা কাগজগুলির প্রায় সবকটিতেই আমার ছবিসহ আমেরিকা ভ্রমণের খবর ছাপে। আর ওই দিন হঠাৎ একটি ফোন পাই আমার মোবাইল ফোনে। নারী কণ্ঠ। এটা কি কবি আলফ্রেড খোকন। আমি বললাম হ্যাঁ। আপনি? অপরপ্রান্ত থেকে বললেন, ভাই আমি নীরা ভাবী, শহীদ কাদরীর স্ত্রী। লিপি আমাকে তোমার নম্বরটা দিল বলে তোমাকে পেলাম। শহীদ তোমার খবর পেয়েই বলে যাচ্ছে– ‘ছেলেটা কবে এসেছে, কোথায় থাকছে, কি করছে, কে জানে। আমি তো চলতে পারি না। পারলে ওকে গিয়ে নিজেই একবার নিয়ে আসতাম।’ শহীদের কাছে তোমার কথা এভাবে শোনার পর ভাবলাম তোমাকে একটা ফোন দিই। যদি তোমার সময় হয় এখানে আসার। শহীদ বলেছে তুমি আসলে ওর ভাল লাগত। আমি তৎক্ষনাৎ নীরা ভাবীকে কথা দিই। এটা তো আমার কাছে পরম পাওয়া হবে। আমি আসব। (সম্পূর্ণ…)

দূর থেকে দেখা শহীদ কাদরী

আবদুস সেলিম | ২৯ আগস্ট ২০১৬ ৭:৩৬ অপরাহ্ন

Shahid-Kadree-singleশহীদ কাদরীর সঙ্গে আমার কোনো ঘনিষ্ঠতা ছিলো না। বলতে কি উনি আমাকে চিনতেনও না। পরিচয় হয়েছিলো সম্ভবত গত শতাব্দীর ঊনসত্তুর বা সত্তুর সালে। তখন আবদুল মান্নান সৈয়দ এবং আমি যৌথ সম্পাদনায় ‘শিল্পকলা’ নামে একটি অনিয়মিত লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করতাম। আমাদের দু’জনেরই কর্মস্থল ছিলো জগন্নাথ কলেজ। পত্রিকা সম্পাদনার কর্মকান্ডে আমরা লেখা সংগ্রহের জন্যে কবি-সাহিত্যিক প্রাবন্ধিকদের সাথে সময় পেলেই সাক্ষাৎ করতাম। সাহিত্য জগতের মানুষদের সাথে আমার তেমন কোনো যোগাযোগ ছিলো না। কারণ আমি কোনো প্রথিতযশা সাহিত্যিক ছিলাম না। ঐ জগতের মানুষদের সাথে আমার একমাত্র যোগসূত্র ছিল মান্নান।
যতদূর মনে পড়ে মান্নান আমাকে শহীদ কাদরীর পুরানা পল্টনের কোনো বাসায় নিয়ে গেছিলেন। শহীদ কাদরী তার আগে পর্যন্ত আমার পাঠ্যতালিকার নাম এবং আলোচনার বিষয় হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। সেই বাসায় অস্পষ্ট ও আচ্ছন্ন স্মৃতিতে তাকে যতটুকু উদ্ধার করতে পারি তা হলো শারীরিক গড়নে তিনি তখনও একটু মেদাক্রান্তই ছিলেন এবং স্বভাবে প্রমোদাকীর্ণ। সহজেই তিনি সকলকে তার প্রতি আকর্ষিত করতে পারতেন এবং আমাকেও করেছিলেন। অল্প সময়েই আড্ডা জমেছিলো এবং কথা প্রসঙ্গে বললেন, ‘বুঝলেন মান্নান, ভাবছিলাম রবীন্দ্রনাথ হমু তাই লেখাপড়া করি নাই, দাড়ি রাখারও ইচ্ছা আছিলো। কিন্তু এখন বুঝতাছি রবীন্দ্রনাথ হওন এতো সোজা না।’ তিনি যে একথাগুলো হুবহু এভাবেই বলেছিলেন তা দিব্যিকেটে আমি বলতে পারব না কিন্তু আবছা স্মৃতি সর্বদাই এমন একটি সংলাপের কথা আমাকে মনে করিয়ে দেয়। (সম্পূর্ণ…)

শহীদ কাদরী: মৃত্যুর গন্ধ পাচ্ছি, স্বদেশ আমাকে ডাকছে

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল | ২৯ আগস্ট ২০১৬ ৩:০৩ অপরাহ্ন

‘না, শহীদ সেতো নেই; গোধূলিতে তাকে
কখনও বাসায় কেউ কোনদিন পায় নি, পাবে না।
…………………
সভয়ে দরোজা খুলি- এইভাবে দেখা পাই তার- মাঝরাতে;
জানি না কোথায় যায়, কি করে, কেমন করে দিনরাত কাটে
চাকুরিতে মন নেই, সর্বদাই রক্তনেত্র, শোকের পতাকা
মনে হয় ইচ্ছে করে উড়িয়েছে একরাশ চুলের বদলে !
না, না, তার কথা আর নয়, সেই
বেরিয়েছে সকাল বেলায় সে তো- শহীদ কাদরী বাড়ি নেই।’
(অগ্রজের উত্তর/ শহীদ কাদরী)

Shahid
ক] মাতৃভূমি ত্যাগ করা লেখকের আত্মহত্যার সামিল
চির বাউন্ডুলে জীবিত শহীদ কাদরী বাড়ি ফেরেননি। এখন ফিরবেন লাশ হয়ে। দশ বছর বয়সে অর্থাৎ কৈশোরে ১৯৫২ সালে জন্মভূমি কলকাতা ছেড়ে ঢাকা আসেন। ঢাকায় বেড়ে ওঠা যৌবনের দিনগুলো ফেলে ১৯৭৮ সালে বিদেশ পাড়ি জমান। জন্মভূমি আর মাতৃভূমির নীড় ছেড়ে হাজার হাজার মাইল দূরে উড়াল দিয়ে চলে গেলেন নিরুদ্দেশে। তারপর আর ঘরে ফিরেননি। হয়ত তাঁকে অনেকেই খুজঁছেন। পাচ্ছেন না। তাই তিনি লিখেছেন- ‘অগ্রজের উত্তর’ কবিতা। বড়ভাই বলছেন-‘না, শহীদ সেতো নেই; গোধূলিতে তাকে/ কখনও বাসায় কেউ কোনদিন পায় নি, পাবে না।/ … বেরিয়েছে সকাল বেলায় সে তো- শহীদ কাদরী বাড়ি নেই।’ (সম্পূর্ণ…)

গুলশানের সেই কফিশপটির কথা কোনোদিন ভুলবো না

মিনার মনসুর | ১৭ মে ২০১৬ ১২:৩৩ অপরাহ্ন

sikder-aminul.jpgআমি তখন সংবাদ-এর সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করি। সিকদার ভাই এলিফ্যান্ট রোডের সেই প্রসিদ্ধ বাড়িটি ছেড়ে চলে গেছেন গুলশানে। ফলে আগের মতো ইচ্ছে হলেই আর ছুটে যেতে পারি না। এ নিয়ে প্রায় মন খারাপ থাকে। সিকদার ভাই মাঝেমধ্যে ফোন করেন। তাঁর শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। ক’দিন আগেই ব্যাংকক থেকে ফিরেছেন চেকআপ করে। তখনই ফোনে কথা হয়েছে। শুনেছি, অবস্থা বিশেষ ভালো নয়। আবারও হার্টের বাইপাস সার্জারি করাতে হবে। আমি সার্জারিটা করে আসার পক্ষেই মত দিয়েছিলাম। জলি ভাবীও তাই চেয়েছিলেন। কিন্তু সিকদার ভাইকে রাজি করানো যায়নি। তিনি সাব্যস্ত করেছেন মুম্বাইয়ের বিশিষ্ট একজন চিকিৎসককে দিয়ে করাবেন। দ্বিতীয় দফা বাইপাস সার্জারিতে তাঁর হাত নাকি খুব ভালো। সিকদার ভাইয়ের কাছের মানুষমাত্রই জানেন যে তিনি কতোটা খুঁতখুঁতে ছিলেন এসব ব্যাপারে। ব্যাংকক থেকে ফিরে আসার পর আবারও ফোন করেছিলেন। গলায় গাঢ় অভিমান। কিছু বলার মতো মুখ ছিল না আমার। এটা কি ভাবা যায় যে তাঁর দেশে ফেরার পর কয়েকদিন কেটে গেছে অথচ আমি দেখতে যাই নি প্রিয় এ মানুষটিকে। (সম্পূর্ণ…)

কবি রফিক আজাদ: যেমন দেখেছি

মুহাম্মদ সামাদ | ৩ এপ্রিল ২০১৬ ৭:৫৩ অপরাহ্ন

kobi_rafiqazad-0911.jpgএক.
আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কবি রফিক আজাদের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় বাংলা একাডেমিতে। তার চারতলার অফিস ঘরে। তার পাশের দুই ঘরে বসতেন কথাসাহিত্যিক রশীদ হায়দার ও সেলিনা হোসেন। কবি আসাদ চৌধুরী বসতেন তিন তলায়। আমি যতবার গেছি প্রায় ততবারই রশীদ ভাইকে পেয়েছি রফিক ভাইয়ের ঘরে। অনেক সময় রশীদ ভাই অফিসের ছোট-খাটো কাজও এই ঘরে বসেই সারতেন। দুজনের তুই-তুই সম্পর্ক, খিস্তি-খেউড় আর উচ্চস্বরে রফিক ভাইয়ের প্রাণখোলা হা হা হাসি সিগ্রেটের ধোঁয়ায় মিলে-মিশে জানালা দিয়ে হাওয়ায় উড়তে থাকতো। এই আড্ডায় ‘উত্তরাধিকার’-এর জন্যে দেশের নানা প্রান্ত থেকে পাঠানো লেখা পাঠ করে রফিক ভাইয়ের মজার মন্তব্য ছিল খুব উপাদেয় ও উপভোগ্য। তখনকার তরুণ কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় এখানেই। (সম্পূর্ণ…)

পঁচিশে মার্চের স্মৃতি: ঢাকার বাইরে

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস | ২৫ মার্চ ২০১৬ ৭:৫১ অপরাহ্ন

26-march.jpgএকাত্তরের মার্চ পুরো মাসটাই ছিল টালমাটাল। রাজনীতির বিশাল, বিস্তৃত জাল এক একবার ফুলে উঠছিল, দুলে উঠছিল, আর সমগ্র দেশ তাতে প্রচন্ডভাবে আন্দোলিত হচ্ছিল। তিন তারিখে জাতীয় সংসদ বসার কথা। ইয়াহিয়া খানের বেতার ঘোষণায় যখন তা বাতিল হল, তখন থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে এলো জনতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হলগুলোই এতদিন দুলছিল সমান তালে। সেদিন রাতে ছাত্র জনতা বস্তির মানুষ সবাই নেমে পড়লো রাস্তায়। এরপর সাতই মার্চের বক্তৃতা। দশ লক্ষ লোকের উপস্থিতিতে এদের কারো মাথায় লালপট্টি বহুজনের হাতে লাঠি–তো এদের সরব উপস্থিতিতে শেখ মুজিব শোনালেন এক শ্বাসরুদ্ধকর, নাড়া দেওয়া স্বতঃস্ফূর্ত বক্তৃতা–তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কবিতা। মনে পড়ে মহসিন হল থেকে আমরা ক’বন্ধু– নূরুল হুদা, সাযযাদ কাদির, মাহবুব সাদিক বের করেছিলাম চারপৃষ্ঠার কবিতা পত্রিকা। তাতে স্বাধীনতার ম্লোগান দেওয়া সব কবিতা আর ছড়া। সেটাই চার আনার বিনিময়ে মাঠের লোকেদের মাঝে বিতরণ করেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা চলছিল তখন–ইয়াহিয়ার ঘোষণার পর সবই আপনা আপনি বন্ধ হয়ে গেছে। আলোচনার ফাঁদে পা দিলেন শেখ সাহেব। আলোচনার কোনো গতি না দেখে বন্ধুদের অনেকেই হল ছেড়ে দেশের বাড়ি চলে গেল। ষোল মার্চে আমিও গেলাম পৈতৃক নিবাস বগুড়া শহরে। (সম্পূর্ণ…)

সন্তপ্ত সংসারের কবি রফিক আজাদ

ইরাজ আহমেদ | ১২ মার্চ ২০১৬ ৭:৪৭ অপরাহ্ন

rafiq_azad.jpgকবি চলে গেলেন। এখন ফাল্গুনের রোদ ফুরিয়ে আসছে। পথে জনস্রোত। পথে উদভ্রান্ত গাড়ির হর্ন। পথে জীবনের কলরোল। দেখতে পাচ্ছি কবি চলে যাচ্ছেন। হয়তো কাঁধে ব্যাগ, হয়তো নেই। পরনে জিন্স প্যান্ট, ঝলমলে টি-শার্ট। ঘাড়ের কাছে লাফিয়ে নেমেছে ঝাকড়া চুল। বিকেলের রোদ ভেঙে চলে যাচ্ছেন কবি রফিক আজাদ। আর কোনদিন এই মলিন শহরে ফিরবেন না কবি।

অসুস্থ ছিলেন। মৃত্যুর ছায়া তাঁর ওপর ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছিলো। কিন্তু রফিক ভাই সত্যি চলে যাবেন এমনটা কখনোই ভাবতে চায়নি মন। একজন কবির প্রস্থানে কি কোকিলেরা শোকসভা ডাকে? বৃক্ষ থেকে ক্রমাগত ঝরতে থাকে পত্রপুষ্প? কবির প্রস্থানে কি ভূমি নিষ্ফলা হয়? হারিয়ে যায় ঘাসের সবুজ? এসবের কিছুই ঘটে না জানি। আজ দুপুর পর্যন্ত এই শহরের হাসপাতালে বেঁচে ছিলেন কবি রফিক আজাদ। আগামীকাল থেকে শুধুৃই স্মৃতি।

আমাদের এই বিমূখ প্রান্তরকে পুষ্পিত করে তুলতে চেয়েছিলেন তিনি। শব্দে, ছন্দে, অনুভূতিতে বাংলা কবিতায় জাগিয়ে তুলেছেন এক আলাদা ভূখন্ড। সে ভূখন্ডে জন্ম নিয়েছে সুঠাম বৃক্ষ, বুনো পাখির মতো শব্দ এসে ঘর বেঁধেছে সেই বৃক্ষের ডালে। এসেছে বসন্ত, চৈত্রের হাহাকার আর শীতের নিরাসক্তি।
প্রায় তেত্রিশ বছর আগে প্রথম দেখা হয়েছিল তাঁর সঙ্গে। সাপ্তাহিক রোববার অফিসের এক সফেন আড্ডায়। যতদূর মনে পড়ে সময়টা আজকের মতোই এক বিকেল ছিলো। নিজের অফিস কক্ষে বসেছিলেন রফিক ভাই। সামনে অনেক লেখক আর অনুরাগীদের ভীড়। সন্তর্পণে জায়গা করে নিয়েছিলাম সেই ভীড়ে। তারপর এই শহরের পথে, কবিতা পাঠের মঞ্চে, সাকুরার নিয়ন্ত্রিত আঁধারে, বই মেলায় দেখা হয়েছে রফিক ভাইয়ের সঙ্গে। আমরা কথা বলেছি, আড্ডা দিয়েছি। কখনো নিঃশব্দে বসে থেকেছি তার সামনের চেয়ারে। তিনি হয়তো তখন তাকিয়ে আছেন বাইরে। কাঁচের জানালা ভেদ করে তাঁর দৃষ্টি চলে গেছে শেরাটন হোটেলের মোড়ে জমে থাকা গাড়ির দীর্ঘ লাইন পার হয়ে বহুদূরে। (সম্পূর্ণ…)

পরের জন্মে দেখা হবে তো রফিকভাই?

শান্তা মারিয়া | ১২ মার্চ ২০১৬ ৭:৩০ অপরাহ্ন

kobi_rafiqazad-09.jpgকবি রফিক আজাদের মৃত্যু সংবাদ আমাকে স্তব্ধ করে দিল। আমাদের প্রিয় মানুষেরা এত দ্রুত চলে যান কেন? কবি রফিক আজাদকে দেখেছি আমার শৈশবে যখন বাবার হাত ধরে বাংলা একাডেমির সাধারণ সভায় এবং একুশের কবিতা পাঠের আসরে যেতাম। প্রথম তারুণ্যে পড়েছি ‘ভাত দে হারামজাদা’ কবিতাটি। কিন্তু আমার কাছে সব সময় অনেক বেশি অসামান্য মনে হয়েছে তার প্রেমের কবিতা। আমি হয়তো মুখস্থ বলতে পারবো ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ কিংবা ‘কণ্ঠে তুলে আনতে চাই’-এর সব কবিতা।

বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পে তাঁকে পেলাম আমাদের শিক্ষক হিসেবে। সেটা ১৯৯৬ সাল। বিশ শতকের শেষ দশকটি চলছে। আমাদের মতো বেশ কয়েকজন তরুণ লেখকের চোখে দুর্দান্ত সব স্বপ্ন। সেই স্বাপ্নিক অভিযাত্রায় তিনি ছিলেন পথ দেখানো আলো। তিনি আমাকে এবং আমাদের অনেককে শিখিয়েছিলেন স্বপ্ন দেখতে। শিখিয়েছিলেন নিজের স্বপ্নকে ভালোবাসতে। প্রকৃত জৈমিনী হয়ে তিনি আমাদের সামনে খুলে দিয়েছিলেন এক নতুন জগৎ। তবে শুধু স্বপ্ন নয়, কবিতা নয়, তিনি প্রায়ই বলতেন, প্রতিটি শিল্পই রক্ত দাবি করে। দাবি করে সমগ্র জীবন। শিল্পের পথে যারা চলাচল করে তাদের জীবন বড় কষ্টের, বড় যন্ত্রণার। সেই যন্ত্রণার স্বরূপ তিনি দেখিয়েছিলেন। তবে রূঢ়ভাবে নয়, বরং আশ্চর্য মায়ায়। (সম্পূর্ণ…)

ফিরে দেখা: কবি কায়সুল হক ও আমাদের কায়সুল ভাই

মঞ্জু সরকার | ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ১:৫৪ অপরাহ্ন

kaisul-haq.jpgপঞ্চাশ উত্তীর্ণ বয়সে প্রকাশিত হয় কবি কায়সুল হকের প্রথম কাব্যগ্রন্থ শব্দের সাঁকো । এই একটি মাত্র তথ্য থেকেও তাঁর ব্যতিক্রমী কবি স্বভাব ও চারিত্র্য-বৈশিষ্ট্য আন্দাজ করা যায় অনেকখানি। নিজের কবিখ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা বাড়ানোর তোয়াক্কা না করেই, সারা জীবন সাহিত্যের জন্য ছিলেন আত্মনিবেদিত। পাকিস্তান আমলে রংপুর জেলাশহরে বাস করেও উন্নতমানের সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। উভয় বাংলার বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকরা লিখেছেন তাঁর সম্পাদিত পত্র-পত্রিকায়। সেই সুবাদে শামসুর রাহমান, জীবনানন্দ দাশ, অন্নদাশঙ্কর রায়, বুদ্ধদেব বসু, নরেশ গুহ, শিবরাম চক্রবতীর মতো অনেক বিখ্যাত কবি-লেখকের সঙ্গে গড়ে উঠেছিল নিয়মিত পত্র-যোগোযোগ। স্বাধীনতার অব্যাবহিত পরে ঘনিষ্ঠ বন্ধু কবি শামসুর রাহমান ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উদ্যোগে ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় সপরিবার স্থায়ীভাবে থাকার জন্য যোগ দেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের চাকরিতে। সংস্থাটির দ্বিতীয় প্রধান কর্তাব্যক্তি হিসেবে মাসিক ‘বই’ পত্রিকা সম্পাদান করেছেন, বহু কবি লেখকের গ্রন্থের প্রকাশ ও প্রসারে সহযোগিতা করেছেন, সাহিত্যের আড্ডা-আলোচনায় উৎসাহিত করেছেন প্রিয় লেখক-কবি বন্ধুদের, কিন্তু আপন কাব্যপ্রতিভার প্রচার ও গ্রন্থ প্রকাশের ব্যাপারে ছিলেন উদাসীন। শব্দের সাঁকোর পর আরো একটি কাব্যগ্রন্থসহ রবীন্দ্রনাথের নিরুপম বাগান, স্বদেশ সংস্কৃতি রবীন্দ্রনাথ, আলোর দিকে যাত্রা ও অনিন্দ্য চৈতন্য শিরোনামে কয়েকটি গদ্যগ্রন্থ বেরিয়েছে মাত্র। কবিতায় অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০০১ সালে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। মৃত্যুর কয়েকমাস আগে, ২০১৫-এর ডিসেম্বরে বাংলা একাডেমির মাধ্যমে পেয়েছেন সাদাত আকন্দ সাহিত্য পুরষ্কার। (সম্পূর্ণ…)

আমার দেখা আবদুশ শাকুর

দিলরুবা আহমেদ | ১৫ জানুয়ারি ২০১৬ ১:১৪ অপরাহ্ন

abdus-sakur.jpg‘গুয়ানজু’ এয়ারপোর্টে আমরা অপেক্ষা করছিলাম। দিনটি ছিল ১৫ই জানুয়ারি ২০১৩। ঢাকা থেকে ফিরছিলাম টেক্সাসে। সে-বার টিকেট কিনতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত গুয়ানজু নাম-টাই ছিল অচেনা। ভূগোলের কোন পৃষ্ঠায় কোনদিন চোখেও পড়েনি। অথচ এখন ইমতিয়াজ (আবদুশ শাকুরের ছোট ছেলে) প্রায়ই বলে ‘চীনের দুঃখ হোয়াংহো, আমাদের দুঃখ গুয়ানজু’। বোডিং হয়ে গিয়েছিল, একজন স্টুয়ার্ড এসে বলল, তোমরা দেশে ফোন কর জরুরি খবর আছে। সেই খবরটাই ছিল যে এতটা মারাত্মক মর্মভেদী তা বোধ হয় ভাবতেও ভয় পেয়েছিলাম ঐ ক্ষণে কিন্তু যেতে হলো তারই ভেতর দিয়ে। সম্পূর্ণ অচেনা দেশে, প্লেনের মাঝে বসে জানলাম আমাদের বাবা আবদুশ শাকুর মারা গেছেন। আমরা যে ফিরবো ১৫ই জানুয়ারি সেটা উনি জানতেন, দুইতিন মাস আগে থেকেই জানতেন। টিকেট কেটেই ওনাকে জানিয়েছিলাম। উনি জেনে রাখলেন আমাদের ফেরার দিন ১৫ই জানুয়ারি ২০১৩। বললাম ২০১২তে ঢাকায় যাচ্ছি, ফিরবো ২০১৩তে, অনেক দিন। আসলে মাত্র একমাস, ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি। বাবা তাতে খুব হাসলেন। আজ ভাবতে অবাক লাগে বাবা জানতেন দিনটির কথা, ১৫ই জানুয়ারি, শুধু জানতেন না ঐ দিনে আমাদের সাথে সাথে উনারও ফেরা হবে কোথাও, যাত্রা করবেন শেষ যাত্রায়। না ফেরার দেশটি ওনারও দেখা হয়ে যাবে। গুয়ানজু হয়ে যাব শুনে উনি বলছিলেন, ভালই তো নতুন রুটে আসছো, আটলান্টিক হয়ে তো অনেক এসেছো এবার আস পেসিফিক হয়ে, পৃথিবীকে পেচিয়েও ধরা হলো দুদিক থেকে। (সম্পূর্ণ…)

« আগের পাতা | পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com