আর্টস

ফারুক মঈনউদ্দীন: শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের ইতিবাচক কিছু দিতে পারছে না

শিমুল সালাহ্উদ্দিন | 8 Oct , 2020  


ফারুক মঈনউদ্দীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি শাস্ত্রে স্নাতক অধ্যয়নের সময় কবিতা লেখার পাশাপাশি সত্তরের দশকের শেষ ভাগে ছোটগল্প দিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। তারপর স্নাতকোত্তর শেষে ব্যাংকিং পেশায় যোগদান করেন। তার আগে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সাংবাদিকতা। প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলায় ১৯৭৯ সালে এবং প্রথম গল্পগ্রন্থ ১৯৯০ সালে। বাংলায় অর্থনীতি ও ব্যাংকিং বিষয়ের মতো জটিল বিশ্লেষণধর্মী লেখাতেও তিনি স্বচ্ছন্দ। অনুবাদ ও ভ্রমণ সাহিত্যে আছে সরব পদচারণা। এ যাবত প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে গল্পগ্রন্থ ৩টি, অনুবাদ গ্রন্থ ৩টি, ভ্রমণ কাহিনী ৫টি, অর্থনীতি ও ব্যাংকিং বিষয়ক ৪টি, প্রবন্ধগ্রন্থ একটি। পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার। তার মুখোমুখি হয়েছেন কবি ও সাংবাদিক শিমুল সালাহ্উদ্দিন।

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: ফারুক ভাই, অভিনন্দন আপনাকে। অনেকদিন থেকেই ভাবছি আপনার সঙ্গে আলাপ করবো। অনেকগুলো বিষয় নিয়ে আলাপ করা দরকার। যে লেখক জীবন আপনি উদযাপন করছেন, সেই জীবনের ক্লান্তি, ক্লেদ, হর্ষ নিয়েই আমরা আজ কথা বলবো মূলত। সব কিছু নিয়েই আপনি লিখছেন। আমরা সেই জীবনের পেছনে ফিরে তাকাতে চাই।
আপনার শৈশবের কোন স্মৃতি আপনার খুব মনে পড়ে?
ফারুক মঈনউদ্দীন: শৈশবের স্মৃতি বলতে আবছা আবছা মনে পড়ে বড় বোনের বিয়ের কথা। কিন্তু আমার কাছে যে স্মৃতিটা সত্যিকার অর্থে বলার মতো স্মৃতি সেটা হচ্ছে, আমার বড় ভাই-বোনেরা পড়ালেখা করতো ঢাকায়; কেউ মেডিকেলে, কেউ বুয়েটে, কেউ ইডেনে। তারা ছুটিতে বাড়ি আসতো। আমরা তখন মফঃস্বল শহরে থাকি। কেননা- আমার বাবার সরকারি চাকরি। তো ঐ সময় তারা যখন আসতো, আমাদের জন্য বই উপহার নিয়ে আসতো। সেটা ছিলো আমাদের জন্য সেরা উপহার এবং তারাও মনে করতো এই উপহারটি ভালো উপহার আমাদের জন্য। তাই আমার শৈশবের উজ্জ্বল স্মৃতির কথা যদি বলো তবে এই বই উপহার পাওয়া ও বই পড়ার স্মৃতিটাই আমার কাছে খুব উজ্জ্বল স্মৃতি।আমি আসলে ব্যক্তিগত স্মৃতির মধ্যে যেতে চাই না।

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আমি আসলে এই প্রশ্নটি করেছি এটা বোঝার জন্য যে আপনি আসলে বড় হয়ে উঠলেন কখন?
ফারুক মঈনউদ্দীন: হ্যাঁ, সেটাই বলছি। আমার বড় হয়ে ওঠা মানে যখন কোন বই পড়ে আমার ভালো লাগছে; মানে আমি বড় হয়ে উঠছি। আমার আবছা মনে পড়ে, বাবার সাথে গ্রামের বাড়ি গিয়ে দেখছি আমার দাদী কোমর থেকে নব্বই ডিগ্রি বেঁকে গিয়ে হাঁটছেন। সেটা আবছা স্মৃতি। তখনো আমি বড় হয়ে উঠিনি, তাই সেটা বলছি না।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার শৈশব কেটেছে কোথায়?
ফারুক মঈনউদ্দীন: আমার শৈশব কেটেছে বিভিন্ন জায়গায়। কিছু অংশ কেটেছে চাঁদপুরের মতো জায়গায়। সেটা আমার বর্ণপরিচয়ের সময়, খুব আবছা স্মৃতি।একটু আবছা মনে পড়ে, মতলব হাই স্কুলের খুব নামী প্রধান শিক্ষক ছিলেন অলিউল্লাহ পাটোয়ারী। তাঁর জামাই পরে বুয়েটের ভিসি ছিলেন, তখনো আমি বড় হয়ে উঠিনি। এরপর আমরা চলে আসি লক্ষ্মীপুরে। সেখানের স্মৃতিও আবছা। মনে পড়ে, আমার বড় বোন লক্ষ্মীপুরকে ইংরেজিতে লাকস্মীপুর লিখতেন। তখন এতই ছোট ছিলাম যে, বুঝতাম না ইংরেজিতে লক্ষ্মীপুর আসলে লাকস্মীপুরই হয়।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনি ভাই-বোনদের মধ্যে কত তম?
ফারুক মঈনউদ্দীন: আমি চার ভাই, চার বোনের মধ্যে সাত নম্বর। আমার ছোট এক ভাই।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনি একটি বড় পরিবারের আবহে বড় হয়েছেন। আজ যখন দেখছেন পরিবারগুলো ভেঙে অণু পরিবারে পরিণত হচ্ছে; আপনার লেখায় সেই ঘাত প্রতিঘাত দেখা যায়, আপনি এটাকে কিভাবে দেখেন?
ফারুক মঈনউদ্দীন: বাঙালি সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় যে সংস্কৃতি সেটা একান্নবর্তী পরিবার। আমার যখন বুদ্ধি হয়, আমার বাবা অবসর নিয়ে এলেন; তার আগ পর্যন্ত আমাদের একান্নবর্তী পরিবার। বাইরে বাইরে থাকার জন্য আমরা একান্নবর্তী পরিবার পাইনি। আমাদের গ্রামে যে একান্নবর্তী পরিবার দাদার ছিল, সেটা আমি মায়ের মুখে শুনেছি। সেই একান্নবর্তী পরিবারের কোন স্মৃতি আমার নেই। মায়ের কাছে শুনেছি, দাদারা দুই ভাই। দুই দাদার তিন ছেলে, তারা সবাই ছিলো একান্নবর্তী পরিবার; কিন্তু আমরা সে পরিবার কখনো দেখিনি। যখন দেখেছি আমাদের পরিবার তখন তিন ভাগ। একান্নবর্তী পরিবার না পেলেও, একান্নবর্তী পরিবারের অনেকগুলো ভালো দিক আছে, সেগুলো আমি অনুভব করি। হ্যাঁ, কিছু খারাপ দিকও আছে। আমরা আট ভাই-বোন মিলেও অনেক বড় পরিবার। কিন্তু সবাই বাইরে বাইরে পড়ালেখা করার দরুন আমরা কখনো একসাথে থাকতে পারিনি। ১৯৭৩ সনে বড় ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে আমরা সব ভাই-বোন একসাথে হয়েছিলাম। এই একটা অনুষ্ঠান, যখন আমরা সব ভাই-বোন একসাথে হয়েছি, এমনকি বাবার মৃত্যুর সময়ও আমার এক ভাই বিদেশ থাকায় আমরা সবাই একসাথে হতে পারিনি। আবার মা যখন মারা যায়, আমি, আমার এক বোন ও ভাই বিদেশে। ফলে তখনো আমরা একসাথে সবাই মিলিত হতে পারিনি। বড়ভাইয়ের বিয়ে ছাড়া আমরা চার ভাই-চার বোন আর কখনো একসাথে হতে পারিনি। এটা দুঃখজনক হলেও সত্যি!
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার একটি গল্পে আমি মুগ্ধ ছিলাম। আপনি জানেন, যেটা পরে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমাও হয়- ‘শারীরবৃত্তীয়’ গল্প। আপনার গল্প ও গদ্যভাষা অনেক বেশি সাংবাদিকতামূলক, হতে পারে আমি সাংবাদিক বলে আমার এমন মনে হয়। আপনি আপনার পেশা জীবনের শুরু করেছিলেন সাংবাদিকতা দিয়ে, তাই বলেই কি আপনার গদ্যভাষা সাংবাদিকতামূলক, নাকি এটা আপনার বাছাই করা গদ্যভঙ্গি?
ফারুক মঈনউদ্দীন: সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিলাম বলে আমার গদ্যভঙ্গি এমন কিনা এটা ঠিক আমি বলতে পারবো না। তবে আমার খুব বেশি কল্পনা এনে লেখার দক্ষতা বোধ করি নেই!
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: এমনটা আপনার কেন মনে হয়?
ফারুক মঈনউদ্দীন: কেন মনে হয়। কারণ- আমি সবসময় নিজের চোখে দেখা জিনিস বা নিজের অভিজ্ঞতা থেকে লিখতে চাই। তাই হয়তো কল্পনা থেকে লেখার দক্ষতা আমার কম। যেমন ধরো, আমার মাথায় একটা গল্প অনেকদিন ধরে ঘুরছে, কিন্তু আমি সেই গল্পটি লেখার আগে একটি মফঃস্বল থানায় কিছুক্ষণ কাটিয়ে আসতে চাই। কেননা- আমি সেই থানার বর্ণনা দিতে পারছি না। কেননা- থানার অভিজ্ঞতা আমার বেশি নেই। একটি থানায় বসে সেই থানার দৈনন্দিন কর্ম দেখে সেই বর্ণনাটি দিতে না পারলে আমি লেখায় সেই শান্তি পাবো না। ধরো, ‘শারীরবৃত্তীয়’ নামে যে গল্পটা লিখি আমি, তখন চট্টগ্রামের ইপিজেড সংলগ্ন একটি শাখার ম্যানেজার। তখন বিভিন্ন ফ্যাক্টরিতে আমি ঘুরেছি দেখার জন্য, ফ্যাক্টরির মালিকদের সাথে কথা বলেছি। ওদের শ্রমিকদের বেতন কত? তারা কিভাবে ঢোকে? তাদের কী কী কাজ? তাদের দেহভঙ্গি, কিভাবে থাকে, সব কিছু দেখেছি। অনেকে বলে আমার লেখায় অনেক ডিটেলস থাকে, ডিটেলস থাকে বলেই হয়তো তোমার মনে হয়েছে, আমার লেখায় সাংবাদিকতামূলক গদ্যভঙ্গির বেশি দেখা পাও। এটা সচেতনভাবে করা হয় না।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: বিভূতিভূষণ, মানিক বা তারাশঙ্কর তাদের লেখা সম্পর্কে যদি বলি, আমরা দেখি বাংলাসাহিত্যের গদ্য ইতিহাসে ডিটেলিংকে আমরা সবাই ভালো লেখা বলি, আপনার প্রিয় লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথাও যদি বলি বা আরও যারা যারা আছেন। আমাদের এখানে জনপ্রিয় লেখালেখির দিকে আপনি কখনো যাননি। আমরা দেখেছি আপনি ভ্রমণকাহিনী লিখছেন, অনুবাদ করছেন, কিন্তু এক ধরনের লিটারেলি কনসাইনমেন্ট আপনার মধ্যে ছিলো যে, মন ছুঁয়ে যাওয়া বিষয়ের দিকে আপনার আগ্রহ বেশি। সেটা কেন? আপনার পড়ালেখার জন্য, নাকি আপনার জীবনবোধটাই এমন?
ফারুক মঈনউদ্দীন: (মুচকি হেসে) এটার সঠিক কোনো উত্তর আমার কাছে নেই। তবে একটা কথা ঠিক, আমি জনপ্রিয়ধারার সাহিত্য করার কথা কখনো ভাবিনি, তার একটা কারণ হতে পারে আমার যে পেশা তাতে সময় নষ্ট করার মত সময় খুব কম তাই অনেক কিছু লিখে সময় নষ্ট করার চেয়ে কংক্রিট কিছু লেখার চেষ্টা করি। সেই কারণে সেটা হতে পারে। আমার যদি অঢেল সময় থাকতো তাহলে হয়তো তেমন কিছু লেখা এসে যেতো। সময় যেহেতু কম, তাই আমি সবসময় কংক্রিট কিছু লিখতে চেষ্টা করি, যা পাঠকের কাছে ভ্যালু এ্যাড করবে।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনি যেসব অনুবাদ করেছেন সেগুলোও খুব আলোড়ন সৃষ্টিকারী সাহিত্য। যেমন- কেনজাবুরো ওয়ে, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের কথা, কিংবা জীবনানন্দ নিয়ে আপনার যে কাজ, যার জন্য সৈয়দ হকের সাথে আপনি আইএফআইসি ব্যাংক পুরস্কার পেয়েছেন। আমি জানতে চাই, আপনার যে গদ্যশৈলী তা নিয়ে আপনার সচেতন কোনো চিন্তা ছিলো কিনা?
ফারুক মঈনউদ্দীন: গদ্যশৈলী নিয়ে আমার সচেতন কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই। যদিও অনেকে বলেন আমার গদ্যটা ভালো। তবে ইউনিভার্সিটি লাইফের শেষ দিকে আমি একটা সাপ্তাহিক করতাম ‘চিত্রবাংলা’ নামে। থার্ডগ্রেড পত্রিকা। তখন আমি, ফয়জুল লতিফ চৌধুরী,শওকত মাহমুদ, আমরা চাইছিলাম পত্রিকাটিকে সিরিয়াস করে তুলতে। ফলে আমরা বেশ কিছু কভার স্টোরি করেছিলাম। যেমন- আমি করেছিলাম প্রাক্তন রাষ্ট্রপতিরা কেমন আছে তা নিয়ে। আমি সব প্রাক্তন রাষ্ট্রপতিদের ইন্টারভিউ করেছিলাম। যখন ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে গেলাম, ‘চিত্রবাংলা’ও ছেড়ে দিলাম। একদিন মিজানুর রহমান মিজান, খবর পত্রিকার সম্পাদক, তিনি ডেকে বললেন, “লক্ষ্মীভাই, তুমি লেখালেখিটা চালাও। তোমার লেখার হাতটি অসাধারণ।” আমি উনার কথাটি পাত্তা দেইনি। অনেকে বলে আমার গদ্য ভালো কিন্তু আমি নিজে জানি না। ফলে সচেতনতা তো নেই-ই চেষ্টাও করিনি কখনো যে, এভাবে লিখবো।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার পাঠ আপনাকে কোনভাবে প্রভাবিত করেনি বলতে চান?
ফারুক মঈনউদ্দীন: না । আমি অনেক আগে একটি গল্প লিখেছিলাম, যেখানে আমি খুব চেষ্টা করেছিলাম আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মত লিখতে। ফলে সচেতনভাবে আমি চেষ্টা করেছিলাম। আর তাই ঐ গল্পের কিছু কিছু বাক্য পড়লে মনে হবে, হ্যাঁ, এটা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখা। পরে সেটা আমি ধারাবাহিক করিনি। বাকী কোন লেখায় আমি সচেতনভাবে গদ্যশৈলী ভেবে লিখিনি। আমি দীর্ঘবাক্য লেখা পরিহার করি সচেতনভাবেই।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার প্রথম কখন মনে হলো আপনি লিখবেন বা আপনি লিখতে পারেন?
ফারুক মঈনউদ্দীন: সবার লেখা শুরু হয় সাধারণত স্কুল ম্যাগাজিনে। আমি সেই কথায় যাচ্ছি না। আমি বলছি আমার লেখা জাতীয় দৈনিকে প্রকাশের কথা। কোনো এক একুশে ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামের দৈনিকে প্রকাশিত কবিতাই আমার প্রথম প্রকাশ। তখন আমি এইট-নাইনে পড়ি। আমার একটি ছড়া প্রথম ছাপা হয় দৈনিক ইত্তেফাকের ‘কচিকাঁচার আসরে’।পরে যখন ‘গণকন্ঠ’ হয়, সেখানে আমি কবিতা লিখতাম। আমি যখন নাইন-টেনে পড়ি, বাংলাদেশ বেতারে দুপুর তিনটায় ‘নবীন কন্ঠ’ নামে একটি অনুষ্ঠান হতো কলেজ পড়ুয়াদের নিয়ে। আমার দাড়ি-গোঁফ ছিলো। সবাই ভাবতো আমি ঢাকা কলেজের ছাত্র। সেখানে আমি স্বরচিত কবিতা পাঠ করতাম। যখন চট্টগ্রাম কলেজে পড়ি তখনো কবিতা লিখতাম। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার শেষে আমি একটি গল্প লিখি। আমি যখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হই তখন গল্পটি দিলাম আহসান হাবীবকে। তার আগে কবিতা পাঠাতাম। সেগুলো ছাপা হয়নি। ‘গণবাংলা’য় আমি আবুল হাসানকে কবিতা দিতাম। আহসান হাবীবকে গল্পটি দেবার তিন সপ্তাহের মধ্যে গল্পটি ছাপা হয়। আমি জানিও না, সাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের ছেলে সাগর ভাইয়ের ছোট ভাই প্রবাল আমার ক্লাসমেট ছিলো স্কুলে। সে বুয়েটে তখন। একদিন তার সাথে দেখা হবার পরে সে আমাকে বললো, “কিরে, তোর নাকি একটা গল্প ছাপা হয়েছে? আম্মা বললো।” আমি তো অবাক হয়ে বললাম, “তাই নাকি? এই তো সেদিন গল্প দিয়ে এলাম!” প্রবাল বললো, “আম্মা বললো তোর গল্প। “ আমি রেফারেন্স রুমে পুরনো ‘দৈনিক বাংলা’ পেপার ঘেঁটে দেখলাম, তাই তো, এ তো আমারই গল্প! ঐদিন থেকেই আমার মনে হলো, আমি গদ্য লিখি, আমি গদ্য লিখতে পারি এবং লেখা উচিত। এতগুলো কবিতা রিজেক্ট যিনি করেছেন, তিনি যখন আমার প্রথম লেখা গল্প ছেপেছেন, তার মানে আমার গদ্য লেখা উচিত।তখন থেকেই আমি গদ্য লেখা শুরু করি। তখন থেকে নিয়মিত গল্প লেখা শুরু। আশির দশকের সেই দিনগুলোতে দৈনিক কম, আর দৈনিকগুলোর সাময়িকী বের হতো শুক্রবারে। এমনও শুক্রবার গেছে, ‘দৈনিকবাংলা’ ও ‘ইত্তেফাক’ দুটো সাময়িকীতে দুটো গল্প প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম গল্পটি ১৯৭৮ সালে প্রকাশের পরেই আমি ভেবেছি সিরিয়াসলি লেখালেখি করবো।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন:১৯৭৮ সালে প্রথম গল্প আর প্রথম বই ‘বৈরী স্রোত’ বের হলো ১৯৯০ সালে, সেই গল্পটা শুনতে চাই।
ফারুক মঈনউদ্দীন: আমার অনেক গল্প প্রকাশিত হয়ে গেছে, আমার তখন সিলেটে পোস্টিং। আমার বসের অতিথি হয়ে কবি সৈয়দ শামসুল হক গেলেন সিলেটে। অফিসে এলেন। আমি তো উনাকে চিনি, উনি তো আমাকে চেনেন না। কথায় কথায় বললাম, “আমি গল্প-টল্প লিখি। বেশ কিছু পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে।“ তিনি বললেন, “আপনার কি বই আছে?” আমি বললাম, “না। বই-টই নেই; আর বই কে করবে? আমি বই করার কথা ভা্বিনি কখনো। “ উনি উনার মতো স্বভাবসুলভ ভাবে বললেন, “একটি বই থাকা উচিত। একটি বই থাকলে লেখক বোঝেন তিনি কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন। পত্র পত্রিকা তো সাময়িক, কিন্তু বই থাকলে দাঁড়াবার জায়গা শুরু হয়।“ কথাটি আমাকে খুব ক্লিক করলো। আমার মনে হলো কথাটি সত্য কিন্তু আমার বই করবে কে? ফয়জুল লতিফ চৌধুরী দেশ প্রকাশনের মালিক। আমার বন্ধু। তিনি বললেন, “আমি বই করবো।“ তারেক সুজাত, কাফি, আরো কয়েকজন মিলে হাত পাকাচ্ছে, ওরাই আমার প্রথম বইটি কাঁচাহাতের কাজটি করে। বাজে প্রোডাকশন, প্রচুর ভুল, ছোট টাইপ।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: এত বাজে প্রোডাকশন, ছাপার ভুল, ছোট ছোট টাইপের বই হাতে কি অনুভূতি হয়েছিলো?
ফারুক মঈনউদ্দীন: আমি তো তখন বুঝতামই না ছাপার ভুল, বইয়ের সৌকর্য কাকে বলে। এখন বুঝি। বাজে প্রোডাকশন, ছাপার ভুল, কিছুই আমার চোখে পড়েনি। কেননা- সেটা আমার প্রথম সন্তান। কেবল টাইপ ছোট হবার একটা দুঃখ ছিলো।

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার গল্পের বই ‘বৈরী স্রোত’, ‘আত্মহননের প্ররোচনা’, ‘অপরিচয়ের কালবেলা’, ‘সেইসব শেয়ালেরা’; আপনার প্রিয় বই কোনটি? এবং কেন?

ফারুক মঈনউদ্দীন: আত্মহননের প্ররোচনা। কারণ- বইটিতে গল্প আছে মনে হয় পাঁচটি কি ছয়টি, এর প্রত্যেকটি গল্প আমার খুব পছন্দের। প্রতিটি গল্প দীর্ঘ। আবার যদি আমার লেখা প্রিয় গল্পটির কথা বলি, সেটি এই বইয়ে নেই। আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্প ‘সেইসব শেয়ালেরা’।

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার গল্প,অনুবাদ বা প্রবন্ধ পড়তে গিয়ে মনে হয় আপনার প্রস্তুতিপর্ব খুব দীর্ঘ এবং আপনি যা নিয়ে লিখবেন বলে ভাবেন তা আপনার মাথায় ও মননে জারিত করতে থাকেন অনেক সময় ধরে।

ফারুক মঈনউদ্দীন: একদম ঠিক। আসলেই আমি দীর্ঘ প্রস্তুতি ছাড়া লিখি না। আমার কাছে খুব অবাক করা বিষয় হচ্ছে, আমি যে দীর্ঘ প্রস্তুতি ছাড়া লিখি না, তা সর্তক পাঠক ধরতে পারছে। সেটা আনন্দের। একটু আগেই বলেছি, একটি গল্প অনেকদিন ধরে মাথায় ঘুরছে, লিখতে পারছি না। কেননা- মফঃস্বল থানায় যেতে চাই, সেটাই প্রস্তুতি। যেমন- গার্মেন্টস কর্মীদের নিয়ে যে লেখাটি লিখেছি, সেটারও অনেক হোমওয়ার্ক ছিলো। আমার একটি গল্প আছে, নাম ‘সময় অসময়’। সেই গল্পটি একজন ঘড়ির মেকানিককে নিয়ে। গল্পটির টানাপোড়েন হচ্ছে, যখন চাবি দেয়া ঘড়ির বদলে অটোম্যাটিক ঘড়ি এলো, তার পর এলো কোয়ার্স ঘড়ি, তখন ঘড়ির মেকানিকের আর কোন কাজ নেই। আমাদের এলাকায় মৃদুল দা বলে একজন মেকানিক ছিলেন। আমি উনার কাছে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতাম,দেখতাম কীভাবে কাজ করেন। কথা বলে বলে জানতাম, উনার কাজ কমে যাচ্ছে। সেই সব প্রস্তুতি নিয়ে যখন গল্পটি লেখা হলো, পরিচিতরা গল্পটি পড়ে বলেছেন আপনার লেখায় এত ডিটেল, মনে হয় আপনি নিজেই একসময় ঘড়ির মেকানিক বা সহকারী ছিলেন। প্রস্তুতির বিষয়টা প্রচ্ছন্ন নেই, পাঠকরা যে বুঝতে পারছেন, সেটা আনন্দের।

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন:
আপনার এই যে দেখা থেকে লেখা, এই প্রক্রিয়াটির কী কারণ?
ফারুক মঈনউদ্দীন: এটির দুটি কারণ। প্রথমত, আমি একজন ব্যাংকার। আমি সবসময় দেখায় বিশ্বাসী। আমি আমার অফিসারদেরও বলি, তোমরা শহরের ছেলে-মেয়ে, তোমরা যে ক্রেডিট প্রপোজাল করছো, তোমরা কি কখনো দেখেছো রাইস মিল বা ধানের চাতাল কী করে করে তারা? তোমরা সেখানে যাও, দেখো, তারপর এ্যাসেস কর। তারপর ক্রেডিট প্রপোজাল তৈরি কর, দেখবে ভুল হবে না। গল্প সাহিত্যে দেখা যায়, দেখা থেকে লিখলে টেকনিক্যাল ভুল হবার সম্ভাবনা কম। হাসান আজিজুল হক এমন ভুল স্বীকার করেছেন—তার একটি গল্পে রাইফেল পানিতে ফেলে দিয়ে গিয়েছিলো। অনেক মাস পরে রাইফেল তুলে এনেছে। পানিতে থাকার জন্য ঐ রাইফেলটি যে আর কাজ করবে না সেটা উনি জানতেন না। আমি চেষ্টা করি তথ্যগত ভুল যেন না থাকে। তাছাড়া, আমার যেহেতু ডিটেলসের দিকে একটু ঝোঁক আছে, ফলে আমি না গেলে ডিটেলস লেখায় আনতে পারবো না।

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: ডিটেলস আমার ভালো লাগে। বিভূতিভূষণের আরণ্যকে তিনি যে ডিটেলস দিচ্ছেন, সেগুলো একরকমের নেশার মতো। আমার মনে হয়, লিখতে গিয়ে লেখকরা ডিটেলসের একটা নেশা আছে মনে করেন। আপনিও কি নিজে যখন লেখেন লেখায় ডিটেলসের নেশাটা উপভোগ করেন?
ফারুক মঈনউদ্দীন: তুমি একদম ঠিক। ডিটেলসের একটা নেশা আছে। কারণ ডিটেলস দিলে বোঝা যায় আমি কতটা ভেতরে ঢুকেছিলাম বিষয়টার। কয়দিন আগে একটা গল্প পড়ছিলাম এক বন্ধুর, থানা হাজতের একরাতের ভেতরের কথা আছে গল্পটিতে। আমি তাকে বললাম, “আমি হলে হাজতে… অন্য যে হাজতিকে হাজতে রাখা হয়েছে, সে রাতে ঘুমাচ্ছে, তার মুখ থেকে লালা গড়াচ্ছে, সেটাই ডিটেলস। তবে আমার ডিটেলসের প্রতি নেশা আছে বলেই আমি না দেখে লিখছি না। এর ফলে আমার লেখার গতি বা পরিমাণ হয়তো কমে যাচ্ছে,তাতে অবশ্য আমার আফসোস নেই। আমার এক বন্ধু বলেছিলো, পারফেকশন আনতে গিয়ে লিখতেই পারলো না।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: হেমিংওয়ে অনুবাদ করেছেন আপনি। উনি খুব দেখাতে বিশ্বাসী বা পজিটিভ মানুষ। আপনি নিজেও বললেন ব্যাংকার হিসেবে আপনি দেখাতে বিশ্বাসী, আপনি কি তবে যা দেখবেন না, তা বিশ্বাস করবেন না?
ফারুক মঈনউদ্দীন: ঠিক তা নয়। প্রতিটি লেখককেই কম বেশি কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়। যদিও কল্পনাও এক রকম দেখাই, তবুও আমি যদি একটু দেখে বাকীটা কল্পনা করে নিই, তবে ঠিক আছে। কিন্তু আমি যদি একদমই না দেখে যদি সবটাই কল্পনা করে লিখি সেটা…আমি একবার চা বাগানে গিয়েছিলাম, ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পরে জীবনের প্রথম চা বাগানে আসা। আমি একটা গল্প লিখে ‘দৈনিক বাংলা’য় পাঠালাম, আহসান হাবীব তখন কী কারণে যেন নেই। গল্প দেখলেন সালেহ চৌধুরী। গল্পটি পড়ে তিনি বললেন, “আপনি কখনো চা বাগান দেখেছেন?” বললাম, “হ্যাঁ, দেখেছি।“ তিনি বললেন, “বেশ ভালো। কিন্তু কুলি-কামিনদের জীবন কোথায় দেখেছেন? যখন দেখেননি, কী করে লিখলেন?” গল্পটি ছাপা হয়নি, আমার সংগ্রহেও নেই। তখন না বুঝলেও আজ বুঝি, গল্পটা খুব কাঁচা হাতের লেখা। বিকজ- আমি চা বাগানের দৃশ্য দেখেছি, কিন্তু কুলি কামিনদের জীবন দেখিনি। সবটাই ছিল কল্পনা। ফলে গল্পে সে জীবন ছিলো না। তখন আমি চিন্তা করলাম, না দেখে আমি লিখবো না।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার গল্পে, যেমন- ‘শারীরবৃত্তীয়’ গল্পে প্রচ্ছন্ন যৌনতা আছে। আপনার মত লেখক যারা বা হেমিংওয়ের মতো লেখক যারা, তারা যে জীবন দেখেছে বা তার অভিজ্ঞতা থেকেই সে লিখেছে, এই রকম যারা লেখক, তাদের বাস্তবতা ও কল্পনায় যে দ্বন্দ, আপনি সেরকম কোন বাস্তবতা ও কল্পনার দ্বন্দে পড়েছেন? মানে, আপনার কি কখনো মনে হয়েছে যে, বাস্তবতায় দেখা চরিত্রগুলো কল্পনায় এমন হলে ভালো হতো?
ফারুক মঈনউদ্দীন: না। আমি লিখেছিও কম। ফলে আমাকে কখনো এমন দ্বন্দে পড়তে হয়নি।আমার কখনো এমন হয়নি, কল্পনা করেছিলাম একরকম, বাস্তবে সে চরিত্রগুলো অন্যরকম।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনি একদম কল্পনা দিয়ে লিখেছেন এমন গল্প তো নিশ্চয়ই আছে আপনার?
ফারুক মঈনউদ্দীন: হ্যাঁ, আছে। আমার একটা গল্প আছে ‘শ্বাপদ ও সংকুল’। সে গল্পটি সম্পূর্ণ কল্পনা থেকে লেখা্। একটি লোক বারে বসে মদ্যপান করছে, সেখান থেকে গল্পটি বেরিয়ে আসে।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার লেখালেখির ব্যাপারে কোনো ট্যাবু আছে কি বা কোন সেন্সরশিপ? কী লিখবেন, কী লিখবেন না, তা নিয়ে? আপনাদের লেখায় বা আপনার লেখায় যৌনতার গল্প সেভাবে ধরা পড়েনি। আপনার কি মনে হয় বাংলায় যৌনতার গল্প সেভাবে নেই কেন?
ফারুক মঈনউদ্দীন: মূল্যবোধেরও ব্যাপার। আমি হেমিংওয়ে নিয়ে যে কাজটা করছি, আমি একটা জায়গায় পেলাম, হেমিংওয়ে প্রথম স্ত্রীকে ফেলে প্রেমিকার সাথে প্রেম করছিলেন, তখন তাদের শারীরিক সম্পর্ক ছিলো। ঐ সময় হেমিংওয়ে প্রথম স্ত্রীকে ছাড়তে পারছেন না, প্রেমিকাকেও বিয়ে করতে পারছেন না। এক মারাত্মক টানাপোড়েনের সময়, আর ঠিক তখনই শারীরিকভাবে হেমিংওয়ে অক্ষম হয়ে পড়েছিলেন কিছু সময়ের জন্য। আমি যে বইগুলো পড়ছি, সেগুলোয় এইসব বিষয়ে খুব বিস্তারিত লেখা আছে, কিন্তু আমি অনুবাদের সময় সে সব লিখিনি। হয়তো প্রচ্ছন্নভাবে আসবে, কিন্তু বিস্তৃতভাবে না, এটাকে যদি ট্যাবু বলো তবে হতে পারে সেটা আমার ট্যাবু।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনি প্রায় গোটা দুনিয়া ঘুরে ফেলেছেন, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত আপনি, তবুও এই ট্যাবু ধরে রেখেছেন কেন?
ফারুক মঈনউদ্দীন: এটা বলতে পারবো না সঠিকভাবে। তবে আমি একা যদি ধরে রাখতাম, ভাবতাম আমার প্রবলেম। কিন্তু আমাদের সমসাময়িক সবাই এই ট্যাবু ধরে রেখেছে।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার একার কথা বলছি না। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস বা নাটক দেখলে মনে হয় এই ভদ্রলোকের ঘরে বাচ্চা-কাচ্চা সব আকাশ থেকে পড়ছে। আখতারুজ্জামানের লেখাতেও এমন কিছু পাবেন না, কেবল মঞ্জু মাষ্টারবেট করছে, এমন একটি বর্ণনা ছাড়া। কিন্তু কেন?
ফারুক মঈনউদ্দীন: ‘উৎসব’ গল্পে হোমসেক্সুয়াল এর কথা প্রচ্ছন্নভাবে লিখেছেন ইলিয়াস ভাই। অনেক লেখক পাঠক টানতে এমন লেখেন, কিন্তু আমি যদি আমার কথা বলি, আমি বলবো এটা এমন কোন বড় ইস্যু নয় যে গল্পে আনতেই হবে। হুমায়ূন আহমেদ পতিতাদের নিয়ে গল্প নাটক লিখেছেন কিন্তু কোথাও বোঝা যাচ্ছেনা ওরা পতিতা।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: ইমদাদুল হক মিলন আপনাদের সমসাময়িক মনে হয়। একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত উনার উপন্যাস মানেই চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ পৃষ্ঠা পর্যন্ত এক ধরনের রগরগে যৌনতা থাকতো। উনি আমাকে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে স্বীকার করেছেন, বাচ্চার দুধ কেনার সময় হলে তাকে এমন লিখতে হয়েছে। আমি আপনার কাছে জানতে চাই, আপনি কি আপনার লেখায় যৌনতা এড়িয়ে যান ভাবী বা অন্যকেউ পড়বে বলে, নাকি আসলে আপনি আনতেই চাননি?
ফারুক মঈনউদ্দীন: না, একদমই না। আমি কখনো ভাবিই না, কে বা কারা পড়ে কী মনে করবে। তবে কখনো প্রয়োজন বোধ করিনি ঐভাবে যৌনতা আনার। ইঙ্গিতে অনেক কিছু বলা সম্ভব আর সেটাকেই আমার কাছে শিল্প মনে হয়। আমি যদি সব খুলেই বলে দেই তবে সেটা শিল্প থাকে না। পাঠক কী মনে করবে, মুরুব্বীরা কী মনে করবে, বা সমাজপতিরা কী মনে করবে, তা নিয়ে আমার মাথায় কোনো চিন্তা ছিলো না। যৌনতার প্রসঙ্গ কখনো আসেনি, আর যদি কখনো প্রসঙ্গ আসে, সেটা ওভাবে শৈল্পিকভাবেই বলবো, রগরগে বর্ণনা দেবার কোনো প্রয়োজন নেই।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার দুটো গল্পের বই বের হবার পরে আপনি ভ্রমণ কাহিনী লিখলেন মুম্বাই ভ্রমণ নিয়ে। ভ্রমণ নিয়ে লিখবেন সেটা কি করে এলো আপনার মনে?
ফারুক মঈনউদ্দীন: মুম্বাই নিয়ে যেটা লিখলাম সেটা আসলে ভ্রমণ কাহিনী নয়, ভ্রমণ কাহিনীর মতোন লেখা।আমি মুম্বাইয়ে পাঁচ বছর ছিলাম। ফলে মুম্বাইকে কাছ থেকে দেখা জিনিসগুলো লিখেছি। কেননা- মুম্বাই নিয়ে বাংলাদেশিদের কাছে এক ধরনের সিনেমাকেন্দ্রিক জাদুময়তা কাজ করে। যেমন ধরো, এখানের অনেকের বিশ্বাস, জুহু বিচে গেলে বলিউডের বহু স্টারকে দেখতে পাওয়া যায়। আমার পাঁচ বছরের জীবনে দু-একজন স্টারকে দেখা ছাড়া দেখিনি। এই বিষয়গুলো নিয়ে যখন আমি প্রথম আলোতে লিখতে শুরু করলাম, আমি প্রচুর পাঠক সাড়া পেয়েছিলাম। মেইল আইডি দেয়া থাকতো, আমি প্রচুর মেইল পেতাম।বুঝতে পারতাম লোকজন লেখাটি পছন্দ করছে।কাইয়ূম চৌধুরীর সাথে আমার আগে কোনো পরিচয় ছিলো না। আমি ফিরে আসার পরে এক অনুষ্ঠানে একজন পরিচিত আমার নাম ধরে ডাক দিলো। কাইয়ূম চৌধুরী অনেকটা দূরে একটা চেয়ারে বসা,তিনি আমাকে দেখে উঠে বলছেন, আপনি ফারুক মঈনউদ্দীন। উনি উঠে আসছেন দেখে আমি এগিয়ে গেলাম। উনি বললেন, “আমি তো আপনার অনেক লেখা পড়েছি।“ মুম্বাইয়ের চিঠিতে আর্ট,পেইন্টিং নিয়ে অনেকগুলো পর্ব নিয়ে কথা বললেন। আমি অবাক হলাম, ওনার বিষয় ছাড়াও উনি নিয়মিত পড়তেন। সাম্প্রতিক একটা ঘটনা বলি, তিনবছর আগে আইএফসিআই পুরস্কার অনুষ্ঠানে আমার পাশে শামসুজ্জামান খান বসা, পরিচয় নেই। আমি উনাকে চিনি, তাই সালাম দিলাম। কিছুক্ষণ পরে তিনি বললেন, “এবার কতদিন থাকবেন?” আমি তো অবাক! ভাবলাম, তিনি ভুল কিছু করছেন কিনা? আমি বললাম, “মানে, আমি তো দেশেই থাকি।“ উনি বললেন, “ও আচ্ছা, আচ্ছা”। বুঝলাম, উনি ভেবেছেন আমি মুম্বাই থাকি, মাঝে মাঝে আসি। ২০১৩ তে আমি আমেরিকা গেলাম, সেখানে গিয়ে দেখলাম, বেশ কিছু লেখা যায়। ফিরে এসে বেশ কিছু পর্ব লিখলাম। আমি সেগুলি ‘অবসর’র আলমগীর রহমান ভাইকে দিলাম। দুই-তিন দিন পরে তিনি একদম এই ভাষায় বললেন, “ওই মিয়া, এইগুলা মিয়া কী লিখেন? আপনার তো উপন্যাস লেখার ভাষা, আপনার ভাষা তো উপন্যাসের ভাষা। আমি এগুলি ছাপছি আপনি উপন্যাস লেখেন।“ এই কথাটি কেন বলছি? কেননা- অনেক বছর আগে নির্মলেন্দু গুণ বলেছিলেন- “বই প্রকাশ নিয়ে আমার এখন কোন দুর্ভাগ্যজনক দুর্ভাবনা নেই।“ আমাদের যখন প্রথম দিকে একটা বা দুটা বই বের হয়, আমরা তখনও ভাবতাম, আমার বই কে ছাপবে? এখন বিষয়টা উল্টো হয়ে গেছে। এখন প্রকাশকরা বই চায়। নাম বলতে চাই না, এবারও একজন প্রকাশক অগ্রিম টাকা দিতে চেয়েছে, আমি নেইনি। ভ্রমণ কাহিনীর শুরু আসলে আমেরিকা থেকে ফেরার পরেই। কেননা- দেখলাম প্রকাশক নিজেই এমন বলছে। তখন থেকেই ভ্রমণ কাহিনী লেখা শুরু। তখন গল্প কম লিখছিলাম। কেননা- ভ্রমণ কাহিনীগুলোর চাহিদা এত বেড়ে গেলো, তাছাড়া আমার অর্থনীতি ব্যাংকিং লেখাও চলছিলো। আসলে আমার মুশকিল হলো, অনেক কিছু করতে চাই, আসলে কিছুই করতে পারি না।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার এমন মনে হবার কারণ কী?
ফারুক মঈনউদ্দীন: মনে হয়, কারণ- আমি কোন কিছুতেই স্পেশালিস্ট না। আমি একটু অনুবাদ, একটু প্রবন্ধ, একটু গল্প,সব কিছু মিলে আমার পাঁচ-ছয়টি বিষয় নিয়ে কাজ আছে।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার কি মনে হয় না গল্পে আপনি গুরুত্বপূর্ণ মানুষ?
ফারুক মঈনউদ্দীন: আমি সব সময় বলি—সেদিন অনেকদিন পরে গল্প লিখলাম,হঠাৎ মিলন ভাই খবর দিলেন, ‘শিলালিপি’তে আমি কখনো লিখিনি। মাসুদ হাসান কল করে বললেন, “মিলন ভাই কল করে বললেন আপনাকে একটা গল্প দিতে।“ আমি বললাম, “মিলন ভাই যখন বলেছে আমি গল্প দিবো।“ ঐ, তারপর দিয়ে দিলাম। আমি যখন গল্পটি ফেসবুকে দেই, আমি লিখেছিলাম, আমার ভেতরে গ্লানি আছে, গল্প যে কম লেখা হয় সেটা আমার গ্লানি। সবাই বলে, আপনি গল্প লিখেন না কেন? আমার স্ত্রীও বলে, “তুমি ভ্রমণ-টমণ বাদ দিয়ে এখন গল্প লেখো।“
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার কি মনে হয় না আপনার গল্প আপনাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে?
ফারুক মঈনউদ্দীন: অবশ্যই মনে হয়। গ্লানিবোধটা আছে মানেই তো মনে হয়, আমাকে আমার গল্প বাঁচিয়ে রাখতে পারে।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার পেশা জীবনের বয়স কত?
ফারুক মঈনউদ্দীন: ত্রিশ বছরের উপরে। ১৯৮৪ থেকে আমার পেশা জীবন শুরু।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: ছত্রিশ বছর থেকে আজ আপনি একটি ব্যাংকের এমডি,আপনি কি এখনো যথেষ্ঠ সময় পান না লেখালেখি করার জন্য?
ফারুক মঈনউদ্দীন: এমডি হবার পরে কাজের প্রেশার অনেক বেড়েছে, ফলে আমার লেখার সময় আরো কমে গেছে। আগে পেশা জীবনের অনুষ্ঠানগুলো আমি এড়িয়ে চলতাম। এখন এমডি হবার পরে আমাকে অনুষ্ঠানগুলোতে থাকতেই হয়। মানে আমার সময় আরো কমে গেছে। আমি টিভি দেখি না। সামাজিক অনুষ্ঠানে যাই না। তবু আমার সময় বড় কম। তবে গত মার্চ মাসের শেষ দিক থেকে আমাকে নিয়ম করে অফিস যেতে হয়নি, বাসাতেই থেকেছি। মাঝে মাঝে ব্যাংকার বলে অফিসে গেছি। ঐ সময়টায় আমি অনেক লিখেছি, পত্র-পত্রিকা নেই বলে সব প্রকাশিত হয়নি। আমি তিনমাসে যা লিখেছি, গত এক বছরে আমি তত লিখিনি। এই সময়টায় প্রায় তিন-চারটি গল্প, তিন-চারটি ভ্রমণ, তিন-চারটি অনুবাদ, একটা গবেষণামূলক দীর্ঘ প্রবন্ধ। সময় পেলাম বলে লিখতে পারলাম। এই রকম সময় পেলে আরো লিখতে পারতাম।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: লেখালেখির বাইরে আপনার কোন শখ আছে?
ফারুক মঈনউদ্দীন: ফটোগ্রাফি।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: ভ্রমণে যখন যান, তখন নোট নেবার সাথে সাথে আপনি তাহলে ছবিও তুলেন?
ফারুক মঈনউদ্দীন: আমার ভ্রমণ লেখার সাথে যত ছবি, সব আমার তোলা। আমি অন্যের ছবি আমার লেখায় ব্যবহার করি না।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার ক্যামেরার নাম কী?
ফারুক মঈনউদ্দীন: ক্যানন সেভেন ডি।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার খুব প্রিয় এটি?
ফারুক মঈনউদ্দীন: আমি ধার করা ক্যামেরা ব্যবহার করি ছাত্রজীবন থেকে। আমার নিজের প্রথম ক্যামেরা হয় ১৯৮৪ সনে, চাকরি জীবনের প্রথম থেকে। প্রথম সেকেন্ড হ্যান্ড ক্যামেরাটি কিনি নাট্য অভিনেতা হাসান মাসুদের কাছ থেকে। ও তখন আর্মির ক্যাপ্টেন খুলনায়,আমার ও পোস্টিং খুলনায়। তখন ওর কাছ থেকে ক্যানন ক্যামেরা কিনি।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনি সেনাবাহিনীর ব্যাংকের এমডি,হাসান মাসুদ ভাইয়ের সাথে আপনার খাতির ছিলো যখন, তার মানে আপনার সাথে সেনাবাহিনীর সম্পর্ক অনেক গভীর?
ফারুক মঈনউদ্দীন: না, না, হাসানকে আমি চিনি ঢাকা ইউনিভার্সিটির উদীচি থেকে।ও আমার জুনিয়ার। উদীচিতে ও অনুষ্ঠান করতো, আর বিটলা টাইপের দুষ্টমি করতো, ওভাবেই চিনি হাসানকে। খুলনায় গিয়ে হঠাৎ একদিন ওর সাথে দেখা।
শিমুল সালাউদ্দিন: আপনার বন্ধু কারা?
ফারুক মঈনউদ্দীন: বন্ধু বলতে যা বলে, সেভাবে বললে আমার বন্ধু সংখ্যা খুব সীমিত। অনেকে আছে বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন স্বার্থে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বন্ধু। আমার যারা বন্ধু, তাদের সাথে আমার যেমন নিছক বন্ধুত্ব, তাদেরও কেবলই বন্ধুত্ব। আমার বন্ধু বলতে ফয়জুল লতিফ চৌধুরি, তুষার দাশ, সিদ্ধার্থ হক, সুব্রত শংকর ধর, মঈনুল আহসান সাবের, খায়রুল আনোয়ার মুকুল, মঈনুস সুলতান, জাফর ওয়াজেদ, শাকুর মজিদ, বিশ্বজিত্‌ চৌধুরী, চ্যানেল আইয়ের ফরহাদুর রেজা প্রবাল। আরো সবার নাম লিখতে গেলে এখানে জায়গা হবে না। কিন্তু লেখালেখির জগতের বাইরেও আমার অগুনতি বন্ধু আছে, তাদের সবার নাম উল্লেখ করতে পারলেও ভালো লাগতো।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনি যত সাহিত্য সন্মাননা পেয়েছেন, তার মধ্যে বাংলা একাডেমিরটাকেই কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?
ফারুক মঈনউদ্দীন: প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যদি বলি, সমগ্র বাংলাদেশের বাংলা একাডেমির পুরস্কার হচ্ছে বাংলাদেশের নোবেল। কিভাবে দেয়া হয়, সেসব দিকে যাচ্ছি না, মর্যাদার দিক থেকে এটা সর্বোচ্চ পুরস্কার।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন:আপনি যখন বাংলা একাডেমির পুরস্কার নিলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে, আপনার কী মনে হয়েছে, মানে আপনি নিজের কাছে কি বিশ্বাসী ছিলেন যে, আপনি যা লিখেছেন তার জন্য আপনি যথেষ্ঠ গর্বিত এই পুরস্কার গ্রহণের জন্য? আপনার অনুভূতি কী ছিলো?
ফারুক মঈনউদ্দীন: আমার নাম তিন-চার বছর থেকে নিয়মিত যাচ্ছিলো, ফেলোদের কাছে নাম চাওয়া হয়। আমার কাছ থেকে বইয়ের লিস্ট বা বায়োডাটা গত তিন-চার বছর থেকে নিয়মিত নেয়া হচ্ছিল। শামসুজ্জামান খানের শেষ ২০১৯ এ আমি মোটামুটি কনফার্ম ছিলাম,অনেকে অগ্রীম শুভেচ্ছাও জানিয়ে ফেলেছে। দেখা গেলো, উনি অনেক কিছু ছাঁটাই করে তিন চারটি বিভাগে পুরস্কার দিলেন। ফলে, আমার কাছে এই পুরস্কার খুব অপ্রত্যাশিত মনে হয়নি। বরং আইএফসিআই পুরস্কারটি আমার কাছে অপ্রত্যাশিত। তাই অনুভূতি ছিলো, অনেকদিন ধরে প্রত্যাশিত পুরস্কারটি, অবশেষে এটা আমি পেলাম।তবে সবচেয়ে বড় তৃপ্তি ছিলো এক-দুই বছর আগে এই পুরস্কার নিয়ে যত বিতর্ক ছিলো, ২০২০ এর পুরস্কার নিয়ে কোন বিতর্ক নেই। এই বছরের আগে এই পুরস্কারটা পেলে আমাকে ভাবতে হতো, আমি সেইদলভুক্ত কিনা যারা কোন না কোন ভাবে পুরস্কার বাগিয়ে নিয়েছে।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার পরিবার, শিক্ষা বা কর্মসূত্রে আপনি চিরকাল উচ্চস্তরের জীবন যাপন করেছেন। আপনার লেখালেখির যে জীবন, তার জন্য আপনি কাদের কাছে কৃতজ্ঞ?
ফারুক মঈনউদ্দীন: কঠিন প্রশ্ন। কেন বলছি কঠিন প্রশ্ন? কেননা- প্রথম কৃতজ্ঞতা দিতে হয় স্ত্রীকে। কেননা প্রত্যেক স্ত্রীই চায় হাজব্যান্ড সময় দিক, আমার কথা মন দিয়ে শুনুক, কিন্তু আমি ততটা সময় দিতে পারতাম না।সেই হিসেবে অবশ্যই আমি কৃতজ্ঞ থাকবো ঘরের লোকটির কাছে।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: লেখালেখি কি সন্তানদের সাথে দূরত্ব তৈরি করেছে?
ফারুক মঈনউদ্দীন: হ্যাঁ, দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আমার এক ছেলে এক মেয়েকে আমি যথেষ্ট সময় দিতে পারিনি। আমাদের মত নয় আজকের জেনারেশন।আমার ছেলের নেশা বই পড়া। দেশের বাইরে যেহেতু আমার খুব যাওয়া হয়, তার আবদার থাকে শুধু বই। ওদের পঠন আমাদের পঠনের মধ্যে অনেক পার্থক্য। একজন পিতা হিসেবে আমি সময় দিতে পারিনি, সেটাও যেমন ঠিক, তারাও যে আমার কাছে সময় চাইতো তাও নয়।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আগামী পাঁচ বছরে আপনার লেখালেখির কোন পরিকল্পনা আছে কিনা বা এমন কোন বড় পরিকল্পনা যেটা সময়ের জন্য করে উঠতে পারছেন না?
ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখালেখির পরিকল্পনার মধ্যে আছে উপন্যাস লেখা। সবাই চায় উপন্যাস। আমারও ইচ্ছা আছে উপন্যাস লেখার। উপন্যাস যায়, লেখা যাবে না কেন? আছে না, একটা বাক্য দিয়ে একটা লাইন, একটা শব্দ দিয়ে একটা লাইন, এইরকম করে ছয় সাত-ফর্মার উপন্যাস একটা হয়েই যায়, কিন্তু তেমন উপন্যাস লিখতে চাই না; যেমন সেরকম গল্পও লিখতে চাই না। তবে মাথায় আছে হয়ত কখনো একটা উপন্যাস লিখবো। আবার সৈয়দ শামসুল হককে ডাকি, তার কিছু কথা একদম প্রবচনের মতো। তিনি তাহমিনার বই ‘সোনা ঝরা দিন’র প্রকাশনায় বলেছিলেন, “প্রত্যেকটি মানুষের ভেতর একটি উপন্যাস থাকে, সে উপন্যাসটি তিনি নামিয়ে ফেলতে পারেন; কিন্তু চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পরেরটি নিয়ে। কারণ- একজন লেখকের জন্য তার বিছানা থেকে তার টেবিল হচ্ছে বড় দূরত্ব।“ আমার কাছে প্রবচন মনে হলো এই কথাটি।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার প্রিয় লেখকদের তালিকায় হক ভাই আছে,শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় আছে। হক ভাইয়ের প্রিয় উপন্যাস কোনটি? বাংলাদেশের তিন জন বিখ্যাত ভ্রমণ লেখক মঈনুস সুলতান, শাকুর মজিদ আর ফারুক মঈনউদ্দীন। আপনার প্রিয় কে?
ফারুক মঈনউদ্দীন: মঈনুস সুলতান। কারণ- মঈনুস সুলতান শুধু ভ্রমণ সাহিত্য নয়, ওর গদ্যে অভিনব শৈলী আছে, ভাষার ব্যবহার, শব্দের ব্যবহার।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আমার প্রশ্নটা একটু টেকনিক্যাল,আমি বলছি এই তিনজন ভ্রমণ লেখকের মধ্যে প্রিয় কে? আপনি বলেছেন, মঈনুস সুলতান। তারপরে কে?
ফারুক মঈনউদ্দীন: একটু ভেবে বলতে হবে। এমন নয় যে, আমি শাকুর মজিদের কথা বলবো না। তা নয় কিন্তু। শাকুর মজিদের লেখা আমি অনেক পড়েছি। যেহেতু আর কারো নাম মনে পড়ছে না, তাই শাকুর মজিদের নাম বলতেই হবে।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আরেকটু কঠিন করে দেই, সৈয়দ মুজতবা আলী দিয়ে শুরু করে পাঁচজন লেখকের নাম বলবেন, তাহলে কাকে কাকে রাখবেন?
ফারুক মঈনউদ্দীন: সৈয়দ মুজতবা আলীকে আমি ভ্রমণ লেখক হিশেবে আনবই না। একটা লেখা দিয়ে তাকে ভ্রমণ লেখক বলা উচিত নয়। রবীন্দ্রনাথ,অন্নদাশঙ্কর অনেক ভ্রমণ সাহিত্য লিখেছেন, কিন্তু তাদের ভ্রমণ সাহিত্যিক বলি কি? এক, মঈনুস সুলতান; দুই, নির্মলেন্দু গুণ; তিন, হাসনাত আবদুল হাই; চার, শাকুর মজিদ। নিজেকে পাঁচ-ছয় কিছুতেই আমি রাখতে চাই না।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার ৬৩ বছরের জীবনে আপনার পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন কী কী?
ফারুক মঈনউদ্দীন: প্রথম অর্জন, এই যে তুমি সাক্ষাৎকার নিচ্ছো, ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি হিসেবে সাক্ষাৎকার নিচ্ছো না। ব্যাংকার বা ব্যাংকের এমডি হিশেবে আমাকে যে কয়জন চেনে, তার চেয়ে বেশি চেনে লেখক হিসেবে, সেটা।
দ্বিতীয় অর্জন, ব্যাংকের মত অসৃজনশীল জায়গায় কাজ করে আমি এখানে আসতে পেরেছি, যেখানে মানুষ ব্যাংকারের চেয়ে অন্য পরিচয়ে বেশি চেনে।
তৃতীয় অর্জন, এমন একটা অবস্থানে আসে যখন কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যাক্তি, তাদের অনেক রটনা থাকে, বদনাম থাকে, আমি এখন পর্যন্ত মুক্ত আছি। আর কোনো অর্জন আমার নেই।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার কোনো হতাশা আছে?
ফারুক মঈনউদ্দীন: হতাশা আছে। উপন্যাস লিখতে না পারার হতাশা।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: উপন্যাস লেখায় আপনি কবে হাত দেবেন?
ফারুক মঈনউদ্দীন: হাত দিলে তো কালই দিতে পারি, কিন্তু গুছিয়ে বসার দূরত্ব। আমার একটি গল্প লেখার প্রস্তুতি নিতে যদি এত সময় লাগে, তবে উপন্যাস লেখার প্রস্তুতি কেমন হবে ভাবো। এমনও হতে পারে আমার এই জীবনে উপন্যাস লেখাই হবে না।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনি প্রথম কার বই পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন?
ফারুক মঈনউদ্দীন: নীহাররঞ্জন গুপ্ত, মাসুদ রানা।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার প্রিয় কবি কারা?
ফারুক মঈনউদ্দীন: আল মাহমুদ,আহসান হাবীব। জীবনানন্দ দাশের কথা বাদই রাখলাম। জীবনানন্দ দাশের কবিতা দিয়ে প্রথম আমার কবিতা পড়া। বড়ভাইয়ের বিয়েতে ১৯৭৩ সনে অনেকগুলো উপহার পাওয়া বইয়ের মধ্যে একটি ছিলো অজিত গুহ সম্পাদিত ‘জীবনানন্দ দাশের কাব্য সম্ভার’। জীবনানন্দ দাশের কবিতা ও ক্রিয়াপদের ব্যবহারে আক্রান্ত হয়েছিলাম।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার উপন্যাস কী বিষয়ক হবে? আর্টসের পাঠকদের কি কোন হিন্টস দেবেন?
ফারুক মঈনউদ্দীন: আমার মাথায় ঘুরছে একটা প্লট। বাংলাদেশ থেকে রিসেন্ট পাস্ট অনেক লোক পশ্চিমবঙ্গে চলে গেছেন। গত দশ বছরের ভেতর আমার অনেক কলিগ পশ্চিমবঙ্গে চলে গেছে। আর যদি বিশ বছরের কথা বলি, তবে আরো বেশি। যে লোক ৭১ এ দেশ ছেড়ে যায়নি, চিটাগাং ছিলো,যে লোকের নাম শিব নারায়ন রায়ের ‘জিজ্ঞাসা’ পত্রিকায় আজীবন সদস্য তালিকায় প্রতিবছর ছাপা হয়, সে চলে গেলো নব্বইয়ের দশকে। মাইগ্রেশন ইজ গোয়িং অন। সাতচল্লিশের মাইগ্রেশনের পরে অনেক আছে, একদম রিসেন্ট যারা যাচ্ছে, তাদের নিয়ে নেই। এটা আমার মাথায় আছে।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনি যাদের নিয়ে কাজ করেছেন তাদের বাড়িতে গেছেন, মিউজিয়ামে গেছেন। আপনার কি কখনো মনে হয়েছে, আপনার যদি লেখক সহকারী থাকতো তবে সুবিধা হতো?
ফারুক মঈনউদ্দীন: আমাদের দেশে কারো জন্য নেই ঠিকই,কিন্তু ইউরোপে আছে। তাদের এডিটর থাকে, এজেন্ট থাকে।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: মার্কেজ বলতেন, আরেকজন লিখতেন। মার্কেজ আবার সেটা দেখে দেখে লিখতেন, ফলে মার্কেজের নিজের হাতের লেখা পান্ডুলিপি প্রায় নেই।
ফারুক মঈনউদ্দীন: মার্কেজের পান্ডুলিপি তো না থাকারই কথা। কেননা- মার্কেজের অনেক আগে থেকেই ইংরেজি লেখকরা টাইপ করে লেখে। আমাদের দেশে সেটা প্রথম করতেন হক ভাই। তিনি মনির অপটিমাইজে লিখতেন। কী কঠিন সে টাইপ! আমি তো ২০০৫ সাল থেকে ল্যাপটপে বিজয়ে লিখি।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার জীবনে এমন কখনো হয়েছে, খুব গুরুত্ব দিয়ে লিখেছেন এবং তা মুছে গেছে?
ফারুক মঈনউদ্দীন: আমি তো অ্যাপেল ব্যবহার করি একবার অ্যাপেল লক হয়ে গেলো।ফলে সব নিল করতে হলো। নিল করতে গিয়ে পাঁচ হাজার শব্দের একটি প্রবন্ধ চলে গেলো, যেটা মার্কেজের বইয়ের উপর লেখা, পরে সেটা আবার লিখেছিলাম। কম্পিউটারে লেখার সুবিধা, তুমি যেভাবে এডিট করতে পারো, এ্যাড করতে পারো, তা হাতের লেখায় করা খুব কঠিন।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: ব্যাংকিং, লেখালেখি সব কিছুর মধ্যে আপনার একটা মূল সূত্র বা আদর্শ আছে। আপনার আদর্শিক অবস্থানটা কোথায়? আপনাকে কখনো রাজনৈতিক উচ্চকন্ঠ হতে দেখা যায় না। এর কারণ কী?
ফারুক মঈনউদ্দীন: প্রথমত, আমার যে পেশা, তাতে পলিটিক্যালি উচ্চ কন্ঠ হবার সুযোগ নেই।লেখক হিসেবে আমার লেখায় তো আছে।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: না, আমি লেখার মধ্যে রাজনীতির কথা বলছি না,আমি বলছি আমাদের রাজনীতিতে লেখকদের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম মতাদর্শে অবস্থান ছিল,আমাদের ইলিয়াস স্যারের অবস্থান ছিলো বামপন্থী,হাসান আজিজুল হকরা সে অর্থে কথাবার্তা বলেননি, গুন দা তো নিজেকে দাবীই করেছেন তিনি আওয়ামী লীগের কবি,আপনার প্রিয় কবি আল মাহমুদ, উনি রাজনৈতিক যে স্ট্যান্ড নিয়েছেন তা আপনি জানেন,হক ভাই এমন কোন গভর্মেন্ট নেই, যার কাছ থেকে সুবিধা নেননি।

ফারুক মঈনউদ্দীন: ব্যক্তিগত দূর্বলতা উনার ছিলো, আমরা তাদের শক্তিমত্তার কারণে তাদের ব্যক্তিগত চরিত্র ভুলে যাই। আল মাহমুদের কবিতা,গল্প বা গদ্যের শক্তিমত্তা, সৈয়দ হকের অবদান সাহিত্যে কী, আমরা সে সব দেখবো। লেখকের পলিটিক্যাল অবস্থানের জায়গাটা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আমরা জানি, আপনি আওয়ামীলীগ ঘরোনার পলিটিক্স করেন।

ফারুক মঈনউদ্দীন: সরাসরি আওয়ামীগের রাজনীতি না করলেও; মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের লোক আমি। একাত্তরের যুদ্ধের সময় আমি ক্লাস নাইনের ছাত্র। সে সময় মায়ের কাছে চিঠি লিখে আমি পালিয়ে গিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ক্যাম্পে যোগ দিতে পারি নাই। আমাকে বর্ডার থেকে ধরে নিয়ে আসা হইছিলো। পায়ে হেঁটে বিলোনিয়া বর্ডার ফেনী নদীর পাড়ে চলে গিয়েছিলাম। মুক্তাঞ্চলে ঢুকে পড়েছিলাম। সেটা সম্ভবত একাত্তরের জুলাই কিংবা অগাষ্ট মাস। এটা চট্টগ্রামের মিরেরসরাই এলাকা। তখন এলাকাটা মুক্তাঞ্চল ছিলো। বাংলাদেশের পতাকা উড়ছিলো। মুক্তাঞ্চলে ঢুকে মুক্তিযোদ্ধাদের একটা গ্রুপের সাথে আমি চলে গিয়েছিলাম নদীর পাড় পর্যন্ত। ওখান থেকে আমার মামা আমাকে ধরে নিয়ে আসেন। আমার মেজ ভাই মুক্তিযোদ্ধা। উনি বিএলএফ কমান্ডার। উনি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার নকশাকারদের একজন। হাসানুল হক ইনুদের সমসাময়িক। আজকে বিডি নিউজে শিব নারায়ণ দাসকে নিয়ে একটা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু শিব নারায়ন দাস একক নকশাকার নন। আমার ভাইও একক নন। উনি যুগান্তরে লিখেছেন, “আমি জাতীয় পতাকার একক নকশাকার” নই। এরজন্য তিনি কখনো একক কৃতিত্ব নেন নাই।
ঘাপটি মারা স্বাধীনতা-বিরোধিতা যে উঠে আসছে; ‘শ্বাপদ সংকূল’সহ আরও বেশ কিছু লেখায় আমি লিখেছি। এছাড়া দুই দলের রাজনীতি নিয়ে আমি কিছু লিখিনি। লেখার প্রয়োজন মনে করিনি। এগুলা খুব ছোট্ট ব্যাপার। বর্তমান পলিটিক্সের যে ধারা দুই দলের মধ্যে আমি এগুলো আনার মতো কিছু মনে করি না সাহিত্যে।

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: লেখকদের পলিটিক্যাল সেন্স থাকা জরুরী বলে আপনি মনে করেন?

ফারুক মঈনউদ্দীন: অবশ্যই। অবশ্যই থাকবে। তবে আমি একটা জিনিস বিশ্বাস করি, সেটা হচ্ছে কবিতা বা যে কোনো জিনিস যাতে রাজনৈতিক ইশতেহারে পরিণত না হয়। রাজনৈতিক সচেতনতা প্রত্যেক লেখকের থাকা জরুরি।

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: কিন্তু সেভেনন্টি ওয়ানে কবিতাই হয়ে উঠেছিলো রাজনৈতিক ইশতেহার।

ফারুক মঈনউদ্দীন: একসময় হইছে না। মোহন রায়হানের কথা বলো তোমাদের কবি। তাঁর কবিতা তো রাজনৈতিক শ্লোগান………
তারপর গুণের অনেক রাজনৈতিক সচেতন কবিতা আছে। তাঁদের কবিতাগুলোকে নিছক রাজনৈতিক শ্লোগান বলে আমি বাতিল করে দিতে পারবো না।

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: মোহন রায়হানের নাম আসলে তো সেই অর্থে ফরহাদ মজহারের নামও আসবে

ফারুক মঈনউদ্দীন: ফরহাদ মজহারের নাম আসবে। সিরাজ শিকদারের কবিতা তোমার মনে নাই। ওই বইটা আমার কাছে বহুদিন ছিলো, যখন আমি স্কুলে পড়ি। তখনই জোগাড় করেছিলাম। সলিমুল্লাহ খানের ‘এক আকাশের স্বপ্ন’। এগুলা তো আসলে টিকে থাকে নাই। তুমি যখনই শ্লোগানধর্মী কিংবা ইশতেহারধর্মী সাহিত্য রচনা করবা, শ্লোগান কিংবা ইশতেহার নিয়ে গল্প,কবিতা বা উপন্যাস করবা, সেগুলা থাকবে না। থাকে নাই। সমর সেন সম্পর্কেও আমার একই বক্তব্য।

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনি প্রায় ৩৬ বা ৪০ বছর ধরে সাহিত্য চর্চা করছেন এদেশে। সাহিত্যের ভবিষ্যৎ কী দেখেন?

ফারুক মঈনউদ্দীন: প্রথম কথা হচ্ছে ৩৬ বছর কিংবা ৪০ বছর, আমি এমন কোন কাজ করছি বলে স্বীকার করি না।

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: সেটা আপনি বিনয় করছেন। কিন্তু ৩৬ বছর কিংবা ৪০ বছর আপনি এই ফিল্ডটা দেখেছেন তো।

ফারুক মঈনউদ্দীন: আমি বিনয় করছি না। আমি মনে করি। সিনসিয়ারলি মনে করছি। আমার ভাবনার জায়গাটা হচ্ছে, সাহিত্য সাহিত্যের জায়গায় থাকবে। টেকনোলজি, মূল্যবোধ, সমাজ, রাজনীতি,দেশ,আর্ন্তজাতিক রাজনীতি সাহিত্যের ওপরে প্রভাব বিস্তার করতে পারে; তবে কোনভাবে সাহিত্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না। সাম্প্রতিক সময়ে কথা উঠেছে, মুদ্রিত বইয়ের ভূমিকা থাকবে কিনা? আমার বিশ্বাস মুদ্রিত বই থাকবে। তেমনিভাবে সাহিত্যও থাকবে। নতুন নতুন টেকনোলজির কারণে সাহিত্যের ভূমিকা কমে যাবে, এটা এখনো আমি মনে করি না। আমাদের এক-দুজনের জীবদ্দশায় সাহিত্যের অবদান বা ভূমিকা কমে যাবে, এটা আমি দেখি না। এটা নিয়ে আমার কোন ধরনের দুঃশ্চিন্তা নাই।

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: বর্তমানকালের সাহিত্য নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

ফারুক মঈনউদ্দীন:
আমাদের মূল্যায়ন হচ্ছে। যারা আমাদের পথিকৃৎ সাহিত্যিক ছিলেন; সেই সময়ে তখন আমাদের জনসংখ্যা অনুপাতে লেখক কিংবা সাহিত্যিকের সংখ্যা ছিলো বেশি। যদি অনুপাত ধরি। সাতকোটি মানুষের মধ্যে গুণগত মানের সাহিত্যিক সেই অনুপাতটাও তো কমে এসেছে। জনসংখ্যা এখন ডাবলের চেয়েও বেশি কিন্তু ওই মানের সাহিত্যিকের সংখ্যা বাড়ে নাই।

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন:
গুণগত সাহিত্যিক না বাড়ার পেছনে শিক্ষা ব্যবস্থার কী কোন ঘাটতি আছে?

ফারুক মঈনউদ্দীন: আমি শিক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতির কথা বলছি না। কারণ- সাহিত্যের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থা কোনো বড় ইস্যু না। খুব বড় সাহিত্যিক যে খুব শিক্ষিত তা না। কিংবা শিক্ষা ব্যবস্থা যে তাঁদের সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছে এর প্রত্যাক্ষ প্রমাণ নাই। সুতরাং শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমি দায়ী করবো না। শিক্ষা ব্যবস্থা যেটা করতে পারে, পাঠক তৈরি করতে পারে।

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আমরা কী পাঠক তৈরি করেছি?

ফারুক মঈনউদ্দীন: না, পাঠক তৈরি করতে পারে নাই। আমার শিক্ষা ব্যবস্থায় আমি ভালো পাঠক তৈরি করতে পারি নাই। আমরা কিছু উচ্চ শিক্ষিত বেকার তৈরি করছি, যাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে, একটি চাকড়ি পাওয়া এবং বিবিএ- এমবিএ করে বিজনেস গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় পুরো গলদ। একশোটার উপরে ইউনির্ভাসিটি আছে, তাদের ওখানে কী শিক্ষা দেয়া হয় আমরা সবাই জানি। সুতরাং শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের ইতিবাচক কিছু দিতে পারছে না।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: পাঠক তৈরি করতে হলে কী করতে হবে?

ফারুক মঈনউদ্দীন: পাঠক তৈরি করার ব্যাপারে শিক্ষা ব্যবস্থার সরাসরি কোনো ভূমিকা নাই। শিক্ষা ব্যবস্থা পাঠক তৈরির পথটি সুগম করতে পারে। স্বশিক্ষার মাধ্যমে পাঠক তৈরি হয়। আমাকে-তোমাকে আউট বই পড়তে কি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা শিখাইছে? আমি-তুমি যে পাঠ্যবইয়ের ভেতরে লুকাইয়া লুকাইয়া মাসুদ রানা পড়তাম, এটা কি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা শিখাইছে? শিখায় নাই। বর্তমান প্রজন্মের ভেতরে আউট বই পড়ার প্রবনতা গ্রো করছে কিনা, এভাবে পাঠক তৈরি হয়।

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন:
লিটারেচারের ফর্ম তো বদলে গেছে। আপনার সাহিত্য নিয়ে শর্ট ফিল্ম তৈরি হয়েছে। কেউ যদি আপনার গল্প নিয়ে সিনেমা বানাতে চায়, ওয়েব সিরিজ বানাতে চায়, তাহলে আপনি সেটা কিভাবে দেখবেন?

ফারুক মঈনউদ্দীন: এটা তো একটা মাধ্যম বটে। যে ছেলেটি আমার গল্প ‘শারীরবৃত্তীয়’ নিয়ে শর্ট ফিল্ম করেছে, যেদিন লেটেস্ট গল্পটা পত্রিকায় ছাপা হইলো, সে কিন্তু সাথে সাথে গল্পটি পড়ে আমাকে ফোন করেছে—“এটার ওপর আমি একটা ছবি করতে চাই।“ আমি তাকে বলেছি, “তুমি নাট্যরুপ দাও, স্ক্রিপ্ট তৈরি করো। তবে এখনই যে ছবি তৈরি করতে হবে, এমন কোনো বাধ্য-বাধকতা নাই।
অনেক বড় লেখকের প্রচুর লেখা কিন্তু ফিল্মে এসেছে। ফিল্মের ভাষা, ফিল্মের শৈলির কারণে হয়তো কিছুটা চেঞ্জ এসেছে। এটা একটা মাধ্যম তো। যারা পড়বে না, তাদের কাছে অন্য মাধ্যমে পৌঁছনো। ‘পদ্মানদীর মাঝি’ যারা পড়ে নাই, তারা ফিল্ম দেখেছে। সাহিত্য যদি অন্য মাধ্যমে দর্শকদের কাছে পৌঁছায়, তাহলে কারো আপত্তি করার তো কথা না।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: কামরুজ্জামান কামুর মতো কবি, নুরুল আলম আতিকের মতো লেখক কিংবা মাসুদ পথিকের মতো কবি সিনেমা বানিয়েছেন। তারা সাহিত্যের লোক ছিলেন আসলে। এই রকম জায়গায় গদ্য লেখকদের সিনেমা বানানোর ইনেশিয়েটিভ নেয়া উচিত বলে মনে করেন কি না?

ফারুক মঈনউদ্দীন: এখন কথা হচ্ছে গদ্য লেখকরা কী চাইবেন না, ওনার একটা গল্প কিংবা উপন্যাস সিনেমা হোক? নিশ্চয়ই চাইবেন। গদ্য লেখকদের ইনেশিয়েটিভ নিতে হলে একজন যোগ্য ডাইরেক্টর লাগবে। একজন যোগ্য অথবা ইচ্ছুক প্রডিউসার লাগবে। লেখকরা চাইলেই হবে না। এর সঙ্গে আরও দু-তিনটা পার্টি জড়িত।

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আমাদের সাহিত্যে নেপোটিজম নিয়ে আপনার বক্তব্য কী? নেপেটিজমের শিকার আপনি কখনো হয়েছেন?

ফারুক মঈনউদ্দীন: নেপোটিজমের শিকার হইনি কখনো। নেপোটিজমের শিকার হইলে আমি এখানে আসতে পারতাম না। আমি প্রথমেই বলেছি, আমি লেখালেখির জন্য বা লেখা প্রকাশের জন্য কারো সঙ্গে কোন সর্ম্পক তৈরি করা কিংবা অনেকে যে নানান স্বার্থে বিভিন্ন জনের সঙ্গে সর্ম্পক তৈরি করে; সেটা থেকে সব সময় দূরে থেকেছি। আশানুরুপ কেউ আমাকে চিনতেন না। নেপোটিজমের শিকার হলে আমার লেখাগুলো প্রকাশ পেতো না।

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন:
এই সময়ে যে লেখকরা লিখছেন তাঁদের জন্য কী বলতে চান?

ফারুক মঈনউদ্দীন: আমি নিজেই যেহেতু কিছু করতে পারি নাই; তাঁদের জন্য কী বলবো। এটাকে বিনয় ভাববেন না।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনি কেন মনে করেন, আপনি কিছু করতে পারেন নাই?

ফারুক মঈনউদ্দীন: আমার সব সময় এটা মনে হয়। এই মনে হওয়ার মধ্যে কোন ভান নাই। কোন বিনয় ও ভান ছাড়াই বলছি। আমি সিনসিয়ারলি মনে করি, আমি কিছু করতে পারি নাই। আমার নিজেকে খুব শিক্ষিত লেখকও মনে হয় না। অনেক যে পড়েছি, সেটা মনে হয় না। অনেকে ভাবে, আমি অনেক পড়েছি। হয়তো পড়েছি। কিন্তু আমার নিজের মনে হয় আমি অনেক কিছু পড়িনি। তেমনিভাবে আমি অনেক কিছু যে সৃষ্টি করেছি, এটা আমার মনে হয় না। এই কথার মধ্যে কোনো ভান নাই, কোনো বিনয় নাই। আমি সিনসিয়ারলি বলছি। আমি নিজেকে খুব বহুল পঠিত লেখক বলে মনে করি না। কিংবা লেখক বলেই মনে করি কি না সেটাও ভাববার অবকাশ আছে। ‘লেখক’ শব্দটা নিজের সমন্ধে ব্যবহার করতে আমার নিজের কুন্ঠা আছে। প্রসঙ্গক্রমে ‘সৈয়দ হকরে’ টানি। উনি একবার বলেছিলেন, “আমাদের সময়ে আমরা যখন লেখালেখি করি, যে সংশয়, যে কুন্ঠা ছিলো নিজের প্রতি, এখনকার প্রজন্মের মধ্যে সেটা নেই। একটা-দুটা লেখার পর মনে হয় ওনারা বিরাট কিছু করে ফেলেছেন।“ সেই প্রজন্মের লোক বা সেই মানসিকতার লোক আমি। আমি এখনও পর্যন্ত কাউকে যদি কোন লেখা পাঠাই খুব সিনসিয়ারলি বলি, “পছন্দ হয়েছে কিনা বলুন। পছন্দ না হলে নির্দ্বিধায় না ছাপবেন।“

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনি পৃথিবীর অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন। কোথায় ভ্রমণ করা বাকী আছে, যেখানে যেতে চান?

ফারুক মঈনউদ্দীন:
ল্যাটিন আমেরিকা। আমি ওই মহাদেশটায়, মানে দক্ষিণ আমেরিকায় যাই নাই। এন্টার্কটিকায় যাই নাই। আর সবগুলা মহাদেশে গেছি। আর দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশে যাই নাই। দক্ষিণ আমেরিকা মানে মেক্সিকো, কলাম্বিয়া, ব্রাজিল। কিউবা যাওয়ার খুব ইচ্ছা। হেমিংওয়ের বাড়িটা দেখার জন্য। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে যাবো।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: আপনার কবিতাগুলো আমাদের পড়া উচিত

ফারুক মঈনউদ্দীন: পড়া উচিত। এবং পড়ানো উচিত। আমার খুব অল্পকিছু কবিতা আছে যেগুলো আমি বলি ‘চূর্ণ পঙক্তিমালা’ । ‘চূর্ণ পঙক্তিমালা’ নিয়ে আমি একটা সিরিজ করছি, যেগুলো কোথাও আসে নাই আগে।

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: হেমিংওয়ে নিয়ে আপনি যে লেখাটা লিখছেন, এটা আমাকে খুব মুগ্ধ করেছে। এরকম লেখার রসদ আপনি পাঠ থেকে পান, নাকি ভ্রমণ থেকে পান?

ফারুক মঈনউদ্দীন: পাঠ থেকে পাই। এজন্য আমার অনেক বই পড়তে হয়েছে। হেমিংওয়ের ‘নারীরা’ নিয়ে আমার একটা সিরিজ লেখার ইচ্ছা ছিলো। অনেক দিন আগে। কিন্তু অনেকগুলো বই পড়তে হয়। পাঁচ -ছয়টা বই আছে ওগুলা ছাড়াও আমি পয়সা দিয়ে ইন্টারনেট থেকে ই-বই ডাউনলোড করেছি।

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন: করোনা কী আমাদের রাষ্ট্র সামলাতে পারলো? প্রতিদিন অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে।

ফারুক মঈনউদ্দীন: আমি সবকিছু রাষ্ট্রের ওপর ছাড়ি কেন? একজন নাগরিক হিসেবে আমারও তো রাষ্ট্রকে সহায়তা করা কর্তব্য। আমি কি রাষ্ট্রকে সহায়তা করছি? নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রকে কতোখানি সহায়তা করেছি? লকডাউনে পুলিশ, সেনাবাহিনী মিলে আমাদের নাগরিকদের কি তারা শৃংঙ্খলাবদ্ধ করতে পেরেছে? পারে নাই।
রাষ্ট্র কী করবে, আমি যদি রাষ্ট্রকে সহায়তা না করি? রাষ্ট্র তো সহায়তা করছে। আমি যদি সহায়তা করতাম, তারপর রাষ্ট্র যদি কিছু না করতো, তখন আমি বলতে পারতাম। আমার বলার কোন রাইট নাই যে রাষ্ট্র কিছু করছে না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: দীর্ঘ সময় আলাপ করলাম আমরা ফারুক ভাই। আলাপ তো আর শেষ হওয়ার নয়। আপনাকে ধন্যবাদ।
ফারুক মঈনউদ্দীন: তোমাকেও ধন্যবাদ শিমুল। তোমার সাথে আলাপ আনন্দের।

শ্রুতিলিপি: অলকানন্দা রায়
বিশেষ সহযোগিতা: তাশমিন নূর


2 Responses

  1. আবুল মোমেন says:

    শিমুলের সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে ভালো দিক হল এটি সুখপাঠ্য, প্রাঞ্জল। এতো বড় সাক্ষাৎকার একটানে পড়ে ফেলা গেল। বলা যায় বাধ্য হলাম। ফারুক মঈনউদ্দীন একজন দারুণ লেখক, জানা হলো তাকে, মনে হলো একটু গাঁ বাচিয়ে চলা লোক তিনি।

    অভিনন্দন দুজনকেই।

  2. prokash biswas says:

    হ্যাঁ, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা পরীক্ষার্থী তৈরি করে, শিক্ষার্থী নয়। শিরোনাম প্রকল্লনটি ভালো হয়েছে। ইন্টারভিউটি প্রাঞ্জল। আর রাষ্ট্রকে আমরা সাহায্য করছি না। সমাজ, রাষ্ট্র ভাঙ্গার কথা বলা সহজ। গড়া সহজ নয়। ভাঙ্গার কথাও এখন কেউ বলে না । গড়ার কথাও বলে না। কবে যে অসীম তমসায় একবিন্দু জ্যেতিমর্য়ের দেখা পাবো!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.