দুই বাগানের ফুল

ওমর শামস | ১২ জানুয়ারি ২০১৭ ১১:১৭ পূর্বাহ্ন


১. ভূমিকা

:
border=0অক্তাবিও পাজ, মেক্সিকোর কবি-নৃতাত্ত্বিক-ডিপ্লোম্যাট, ১৯৫১ সনে এক সরকারি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সফরে ভারতে গিয়েছিলেন। শুধু ছ-মাস ছিলেন। ১৯৬২ তে তিনি মেক্সিকোর রাষ্ট্রদূত হয়ে আবার দিল্লী পৌঁছান। এবার ছ-বছর অবস্থান করেছিলেন, শুধু ভারতের নয় আফগানিস্তান,পাকিস্থান, সিংহলের রাষ্ট্রদূত হিশাবেও। তিনি সারা ভারতবর্ষ, আফগানিস্তান প্রভূত ঘুরেছিলেন, বিশেষ করে ঐতিহাসিক নিদর্শন, ভারতীয় ইতিহাস-সংস্কৃতি, হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্ম পড়েছিলেন। এসব নিয়ে স্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছিলেন। অবশেষে বই লিখছিলেন : Conjunctions and Disjunctions, The Monkey Grammarian, In Light of India।Alternating Currents বইতেও বৌদ্ধচিন্তা নিয়ে প্রবন্ধ আছে। A Tale of Two Gardens, তাঁর ভারতবর্ষে থাকাকালীন রচিত কবিতার সংগ্রহ। “দুই বাগানের গল্প” গ্রন্থের কবিতাগুলোর নাম : মথুরা, আমীর খুসরো-র সমাধি, হুমায়ুন-এর সমাধি, লোদি উদ্যান, উদয়পুরে একদিন, মাইসোর-এর রাস্তায়, উটকামুন্ড, মাদুরাই, কোচিন, হিরাটে সুখ, থাঙ্গিগারু গিরিপথ, বৃন্দাবন, শূন্যতা, মৈথুন, এলিফান্টার দ্বীপে রবিবার । বৌদ্ধ, হিন্দু দর্শন সংক্রান্ত বিষয় অথবা ভূগোল, ঐতিহাসিক স্থান, ঘটনার মধ্যে দিয়ে ভারতবর্ষীয় চিন্তাকে বোঝা ও প্রকাশ করা। তিনি আমীর খুসরোকে, সূফিবাদ, তাঁর কবিতা এবং নিজামুদ্দীন আউলিয়া-র সঙ্গে সম্পর্ককে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। আমীর খুসরো (১২৫৩-১৩২৫) ভারতে জন্মগ্রহণ করা তুর্কি বংশীয় পণ্ডিত, সূফি, ঐতিহাসিক, কবি এবং রাজসভাসদ-মন্ত্রী ( আলাউদ্দীন খিলজী এবং অন্যন্য বাদশা-র)। দুই ভূগোলের, দুই যুগের দুই কবির কয়েকটি কবিতা অনুদিত হলো। দুজনের কবিতার মেজাজ, গঠন অবশ্যই আলাদা – তাঁরা দুই বাগানের ফুল।

২. অক্তাবিও পাজ (১৯১৪-১৯৯৮)

:

লোদি উদ্যান
কালো, করুণ, ঘন
সৌধর গম্বুজ,
সহসা পাখিদের সমুত্থান
একাগ্র সুনীলে।

ধম্মডুমুর
হাওয়া,
ফলচোরেরা
(বানর, বাদুড়, পাখি)
বীজ ছড়ায়
বৃহৎ বৃক্ষের ডাল থেকে।
সবুজ গুঞ্জরণশীল
তার অন্ত্র উদ্যত বাতাসে,
সে এক বিশাল উপচানো হাঁড়ি,
যেখানে সূর্য এসে পান করে।
খোলা,
শূন্যতায় তরু বাঁধে বাসা,
চক্রায় ভার্টিগো –
তারই মধ্যে লম্বায়, মাথা নাড়ে – বাড়ে।
বছরের পর বছর
গড়িয়ে পড়ে সরল রেখায়।
এ এক পতন
বিন্দু জলের ঝাঁপ –
থমকানো, সময়ে বরফ।

হাতড়ায় পথ পায়
ছোঁড়ে বিশাল শিকড় –
স্নায়ুজ ঊরু।

জড়িয়ে ওঠে বিস্তৃত শিকড়
ঘুরন্ত
জাপটায়,
সে এক
কাঁটাগুল্মের হাত –
মাটি খোঁজে না, খোঁজে দেহ
জড়িয়ে আলিঙ্গনে,
বন্দী ক’রে রাখে বৃক্ষ – আজীবন।
একশো বছর লাগে কাণ্ডের মরতে –
তার মুকুট
ধোয়া খুলি, ভাঙা হরিণের শিং।
পাতার চাদরের নীচে
মর্মর, গান –
গোলাপি, সোনালি, সবুজ,
জটায় জঙ্গমে –
ডুমুরবৃক্ষ লতায়, গজায়
এবং নিজেকেই গলা চেপে ধরে।

ব্যালকনি (অংশ)

প্রাচীন দিল্লি, দুর্গন্ধ দিল্লি
গলি ছোট-ছোট চৌমাথা আর মস্‌জিদ
কোপানো দেহের মতো
ভূগর্ভস্থ বাগানের মতো
ধুলোবৃষ্টি শতাব্দীর পর শতাব্দী
ধুলোমেঘ তোমার নেকাব
তোমার বালিশ ডুমুর পাতার ওপর
এক খণ্ড ইট
ভগবানের উচ্ছিষ্ট তোমার আহার
মন্দির অচিকিৎস্যদের গণিকালয়
পিঁপড়েয় আবৃত তুমি
পরিত্যক্ত ভুঁই
বিধ্বস্থ সমাধি
একটা অপচয়িত মড়ার মতো ন্যাংটা
ওরা লুটেছে তোমার অলংকার আর তোমার কাফন
শায়েরিতে আবৃত হলে তুমি
তোমার সারা দেহই ক্যালিগ্রাফি
মনে পড়ে
মনে পড়ে শব্দগুলো
তুমি অপরূপা
তুমি জানো কি ক’রে কথা বলতে হয়, গাইতে হয়, নাচতে হয়।

আমীর খুসরো-র সমাধি

পাখি-সমাচ্ছন্ন গাছ
অপরাহ্ন হাতে তুলে ধ’রে রাখে।
খিলান আর চবুতরা
চৌবাচ্চা পানিভরা, লাল দেয়ালের মধ্যে,
বিষ-সবুজ
একটা করিডর গিয়েছে বেদীতে –
ভিখারি, কুষ্ঠ, ফুল, মর্মর।

দুটি নাম, তাদের কাহিনী, সৌধ –
নিজামুদ্দীন – ব্রজক দরবেশ ।
আমীর খুসরো – তোতার বচন –
সন্ত আর কবি। আনভোলা এক তারা
গম্বুজে জেগে ওঠে,
চৌবাচ্চার শ্যাওলায় চমক।
টিয়া অথবা ময়না, আমীর খুসরো,
প্রতিটি মুহূর্তের দ্বিত্ব –
ঘোলাটে দুঃখ ও আলোর আওয়াজ।
ঘুরন্ত আগুন, স্বরবর্ণ, উদাস স্থাপত্য –
প্রতিটি কবিতাই কাল, যা জ্বলে আর পোড়ে।

৩. আমীর খুসরো (১২৫৩-১৩২৫)

:
Amir
রুবাই
আমাদের এই নৌকা পরে নাইবা যদি কাণ্ডারি,
মধ্যে আছেন আল্লা তবে সমুদ্র কি দরকারি ?
মূর্তি-পূজক খুসরো বটে, বলছে ভূঁয়ের মানুষরা।
করে, করুক – পৃথিবী আর মনুষ্য কি দরকারি ?

গজল্‌
আশিকবিলাস কাফির আমি, মুসলমানির কি দরকার ?
ত্যক্ত শিরাই তারের মতোন, পৈতা এখন কি দরকার ?
(আমার) বিছ্না ছেড়ে সর্রে ব’সে অজ্ঞ মহান কবিরাজ ,
আশিক সোজন দেখতে পেলেই সারবে প্রেমের সব বিমার।

গজল্‌
জফা কম্‌ কুন্‌ কে ফার্‌দা রোজ-এ-মাহ্‌শর
বা রূহে-আশেকান শরমিন্দা বাশী
যে কয়েদ-এ- দোজাহান আজাদ গাশ্‌তাম
আগর্‌ তু হম্‌নশিনী বান্দা বাশী।
বারিন্দি ও বাশোখী হম্‌ চো খুসরো
হাজারাঁ খানুমা বারগান্দা বাশী ।

প্রেমিক তোমার সবার সামনে দাঁড়িয়ে যখন রোজ-হাশর
প্রার্থনা ক’রো যদিবা শরম , ভরমে হ’য়ো না কঠোর মন ।
দুই জাহানের বন্ধন থেকে মুক্ত তখন হবো স্বাধীন
যদি তুমি হও প্রিয়সঙ্গিনী আমার সঙ্গে কিছুটা ক্ষণ ।
প্রগলভতায় ছলা ও কলায় পারদর্শিনী হে নন্দিনী ,
আমার মতন আশেক তোমার হাজার প্রেমিক ভেঙেছ মন।

নিজামুদ্দীন আউলিয়া-র সঙ্গে কথোপকথ

বললাম, “উজ্জ্বল কে চাঁদের মতোন”, বললো “আমার গাল”।
বললাম, “মিষ্টি কে চিনির মতোন”, বললো “আমার কথা” ।
বললাম, “প্রেমের মৃত্যু কি”, বললো “আমার বিচ্ছেদের যাতনা”।
বললাম, “ জিন্দেগীর এলাজ কি”, বললো “আমার দর্শন” ।
বললাম, “ হুরি আর পরি কি”, বললো “আমিই ওদের বাদশা ” ।
বললাম, “ খুসরো খুব নাজুক”, বললো “তাতে কি, সে আমার শিষ্য” ।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Shah Huq — জানুয়ারি ১৩, ২০১৭ @ ২:০৯ পূর্বাহ্ন

      What is the identity of the translator? It is a good piece of work. I encourage him to write more about Islamic poets who are well known among Bangladeshi. Thank you

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন poliar wahid — জানুয়ারি ১৩, ২০১৭ @ ১০:১০ অপরাহ্ন

      কবিতার অনুবাদ যে খাঁটি কবিতার মতো হতে পারে সেটা এই কবিতাগুলো পড়লে বুঝা যায়। মনে হয় যেন পাজের অনুবাদ নয়, একেবারে তাঁর কবিতাই পড়ছি। ধন্যবাদ ওমর ভাই। কতো মধুর আর মধুময় এই কবিতাগুলো। পড়ে আনন্দ পেলাম। কি ঝরঝরে মেদহীন বাসনার ডানা মেলে দিলো ক্লান্ত শরীরের খোলে। জানা হলো যেন ভারতীয় অখন্ড এক ইতিহাস! যদিও পাজ, ভিক্টর, নজরুল, পাউন্ড, জীবন, নাজিম, জিবরান, আচেবে আমার প্রিয় কবি। আর খুসরোর কবিতা, গজল, রুবাই তো মূল কবিতাকে যেন অতিক্রম করে গেল। মারহাবা ওমর ভাই। মারহাবা। জাহিদের কাছে আপনার যে গান-বাজনা-বাঁশি নিয়ে কবিতা শুনেছিলাম এখনো ভুলিনি। ধন্যবাদ আবার

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ওমর শামস — জানুয়ারি ১৫, ২০১৭ @ ৩:০৯ পূর্বাহ্ন

      ধন্যবাদ পলিয়ার। ভালো লেগে থাকলে পরিশ্রমের কিছু সার্থকতা হলো । Shah Huq-এর কথা কি বলবো। নামের মধ্যে “শাহ” আছে, কথাবার্তা বাদশাহ-র মতো ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com