প্রবন্ধ

বাৎস্যায়নের কামসূত্র: ‘অশ্লীলতার’ ঔপনিবেশিক কূটচাল এবং আমাদের ভ্রান্তি

হোসেন আলমগীর | ৩০ জুলাই ২০১৮ ৬:৩৭ অপরাহ্ন

প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃত সাহিত্যে মালঙ্গ বাৎস্যায়নের ‘কামসূত্র’ একটি কালজয়ী গ্রন্থ। নারী ও পুরুষের দাম্পত্য জীবন, কামকলা, অভিজাত শ্রেণীর সংস্কৃতি, এবং আমোদ-ফুর্তি বিষয়ে এ গ্রন্থটি বিগত দু’হাজার বছর ধরে পাঠকদের আকৃষ্ট করে রেখেছে। ১৮৭৬ সালে রিচার্ড ফ্রান্সিস বার্টন, ভগবান-লাল ইন্দ্রজি, ফস্টার ফিটজজেরাল্ড আর্বাথনট, এবং শিবরাম পরশুরাম ভিড়ে’র সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ‘কামসূত্র’র ইংরেজি তর্জমা প্রকাশিত হয়। পাশ্চাত্যে বইটি ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা লাভ করে, তবে সেটা ‘কামসূত্র’র সামগ্রিক বিষয়বস্তুর কারণে নয়; মূলত বাণিজ্যের স্বার্থে একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপনের কারণে। পন্ডিতজনের ধারণা, প্রাচীন ভারতে সংস্কৃত ভাষায় যখন এ বইটি লেখা হয়েছিল তখন সমাজের অভিজাত শ্রেণীর ভেতরে ধর্ম এবং অর্থশাস্ত্রের পাশাপাশি কামশাস্ত্রের চর্চা ছিল। সংস্কৃত ‘কাম’ এর অর্থ বাসনা, প্রেম, আনন্দ, এবং যৌনক্রিয়া। অর্থাৎ পঞ্চ-ইন্দ্রিয়লব্ধ যে কোন আনন্দই কামের আওতাভুক্ত, আর ‘সূত্র’র অর্থ কোন নীতি বা তত্ত্বের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা। এ পদ্ধতিতে লেখার সুবিধা হলো শিক্ষার্থীরা সূত্রগুলো সহজেই স্মরণ করতে পারে। প্রাচীন ভারতে প্রায় সব উল্লেখযোগ্য সংস্কৃত গ্রন্থ, যেমন: যুক্তিবিদ্যা, ব্যাকরণ, এবং দর্শনশাস্ত্র এ সূত্ররীতিতে লেখা হয়েছে। বাৎস্যায়নের এ গ্রন্থের উদ্দেশ্য ‘কাম’ অর্থাৎ আমোদ- প্রমোদের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যাপারেপাঠকদের যথাযথ ধারনা প্রদান করা। উল্লেখ্য, ‘কামসূত্র’ শুধুমাত্র যৌনতার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; প্রাচীন ভারতের সমাজ জীবনের হরেক রকম বিষয়ে বিস্তারিত এবং বাস্তব-ধর্মী তথ্যাবলীর সমাবেশ ঘটেছে এখানে, যেমন: পোশাক, প্রসাধনী, বিনোদন, সমাজ, ক্রীড়া, বাড়ির অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা এবং বহিরাঙ্গনের নান্দনিকতা। উপরন্তু, বাৎস্যায়ন কমবেশি মনোবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, যৌন বাসনা, সমকামিতা, ভেষজ চিকিৎসা, এবং নারী যৌনকর্মীদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নসহ আরও অনেক বিষয়ে এখানে পরামর্শ দিয়েছেন। অতএব, এ বিষয়গুলো বিবেচনায় আনলে ‘কামসূত্র’ সম্পর্কে গতানুগতিক ধারণা (marriage manual, sex guide, pillow book) বদলে যাবে। মূলত, ‘কামসূত্র’ প্রাচীন ভারতের মৌর্য এবং গুপ্ত সভ্যতার ৮০০ বছরের শিল্প সংস্কৃতির একটি লিখিত প্রমাণ। প্রকাশের পর থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত ‘কামসূত্র’ ভারতের সাহিত্য এবং শিল্পকলাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। প্রাচীন কাল থেকে ১৮ শতক পর্যন্ত ভারতে কামশাস্ত্রের চর্চা অব্যাহত ছিল, এবং এ বিষয়ে রচিত একাধিক গ্রন্থ তার সাক্ষ্য বহন করছে। কিন্তু ভারতে ইংরেজ শাসনামলে এ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়।
ঔপনিবেশিক আমলে ইংরেজ প্রশাসন এ সাহিত্যচর্চায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করে এবং সু-পরিকল্পিতভাবে ভারতবাসীর মতামত এর বিপক্ষে নিয়ে যায়। যৌনতার প্রতি ভারতীয়দের উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলার জন্য খ্রিস্টান মিশনারি, ইংরেজ প্রশাসন, এবং তাদের সৃষ্ট ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী ভারতের শৃঙ্গাররস-কেন্দ্রিক সাহিত্য, শিল্পকলা, অভিনয়, এবং সঙ্গীতের প্রতি অশ্লীলতার অভিযোগ এনে এর নিয়ন্ত্রণ শুরু করে, এবং একটি আইন (Obscene Publication Act) প্রণয়নের মাধ্যমে এধারার সাহিত্যকর্মের প্রকাশনা নিষিদ্ধ করে দেয়। ফলশ্রুতিতে, ভারত উপমহাদেশে দু’হাজার বছর ব্যাপী প্রবহমান কামশাস্ত্রের চর্চা উনিশ শতকে এসে ব্যাহত হয়, এবং তখন থেকেই এ সাহিত্যধারার প্রতি ভারতীয়দের, বিশেষত: শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির, দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করে। এ প্রবন্ধে ভারতের শিল্প-সাহিত্যের আঙিনায় কামসূত্রের প্রভাব, ইংরেজদের এ সাহিত্যধারার প্রতি বিরূপ মনোভাবের কারণ, এবং এর নিয়ন্ত্রণের পরিণাম বিশ্লেষণ করা হবে।
অধ্যাপক হারাণচন্দ্র চাকলাদারের মতে বাৎস্যায়ন দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতের অধিবাসী ছিলেন। কামসূত্রে ভারতের প্রায় সব অঞ্চল সম্পর্কে অল্পবিস্তর আলোচনা থাকলেও দক্ষিণ-পশ্চিম ভারত সম্পর্কে লেখকদের ব্যাপক এবং গভীর ধারণা লক্ষ্য করা যায়। যশোধরা’র মতানুযায়ী ‘বাৎস্যায়ন’ হচ্ছে তাঁর বংশ এবং ‘মালঙ্গ’ তাঁর নিজের নাম। বাৎস্যায়নের জন্মকাল নিয়েও বিতর্ক আছে। শ্যামশাস্ত্রীর (কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের সম্পাদক) ধারণা তিনি ১৩৭-২০৯ খ্রিস্টাব্দে মধ্যে কোন এক সময়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ভান্ডারকরের মতে তাঁর জন্ম ১০০ খ্রিস্টাব্দের ভেতরে। এ বি কিথ এর দাবী, বাৎস্যায়নের জন্ম চতুর্থ শতাব্দীতে। অধ্যাপক হারানচন্দ্র চাকলাদার এ সমস্যাটি নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে ‘কামসূত্র’ ৪০০ খ্রিস্টাব্দের আগে লেখা হয়েছে এবং সেটা কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ এবং পতঞ্জলির ‘মহাভাষ্য’র পরে, কেননা বাৎস্যায়ন এ দুটি গ্রন্থ দ্বারা কমবেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন। অতএব, উপরিউক্ত মতামতের ভিত্তিতে অন্তত এটা ধরে নেয়া যায় যে খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ থেকে খ্রিস্টাব্দ ৩০০ এর মাঝে কোন এক সময়ে বাৎস্যায়ন ‘কামসূত্র’ রচনা করেছিলেন। কামসূত্রে অভিজাত শ্রেণির ভোগ-বিলাস এবং আভিজাত্যের ফিরিস্তি থেকে অনুমান করা যায় যে এ ধরণের গ্রন্থ রচনা তখনই সম্ভব যখন রাষ্ট্র ছিল সমৃদ্ধশালী, নগরবাসীরা ছিল ধনবান এবং বিলাস-ব্যাসনে মশগুল। সন্দেহ নেই যে, সময়টা ছিল সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং ওই জনপদ ছিল কোন রকমের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, এবং বিদেশী আগ্রাসন থেকে মুক্ত। গুপ্ত যুগ (৩০০ -৩০০ খ্রি:) ছিল এমনই একটা সময় যখন শিল্পকলা এবং সাহিত্য চর্চা সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল। (সম্পূর্ণ…)

এপিটাফ, এপিটাফ-কবিতা: মৃত্যু-মাদ্রিগাল

কুমার চক্রবর্তী | ১৭ জুলাই ২০১৮ ১১:৪৮ পূর্বাহ্ন

কীভাবে মানুষ মরে যায়? কী আশ্চর্যের, কেউ ভাবে না তা নিয়ে!
আর যারা ভাবে, তারা যেন ক্রুসেড বা সালামিস যুদ্ধের ইতিহাস
থেকে স্মরণ করে কিছু একটা।
তথাপি মৃত্যু হলো এমন কিছু যা ঘটে: কীভাবে মানুষ মরে?
এসব না-জেনেও প্রত্যেকেই পেয়ে যায় নিজ নিজ মৃত্যু,
তার মৃত্যু, শুধু তার নিজের, যা বর্তায় না অন্যের ওপর
আর এই মৃত্যু-মৃত্যু খেলার নামই যে জীবন।

গ্রিক কবি জর্জ সেফেরিস-এর এই কাব্যিক উচ্চারণ বস্তুত বলতে চায় মৃত্যুর অনিবার্যতা ও তার উপস্থিতির উদ্ভটতার কথা। সত্যিই, মানুষের মৃত্যুর মতো আশ্চর্যের আর কিছু নেই। প্রতিদিন ঘটছে তা, তবুও তা এক অলীক বাস্তবতা বলে মনে হয়। মহাভারতের ধর্মবকের প্রশ্নেও তাই এই আশ্চর্যতা অন্তর্ভূত, প্রতিনিয়ত এই যে মৃত্যুর খেলা চলে তবু মানুষ তা নিয়ে ভাবে না। বেঁচে থাকতে কত ইহকালিক-পরকালিক প্রজ্জ্বলিত লণ্ঠন ধরিয়ে দেওয়া হয় ব্যক্তির হাতে যেন মৃত্যুর পথ পাড়ি দেওয়া যায় নির্বিঘ্নে, কিন্তু মৃত্যুর মুহূর্তে সবকটি লণ্ঠনই নিভে যায়, অন্ধকারে নেভা লণ্ঠনই সম্বল হয় তার। মৃত্যু নিয়ে যত দর্শন আর সাহিত্যের সৃষ্টি হয়েছে, অন্যকিছুতে তেমনটা নয় আর। বুদ্ধদর্শনে জন্ম আর মৃত্যুকে ‘সমগ্র’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, বলা হয়েছে যে মৃত্যু হলো জীবনেরই আরেক অধ্যায়ের সূত্রপাত; মৃত্যু হলো মুকুর যেখানে জীবনের সামগ্রিক অর্থময়তা প্রতিফলিত। বুদ্ধের কাছে অস্তিত্ব শরৎকালের মেঘের মতোই ক্ষণস্থায়ী, আর সত্তার জন্মমৃত্যুর অবলোকন নৃত্যের গতিময়তাকে অবলোকনেরই মতো এক ব্যাপার।
মৃত্যু মানসিক ও শারীরিক। মৃত্যুতে মন তাৎক্ষণিক নিশ্চিহ্ন হলেও শরীর পড়ে থাকে, আর প্রয়োজন হয় তার ব্যবস্থাপনার যাকে বলে সৎকার। মৃতদেহ সৎকারের পদ্ধতি মোটাদাগে দুটো: পুড়িয়ে ফেলা আর মৃত্তিকাভূত করা; এর বাইরেও পদ্ধতি আছে, যেমন জরাথুস্ট্রীয়রা মৃতদেহ রেখে দেয় সাইলেন্স টাওয়ারে যেন শকুন বা অন্য শবভূক পাখিরা এসে ভক্ষণ করতে পারে গলিত মাংস। কোনো কোনো গোত্রে জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয় শব যেন তা সমুদ্রপ্রাণিদের খাদ্য হতে পারে। একসময় আমাদের দেশে শর্পদংশিত অচেতন দেহ জলে ভাসিয়ে দেওয়া হতো। প্রাচীন মিশরীয়রা মমি করে রাখত বিখ্যাতদের শব। প্রাচীন গ্রিসে দাহ ও কবর, দুটোরই প্রচলন ছিল; ইলিয়াদ-এ দেখা যায়, পাত্রোক্লুস মারা যাওয়ার পর তাকে চিতায় ওঠানো হয়েছিল। অনেকসময় দেহভস্ম ধাতুপাত্রে রেখে তা মাটিতে সমাহিত করা হতো। সাধারণত ভারতবর্ষীয় ধর্মবিশ্বাসীদের দাহ করা হয় কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, আর সেমেটিক ধর্মবিশ্বাসীদের মধ্যে কবর দেওয়ার রীতি বহমান যদিও পাশ্চাত্যে দাহপদ্ধতি জনপ্রিয় হচ্ছে এখন। (সম্পূর্ণ…)

দার্শনিকের মগ্নতা এবং ইতিহাসের পঙ্কিল পথ

দেবাশিস চক্রবর্তী | ২১ জুন ২০১৮ ৩:০৫ অপরাহ্ন


পিথাগোরাস, অগাস্টাস ন্যাপ (১৯২৬)

গৌতম বুদ্ধের প্রায় সমসাময়িক আয়নীয় গ্রিক গণিতবিদ, দার্শনিক পিথাগোরাস (খ্রিস্টপূর্বাব্দ ৫৭০-৪৯৫) মৃত্যুর আড়াই হাজার বছর পরেও এই যান্ত্রিক সভ্যতার অংশ হয়ে আছেন। আজও প্রতিটি স্কুলগামী শিক্ষার্থীর মননকে যৌক্তিকতার আলোয় উদ্ভাসিত করছেন পিথাগোরাস। যদিও ভুল শিক্ষা পদ্ধতিতে এই যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুভবের আনন্দ শিক্ষার্থীরা কতটুকুই বা পায় তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। সংখ্যাতাত্ত্বিক যুক্তি এবং আজকে নিজের নামেই পরিচিত উপপাদ্যগুলো প্রকাশের মাধ্যমে পিথাগোরাস মানব ইতিহাসে গণিতের এক স্বর্ণযুগের সূচনা করেছিলেন । আসলে এর মাধ্যমেই পৃথিবী বৈজ্ঞানিক প্রমাণের মত ধারণার দিকে এগিয়ে যায়। সময়ের পরিক্রমায় তার ধারণাগুলো ছড়িয়ে গেছে প্লেটো, কোপার্নিকাস, দেকার্ত, কেপলার, নিউটন এবং আইনস্টাইনের মানসে। তাদের যৌক্তিকবোধের কাঠামো পিথাগোরাসের ধারনাগুলোরই উত্তরাধিকার। বৈজ্ঞানিক অর্জন ছাড়াও পিথাগোরাস আমাদের সামনে নিয়ে আসেন একটি নতুন শব্দ “দার্শনিক (Philosopher)” । নিজেকে আখ্যায়িত করেন “জ্ঞানের প্রেমিক” হিসেবে। এ ভালবাসাকে তিনি মানব জীবনে দর্শনের ব্যবহার হিসেবে আবদ্ধ করেন এক পরিমিত, ধ্যানমগ্নতায়। সিসেরোর বর্ণনায় দেখা যায়, ফ্লাইয়াসের শাসক যুবরাজ লিওনের সাথে পিথাগোরাস খ্রিস্টপূর্ব ৫১৮ এর অলিম্পিক গেমসে উপস্থিত ছিলেন। পিথাগোরাসের বহু বিষয়ে গভীর জ্ঞানের পরিচয়ে যুবরাজ লিওন পুলকিত হয়ে যান। একসময় পিথাগোরাসকে প্রশ্ন করেন কেন তিনি কোন একটি বিশেষ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ না হয়ে একজন “দার্শনিকের” জীবন যাপন করছেন। পিথাগোরাস এই প্রশ্নের উত্তরে যে উক্তিটি দিয়েছিলেন তা পাওয়া যায় সাইমন সিংয়ের মনমুগ্ধকর Fermat’s Enigma: The Epic Quest to Solve the World’s Greatest Mathematical Problem বইটিতে । (সম্পূর্ণ…)

বাংলাভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতিতে চীনের প্রভাব

শান্তা মারিয়া | ৭ মে ২০১৮ ৩:২৯ অপরাহ্ন

বিশ্বের সুপ্রাচীন সভ্যতাগুলোর অন্যতম চীন। সুমেরীয়, ব্যাবিলনীয়, মিশরীয়, ভারতীয় এবং চীনের সুপ্রাচীন সভ্যতা মানবজাতিকে প্রগতির পথে চালিত করার ক্ষেত্রে প্রধান অবদান রেখেছে। গ্রিস, রোম এবং পরবর্তিতে ইউরোপের অন্যান্য দেশের সভ্যতার বিকাশে চীনের অবদান বিপুল। অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতার সঙ্গে চীনের সভ্যতা, ভাষা ও সংস্কৃতির মৌলিক পার্থক্য হলো অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতার ভাষাগুলো এখন বিলুপ্ত বা শুধুমাত্র গবেষকের পাঠ্য। কিন্তু চীনের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি এখনও বর্তমান চীনা জনগণের চর্চিত বিষয়। চীনা সভ্যতার প্রাচীন নদীটির ধারা এখনও বহমান, তার জল এখনও সুপেয়।
বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিও সমৃদ্ধ। বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ গাঙ্গেয় অববাহিকায় প্রাচীনকাল থেকেই জনবসতি গড়ে ওঠে। গ্রিক ইতিহাসবিদদের লেখায় গঙ্গা অববাহিকায় মোহনা অঞ্চলে অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলে গঙ্গাহৃদয় বা গঙ্গাহৃদি নামে এক শক্তিশালী রাজ্যের কথা রয়েছে। তাদেরকে গঙ্গারাইডিস নামে অভিহিত করা হয়েছে। দুধর্ষ গঙ্গারাইডিসদের ভয়ে মেসোডোনিয়ার দিগ্বিজয়ী সম্রাট আলেকজান্ডার এই দেশ আক্রমণে সাহসী হননি। (সম্পূর্ণ…)

মেধাসম্পদ বিকাশে কপিরাইটের ভূমিকা

মুহম্মদ নূরুল হুদা | ২৪ এপ্রিল ২০১৮ ১১:১৩ পূর্বাহ্ন

মেধাসম্পদ কি? – খুব সহজ কথায় বলা যায়, মানুষ নিজে যে মেধা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, সেই মেধা সচেতনভাবে খাটিয়ে যে ধরনের সম্পদ তৈরি করতে সক্ষম, তা-ই মেধাসম্পদ। রবীণ্দ্রনাথ জন্মসূত্রে কবিতা লেখার মেধা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সেই মেধা খাটিয়ে তিনি ‘গীতবিতান’ রচনা করেছেন। অতএব তাঁর সৃষ্ট ‘গীতবিতান’ তাঁর মেধাসম্পদের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

এই সম্পদ মানুষের গতানুগতিক সম্পদ অর্থাৎ জমিজমা, টাকাপয়সা বা সোনারূপার চেয়ে আলাদা এক সম্পদ। জমিজমা, দালানকোঠা ইত্যাদিকে আমরা বলি স্থাবর সম্পদ; অন্যদিকে টাকা-পয়সা কিংবা সোনা-রূপা ইত্যাদিকে বলি অস্থাবর সম্পদ। এগুলোর মালিকানা সহজেই হস্তান্তরযোগ্য। মেধা-সম্পদ ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক অস্তিত্ব, সক্ষমতা ও তার প্রয়োগ-কুশলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বিধায় তাকে ব্যক্তি-স্রষ্টা থেকে আলাদা করা যায় না। তাই ব্যক্তির সত্তালীন সৃষ্টিশীলতাই এই সম্পদের উৎস।

এই ব্যক্তিলীন সৃষ্টিশীলতার দুই প্রধান উপাদান : স্বজ্ঞা ও প্রজ্ঞা। স্বজ্ঞা তার জন্মগত জ্ঞান; আর প্রজ্ঞা তার অধীত, চর্চিত ও অভিজ্ঞতালব্ধ বোধ-বুদ্ধি, বিদ্যা, চর্চা ও প্রয়োগকৌশলের ফসল। এ দুয়ের সমন্বয়েই তার সৃষ্টিশীলতার ফলপ্রসূতা। এই সৃষ্টিশীলতাই ব্যক্তিস্রষ্টার অস্তিত্বের সমার্থক। তাই তার অধিকার বা সুফল-কুফলও একমাত্র তারই কর্তৃত্বাধীন। আসলে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, যেমন জমিদারের জমিজমা বা লেখকের কালি-কলমের চেয়েও ব্যক্তির সৃষ্টিশীলতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।ব্যক্তির সৃষ্টিশীলতার উৎসজাত ও স্রষ্টার সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ-কর্ম কতো বেশি মূল্যবান তা একবিংশ শতাব্দীর ধনীগরীবসহ জগতের সকল সম্প্রদায়ই মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে চলেছেন। আশার কথা, বাংলাদেশেও সেই বোধ-বুদ্ধিকেন্দ্রিক সৃষ্টিসম্পদের অপরিহার্যতার বার্তা এসে পৌঁছেছে। তাই মেধাসম্পদকে সুরক্ষা দেয়া আজ যুগের দাবি। (সম্পূর্ণ…)

বিপ্লবী এম. এন. রায়ের সাম্যবাদ: “শুরুটা ছিল মেক্সিকোতে”

ইমরান খান | ২৪ মার্চ ২০১৮ ৩:৪২ অপরাহ্ন

দানিয়েল কেন্ট-কাররাসকো

দানিয়েল কেন্ট-কাররাসকোর জন্ম মেক্সিকোয়। পেশায় ইতিহাসবিদ। সমসাময়িক ভারতীয় রাজনৈতিক চিন্তা এবং তৃতীয় বিশ্বের আন্ত:সম্পর্কিত ইতিহাস বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে তিনি পিএই্চ করেছেন। বর্তমানে মেক্সিকো সিটিতে অবস্থিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় `উনাম’ (Universidad Nacional Autonoma de Mexico)-এর পোস্টডক্টোরাল ফেলো হিসেবে আছেন। দক্ষিণ এশিয়া ও মেক্সিকোয় বামপন্থী রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস নিয়ে অসংখ্য গবেষণা ও নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে ইংরেজি ও স্প্যানিশ ভাষায়। বর্তমানে তিনি ভারতে সাংস্কৃতিক ঠাণ্ডা যুদ্ধ ও সিআইএ-এর কর্মকাণ্ড নিয়ে পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করছেন।
উপমহাদেশের বিখ্যাত বিপ্লবী ও রাজনৈতিক নেতা এম এন রায় সম্পর্কে বাঙালি জনগোষ্ঠী অনেক কিছু জানলেও গত শতাব্দির প্রথম দশকে সিআইএর তাড়া খেয়ে মেক্সিকোতে তার দুই বছরের অবস্থানকাল সম্পর্কে খুব কমই জানেন। রায়ের এই অজানা দিক নিয়ে গবেষক দানিয়েল ইংরেজিতে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছেন যেটি প্রকাশিত হয়েছিল কানাডার বাংলা জার্নাল পত্রিকার সাম্প্রতিকতম সংখ্যায়। লেখকের অনুমতি নিয়ে তার সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধটি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর পাঠকদের জন্য অনুবাদ করেছেন ইমরান খান। বি. স.
(সম্পূর্ণ…)

আন্তঃনাক্ষত্রিক সভ্যতার স্বপ্ন ও স্টিফেন হকিং-এর সেরা বইগুলো

বিপাশা চক্রবর্তী | ১৬ মার্চ ২০১৮ ১০:২৪ অপরাহ্ন

গত ১৪ মার্চ ২০১৮ তারিখে চলে গেলেন বর্তমান বিশ্বের জনপ্রিয় এক মানুষ। স্টিফেন হকিং, যাকে আইনস্টাইনের পর সবচেয়ে প্রতিভাবান বিজ্ঞানী বলা হয়। তবে এক দিক থেকে তিনি হয়তো আইনস্টাইনকেও ছাড়িয়ে গেছেন, তাহলো সাধারণ মানুষের কাছে তার বিপুল জনপ্রিয়তা। আইনস্টাইন যে জনপ্রিয় ছিলেন না, তা কিন্তু না। তবে তার জনপ্রিয়তা বেড়েছিল তার মৃত্যুর পর। সেদিক থেকে স্টিফেন হকিং দারুন ভাগ্যবান এক মানুষ। আর সেই ভাগ্যবান মানুষটিই মানবজাতিকে দিয়ে গেলেন ভবিষ্যৎ পথ চলার এক আশ্চর্য পাথেয়।

বেশি দিন আগে নয়, সম্প্রতিই বলা যায়, বিখ্যাত এই পদার্থবিজ্ঞানী বারবার মানবজাতিকে হুঁশিয়ার করে বলেছিলেনঃ “মানুষই মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। মানুষের প্রযুক্তি জ্ঞানের অপব্যবহার মানুষের জন্য বিপদ ডেকে আনছে। একদিকে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, অন্যদিকে পারমানবিক যুদ্ধ আর কৃত্রিম ভাইরাসের মতো মানবসৃষ্ট সমস্যার কারণে গোটা মানবজাতি আজ ভয়ানক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পৃথিবী ক্রমশ বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। তবে মহাদুর্যোগ নেমে আসতে এক হাজার বা দশ হাজার বছর লাগতে পারে। এরই মধ্যে মানুষকে মহাকাশে অন্য নক্ষত্রপুঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়তে হবে, যাতে মানব জাতি নিশ্চিহ্ন না হয়ে যায়”।

বহু বছর যাবৎ জটিল মোটর নিউরন রোগে আক্রান্ত অধ্যাপক হকিংয়ের প্রায় পুরো শরীর অসাড় হয়ে যাওয়ায় তিনি স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারতেন না। থুতনির সাথে যুক্ত সূক্ষ্ম সেন্সরের সাহায্যে বিশেষভাবে তৈরি কম্পিউটারের কীবোর্ড চালিয়ে তিনি ভাববিনিময় করতেন। খ্যাতিমান এ বিজ্ঞানী মনে করতেন, মহাকাশে পাড়ি জমাতে পারলেও সেখানে স্বনির্ভর আবাসস্থল গড়ে তুলতে মানুষের অন্তত কয়েক’শ বছর সময় লেগে যাবে। কাজেই, সে পর্যন্ত মানুষকে সতর্কভাবে থাকতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গবেষকদের তাই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির ক্ষেত্রে অনেক বেশি সাবধান হতে হবে। (সম্পূর্ণ…)

অমর কবিতার জন্মক্ষণ

বিনয় দত্ত | ৯ মার্চ ২০১৮ ১০:৫২ পূর্বাহ্ন

অমর কবিতার জন্মক্ষণটি সবাই স্মরণ করছে শ্রদ্ধাভরে। মহাকাব্যের সেই কবির প্রতি আমরা গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করছি প্রতিটি ক্ষণে। অমর কবিতার জন্মক্ষণটি কিন্তু খুব সুগম ছিল না। বরং ক্ষণটি ছিল কণ্টকময়, অস্থির, দুর্গম। কবির ভুল শব্দের মধ্যে দিয়ে রচিত হতে পারতো ভিন্ন ইতিহাস।
মহান নেতার বিচক্ষণতা, ভিতরকার আর্তনাদ, নির্যাতিত মানুষের কান্নার হাহাকার, রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করার দৃশ্যপট, বাংলার মানুষের মুমূর্ষু আর্তনাদের তীব্র শব্দ কবিকে করেছে আরো পরিশুদ্ধ। এই ইতিহাস একদিনের নয়, এই ইতিহাস দীর্ঘ তেইশ বছরে নিপীড়িত, বঞ্চিত হওয়ার। এই ইতিহাস শোষণের, শোষিত হওয়ার। এই ইতিহাস অসংখ্য স্বাধীনতাকামী মানুষের তীব্র আকাঙ্ক্ষার ইতিহাস।
ইতিহাসের সেই অমর কাব্য শোনার জন্য সেই দিনের অপেক্ষা সবার। কখন আসবে স্বাধীনতার ঘোষণা বহনকারী সেই কবি? যিনি বাঙালির জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গিয়েছেন। যিনি সবার অজান্তে নিজের জীবনের প্রতিটা রক্ত বিন্দু উৎসর্গ করে রেখেছেন। ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো’ এই কবিতায় কবি নির্মলেন্দু গুণের মতো আমিও বলতে চাই।

একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে
লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে
ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে-
‘কখন আসবে কবি?’ ‘কখন আসবে কবি?’ (সম্পূর্ণ…)

৭ মার্চের ভাষণ: মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর বিজয়

ফরিদ আহমদ দুলাল | ৭ মার্চ ২০১৮ ৯:৩০ পূর্বাহ্ন

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে পৃথিবীর অন্যতম ‘ওয়ার্ল্ড ডকুমেন্টরি হেরিটেজ’ ইউনেস্কো স্বীকৃতি দিয়েছে, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ উচ্চারিত হবার ছেচল্লিশ বছর পর। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্যের বিষয়টি বাঙালি ১৯৭১-এ এক নদী রক্ত দিয়ে এবং বিজয় অর্জনের মাধ্যমে প্রমাণ করে দিয়েছে। ১৯৭১-এর ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে কিছু লেখালেখি অবশ্যই হয়েছে, বক্তৃতাও অল্পবিস্তর হয়েছে; কিন্তু প্রায় অর্ধশতাব্দী পর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা যখন বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণকে বিশ্বপ্রেক্ষাপটে অন্যতম প্রভাববিস্তারকারী ঐতিহাসিক ভাষণ বলে স্বীকৃতি দেয়, তখন সচেতন মানুষ মাত্রই একবার নড়েচড়ে বসেন। আমরা আগেই জেনেছি বিশ্বসেরা ভাষণের তালিকায় গৌরবান্বিত হয়েছে মার্টিন লুথার কিং, আব্রাহাম লিংকনের ভাষণ। যতবার আমরা তাদের ভাষণের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর ভাষণকে বিবেচনায় এনেছি, ততবারই মনে হয়েছে, যে কোনো বিবেচনায়ই বঙ্গবন্ধুর ভাষণ পৃথিবীর যে কোন ঐতিহাসিক ভাষণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যম-িতও বটে; কিন্তু যেহেতু বঙ্গবন্ধুর ভাষণ তৃতীয় বিশ্বের পশ্চাদপদ মানুষের একজন বিশ্বপ্রভাববলয়হীন নেতার ভাষণ, এবং যেহেতু সে ভাষণের অনিবার্য ফল হিসেবে বিশ্বের পরাশক্তির ভিত্তি কাঁপিয়ে দিয়েছে; সঙ্গত কারণেই তাঁর ভাষণকে কেউ বড় ধরনের স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠাবোধ করেছে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ যে বিশ্বের প্রভাবশালী ভাষণগুলোর অন্যতম সে কথা বিশ্বের জ্ঞানী-গুণীরা সবাই জানেন; কিন্তু যে জাতি তার স্বপ্ন পূরণকারী নেতাকে এভাবে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করতে পারে, সেই জাতির নেতাকে বিশ্ব কেন সম্মান জানাবে? ধারণা করি, এই একটি মাত্র কারণেই বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি ওয়াল্ড হেরিটেজের দলিল হিসেবে স্বীকৃতি পেতে বিলম্ব হলো। আজ ইতিহাসের অমোঘ সত্যি হিসাবেই ছেচল্লিশ বছর পর সত্যিটা সামনে এসেছে এবং ইউনেস্কো বঙ্গবন্ধুর অবিস্মরণীয় ভাষণটিকে মর্যাদা দিয়েছে। (সম্পূর্ণ…)

২৪০ বছর পর হালেদ সাহেবের বাংলা ভাষার ব্যাকরণের দ্বিতীয় মুদ্রণ

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী | ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ২:০৬ অপরাহ্ন

বাংলাভাষীরা বাংলা ভাষার জন্য আত্মদান করেছেন, কিন্তু আমরা ভুলে যাইনি যে অবাঙালি বহু পণ্ডিত ও গবেষকরাও এই ভাষাকে তাদের মেধা ও মনন দিয়ে ভালো বেসেছিলেন এবং এই ভাষার গদ্যরূপ ও ব্যাকরণ নির্মাণে রেখেছিলেন অসামান্য অবদান। বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ গ্রন্থটি রচিত হয়েছিল কোনো বাঙালির হাতে নয়, হয়েছিল এক জ্ঞানদীপ্ত ইংরেজ পণ্ডিতের হাতে ১৭৭৮ সালে, তার নাম নাথানিয়েল ব্রাসলি হালেদ। তিনিই প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রচয়িতা বলে যেমন আমরা গৌরববোধ করি, তেমনি আমরা বাংলাদেশিরা আজ এ কারণেও গৌরববোধ করতে পারি যে সেই ঐতিহাসিক বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হতে যাচ্ছে দীর্ঘ ২৪০ বছর পর স্বনামধন্য প্রাবন্ধিক ও গবেষক ফয়জুল লতিফ চৌধুরীর সম্পাদনায় এবারের বইমেলায়। প্রকাশনার ২৪০ বছরপূর্তি উপলক্ষ্যে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেছে জার্নিম্যান বুকস প্রকাশনী। সম্পাদকের পরিশ্রমী ও গবেষণালব্ধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি প্রকাশ করা হলো বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর ডটকম-এর পাঠকদের জন্য। বি.স.

নাথানিয়েল ব্রাসি হালেদ
[১৭৫১-১৮৩০]


প্রচ্ছদ চিত্র: A Grammar Of The Bengal Language

বাংলা ভাষার ব্যাকরণের প্রথম গ্রন্থটি ১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল। এর লেখক একজন ব্রিটিশ–নাম নাথানিয়েল ব্রাসি হালেদ (১৭৫১-১৮৩০)। ইংরেজিতে লিখিত এই ব্যাকরণ গ্রন্থের প্রচ্ছদনাম দেয়া হয়েছিলর A Grammar Of The Bengal Language। মূলতঃ ইংরেজিতে লিখিত হলেও এতে বাংলায় লেখা অনেক অক্ষর, শব্দ, বাক্য, পদ্যাংশ ও শ্লোক বাংলা হরফেই মুদ্রিত হয়েছিল ; কয়েকটি স্থানে কিছু ফারসি লিপিও ছিল।
হালেদ সাহেব লিখিত A Grammar Of The Bengal Language সম্পর্কে দু’টি বিষয়ে পাঠকের কৌতূহল থাকা স্বাভাবিক। প্রথম প্রশ্নটি হতে পারে বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ রচনা করতে গিয়ে হালেদ কী লিখেছিলেন। দ্বিতীয় প্রশ্নটি হতে পারে সেই থেকে বিগত প্রায় আড়াই শত বৎসরে বাংলা ব্যাকরণের কীরূপ পরিবর্তন হয়েছে। (সম্পূর্ণ…)

শহীদ মিনার: চেতনার বাতিঘর

ফরিদ আহমদ দুলাল | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ১২:৩৫ পূর্বাহ্ন

ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে যে-সৌধ নির্মিত হয়েছে, যে সৌধে প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখে তো বটেই, বিভিন্ন উপলক্ষে বাঙালি মিলিত হয় তা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আশ্রয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শহীদ মিনার-এর নকশা সারাদেশেই যে এক তা নয়। বিভিন্ন নকশার শহীদ মিনারের স্থাপত্যে শিল্পীর কী দৃষ্টিভঙ্গি তা আমরা সবাই জানি না; এমন কী কেন্দ্রীয় যে শহীদ মিনার, তার স্থাপত্যে মা ও সন্তানের সমন্বিত উপস্থাপনের যে শিল্পিত উপস্থাপনা, তা-ও বোধকরি বাঙালি মাত্রই অবগত, তা-ও নিশ্চয়ই সঠিক নয়; কিন্তু শহীদ মিনারের চেতনার যে বিষয়টি সে-টি বাঙালি মাত্রই জানেন। অবশ্য এ-ও তো সত্য, বাঙালির এই চেতনার আঙিনা শহীদ মিনার প্রসঙ্গে এক শ্রেণির বাঙালির (?) অবজ্ঞা অথবা কটুক্তি যে আমরা শুনিনি তা কিন্তু নয়; এবং অপ্রিয় হলেও সত্যি সেইসব কটুক্তিকারীদের কখনো আইনের আওতায় এনে দণ্ডিত করা হয়েছে তেমনটি কখনো শুনেছি বলে স্মরণে আসছে না। এ কথা অবশ্যই সত্যি, যারা শহীদ মিনার নিয়ে কটুক্তি করে, তারাও এর চেতনার শক্তি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল; যেমন ওয়াকিবহাল ছিলো পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী। কিন্তু বাঙালির আধুনিক-বিজ্ঞানমনষ্ক-প্রাগ্রসর অংশ নিজেদের চেতনার সাথে শহীদ মিনারের সম্পৃক্তির বিষয়টি কোনোদিন কোনো অবস্থায় বিস্মৃত হননি; যে কারণে বাঙালি তাদের সংকটে-সংগ্রামে-হতাশায়-বঞ্চনায় শহীদ মিনারের শরণাপন্ন হয়ে নিজের ভেতরের চেতনাছুরিটিকে শান দিয়ে নিয়েছে। (সম্পূর্ণ…)

‘যখন এসেছিলে, অন্ধকারে’: অভিজাত প্রেম

কুমার চক্রবর্তী | ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ৭:২৬ অপরাহ্ন

ফ্রান্সের প্রভাঁস নগরীতে, দ্বাদশ শতাব্দে, অপূর্ণ বাসনাজাত এক বিশেষ ধরনের গীতিকবিতার জন্ম হয়
যার কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল প্রেমের কাব্যময় উদ্ভাসন, যা সভ্যতার ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য
পরিবর্তনের সূচনা করে। প্রাচীনকালেও প্রেমের বেদনাময় গীতি রচিত হয়েছিল, কিন্তু সুখান্বেষণজাত
অভীপ্সা বা দুঃখজাত বিষাদের যে করুণ ছবি এবার ফুটে উঠল তা আগে কখনও ঘটেনি।…
প্রেম যেন এখন হয়ে উঠল সকল নৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিপূর্ণতার ফুলবাগান। আর এই প্রেমের কারণেই
বিনয়ী প্রেমিক যেন হয়ে গেল নিষ্পাপ এবং পবিত্র।

[মধ্যযুগের অবক্ষয়: দ্য ওয়েনিং অফ মিডল এজেস: ইয়োহান হাইজিংজা ]
প্রেমমাত্রই কাম থেকে উদ্ভূত কিন্তু কিছু প্রেমধারণা আছে যা কামকে পরিহার করে, অন্তত আচরণগতভাবে। এই বিষয়টি প্রাচীন নয়জ্জপ্রাচীন গ্রিক, রোমক বা ভারতীয় পুরাণ বা দর্শনে এর নজির দেখা যায় না, বরং সেখানে দেখা মেলে নানা যৌনপ্রতীকের যা কামকেই অগ্রবর্তী করে। ভারতীয় ও গ্রিক, উভয়েরই প্রেমদেবতা কামের ধনুর্ধারী। প্রাচীন ভারতে প্রেমধারণা আসলে কামধারণা। যৌনমিলনের অনেক স্থূলচিন্তা রয়েছে ভারতীয় পুরাণে। বড়ো প্রমাণ গৌরীপট্ট ও শিবলিঙ্গ। এখনও এই প্রতীক ব্যবহৃত হচ্ছে বামাচারী, তান্ত্রিক ও বাউলদের মধ্যে। কাম থেকে মুক্তির জন্য এরা কামকেই ব্যবহার করছে। তাছাড়া যাকে আমরা বলি প্লেটোনিক লাভ তা-ও মূলত কাম থেকে জন্ম নিয়ে একটি অবস্থাকে বোঝায় যা বর্ণিত সিম্পোজিয়াম-এ দাইআতাইমার বাচনে, যদিও মধ্যযুগে এই ধারণাকে নবরূপ দিয়ে তাকে অযৌন রং দেওয়া হয়েছে। প্রেম অবশ্যই কামসংশ্লিষ্ট কিন্তু তা তাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কামের নদীর পারে সে গড়ে তোলে প্রেমের নন্দনকানন। বাট্রান্ড রাসেল বলেছেন, প্রেম হলো বৃক্ষ যার শিকড় মাটিতে প্রোথিত আর শাখাপ্রশাখাগুলো ছড়িয়ে আছে স্বর্গে। রাসেলের এ কথায় রয়েছে কামবাস্তবতা ও কাম-অবাস্তবতা; প্রেমে কামকে ছাড়িয়ে যাওয়ার কথাই বুঝিয়েছেন রাসেল। (সম্পূর্ণ…)

পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com