২০১৬-এর ব্যক্তিগত পাঠ-পরিক্রমা

ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী | ১ জানুয়ারি ২০১৭ ৭:১১ অপরাহ্ন

প্রতি বছরই বেশ অনেক বই পড়া হলেও, একদম প্রথম পাতা থেকে শেষাবধি পড়া হয় খুব কমই। অনেক বই কেজো বই, শুধুমাত্র কাজের পাতাতেই তাদের পাঠ সীমাবদ্ধ থাকে। অনেক বই রেফারেন্স বই, শুধু কয়েকটি পাতার জন্যই কেনা হয়। কখন কাজে লাগে কেউ জানে না। এদের মধ্যে কোনো কোনোটি দারুণ স্বাদের। একদম মনপ্রাণ কেড়ে নেয়ার মত। গত বছর ২০১৬তেও এমনই পাঠ-পরিক্রমা থেকে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পাঠ-প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা যেতে পারে। যেহেতু আমি মূলত নন-ফিকশন পাঠক, কাজেই প্রবন্ধসাহিত্যেই মনোযোগ দিলাম।

border=0
‘এ বিউটিফুল কোয়েশ্চেন’, ফ্র্যাঙ্ক উইলচেক, ২০১৫।
অনেকদিন বাদে বিজ্ঞানের এতো ঢাউস একটা বই পড়ে শেষ করলাম। লেখক ফ্র্যাঙ্ক উইলচেক, নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী। বইটা পড়ে মনে হলো, সত্যিই নোবেল-জয়ীদের ধাতই আলাদা। কনসেপ্ট এতো সুন্দর এবং ততোধিক সুন্দর করে বোঝাতে পারেন, কিম্বা ধরা যাক নতুন একটি প্রপঞ্চকে কিম্বা পুরনো প্রপঞ্চকেই এমনভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন, যে মাথা ঘুরে যায়। পদার্থবিজ্ঞান, কিছুটা গণিতেরও, এক অনবদ্য ভাষ্য রচিত হয়েছে এই বইটিতে। বইটিতে মূলত একটি প্রশ্ন করা হয়েছে – জগত কি সুন্দর আইডিয়া ধারণ করে কিনা, অথবা এই বিশ্বজগৎ একটি শিল্পকর্ম কিনা? তারপর পিথাগোরাস এবং প্লেটোর ধারণা থেকে সূত্র ধরে বাস্তবতার ব্যাখ্যা, গণিতের অর্থ, প্লেটোনিক সলিডের ওপর বিস্তারিত আলোচনা, প্রকৃতিতে প্লেটোনিক সলিডের প্রাপ্যতা, ব্যবহারিক প্রয়োগ, নিউটনের তিনটি আবিষ্কার – তাঁর অ্যানালিসিস ও সিন্থেসিস, রঙের ধারণার বিস্তার, গতিশীলতার সূত্রধরতা, বিদ্যুত-চুম্বকত্বের বিস্তার ও ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ (ইএম থিওরি), রঙের পারসেপশনে ইএম থিওরির প্রয়োগ, সিমেট্রির আইডিয়া, গাণিতিক তত্ত্বে সিমেট্রির প্রয়োগ এবং উচ্চতর কণাপদার্থবিজ্ঞানে সেই সিমেট্রির প্রভাব, কোয়ার্ক-গ্লুয়ন স্যুপের ব্যাখ্যায় কোয়ান্টাম ক্রোমোডায়নামিকস, কোয়ান্টাম তত্ত্বের বিস্তার, কণার ওয়েভ-ফাংশনের বিস্তারে সিমেট্রির প্রয়োগ, তার ব্যাখ্যা, বাক্সবন্দী ইলেকট্রন আর টানাতারের কম্পনের অদ্ভুত মিল, এমি নয়থারের অবদান, সুপারসিমেট্রির ধারণা ইত্যাদি নিয়ে এক চরম দক্ষযজ্ঞ বাধিয়ে দিয়েছেন ফ্র্যাঙ্ক।রজার পেনরোজের “দ্য এম্পেররস নিউ মাইন্ড” গ্রন্থটির পর তুলনীয় এনসাইক্লোপিডিক গভীরতায় প্রাকৃতিক বিজ্ঞান নিয়ে বিশাল ক্যানভাসে লেখা হয়েছে বিরল। তাই ফিজিক্স এবং ন্যাচারাল সায়েন্সে যারাই আগ্রহী এই বইটি তাদের গভীর তৃষ্ণা মেটাবে। বইটিতে আছে ৫৩টি কালার প্লেট এবং আরও ৪০টি সাদাকালো ছবি, এক সমৃদ্ধ টেকনিকাল গ্লসারি যেটা বইয়ের মূল সরল ভাষ্যের গাণিতিক এবং বৈজ্ঞানিক পূর্ণতা দেয়।

শেষ পর্যন্ত প্রকৃতিতে আনন্দ এবং সৌন্দর্য খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানী। তবে একইসাথে স্বর্গোদ্যানে সাপের মত এখনও অসমাহিত সমস্যা আছে। এমনও হয়েছে, অসাধারণ সৌন্দর্য থাকা সত্বেও প্রাকৃতিক নিয়মাবলি সেই সূত্র মানেনি, কিন্তু আরও গভীরে রয়ে গেছে আরও সুন্দর কোনো তত্ত্ব। যেমন কেপলারের গ্রহগতির বৃত্তীয় সমাধান কিম্বা প্লেটোর সলিড দিয়ে জগৎ ব্যাখ্যা করা যায়নি। কিন্তু তার বদলে পেয়েছি কোয়ান্টাম ক্রোমো-ডায়নামিকসের অষ্টমাত্রিক সৌন্দর্য, যে সৌন্দর্য ১০-মাত্রায় প্রতিভাত হয়। বর্তুলের সংগীত (মিউজিক অব দ্য স্ফিয়ার) ঠিকই সুমধুর হয়ে বেজেছে। আমাদের সময় লেগেছে, কিন্তু আমরা প্রকৃতির সেই বিমূর্ত সুর ধরতে পেরেছি। ভবিষ্যতেও পারব, সেই আশাবাদ লেখকের। তবে জাগতিক সৌন্দর্যের ভেতরে ইন-ইয়্যানের মত কমপ্লিমেন্টারিটি আছে। সব সত্য সত্য নয়, অনেক ভাবেই সত্য হতে পারে। সত্যের কোনো একটিমাত্র পথ নেই, আছে মিউচুয়ালি এক্সক্লুসিভ একাধিক পথ। হয়ত প্রকৃতিতে সত্য তত্ত্ব বলে কিছু নেইই, আছে সৌন্দর্য আর তার বিমূর্ত কনসেপ্ট। কিন্তু বারম্বারই দেখি সুন্দর তত্ত্বের প্রতিই প্রকৃতির পক্ষপাত। কেন? কে জানে!

border=0
‘দ্য সায়েন্স অব দ্য ইন্টারস্টেলার’, কিপ থর্ন
‘ইন্টারস্টেলার’ মুভিটিঅনেকেই দেখেছেন। অত্যন্ত উপভোগ্য সায়েন্স ফিকশন মুভি। সত্যি বলতে কি, এখন পর্যন্ত সবচাইতে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক ধারণার ভিত্তিতে বানানো হয়েছে এই মুভি। কিন্তু কেমন সেই ভিত্তি? কীভাবেই বা ওয়র্মহোল বা গার্গাঞ্চুয়ার মত ব্ল্যাকহোল তৈরি হতে পারে, তার আশেপাশে স্থান-কালের বক্রতা কেমন রূপ গ্রহণ করে? আর সেই চরম স্পেসটাইমে আমরা আর কী কী ভৌত প্রপঞ্চ আশা করতে পারি? এই সব নিয়ে কলম ধরেছেন বিখ্যাত পদার্থবিদ কিপ থর্ন। গ্রাভিটি বিষয়ক একজন জগৎখ্যাত এক্সপার্ট উনি। তাঁর আগের বই ‘ব্ল্যাক হোলস অ্যান্ড টাইম ওয়ার্পস’ও বিখ্যাত হয়ে আছে। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় অবদান ‘গ্রাভিটেশন’ নামের ঢাউস বইটি। কেউ যদি গ্রাভিটি শিখতে চায় তাহলে এই বই পড়তেই হবে। আন্ডারগ্র্যাড থেকে পিএইচডি পর্যন্ত মহাকর্ষ বিষয়ে নানান পর্যায়ের খুঁটিনাটি বিজ্ঞান এই বইয়ে আছে। এই কিপ থর্ন সম্প্রতি লিখেছেন ‘দ্য সায়েন্স অব দ্য ইন্টারস্টেলার’ (২০১৪) বইটি। কিপ বহুদিন ধরে এক্সাক্ট সায়েন্সের ভিত্তিতে একটি মুভি বানানোর চিন্তা করছিলেন। তিনি লিখেছেন, প্রায় কুড়ি বছর ধরে তার চিন্তার ফসল ‘ইন্টারস্টেলার’ মুভি। এই বইতে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, ইন্টারস্টেলার মুভির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার কথা, তার স্বপ্ন কল্পনার কথা, পাঁচ মাত্রার কথা, ব্ল্যাকহোলের কোল ঘেষে টেসারেক্টের কল্পনার কথা, পাঁচ মাত্রিক সত্তা বাল্ক-বিইঙের কথা, টাইম ট্রাভেলের কথা, ওয়ার্মহোলের কথা, কক্ষপথের স্ট্যাবিলিটির কথা, ব্রেন বিশ্বের কথা, কম্পুটার গ্রাফিক্সের কথা, আইনস্টাইনের সমীকরণের বিবিধ সমাধানের কথা, জোয়ার বলের কথা, এইসব বৈজ্ঞানিক চিন্তার বাস্তব সম্ভাবনার কথা ইত্যাদি। মূলত ‘ইন্টারস্টেলার’ মুভির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এই বইতে আছে। এবং মুভিতে যেসব কমপিউটার গ্রাফিক্স দেখানো হয়েছে তার পেছনের বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করেছেন অত্যন্ত সহজ ভাষায়। ব্ল্যাকহোলের পাশে যে আলোর ডিস্কটি দেখা যায় তাকে কাছ থেকে দেখলে কেমন দেখাবে এবং কেন দেখাবে সেটার পরিষ্কার ব্যাখ্যা এই বইতে আছে। সেটা অনেক বড় একটা শিক্ষার ব্যাপার। বিজ্ঞান শেখার জন্য এই মুভি এবং এই বইটি তুলনারহিত।

border=0
‘দ্য কোপার্নিকাস কমপ্লেক্স’, কালেব শার্ফ।
গ্রহ বিজ্ঞানী এবং অ্যাস্ট্রোবায়োলজিস্ট শার্ফের লেখা একটি চমৎকার বই ‘দ্য কোপার্নিকাস কমপ্লেক্স’ (২০১৫)। এই বইতে তিনি সৌরজগতের নির্মাণ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের নতুন ভাবনার কথা লিখেছেন। বাহ্যগ্রহ বা এক্সোপ্লানেটদের বৈশিষ্ট্যের কথা লিখেছেন। এই সব গ্রহের এবং তাদের বাহ্য-সৌরজগৎসমূহের বিচিত্র ধরণ-ধারণের কথা লিখেছেন। পৃথিবীর প্রাণের বৈশিষ্ট্য এবং জৈবরাসায়নিক ক্রিয়াকর্মাদির ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। সেই আলোকে প্রয়াস পেয়েছেন বাইরের গ্রহের কী ধরণের বৈশিষ্ট্য প্রাণবান্ধব হবে অথবা হবে না। তিনি লিখেছেন,
“এখন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য গ্রহগত গঠন ও পরিবেশের এক বিচিত্র রঙধনু সমাবেশ খুঁজে পেয়েছেন। খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে এমন সব গ্রহ যাদের বাতাবরণে আছে জলীয় বাষ্প কিংবা আণবিক হাইড্রোজেন, মহাসামুদ্রিক গ্রহ যাদের কোন ডাঙ্গাই নেই (শুধুই জলরাশি), কার্বনগ্রহ এবং তাদের বিচিত্র গ্রহবিজ্ঞান, এবং চিরস্থায়ী শৈত্যে আক্রান্ত তুষারিত ধরিত্রী যাদের বায়ুমণ্ডল পর্যন্ত জমে ভূপৃষ্ঠে পতিত হয়েছে। আছে অত্যুত্তপ্ত, অতিশীতল, উষ্ণ কিংবা সামান্য গরম গ্রহ কিংবা এমন গ্রহ যার মধ্যে এর সবগুলোই দেখা যায়। আছে রসায়নে সমৃদ্ধ গ্রহ যাদের মধ্যে থাকবে অজানা যৌগের সমুদ্র, অনেকেই থাকবে পৃথিবীর মতই। এমনকি রসায়নে দুর্বল গ্রহও থাকবে। শনির মত ধুলো কিংবা বরফের বলয় যুক্ত গ্রহও থাকবে। অনেক গ্রহের উপগ্রহ থাকবে, কারও কারও উপগ্রহ হয়ত পৃথিবী বা মঙ্গলের মতই বড় হবে, যাদের নিজস্ব বায়ুমণ্ডল, মহাসমুদ্র ও ডাঙ্গার অঞ্চল থাকবে। এই জরিপ থেকে একটা জিনিস খুব স্পষ্ট বোঝা যায়। না আমাদের সূর্য এবং না আমাদের সৌরজগৎ এমন কোন সহজলভ্য সিস্টেমের/পরিবেশের অংশ যেখানে ছোট পাথুরে জলে ভেজা গ্রহ পাওয়া যাবে। অন্যভাবে বললে, এই বহু বৈচিত্র্যের মাঝেও আমাদের পৃথিবী এবং তদীয় পরিবেশ বেশ বিরল ঘটনা।”
আমাদের পৃথিবী এবং তার সৌরজগতের এই বিরলতাই পুরনো ‘কোপার্নিকান নীতি’ (যে আমাদের পৃথিবী, সূর্য, এই সৌরজগৎ ইত্যাদি আমাদের গ্যালাক্সির একটি অন্যতম স্বাভাবিক ঘটনা) থেকে আমাদের দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। এই বইটি আপনাকে নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করবে।

border=0
‘হারিয়ে যাওয়া জীবিকা’, প্রশান্ত মৃধা।
প্রশান্ত মৃধার আত্মকথন জাতীয় রচনাগুলো আমার অসম্ভব প্রিয়। ‘সন্ন্যাসের সহচর’ নামের যে বইটি তিনি রচনা করেছিলেন, আজীজ মার্কেট ভিত্তিক তরুণ লেখকদের আড্ডাবাজী এবং সাহিত্যপ্রচেষ্টা নিয়ে, সেটা আমি এক লহমায় পড়ে ফেলেছিলাম।কারণ তিনি যে সময়ে ‘আজীজ’কে দেখেছিলেন, একই সময়ে আমরাও বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে সেখানে যেতাম। একই বৃত্তের না হলেও, সেই সময়ের একটা জাজ্বল্যমান স্ন্যাপশট চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আজীজ মার্কেট সংলগ্ন বইকেন্দ্রিক আড্ডাসমূহ যে একটা প্রপঞ্চ হয়ে উঠেছিল সেটার এক তাৎকালীক চিত্র ‘সন্ন্যাসের সহচর’-এ আছে। ‘আজীজ’ শব্দটার ভেতরেই কেমন একটা অন্তস্ফোরণ কাজ করে, যেন একটা ফেনোমেনা, কিনবা এপিফেনিও।
ঠিক একইরকম তাঁর এই বর্তমান বইটি। প্রথম পাতাটি খুলেই এক ঝলকে পৌঁছে গেলাম শিশুকালের স্কুল স্মৃতিতে। সেখানে তখন আমরা ঝরণাকলম ব্যবহার করতাম, নাম খোদাতাম, অদৃশ্য কালি কিনতাম, কটকটি খেতাম, মালাই চাখতাম, চানাচুর ওয়ালার বা ঝালমুড়ি ওয়ালার ডুগডুগি বাজানো মুড়ি-বানানো দেখতাম। ঐ আওয়াজেই মনে হয় মুড়ির অর্ধেক স্বাদ লুকনো থাকত। ভারতের শাড়িওয়ালা ব্ল্যাকের মহিলা আসলেই মা-খালাদের নিরন্তর হাসিমুখ মনে পড়ে গেল। শিলপাটা ধার এখনও পাড়ায় আসে, কিংবা প্রতিদিন ঠিক রাত এগারোটা নাগাদ একজন হটপেটিস এখনও নিয়ে যায়। টিয়েপাখির ভাগ্য নির্ধারণ ষষ্ঠশ্রেণিতে একবার করেছিলাম। সেসব এখন বিরল হয়ে যাচ্ছে। টাইপরাইটারে খটখটানি, বহুরুপীর নাচ কিংবা বাতের ব্যথা নামানোর বেদেনিদের ডাক শহরের অলস দুপুরকে জানান দিত এক সময়ে। কোবরেজী পেশাটার কথা লেখক বলেননি হয়ত এখনও হারিয়ে যায়নি বলেই। কিন্তু আমাদের সময়ের সেইসব রঙিন শৈশবের দখল নিয়েছে এখনকার ভিডিওগেম কিংবা মুঠোফোনের অজস্র গেম। বাচ্চাদের রঙিন দুনিয়ার জায়গায় এখন ভার্চুয়াল রিয়ালিটি খেলা করে। তাদের চোখেমুখে স্ক্রিনজোড়া আবছা নীল আলো। আর চোখ তুললেই বাস্তবের সাদাকালো অথবা ফিকে জগত। ভার্চুয়াল আর প্রকৃত বাস্তবের মধ্যে এই ফ্রিকোয়েন্ট যাতায়াত তাদেরকে কীভাবে গড়ে তোলে সেটা দেখবার বিষয়। কিন্তু বলিহারী প্রশান্তদা’র দেখার চোখ! তিনি এতো সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করেছেন এতো ডিটেইলে বর্ণনা করেছেন দৃশ্যপটের, যে আমার স্মৃতিগুলো সব একদম বুক থেকে উঠে মুখ ফুঁটে বেরিয়ে গেল – “দেখলে বোঝা যায় কলমটা দামি। পাইলট কোম্পানির। দেখতেও বেশ। পিছনে ক্লিপ লাগলে আকৃতিতে বড়ো, খুলে মুখে আটকালে তখন কলমটা ছোটো। সে ক্লিপে কিছু লতাপাতা মতন আঁকা। কলমের গায়ের রঙ সাদা, নিবটা বেশ বের হয়ে আছে। নিবের পেছন থেকে প্রায় আগা পর্যন্ত আটকানো, একেবারে শেষ মাথায় একটি ছিদ্র, সেখান থেকে নিবে কালি আসে”। এইসব কলম আমরা বাল্যে ব্যবহার করেছি। এতো ডিটেইল ছবি ৩০ বছর আগের স্মৃতি থেকে আঁকা লেখকের সাংঘাতিক পর্যবেক্ষণ শক্তির পরিচয় দেয়। এরকম গত ৪ দশকে হারিয়ে যাওয়া ৩০টি জীবিকা নিয়ে অনবদ্য বই প্রশান্ত মৃধার। সেইসময়কার সমাজচিত্রও পাওয়া যায় বইটা থেকে। অবশ্য সে সমাজচিত্র পড়ে নিতে আমাদের কোনো সমস্যা হয়না, আমরা যারা কাছাকাছি সময়ের এবং স্থানের। তবে লেখকের শক্তিটা সেখানেই যে তিনি সেই ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণগুলোকে সার্বজনীন করে তুলতে পেরেছেন। বইটি প্রকাশ করেছে কথাপ্রকাশ, পৃষ্ঠা ১৪০, মূল্য ২০০ টাকা।

border=0
‘কথার কথা’, পার্থ চট্টোপাধ্যায়।
বইটি পার্থ চ্যাটার্জির সাথে তরুণ পাইনের কথোপকথনের ভিত্তিতে রচিত একটি ছোট চমৎকার ছিমছাম গম্ভীর ভাবনার বই। অনেক বিষয়ে পার্থ চ্যাটার্জি খোলাখুলি কথা বলেছেন – ভারতে সমাজবিজ্ঞানের গবেষণার ভেতরের কথা, কলকাতায় সেন্টারের ইতিকথা, বাঙালি মুসলমানের কথা, ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনার কথা, পশ্চিমবাঙলার গ্রামের কথা, গ্রামের রাজনীতিতে জাতপাতের ইতিবৃত্ত, উচ্চবর্ণের রাজনীতিতে আধিপত্যের কথা, সামাজিক গণতন্ত্রীকরণের প্রক্রিয়ার কথা ইত্যাদি। স্নিগ্ধ জ্ঞানের আভা পুরো বইটা জুড়ে।প্রকাশক – তালপাতা, কলকাতা। মূল্য ১০০রুপি।

border=0
‘বাংলার আর্থিক ইতিহাস’, সুবোধ কুমার মুখোপাধ্যায়। ঊনবিংশ শতাব্দী এবং বিংশ শতাব্দী।
এই দুটি বইয়ের প্রকাশক কে পি বাগচী অ্যান্ড কোম্পানী, প্রকাশকাল ২০১১, দ্বিতীয় মুদ্রণ। বইদুটি চমৎকার সুখপাঠ্য, যদিও পাঠ্যবইয়ের আদলে লেখা। লেখক জানাচ্ছেন, ‘লর্ড কর্ণওয়ালিশ ও তাঁর সহযোগীরা বাংলায় যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন তার উদ্দেশ্য ছিল ভূমিতে ব্যাক্তিগত মালিকানা সৃষ্টি করে উৎপাদনের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা। … চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর বাংলার লোকসংখ্যা বেড়েছিল, কৃষির বিস্তার ঘটেছিল। দীর্ঘকাল বাংলা দুর্ভিক্ষ থেকে মুক্ত ছিল, এজন্য জমিদারদের কোনো অবদান ছিল না, কৃতিত্ব প্রাপ্য অবশ্যই কৃষক শ্রেণি’। কৃষি ও কৃষক, বাংলার ভূমি ব্যবস্থার বিবর্তন, এই দুই শতাব্দীতে যন্ত্র ও কুটির শিল্পের বিকাশ, বহির্বাণিজ্যের পরিস্থিতি, অন্তর্বাণিজ্যের অবস্থা, ব্যাঙ্কিং-ঋণ-সমবায়-সুদের ব্যবস্থাদি, কৃষি অর্থনীতির সমস্যা, কৃষক আন্দোলন, বর্গা ব্যবস্থা নিয়ে চমৎকার আলোচনা আছে। গোছালো বাক্যে, সুললিত গদ্যে বাংলার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে এক চমৎকার আলোচনা আছে এই দুটি বইয়ে। অষ্টাদশ শতাব্দী নিয়েও এই লেখকের একটি বই আছে, তবে সেটি সংগ্রহ করা যায়নি।

border=0এগুলি ছাড়াও উল্লেখযোগ্য পাঠ হলো ইতালীয় তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী কার্লো রভেলির সাড়া জাগানো বই ‘সেভেন ব্রিফ লেসেন্‌স অফ ফিজিক্স’ (২০১৪)। মাত্র প্রায় ৮০ পাতার মধ্যে আধুনিক পদার্থবিদ্যার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের কথা তুলে ধরেছেন। সংক্ষিপ্ত অথচ প্রাঞ্জলভাবে লেখা এই বইটি সব ধরণের, সব বয়েসের মানুষের উপযোগী করে লেখা। আরেকটী বই হলো অমিতাভ ঘোষের ‘দ্য গ্রেট ডিরেঞ্জমেন্ট’ (২০১৬)। অমিতাভ ঘোষ বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক। বিশাল ক্যানভাসে ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার। ‘আইবিস ট্রিলজি’ তাঁর সাম্প্রতিকতম ফিকশন, যার মূল প্রতিপাদ্য আফিম ব্যবসার দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় বিস্তৃতি এবং তাতে ব্রিটিশ উপনিবেশের অহেতুক পেশীশক্তির প্রয়োগ, চিনের জটীল প্রতিক্রিয়া, ভারতীয় আফিম ব্যবসা ও ব্যবসায়ীদের হালহকিকত। ঘোষ নন-ফিকশনেও বিখ্যাত।
border=0 ‘দ্য গ্রেট ডিরেঞ্জমেন্ট’ বইটিতে তিনি জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে আমাদের সচেতনতার সাহিত্যিক, রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক ভূমিকার বিশ্লেষণ করেছেন। বইটি শুরুই করেছেন স্মৃতি রোমন্থন দিয়ে। তিনি লিখেছেন, তাঁর পরিবার বহু আগেই ইকোলজিকাল রেফিউজি হিসেবে পূর্ববঙ্গ থেকে বিহারে অভিবাসন করেন। ১৮৫০-এর দশকের মাঝামাঝি পদ্মার পাড়ে তাঁদের পৈত্রিক গ্রামটি হঠাৎই নদীভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেলে তাঁর প্রপিতামহেরা বাস্তুত্যাগে বাধ্য হন। এইভাবে জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে উদ্ভূত বাস্তুতান্ত্রিক পুনর্বিন্যাস ব্যক্তিগত জীবনে ঘটলেও সেটা যেন একটা সম্মিলিত বিস্মৃতির মতো কাজ করে। জলবায়ু সংক্রান্ত এই সকল বিষয়াদি ফিকশনে, নন-ফিকশনে, আমাদের সম্মিলিত ক্রিয়াকর্মে কীভাবে বিরাজ করছে, কতটুকু করছে, যথেষ্টভাবে করছে কিনা – এইসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অনুসন্ধান থেকে শুরু করে অমিতাভ ঘোষ যেন আত্মানুসন্ধানে নেমেছেন। আরেকটি বইয়ের নামোল্লেখ না করলেই নয়।
border=0সেটি হলো ‘দ্য মিনিং অফ হিউম্যান এক্সিসটেন্স’ (২০১৫)। লেখক স্বনামধন্য জীববিজ্ঞানী এবং পুলিৎজার পুরষ্কারপ্রাপ্ত লেখক এডওয়ার্ড উইলসন। বইটি একটি সিন্থেসিসধর্মী বই। আধুনিক বিজ্ঞান আমাদেরকে কী শিখিয়েছে, কী শেখাচ্ছে, আমরা কোন পথে হাঁটছি, সে পথে পৃথিবীর মঙ্গল নিহিত আছে কিনা, ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রয়াস দেখা যায় এই বইয়ে। বইটির শুরুতেই তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, ‘এই বিশ্বজগতে মানবতার কি কোনো বিশেষ স্থান রয়েছে? আমাদের ব্যক্তিজীবনের অর্থই বা কী? আমার বিশ্বাস, মহাবিশ্ব ও নিজেদের সম্পর্কে আমরা এখন অনেক ভাল জানি এবং ফলত এইসব প্রশ্ন উত্তরযোগ্য এবং যাচাইযোগ্য’। মানববিদ্যাসমূহ এবং বিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটিয়ে উইলসন প্রজাতি হিসেবে পৃথিবীতে আমাদের অবস্থান, আমাদের চলার পথ, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের শিক্ষা, মানববিদ্যার অর্জন ইত্যাদিকে খুঁটিয়ে দেখেছেন। বিজ্ঞানীপ্রবরের উপসংহারটি যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপক, ‘এ কথা সত্যি, বিজ্ঞান ও মানববিদ্যা যা বলে এবং করে তা মৌলিকভাবে আলাদা। কিন্তু তারা সৃষ্টিগতভাবে পরস্পরের পরিপূরক, এবং মস্তিষ্কের একই সৃজনশীল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের উভয়ের সৃষ্টি। বিজ্ঞানের অভিজ্ঞতাজাত জ্ঞান এবং বিশ্লেষণী শক্তিকে যদি মানববিদ্যার অন্তঃশীল সৃষ্টিশীলতার সাথে মিলিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে মানব অস্তিত্ব এক অসাধারণ কর্মময় ও কৌতূহলোদ্দীপক উদ্দেশ্যে উন্নীত হবে’।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ফ্র্যাঙ্ক উইলচেকের ‘আ বিউটিফুল কোশ্চেন’ ২০১৬তে পঠিত আমার সবচেয়ে প্রিয় গ্রন্থ। সেই সাথে ‘দ্য মিনিং অফ হিউম্যান এক্সিসটেন্স’ ছাড়া ২০১৬ অর্থহীনও বটে!

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ওমর শামস — জানুয়ারি ১, ২০১৭ @ ৮:৫৬ অপরাহ্ন

      ভালো ভালো বই পড়েছো । চমৎকার লিখেছো। ফ্রন্টিয়ারের ফিজিক্স থেকে বাংলাদেশের সমাজের ব্যাপার। ওয়ান অব দ্য বেস্ট ইন বিডি আরটস। একটা কথা, বিডি নিউজ কয় পয়সা দেবে? বইগুলো কিনতেই ১০০ ডলারের বেশি। কাগজগুলোর ফ্রি খাওয়ার ট্রাদিশন টা বদলানো দরকার।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — জানুয়ারি ১, ২০১৭ @ ৯:১৫ অপরাহ্ন

      খুবই ভালো লাগলো। দুটি বই পড়া। বাকীগুলোও দ্রুতই পড়ে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে। অভিনন্দন ফারসীম ভাই।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com