ব্যক্তিত্ব

তারেক মাসুদ: বন্দি পাখিটা কি মুক্তি পেল

ফাহমিদুল হক | 14 Aug , 2011  

tm_asma.jpg
মাটির ময়না ছবির অভিনেত্রীর সঙ্গে তারেক মাসুদ

তারেক মাসুদ বলতেন বাংলাদেশে ডিজিটাল ফরম্যাটের কয়েকজন ভালো সিনেমাটোগ্রাফার আছেন। কিন্তু ৩৫ মিমি ফরম্যাটের সিনেমাটোগ্রাফার আছেন একজনই, সে হলো মিশুক। আমার সঙ্গে ওর বোঝাপড়া এত ভালো যে ওর চোখের দিকে তাকালেই ও বুঝে যায় কী করতে হবে। তাদের এই যৌথতা প্রথম ছবি আদম সুরত থেকেই। তারেক মাসুদের যে কয়েকটি প্রজেক্টে মিশুক মুনীর ছিলেন না, বুঝতে হবে সেই সময় তিনি বাংলাদেশেই ছিলেন না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই তারা দু’জন বন্ধু ছিলেন। আর কাজের ক্ষেত্রে জুটি। ১৩ আগস্ট ২০১১ তারিখে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তারা দু’জনেই নিহত হয়েছেন।

family-tareq.jpg……..
তারেক ও ক্যাথেরিন, ছেলে নিষাদ ব্রিংহাম মাসুদের সঙ্গে; পারিবারিক অ্যালবাম থেকে।
……..
মিশুক মুনীর ছিলেন আমার সরাসরি শিক্ষক। তার চালচলন একেবারেই ‘শিক্ষকসুলভ’ ছিল না। ইয়া বড়ো এক মোটরবাইকে করে ভোঁ ভোঁ শব্দে ক্যাম্পাসে আসতেন–পায়ে বুট, পরনে জিন্স, হাতে গ্লাভস, মুখে পাকানো গোঁফ। তিনি সম্ভবত শিক্ষকতার পেশাটি উপভোগ করতেন না। ক্লাস ফাঁকি দিতেন। শিক্ষার্থী অবস্থায় আমি তাকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম বিজ্ঞাপনকলা ক্লাসে। মোটমাট তিনদিন ক্লাস নিয়েছিলেন। কিন্তু ঐ তিন ক্লাসেই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম শিক্ষক হিসেবে তার সামর্থ্য। কথাবার্তায় তিনি ছিলেন চৌকস। কিন্তু শিক্ষকতা পেশার ন্যূনতম নিয়মনিষ্ঠা তিনি পালন করতে অপারগ ছিলেন। তার প্যাশনের জায়গাটি ছিল অন্যত্র–চলচ্চিত্রের ক্যামেরার পেছনটায় দাঁড়াতে তিনি ভালোবাসতেন, উপভোগ করতেন। ফলে শিক্ষকতার ছিমছাম চাকরিটি ছেড়ে বা বাধ্য হয়ে ছেড়ে চিরতরে ক্যামেরার মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন। ক্যামেরার কারবার করতেই তিনি ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকা ছেড়ে দেশে ফিরে এসেছিলেন। তাই তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদের সর্বশেষ কয়েকটি প্রজেক্টে (কানসাটের পথে, নরসুন্দর, রানওয়ে, অন্তর্যাত্রায় আংশিকভাবে) আমরা তারেক-ক্যাথরিন-মিশুক ত্রয়ীকে দেখতে পেলাম।

মিশুক মুনীরকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ খুব বেশি পাইনি আমরা, কারণ শিক্ষক হিসেবে তিনি সুলভ ছিলেন না। কিন্তু আমার সৌভাগ্য হয়েছে তারেক মাসুদের কাছাকাছি যাবার। এই রচনায় আমি আসলে তারেক মাসুদের কথাই বলতে চাই। কারণ লেখালেখি, শিক্ষকতা ও গবেষণার যে জীবন আমার, তাতে এক পর্যায়ে আমি চলচ্চিত্র নিয়ে গবেষণার কাজে নিজেকে ব্যাপৃত করি। ফলে এই সময়ের সবচেয়ে মেধাবি চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের কাজ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তার কাছাকাছি আমাকে পৌঁছাতে হয়েছে।

তবে তাদের মনিপুরী পাড়ার বাসায় আমি প্রথম গেলাম আমাদের যোগাযোগ পত্রিকার জন্য লেখা সংগ্রহ করতে। যোগাযোগ ও সংস্কৃতি বিষয়ক আমাদের পত্রিকায় সাংবাদিকতার পাশাপাশি চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখা অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে ততদিনে জোর সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছি। ততদিনে মাটির ময়নার কল্যাণে তারেক মাসুদ খ্যাতিমান হয়ে উঠেছেন। তারই ব্যবস্থাপনায় বাসায় বসে মাটির ময়না আবার দেখলাম। তার আগ্রহ ছিল যে, মাটির ময়না নিয়ে দেশে ভালো কোনো লেখা তখনও রচিত হয়নি, যদি আমি সেই চেষ্টাটা করি! তবে ভালো মন্দ যাই হোক বহু লেখা পত্র-পত্রিকায় ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। আমার আগ্রহ মাটির ময়নার সমালোচনা লেখায় ছিল না, পত্রিকার জন্য তার লেখা কীভাবে পাওয়া যায়, তাতেই আগ্রহ ছিল বেশি। সে যাত্রায় একেবারে খালি হাতে আসিনি, আমাদের পত্রিকা ষষ্ঠ সংখ্যার জন্য তারেক মাসুদ আমার হাতে তুলে দিলেন ক্যাথরিন মাসুদের একটি লেখা, যা লন্ডনের ভার্টিগো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। আমরা অনুবাদ করে সেই লেখাটি ছাপলাম। বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের ধারণাটি কীভাবে মুক্তির গান থেকে মুক্তির কথায় এসে পাল্টে গেল এবং কীভাবে তারা মাটির ময়নার জন্য প্রস্তুত হতে থাকলেন, সেই প্রেক্ষাপটে একটি ভালো লেখাই লিখেছিলেন ক্যাথরিন। এরপর তারেক মাসুদ নিজেও একটি লেখা লিখেছিলেন আমাদের পত্রিকার সপ্তম সংখ্যায়–বাংলা চলচ্চিত্রের সঙ্কট ও তা থেকে উত্তরণের উপায়–এরকমই ছিলে সেই লেখার বিষয়বস্তু। তারেক মাসুদের সেই নিবন্ধে ব্যবহৃত ভাষারীতি আমাকে আকৃষ্ট করেছিল। চলচ্চিত্র গবেষক ও তারেক মাসুদের বন্ধু সাজেদুল আউয়ালকে বলতে শুনেছি, তারেকের লেখার হাত খুব ভালো ছিল। ও যদি কেবল গল্প লিখতো তবে সে সেরা গল্পকার হতো। আমিও খেয়াল করেছি শিল্পের বহু শাখায় তার গভীর ধারণা ছিল, কিন্তু শিল্পবোধ প্রকাশের জন্য তিনি চলচ্চিত্রকেই শেষ পর্যন্ত বেছে নিয়েছিলেন। তার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপে বুঝতে পেরেছি সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতি নিয়ে তার ভাবনাও গভীর ও বহুবিস্তৃত ছিল। কিন্তু তার প্রয়োগ তিনি কেবল চলচ্চিত্রেই করেছেন। পত্রিকায় কলাম-বিবৃতি বা টেলিভিশনে টক-শো বা সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে দেশ-জাতিকে মুহুর্মুহু বাণী-পরামর্শ দিয়ে মানুষকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলেননি, যদিও সেই যোগ্যতা তার পুরোমাত্রায় ছিল। তার যাবতীয় অভিপ্রকাশের মাধ্যম ছিল চলচ্চিত্র, মিডিয়ায় তার সৌম্য-হাস্যোজ্জ্বল চেহারা আমরা দেখতে পেয়েছি কেবল চলচ্চিত্রের কারণেই।

অথচ তার কাছে গিয়ে যারা দুদণ্ড বসেছেন, তারা জানেন কী আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বই না তিনি ছিলেন! সত্যজিৎ রায় যেমন খর্বকায় সব বাঙালিকে ছাড়িয়ে সটান দাঁড়াতেন, কেবল ক্যামেরার কারণে বা খর্বাকৃতির জাতিগত ভাই-বোনদের সঙ্গে কথা বলার জন্যই একটু ঝুঁকে আসতেন–তারেক মাসুদের মধ্যেও তার কিছু লক্ষণ ছিল। তিনি কেবল দীর্ঘকায় ছিলেন না, মননে-চিন্তায়-সৃজনশীলতায় তিনি ছিলেন অনেক উঁচুতে। তাই তার কাছে যখন গবেষণার প্রয়োজনে সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছি, প্রথম প্রথম তার ব্যক্তিত্বের সামনে কুলাতে পারতাম না। নিজেকে বড়োই ক্ষুদ্র মনে হতো। ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রের তাত্ত্বিক জ্ঞান বেড়েছে, সমানে সমানে না হোক, আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দেবার মতো যোগ্যতা ততদিনে হয়েছে। ফলে আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধার একটা পাটাতনে বসেই আলাপগুলো করতাম।

আমার পিএইচডি গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল বাংলাদেশের স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্রে জাতীয় আত্মপরিচয় কীভাবে রূপায়িত হয়েছে তা অনুসন্ধান করা। তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রে জাতীয় আত্মপরিচয়ের প্রশ্নটি ঘুরেফিরে এসেছে। ২০০৬ সালের দ্বিতীয় ভাগে আমি তার সঙ্গে তিন দফায় প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী সাক্ষাৎকার নিই। এছাড়া পিএইচডির পরে বাংলাদেশের ডিজিটাল চলচ্চিত্র নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেড় ঘণ্টার একটি সাক্ষাৎকার নিই। এইসব সাক্ষাৎকারের বাইরে ফোনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রচুর আলাপ হতো। তার চলচ্চিত্র অন্তর্যাত্রা আর রানওয়ে নিয়ে আমি সমালোচনা লিখেছি, সেসবও আলাপের উপলক্ষ্য ছিল। একবার তিনি আমাকে ডেকে নিলেন, লাঞ্চ করালেন, উদ্দেশ্য তার স্বপ্নের প্রজেক্ট কাগজের ফুল-এর চিত্রনাট্য আমাকে পড়াবেন এবং মন্তব্য শুনবেন। আমি নাকি অল্প চার-পাঁচজনের একজন যাদের তিনি চিত্রনাট্য পড়তে দিয়েছেন, যদি কোনো কার্যকর ফিডব্যাক পাওয়া যায়, সেই উদ্দেশেই তিনি আমার হাতে চিত্রনাট্য তুলে দিলেন। আগেই বলেছি, তার ছবিতে জাতীয় আত্মপরিচয়ের বিষয়টি ঘুরেফিরে আসে। কাগজের ফুল-এর ক্যানভাস অনেক বড়ো, ১৯৪৭-এর দেশভাগ ছবিটির প্রেক্ষাপট। মুক্তির গান, মুক্তির কথা, মাটির ময়না, নরসুন্দর–সব ছবিতেই জাতীয় আত্মপরিচয়ের প্রসঙ্গটি আছে। কাগজের ফুল হয়তো মাটির ময়নার চাইতেও বড়ো প্রজেক্ট–একে তিনি বলতেন মাটির ময়নার প্রিকুয়েল। বড়ো বিনিয়োগ দরকার ছবিটির জন্য। তৎকালীন কলকাতাকে তিনি কলকাতায় খুঁজে পাননি। তাই আলাদা সেট নির্মাণের কথা তার মুখে শুনেছি। তার মুখে শুনেছি প্রধান নারী চরিত্র কঙ্কনা সেনশর্মার কথা ভাবছেন। নানা কারণেই ছবিটি শুরু করতে পারছিলেন না। অন্তর্যাত্রা, রানওয়ে এগুলোকে তিনি বলতেন মাটির ময়নাকাগজের ফুল-এর মধ্যবর্তী ছোট বা মাঝারি প্রজেক্ট। সেই স্বপ্ন-প্রকল্পের লোকেশন দেখেই ইউনিট নিয়ে তিনি ফিরছিলেন মানিকগঞ্জ থেকে। ঘাতক বাস তারেক মাসুদের সেই স্বপ্ন পূরণ হতে দিল না।

তারেক মাসুদের জাতীয় আত্মপরিচয়ের ধারণার একটা বিবর্তন আমি দেখতে পাই। এটা তার ছবির মধ্যে যেমন আছে, তেমনি তার সঙ্গে আলাপেও এটা খুঁজে পেয়েছি। মানুষ ও সময় এই বিবর্তনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। তার মধ্যে এটা ছিল যে তিনি নিজেকে ক্রমাগত পাল্টাচ্ছেন, আপডেট করছেন। অন্য যেকোনো পরিচালকের চাইতে তার বৈশ্বিক চলচ্চিত্রের সঙ্গে যোগাযোগ বেশি ছিল। ফলে চলচ্চিত্রের সাম্প্রতিকতম কর্ম বা প্রযুক্তির বিবর্তনের সঙ্গে তিনি পরিচিত ছিলেন। সেইমতো তিনি নিজেকে পাল্টে ফেলতেন। তার অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বলতেন যে, যখন মুক্তির গান নিয়ে সারা দেশে প্রদর্শন করে বেড়াচ্ছি, আমরা সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া পেলাম। গ্রামের মানুষেরা বলছে, এইখানে তো আমাদের কথা নাই। কিন্তু যুদ্ধ তো আমরাও করছি। ব্যাস, আমরা এইসব প্রতিক্রিয়া ধারণ করতে থাকলাম, ভিডিও ক্যামেরায়। এভাবে এক ছবির মধ্য দিয়ে আরেক ছবি নির্মিত হতে থাকলো। মুক্তির কথার জন্ম এভাবেই। নারীর কথাও তাই।

rw7.jpg
রানওয়ে থেকে দৃশ্য

অর্থাৎ মুক্তির গান-এ যে মুক্তিযুদ্ধ, তা মূলধারার আধিপত্যশীল মধ্যবিত্তের দৃষ্টিতে দেখা মুক্তিযুদ্ধ। ছবির শেষে ন্যারেটর তারেক এরকম বলেন যে, যাদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা পেয়েছি, আমরা কি পেরেছি তাদের ত্যাগের মূল্য দিতে? এখানে ন্যারেটর মধ্যবিত্ত হলেন ‘আমরা’ এবং মুক্তিযোদ্ধা কৃষক হলেন ‘তারা’। তো ঐ কৃষকরাই বলে দিলো যে ঐ ছবিতে তাদের কথা নাই। ফলে মুক্তির কথায় আমরা একটা মুক্তিযুদ্ধের ভিন্ন বয়ান পাই। [তারেক মাসুদের আক্ষেপ ছিল যে মুক্তির গান নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, মুক্তির কথা নিয়ে তার যৎসামান্যও আলোচনা হয়নি। কিন্তু ঐ ছবিটির জন্য তার বিশেষ মমতা ছিল। তিনি একে বলতেন কাল্ট ফিল্ম। অর্থাৎ অল্প কজন মাত্র মানুষ একে পছন্দ করেছে, এবং ভালোমতোই নিয়েছে। মাটির ময়নায় দেখা গেল মুক্তিযুদ্ধকালেও একজন দাড়িওলা মূল চরিত্র রাজাকার বনে যাচ্ছে না, যদিও পাকিস্তানের ভেঙে যাওয়াটা সে মানতে পারছে না। আর যে বিহারিদের গড়পড়তা আমরা জানি যে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, সেই বিহারিরাই পাকিস্তানি মিলিটারির ধাওয়া খেয়ে পলায়নরত একজন মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচিয়ে দেয়। অর্থাৎ একজন শিল্পী হিসেবে তিনি প্রাধান্যশীল ধারণার বাইরে এসে একটা ভিন্ন বাস্তবতাকে তুলে ধরছেন, যেই বাস্তবতাকে প্রাধান্যশীল ধারণা পুরোপুরি অস্বীকার করতে চায়। শিল্পী হিসেবে তারেক মাসুদ এভাবে সততা ও নিষ্ঠার পরিচয় দিয়ে চলছিলেন।

আমি কাজ করছিলাম বাংলাদেশের স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র নিয়ে। তাদের নির্মিত চলচ্চিত্রকে যে আমি বিকল্প না বলে স্বাধীন বলছিলাম, সেই ২০০৬ সালে তিনি সেটাকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। বা বলা যায় তিনি নিজেই বিকল্প পরিচয়ে ততদিনে পেরেশান হয়ে পড়েছিলেন। তিনি এরকমও বলতেন যে, ফর্ম বা কন্টেন্ট কোনোটাতেই তো বিকল্প নই আমরা। তাই আমাদের ছবিগুলোকে স্বাধীন বলাই শ্রেয়, যেহেতু আমরা এফডিসির বাইরে স্বাধীনভাবে ছবি করছি। আমার কোনো কোনো বন্ধু এখনও বিকল্প শব্দটা ব্যবহার করে চলেছে। কিন্তু আমি বাজি ধরে বলতে পারি এক বছরের মধ্যে তারাও আর নিজেদের বিকল্প দাবি করবে না। ব্যাপারটা তাই ঘটলো। বিকল্প সেইসব বন্ধুদের কেউ কেউ বিকল্প ইন্ডাস্ট্রি ইমপ্রেস টেলিফিল্মের অধীনে ছবি বানিয়ে শেষ স্বাধীনতাটুকুও খুইয়ে ফেললেন। কিন্তু তারেক মাসুদ ও পথ না মাড়িয়ে স্বাধীন পরিচালকের পরিচয়টি অক্ষুণ্ন রেখেছিলেন।

তারেক মাসুদকে নিয়ে আলাপ করতে গেলে ক্যাথরিন মাসুদের কথা আসবেই। ক্যাথরিন সহ-পরিচালক, সম্পাদক, প্রযোজক। তাদের প্রডাকশনে ক্যাথরিনের ভূমিকাই যেন বেশি। তারেক ভাই বলতেন, পাগল না হলে কি আর এভাবে এখানে কেউ পড়ে থাকে। ক্যাথরিনের দাদা (নানাও হতে পারে, নিশ্চিত নই) হিরাম ব্রিংহাম ছিলেন পেরুর মাচুপিচু সভ্যতার আবিষ্কারক। ব্রিংহাম পরিবার ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তারেক মাসুদ একদিন লাজুক স্বরে বললেন, আর বলবেন না, বুড়ো বয়সে বাবা হতে চলেছি। তাদের প্রথম সন্তান হলো গত বছরের এপ্রিলে, সম্ভবত। নাম রাখা হলো নিষাদ ব্রিংহাম মাসুদ। ক্যাথরিন হলেন ওরকম একটি পরিবারের মেয়ে। চারুকলার ছাত্রী এস এম সুলতানের ওপরে গবেষণা করতে এলেন বাংলাদেশে। আর তারেক মাসুদ তখন এস এম সুলতানের ওপর আদম সুরত বানাচ্ছেন। বানাচ্ছেন মানে দীর্ঘ সাত বছর ধরে তিনি সুলতানের সাহচর্য নিচ্ছেন। তারেক-মিশুক জুটির প্রথম কাজ। এস এম সুলতান তারেক-ক্যাথরিন জুটিরও উপলক্ষ্য হয়ে রইলেন। তারেক মাসুদ সুলতানকেই দীক্ষাগুরু মানতেন। কিন্তু কথা হলো, দেড় বছরের নিষাদ এখন আর বাবাকে দেখবে না। ইমেইলে তার ছবি দেখেছিলাম। একদিন বাসায় গিয়ে তুলতুলে গালের নিষাদকে আদরও করে এলাম। আহা, আমরা হারিয়েছি তারেক ভাইকে। নিষাদ হারিয়েছে বাবাকে! নিষাদ ব্রিংহাম মাসুদ, তুমি কি ব্রিংহামকূলে ঢলে পড়লে? এ পাশের মাসুদকে আমরা আর কোথায় পাবো? তার দেহের খাঁচায় বন্দি হয়ে যে পাখিটা ছটফট করতো, সে তো উড়ে চলে গেছে।

১৩ আগস্ট, ২০১১

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: ফাহমিদুল হক
ইমেইল: fahmidul.haq@gmail.com



আরো লেখা

আমার শিক্ষক তারেক মাসুদ / সলিমুল্লাহ খান


তাহলে কি দেশপ্রেমই দায়ী! / আলম খোরশেদ



—–

আর্টস-এ প্রকাশিত আরো লেখা
ডিজিটাল সিনেমা নিয়ে তারেক মাসুদের সাক্ষাৎকার
খেলাঘর: যুদ্ধকালের ভালবাসার গল্প
অস্বস্তির সঙ্গে বসবাস (গল্প)
ডিজিটাল এইজে মানুষকে আরও বড়ো মাপের মানুষ হতে হবে — তারেক মাসুদ

ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters
Free counters


12 Responses

  1. সৈয়দ মাহবুব আহসান (শিমুল) says:

    পুরো জাতির সঙ্গে আমিও শোকাহত। জাতি হারালো দুই কৃতি সন্তান, আর চলচ্চিত্র কর্মীরা হারালো নতুন ধারার একজন পরিচালককে। তা ছাড়া মিশুক মুনির যে এত বড় মাপের একজন সাংবাদিক ছিলেন, তা অনেকের মতো আমিও জানতাম না। দুঃখ হয়, এই হত্যারও বিচার হবে না জানি।

  2. রানা says:

    মানুষ যখন চলে যায় তখন কেন আমরা তার মর্যাদা বুঝতে পারি। বেচেঁ থাকতে সঠিক মর্যাদা কি আমরা দিতে পারি না?

  3. Zaman says:

    মৃত্যু বড়ই নির্মম। আপনার লেখা পড়ে মনকে প্রবোধ দিতে পারছি না বরং হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এমন মৃত্যু চাই না যেটার ভার বহন করার ক্ষমতা আমার/আমাদের নেই। আমি আমার ছোট ভাই হারিয়েছি, ও ছিল আমার ভালোবাসার, স্নেহের সংশ্রব আর, তারেক ভাই কত দূরের একজন পেশার মানুষ অথচ তার জন্য মনে এত ভালোবাসা, শ্রদ্ধা জমা ছিল বুঝতে পারি নি। ক্ষমা করো হে প্রভু, ক্ষমা করো, তোমার এ নিষ্ঠুর খেলা থেকে।

  4. গোলাম কায়েস says:

    ভাষা নেই। এভাবে আর কত জীবন দিতে হবে।

  5. আহসান হাবিব শিমুল says:

    ফাহমিদুল হক, আমাদের কি এইভাবেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে যেতে হবে!

    তারেক মাসুদ তো মারা যাননি, তাঁকে খুন করা হয়েছে। যখন কোনো তথাকথিত দুর্ঘটনা নিত্যদিনের ঘটনায় পর্যবসিত হয়, তখন সেটাকে দুর্ঘটনা বলা অনুচিত। সেটা রাষ্ট্রের সিসটেম্যাটিক কিলিং।

  6. আমিনুল ইসলাম says:

    আমি তাদের রুহের মাগফেরাত কামনা করি। এই দুর্ঘটনাজনিত হত্যাকাণ্ডের একটা ভাল সমাধান হউক, যাতে আার মেধাবী প্রাণ এভাবে হারিয়ে না যায় আমাদের মাঝ থেকে।

  7. অর্ণব পুত্‌ says:

    এই মানুষগুলোর মৃত্যু এই বাংলাদেশের বাঙলা চলচিত্রের এক অলিখিত ইতিহাস হয়ে রইল। আমরা তাঁদের আর ফিরে পাবো না কিন্তু তাঁদের দেখানো পথেই জেনো আমাদের পথ চলা হয়।

  8. Md.Ashraful Islam says:

    আমার বাকরুদ্ধ। কোন ভাষা নেই আমার। কেন আমরা এখনও নির্লিপ্ত? আমাদের কি কিছুই করার নেই? আমরা কি সরকারের প্রহসন এখনও সহ্য করব ।

  9. Md. Mamun Rashid says:

    আগে আমি মিশুক মনিরকে চিনতাম না, তবে তারেক মাসুদকে অনেক আগে থেকেই চিনতাম! আমাদের দেশের দুই নক্ষত্র এই ভাবে টর্নেডোর মতো আমাদের সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যাবে? দুঃখ এই যে আমরা তাদের জন্য কিছুই করতে পারলাম না।

  10. seikh rahim says:

    একরাশ কষ্ট আর দীর্ঘ নিঃশ্বাস…………

  11. মাহমুদ says:

    তারেক মাসুদকে নিয়ে ফাহমিদুল হকের তথ্যবহুল স্মৃতিচারণমূলক লেখাটি পড়ে অনেক কিছু জানলাম এজন্য লেখককে ধন্যবাদ।

  12. Afroza Sultana says:

    একরাশ হাহাকার আর আতঙ্ক নিয়ে প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুলি, মনে হয় কাকে যেনো হারাবার খবর ছাপা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.