
সবাই গান গাইতে পারে না। বেশির ভাগ লোকই গান শোনে। আর গান রচনা করে তার থেকেও কম লোক। গান শোনা, গান গাওয়া এবং গান রচনা করা—প্রত্যেকটা কাজের উদ্দেশ্যে কিছু মিল আছে। আবার অমিলও আছে। যারা গান শোনে, গান গায় এবং গান রচনা করে, গান সম্পর্কে তাদের প্রত্যেকেরই অনুভূতি এবং সেই অনুভূতির তীব্রতা ভিন্ন ধরনের। বেশির ভাগ লোক গান শোনে ফুর্তি করার জন্যে। এই লোকেদের মধ্যে এক দল আছে, যারা গান-বাজনার কিছুই বোঝে না। তাদের কাছে গান-বাজনা আর হৈচৈয়ের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। যারা গান-বাজনা সামান্য হলেও বোঝে, তারা গান শোনে আনন্দ পাওয়ার জন্যে। তা ছাড়া, গান শুনে মনের ভার অথবা মনের দুঃখ হালকা করা যায়। শোকে সান্ত্বনা পাওয়া যায়। গান শুনতে শুনতে তাদের মধ্যে গানের রুচিও তৈরি হয়। তখন তারা আর সব রকমের গান শোনে না। তাদের একটা পছন্দ-অপছন্দের বোধ গড়ে ওঠে।
সবাই গান গাইতে পারে না। কারণ গান গাইতে এক ধরনের দক্ষতা লাগে। কণ্ঠ সুমিষ্ট হতে হয়। সুর অনুকরণ করার ক্ষমতা থাকতে হয়। আর সত্যিকার গায়ক হতে হলে গানের বারোটি স্বর গলায় নিখুঁতভাবে তুলে নিতে হয়। সেটা বেশ কঠিন কাজ। তেমন করে সবাই গান গাইতে পারে না। তবে গুনগুন করে অনেকেই।
সবশেষে আছে গান রচনা করার কাজ। এ কাজটা খুব কম লোকই করে। যারা করে, তাদের সবারই কমবেশি কবিত্ব শক্তি থাকে। সৃজনশীলতা থাকে। তাদের ঠিক সাধারণ মানুষ বলা যায় না। তাদের মনের মধ্যে একটা প্রবল ভাব জেগে উঠলে, সে ভাবটা প্রকাশ করার জন্যে এবং প্রকাশ ক’রে অন্যদের সঙ্গে নিজের ভাবটাকে ভাগ করে নেওয়ার জন্যে তারা অস্থির হয়ে ওঠে। কিন্তু নিজের ভাব অন্য একজনের মনে সঞ্চারিত করা খুব কঠিন কাজ। তার জন্যে কতোগুলো কলাকৌশল লাগে। যেমন, যারা গান রচনা করে তারা খুব বাছাই-করা শব্দ দিয়ে নিজেদের মনের ভাব প্রকাশ করতে চেষ্টা করে। তা ছাড়া, নানা রকমের কৌশল প্রয়োগ করে। যেমন ছন্দ, উপমা, অনুপ্রাস, অন্ত্যমিল, সংগীতময় শব্দ ইত্যাদি মনের ভাগ প্রকাশ করতে সাহায্য করে। ভাব প্রকাশের আর-একটা উপায় হলো সুর।
রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল—দুজনই কবি, যদিও দুজন দু ধরনের কবি। এঁদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ অল্পবয়স থেকে গান শুনেছেন। নজরুল অতো কমবয়স থেকে গান শোনার সুযোগ পাননি। তবে গীতিকার এবং সুরকার হওয়ার সম্ভাবনা, সম্ভাবনা কেন, প্রতিভা, দুজনের মধ্যেই ছিলো। কিন্তু দুজন যে-পরিবেশে মানুষ হয়েছেন, তার মধ্যে ছিলো আকাশ-পাতাল পার্থক্য। গান বলতে তাঁরা একই জিনিস বুঝতেন না। তাঁদের গান রচনার প্রেরণা এবং উদ্দেশ্যও ছিলো আলাদা।
একেবারে বালক বয়স থেকে রবীন্দ্রনাথ গান শেখেননি। কিন্তু গান শুনতেন। কারণ তাঁদের বাড়িতে প্রায় রোজই গানের আসর বসতো। তাই তিনি বাড়িতে শুনতে পেতেন উচ্চাঙ্গ সংগীত আর আদি ব্রাহ্মসমাজের সাপ্তাহিক উপাসনা-সভায় শুনতেন ব্রহ্মসংগীত। তারপর তাঁর গান শেখার হাতে-খড়ি হয়েছিলো সেকালের নাম-করা একজন ওস্তাদের কাছে।
রবীন্দ্রনাথ প্রথম গান লেখেন চোদ্দো বছর বয়সে, বড়ো ভাইদের একজন—জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি নাটকের জন্যে। খুব সম্ভব সেই ভাইয়ের সাহায্য নিয়েই তিনি এ গানটি লিখেছিলেন। তারপর প্রথম দিকে যে-গানগুলো রচনা করেন, সেগুলো ছিলো উপাসনা সংগীত। কিন্তু সেসব উপাসনা সংগীতে মূলধারা হিন্দুসমাজের দেবদেবীর নামও থাকতো না। কারণ তাঁদের পরিবার ছিলো নিরাকার একেশ্বরবাদী। তবে বৈষ্ণব পদাবলীর অনুকরণে কিশোর রবীন্দ্রনাথ ‘ভানুসিংহের পদাবলী’ নাম দিয়ে কতোগুলো গান রচনা করেছিলেন রাধাকৃষ্ণের প্রণয়লীলা নিয়ে। তিনি যখন কিশোর-বয়স অতিক্রম করলেন, বয়স সতেরো বছর, তখন লেখাপড়া শেখার জন্যে তিনি ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন। সেখানে ইংরেজি গানের স্বাদ পেয়েছিলেন। লেখাপড়া তেমন হয়নি, কিন্তু তিনি নতুন ধরনের গান শিখে এসেছিলেন। দেশে ফিরেই তিনি ‘বাল্মীকিপ্রতিভা’ নামে একটি গীতালেখ্য রচনা করেছিলেন। তাতে পশ্চিমা সংগীতের প্রভাব লক্ষ করা যায়।
তা ছাড়া, প্রতি বছর ব্রাহ্মদের মাঘোৎসব উপলক্ষে তাঁর গান রচনা করতে হতো। এ গানগুলোর বেশির ভাগ তিনি আন্তরিক প্যাশনে রচনা করেননি। এগুলোকে বলা যেতে পারে ফরমায়েশী গান। মোট কথা, আন্তরিক প্রেরণা থাক অথবা না-ই থাক তিনি প্রথম যৌবন থেকে ধর্মীয় সংগীত লিখতেই অভ্যস্ত হয়েছিলেন। অপর পক্ষে, তিনি দেবদেবী-বর্জিত যে-ব্রহ্মসংগীত রচনা করেন, হিন্দুসমাজ তা শুনতে অভ্যস্ত ছিলো না। সে জন্যে তাঁর গান দীর্ঘ দিন জনপ্রিয়তা লাভ করেনি—সীমাবদ্ধ ছিলো প্রধানত ব্রাহ্মদের মধ্যে।
অপর পক্ষে, নজরুল ছিলেন একটি অতি দরিদ্র মুসলিম পরিবারের ছেলে। মুসলিম সমাজে সেকালে গান শোনা ছিলো নিষিদ্ধ। কাজেই পৈতৃক পরিবারের মধ্যে নজরুল গান শোনেননি অথবা গান করার সুযোগ পাননি। গানে তাঁর হাতে-খড়ি হয়েছিলো লেটোর দলে যোগ দেবার পর। তখন তাঁর বয়স বছর বারো। তাঁদের পরিবার এতো দরিদ্র ছিলো যে, তার আগেকার দু বছর যৎকিঞ্চিৎ আয়ের জন্যে তিনি এক মাজারের খাদেম অর্থাৎ সেবায়েত হিসেবে কাজ করেছিলেন, মসজিদেও কাজ করতেন তিনি। এটা গান করার খুব একটা অনুকূল জায়গা ছিলো না। কিন্তু লেটোর দলে যোগ দিয়েই তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, তিনি চালাক-চতুর ছেলে। লেটোর দলের লোকেরা বললো দলে লেগে থাকলে ভবিষ্যতে তিনি ওস্তাদ হতে পারবেন। কিন্তু লেটোর দলে বেশি দিন থাকা হলো না। বছর তিন-চার কাটলো গানের জগৎ থেকে অনেক দূরে।

তারপর তিনি যখন শিয়ারশোল-রাজ স্কুলে পড়তেন, তখন তিনি তাঁর একজন শিক্ষকের চোখে পড়েন। এই শিক্ষক গানের ব্যাকরণ কতোটা জানতেন, সেটা পরিষ্কার নয়। কিন্তু তাঁর একটা হারমোনিয়াম ছিলো। বোধহয় স্বরলিপির বইও ছিলো। সেখানেই গানের ‘অআকখ’-এর সঙ্গে নজরুলের পরিচয়। কিন্তু পরিচয় ঘনিষ্ঠ হবার আগেই তিনি সেনাবাহিনীতে নাম লেখান এবং আশ্রয় পান করাচির সেনাছাউনিতে।
সেখানে রাতের বেলায় ব্যারাকের সামনে গানের নামে যা হতো, তাকে বলা যায়—বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা কমবয়েসী সৈনিকদের হৈচৈ আর অশিক্ষিত পটুত্ব দেখানোর প্রতিযোগিতা। তরুণ নজরুল এ সময়ে স্বরলিপির বই থেকে অনেকগুলো রবীন্দ্রসংগীত শিখে ফেলেন। তিনি এবং তাঁর সহকর্মী সৈনিকদের কাছে তখন গান কথাটার মানে ছিলো একটাই—আনন্দ করা, হৈহুলোড় করা। চোখ বন্ধ করে পরকালের কথা ভাবতে ভাবতে ধ্রুপদাঙ্গ ব্রহ্মসংগীত গাওয়া নয়।
বয়স বাড়ার পরও গানের প্রতি তাঁর মনোভাব কমবেশি একই রকমের ছিলো। গান তাঁর কাছে ছিলো প্রধানত আনন্দ করার মাধ্যম। নয়তো কেন লিখলেন এবং কী করে লিখলেন, ‘আলগা কর গো খোঁপার বাঁধন / দিল ওহি মেরা ফ’স গয়ি।’ –তোমার খোঁপার বাঁধন আলগা করো, কারণ ঐখানে আমার মনটা আটকা পড়েছে। বোঝাই যায়, এ স্থূল রুচির গানটি হলো করাচির সেনাছাউনিতে বসে ইয়ার-বন্ধুদের নিয়ে গাওয়ার মতো একটা বৈঠকী গান। পারিবারিক পরিবেশে গাইবার মতো গান নয়। কী ধরা যাক, নীচের গানটা। গানটার পটভূমি এ রকম:
সময়: মেঘলা রাত। নায়ক: এক যুবক। নায়িকা: এক যুবতী পরস্ত্রী। সেই যুবতী গাইছে:
হায়, পারে নেওয়ার ছলে নিলে মাঝনদীতে, / যৌবন-নদী টলমল নারি রোধিতে,
ঐ ব্যাকুল বাতাস হরি’ নিল লাজ-বাস, তায় চঞ্চল-চিত যে তুমি চাহ বধিতে;
পায়ে ধরি, ছাড় বঁধু / আমি পরের ঘরের ঘরণী।
তরঙ্গ ঘোর রঙ্গ করে, অঙ্গে লাগে দোল / এ কি এ নেশার ঘোরে তনু মন আঁখি লোল।
দুলিছে নদী দুলে বায়ু, দুলিছে তরী, / কেমনে থির রাখি মোর চিত উতরোল।
ওঠে ডিঙি পানসী ভরি বারি / কি করি কিশোরী রমণী।
আদিরসের খোলামেলা একটি গান! শূচিতার দোহাই দিয়ে গানটিকে অপাংক্তেয় করে রাখার সুপারিশ করছি না। বরং বলতে চাই হালকা রসের বৈঠকী গান হিসেবে এ গান একটা বয়সের তরুণ-তরুণীকে যথেষ্ট আনন্দ জোগাবে। তবে রবীন্দ্রনাথের মতো কোনো লোক এ গান লিখতেই পারতেন না, শুনতেও রাজি হতেন না। এটা রুচির ব্যাপার। নজরুল এ রকমের গান আরও লিখেছিলেন। যেমন, তাঁর আর-একটি গানে গলায় চুমু খাওয়ার কথাও শুনেছিলাম। শোকের কথা উঠলেও নজরুল পিছিয়ে থাকেননি। শোকে তিনি কখনো কখনো একেবারে আত্মহারা হয়েছেন। বুলবুলকে নিয়ে বেশ কয়েকটা শোকের গান আছে তাঁর। তা থেকে তাঁর ব্যাকুলতার তীব্রতা বোঝা যায়। তিনি যে ডিমেনশিয়া রোগে স্মৃতিহারা হয়ে গেলেন, তার পেছনেও বুলবুলের জন্যে তাঁর গভীর বিষণ্নতা কাজ করেছিলো। মোট কথা, তিনি যখন যে-রসে ভেসেছেন, সংযম হারিয়ে সেই রসেই প্লাবিত হয়েছেন। কিন্তু শ্রেষ্ঠ সাহিত্যের, সাহিত্যের কেন, যে-কোনো সৃজনশীলতার কাজে সংযম অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা উপাদান।
গান রচনা করে রবীন্দ্রনাথও উচ্ছ্বসিত হয়েছেন। বলেছেন, ‘প্রাণে খুশির তুফান লেগেছে / ভয় ভাবনার বাঁধন টুটেছে।’ না-বললেও কিছু যায়-আসে না। অনুমান করতে পারি, প্রতিটি গান রচনা করেই সৃষ্টির আনন্দে, তৃপ্তিতে তাঁর হৃদয় পূর্ণ হয়েছে। গানে সুর দিয়ে মন ভরে গেছে। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে নজরুলও মাতোয়ারা হয়েছেন। সৃষ্টির আনন্দ সবারই এক। গান যে রচনা করে, সে যেমন তৃপ্তি পায়, যে-তানপুরা বানায়, সেও একই রকমের তৃপ্তি লাভ করে। তবে দুজনের সৃষ্টি আলাদা। একজন গানের সঙ্গে বাজানোর জন্যে বাদ্যযন্ত্র বানায়, একজন খোদ গানটাই বানায়।
রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল দুজন আলাদা মানুষ। লালিত হয়েছেন একেবারে আলাদা পরিবেশে। তাঁদের রুচি তো আলাদা হবেই। দুজন তো দু রকমেরই গান লিখবেন। দুজনের উপাসনা সংগীত, দুজনের প্রেমের গান, প্রকৃতির গান তো আলাদাই হবে! রবীন্দ্রনাথের যে-ভাবমূর্তি আমাদের মনে তৈরি হয়েছে, সে মূর্তি শান্ত, সমাহিত। ঋষি-ঋষি ভাব। অপর পক্ষে, নজরুলের যে-ভাবমূর্তি গোলাম মোস্তফা কল্পনা করেছেন, সে হলো: ‘ভায়া লাফ দেয় তিন হাত / হেসে গান গায় দিনরাত / প্রাণে ফুর্তির ঢেউ বয় / ধরার পর তার কেউ নয়।’ রবীন্দ্রনাথ আর নজরুল – দুজনের গানের চরিত্র ভিন্ন, এমন কি, যেসব গানের বক্তব্য একই ধরনের, তাদেরও স্পিরিট ভিন্ন।
রবীন্দ্রনাথ দু হাজারের থেকেও বেশি গান লিখেছিলেন। বিষয়বস্তু অনুসারে এগুলোকে ঠিক শ্রেণীবদ্ধ করা যায় না। যেমন, বলা যায় না, এগুলোর মধ্যে এতোগুলো হলো শুধুই ‘প্রকৃতির গান’। বলা যায় না, কারণ তাঁর কোনো গানে শুধুমাত্র প্রকৃতির কথা নেই। প্রকৃতির কোনো গানের মধ্যে প্রেম এসে উঁকি দিয়েছে, কোনোটার মধ্যে আবার ঈশ্বর এসে উঁকি দিয়েছেন। ভাবগুলো তাই তালগোল পাকিয়ে বিচিত্র রূপ নিয়েছে। সে জন্যে রবীন্দ্রনাথকে ‘প্রেমের কবি’, কি ‘উপাসনার কবি’ বলে আখ্যায়িত করা যায় না। তা সত্ত্বেও, ‘গীতবিতানে’ রবীন্দ্রনাথের গানগুলোকে পূজা, প্রেম, স্বদেশ, প্রকৃতি, বিচিত্র ইত্যাদি নামে ভাগ করে সাজানো হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গান আছে ‘পূজা’ পর্বে। প্রায় সাত শো গান। তাঁর উপসনামূলক গানের মধ্যে কতোগুলো গান আছে, যেগুলোকে অনায়াসে বলা যায় প্রেমের গান। ‘তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম’ গানটিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে পূজার গানের মধ্যে, কিন্তু একে প্রেমের গান বলে চিহ্নিত করলে অযৌক্তিক হতো না। আবার কোনো কোনো প্রেমের গানকে অনায়াসে বলা যায় উপাসনার গান। প্রকৃতির গানও বলা যায়। কেবল একটা কথা বলা যায় না, তাঁর পূজার গানে অমুক অমুক দেবদেবীর নাম আছে। কারণ, সত্যি সত্যি নেই। তাঁর ঈশ্বর ধর্ম-নিরপেক্ষ ঈশ্বর; সে ঈশ্বর কোনো বিশেষ ধর্মের সঙ্গে যুক্ত নন।
অপর পক্ষে, নজরুলের ‘ঈশ্বর’ নানা নামে অভিহিত। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের মূর্তিমান ঈশ্বর। ফলে মূলধারা হিন্দুধর্মের শিব, উমা, পার্বতী, দুর্গা; বৈষ্ণবদের রাধাকৃষ্ণ; শাক্তদের শ্যামা ইত্যাদি দেবদেবী সাধারণ মানুষের কাছে ‘ঈশ্বরের’ চেয়ে অনেক বেশি পরিচিত। নজরুলের গানে এসব দেবদেবীর নাম শুনে এই মানুষরা সহজেই এসব গানকে ধর্মীয় সংগীত বলে চিনতে পারলো। আর, মুসলমানদের মুহাম্মদ এবং আল্লাহ নিয়ে অবশ্য কোনো সংশয় ছিলো না। সংশয় না-থাকলেও, প্রথম দিকে মুসলমানরা তাঁর গানের দিকে আকৃষ্টও ছিলো না। তাঁর বেশির ভাগ উপাসনার গানে উপাস্য দেবতা / দেবী / ঈশ্বর / মুহাম্মদকে তিনি যেভাবে অঙ্কন করেছেন, সেই রূপকল্প থেকে তাঁদের প্রত্যক্ষ করা যায়।
তিনি উপাসনার বহু গান রচনা করেছেন গ্রামোফোন কম্পেনির ফরমায়েশে, ঠিক আন্তরিক প্রেরণায় নয়। কিন্তু আন্তরিক প্রেরণা থাক অথবা না-ই থাক, তাঁর গানে ঠাকুর-দেবতার নাম শুনে হিন্দু সমাজ তাকে সমাদর করে গ্রহণ করলো। তিনি যে মুসলমান, সে বাধা থাকা সত্ত্বেও, তাঁর ধর্মীয় গান হিন্দু সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছিলো। নয়তো ভেতরে ভেতরে হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ মোটেই লোপ পায়নি। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, সেকালের একজন নাম-করা শিল্পী কাশেম মল্লিক হিন্দু ধর্মীয় গান গাইতেন বলে তাঁর নাম রেকর্ডের গায়ে এবং রেকর্ড বুলেটিনে লেখা হতো কে. মল্লিক। কারণ এ নামটা হিন্দুনাম বলে মনে হতে পারে। আবার ১৯৩০-এর দশকে হিন্দু গায়ক-গায়িকারা যখন ইসলামী গান গাইতে আরম্ভ করেন, তখন তাঁদের একটা মুসলমানী নাম দেওয়া হয়।
কেবল ধর্মীয় গানের জন্যে নজরুলকে সাধারণ শ্রোতারা পছন্দ করতো না, তাঁর ভাষা এবং ভাবও ছিলো তাদের নাগালের মধ্যে। এ ছাড়া, নজরুলের ইংরেজ-বিরোধী রাজনৈতিক পরিচয়ও তাঁর জনপ্রিয়তার একটা বড়ো কারণ। প্রসঙ্গত, ১৯২৯ সালে নজরুলকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়ার সময় সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর ভাষণে নজরুলের দেশপ্রেমের যে-উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন, তা এখানে স্মরণযোগ্য। দেশবাসী সে অর্থে রবীন্দ্রনাথকে স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেনি। রবীন্দ্রনাথ গদ্যে-পদ্যে এবং গানের ভাষায় নজরুলের থেকে অনেক বেশি লিখেছিলেন, কিন্তু কোথাও ইংরেজ-মুক্ত স্বাধীনতার কথা লেখেননি।
রবীন্দ্রনাথ ডজনখানেক হাসির গান রচনা করেছিলেন। সে তুলনায় নজরুল হাসির গান লিখেছিলেন অনেক বেশি। কিন্তু তাঁদের পার্থক্য কেবল সংখ্যার দিক দিয়ে নয়। বড়ো পার্থক্য রুচির। রবীন্দ্রনাথের সূক্ষ্ম রসিকতা সাধারণ শ্রোতাদের হাসাতে পারতো কিনা, সন্দেহ আছে। দ্বিজেন্দ্রলালও তাঁর হাসির গানের জন্যে বিখ্যাত। অন্য দিকে, নজরুল সাধারণ শ্রোতাদের উপযোগী হাসির গান লিখে তাদের হাসিয়েছেন। ‘আমার ঠনঠনিয়ার চটি’ অথবা ‘আমার খোকার মাসী শ্রীঅমুকবালা দাসী’ অথবা ‘আজকে হইব মোর বিয়া / কালকে আইমু বৌ নিয়া’ অথবা ‘দে গোরুর গা ধুয়ে’র মতো গান তার প্রমাণ। প্রায় সুড়সুড়ি দিয়ে হাসানোর মতো।
নজরুল হাজার তিনেক গান লিখেছেন। অনেকে তিন হাজারের বেশিও বলেন। কিন্তু তার কোনো প্রমাণ নেই। এই বিপুল সংখ্যক গান দিয়ে নানা শ্রেণীর শ্রোতাদের চাহিদা মিটিয়েছেন তিনি। তাঁর এসব গানের বেশির ভাগই ফরমায়েসী গান। তিনি রোজ রেকর্ড কম্পেনিতে যেতেন। সেখানে গায়করা এসে তাঁর কাছে গান চাইতেন। কবি তাঁদের গান লিখে দিতেন। প্রত্যেকটা গানের জন্যে রেকর্ড কম্পেনির কাছ থেকে বিশ টাকা পেতেন। প্রায় দোকানদারির মতো। অবশ্য লিখিয়েই শেষ নয়, তারপর তিনি গানে সুর দিতেন। সেখানেও তাঁর দায়িত্ব শেষ হতো না। গায়ককে গানটা শেখানোর দায়িত্বও ছিলো তাঁর। সময় না-পেলে কমল দাশগুপ্ত, সুবল দাশগুপ্ত, চিত্ত রায় প্রমুখ সুরকারকে ডেকে সুর দিতে বলতেন। অনেক সময় সুরের কাঠামোটাও বুঝিয়ে দিতেন। কমল দাশগুপ্ত একাই নজরুলের লেখা দেড় শো/দু শো গানে সুর দিয়েছিলেন।
এ রকমের ফরমায়েসী গান অনেক সময় কথা ও সুর মিলে উৎকৃষ্ট গানে পরিণত হতো না। ব্যতিক্রম ছিলো বৈকি! একবার কমল দাশগুপ্ত কয়েকটা শ্যামাসংগীত লিখে দেবার জন্যে কবিকে অনুরোধ করেন। কবির আর সময় হয় না। শেষে একদিন সন্ধ্যের পর নির্জন পরিবেশে কবি চা আর পান আনতে বলেন কমল দাশগুপ্তকে। তারপর কোনো কথা না-বলে একটার পর একটা শ্যামাসংগীত লিখে চললেন। একে একে বারোটা গান লিখে তবে যেন তিনি বাস্তব জগতে ফিরে এলেন। নয়তো রেকর্ড কম্পেনিতে গিয়ে তিনি দিনে দুতিনটা গানের বেশি গান লিখতেন না। অন্তরের তাগিতে যখন লিখতেন তখনকার কথা আলাদা।
এ রকম ঢালাও মন্তব্যের সবটা সাধারণত সঠিক হয় না। তা সত্ত্বেও আমার মনে হয় নজরুলের শ্রেষ্ঠ গানগুলো হলো তাঁর প্রেমের গান আর শ্যামাসংগীত। যা তিনি লিখেছিলেন তীব্র প্যাশন নিয়ে। তবে ব্যতিক্রম আছে বৈকি! ‘সখি, বাঁধো লো বাঁধো ঝুলনিয়া’ তাঁর সবচেয়ে সুন্দর গানগুলোর অন্যতম। কিন্তু গানটি প্রকৃতির গান। ‘মন বলে তুমি আছ ভগবান / চোখ বলে তুমি নাই’, যাহা কিছু মম / আছে প্রিয়তম’ অতি উৎকৃষ্ট গান, কিন্তু কোনোটিই প্রেমের গান অথবা শ্যামাসংগীত নয়। তিনি রবীন্দ্রনাথের মতো বড়ো কবি ছিলেন না। তাঁর গানগুলো তাই কাব্যিক মূলের দিক দিয়ে সর্বত্র সমান উৎকর্ষ লাভ করেনি। কথা ও সুর মিলে তাঁর যে-গানগুলো সফল হয়েছিলো, সেগুলো রবীন্দ্রসংগীতের চেয়ে হেয় নয়। বস্তুত, রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল বাংলা গানের দুই শ্রেষ্ঠ গীতিকার ও সুরকার।
Comments RSS Feed