গল্প

করাতকাটা ঘুম

সিদ্দিক বকর | 28 Jul , 2020  


একটি সাপ ও একটি ব্যাঙ। সাপটা ব্যাঙটাকে ধরতে যায়। ব্যাঙটা বসে আছে একটা মজা গর্তের স্যাতস্যাতে পানির কিনারের লাগোয়া ডাঙ্গায়। মজা গর্তটায় বৃষ্টির পানি জমে আছে। গাছের পাতা, শ্যাওলা, কচুরিপানা, মটকা,জারমুনি সব মিলিয়ে পানি খুব কালো হয়ে আছে। ব্যাঙটা দেখে সাপটা এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে, সাপটা বেশ বড়োসড়ো, রসিয়ে রসিয়ে এগুচ্ছে, কিঞ্চিৎ আঁকাবাঁকা করে শরীরটাকে টেনে টেনে,শুধু মাথাটা মাটি থেকে একটু ওপরে, তীক্ষè নজর রেখে ব্যাঙটার দিকে।
দৃশ্যটা দেখার সাথে সাথে বায়ুমন্ডলে ভেসে চলা সাদা মেঘের মতো ভেসে এসে নামে একটা বায়োস্কোপ। মেলার সেই কিশোর-কিশোরের উদ্বেগে মিথুন দৌড়ে গিয়ে বায়োস্কোপে চোখ রাখে। একটা বিন্দু দ্রুত তার দিকে ক্রমে বড়ো হয়ে আসে, বিন্দু থেকে বড়ো হয়ে বায়োস্কোপের বিশাল পর্দা জুড়ে ভেসে ওঠে কস্তুরীর মুখ ।
ব্যাঙটাকে ঘিরে তখন কস্তুরীর মুখ ভাসে, মিথুন তার দুইহাত বুকের ওপর ক্রস করে রেখে ম্যালেরিয়ার প্রকোপে কাঁপতে থাকে, শক্ত করে নিজেকে আকড়ে ধরে কস্তুরীর দিকে তাকিয়ে রয়, কী সুরতে সামনে আসো ও আমার হরিনের নাভী!
– যেমনে ধরেন, আমারে ব্যাঙ পায়ছেন ? আমি ব্যাথা পায়না ? যেমনে ধরে মনে অয় সাপে ব্যাঙ ধরছে।
– আমি কি সাপ ?
– সাপইতো। দুক দেন ক্যান ? দুক দেয়া কি মজাডা পান ?
– দুক দেয়াই মজা পাইগো। তুমিতো ইকটুতেই ব্যাঙের মতো ক্যাঁৎ করে ওডো। তখন আমার মজাডা কৈ যায়, এ-ই চিন্তাটাতো করোনা।
ব্যাঙটা কোলা ব্যাঙের জাত। বয়স কম। কাঁছি বাছুরের মতো কচি ও সুন্দর, শরীরটা পিচ্ছিল। মাত্র পানির ভেতর থেকে ডাঙায় উঠেছে দেখে বুঝা যায়। ক্ষুধার্ত। পেটটা ঝুলে আছে ভিক্ষুকের শূন্য ভিক্ষারঝুলির মতো। ব্যাঙটার তীক্ষ্ণ নজর এবং গতরখাটা মনোযোগ পোকা-মাকড়দের নিরলস ও আনন্দঘন চলাচলের ওপর। ওরা খেলছে, দৌড়ছে, ছোট ছোট দুর্বা-ঘাসের সুশৃঙ্খল এলোমেলো ছড়িয়ে থাকা চিকন ডাঁটার ওপর দিয়ে, কখনো অকস্মাৎ একটুক্ষণের জন্য দুর্বা-ঘাসের চূড়ায় এসে থামছে, ঠিক নাকফুলের মতো ফুটে থাকা বোঁটার ওপর- হয়তো ঐ বোঁটার ভেতর আছে মধু- কখনো দৌড়াদৌড়ি খেলার ভিতর দিয়ে পারছে তো খেয়ে যাচ্ছে সেই মধু, আবার মত্ত হয়ে পরছে খেলায়, কিন্তু ক্ষুধার্ত এক ব্যাঙ যে গভীর মনোনিবেশে বসে আছে আধারের জন্যে গোপনে, সেকি আর ঐ পোকা জানেগো; ঠিক ঐ সুযোগে ওত পাতা ব্যাঙ একটার পর একটা পোকা খেয়ে যাচ্ছে অন্তরোল্লাসে থাকা, মধুতে চুমুক দেয়া অবস্থায়। এই খেলা পোকাদের একধরনের চক্রাকার খেলা, যেইনা ব্যাঙের কাছাকাছি আসছে পোকা, আর অমনি ব্যাঙ তার চিকন সুতার মতো জিহ্বা দিয়ে, নিঃশব্দ তড়িৎ গতি ব্যবহার করে পোকা ধরে ধরে খেয়ে নিচ্ছে এক নৈঃশাব্দিক ধ্যানের মধ্যে থেকে। এই ধ্যানমগ্ন ব্যাঙের পেছন দিক থেকে খুব সন্তর্পনে আসে সাপ, ব্যাঙ তার আধার। আধারের আধিক্যে পড়ে ব্যাঙ দিশেহারা হয়ে পড়ে, লালসা উগ্রে ওঠে। এদিকে সাপ অতিশয় নিরবে, নিরবতায় যুক্ত থেকে, নিজ হতে সৃষ্ট, নিজের চলনে কোনো ধরনের ছন্দপতনে গড়ে ওঠা শব্দাবলীর কারণে যেন ব্যাঙের ধ্যান না ছোটে ততটুকুই সাবধানে এগিয়ে আসে সাপ। প্রকৃতিতে যত শব্দ আছে – যখন যেমন শব্দ থাকে তার সবই – সেই সব শব্দাবলীর নম্রতা, রূপমাধুর্য, শ্রুতিমধুরতা- এরূপ বিভিন্ন মূলস্বরধ্বনি ; যেমন বাতাসের শব্দ, লতাপাতার শব্দ, শিশির ঝরার শব্দ, প্রাণীদের চলাচলের শব্দ- এ সব শব্দ একত্র হয়ে (কম্পোজ) প্রকৃতিতে এক বিশেষ প্রাকৃতিক সংগীতের রচনা হয়- সেই সংগীতের মূলসুর ও স্বরকে তার মতো প্রশান্ত রেখে, তাকে শোষন শাসন না করে, সাপ তাই অতিরিক্ত সাবধানে এগিয়ে যায় তার আধারের ওপর দখল নিতে।

এখন সময়টা ভোরের, রাত শেষে দিনের শুরু, এমন সময়টা সাপকে আরো অতিরিক্ত সাবধানী করে তোলে। রাত পোহায়ে দিনের শুরুতে ভোরের সংগীতস্বর হয় নরম, নম্র; তাই সাপের এমন প্রশান্ত পরিবেশে একটু অসাবধানতার কারণে তার চলাচলে সৃষ্ট শব্দমণ্ডলী যদি প্রকৃতিতে চলমান শব্দের চেয়ে একটু পরিমানে তীব্র হয়ে ওঠে, সাথে সাথে ব্যাঙ সতর্ক হয়ে লাফ দিয়ে পড়বে জলে, না তা হতে দেয়া যাবেনা, প্রকৃতির মূলসুরে নিমজ্জিত হয়েই সে এগুচ্ছে, ব্যাঙের সামনের অংশ একটু নড়লেই সাপ থেমে যাচ্ছে ; আর একটু, আর একটু পথ এগুলেই শিকার নাগালের ভিতর।
মিথুনেরও সাবধানতার শেষ নেই। শারীরিক নড়াছড়াতো দূরাবাস,শ্বাসটাও সাবধানে ফেলছে, এমনভাবে শ্বাস-প্রশ^াসের প্রক্রিয়া চালু রাখছে, যার শব্দ সে নিজেই যেন শুনতে না পায়।
সাপ আর ব্যাঙের এমন জীবন্ত খাবারের ওপর দখল নেয়ার প্রাণপণ, অনুপম প্রয়াস, তার জীবনে ইতিপূর্বে, এরূপ নীরবে, ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভূত করার বিষয় হয়ে আর আসেনি; আজ তার সে এক মহাজাগতিক প্রত্যক্ষদর্শী।

প্রতিদিন সকালে ঠিক এমন সময়েই মিথুন ঘুম থেকে জেগে ওঠে, ওঠেই বাড়ির পূর্ব-দক্ষিন কোণায়, আম গাছের তলায় বসে, দক্ষিন দিকে মুখ করে পাইপ দিয়ে কাঁচা ওয়ালে পানি দেয়ার মতো চেন চেন করে প্রস্রাব করে; প্রস্রাবের তোড় বালুমাটি কিভাবে গর্ত করে চলে দেখতে দেখতে তলপেট খালি হয়ে যায়। প্রস্রাব শেষ কোরে দক্ষিন দিকে দাঁড়িয়েই, বাম হাতটা লুঙির তলে রেখেই চুলকাতে চুলকাতে ঘুমকাতর শরীরটা মেলে ধরে দক্ষিনা হাওয়ায়। দক্ষিন দিক একেবারে খোলা। আরো দক্ষিনে ঘোড়াউত্রা নদী। সেই নদী থেকে দলে দলে ওঠে আসে শীতল বাতাস, প্রাণ মন যায় জুড়িয়ে। বুক ভরে আরো বাতাস নেয়ার জন্য সে ধীরে ধীরে বাড়ির ঢাল বেয়ে নিচে নামে, সেই মজা পুকুরের দক্ষিনের পাড় হয়ে। এই মজা পুকুরটি মিথুনের বাড়ির পূর্ব পাশে, বাড়ি ঘেঁষে ঢালু হয়ে নেমেই এই মজা পুকুর যেন মিথুনের বাড়িটাকে তার ডান কাঁধে করে আগলে দাঁড়িয়ে আছেতো আছেই, কোনো প্রকার ওজর-আপত্তি নেই।
ঢালুতে নামতে নামতে মিথুনের চোখের ক্যামেরায় ধরা পরে সাপ-ব্যাঙ-পোকার নির্মানাধীন ত্রিমাত্রিক প্রাণবন্ত ধীরগতির এক দৃষ্টিনন্দন চলচ্চিত্র। ঠিক তখন থেকে সে নীরব হয়ে প্রায় এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে এখানে।
সাপ-ব্যাঙের আধার খাওয়ার এই সজীব জীবনীয় চলচ্চিত্রায়ন শেষ না করে সে কোথাও যাবেনা আজ। যত রকমের সাবধানতা আছে, নীরব হওয়ার যত ধরনের ফন্দি আছে তার পেটে, সব নিয়োজন করছে এখন সে; কোনোমতেই আমার অস্তিত্ব ওদের গোচরে আনা যাবেনা, সেরকম যদি কিছু ঘটেই যায় তাহলে প্রথমেই সাপের আগে ব্যাঙ এক লাফে কোথায় যাবে তার কোনো হদিসই পাবেনা সাপ। পুরো দৃশ্যটাই দেখতে চায় মিথুন, তাই সে উত্তেজনায় একেবারে টানটান হয়ে আছে, সাপকে নিয়ে সে অতটা চাপ বোধ করছেনা যতোটা না করছে ব্যাঙকে নিয়ে। সাপের যে দৃষ্টি, শ্রবণ ও ঘ্রাণশক্তি অত্যন্ত দুর্বল সে তার খুব ভালো করেই জানা আছে, টেনশন হলো তার ব্যাঙকে নিয়ে; সে খুবই চালাক, যদি কোনো উপায়ে ভয় জাগানিয়া কোনো একটি শব্দ তার কান পর্যন্ত পৌঁছতে পারে আর অমনি সে চক্ষের পলক ফেলতে দেরি হবে কিন্তু পালাতে বিন্দু-বিসর্গও দেরি হবে না, সেটা ঐ সাপ তার চেয়ে আরো ভালো করে জানে, তাইতো সাপ এত সাবধানে এগুচ্ছে।
এই যে এমন আনন্দঘন একটা দৃশ্য অবলোকন করার মাঝে, ছন্দ পতনের আশংকায়, শরীর মনে যে স্নায়বিক চাপ তৈরী হয় তার মাঝে লুকিয়ে প্যাচিয়ে থাকে সুখ, আর না হয় সে কিভাবে এতক্ষণ ধৈর্যকে বশ করে সময়টা অতিক্রম করতে পারতো- অপেক্ষার পালা যেন বিশাল গুরুভার এক পাথর খণ্ড বুকে ওঠে বসে থাকে- এমন সব বহু রঙের কল্পনায় ভর কোরে ধৈর্যটাকে আরো খুঁটিগাড়া করে নেয়। ঘর থেকে বের না হলে কি আর এমন এক সাধারণ বিষয়কে অসাধারণ রূপে ধরা যেত।
মিথুনের বাড়িটাও একটু পরিমানে আলাদাই বলা যায়- তার বাড়ির পিছনে, মানে উত্তরে বাড়ি আছে সারি সারি, কিন্তু ঘন নয়।
পশ্চিমে ছোট্ট একটি জঙ্গল, যেখানে থোকা থোকা বাঁশের ঝাড়ে ভর্তি, তার মাঝে- তার আশ-পাশে বড়ো বড়ো কিছু রেইনট্রি, বড়ো ছোটো মিলিয়ে অনেক গাবগাছ ও গাবের চারা, কড়ুই, আম, জাম, কাঠাল, রইন্যা, মান্দাইল, তেতুল, জলপাই গাছ মিলিয়েই এই জঙ্গলের অবস্থান কিন্তু এখনের এই জঙ্গলকে ত্রিশ বৎসর আগের জঙ্গলের তুলনায় জঙ্গল বলাটা সঠিক নয়, কারণ বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে জঙ্গলের পশ্চিম পাশের রাস্তায় মানুষ ও ছোট যান চলাচল ষ্পষ্টই দেখা যায় জঙ্গলের ফাঁক-ফোকর গলিয়ে, সূর্যের আলোও ঢুকে এখন গাছের ফাঁকে ফাঁকে। ত্রিশ বৎসর আগের জঙ্গলের ভিতর দুপুরে ঢুকলে মনে হতো সন্ধ্যা, তিন হাত দূরের লোকটা জঙ্গলের ভিতর অন্ধকারে সহসা হারিয়ে যেত।
দক্ষিনে অবারিত দ্বার, ফসলের মাঠ, বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রঙে বিভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয় এই বিশাল মাঠ। কখনো সোনালি কখনো সবুজ আবার কখনো রূপালী এক চিতল মাছের পেট সদৃশ নদী হয়ে হাজির হয়। আরও দক্ষিনে শালপ্রাংশু জলকাক ও পালওড়া পানসি বাওয়া নদী এক- নাম তার ঘোড়াউত্রা, যে নদী তার শাাখা প্রশাখা দিয়ে বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চল প্লাবিত ও উর্বর করে চলেছে সাত পুরুষ পরম্পরায়।

বাড়ির দক্ষিন সীমানায় নদীমুখ করে দাঁড়ানো মাত্রই চৈত্রের দাবদাহেও নদী থেকে নির্মল হাওয়া বয়ে এসে শরীর জুড়িয়ে দেয়। এক লহমা আগেই মিথুন ঐ পানসি বাওয়া নদীর কথা ভাবছিল, ভাবতে ভাবতে দৃষ্টির বায়োস্কোপে ঘোড়াউত্রার জলে ফুটে ওঠে পদ্ধের মতো সুন্দর এক পাল ওড়ানো পানসি নাও, যার ভিতর ঘোমটা টেনে রঙধনু নোলক পড়ে বসে আছে তার কলাবউ, হরিনের নাভি- কস্তুরী। রাতে বিয়া করে ভোরে রওনা হয়েছিল বর-কনে, কন্যাশিশুর মতো ফুটফুটে ছোট্ট পানসি নৌকায়। সে রাত ছিল ঋতুবতী পূর্ণিমা রাত। আয়না-জ্যোৎস্নার ভিতর রাত থেকে ভোর, ভোর থেকে রাত আলাদা করা ছিল খুবই দুরূহ। পূর্ণিমা রাতে বিয়ে হলে মিলনে দুজনেরই সমান সুখ হয়, সন্তান হবে সুন্দর ফুটফুটে করপদ্ম। সেই কারণেই দুই পক্ষের অভিভাবক মিলে বিয়ের পরব পূর্ণিমার জ্যোৎস্নার ঘোমটার ভিতরই মূর্ত করে তোলে। বিয়ের রেজিষ্ট্রিতে স্বাক্ষর করার সময়, কস্তুরী লেখা স্বাক্ষরটা অনেক্ষণ ধরে, চোখের ভিতরের লেন্স হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল মিথুন; তার চোখের সামনে ভেসে ভেসে উঠছিল দূরন্ত হরিণীর চকিত চাহনি। এর বেশি কল্পনা করতে চায়নি মিথুন, পরের দিনের জন্য তোলে রেখেছিল।
পরেরদিন সকাল-সকাল পূর্বাকাশে সূর্যটা আছড়ে পড়ছিল, আলোটাও যাচ্ছিল কাঁচভাঙ্গা ভেঙ্গে; কাঁচভাঙ্গা আলোর ঘষায় মিথুনের করাতকাটা ঘুমের জ্বলুনি-চোখজোড়ার ঘুমটা যায় কেটে, তার ওপর সূর্যের আলো এসে কাটা ঘুমে নুনের ছিটা দিচ্ছে যেন, চোখ কচলাতে কচলাতে তাকায় মিথুন, মনে হয় মরিচপুড়া গ্যাস এসে চোখে-মুখে ঝাপটা মারে; তড়িৎ মিথুন হাত দিয়ে নদীর পানি তোলে যেই চোখে-মুখে ঝাপটা দেয়, চোখের ভিতরটা গড়গড়িয়ে ওঠে, মনে হয় এ যেন জল নয়, মিহি কাঁচগুড়া।
একদিনের অনিদ্রা মিথুনের মনে হয় সবকিছুই তার উলট-পালট করে দিয়েছে। নিজেকে একটু সামলেই সে কস্তুরির দিকে তাকায়। যেমন দেখেছিল সে এখনও তেমনই আছে। ঘোমটাটা টানাই। শরীরজুড়ে শাড়ির বিস্তারের জন্য ভিতরে নিবিষ্ট অবয়বটুকুর বাঁক চোখে পড়ে না, অবভাসটুকুও নিবে আছে যেন।
মিথুন নিজের ভেতর ধুকপুক করে-
কাছে যাবে! কাছে বসে একটু নিচু স্বরে ডাকলে কেমন হয়! বেচারির মন নিশ্চয় এখনো বিষাদময়। বিদায়ের সময় বেচারি কেবল কান্নার গমকে কাটা বৃক্ষের ন্যায় ঢলে পড়তে যাচ্ছিল আর অমনি মা,বাবাসহ ভাই-বোনদের সেকি বজ্রপাতসহ কান্নার ঝড়,অবস্থা বেগতিক দেখে নিজেদের মধ্যে কে-না-কে জানি নতুন বউকে পাজা-কোলা করে পলকের মাঝে নৌকায়। মুহুর্ত সময়ের মধ্যে কস্তুরী লকডাউন হয়ে যায়- দাঁতি লাগে। অনেকেই গুমরো মুখে ব্যস্ত হয় কস্তুরীর দাঁতি খোলতে।
মিথুন প্যাড়ালাইজড লোকের মতো, ডান হাতের ওপর ভর করে, কোমর টেনে টেনে, বাহির থেকে ছৈইয়ের ভিতর দিয়ে কস্তুরীর কাছাকাছি যেয়ে বসে।
আবার মিথুন নিজের ভেতর ধুকপুক করে-
শরীরে নড়াচড়া নেই, নৌকার দুলুনি যতটুকু দোলাচ্ছে সেইটুকুই ; হাটুর ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লো! কোনরূপ ভঙ্গিই বোঝা যাচ্ছেনা। একটু ডাকবে! কিন্তু সে কিভাবে? নাহ্ নিঃশব্দ বসে থাকাই ভালো, অপেক্ষা করি।
কস্তুরীর পাশে বিড়ালের ন্যায় হাত-পা ও শরীর ছেড়ে বেঘোর ঘুমায় তার ছোট বোন তরী।
নৌকায় সেদিন আর কস্তুরীর মুখ দেখা হয়নি মিথুনের। সে ছিল বর্ষাকাল। মিথুনের বাড়ির কুলে কুলে ছিল পানি। মিথুনের বাড়ির দক্ষিন দিকে তাকালে মনে হবে এ এক বিশাল নদী যেন। কনের নৌকা যখন ঘাটে এসে ভীড়ে, তখন দুপুর হওয়ার আর খুব বেশী বাকী নেই। পাড়ার মহিলারা আগে থেকেই মিথুনের বাড়ির দক্ষিন-পূর্ব কোণায় এসে ভীর কোরে অপেক্ষা করছে মিথুনের বউ দেখবে বলে। এর ঠিক নিচেই মিথুন আজ একেবারে নিরাকার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাপ-ব্যাঙ-পোকার দৃশ্যের পিছনে। সেদিন এখানে ছিল প্রায় নাক-ডোবা জল। ঘাটে এসে নৌকা ভিড়ার পর আনন্দের খৈ ফুটতে থাকে সবার মাঝে। নৌকার ভিতর থেকে কস্তুরীকে সবার হাতের করতলে বসিয়ে নিমিষে নিয়ে আসে টানে। উল্লাসমাখা টানাটানির ভিতর সেদিন কস্তুরীর পক্ষে ঘোমটার আব্রু ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। তখনি মিথুন কস্তুরির মুখ দর্শনে সক্ষম হয়। দেখেতো মিথুন তাজ্জব বনে যায়, থেমে যায় চোখের পলক- এতো দেখি মহাসুন্দরীরে বাবা! মিথুনের আত্মার অনেক গভীর থেকে একটি শব্দ ওঠে আসে, অনুচ্চারিত হয়ে ঠোঁটে বসে- ”সুব্হান আল্লাহ”!

এদিকে সুন্দরকে বর্ণনা করার জন্য যত শব্দ-প্রতিশব্দ আছে তার সব গুঞ্জনাকারে লোফা-লুফি করে উপস্থিত মহিলাদের মুখ থেকে মুখেমুখে ফিরে। সেই বউ মরে গেল হুটহাট করে বছর না যেতেই! মিথুনের ভেতরটা পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে গিয়েছিল। মিথুনের কাছে বেঁচে থাকার অর্থই গিয়েছিল বদলে। সে অন্ধকারে ডুবে যায়, কস্তুরীকে কবর দেয়ার সাথে সাথে মিথুনের দেহটা ব্যতীত তাঁর সবকিছুরই কবর হয়ে যায়। কস্তুরী তাঁর জীবনকে আলোকিত করেছিল, তাঁর জীবনের সবকিছু খুব মূল্যবান ও অর্থময় করে দিয়েছিল। কস্তুরীর মৃত্যু হয়েছিল প্রসবের পরপরই। সেই প্রসবে কন্যা সন্তান জন্ম দিয়েছিল কস্তুরী। সেই কন্যাকে সুস্থ রেখে সে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে। আর সেই কন্যাই মিথুনকে ধীরে ধীরে বেঁচে থাকার জন্য তৃষ্ণার্ত করে তোলে। মিথুনের বয়স মাত্র তখন পঁচিশ। মা তাঁর একমাত্র সন্তানকে সখ করে বিয়ে দিয়ে দেয়। সেভাবে কোনো উপযুক্ত কর্মেও ঢুকেনি মিথুন। বিয়ের পর সারাদিন দুজন একসাথে সময় কাটায়। দুজন একেবারে গলাগলি হয়ে থাকে- কবুতরের জোড়া, লাঙ্গলে জোরা গরুজোড়া যেন।
যেদিন মিথুনের মা প্রথম শুনেছিল কস্তুরীর গর্ভকাণ্ডে ভ্রূণকূঁড়ি ফুটেছে সেদিন থেকে মিথুনের মায়ের পা আর মাটিতে পরেনা আনন্দে, নতুন মেজবানের খবর শোনে সারা শরীর তাঁর আনন্দের মরিচবাতির আলোকসজ্জায় চোখটিপে জ¦লে নিবে।
এর মধ্যে ব্যাঙ হঠাৎ উচ্চস্বরে ক্যাঁককেঁকে, ক্যাঁকক্যাঁক চিৎকার করে উঠলে মিথুন দেখে ব্যাঙ সাপের মুখে, কামড়ে ধরে আছে, কামড়ের তীব্রতা বাড়ানোর জন্য গড়াগড়ি যাচ্ছে, ব্যাঙের তীব্র কেঁকে চিৎকারে বাতাস ও পরিপাশর্^ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তাতে সাপের গায়ে ভয়েরও সঞ্চার ঘটে। কারণ প্রায়শ ব্যাঙের চিৎকার শুনে মানুষ দৌড়ে আসে ব্যাঙকে বাঁচানোর জন্যে, উল্টা কখনো কখনো সাপই মানুষের হাতে মারা পরে- সে ভয়ে সাপ ব্যাঙকে ধরে একটু ঝোপের দিকে সরে যায়, এখানে সে রকম কোনো ঝোপের আড়াল নেই যে, তাই সাপ কিছুক্ষণ গড়াগড়ি যেয়ে এখন আর নড়ছেনা, কেউ যদি আসেও খোঁজে পেতে পেতে ততক্ষণে ব্যাঙ চুপ হয়ে যাবে। কিন্তু মিথুনের এতক্ষণের উপভোগ্য নজর থেকে সাপ নিজেকে আড়াল করতে যে পারেনি। এতক্ষণে ব্যাঙের তীব্র ক্যাঁককেঁকে চিৎকার আর তীব্র হয়ে উঠছেনা, মনে হচ্ছে ব্যাঙ তার সর্বোচ্চ প্রাণশক্তি দিয়ে তীব্র চিৎকার করার চেষ্টা করতে যেয়ে এখন শুধু কোঁ কোঁ, কোঁকানো শব্দ বেরিয়ে আসছে। মনে হচ্ছে ব্যাঙটা মৃত্যু থেকে বাঁচতে বেদনাবোধক যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে, অনুচ্চস্বরে কাঁদছে। মুহুর্তে মিথুনের চোখে কস্তুরীর মৃত্যুর সময়ের মুখটা ভেসে ওঠে- যেভাবে মিথুনের দিকে মাথাটা কাত করে নিষ্পলক তাকিয়ে অস্ফুট চোখের জল গড়িয়ে পড়ছিল; মিথুনের ভেতরটা একটা প্রচণ্ড শব্দে মোচড় দিয়ে ওঠে; মিথুন প্রবল বেগে চিৎকার করে সাপের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। ভয়ে সাপ পালিয়ে গেলে ব্যাঙটা হাত পা ছড়িয়ে বুকচিতিয়ে পড়ে থাকে। ব্যাঙের ওপর হাটু গেড়ে, উপুড় হয়ে, অস্থির চিত্তে নিষ্পলক চেয়ে থাকে; বুকটা ধুকপুক করছে, হাত পা’য়ে সাড় নেই, আঙুলগুলোর কোনো কোনোটা অণুমাত্র নড়ে, মন্থরগতিতে অবশ হয়ে আসছে শরীর; মিথুন বুঝতে পারে কস্তুরী বাঁচবেনা, ভেতরে একটা জলোচ্ছাস তৈরী হতে থাকে, মিথুন তাঁর কম্পমান দুই হাতের করতলে তুলে ধরে ব্যাঙের অসাড় দেহ, কস্তুরীর দেহ আর অণুমাত্রও নড়েনা, প্রখর বেগে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে জলোচ্ছাসের তোড়, মিথুনের চোখ ফেটে জল আসে। শূন্যে, আকাশের দিকে মুখ উঁচিয়ে প্রবল এক প্রতিঘাতী চিৎকার ছুড়ে-
আ…হ্ ! আল্লা..হ্!
মিথুনের মা তার ছেলের চিৎকার শুনে নিরবে এসে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিল তখনই। ভিতরে কস্তুরীর মৃত্যুশোকের দগদগে ঘা নিয়ে এখনো বেঁচে আছে মা, মিথুন তাঁর লাশবাহী করতল বাড়িয়ে ধরে মা’র দিকে- খিঁচুনি খেয়ে খেয়ে মা’কে ঝাঁকুনি দিয়ে সবেগে উচ্চৈঃস্বরে চেঁচামেচি করে-
মা.., ও.. মা…, মা… গো.., কস্তুরীকে আমি মেরে ফেলেছিগো মা.., কস্তুরীকে আমি মেরে ফেলেছি….!
আহ্… কস্তুরী!
এমন লুটেপড়া কান্নার ঝাকুনিতে খোলে পড়া অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়ে মিথুন মা’র পা’য়ের কাছে লুটাপুটি খায়, মা তাঁর সন্তানকে কুড়িয়ে বুকে লয়, একাকার এক অনাদি রোদনের লহরে পড়ে অতলে ডুবে যায়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.