স্মরণ

মিজান রহমান ও তাঁর কবিতা

সরকার মাসুদ | ২২ december ২০১৭ ২:৩১ অপরাহ্ন

mizanঊনষাট বছর বয়সে কবি মিজান রহমান (১৭ ফের্রুয়ারি , ১৯৫৮) প্রয়াত হলেন গত ৩০ সেপ্টেম্বর। আশির প্রজন্মের প্রথম সারির কবি ছিলেন মিজান। ৪৪/৪৫ বছর পর্যন্ত তিনি শুধুই লিটল ম্যাগাজিনে লিখেছেন। তারপর নিজেকে বিস্তৃত করেন দৈনিকের সাহিত্যপাতা পর্যন্ত। তার অনেক কবিতাপ্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলো, কালের কন্ঠ, সমকাল এবং যায় যায় দিন- এর সাহিত্য সাময়িকীতে।
মিজান রহমান জীবনের শেষ ১৭/১৮ বছর কাটিয়েছেন ঢাকা জেলার দোহার থানাস্থ হাতুরপাড়া গ্রামে। ঠিক এ ধরনের পল্লীকেই কবি আবুবকর সিদ্দিক বলেছেন ‘কবিতাসর্বস্ব মফস্বল।’ তো এরকম নির্ভৃত গ্রামে বসে মিজান লিখে গেছেন ভাবমগ্ন, দর্শনদীপিত ছোট ছোট কবিতা। মিজান যখন ঢাকায় থাকতেন, ধানমন্ডি ১৫ নং- এর ভেতরে একটা টিনশেড ছিল তার বাসা, তখনো তার কবিতা আরও ছোট ছিল, ভাবসমৃদ্ধ ছিল। উত্তরকালে সেই তন্ময়তা এবং ভাবাতুরতা একটা বিশিষ্ট পর্যবেক্ষণ-বলয় তৈরি করতে পেরেছিল, আমার এমনই ধারণা। কেননা, হাতুরপাড়ার পৈত্রিক ভিটেয় থিতু হওয়ার পর তিনি কবিতা নিয়ে ভাবার অবসর পেয়েছিলেন অনেক বেশি।
ব্যক্তি মিজানের মতো তারঁ কবিতাও অন্তর্মুখি। ব্যক্তির মনের একান্ত নিবিড় অনুভব ও গভীরাশ্রয়ী জীবনভাবনা তার কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মিজানের কবিতায় অন্ধকার, সূর্য, নক্ষত্র, ছায়াপথ, শিশির, সরিসৃপ প্রভৃতি শব্দের পৌনপুনিক ব্যবহার মনে করিয়ে দেয় জীবনানন্দ দাশের কথা। কিন্তু এইসব মিলে যে মুখোস তৈরি হয় তার পেছনেই আছে কবি মিজানের আসল মুখটি। প্রথমত, তিনি জীবনানন্দের মতো পয়ারের আশ্রয় নেননি। প্রথানুগ অন্য কোন ছন্দও ব্যবহার করেননি। দ্বিতীয়ত, ‘সূর্য মনি-কর্নিয়ার প্রতিবিম্ব হয়ে’ প্রখর রশ্মি ছড়াচ্ছে এমন কবিকল্পনা কিংবা ‘বিশালতা গ্রাস করে কুঁকড়ে যায় ঘাস’ এ জাতীয় কল্পছবি মিজানকে আলাদা করেছে জীবনানন্দ থেকে। (সম্পূর্ণ…)

আশির স্বতন্ত্র কবিকণ্ঠ মিজান রহমান

পুলক হাসান | ২১ december ২০১৭ ৮:৪৭ অপরাহ্ন

mizanপাখি নেই পাখির প্রতীক্ষায়
পাখির প্রতীক্ষায় উন্মুখ আকাশ

তবে কী মানব এ জীবন পাখির মতন? মর্ত্যের খাঁচা ছেড়ে তাকে উড়ে যেতেই হয় আকাশের ঠিকানায়? পৃথিবীর বন্ধন মুক্ত হওয়ার আগে উপরোক্ত দুই লাইনের ছোট্ট ‘পাখি নেই’ কবিতায় এ কথাই যেন জানিয়ে দিয়ে গেলেন কবি মিজান রহমান যে, আকাশই ছিল তার প্রতীক্ষায় উন্মুখ।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে আটটায় ঢাকার দোহার থানার হাতুরপাড়া গ্রামের নিজ বাড়িতে মারা যান তিনি। তার এই হঠাৎ বিদায় আমার জন্য একই সঙ্গে বিস্ময় ও বেদনাদায়ক। কারণ, মাত্র দুইদিন আগে তার সঙ্গে আমার কথা হয়। তাকে কুরিয়ার করার জন্য আমাকে তার গ্রামের ঠিকানাটা দেয় এবং বলেছিল, কন্টিনেন্টাল-এ যেন পাঠাই। এখন তাকে আমি কোন ঠিকানায় কুরিয়ার করব?
বয়সে সে আমাদের চেয়ে বছর তিনেকের বড় কিন্তু সমসাময়িক। তার জন্ম ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৮। কবি সরকার মাসুদ সূত্রে অনেকটা বিলম্বে পরিচয় হলেও কবিতাকেন্দ্রিক অকৃত্রিম সম্পর্কটা গড়িয়েছিল অনেক দূর। তার কবিতাই সে-সম্পর্ক গভীর করে তুলেছিল। মৃত্যুর খবরটাও দিয়েছিল সরকার মাসুদই, সুদূর কুড়িগ্রাম থেকে। ওর সঙ্গেই সম্পর্কটা ছিল গভীর এবং নিবিড়। তাই মিজানের আকস্মিক বিদায়ের খবরটা জানাতে কণ্ঠ ভিজে উঠেছিল ওর। আমারও খারাপ লেগেছে বৈকি। কিন্তু সবারই তো যেতে হবে ও-পথে। মিজান একটু আগে এই হিংস্র উন্মত্ত পৃথিবী ও মেকি সামাজিক বন্ধন থেকে দূরে চিরশান্তির দেশে গিয়ে হয়তো ভালোই আছে এবং আমাদেরকে তারুণ্য ও সাম্যের কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর সেই বিখ্যাত গানের চরণ শুনিয়ে জীবনের চরম সত্য মেনে নিতে উদ্বুদ্ধ করছে : ‘ভাল আছি ভাল থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’। (সম্পূর্ণ…)

এ দেশে তুমি মূল্যহীন

সুমন সাহা | ১৯ december ২০১৭ ১:১০ অপরাহ্ন

Kanu Bhuson Saha 2017বাবা, এ দেশে তুমি মূল্যহীন! কারণ তুমি সনদবিহীন মুক্তিযোদ্ধা। তুমি দেশ স্বাধীনের জন্য যুদ্ধ করেছিলে ১৯৭১ সালে আর এখন ২০১৭ সাল। ৪৬ বছর পেরিয়ে গেছে। আমি প্রায়ই বলতাম তোমার সনদের কথা। তুমি তখন বলতে- ‘দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি, সনদ দিয়ে কী হবে?’ ১৯৯৬ সালে একবার ভাবলাম তোমার সনদের জন্য আবেদন করবো। ময়মনসিংহ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ থেকে আবেদনপত্র নিয়ে এলাম নিজেই। আবেদনপত্রটা তোমাকে দেওয়ার পর তুমি বললে, ‘কার কাছ থেকে সার্টিফিকেট নেবো?’ আমি চুপ হয়ে গেলাম। তা-ও তো ২০ বছর হয়ে গেলো। তোমার কী নিয়ে অভিমান ছিলো জানি না। তোমার মুখে কোনোদিন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুনিনি। যেটুকু শুনেছি, যাদের কাছ থেকে শুনেছি, তারা হলেন তোমার মা-বাবা, আমার ঠাম্মা (ঠাকুরমা) ও দাদু আর পাশের বাসার খগেন (খগেন বষাক) জেঠার কাছে (তাদের কেউ এখন আর বেঁচে নেই)। তুমি যুদ্ধে যাওয়ার বেশ কিছুদিন পরের ঘটনা (জুলাই ১৯৭১)। বাড়িতে এসে কয়েকজন দাদুকে বলে গেলো, রেল সেতুর কাছে তিনজন মুক্তিযোদ্ধার লাশ পড়ে আছে। তার মধ্যে তোমার লাশও আছে! (সম্পূর্ণ…)

উত্তরাধুনিক সাহিত্য এবং রোকেয়ার ‘জ্ঞানফল’

মোস্তফা তোফায়েল | ১০ december ২০১৭ ৩:২৪ অপরাহ্ন

Rokeya‘জ্ঞানফল’ রোকেয়া এস. হোসেনের একটি রূপকথা গল্প, বা অ্যালেগরি। এ গল্পটি আছে তাঁর ‘মতিচূর’ দ্বিতীয় খন্ডে। ‘জ্ঞানফল’ গল্পটি রোকেয়ার অন্য অনেক গল্প বা গল্পাকৃতির প্রবন্ধের মতো নারীচরিত্রপ্রধান। এই রূপকটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে আছে ‘হাভা’ বা হাওয়া, ইংরেজিতে যিনি ‘ইভা’, তার সাথে যুগল চরিত্র হিসেবে আছে ‘আদম’। তার রূপক কহিনিটি এখানে পুনর্সৃষ্ট। রোকেয়া পাদটীকায় উল্লেখ করেছেন, “এস্থলে কোরান শরিফ বা বাইবেলের বর্ণিত ঘটনার অনুসরণ করা হয় নাই।”

রূপক গল্পটির চতুর্থ অনুচ্ছেদেই একটি প্রমিথীয় দ্রোহের লক্ষণ স্পষ্ট। প্রমিথিউজ দেবতাকুলে সম্মান ও মর্যাদার আসনে ছিলেন; ছিলেন দেবরাজ জিউসরে প্রিয় পাত্র। কিন্তু স্বর্গীয় সুখ তার ভাল লাগেনি।শুধু আদেশ আজ্ঞা পালন জিউসের সমর্থনে শোভাযাত্রায় শরিক হয়ে ‘ধন্য ধন্য, জিউস দেব’ বলতে বলতে তাঁর বিরক্তি এসে গিয়েছিল। মর্ত্যের মৃত্তিকা তার মাতা; মাতার সন্তান মানবকুল অনাহারে অর্ধাহারে, ছিন্নবস্ত্রে, বিনাবস্ত্রে বসবাস করে। তারা জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেচনা ও উদ্ভাবনী জানে না; বঞ্চনা ও প্রতারণা বুঝে না; সম্পদ সৃষ্টির প্রণোদনা উপলব্ধি করে না। তাই প্রমিথিউজ স্বর্গে আয়োজিত একটি শোভাযাত্রা থেকে আগুনের মশাল চুরি করে এনে মর্ত্যের মানবজাতির হাতে দিলেন। বললেন, ‘তোমরা আমার ভাই। এই মশাল জ্বালিয়ে রেখ; জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা করো; কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করো। শ্রমের ঘাম আর ত্যাগের রক্ত এক সাথে প্রবাহিত করো; কেউ তোমাদের দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’ জিউস প্রমিথিউজের এই বিদ্রোহে মহা ক্ষুব্ধ হলেন। তিনি প্রমিথিউজকে স্বর্গ থেকে বহিষ্কার করে দিলেন। তাকে লোহার শেকলে বেঁধে ককেশাস পর্বতে বন্দি করে রাখা হলো।
‘জ্ঞানফলে’ রোকেয়া লিখলেন, (সম্পূর্ণ…)

ইংরেজ-রাজের রোষানলে নজরুল : ফিরে দেখা

মুহিত হাসান | ২৭ আগস্ট ২০১৭ ৫:০৯ অপরাহ্ন

Nazrul islamমনোবিকারগ্রস্ত নিন্দুককুল ও বিদ্রোহত্রস্ত ঔপনিবেশিক সরকারি মহল, এই দুই মহল নজরুলের উত্থানকাল থেকে তাঁর অসুস্থ হয়ে পড়ার আগ অব্দি তাঁকে হেনস্তা করতে উদ্যোগী ছিল– এমনটা বললে হয়তো অত্যুক্তি হবে না। তবে ব্রিটিশরাজের তুলনায় নিন্দুকদের পীড়ন ছিল নেহাতই মামুলি। তারা কুরুচিপূর্ণ লেখায়-কথায় তাঁকে হেয় করতে চাইতো। আর ব্রিটিশরাজ নজরুলকে ঘায়েল করতে চেয়েছিল বই নিষিদ্ধ করে, এমনকি জেলে ভরেও।
নজরুল ঠিক কোন সময়টায় প্রথমবারের মতো ইংরেজ-রাজের নজরে পড়েন, তা দিনক্ষণ মিলিয়ে বলা মুশকিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বাঙালি পল্টনে সৈনিক হিসেবে কর্মরত নজরুল রুশ বিপ্লবের খবর জেনে উৎসাহিত হয়েছিলেন এমন খবর তাঁর সহ-সৈনিক শম্ভুনাথ রায় দিয়েছেন। পল্টন থেকে ফিরে আইরিশ বিপ্লবী রবার্ট এমেটের জীবনকথাও রচনা নজরুল করেছিলেন ছদ্মনামে। কাজেই ব্রিটিশরাজ-বিরোধী মনোভাব যে পরাধীন স্বদেশে জন্ম নেওয়া নজরুলের মধ্যে তরুণ বয়স থেকেই প্রবাহিত হচ্ছিল এমনটা বলা অসংগত নয়। এসব কর্মকান্ড ইংরেজ সরকারের স্বভাবতই ভালো লাগবার কথা নয়। তবে পল্টনে থাকার সময়েই তিনি বিপ্লবপ্রীতির কারণে ব্রিটিশরাজের গোয়েন্দাদের নজরে পড়েছেন, এমন খবর মেলে না। গবেষক শিশির করের ধারণা, ১৩২৮ বঙ্গাব্দে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রথম প্রকাশের পর থেকেই পুলিশ দপ্তর নজরুলের ব্যাপারে নড়েচড়ে বসেছিল। কিন্তু তখন কবির বিরুদ্ধে আইনানুগ পথে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে কীভাবে, তা নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছিল। কারণ, ঠিক কোনদিক থেকে এখানে সরাসরি ইংরেজ সরকারকে আক্রমণ করা হয়েছে, তা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা নির্ণয় করতে পারেননি। নজরুলের সমসাময়িক কথাসাহিত্যিক অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ধারণা ছিল যে “এ কবিতায় হিন্দু-মুসলমান দু’জনেরই এত পুরাণ প্রসঙ্গ ঢুকেছে যে ব্রিটিশ সরকার সরাসরি একে রাজদ্রোহ বলে চিহ্নিত করতে পারলো না।…একে রাজদ্রোহ বলতে গেলে ধর্মের উপরে হাত দেওয়া হবে।” (সম্পূর্ণ…)

এবং নজরুলের লাঙল

মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক | ২৭ আগস্ট ২০১৭ ৪:৪৪ অপরাহ্ন

Nazrulজাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক ও সংগীতসহ সাহিত্য ধারার নানামাত্রিক সৃষ্টিশীলতার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। জীবনের একটি অধ্যায়ে যুক্ত ছিলেন সাংবাদপত্রের সাথে। সম্পাদক হিসেবে সম্পাদনা করেছেন একাধিক পত্রিকা। এই সম্পাদনার সুবাদে তিনি জাতীয় জাগরণের কবি হিসেবে জনগণকর্তৃক নন্দিত হয়েছেন। এ সমস্ত পত্রিকায় সাহিত্যকর্ম ছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ। সেনাবাহিনীতে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর ছাত্র জীবনের ইতি ঘটলেও এ সময়েই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সাহিত্যাঙ্গনে পদার্পন করেন। করাচি সেনানিবাস থেকে প্রেরিত তাঁর গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় সওগাত, প্রবাসী ও বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্যসহ বিভিন্ন পত্রিকায়। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ৪৯ নম্বর বেঙ্গলি পল্টন ভেঙে দেয়া হলে নজরুল আর আসানসোলে ফিরে যাননি, স্কুলের দিকেও পা বাড়াননি। কলকাতায় এসে বাল্যবন্ধু শৈলজানন্দের হোস্টেলে ওঠেন এবং পরবর্তী পর্যায়ে সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ কমরেড মুজফফর আহমদের আস্তানায় স্থিত হন। এই মহান কমরেডের সান্নিধ্য ও পৃষ্ঠপোষকতায় প্রবেশ করেন পত্রিকার পরিমণ্ডলে। এ সময়, ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ২ জুলাই এ. কে. ফজলুল হকের অর্থায়নে ও সম্পাদনায় ‘দৈনিক নবযুগ’ নামের সান্ধ্য দৈনিক প্রকাশ করা হলে, তার সার্বিক দায়িত্ব অর্পিত হয় কমরেড মুজফফর আহমদ এবং নজরুল ইসলামের উপর। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি যুক্ত হন যথাক্রমে ধুমকেতু ও ‘লাঙল’ এর সাথে। (সম্পূর্ণ…)

আমাদের বেবী আপা

আনিসুর রহমান | ২৫ জুলাই ২০১৭ ৮:৩৮ পূর্বাহ্ন

baby.gifবদরুদ্দোজা মোঃ ফরহাদ হোসেন সংগ্রাম ভাইর সঙ্গে রিক্সায় করে সেগুনবাগিচায় একটি ছোট ছিমছাম দালানের দোতলা বাসায় আমরা গিয়ে হাজির। বেবী আপা বাসায় নেই। বাসায় আছেন বুয়া, বেবী আপার ছোট ছেলে পুটু, সম্ভবত বুয়ার ছেলে আনোয়ারও ছিল। পুটু মানে কি বেবী আপার পরিচিত সকলেই তার মামা। আমাদের দেখেই পুটুর উৎফুল্ল কথার ঝুড়ি- মামা আসেন, বসেন। আম্মুতো বাসায় নাই। কিন্তু এসে যাবেন শীঘ্রই। খানিকক্ষণ পর বেবী আপা আসলেন। বাসায় ঢুকার আগেই পুটুর মাধ্যমে খবর পেয়ে গেলেন- আমরা এসেছি। বেবী আপা বাসায় ঢুকলেন পরিচয় পর্বের পরে বললেন চা টা কিছু খাও। আজ তো রাত হয়ে গেছে। তুমি বরং ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে এসো। ওখানে বঙ্গবন্ধু যাদুঘরে আমার খোঁজ করো; দুপুরের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাশ শেষ করে এসো। ক্লাশ মিস করো না।
পরের দিন যথারীতি আমি যাদুঘরে গিয়ে হাজির। পাশের বাড়ির একতলা একটা ভবনে বেবী আপার সঙ্গে আমিও গেলাম। ভবনের একটা কক্ষে একটা টেবিল আর গোটা কয়েক চেয়ার। তিনি আমার খোঁজ খবর জানলেন। তারপর বললেন-
বন্ধ হয়ে যাওয়া সাপ্তাহিক বিচিত্রা আমরা নতুন ব্যবস্থাপনায় বের করব। তার প্রস্তুতি হিসেবে আসন্ন জাতীয় শোক দিবসে ১৫ আগস্টে ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’ নামে একটা স্মরণিকা প্রকাশ করব। আমার সঙ্গে তেমন কেউ নাই; কম্পিউটার কম্পোজের জন্যে আছে চম্পক। পুরো কাজটা আমি আর তুমি মিলে করব। আসলাম সানীও আমাদের সঙ্গে থাকতে পারে। তোমার কাজ হবে জুতো সেলাই থেকে চন্ডিপাঠ। শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং বিচিত্রা দুটোরই সম্পাদক থাকবেন শেখ রেহানা। আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আপা শ্রদ্ধাঞ্জলির কাজের সঙ্গে আমি থাকব। কিন্তু বিচিত্রার কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়া আমার জন্যে কঠিন হবে। সে দেখা যাবেনি। ও নিয়ে ভেবো না। (সম্পূর্ণ…)

বেবী মওদুদ: কেমন করে ভুলি সেই মুখ!

মাজহার সরকার | ২৩ জুন ২০১৭ ১২:০৭ পূর্বাহ্ন

baby.gifঘুম যখন ভাঙলো তখন চারটা দশ বাজে। বিছানায় শুয়েই মুঠোফোন হাতে নিয়ে দেখি পাঁচটা মিসড কল। একটা ম্যাসেজ ঝুলে আছে, খুলে দেখি- ‘অ্যাট প্রেস ক্লাব, হোয়ের আর ইউ?’। লাফিয়ে উঠে বসলাম বিছানার ওপর।

টলটলে পায়ে এক হাতে চোখ কচলাতে কচলাতে দরজা খুলে বেসিনের গিয়ে মুখ ধুলাম। রুমে এসে চেয়ারের পিঠ থেকে শার্টটা গায়ে দিয়ে দ্রুত বের হলাম রুম থেকে। ২০১২ সালের জুলাইয়ের কোন একটা দিন। তখন আমি থাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ২০৭ নাম্বার রুমে। হল গেটে এসে রিকশা করে রওয়ানা দিলাম প্রেস ক্লাবের উদ্দেশ্যে।

খুব সুন্দর একটা বিকেল। রোদের গা বেয়ে বাতাস বইছে। বৃষ্টিতে ভিজে ক্যাম্পাসের গাছগুলো সবুজ হয়ে আছে। কালো পিচের ওপর ছোপছোপ রোদ আর ছায়া। এর ভেতর দিয়ে রিকশাটা দুলতে দুলতে যাচ্ছে। আর আমার মনের ভেতরটা খচখচ করছে। কাজটা কি ঠিক হলো? মানুষটা আমাকে যেতে বলেছিলো চারটায়। একজন সংসদ সদস্য একা দাঁড়িয়ে আছেন আমার অপেক্ষায়, অথচ আমি দুপুরে ভাত খেয়ে কখন ঘুমিয়ে গেছি!

রিকশা দোয়েল চত্বর পেরিয়ে হাই কোর্টে আসতেই একটু সাহস পেলাম। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে কল দিয়ে বললেম, ‘আপা, ভুল হয়ে গেছে। ঘুমিয়ে গেছিলাম। আমি এসে গেছি, এই যে হাই কোর্টের সামনে।’ ওপাশ থেকে কোন রাগ বা আভিমান শুনতে পেলাম না। রিকশা শিক্ষা ভবনের পাশে আসতেই উল্টো পথ পার হওয়ার ভাবনায় তাড়াতাড়ি ভাড়া মিটিয়ে নেমে হাঁটা শুরু করলাম। (সম্পূর্ণ…)

‘কুইজদাতা’ শওকত ওসমানের দুটি উপহার

রাজু আলাউদ্দিন | ২ জানুয়ারি ২০১৭ ৮:২২ অপরাহ্ন

Osmanসৃষ্টিশীলতা ও মননের আধুনিকতা তীক্ষ্ণ রসবোধ ও কৌতুকবোধের মাধ্যমে একটি পরিশীলিত রূপ লাভ করেছিল বাঙালি মুসলমান লেখকদের মধ্যে শওকত ওসমানের মধ্যেই সর্বপ্রথম, আর এই প্রকাশের বাহন ছিল তার গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ। তার মনন-নির্ভর শ্লেষ ও বিদ্রুপের শানিত রূপ তাকে আলাদা করে দিয়েছিলো তার সমসাময়িক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্যিক স্বভাব ও স্বরূপ থেকে, যদিও দুজনেরই সৃষ্টির প্রেক্ষাপট প্রধানত মুসলমান সমাজ ও জনগোষ্ঠী। জ্ঞান বিজ্ঞানের একটি পরিশ্রুত রূপ শওকত ওসমানের মধ্যে যেভাবে ফুটে উঠেছিল তার তুলনা পরবর্তী অন্য কোনো সৃষ্টিশীল বাঙালি মুসলমান লেখকদের মধ্যে বিরল।

জননী, ক্রীতদাসের হাসি’র মাতা স্মরণীয় উপন্যাসের পাশাপাশি তার বহু গল্পে শিল্পী হিসেবে আধুনিক রুচির রূপকার যেমন হয়ে উঠেছিলেন, তেমনি তার প্রবন্ধেও আমরা দেখতে পাই উদার ও মুক্তবুদ্ধির এক লেখককে যিনি জাতীয়তা ও ধর্মীয়বোধের সংকীর্ণ সংস্কার থেকে পুরোপুরি মুক্ত। আর তার একমাত্র কবিতার বই নিজস্ব সংবাদাতা প্রেরিতও ছিল সেই সঘন কৌতুকরস থেকে উৎসারিত কাব্যময় আত্মভাষ্য। লেখক হিসেবে শওকত ওসমানের এসব গুণ আমাদের কাছে ছিল খুবই শ্রদ্ধার ও আকর্ষণের।

আমরা যেসময় লেখালেখি শুরু করেছি তখনই তিনি সর্বজনগ্রাহ্য ও নমস্য এক লেখক। শুধু লেখকই নন, শুনেছি তিনি তুখোড় অধ্যাপকও। কিন্তু এই তুখোড় অধ্যাপক যখন নিজেকে নিয়ে জীবদ্দশায় আত্মমৃত্যুর কাব্যবার্তা ঘোষণা করেন কৌতুকরসের মিষ্টতায়, তখন অনুমান করতে অসুবিধা হয় না ব্যক্তিমানুষটি আলাপচারিতায় কতটা উপভোগ্য হতে পারেন। (সম্পূর্ণ…)

পাণিহাটি-সোদপুরের রোকেয়ার কবর, রোকেয়া দিবস ও অন্যান্য

পূরবী বসু | ২৮ december ২০১৬ ১১:৪৬ অপরাহ্ন

Rokeyaযতই কেন না আমরা শ্রদ্ধায় অবনত এই মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়ার প্রতি, তাঁর জীবন ও বহুবিধ কর্ম সম্পর্কে বহু ভুল তথ্য আজো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সর্বত্র যার সংশোধন একান্ত জরুরী। জরুরী তাঁর জীবনের এবং সংগ্রামের কিছু কিছু অজানা তথ্য জানার প্রচেষ্টা। আমরা যেন বিশেষ মনোযোগ দিয়ে আবার ফিরে দেখি তাঁকে। নবতর পর্যায়ে যাচাই করি নারীর স্বাবলম্বিতার জন্যে তাঁর ভাবনা, অবদান; তাঁর পারিপার্শ্বকতা; দেখি তাঁর একান্ত নিরুপায় হয়ে বৃহত্তর স্বার্থে কখনো কখনো বাহ্যিক আচার-আচরণে সমঝোতা করার প্রয়াস।
এই সব প্রচেষ্টার সঙ্গে আমাদের আরেকটু বেশি সতর্ক হতে হবে তাঁর সঠিক মূল্যায়ণে এবং তাঁর বিষয়ে নির্ভুল তথ্য পরিবেশনে। নিচের প্রতিবেদন থেকে বোঝা যায়, পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে গবেষণা নিবন্ধে আজো প্রচুর ভুল তথ্য সংযোজিত রয়েছে বেগম রোকেয়ার বিষয়ে। পরিহাসের মতো শোনালেও সত্য, যে প্রতিবেদক এইসব তথ্যগত ভুলের কথা লিখেছেন তাঁর প্রতিবেদনের শিরোনামেই রয়েছে মস্ত বড় এক ভুল। “রোকেয়ার জীবনী” লিখতে তিনি “রোকেয়ার আত্মজীবনী” লিখে ফেলেছেন যা পড়ে মনে হতেই পারে যে নিজের জীবনের তথ্য-ই বুঝি সঠিক দেননি রোকেয়া। (রংপুর, নিজস্ব প্রতিবেদক,পাঠ্যপুস্তকে ভুলে ভরা রোকেয়ার আত্মজীবনী jagonews24.com ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬)।
কিন্তু কার্যত অবরোধপ্রথা নিয়ে তাঁর রচনা এবং অতি গোপনে ও একান্ত নিভৃতে বাংলা ও ইংরেজি ভাষা শিখতে গিয়ে তাঁর যে প্রবল বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল তাঁর বর্ণনা কিংবা নিজের প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের বিদ্যালয় সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল চালাতে গিয়ে যে বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত হতে হয়েছে তাঁকে সেসব কথা বিভিন্ন প্রবন্ধ ও গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করলেও যতদূর জানি, বিশদভাবে আত্মজীবনী লিখে যাননি রোকেয়া। ফলে এখানে নিশ্চয় বেগম রোকেয়ার স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলালের বরাদ দিয়ে জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক রোকেয়ার জীবনী লিখতে গিয়ে খ্যাতিমান লেখকদের ভুল তথ্য পরিবেশনার প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন। মানে, ভুলে ভরা “রোকেয়ার জীবনী”র প্রসঙ্গ এনেছেন। “রোকেয়ার আত্মজীবনী” নয়। আমাদের দেশের অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ও জনপ্রিয় লেখক/গবেষকগণ রোকেয়ার জীবনী লিখতে গিয়ে কতো ভুল তথ্য পরিবেশন করেছেন, এটাই ছিল বক্তব্য। এইসব গ্রন্থে রোকেয়ার বসতবাড়ির জমির পরিমান একশ গুণ হেরফেরে উল্লেখ করা থেকে শুরু করে তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সন তারিখ সঠিকভাবে উদ্ধৃত হয়নি। সঠিক হয়নি কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানুষের নাম ও পারিবারিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে দেয়া তথ্য। রোকেয়ার ছোটবোন হোমায়রা খাতুনের স্বামী বলে নজরুল-গবেষক আমীর হোসেন চৌধুরীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে হোমায়রার স্বামীর নাম তোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী। আমীর হোসেন চৌধুরী হলেন হোমায়রা ও তোফাজ্জল হোসেন চৌধুরীর পুত্র যিনি ১৯৬৪তে ঢাকায় হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা বাঁধলে দাঙ্গা প্রতিরোধ মিছিল ও আনুষঙ্গিক কর্মকান্ডে যোগ দিতে গিয়ে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান। আমীর হোসেন চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে তাঁর জীবনীর ওপর বাংলা একডেমী থেকে একখানা গ্রন্থ প্রকাশিত হয় (আমিনুর রহমান সুলতান, দাঙ্গায় শহীদ আমির হোসেন চৌধুরী, বাংলা একাডেনি, জুন ২০১৩)। এক বছর আগে সেই বইখানি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে লেখক শামসুজ্জামান আমীন হোসেন চৌধুরীর আত্মত্যাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন (শামসুজ্জামান, চৌষষ্টির নায়কের জীবনী, সাম্প্রতিক দেশকাল, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৫)। আমীর হোসেন চৌধুরী শৈশবে পিতাকে হারিয়ে মা হোমায়রা খাতুনসহ কলকাতায় চলে যান। আর এদিকে স্বামীর মৃত্যুর পর সৎ মেয়ে ও শ্বশুর বাড়ির অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের অসহযোগিতায় রোকেয়াও তাঁর শ্বশুরবাড়ি ভাগলপুরে নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের স্কুল তুলে দিয়ে কলকাতায় চলে আসেন এবং সেখানে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্থাপনের কাজ শুরু করেন। কলকাতা আসার পর, অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে বেগম রোকেয়া, হোমায়রা খাতুন ও তাঁর পুত্র আমীর হোসেন চৌধুরী এক-ই বাড়িতে বাস করতেন। আমীর হোসেন চৌধুরী, যিনি সন্তান-বুভুক্ষু বেগম রোকেয়ার পুত্রবৎ ছিলেন, কলকাতা থেকেই বি এ পাশ করেন, কিন্তু দেশভাগের পর ঢাকায় চলে আসেন। আর সেখানেই দাঙ্গা প্রতি্রোধ করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ( শফি আহমেদ ও আমার যৌথ সম্পাদনায় বাংলাদেশের খবরের কাগজে বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার পরবর্তি দাঙ্গার প্রতিফলন নিয়ে যে বিশাল আকারের বই এখনো গেল না আঁধার প্রকাশ করি ফেব্রুয়ারী ১৯৯৩তে, সেটা আমীর হোসেন চৌধুরীকে উৎসর্গ করেছিলাম আমরা, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা থামাতে গিয়ে যিনি আত্মদান করেন।)। (সম্পূর্ণ…)

আমি জন্মগ্রহণ করিনি

মুহম্মদ নূরুল হুদা | ২৭ december ২০১৬ ১২:৪৫ অপরাহ্ন

Hoqচিরজীবনে প্রবেশের পর প্রথমবারের মতো তাঁর জন্মদিন পালনের মুহূর্তে আমি যখন সৈয়দ শামসুল হকের কবিতাসমগ্র ১-এর পাতা উল্টাতে থাকি অনেকটা অন্যমনে, তখনি চোখ আটকে যায় বর্তমান রচনার শিরোনামটির প্রতি। এটি আসলে তাঁর রচিত জন্মদিন বিষয়ক অনেক কবিতার একটি। কবিতাটি তিনি লিখেছিলেন ১১ ডিসেম্বর ১৯৮৯ তারিখে, বগুড়ায় বসে। অর্থাৎ তাঁর সেবারের জন্মদিনের ১৬ দিন পূর্বে। অন্যরকম অভিব্যক্তির এক প্রতিচিত্রী বা দ্বান্দ্বিক বা সাংঘর্ষিক ভাষ্য এটি। প্রায় পাঁচ পৃষ্ঠার এই কবিতাটিতে অসম দৈর্ঘের ১৪৫টি পঙক্তি ও ৯টি আন্ত:সম্পর্কিত স্তবক আছে। আমি প্রথমবার দ্রুত চোখ বুলাতে গিয়েই আটকে যাই, এবং বুঝতে পারি, খুব সহজে পাঠোদ্ধার করার মতো রচনা এটি নয়। নিজের জন্ম-সংক্রান্ত কিছু অকপট স্বীকারোক্তির মাধ্যমে প্রান্তমুক্ত পদ্ধতিতে রচিত এই কাব্যবয়ানে তিনি তাঁর ব্যক্তিজন্মের প্রসঙ্গ টেনে স্বসমাজ ও পরিপার্শ্বকে এমন এক অন্তর্বয়িত আখ্যানে পরিণত করেছেন, যার দৃষ্টান্ত সমকালীন বাংলা কবিতায় আগে পেয়েছি মনে পড়ে না। প্রথম পঙক্তিতেই তিনি তিনবার উচ্চারণ করছেন শিরোনাম-বাক্যটি : “আমি জন্মগ্রহণ করিনি, আমি জন্মগ্রহণ করিনি, আমি জন্মগ্রহণ করিনি।” যেন কোনো পার্লামেন্টের মাননীয় মহা-সম্ভাষক একটি মীমাংসিত সিদ্ধান্তের সত্যোচ্চারণ করছেন নির্বিকার চিত্তে। (সম্পূর্ণ…)

রৌদ্রময় অনুপস্থিতি : বাংলা কবিতার আলোক

প্রদীপ কর | ২৭ নভেম্বর ২০১৬ ৭:০৭ অপরাহ্ন

Alok
ছবি: অমিতাভ দাসের ক্যামেরায় কবি আলোক সরকার

সামগ্রিক কোলাহলের ভিতরই হয়তো সৃজন সম্ভব এক নিভৃতলোক। সময় হয়তো সেই মৌলিক ধ্যানের মগ্নতায় মিশে থাকে পরম সাধনায়। নিভৃতির মৌলিক সাধনা। বাংলা কবিতার শরীরে মিশে আছে যে বিশেষ কতকগুলি সময়, পঞ্চাশের দশক সেরকমই একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবর্ণ সময়। ভাঙা দেশে, ভাঙা মানুষের যন্ত্রণা পেরিয়ে এসে, অনেক না-পাওয়ার বেদনাকে অতিক্রম করে এক বিষন্ন স্বাধীনতার জন্ম। প্রাণের ভাষাকে অনন্তজীবন দেবার জন্য অকাতরে প্রাণত্যাগ… এইসব ভাঙাগড়ার মধ্যেই স্পষ্ট চিহ্নিত হয়ে উঠেছে বাংলা কবিতার পঞ্চাশকাল।

একটি তাৎপর্যপূর্ণ সময়ের মধ্যেই একদল কৃত্তিবাসী যখন ফুটপাথ বদল করতে করতে মধ্যরাতে শাসন করছে কলকাতা শহর, তখন, তার সমান্তরালে আরেক দল, বিশিষ্ট হয়ে উঠছেন ‘শতভিষা’ (১৯৫১) পত্রিকাকে অবলম্বন করে ভিন্নধারার কাব্য প্রয়াসে যার নেতৃত্বে ছিলেন কবি আলোক সরকার। ঐতিহাসিকভাবেই সত্য এই যে, এই দশকের প্রথম প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থটিও কবি আলোক সরকার রচিত উতল নির্জন। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সকলেই বুঝতে পারলেন বিশুদ্ধ কবিতার এক অন্য আলোক উদ্ভাসিত। যদিও, খুবই দুর্ভাগ্যজনকভাবে উল্লেখ করতে হয়, সম্মান, পুরস্কার ইত্যাদি সাহিত্যের সাধারণ মূল্যায়নগুলি তাকে নিয়ে হয়েছে অনেক ধীরে, অনেক পরে। ফলতঃ বাংলা কবিতায় অন্য আলোর উজ্জ্বল প্রভা সবার কাছে তেমন করে পৌঁছায়নি। ভাবি, এই-ই তো অনিত্য, যে, কোলাহল মুখরতায় মিশে থাকতে পারে হাজার হাজার মুখ কিন্তু ধ্যান তো একক। মগ্নতা তো সব সময়েই নিভৃতির। ‘হাজার ঝরাপাতার বুকে পায়ের চিহ্ন মর্মরিত আছে’ (আলোকিত সমন্বয়। নাম কবিতা) যিনি লিপিবদ্ধ করেন কিংবা বলেন:

অনেক দিন ফিরে আসার পরও
যারা পুরোনো ছবিকে নতুন নামে বলছে
তাদের ভিতরের আঁধার
কত গোপন হুহু করছে।

কেউ শুনতেই পাচ্ছে না এমন গোপন।
(আধার। সমাকৃতি ১৯৯৫) (সম্পূর্ণ…)

পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com