রুখসানা কাজলের গল্প: জ্যোৎস্নাধরা

রুখসানা কাজল | ২১ december ২০১৬ ৩:২৮ অপরাহ্ন

monish.jpgদুধজোস্নায় ভেসে যাচ্ছে চারদিক। খোলা বারান্দায় চকিতে শুয়েছিল গনেশ। কাঁঠাল গাছের পাতাগুলো তারার মত চকচক করছে। তার পাশে বারোমাসি আমড়াগাছ। আমকাঁঠালের পাতার বুননে বানানো জালে ধরা পড়ে জ্যোৎস্না হাসছে কলকলিয়ে। ঠিক এই সময়ে ভুতু কেন যেনবড় উঠোনের মাঝখানে এসে চাঁদের দিকে মুখ উঁচু করে লেজ নামিয়ে ডেকে উঠল, ঘুঘুঘুউউ ঘুউ ঘুউঘুউউউউউউউউউউউ—বিষ কামড় দিয়ে উঠল গণেশের শরীর! ভয় আতংকে কেমন কেমন করে উঠছে বুকের ভেতর। তড়াক করে উঠে বসে বিছানায়। ঠাকুমার কাছে শুনেছে বিপদ আপদের কথা নাকি পশুপাখিরা আগে ভাগে জেনে যায়। আর জানতে পারে বলে এরকম আর্তচিৎকার করে পাড়া মাতিয়ে কেঁদে কেঁদে উঠে। কোথায় কার কি হলো কে জানে! ধুকপুক করতে থাকে গনেশের বুকের ভেতর।
ভিজে জ্যোৎস্না চাঁদকে নিয়ে ঢুকে যাচ্ছে মেঘের কোলে। আবার ভেসে উঠছে মণিমুক্তোর মত আলো ছড়িয়ে। এই রকম আলো আঁধারে অনেকক্ষণ ধরে একটানা ডেকে ডেকে একসময় থেমে যায় ভুতু। তারপর গনেশের দিকে মুখ করে দুপা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ে । পায়ের ফাঁকে কাত করে রাখা ভুতুর মাথাটাকে অদ্ভুত অসহায় লাগে। সাড় শব্দহীন। কেবল একটা চোখ জ্বলজ্বল করছেভুতুর। শালা মাথা কাত করে রাখিছে ত রাখিচ্ছেই। একবারের জন্যিও লড়াচড়া নাই। এট্টু খানি মাথাও ওঠায় না ভুতুরবাচ্চা। বাঁচি আছি ত? আরো ভয় খায় গনেশ, মরি গেল নাহি! মারিচ্ছে ত আমাগের! পোষা কুকুরের আতকা মরণ গেরস্তোর জন্যে সুলক্ষণ নয় মোটেও। তার উপর কদিন ধরে যে বিপদ চলিচ্ছে সংসারে! তিন লাফে ভুতুর কাছে গিয়ে লেজ ধরে টান দেয় গনেশ। ভুতু সেই ভাবে শুয়েই ঝাঁকি দিয়ে লেজ টেনে নেয়। গনেশ যেন অচ্ছুত। একবার ফিরেও তাকায় না।

নাহ বেঁচে আছে ব্যাটা। চুতমারানীর বাচ্চা এমন ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল যে দম বন্ধ হয়ি গিছিল তার। বালিশের পাশ থেকে বিড়ি বের করে আগুন ধরায় গনেশ। খুব বিড়ি খাওয়া বেড়ে গেছে। একা থাকলেই বেশি খেতে ইচ্ছা করে। ভুতুর হলুদ শরীরে মেঘ জ্যোৎস্নার আলোছায়া খেলে খেলে বিলিকাটছে। হঠাত গনেশের মনে পড়ে যায় এরকম একটা হলুদকালো ডুরে শাড়ি ছিল দিপালির। আচমকা তব্দা মেরে যায় সে। হাত ফস্কে মাটিতে পড়ে গড়িয়ে যায় জ্বলন্ত বিড়ি। গনেশের ইচ্ছা করে না তুলে নিতে। মাটির দাওয়ায় পোড়াবার মত কিছু না পেয়ে কিছুক্ষণ ধুঁকে ধুঁকেজ্বলে নিভে যায় বিড়ির আগুন। গনেশের মন তখন উথাল পাথাল। মনটাকে কুরে কুরে খাচ্ছে ঘুঘুউঘুউঘুউঘুঘুউউউ, কেমন আছে মাত্র আড়াই মাস বিয়ে করা তার বউটা ?
সবাই যখন বুঝেছিল দিপালির মাথার ঠিক নাই গনেশ বুঝেছিল তারো আগে। স্বাস্থ্যবতী সুন্দরী মাত্র কুড়ি বছরের দিপালি বালিশে মাথা রেখে জানালা দিয়ে জুলজুল করে চাঁদ দেখত। আকাশে চাঁদ না থাকলে চোখ বন্ধ করে তবু জানালার দিকেই তাকিয়ে থাকত। গণেশ আদিম উন্মাদনায় ছেনে যেত দিপালির শরীর। বুক, নাভি, নিটোল পেট তার নীচে জলে ভাসা পদ্মবিল। তাতে আঁশগন্ধ। সেই গন্ধ ঘাই মারছে তার উতল পুরুষ রত্নে। কেঁপে কেঁপে উঠছে পদ্মনাল। মোহগ্রস্ত হয়ে বার বার দিপালির মুখ দেখত গনেশ। হাজারবার চুমু খেলেও একবারের জন্যেও তাকিয়ে দেখত না গনেশকে। কি নরম পেলব সুন্দর ছিল দিপালির মুখ। সদ্য ফোঁটা শাপলা ফুলের মত মিষ্টি ঠান্ডা। গনেশসজোরে জাপটে ধরে বলত, আমারে দেখ ক্যানে এট্টু। একবার হাতি ধরি বুঝি নে তোর জিনিস।খালি চান দেহিস তুই ! চান্দের কি ইয়ে আছে– খিলখিল হাসি দিয়ে গড়িয়ে পড়ত দিপালি, ইসসিরে কি আমার লায়ক শাকিব খান আইছে য্যান। অই ত জলপচা নালের নাহাল শইল। তার দেকপো কি । গণেশ ক্ষেপে যেত। বিছানা ছেড়ে দিপালির বাক্স খুলে সারা গায়ে বডি স্প্রে মেখে এসে বলত , দ্যাখ ক্যানে এহন! কেমুন লাগতিছে ক দেহি। গনেশের বালিশ দিয়ে উদ্ধত নগ্ন বুক ঢেকে দিপালি সড়াত করে বিছানার এককোণে সরে গিয়ে বলত ইচা মাছের লাহান ইকড়িমিকড়ি চিকড়ি চিকড়ি—হিহিহি—গণেশ ঝাঁপ দিয়ে পড়ত বিছানায়। যেন এখুনি কোন রক্তিম পাঙ্গাস জাল কেটে পালিয়ে যাবে সুগভীর গহন জলের অতলে।
সে বড় সুখের দুটি মাস ছিল। সারাদিন দেখা হত না প্রায় । ভোররাতে গরম ভাত খেয়ে গনেশ বাপ, কাকা, বন্ধুদের সাথে মাছ ধরতে বেরিয়ে যেত। দিপালি তখনো স্বাভাবিক ছিল। মা ঠাকুমার সাথে হাতে হাতে কাজ করত। গনেশরা ঘরে ফিরত একবারে বাজারে মাছ বিক্রি করে চাল ডাল আটা তেল কেনাকাটা করে। শ্বশুরের দেওয়া পণের টাকায় নতুন জাল কিনেছ গনেশ। বিয়েতে বাইশ হাজার টাকা পণ দিয়েছিল শ্বশুর। দেখতে না দেখতে ফুরিয়ে গেল। তেজপাতার গায়েও ওজন আছে টাকার ওজন তা্রো কম। আজকাল বেশ ঘনঘন বিড়িও খায় গনেশ। আগে তবু একটু আড়সাড় ছিল বাবা কাকাদের সামনে। বিয়ের পর এখন আর সেসব নাই। এখন বাবা কাকারাই বিড়ি ফুরিয়ে গেলে গনেশের কাছে বিড়ি চায়। অনেক সময় আধাখানা বিড়িতেও তিনজনে সমান টান দেয়। মাঝে মধ্যে মাছ বেচার একফাঁকে এট্টু জল ছাড়ি আসতিছি বলে মোতালেবের দোকান থেকে কনডম কিনে সে তাড়াতাড়ি হাফ প্যান্টের চোরা পকেটে ঢুকিয়ে ফেলত। তার বয়েস এখন বাইশ, বউয়ের মাত্র কুড়ি এখুনি কিছুতেই ছানাপোনা নেবে না গনেশ।
সেদিন সবে বাজারে বসেছে এমন সময় বুড়ো শংকরকাকা ছুটতে ছুটতে এসে ডাক দেয়, ওরে ও গনশা বাড়ি যা তাড়াতাড়ি। তোর বউ কেমুন কেমুন যেন করিচ্ছে। কেমন আবার কইরবে –পাত্তা না দিয়ে বিড়ি ধরায় গনেশ। বউ তার গায়ে আঁশগন্ধ পায় বলে মাছ ধরে এসে সে ভাল করে গা কচলে গোসল করে নেয় বাজারের কলে। ফুরফুরে সাবান শ্যাম্পুর গন্ধে নিজেকে তার নায়ক নায়ক লাগে আজকাল। কেবল মনে হয় ধুরব্বাল কহন যে বাড়ী যাতি পারবানি। মাছগুলান শেষ হয় না ক্যান! মাঝে মাঝে সস্তায় ছেড়ে দেয় মাছ, আবার কখনো ভাবে এমন কিছু ঘটুক যেন দুদিন সে বাড়িতে শুয়ে বসে থাকতে পারে। সারাদিন দিপালি কি করে তা দেখার খুব সখ গনেশের।
শংকরকাকা বাবার সাথে ফুসমন্তরে কি সব বলে চলেছে। বাবার মুখে দুশ্চিন্তা । এইবার বাবা তাড়া দেয়, যা জলদি বাড়ি যা। বাজার আমি দেখপানি। তোরে বাড়িতে দরকার এহন। হেলেদুলে বিরক্তিভাব দেখিয়ে উঠে আসে গনেশ। রাত্তিরে তো ভালই ছিল । জন্মাষ্টমীর পূজার জন্যে ফুল তুলতে ওর সাথেই ত বিছানা ছাড়ল। ঝেঁপে ফুল ধরেছে ঘন্টা জবার গাছে। আগুন জ্বলছে যেন । তার পাশে গন্ধরাজ, টগর, তারা ফুলের গাছ। গনেশ বড় ভালবেসে দিপালিকে সাবধান করেছিল, সকালে ফুল তুলিস। আর একটা লাঠি রাখিস হাতে। বাগানে কলাম লতা থাকতি পারে। একটা লাঠিও বেছেনিয়েছিল দিপালি। বেতের ঝাঁপির পাশে লাল গামছা, সাবান আর লাঠি রেখে রান্নাঘরে গেছিল মাকে সাহায্য করতে। এর মধ্যে কি এমন হল যে গনেশকে ছুটতে হচ্ছে বাড়ি?
ছোটখাটো ভিড় জমে গেছে উঠোনে। গনেশকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠল অনেকে। ঠাকুমা উঠোনে শোওয়া দিপালিকে দেখিয়ে কেঁদে ফেলে,ও গনেশ আমার সোনার পিরতিমা যে মাডিতে লোটায় ! চমকে উঠে গনেশ! তবে কি লতা কাটল দিপালিকে?নাহ মাঝ উঠোনে হাতের উপর মাথা রেখেএককাতে শুয়ে আছে দিপালি। লালশাড়ি, লাল সায়া, ঘটিহাতা লাল ব্লাউজের একধার ধূলোয় ধূসর। দুপায়ে গনেশের দেওয়া চিকন দুটো ইমিটেশনের মল। মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করছে দিপালি। যেন ঘুমুচ্ছে। কিছুক্ষণ পর তাকিয়ে ঘুমভাঙ্গা শিশুর মত দেখে নিচ্ছে চারপাশ। তারপর ডান হাতে মুখ ঢেকে বাঁহাতের উপর মাথা রেখে নিস্তব্দ হয়ে পড়ে থাকছে কিছু সময় । আবার মুখ থেকে হাত সরিয়ে অনির্দেশ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকছে কাঁঠালগাছের মাথার উপরে কোন আকাশের দিকে কে জানে ! সবাই ডাকছে , জানতে চাইছে কি হয়েছে , ঠাকুমা গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করছে, ও বউ ভয় পাইছিস নাহি? কি দেখে ডরাইছি ক দেহি ? দিপালি কিছুই বলছে না। যেন ও মানুষের ভাষা কখনো শোনেনি। জানেও না।
গনেশ ভারিক্কিভাবে ডাক দেয় , অই উঠ, ঘরে যা। দিপালি গনশকে চেনে না। যে দিপালি গনেশকে দেখলে ইকরিমিকরি ইচার ছাও বলে খেপাত সে গনেশকে দেখেও দেখে না। ওর চোখের চাহনি বলে দিচ্ছে গনেশ ওর বিলকুল অচেনা। এর মধ্যে কপাল চাপড়াতে শুরু করেছে গনেশের মা পাগলি পাগলি । ওর বাপ হারামজাদাকে খপর দে। নে যাক। মিথ্যে কথা বলি মেয়া পার করিছে শুয়োরের বাচ্চারা। একবার পালি কোমর ভাঙ্গি দিবানি শয়তানের বচ্চাদের। গ্রামে গনেশের মা নমিতার গালাগালিতে বড় সুনাম। পাঁচ ক্লাশ ইশকুলে পড়েছিল গনেশ। স্যাররা গনেশকে চিনত খিস্তিরাণী নমিতার ছেলে হিসেবে। হুজুর স্যার তো নমিতাকে দেখলেই ছাতা কাত করে মুখ ঢেকে পালাতে পারলে বাঁচত । নমিতা পেছন থেকে মজা করত, ও হুজুর লুঙ্গি মনে অয় খুলি যাতিছে। হুজুর স্যার আরো জোরে ছুট দিত। নমিতার হাসিতে তখন মজা জমে যেত আশে পাশে। চেয়ারম্যানচাচা ইমদাদ নমিতাকে দেখলেই উঠে দাঁড়ায় । ছোটবেলার বন্ধু বলে নমিতাও তুই তোকারি করে কথা বলে। জামার উপর ভুঁড়ি ধরে মস্করা করে, ইমদারে তর ভুঁড়ি উটিচ্ছে। কুটি টাহার ভুঁড়ি। হারাম টাহা পয়সা এট্টু খারে ভাই। এই ভুঁড়ি তরে ফাঁসায় দেবেনে কলাম। ইমদুচাচা ধমক দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দেয়। ইমদু চাচার বউয়ের সাথেও খুব খাতির। ভোটের সময় একসাথে দুজনে কাজ করে। মার জন্যেই জেলে পাড়ার সব ভোট পায় ইমদু চাচা। কিন্তু মার মুখের জন্যে গনেশ লজ্জা পায়। গনেশের অনেক বন্ধুরা এখনো পড়াশুনা করে। তারা নমিতাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। মাকে এইবার ধ্মক দেয় গনেশ, চুপ মার না ক্যানে মা।আগি ত দেহি তারপর সেনে খপর দেওয়া যাবিনি। তুই আগির থেইকে কুকথা কস না। অন্যদের সাহায্যে ধরে বেঁধে অই কাপড়েই বউকে ঘরে তুলে আনে গনেশ। নমিতা ছুটে দিপালির বাবার দেওয়া বিছানায় পাতা নতুন চাদরখানা তুলে নেয়। কিছুতেই বিছানায় উঠে না দিপালি। বার বার বিছানা থেকে নেমে ঘরের মাটিতেই আবার শুয়ে থাকে জালে ধরা মৃগেল মাছের মত। নমিতা দাঁত কিড়মিড় করে, মাগির মাটিমেখা রোগ হইছে। থাকুক পড়ে । দেহি কতক্ষণ থাকতি পারে।
অনেক রাতে গনেশ জানালা খুলে দিপালিকে কাছে টানে, অই দ্যাখ তোর চান। কি হইছে তোর ? ভয় পাইছিস কিছু দেহে ? কি দেহিছিস ক আমারে! কিছুই বলে না দিপালি। গনেশ অনেক আদর করে। দিপালির হাত হাতের ভেতর নিয়ে বলে না বললি কি করে বুঝপো তোর কি হইছে। কিছু ত বল দিপু। জানালার দিকে তাকিয়ে থাকতে থকতে এক সময় ঘুমিয়ে যায় দিপালি। কিন্তু গনেশ ঘুমায় না। সে রাতে কেউ মাছ ধরতেও যায় না। বাবা কাকারা উঠোনে বসে কেবল আলোচনা করে কি হলো সুস্থ সমর্থ বউটার। বিয়ের আগে ত কেউ বলেনি মেয়ে পাগল ছিল। ভাল করে খোঁজ নিয়েই ত বিয়ে দিয়েছে। তবে?
তিনরাত তিন দিন মাছ ধরতে যায় না কেউ।ঝাড় ফুঁক তাবিজে ভরে উঠে দিপালির শরীর। ডাক্তার বদ্যি মুখ কালো করে উঠে যায়। রোগী কিছু না বললে কি চিকিতসা করবে তারা! দিপালি কেবল শুয়ে থাকে। ঘুমায়, জাগে আবার ঘুমায়। প্রথম প্রথম মায়া লাগত। এমনকি নমিতা পর্যন্ত ভাত মাখিয়ে খাইয়ে দিতে চেয়েছে। কিন্তু দিপালি খায় না। জলও মুখে দেয় না। খেতেও জানে না। জল গড়ায় বুক ভিজে যায় । এখন বিরক্ত লাগছে সবার। সংসারে আরো কত কাজ পড়ে আছেসবার।ওদিকে মাছ না ধরলে খাবে কি ? সংসার চলবে কেমনে? চারদিনের ভোর রাতে জাল নিয়ে বেরুবার মুখে দিপালি স্বাভাবিক মানুষের মত উঠে দাঁড়ায়। গলা, হাত,কোমর থেকে তাবিজ কবচ খুলে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে উঠোনপানে ছুটে যায়। গনেশও ছোটেপেছন পেছন। হরিপদকাকার বাঁশঝাড়ের কাছে এসে দিপালিকে ধরে ফেলেগনেশ। দিপালি তখন উন্মত্ত। চারদিনের না খাওয়া শরীরে প্রচুর শক্তি। গনেশকে ছেড়ে অই বাঁশঝাড়ের দিকে ছুটে যেতে চাইছে অমানসিক শক্তিতে। গনেশ একা পারে না দেখে ডাক দেয়, ও বাবা ও মা, ঠাকুমারে শিগগির আয়!
এইবার একেবারে বেঁকে বসে গনেশের মা। গনেশের মুখের উপর আংগুল নাচিয়ে নমিতা জানায় বউ ত নয় টউ! এই বালের বউ থুয়ে আয় গনেশ। আমার লাগবি না বউ। ঘরের মদ্দি হাগামুতা শুরু করলি কিন্তু ঝাঁটার বাড়ি দিয়ে তরেও তাড়াবানি বাড়ি থেন ! ইমদুচাচার পরামর্শে সেদিনের পর থেকে শিকলবেঁধে দেওয়া হয়েছে দিপালির জোড়া পায়ে। ইমদুচাচা বাবা মাকে বলেছে দিপালির বাবামাকে অতি অবশ্য খবর দিতে। তাদের মেয়ের খারাপ কিছু হয়ে গেলে হাতে হাতকড়া পড়ে যাবে। আইন মেনে কাজ কর। ইমদুচাচার কথায় যুক্তি আছে।গনেশকে বোঝায় সবাই যা কিছুদিনের জন্যে রাখি আয়। দেখ বাপমার কাছে থাকলি ভয় কাটি ভাল হয়ি যাতিও পারে।
ইশকুলের বন্ধু কেরামতের ঠেলাগাড়িতে করে মালপত্রসহ দিপালিকে ফিরিয়ে দিয়ে এসেছে বাপের বাড়ি। নমিতা গনেশের শ্বশুরের দেওয়া একটি জিনিসও ঘরে রাখেনি। ঠাকুমা একবার বলেছিল, মতলব কি তোর? তুই কি বউ আর আনবিনা নাহি? সব কিছু দিয়ে দিতিছিস যে। নমিতা রাগে গরগর করে বলেছিল, আনব না ক্যান। তয় এবার ভাল করি দেখে শুনে আনব। এই পাগল বউ দে আমি কি করব মা। ঠাকুমা চুপ করে গেছে। ফিসফিস করে নমিতা বলে, যত বেশি এহানে থাকপিনে গনশার মায়া তত হানি বাড়ি যাবিনি। তাড়াতাড়ি বিদায় দিলি তবু ছেলেডা মন ভুলে সহ্য করি নিবিনে বুঝলেন মা! বাবা কাকা ঠাকুমা বোঝে সে কথা। ইমদু চেয়ারম্যান কি খালিখালি নমিতাকে মাথায় করে রাখে!
দিপালিকে ফিরিয়ে দেওয়া সহজ হয়নি। দিপালির মা ডাক ছেড়ে কানতে শুরু করেছিল, ও বাবা তোমরা আমার মাইয়ের কি করিচ্ছ। আমার মেয়া ত এমুন ছিলনা। কিন্তু দিপালিই সহজ করে দেয় সবকিছু। নিজেই ঠেলা থেকে নেমে উঠোনে শুয়ে পড়ে। দিপালির বাবা মা দুই বোন ওকে ঘিরে ধরতেই , আমরা আসি। কাজ আছে বলে গনেশ কেরামত দ্রুত ফিরে আসে। ফেরার সময় সত্যি সত্যি কেঁদে ফেলে গনেশ। কেরামত গায়ে মাথায় হাত দিয়ে সান্ত্বনা দেয়, ভাডিরে অ ভাডি কপালের লেখন কে করে খন্ডন! দেহ যদি ভাল হয়ি আসে ত আবার এই বউ পাবা।
ঘুমে চোখ বুজে আসে গনেশের। রাত প্রায় মাঝামাঝি। জ্যোৎস্না উঠোন পেরিয়ে দাওয়ায় উঠে এসেছে। কেমন এক আলোমাখা হাত গনেশের দু চোখ ছুঁয়ে যায়। গনেশ তাকিয়ে দেখে আমপাতা কাঁঠালপাতার ফাঁকে সোনালি চুল বিছিয়ে খেলে যাচ্ছে জ্যোৎস্না মেয়েরা। জলের গন্ধ ভাসছে বাতাসে। খলবল করছে মাছের শব্দ। বারান্দার আড়ে গুছিয়ে রাখা জালের লোহাগুলো দুলছে । বাঁশবনের মাথায় চাঁদ এই হাসছে এই ভাসছে। জল ডাকছে অনিমিখে! জাল তুলে কাঁধে ফেলে হাঁটতে শুরু করে গনেশ। এই জ্যোৎস্নায় জলের উপরে উঠে আসে বড় বড় মাছ। লেজের ভরে জলের উপর খেলা করে তারা। তাদের চোখে ভাসে জ্যোৎস্নার আলো। সেবার এক রুই উঠেছিল জালে। তাজা মাছ । অথচ জালে পড়েও একটুখানি লাফালাফি ঝাঁপাঝাঁপি করেনি। নৌকার খোলে অল্প জলে কাত হয়ে শুয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে ছিল অঘোর নেশায়। রুপালি গায়ে ঠিকরে পড়ছিল জ্যোৎস্না । জলের ছিটা দিলেও রুই তবু একভাবে এককাতে শুয়ে জ্যোৎস্না দেখছিল।
হরিপদকাকার বাঁশঝাড় পেরিয়ে নদীর পথ ধরতেই কে যেন ডাক দেয়, কে যায়! ওরে কে যাস ! আমার কিরিষ্ণসখা নাহি! ওরে ও সখি এই জ্যোৎস্নায় যমুনায় যাস না সখি । ঝড় উঠিছে যমুনায়। ফিরি আয় কতিছি ফিরি আয় রাধা। ভোজবাজির মত বাঁশবন থেকে বেরিয়ে আসে হরিপদকাকা। তারহাতে ঝকমক করছে খাগের বাঁশি। নগ্ন শরীর ! কেবল তার মাথায় জ্বলছে রাংতার কৃষ্ণ মুকুট। গনেশ অবাক হয়না। এক সময় সারা বছর যাত্রাপালায় কৃষ্ণ সাজত কাকা। মাথায় গোলমাল দেখা দেওয়ায় বাড়িতেই থাকে ঘরবন্দি হয়ে। কোনো কোনো মাতাল জ্যোৎস্না রাতে হরিপদকাকা কৃষ্ণ সেজে উদোম বেরিয়ে পড়ে পথে ঘাটে। তবে বেশিদূর যায় না। বাঁশঝাড় ঘুরে ঘুরে বাঁশি বাজায়। গ্রামের সবাই বলে জ্যোৎস্না ধরা পাগল। কারু কোন ক্ষতি করে না।একা একা মনে থাকে।
গনেশের কাছে এসে বাঁশিতে সুর তোলে । ঝুরঝুর করে ভেঙ্গে পড়ে জ্যোৎস্না । গনেশ দেখে মাথা নামিয়ে শুয়ে পড়েছে বাঁশঝাড় । বাতাস ঘন হয়ে থেমে গেছে । ঘাস মাটি পাতা ঝোপ সুর শুনছে কেমন মায়ামনে। গনেশের শরীর নরম হয়ে আসে। শুকনো পাতার মত কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে পড়ে যাওয়ার আগে বাঁশবন থেকে ডানা ঝাপটে কর্কশ স্বরে ডেকে উঠে কাকের ঝাঁক। আচমকা থেমে যায় বাঁশির সুর। হরিপদকাকা ঝপাত করে পড়ে যায় মাটিতে। গনেশ দেখে বিবর্ণ রঙ নিয়ে সরে যাচ্ছে চাঁদ। সে মুখে জাল কেটে বেরিয়ে যাওয়া মাছের জন্যে জেলের দুঃখ ভাসছে । গনেশ শিউরে উঠে গল্প তবে মিথ্যে নয়। জ্যোৎস্না যে মানুষ শিকার করে পাগল বানিয়ে দেয় এবার সে গল্প গনেশ বিশ্বাস করে। দূর মসজিদে আজান কাঁপছে । নতুন কেনা জাল দিয়ে হরিপদকাকার ন্যংটো ঢেকে গনেশ বাড়ির কাছে এসে ডাক দেয় বাবা, ও বাবা – ও মা , ঠাকুমা রে—

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শামীম খান — december ২৩, ২০১৬ @ ৬:২৬ পূর্বাহ্ন

      অসাধারন লিখেছেন । একটানে শেষ করলাম । শুভকামনা রইল ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com