পাণিহাটি-সোদপুরের রোকেয়ার কবর, রোকেয়া দিবস ও অন্যান্য

পূরবী বসু | ২৮ december ২০১৬ ১১:৪৬ অপরাহ্ন

Rokeyaযতই কেন না আমরা শ্রদ্ধায় অবনত এই মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়ার প্রতি, তাঁর জীবন ও বহুবিধ কর্ম সম্পর্কে বহু ভুল তথ্য আজো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সর্বত্র যার সংশোধন একান্ত জরুরী। জরুরী তাঁর জীবনের এবং সংগ্রামের কিছু কিছু অজানা তথ্য জানার প্রচেষ্টা। আমরা যেন বিশেষ মনোযোগ দিয়ে আবার ফিরে দেখি তাঁকে। নবতর পর্যায়ে যাচাই করি নারীর স্বাবলম্বিতার জন্যে তাঁর ভাবনা, অবদান; তাঁর পারিপার্শ্বকতা; দেখি তাঁর একান্ত নিরুপায় হয়ে বৃহত্তর স্বার্থে কখনো কখনো বাহ্যিক আচার-আচরণে সমঝোতা করার প্রয়াস।
এই সব প্রচেষ্টার সঙ্গে আমাদের আরেকটু বেশি সতর্ক হতে হবে তাঁর সঠিক মূল্যায়ণে এবং তাঁর বিষয়ে নির্ভুল তথ্য পরিবেশনে। নিচের প্রতিবেদন থেকে বোঝা যায়, পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে গবেষণা নিবন্ধে আজো প্রচুর ভুল তথ্য সংযোজিত রয়েছে বেগম রোকেয়ার বিষয়ে। পরিহাসের মতো শোনালেও সত্য, যে প্রতিবেদক এইসব তথ্যগত ভুলের কথা লিখেছেন তাঁর প্রতিবেদনের শিরোনামেই রয়েছে মস্ত বড় এক ভুল। “রোকেয়ার জীবনী” লিখতে তিনি “রোকেয়ার আত্মজীবনী” লিখে ফেলেছেন যা পড়ে মনে হতেই পারে যে নিজের জীবনের তথ্য-ই বুঝি সঠিক দেননি রোকেয়া। (রংপুর, নিজস্ব প্রতিবেদক,পাঠ্যপুস্তকে ভুলে ভরা রোকেয়ার আত্মজীবনী jagonews24.com ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬)।
কিন্তু কার্যত অবরোধপ্রথা নিয়ে তাঁর রচনা এবং অতি গোপনে ও একান্ত নিভৃতে বাংলা ও ইংরেজি ভাষা শিখতে গিয়ে তাঁর যে প্রবল বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল তাঁর বর্ণনা কিংবা নিজের প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের বিদ্যালয় সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল চালাতে গিয়ে যে বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত হতে হয়েছে তাঁকে সেসব কথা বিভিন্ন প্রবন্ধ ও গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করলেও যতদূর জানি, বিশদভাবে আত্মজীবনী লিখে যাননি রোকেয়া। ফলে এখানে নিশ্চয় বেগম রোকেয়ার স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলালের বরাদ দিয়ে জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক রোকেয়ার জীবনী লিখতে গিয়ে খ্যাতিমান লেখকদের ভুল তথ্য পরিবেশনার প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন। মানে, ভুলে ভরা “রোকেয়ার জীবনী”র প্রসঙ্গ এনেছেন। “রোকেয়ার আত্মজীবনী” নয়। আমাদের দেশের অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ও জনপ্রিয় লেখক/গবেষকগণ রোকেয়ার জীবনী লিখতে গিয়ে কতো ভুল তথ্য পরিবেশন করেছেন, এটাই ছিল বক্তব্য। এইসব গ্রন্থে রোকেয়ার বসতবাড়ির জমির পরিমান একশ গুণ হেরফেরে উল্লেখ করা থেকে শুরু করে তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সন তারিখ সঠিকভাবে উদ্ধৃত হয়নি। সঠিক হয়নি কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানুষের নাম ও পারিবারিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে দেয়া তথ্য। রোকেয়ার ছোটবোন হোমায়রা খাতুনের স্বামী বলে নজরুল-গবেষক আমীর হোসেন চৌধুরীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে হোমায়রার স্বামীর নাম তোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী। আমীর হোসেন চৌধুরী হলেন হোমায়রা ও তোফাজ্জল হোসেন চৌধুরীর পুত্র যিনি ১৯৬৪তে ঢাকায় হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা বাঁধলে দাঙ্গা প্রতিরোধ মিছিল ও আনুষঙ্গিক কর্মকান্ডে যোগ দিতে গিয়ে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান। আমীর হোসেন চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে তাঁর জীবনীর ওপর বাংলা একডেমী থেকে একখানা গ্রন্থ প্রকাশিত হয় (আমিনুর রহমান সুলতান, দাঙ্গায় শহীদ আমির হোসেন চৌধুরী, বাংলা একাডেনি, জুন ২০১৩)। এক বছর আগে সেই বইখানি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে লেখক শামসুজ্জামান আমীন হোসেন চৌধুরীর আত্মত্যাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন (শামসুজ্জামান, চৌষষ্টির নায়কের জীবনী, সাম্প্রতিক দেশকাল, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৫)। আমীর হোসেন চৌধুরী শৈশবে পিতাকে হারিয়ে মা হোমায়রা খাতুনসহ কলকাতায় চলে যান। আর এদিকে স্বামীর মৃত্যুর পর সৎ মেয়ে ও শ্বশুর বাড়ির অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের অসহযোগিতায় রোকেয়াও তাঁর শ্বশুরবাড়ি ভাগলপুরে নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের স্কুল তুলে দিয়ে কলকাতায় চলে আসেন এবং সেখানে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্থাপনের কাজ শুরু করেন। কলকাতা আসার পর, অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে বেগম রোকেয়া, হোমায়রা খাতুন ও তাঁর পুত্র আমীর হোসেন চৌধুরী এক-ই বাড়িতে বাস করতেন। আমীর হোসেন চৌধুরী, যিনি সন্তান-বুভুক্ষু বেগম রোকেয়ার পুত্রবৎ ছিলেন, কলকাতা থেকেই বি এ পাশ করেন, কিন্তু দেশভাগের পর ঢাকায় চলে আসেন। আর সেখানেই দাঙ্গা প্রতি্রোধ করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ( শফি আহমেদ ও আমার যৌথ সম্পাদনায় বাংলাদেশের খবরের কাগজে বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার পরবর্তি দাঙ্গার প্রতিফলন নিয়ে যে বিশাল আকারের বই এখনো গেল না আঁধার প্রকাশ করি ফেব্রুয়ারী ১৯৯৩তে, সেটা আমীর হোসেন চৌধুরীকে উৎসর্গ করেছিলাম আমরা, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা থামাতে গিয়ে যিনি আত্মদান করেন।)।

নয় ডিসেম্বর, ১৯৩২ সালে “নারীর অধিকার” নামক প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে তা অসমাপ্ত রেখেই মাত্র ৫২ বছর বয়সে নিজ বাসস্থানে মৃত্যুবরণ করেন রোকেয়া। এর অনেক পরে, ছয় দশক পরে, ইতিহাসবিদ ও শেরেবাংলা ফজলুল হকের নাত-জামাই অমলেন্দু দে’র সোদপুরে রোকেয়ার কবর আবিষ্কারের ঘটনা রোকেয়ার প্রতি বাঙালির নতুন করে দৃষ্টিপাতের সুযোগ করে দিয়েছে – বিশেষত পশ্চিম বাংলায়।
আমি যখন ফেইসবুকে স্টেটাসে রোকেয়ার কবর ও অমলেন্দু দে’র দ্বারা কবরের অবস্থান শনাক্তের তথ্যটা উল্লেখ করলাম, দেখলাম, আমার মতো অনেকেই এই সংবাদটা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। আমি যা লিখেছিলাম ফেসবুকে ডিসেম্বরের ৩ তারিখে সেটা এরকমঃ
“এবার বইমেলায় অন্যপ্রকাশ ও পাললিক সৌরভ থেকে আমার দু’টি বই বের হচ্ছে যার জন্য বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন সম্পর্কে নতুন করে কিছু তথ্যাদি খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। সেই সূত্রে একটি তথ্য পেলাম, যা আপনাদের অনেকেরই জানা থাকলেও আমার কাছে অজানা ছিল; আর সেটা হলো বেগম রোকেয়ার কবর পশ্চিমবাংলায় সোদপুর গোরস্তানে। আর যে প্রখ্যাত ব্যক্তির বিশেষ উদ্যোগে বেগম রোকেয়ার অন্তিম শয্যার স্থান আবিষ্কৃত হয়েছে , তিনি স্বনামধন্য ইতিহাসবিদ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অমলেন্দুদে।অমলেন্দু দে শেরেবাংলা ফজলুল হকের নাতনী নাসিমা বানুর স্বামী। মে১৬, ২০১৪তে ৮৪ বছর বয়সে অমলেন্দু দে মারা যান, তার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই, (জুন৩, ২০১৪), তাঁর স্ত্রী নাসিমা বানুর-ও মৃত্যু হয়।”
এই ছোট্ট লেখাটির এতোখানি ইতিবাচক এবং কৌতুহলি প্রতিক্রিয়া হবে ভাবি নি। কিন্তু তখনো জানতাম না, আমার এ লেখার অনেক আগেই উত্তর বঙ্গের সাংবাদিক জিনাত রহমান এই তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে সোদপুর-পাণিহাটিতে গিয়ে রোকেয়ার কবরস্থান পরিদর্শন করে এসেছেন। গত সপ্তাহে তাঁকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি, এ সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষন ও অভিজ্ঞতা তিনি দেশের অনেক নারী নেত্রী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। একটি আঞ্চলিক কাগজেও অংশবিশেষ ছাপা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে তাঁর নামে গুগুল সার্চ করলে আজ আর তেমন কোন লেখা ভেসে ওঠে না। জিনাত রহমান আমার পূর্বপরিচিত নন। ফেসবুক বন্ধু-ও নন। তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগ রোকেয়ার ওপর আমার সেই স্টেটাসকে কেন্দ্র করেও নয়।
নেহায়েৎ কাকতালীয়ভাবেই আমার সেই স্টেটাসটা ছাপাবার কিছুদিন পরেই নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত “নারী” ম্যাগাজিনের সম্পাদক পপি চৌধুরী আমাকে রোকেয়ার কবরের ওপর জিনাত রহমানের একটি নিবন্ধের পান্ডুলিপি নারীতে প্রকাশের ব্যাপারে আমার মতামতের জন্যে আমার কাছে ইমেইল করে পাঠান (বলা বাহুল্য, আমি “নারী”-পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক)। লেখাটি বেশ কিছুদিন আগেই তাঁর কাছে এসেছে, জানান পপি। লেখার পান্ডুলিপিটি পড়ে পপি ও আমি উভয়েই আন্দোলিত হয়ে ভিন্ন ভিন্নভাবে ফোন করে জিনাত রহমানের সঙ্গে কথা বলি। জিনাত ও তাঁর পরিবার উত্তরবঙ্গে বসবাস করেন। তিনি ও তাঁর স্বামী মতিয়র রহমান দৈনিক উত্তরবাংলা পত্রিকার যথাক্রমে নির্বাহী সম্পাদক ও সম্পাদক। তিন তিনবার ফোন করে অনেকক্ষণ ধরে তাঁর সঙ্গে কথা বলি আমরা। আমাদের অনুরোধে তিনি তথ্যের প্রাসঙ্গিক প্রমাণ বা ভিত্তি হিসেবে কিছু ছবি ও সোদপুর-পাণিহাট্টির স্থানীয় কয়েকজন গন্যমান্য ব্যক্তির নাম, পদবী, সরবরাহ করেন যাঁরা রোকেয়ার কবর সম্পর্কে তাঁর দেয়া তথ্যের উৎস। আমরা তাঁর সচিত্র রচনাটি ডিসেম্বর ২০১৬ সংখ্যায় নারী-তে ছাপানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যা এই সপ্তাহেই নিউ ইয়র্ক থেকে বেরুচ্ছে (নারী ;সম্পাদক পপি চৌধুরী, নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র, ডিসেম্বর ২০১৬ সংখ্যা)। তবে যেহেতু সেখানে বর্ণিত অনেক তথ্য-ই মৌখিক আলাপ থেকে গৃহিত, তিনি সেখানে গিয়ে রোকেয়ার কবর শনাক্তকারী ফলকটি নিজের চোখে দেখে ছবি তুলে এনেছেন এবং পানিহাটি বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষকসহ স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন– এর বাইরে আর কোন তথ্য আমি নেইনি আমার এই রচনায়। কেননা তাৎক্ষণিকভাবে সেসব তথ্য যাচাই করে দেখার মতো সুযোগ, সামর্থ বা উপায় আমার ছিল না। তবে একাধিক সূত্র থেকে তথ্য ঘেঁটে অনুমান করা হয় যা জিনাত রহমান ও অজিত কুমার ঘোষও উল্লেখ করেছেন, যে রোকেয়াকে তৎকালীন মৌলবাদীদের বাধার জন্য কলকাতার কোন গোরস্তানে সমাহিত করা সম্ভব হয়নি যার জন্যে তাঁর মরদেহ পানিহাটি-সোদপুরে আনা হয়েছিল। কেননা মেয়েদের জন্যে স্কুল করায় ও নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলায় ও সাহিত্য রচনা করায় ধর্মের অপব্যাখ্যাকারীদের চোখে রোকেয়া মোটেই গ্রহনীয় ছিলেন না।
ইতোমধ্যে এই বিষয়ের ওপর নতুন করে অনুসন্ধান করতে গিয়ে অতি সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ/নিবন্ধের ওপর আমার চোখ পড়ে। বেগম রোকেয়ার কবরের স্থান যে সোদপুর-পানিহাটিতে যা অমলেন্দু দের প্রথমিক আবিষ্কার, সে ব্যাপারটায় আজ কেউ আর সন্দেহ বা দ্বিমত পোষণ করেন না।
তথ্য খুঁজতে গিয়ে আরো পেলাম পানিহাটির ঐতিহ্যময় ইতিহাসের সুদীর্ঘ বিবরণ। এ জায়গার সঙ্গে বড় বড় সব মণিষী যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, চৈতন্যদেব, মহাত্মা গান্ধী, বেগম রোকেয়া, স্যার প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, রাজশেখর বসু (পরশুরাম), সুকুমার রায়সহ অনেকের অতি ঘনিষ্ট সংস্লিষ্টতার তথ্য রয়েছে সেখানে। (ধন্য পানিহাটি, অজিত কুমার ঘোষ, প্রাক্তন ছাত্র ও শিক্ষক, পানিহাটি ত্রাণনাথ হাইস্কুল, অক্টোবর ৩১, ২০০৯)।
দীর্ঘ আয়তনের এই প্রবন্ধের এক জায়গায় লেখক অজিত কুমার ঘোষ বলেছেন, “কিছুদিন আগে বেগম রোকেয়ার সমাধির কিছু নিদর্শন এখানে (পানিহাটি বালিকা বিদ্যালয়ে) পাওয়া গেছে। তার জন্যে এই বিদ্যালয়ে একটি বেদী নির্মাণ করে (তাঁকে) শ্রদ্ধা জানানো হয়।”
সম্প্রতি প্রকাশিত প্রাণতোষ বন্দোপাধ্যায়ের লেখা “ইতিহাস চেতনায় সোদপুরপাণিহাটি”( the report24.c0m ১২ আগস্ট ২০১৬) নিবন্ধে পাণিহাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং এই জনপদের সঙ্গে সংশিষ্ট বহু বড় বড় মণিষীর কথা আমরা নতুন করে এবং আরো অন্তরঙ্গভাবে জানতে পারি আজ। ইতোমধ্যেই স্থানীয় শিক্ষক ও ইতিহাস প্রেমিকদের উদ্যোগে আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চার দিশারী হয়ে উঠেছে সোদপুর-পাণিহাটি অঞ্চল। যেহেতু একাধিক সূত্রে প্রাণতোষের এই সংবাদ্গুলো পরিবেশিত হতে দেখেছি, প্রাণতোষের নিবন্ধ থেকে বেশ কিছুটা অংশ প্রায় অবিকল তুলে দিলাম নিচেঃ
গত ৪ঠা আগস্ট বৃহস্পতিবার বিকালে তার (পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়) গৃহসম্মুখে সভায় সমবেত হন ইতিহাস সচেতন মানুষজন। তার স্মৃতিতে ১১৪তম প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধা নিবেদন করে বক্তৃতা করেন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুনীল পাল, প্রাক্তন প্রধান শিক্ষিকা কল্পনা বসু, বিশিষ্ট আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক ও প্রাবন্ধিক কৃশানু ভট্টাচার্য প্রমুখ সুধীজন। শ্রোতাদের অধিকাংশ ছিলেন বয়স্ক। অনুষ্ঠানের পুরোধা সুনীল পাল বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিষয়ে যারা দেশের মঙ্গলসাধন করেছেন, তাদের অনেকের স্মৃতিধন্য এই সোদপুর-পাণিহাটি অঞ্চল। আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চায় নবপ্রজন্মকে প্রাণিত করা প্রয়োজন। আগামী বছর এলাকার প্রতি বিদ্যালয়ে এদের অবদান স্মরণে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে তারা শিক্ষক সমাজকে অনুরোধ জানাবেন ”
এখানে অর্থাৎ পনেটির (পানিহাট্টির) বাগানবাড়িতেই জোড়াসাঁকোর বাইরে বেরিয়ে প্রথম গঙ্গা দেখেন রবীন্দ্রনাথ। তখন ছিল তাঁর কিশোর বয়স। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় জালিওয়ানালাবাগের নির্মম হত্যাকান্ডে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ কবি প্রাণ জুড়াতে তাঁর অতি“ভালোবাসার ধন” পনেটির(পানিহাটির) বাগানবাড়িতে এসে থেকেছেন। তাঁর পরামর্শে মৃত্যুপথযাত্রী সুকুমার রায়ও জীবনের শেষ বেলায় কিছু সময় পরম শান্তিতে কাটিয়েছেন এখানে। আর গান্ধীতো কতোবার এসেছেন সোদপুর তার হিসেব নেই। “শিক্ষাব্রতী রোকেয়ার পরিকল্পনায়, তার সহকর্মী ব্রাহ্মমহিলাদের অনুরোধে শেরপুরের জমিদার এবাড়িতে ‘গোবিন্দকুমার হোম’ প্রতিষ্ঠা করে অনাথ, দরিদ্র কন্যাদের আশ্রয় দিয়ে শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। একটি অনাথ মেয়ের বিয়ে উপলক্ষেও এবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন। শিক্ষাব্রতী রোকেয়া তার স্কুলের ছাত্রীদের নিয়ে ১৯২৮ সালে এই ভবনে এসেছিলেন ”
“১৯৩২ সালে ৯ ডিসেম্বর বিকালে রোকেয়ার সমাধি হয় রহমান পরিবারের বাগানে। সেখানে গড়ে উঠেছে পাণিহাটি বালিকা বিদ্যালয় ভবন। ঐতিহাসিক অমলেন্দু দে ও অধ্যাপক শান্তিময় রায় সমাধিস্থান স্কুল প্রাঙ্গনে নির্ধারণ করেন। সৈয়দ মনসুর হবিবুল্লাহ’র অনুপ্রেরণায় সুনীল পাল এবং স্কুল কর্তৃপক্ষের যৌথ উদ্যোগে সেখানে ১৯৯৫ সালে রোকেয়া সমাধিফলক স্থাপিত হয়। ১৯৯৭ সালে আনুষ্ঠানিক উন্মোচন করেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ও লেখক বদরুদ্দিন উমর। রোকেয়া স্মরণে ভারতে নিয়মিত ‘৯ ডিসেম্বর রোকেয়া দিবস’ পালন শুরু হল। রোকেয়া সমাধিফলক প্রতিষ্ঠালগ্নে ধ্বংসোন্মুখ ‘পেণেটির বাংলোবাড়ি’‘ঐতিহাসিক’ ঘোষণা করে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহায়তায় এর সংস্কার করেন।”
সুনীল পালের নেতৃত্বে এখানে গড়ে উঠেছে রি.ভা.র.-রোকেয়া ইন্সটিটিউট অব ভ্যালু এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ। রোকেয়া দিবসের কাছাকাছি কোন রবিবার শিক্ষার্থীদের যুক্ত করে, সারাদিনের অধিবেশনে সমাজ উন্নয়নে মহিলাদের অবদান বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ পাঠ ও আলোচনা হয়।
আমি যখন রোকেয়া, তাঁর দাফন এবং কবরস্থানের সঠিক অবস্থিতি নিয়ে নানা জায়গায় খোঁজখবর নিচ্ছি, তখন রোকেয়ার ওপর গণশক্তি পত্রিকায় (২৩ডিসেম্বর, ২০১৬) একটি লেখা বেরোয়। কৃশাণু ভট্টাচার্য্যের এই লেখাটিতে রোকেয়ার কবরের প্রসঙ্গটি আবার এসেছে। রোকেয়ার মৃত্যুর অব্যবহিত আগের থেকে মৃত্যু ও দাফন পর্যন্ত সময়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি্ বেগম রোকেয়া-প্রসঙ্গে লিখেছেনঃ
“এক বৃত্তাকার জীবনসংগ্রাম প্রায় শেষ হয়ে আসছে। কঠোর পরিশ্রম আর উদ্বেগ দুই’ই রোগের কারণ। ১৯৩২-এর ৯ই ডিসেম্বর প্রয়াত হলেন ১৬২ লোয়ার সারকুলার রোড যেখানে বর্তমান ভুপেশ ভবন অবস্থিত। কিন্তু সহিষ্ণুতা অসহিষ্ণুতার সংগ্রাম মৃত্যুতেও সক্রিয়। বুআলিম সজিদে জানা জাহলো। কবর দেবার জন্য জায়গা মিলল না কলকাতায়। আবদুর রহমানের পারিবারিক কবরখানা সোদপুরের সুখচরে গঙ্গার ধারে সমাহিত হলেন রোকেয়া।
তারপর বহু বছর বাদে ঐ স্থানে গড়ে উঠল পানিহাটি বালিকা বিদ্যালয়। কবরে শুয়েও রোকেয়া নিয়মিত অনুভব করেন মেয়েদের কলকাকলি।”
(কৃশাণু ভট্টাচার্য্য, নারীশিক্ষা প্রসারের অগ্রপথিক রোকেয়া,গণশক্তি, ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৬)
এই আব্দুর রহমান যার পারিবারিক গোরস্তানে বেগম রোকেয়াকে কবর দেওয়া হয়েছিল বলে একাধিক কাগজে উল্লেখ করা হয়েছে, এই আবদুর রহমান কে, এবং রোকেয়া পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কী, এই তথ্য আমি নিশ্চিতভাবে খুঁজে পাইনি। জিনাত রহমানের মতে এবং স্থানীয় একাধিক বয়স্ক লোকের কথা অনুযায়ী, আবদুর রহমান বেগম রোকেয়ার ছোটবোন হোমায়রার স্বামী যিনি ২৪ পরগণায় বাস করতেন। সেখানে কথিত আছে তিনি-ই রোকেয়ার কবরের জন্যে নিজের জমি দান করেছিলেন যখন রোকেয়াকে কলকাতায় কবর দেওয়া সম্ভব হয়মি। কিন্তু আগেই বলেছি, অন্য প্রায় সকল উৎস অনুযায়ী বেগম রোকেয়ার ছোট বোন, হোমায়রা খাতুনের স্বামীর নাম তোফাজ্জ্বল হোসেন চৌধুরী এবং তাঁর বাড়ি ছিল পূর্ববঙ্গের দোহা অঞ্চলে। তিনি তাঁর পুত্র পরবর্তিকালে খ্যাতিমান নজরুল গবেষক ও বিশেষজ্ঞ আমীর হোসেন চৌধুরীকে ছোট রেখে অল্প বয়সে মারা যান। তারপরেই হোমায়রা নাবালক পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় বেগম রোকেয়ার কাছে চলে আসেন। তবে কি হোমায়রা আব্দুর রহমান বলে কাউকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছিলেন? এমন কোন ঘটনা বা কোন রকম তথ্য লিখিত আকারে কোথাও চোখে পড়েনি। এই ব্যাপারে সঠিক ও বিস্তৃত তথ্য কারো জানা থাকলে তা প্রকাশ করে অথবা সরবরাহ করে আমাদের কৃতজ্ঞতাভাজন হবার আমন্ত্রণ জানাই। মনে প্রশ্ন থেকে যায় আবদুর রহমান যিনি পরবর্তিকালে জ্যোতির্ময়ী রোকেয়া বলে রোকেয়ার জীবনী লিখেছেন, তাঁর পরিচয় ও রোকেয়া-পরিবারের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতার বিষয়টা। জিনাত রহমানের সর্বশেষ বক্তব্য, পাণিহাটি অঞ্চলের অতি সাম্প্রতিক ভাষ্য অনুযায়ী এমন কথাও প্রচলিত রয়েছে যে আবদুর রহমান বেগম রোকেয়ার আপন বোনের স্বামী নন, রোকেয়ার এক কাজিনের (খালাতো, মামাতো বা ফুফাত বোনের) স্বামী। এই বিশেষ প্রসঙ্গ ছাড়াও যদি অন্য কো্ন তথ্য থেকে থাকে বা আমার এই রচনায় যদি তথ্য বিভ্রান্তি খুঁজে পান, সকলের কাছে অনুরোধ রইল, সুস্পষ্টভাবে তার উল্লেখ করে সেসব শুধরে দেবার জন্যে সঠিক তথ্যও সংযুক্তির সন্ধান দেবেন। আমরা চাই না এই মহান নারী জীবদ্দশায় যেমন অনেক ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়েছেন, মৃত্যুর এতো বছর পরেও এক-ই ভাবে তাঁর সম্পর্কে সঠিক তথ্যের ব্যত্যয় ঘটে।

বেগম রোকেয়া স্মরণে ও সম্মাণে বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকল্প ও স্থাপনা
রোকেয়া রচনা পুনঃপ্রকাশ:
বাংলা একাডেমী রোকেয়া রচনাবলী নামে রোকেয়ারচিত সামগ্রিক সাহিত্য প্রকাশ করে এবং পুরনো সংস্করণ ফুরিয়ে গেলে নতুন সংস্করণ করে তা ছাপিয়ে রোকেয়ার সাইত্যের প্রতি পাঠকের আগ্রহ ধরে রেখেছে।

ডিসেম্বর ৯ রোকেয়া দিবস উদযাপন
যেহেতু বিস্ময়করভাবে বেগম রোকেয়ার জন্মদিন আর মৃত্যুর দিন বছরের এক-ই দিনে পড়েছে, সেই বিশেষ দিনটিকে রোকেয়া দিবস বলে মেনে নিয়ে সেই দিন বেগম রোকেয়ার কর্মময় জীবন ও তাঁর অবদানের কথা সশ্রদ্ধভাবে স্মরণ করা হয়। নারী জাগরণের বিশেষ করে মুসলমান নারী জাগরণের অগ্রদূতকে সামনে রেখে নারীর প্রত্যাশিত অধিকার আদায়ের জন্যে বিভিন্ন কর্মসূচি ও আন্দোলণনের দিকনিশানা ঠিক করার প্রয়াশ চলে সেদিন। রোকেয়া দিবস উপলক্ষে সারাদিনব্যাপিতো বটেই কোথাও কোথাও সন্ধ্যা ছাড়িয়ে গভীর রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠান চলে।
এর মধ্যে বিশেষ গুরুতপূর্ণ পদক্ষেপ হলো, রোকেয়া দিবস উপলক্ষে প্রতি বছর রাষ্ট্রুপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বাণী প্রদান প্রায় প্রতিটি দৈনিক খবরের কাগজে ছাপা হয়। এছাড়া জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক পত্রিকায় এই দিবসটির গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে রোকেয়ার কর্মজীবন ও সাহিত্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা চলে। কোন কোন পত্রিকা/সাময়িকী এই উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। রোকেয়া হলে এবং রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রে রোকেয়া বিষয়ক আলোচনা ও পুরস্কার বিতরনী সভা অনুষ্ঠিত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ও প্রধান ছাত্রীবাসের নামকরণ “রোকেয়া হল”
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম ছাত্রীবাস অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের আবাসনের জন্যে নির্মিত সবচেয়ে প্রাচীন বাসস্থানের নাম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে “রোকেয়া হল” করে নারী শিক্ষায় নিবেদিত এই মহান নারীর অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখা হয়েছে।

পায়রাবন্দ গ্রামে গণউন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান “বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র”
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন স্মরণে বাংলাদেশ সরকার একটি গণউন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন। বাংলাদেশের রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে পৈতৃক ভিটায় ৩ দশমিক ১৫ একর ভূমির ওপর নির্মিত হয়েছে বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র। এতে অফিস ভবন, সর্বাধুনিক গেস্ট হাউজ, ৪ তলা ডরমেটরি ভবন, গবেষণা কক্ষ, লাইব্রেরি ইত্যাদি রয়েছে। স্মৃতিকেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের শিশু ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশের ৭ম বিভাগ হিসেবে রংপুর বিভাগের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ‘রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়’ ৮ অক্টোবর ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দ ‘নারী জাগরণের অগ্রদূত’ হিসেবে তাঁর নামকে স্মরণীয় করে রাখার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম রাখা হয় বেগম রোকেয়াবিশ্ববিদ্যালয়।

বেগম রোকেয়া পদক:
নারী জাগরণের ক্ষেত্রে বেগম রোকেয়ার অবিস্মরণীয় অবদান ও স্বীকৃতির স্মৃতিস্বরূপ প্রদত্ত বাংলাদেশ সরকারের একটি রাষ্ট্রীয় পদক। প্রতিবছর ডিসেম্বরের ৯ তারিখ বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যুর তারিখে সরকারিভাবে এ পদক প্রদান করা হয়। নারী কল্যাণ সংস্থা ১৯৯১ খৃস্টাব্দ থেকে এ নামের একটি পদক প্রদান করা শুরু করে। সরকারিভাবে ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে এ পদক প্রদান করার সূচনা ঘটে। পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রত্যেককে এককালীন এক লক্ষ টাকার চেক, ১৮ ক্যারেট মানের পঁচিশ গ্রাম ওজনের একটি স্বর্ণপদক এবং একটি সম্মাননাপত্র প্রদান করা হয়। এই বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালে দুইজন নারী, অারমা দত্ত (সমাজসেবা) ও বেগম নূরজাহানকে (শিক্ষা) রোকেয়া পদকে ভূষিত করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া বেগম রোকেয়া পদক অর্জনকারীদের মধ্যে ড.নীলিমা ইব্রাহিম (১৯৯৬), শামসুন নাহার মাহমুদ (১৯৯৫, মরনোত্তর), বেগম মেহেরুন্নেসা খাতুন (২০১১), হামিদা খানম (২০১১, মরণোত্তর), জোহরা বেগম কাজী (২০০২), মেহের কবীর (২০১০) ও আয়েশা জাফর (২০১০) প্রমূখ উল্লেখযোগ্য।

ডাক টিকিট:
বেগম রোকেয়ার ভূমিকাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বাংলাদেশ ডাক ও তার বিভাগ তাঁর ছবিসহ ডাকটিকিট প্রবর্তন করেন।

ভারত ও ইংল্যান্ডে রোকেয়া স্মরণ ও শ্রদ্ধার্ঘ:
রোকেয়ার জন্মশতবর্ষ ভারতে তেমনভাবে পালিত না হলেও উৎস মানুষ গ্রন্থে ও পত্রিকায় রোকেয়ার রচনা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ শুরু হয়। প্রকৃতপক্ষে রোকেয়ার সোদপুরে কবর আবিষ্কারের পর থেকে যেন রোকেয়ার অবদান ও মর্যাদা সম্পর্কে নবমূল্যায়ণের সূচনা ঘটেছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক স্তরে বাংলা পাঠ্যে তাঁর লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়। “সুরাহা সম্প্রীতি বার্ষিক রোকেয়া স্মারক বক্তৃতা”র আয়োজন করা হয়। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক অমলেন্দু দের নেতৃত্বে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় সংহতি কেন্দ্র সোদপুরে তাঁর সমাধির সন্ধান পায়। সেখানে স্মৃতিফলক স্থাপিত হলে ‘৯ ডিসেম্বর রোকেয়া দিবস’ পালন শুরু হয়। ২০০০ সালে সল্ট লেকে ‘বেগম রোকেয়া স্মৃতি সরকারী বিদ্যালয়’ হয়। ২০০১ সালে ‘রোকেয়া দিবসে’ রোকেয়া রচনাবলী প্রকাশ করা হয়। শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মীরা যৌথভাবে সারা ভারতে ২০০৫ সালে রোকেয়ার ১২৫তম জন্মবার্ষিকী পালন করেন। ভারতে ও সর্বত্র প্রগতিশীল মানুষ, শিক্ষালয়, সামাজিক সংগঠন স্বতঃস্ফূর্তভাবে রোকেয়ার চেতনা প্রসারে ব্রতী হয়েছেন। তাঁর কর্মস্থল কলকাতায় ঐতিহ্যমন্ডিত কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাবিদ হিসেবে এই মহিয়সী নারীর চিত্র শোভা পাচ্ছে। কলেজ স্ট্রিটের আশুতোষ ভবনে একটি কক্ষ তাঁর নামে রাখা হয়েছে। লন্ডনে বিশ্ববিখ্যাত Rose Brufford College of Theatre & Performance-এর প্রাক্তন ছাত্রেরা “Rokeya’s Dream” team গঠন করে দেশে দেশে মানবাধিকার, পরিবেশ ও ভাবনা ও বিশ্বশান্তির ওপর রোকেয়ার ভাবনা ও বাণীকে বার্তার মাধ্যমে চারপাশে ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করছে। সল্টলেক বেগম রোকেয়া স্মৃতি স্কুলের শিক্ষিকাদের উদ্যোগে সেখানে তাঁর আবক্ষ মূর্তি স্থাপিত হয়েছে। (সকালের খাস খবর, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬)।
“আজ রোকেয়াদিবস” এই শিরোনামে সকালের খাস খবর-এর এই প্রতিবেদনটি শুরু হয় এভাবে “৯ ডিসেম্বর, ’১৬ রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ১৩৭তম জন্মবার্ষিকী ও ৮৫তম প্রয়াণদিবস। রোকেয়া জন্মমৃত্যু দিবস ভারতে, বাংলাদেশে, ইংলন্ডে ও অন্যত্র ‘রোকেয়াদিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে। যাঁরা অশিক্ষা, অজ্ঞানতা, কুসংস্কার, ধর্মবিদ্বেষ, কূপমন্ডুকতার অন্ধকার দূর করে, জ্ঞানের আলোকে উদ্ভাসিত যুক্তিবাদী মানবিক সমাজ গড়ার জন্য সংগ্রাম করেছেন, এদেশে তাঁদের পুরোধা ছিলেন রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ। রোকেয়া(১৮৮০-১৯৩২)মানবাধিকার ও বিজ্ঞানচেতনা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামী ধারায় রামমোহন, বিদ্যাসাগরের সার্থক উত্তরসূরী। সমাজের সর্বাঙ্গীন মঙ্গলের জন্য তাঁর কর্মক্ষেত্র ছিল নারীজাগরণ।”

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাপস গায়েন — december ২৯, ২০১৬ @ ১১:০২ পূর্বাহ্ন

      পূরবী বসুর,”পাণিহাটি-সোদপুরে রোকেয়ার কবর, রোকেয়া দিবস ও অন্যান্য” লেখাটি পড়ে মুগ্ধ হয়েছি । তথ্যবহুল হয়েও এই লেখাটি এক গভীর সংবেদনা থেকে জাত বলে লেখাটি এক ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে । পূরবীদিকে দেখিনি অনেকদিন । দিদি, নিরন্তর ভালো থাকুন ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পূরবী বসু — december ২৯, ২০১৬ @ ১০:২৬ অপরাহ্ন

      তাপস গায়েন, আপনার মন্তব্যের জন্যে ধন্যবাদ। হ্যাঁ, বহুদিন পরে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ হলো। গত সাড়ে ছয় বছর ধরে আমরা ডেনভার, কলোরাডোয় আছি। যোগাযোগ রাখবেন। আপনার সৃষ্টিশীলতা ও সুসাস্থের জন্যে শুভেচ্ছা রইল।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mostafa Tofayel — জানুয়ারি ২, ২০১৭ @ ৯:১৮ অপরাহ্ন

      পুরবী বসুকে ধন্যবাদ যে তিনি রোকেয়া দিবসকে মর্যাদা দিয়ে রোকেয়া বিষয়ে একটি নিবন্ধ উপহার দিয়েছেন। এমন নামকরা সাপ্তাহিক সাময়িকীও আছে যার পাতায় ৯ ডিসেম্বর সংখ্যার ৩২ পৃষ্ঠার কলেবরে রোকেয়া স্মরণে একটা অক্ষরও ছাপা হয়নি। পুরবী বসু, আপনাকে অনুরোধ করি, রংপুরের সেই স্বল্পবিদ্যাধর লেখক যিনি জীবনী লিখতে গিয়ে আত্মজীবনী বলেছেন, তাকে ক্ষমা করবেন। কিন্তু, ক্ষমা করবেন না জ্ঞানপাপী আর দাম্ভিকদের। আর ক্ষমা করবেন না সেই পন্ডিতদের যারা খ্যাতির জোরে বই লিখে প্রকাশ করেন অথচ রোকেয়া সাহিত্যের সঠিক ব্যাখ্যা দেন না।
      বেগম রোকেয়া সম্পর্কে হুমায়ূন আজাদ তাঁর নারীতে বলেছেন যে রোকেয়া কট্টর নারীবাদী। এর জবাবে মাওলা ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত নারীবাদ ও বেগম রোকেয়া গ্রন্থে মোতাহার হোসেন সুফী বলেছেন, রোকেয়া মোটেও নারীবাদী নন। অশীতিপর মোতাহার হোসেন সুফী গত শতকের পঞ্চাশের দশকে এই বই লিখলে রোকেয়াকে বামপন্থী নারীবাদী বলতেন। নারীবাদের সংজ্ঞায় আমরা পাই: রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানে লিঙ্গীয় সমতা এবং নারীর সম-অধিকার ও স্বার্থ আদায়ের লক্ষ্যে সংগঠিত আন্দোলন। পরবর্তীতে নারীবাদের আওতায় আসে পুরুষের সাথে নারীর আইনী সমতায়নের সুযোগ সৃষ্টিকরণ, শিক্ষালাভের পূর্ণ অধিকার ও সমান সুযোগ; কর্মক্ষেত্রে নারীর সমান সুযোগ ও সমান পারিশ্রমিক; ভোটাধিকার। বিশ শতকে এর সাথে যোগ হয় জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী নির্বিশেষে নারীর অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত অধিকার; বাইরে বেড়ানোর অধিকার এবং যৌন অধিকার।
      নারীবাদ বিষয়টিকে আলোচনার প্রদীপে দীপ্ত করেন যিনি, তাঁর নাম মেরি ওলস্টোনক্রাফ্ট (১৭৫৯-৯৭)। নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে আন্দোলনে রূপ দেবার জন্য তিনি লেখেন A Vindication of the Right of Woman (১৭৯২) । এই বইয়ের উৎসর্গপত্রে তিনি বলেন,
      “Contending for the rights of woman, my main argument is built on this simple principle that if she be not prepared by education to become the companion of man, she will stop the progress of knowledge and virtue; for truth must be common to all, or it will be in-efficacious with respect to its influence on general practice… They (women) may be convenient slaves, but slavery will have its constant effect degrading the master and the abject dependent’’.
      মেরির ঘোষণাপত্রটুকুর বাংলা তরজমা করলে দাঁড়ায়:
      নারীর অধিকারের স্বপক্ষে বলতে গিয়ে আমার যুক্তির পেছনে আমি উত্থাপন করেছি একটি সরল নীতিকথা: সেটি হচ্ছে, পুরুষের যোগ্য সঙ্গী হওয়ার মতো শিক্ষাগত প্রস্তুতি যদি নারীর না-থাকে, সেক্ষেত্রে সাধারণ জীবনযাত্রায় তার বিরূপ ফলাফল দেখা দেবে।… নারীরা হয়ে পড়বে ব্যবহারযোগ্য দাস বা দাসী, এবং তাদের দাস্য অবস্থা প্রভুদের মানসিকতাকে হীনমন্যতার পর্যায়ে নগ্নভাবে নামিয়ে নিয়ে আসবে।
      মেরির ওই ঘোষণাপত্র ও বেগম রোকেয়ার ‘অর্ধাঙ্গী’ নামক প্রবন্ধের বক্তব্য একই। মেরি যা বলেছেন ঘোষণার সাদামাটা ভাষায়, রোকেয়া তা-ই বলেছেন উপমা-উৎপ্রেক্ষার অলংকার সাজিয়ে। ‘অর্ধাঙ্গী’তে রোকেয়া বলেছেন,
      ‘‘তবে দ্বিচক্রে শকটের গতি দেখাই! যে শকটের এক চক্র বড় (পতি) এবং এক চক্র ছোট (পত্নী) হয়, সে শকট অধিক দূরে অগ্রসর হইতে পারে না; সে কেবল একই স্থানে (গৃহকোণেই) ঘুরিতে থাকিবে। তাই ভারতবাসী উন্নতির পথে অগ্রসর হইতে পারিতেছেন না।’’
      মেরি তার ভিন্ডিকেশনে বিশ্বের তাবৎ নারীর সমঅধিকার আদায়ের দাবি উপস্থাপন করেছেন। এবং সে-দাবি যা-তে আন্দোলনে রূপলাভ করে, তেমন প্রণোদনা দিয়েছেন। মেরির লক্ষ্য বিশ্বের সকল কালের সকল দেশের নারী সমাজ। রোকেয়ার লক্ষ্য ভারতবাসী নারীসমাজ, বিশেষত মুসলমান সমাজের অন্তর্ভূক্ত যারা। মেরি তাঁর স্বঅবস্থানে স্বকীয় নারীবাদ প্রচার করেছেন; রোকেয়া তাঁর অবস্থানে স্ককীয় নারীবাদ প্রচার করেছেন।
      মেরির ঘোষণাপত্রে শিক্ষায় অনগ্রসর কিংবা শিক্ষাবঞ্চিত নারীর দাসে পরিণত হওয়ার আশংকার কথা বলেছেন। রোকেয়া বলেছেন, স্বামী স্ত্রীর প্রভু নয় কিংবা স্বামীর দাসী নয়। ‘অর্ধাঙ্গী’ শিরোনামযুক্ত প্রবন্ধেই তিনি বলেছেন।
      ‘‘স্বীকার করি যে, শারীরিক দুর্বলতাবশত নারীজাতি অপর জাতির সাহায্যে নির্ভর করে। তাই বলিয়া পুরুষ ‘প্রভু’ হইতে পারে না।’’
      এর কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, ‘‘জগতে দেখিতে পাই প্রত্যেকেই প্রত্যেকের নিকট কোনো-না-কেনো সাহায্যে প্রার্থনা করে, যেন একে অপরের সাহায্য ব্যতীত চলিতে পারে না।’’
      প্রতীতি হয় যে, রোকেয়া মেরি ওলস্টোনক্রাফ্টের ভিন্ডিকেশন পড়ে থাকবেন। দু’য়ের বক্তব্যের মধ্যে যথেষ্ট মিল আছে। তবে হুমায়ূন আজাদ তাঁর নারীতে রোকেয়া সম্পর্কে বাড়াবাড়িমূলক মন্তব্য করে বলেছেন, ‘‘মেরি ওলস্টোনক্রাফ্ট অপেক্ষা রোকেয়া কট্টর নারীবাদী।’’ হুমায়ূন আজাদ আরো বলেছেন, ‘‘রোকেয়ার সমাজের পুরুষ তাঁর কাছে ছিলেন পশুর সমান। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি পুরুষ প্রসঙ্গ তোলেনই নি; পিতাকে তিনি প্রায় পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন, স্বামী ও ভাইদের স্বীকার করেছেন অনেকটা করুণা করে।’’ হুমায়ূন আজাদ রোকেয়ার স্বামীভক্তি প্রসঙ্গেও মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন,
      ‘‘ রোকেয়া নিজে পতিধ্যান করেননি। তিনি ( বেগম রোকেয়া) বিদ্যালয়ের নামবদলের জন্যও প্রস্তুত ছিলেন; কিন্তু তাঁর পুরুষ অভিভাবকেরা তাতে রাজী ছিলেন না; কেননা তাঁরা সাখাওয়াত মেমোরিয়াল নামটিতে দেখতেন পুরুষতন্ত্রের জয়।’’ হুমায়ূন আজাদের এসব কথায় আবেগের আতিশয্য প্রকাশ পেয়েছে। আবেগের বারুদ পাতায় পাতায় পুরে দিয়ে তিনি তাঁর নারী গ্রন্থ বাজারে ছেড়ে দেন, উদ্দেশ্য ছিল বাজার মাত করা। তাঁর জানা ছিল না যে, রংপুরের পায়রাবন্দে প্রতিষ্ঠিত বালিকা বিদ্যালয়টির নাম ‘রোকেয়া মেমোরিয়াল গার্লস হাই স্কুল’’ ; যদিও পায়রাবন্দ-মিঠাপুকুরবাসী জনগণ আজ পর্যন্ত পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বিশ্বাস করেন এবং এলাকাটি নারীশিক্ষায় অনগ্রসর। বিদ্যালয়ের নামকরণ ১৯১১ সালে হয়েছিল অর্থদাতার প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য; এখনকার দিনেও তা-ই হয়ে থাকে। পায়রাবন্দ মিঠাপুকুরের জনগণ বেগম রোকেয়ার প্রতি সম্মান দেখিয়েই বিদ্যালয়টির নামকরণ করেছেন, নারীতন্ত্রের জন্য নয়, যেমন ছিল না সাখাওয়াত মেমোরিয়াল নামকরণ পুরুষতন্ত্রের সমর্থনে। রোকেয়ার জীবনীগ্রন্থ থেকে জানা যায়, তিনি ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দ থেকেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের ভবিষ্যত নিয়ে। তিনি তৎকালীন সরকারকে চিঠিপত্র দিয়ে অনুরোধ করেছিলেন স্কুলটিকে সরকারীকরণ করে নেওয়ার জন্য । নামকরণ নয়; নামকরণের লোভ বিসর্জন দিয়ে তিনি স্কুলটির স্থায়িত্ব চেয়ে ছিলেন। সরকারই নতুন নামকরণ প্রস্তাব করেছিল, ‘‘ Government H.E. School for Muslim girls’’ । তা-তে তিনি রাজি হয়েছিলেন। স্কুলটি টিকে থাকুক্- এটাই ছিল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য; পুরুষতান্ত্রিকতার অবতারণা এখানে অতিশয়োক্তি। রোকেয়ার স্বামীভক্তি, পিতৃভক্তি, ভ্রাতৃশ্রদ্ধা-এসব কথা হুমায়ূন আজাদ তাঁর বইয়ের বাজারে বারুদ জোগানোর তাগিদেই করেছিলেন, সৎ-উদ্দেশে নয়। হুমায়ূন আজাদ বাড়াবাড়ি করে বলেছেন, ‘‘রোকেয়া পতিধ্যান করেননি।’’ রোকেয়ার ব্যক্তিগত জীবনকাহিনী এ-তথ্য সমর্থন করে না। বরং, তাঁরা উভয়ে চমৎকার পারস্পরিক সম্পর্কসুন্দর উন্নত জীবনযাপন করেছেন, যা-ছিল উন্নত অধ্যয়ন, উন্নত সমাজনির্মাণ ও বিনিময়বহুল সমবায়ী প্রতিশ্রুতিতে ঋদ্ধ। রোকেয়ার ভ্রাতৃশ্রদ্ধাও ছিল প্রবল। মাতৃশ্রদ্ধা অবশ্যই ছিল, তাঁর মা কলকাতায় তাঁর সাথেই থাকতেন; সেখানেই ১৯১০ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। রোকেয়ার বাবা শেষ জীবনে মামলার আসামী হয়ে, জমিদারী হারিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতেন। পায়রাবন্দের আফতাব উদ্দীন নামে প্রতিবেশি এক জোতদারের লেখা পুঁথিকাব্য‘পায়রাবন্দ কাহিনী’ থেকে জানা যায় যে তিনি গৃহপরিচারিকা আয়না দাসীর গুম্ বিষয়ক একটি সরকার-বাদী মামলায় ফেরারি ছিলেন। বাবার এ-অবস্থায় কন্যার পক্ষে তাঁর প্রতি সমব্যাথী হওয়া বা যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব ছিল না। তবে ছোট বোন হোমায়রাকে তিনি কলকাতায় তাঁর সাথেই রেখেছিলেন। মিস্টার সাখাওয়াত হোসেনকে স্বামী হিসেবে পেয়ে রোকেয়া তাঁর সন্তুষ্টি প্রকাশেও পিছপা ছিলেন না। মিষ্টার সাখাওয়াত প্রভু ছিলেন না, ছিলেন অকৃত্রিম বন্ধু এবং আত্মিক ও সামাজিক উন্নতির সোপান। রোকেয়ার নিজের ভাষ্য,
      ‘‘আমাকে সাহিত্যচর্চায় তিনিই উদ্বুদ্ধ করিয়াছিলেন। বলিতে কি, তিনি উৎসাহ না দিলে এবং আমার শ্রদ্ধেয় স্বামী অনুকূল না হইলে আমি কখনই প্রকাশ্য সংবাদপত্রে লিখিতে সাহসী হইতাম না।’ (‘লুকানো রতন’ প্রবন্ধ, মতিচুর থেকে)
      হুমায়ূন আজাদের মন্তব্য, ‘মেরি ওলস্টোনক্রাফ্ট অপেক্ষা কট্টর নারীবাদী ছিলেন রোকেয়া’ শুনে ক্ষেপে গিয়েছেন মোতাহার হোসেন সুফী। তিনি তাঁর বই নারীবাদ ও বেগম রোকেয়া, প্রকাশক মাওলা ব্রাদার্স, ফেব্র“য়ারি ২০১৪-তে পশ্চিমা বিশ্বের সমাজে নারী-পুরুষের স্বাধীন মেলামেশা ও লিভ্ টুগেদারকে ধিক্কার দিয়েছেন। আসলে হুমায়ূন আজাদ নিজে ছিলেন স্বাধীন মেলামেশা ও লিভ্ টুগেদারের সমর্থক; এবং তিনি চেয়েছিলেন রোকেয়ার গায়ে কাদা মেখে দিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে। হুমায়ূন আজাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ছোট একটু মন্তব্যই যথেষ্ট ছিল মোতাহার হোসেন সুফীর জন্য : Know thyself’, not Rokeya। আমরা জানি, রোকেয়া ছিলেন নিজ ধর্ম, নিজ জাতি, নিজ দেশ ও সমাজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেই সমাজবিপ্লবী এবং সম অধিকার প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলনের পথিকৃত এবং অগ্রণী। হিজাব পালনকারী অথচ বোরখা অবরোধপ্রথাবিরোধী রোকেয়া নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমানাধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক আন্দোলনে রূপ দিয়ে অবশ্যই বিশিষ্টার্থে ও সম্মানজনকভাবে নারীবাদী। লিঙ্গীয় সমতার যৌনতা প্রসঙ্গ সবার ক্ষেত্রেই বিচার্য হতে হবে, এমনটা নয়। এ প্রসঙ্গ নারীবাদের আবশ্যকীয় শর্তও নয়, এমনকী হুমায়ূন আজাদ বললেও! অমর্ত্য সেন আর্থসামাজিক নারীবাদী আন্দোলনের নিরীখেই রোকেয়াকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেন।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com