কামাল চৌধুরীর কবিতা: লণ্ঠন জ্বালিয়ে রাখে কারা এই পথের ওপর

মণিকা চক্রবর্তী | ২৮ জানুয়ারি ২০১৭ ৮:৫৭ পূর্বাহ্ন

kamal chowdhury
সমাপ্ত সর্পিল পথ দিগন্তের পর্বতশিখরে
তার পরে অপার নীলিমা
কী হবে উদ্দেশ্য খুঁজে উর্ধ্বশ্বাস নক্ষত্রনিকরে?
এখানেই পৃথিবীর সীমা।

[উপসংহার: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]

কবি কামাল চৌধুরীর ভ্রমণ কাহিনি কবিতার বইটি হাতে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের উপরোক্ত লাইনগুলো মনে পড়ল। বিচিত্র লক্ষ্যে, ভিন্ন ভিন্ন দিকে ও ভবিতব্যে ছুটে যাওয়া মানুষ খুঁজে ফেরে জীবনের মানে। কামাল চৌধুরীর ভ্রমণ কাহিনি সিরিজের কবিতাগুলি পড়তে পড়তে তার অন্তর্গত যাত্রা ও উপলব্ধির মাঝে আমিও পাঠক হিসেবে চমকে দাঁড়িয়ে পড়ি। কবিতার শব্দগুলো আমার বোধের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে যেন:

পড়শি রাতের শব্দ,কার নামে এই পাতাঝরা
বনপথে অভিভূত কারা আজ শব্দ অনুগামী
শীত না শোক না জন্ম―এই নিশি কার জন্য লেখা
লণ্ঠন জ্বালিয়ে রাখে কারা এই পথের ওপর?

[০১নম্বর কবিতা]
এক পাতাঝরা শীতের রাতে কবিতাটি রহস্যে আবৃত। সত্যিই কী শীত, না শোক, না জন্ম? কৌতূহল বেড়ে যায়। আবার পড়তে থাকি। আপাত সরল কবিতাটির মধ্যে দেখা পাই এক রহস্যনির্ভরতা। শীতের নির্জনতা আর শোকের বিষাদের মধ্যে টের পাই কোনো এক আকস্মিকের উপস্থিতি: ‘লন্ঠন জ্বালিয়ে রাখে কারা এই পথের ওপর?’ শীত-শোক-জন্ম যেন এক সমান্তরাল রেখা, তাতে মিশে যায় প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম। ‘বিস্ময় বালক লতাগুল্ম পার হয়ে হারাবে কি যাদুর কোটরে?’ বাক্যটি পড়ার পর আমি যেন সত্যি সত্যিই সেই বালকটিকে দেখতে পেলাম যে খুঁজে বেড়াচ্ছে তার জীবনকে। তীব্র পাতাঝরার কালে, তীব্র শীতের ভিতর যে খুঁজে বেড়াচ্ছে তার নিজকে। শীতে শেকড় ছিঁড়ে যাবার ভয় যত তীব্র, তার চেয়েও তীব্র হয়ে উঠছে এক অস্তিত্বের সংকট। ভয়, হতাশা, আশঙ্কা পেরিয়ে শব্দের পর্দায় ভেসে উঠেছে নিরন্তর খোঁজার সংগ্রাম। আইডেনটিটি হারিয়ে আমরা আইডেনটিটিকেই খুঁজি। এখানেও তাই, ‘মহিমার বীজ নিজের প্রশ্রয়ে তারা পুনর্বার জন্ম নেবে শীতে।’


১.চির প্রভাতের মেয়ে আমি দেখি শুধু উষাকাল
আমার চোখের নিচে প্রজাপতি এঁকেছে ভ্রমর।

[০২ নম্বর কবিতা]

২.―আয় তোকে শান্ত স্নান দেব
আমরা যমজ গর্ভ, একসঙ্গে আয় ভেসে যাই।

[০৩ নম্বর কবিতা]

৩.মাধবের এই কৃপা―সে দিয়েছে কুন্ডে জলধারা
দিয়েছে পাখির স্নান অতিথির মুখর উল্লাসে
বনবিবি পাহারায় তার চুলে আষাঢ়ের ঢেউ
বেড়াতে এসেছে যারা তারা শুধু মুগ্ধ চোখে দেখে।’

[০৩ নম্বর কবিতা]

৪.বাঁচে না সহজে গ্রাম। পাখ পাখালির ঘেরাটোপ
বালিবাঁধ ভেসে গেলে ছিন্নমূল প্রোথিত শিকড়
উদ্বাস্তু পাখির কান্না, ছিন্নভিন্ন গ্রামগুলো দেখে
উনত্রিশে এপ্রিলের ভয়ঙ্কর খাতা খুলে যায়।

[০৪ নম্বর কবিতা]

এসব কবিতায় পেয়ে যাই জীবন ও প্রকৃতির এক সোজাসাপটা দর্শন। কবিতাগুলোতে মুখ্য হয়ে ওঠে প্রকৃতির অপার্থিব উপাদানের সমাহার, আর তার মধ্যে জীবনের লুটোপুটি খেলা। গভীর মমতায় বলে ফেলা যায়, ‘আয় তোকে শান্ত স্নান দেব/আমরা যমজ গর্ভ, একসঙ্গে আয় ভেসে যাই।’ এক স্নেহময় উচ্চারণ। ভ্রমণকাহিনি সিরিজের প্রায় প্রতিটি কবিতায় প্রকৃতির অবস্থানের সাথে জীবনের অবিরাম স্রোত খেলা করে। কবির সঙ্গে নির্দিষ্ট হয়ে যায় কোথাও কোথাও প্রকৃতির অবস্থানগত রহস্যময়তা ও ব্যাপ্তি। জীবন ও প্রকৃতির মাঝখানের সম্পর্কের এক নতুন প্রতিষ্ঠা পাঠকদেরও মানসিক প্রতিক্রিয়া ঘটায়। ‘উনত্রিশে এপ্রিলের ভয়ঙ্কর খাতা’ পাঠকের শারীরিক প্রতিক্রিয়াও ঘটায়। অন্ধকার নেমে আসে চরাচরে। ভয়ার্ত হয়ে উঠি। অন্ধকারের স্মৃতি হানা দেয় মনের গভীরে:

আবার যখন পড়ি ‘এইভাবে আসে ভোর, পুরানো পথের রেখা ফোটে
ছায়াবৃক্ষ,পাতা, কুঁড়ি, বেঁটে টিলা, ক্ষুধার শাসন
আকাশ ছাদের নিচে অবিচ্ছিন্ন ব্যাকুল জীবিকা
আঁকে এক বৃত্তরেখা―তাতে সুখী অন্ধ শ্রমজীবী।


‘বিপরীত দৃশ্যে তবু নান্দনিক ঝুড়ি ভরে ওঠে
কামিনী সবুজ বন্ধু-চোখে জাগে অনন্য পৃথিবী।

[০৫ নম্বর কবিতা]

পৃথিবী আদিম ও প্রাচীন। সমস্ত নদী-পাহাড় ডিঙিয়ে বিশাল আকাশের নিচে মানুষের সম্পর্কের প্রতিষ্ঠা। শ্রম-শোক-ভালবাসা মিলে অনেক বেশি তরঙ্গময় মানুষের জীবনধারা। কবিতাগুলোর স্বচ্ছ শরীর থেকে প্রকাশিত হতে থাকে জীবনদর্শনের ব্যাপ্তি ও গভীরতা। কবিতায় দার্শনিক সত্যগুলো প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ―সরলতায়, ইঙ্গিতে, ব্যঞ্জনায়। সাধারণ কোনো পারিপার্শ্বিক দৃশ্যও অনুভূতির দরজাগুলোকে খুলে দেয়। সামান্য দৃশ্যের মধ্যেই ডুবে থাকে চেতনার ভরকেন্দ্র। কবি উইলিয়াম ব্লেকের কথার সঙ্গে মিল খুঁজে পাই: `The world is a world of imagination and vision… …But to the eyes of the man of imagination, the nature is imagination itself. As a man is, so he sees. As the Eye is formed, such are its powers..’ দৃশ্যের ভিতরে, কবিতার ভাষা ও শব্দের নির্মাণে এক দার্শনিক ক্রমশই যেন জীবনের দিকে ঝুঁকে দেখেছেন। কবিতাগুলোতে ছড়াতে দেখি জীবনের ভাইব্রেশান।

ভ্রমণকাহিনি সিরিজের পনেরো নম্বর কবিতাটি একটু অন্যরকম, অসাধারণ দ্যোতনাময়, এবং ভাললাগার: ‘পেঙ্গুইন বন্ধু পাখি, সে নিয়েছে বরফ আকার/ চোখে ভাসে শুভ্র ডানা, ভাস্কর্যের সূক্ষ্ম কারুকাজ / কিন্তু হে কোরীয় শিল্পী, মৃত্যুদৃশ্যে ডেকেছ পাখিকে / কী নাম দিয়েছ তার―উষ্ণতার শুদ্ধ শিল্পকলা?’ কবিতাটির শেষ স্তবকে এসে, ‘কিয়োটো প্রাচীন গর্ব, সভ্যতার মহিমা স্মারক/আসন্ন ধ্বংসের বার্তা পাখি তাকে জানান দিয়েছে/ পার্টি ফূর্তি, যুক্তিতর্ক, এই ফাঁকে সবাই জেনেছে / সম্মেলন ব্যর্থ হলে প্রাণ-হত্যা ত্বরান্বিত হবে।’ কবিতাটির সমাপ্তিতে একটা শ্বাসরোধী সিদ্ধান্ত সময়ের চূড়ান্ত অবক্ষয়কে প্রকাশ করে। কল্যাণ ও সুন্দরের মেলবন্ধন হারিয়ে জগৎ এক উগ্রমাত্রায় প্রকাশিত। আলো থেকে শুরু করে অন্ধকারে প্রস্থান। সমস্ত সভ্যতাই আজ ঢুকে পড়েছে ঘাতকপরিধিতে। সময়ের ভুলভুলাইয়ার মধ্যে, সভ্যতার অত্যাচার ও মৃত্যুর কেন্দ্রে একইসঙ্গে যেন দাঁড়িয়ে আছে কবিতাটি।

পড়তে পড়তে আরও কিছু চমৎকার পংক্তির হদিশ পেয়ে গেলাম। আমার পাঠকসত্তার প্রত্যাশাও বেড়ে গেল। কবিতাগুলোকে পাই নৈর্ব্যক্তিক প্রশান্তি। Originality in literature lies in the capacity to absorb the universal in all literatures and arts and give it a unique expression. ―‘এ জন্মের পথ ভয়, জন্মে জন্মে কবি সিসিফাস/পাথর সরিয়ে তাকে পেতে হবে ভোরের আকাশ।’ অথবা ‘বিতর্ক করি না প্রভু, শুধু চাই পথের উত্তর/ নির্বাণেই মহামুক্তি ―না কি আরো পথ আছে বাকি?’। নানান ভাবেই মুক্তি খোঁজা যায়। মুক্তির কাছাকাছি যাবার পথে মানবিকতা, নৈতিকতা, এই প্রশ্নগুলোও আসে। এই কবিতাগুলোতে মহত্ত্ব ও শুভশক্তিকে একসঙ্গে দেখতে পাই। মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সাথে পাওয়া যায় জীবন মৃত্যুর সারসত্য। কবিতাগুলো প্রকৃতির কাছ থেকে বয়ে আনে প্রেমের বাণী। কবি কামাল চৌধুরীর ভ্রমণকাহিনি সিরিজের কবিতাগুলো পড়তে গিয়ে পাঠক হিসেবে আমারও ঘটে যায় এক মানসভ্রমণ। আরও বেশি উৎসুক হয়ে স্নাত হতে থাকি বোধের ঝরনাধারায়।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com