সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য : যন্ত্রের পেটে ছোটগল্প

রেশমী নন্দী | ১৮ december ২০১৬ ৮:৩৩ পূর্বাহ্ন

storyস্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের পেট ভর্তি ছোটগল্প। বোতাম টিপে বের করে পড়ে নিলেই হলো। ফ্রান্সের ট্রেন অপারেটর SNCF স্টেশনে আপনার অপেক্ষা করার সময়টুকু নষ্ট না করে ঘুরিয়ে নিয়ে আসতে পারবে সাহিত্যের ভুবনে। সম্পূর্ণ বিনা খরচে কেবল বোতাম টিপে যে কেউ একটা ছোটগল্প বের করে চট করে পড়ে নিতে পারবেন এখানে। ক্ল্যাসিক বা মডার্ণ এমনকি রূপকথার গল্পও মিলবে এই যন্ত্রের পেটে। মজার এই যন্ত্রে তিনটি বোতাম রয়েছে ১, ৩ কিংবা ৫ মিনিট সময় নির্দেশ করে। অর্থাৎ পাঠক কতটুকু সময় দিতে চান এর পিছনে, সেটা ঠিক করারও সুযোগ আছে। গতবছর গোনবেল ( Grenoble )-এ সফল শুরুর পর এ বছর অন্তত ৩৫টি ষ্টেশনে “এমন গল্প পেটে ঢোকানো” যন্ত্র বসানো হবে বলে জানিয়েছেন SNCF। এ ছোটগল্প মানুষকে পড়ানোর প্রকল্প পরিচালনা করছে “Short Edition”। ২০১৩ সালে ‘লেখকের জাতি’ হিসেবে ফরাসিদের খেতাব মিলেছিল এ তথ্যের ভিত্তিতে যে, সে দেশের ১৭ ভাগ জনগন লেখালেখি করে। অবশ্য বেশিরভাগই থেকে যায় অপ্রকাশিত। আর তাই এমন যন্ত্রের ব্যবস্থা সে দেশে পাঠকের পাশাপাশি নবীন লেখকদেরও ভরসার জায়গা হয়ে উঠবে নিঃসন্দেহে। এরই মধ্যে তাঁদের কাছে ৫ হাজারেরও বেশি অজ্ঞাতনামা লেখকের লেখা জমা পড়েছে। এমনকি স্মার্ট ফোনের যুগে কাগুজে পদ্ধতিও ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। মাত্র ছমাসে একটি মেশিন থেকেই অন্তত ১ লাখ গল্প পড়েছে ট্রেন যাত্রীরা। এরই মধ্যে চলচ্চিত্র পরিচালক ফ্রান্সিস ফোর্ড কোপোলা ঘোষণা দিয়ে ফেলেছেন, সান ফ্রান্সিসকোতে তাঁর পানশালাতেও এমন একটা যন্ত্র বসাবেন।

গল্প পড়তে পড়তে কারো হাতে চলে আসতে পারে ইতিহাসখ্যাত চেঙ্গিস খানের কাহিনীও। যুদ্ধবাজ নীতির কারণে এই মঙ্গোলিয়ান শাসকের প্রতি অনেকের ঘৃণা থাকলেও ইতিহাস ঘেঁটে অনেকে আবিষ্কার করেছেন চেঙ্গিস খানের ভাবমূর্তির বিপরীত চিত্র। এঁদের মধ্যে অন্যতম নৃবিজ্ঞানী জ্যাক ওয়েদারফোর্ড। Genghis Khan and the Quest for God বইটি মাত্র দুমাস আগে প্রকাশিত হয়ে এরই মধ্যে সাড়া ফেলেছে বেশ। লেখক দাবি করেছেন, চেঙ্গিস খান নিজে ধর্মের ধার না ধারলেও তাঁর রাজত্বে সব ধর্মের মানুষের ছিল সমান অধিকার। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ কিংবা ইহুদী-কারো প্রতি পক্ষপাত ছিল না। একধাপ এগিয়ে তিনি এমন দাবিও তুলেছেন, মার্কিন সংবিধানে খ্রীষ্টানদের ভেদ দূর করতে প্রথম যে সংশোধনী আনা হয়, তা নাকি এই চেঙ্গিস খানের কর্মকান্ডেরই ধারাবাহিকতা। অনেকের কাছেই এমন দাবি উদ্ভট মনে হলেও ইতিহাস আমাদের জানাচ্ছে, Genghizkan the Great, নামের একটি ইতিহাসের বই ১৮ শতকের মার্কিনীদের, যে তালিকায় নাম আছে ব্রেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন, থমাস জেফারসনের মতো রাজনীতিবিদেরও, অন্যতম জনপ্রিয় বই । এমনকি, মঙ্গোল আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নানা বিধিবিধানেও ছিল আশ্চর্য মিল। লেখক জ্যাক ওয়েদারফোর্ড ২০০৪ সালে চেঙ্গিস খানকে নিয়ে লেখেন প্রথম বই Genghis Khan and the Making of the Modern World, এরই মধ্যে ২৭টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে বইটি।
ইতিহাসের পরতে পরতে ছড়িয়ে থাকে বিস্ময়। সময়ের সাথে উন্মোচিত হয় নতুন সব সত্য। এই যেমন জার্মান লেখজ নর্ম্যান ওহলার তাঁর Blitzed: Drugs in Nazi Germany নামের বইতে সম্প্রতি জানিয়েছেন, ইতিহাসের কুখ্যাত মানুষ হিটলার মারাত্মক রকমভাবেই মাদকাসক্ত ছিলেন। এরই মধ্যে নাৎসি বর্বরতা নিয়ে পৃথিবীর নানা ভাষায় এত বই লেখার কারণে যারা মনে করেছিলেন, সবই প্রায় জানা হয়ে গেছে সে সময়কার তাদের জন্য এ তথ্য নিঃসন্দেহে অবাক করার মতোই। লেখক জানাচ্ছেন, হিটলারসহ “third reich”-এর সবাই এমনকি গৃহবধূরা পর্যন্ত মারাত্মক রকমের মাদকাসক্ত ছিলেন। নাৎসী সাম্রাজ্যে মাদকের ব্যবহার ছিল পিলে চমকানোর মতো- কোকেন, হেরোইন, মরফিনসহ হেন মাদক নেই, যা গ্রহণ করতো না আদর্শের বুলিসর্বস্ব নাৎসী সেনারা। নাটের গুরু হিটলারও রীতিমত পাঁচমিশালি মাদকে অভ্যস্ত ছিলেন। লেখক জানাচ্ছেন, ১৯৪০-এ ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধ জয়েও এই মাদকের প্রভাব রয়েছে। পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যখন পেড়ে ওঠা যাচ্ছিল না, তখন “চারদিক থেকে খবর আসতে থাকলো জার্মানীর অনেক শহরের উপর বোমা বর্ষণ হচ্ছে,” মি: ওহলার লেখেন, “আর হিটলার কেবল বলেছে: ‘আমাদের জয় অবশ্যম্ভাবি। এ হার আমাদের আরো শক্তিশালী করছে।’ শুনে অন্যান্য নেতারা বলেন: ‘হয়তো এমন কিছু আছে যা কেবল তিনিই জানেন। হয়তো তাঁর কাছে কোন মোক্ষম অস্ত্র আছে।’ কিন্তু হিটলারের কাছে কোন জাদুকরী অস্ত্র ছিল না, ছিল জাদুকরী মাদক যার প্রভাবে তিনি এতটা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন। প্রথমে উপন্যাস লেখার উপাদান খুঁজতেই এসব সামরিক তথ্য ঘাঁটাঘাঁটি করেন এই ঔপন্যাসিক। পরে এমন সব বিস্ময়কর তথ্য আবিষ্কারের পর এতে আর কোন গল্প না মিশিয়ে প্রকাশকের পরামর্শে লেখেন এই তথ্যবহুল বই। ২০১৫ সালে প্রকাশের পর পরই এ বইকে ঘিড়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ তুঙ্গে ওঠে। জার্মান এবং ব্রিটেনে ব্যাপক সাফল্যের পর আগামী বছরের এপ্রিল নাগাদ বইটি প্রকাশিত হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও।
ইতিহাসের পরত খুলতে খুলতে এমন কত কিছুই না বেরিয়ে আসবে সময়ের সাথে সাথে। অন্যদিকে, সময়ের ফেরেই কত ঘটনার ঠাঁই হচ্ছে ইতিহাসের পাতায়। এই যেমন বব ডিলানের নোবেল জয় নিয়ে নানা বিতর্ক, পুরষ্কার গ্রহণ করতে সরাসরি হাজির না হয়েও উপস্থিত ছিলেন গানে-কথায়।
বব ডিলানের সেই লিখিত ভাষণ, যা সুইডেনে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত তাঁর হয়ে পাঠ করেছিলেন পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে, এর কিছু অংশ এমন:
“যদি কেউ এসে আমাকে বলতেন যে, নোবেল জয়ের সামান্য সম্ভাবনাও আমার আছে, আমার কাছে বিষয়টা চাঁদের পা দেয়ার মতোই অদ্ভুত ঘটনা মনে হতো………………
এ বিষ্ময়কর সংবাদ যখন আমার কাছে আসে, তখন আমি রাস্তায় ছিলাম। আমার কয়েক মুহূর্ত সময় লেগেছিল বিষয়টা বুঝে উঠতে। আমি তখন সাহিত্যের দিকপাল উইলিয়াম শেকসপিয়ারের কথা ভাবতে শুরু করলাম।…ভাবছিলাম যে, তিনি যে সাহিত্যের জন্ম দিচ্ছেন তা তিনি নিজেই বুঝে উঠতে পারেন নি। তিনি লিখছিলেন মঞ্চের জন্য। এ লেখা পড়ার জন্য নয়, উচ্চারিত হবার জন্য। যখন তিনি হেমলেট লিখছিলেন, আমি নিশ্চিত তিনি অনেক কিছু ভাবছিলেন: “ এ চরিত্রে কাকে সবচেয়ে ভালো মানাবে?” “ কিভাবে মঞ্চায়িত হবে এ নাটক?” “ ডেনমার্ক-এ গল্পের জন্য উপযোগী হয়েছে তো?” লেখা নিয়ে তাঁর সৃজনশীলতা আর উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিঃসন্দেহে তাঁর কাছে সবচেয়ে আগে ছিল, তারপরও অনেক তুচ্ছ বিষয়ও তাঁকে একই সাথে চিন্তা করতে হয়েছে। “অর্থায়নের ব্যবস্থা ঠিকঠাক আছে তো?” “পৃষ্ঠপোষকদের জন্য উপযুক্ত আসন খালি রয়েছে তো?” “ মানুষের খুলি কোথায় পাওয়া যাবে?” আমি বাজি ধরে বলতে পারি, শেকসপিয়ারের মনে এ প্রশ্ন আসে নি যে “এটা কি সাহিত্য?”…
আমিও আমার সৃষ্টিশীলতা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি এবং একই সাথে জাগতিক অনেক কিছু নিয়েও আমাকে ভাবতে হচ্ছে। “গানগুলোর সাথে সবচেয়ে ভালোভাবে সঙ্গত করতে পারবে কে?” “ঠিক স্টুডিওতে রেকর্ডিং করছি তো?” “ঠিক স্বরে আছে তো গানটা?” কিছু কিছু বিষয় আছে যা চারশো বছরেও বদলায় না।
একবারের জন্য আমিও নিজেকে প্রশ্ন করার সুযোগ পাইনি, “সাহিত্য হয়ে উঠেছে কি আমার গানগুলো?”
আর তাই আমি সুইডিশ একাডেমিকে ধন্যবাদ জানাই এ প্রশ্ন নিয়ে ভাবার জন্য সময় দেয়ায় এবং সর্বোপরি, এর একটা চমৎকার উত্তর দেয়ায়।

তথ্যসূত্র: দি ইনডিপেনডেন্ট, নিউ ইয়র্ক টাইমস
Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আলমগীর সবুজ — december ১৮, ২০১৬ @ ২:৩৭ অপরাহ্ন

      রেশমী নন্দী ইদানিং বিশ্বসাহিত্যের অনেক গল্পের সাথেই পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। তাঁর অনুবাদ আমার কাছে প্রাঞ্জল মনে হয়েছে। আশা রাখছি, আগামীতে আরো অসাধারণ অনুবাদ গল্প পড়ার সুযোগ পাবো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আমিন বাবু — december ১৯, ২০১৬ @ ২:২৬ অপরাহ্ন

      অনুবাদ নির্ভর কাজও যে সোজাসাপ্টা হতে পারে তা জেনে ভালো লাগলো। উক্তিনির্ভরতা মনে হয় আরেকটু কমানো যেত। মৌলিক লেখাও চাই দিদি।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com