জুয়েল আইচ: রাষ্ট্র কি কোন জীব নাকি যে তার ধর্ম থাকবে?

রাজু আলাউদ্দিন | ২৪ december ২০১৬ ৪:১৫ অপরাহ্ন

Jewel-2
ছবি: নয়ন কুমারের ক্যামেরায় জুয়েল অাইচ।

সবাই তাকে জাদুকর হিসেবে চেনেন, কিন্তু তিনি নিছক জাদুকর নন, বরং তার চেয়ে বেশি কিছু। তিনি জাদুশিল্পী। তিনি যদি শুধুই বক্তা হতে চাইতেন, সেখানেও তার জাদুকরী শক্তির বিচ্ছুরণ যে কাউকে অভিভূত করতো। তিনি যদি কেবল উচ্চাঙ্গ সংগীতের শিল্পী হিসেবে পরিচিত হতে চাইতেন, তবে সেই পরিচয়টিও তাকে শিখরে নিয়ে যেত। তিনি যদি কেবলই লেখক হতে চাইতেন, তাহলেও তিনি লেখালেখির জগতে সর্বোচ্চ জায়গাটিতেই অবস্থান করতেন। কিন্তু তিনি বিচ্ছিন্নভাবে এর কোনোটাই হতে চাননি, তিনি হয়েছেন এই সবকিছুর এক সমন্বিত রূপ যা তাকে জাদুশিল্পের জগতে অনন্য ও বিরল ব্যক্তিত্ব করে তুলেছে। তাঁর অারও একটি বড় পরিচয় তিনি মহান মুক্তিযোদ্ধাদের একজন। এই মানুষটিই আত্মত্যাগে অটল হয়ে কাঙ্ক্ষিত ক্রোধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন শক্রর মোকাবেলায়। নিশ্চিত মৃত্যুর থাবা ফসকে বেরিয়ে গেছেন কয়েকবার। যুদ্ধাকালীন রোমহর্ষক ও রোমাঞ্চকর বহু ঘটনার সাক্ষী তিনি। যুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধীদের মৃত্যুফাঁদ থেকে আজকের জননন্দিত জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ কীভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন তার প্রথম সবিস্তার স্মৃতিচারণ করেছেন কবি-প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিনকে দেয়া এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে। ভিডিওতে ধারনকৃত সাক্ষাৎকারটির শ্রুতিলিখন করেছেন সোহেল আহসান। ভিডিও ও আলোকচিত্র গ্রহণে ছিলেন নয়ন কুমার। বি. স.

রাজু আলাউদ্দিন: আপনি আমাদের অহংকার, এক বীর মুক্তিযোদ্ধা। আমি প্রথমেই জানতে চাইব যে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য কিভাবে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন?

জুয়েল আইচ: আসলে ওই সময় আমার চরিত্রগত কারণেই আমি যুদ্ধে গিয়েছিলাম। যেমন আমি অপমান সহ্য করতে পারি না। আমার কাছে মনে হচ্ছিল যে, ওরা আমাদেরকে চূড়ান্ত অপমান করছে। বিনা অপরাধে আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পরেছে এবং আমাদেরকে মারছে। ২রা মার্চ স্টেডিয়ামে ছিলাম, যেখানে ক্রিকেট খেলা হচ্ছিল। ভুট্টোর ঘোষণা আসল যে, তারা সংসদে বসছে না। তারপরতো ক্রিকেট খেলা পণ্ড হয়ে গেল। ওইখান থেকে ৭ মার্চের ভাষণ পর্যন্ত আমরা স্টেজের কাছে ছিলাম।

রাজু: তাই নাকি? এটাতো এক পরম সৌভাগ্য– সেখানে থাকার এবং দেখার এবং বক্তৃতা শুনবার।

জুয়েল: ওরে, সে কি ফিলিং! উপরে আর্মিদের হেলিকপ্টার উড়ছে। বোমা ফেলতে পারত। পরবর্তীতে ওদের চরিত্র যা দেখেছি, তাতে করে ওইখানেই বোমা ফেলতে পারত। এত লক্ষ লক্ষ মানুষ দেখে হয়তো আর ফেলেনি। হঠাৎ করে লক্ষ লক্ষ মানুষ যদি–আমি জানি না কত লক্ষ হয়েছে–সেটা সাংবাদিকরা জানবেন। মানুষে থই থই করছে।

রাজু: আমার ধারণা আমি ছিলাম। আমার এক বড় ভাই আওয়ামী লীগ করতেন তো। ওই যে আওয়ামী লীগের একজন নেতা ছিলেন মহিউদ্দিন আহমেদ। উনি তার পি.এ. ছিলেন। আমি তখন খুব ছোট। ৬/৭ বছর বয়স। আমাকে খুব পছন্দ করতেন। আমাকে মাঝে মধ্যে নিয়ে যেতেন বিভিন্ন জায়গায়। আমার মনে আছে, ৭ মার্চের ওই ব্যাপারটা আমি দেখেছি। বিশাল। গোটা সোহরাওয়ার্দি উদ্যান, যেটা কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। মাঝখানে একটা ছোট্ট পুকুর ছিল, সেটায় আর পানি ছিল না, বিপুল সংখ্যক মানুষের কারণে তা কাদায় পরিণত হয়েছিল।

জুয়েল: সেই সময় আমার নবযৌবন। অতএব হেলাল হাফিজের একটা কবিতা আছে না, এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়। ২৫ মার্চ কিন্তু আমি চোখের সামনে মানুষ মারতে দেখেছি ঢাকায়। আমি ৩ নম্বর পাটুয়াটুলিতে থাকতাম। যেখানে জীবনানন্দ দাশ থাকতেন। সেই ঘরে ওই খাটে আমি থেকেছি। খাট না তো, নড়বড়ে একটা চৌকি।
আমি খুব সৌভাগ্যবান।
রাজু: আপনি তো বোধহয় বরিশালের উত্তরাধিকারী হিসেবে সেটা পেলেন।

জুয়েল: কলেজিয়েট স্কুলের পেছনে যে ব্রাহ্ম সমাজ পাঠাগার, ওইখানে ছিল ছাত্র কোঠা। ওইখানে জীবনানন্দ দাশ থাকতেন। রামমোহন পাঠাগারের তিনি লাইব্রেরিয়ান ছিলেন।

রাজু: সম্ভবত বিয়েটাও হয়েছিল ওইখানেই, তাই না?

জুয়েল: সম্ভবত। তো ওইখানে ছিলাম। ২৫ মার্চের পর আর ঢাকা থাকা উচিৎ হবে না ভেবে আমি চলে গেলাম বাড়িতে। বাড়িতে যাবার অারেক বিরাট গল্প। অনেক কষ্ট করে বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলাম। বাড়িতে গিয়ে কিছুদিন পরে দেখলাম আর্মি জেলায় জেলায় নেমে গেছে। গ্রামে গ্রামে যাচ্ছে। তো এই যখন অবস্থা, আমরা দেখেছি কি নিষ্ঠুর নৃশংসভাবে মানুষকে মারছে, নিরিহ মানুষকে মারতে আমি দেখে গেছি ঢাকায় থাকতেই। তারা আমাদের মা বোনদেরকে ধর্ষণ করছে। তো এইসব জিনিস আমাকে প্রচণ্ডভাবে আঘাত করল। তখন আমার মনে হল যে, আমি যদি এখন যুদ্ধে না যাই তাহলে আমার পক্ষে এটা একটা কাপুরুষের আচরণ হবে। কিন্তু বাড়িতে তো বলে যাওয়া যাবে না যুদ্ধে যাচ্ছি। তাহলে যুদ্ধে যেতে দেবে না। তো, কী করলাম? একটা রেগুলার লুঙ্গি, কোমড়ে একটা গামছা, তার উপর একটা ফ্লাইং শার্ট। এইটা পরে আমি বেড়িয়ে পড়লাম। আমার বন্ধু ছিল নিটুল। সব সময় আমার সঙ্গী। যা কিছু করতাম, বিনা বাক্যব্যয়ে আমার সঙ্গী হিসেবে লেগে খাকতো। সে জানতো যে আমি না ভেবে কোনো স্টেপ নেই না। আর্মিরা গ্রামে গ্রামে যাচ্ছে। অতএব আমাদের গ্রামেও আসবে। আমাদের গ্রামে এসে যদি আমাকে মেরে যায়, তাহলে সেটা হবে একটা কাপুরুষের মৃত্যু। অতএব যদি মারে, তাহলে আমি যুদ্ধ করে মরব। আমার কাছে তো কোনো হাতিয়ার নেই। প্রথমদিকে ওরা আসছে। এদিক ওদিক শেল পড়ার শব্দ, মেশিনগানের শব্দ শুনছি।

Jewel-1
ছবি: নয়ন কুমারের ক্যামেরায় জুয়েল অাইচ ও রাজু আলাউদ্দিন।

কয়েকদিন হাতে একটা রাম দা নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছি আমরা ৪/৫ বন্ধু মিলে। কিন্তু দেখি তাতে মুশকিল হচ্ছে কি, আমরা যখন বড় রাস্তা থেকে টহল দিচ্ছি তখনই যারা জঙ্গলের মধ্যে পালিয়েছে তাদের কাঁপুনি লেগে গেছে। বাচ্চারা কান্না শুরু করে দিয়েছে। আমরা তো মিলিটারিদের সঙ্গে রাম দা দিয়ে যুদ্ধে করতে পারব না এটা সত্য। আমাদের লক্ষ্য ছিল যে, মিলিটারি চলে যাওয়ার পর যারা লুট করতে আসে, তাদেরকে আমরা প্রতিহত করব। কিন্তু বিপদ তো একা আসে না। ওদেরকে ফলো করে দালালরা আসে। ওদেরকেও নিয়ে আসে কিন্তু দেশীয় দালালরা। যেমন আমাদের গ্রামে যে ক’বার আর্মি এসে মারল–শত শত মানুষ। হামেদ জমাদ্দার নামে একটা লোক ছিল রাজাপুর থানার। তার ছেলে, সে একেবারে সপরিবারে নেমে গেল। তার ছেলে, তার বউ, এরা সবাই আর্মিদের সহযোগিতা করেছে। আমাদের পাশের গ্রামটি ছিল সেহাঙ্গল। এক অসাধারণ গ্রাম। সেই জায়গার মানুষ রেগুলার মানুষের চাইতে এতো উন্নত চেতনার ছিল যে, সেখান থেকে আর্মি কোনো লোক বাগাতে পারেনি। অনেক দূর থেকে হামেদ জমাদ্দারের ছেলে এসেছে। হামেদ জমাদ্দার আমাদের গ্রাম অল্প অল্প চেনে। সেহাঙ্গল থেকে কাউকে নিতে পারেনি, সেহাঙ্গল থেকে যদি কোনো লোক পেত তাহলে তারা আমাদেরকে সহজে মারতে পারত। যাই হোক যখন বুঝলাম যে, ওদের সঙ্গে রাম দা দিয়ে কিছু হবে না। আর আমাদের পাশের গ্রাম হচ্ছে সেহাঙ্গল আর সেহাঙ্গলের লোক হচ্ছে আমাদের জন্য ঢালের মতো। আমাদেরকে তারা মারতে দেবে না। দুয়েকটা খারাপ লোক বাদে ওখানকার ম্যাক্সিমাম লোক হচ্ছে উন্নত চেতনার। সেইখান থেকে ওরা যেহেতু কাউকে রিক্রুট করতে পারে নি, তখন অন্যান্য গ্রাম থেকে আমাদের গ্রামে গ্রামে লুটেরারা যে আসবে– এই সাহস আর তারা করেনি, কারণ সেহাঙ্গল। তো ওই অবস্থা দেখে আমি চলে গেলাম। মুক্তিযোদ্ধাদের খবর পেয়েছি তারা আটঘর-কুড়িয়ানাতে আছে। আমি আর নিটুল চলে গেলাম। ওরা তো আন্ডারগ্রাউন্ড। নিজেদেরকে ধরা দেয় না। একদিন আমাদের গাছতলায় থাকতে হলো। গাছতলায় না খেয়ে পড়ে থাকা কি যে কঠিন কাজ। রাতে মশা, নিচে পিঁপড়া, পোকা, এটা সেটা।

পরেরদিন সকাল থেকে খোঁজ খোঁজ। কি করে যেন একজন লোক বুঝল যে আমরা খুব ডেসপারেট। বিপ্লব( আসল নাম শশাঙ্ক পাল) নামে একজন আসল, সঙ্গে মাহতাব নামে একজনকে নিয়ে এল, তার বাড়ি লৌহজং। তারা আমাদের খোঁজ-খবর নিয়ে দেখল যে আমরা সাংঘাতিক ডেসপারেট। আমরা যুদ্ধ করবই। ওরা আমাকে ওদের হেডকোয়ার্টারে ডাকল। ওরা দেখল যে, ঠিক ওদের চেতনার সঙ্গে আমার যায় না। ওরা ছিল পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন নামে একটা সংগঠনের লোক। ওরা বলল যে, আপনার চেতনা হচ্ছে পেটিবুর্জোয়া চেতনা। আপনি জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে থাকবেন। তারপর কিন্তু আমরা আর আপনাকে নেব না। তখন আপনাদের সঙ্গেই আমাদের লড়াই হবে। তখন আমি বললাম যে, এই মুহূর্তে যারা পাকিস্তানি আর্মিদের ঠেকাতে চাইছে তাদের সঙ্গে আমি থাকব। তারা যে-ই হোক। পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলনের মেনিফেস্টো আমার জানা নাই। আতএব আপনারা কি চান না চান তা আমি জানি না। পরে তাদের কিছু জিনিস আমি পছন্দ করেছিলাম। সেটা হচ্ছে, না বলে কারও একটা ফসলেরও ক্ষতি করা যাবে না। একটা পেয়ারাও খাওয়া যাবে না। কারও সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা যাবে না। তাদের ছিল শ্রণি সংগ্রাম। সে সময় তারা মার্কসিস্ট ছিল। তাদের ধারণা ছিল যে, জাতীয় যুদ্ধের পরেই শুরু হবে তাদের শ্রেণি সংগ্রাম। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত তারা বুর্জোয়াদের সাথে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। আমাকে তারা ৭ জনের একটা গ্রুপের হেড করে নিল। সে সময় আমার বি,এ, পরীক্ষা দেয়ার কথা ছিল। তারা জানত যে বিশ্বরাজনীতি সম্পর্কে আমার ধারণা আছে। আমি বই পড়ি। মার্কসবাদ কী–তাও আমি জানি। মাও সে ‍তুং-এর চিন্তাধারা নিয়ে আমাকে প্রশ্ন করলো। আমি বই পড়ি মানে কি আমি যখন উপন্যাস পড়ি তখনই যখন ভাল্লাগছে না কিছু। মনকে আনন্দ দেয়ার জন্য আমি উপন্যাস পড়ি, কবিতা পড়ি। আমার কাছে উপন্যাস এবং কবিতা লঘু বিনোদন। আমি কিন্তু সিরিয়াস রিডার। দুনিয়ার সব খবর জানব, এই হচ্ছে আমার আকাঙ্ক্ষা। আমি নিজেকে জানব, মানুষকে জানব, সাইকোলজি জানব, ফিলসফি জানব, হিস্ট্রি জানব, জিওগ্রাফি জানব, নৃতত্ত্ব জানবো। অর্থাৎ আমি দুনিয়াতে আসছি, আমার দুনিয়াকে জানতে চাই। আমি অন্যের ক্রিয়েটিভ গল্প কি, আমি তাতে হাসলাম না কাঁদলাম, সেটা আমার কাছে একটা লঘু বিষয়।
যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি, আমি তখন রবি ঠাকুরের গল্পগুচ্ছ পড়ে শেষ করি। ওটা ছিল বি,এ, ক্লাসের পাঠ্য। কয়েকটা স্টোরি ছিল আমি বারে বারে পড়েছি। বেশি ভালো লেগেছে যে-গুলো। এটা আমার কাছে সিনেমা দেখার মতোই এটা লঘু বিনোদন।

Jewel-3
ছবি: নয়ন কুমারের ক্যামেরায় জুয়েল অাইচ।

আমাকে ওরা যখন প্রশ্ন করতে লাগল, তারা টোকা দিয়ে দেখল যে আমি তাদের যে মতবাদ আছে সেটাও আমি জানি। ওরা কিন্তু নিজেদের রিভিল করেনি যে, ওরা কোত্থেকে আসছে। তাদের লক্ষ্য সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। আমার সে সময় কাজ হচ্ছে আমি আর্মি ধ্বংস করব।

রাজু: বিদেশিদেরকে তাড়াতে হবে। ওদেরকে পরাজিত করতে হবে..

জুয়েল: হ্যাঁ, হ্যাঁ । এক্সাক্টলি। আমি যে নৃশংসতা দেখে এসেছি, যে নৃশংসতার গল্প চারিদিকে ছড়িয়েছে, তা আমাকে এমন পাগল করেছে যে আমি নিজের জীবন দেয়ার জন্য গিয়েছি। আমি ফিরে আসব, এটা আমার টার্গেট ছিল না।

রাজু: তখন ফিরে আসার কথা ভাবেননি…

উত্তর : না না । ফিরে আসব– এটা আমি চিন্তাই করিনি। নয় মাসের মধ্যে আমরা স্বাধীনতা পেয়ে যাব–এটা ভাবিনি, কারণ তখন ১৬ বছর হয়ে গেছে ভিয়েতনামে, তারা জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ চালাচ্ছে।
রাজু: তখন তো ভিয়েতনামের যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করে সেই শ্লোগানগুলো তৈরি হচ্ছিল …বাংলা হবে ভিয়েতনাম”।

জুয়েল: হ্যাঁ, হ্যাঁ। তারপর আমাকে ৭ জনের একটা গ্রুপের লিডার করে দেয়া হলো । নিটুল আমার অধীনেই। তবে গ্রুপের প্রধানের নির্দেশনা অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক ছিল। তবে আমি এই জায়গায় স্বৈরতান্ত্রিক ছিলাম না। আমাকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিল, জেনারেলের নির্দেশ যদি সিপাহিরার না মানে তাহলে সেই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অতএব আপনি যখন ছবি আঁকবেন বা বাঁশি বাজাবেন তখন তবলাবাদককে যত খুশী স্বাধীনতা দেন তাতে কেন অসুবিধা নেই। কিন্তু এটা যুদ্ধ, এটা কোন ভোজসভা না। আমি বললাম, বাহ, মাও সে তুংয়ের বক্তৃতা দিচ্ছেন। ওরা বললো, আচ্ছা, আপনি মাও সে তুং পড়েছেন নাকি? আমি বললাম, হ্যাঁ, পড়েছি তো বটেই। তো আমাকে নিয়ে নিল। প্রথমে যে-যুদ্ধটা হলো, কাপড়কাঠি বলে একটা জায়গা ছিল, স্বরুপকাঠি-বানারীপাড়া এবং ঝালকাঠি এই তিন এলাকা নিয়ে একটা বিশাল পেয়ারা বাগান। ওই পেয়ারা বাগানের মধ্য দিয়ে গেছে একটা ছোট নদী। একটা গ্রামের নাম ছিল কাপড়কাঠি। ওই সময় নদীটাকে কাপড়কাঠি নদী বলেই আমরা বলতাম। ওইখানে আমরা ৫০০ গজের মতো জায়গায় ৬/৭টা ইউনিট একত্রিত হলাম। একজন সিনিয়র লিডারের হাতে রইল বাঁশি সংকেত দেয়ার জন্য। আমাদের প্রত্যেকের হাতে কিন্তু প্রাচীন থ্রি নট থ্রি রাইফেল। আর ওদের হাতে তো মেশিনগান, শেল, হোয়াট নট। যুদ্ধ যে কি ভয়াবহ হতে পারে সেটা আমরা জানতাম। ভাবতাম এইটাই আমাদের মৃত্যু। সবাই প্রশ্ন করে, যদি মৃত্যু হয় তোমরা রাজি কি-না। সবাই চিৎকার করে বলল যে, আমরা যুদ্ধ করতে এসেছি, আলাপ করতে তো আসিনি। তো ওই ৫০০ গজের মধ্যে আমরা আলাদা আলাদা ইউনিট নিয়ে অবস্থান করলাম। আমাদের প্ল্যান ছিল যে, আমাদের ঘর পুড়তে, মানুষ মারতে ওরা আসত সকালে। সকালে আমরা ওদেরকে আক্রমণ করবো না। যেহেতু আমরা গেরিলা যুদ্ধ করছি, তাই ওরা যখন দুর্বল তখন ওদেরকে আঘাত করার আমাদের আসল টাইম। আমরা অ্যামবুশ করে রেখেছি। ওরা আসতো কাঠের লঞ্চে, আমরা ওটাকে বলতাম ঘরপোড়া লঞ্চ। যখন ওরা জাহাজ থেকে নেমে গেল তখন আমরা পজিশন নিয়ে বসে থাকলাম। কারণ ঘরটর পুড়িয়ে, মানুষ মেরে ঠিক বিকেলে ওরা ঠিকই আসছে, যখন সূর্য যাবে যাবে। তার আগে ওরা থানায় যাচ্ছে। থানায় ওদের ঘাঁটি। গানবোটসহ অনেক কিছুই আছে। আমরা যেহেতু গানবোটের সঙ্গে পারব না, তাই আমরা টার্গেট করলাম ওই কাঠের লঞ্চ যেটাতে করে ওরা আসত। আমরা আমাদের সিনিয়র লিডারের হুইসেলের অপেক্ষায় আছি।

Jewel-4
ছবি: নয়ন কুমারের ক্যামেরায় জুয়েল অাইচ ও কন্যা খেয়া।।

কথা ছিল যে, লঞ্চটি যখন আমাদের রেঞ্জের মাঝখানে পড়বে তখন আমরা গুলি করব সারেংকে। তারপর এলোপাথাড়ি গুলি করব লঞ্চটির গায়ে যাতে ডুবে যায়। কি হবে আমরা জানি না। কারণ লঞ্চে এর আগে আমরা আক্রমণ করিনি। আমরা বিভিন্ন জনের কাছ থেকে মত নিয়েছে কিভাবে আক্রমণ করা যায় এবং কিভাবে আক্রমণ করলে তার ফল কী হতে পারে। আমাদের ধারণা ছিল সারেংকে যদি গুলি করে মেরে ফেলতে পারি তাহলে লঞ্চটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডুবে যাবে। লঞ্চের সবাই দিশাহারা হয়ে যাবে। নিজেদের মধ্যে প্যানিক সৃষ্টি হয়ে যাবে। আমরা মুখে যতই বীরত্ব দেখাই না কেনো বুকে কিন্তু ঠিকই ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেছে। লঞ্চটি আমাদের রেঞ্জের কাছাকাছি আসার আগেই আমাদের কারও একজনের বন্দুক থেকে গুলি বেরিয়ে গেছে। ওরা তখন কোনদিকে না তাকিয়েই মেশিনগান থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি করতে থাকল। আমরা তো ঘাবড়ে গেছি যে এখন কি করব আমরা। তারা তো আমাদের রেঞ্জের বাইরে। ওই যুদ্ধ তো আমাদের প্রথম। পরে তো আমরা অনেক পাকা হয়ে গিয়েছিলাম। ওই সময় ভাটা ছিল নাকি জোয়ার -সেটা আমাদের খেয়ালে ছিল না। ওইটা ছিল ভাটির টান। লঞ্চটি যাচ্ছে ভাটির দিকে। আমাদের যে-লোকটি গুলি করেছে সে ভুল করেও সঠিক সময়েই গুলি করেছে। কারণ লঞ্চটি আমাদের কাছাকাছি চলে এসেছে। ইতিমধ্যে লঞ্চ আমাদের ঠিক সেন্টারে এস পড়েছে। আমরা ধামাধাম গুলি করলাম। সারেং পড়ে গেছে, লঞ্চ ঘুরে গেছে।
এবার লঞ্চে যখন আমরা গুলি করেছি, তখন লঞ্চটি ফেটে উল্টে গেছে। আর ওরা সাঁতার না জানা কুকুরের মতো হাবুডুবু খেতে থাকল।
তারপর কেউ কেউ ওরা কাঠফাট ধরে ওপারে গিয়ে উঠল। উঠেই মেশিনগান সেট করে শা শা গুলি করতে থাকে। তখন গোধুলী, তখনও অন্ধকার হয়নি। পুরো সন্ধ্যা। ওরা কল্পনাই করতে পারে নাই যে, একটা পেয়ারা বাগানের মধ্যে একদল গ্রাম্য মানুষ এমন করবে। ওরা পেনিকের চোটে মেশিন গান চালাচ্ছে তো চালাচ্ছেই। এরপর রাত ১২টা কিংবা সাড়ে বারোটার পরে ওদের আর গুলির শব্দ পাওয়া যায়নি। আমরা যখন আবার ঠুশঠাশ করে দুয়েকটা গুলি করছি তখন ওরা আবার ঝরঝর করে গুলি করতে শুরু করলো। এরকম করে বার তিনেক পরে ওদিক থেকে আর কোন গুলি আসছে না। তার মানে ওদের অ্যামুনেশন শেষ।

যতটুকু পারে ওরা ঝোপের মধ্যে গিয়ে আশ্রয় নিল। আমাদের পরিকল্পনা হলো সকালের আলো যখন ফুটবে তখন নৌকা নিয়ে ওপারে যাব। ওদিকে গ্রামের শত শত লোক মারতে মারতে ওদের চারটাকে ধরে নিয়ে আসছে। তাদের এমন পিটিয়েছে যে তারা সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারছে না। সব কিন্তু পাঞ্জাবি। লম্বা লম্বা। ওই চারটাকে আমরা বাঁচালাম ওদের হাত থেকে।
রাজু: বাঁচালেন কেন?

জুয়েল:আমরা স্থানীয় লোকদের কনফিডেন্স দেয়ার জন্য বাঁচালাম। ওদেরকে যদি মেরে ফেলি তাহলেতো মরেই গেল। ওদের অনেকেই গুলি খেয়ে মরেছে, ডুবে মরে গেছে। আমরা বাঁচালাম এই জন্যে যে–অামাদের মধ্যেই কিন্তু কেউ কেউ বাঁচাবার বিপক্ষে ছিল– ওদেরকে নিয়ে আমরা গরুর মতো করে রশি বেঁধে গলায় জুতা ঝুলিয়ে হাটে হাটে ঘুরাব। আবার এটাও জানি এটা আমরা বেশিদিন করতে পারবো না, কারণ পাকবাহিনী প্রতিআক্রমণের জন্য প্রস্তুত হবে। তবে ওরা এতো ভয় পেয়ে গেলো যে পরবর্তী ৭দিন ওরা আর আমাদের এলাকায় আসে নাই।

Jewel-5
ছবি: নয়ন কুমারের ক্যামেরায় জুয়েল অাইচ।
এক সময় কি হলো, ওই যে শরসিনার পীর ছিল না, সে কুৎসিত কুৎসিত ফতোয়া দিতে শুরু করল। যেমন বলতে শুরু করলো, এই যারা স্বাধীনতা চায় তাদের সমস্ত সম্পত্তি এবং বৌ, মেয়ে–এরা হচ্ছে গনিমতের মাল। ওই পীরের মাদ্রাসার ছাত্র এবং তার হাজার হাজার মুরিদকে ডেকে আনা হলো। হাজার হাজার দা দিয়ে পেয়ারা বাগান কাটার জন্য। পুলিশতো তাদের পক্ষেই ছিল, চৌকিদার আগে থেকেই কাজ করছিল আর ওই সমস্ত দালালগুলোও।
এরা আমাদের পুরো পেয়ারা বাগান সাফ করে ফেলল। আমরা মুক্তিবাহিনী ওখানে আছি জেনে আশেপাশে যত বন্দর আছে সেখান থেকে লোকজন এসে বাঁচার জন্য ওখানে থাকতো। এই মুহূর্তে আমি একটা কথা বললে লোকজন বিশ্বাস করবে না, কিন্তু সত্যটা আমি জানি যেহেতু তাই অামাকে বলতেই হবে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি হলো আটঘর-কুডিয়ানার ওই এলাকাগুলো। কারণ ওই এলাকার পাঁচ হাজার মানুষকে মেরে ফেলেছে ওরা। মাইন্ড ইট, নট ফাইভ হান্ড্রেড, ফাইভ থাউজেন্ড। ওই সময় নানান ঘটনা আছে। মরতে মরতে বেঁচে গেছি, এমনও হয়েছে। আর্মিরা কোন দিক দিয়ে আসছে তা দেখার জন্য একজন স্কাউটের দায়িত্ব ছিল, কিন্তু সে গাইগুঁই করছে, বলছে যে তারা মাথা ধরেছে। তো একদিন কেউ এই দায়িত্ব নিচ্ছে না দেখে আমি বললাম, ঠিক আছে আমি যাচ্ছি, দেখে আসি।
একদিন দেখছি ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের উঁচু রাস্তা দিয়ে আর্মিরা যাচ্ছে অস্ত্রশস্ত্রসহ, ঘরবাড়ি পোড়াতে পোড়াতে। আমরা কোনদিক থেকে আক্রমণ করবো সেসব নিয়ে চিন্তা করছি। আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল যেগুলো মেটাল বডি সেগুলো আক্রমণ করবো না। অামরা শুধুমাত্র কাঠের এবং ফাইবার গ্লাসট্লাস দিয়ে বানানো স্পিডবোটগুলো আক্রমণ করবো। আমি আরেকটু নজর দেয়ার জন্য একটু একটু করে হামাগুড়ি দিয়ে এগুচ্ছি। হঠাৎ দেখি পিছনে শব্দ। বুটের শব্দ। অারেক দল আমার পেছন দিক থেকে আসছে। উর্দুতে কথা বলছে। আমি রাস্তার পাশে। খাটো খাটো কচু গাছ। অামার মনে হলো এটাই আমার সর্বশেষ মুহূর্ত। একজন এলে আমি হয়তো তার গলা কামড়ে ধরতে পারি, কিন্তু এতগুলো যদি আমাকে গুলি করে–আমিতো হামাগুড়ি দিচ্ছি–আমিতো ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবো। আমি ওইখানে ঘাসের মধ্যে উবু হয়ে শুয়ে রইলাম দম বন্ধ করে যাতে একটা পাতাও না নড়ে। অন্য একটা গ্রুপ হয়তো ওদেরকে ডেকে পাঠিয়েছে তাই ওদিকে যাচ্ছে। ওরা যেহেতু উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াচ্ছে, ওরা আর এদিক ওদিক দেখেনি। আমি ক্ন্তিু ওদেরকে দেখছি, ওরা যাচ্ছে।
আরেকদিনের একটা ঘটনা। একটা বাঁশের সাঁকো। আমি কাঁধে রাইফেলসহ যাচ্ছি। বিলটার ওপারে আর্মি এসেছে। কোথায় এসেছে, আমাদের কি করতে হবে এটা বোঝার জানার জন্যে। আমার সে সময় নাম ছিল জাহিদ, গোপন আস্তানায়। সবাই বলল জাহিদ ভাই এটা খুব ভালো পারে। আমি মনে মনে বলি ভালো পারি কি, ওরা ভয়ে যাবে না। আমিতো মৃত্যুর ভয় আগেই ফেলে এসেছি–সেটা ওরা বুঝতে পারেনি। কাঁধে একটা থ্রি নট থ্রি রাইফেল। আমি সাঁকো পার হচ্ছি। সাঁকোটা তখন বেশ কর্দমাক্ত থাকত। গ্রামেগঞ্জেতো কাদা অনেক। আমি যাচ্ছি বেশ শক্ত করে হাতল ধরে ধরে। হঠাৎ এক ঝাঁক গুলির মতো শব্দ পেলাম এবং আমি টের পেলাম যে আমি পড়ে গেছি কচুরিপানার মধ্যে। ও মাই গড। ওরা যে গুলি করেছে, তা সাঁকোর নিচ দিয়ে গেছে। সাঁকো যেগুলোর ওপর দাড়ানো ছিল, সেগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। এরপর আমি দেখলাম যে ওই কচুরিপানার উপর দিয়ে জোনাকির মতো ঝলমল ঝলমল করে যাচ্ছে গুলি। ওরা হয়ত বুঝল যে, এতো গুলির পর তো আর থাকার কথা নয়। কেমনে যে থাকলাম, আমি নিজেই জানি না।

রাজু: একদম নিশ্চিত মৃত্যু..

জুয়েল: একদম নিশ্চিত মৃত্যু। আমাকে টার্গেট করেই কিন্তু ওরা মেশিনগান চালিয়েছে। ওখান থেকে বেঁচে আসাতো এক মিরাকল। গুলি যদি নিচ দিয়ে না গিয়ে উপর দিয়ে যেত তাহলেই আমি মরে যেতাম। কচুরিপানা থাকায় ওরা আর বুঝতে পারেনি যে আমি বেঁচে আছি। এ রকম অনেক অনেক ঘটনা আছে। অনাহারের কষ্ট, মনে হয়েছে এই বুঝি না খেয়ে মরে যাব। না ঘুমাতে না ঘুমাতে এমন মনে হয়েছিল যে আর বাঁচবো না। তারপর পায়ে গ্যাংগ্রীন হয়ে গিয়েছিল। শহরে তো আমাদের জুতো পরে অভ্যাস। কাদার মধ্যে চলার তো অভ্যাস নাই। পায়ের আঙুলের গোড়ার যে সরু অংশটা, ওটা কাদায় খেয়ে হাড় বেরিয়ে গেছে। কোনো ওষুধ নাই, কিচ্ছু নাই। কারও যদি ক্ষত হয় তাহলে তাকে সারেন্ডার করতে হবে অন্য সঙ্গীদের কাছে, এটা আমারই নির্দেশ ছিল। তারা সর্ষের তেলে সলতে ডুবিয়ে আগুন জ্বালিয়ে ওই জায়গাটা পিটিয়ে পিটিয়ে পুড়িয়ে দেবে। তাহলে সেপটিক থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এটি দেখেছি বাড়িতে যারা হাল চষত,তাদের করতে দেখেছি। ওইটা থেকেই এই আইডিয়াটা নেয়া। আমার নিজেরই হয়ে গেছে এই অবস্থা। ওই নিয়ে কাদার মধ্যে চলা। ওহ, সেই সব দিন । ওই নিয়ে আবার যেতেও হবে। ওই গর্তের মধ্যে পুটিং ঢুকাতাম। পুটিং মানে, আম গাছের কষ সরু করে চেপে ধরে তারপর ওটার মধ্যে ঢুকিয়ে দিতাম।
Jewel-6
ছবি: একমাত্র কন্য খেয়াকে খাইয়ে দিচ্ছেন জুয়েল আইচ।

রাজু : এতে করে জীবাণুগুলো মারা যায়, তাই তো?

জুয়েল: অন্তত এতে করে কাদা ঢুকবে না। কাদা বের করা আরেক যন্ত্রনা। ভেতরে পুঁজ হয়ে যেত। শরীর না একটা অদ্ভুত জিনিস, শরীর আউটার এলিমেন্টগুলোকে বের করে দেয়। ওগুলোকে চেপে ধরে বের করতে হতো। যাই হোক শেষে ওখানে আর থাকার উপায় ছিলনা। পেয়ারা বাগান সাফ করে ফেলল। তখন আমরা যে যার মতো করে নিজের আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা করলাম। তখন বাড়িতে যেতে খুব ইচ্ছে করছিল। আমি চলে গেলাম সেহাঙ্গল। কারণ জানতাম সেহাঙ্গলের মানুষ আমাকে আশ্রয় দেবে। সত্যিই আমাকে আশ্রয় দিয়েছিল। যতখানি তাদের পক্ষে সম্ভব তারা আমার জন্য করেছিল। এর মধ্যে একদিন একভদ্র লোক, নাম খলিল হাজরা, হুলারহাট থেকে এসেছেন। উনি ইন্ডিয়াতে গিয়েছিলেন। আমাদের তখনকার যিনি এম এন এ ছিলেন, ওনার নাম এনায়েত হোসেন খান। উনি ওই ভদ্রলোককে পাঠিয়ে দিয়েছেন দেশ থেকে মুক্তিকামী যুবকদের রিক্রুট করার জন্য।

সেহাঙ্গল থেকে কাউকে পায়নি, আমাকে পেয়েছিল। আমি তো যাওয়ার জন্য রেডি। রাস্তা চিনি না বলে হাঁটা ধরিনি। তো উনি বললেন পারবা তো তুমি হেঁটে যেতে, তুমি তো খোড়াচ্ছো? আমি বললাম পারব। খোড়া একটা পা থাকলেও আমি পারব। তো পরেরদিন যখন সময় হলো, সেদিন রাতে শেষ বারের মতো মাকে একটু দেখতে যাব।

পাশের গ্রাম। রাত হওয়ার পর আমি গেলাম। গিয়ে আমি ওই রান্নাঘরের বেড়ার ছিদ্র দিয়ে তাকিয়ে আছি। দেখি আমার ভাইবোন সবাইকে গোল করে বসিয়েছে রান্নঘরে। আমার মা, গরম ভাত থেকে ভাপ উড়ছে। আমার কিন্তু পেটে খিদে। মা ভাত বেড়ে দিচ্ছে সবাইকে। তারপর কি কি যেন দিলো। এখন মনে নাই আমার। দিয়ে তাদের দিক থেকে মা মুখ বিপরীত দিকে ঘুরে তার আঁচল দিয়ে নাক মুচছেন। চোখ মুচছেন আমার জন্য। আমার কথাটা বোধহয় তার মনে পরেছে।
রাজু: খাওয়ানোর সময় কিন্তু এটা হয়। অনুপস্থিত সন্তানের কথাটা ওই সময় বেশি মনে পরে মায়েদের।
জুয়েল: আর ও সময় জানাজানি হয়ে গেছে যে আমি চলে গেছি। থানা জানতো। থানা থেকে আমাকে খুঁজতে এসছিল তো বাড়িতে। তারপর ওখান থেকে দৌড়ে গিয়ে আমাদের একটা সাঁকোর গোড়ায় উঁচু একটা জায়গায় মাথা রেখে আমি কতক্ষণ একা একা কাঁদলাম। আমার এত বেশি কান্না এলো যে আমার কান্নার শব্দ বেড়িয়ে গেল। মা মা বলে আমি কতক্ষণ একা একা কাঁদলাম। তারপরে ওখানে তো আর থাকার উপায় নাই। কেউ যাতে না দেখে এইভাবেই আমি এসেছি। কেউ যাতে না দেখে এইভাবেই আমি বেড়িয়ে যাই। চলে গেলাম।

Jewel-7
ছবি: নয়ন কুমারের ক্যামেরায় জুয়েল-পরিবার।
তারপর হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে গেলাম হুলারহাট, কচুয়া । এ রকম করে আশাশুনি, তালা, কালিগঞ্জ । আমার মনে আছে এই জায়গাগুলির কথা। কারণ এই জায়গাগুলো সম্পর্কে আমার কিছু ভীতিকর স্মৃতি আছে। যাইহোক, পরে হিঙ্গোলগঞ্জে গিয়ে পৌঁছলাম। পথে আমরা আরও চারটা ছেলেকে পেলাম। খুব ডেসপারেট তারা। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় যোদ্ধা যে ছিল তার নাম ছিল চান। রাইফেল পরিস্কার করতে গিয়ে মাথার ভেতর দিয়ে গুলি বেরিয়ে গেছে। এ রকম কত যে দুঃখের গল্প আছে। তারপর হিঙ্গোলগঞ্জ থেকে গেলাম হাসনাবাদ। হাসনাবাদে একটা লঞ্চ ছিল। আমাদেরকে নিতে পাঠিয়েছিলেন এনায়েত হোসেন খান, পিরোজপুরের এম এন এ। এনায়েত হোসেন সাহেবের কোন লঞ্চটঞ্চ ছিল না। মঞ্জু সাহেবের লঞ্চ ছিল।
রাজু: মঞ্জু মানে কি আনোয়ার হোসেন মঞ্জু?
জুয়েল: ইনি অন্য মঞ্জু। ওই সময় আওয়ামী লীগের এম এন এ-এ ছিলেন তিনি । পুরো নামটা আমার মনে পরছে না। পরে মাছের ব্যবসা ট্যাবসা করে বড় ধনী হয়েছেন। পরে এই পার্টি ছেড়ে কোন স্বৈরশাসকের পার্টিতে যুক্ত হয়েছিল। যাইহোক, তার একটা লঞ্চ ওখানে ছিল। লঞ্চে ধারন ক্ষমতার চেয়ে তিনগুণ লোক ওখানে গিয়ে হাজির হয়েছে। ওইখানে আমাদেরকে রিক্রুট করবে । ইতিমধ্যে খাওয়ার অনিয়মের জন্য আমার রক্ত আমাশয় হয়েছিল।

যাইহোক আমি তো নিশ্চিত যে, আমি কমিশন পেয়ে যাচ্ছি। সে বছর আমার বি,এ , পরীক্ষা দেয়ার কথা। ইন্টারমিডিয়েট পাশ যারা তাদেরকেই অফিসার হিসেবে রিক্রুট করত। আমি খুব খুশি কিন্তু কি করে যে তারা জেনে গেছে যে আমার প্রবলেম হয়েছে। ইমিডিয়েট ট্রিটমেন্ট দরকার। অামাকে যখন ডাকলো আমি খোঁড়াতে খোঁড়াতে গিয়ে হাজির হলাম। জিজ্ঞেস করলো কী হয়েছে। আমি বললাম যুদ্ধ করতে গিয়ে এরকম হয়েছে। তারপরে বললো, শুনলাম আপনার নাকি ব্লাড ডিসেন্ট্রি হয়েছে। আমি বললাম হয়েছে, কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি সেরে যারে। তাহলে ওই তাড়াতাড়ি সময়টুকু আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে। আমরা আপনাকে দমদম ক্যান্টনমেন্টে পাঠিয়ে দিচ্ছি। এই ব্যাচে আপনার যাওয়া হচ্ছেনা। আমিতো খুব মন খারাপ করে ফেললাম। দমদম ক্যান্টনমেন্টে আমার ট্রিটমেন্ট হলো–হাই ডোজ এন্টিবায়োটিক। দীর্ঘদিন চললো ট্রিটমেন্ট। এর মধ্যে ওইখানকার একজন ডাক্তার আমার ভক্ত হয়ে গেলো। দেখলো যে জয় বাংলার ছেলে, কিন্তু কথাবার্তায় চৌকশ। সে যখন ফ্রি থাকতো তখন এসে আমার সাথে নানান গল্পটল্প করতো। এক সময় সে বলল, আপনি যে কাজ করতে যাচ্ছেন, এরজন্য বহু লোক আছেন, মানে রাইফেল চালানো। আপনি তো মোটিভেশনের কাজ করতে পারেন। যুদ্ধ কি খুব শিগগির শেষ হবে বলে মনে করেন? আমি বললাম, না। ভিয়েতনাম ১৬ বছর যুদ্ধ করেছে, আমাদের কত বছর লাগবে জানি না। তাহলে এতদিন ক্যাম্পের ছেলেপেলেগুলো কি নিরক্ষর থেকে যাবে? ওদের মোটিভেশন দরকার না? ওরা তো হতাশ। কারোর বাবা মা ভাইবোন কিছুই নাই। তার তো মোটিভেশন দরকার। আপনাদের রাইফেল তাদের হাতে দিয়ে যেতে হবে। আমি দেখলাম কথাটা খুবই যৌক্তিক। তারপর উনি আমাকে কলকাতায় এক ভদ্রলোকের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিলেন চিঠি দিয়ে। ওমা, সেখানে গিয়ে দেখি এক ভদ্রলোক, অ্যামেরিকান যিনি আমাদের রামমোহন পাঠাগার ভিজিট করতে গিয়েছিলেন। তিনি হিস্ট্রিয়ান। এবং উনি মুক্তিযুদ্ধের খুবই পক্ষের একজন লোক ছিলেন। ক্যাম্পে ক্যাম্পে স্কুল গড়ে দেয়ার কাজটা কিন্তু তারই ছিল। তো সেখানে গিয়ে ওনাকে দেখি। উনি কিন্তু আমাকে দেখে চিনতে পারেননি। আমি তাকে ঠিকই চিনেছি। আমি পরিচয় দিয়ে হাত বাড়িয়ে তাকে বললাম, ডু ইউ রিমেম্বার ব্রাহ্ম সমাজ ইন ঢাকা? ও ইয়েস ইয়েস। তোমার সঙ্গে এক গাড়িতে করে কাওরাইদ গিয়েছিলাম। হ্যাঁ, হ্যাঁ।
রাজু: কাওরাইদ তো তখন জঙ্গল।
জুয়েল: হ্যাঁ, হ্যাঁ। তার আগ্রহ ছিল পুরাতত্ত্ব, প্রাচীন বিষয়গুলো খুঁজে খুঁজে বের করা। সেই জন্যই রামমোহন পাঠাগার তার প্রিয় ছিল। রোজ যেতেন তিনি। নানান বইটই ঘেটে ঘেটে কী কী বার করতো, নোট নিত। বোধহয় কামরুজ্জামান ছিলেন তখন এডুকেশনের দায়িত্বে। উনি আমাকে কামরুজ্জামানের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন ‘হি ইজ মাই ওল্ড ফেন্ড ফ্রম ঢাকা’। কামরুজ্জামান সাহেব বললেন হোয়াট ক্যান উই ডু ফর হিম। তখন আমাকে ক্যাম্পে শিক্ষক হিসেবে পাঠিয়ে দেয়া হলো বাহাদুরপুর ক্যাম্পে।

Jewel-8
ছবি: নয়ন কুমারের ক্যামেরায় জুয়েল অাইচ ও রাজু আলাউদ্দিন।
সেখানে আমি এক সঙ্গে একাধিক কাজ করতাম। যেমন ওদেরকে অক্ষরজ্ঞান দিতাম ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা দশটা ক্লাস ভাগ করলাম। আমি খুব ইন্টারটেইনিং ওয়েতে ওদেরকে শেখাতাম, কারণ ওরাতো ট্রোমায় ভোগা ছেলেপেলে। ওদেরকে যতটা পারা যায় বিনোদনের মাধ্যমে সেই কাজটা করতাম। আমি ওদেরকে ছবি এঁকে বিনোদনের মাধ্যমে ক্লাস নিতাম। আর আমি যেহেতু ম্যাজিক জানতাম, ম্যাজিক যে এতো কাজ করবে তা আমি বুঝতে পারিনি।
রাজু: ম্যাজিক ম্যাজিকের মতো কাজ করে।
জুয়েল: হ্যাঁ হ্যাঁ। অাগে ডেকে আনা যেত না, এখন দেখি লাইন দিয়ে সবাই আসতে থাকল। আমার একটা অভ্যেস ছিল, পকেটভর্তি ক্যান্ডি রাখতাম। যারা একটু বেশি আগ্রহ দেখাতো–সবাইকে না, সবাইকে দেয়ার সামর্থ্যও আমার ছিল না্–তাদেরকে আমি উৎসাহ যোগাতাম। এতে করে অন্যদেরও আগ্রহ বাড়তো।
রাজু: সেই সময় বোধহয় লজেন্স বলতো।
জুয়েল: হ্যাঁ, হ্যাঁ।
রাজু: লম্বা একটা কাঠির মাথায় লজেন্সটা থাকতো।
জুয়েল: হ্যাঁ, কিন্তু অামার কাছে থাকতো সেলোফিন পেপারে মোড়ানে চকলেট। ওগুলো পকেটে রাখা সহজ ছিল। ওদেরকে দিতে খুব ভালো লাগতো। সেই মুখগুলো এত মলিন, চামড়াটামড়া শুকিয়ে কী অবস্থা! এই কাজগুলো আমি করতাম, আর খোঁজ রাখতাম কোথায় কি হচ্ছে। আমরা কিন্তু ওখানে বসেই টের পেয়েছি দেয়ার আর ফিউ এলিমেন্টস… মুশতাকের নাম তখন শুনিনি কিন্তু শুনেছি যে আমাদের মধ্যেই কিছু লোক পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। কেউ কেউ ধরাও পড়ে যাচ্ছে। এরা কারা, তখন তো বিস্তারিত জানা যায়নি। পরে জেনেছি মুশতাকের নেতৃত্বে সেই কাজ হয়েছিল। মুশতাক কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফেলেছিল তখনই। মুশতাকের বিদেশ সফরে তাজউদ্দীন বাধা দেন। তাজউদ্দীন যে কি করেছেন, বঙ্গবন্ধু হয়তো ঠিক মতো বুঝতে পারেন নি। তাজউদ্দীনকে দূরে সরানো হল এবং মুশতাককে কাছে নেয়া হলো। এই ভুলের মাশুল আমরা এখনও দিয়ে যাচ্ছি। তারপর অাস্তে আস্তে ইন্ডিয়া আমাদেরকে স্বীকৃতি দিল। ইন্ডিয়াতে বসেই তো আমরা সবকিছু, ওদের খাদ্য, ওদের বাসস্থান, ওষুধ–এসব পেয়েছি। তারপরে আমাকে মাসিক একশ টাকা দেয়া হতো। সেই সময় একশ টাকা আমাদের কাছে লাখ টাকার মতো। দু আনা দামের একটা রুটি খেয়ে সারাদিন চলতাম। তো সেই টাকার অাধাআধি নিজের জন্য রাখতাম আর বাকি অর্ধেকটা বাচ্চাদের জন্য রাখতাম। যেদিন পশ্চিম রনাঙ্গণে ইন্ডিয়াকে আক্রমন করল পাকিস্তান, তখন কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। একজন বড় অফিসার উনাকে গিয়ে কানে কানে কি যেন বললেন। বক্তৃতা কেবল শুরু করেছেন, তখন তিনি বক্তৃতা বন্ধ করে চলে গেলেন দিল্লিতে। আমি সেই বক্তৃতা শুনিনি, সেখানে ছিলামও না। বাহাদুরপুরে শুনেছি এই ঘটনা। সবার কাছে একটু আতংকের মনে হলো, কী ব্যাপার বক্তৃতা দিতে উঠেই শেষ না করে চলে গেলেন। তার কানে কী বললেন? পরে ইন্ডিয়াও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। প্রথমে আমাদেরকে স্বীকৃতি দিয়েছিল নেপাল, তারপর ইন্ডিয়া। ইন্ডিয়া যখন যুদ্ধ ঘোষণা করলো তখন আনন্দে চিৎকার করে উঠলাম। তখন বুঝলাম যে এইবার আর আমাদের কেউ ঠেকাতে পারবেনা। আমি তখনই শুনছিলাম যে ওরা(পাকিস্তানিরা) যশোর ছেড়ে গেছে।
ধোঁয়া দেখে যেমন আগুন বোঝা যায়, সেই রকম যশোর ছেড়ে গেছে মানে তারা পালাচ্ছে। ওদের পরাজয় ওরা গ্রহণ করে নিচ্ছে। যশোর ছিলো ওদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। কারণ ইন্ডিয়ার সাথে যদি পূর্ব রনাঙ্গণে যুদ্ধ করতে হয় তাহলে যশোরতো ওদের লাগবেই। সেই যশোর ছেড়ে যাওয়া মানে ওরা মেনে নিয়েছে যে ওরা পারছে না। এদিকে আমাদের তেজ বাড়ছে। শেষ পর্যন্ত যেদিন ওরা সারেন্ডার করল, আমরা তো লাফিয়ে উঠলাম অানন্দে। আমি আনন্দে কান্না করে দিয়েছি। এতো আনন্দ জীবনে আর কখনও পাইনি। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ঘটনা ছিলো ওই ১৬ ডিসেম্বর। বিজয় দিবস।
Jewel-9
ছবি: কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের আঁকা পেইন্টিংয়ের পাশে জুয়েল আইচ।

রাজু: জানি না, এসব কথা আপনি আগে কখনো বলেছেন কিনা।
জুয়েল: না, এত ডিটেইলে কখনো বলিনি। দেখতে হবো তো রাজু আলাউদ্দিনের সাথে কথা বলছি। হা হা হা।
রাজু: আপনি বাংলাদেশের জন্ম-প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। এই জন্মের পরে ৪০ বছর কেটে গেছে ।
জুয়েল: আরও বেশি।
রাজু: হ্যাঁ, আরও বেশি। এই যে স্বাধীনতার চেতনা, যেমন বিএনপি জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে। তারপর এরশাদ সাহেবের জাতীয় পার্টি, তারপর আওয়ামী লীগ–এই দলগুলো–আপনি কি মনে করেন–এরা সাফল্যের সঙ্গে এই স্বাধীনতার চেতনাকে বহন করতে পারছে, ছড়িয়ে দিতে পারছে?

জুয়েল: আমি রাজনৈতিক কথা বুঝলেও বলব না। আমি রাজনীতি-সচেতন কিন্তু রাজনীতিবিদ না। রাজনীতি-সচেতন না হলে শিল্পোত্তীর্ণ শিল্প, সাহিত্য রচনা করা সম্ভব না। যে প্রতিজ্ঞা করা হয়েছিল–স্বাধীনতার আগে কী ছিল, মনে আছে? ছয় দফার কথা মনে আছে? ৪টা পিলারের কথা মনে আছে? সেই চার পিলারের দুই পিলারই কিন্তু ধ্বসে গেছে। এই ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ এবং ‘সমাজতন্ত্র’। এখন রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হয়ে গেছে। গণতন্ত্রে রাষ্ট্রধর্ম থাকে নাকি? রাষ্ট্র কি কোন জীব নাকি যে তার ধর্ম থাকবে? সোনার পাথর বাটি হয়ে গেছে। এবং সেই যে আঠা লেগেছে, নোংরা আঠা, সেই আঠা কেউ ছাড়াতে পারছে না।
রাজু: এই নোংরা আঠা লাগানোর জন্য কাকে দায়ী করছেন?
জুয়েল: আমি দল নাম বলব না।
রাজু: কিন্তু ঘটনাটা ঘটেছে তো জাতীয় পার্টির আমলে?
জুয়েল: যেদিন ঘোষণা করা হয়, সেদিন আমি শো করছি কুয়েতে। আমাদের শো সেখানে খুব ওয়েল এক্লেইমড হয়েছিল। আমাকে ‘আল কাবাস’ পত্রিকার পক্ষ থেকে হোটেল মেরিডিয়ানে আমার ইন্টারভিউ নিতে গিয়েছিল দুই জন ক্যামেরাম্যান আর একজন জার্নালিস্ট। ওইখানে বসে আমাকে বলল তোমাদের তো রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হয়ে গেছে। ইট ইজ নো মোর এ সেকুলার কান্ট্রি। সে বললো, তোমার কী অভিমত। আমি বললাম, আমি জানি না। আমি তো এইমাত্র শুনলাম। না জেনে, না বুঝে আমি কোন মন্তব্য করতে পারবো না। সে তখন তার মন্তব্য বলল,‘ভিক্ষার নতুন পদ্ধতি’। আমরা দেখছি যে, মানুষ মারার আরেকটা পদ্ধতি। এবং স্বাধীনতার পরে পরেই–সেই আবার আসে তাজউদ্দীন প্রসঙ্গ। তাজুদ্দীনকে বিতাড়ন। ইয়াহিয়া অত বেশি দায়ী না, যত বেশি দায়ী ভুট্টো। ভুট্টো যদি জনতার রায় মেনে নিত তাহলে আর এই মাস কিলিং হতো না।
রাজু: মূল কশাই তো সেই-ই।
জুয়েল: সে-ই। অথচ স্বাধীনতার পরে পরেই খুব দ্রুত তাকে এদেশে আনার ব্যবস্থা করা হলো। সাধারণ ক্ষমায় অনেক অপরাধীকে বের করে দেয়া হলো, বিশেষ করে ভুট্টোকে দেখাতে হবে, পাকিস্তানকে দেখাতে হবে, এ জন্য আমাদের সব শাসকরা উদগ্রীব হয়ে পড়ল। এবং ভুট্টোকে আনা মানে খাল কেটে কুমির আনা । ভুট্টো ঠিকই তার কাজগুলো করে গেছে। এখানে পরবর্তীতে যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে, তাদের সঙ্গে ভুট্টো ঠিকই লিয়াজোঁ করে গেছে। তার ফল আমরা ৭৫-এ পেয়েছি। তারপরের ঘটনা তো সবার জানা। আর আমি আলাদা করে কী বলব। যেমন কেমন করে প্রধানমন্ত্রী হলো রাজাকার শাহ আজিজ। যে কিনা প্রধান রাজাকার, সে হলো প্রধানমন্ত্রী। তারপর আরেকটু বাড়িয়ে গিয়ে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হলো। এবং আজকে দেশের মধ্যে যা হচ্ছে, আমি তো জঙ্গীদের ওতো ভয় পাই না, যতটা ভয় পাই দেশের মধ্যে মানুষ যেটাকে স্বাভাবিক ভাবছে–সেই পরিস্থিতিটাকে। এই দেশে সমস্ত সচেতন মানুষ এখন প্রমাদ গুনছে। হিন্দু কি মুসলমান, বুদ্ধিষ্ট কি খৃষ্টান, সবাই। যে-ই প্রগ্রেসিভ সেই প্রমাদ গুনছে, কার ঘাড়ে কখন খড়গ পড়বে তা কেউ জানে না।
রাজু: আপনি যে শরসিনা পীরের কথা বললেন– স্বাধীনতার পরে লোকটি পুনর্বাসিত হলো। অথচ তার শাস্তি হওয়া উচিৎ ছিল।
জুয়েল: তাকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেয়া হলো।
রাজু: সেটা কার আমলে দেয়া হলো?
জুয়েল: সেটা খুঁজে দেখবেন।
রাজু: এই জিয়াউর রহমানের আমলে?
জুয়েল: দেখেন খুঁজে। সাংবাদিক আপনি।
রাজু: এইটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার না! যে-জিয়াউর রহমান একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, সেই তিনি মুক্তিযোদ্ধা হয়ে স্বাধীনতাবিরোধী একটা লোককে কীভাবে পুরস্কৃত করে, কীভাবে সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দেয়– এটা আমার কাছে একটা… কোনোভাবেই আমি মেনে নিতে পারিনা।
Jewel-10
ছবি: একমাত্র কন্যা খেয়াসহ জুয়েল আইচের জাদু প্রদর্শনীর একটি পোস্টার।
জুয়েল: মানুষের লোভ নানান রকম থাকে। যেমন এখন অর্থের লোভে মানুষ মরিয়া। আবার কেউ কেউ সুনামের লোভে মরিয়া। কেউ পাওয়ারের লোভে মরিয়া। এখন পাওয়ারের লোভ যাকে পেয়ে বসে সে তো আওরঙ্গজেবের মতো। বাবাকে নির্বাসন করে, দারাশিকোকে শিরচ্ছেদ করে, এবং তাকে শিরচ্ছেদ করার আগে, তাকে শেকল দিয়ে বেঁধে দিল্লির রাজপথে তাকে ঘুরিয়েছে। আওরঙ্গজেব দেখে আরে এসব কী? আমি কোথায় সম্রাট। দারাশিকোকে এরা স্যালুট করে। দিল্লির রাস্তায় রাস্তায় কান্নাকাটি পড়ে গেলো, দারাশিকোকে যখন মারতে নিয়ে গেলো। তারপর সুজা। ভারতবর্ষের মধ্যে থেকে সুজা এসে, জান তো সুজা বাংলায় এসেছিল? তাকে বাংলায় আশ্রয় দেয়া হয়নি, তাকে আশ্রয় দিয়েছে বার্মা। পরে এই সুজাই আবার বাংলার শাসক শায়েস্তা খানের সাহায্য নিয়ে যে তাকে আশ্রয় দিয়েছে তাকে আবার মারতে গেছে। এই করতে গিয়ে ক্রমান্বয়ে উনিও কিন্তু খুন হয়েছেন। ভাই যদি ভাইদেরকে এভাবে হত্যা করতে পারে, বাপকে যদি এ রকম বন্দি করে ফেলতে পারে, তাহলে ক্ষমতার লোভে আর কি না-করার থাকে। আমরা তো কেউ না। আমরা তো ছোটো ছোটো কুশীলব।
রাজু: ধর্ম-নিরপেক্ষতা–এটি ছিলো আওয়ামী লীগের প্রধান একটা স্লোগান।
জুয়েল: অফ কোর্স..
রাজু: যেইটার ভিত্তিতে…
জুয়েল: ফোর্থ পিলারস বলা হতো না?
রাজু: ফোর্থ পিলারস। আজকে রাষ্ট্রধর্মের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ কি কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে বলে মনে করেন আপনি?
জুয়েল: চিন্তাও করছে বলে আমি মনে করি না। আমি তো বলব তিনটা পিলারই নাই। আমাদের জাতীয়তাবাদ আছে বলেই তো আমরা বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন করেছি। তারপর আরও কতো আন্দোলন করেছি। সবশেষে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে জয়লাভ করেছি। কিন্তু যেখানে রাষ্টধর্ম ইসলাম থাকে, সেখানে গনতন্ত্র কোথায়? ইসলাম ছাড়া অন্য যারা আছে, তারা তো সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন। তার মানে নো ডেমোক্রেসি। তোমার ডেমোক্রেসি নেই। ধর্ম নেই, সমাজতন্ত্র নেই। যে গাড়িটা চার চাকায় চলে, তার যদি তিনটা চাকাই পাংচার্ড হয়ে যায় বা ছুটে চলে যায়, তাহলে সে গাড়িটার অবস্থাটা কী। সে কী গাড়ি আছে আর! কিছুই নেই। চলেও না।
রাজু: আচ্ছা, এখন আপনার কী মনে হয় না যে, এটা দিন দিন আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে? যদি আওয়ামী লীগ মনে করে যে রাষ্টধর্ম রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করবে–আওয়ামী লীগের পক্ষে সেটা কী আরও কঠিন অবস্থার দিকে যাচ্ছে বলে মনে হয় না?
জুয়েল: আমি মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। মন্তব্য করলে অনেক প্রসঙ্গই এসে যাবে যেটা অনেকেই পছন্দ করে না।
রাজু: তবুও আপনি বলেন। যেটুকু আপনার…
জুয়েল: আমি যা বলেছি, তাতে বোঝা যায়। কারণ আওয়ামী লীগ এসেছে, এটা আমাদের কাছে একটু অক্সিজেন পাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে। আমরা যে এই কথাগুলো বললাম, এটা আওয়ামী লীগ আছে বলে বলতে পারলাম। তা না হলে কী বলতে পারতাম যে শরসীনা পীর-এর মতো অতো বড় রাজাকারটাকে কেউ একজন…
রাজু: আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে বলেই এইবার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারটা করা সম্ভব হলো।
জুয়েল: হ্যাঁ, এটা যে আমাদের কত বড় যন্ত্রণা ছিল তা বুঝাতে পারবো না। গলার কাটা একটা একটা করে বের হচ্ছে। আমার গলায় কাঁটা, দাঁতে কাঁটা, চোখে কাঁটা–এইগুলো কিছু হলেও তো আওয়ামী লীগ এসে একটা একটা করে বের করছে। তা না হলে কে বা আন্য কোন দল এ কাজ করতো? বীভৎস একটা অসভ্য মানুষ সাকা চৌধুরী, সে প্রধান উপদেষ্টার পদে ছিল একটা রাজনৈতিক দলের, তারা কী করবে? সাকা চৌধুরীর মতো অতো বড় একটা যুদ্ধাপরাধী প্রধান উপদেষ্টা হয়, শাহ আজিজের মতো একটা যুদ্ধাপরাধী প্রধানমন্ত্রী হয়, তাহলে কমিটমেন্টের কী হবে?
রাজু: কমিটমেন্ট থাকতে পারে না, তাই না?
জুয়েল: এবং ছিলো না। একদিন আমাদের কামরুল ভাই ছবি এঁকেছিলেন শহীদ মিনারে বসে, মনে আছে?
রাজু: দেশ আজকে বিশ্ব বেহায়ার খপ্পরে…
জুয়েল: তুমিই বলছো, আমার অার বলার দরকার নাই। হা হা হা। সেই মানুষগুলোই কিন্তু এখনও টিকে আছে।
রাজু: এখন এই আওয়ামী লীগ, এই সরকারের কাছে আপনি আশা করেন যে তারা রাষ্ট্রধর্ম বাদ দিতে পারবে?
Jewel-Rabi
ছবি: পন্ডিত রবিশঙ্করের সাথে জুয়েল আইচ ও বিপাশা আইচ।

জুয়েল: আমি আশা করি সবসময়ই। আশা ছেড়ে দিলে তো আমার আর কিছু থাকে না। অতএব আমি আশা করি সব সময়। কিন্তু লক্ষণ তার আমি দেখছি না। অবশ্যই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে তাদের শাস্তি কার্যকর করেছে–এটাকে আমি বারবার স্যালুট করি। কিন্তু সেই চারটা পিলার, যে চারটা পিলার, যেখানে বাংলাদেশ দাঁড়িয়েছিলো, তার তিনটা পিলারই আজকে নেই।

রাজু: লক্ষণ দেখে বলা যায় না, এখন পর্যন্ত ইতিবাচক কিছু আছে?

জুয়েল: কিছু তো আছে বটেই। একদম না–তা নয়। ওই যে বললাম যে, আওয়ামী লীগ না থাকলে আজকে এই কথাগুলোও ক্যামেরার সামনে বলতে পারতাম না।

রাজু: আপনি বললেন যে, যেহেতু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যটা সম্পন্ন করতে পারছে, সেক্ষেত্রে আমার মনে হয় কিছুটা আশা আছে।
জুয়েল:হ্যাঁ। আমরা আশা ছাড়ব না।
রাজু: আমরা আশা ছাড়ব না। কারণ এটা তো আর অন্য কোনো দল করেনি। আর কোনো সরকার তো করে নি।
জুয়েল: না, করে নাই।
রাজু: যেহেতু ৪০ বছরের বেশি হয়ে গেছে…
জুয়েল: ৪৫ বছর। আজকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর। ৪৫ বছর পূর্ণ হয়ে গেছে।
রাজু: ৪৫ বছর পরে এসে যে কাজটা(যুদ্ধাপরাধের বিচার) করতে পারছে সে জন্য স্যালুট জানাই।
জুয়েল : স্যলুট জানাই।
রাজু: আশা করবো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ সরকার-প্রধান মানুষের বৃহত্তর আকাঙক্ষা যেটা– আপনি যাকে তিনটি স্তম্ভ বললেন–সেটা ফিরিয়ে দিতে পারবে।
জুয়েল: এটা তাদের প্রমিজ, এটা তাদের প্রতিজ্ঞা। এইটার জন্যই আমরা যুদ্ধ করেছিলাম।
রাজু: আপনি এই প্রতিজ্ঞাটিকেই স্মরণ করিয়ে দিতে চাচ্ছেন?
জুয়েল: অবশ্যই। আমরা ‘এই বাংলাদেশের’ জন্য যুদ্ধ করি নাই।
রাজু: আপনি বলছিলেন যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আপনি দেখেছিলেন ৭ মার্চের ওই ভাষণের দিন। আপনি প্রায় কাছাকাছি ছিলেন।
জুয়েল: হ্যাঁ। মানে…
রাজু: মানে ওই সময় মঞ্চের যতোটা কাছে থাকা যায়।
জুয়েল: ওই সময় এটা চিন্তাও করা যায় না। তুমি ছিলে ওই দিন?
রাজু: আমি কাছে ছিলাম না, আমি ছিলাম অনেক দূরে। আমার শুধু মানুষের কথা মনে আছে। তাকে আমি দেখেছি–এটা বলতে পারবো না।
জুয়েল: আমরা যে কাছে ছিলাম, সে কাছেও মেলা দূরে। আমরা দেখেছি, তার মুভমেন্টগুলো দেখেছি। সেই সময় আমার মনে হয়েছে যে, আনুপাতিক হিসাব করে তো মানুষ, আনুপাতিক হারে অধিকাংশ মানুষের চাইতে আমরা কাছে ছিলাম।
রাজু: লক্ষ লক্ষ লোক এইটুকু মনে আছে, হাটা যেত না–এমন অবস্থা ছিল।
জুয়েল: না না…স্রোত যেদিকে যাচ্ছে ওর এদিক ওদিক যাওয়ার সুযোগ ছিল না।
রাজু: ওই দিনের পরে, স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধুকে আপনার দেখার কী অভিজ্ঞতা হয়েছিল?
জুয়েল: একবার হয়েছিল।
রাজু: সেটা কখন, কোন সময়?
জুয়েল: এটা ওই ৩২ নম্বরেই। এটা ৭৩ সালের দিকে হবে। ওনার বাড়িতে গিয়েছিলাম একটা ব্যাপারে কথা বলার জন্য। আমার সিনিয়র একজন শিক্ষকের সঙ্গে।
রাজু: ওনার সঙ্গে সরাসরি কথা হলো আপনার?
Jewel-Hari
ছবি: পন্ডিত হরিপ্রসাদ চুরাশিয়ার হাতে জুয়েল আইচ উদ্ভাবিত জুয়েল-বাঁশি।
জুয়েল: উনি আমার সঙ্গে সরাসরি কথা বলেননি। আমি কিছু জিনিস খুব অবাক হয়ে দেখলাম, উনি এতো সুন্দরভাবে মনে রাখতে পারেন। সবাইকেই প্রায়, অবশ্য আমার শিক্ষককে উনি আপনি আপনি বললেন। কিন্তু এমনি যারা এলো, আমার শিক্ষকের চাইতেও বেশী বয়স্ক লোককেও তুই তুই করে সম্বোধন করেন। কিন্তু এই তুইয়ের মধ্যে ছিল একটা আদরের ভাব। জিজ্ঞেস করতে পারতেন, তোর মেয়ে এবার ইন্টারমিডিয়েট দিল, না? সেই লোক না ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়। এতকিছু যার মাথায়, সে কেমন করে বলছে যে আমার মেয়ে, মেয়ের নাম পর্যন্ত বলতেন। অবিশ্বাস্য ফটোগ্রাফিক মেমোরি ছিল। এইটা বোধ হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও আছে। কারণ তিনি যখনই আমাকে দেখেছেন, অনুষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষের মধ্যে উনি ঠিকই আমাকে মনে রেখেছেন, নামটা পর্যন্ত।
রাজু: আপনাকে কিন্তু মনে রাখাটা– আমি একটু নিরপেক্ষ জায়গা থেকে বলি– মনে রাখার জন্য তো আর স্মৃতি শক্তির দরকার হয় না। আপনার তো আলাদা একটা পরিচিতি তৈরি হয়ে গেছে। ওর বাইরে কি আপনি মনে করেন সত্যি সত্যি তার…
জুয়েল: আমার মনে হয় আছে। কারণ উনি যেটা নিজে সঠিক বলে মনে করেন, সেটা কিন্তু তিনি মনে রাখেন। এবং আমার কিছু বন্ধু আছে যারা সেক্রেটারি লেভেলের,যাদেরকে যেতে হয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে। তারা বলেন যে, কোনো জিনিস চাপা দিয়ে তার কাছ থেকে আসা যায় না। ঠিকই সেই প্রসঙ্গটা যখন বাদ পড়ে যায় তখন তিনি আবার বলেন, সেই কাগজটা তো দেখলাম না।
রাজু: হ্যাঁ, আপনার সাথে একমত যে, মনে হয় এটা তার বাবার কাছ থেকে পাওয়া–এই স্মৃতি মনে রাখার যে অসামান্য ক্ষমতা। ৭৫ এর ঘটনা আপনার মনের মধ্যে কী অভিঘাত ফেলেছে?
জুয়েল: আমরা খুব প্রমাদ গুনছিলাম। আমার খুব ধাক্কা লেগেছিল…
রাজু: শুধুমাত্র একটা পরিবারকেই হত্যা করেনি….
জুয়েল: না না এটা কেবল পরিবারকে নয় তো, আমাদের পুরো মুক্তিযুদ্ধের মুল অনুপ্রেরণা যার কাছ থেকে এসেছে তাকে হত্যা করেছে। কারা তাকে হত্যা করেছে তা তো স্পষ্ট। এখানে অস্পষ্ট কিছু নাই। যাকে ৭১-এ মারতে পারে নাই যারা, তারা এইখানে এসে মেরেছে। তাদের প্রেতাত্মারা মেরেছে। এটা বুঝতে বড় কোনো গবেষণা লাগে না। খুব সহজেই বুঝেছিলাম এবং খুবই একটা শঙ্কার মধ্যে ছিলাম।
রাজু: যে সত্যি সত্যি পাকিস্তানই হয়ে যায় কি না? মানে আবার সেই পাকিস্তানেই ফিরে যাই কিনা ?
জুয়েল: না । সেটা আমার কখনও মনে হয়নি। কারণ এই যে এতগুলো মানুষ প্রাণ দিল–এই চেতনা কিন্তু তখনও পর্যন্ত মানুষের ছিল। মানুষ হতাশ হয়ে নানান কথা বলত। এটাও সত্য। অনেক দুঃখের ভারে অনেক কথা বলে না মানুষ? সেইগুলো ক্রমেই বেড়েছিল। কিন্তু আমার দেশটা পাকিস্তানের কাছে আবার বিক্রি করে দেব–ইম্পসিবল, এটা চিন্তা করত না।
রাজু: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে সময় দেয়ার জন্য।
জুয়েল: স্বাগতম।

ইতিপূর্বে আর্টস-এ প্রকাশিত রাজু আলাউদ্দিন কর্তৃক গৃহীত ও অনূদিত অন্যান্য সাক্ষাৎকার:
দিলীপ কুমার বসুর সাক্ষাৎকার: ভারতবর্ষের ইউনিটিটা অনেক জোর করে বানানো

রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে সনজীদা খাতুন: “কোনটা দিয়ে কাকে ঠেকাতে হবে খুব ভাল বুঝতেন”

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাক্ষাতকার: “গান্ধী কিন্তু ভীষণভাবে সমাজতন্ত্রবিরোধী ছিলেন”

নন্দিতা বসুর সাক্ষাতকার: “তসলিমার মধ্যে অনেক মিথ্যা ভাষণ আছে”

ভরদুপুরে শঙ্খ ঘোষের সাথে: “কোরান শরীফে উটের উল্লেখ আছে, একাধিকবারই আছে।”

শিল্পী মনিরুল ইসলাম: “আমি হরতাল কোনো সময়ই চাই না”

মুহম্মদ নূরুল হুদার সাক্ষাৎকার: ‘টেকনিকের বিবর্তনের ইতিহাস’ কথাটা একটি খণ্ডিত সত্য

আমি আনন্দ ছাড়া আঁকতে পারি না, দুঃখ ছাড়া লিখতে পারি না–মুতর্জা বশীর

আহমদ ছফা:”আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই”

অক্তাবিও পাসের চোখে বু্দ্ধ ও বুদ্ধবাদ: ‘তিনি হলেন সেই লোক যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি ’

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০০৯: রেডিও আলাপে হার্টা ম্যুলার

কবি আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুর রাহমান-এর দুর্লভ সাক্ষাৎকার

হুমায়ুন আজাদ-এর সঙ্গে আলাপ (১৯৯৫)

নির্মলেন্দু গুণ: “প্রথমদিন শেখ মুজিব আমাকে ‘আপনি’ করে বললেন”

গুলতেকিন খানের সাক্ষাৎকার: কবিতার প্রতি আমার বিশেষ অাগ্রহ ছিল

নির্মলেন্দু গুণের সাক্ষাৎকার: ভালোবাসা, অর্থ, পুরস্কার আদায় করতে হয়

ঈদ ও রোজা প্রসঙ্গে কবি নির্মলেন্দু গুণ: “ আমি ওর নামে দুইবার খাশি কুরবানী দিয়েছি”

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: আমি একজন শিল্পী হয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (13) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — december ২৪, ২০১৬ @ ৫:৫৩ অপরাহ্ন

      সাক্ষাৎকারগ্রহীতা হিসেবে এই সাক্ষাৎকারটি নিয়ে আপনি, রাজু ভাই, নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। কী অসাধারণ আলাপচারিতা। ভালোবাসা জানবেন হে সাক্ষাৎকারসম্রাট। কথাশিল্পী, মুক্তিযোদ্ধা জুয়েল আইচের প্রতি আনতশ্রদ্ধা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Pappu Dutta — december ২৪, ২০১৬ @ ৬:৩২ অপরাহ্ন

      সাক্ষাৎকারটি পড়ে কি বলবো বুঝতে পারছি না।কয়েকবার মনে হলো চীৎকার করে কাঁদি। বেশ কিছু অজানা তথ্য পেলাম। সাধারণত পড়েই চলে যাই, কখনও কমেন্ট করি না। সাক্ষাৎকারটির জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি জনাব রাজূ আলাউদ্দিনকে এবং অবনত শ্রদ্ধা প্রিয় জুয়েল আইচের প্রতি। উনার যাদু দেখে বড় হয়েছি। শ্রদ্ধাটা এখন আরও কয়েকগুন বেড়ে গেল। উনার দীর্ঘায়ু এবং সুস্থ জীবন কামনা করি। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু। এরকম আরও অনেক সাক্ষাৎকারের অপেক্ষায় রইলাম।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাইফ বরকতুল্লাহ — december ২৪, ২০১৬ @ ৭:২৯ অপরাহ্ন

      পড়ে ভালো লাগল। অনেক কিছু জানা গেল। ধন্যবাদ রাজু ভাই

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রোদেলা নীলা — december ২৪, ২০১৬ @ ১১:৫৭ অপরাহ্ন

      কথোপকথনে অনেক অজানা তথ্য পেয়ে গেলাম।প্রিয় জাদুশিল্পী যে একজন মুক্তিযোদ্ধা তা আজ প্রথম জানলাম।অনেক শুভেচ্ছা ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Anisur Rahman — december ২৫, ২০১৬ @ ১:৩৫ পূর্বাহ্ন

      এই কথাগুলো বলা খুব জরুরি ছিল, যেমন দরকারি প্রশ্নগুলো|

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Nizhum Rahman — december ২৫, ২০১৬ @ ১:৫১ পূর্বাহ্ন

      রাষ্ট্র কি কোন জীব নাকি যে তার ধর্ম থাকবে? ও কে তবে রাষ্ট্র কি কোন জীব নাকি যে তার ভাষা থাকবে?
      এর উত্তর টা দেন দেখি?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Zahid — december ২৫, ২০১৬ @ ৭:৩১ পূর্বাহ্ন

      রাষ্ট্র জীব না সত্য, তবে জীব ছাড়া রাষ্ট্র হয় কি?

      রাষ্ট্রের আইন কানুন কার জন্য? রাষ্ট্রের মাটির জন্য? না বসবাসকারী মানুষের জন্য?

      আর একই ভাবে, রাষ্ট্রের যদি নাম থাকতে পারে, আইন থাকতে পারে, ভাষা থাকতে পারে; তবে ধর্ম (Religion) কেন থাকতে পারবে না?

      আইন-কানুন যেমন বসবাসকারী মানুষের জন্য, তেমনই ধর্ম (Religion) বসবাসকারী মানুষের জন্য, যা সংখ্যা গরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় ও রাষ্ট্রের পরিচয় বহন করে। পৃথিবীর সর্বত্র প্রচলিত।

      Smartness ভাল, তবে Over Smartness ভাল না।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শাহীন — december ২৫, ২০১৬ @ ৯:৩৪ পূর্বাহ্ন

      রাষ্ট্র কাকে বলে? তা জানতে হবে। রাষ্ট্রের গুরুত্ত্বপূর্ন উপাদান হল জনসমষ্টি। জনসমষ্টি ছাড়া রাষ্ট্র হয় না। জনসমষ্টির যেহেতু ভাষা আছে, সুতরাং রাষ্ট্রেরও ভাষা অাছে। অামার মনে হয় এই মন্তব্যের মাধ্যমে তার জ্ঞানের গভীরতা প্রকাশ পেয়েছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন dulal — december ২৫, ২০১৬ @ ১২:৪৮ অপরাহ্ন

      We can not forget freedom fighter.Hajar salute Razu bhai.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Akash Kumar — december ২৫, ২০১৬ @ ৯:৫৩ অপরাহ্ন

      ব্যক্তির – বংশ পরিচয় থাকে, স্বামী/স্ত্রী থাকে, পেশা থাকে, নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস থাকে, অন্য ব্যক্তির সাথে যোগাযোগের জন্য পছন্দের ভাষা থাকে
      পরিবারের – বংশ পরিচয় থাকে, স্বামী/স্ত্রী থাকে না, একক কোন পেশা নাও থাকতে পারে, পরিবারের সাধারণত একই ধর্মীয় বিশ্বাস থাকে, পরিবারের সাধারণত পছন্দের ভাষা একই থাকে
      সম্প্রদায়ের – একক কোন বংশ পরিচয় থাকে না, স্বামী/স্ত্রী থাকে না, একক কোন পেশা থাকে না, একই ধর্মীয় বিশ্বাস নাও থাকতে পারে, সাধারণত পছন্দের ভাষা একই থাকে

      রাষ্ট্রের – একক কোন বংশ পরিচয় থাকে না, স্বামী/স্ত্রী থাকে না, একক কোন পেশা থাকে না, একই ধর্মীয় বিশ্বাস থাকে না, পছন্দের ভাষা একই থাকে / নাও থাকতে পারে

      —-
      রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট ভাষা থাকলেই যে নির্দিষ্ট ধর্ম থাকবে – এই যুক্তি ভ্রান্ত। যুক্তি বিজ্ঞানের ‘যৌক্তিক ভ্রান্তি’ পড়ুন এবং তার পর মন্তব্য করুন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাহিদ সোহাগ — december ২৫, ২০১৬ @ ৯:৫৯ অপরাহ্ন

      দারুণ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাপস গায়েন — december ২৬, ২০১৬ @ ২:৫২ পূর্বাহ্ন

      যাদুশিল্পী জুয়েল আইচ এবং কবি রাজু আলাউদ্দিনের এই আলাপচারিতা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক আসামান্য দলিল হয়ে রইল, কিন্তু যা উহ্য থেকে গেল তা হোল কীভাবে এই যাদুশিল্পী শিল্পের এই শাখায় ভীড়লেন, এবং আমাদেরকে বিশ্বে পরিচিত করে তুললেন !

      তাজউদ্দীনের প্রস্থান এবং মোস্তাকের উত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অভ্যুত্থান এবং তার বিস্তার আরও বেগবান হোল । যুদ্ধপরাধীদের বিচারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি যতটুকু লাভবান হয়েছে, তারচে’ অনেক বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, স্বাধীনতার মূল স্তম্ভগুলোর অপসারণের মধ্য দিয়ে । ১৯৯১ সাল থেকে উত্তর আমেরিকায় অভিবাসী হয়ে আছি । আজকাল বাংলাদেশে গেলে দেখি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় আচরিক ধর্মে অনেক বেশী আচ্ছন্ন । সুতরাং, রাজনৈতিক শক্তিগুলো শুধু নয়, বরং এই সামাজিক সাংস্কৃতিক রূপান্তর অনেক বেশী ভয়ঙ্কর !

      যাদুশিল্পী জুয়েল আইচ এবং শব্দশিল্পী রাজু আলাউদ্দিনের প্রতি রইল আমার নিরন্তর ভালোবাসা ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্্বদেশ — december ২৬, ২০১৬ @ ১০:৪৬ পূর্বাহ্ন

      বাঁশিটার ভিডি্ওটা দেখে খুব বিরক্ত লাগলো। জুয়েল আইচের বাঁশির সাথে কি বোর্ডের বিট মিক্সটা বেমানান মনে হল। শুধু বাঁশির ভিডিও দিয়ে আপডেট দিন।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com