রবিউল করিমের গল্প: মধুচক্র

রবিউল করিম | ২৭ জানুয়ারি ২০১৭ ৫:০৫ অপরাহ্ন

এই মধুচক্র কীভাবে, কোথায় শুরু হয়েছিল জানি না। কিছু দৃশ্য শুধু স্মৃতির কোঠরে লেপটে আছে। সেই লেপটে থাকা কুয়াশার পরতের তুলো একটু একটু করে সযতনে সরতে থাকলে আমি দেখি, শৈশবের মধু দৌড়াচ্ছে।
বাপ আমাকে আদর করে মধু পাগলা ডাকতেন। সেই নামের পেছনের ইতিহাসটা বড় গোলমেলে। কিন্তু আমি জানি, জন্মের পর আমার মুখে প্রথম মধুই তুলে দেয়া হয়েছিল। আর এ কথা আমাকে বলেছিল মা। মা তো মিথ্যে বলতে পারে না। যে শিশুটি পৃথিবীর প্রথম স্বাদ গ্রহণ করেছিল মধুর; সে যে ভাবিকালে মধু পাগলা হবে এতে আশ্চর্যের কী আছে?
modhu
মনে পড়ে, তখন ক্লাস টু কী থ্রিতে পড়ি। বাড়ি থেকে স্কুল প্রায় দু ক্রোশ দূরে। হেঁটেই যাই আসি। আমার সাথে যায় আমারই সহপাঠি গোল্লা, নারায়ণ, বাসেত, রমেশ, শুকবর। রমেশের বাড়ি আমাদের বাড়ির লাগোয়া। সে এসে ডাক দিলেই মা তড়িঘড়ি করে আমার চুলে তেল দিতে লাগতেন। আমি যতই বলি, হেছ তো, স্কুলত দেরি হয়্যা য্যাবিনি। ততই তিনি সরিষার তেল মাখানো আঙুল চুলের ভেতরে নিয়ে মালিশ করতে করতে ধমক দিয়ে বলতেন, থাম ছোড়া, চুলগুলার কি অবস্থা কর‌্যা রাখিছু! ইংক্যা করা স্কুলোত যায়। মাস্টার কি কবেনি? চুলেত ত্যাল দিলে মাথা ঠান্ডা থাকে। পড়াত তো আর মন নাই, খালি ছটফট। তারপর চিকন দাঁতের চিরুনি দিয়ে থুতনিটা শক্ত করে ধরে চুল আঁচড়িয়ে দিতেন। ততক্ষণে রমেশ বার কয়েক ডেকে বাইরে অস্থির। নিত্যদিন এইসব হ্যাপা সামলিয়ে যখন পড়ার বইগুলো বুকে চেপে ধরে দৌড় দিতাম; তখনো মা চেঁচিয়ে বলতেন, দেখিছু দেখিছু, এই ছোড়া পড়্যা যাবু তো। কিন্তু কোনোদিনই পড়ে যাওয়ার বিপত্তি না ঘটিয়ে দু বন্ধু ছুটে যেতাম স্কুলে। পথে সঙ্গি হতো ওরা চার জন। এই ছয়জন মিলে সেই দু ক্রোশ পথ পাড়ি দেয়া ছিল এক রোমাঞ্চকর ভ্রমণ। কখনো বাসেতদের শবরিগাছে ঢেলা দিয়ে শবরি খাওয়া, কখনো গাবলের গাছে চড়ে ঘুঘুর ডিম পেড়ে আনা, কত কী। হরিশপুরের শেষ মাথা থেকে আতাইকুলার রাধারমন প্রাইমেরি স্কুল পর্যন্ত পথে পথে ছড়িয়ে থাকত আমাদের দুষ্টামি।

স্কুল শুরু হতো সকাল ১০ টায়। তখন তো আর এত ঘড়ির চল ছিল না। সময় চলত আন্দাজে। পথে দুষ্টামির মাত্রাটা ভারি হলে প্রথম ঘণ্টাটা ছুটে যেত। বাসেত স্যার প্রথম ঘণ্টায় বাংলা পড়াতেন। ইয়া লম্বা মানুষ। পাঞ্জাবি আর লুঙি পরতেন। দেখলেই ভয় ভয় করত। কিন্তু মনটা ছিল বড় নরম। একটা ধমক দিলেই আমরা ভ্যা করে কেঁদে ফেলতাম। তখন তিনি হাত বুলিয়ে দিতেন মাথায় । বলতেন, কান্দছু ক্যান? ইংকা করা কি পড়া হয়? পড়া হলো তোর সাধনার ব্যাপার। তোরকেক দিয়া হাল বয়া ছাড়া কোন কাম হোবে না, বুঝিছু। যা হাল বগা।
আমার মধু চক্রটা বাসেত স্যারের কল্যাণেই ফুল ফুটেছিল। তিনি একদিন ক্লাসে ‘মৌমাছি মৌমাছি কোথা যাও নাচি নাচি’ কবিতা পড়াতে গিয়ে হঠাৎ করে আমাকে ক্লাসে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বললেন,
এই মধু ক তো মৌমাছি কি করে?
মৌমাছি কি করে তার হামি কি জানি? বলতেই সারা ক্লাস হো হো করে হেসে ওঠে। বাসেত স্যার গম্ভীর গলায় বলেন, এই তোর নাম মধু কে রাখিছে রে? গাধা কুনটিক্যা। মৌমাছি দেখিস নি।
হ দেখিছি।
কোনটি দেখিছু?
ক্যান, সরস্যা ক্ষেতত।
সরস্যা ক্ষেতত ওরা যায়া কি করে তা দিখিস নি? গাধা। সরস্যার ফুলত থ্যাকা ওরা মধু লিয়া যায়। বুঝিছু। সেই মধু লিয়া মৌচাকত জমা করে। হামরা সেই চাক ক্যাটাই মধু লিয়া আসি। এবার বুঝিছু। চোক, কান খুলা রাখা লাগে। তালে আর পড়া লাগে না।
ক্লাস শেষে বাসেত স্যার চলে গেলে সবাই ক্ষ্যাপাতে শুরু করে, মধু, হি হি। শুধু ঐ মধু ডাকটিই তখন আমার কাছে অসহ্য বোধ হতে থাকে। দুনিয়ায় এত নাম থাকতে কেন যে আমার নাম মধু হতে গেল? অথচ বাপের সাথে সরিষা ক্ষেতে কাজ করার সময় কত মৌমাছি দেখেছি। তাদের ফুলে ফুলে বসা দেখেছি। কখনোই আলাদা করে প্রশ্ন জাগেনি। কত কিছুই না ফুলে বসে, ফড়িং, প্রজাপতি, পাখি। তারাও কি ফুল থেকে মধু নেয়? এই প্রশ্নটা তখন বড় ভারি হয়ে ওঠে। স্কুল থেকে ফিরেই বাপকে জিজ্ঞাস করি, ক্যা আব্বা, সরস্যার ক্ষেতত থ্যাকা কি ফঙিং মধু ল্যায়? বাপ আমার হো হো হেসে ওঠে। মাকে ডেকে বলে, শুনিছু তোর ব্যাটা কি কয়? মা উঠানে গবরের ঘুটা বানাতে বানাতে বলে, কি কয়? বাপ বলে, তোর ছোল কয়, ফঙিং সরস্যার ক্ষেতত থ্যাকা কি মধু লিয়া যায়? ক এর উত্তর কি দিমু? বলেই আবার হাসতে শুরু করে। আমার ভীষণ রাগ হয়। স্কুলের সেই অপমান ভাতের বলকের মতো উথলে উঠতে চায় বাবার হাসিতে।
মাটিতে সজোরে দু পা দাফাতে দাফাতে আমি মায়ের কোলে গিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে বলি, মা থামবার কও।
মাও কপট রাগ দেখিয়ে বলে, আহ থামেন তো? সোনা হামার এডা কথা জিগাছে, এ্যাত হাসির কি আছে?
বাবা হাসতে হাসতে বলে, আরে পাগলা এদিকিন আয়।
আমি মাকে আরো জোরে লেপটে থাকি। মা’ই বলে, নারে বাপ মৌমাছি ছাড়া আর কেউ মধু লিবার পারে না ফুলত থ্যাকা। ও বিদ্যা আর কারো জানা নাই। আমার ভারি আশ্চর্য লাগে। সারা জগতে একমাত্র মৌমাছিই কেন পারবে ফুল থেকে মধু নিতে, আর কেউ কেন পারবে না? কিন্তু কে দিতে পারে এর উত্তর। বাসেত স্যার কি জানে? কিন্তু তাকে দেখলেই তো ভয় করে। বুঝি, এ প্রশ্নের উত্তর আমাকেই খুজেঁ বের করতে হবে।
সেদিন থেকেই মৌমাছির পিছনে ছোটা। মাঘের শীতে কুয়াশায় ভারি হয়ে থাকত সরিষা ফুল, গাছ। তখন বেশ বেলা করে আমরা ছেলেপুলের দল সরিষা ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে দৌড়ে বেড়াতাম। কার গা কতখানি হলুদ হয়ে উঠল এই ছিল আমাদের খেলা। হলদে পরাগ মাখামাখি করে যখন বাড়ি ফিরতাম তখন মা বকুনি দিত। এই ছোড়া কতদিন কছি, সরস্যার মধ্যে দৌড়াবু না। যখন মৌমাছি কামড় দিবে তখন বুঝবু নি।
একদিন সত্যি সত্যি মৌমাছি আমাকে কামড়ে দিল। আমরা সাধারণত যে জমিতে মৌমাছি ঝাক বেঁধে ওড়াওড়ি করে; সেই জমি বাদ দিয়ে খেলতাম। কিন্তু সেদিন অসর্তক হয়ে ঢুকে পড়লাম তাদের ভেতরে। কানের পাশে ভোঁ করে উঠতেই দেখি ঘাড়ে যন্ত্র্রণা। একটা চিৎকার দিয়ে পালাতে গিয়ে বুঝলাম আরো কয়েকটা জায়গা জ্বলছে। সেই দৌড়ের মাঝেই কখন যে প্যান্টের ফাঁক দিয়ে মৌমাছি ঢুকে বসেছিল টের পাই নি। দৌড়ে বাড়িতে এসে, ওমা তুই কুন্টি গেলু। এমন বেদনার্ত ডাকে মা রান্না ফেলে দৌড়ে আসে।
কি হছে বাপ? ও বাপ তুই ইংকা করছু ক্যা?
মারে জ্বলে গেল, মা। বলে আমি দাফাতে থাকি। আর তখনি প্যান্টের ফাকেঁ লুকিয়ে থাকা মৌমাছি হুল ফুটিয়ে দেয় আমার হোলে। একটা গগনভেদি চিৎকার করে আমি হোল চেপে ধরে মাটিতে গড়াগড়ি দিতে থাকি। মা হ্যাচকা টানে আমার প্যান্ট খুলতেই দুটি মৌমাছি বোঁ করে উড়াল দেয়। হারামজাদা ছোড়া, কতদিন কছি সরস্যা ক্ষেতত যাস না। হচে, এবার হছে। ক্যাংকা মজা বোঝ। আমার চোখ গড়িয়ে অঝোর ধারায় পানি গড়াতে থাকে। আমি শুধু চিৎকার করে বলতে থাকি, মা তুই কিছু করছু না ক্যা? হামি আর করমু না মা। মারে, মা।
মা ঘর থেকে চুনের বাটিটা নিয়ে এসে ন্যাংটা আমার সারা শরীর খুঁজতে থাকে, কোথায় কোথায় মৌমাছি তার হুল ফুটিয়েছে। তারপর নখ দিয়ে চিমটি কেটে কেটে হুল সরায়, চুন লাগিয়ে দেয়। ততক্ষণে ঘাড়, মুখ, বুকের কয়েকটি জায়গা আর হোল ফুলতে শুরু করেছে। মা উঠানে পাটিতে শুইয়ে দিয়ে বলে, চুলকাবু না। চুন ল্যাগা দিছি। ভালো হ্যা য্যাবে নি। আর যদি কুনুদিন ঐ ক্ষেতত য্যাস তালে হামিই তোক মৌমাছির চাকত ছ্যাড়া দিয়া আসমুনি। শয়তান একটা। ক্যারে পাড়শুনা করবু। তা লয়। খালি টো টো। তোর বাপ আসুক আজকা। হয় পড়বু নালে ক্ষেতত যাবু। মিনস্যাটা সারাদিন একলা কাম করে, ক্যা রে অ্যানা জোগালি দিলেও তো বাঁচে। বক বক করে আর চুলায় জ্বাল ঠেলে। আর আমি শুধু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি, শালার মৌমাছি। থাম ভালো হয়্যা উঠি, তারপর দেখামুনি ক্যাঙকা মজা। সারাটাদিন হুল ফোটানো জায়গাগুলো ব্যথায় টনটন করে আর চুলকায়। হোল ফুলে আস্ত একটা মানিক কলার মতন। খালি চুলকায়। চুলকালে আরাম লাগে। কিন্তু চুলকাতে হোল খাড়া হয়া যায়। লজ্জায় সেটাও করা যায় না। মা মুচকি হাসতে হাসতে বাপের একটা লুঙি দিয়ে বলে, হছে পর। ডাঙর হওয়ার শখ কত!
রাতে বিছনায় শুয়ে কিছুতেই ঘুম আসে না। আক্রান্ত জায়গাগুলো চুলকায়, বেশি চুলকায় হোল। বাপের ভয়ে সেটাও করতে পারি না। দাতেঁ দাঁত চেপে পড়ে থাকি। ওদিকে পাশের চৌকিতে বাপ-মায়ের ফিসির ফিসির। অস্ফুট স্বর কানে ভেসে আসে। বাপ বলে, তোর ছোল তো বড় হয়্যা গেছে। মা বলে, হু।
হু ক্যান, দেখিছু না। মা ধমক দিয়ে বলে, চুপ করিন তো, ছোল কিন্তু জ্যাগা আছে। বাপ বলে, হ, কছে তোক। শোন, এডা মজার কথা কই, ধলুক চিনিস না। আরে মধ্যপাড়ার। বিয়া করল না আরেকডা।
মা বলে, হয় চিনিছি তো।
সেই ধলু হারামজাদা কি করে জানিস! লিত্যি মৌমাছির হুল হোলত ফুটায়।
ওমা ক্যান?
বুঝলু না। হোল মোটা হয়, আর চুলকায়। কাম করার সুময় আরাম লাগে।
হ আপনাক কছে। কিসব আজগুবি কথা।
আরে সত্যি কনু।
আমার কান গরম হয়ে ওঠে। আর কিছু শুনতে চাই না। বালিশে কান গুজেঁ জোর করে ঘুমাতে চেষ্টা করি। পরদিন সকালে রমেশ, রফিক আসে। ‘ক্যারে কাংকা আছু? হোল বুলে ফুলা গেছে। দেখ্যা না ভাড়ি।’ ওদের কাকুতিমিনতিতে একটু জংলা মত জায়গায় গিয়ে লুঙি উঁচু করে দেখালে সবাই হাসিতে ফেটে পড়ে। আমি তখন তাদের গতরাতের কথা বলি, ধলু চাচার হোল মোটা করার গল্প। তারা বিশ্বাস করতে চায় না। তবুও যুক্তির বেড়াজালে মেনে নেয়, হতেও পারে, নাহলে তিনডা বিয়া কেমন করে? তারপর থেকে সরিষা ক্ষেতে আমরা ধলু চাচাকে দেখলেই লুকিয়ে চেঁচাতাম, ক্যা চাচা হোল মোটা করছিন? সেকথা শুনে ধলু চাচা কাজ ফেলে আমাদের পেছনে ছুটত। শালার শয়তানের গুষ্টি। একটাক ধরবার পারলে বুঝামুনি। কিন্তু আামাদের ধরতে তো শয়তানের ডানা লাগবে। যাই হোক, মৌমাছির কামড় খেয়ে আমার মৌমাছিবিদ্যা শুরু।
মনে আছে, কচু পাতা দু হাতের তালুতে নিয়ে প্রথম আমার মৌমাছি শিকার। ডোরাকাটা হলুদ আর কালো গা। পাছায় হুল। দুষ্টামি করে কলার ছোতর ধরতাম পাছার কাছে। ছোতরের ভেতরে হুল ফুটিয়ে দিত। সবচেয়ে আশ্চর্য করা ব্যাপার ছিল যে, শরীর থেকে আলগা হয়েও হুলগুলো জীবন্ত থাকত। প্রথম যেদিন মৌচাক দেখিছিলাম, সেদিনের কথা আজো ভাবলে শরীরের ভেতরে শিহরিত জাগে। মৌমাছির কয় পা, কয় ডানা কেমন করে ফুল থেকে মধু নেয় এসব জানা হয়ে গেলে পর একদিন তাদের সাথে ছুটি। দৌড়, দৌড়। তারপর হঠাৎ নিজেকে দেখি কছিমুদ্দিন চাচার বাগানে। একটা কাঁঠাল গাছের ডালে মস্ত চাক। কালো একটা জীবন্ত পিন্ড ঝুলে আছে ডালে। শত শত মৌমাছি। একদল আসে, আরেকদল উড়াল দেয়। সম্মোহিত হয়ে দেখি, আর ভাবি, যে করেই হোক এই চাক থেকে মধু পেড়ে আনার বিদ্যাটা আমার জানা জরুরি।
প্রতিদিন একবার করে সকলের অগোচরে বাগানে ঢু দেই। এরি মধ্যে একদিন ধরা পড়া যাই কছিমুদ্দিন চাচার কাছে।
ক্যা বা মধু, এটি ইংক্যা করা বসা থ্যাকা কি দেখছু?
কিছু লয় চাচা।
মিছা কতা কবু না। সত্যি কোরা ক, কি দেখছু। চুরির মতলব করছু নাকি?
চুরি করার কথা শুনে ভাবি, সত্যি কথাটা না বললে যদি আমাকে চোর মনে করে পিটন দেয়। সেই ভেবে বলি, চাচা চাক দেখি।
চাক! চাকত দেখার কি আছে? যখন কাটবে নি তখন দেখিস। এটা কাটবে জেনে আমার চোখ চকচক করে ওঠে।
কোদ্দিন কাটবে চাচা?
তা হামি ক্যাংকা কর‌্যা কমু। মুন্সি দেখ্যা গেছে। কছে কদিন পরই নাকি কাটা যাবে?
আমি অনুনয়বিনয় করি, ও চাচা, চাক কাটার সুময় হামাক এ্যানা খবর দিবিন। হামি কুনদিন চাক কাটা দেখিনি। ক্যাংকা করা মধু হয় দেখিনি।
কছিমুদ্দিন চাচা আমার আব্দার শুনে হাসতে শুরু করে, বুঝিছি, বুঝিছি, আর কওয়া লাগবে না। সাথে কি আর তোক মধু পাগলা কয়। খবর দিমুনি যা।
তারপর থেকে প্রতীক্ষার দিন গোনা। অবশেষে একদিন দুপুর বেলা বাপ ভাত খেতে খেতে সংবাদ দিলো, তোক কছিমুদ্দিন য্যাবার কছে। আমার তো সে খবর শুনে গলা দিয়ে ভাত নামতে চায় না। কোনোরকম ঢোক গিলে বলি, কখন?
এই বিক্যাল বেলা।
মা বলে, ক্যান কছিমুদ্দিন ওক ডাকোছে ক্যান?
বাপ বলে, তোর ছোলকই জিগা? চাক কাটা দেখবে বুলে। এমনি কি আর ডাকি মধু পাগলা।
মা সেকথা শুনে হাসে। বলে, সাবধানে থাকিস। দূরেত থাকবু ক্যান। নালে আবার কামড় খাবুনি।
বিকেল হতে হতেই আমি বাগানে হাজির। ঘুর ঘুর করি। কেউ আসে না। সন্ধ্যার আগে আগে কছিমুদ্দিন চাচার সাথে দাড়িঅলা একজন একটা বালতি আর খড়ের আঁটি নিয়ে হাজির। বুঝি এটাই মুন্সি। সাথে আরো জনা পাচেঁক। আমি তন্ত্রমুগ্ধ হয়ে মুন্সি চাচার কাজকর্ম দেখতে থাকি। প্রথমে সে এক বাটি পানিতে কি যেন বিড়বিড় করে আওড়িয়ে ফুঁ দেয়। তারপর বালতির মধ্যে থাকা হ্যাসাটা বের করে কোমরে গোজেঁ। একহাতে একটা মই নিয়ে গাছের দিকে এগিয়ে যায়। গাছের কাছাকাছি পৌছেঁ, গামছা দিয়ে মুখটা ঢাকে। মইটা গাছের সাথে লাগিয়ে দিয়ে খড়ের আটিতেঁ আগুন ধরায়। আমার তখন মনে হয়, এ তো ডাকাত! তারপর মন্ত্রপুত পানি দিয়ে আগুনের শিখা নিভিয়ে দিলে চারিদিকে ধোঁয়ায় ভরে ওঠে। মই বেয়ে তরতর করে সে উঠতে থাকে। ধোঁয়ায় কিছুই ভালোভাবে দেখা যায় না। মৌমাছিরা সেই ধোঁয়ায় দিকবিদিক ছুটে পালায়। কিছু পট পট করে পেট ফেটে মরে। আমি মাথা নিচু করে বসে পড়ি। কিছুক্ষণ পর বীর দর্পে মুন্সিচাচা আস্ত চাকটা হাতে করে নেমে আসে। কছিমুদ্দিন চাচা আমাকে বলে, মধু চ, বাড়ির মধ্যে চ। উঠানে আমরা গোল হয়ে বালতিতে রাখা চাকটাকে ঘিরে ধরি। লন্ঠনের আলোতে দেখি, কিছু মৌমাছি তখনো আধোমরা হয়ে চাকের গায়ে লেপটে আছে। মুন্সি আস্তে আস্তে করে সেগুলোকে বাছে। তারপর চাকের এক টুকরো কেটে আমাদের সবাইকে বলে, হাত পাতো বা। মধু মাশাল্লা এক্কেরে যা হছে না, সোনার লাকান। আমরা হাত বাড়িয়ে দেই। তরল সোনার কিছু অংশ ডান তালুতে এলে একটু গরম গরম লাগে। জিহ্বা ঠেকিয়ে তালুটা চেটেপুটে খাই। আহ্, কী মধুর মধু। বাঘ যেরকম নাকি মানুষের মাংসের স্বাদ একবার পেলে আর কোনো মাংস তার মুখে রোচে না। আমারও হলো ঠিক সেই দশা। মধু, মধু আর মধু। সারাক্ষণই মৌমাছি আর মধুর চিন্তা। কেমন করে বিন্দু বিন্দু ফুলের নির্যাস মিলে এক এক ফোঁটা করে মধু হয়ে ওঠে আর ভরে ওঠে চাক। যোগাযোগ বাড়তে থাকে মুন্সির সাথে। সুযোগ পেলেই তার সাথে চাক কাটতে চলে যাই এদিক সেদিক। মুন্সি আমাকে শেখাতে থাকে মধুবিদ্যা। মধু দিয়ে কতরকম রোগব্যাধি সারানো যায়। কিভাবে সারানো যায়।
দিনের পালাবদলে আমি একদিন মধুকবিরাজ হয়ে উঠি। আশেপাশের সাত গায়ের মানুষ আমার কাছে চিকিৎসা নিতে আসে। আমি মধুর সাথে কখনো আদা, কখনো কালোজিরা, কখনো পুদিনা, অশোক, তুলসি, ডুমুর মিশিয়ে নানান রোগের চিকিৎসা দিতে থাকি। মুন্সির থেকেও মৌমাছিবিদ্যা আমি আরো ভালোভাবে রপ্ত করতে পেরেছিলাম। জানতাম, রানি মৌমাছিই হলো আসল। চাইলেই যেখানে সেখানে আমি চাক তৈরি করতে পারতাম। এমন কি আমার হাতেও। মৌচাক থেকে আমি সংগ্রহ করে রেখেছিলাম এমন একটা জিনিস যা তাদেরকে করেছিল আমার পদানত। আমি ডাকলেই মৌমাছিরা উড়ে এসে আমার গায়ে বসত। মানুষ আমার এই বিদ্যা দেখে অবাক হয়ে যেত। মৌমাছির সাথে আমার একরম সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। আমার কখনো কখনো মনে হতো, ওদের ভাষা আমি বুঝতে পারি।
আমার মৃত্যুর আগে ওরা এসেছিল। আমার সারা গা ভরে গিয়েছিল হাজার হাজার মৌমাছিতে। গ্রামের মানুষ এমন অলৌকিক ঘটনা দেখেনি কোনোদিন। হাজার হাজার মৌমাছির সেই মিলিত গুঞ্জন আর মৃদু পাখার আন্দোলন আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল স্বর্গীয়লোকে। মৃত্যুমুহূর্তে আমি ভাসছিলাম আনন্দে, শিহরণে।

আমাকে যে কবরে শায়িত করা হয়েছিল, সেখানে আমারই শরীরের নির্যাসে একটা আতাগাছ ডালপালা মেলে; আমাকে ছায়া দেয়। আতাগাছে ফুল ফুটেছে। আজ সেখানে উড়ে এসে বসেছে একটা রানি আর শত শত মৌমাছি। আমার শরীরের নির্যাস মধু হবে। তখন মৃত্যুহীন এই আমি ছড়িয়ে পড়ব। এই মধুচক্র চলবে অনন্তকাল।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com