কবিতার নুন ও গুণ

শান্তনু কায়সার | ২৮ জানুয়ারি ২০১৭ ৬:৫৩ অপরাহ্ন

kamal chowdhuryজগতে নুনের মূল্য শোধ দিতে বহু দেনা বাকি
কবিতাংশ ৫ : রোদ বৃষ্টি অন্ত্যমিল

১৯৫৭-র ২৮ জানুয়ারি কামাল চৌধুরীর জন্ম। আর তাঁর কবিতাসমগ্র প্রকাশিত হয়েছে ২০০৯-এর ফেব্রুয়ারিতে। অর্ধশতকের যে জীবন তিনি যাপন করেছেন তার একটি কাব্যিক প্রকাশ তাঁর এই সংকলনগ্রন্থ। এতে সংকলিত হয়েছে মোট আটটি কাব্যগ্রন্থের প্রায় সব অথবা নির্বাচিত কবিতা। প্রসঙ্গ-কথা’য় কবি বলেছেন, ‘সংগ্রহের বিশালত্বের প্রশ্রয় পেয়ে আমার অনেক অপছন্দের কবিতাও ঢুকে গেছে এ সংকলনে।’ কবিতাসমগ্র’য় অন্তর্ভুক্ত কাব্যগ্রন্থগুলো হচ্ছে মিছিলের সমান বয়সী, টানাপোড়েনের দিন, এই পথ এই কোলাহল, এসেছি নিজের ভোরে, এই মেঘ বিদ্যুত ভরা, ধূলি ও সাগর দৃশ্য, রোদ বৃষ্টি অন্ত্যমিল এবং হে মাটি পৃথিবীপুত্র। কবির জবানবন্দি থেকে জানা যায়, ১৯৭৬ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত লেখা কবিতাগুলো এই সংগ্রহে অন্তর্ভুক্ত অর্থাৎ তিরিশ বছরের কাব্যচর্চার সাক্ষ্য এই সংকলন।
কিন্তু আমরা যারা তাকে কাব্যক্ষেত্রে আবির্ভূত হতে দেখেছি তাদের কাছে এখনো তিনি মিছিলের সমান বয়সীরই কবি। এ বছরই অর্থাৎ ১৯৮১-র ফেব্রুয়ারিতে দ্রাবিড় প্রকাশ করেছিল বেশ কিছু কবিতাগ্রন্থ। মুহম্মদ নুরুল হুদার আমরা তামাটে জাতি, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম, কামাল চৌধুরীর মিছিলের সমান বয়সী এবং আমার রাখালের আত্মচরিত। তাঁর শেষ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত একটি কবিতায় বলেছেন ‘একটি বয়স থাকে, ভালোবাসার জন্য ভেতরে ভেতরে মানুষ বিপ্লবী হয়ে ওঠে’ রুদ্র সেই বয়সে প্রয়াত হয়ে মানুষকে ভালোবাসার বয়সে থেকে গেছেন।
রুদ্রর দ্রোহ এতোটাই জীবন্ত ছিল যে তিনি জাতীয় কবিতা পরিষদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে এর অভ্যন্তরীণ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধেও তাঁর প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। কামাল তাঁর এই সংকলনের দুটি কাব্যগন্থের দুটি কবিতায় রুদ্রকে স্মরণ করেছেন–

এখন কোথায় খুঁজি পালাবার পথ বন্ধ
তবু দিন যাপনের গ্লানিময় অন্ধ শহরের
সতর্ক প্রহরা এড়িয়ে গিয়ে পালিয়ে গিয়েছ অন্য কোথাও।

অন্য কবিতায় বলেছেন-

কলমের মতো মহাকাল ছোঁয়া বাঁশি
বাজাতে বাজাতে তামাটে রাখাল তুই
এই শহরের ত‚র্য বাদক হয়ে
নেমেছিল পথে কবিতার সন্ন্যাসী

যারা ছিল পাশে ছিটকে পড়েছে তারা
একাকী পথিক সঙ্গে ছিল না কেউ
বেদনার মতো দীর্ঘ হয়েছে দিন
শোনা গেছে তবু দ্রোহী কবিতার নাড়া।

এই পরিপ্রেক্ষিতে কামাল চৌধুরীর বেড়ে ও হয়ে ওঠা। ‘বয়স পঁচিশের গল্প’য় তিনি বলছেন-

নিয়তির প্রতিপক্ষে দাঁড়িয়েছি আজ
বুঝে গেছি এ জীবন নিরন্তর লড়াই লড়াই
বেঁচে থাকা সেও এই নিয়তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো
যুদ্ধে যদি টিকে যাই
তাণ্ডবের পরে যদি খুঁজে পাই সৈকতের বালি
এই ঘোর অন্ধকার
হয়তবা কেটে যাবে উত্তর পঁচিশে।

আর ‘ছত্রিশ বছর’ বয়সে পৌঁছে তাঁর মনে হয়

আরো কিছুকাল বেঁচে থেকে হোক জানা
বসন্তের আসল ঠিকানা।

প্রায় সমকালে ‘দ্রব্যমূল্য’ বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা তাঁকে আরো প্রত্যয়ঋদ্ধ করে

এখন আমি পাগলা ঘোড়ায় চড়ে
পার হতে চাই এই অভাবের গাঁ
অশ্ব ক্ষুরে বিদ্ধ বর্তমান
অন্ন ছাড়া লাগাম ছাড়ব না।

‘কবিতাংশে’র ৮-এ কবি যাকে ‘দ্বান্দ্বিক ধূলি’ বলেছেন তা জীবনের স্বর। এই স্বর তাঁকে ‘বাম বিচ্যুতি’ ও ‘শ্রেণিসমাজ’-এর কথা বলতে বলে। তবে কবির কাছে তা নেহাতই শ্লোগান থাকে না, হয়ে ওঠে শিল্প। প্রথম কবিতাটি পুরোটাই উদ্ধৃত করা যাক-

সে কোনো বাধা নয়, একটু লাফিয়ে গেলে
অতিক্রম করা যায় তাকে
যে-কোনো সময়
তবু সে কাঁটাতারে বিঁধে পড়ে আছে।

আর ‘শ্রেণিসমাজ’-এ ‘মেয়েরা’ যে ‘কাহিনী’ বলে তাতে অভাব ও ক্ষুধার গল্পের সঙ্গে থাকে ‘প্রভুদের রাতে’ নখের ছিন্নভিন্ন আঘাত। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে তিনি উচ্চকণ্ঠ নন, অপ্রত্যাশিত এই মোড় ও মোচড়াই কবির শক্তি।
‘বিসর্জন’ কবিতাটির কথা ধরা যাক। এর প্রারম্ভিক অংশ : ‘দিদির মত শান্ত দিঘি’। মানুষ প্রকৃতি কিংবা প্রকৃতি মানুষ, নীরবতা ভাষা পায় এবং ভাষা নীরবতা। নিজের ‘জন্মদিন’কে চিহ্নিত করতে কবি তাই পরিস্থিতির আভাস দেন এভাবে-

লোকে তোমায় কবি বলে, তরুণ কবি– না না
তোমায় তরুণ বলতে মানা।

সংকলনের ভ‚মিকা-বক্তব্য ‘কবিতা কি আমার কথা শোনে’য় তিনি তাঁর কবি হয়ে ওঠার বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন, বলেছেন, ‘আমার জন্মও কোনো কবি বংশে নয়।’
তবে কবিতাকে তিনি খুঁজেছেন ‘জীবনের ভেতর’। মুক্তিযুদ্ধ, প্রেম, শ্রমজীবী মানুষ এসব অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে হয়ে উঠলাম কবিতার পথিক।’
কিন্তু সেখানেও রয়েছে তাঁর স্বাতন্ত্র্য। তাঁর দীর্ঘতম কবিতা ‘ভ্রমণকাহিনি’র ৪ অংশের ‘এপ্রিল কঠিন মাস’ পড়লে মনে হয় তা বুঝি ইংরেজি কবিতার প্রভাব অথবা তার ছায়ায় লেখা কিন্তু তার পরেই তার স্বাদেশিকতা আমাদের দ্রবীভূত করে। ‘কালো সুন্দরী’র শিরোনাম থেকেই মনে হয়, এ বুঝি শেক্সপীয়রের সনেটের ‘ব্ল্যাক লেডি’ কিন্তু কবিতাটি তাকে ছাড়িয়ে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে–

একহাত জীবনের প্রিয় পুষ্প প্রেম
অন্যহাত মুষ্টিবদ্ধ মিছিলের হাত
যখন সে দ্রুত আসে সামাজিক আঁধার সম্মুখে
এত আলো তার পাশে– আলোদের অথই প্লাবন
কালো সুন্দরী সে কালো
চতুর্দিকে থরো থরো অন্ধকার জয় করা আলো।

কবিতাটির অন্তিমাংশ–

কালো সুন্দরী সে কালো
দারিদ্র্যপীড়িত দেশে নিরাশ্রয় গৃহীদের আলো।

মিছিলের মত নদীকেও তিনি গতিশীল করতে চান তাঁর কবিতার নাম হয়, ‘নদী পেয়ে গেছে ঢাকা।’ সমুদ্র গুপ্তর কবিতা ও কাব্যগ্রন্থের নাম ‘নদীও বাড়িতে ফেরে’। কামাল এভাবে পূর্ব ও উত্তরসূরি কবিদের যুগলবন্দি। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণে তাই তাঁর মনে হয়, ‘কবিকেও যেতে হয়’, ‘তবু ভালবেসে কেউ কেউ বাঁচে’। তার চেয়েও বড় কথা, ‘ভাগ্যিস, সমুদ্র দা আপনি পাগল হয়ে যাননি’। সেজন্যে কামাল যেমন একদিকে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ শীর্ষক কবিতা লেখেন তেমনি জীবনানন্দের ভাষায় অর্থান্তর করে বলেন, ‘সকলেই যোদ্ধা নয়’। ‘মুক্তিযোদ্ধা’য় তিনি বলেন, ‘মুক্ত স্বদেশে অমর কবিতা তুমি’। আর ‘সকলেই যোদ্ধা নয়’-এ তাঁর তিক্ত কিন্তু সত্য উপলব্ধি–

যাদের স্তুতিবাক্যে যাদুকণ্ঠে মাইক্রোফোন বিমোহিত
তারা সবাই যোদ্ধা নয়, চেতনা-বাইকও নয়
তাদের উপর নির্ভর করা ঠিক নয়।
অথচ কী আশ্চর্য ফুল ফোটার দিনে
ফুলের দোকানের পাশে তারাই বেশি ভিড় করে
বসন্তের জয়গান গায়
তাদের হাতের ফুল সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়।

অতএব কবির উপসংহার-

আমাদের পতাকা ও তাদের মাঝখানে
অন্তত এক সুতো ব্যবধান থাকা খুব জরুরি
যাতে তারা এই বাংলায়
সম্পূর্ণ মিশে যেতে না পারে।

দুই.
সংকলনের দীর্ঘতম কবিতা, আগেই উল্লেখ করেছি, ‘ভ্রমণকাহিনি’। এই কবিতা তিনি রচনা শুরু করেন ১৯৯৫-র ২০ সেপ্টেম্বর। তেরো বারে তিনি তা লিখে শেষ করেন ১৯৯৭-র ২১ জানুয়ারি। কিন্তু এই কবিই আবার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ‘কবিতাংশ’ লেখার প্রয়োজন বোধ করেন। এরই একটি অংশে তিনি লিখেছেন–

রন্ধন করেছি স্বপ্ন, গরীবেরা সুখী হয়
জগতের নুনের মূল্য শোধ দিতে দেনা বাকি
অলৌকিক এই চুলো, গদ্য পদ্য সব দ্রবীভূত
গন্ধম দুজনে খাব, তারপর পবিত্র পতন।

নুনের ঋণ শোধ যেমন মানুষের কর্তব্য তেমনি নুনের সত্যই প্রকৃত সত্য। এটি কবিতারও গুণ। কারণ কবিতা বানানো সত্য বলে না, যত অমিষ্টই লাগুক। নুন প্রকৃত সত্যই বলে। সেটিই তার মাধুর্য ও সৌন্দর্য। এক্ষেত্রে কবির সংযমও তাঁকে সাহায্য করে।
কামাল চৌধুরীর কবিতাসমগ্র তাঁর পিতাকে উৎসর্গীকৃত। কিন্তু কবির মতোই তিনি তা অনুক্ত রাখেন, এমনকি সেজন্যে তিনি নতুন পঙ্ক্তিমালাও রচনা করেন না। উৎসর্গের কবিতাংশটি তিনি ‘শোকগাথা : পিতার জন্য’ কবিতার শেষাংশ থেকে গ্রহণ ও ব্যবহার করেন। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মিছিলের সমান বয়সী’র উৎসর্গপত্রেও তিনি এই সাশ্রয়ের পরিচয় দেন। ‘বাবা ও মাকে’ উৎসর্গ করে তিনি যে বলেন ‘আমি শুধু জন্মের কাছে ঋণী’ তা আসলে ঐ কাব্যগ্রন্থের ‘জন্মদিনের কবিতা’ থেকে নেয়া।
‘কবিতা কি আমার কথা শোনে’য় কবি লিখেছেন, ‘স্ত্রী পুত্র কন্যা ¯^জনের হাসি আমার কাছে স্বর্গসুখের সমান’। এই উক্তিকে খুবই নাইভ মনে হতে পারে কিন্তু তা তাঁর সৎ উচ্চারণ। কিন্তু তিনি যখন বলেন তাঁর অকালপ্রয়াত যমজ ভাইয়ের হয়ে তিনি লিখছেন তখন তার অন্য তাৎপর্য রয়েছে বলে মনে হয়। এটা কবির শুধু ব্যক্তিগত উক্তি নয়, তাঁর রচনাতেও এর সাক্ষ্য রয়েছে। ‘জন্মদিন’ থেকে–

দুজন ছিলাম দু’ভাই মিলে
এক-ই মায়ের পেটে
এক পৃথিবী লিখতে এলাম
আঁধারে জল ঘেটে
আমরা ছিলাম ভ্রুণের কবি
ছিলাম ছন্দ-শিশু
অপূর্ণ হাত পা ও নখে
ভাবীকালের যিশু
ভাই বাঁচেনি মাঘের শীতে
তার কলমটা আমি
আমায় দিয়ে লিখিয়ে নেয়
নিষ্ঠুর অন্তর্যামী।

‘যমজ’ কবিতাটিও এ প্রসঙ্গে স্মর্তব্য। কিন্তু ‘সহোদর’-এর অন্তিমাংশটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়–

অন্ধকারে আমি ও আমার ভাই– একজন সহোদর খুঁজি
একজন প্রিয় ধান, প্রিয় সহোদর।

‘ধান’ তাকে আর ব্যক্তিগত থাকতে দেয় না, করে তোলে সমষ্টিগত। ‘সাহসী’ জননী বাংলা’য় এর একটা সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যায়–

যার সঙ্গে যে রকম সেরকম খেলবে বাঙালি
মেরেছি সুখে… কান কেটে দিয়েছি তোদের।
এসেছে আবার ফিরে– রাতজাগা নির্বাসন শেষে
এসেছি জননী বলে স্বাধীনতা উড়িয়ে উড়িয়ে

একইভাবে কবি যখন ‘একটি উজ্জ্বল লাল’-এ বলেন ‘এখন সে শত্রুর হাতে-বন্দি তার স্বাধীন স্বদেশ’ তখন আসলে সকল অবস্থায়ই যে মাতৃভূমি স্বাধীন সেই প্রত্যয়ই ঘোষিত হয়। ‘সর্বপ্রিয় ভূমি’তে তাই কবি বলেন–

জাগিয়ে রাখো উষ্ণ শিরায় তুমি
ত্রিভুবনের সর্বপ্রিয় ভূমি।

ফলে ‘হানাদার পাকিস্তানী সেনা’, ‘মার্কিনি মানবপ্রেম’ ও ‘বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ মানুষ’ কবির বিশ্বাস উৎপাদন করে না। প্রেম ও স্বদেশের অবিচ্ছিন্ন রূপ ও প্রকাশ তাই ‘রক্তাক্ত পঙক্তিমালা’য় এভাবে ঘটে–

তোমাকে বলেছি আমি অলংকার ভালবাসা নয়
ঘামের সুবাসে দ্যাখো আরো বেশি মৃগনাভি ঘ্রাণ
তাহলে প্রলেপ কেন? ঝেড়ে ফ্যালো সব প্রসাধন
ঘামের গন্ধকে বলো নিখিলের হরিৎ প্রণয়

কারণ কবির মূল বিশ্বাস : ‘আমিতো বিশ্বাসী নই শ্রমহীন জাগতিক প্রেমে’। ২০০৫-এর পর ২০০৯-এ লেখা কবিতায়ও তিনি তাঁর মূল সত্য থেকে বিচ্যুত না হয়ে বলেন–

ব্যাকরণ ভুলে উপগত অধিকাল
উৎকেন্দ্রের প্রথাগত চোখে হানে।
আকাশপর্বে নিম্নর্বণ আজও
যাপিত স্বপ্নে বহু অধিকার বাকি
জেলেপাড়া থেকে নগরের প্রশ্রয়ে
ভালোবাসি তবু শিরোনামহীন থাকি।

তিন.
‘বিনির্মাণ’-এ বিশ্বাসী কবি রোমান্টিকতায়ও কম রক্তিম নন। ‘গৃহশিক্ষক’ তার যথাযথ দৃষ্টান্ত। ‘আমি ছিলাম অতি সাধারণ, বোকাসোকা লাজনম্র মেয়ে’, ‘আমার কোনো চক্ষু ছিল না, তুমি আমাকে চক্ষু দিয়েছিলে’, ‘তুমি আমাকে হাত ধরতে শিখিয়েছ, স্পর্শ করতে শিখিয়েছ’, ‘তুমি আমাকে ফুটে উঠতে বলেছিলে’, ‘আমি খোলস ভেঙে দাঁড়িয়ে পড়েছি অপার বিস্ময়ের এক ভূখণ্ডে’। অতএব ‘এই আমাকে প্রস্ফূটিত, উন্মুক্ত, অনবগুণ্ঠিত রেখে/ আজ তোমাকে আমি অন্য কারো গৃহশিক্ষক হতে দিতে পারি না।’।

চার.
কিন্তু সব কিছুুর পরেও একটা প্রশ্ন জাগে। কবি লিখেছেন, মিছিলের সমান বয়সীটানাপোড়েনের দিন গ্রন্থের কয়েকটি কবিতাকে বাধ্য হয়ে বাদ দিতে হয়েছে।
আঙ্গিক ও বিষয়ে পরিবর্তন না করেও কিছু কবিতা সামান্য পরিমার্জন করতে হয়েছে সচেতনভাবেই। ভালো। কিন্তু মিছিলের সমান বয়সীর প্রথম প্রকাশে রচনার স্থান হিসেবে আদমজীনগরের উল্লেখ থাকলেও কবিতাসমগ্রয় তা অন্তর্হিত কেন? তবে কি কবিরই কথামতো ‘শ্রেণিচ্যুতি এ-সমাজে সবার সাজে না?’ কবিরও না?

পাঁচ.
কবি জানেন

হানাহানি রক্তপাত একবিশ্বের বিভক্ত পৃথিবী
কবি তার অংশ নয় তার নাম চিরমুক্ত পাখি
জন্ম যদি চুরুলিয়া, মৃত্যু তবে ঢাকার মাটিতে
কবিকে রুখতে পারে এরকম কাঁটাতার নেই।

নিশ্চয়ই। কিন্তু কবিকে ঢাকায় মাটি দেয়ার বিষয়ে আমরা সামান্য চাতুরিও কি করিনি? সেই চাতুর্য কিন্তু আমাদের কাব্যিক সত্যের অকাব্যিক বাধা। কবিতায় তখন আর নুনের গুণ থাকে না, সে সত্যবিচ্যুত হয়। তার সামনে দাঁড়িয়ে যে কোনো সৎ পাঠকেরই অস্বস্তি হবে।
Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন গনী আদম — ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৭ @ ৭:৪১ অপরাহ্ন

      শ্রদ্ধাভাজন শান্তনু কায়সারের আলোচনা পড়ে, আলোচ্য কাব্যটি সংগ্রহ ও পাঠের তুমুল আগ্রহ বোধ করছি।

      শ্রদ্ধেয় কামাল চৌধুরী আমাদের প্রজন্মে খুব পঠিত বলা যাবে না, অন্তত কবিতার সাধারণ পাঠকের কাছে। আমরা যারা নব্বুয়ের লিটল ম্যাগ লিখিয়ে, প্রতিষ্ঠানবিরোধী অতি কঠোর মানসিকতা নিয়ে আমাদের অনেকেই একটা সময়ে ছিলাম বেশ উন্নাসিক। কামাল চৌধুরীর কবি পরিচয়ের চাইতেও আমাদের কাছে বড়ো ছিলো তাঁর পেশা পরিচয়, তিনি সরকারের আমলা। আমাদের মধ্যে যারা একটু বেশি পড়াশুনা করতাম আর একটু কম গোঁড়ামি দেখাতাম, তাদের কাছে অবশ্য ‘মিছিলের সমান বয়সী’ হয়ে তাঁর একটা গ্রহণযোগ্যতা ছিলো। ওই পর্যন্তই, আর বড়োজোর এদিক ওদিক কিছু লেখা তাঁর পড়া হয়েছে।

      পরে, ‘বড়ো’ হয়ে পড়েছি কামাল চৌধুরীকে। পড়ে কমবেশি মুগ্ধই হয়েছি। শান্ত, নরম সুরটা ভালো লেগেছে। নিজের পেশাগত প্রয়োজনে সরকারের ডাকসাঁইটে আমলা কামাল নাসের চৌধুরীর কাছে যাওয়ার সময়, মনে মনে মেলানোর চেষ্টা করেছি কবি কামাল চৌধুরীর সাথে। মেলে নি খুব একটা। আর মেলে নি বলে ভালো লেগেছে। মনে হয়েছে, খুব সচেতন ও সুস্পষ্টভাবেই এই লোক তাঁর নিজের ভেতরটার (কবিত্ব) সাথে বাইরেটাকে (আমলাত্ব) গুলিয়ে যেতে দেননি।

      তাঁর তিন দশকের কাব্যযাত্রা এক মলাটে পাওয়ার সুযোগ হারাবে কে!

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com