গায়ক পাখি গফুর হালী: যেই যন্ত্র বাজাইলে গানের যন্ত্রণা হয়; ওই যন্ত্র বাদ দেন বাংলা গান থেকে

শিমুল সালাহ্উদ্দিন | ২৬ december ২০১৬ ১১:৫০ পূর্বাহ্ন

পুরো নাম আবদুল গফুর হালী। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক, আধ্যাত্মিক ও মাইজভাণ্ডারি গানের কিংবদন্তি গীতিকার সুরকার ও শিল্পী। শেফালী ঘোষ, শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব, সন্দীপন, শিরিনসহ আরো বহু লোকগানের তারকা শিল্পীর উত্থান গফুর হালীর গান গেয়ে। দেশের একাডেমিগুলো, সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম তাঁর কাজকে পাত্তা না দিলেও দেশের বাইরে প্রচুর কাজ হয়েছে গফুর হালীর কাজ নিয়ে। জার্মানীর হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে তার গান নিয়ে গবেষণাকর্ম করছেন একদল লোকগবেষক। জার্মান ভাষায় তাকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে তথ্যচিত্র। ২০০৪ সালে হালে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হান্স হার্ডার গফুর হালীর ৭৬টি গান জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে ‘ডর ফেরুখটে গফুর স্প্রিখট’ বা ‘পাগলা গফুর বলে’ শিরোনামে গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন।
hali-2
সোনাবন্ধু তুই আমারে করলিরে দিওয়ানা, পাঞ্জাবিঅলা, মনের বাগানে ফুটিল ফুল গো, তুঁই যাইবা সোনাদিয়া বন্ধু মাছ মারিবার লাই,‘অ শ্যাম রেঙ্গুম ন যাইও, বানুরে অ বানু— কিংবা মাইজভাণ্ডারী গান- দেখে যারে মাইজভাণ্ডারে হইতাছে নূরের খেলা, কতো খেলা জানরে মাওলা, মাইজভাণ্ডারে কি ধন আছে এবং মোহছেন আউলিয়ার গান— চল যাই জিয়ারতে মোহছেন আউলিয়ার দরবারে, আল্লাহর ফকির মরে যদি, ইত্যাদি শত শত কালজয়ী গানের রচিয়তা আবদুল গফুর হালী।

আবদুল গফুর হালীর জন্ম ১৯২৯ সালে পটিয়ার রশিদাবাদে। বাবা, আবদুস সোবহান, মা গুলতাজ খাতুন। লেখাপড়া করেছেন রশিদাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয় ও জোয়ারা বিশ্বম্ভর চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয়ে। রশিদাবাদ আরেক সাধকশিল্পী আস্কর আলী পণ্ডিতের গ্রাম। আস্কর আলীর গান শুনে বড় হয়েছেন গফুর। ছোটবেলায় তাঁর আধ্যাত্মিক ও মরমি গান গফুরের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। কারো কাছে সেই অর্থে গান না শিখলেও শিক্ষক বলে মানতেন চট্টগ্রামের প্রকৃতিকে, যা তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছে সৃষ্টিকর্মে, প্রেরণা পেয়েছেন আস্কর আলী পণ্ডিত ও রমেশ শীলের গান থেকে। আবদুল গফুর হালীর আঞ্চলিক গানের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। মাইজভান্ডারি গানও হাজারের বেশি হবে। ‘দুই কুলের সোলতান’, ‘দেখে যারে মাইজভান্ডারে’সহ অসংখ্য গান শ্রোতাদের মুখে মুখে ফেরে। তাঁর গান আরও গেয়েছেন উমা খান, সঞ্জিত আচার্য, কান্তা নন্দী, শিল্পীরানী, আবদুল মান্নান রানা, সেলিম নিজামী,শিমুল শীল, কল্যাণী ঘোষ, কল্পনা লালা ও সন্ধ্যারানী দাশ।

হান্স হার্ডার মনে করেন, বাংলার লোকসঙ্গীতে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানকে বিশেষভাবে অধিষ্ঠিত করেছেন গফুর হালী। এসব গান কালের সীমা অতিক্রম করে পৌঁছে গেছে বর্তমান প্রজন্মের কাছে এবং বেশ আদৃত হচ্ছে। আবদুল গফুর হালী প্রথম মোহসেন আউলিয়াকে নিয়ে গান রচনা করেন। চট্টগ্রামের ভাষায় প্রথম লোকনাটকের রচয়িতাও গফুর হালী। হার্ডার আবদুল গফুর হালী সম্পর্কে লেখেন, ‘আবদুল গফুর হালীর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ ডিগ্রি বা উপাধি না থাকলেও নিজের চেষ্টায় তিনি অসাধারণ জ্ঞানের অধিকারী হতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি নিজেকে শুধু বাংলা সাহিত্যের দিকে সরাসরি ধাবিত করেননি, সুর ও আধ্যাত্মবাদে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। প্রায় প্রতিদিনই তিনি মাইজভান্ডারি গান রচনা করেন’।

কবি শিমুল সালাহ্উদ্দিনের সাথে গফুর হালীর এ আলাপটিই আমাদের জানামতে কিংবদন্তি শিল্পীর দেয়া শেষ সাক্ষাৎকার। ভিডিও থেকে সাব্বির জাদিদ উদ্ধারকৃত পুরো আলাপচারিতা এখানে পত্রস্থ হলো। বি.স.

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: যেটা সবার আগে জানতে চাই, আপনি স্বাধিকারের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন। আপনি এতো এতো সব জনপ্রিয় গান করেছেন, মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে আপনার গান। আপনি নিজে গান করবেন এই বিষয়টি শৈশবে কবে প্রথম ভেবেছিলেন? কেন গানের প্রতি আপনার আকর্ষণ তৈরি হল?
আব্দুল গফুর হালী: শৈশবে গাইতে গাইতে আমি শিল্পী, গাইতে গাইতেই। তখন আমাদের এই সংস্কৃতি, দেশে কী রকম ছিল এটা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না আপনাকে। উঠানে পুঁথির আসর হতো। তারপর আপনার ওটাকে কী বলে, আমাদের দেশে (চট্টগ্রামে) এটাকে নাট্যপুয়ার গান বলে। মানে এই রকম আসর প্রায়ই হইত। গানের আসর। আমি গানের পোকা ছিলাম। ওখানে যাইতাম। ওদেরকে অনুকরণ করতাম। আর বিশেষ করে সিনেমার পোকা বেশি ছিলাম। আমি সিনেমা চাইতাম (দেখতাম) বেশি। তখনকার সিনেমা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এবং আপনি হলে গিয়ে গিয়ে সিনেমা দেখতেন!
আব্দুল গফুর হালী: দেখতাম। এই যুগের সিনেমা না। তখনকার সিনেমা। তখনকার সিনেমা খুব মিষ্টি একটা জিনিস ছিল। বোঝার কিছু জিনিস ছিল। তখন আমি এই সিনেমার গান শুনে শুনে হুবহু করে করে গাইতাম। গাইতে গাইতে গাইতে গাইতে আমি শিল্পী হয়ে গেলাম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি যতো গান লিখেছেন, যেমন স্বাভাবিকভাবে যেটা বলতে হবে: রেঙ্গুন শহর… কিংবা ধরেন মধু খই খই বিষ খাওয়াইলা—
আব্দুল গফুর হালী: না, মধু খই খই এটা আমার না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আচ্ছা। এটা কার?
আব্দুল গফুর হালী: এইটা দক্ষিণ চট্টগ্রামের একটা প্রচলিত গান।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মনেরও বাগানে ফুটিল ফুল— এইটা আপনার?
আব্দুল গফুর হালী: হ্যাঁ, এইটা আমার। ‘বইনদ্দি নওশিরো, নিশিরও কালে, ছোটকাইল্যা পিরিত..’ তারপর কী বলে বর্তমানের একটা, ইদানীং কালের ‘পঞ্জাবিওয়ালা’ ইত্যাদি গান; তারপর ‘সোনা বন্ধুরে আমারে করলি যে দিওয়ানা’– এই গানগুলো আমার লিখা। এবং অনেক গান আমার আছে, যেগুলো আমি লিখেছি। আমি প্রথমে ছিলাম শিল্পী, গান গাইতাম। রেডিওতে, তখন তো চ্যানেল ছিল একমাত্র রেডিও। রেডিওতে গান গাইতাম। গাইতে গাইতে শেফলী ঘোষকে পাইলাম। শেফালী ঘোষকে গান শেখানো শুরু করলাম। এরমধ্যে আসল কল্যাণী ঘোষ। এরমধ্যে আসল আরো অনেকেই। যারা আজকে প্রতিষ্ঠিত শিল্পী। এদের মধ্যে অনেকেই আমার গান গেয়েছেন। তো আমি আজকে আপনাদের সামনে এসেছি, এখানে একটা অনুষ্ঠানে এসেছি। আমি ছায়ানটে এসেছি। ছায়ানটের একটা অনুষ্ঠানে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এটা নিয়ে আপনার কাছে আলাদা একটা প্রশ্ন আছে আমার। সেটা হল যে, আপনি একদম চট্টগ্রামের, চট্টগ্রামে থেকেছেন, ওখানে রেডিওতে গান করেছেন, আপনার কাছে গান নিতে গেলে শিল্পীদেরকে বেশ একটা কড়া রেট সবসময় ইয়ে করতে হতো, মেইনটেন করতে হতো।
আব্দুল গফুর হালী: হ্যাঁ অবশ্যই। মেইনটেন মানে গান, গান যেটা গ আ-কার গা দন্ত্য-ন, গান। গানকে যদি উল্টান আপনি, কী হয় দ্যাখেন— নগা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: নগা।
আব্দুল গফুর হালী: নগা মানে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় নগা মানে গাইয়ো না। গানকে নগা যদি করেন আপনি, এইভাবে যদি পরিবেশন করেন আপনি— ওটা গান হবে না। গান কোনো ক্যাসেটে আমি উঠায়ে দেব না। কোনো মোবাইলে উঠায়ে দেব না। আমার সামনে বসে তোমাকে গান লিখে নিতে হবে। আমি ইদানীং কয়েকটা বই বের করেছি— ‘সুরের বন্ধন’ ‘শিকড়’ ‘গানভাণ্ডার’— এগুলো আমার গানের বই। স্বরলিপি করে আমি বের করেছি। যাতে আমার গানগুলি হুবহু থাকে। এই জন্য আমি গান বের করেছি স্বরলিপি করে। শুধু গান না, এখানে আমি গান শেখার জন্য আমার গানগুলোর একটা করে স্বরলিপি, করে রেখেছি। যাতে বিকৃত না হয় গানগুলা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মানে আপনার আরোপিত সুর, আপনার আরোপিত কথার যে গঠন— সেটা হুবহু থাকে।
আব্দুল গফুর হালী: হ্যাঁ, হুবহু থাকে, এই জন্য।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কিন্তু আঞ্চলিক গানের একটা সমস্যা আছে যে সারা দেশের মানুষ সেটা গাইতে পারে না। প্রশিক্ষিত শিল্পীদেরকেই সেটা গাইতে হয়। সেক্ষেত্রে আপনার অনুসারী যারা, যারা পরে গান গাইবে, শেফালী ঘোষ বা এরকম কিংবদন্তি শিল্পীদের পরে নতুন শিল্পী কি আছেন?
আব্দুল গফুর হালী: গাইতে পারে না এরকম কোনো কথা না। আপনি যদি ইংলিশ গানকে ট্রানসলেট করে, ইংরেজি সুর দিয়ে বিকৃত করে যদি গাইতে পারেন, তাহলে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান গাইতে পারবেন না কেন! যতো পারেন আপনি গলা চিবাইয়া চিবাইইয়া.. (উত্তেজিত)…আমি ঢাকায় এসেছি এগুলো বলার জন্য।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বলেন।
আব্দুল গফুর হালী: যে গানগুলো আপনারা করছেন, এটা কি বাংলা সংস্কৃতি! এটা কি বাঙালি সংস্কৃতি! বাঙালি সংস্কৃতিকে কেন আপনারা অবহেলা করছেন! আমার শিকড় কই! আমার ভাওয়াইয়া কই! আমার লালন কই! আমার হাছন কই! সেইদিন শুনলাম আমি, এক লালনগীতি গাইতেছে— কী বলব, বলার তো আর অপেক্ষা রাখে না কিছু! লালনগীতি লালনগীতির মতো গাইতে হবে না!? আমি বলব, যেই যন্ত্র বাজাইলে যন্ত্রণা হয়, যেই যন্ত্র বাজাইলে গানের যন্ত্রণা হয়; ওই যন্ত্র বাদ দেন বাংলা গান থেকে। যন্ত্র ব্যবহার করেন, আমাদের দোতারা, বাঁশি, বেহালা, হারমোনিয়াম— এগুলো তো আছেই। আমাদের নিজস্ব একতারা আছে। আমার দেশের গান, বাংলা গান, বাংলা গানের যেই জিনিস সংযোজন করা দরকার সেইটাই তো আপনি করবেন। আপনি ইংরেজি মিউজিক মিউজিশিয়ান আইন্যা দিয়া যদি ওইটা করেন, যন্ত্র বাজান, তাহলে তো ওইটা গান হবে না।ওইটা নগাই হবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তারমানে এই সময়ের যে চর্চা, মরমী বা আঞ্চলিক গান নিয়ে, সেটাতে আপনি বিরক্ত?
আব্দুল গফুর হালী: অবশ্যই। তবে গান নিয়ে বিরক্ত হব না আমি। গান নিয়ে কেন বিরক্ত হব!
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কিন্তু ‘নগা’ নিয়ে বিরক্ত আপনি।
আব্দুল গফুর হালী: হ্যাঁ নগা! গানকে উল্টায়া যদি ফেলেন আপনি, এটাতে সমস্ত দেশের মানুষ বিরক্ত হবে। বাঙালি যারা, আমার মনে হয় সবাই তো বিরক্তবোধ করবে। কিছুক্ষণের জন্য আপনি এইটায় আনন্দ পেতে পারেন। ক্ষণিকের জন্য। এইটা টিকবে না। কারণ, নকল সোনা কোনোদিন টিকে থাকে না। নকল নকলই। আসল যেইটা ওইটা চিরদিন থাকবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার আগে, আপনার যে পূর্বসূরীরা এই অঞ্চলের মরমী গান গেয়েছেন, আপনি লালনের নাম বললেন, হাছনের নাম বললেন; একজন গফুর হালী— তাদের যে চেতনা, সেটা ধারণ করেও তাদের থেকে অনেক বেশি আলাদা। আলাদাটা কোন জায়গায়?
আব্দুল গফুর হালী: শোনেন, কেউ এক হয় না। আপনি হাছন রাজার গান শোনেন—
এইটা এক ধারা। লালনের গান শোনেন— ওইটা আরেক ধারা। সঙ্গীত একটা বিরাট জিনিস! সঙ্গীত তো সীমার মধ্যে নাই, অসীম জিনিস এইটা। আপনি যেইটা সৃষ্টি করবেন ওটা আপনার মতো হবে। আমি যেইটা করব ওইটা আমার মতো হবে। আমার দেশের আশকর আলি পণ্ডিত আছে, আরো অনেকেই আছে। আমার দেশের মাইজভাণ্ডারি গান, মাইজভাণ্ডারি গান এটা তো আজকের না; এটা অন্তত একশ-দ্ইুশ বছর আগের।
hali-3
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি একজন অগ্রজ বরেণ্য শিল্পী হিসেবে আপনি কি মনে করেন যে, এই মাইজভাণ্ডারি কিংবা বলেন লোকগীতি— এগুলো সংরক্ষণের জন্য সরকার যেসব কাজকর্ম করছে সেটা যথেষ্ট? বা কোনো কাজ করতেছে কি?
আব্দুল গফুর হালী: ভাই, কোনো কাজ করতেছে আমি দেখতেছি না। আপনি দেখেন, আজকে এখানে এসে আমি অবাক হয়ে গেছি, যে ছায়ানটের যে অবস্থা! আপনি চট্টগ্রামে যান, কিচ্ছু নাই। শুধু গানকে সংরক্ষণ না, পুরো বাংলা সংস্কৃতি…. সংস্কৃতি মানে তো রাষ্ট্রের একটা অঙ্গ। একটা অঙ্গের যদি হানি হয়, তাহলে রাষ্ট্রের ক্ষতি হবে না!
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অবশ্যই।
আব্দুল গফুর হালী: এটাকে নিয়ে অনেক কিছু করার আছে। চট্টগ্রামের সংস্কৃতি ওটা বিরাট ব্যাপার। বড় দুঃখ হয় যখন আমি টেলিভিশন খুলি, আমার বউ, আমার পুতের বউ, আমার নাতিন— তারা ভারতীয় চ্যানেল খোলে, বিভিন্ন ইয়ে দেখে। আমার দুঃখ হয়। কারণ, আমি শুধু গীতিকার না। আমি নাটকও লিখেছি অনেক। কিচ্ছু না, আমার দেশের সংস্কৃতির তুলনায় ভারতীয় চ্যানেলে যেগুলো দেখায়, ওগুলো কিচ্ছু না। আমার তো বয়স হয়ে গেছে। আমি এখন বুড়ো হয়ে গেছি। আমি তো আর পারব না। কারণ, আমার সময় নেই। না হলে আমি দেখিয়ে দিতাম যে বাংলার সংস্কৃতিতে কী আছে! শুধু পদ্মাবতী—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মহাকবি আলাওল!
আব্দুল গফুর হালী: আলাওলের পদ্মাবতী; পদ্মাবতীকে দিয়ে যদি আপনি একটা সিরিয়াল করেন,দুই বছরেও আপনি শেষ করতে পারবেন না। ওই জন্য ফাইন্যান্সের প্রয়োজন আছে। টাকার প্রযোজন আছে। ব্রেনের প্রয়োজন আছে। দেমাগের প্রয়োজন আছে। করার মানুষ তো লাগবে ভাই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি কি মনে করেন, বাঙালি সংস্কৃতিকে যদি ধারণ করে এই টেলিভিশনগুলা, বিভিন্ন মাধ্যমগুলা, সেই ক্ষেত্রে ভারতীয় মিডিয়ার যে আগ্রাসন….
আব্দুল গফুর হালী: (প্রশ্নকর্তাকে থামিয়ে দিয়ে উত্তেজিত গলায়) আমি চ্যালেঞ্জ করব। আমার তো বয়স হয়েছে। ঊননব্বই বছর আমার বয়স। অষ্টাশি-ঊননব্বইয়ের মতো আমার বয়স। আপনাকে বলছি, নয়তো আমি দেখিয়ে দিতাম বাংলা সংস্কৃতিতে কী আছে! কিন্তু পারলাম না। বড় দুঃখের ব্যাপার। আল্লাহ আমাকে এতোদিন বাঁচিয়ে রাখছেন, আমার আর সময় নাই। উনারা এখানে এনেছেন, আজকে এক বছর পর্যন্ত আসতে পারি নাই। শরীরে কুলায় না। তো আমার সবিনয় অনুরোধ সবার কাছে, যারা সংস্কৃতিবান মানুষ আছেন, এখানে। আপনি অর্থের পিছনে ছুটলে অর্থ আপনার থেকে দূরে যাবে। আপনি এমন হন যেন অর্থ আপনার পিছনে ছোটে। অর্থের পিছনে আপনি ছোটাছুটি করবেন না। সংস্কৃতিতেও এ্যাঁ, সংস্কৃতিতেও আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যায়, এটা নিয়েও ব্যবসা করা যায়; কিন্তু আমার মূলকে বাদ দিয়ে না। আমার মূল সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে না। আজকে হলে মানুষ নাই, সিনেমা হলে। কেন নাই? সিনেমা কি মানুষ দেখত না! আপনারা ভারতের দোষ দেবেন। ভারতীয়রা ভারতীয়তা করে। আমরা কম্পিটিশনে তো হেরে গেলাম। হেরে গেলাম। নাকি! তো আমরা ওদের জবাব আমাদেরটা দিয়ে দেব। ওদেরকে নকল করে না। দোহাই আপনার, ওদেরকে নকল করবেন না। আমার দেশের অভাব নাই। আমার দেশে যে প্রকৃতি, কোনো দেশে আছে বলে আমি মনে করি না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যুটিং করার জন্য সুইজারল্যান্ড যাওয়ার দরকার নাই।
আব্দুল গফুর হালী: দেখেন তো, কত কোটি কোটি টাকা, লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে। সুইডেন সুইজারল্যান্ড কি বাংলাদেশ থেকে সুন্দর! আমার তো মনে হয় না। কী জন্য যাওয়া ওখানে! কোনর তো দরকার নাই। ওই টাকাটা আপনি অন্য পারপাসে, অন্য খাতে খাটান। আপনি সিনেমায় খাটান।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: যেটা জানতে চাই, আপনি বলছিলেন যে বাংলা সংস্কৃতির বা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির যে উপাদানগুলো আছে তার শক্তি এতোই অপরিসীম, সেগুলো ঠিকভাবে ব্যবহার করলে আসলে ভারতের নকল করতে হয় না বা অন্যের দিকে তাকায়ে থাকতে হয় না।
আব্দুল গফুর হালী: শুধু ভারতের না। যে কোনো দেশের। আপনি দেখেন যে ইংরেজি গানের সুর এনে বাংলা গানে মিশিয়ে বাংলা কথা দিয়ে ইংরেজি গানের সুরে মেশাচ্ছেন। কী দরকার ছি! কী দরকার আছে! আমি একজনকে দোষ দেব না। আপনাদেরও আমি দোষী করব। কেননা আমার দেশের ভাওয়াইয়া, শুধু ভাওয়াইয়া আর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান দিয়ে একটা চ্যানেল চলে। আপনি করে দেখেন চলে কি না। আমার কথাটা শুনে আপনি করে দেখেন চ্যানেল চলে কি না! নকল আমরা করব না। আমি নকলের ঘোর বিরোধিতাকারী। বিশেষ করে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে। আমার দেশের সংষ্কৃতি সব দেশের সংস্কৃতি থেকে অনেক উন্নত। কিন্তু ওটাকে অবহেলা করা হচ্ছে। ফেলে রাখা হয়েছে। আমরা শুধু অনুকরণ করতেছি বাইরেরটা। নিজেরটা দেখছি না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আজকে আপনি দেশঘরের যে আয়োজন ছায়ানটের, সেটা উদ্বোধন করতে এসেছেন। তো আপনি ছায়ানটের মতো একটা প্রতিষ্ঠানের এই প্রস্তাবে কিভাবে রাজি হলেন, সেটা জানতে চাই।
আব্দুল গফুর হালী: (হেসে) আমাকে ওরা ছায়ানটে আনতেছে আজকে একবছর। আপনাকে আগেই বলেছি, আমি দুঃখিত, বয়স হয়েছে, বিধায় আমি আসতে পারিনি। আজকে ওনাদের একটা চিঠি পেলাম আমি। চিঠিতে ডিটেল্স লেখা আছে। ওই চিঠি পড়ে দেখলাম, না, আমাকে যেতেই হবে। আমি যাব। উদ্বোধক হিসাবে না। আমি যাব এই নকলের প্রতিবাদ কী করে করা যায়, বাংলার সংস্কৃতি সম্বন্ধে দুইচারটা কথা বলব— এই জন্যই আমার এখানে আসা। এবং এখানে এসে আমি খুব খুশি, সবাই আমাকে খুব আদর-আপ্যায়ন করেছে, এই জন্য আমি কৃতজ্ঞ উনাদের কাছে।
hali-1
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: শিল্পী, আপনি তো পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চলে আপনার গানের বড় প্রভাব রয়েছে। সারা দেশে আছে। অনেক দূরে থেকেও আমরা কিছুটা টের পাই। যেটা জানতে চাই যে, আপনার যে গান, আপনার লেখা গান, আপনার গাওয়া গান, আপনার লিখিত রেডিও-নাটক, আপনার লিখিত বিভিন্ন নাটক– এই সমস্ত কিছু নিয়ে কোনো প্রকাশনা এরমধ্যে বেরিয়েছে?
আব্দুল গফুর হালী: হ্যাঁ, বলেছি আপনাকে। আমি চারটা বই বের করেছি। আমার ছয়টা নাটক: গুলবাহার, নীলমণি, সতী মায়মুনা ইত্যাদি ইত্যাদি আমার ছয়টা নাটক দিয়ে একটা বই বের করেছি আমি, নাটকসমগ্র নাম দিয়ে। গানের একটা বই বের করেছি, মাইজভাণ্ডারি গান আর কিছু ভক্তিমূলক, পল্লীগীতি, মাটির গান— এই সমস্ত নিয়ে ‘সুরের বন্ধন’ স্বরলিপিসহ। আর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান শিখর এটা দিয়ে আমি একটা বই বের করেছি। এটাও স্বরলিপিসহ, গানভাণ্ডার। আরেকটা আঞ্চলিক গানও করব ইনশাআল্লাহ আশা রাখি। সেটার নাম এখনো দিই নাই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাহ! মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার একটা গান চট্টগ্রাম অঞ্চলে খুব আলোড়ন ফেলেছিল, একটা না, ইনফ্যাক্ট দুইটা গান আসলে, একটা হল যে ‘আমি বাঙালি পাঠান’— এরকম একটা গান ছিল।
আব্দুল গফুর হালী: (সুর করে) তর লই আর লই হইবো কেমনে, আই বাঙালি তুই পাঠান, তু দেশে আর আর দেশে দুই হাজার মাইল ব্যবধান। এইটা এইটা এইটা। এই গানটা আমি গেয়েছিলাম বঙ্গবন্ধু তখন স্টেজে ছিলেন। আমাদের দেশে একজন আছেন। উনি পুঁথি পাঠ করতেন। মুহাম্মদ শাহ বাঙালি নাম। সন্দ্বীপ উনার বাড়ি। উনি নাই এখন। উনি পুঁথি পাঠ করতেন আমি গান গাইতাম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার এই শিল্পী জীবন, আপনি বারবার বলছেন, অনেক বয়স হয়ে গেছে, আপনার এই শিল্পী জীবনে বড় অর্জনগুলা কী বলে আপনি মনে করেন?
আব্দুল গফুর হালী: অনেক, অনেক বড় অর্জন। আমি তো ভাবি নাই যে আজকে আমি আব্দুল গফুর হালী হব। বা আজকে আপনার টেলিভিশনের সামনে বসে কথা বলব। আপনাদের সামনে বসে কথা বলব। আজকে যে গুণী মানুষগুলো এখানে সমবেত হবেন ওঁদের সামনে আমি কথা বলতে পারব, এটা আমি চিন্তাও করি নাই। এটা আল্লাহ আর আমার ভাণ্ডারি বাবা ওনাদের দোয়া, আল্লাহর রহমত, আমি এই বয়সেও ঢাকায় এসেছি। আর তো আসতে পারব না। তো আমি সবার কাছে আমি দোয়া চাই। আমি গানের জন্য কাজ করেছি। গান মানে এটা বিরাট ব্যাপার। গান মানে আত্মাকে উপলব্ধি করা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি নগা এবং গানের কথা বলতেছিলেন। গান আসলে আপনার কাছে কী?
আব্দুল গফুর হালী: গান আমার কাছে আমার সাধনা। গান নিয়ে আমি আল্লাহর কাছে পৌঁছতে চাই। গান আমার সবকিছু। তো গানকে যদি আপনি উল্টান, নগা করেন, তাহলে দেখেন এটা কী হয়ে যায়! আমার ইবাদতে এটা আঘাত লাগে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি গান কিভাবে লেখেন?
আব্দুল গফুর হালী: কাগজ-কলম দিয়ে লেখি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হা হা সাদা কাগজে লেখেন এটা একদম ঠিক আছে। কিন্তু এইটা অনেক দিন ধরে আপনার ভেতর কাজ করতে থাকে তারপর নামান নাকি…
আব্দুল গফুর হালী: শোনেন, গান যে কেউ লিখতে পারে না। ওই নগা যেইটা, ওইটা লিখতে পারে। গান লেখা, ওটাকে কী যেন বলে, আসতে হবে। বিভিন্ন পয়গম্বরের কাছে যেমন আসত।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ওহি, ওহি আসত!
আব্দুল গফুর হালী: ওহি ওহি। এটা ওহি না কিন্তু ওহির মতো আরেকটা জিনিস। ওটা জিবরিলের মারফতে আসত। এটা আসে। এটাও যখন আপনার মাথায় আসবে তখন কলম দিয়ে লিখতে হবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার সবচে’ প্রিয় গান কোনটা, যেটা আপনার লেখা?
আব্দুল গফুর হালী: আমার সবচে’ প্রিয় গান দুই হাজার আড়াই হাজার। আপনি যদি বলেন আপনার সন্তান কোনটা, আমার পাঁচ দশটা সন্তান আছে, তাহলে আমি কী বলব আপনাকে, আমার সন্তান ‘কোনটা’! এটা তো আমি বলতে পারব না। আমার লেখা সব গান আমার প্রিয়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বলছিলেন, আপনি বলছেন যে নকলের বিরুদ্ধে কথা বলতে আপনি ঢাকায় এসেছেন, কিন্তু বাংলাদেশে যে ধরণের সংস্কৃতি চর্চা হচ্ছে, সেটা নিয়ে আপনার উপলব্ধি কী? চট্টগ্রামে হোক, ঢাকায় হোক, সিলেটে হোক, রাজশাহীতে হোক, বরিশালে হোক?
আব্দুল গফুর হালী: আমি আপনাকে আগেই বলেছি এটার প্রতিবাদ করার জন্য আমি এসেছি। এটাকে থামানো দরকার। আমি আপনার মারফতে সবাইকে বলব— গণমাধ্যম যারা চালান, আপনাদের অনেক সুযোগ আছে। অনুগ্রহ করে আপনারা এগুলোকে থামান। এগুলোর প্রচার আপনারা বন্ধ করেন। আপনারা মাটির গান করেন। আধুনিক গান করেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত করেন। নজরুলেরন গান করেন। কোনো অসুবিধা নাই। কিন্তু ওই নগাটা, দোহাই আপনাদের, আপনারা ওটা করবেন না। যন্ত্র বাজে যন্ত্রণা ওটা আপনারা করবেন না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার পরে যারা সঙ্গীত চর্চায় এসেছেন এ দেশে, যারা কাজ করছেন, তাদের জন্য আপনি কী বলবেন?
আব্দুল গফুর হালী: খুব ভালো। ওরা তো খুব ভালো। দেখতেছি তো ইনশাআল্লাহ ওদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। আমরা তো ওই সুযোগ পাই নাই। তারা তো সুযোগ পেয়েছে। দ্যাশ পেয়েছে। একটা বাংলাদেশ পেয়েছে। আমরা অনেক কষ্টে ছিলাম এই সংস্কৃতির চর্চা করতে গিয়ে। ওদেরকে বলব, তোমরা আসল জিনিসটা ধরে রাখো। হোক এটা আধুনিক গান। সুবীর নন্দী.. তারা কি আধুনিক গান করেন নাই! সাবিনা ইয়াসমিন করেন নাই!
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি এদের গান তো নিশ্চয় শুনেছেন?
আব্দুল গফুর হালী: অবশ্যই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মানে আপনার যে ঘরানা, এই ঘরানার বাইরে আর কী কী গান আপনার পছন্দের? এটা অন্য সবার জানার জন্য জানতে চাচ্ছি।
আব্দুল গফুর হালী: সব গান সব গান। শোনেন, রবীন্দ্রসঙ্গীত আমি খুব ভালো শুনি। নজরুলগীতি আমি শুনি। আধুনিক গান শুনি। আমি সব গান শুনি। কিন্তু একটা জিনিস, আমি আমার সাবজেক্ট, এটার বাংলা কী যেন?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বিষয়।
আব্দুল গফুর হালী: আমার বিষয়টা হল চট্টগ্রামের মাইজভাণ্ডারি গান এবং চট্টগ্রামের ভাষার গান।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার গানে তো মানুষের জনজীবন, মানুষের সাংসারিক জীবন, যে টানাপোড়েন– এই বিষয়গুলা প্রচণ্ডভাবে আসে। আবার একইসাথে সেটা আবার আধ্যাত্মবাদের সাথে আসে, এমন প্রচুর গান আপনার আছে। এই দুই ধরণের বিষয়ের সাথে মানে এরকম যোগসূত্রটা আসলে কিভাবে স্থাপন করেন?
আব্দুল গফুর হালী: এইটাই তো গান। ওইটাই গান যেইটা আপনার চিন্তায় আসবে। আপনি একটা ছেলে দেখতেছেন এখেনে, সে একটা জিনিস নিয়ে যাচ্ছে বা নিতে পারছে না, কাঁদছে– এই ধরণের সুখদুঃখ; একটা মাঝি সে কত কষ্ট করে সে সাম্পান নিয়ে তার জীবন চালায়, একটা শ্রমিক কী করে তার জীবন চালায়, এই যে বাহারি বাহারি ঘর, এগুলো দেখতেছেন— এইগুলো শ্রমিকের। শ্রমিকেরা করেছে। কিন্তু তারা বাস করে না। ওরা থাকে না। ওদেরকে কিছু টাকা দিয়ে বের করে দেয়া হয়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার অনেক বয়স হয়েছে। বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রীকে যদি বলতে বলা হয় আপনাকে, যে, লোকগানের জন্য বা আঞ্চলিক সংস্কৃতি রক্ষার জন্য কী কী করা উচিত, এই সাজেশান যদি আপনাকে দিতে বলা হয় আপনি কী বলবেন?
আব্দুল গফুর হালী: আসাদুজ্জামান নুর আমার খুব কাছের মানুষ। আসাদুজ্জামান নুর একজন শিল্পী। উনি আজকের মন্ত্রী। মন্ত্রীর আগে যে আসাদুজ্জামান নুর ছিলেন, সেসময় উনি যেইটা যেইটা নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন ওইটা পূর্ণ করলেই হবে আর কিছু লাগবে না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ওইটা আমরা জানতে চাই। অন্য সবাই এটা জানে না। আপনি যদি বলেন।
আব্দুল গফুর হালী: উনি সব জানেন। বেতারের একজন শিল্পীর সম্মানী সাড়ে তিনশ চারশ টাকা। অথচ তার আসা যাওয়ার খরচ হয় পাঁচশ-ছয়শ-সাতশ টাকা। চট্টগ্রামের টেলিভিশনের যে অবস্থা ওটা তো আর বললাম না আমি। এটা বলার কোনো অপেক্ষা রাখে না। সাংঘাতিক অবস্থা এখন। টেলিভিশনে আমি দুই-চার-পাঁচবার গেছিলাম। আমি যাই না। এইটা ঠিক করেন। আপনার কাছে অনুরোধ, আপনি এখন মন্ত্রী, মন্ত্রীর আগে আপনি একজন শিল্পী। আপনি একজন শিল্পী, আপনার কাছে অনুরোধ করব, আমি চাইলে অনেক কিছু করতে পারেন। আর আপনার কাছে ছোট্ট একটা আবদার আমার, চট্টগ্রাম বড় অবহেলিত এই সংস্কৃতি থেকে। কিচ্ছু নাই। একটা বসারও জায়গা নাই। আমি তো চলেই যাচ্ছি। আমার বেশিদিন আর নেই। কয়দিন থাকব! অন্তত একটা প্রতিষ্ঠান আপনি গড়ে দেন চট্টগ্রামে, যাতে শিল্পীরা ওখানে বসে আলাপ-আলোচনা করতে পারে।
hali
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: শিল্পীরা তো সংসার বৈরাগি হয়, উদাসীন হয়, আপনার..
আব্দুল গফুর হালী: কে বলে! না না না। সংসার বিরাগী হব কেন! সংসার এটা আল্লাহ দিয়েছে ভোগ করার জন্য। আমি বিরাগী হব কেন! এইটা ভুল। এইটাকে আল্লাহ দিয়েছে ভোগ করার জন্য। সংসার ভোগ করো ছাড়খাড় করো না। জ্বালাইয়া দিও না। ম্যাচ মেরে জ্বালাইয়া দিও না। এটাকে ভোগ করো। উপভোগ করো।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: উপভোগ করার উপায়টা কী? সূত্রটা কী? আপনার জীবন তো ভোগ করে আসছেন।
আব্দুল গফুর হালী: শোনেন। এটা খুব সুন্দর। আপনি সৎ কামাই করবেন। সৎ চলাফেরা করবেন। আপনি দেখেন, সকালবেলা কী নাস্তা করছেন! একটা রুটি। দুপুরবেলা এতটুকু ভাত। রাত্রে এতটুকু ভাত। এই তো! এইটার জন্য কাউকে কোপাইয়া মারতে হয় না। কারো গলায় ছুরি দিতে হয় না। আপনি কাজ করুন। ওই যে উনি ক্যামেরা চালাইতেছেন। উনার ডিউটি হল ক্যামেরা চালানো। ওইটা সুষ্ঠুভাবে সুন্দরভাবে চালানো। আপনি আমার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন। সুন্দরভাবে নেন। এ্যাঁ, আমার মন্ত্রী সাহেবানরা যে যেইখানে আছেন উনারা ঠিক কাজটা করুন। দেখেবেন সোনার বাংলা হইতে দেরি হবে না। আমরা এমন একজন প্রধানমন্ত্রীকে পেয়েছি যার মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্লাড আছে, রক্ত আছে। বঙ্গবন্ধু নাই এটা আমি মানি না। আমাদের শেখ হাসিনা আছে প্রধানমন্ত্রী। ওঁর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর রক্ত আছে, ওঁ কোনোদিন বেইমানি করতে পারে না দেশের সাথে। আমি আপনার টেলিভিশনের সামনে বলছি বলে এটা বলছি না। আমি কোনো এ্যাডভ্যাটাইজ করি না। সত্য যেইটা আমি সেইটা বলছি। আমি ওনার কোনোদিন সামনেও যাই নাই। বঙ্গবন্ধু আমার খুব কাছের মানুষ ছিলেন। তেহাত্তরে আমরা আসছিলাম, ইয়েতে…
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ৩২ নাম্বারে? ধানমন্ডি?
আব্দুল গফুর হালী: ধানমন্ডি না। আমাদের একটা ইয়ে ছিল, সমস্ত বাংলাদেশের একটা ফোক, ফোকের একটা ইয়ে ছিল।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ফোক কনফারেন্স?
আব্দুল গফুর হালী: হ্যাঁ কনফারেন্স। চট্টগ্রামে ফার্স্টে হয়। আমরা বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেছি। ওটা বলতে গেলে আজকে সারাদিন যাবে। ওটা বলব না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার পরিবার নিয়ে যদি আমাদের বলেন, সন্তান-সন্ততি নিয়ে যদি কিছু বলেন।
আব্দুল গফুর হালী: পুরোটা বাংলাদেশেই আমার পরিবার। আপনি আমার পরিবার। উনি (ক্যামেরাম্যান) আমার পরিবার। সবাই আমার পরিবার।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই যে আপনার বিশাল জীবন কাটল, প্রচুর লিখেছেন, প্রচুর গেয়েছেন, আপনার হাত দিয়ে অসামান্য সব শিল্পীরা তৈরি হয়েছে, এবং আজকে যে কথাগুলো বললেন, এগুলো নিশ্চয় সারা দেশের মানুষ শুনবে। আপনি যদি কাল না থাকেন, যেমনটা আপনি বললেন, আপনার সময় নাই, আপনি চান কিভাবে মানুষ আপনাকে স্মরণ করবে? কী চান আপনি?
আব্দুল গফুর হালী: আমাকে গানে স্মরণ করবে। আপনি আমার গান করেন আমি ইনশাআল্লাহ আপনার সামনে আসব। আর মানুষ মরে না। কোনোদিন মরে না। মানুষের মৃত্যু হয় না। আপনার জামাটা যদি আমি খুলে নিই, আপনি মরে যাবেন? এই জামাটা যাবে। আপনি যাবেন না। আপনি কই যাবেন? মান আরফাআ’ নাফসাহু ফাকদ আরফাআ’ রব্বাহু— আপনি আপনাকে চেনেন। আপনি মরবেন না। মানুষের মৃত্যু নাই। মানুষের আত্মার মরণ হয় না। এই দেহটা শুধু চলে যায়। আপনি এখান থেকে দুবাই গেলে কি মরে যাবেন? এই আরেকটা জগতে চলে যাবেন। যেখানে অনন্তকাল থাকতে হবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আমার জন্য দোয়া করবেন। আপনি যে আন্তরিকতার নিয়া কথা বললেন, আমারে সময় দিলেন এজন্য ধন্যবাদ।
আব্দুল গফুর হালী: সংস্কৃতি নিয়ে অনেক কাজ করবেন, আমার আশির্বাদ থাকলো আপনাদের জন্য। সালামুআলাইকুম।

ছায়ানট।। দুপুর ১২.১০।। ২৩ শে মার্চ।। ২০১৬।।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাইফুল — december ২৬, ২০১৬ @ ১২:৫৩ অপরাহ্ন

      মরহুম গফুর হালি সাহেবকে আল্লাহ জান্নাত বাসি করুন।
      যে কথাটা মনে থাকবে তা হল
      “আপনি এমন হন যে অর্থ আপনার পেছনে ছুটে”

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Enayet dewan — december ২৬, ২০১৬ @ ২:০২ অপরাহ্ন

      moromi ai sadhok er alaptir jonno dhonnobad. amader sorkar e jara achen tara ki esob poren? dekhen?

      subheccha sakkhatkar jini nilen take. Gafur halir attar magferat kamona kori.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন লোকমান হেকিম — december ২৬, ২০১৬ @ ৫:২৯ অপরাহ্ন

      সাক্ষাতকারটি পড়লাম। আব্দুল গফুর হালী সম্পর্কে অনেক দিন ধরে অনেক আগ্রহ ছিল আমার।
      ধন্যবাদ শিমুল সালাউদ্দিনকে। তিনি শিল্পীর আপন সত্ত্বাকে পাঠকের কাছে বের করে এনেছেন।
      আপনারা কি বাউল শিল্পী সুনীল কর্মকার অথবা যাত্রা শিল্পী গৌরাঙ্গ আদিত্য’র সাক্ষাতকার নিতে পারেন? তারা এখন বয়সের ভারে ন্যুজ প্রায়। তারা যখন পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবেন, লোক সংস্কৃতির গুরু পরম্পরার যে ধারাটি আছে, এদেশ থেকে তা বিদায় নিবে বলে আমি মনে করি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায় — december ২৭, ২০১৬ @ ১:৩৭ পূর্বাহ্ন

      বিশেষত সংস্কৃতি নিয়ে শিমুল সালাহউদ্দিনের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কাজ আলাদা কৃতিত্বের দাবি রাখে। এমন আরো অনেক সাধক শিল্পী ছড়িয়ে আছে দুই বাংলায়, যাদের মূলধারার প্রচারমাধ্যমে তুলে ধরার আসল লোকটিই নেই। শিমুল সে কাজটি খুব যত্নের সাথে করছেন।

      তাকে অভিনন্দন। গফুর হালী নেই শুনে আদতেই মন খারাপ হচ্ছে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com