কামাল চৌধুরী : সত্তরের মেধাবী কবি

ফরিদ আহমদ দুলাল | ২৮ জানুয়ারি ২০১৭ ৫:৪৫ অপরাহ্ন

f2764352সত্তর দশকের দীর্ঘ কবি তালিকায় অসংখ্য বর্ণিল নাম থেকে মাত্র কজনের নাম বেছে নিতে চাইলেও একটি নাম বিবেচনায় থেকেই যায়; যাঁর সাথে সৌজন্যের অতিরিক্ত ব্যক্তিগত সম্পর্ক ততটা ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেনি। হয়ে ওঠেনি কারণ, একদিকে একজন অন্তর্গত স্বভাবের সাহিত্যকর্মী অন্যদিকে নির্লিপ্ত পরিমিত স্বভাব-সংহত একজন কবি। একদিকে একজন ব্যর্থ মানুষের উদ্বেগ-সংকুল প্রাত্যহিক জীবন, অন্যদিকে মেধাবী সৌভাগ্যের প্রবহমান সাফল্য। যাঁকে নিয়ে আলোচনা তিনি সত্তর দশকের অন্যতম মেধাবী কবি। সত্তর দশকের প্রিয় কবির তালিকা যতবার প্রণয়ন করতে চেয়েছি ততবার ঐ একটি নাম সামনে এগিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে; করমর্দন করে বলেছে– ‘এখানে এই অসংখ্য সুদীপ্ত মানুষের ভিড়ে আমি কি তোমার নজরে আসিনি?’ আমি বিস্মিত হয়ে বারবারই ভেবেছি এই নামটি কেন সামনে এগিয়ে যায় বারবার! বিভিন্ন সংকলন ও আলোচনায় সত্তর দশকের উল্লেখযোগ্য কবি হিসেবে স্বীকৃত তাঁদের তালিকা কিছুতেই পঞ্চাশোর্ধ নয়। কোনো ঘাটাঘাটি ছাড়াই যদি সত্তর দশকের অন্যতম কবিদের একটা তালিকা কেবল স্মৃতি থেকে উচ্চারণ করতে চাই, তাহলে বলতে পারি আবিদ আজাদ, আবিদ আনোয়ার, জাহাঙ্গীর ফিরোজ, রবীন্দ্র গোপ, নাসির আহমেদ, ময়ূখ চৌধুরী, তুষার দাশ, আবুল মোমেন, নিতাই রায়, বিমল গুহ, শামসুল ফয়েজ, আশরাফ মীর, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কামাল চৌধুরী, মাহমুদ কামাল, জরিনা আখতার, নাসরীন নঈম, মাহবুব হাসান, মুজিবুল হক কবীর, জাফরুল আহসান, ফারুক মাহমুদ, আবু করিম, আতাহার খান, শিহাব সরকার, আবু হাসান শাহরিয়ার, সোহরাব পাশা, সোহরাব হাসান, জাহিদ হায়দার ইত্যাদি নামের তালিকা। স্মৃতি ঘেটে আরো কিছু নাম নিশ্চয়ই উদ্ধার করা যাবে। এসব নামের পাশে অবশ্যই নিজের নামটিকেও বাদ দিতে চাই না। যদিও সে অর্থে আমি ততটা পরিচিত নই সবার কাছে। এই যে নিমিষে মনে করা নিজের দশকের নামের তালিকাটি, তাও তো একেবারে ছোট নয়। কিন্তু যদি আমাকে সত্তর দশক থেকে দশজন কবিকে বেছে নিতে বলা হয়, কিছুতেই আমি সেই বিশেষ নামটি বাদ দিতে পারি না। আমি লক্ষ করেছি একই বিষয়ে যখনই ষাট-সত্তর-আশির দশকের কবি বন্ধুদের সাথে মত বিনিময় করেছি, প্রত্যেকেই সেই বিশেষ নামটি অনিবার্য বলেই উল্লেখ করেছেন। এতোসব সঙ্গত কারণে ক্রমশ আমি তাঁর বিষয়ে মনোযোগী হয়েছি। অভিনিবেশন দিয়ে পড়তে চেষ্টা করেছি তাঁর কবিতার অন্তর্গত সৌন্দর্য। নির্বাচিত কবিতাসহ তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা আমার জানা মতে নয়টি। সত্তর দশকের কবিতার একটি সংকলন তিনি সম্পাদনাও করেছেন। তার সংকলনে তিনি আমাকে বিবেচনা করেননি, তবুও আমি কখনো তাঁর নাম বাতিল করতে পারি না। এ আমার ঔদার্য নয় বরং এ তাঁর অর্জন। তাঁর প্রকাশিত বইগুলো হচ্ছে– মিছিলের সমান বয়সী, টানাপোড়েনের দিন, এই পথ এই কোলাহল, এসেছি নিজের ভোরে, এই মেঘ বিদ্যুত ভরা, নির্বাচিত কবিতা, ধূলি ও সাগর দৃশ্য, রোদ বৃষ্টি অন্ত্যমিল এবং হে মাটি পৃথিবীপুত্র। কবিতার জন্য তিনি ইতোমধ্যে রুদ্র পদক এবং কবিতালাপ সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। আমি বিশ্বাস করি তাঁর নাম আলাদা করে উচ্চারণ না করলেও যে কোনো সচেতন পাঠক বুঝে গেছেন সত্তর দশকের এই অনিবার্য কবির নাম কামাল চৌধুরী।

সময়ের প্রবহমানতায় কামাল চৌধুরী যেমন নিজেকে সত্তর দশকের কবি তালিকায় অনিবার্য করে তুলেছেন একইভাবে এ কবির যে কোনো অনুসন্ধিৎসু পাঠকের প্রত্যাশাও একটু বেশি হয়ে উঠেছে। রোমান্টিক স্বভাবের কবি কামাল চৌধুরীর কাব্য ভাষায় আছে এক লিরিক্যাল দ্যোতনা, কবিতার শব্দ চয়নের ব্যাপারে তিনি খুবই সতর্ক, অনুসন্ধানী এবং ‘চুজি’। তাঁকে দিয়েছে স্বাতন্ত্র্য। কামাল চৌধুরীর কবিতা পাঠে পাঠক আবিষ্কার করে নেবেন নস্টালজিয়া, প্রকৃতি-অনুসন্ধান, প্রেম-বিরহ, ইতিহাস-ঐহিত্য-চেতনা, ক্ষোভ-ঘৃণা-দ্রোহ মিলিয়ে বিচিত্র অনুভবের স্বাদ। তাঁর কবিতার বিমূর্ততা ও প্রচ্ছন্ন চারিত্র্যের পরও অসংখ্য পংক্তি পাঠককে ছুঁয়ে দেবে– আপ্লুত করবে গভীর অনুরণনের দ্যোতনায়। তাঁর কাব্য অনুসন্ধান করে এবার আমরা কবিতার প্রকরণ, কাব্য ভাষা, বিষয়-বৈচিত্র্য, মেজাজ ও নির্মাণশৈলী আবিষ্কারে সচেষ্ট হবো।
সমুদ্র-বন্দনা করে অনেক কবি কবিতা লিখেছেন, কামাল চৌধুরীর কবিতায় দেখি কবির সমুদ্র বন্দনার পংক্তি

জোয়ারে ভেসেছে দৃশ্য; দস্যুতার শৈবাল ও শিলা
বিকেলের কোলাহলে ঝিনুকের স্থির অস্থিরতা
দ্রুত ধরে পড়ে যাবে। আহ্বানে… বালিতে, সৈকতে
তাতেই গোধূলি আসে ফের সেই মাতাল জোয়ার
চোখের সম্পাতে নীল, ফেনা ওঠা, প্রতিশব্দময়
সাঁতারে এসেছে তীরে। ব্যক্তিগত কথোপকথনে
রাত্রিরূপ মর্ম ঘ্রাণে ঢেউয়ে ঢেউয়ে পাথরে পাথরে
ব্রতচারিণীর চুমু দিয়ে গেছে নাবিক পুরুষে।

[তর্পণ/ রোদ বৃষ্টি অন্ত্যমিল]

একই কাব্যের অন্যত্র তাঁর কবিতায় মেধাবী উপমা চমৎকৃত করে পাঠককে

দিদির মত শান্ত দিঘি। কারা খুঁজছে মুখ
গাছেরা সব দাঁড়িয়ে দেখে বিরহের অসুখ
গাছের সাথে আমরা আছি; আমরা পথ ধূলি
দূর্বাদলের সাথে আজ পেতেছি অঞ্জলি

[বিসর্জন]

কতো সাবলীল ও সহজ উপস্থাপনায় মৃত্যুর অনিবার্যতার বিষয়টি উপস্থাপন করা সম্ভব তা জেনে নিতে আমরা পড়ে নিতে পারি

মৃত্যু ভয়ানক থাবা
কে কখন যাবে জানা নেই
যার জন্ম দ্বীপ দেশে, সে কেন যে মাটিতে ঘুমায়
একা একা অন্ধকারে, অন্ধকার সকলের সীমা।

[শ্বাশুড়ি মা-কে/ রোদ বৃষ্টি অন্ত্যমিল]

নিজের জন্মদিনকে বাক্সময় করে তুলতে চেয়েছেন কিনা জানি না, কিন্তু জন্মদিনের হাত ধরে প্রকৃতি ও পরিপার্শ্ব যেন নড়ে উঠেছে ‘জন্মদিন’ শিরোনামের কবিতায়

ভোরবেলাকার শালিক শোন, শোন শিশির
পতনমুখী পাতা
আজ যে আমার জন্মদিন আজ যে আমার খুলতে হবে
লেখার নতুন খাতা।
হঠাৎ দেখি প্রজাপতি উড়ে বসল পাশে
শালিক শ্যামা লাল মুনিয়া দোয়েল দূর্বাঘাসে
বৃষ্টি এল, ডানায় আঁকা আকাশী রঙ শাড়ি
বলল, আমি ক্ষণিক এলাম ফিরব তাড়াতাড়ি

ইতিহাস-চেতনা প্রকৃতিপাঠ আর স্বপ্নময়তা একাকার হয়ে যেতে দেখি কামাল চৌধুরীর কবিতায়

তিমি শিকারীর চোখে কাঁপছে পৃথিবী
শীত এসে যাচ্ছে ফের। গত শীতে প্রভাবে কেঁপেছে,
বন্দরে বন্দরে ঘুরে হিমাঙ্কের নিচে এত এত অভিজ্ঞতা!
অথচ তোমরা জানো, যদি তুষারের যুগে, নূহের নৌকায়
তোমার মাটির দিকে ফিরে যেতে যেতে
আমারও শরীরে ছিল উষ্ণ রক্ত।
আমারও বন্ধু ছিল ঠোঁটে খড় নিয়ে উড়ে আসা পাখি…

[ভাসমান/হে মাটি পৃথিবীপুত্র]

সমকাল ও কঠিন বাস্তবতা কতো সহজ ভঙ্গিতে মেধাবী উপস্থাপনায় কবি তুলে ধরেন

সামান্য হৃদয় ছিল বিনিয়োগ করেছি দেশেই
অস্বাভাবিক লেনদেনের লোভে লোকসানের চুক্তি করিনি
এখন বন্ধকী সুদে
স্বর্গ মর্ত্য ফাঁকা
মাইলের পর মাইল হেঁটে দেখলাম, যে পলাশে
জন্ম নিয়েছি সেখানেও পাথরের টান
এই রোবট পৃথিবীতে
ধাতব ওংকার ছাড়া অন্য কোন বর্ষাতি নেই

[বিজ্ঞাপন/ হে মাটি পৃথিবীপুত্র]

গারো জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা নিয়ে গবেষণা করেছেন কামাল চৌধুরী। রোবট পৃথিবী, কংক্রিটের নিরাবেগ নিস্পৃহতা, নগরের সৌজন্যের চেয়ে প্রকৃতিক আন্তরিকতার প্রতি পক্ষপাত খুঁজে পাওয়া যাবে ‘এ শহরে বৃষ্টি এলে’ কবিতাটিতে

এ শহরে বৃষ্টি হলে আমি হারানো টিলায় চলে যাই
যেখানে বিশাল তাঁবু, খোলামেলা, শান্ত
ঘাস ফড়িঙের জীবনী পাঠের মতো বুনো রঙ
সেখানে বন্ধুর মুখ, ইস্কুল পালানো সব দুপুর অস্থির গান
তামাটে বেহালা হাতে সুখি মাটি
পাখি ডাকা বাতাসের ফাঁকে মাথা উঁচু গাছগুলো সারাদিন হৈচৈ করে
………………………….
এই কিলোমিটারের যুগে ভাঙাচোরা, খোয়া ওঠা পুরনো পাতায় ঢাকা
সবগুলো মাইলপোস্ট পাড়ি দিয়ে আমি সে হারানো টিলায় চলে যাবো

এই যে বিবর্ণতা, কপট সৌজন্য ছেড়ে আমাদেরকে স্মৃতিময় সবুজের দিকে বারবার ডেকে নিতে চান কবি কামাল চৌধুরী, সম্ভবত সে কারণেই তাঁর নামটিও আমাদের চেতনায় নাড়া দিয়ে যায় বারবার। হয়তো তাঁর বিমূর্ত আহ্বানের প্রতীকী টান আমাদের শেকড়সন্ধানী হতে প্রাণিত করে; আমাদের কৃতজ্ঞ করে তাঁর প্রতি।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com