মাসুদ খানের গুপ্তচর, বলাধ্যক্ষ ও যুদ্ধপরিস্থিতি এবং অন্যান্য

মাসুদ খান | ১২ অক্টোবর ২০১৮ ৭:৪১ অপরাহ্ন


প্রস্থানের আগে

প্রীতি পেলে থেকে যাব আরো কিছুদিন, না পেলে এক মুহূর্ত নয়।

আবার যোগ দেব প্রকৃতির প্রতিটি আয়োজনে–
মেষশাবকের তৃণপ্রাশনের দিনে, জোনাকিদের বিচিত্রানুষ্ঠানে,
বৃষদের বপ্রক্রীড়ায়, সাতভাইচম্পা পাখিদের বেলাশেষের কলহকাণ্ডে,
হরিণ-হরিণীদের বিবাহপ্রস্তাবে,
নবীন পাহাড়ি ঝরনার অভিষেকে, উদ্বোধনে…।

জানি অবহেলা পাব, তবু
কখনো বেহাগ রাগে, কখনো তোটক ছন্দে ঘুরব
রঙচিত্র প্রজাপতিদের পিছু পিছু
বাজি ধরব শিকারসফল উদবেড়ালের অন্তরা থেকে সঞ্চারী অবধি
জলপলায়নরেখা বরাবর।

বহুকাল আগে ভুলে-যাওয়া সহপাঠীদের ঝিলিক-মাখানো
মর্নিং স্কুলের রোদ এসে পড়বে গায়ে
সেই রোদ দিয়ে সেরে নেব শান্ত প্রভাতি গোসল।

প্রীতি পেলে থেকে যাব, না হলে এক মুহূর্ত নয়।

অমৃতের সন্তান

তোমরা কারা? কতদূর থেকে এলে?
মনোহরপুর? মধুপ্রস্থ? লীলাস্থলী? অবাকনগর?
কোন যুগেরই-বা তোমরা?
উপলীয়? তাম্র? প্রত্ন? নাকি নুহের আমল?
যে যেখান থেকে যে-যুগ থেকেই আসো-না-কেন
একই জাহাজের যাত্রী আমরা এ অকূল মহাকাশে।

সহযাত্রী, এবং সমবয়সী।
তোমাদের বয়স প্রায় পনেরোশো কোটি বছর, আমাদেরও তা-ই।
যে-যে কণিকায় গড়া দেহ তোমাদের, আমাদেরও তা-ই–
সব উদ্ভব ওই মহাবিস্ফোরণের ক্ষণে।

অমরতা চাও? চাও অন্তহীন পরমায়ু?
বিলাপ থামাও, শোনো, আমরা যে যখনই আসি
অমরতা নিয়েই আসি হে অমৃতের সন্তান–
অলুক, অব্যয়, অনশ্বর, চির-আয়ুষ্মান।

জরা ব্যাধি মন্বন্তর মহামারী অনাহার অত্যাচার গুম খুন দুর্বিপাক দুর্ঘটনা
কোনো কিছুতেই হবে না কিছুই, ধস নেই, মৃত্যু নেই,
ক্ষয়ে যাওয়া ঝরে যাওয়া নেই
শুধু বয়ে চলা আছে, রূপ থেকে রূপান্তরে,
রূপক থেকে ক্রমশ রূপকথায়…
জলে স্থলে মহাশূন্যে অগ্নিকুণ্ডে…কোত্থাও মরণ নাই তোর কোনোকালে…

সাড়ে চারশো কোটি বছরের পুরনো এক সজল সবুজ
কমলা আকারের মহাকাশযানে চড়ে
শাঁ-শাঁ করে চলেছি সবাই এক অনন্ত সফরে।

অপ্রাকৃত

ছোট্ট একটি ট্রেন– কিশোরী-বয়সী। অসুস্থ, অর্ধবিকল।
পরিত্যক্ত লোকোশেড ছেড়ে
নিশীথে বেরিয়ে পড়ে একা, নিশ্চালক।
সারারাত কোথায়-কোথায় কোন পথে ও বিপথে ঘুরে বেড়ায়…
কিছুটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, গ্রাম-গঞ্জ-শহর পেরিয়ে…

রেললাইন ছেড়ে নেমে যায় মাঠে। চলতে থাকে মাঠের ভেতর
পৌষের শূন্য শীতার্ত মাঠ…
সুখী মানুষেরা ঘুমে। অসুখীরা নির্ঘুম, উনপ্রাকৃতিক–
দীর্ঘনিশ্বাসের আতসবাতাসে একাকার তাদের ঐহিক-পারত্রিক।

ঘুমে-ঢুলুঢুলু স্টেশনের বিধ্বস্ত কোণে
কয়েকজন নির্দন্ত নুলা ভিখারি সোল্লাসে মেতেছে সম্মিলিত স্বমেহনে।
পথ থেকে এক পথকিশোরকে গাড়িতে উঠিয়ে নিচ্ছে দুই সমকামী
সদ্যমৃত শিশুর লাশ তুলে নিয়ে পালাচ্ছে এক শবাহারী।
কাঁপতে কাঁপতে এগুচ্ছে চোখবাঁধা এক হতভাগা,
ক্রমে ক্রসফায়ারের দিকে।
তা দেখতে পিছু নিয়েছে দুই রোঁয়া-ওঠা ঘেয়ো ক্ষুধার্ত কুকুর
আর রাজ-রহমতে সদ্য-ছাড়া-পাওয়া এক মৃত্যুসাজাপ্রাপ্ত খুনি।
বাসায় বাসায় বন্দি, নির্যাতিতা শিশু পরিচারিকাদের স্ফুট-অস্ফুট কান্না…

এসব কোন অ্যাবসার্ড নাটকের নিষ্ঠুর নাট্যায়ন, ঘূর্ণ্যমান নাটমঞ্চে!
শেষ অঙ্ক থেকে পিচকারির বেগে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে সমাপ্তিসংগীত–
পরাজিত মানুষের শোচনা ও খুনির নৈশ নিভৃত অনুশোচনা
এ-দুয়ের মিশ্ররাগে জেগে-ওঠা এক নিষ্করুণ গান।

প্রাকৃত-অপ্রাকৃতের ভেদ ভুলিয়ে-দেওয়া সব দৃশ্যনাট্য
ঠেলে উজিয়ে চলেছে সেই পালিয়ে-বেড়ানো ট্রেনটি।

কেউ কি দেখেছে ট্রেনটিকে?
–কেউ না।
শুধু পরান মল্লিকের চির-রোগা রাতজাগা ছেলেটি বারবার বলে যাচ্ছে–
“গভীর রাতে জানালা খুলে দেখি-কি,
আগাগোড়া ফিনফিনে কুয়াশা-কালারের হিজাবে মোড়া
নুপূর-পরা এক ঘরপালানো গৃহবধূ
ত্রস্তপায়ে হালকা ঝুমঝুম শব্দ তুলে চলে যাচ্ছে দূরে
আরো অধিক কুয়াশার ভেতর।”

কিন্তু কেউ বিশ্বাস করছে না তার কথা।

প্রশান্তি

যখনই বাসায় আসে মায়ের পুরনো সেই প্রেমিক, শিশুটি বোঝে–
এ নিঃসীম নরকসংসারে
ওই স্নিগ্ধ সম্পর্কটুকুই যেন একপশলা মায়াবী শুশ্রূষা,
তার চিরবিষণ্ন মায়ের।
একখণ্ড নিরিবিলি রঙিন সুগন্ধদ্বীপ
মায়ের এ রং-জ্বলা নিষ্করুণ নিজস্ব ভুবনে।

স্রেফ, স্রেফ কিছুটা সময় হাসিখুশি দেখবে মাকে, শিশু তাই দ্রুত গিয়ে
সিডিতে চালিয়ে দেয় সেই গান,
যে-গান গেয়ে ওঠে চিরন্তন প্রেমিক-প্রেমিকা
চাঁদনি রাতে, প্রশান্ত নদীতে, দু-পা মেলে দিয়ে, ছইয়ের ওপরে।

এইসব ছোট-ছোট প্রসন্ন মুহূর্ত, মধুলগ্ন
ধীরে ধীরে গিয়ে গেঁথে যায় এক বিষণ্নবিপুল মহাকালে।
সার্থক হয় মায়ের প্রণয়, মর্মী সন্তানের সহযোগ পেলে।

ফল

সরু সরু লোহার জালিকা–
তাকেই অবলম্বন ক’রে
লতিয়ে উঠেছে কিছু আঙুরলতিকা,
বহু ব্র্যাকেটের ঘেরাটোপ-ঘেরা হর-লবে-ভরা সরল অঙ্কের মতো,
জটিল আকারে।

বিচিত্র গণিতচিহ্ন আর বন্ধনীর ভিড়ে হঠাৎ-হঠাৎ দৃষ্টিশান্তিরূপে
দেখা-দেওয়া দ্বিতীয় বন্ধনীদের মতো গজিয়েছে কিছু লতাতন্তু,
চাষি যাকে আঁকশি বলে ডাকে।
সেইসব আঁকশি বাড়িয়ে দিয়ে লতারা আকাশ থেকে পেড়ে আনে
আলোহাওয়া বৃষ্টিজল, রূপ রূপক ও অনুপ্রাস।

জানি না কোথায় থাকে গাছের হৃৎ-পাম্প,
ভূ-মাতার দেহ থেকে স্তন্যরস শুষে নিয়ে যা পাঠিয়ে দেয়
ঊর্ধ্বমুখী, পরাক্রান্ত মাধ্যাকর্ষ-স্রোতের উজানে,
ঠিক-ঠিক পাতায় পল্লবে!

গাছ তার কোন স্নায়ুকেন্দ্র থেকে পাঠায় সংকেত, সেই কোমল স্পন্দন
বীজে যার সূত্রপাত, ফল-এ যার আপাত সমাপ্তি,
যা শেকড় থেকে পাতা অব্দি হয় অবিরাম সম্প্রচার
ধীরে ধীরে লতা বেয়ে ক্রমে লৌহজালিকায়।

সেসব সংকেতই নাকি রূপান্তরে হয়েছে আঙুর–
ফল তাই থোকা-থোকা, ফল তাই সুরসম্মোহিত,
স্পন্দমান, রসাত্মক, রসিক, বর্তুল।

আর সঙ্গগুণে দিনে দিনে লোহারাও হয়ে ওঠে
আঙুরের মতো সুরেলা, সরস।

গুপ্তচর, বলাধ্যক্ষ ও যুদ্ধপরিস্থিতি

সৈনিকেরা সার ধরে ক্রল করে এগুতে থাকে আর চালায় বন্দুক।
গুলি ছোটে ভবিষ্যৎ বরাবর আর ব্যাক-ফায়ারে
প্রতিবারই ফোঁস করে বেরিয়ে আসে এক-হলকা আগুন।

হলকারা ছোটে অতীতের দিকে, অতিদূর আর নিকট-অতীত…
বন্দুকচিদের মধ্যে কারো-কারো বেশ লম্বা চুলদাড়ি।
একটু একটু করে আগুন ধরে নিকট অতীতে,
বেসামাল বাঁকা চুলদাড়িতে তাদের।

গুপ্তচর ব্যস্ত থাকে চুলদাড়ি-পোড়া গন্ধবিচারে।

আচমকা বৃষ্টি নামে মুষলধারায়, প্রতিপক্ষদের পরগনায়।
ভিজে যায় বারুদ তাদের, স্যাঁতসেঁতে বারুদখানায়।

সেই ফাঁকে ধূর্ত ও বিলাসী বলাধ্যক্ষ
বলচর্চা বাদ দিয়ে যথারীতি মন দেয় ব্যসন ও বালাচর্চায়।

বোমা একটাই
রিমোট দুইটি, দুই বিরুদ্ধপক্ষের হাতে, মুখোমুখি।

মামুলি কবিতা

প্রমত্ত ঝড়ের আগে-আগে-ছোটা
ঈগল-আরোহী তরুণেরা আজ কেমন নির্জীব, ন্যুব্জ!

আবার সজীব হয়ে উঠুক তো তারা,
পাকড়ে ফেলুক ফের সে-দুরন্ত ঈগলের ডানা।

ক্লিষ্ট যুবকের দূর হোক ক্লেশ
অনাথ অনন্যগতি তরুণীর হোক ইষ্টগতি
অস্থির শিশুর মুখে ঢুকে যাক মায়ের ব্যাকুল স্তন
মধুর স্তননে আমোদিত হোক আশপাশ
রশ্মিরোষে দগ্ধ হোক বলদাম্ভিকের দম্ভ
রেলভ্রষ্ট ট্রেন উঠে আসুক সঠিক রেলরেখায়…

জীবের জীবন

নাভিমূল থেকে সাইফন করে তুলে-আনা প্রলম্ব আওয়াজ
ধারালো জিকিরধ্বনি, কুফরি কালাম, আরতিকৃত্যের বুলিয়ান বীজগণিত…
তারপর পাশুপত দৃষ্টিক্ষেপ, পূর্বরাগ, রমন্যাস…
অতঃপর জীবনের প্রথম রমণ–
গুজব ও বক্র ব্যাসকূটে-ভরা রোলার কোস্টারে
প্রথম আরোহণের রোমহর্ষ অভিজ্ঞতা, দুকূল-ছাপানো
শিহর-জাগানো লাল-লঙ্কা বিনোদন।

তরল মানবফল, ভেতরে তরল বীজ।
মাত্র দুয়েকটি ছাড়া সব বীজ চিটা ও নিষ্ফলা।
সেই একটি বা দুটি সুপুষ্ট সফল বীজই অঙ্কুরিত একদিন।

প্রথমেই চারাগাছ, দিনে দিনে সবল সুঠাম মহিরুহ,
প্রগাঢ় তরল তার পুষ্প, অধিক তরল তার পরাগায়ন
কালক্রমে ফের সেই মধুফল, ফল গলতে গলতে ফের নিখাদ তরল…

পূর্বমানবের পরমায়ু শুষে নিয়ে
আয়ু পায় উত্তরমানব।
এভাবেই কিছু শুভাশুভচক্রে কেটে যায় বদ্ধ সব জীবের জীবন।

আগুন

জ্বলিনী, জ্বালিনী– দুই রূপ আগুনের।

তা দেখতে ফিরে ফিরে আসে যত চোরাই মোমবাতি
কী-এক নিষিদ্ধ আবগারি উন্মাদনা নিয়ে
মন-নাজুক-করা বাউরি বাতাসের দিনে
অসংখ্য উড়ন্ত চোরপতঙ্গের ভিড় ঠেলে ঠেলে।

বিপদসংকেত

মাথা-ছেঁটে-ফেলা আর্ত আহত ঘাসেরা
ত্বরিত ছড়িয়ে দেয় বিপদবিষণ্ন এক তৃণগন্ধ।
সে-গন্ধ তো আর কিছু নয়, ঘাসেদের মরণচিৎকার
পুরো তৃণসমাজের উদ্দেশে বিপন্ন ঘাসেদের প্রচারিত প্যানিক অ্যালার্ম–
যে যেভাবে পারো দ্রুত পালাও, লুকিয়ে পড়ো, ধেয়ে আসছে মানুষ
আসছে শিরশ্ছেদযন্ত্র।
কিন্তু হায় কিছুতেই পালাতে পারে না তারা,
ঘাসেরা, তাদের সহজাতকেরা।

সিংহাসন ও শীতবস্ত্র

যেসব জীবের অভ্যন্তরে তুমুল উত্তাপ
শীতল তাদের ত্বক, ঠান্ডা রোমরাজি।

আর
ভেতরটা যাদের শীতল,
বাহিরটা তাদের উষ্ণ যথারীতি।

বারুদগর্ভ সিংহের হুঙ্কার
আর সেই হুঙ্কারের ওপর বিছিয়ে দিয়ে কেশরশোভিত টানটান সিংহচর্ম,
সুসজ্জিত করা যায় বটে সিংহাসন, কিন্তু
সেসবে হয় না কোনো শীতের বসন।

ভেতর ও বাইরের এ এমন এক কারসাজি
শীতবস্ত্রে লাগে নম্র নিরীহ মেষের রোমরাজি।

বাস্তবতা

ছেলেটি আহার করে, মুগ্ধ হয়ে তা-ই দ্যাখে তার অভুক্ত মা,
নির্নিমেষ, কুপির আলোয়
এবং তাতেই হয়ে যায় তার রাতের আহার।

কেউ বলে নিরুদ্দেশ, কেউ বলে গুমখুন। বহুকাল পরে
যেদিন ভিড়ের মধ্যে ছেলেটিকে, হুড-তোলা হালকা জ্যাকেটে,
বিজলিচমকের মতো একঝলক দেখতে পেল তার মা,
দিনে-দিনে একদম ভেঙে-পড়া উদ্ভ্রান্ত জননী,
সেইদিন থেকে শেষ সদবাস্তবতার কাল,
শুরু হলো সে-এক ফণীতে-মণিভ্রম
গরলে-মধুকভ্রম আলেয়াবাস্তবতার পর্ব।

পরিণতি

পূর্ব বেঁকে যেতে যেতে একসময় পশ্চিমে গিয়ে মেশে
চরম শত্রুও এক কালে হয়ে ওঠে মিত্র, সুহৃদ পরম।
প্রখর রোদ্দুরও বদলে যায় মৃদু মসৃণ জ্যোৎস্নায়।

রাতদিন বলকাতে-থাকা, আগুন-উগরানো
পাহাড়ও ঘুমিয়ে যায় চুপচাপ একদিন।
গনগনে লাভা ক্রমে হয়ে আসে সুস্থির শীতল
এবং হঠাৎ-ফ্রিজ-হয়ে-যাওয়া, ঠাণ্ডা সেই লাভাপ্রবাহের গায়ে
একদা গজিয়ে ওঠে তৃণগুল্ম, ফোটে ফুল, টকটকে অঙ্গারবরণ।

মেঘরোদ্দুরে, ফলিত পুলকে…

আজকে না হয় কোনোমতে কেটে গেল দিন। কিন্তু
কী খাবে আগামী দিনে-সেই ভাবনায় ব্যস্ত ও ব্যাকুল দিনমণি
প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই পনেরো কোটি কিলোমিটার
দূর থেকে পাঠাতেই থাকে তার কিরণবাহিনী।

পড়িমরি ছুটে আসে তারা।
সাগরের থেকে শুষে তুলে আনে জল বাষ্পমসলিনের বেশে
হাওয়া বয় উত্তেজনাবশে, মেঘ জমে সম্মোহনে
মেঘ তো গগনশোভা, ঘোর হয়ে আসে ক্রমে…।
শস্যখেত বাগান বনস্থলীতে ঝেঁপে নেমে এসে
ঝিলমিল করে বয়ে যায় মগ্ন মেঘমসলিন।

অন্যদিকে, হাসিখুশি কিরণেরা এসেই তাদের চনমনে গুণাগুণসহ
প্রভূত ঝিলিক তুলে ছলকে চলে হুলুস্থুল পাতায় পল্লবে…
উন্মাতাল সোহাগে ও শিহরনে, পুলকিত আলো-সংশ্লেষণে।

রৌদ্রযতি আর বায়ু-বিরামের মধ্যকার টানাপড়েন ও স্নিগ্ধ বৃষ্টিবিবৃতির
ত্রিভুজ তৎপরতায় সৃজনচঞ্চল হয়ে ওঠে ঋতু
ফলিত পুলকে ক্রমরোমাঞ্চিত হতে থাকে বসুমতী।

Flag Counter

জুননু রাইনের কবিতা: এয়া সিরিজ

জুননু রাইন | ৯ অক্টোবর ২০১৮ ১০:০২ অপরাহ্ন


এয়া-ক

আমিও বলে দিতে পারি চোখ কচলানো সকালকে
আমিও জানি অভিমানের নিজের কিছু নেই
একটি তেরসা মনবেদনা ছাড়া

প্রতিদিনই আমাদের উঠোন পার হয়ে
এই সকালটা যায় দুপুরের দিকে
বিকেলের দিকে
সন্ধার দিকে

সকাল বিকেল সন্ধেকে আমি চিনি;
এই সবুজ-
তোমার অবুঝ, তোমার চোখের শিশু…

দেখ, আমি তাকে কখনো মারি নি। (সম্পূর্ণ…)

বিশুদ্ধ সদগুনের কথোপকথন

ফারজানা নাজ শম্পা | ৯ অক্টোবর ২০১৮ ৯:৪৫ পূর্বাহ্ন

মূল: কবি জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক

(কানাডার প্রাক্তন পোয়েট লরিয়েট )

অনুবাদ: ফারজানা নাজ শম্পা

একজন গীতা

বাদামিকন্যা, সোনালী, লোমশ অক্ষি,
পরিস্ফূটন ঘটায় হলুদ হিবিস্কাস পুষ্পরাশি,
যার উচ্ছল পদচারনায়,
অগাস্ট তার ঘরে পূর্ণরূপে প্রবেশ করে –
কন্যার উদ্দাম বিলাসী জরিদার সোনারং রেশম শাড়ী
তার পিঙ্গল বর্ণের পদযুগলে মধুবর্ণি আলোকস্রোতের বহমান প্রাচুর্য,
চন্দনশোভিত, সিডারকাঠের ন্যায়,
সে জড়ানো ছিলো এক সুরভিত চন্দনের সৌরভদীপ্তি বলয়ের মহিমার আবেশ
তার স্বতন্ত্র উষ্ণ ঘনবর্ণের দেহ,
তার প্রতিটি দৃষ্টিপলক বাতাস প্রবাহের গতি নির্ধারিত করে
তার চাপল্য আর দুষ্টিমিভরা দৃষ্টির অম্ল-মধুর…আহবান
ওহ সেকি তবে এসেছিলো ..? (সম্পূর্ণ…)

আমরা ফিরে যাব বারবার তার শিল্প ও সাহসের কাছে

দিল মনোয়ারা মনু | ৭ অক্টোবর ২০১৮ ৫:৫৩ অপরাহ্ন


মুক্তিযোদ্ধা প্রিয়ভাষিণীকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য দীর্ঘ লড়াই করতে হয়েছে। লড়াই করতে হয়েছে হানাদারদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে, যুদ্ধ শেষে লড়াই করতে হয়েছে হানাদারদের এ দেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে সামাজিক মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করতে, লড়তে হয়েছে প্রবল সামাজিক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে। কিন্তু এ দেশের মানুষ তাকে মনে রেখেছে এজন সফল যোদ্ধা হিসেবে।
প্রিয়ভাষিণী ছিল শিল্পী। খুব কাছ থেকে অবাক বিস্ময়ে দেখেছি কুড়িয়ে আনা খর, পাতা, বাঁশের, গাছের ছাল,বাকল, ডাল ও গুড়ি দিয়ে কি নিপুণভাবে তিনি একে একে অসাধারণ সব শিল্প তৈরী করতেন। সেই শিল্প যে কত আধুনিক, কত জীবন-ঘনিষ্ঠ এবং যুগোপযোগী যা শিল্পপ্রেমিক মানুষ মাত্র অনুধাবন করতে পারেন। সাধারণ মানুষের জীবনের রূপকার এই নান্দনিক মানুষটির অনবদ্য শিল্পকর্মই শুধু নয়, ব্যক্তি মানুষটি তাদের কাছে শ্রদ্ধা ভালবাসায় অনন্য হয়ে ওঠেন। প্রকৃতির সহজ সরল রূপের মধ্যে তিনি দেখেছিলেন শিল্পের অমিত সম্ভাবনা তাই দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা এই নারী বলতেন, আমি কোন বড় প্রতিষ্ঠান থেকে হাতে কলমে শিক্ষা নেইনি, আমি পরম আগ্রহে ভালবাসার সাথে শিক্ষা নিয়েছি প্রকৃতির পাঠশালা থেকে। আর এর মধ্য দিয়েই চিন্তা চেতনায় আধুনিক প্রগতির পথে হাটা এই মানুষটি শিল্পের ক্ষেত্রে নিজেকে অনিবার্য করে তুলেছেন। পেয়েছেন সকল শ্রেণীর শিল্পসচেতন মানুষের অকৃত্রিম ভালবাসা। এখানেই তিনি ব্যতিক্রম। তাকে বলা যায় শিল্পের এক মানবিক কারিগর। তিনি শিক্ষা গুরু হিসেবে, অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে যার কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ, তিনি হচ্ছেন আর এক মহান শিল্পী নড়াইলের এস এম সুলতান। (সম্পূর্ণ…)

ভ্রমণে, অন্য ভুবনে

দেবাশিস চক্রবর্তী | ৫ অক্টোবর ২০১৮ ৭:৪৮ অপরাহ্ন


ভ্রমণ মানব চৈতন্যের এক পরিবর্তিত অবস্থা। তা কিসের সাপেক্ষে এই পরিবর্তন? প্রতিদিন স্বাভাবিক ভেবে আমি যেই বাস্তবতায় বসবাস করি, যে রূপে বাস্তবতা আমার মানসে ধরা দেয় তা থেকে ঘটে এই পরিবর্তন। প্রতিদিনকার এই স্বাভাবিক জীবনের ধরা-বাঁধা-নিয়মিত যে কাঠামোটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে তারই ধস নামে ভ্রমণের সময়। সারা পৃথিবী জুড়েই মানুষ কম-বেশি এক ধাঁচেই তার নিজের জীবনকে আবদ্ধ করে ফেলেছে। তা সে নিজের ইচ্ছা বা অনিচ্ছাতেই করুক বা বেঁচে থাকার তাগিদেই করে থাকুক না কেন পুনরাবৃত্তির এক ভীষণ আবর্তে আজ ঘূর্ণায়মান বেশিরভাগ মানুষের জীবন। ছুটে চলাই হল এখন জীবনের মূল মন্ত্র। থামলে কিন্তু চলবে না। আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নিষেধ আছে। এর নিজের কোন সীমানা নেই। অসীমের দিকে তার চোখ। সসীম এক গ্রহে অসীম মুনাফার দিকে রক্ত চক্ষু করে তাকিয়ে আছে মানুষ এই মহাব্যবস্থাটির প্ররোচনায়। মানুষ তার চারপাশ ছারখার করে ছাড়ছে। কিন্তু সে নিজেকে কি বাদ দিয়েছে? মানুষ নিজের অজান্তেই চোরাবালির অতল গহ্বরের তলিয়ে যে যাচ্ছে না তার হিসেব কজনের কাছেই বা আছে। এই উপলব্ধিতে পৌঁছাবার সুযোগই বা কজন পায়। মুনাফার ঘোরে আক্রান্ত মানুষ পৌঁছুতে চায় উন্নতির চরম শিখরে। মানুষের প্রবৃত্তির অন্ধকার যেসব দিক, তার যে অসীম চাহিদা এই সবের দারুণ সদ্ব্যবহার করে চলেছে ব্যবস্থাটি। মানুষ হয়েছে কর্মতৎপর। শুধু তাই হলে কি চলে? ব্যতিব্যস্ত থাকা চাই। এটা চাই সেটা চাই। চোখের সামনে রংবেরঙের ঝালর ঝুলিয়ে কানে কানে কুমধুর মন্ত্রণা দিয়ে মানুষকে ছুটিয়ে বেড়ানো হচ্ছে। সাফল্যের এমন কিছু মাপকাঠি চালু করে রাখা হয়েছে যে সেসব পূরণ করতে করতেই মানুষের মধ্যকার সবটুকু প্রাণশক্তির কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না। এতে আখেরে কার লাভ হচ্ছে সেটা চিন্তা করবার প্রশ্নই উঠছে না। ভাবার অবসরটা কোথায়? জন্মের পর থেকেই মানবশিশুকে ক্রমে ক্রমে প্রস্তুত করা হয়েছে। তার মনের আবহাওয়াটাও তৈরি করা। এর থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ কাজ নয়। কারণ পরাধীনতার উপলব্ধি হলেই না মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রশ্নটি আসছে। তার আগে নয় নিশ্চয়ই। পরম প্রতাপশালী অর্থনৈতিক ব্যাবস্থাটি আজ এই গ্রহে তার রাজত্ব কায়েম করেছে এবং তাকে নিছক এক ব্যাবস্থা মাত্র ভাবার কোন কারণ কি আর অবশিষ্ট আছে? এর অস্থিরতা, প্রবল স্রোত ছড়িয়ে গেছে আমাদের মস্তিষ্কে-রক্তের কণায় কণায়। এর প্রভাব গিয়ে পড়ছে মানুষে-মানুষে সম্পর্কে। তার সকল নির্মান, শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞানে। তারপরও এই মহাব্যাবস্থা হয়তো কিছুটা করুনাবশতই কালেভদ্রে-বছরান্তে খানিক সময়ের জন্য আমাদের মুক্তি দেয়। তার লাগাম কয়েকদিনের জন্য হলেও খুলে যায়। ভ্রমণের মত “বিলাসিতা”র সুযোগ হয় তখন। (সম্পূর্ণ…)

দীপেন ভট্টাচার্য: তারা বিশ্বাস করতে পারছেন না প্রকৃতি তাদের সঙ্গে এভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করবে

রাজু আলাউদ্দিন | ৩ অক্টোবর ২০১৮ ১১:১১ অপরাহ্ন


দীপেন ভট্টাচার্য আমাদের অগ্রগন্য বিজ্ঞানকল্পকাহিনীকার। সাহিত্যের এই শাখায় আমাদের মৌলিক লেখকের সংখ্যা একেবারেই হাতেগোণা, দীপেন ভট্টাচার্য এই হাতেগোণাদের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ে আছেন তার মৌলিকতার গুণে আর অসামান্য বুননকৌশলের কারণে। তার পেশা তাকে নিশ্চয়ই বিষয়ের দখলদারিত্বে নিশ্চয়তা এনে দিয়েছে, যেহেতু তিনি পেশায় জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী, অধ্যাপক; কিন্তু বুননকৌশলের চমৎকারিত্ব তিনি পেয়েছেন বিশ্বসাহিত্যের পাঠ ও নান্দনিক রসজ্ঞ মনের পরিগ্রহণের সূত্রে। অধ্যাপনা করছেন রিভারসাইড কমিউনিটি কলেজ, ক্যালিফোর্নিয়ায়। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড-এ জ্যোতির্বিদ্যায় গবেষণা করেছেন। প্রাক্তন গবেষক, নাসা গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টার, ম্যারিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র। ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে তার অভিজিৎ নক্ষত্রের আলো, দিতার ঘড়ি, বার্ট কোমেনের ডান হাত, নক্ষত্রের ঝড় এবং নিওলিথ স্বপ্ল। সংখ্যায় অল্প হলেও প্রতিটি গ্রন্থেই তিনি কল্পনাশক্তির মৌলিকতা নিয়ে হাজির হয়েছেন।

দীপেন ভট্টাচার্যের সাথে গত জুলাই মাসের শেষ দিন কবি ও অধ্যাপক তাপস গায়েন, অনুবাদক আনিসুজ্জামান ও আমার সাথে সান দিয়েগোতে একদিনের জন্য দেখা হলে সেখানকার করোনাদো ফেরিঘাটের কাছে বিকেলের উজ্জ্বল আলোয় ঘেরা একটি রেস্তোরাঁয় আড্ডা দিতে দিতে আলাপ হচ্ছিল পদার্থবিজ্ঞানের একেবারে তাত্ত্বিক বিষয়গুলো নিয়ে। পরে সেই আলাপ ক্রমশ বাঁক নেয় সাহিত্যের দিকে। কিন্তু আড্ডার স্বভাবসুলভ চরিত্র অনুযায়ী আকস্মিকভাবেই অসমাপ্ত থেকে যায় এর বিস্তার। এই সাক্ষাৎকারটি সেই আড্ডারই লিখিত রূপ।রাজু আলাউদ্দিন।

রাজু আলাউদ্দিন: আমি তো বিজ্ঞান-ওরিয়েন্টেড লোক না, কিন্তু আমি বিজ্ঞান ভালোবাসি। আমি একটা জিনিস লক্ষ করেছি, লেখালেখির সূত্রে, যে-কোনো বিজ্ঞানী বা বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার যারা শীর্ষ ব্যক্তিত্ব তাদের ধারণার মধ্যে এক ধরনের ইস্থেটিক বিউটি থাকে, যেটা আমরা লেখকশিল্পীদের মধ্যেও দেখতে পাই। এ্টা কিন্তু উভয়ের মধ্যে সমান্তরাল। এটা কেন ঘটে বলে মনে হয় আপনার?
দীপেন ভট্টাচার্য়: পদার্থবিদ্যার মূল সমীকরণ যেগুলো আছে সেগুলো সিমেট্রিক্যাল। বাংলায় এটাকে প্রতিসাম্য বলা যেতে পারে। সিমেট্রির সাথে বিউটির সম্পর্ক আছে আমরা তো সেটা জানি। যেকোনা সিমেট্রির সাথে থিমেটিক্যাল একটা জিনিসকে আমরা পছন্দ করি। সমীকরণের মধ্যে এক ধরনের সৌন্দর্য আছে, সেটা বিজ্ঞানীদের ধারণা। সমস্ত পদার্থবিদই, তারা শেষাবধি যে-জিনিসটা চায় তা হল সুন্দর কিছু তৈরি করতে। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের যে সমীকরণ তার মধ্যেও একটা সুন্দর প্রতিসাম্য আছে। চন্দ্রশেখরের একটা বই আছে, চন্দ্রশেখর সুব্রামনিয়মের, নাম হল Truth and Beauty: Aesthetics and Motivations in Science। (সম্পূর্ণ…)

কামরুল হাসান: জীবনের মিছিলে মৃত্যুর কারাভান ও অন্যান্য

কামরুল হাসান | ২ অক্টোবর ২০১৮ ৫:৪৯ অপরাহ্ন


দৈত্যের ঘরবাড়ি

দৈত্য তোমার ঘরবাড়ি দেখে বুঝি
মাঠের সিথানে অতবড় কার মুখ,
হা করে আছো সবকিছু গিলে খাবে
পেছনে যমের ছায়া কি দেখেছ, নড়ে?

ঘরবাড়ি সব মাটির উপরে খাঁড়া
দৈত্য শুয়েছে অতল মাটির খাটে,
প্রতিধ্বনিত হুঙ্কার ফিরে আসে
সরলজনের যম হয়ে ছিলে পাটে।

দৈত্য তোমার আকাশছাপানো ঘর
যমের হাতে নড়ে ওঠে পড়ো পড়ো,
ভয়ের শেষে আরো কত ভয় জাগে
প্রাণান্ত ঐ চোখমুখ কারা আঁকে? (সম্পূর্ণ…)

সিকোরাক্স: আত্মরতির মহা ওঙ্কার

ঝর্না রহমান | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ১২:২২ পূর্বাহ্ন


শঙ্খের মুখে কান পাতলে সাগরের গর্জন শোনা যায়, ঝিনুকের অন্ত্রতলে মুক্তোর ভেতরে লুকোনো থাকে সাগরতলের বালুকণার গল্প। এই তুলনাগুলো মনে পড়বে তখন, যখন আপনার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা রচিত ‘সিকোরাক্স’ নামের একটি ক্ষুদ্রকায় কাব্যপাঠের অভিজ্ঞতা হবে, যে অভিজ্ঞতা আপনার অনুভূতির ঈথারে ক্রমোৎসারিত ঢেউয়ের মতো একটানা ছড়িয়ে পড়তে থাকবে। আর ক্রমশ তা আপনাকে ভূমি থেকে উপকূলে, উপকূল থেকে সাগর তরঙ্গে, তরঙ্গ থেকে অতলান্ত গভীরে, প্রতি বালুকণায়, প্রতি জলকণায়, প্রতি মুক্তোভ্রুণে, প্রতি অভ্রদ্যুতি ও সূর্যের বর্ণালিতে অণু অণু করে ছড়িয়ে দিতে থাকবে।

মুহম্মদ নূরুল হুদা রচিত এ বই আয়তনে যেন ছোট্ট একটি ঝিনুক। তার দুই মলাটের খোলের ভেতর সাজানো দশটি অধ্যায়ের দশটি মুক্তো। এই মুক্তোর ভেতরে ‘সাগরতলের বালুকণা’ নয়, বরং রয়েছে একটি গোটা সমুদ্রের অথবা দশটি মহা সমুদ্রের গল্প। বিন্দুতে সিন্ধু বলে একটি কথা প্রচলিত আছে, কিন্তু ‘সিকোরাক্স’ কাব্যকে এই প্রচল শব্দবন্ধও ধারণ করতে পারবে না। তার জন্য নির্মাণ করতে হবে প্রচলভাঙা নতুন রূপভাষ্য। ‘সিকোরাক্স’ একের ভেতরে বহুমাত্রিক, বহুকৌণিক সৃষ্টিভাবনা। পাশ্চাত্ত্য মিথের সাথে প্রাচ্য পুরাণের বহুমাত্রিকতাকে দৈর্ঘ্যে প্রস্থে রেখে, নববয়ানে এক নবতর অবয়বের উদ্ভাসন। একই সাথে এখানে যেন মহাজাগতিক কেন্দ্র থেকে কোটি রশ্মির বিচ্ছুরণ ঘটে আবার অপরদিকে সৃষ্টি হয় কোটি রশ্মির কেন্দ্রাতিগ গতির এক কৃষ্ণগহ্বর। ‘এক’ এবং ‘বহু’র একাকার হওয়া এক বিস্ময়কর ভাব ও নির্মাণকলার রূপপ্রতিমা ‘সিকোরাক্স’। (সম্পূর্ণ…)

পুরাণে ফসলের আদিম সুঘ্রাণ

শান্তা মারিয়া | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ৮:৩৬ পূর্বাহ্ন


আদিম মানব সমাজ শিকার অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে কৃষিভিত্তিক সমাজে যখন রূপ নিতে থাকে তখন তার মানসলোকেও সৃষ্টি হতে থাকে নানা কাহিনী। বজ্র, বৃষ্টি, বিদ্যুত্ আগুনের মতো নতুন এক শক্তির অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে থাকে আদিম মানবগোষ্ঠি। এই শক্তি ফসলের নবজন্ম। প্রথমে উদ্যান চাষ তারপর বৃহত্তর কৃষিক্ষেত্র। নীরস, নির্জীব মৃত মাটি ফুঁড়ে জন্ম নেওয়া সজীব অংকুর মানুষকে বিস্মিত করে। সবুজ পাতায় কিভাবে জীবনের স্পন্দন ফুটে ওঠে তা দেখে বিস্মিত হয় মানুষ। বীজ থেকে উদ্ভিদের জন্ম মানুসের কল্পনাশক্তিকেও জারিত করে। বজ্র, বৃষ্টি, আগুনের মতো কৃষি বা উদ্ভিদের জন্মকেও মানুষের কাছে বিষ্ময়কর বলেই মনে হযেছে। বজ্র, বৃষ্টির মতো তাই কৃষিকেও দৈবশক্তির প্রকাশ বলে ধরে নিয়ে মানুষ সৃষ্টি করেছে নানা কাহিনী। বজ্রদেব, অগ্নিদেব, পবনদেব, সাগর-মহাসাগরদেবের পাশাপাশি ধরিত্রীদেব বা কৃষিদেবও পূজিত হওয়া শুরু হয়। কৃষির উদ্ভাবন ঘটেছে নারীর হাত ধরে। তাই অধিকাংশ প্রাচীন পুরাণ কাহিনীতে ফসলের দেবশক্তিকে নারীরূপে কল্পনা করা হয়েছে। দিমিতির, সিরিস, আইসিস, ইশতার, ফ্রিয়া, ফ্লোরা এরা সকলেই হয ফসলের নয়তো উর্বরতার দেবী। শরতে ফসল ওঠার পর তাই আদিম সমাজগুলোতে নানা রকম আচার অনুষ্ঠান পালনের রীতি গড়ে ওঠে অথবা দেবীপূজার আয়োজন চলে। কখনও সর্বজনীন পূজা হিসেবে আবার কখনও গোপন কাল্ট হিসেবে ফসলের দৈবশক্তিকে আরাধনা করা হয়। শীতে উদ্ভিদের মৃত্যু আবার বসন্তে বীজ থেকে তার জেগে ওঠা এবং শরতে ফসল ঘরে তোলার মধ্য দিয়ে মানবসমাজ জীবনের বৃত্তকেই যেন আবিষ্কার করেছে। আদিম মাতৃতান্ত্রিক সমাজের অবশেষ হিসেবে তখনও প্রধান দৈবশক্তিকে নারীরূপেই ধরা হতো। মাতৃদেবী, উর্বরতার দেবীরাই কৃষিযুগে কৃষির দেবী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। (সম্পূর্ণ…)

গোলাম কিবরিয়া পিনু’র কবিতা

গোলাম কিবরিয়া পিনু | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ৯:৩০ পূর্বাহ্ন

পেটে ধরে রাখা জন্তু

নদীটার স্বচ্ছজল ও উল্লোল দেখে
আমারও ভালো লেগেছিল!
তার পারে গিয়ে বসলাম–
অন্যান্য দূষিত নদী থেকে
তাকে আলাদা ভাবতে লাগলাম!
যখনই তার জলে নেমে
সাঁতরাতে থাকলাম
তখন কী কাণ্ড!
নদীটার ভাণ্ডভরা জল
এঁদোপুকুরের জল হয়ে গেল
মজাপুকুরের জল হয়ে গেল!
আমি ভাবলাম–
নদীও কি পেটে ধরে রাখে কোনো জন্তু
তার জলহস্তী দূষণ তৈরিতে পটু! (সম্পূর্ণ…)

পুলক হাসান: শিরোনামহীন ও অন্যান্য কবিতাগুচ্ছ

পুলক হাসান | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ৭:২৫ অপরাহ্ন


শিরোনামহীন

সময়ের বরফ যে গলে
সে তোমার উষ্ণতার ফলে
যেন তুমি সুন্দরী এক বালিকা
শূন্য বুকে নামাও স্বস্তির চাকা।
মনে হয় তখন আশাহত অতীত
পেল বুঝি মজবুত এক ভিত
সহসা হচ্ছে না আর নড়বড়ে
হঠাৎ পাওয়া কোনো ঝড়ে!
বিপর্যয় যদিওবা ঢুকে পড়ে
তার নিবিড় বেষ্টন ভেদ করে
বেরুবার পথ আছে খোলা
তুমি সেই নির্ভরতার ডালা।
কিন্তু তারপরও থাকে গুপ্ত ভয়
যখন এসে ভর করে সন্দেহ সংশয়
নিমিষে খান খান তাসের ঘর
চির আপন হয়ে যায় দ্রুতই পর।
এই যে প্রাপ্তির পরও হৃদয় ফাঁকা
সে আদপে সুখের অসুখ
যেন তুমি জীবনমন্ত্র সুবর্ণরেখা
তুমি ছাড়া প্রান্তর বিমুখ
হে আমার অমল ধবল টাকা। (সম্পূর্ণ…)

কখনো নেভে না

মাজহারুল ইসলাম | ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ৬:১৭ অপরাহ্ন

মাছের মুড়োটা কাটতে গিয়ে তর্জনীটা কেটে ফেললেন জাহানারা বেগম। অনেকটা কেটেছে, রক্তারক্তি অবস্থা। মাছের রক্ত আর জাহানারা বেগমের রক্ত মিলেমিশে একাকার। আঙুল যতটা কেটেছে তার চেয়ে বেশি তাঁর চিৎকার চেঁচামেচিতে বাসায় হুলস্থুল পড়ে গেছে। কাজের মেয়ে রহিমা নিজের ওড়না পেঁচিয়ে শক্ত করে ধরে আছে যেন রক্ত পড়া বন্ধ হয়। আকবরের মা এদিক-ওদিক দৌড়াচ্ছে, ডেটল-তুলা কিছুই খুঁজে পাচ্ছে না। বিড়বিড় করে কী যেন বলছে। এদিকে জাহানারা বেগম চিৎকার করছেন, আগে তোর খালুজানকে খবর দে। ফোন কর। হাসপাতালে না গেলে রক্ত বন্ধ হবে না। রহিমা উঠে গিয়ে ফোনের ডায়াল ঘোরাচ্ছে। এপাশে রিং হচ্ছে, কিন্তু কেউ ধরছে না। এরমধ্যে আকবরের মা এসে বলল, খালাম্মা, ডেটল খুঁইজা পাইলাম না। সেভলন পাইছি।
জাহানারা বেগম কপাল কুঁচকে বললেন, জিনিস তো একই। সব মূর্খের দল কোথাকার!
আকবরের মা কাটা আঙুলে সেভলন লাগিয়ে দিল।
জাহানারা খুব অল্পতেই হইচই করে বাড়ি মাথায় তুলে ফেলেন। নাইনটি নাইন জ্বর হলে মাথায় পানি ঢালা, জলপট্টি দেওয়া, বাড়িতে ডাক্তার ডেকে এনে হুলস্থুল কাণ্ড বাধিয়ে ফেলা তার জন্য নতুন কোনো বিষয় না। একবার এক শ’ দুই জ্বর হলো তাঁর। প্যারাসিটামল টেবলেট দুইটা একসঙ্গে খাওয়ানো হলো। রহিমা মাথায় পানি দিচ্ছে। আকবরের মা রশুন দিয়ে সরিষার তেল গরম করে পায়ের তলায় মালিশ করছে। খলিকুজ্জামান খাটের একপাশে চুপচাপ বসে আছেন। আধা ঘণ্টা মাথায় পানি দেওয়ার পর থার্মোমিটার লাগিয়ে দেখা গেল জ্বর কমা তো দূরের কথা বেড়ে এক শ’ তিন হয়ে গেছে। জাহানারার ধারণা তার জ্বর আর কমবে না এবং তিনি মারা যাচ্ছেন। খলিকুজ্জামানের হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আমাকে তুমি মাফ করে দাও। আমি মনে হয় আর বাঁচব না। তুমি মসজিদের ইমাম সাহেবকে ডেকে আনো। আমি তওবা পড়ব। অনেক পাপ করেছি। মৃত্যুর আগে তওবা পড়তে চাই। এরপর বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কান্না শুরু করলেন।
জাহানারা বেগমের কান্না দেখে আকবরের মা ও রহিমাও কান্না শুরু করল। আকবরের মা প্রায় দশ বছর ধরে এ সংসারে আছে। রহিমা সাত বছর। খলিকুজ্জামান পড়ে গেলেন মহা বিপদে। কোনোভাবেই জাহানারাকে বোঝাতে পারছেন না এক শ’ তিন জ্বর এমন কিছু না। ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে। জ্বর কমতে একটু সময় লাগবে। রহিমা কাঁদতে কাঁদতে বলছে, খালুজান, খালাম্মারে হাসপাতালে নিয়া যান। একপর্যায়ে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে হাসপাতালে নিতে হয়েছিল। খলিকুজ্জামানের সঙ্গে রহিমাও গিয়েছিল হাসপাতালে। খলিকুজ্জামান ডাক্তারকে বলেছিলেন, হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করেন। ভীতু মানুষ। বাসায় ম্যানেজ করা কঠিন। ডাক্তার থার্মোমিটার লাগিয়ে দেখেছিলেন জ্বর একশ’তে নেমে এসেছে। সামান্য জ্বরে এত রাতে বাড়ি থেকে ডেকে আনায় ডাক্তার খানিকটা বিরক্ত। তার উপর হাসপাতালে ভর্তি করাতে বলায় ডাক্তার খুব অবাক হয়েছিলেন। বলছিলেন, খলিকুজ্জামান সাহেব, ঘাবড়াবেন না, ভাবিকে বাসায় নিয়ে যান। একশ ডিগ্রি জ্বরে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কিছু নাই। রহিমা এসব দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। খালুজানকে ফোন করতে করতে পুরোনো কথা মনে পড়ছিল তার।
রহিমা বলল, খালুজান তো ফোন ধরতাছে না। মনে হয় কোনো মিটিং ফিটিংয়ে আছে। (সম্পূর্ণ…)

পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com