আমি জন্মগ্রহণ করিনি

মুহম্মদ নূরুল হুদা | ২৭ december ২০১৬ ১২:৪৫ অপরাহ্ন

Hoqচিরজীবনে প্রবেশের পর প্রথমবারের মতো তাঁর জন্মদিন পালনের মুহূর্তে আমি যখন সৈয়দ শামসুল হকের কবিতাসমগ্র ১-এর পাতা উল্টাতে থাকি অনেকটা অন্যমনে, তখনি চোখ আটকে যায় বর্তমান রচনার শিরোনামটির প্রতি। এটি আসলে তাঁর রচিত জন্মদিন বিষয়ক অনেক কবিতার একটি। কবিতাটি তিনি লিখেছিলেন ১১ ডিসেম্বর ১৯৮৯ তারিখে, বগুড়ায় বসে। অর্থাৎ তাঁর সেবারের জন্মদিনের ১৬ দিন পূর্বে। অন্যরকম অভিব্যক্তির এক প্রতিচিত্রী বা দ্বান্দ্বিক বা সাংঘর্ষিক ভাষ্য এটি। প্রায় পাঁচ পৃষ্ঠার এই কবিতাটিতে অসম দৈর্ঘের ১৪৫টি পঙক্তি ও ৯টি আন্ত:সম্পর্কিত স্তবক আছে। আমি প্রথমবার দ্রুত চোখ বুলাতে গিয়েই আটকে যাই, এবং বুঝতে পারি, খুব সহজে পাঠোদ্ধার করার মতো রচনা এটি নয়। নিজের জন্ম-সংক্রান্ত কিছু অকপট স্বীকারোক্তির মাধ্যমে প্রান্তমুক্ত পদ্ধতিতে রচিত এই কাব্যবয়ানে তিনি তাঁর ব্যক্তিজন্মের প্রসঙ্গ টেনে স্বসমাজ ও পরিপার্শ্বকে এমন এক অন্তর্বয়িত আখ্যানে পরিণত করেছেন, যার দৃষ্টান্ত সমকালীন বাংলা কবিতায় আগে পেয়েছি মনে পড়ে না। প্রথম পঙক্তিতেই তিনি তিনবার উচ্চারণ করছেন শিরোনাম-বাক্যটি : “আমি জন্মগ্রহণ করিনি, আমি জন্মগ্রহণ করিনি, আমি জন্মগ্রহণ করিনি।” যেন কোনো পার্লামেন্টের মাননীয় মহা-সম্ভাষক একটি মীমাংসিত সিদ্ধান্তের সত্যোচ্চারণ করছেন নির্বিকার চিত্তে।

তার পরেই তাঁর উক্তি : “আমাকে জন্ম দেয়া হয়েছে – এবং কী সেই জন্ম?” বুঝতে পারছি তিনি তাঁর জন্ম নিয়ে তৃপ্ত নন অন্য অনেকের মতো, বরং তিনি এই ব্যক্তিজন্মের কূটাভাসকেই উন্মোচিত করতে চান প্রশ্নের পর প্রশ্ন বলয়িত করে, এবং সে-সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে খুঁজে। তৃতীয় পঙক্তিতেই তিনি স্বীকার করেন, “এক পিচ্ছিল জরায়ু ছিঁড়ে/ আমাকে বেরিয়ে আসতে হয়েছে ন’মাস ন’দিনের আগেই, কারণ,/ কাম কোনো সন্তানের জন্ম দিতে পারে না যেখানে চলছে যুদ্ধ।” সহেজেই অনুমেয়, এই পঙক্তিতে তিনি দশমাস দশদিনের বদলে ‘ন’মাস ন’দিন’ ও ’যুদ্ধ’ পরিস্থিতির কথা বলে বাংলাদেশের ন‘মাস-স্থায়ী মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন তাঁর চিরাচরিত কনফেশনাল পদ্ধতিতে, যার প্রথম সফল প্রয়োগ দেখেছি “বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা”য়। আত্মজৈবনিক উচ্চারণকে সামষ্টিক সমাজসত্যের দর্পন করার এই কুশলতা তাঁর মজ্জাগত।
ভাতঘুমের পর জনক-জননীর জান্তব সঙ্গম ও তারপর কোটি কোটি কীটরূপী শূক্রাণু থেকে যে সন্তানের জন্ম, সে শরীরধারী হওয়ার পর পায়ে হেঁটে বা দ্রুতগামী বাস, জলযান, বা অন্য কোনো বাহনে গ্রামবাংলার টক আমগাছের ছায়া মাড়িয়ে বা শ্রীকান্তের গা-ছমছম-করা গ্রামের ভিতর দিয়ে কেবলি সামনে এগোতে থাকে। এ হচ্ছে সনাতন বাঙালি ব্যক্তির চিরচেনা চেহারা। তাকে পাল্টাতে চান তিনি, কিন্তু পারেন না: “আমি তো বদলাতে পারি না বর্তমান –”। কারণ সামাজিক ও সামষ্টিক পরিবর্তন একক ব্যক্তির সাধ্যাতীত, তার জন্যে চাই সামষ্টিক উদ্যোগ ও কর্মযজ্ঞ। তিনি একক ব্যক্তির নানামাত্রিক পতনের সাক্ষী : “আমি তো মুখেই বলি, পাঠ নিচ্ছি ভবিষ্যতের / এবং দেখছি একের পর এক প ত ন আমার পিতার,/ আমার বোনের,/ আমা মায়ের,/ আমার বন্ধুর -/ দেখছি মাইকের উত্থিত লিঙ্গ ধরে যশোপ্রার্থীদের বীর্য,বমন/ কবিতার সম্মেলনে/ সড়কদ্বীপের সভায় এবং গণতন্ত্রের দাবিতে কোনো সমাবেশে।/”
এ বর্ণনায় যেমন আছে ব্যক্তিক উদ্যোগের ব্যর্থতা ও বিপর্যয়ের কাহিনী, তেমনি আছে স্বাধীনতাকামী ব্যক্তিবাঙালির ওপর হানাদারদের গণহত্যা ও নির্যাতনের কবিতাসমম্মত ইঙ্গিত। এমনকি তিনি লক্ষ্যবিবর্জিত কাব্যিক, সাংস্কৃতিক বা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দেউলিয়াপনাকে কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি। এ এক চরম আত্মসমালোচনা ও আত্ম-বীক্ষণ। কেননা আমাদের অধিকাংশ কাব্যিক, সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা যতখানি ব্যক্তিক আত্মোন্নয়নের স্বার্থ-প্রণোদিত, ততখানি সামষ্টিক মঙ্গলের স্বার্থে নিবেদিত নয়। এমনতরো আত্মরতিপরায়ণ বাংলাদেশে তার জন্ম নেয়া কাম্য নয় তাঁর। তাই তিনি নিজের জন্মনদী ধরলার তীরে দাঁড়িয়ে বলতে চান, “আমি জন্মগ্রহণ করিনি, আমাকে জন্ম দেয়া হয়েছে/ এক প্রেমহীন অন্ধকারে, রমণসিক্ত কাথায়, / বনবেড়ালের ক্রুদ্ধ চিৎকার এবং দূরে দূরে ফেউয়ের ডাকের ভিতর; এক পরিকল্পনাহীন সঙ্গমের পরিণাম আমি।/”
কাজেই এই পরিকল্পনাহীন জন্ম তাঁর প্রার্থিত নয়। এটি তাঁর কাছে না জন্ম, না জীবন, না বাস্তসম্মত সংসারযাপন। বিরুদ্ধ সঙ্গমে তাঁর জননী সন্তান প্রসব করতে করতে ভাগাড়ে অন্তিম শয্যায় শায়িত মৃত্যুপথযাত্রী গাভীর মতো আকাশের দিকে চোখ রেখে প্রহর গুণতে থাকে। কোটি কোটি দুঃস্বপ্নের জননী এই রমণীর প্রতি তাঁর অশেষ শ্রদ্ধা ও অনুকম্পা। বহমান কাল ধরে কেবল অক্ষম সন্তানের জন্মদাত্রীর বিপরীতে তিনি প্রত্যাশা করেন এক সক্ষম জননী, যিনি জন্ম দেবেন মুক্তিযোদ্ধা সন্তান, যার কোমরে বাংলার বিজয়ী তলোয়ার। তিনি নিজেকে পরাজিত রাজবংশের উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখতে চান না, বরং দেখতে চান সমস্ত পরাজয়কে হটিয়ে দিয়ে প্রাগ্রসর বিজয়ীর ভূমিকায়।

এই কৃষিভিত্তিক সমাজে লাঙল ও প্রজনন-যন্ত্র প্রায় সমান সক্রিয়। এই অনন্য প্রাকৃতিক সমৃদ্ধির দেশে পুরুষ-রমণী তাদের প্রেমময় মিলনে জন্ম দেবে অনন্য মানবমানবী। তাই কবির জন্মদানের পরিকল্পিত প্রক্রিয়া তার মতে এরকম : ‘এবং আমার সংগে থাকতো আমার রমণী,/ এবং রাতের উজ্জ্বল সব তারার নিচে/ দু’জনে দুই নিষ্পাপ শিশুর মতো বস্ত্র ত্যাগ করে/ এই আমি তো মিলিত হতাম/ এ ক টি জ ন্ম দে বা র জ ন্যে – / রবীন্দ্র মুজিব কি জয়নুল।” সুপারম্যান নয়, বরং নতুন এক মাঙ্গলিক-নান্দনিক সমাজ নির্মাণের ব্রত নিয়ে কবি ও তার রমণী যে সন্তানের জন্ম দিতে চান, সে ব্যক্তি হয়েও সামষ্টিক ও নান্দনিক কল্যাণ প্রত্যাসন্ন করতে চায়। তা নাহলে কেবল ব্যর্থ ব্যক্তিমানুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ তার জন্যে অযাচিত ও অবাঞ্চিত।
তারপর তিনি বিরুদ্ধাচারণ করছেন এক অস্ত্রশাসিত যুদ্ধবাজ পৃথিবীরও। যেখানে অন্ন ও কবিতার বদলে কেবল ‘অস্ত্র এবং কুচকাওয়াজ’ তেমন স্বদেশে ও বিশ্বেও তিনি জন্ম নিতে নারাজ। কেননা তেমন যুদ্ধবাজ পৃথিবীতে ‘সিঁড়ির ওপর অনবরত লুটিয়ে পড়ছে পিতার গুলিবিদ্ধ দেহ’। (মুজিব হত্যার চিত্রকল্প)। বরং কবির কাঙ্ক্ষিত সেই যুক্তিযুদ্ধ ও আলোকসমর, যার সফল সমাপ্তির পর “কখন একটি উন্নত মানুষ হেঁটে আসবে, তার জন্যে,/ তার শরীরে রক্তাক্ত একটি ছিদ্র রচনার জন্যে -/ যে-ছিদ্র থেকে, আমি আশা করছি, আশাই তো একমাত্র, যে,/ আমরা জন্মগ্রহণ করবো/ আমরা জন্মগ্রহণ করবো/ আমরা জন্মগ্রহণ করবো/ এই চিৎকার, এই ধবল ধ্বনি ছড়িয়ে পড়বে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে।।/”
বোঝ যায়, বাঙালিকে হীনজন্ম থেকে উন্নতজন্মে উন্নীত করে এক সক্ষম,আলোকিত, সদাচারী, নৈয়ায়িক ও নান্দনিক সমাজে বিবর্তিত করাই তার লক্ষ্য। এ-কারেণ তিনি অস্বীকার করেছেন তার ব্যর্থজন্মের গ্লানি ও কলঙ্ক। এটি সৈয়দ শামসুল হকের নৈয়ায়িক, নান্দনিক ও মাঙ্গলিক কবিসত্তারই নির্বিরোধ অভিব্যক্তি। ব্যক্তিবাঙালি ও জাতিবাঙালি হয়ে উঠুক তেমন এক হিতকরী মানবসমাজ। সৈয়দ শামসুল হক তেমন এক কবিতাম্মত সমাজের স্বপ্নদ্রষ্টা।

২৬.১২.২০১৬
Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাজহার সরকার — december ২৮, ২০১৬ @ ৫:৫৩ অপরাহ্ন

      কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার লেখাটা ভালো লাগলো। পড়তে পড়তে এতো তাড়াতাড়ি শেষ হল, যেন আরও লেখা থাকলে ভালো হত।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mostafa Tofayel — জানুয়ারি ৪, ২০১৭ @ ১০:১১ অপরাহ্ন

      I also have read that very poem interpreted in this page by eminent poet Mohammad Nurul Huda, my literary teacher-preacher. That particular poem by Syed Haque is an unique creation indeed, in that here the master poet has so beautifully blended his own birth story with the birth history of Bangladesh. It speaks of Haque’s extra-ordinary craftsmanship, for it is solely to the altar of craftsmanship that he has dedicated himself. But we must differ with Haque as regards his opinion or contention that in 1971 Bangladesh earned an untimely and premature biological birth. We cannot lend countenance to this sort of idea. It is too cynical to be admitted.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com