কবিতা

জল ও বৃষ্টির কাব্যভাসান

মতিন রায়হান | 9 Oct , 2020  


জলস্মৃতি ও প্রাচীন সিন্দুক

ডুবে গেলে জাহাজ, মাস্তুলে লেগে থাকে জলস্মৃতি!

তুমিও জাহাজ এক, অতীতের স্মৃতিজলে! নোঙরের
গল্পগুলো তোলা আছে প্রাচীন সিন্দুকে! রঙিন
বাদাম তুলে কে যায় সুদূরে? কলম্বাস? ক্ষণে ক্ষণে
জাহাজের ভেঁপু বেজে ওঠে! কোথায় মার্কিন মুল্লুক?
বাতাসে কান পেতে শুনি! তারাভরা আকাশে হাসে
ধ্রুবতারা, সপ্তর্ষিম-ল; কিন্তু আমার আকাশ কেন
অন্ধকারে ভাসে! শতেক বছর আগেকার স্পেনিশ
ফ্লু নয়, এ এক নতুন অণুজীব পৃথিবীজুড়ে যার
মারণ উল্লাস! অদৃশ্য শত্রুর ঘায়ে যেন তটস্থ ধরণি!
এমন জাহাজ এক ভাসাই সমুদ্রে সকল অশুভ
আর মৃত্যু-জরা যত আছে নিয়ে যাবে দিগন্তের
ওপারেতে! একদিন প্রেমের উদ্ধারে গিয়ে ডুবে মরে
জ্যাক…সলিল সমাধি! স্মৃতি নিয়ে বাঁচে তবে রোজ!
বরফের স্তূপ তাই টাইটানিকের এক করুণ উদ্ধৃতি!

ডুবে গেলে জাহাজ, মাস্তুলে লেগে থাকে জলস্মৃতি!

বৃষ্টিস্নান

বৃষ্টিতে ভেজাবে তো? ভেজাও! দেহমন খাক হয়ে আছে!

দেখেছো তো বর্ষাকালে কদমের দেহশোভা? হলুদ
কান্তির ঢেউ ডেকে আনে যৌবনের দূত; সোনারং
রোদে ভিজে তাই আজ স্বাগত জানাই : এসো,
মিলনের স্বপ্নগুলো সত্যি করে তুলি! তোমার ঠোঁটের
কোণে যদি হেসে উঠে চাঁদ, তবে ওই চাঁদের আলোয়
ডুবে যেন মরি! পিকাসো কি ভ্যানগগ আঁকুক
তোমার মুখ, বুকের সুষমাফুল! আমি বুঁদ হয়ে দেখি!
বনের হরিণী যদি ছুটে আসে জ্যোৎস্নাধোয়া চরে
কী করে ফেরাই বলো ঘোরলাগা সেই নিশিডাক?
মুখ তুলে দেখো, আমি এক পুণ্যবান রূপের পূজক!
তোমার কথার জাদু আর বাকভঙ্গি কী উতল ঢেউ
তোলে মনে! শ্রাবণের ঝরো দিন ক্ষণে ক্ষণে কাছে
টেনে আনে! কালের আবর্তে যদি রূপ-রস-গন্ধসুধা
দিগন্তে হারায়! কে আর আপন ভেবে ডেকে নেয় কাছে?

বৃষ্টিতে ভেজাবে তো? ভেজাও! দেহমন খাক হয়ে আছে!

হাওরগাথা

[উৎসর্গ : সাকিন হাওরবাড়ি আর চৈতন্যের প্রিয় রাজীব চৌধুরীকে]
নলুয়ার হাওরের জলে ভাসে আজ জোড়া জোড়া হাঁস!

আমি তো হাঁসের চোখ দিয়ে দেখি থইথই সমুদ্দুর!
ভাসমান বাড়িগুলো দ্বীপের ঐশ্বর্য নিয়ে ভেসে আছে।
বাড়ি বাড়ি হচ্ছে জবাই রঙবেরঙা লেজতোলা হাঁস;
আর রান্নার সুঘ্রাণে উতল শৌখিন পর্যটকী মন!
কখনোবা হাওড়ের বিশাল বোয়াল স্বাদু জিহ্বায়
রসনার ফুল হয়ে ফোটে! ফিরে এলে নৌকাবাইচের
দিন, হাসন রাজার চোখে জ্বলে ওঠে তেলের পিদিম!
বাউল আব্দুল করিমের ‘কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে…’
ঝঙ্কারে ঝঙ্কারে ডুবে-ভাসে অন্তরবাউল! এসো তো
বঁধুয়া, প্রাণের ওপরে রাখি প্রাণ, দেহ তো বাঁচুক!
অঙ্গে অঙ্গে না হয় বিলাবো দেহসুধা আর মরমে
মরমে প্রাণের কান্দন! লালনের খাঁচা যদি ডাক
পাড়ে : ছুটে যাবো, আমি তো অচিন পাখি! এ জগৎ
রঙ্গশালা! হাসিঠাট্টা সুখদুঃখে শুধু ক্ষণিকের বাস!

নলুয়ার হাওরের জলে ভাসে আজ জোড়া জোড়া হাঁস!

কোড়াপাখির গল্প

খাঁচাবন্দি কোড়াপাখি ছেড়ে দাও বনে, তুমি তো শিকারী!

চতুর কোড়াটা দেখি শেখানো কৌশলে ডেকে আনে
বুনো কোড়াদের, অতঃপর বন্দি করে নেয় লোহার
খাঁচায়! তুমি ক্রূর হাসি হাসো! এমন খেলায় তুমি
মেতে আছো বহুদিন; ওরে নিদয়া শিকারী! দ্যাখো,
বিপুল বিষণœ মনে কোড়াশিশু দিগন্তে হারায়! হায়!
বিলে-ঝিলে জলে ও জঙ্গলে কী করুণ বেদনা
ছড়ায়! শ্রাবণের মেঘঘন এই দিনে রঙিন পিনিস
ছোটে যেন শখের সন্ধানে… তুমি মনে মনে রাজার
কুমার! আমরা তো প্রজাসাধারণ! আমাদের চিত্তে
বাজে বিত্তহীনতার সুর, শ্রমে আর ঘামে ভেজা
বেদনা বিধুর! তোমার ভাগ্য তো চন্দ্রলেখা, বলিহারি!
আমাদের দিন পোড়ে সূর্যের প্রখর তাপে! কখনোবা
ধোঁয়া ওড়ে, ধূলিঝড় অন্ধকারে খুঁজি আপনা সাকিন
হায়! পোড়াদগ্ধ মন নিয়ে কেন আজ পথে পথে ঘুরি?

খাঁচাবন্দি কোড়াপাখি ছেড়ে দাও বনে, তুমি তো শিকারী!

নদী ও সমুদ্রের গান

নদী-সমুদ্রের বন্ধনের কাছে কিছু জমা রেখে যাই

তুমি শল্কপত্রে প্রতœস্মৃতি, আমি মন্মথ তোমাকে পাই
দেহের বীণায়! হৃদয়ের পুষ্প ডানা নাড়ে সজল
গ্রীবায়, এসো মরমিয়া, উজ্জ্বল উদ্ধারে পৃথিবীকে
ত্রস্ত করে তুলি! তুমি চর কুকরি মুকরি যাবে?
ফুঁসছে সমুদ্র, রোদ উঁকি দিচ্ছে দেহের কিনারে;
সবুজ বনের হরিণীরা চর্যার নতুন চরে ঢেউ তুলছে!
বোধের নগরে দোলা দিচ্ছে অজন্তার গুহাচিত্র!
বিস্ময়ে বিমূঢ় আমি! চরফ্যাশনের জাহাজঘাটে
আজ কী রেখে এলাম? অন্ধকার না কি আলোর
ফোয়ারা? মধুমতি, তুমি কি নদীকে চেনো?
চিকিৎসাবিদ্যার ভাষায় ও কথা বলে! আমি তো
চিরশরণার্থী হৃদয়ের অসুখে-বিসুখে! ও ঢেউখেলানো
সবুজ, কী অস্থির পরাপৃথিবীর সজল মেঘমল্লার…
দ্যাখো, প্রেমের নৈবেদ্য আজ কী করে সাজাই!

ও জোৎস্নাফোটা রাত, নিরজনে স্তনের মতো তোমাকে বাজাই!


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.