কবিতা

মারুফুল ইসলাম: সাঁইজি কবিতাগুচ্ছ

মারুফুল ইসলাম | 26 Apr , 2020  



প্রথম পর্বে গর্ভে
মধ্য পর্বে গর্বে
কে আর কী করবে শেষপর্বে
যে আজ সর্বেসর্বা সেও যাবে ভেসে
উজানের ঢেউ শেষে ভাটির দেশে
বিধর্মীরও আছে ধর্ম কৃতকর্ম লোলচর্ম
তাললয় ভেদে মর্ম
কামনাগন্ধে রমণানন্দে যোগছন্দে
চোখাচোখি দ্বিধাদ্বন্দ্বে
মণিবন্ধে বাঁধন রবে না

সাঁইজি কল্কিতে দেন টান
একতারা বাজান
উদারা মুদারা তারায় ধরেন গান
সময় গেলে সাধন হবে না

তোর সনে আর হল না রে সই
নিজের মনে নিজেই বান্ধা রই
মন পুড়িয়ে লুকোচুরি
হাত পুড়িয়ে ভাত পুড়িয়ে রাত পুড়িয়ে
একলা হাওয়ায় কাটা ঘুড়ি
হায়রে পবন ছন্দপতন
হায়রে আমার মন্দ সমীরণ
বন্ধ ঘরে অন্ধ ঘোরে রন্ধ্রপথে
যখন-তখন কার আগমন নির্গমন
কী কারণে কার বারণে প্রবারণে নিবারণ
জনমভরা কপালপোড়া নয়নজোড়া আন্ধা এখন
ঘরের কোনায় বান্ধা কানন
কার ক্রোড়ে কে কান্দে কখন
কে করে কার হৃদয়হরণ কবর-খনন
শ্বেতচন্দন দাফনকাফন
রক্তচন্দন ললাটলিখন
কানা শাস্ত্রে পাই না বিবরণ

সাঁইজি করেন তার দক্ষিণ হস্ত প্রসারণ
যুগপৎ চক্ষু নিমীলন

তালযন্ত্রে উল্লাস আর তারযন্ত্রে যন্ত্রণা
বাজাও খোল করতাল ঢোল ডুগডুগি নাল
খঞ্জনি মৃদঙ্গ মন্দিরা
বাজাও একতারা দোতারা
বেদনার প্রস্রবণে মানবিক প্রণোদনা
মর্মে মন্ত্রণা চিত্তে উন্মাদনা
প্রবৃত্তির বৃত্তে প্ররোচনা
ঘুরে ফিরে ঘিরে ঘিরে বাজে
কভু ধীরে কভু জোরে
নেই খটকা নেই শংকা
যার কাজ তারই তাজ
আনাড়ির লবডংকা
মাথায় বাজ

সাঁইজির কালচক্রনেমি ঘোরে
অনিঃস্ব অনিত্য বিশ্ব নিত্যরূপে সাজে

আনন্দমৌমাছি ঝংকারে
পার্থ তীরন্দাজ টংকারে
বৃন্দাবনে রাধিকা ঢং করে
ষোলশ গোপিনী রং করে

তোমার আমার রংবাজি
কৃষ্ণলীলার কারসাজি
পাঁচ আঙুলের ভোজবাজি
আমরা আড়ালে সং সাজি

শিষ্যচিত্ত উড়ুউড়ু
ঈশান মেঘে গুড়ুগুড়ু
আঁধার অম্বরে প্রচণ্ড ডম্বরু
বিদীর্ণ বক্ষ দুরুদুরু
পথের শেষ কোথায়, কোথায় শুরু
সাঁইজি গুরু

পুরুষকার কথায় নয়
যথায় তথায় নয়
হেথায় হোথায় নয়
লতায় পাতায় নয়
লেপ কম্বল কাঁথায় নয়
হাঁড়ি পাতিল যাঁতায় নয়
আজে বাজে কাজে নয়
মন্ত্রে তন্ত্রে যন্ত্রে নয়
ব্যক্তিত্বের হ্রস্বত্বে দীর্ঘত্বে লঘুত্বে ঘনত্বে গাঢ়ত্বে নয়
ক্ষণস্থায়িত্বে দীর্ঘস্থায়িত্বে নয়
কৃতি কীর্তি কৃতিত্বে নয়
শৌর্যে বীর্যে নয়
ছলে বলে কলে কৌশলে নয়
আক্রমে বিক্রমে নয়
ধনে জনে শানে মানে গানে নয়
তংকায় ডংকায় নয়
ওংকারে ঝংকারে টংকারে ঢংকারে নয়
তাহলে কোথায়

সাঁইজির বিবেচনা ভালোবাসায়

কে কথা কয়, কে কয় না
শিস কাটে সোনার ময়না
বিষজ্বালা সোনার অঙ্গে
সঙ্গে সঙ্গে ফিসফিস কানাকানি
রঙ্গেরসে নিশপিশ জানাজানি
অঙ্গে-বঙ্গে-কলিঙ্গে
গালগল্প ফুরোয় না
ধুলোয় লুটোয় সুয়োরানির গয়না
দুয়োরানির দু:খ আর সয় না
নটে গাছটাও মুড়োয় না
শেষ হয়েও শেষ হয় না

কে বানায় দালান-কোঠা শূন্যের মাঝার
কে দেখে আয়নায় পাকনা চুল তার

সাঁইজির আয়না
সাত রাজা সাতশো রানির বায়না
কেউ পায়, কেউ পায় না

জমিনের পেছনে কমিন
কমিনের কেন্দ্রে কামিনীকাঞ্চন
প্রভু হে নিরঞ্জন
হেথায় হোথায় রঞ্জন অতিরঞ্জন পুষ্পচন্দন
নন্দনকাননে মানভঞ্জন মনোরঞ্জন
ভজন কীর্তন দেহবন্ধন
আলিঙ্গনে আলিম্পন তৈলমর্দন তৈলচিত্রাঙ্কন
আলিশান আয়োজনে আত্মনিবেদন
পঞ্চব্যঞ্জনে রসায়ন
উত্তরায়ন দক্ষিণায়ন চিরন্তন
ক্ষুদ্রায়তন বৃহদায়তন শাসনশোষণ বশীকরণ

সাঁইজির আকর্ষণ চুম্বকসমান
ঘাটে লাগাইয়া ডিঙা পান খাইয়া যান

পাথর মন পাখা মেলে উচাটন
চারণ মেঘ চামর দোলায়
ময়ূরপুচ্ছ বাতাসে উড়ে উড়ে আসে আনন্দ আবাহন
পর্বতচুড়োয় বরফ গলে
জলবায়ুর পরিবর্তন
গাছের পাতায় রোদের ঝিকিমিকি
পকেটে আধুলি সিকি
ছলায়-কলায় কে ভোলায়
কেউ হাসে কারাবাসে
কেউ ফাঁসে বনবাসে
কারো চিঠি চাপা পড়ে বালিশতলায়
কারো নাম ছাপা হয় ইতিহাসে

সাঁইজি আত্মগর্ভে সমাহিত
উপকণ্ঠে উপনীত
মন কেন এত কথা বলে

গর্ভের সন্তান সংহার
ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় একাকার
উত্তরে দক্ষিণে সংঘাত
বেহুদা মরণ বেশুমার
কুপোকাতে বাজিমাত
চক্রব্যূহে বক্র জ্যামিতি
জয়-পরাজয় নির্বন্ধ নিয়তি
ক্ষুদ্র-বৃহৎ তুচ্ছ-মহৎ এক-কাতার

সাঁইজি ভবদরিয়ায় কাটেন সাঁতার

১০

দূর মধুর
দূর বিধুর
দূরের বাদ্যে ফাঁক
নগদ নারায়ণে তুষ্ট শিষ্ট গৃহলক্ষ্মী
বিশিষ্ট বাকির গোয়ালে দুষ্ট শূন্য থাক
অন্নে ধন্য দেহ, লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ
হন্যে হয়ে হৃষ্টপুষ্ট ইষ্টদেবতা খােঁজেন
খোলা ময়দান
সই, কেবা শুনাইল শ্যামনাম

আম্ররসে নিমগ্ন মক্ষী
যা বোঝার সাঁইজি বোঝেন


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.