arts.bdnews24.com

শামসুজ্জামান খান: নিজের দলের কোনো সমালোচনা করব না, অন্যদের করব– তাহলে তো সে পার্সিয়াল হয়ে গেল

রাজু আলাউদ্দিন | ১৯ আগস্ট ২০১৮ ৭:২০ পূর্বাহ্ন


রাজু আলাউদ্দিন: আমি যদ্দুর জানি, লেখালেখির একদম শুরুর দিকে আপনি গল্প এবং কবিতা লিখতেন। এখন আপনি আর গল্প কবিতা লেখেন না। প্রচুর ননফিকশন, অর্থাৎ গবেষণা বা প্রবন্ধ এইগুলোতে আপনি এখন অনেক বেশি লিপ্ত। তো এরপরে আর কখনোই কেন গল্প এবং কবিতা লিখলেন না?
শামসুজ্জামান খান: এটা বলতে গেলে আমাকে শুরু করতে হবে একেবারে প্রাইমারি স্কুল থেকে। আমার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকরা সব্বাই খুবই বিদ্বান তো ছিলেনই, সেই সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বাংলার যিনি শিক্ষক ছিলেন, তিনি জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে খুবই আগ্রহী ছিলেন। তিনি জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়তেন, আমরা বুঝতাম না, তবু তিনি আমাদের সামনে সেসব কবিতা পড়তেন। সাহিত্যের ব্যাপারে আমার আগ্রহটা তখন থেকেই শুরু হয়েছিল। তার চার বা পাঁচ বছর পরে যখন আমি হাইস্কুলে এলাম, আমার বাড়ি হলো বর্তমান মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর থানার চারিগ্রামে। এই গ্রামের স্কুলের নাম হলো এস. এ. খান হাইস্কুল। আমার দাদা-শ্বশুর এই স্কুলটা দিয়েছিলেন। তো সেই স্কুলে আমি ভর্তি হলাম। ভর্তি হওয়ার পর যে শিক্ষকদের পেলাম, তারা সব্বাই ভালো লেখাপড়া জানা মানুষ। প্রধান শিক্ষক ছিলেন ইংরেজির শ্রীযুক্ত বাবু রাজ্যেশ্বর চৌধুরী। অসাধারণ ইংরেজি জানতেন।
রাজু আলাউদ্দিন: তখনকার দিনে বোধহয় সব স্কুল বা কলেজের শিক্ষকরাই একটা স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেন করতেন।
শামসুজ্জামান খান: খুব স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেন করতেন। বাংলার শিক্ষক যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে ফজলুল করিম স্যার ছিলেন, আনোয়ারুল ইসলাম সাহেব ছিলেন, এঁরাও খুব ভালো বাংলার শিক্ষক ছিলেন। এবং আরেকজন শিক্ষক এলেন, তিনি বাংলা ছাড়াও অন্য বিষয় পড়াতেন। তার নাম খলিলুর রহমান। তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। এইটুকু আমরা পরে জানতে পেরেছি। তিনি বামপন্থী চেতনার সাথে আমাদের পরিচিত করেন। তিনি এবং কার স্ত্রী রুকাইয়া সুলতানা; রুকাইয়া সুলতানা পরবর্তীকালে ডক্টর জি. সি. দেবের পালিতা কন্যা হয়েছিলেন। এই দুইজনই আমাদের গ্রামে তখন থাকেন। তারা আমাকে নিয়ে ‘পূর্বাভাস’ নামে একটা পত্রিকা বার করলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা কত সালের ঘটনা বলছেন?
শামসুজ্জামান খান: ১৯৫৩/৫৪ সন। এই সময় পত্রিকা বার করলেন। তো একটা মজার ব্যাপার হলো, আমাদের গ্রামেরই কবি মঈনুদ্দীন সাহেব.. (সম্পূর্ণ…)

প্রেমের জীবনচক্র

সাব্বির জাদিদ | ১৬ আগস্ট ২০১৮ ৯:৪৯ অপরাহ্ন

নয়ন ও লাইজু পর্ব:
সিঁড়ির মুখে দেখা। কলেজের ইউনিফর্ম গায়ে হন্তদন্ত হয়ে নিচে নামছিল মেয়েটা। নয়ন দোকান থেকে ফিরছিল। হাতে লবণের প্যাকেট। গতকাল বাজারে লবণ কিনতে ভুলে গিয়েছিল বাবা। আজ সকালে ছেলেকে লবণ কিনতে দোকানে পাঠিয়েছিলেন মা। কেনার সময় ডেট দেখতে মনে নেই। এখন, প্যাকেটটা উল্টেপাল্টে মেয়াদ শেষের তারিখটা খুঁজছিল সে, বাসায় ঢোকার সময়। হঠাৎই সিঁড়ির সরু রাস্তাটা সুবাসিত হয়ে উঠল। বেলি ফুলের ঘ্রাণ। যেন আস্ত একটা বেলির ঝাড় এই কংক্রিট ঘেরা গলির ভেতর এসে পড়েছে। অবাক নয়ন লবণের প্যাকেট থেকে চোখ তুলল। তখনই চোখাচোখি হলো মেয়েটার। সদ্য প্রসব হওয়া বকনা বাছুরের মতো টানা টানা চোখ। কাজল পরেছে। পানপাতার মতো সামান্য লম্বাটে মুখ। যেমনটা নয়নের পছন্দ। নাকের নিচে বিন্দু বিন্দু ঘাম। যেন ঘাসের ডগায় রুপালি শিশির। কয়েক সেকেন্ডের দেখা। অথচ ওই অল্প সময়ের মধ্যেই নয়নের মনে হলো–যদি ঘামের ফোঁটাগুলো মুছে দেয়া যেত!
বিস্ময়ের ঘোর যেন কাটে না নয়নের। অপ্সরীর মতো এই মেয়েটা কোথা থেকে টুপ করে ঝরে পড়ল তার সামনে! ইউনিফর্ম দেখে বোঝাই যাচ্ছে, সরকারি কলেজে পড়ে। কিন্তু এই বাসায় কবে থেকে? বাসাটা নয়নদের নিজস্ব। নিচতলায় বাবা-মা আর ছোট একটা ভাইকে নিয়ে নয়নরা থাকে। উপরতলা ভাড়া খাটে। গেল মাসে অনেক দিনের পুরনো ভাড়াটিয়া বাসা ছেড়ে চলে গেছে। টাঙ্গাইলের ওইদিকে না কোথায় যেন আঙ্গেল বদলি হয়েছে। শহরের ধারেই নয়নদের এই বাসা। সুযোগ সুবিধা প্রচুর। পুরনোর বিদায়ের সাথে সাথে তাই নতুন ভাড়াটিয়া বাসা বেঁধেছে। একটা মাসও বিশ্রামের সুযোগ পায়নি ব্যস্ত বাসাটা। বেলি ফুলের সেন্ট মাখা এই মেয়ে তাহলে নতুন ভাড়াটিয়ার কন্যা। নয়নের বুকের ভেতর টুপটুপ করে উত্তেজনার বৃষ্টি পড়তে লাগল। সেই সকালে, খালি পেটে, লবণের প্যাকেট হাতে প্রর্থনায় মগ্ন হলো নয়ন–আল্লাহ, কখনোই যেন নতুন আঙ্কেলের বদলির আদেশ না আসে। তার রিটায়ার্ড, মৃত্যু, দাফন-কাফন এমনকি হাশর-নাশরও যেন এই শহরেই হয়। (সম্পূর্ণ…)

মুহম্মদ নূরুল হুদা: আয় বাঙালি ঘরে আয়

মুহম্মদ নূরুল হুদা | ১৫ আগস্ট ২০১৮ ১২:৪১ অপরাহ্ন


পিতা, তোমার চিরজন্ম হলে
পাখপাখালি কথা বলে
পাল তুলে সব নৌকা চলে
ঘাতক পালায় সদলবলে

বুকে যখন লাগলো গুলি
গুলি হলো অমর তুলি
রক্ততুলির রক্তে দেখা
জন্মপঞ্জি রক্তে লেখা

সেই থেকেই অনাদিকাল
সেই থেকেই অরাত্রিকাল
বাংলাজোড়া বসন্তকাল
ফুলফসলের শুভ্রসকাল

বদর বদর হাঁকছে মাঝি
হাসছে তারার আতশবাজি
জয়-বাংলার তুমিই পাল
নাওবাংলার তুমিই হাল (সম্পূর্ণ…)

অমর দেয়ালের ছবিগুলো

ঝর্না রহমান | ১৫ আগস্ট ২০১৮ ১০:৫৮ পূর্বাহ্ন


তুমি যেদিন রমনার রেসকোর্স ময়দানে দীর্ঘবাহু,
আকাশপটে তর্জনীতে সিরাতাম মুস্তাকীম এঁকে বলেছিলে,

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’
সেদিন সূর্যের প্রতিটি রৌদ্ররশ্মি থেকে তাক করা হয়েছিল ক্যামেরা
তোমার ছবি মুদ্রিত হয়েছিল সাড়ে সাত কোটি জনতার চোখে।
তুমি যেদিন ইবলিশের বন্দিশালায় তোমার জন্য খুঁড়ে রাখা
কবর-বিবর টপকে ফিরে এলে আপন ভূমিতে,
পরম শ্রদ্ধায় মাথা নোয়ালে তোমার নাড়ী-পোঁতা মাটিতে,
জলোচ্ছ্বাস উঠলো দুই চোখের দরিয়ায়, আয়ু দিয়ে বরণ করে নিলে
তিরিশ লক্ষ শহীদের রক্তে ভেজা পবিত্র প্রাণময়ী মাটি–
সেদিন এদেশের প্রতিটি ধূলিকণায় তোমার ছবি আঁকা হয়েছিল,
ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের প্রতিটি ঘরে টাঙানো হয়েছিল তোমার অশ্রুবিলাপি ছবি। (সম্পূর্ণ…)

ভূমেন্দ্র গুহ: পশ্চিমবঙ্গ বলে একটা দেশ যার কোনো পিতা নেই, মাতা নেই, চরিত্র নেই, কিচ্ছু নেই

রাজু আলাউদ্দিন | ১০ আগস্ট ২০১৮ ৫:৫৯ অপরাহ্ন


২০১৫ সালের ৪ এপ্রিল একেবারে অপরিকল্পিতভাবেই দেখা হয়েছিল কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক ভূমেন্দ্র গুহর সাথে কোলকাতায় তার নিজস্ব বাসভবনে। অসামান্য এই ব্যক্তিত্বের সাথে দেখা করার সুযোগটা করে দিয়েছিল আমার বন্ধু কবি রাহুল পুরকায়স্থ। বিকেলের দিকে রাহুলের সাথে কফি হাউজে দেখা করার কথা। লক্ষ্য ওখানে বসে আড্ডা দেয়া কিংবা রাহুলের হাত ধরে কোলকাতার অলিগলি ঘুরে দেখা। কফি হাউজে পৌঁছাতেই রাহুল বললো, ভূমেনদার সাথে তোমার কখনো আলাপ হয়েছে, পরিচয় আছে তার সাথে? আমি বললাম, এই মশহুর মানুষটির খ্যাতির সুবাস পাচ্ছি অনেক বছর থেকেই, কিন্তু কোনদিন দেখা সাক্ষাৎ হয়নি। দেখা হয়নি কখনো? না। তাহলে চলো ভূমেনদার সাথে তোমার দেখা করিয়ে দেই। সে কি? এখনই? হ্যাঁ, অসুবিধা আছে কোনো? না না, অসুবিধা নেই। আমিতো ভাবতেই পারছি না কিংবদন্তীতুল্য এই মানুষটির সাথে এত সহজেই দেখা করা সম্ভব। রাহুল আমার বিস্ময়সূচক সম্মতি পেয়েই বলে উঠলো, চলো তাহলে। কিন্তু তাকে আগে জানাবে না যে আমরা আসছি? রাহুল প্রায় তোয়াক্কাহীন ভঙ্গিতে বললো, বলতে হবে না, চল। তক্ষুণি একটা ট্যাক্সি ধরে আমরা রওয়ানা হয়ে গেলাম করুণময়ী সল্ট লেকের দিকে। তখন বোধহয় কোন এক ছুটির দিন ছিল সেটা। রাস্তাঘাট বেশ ফাঁকা। রাহুল মাঝেমধ্যেই কথার ফাঁকে ফাঁকে আশেপাশে কী যেন খুঁজছিল। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম বোধহয় ভূমেনদার বাড়ি খুঁজছে। কী খুঁজছ জিজ্ঞেস করে তখন কোনো সদুত্তর পাইনি। এর উত্তর পাওয়া গেল পরে, ভূমেনদা আর রাহুলের আলাপচারিতার ভেতরে। সম্ভবত ২০/২৫ মিনিট লেগেছিল তার বাসায় পৌঁছুতে। সুউচ্চ এক ফ্ল্যাট বাড়ির তৃতীয় তলায় গিয়ে রাহুল কলিং বেল-এ টিপ দিতেই এক যুবতী নারী দরজা খুলে দিলেন। সম্ভবত ভূমেনদার মেয়ে হবেন। ভূমেনদা আছেন না?–এটা প্রশ্ন হলেও রাহুল এমনভাবে বললো যেন ভূমেনদা আছেন, রাহুলের এতে কোনো সন্দেহ নেই। স্রেফ সৌজন্যের খাতিরে জিজ্ঞেস করে প্রবেশ করতে হয়, তাই এই প্রশ্ন। সেই নারী আমাদেরকে অতিথি কক্ষে বসিয়ে ভূমেনদাকে ডাকতে গেলেন। অতিথি কক্ষের দক্ষিণদিকে একটা দরজা যেটা যুক্ত হয়েছে এই বাসার একদিলের বারান্দার সাথে। ওখানে একটা
জলচৌকিতে বসে উবু হয়ে বসে আছেন তিনি, চারিদিকে শিশুর খেলনার মতো পাণ্ডুলিপি অার বইপত্র ছড়ানো ছিটানো। পরনে একটা চেক লুঙ্গি, গায়ে হাতাকাটা গেঞ্চি। রাহুলের আওয়াজ পেয়েই তিনি কাত হয়ে রাহুলকে দেখতে পেয়ে উঠে এলেন অতিথি কক্ষে। গায়ের রং ফর্সা। তিনি প্রবেশ করতেই রাহুল তার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমি উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম। আমার সম্পর্কে রাহুল এটা সেটা বললো, প্রথম পরিচয় করিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে আমরা যেমনটা করি থাকি। রাহুলের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, সাহেবকে নিয়ে এলেন, কিন্তু ‘জিনিস’ নিয়ে এলেন না যে। আমি সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে ফেললাম এই ‘জিনিস’-এর মানে। রাহুল জবাবদিহির ভঙ্গিতে জানালো, খুঁজেছি, পেলাম না। সবগুলোই বন্ধ পেলাম। ভূমেনদা রাহুলের উত্তরে নির্বাপিত না হয়ে অন্য একটা ঠিকানা দিলেন। রাহুল সেখানে যেতে উদ্যত হতেই, আমি সদ্য জ্বলে ওঠা উৎসাহের শিখাটিকে ফু দিয়ে নিভিয়ে দেয়ার জন্য বললাম, ভূমেনদা, আজ নয়, কারণ বৌবাচ্চাদেরকে হোটেলে রেখে এসেছি। ওরা ক্লান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে। উঠেই আমার উপস্থিতি আশা করবে। সুতরাং, পরের বারের জন্য এই আতিথেয়তা বরাদ্দ থাকুক। ভূমেনদার বয়স তখন ৮২ বছর, এই বয়সেও তিনি দিব্য সিগারেট ফুকছেন, এমনকি সোমরসেও তার আসক্তি অটুট আছে দেখে আমি সত্যি অবাক হয়েছি। নিজে ডাক্তার ছিলেন, খুবই বড় নামকরা ডাক্তার। কিন্তুু বাঙালি-কথিত এইসব ‘বদভ্যাস’ থেকে নিজেকে একটু দূরে সরিয়ে রাখেননি। তার সাথে এটা সেটা টুকটাক কথাবার্তা চলতেই আমি তার সাথে কথাবার্তা রেকর্ড করার অনুমতি এক প্রশ্ন করার অনুমতি চাইতেই তিনি উদারতার সাথে সম্মতি দিলেন। প্রয়াত ভূমেনদার সাথে আমার আলাপচারিতার পূর্ণ বিবরণটি এখানে প্রকাশ করা হলো। বিডিআর্টসের পাঠকের জন্য অপ্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারটি শ্রতি থেকে লিপিরূপটি তৈরি করেছেন তরুণ গল্পকার অলাত এহসাত।–রাজু আলাউদ্দিন। (সম্পূর্ণ…)

জোমো কেনিয়াটার গল্প: জঙ্গলের ভদ্রলোকেরা

নূর-ই-ফাতিমা মোশাররফ জাহান | ৮ আগস্ট ২০১৮ ৯:৪৭ অপরাহ্ন

অনুবাদ: নূর-ই-ফাতিমা মোশাররফ জাহান

কেনিয়ার সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান জোমো কেনিয়াটাকে (১৮৯৭ – ১৯৭৮) বলা হয় স্বাধীন কেনিয়ার জাতির জনক। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে কেনিয়ায় স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থার সূচনা হয়। ইংরেজ মিশনারিদের তত্ত্বাবধানে কৈশোরে তাঁর ইংরেজি শিক্ষার হাতেখড়ি। বর্ণাঢ্য জীবনে কখনো ছিলেন কাঠমিস্ত্রি, কখনো কৃষি-সরঞ্জাম বিক্রেতা, কখনো স্কুলশিক্ষক আবার কখনো বা পত্রিকার সম্পাদক। ১৯৩১ সালে পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে। দীর্ঘ ১৫ বছরের এই প্রবাসজীবনে তাঁর যোগাযোগ ঘটে অসংখ্য বরেণ্য ব্যক্তিত্বের সাথে। ১৯৩৫-৩৭ সালে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ধ্বণিবিদ্যা বিভাগে ধ্বণিতাত্ত্বিক তথ্যদাতা হিসাবে কাজ করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ও ধ্বণিতত্ত্বে সংক্ষিপ্ত শিক্ষালাভ শেষে তিনি সামাজিক নৃতত্ত্ব বিষয়ে পড়াশোনা আরম্ভ করেন লন্ডন স্কুল অভ ইকোনমিক্সে। অধ্যয়নকালে তাঁর রচিত সামাজিক নৃতত্ত্ব বিষয়ক ইংরেজি নিবন্ধসমূহ ফেসিং মাউন্ট কেনিয়া নামের বই আকারে প্রকাশিত হয় ১৯৩৮ সালে। “জেন্টলম্যান অফ দ্য জাঙ্গল” শিরোনামের গল্পটিও একই বইয়ের অন্তর্ভুক্ত। উপকথার আদলে লেখা এই গল্পের মাধ্যমে আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক শাসকের শোষণ এবং শোষিত জনতার ‘সম্ভাব্য’ প্রতিবাদের প্রতিকী বর্ণনা দিয়েছেন তিনি।

অনেক অনেক দিন আগে এক হাতির সাথে এক মানুষের বন্ধুত্ব হয়েছিল। জঙ্গলের ধারে লোকটার ছোট্ট কুটির। একদিন প্রচ- ঝড়বৃষ্টি শুরু হলে হাতি তার বন্ধুর কাছে গিয়ে বলে, “মানুষ ভাই, দেখেছ কেমন মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। তুমি কি দয়া করে তোমার কুটিরে আমার শুঁড়টা একটু রাখতে দেবে?” বন্ধুর এহেন অবস্থা দেখে লোকটা জবাব দেয়, “আমার কুটির যে বড্ড ছোট, হাতি ভাই। আমার নিজের থাকার জায়গাটুকু বাদ দিলে, এখানে কেবল তোমার শুঁড়টা কোন মতে ধরবে। খুব সাবধানে তোমার শুঁড় ভেতরে ঢোকাও, কেমন।” হাতি তার বন্ধুকে ধন্যবাদ দিয়ে বলে, “বড় উপকার করলে তুমি। একদিন তোমাকে অবশ্যই এর প্রতিদান দেব।” কিন্তু কুটিরের ভেতর শুঁড় ঢোকানোর পর হাতি আস্তে আস্তে নিজের মাথাও ভেতরে পুরে দেয়। এভাবে ঠেলতে ঠেলতে শেষমেষ সে লোকটাকে কুটিরের একেবারে বাইরে, ঝড়বৃষ্টির মাঝে ছুঁড়ে ফেলে। এরপর আরাম করে শুয়ে পড়তে পড়তে বলে, “বন্ধু, তোমার চামড়া তো আমার চেয়ে বেশী শক্ত। এখানে যখন আমাদের দু’জনের থাকার জায়গা হচ্ছে না, তুমি না হয় বৃষ্টিতেই থাকো। আমি বরং আমার নরম চামড়া এই শিলাবৃষ্টির হাত থেকে বাঁচাই।” (সম্পূর্ণ…)

দিলরুবা আহমেদের ‘কোকোনাট ককটেল’

দিলরুবা আহমেদ | ৫ আগস্ট ২০১৮ ৭:১৫ অপরাহ্ন


অলংকরণ: শিল্পী মোহাম্মদ ইকবাল

টগর নামটা শুনলেই আমার মনে হয় তুমি বুঝি টগবগ টগবগ করে ঘোড়া ছুটিয়ে চলে যাচ্ছো। আমি অবাক হয়ে ভাবলাম এরকম মনে কেন হচ্ছে। তুমি কি ঘোড়া চালাতে জান। টেক্সাসে তো অনেক ঘোড়া আছে জেনেছিলাম।
টগর শুনে থাকলো। জবাব দিল না। ম্যাসেঞ্জার আবিস্কৃত হবার পর থেকে যত পরপুরুষ আছে সবার সুবিধা হয়েছে বড় বেশি। ফোন দেয়, যখন তখন। আলাপ চালাতে চায় বিরতিহীন ভাবে। তার ঘুম পাচ্ছে। কিন্তু ঐ লোকের দেশে এখন আলো। দিন। সে কথা বলবেই। বলেই যাবে। গত তিনদিনে তিনবার ফোন করেছে। প্রথম দিনেই তুমিতে নেমে গেছে বা উঠে এসেছে। নিচের তলার আন্টির ছাত্র ছিলেন। আন্টির ধারণা এই মানুষটা একজন অতি উত্তম এবং প্রয়োজনীয় পাত্র। ফেলে দিলে ভাংবে না। ছুড়ে মারলেও চৌচির হবে না। ফিরে ফিরে আসবে। অসাধারণ পাত্র। সেই অসাধারণ লা-জবাব পাত্র জানতে চাইছে বা চালিয়ে যাচ্ছে সেই একই ঘোড়া কথন,
 ওয়েস্টার্ন মুভিতে তো দেখতাম মরুভূমিতে বিশাল বিশাল ঘোড়ায় চড়ে ঘুরছে হ্যাট পরে সবাই, টেক্সাস আরিজোনায়।
কিন্তু কোথায় ঘোড়া এখানে! টগর চোখ বড় করে ডানে বায়ে চেয়ে অবাক হবার ভান করে ভাব ধরে ভঙ্গীমা করলো। টেক্সাসের ডালাসের এই লোকালয়ের চারদিকে তো এত বছরেও ঘোড়ায় চড়ে কোন মানুষকে ঘুরতে দেখেনি সে। মানুষও যেমন না! একটা মুভিতে কি দেখলো ব্যাস ঐটাই বুকে আগলে জিন্দেগী পার করে দিলো।
 এখানে কোন ঘোড়া নেই। ঘোড়াবিহীন জীবন যাপন আমাদের। আপনি এলে না হয় একটা ঘোড়া কিনে দেব। টাট্টু ঘোড়া।
 না না , কি যে বল না। আমি ঘোড়ায় চড়তে জানি নাকি!
 শিখে আসবেন।
 ম্যাডাম যে বললেন গাড়ি চালাতে জানা মাস্ট।
 জী আন্টি আপনাকে ঠিকই বলেছেন। প্লেন চালাতে পারলে আরো ভাল। বাংলাদেশ থেকে একটা প্লেন নিয়ে সোজা আমাদের এ্যাপার্টমেন্টের মাথায় নামতে পারতেন।
 তুমি কি আমার উপর বিরক্ত হচ্ছো টগর।
 এখন রাতের তিনটা বাজে, আমি ঘুমাবো,ড্রিম দেখবো ।
 অবশ্যই অবশ্যই। গুড নাইট। কাল কথা হবে। (সম্পূর্ণ…)

শিল্পী রফিকুন নবী: ওই বাড়িতে আমরা বঙ্গবন্ধুকে বইটা দিলাম

রাজু আলাউদ্দিন | ৩ আগস্ট ২০১৮ ১:২৭ অপরাহ্ন



কাগজ এবং ক্যানভাস–দুয়েই তার স্বাচ্ছন্দ্য । কাগজে তিনি আঁকেন তার অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে এমন এক ভাষায় যা চিত্রল গুণে ঋদ্ধ। অন্যদিকে ক্যানভাসে তিনি তুলে ধরেন রংয়ের সেই বর্ণময় সম্ভার যা কথার অমরাবতী হয়ে উঠেছে। বর্ণ ও বর্ণমালা অভিন্ন মর্যাদায় রফিকুননবীর কাছে উদ্ভাসিত, তারা একে অপরের বিরুদ্ধে না গিয়ে শিল্পী রফিকুন নবীকে অনন্য করে তুলেছে। চিত্রশিল্পী, কার্টুনিষ্ট, ঔপন্যাসিক, শিশুসাহিত্যিক, শিল্পসমালোচ এবং চিত্রকলার শিক্ষক এখন পরিচয়ের ব্যাপ্তির কারণে কেবলই ‘রনবী’ নামে সুপরিচিত, যিনি অসামান্য খ্যাতি অর্জন করেছেন টোকাই নামক এক চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই লেখক-শিল্পীর জন্ম ১৯৪৩ সালের ২৮ নভেম্বর রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়।
পুলিশ অফিসার বাবার বদলির চাকুরির সুবাদে রফিকুন নবীর বাল্য ও কৈশোরকাল কেটেছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়৷ পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝিতে ঢাকায় স্থায়ী হন তাঁরা। পুরান ঢাকাতেই কৈশোর ও যৌবনের অনেকটা সময় কাটে রফিকুন নবীর৷ ১৯৫০-এর মাঝামাঝিতে স্কুলে ভর্তি হন তিনি৷ পুরান ঢাকার পোগোজ হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৫৯ সালে ঢাকার সরকারি আর্ট কলেজে ভর্তি হন৷ এখানে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সফিউদ্দিন আহমেদ, কামরুল হাসানসহ দেশের খ্যাতিমান দিকপালের সান্নিধ্যে থেকে পড়াশোনা করেন৷
পড়াশোনা শেষ করে রফিকুন নবী সে সময়ে ঢাকার প্রথম সারির পত্রিকাগুলিতে নিয়মিত কাজ শুরু করেন। নিয়মিত কার্টুন আঁকতেন সাপ্তাহিক পূর্বদেশ পত্রিকায় কবি আবদুল গনি হাজারির কলাম কাল পেঁচার ডায়েরীতে৷১৯৬৪ সালের ৩ আগস্ট ঢাকা আর্ট কলেজের শিক্ষক হিসেবে জীবন শুরু করেন৷ আর্ট কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রদের নিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের শুরু হয়৷ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে অন্যান্য শিল্পীদের সাথে দলবদ্ধ হয়ে ঢাকায় থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ, কাপড় ও খাদ্য সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। ১৯৭৩ সালে গ্রীক সরকারের পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন বৃত্তি নিয়ে তিনি ভর্তি হন গ্রীসের এথেন্স স্কুল অব ফাইন আর্ট-এ৷ পড়াশোনা করেছেন ছাপচিত্র বা প্রিন্ট মেকিং-এর ওপর৷ ১৯৭৬ সালে দেশে ফিরে আসেন৷ শিক্ষক থেকে ধীরে ধীরে প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং অধ্যাপকের পদে অধিষ্ঠিত হন৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অফ ফাইন আর্টস-এর ড্রইঙ ও পেইন্টিং বিভাগে প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৮৮ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন এই ইন্সটিটিউটের পরিচালক। ২০০৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রথম নির্বাচিত ডিন হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
রফিকুন নবী পেয়েছেন একুশে পদক, চারুকলায় জাতীয় সম্মাননা শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার, বুক-কভার ডিজাইনের জন্য ১৩ বার ন্যাশনাল একাডেমি পুরস্কার৷২০০৮ সালে তাঁর আঁকা খরা শীর্ষক ছবির জন্য ৮০টি দেশের ৩০০ জন চিত্রশিল্পীর মধ্যে ‘এক্সিলেন্ট আর্টিস্টস অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ হিসেবে মনোনীত হন।
লেখক-শিল্পী রনবীর দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারটি গৃহীত হয়েছিল গত বছর তার বাসায়।
কবি ও প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিনের সাথে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে রনবী তার শিল্পী ও লেখক জীবনের নানাদিক তুলে ধরেন। অডিওতে ধারণকৃত এই সাক্ষাৎকারের লিখিত রূপটি তৈরি করেছেন গল্পকার সাব্বির জাদিদ। বি. স. (সম্পূর্ণ…)

বাৎস্যায়নের কামসূত্র: ‘অশ্লীলতার’ ঔপনিবেশিক কূটচাল এবং আমাদের ভ্রান্তি

হোসেন আলমগীর | ৩০ জুলাই ২০১৮ ৬:৩৭ অপরাহ্ন

প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃত সাহিত্যে মালঙ্গ বাৎস্যায়নের ‘কামসূত্র’ একটি কালজয়ী গ্রন্থ। নারী ও পুরুষের দাম্পত্য জীবন, কামকলা, অভিজাত শ্রেণীর সংস্কৃতি, এবং আমোদ-ফুর্তি বিষয়ে এ গ্রন্থটি বিগত দু’হাজার বছর ধরে পাঠকদের আকৃষ্ট করে রেখেছে। ১৮৭৬ সালে রিচার্ড ফ্রান্সিস বার্টন, ভগবান-লাল ইন্দ্রজি, ফস্টার ফিটজজেরাল্ড আর্বাথনট, এবং শিবরাম পরশুরাম ভিড়ে’র সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ‘কামসূত্র’র ইংরেজি তর্জমা প্রকাশিত হয়। পাশ্চাত্যে বইটি ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা লাভ করে, তবে সেটা ‘কামসূত্র’র সামগ্রিক বিষয়বস্তুর কারণে নয়; মূলত বাণিজ্যের স্বার্থে একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপনের কারণে। পন্ডিতজনের ধারণা, প্রাচীন ভারতে সংস্কৃত ভাষায় যখন এ বইটি লেখা হয়েছিল তখন সমাজের অভিজাত শ্রেণীর ভেতরে ধর্ম এবং অর্থশাস্ত্রের পাশাপাশি কামশাস্ত্রের চর্চা ছিল। সংস্কৃত ‘কাম’ এর অর্থ বাসনা, প্রেম, আনন্দ, এবং যৌনক্রিয়া। অর্থাৎ পঞ্চ-ইন্দ্রিয়লব্ধ যে কোন আনন্দই কামের আওতাভুক্ত, আর ‘সূত্র’র অর্থ কোন নীতি বা তত্ত্বের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা। এ পদ্ধতিতে লেখার সুবিধা হলো শিক্ষার্থীরা সূত্রগুলো সহজেই স্মরণ করতে পারে। প্রাচীন ভারতে প্রায় সব উল্লেখযোগ্য সংস্কৃত গ্রন্থ, যেমন: যুক্তিবিদ্যা, ব্যাকরণ, এবং দর্শনশাস্ত্র এ সূত্ররীতিতে লেখা হয়েছে। বাৎস্যায়নের এ গ্রন্থের উদ্দেশ্য ‘কাম’ অর্থাৎ আমোদ- প্রমোদের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যাপারেপাঠকদের যথাযথ ধারনা প্রদান করা। উল্লেখ্য, ‘কামসূত্র’ শুধুমাত্র যৌনতার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; প্রাচীন ভারতের সমাজ জীবনের হরেক রকম বিষয়ে বিস্তারিত এবং বাস্তব-ধর্মী তথ্যাবলীর সমাবেশ ঘটেছে এখানে, যেমন: পোশাক, প্রসাধনী, বিনোদন, সমাজ, ক্রীড়া, বাড়ির অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা এবং বহিরাঙ্গনের নান্দনিকতা। উপরন্তু, বাৎস্যায়ন কমবেশি মনোবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, যৌন বাসনা, সমকামিতা, ভেষজ চিকিৎসা, এবং নারী যৌনকর্মীদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নসহ আরও অনেক বিষয়ে এখানে পরামর্শ দিয়েছেন। অতএব, এ বিষয়গুলো বিবেচনায় আনলে ‘কামসূত্র’ সম্পর্কে গতানুগতিক ধারণা (marriage manual, sex guide, pillow book) বদলে যাবে। মূলত, ‘কামসূত্র’ প্রাচীন ভারতের মৌর্য এবং গুপ্ত সভ্যতার ৮০০ বছরের শিল্প সংস্কৃতির একটি লিখিত প্রমাণ। প্রকাশের পর থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত ‘কামসূত্র’ ভারতের সাহিত্য এবং শিল্পকলাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। প্রাচীন কাল থেকে ১৮ শতক পর্যন্ত ভারতে কামশাস্ত্রের চর্চা অব্যাহত ছিল, এবং এ বিষয়ে রচিত একাধিক গ্রন্থ তার সাক্ষ্য বহন করছে। কিন্তু ভারতে ইংরেজ শাসনামলে এ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়।
ঔপনিবেশিক আমলে ইংরেজ প্রশাসন এ সাহিত্যচর্চায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করে এবং সু-পরিকল্পিতভাবে ভারতবাসীর মতামত এর বিপক্ষে নিয়ে যায়। যৌনতার প্রতি ভারতীয়দের উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলার জন্য খ্রিস্টান মিশনারি, ইংরেজ প্রশাসন, এবং তাদের সৃষ্ট ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী ভারতের শৃঙ্গাররস-কেন্দ্রিক সাহিত্য, শিল্পকলা, অভিনয়, এবং সঙ্গীতের প্রতি অশ্লীলতার অভিযোগ এনে এর নিয়ন্ত্রণ শুরু করে, এবং একটি আইন (Obscene Publication Act) প্রণয়নের মাধ্যমে এধারার সাহিত্যকর্মের প্রকাশনা নিষিদ্ধ করে দেয়। ফলশ্রুতিতে, ভারত উপমহাদেশে দু’হাজার বছর ব্যাপী প্রবহমান কামশাস্ত্রের চর্চা উনিশ শতকে এসে ব্যাহত হয়, এবং তখন থেকেই এ সাহিত্যধারার প্রতি ভারতীয়দের, বিশেষত: শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির, দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করে। এ প্রবন্ধে ভারতের শিল্প-সাহিত্যের আঙিনায় কামসূত্রের প্রভাব, ইংরেজদের এ সাহিত্যধারার প্রতি বিরূপ মনোভাবের কারণ, এবং এর নিয়ন্ত্রণের পরিণাম বিশ্লেষণ করা হবে।
অধ্যাপক হারাণচন্দ্র চাকলাদারের মতে বাৎস্যায়ন দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতের অধিবাসী ছিলেন। কামসূত্রে ভারতের প্রায় সব অঞ্চল সম্পর্কে অল্পবিস্তর আলোচনা থাকলেও দক্ষিণ-পশ্চিম ভারত সম্পর্কে লেখকদের ব্যাপক এবং গভীর ধারণা লক্ষ্য করা যায়। যশোধরা’র মতানুযায়ী ‘বাৎস্যায়ন’ হচ্ছে তাঁর বংশ এবং ‘মালঙ্গ’ তাঁর নিজের নাম। বাৎস্যায়নের জন্মকাল নিয়েও বিতর্ক আছে। শ্যামশাস্ত্রীর (কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের সম্পাদক) ধারণা তিনি ১৩৭-২০৯ খ্রিস্টাব্দে মধ্যে কোন এক সময়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ভান্ডারকরের মতে তাঁর জন্ম ১০০ খ্রিস্টাব্দের ভেতরে। এ বি কিথ এর দাবী, বাৎস্যায়নের জন্ম চতুর্থ শতাব্দীতে। অধ্যাপক হারানচন্দ্র চাকলাদার এ সমস্যাটি নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে ‘কামসূত্র’ ৪০০ খ্রিস্টাব্দের আগে লেখা হয়েছে এবং সেটা কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ এবং পতঞ্জলির ‘মহাভাষ্য’র পরে, কেননা বাৎস্যায়ন এ দুটি গ্রন্থ দ্বারা কমবেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন। অতএব, উপরিউক্ত মতামতের ভিত্তিতে অন্তত এটা ধরে নেয়া যায় যে খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ থেকে খ্রিস্টাব্দ ৩০০ এর মাঝে কোন এক সময়ে বাৎস্যায়ন ‘কামসূত্র’ রচনা করেছিলেন। কামসূত্রে অভিজাত শ্রেণির ভোগ-বিলাস এবং আভিজাত্যের ফিরিস্তি থেকে অনুমান করা যায় যে এ ধরণের গ্রন্থ রচনা তখনই সম্ভব যখন রাষ্ট্র ছিল সমৃদ্ধশালী, নগরবাসীরা ছিল ধনবান এবং বিলাস-ব্যাসনে মশগুল। সন্দেহ নেই যে, সময়টা ছিল সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং ওই জনপদ ছিল কোন রকমের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, এবং বিদেশী আগ্রাসন থেকে মুক্ত। গুপ্ত যুগ (৩০০ -৩০০ খ্রি:) ছিল এমনই একটা সময় যখন শিল্পকলা এবং সাহিত্য চর্চা সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল। (সম্পূর্ণ…)

মঈনুল আহসান সাবেরের গল্প: দি নিউ হযবরল

মঈনুল আহসান সাবের | ২৭ জুলাই ২০১৮ ৭:২৯ অপরাহ্ন

বেশ ক’বছর আগে আমি ‘ওয়াল্ডারল্যান্ড’ নামে একটা গল্প লিখি। তবে ‘ওয়াল্ডারল্যান্ড’ লেখার আগে আমি যে গল্পটা লিখেছিলাম, তার নাম ‘সুকুমারের লজ্জা’ এ গল্পটার কথাও বলতে হবে। সুকুমারের লজ্জার যে মূল চরিত্র, মূল চরিত্র বলে আমার অনেক গল্পে যেহেতু কিছু থাকে না, কাউকে মূল চরিত্র আখ্যা দেওয়া উচিত না, কারণ আশপাশে অন্যান যে চরিত্রগুলো আছে, সেগুলো কোনো না কোনো ভাবে মূলের দায়িত্ব পালন করে। এই যেমন আবদুল হক, তার স্ত্রী রেবা, তাদের সন্তান রেবা, আবদুল হকের বন্ধু গোলাম হায়দার, সবাই হযবরল গল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। শান্তাকে এখানে অসুস্থ দেখানো হয়েছে, মানসিকভাবে অসুস্থ, সে ক্লাস টেনে পড়ে, ক্লাস টেনে পড়লে তার মানসিক বিকাশ সে অনুযায়ী নয়ই, বরং দেখা যায় ছোট বাচ্চাদের মতো তার মাথার পাশে বসে তাকে গল্পের বই পড়ে শোনালে তার ঘুম আসে না। এই কাজটি করে আবদুল হক।

‘আবদুল হকের যে ঘনিষ্ট বন্ধু, কিংবা একমাত্র বন্ধুও বলা যায়, যার কথা আমরা বলেছি, গোলাম হায়দার, তার এক অদ্ভুত বাতিক আছে। সে প্রতিদিন পত্রিকায় পাতা থেকে নানা নিউজ কেটে তার মোটা খাতায় পেস্ট করে। মোটা খাতা তার অনেকগুলো। একেক পাতায় একক ধরনের নিউজ। কোনোটায় আছে ধর্ষন ও গণধর্ষনের কথা, কোনোটায় টেন্ডার বাজির কথা, কোনোটায় নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মানুষের কথা (আমার ঠিক মনে পড়ছে ‘নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মানুষ’দের নিয়ে কোনো কিছু গোলাম হায়দার বানিয়েছিল কি না। সম্ভবত তখন ছিল না, তবে এখন থাকতেই পারে। একদিন গিয়ে দেখে আসতে হবে)। যাক, যা বলছিলাম, কোনোটায় হয়তো ব্যাংক লুটপাটের কথা, কোনোটায় হয়তো নানা নৈরাজ্য আর অবক্ষয়ের কথা, এমন তরো না। এই কাজটি গোলাম হায়দার গভীর মনোযোগের সঙ্গে করে যাচ্ছে। খাতাগুলো সে মাঝে মাঝে আবদুল হককে পড়তে দেয়। এ নিয়ে আবদুল হকের আপত্তি আছে, না উৎসাহ, অনেক দিন আগে লেখা গল্প– বলেছি, ঠিক মনে নেই, আমরা আপাতত কেবল এরকম অনুমান করতে পারি, আবদুল হক ঠিক বিরক্ত হয় না, ঠিক খুশিও না। সে হয়তো বলল–আহা, গোলাম হায়দার, আমার!
কে নয়! কতদূর এগোলাম, দেখবে না!
দেখছি তো!
কোথায়! খাতাই খোলোনি।
চারপাশে দেখছি না?
অবশ্য দেখছ।
আমিও কি, তুমি যা দেখছ, তার মধ্যে নেই? (সম্পূর্ণ…)

সাসকিয়া নোর্ট: আমার ধর্ষক যদি এখনও বেঁচে থাকতো তাহলে এই বইটি আমি লিখতাম না

তানবীরা তালুকদার | ২৬ জুলাই ২০১৮ ৩:৩৯ পূর্বাহ্ন

সাসকিয়া নোর্ট এর প্রথম উপন্যাস স্ট্রমবলি। এক জোড়া সফল লেখক দম্পত্তি তাদের বিয়েকে কিভাবে ধ্বংসের রাস্তায় নিয়ে যায় সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা রযেছে এতে। লেখক দম্পত্তি এইভা হুকে আর মারসেল ভান রোজমারেন তার সাথে কথা বলেছেন তার সাফল্য, নেদারল্যান্ডসের মেরুকরণ, তার উপন্যাসের বিষয়বস্তু আর যৌন সহিংসতা নিয়ে।
ভাবা হচ্ছিলো কোন এক লেখক দম্পত্তি যেন সর্বাধিক বিক্রিত উপন্যাসের লেখকের সাক্ষাতকার নেয় কারণ উপন্যাসটিও আবর্তিত হয়েছে একটি লেখক দম্পত্তিকে কেন্দ্র করে। উপন্যাসের কারেল ভান বোহেমেন আর সারা যোমার-এর অকপট সংলাপে, তাদের সংসার, তাদের ঝগড়া, বিদ্বেষ, হিংস্রতা, বিরক্তি আসলে ছদ্মরূপে সাসকিয়া’রই নিজের জীবন কথা।
তখন ফোল্কস ক্রান্ত আমাদের কথা ভাবলো।
সাসকিয়া’র সাথে আমাদের সম্পর্ক কেমন ছিলো?
বেশ কয়েক বছর আগে একদম শেষ মুহূর্তে আমরা ভান দ্যা ডাইকের “ওভার হার” কনসার্টের টিকেট কিনি। সেই টিকেট আনতে আমাদেরকে যেতে হয়েছিলে লাইস্টারপ্লাইনের ক্যাফে ওয়েবারে যেখানে সাসকিয়া তার পরিবারের সাথে বিয়ার পান করত। ওর ভাইয়ের ছেলে ইয়ান রুফও সেখানে ছিল। কথাবার্তা শেষ হয়ে যাওয়ার পর আমাদের মধ্যে ঝগড়া হল কারণ একজন অপরজনকে দোষ দিচ্ছিলো যে আমরা একে অপরের প্রতি যথেষ্ঠ ভদ্র ছিলাম না।

যখন আমরা প্রথম বারের মত এক সাথে ছুটি কাটাতে গেলাম, সমুদ্রতটে বসে এইভা প্রথমবারের মত সাসকিয়া নোর্ট-এর Koorts বইটা পড়লো। তারপরেই হোটেলের সুইমিংপুলের কাছে রাখা বইয়ের তাক থেকে নিয়ে সে De verbouwing en De eetclub বইটাও পড়লো। (সম্পূর্ণ…)

সুদূরে দিগন্ত : বাঙালি নারী-জীবনের নিপুণ বয়ান

মোহাম্মদ শেখ সাদী | ২৪ জুলাই ২০১৮ ৮:৩৬ পূর্বাহ্ন

এক
‘সুদূরে দিগন্ত’ ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক বীক্ষার আলোকে রচিত চারশত পৃষ্ঠার একটি উপন্যাস । ২০১৮ সালের একুশে বইমেলায় ‘দেশ পাবলিকেশন্স’ থেকে গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি মেহেরুন্নেছা রোজীর প্রথম সৃজনশীল কর্মপ্রয়াস হলেও এর আঙ্গিক-গঠন, প্লট-কাহিনি নির্মাণ, ভাষা ও পরিবেশ রচনা, চরিত্র-সৃজন দক্ষতা ও সংলাপ-বয়নের অপূর্ব নিপুণতা সহজেই সকল দুর্বলতা ও আড়ষ্টতাকে ছাপিয়ে গেছে। বোঝা যায়, সুদীর্ঘ পাঠ-পরিক্রমাকে আত্মস্থ করে, বাঙালির বহুকালের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার নিবিড় পাঠ এবং অনুধাবনের মধ্য দিয়েই নিজের অভিজ্ঞতাকে শাণিত করে নিয়েছেন লেখক। এছাড়া লেখকের আত্মজৈবনিক জীবনবীক্ষাও চমৎকারভাবে সন্নিবেশিত হয়েছে উপন্যাসটির শৈল্পিক নির্মিতিতে।

দুই
‘সুদূরে দিগন্ত’বাঙালি নারী জীবনের পূর্ণাঙ্গ বয়ান- একথা বললে অত্যুক্তি হবে না। ভারতবর্ষীয় বাঙালি সমাজ-জীবনে নারীর সার্বিক অবস্থান, দেশ-কাল- সমাজ-রাষ্ট্রের পরিবর্তন-বিবর্তনের ধারায় নারী-জীবনের সমাজ-ইতিহাস অনুপুঙ্খভাবে উঠে এসেছে উপন্যাসটিতে। মধ্যযুগের সমাজব্যবস্থায় নারীর অবনমনের কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু সমাজ-ইতিহাসের ক্রমবিকাশের ধারায় অধুনা বিশ্বে নারীর অবস্থান কোথায়? এমনকি আজকের এই একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে দাঁড়িয়েও বাঙালি নারী-জীবন কতটুকু মুক্তি ত্বরান্বিত হয়েছে? – সম্ভবত এই মৌলিক প্রশ্নটির যুক্তি-গ্রাহ্য উত্তর খুঁজে পাবার শৈল্পিক ও সংবেদনশীল অনুসন্ধান রয়েছে ‘সুদূরে দিগন্ত’ গ্রন্থটিতে। নারীও যে আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন সম-তাৎপর্যে উদ্ভাসিত মানুষ- আমাদের সমাজব্যবস্থায় এই প্রত্যাশিত জীবনদৃষ্টি নেই বলেই কখনও নারী-জীবনের সার্বিক মুক্তি ও বিকাশ সম্ভব হয়নি। ঔপন্যাসিক মেহেরুন্নেছা রোজী বাঙালি নারী-জীবনকে ঊনিশ শতকের সূচনালগ্ন থেকে সাম্প্রতিককাল সীমায় স্থাপন করে প্রায় দু’শো বছরের সমাজ-ইতিহাসের নিরিখে নারীর সামূহিক অবস্থানকে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। ইউরোপে শিল্প-বিপ্লবের কিছুটা সময় অতিবাহিত হলে ভারতবর্ষেও রেনেসাঁসের হাওয়া বইতে লাগলো। এই নবজাগরণ কলকাতা-কেন্দ্রিক সমাজে বেশ ভালোভাবেই সূচিত হয়েছিল। প্রায় দু’শো বছরের ইংরেজ আমলের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শাসন-শোষণের কথা সকলেরই জানা। তবে ইংরেজ শাসন কিছুটা হলেও আশীর্বাদ বয়ে এনেছিল বাঙালি জীবনে। (সম্পূর্ণ…)

পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com