আমি আমার বাবার দিকে তাকিয়ে আছি

কিযী তাহনিন | ১২ december ২০১৬ ১১:২৭ পূর্বাহ্ন

Kizi-1বাইশ নাকি তেইশ? চব্বিশ তো নয়, একদমই নয়। না না, বাইশ, মনে পড়েছে। ১৯৭১, বাইশে জুলাই। মনে মনে উচ্চারণ করলো সে। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে সব কিছু ভুলে যাওয়াটা স্বাভাবিক। সে কিছু ভুলেনি। দিনক্ষণে একটু গোলমাল হচ্ছে খালি। তা সে এখন মারা যাবে বলে নয়, সবসময়ই হয়। নিজের মৃত্যুর দিন’টি সবাই কি জেনে যায়? যারা গাড়ি চাপা পরে? কিংবা ঘুমের মাঝে? বাহ্, সে ভাগ্যবান। সে জেনে গেছে, দিনটির কথা, সময়টা জানতে পারলে ভালো হতো। প্রায় চার ঘন্টা তো হয়ে এলো। অপেক্ষা শেষ হবার অপেক্ষা চলছে। সে তাকিয়ে আছে সামনে।

তখন ও তাকিয়ে ছিল সামনে, স্টিমারের সেলুনে বসে। স্টিমার থামে। সে বসে আছে তার পরিচিতজনদের সাথে। একই এলাকায় বাস, একসাথে ইউনিভার্সিটি’তে পড়ে। এমন সময়গুলোতে, পাশে বসে থাকা মানুষগুলোই পরিচিত মানুষ হয়ে ওঠে। বনরুটি কামড় দিয়েছিলো কি মাত্র? হ্যাঁ দিয়েছিলো এক কামড়। তারপরেই শব্দ, ভারী জুতোর মাটিতে আঘাতের শব্দ।

অকস্মাৎ ব্যাথা অনুভব করলো, উফফ, চুলে পেছন থেকে মুঠো করে টান দিয়ে ধরেছে কেউ। কয়েক মুহূর্ত। বোঝা হয়ে গিয়েছিল পেছনে কারা দাঁড়িয়ে। তাদের চেহারা না চিনলেও দেখতে কেমন হয় তা জানে। ওরা দেখতে সবাই একইরকম। বা আমরা ভেবে নেই যে তারা সবাই দেখতে একই রকম। কারণ তারা আমাদের মতন নয়, অন্যরকম।

চুলে ব্যাথা লাগছে। পেছন ফেরে দেখে সে। চোখে পরে একজোড়া চোখ। যেমন ভেবেছিলো, চোখ জোড়া তেমনি। বোবা চোখ। ভাষা নেই, গর্জন আছে। বোবা চোখ বড্ড হিংস্র দেখতে। ঠিক যা ভেবেছিলো তাই হলো, একদম তাই। সে জানে যে লোকটা এখন বলবে,

” তু মুক্তি হ্যায় ?”

হলোও তাই।

আর তার যা উত্তর দেবার কথা, সে তাই দিলো,

-“আমি ছাত্র।”

বোবা হিংস্র চোখওয়ালা মানুষ তার সাথীদের বলে ওঠে, “ইয়ে মুক্তি হ্যায়।”

এমনই হবার কথা ছিল। ওরা চুলের মুঠি ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু এখন সে নিজের চুলে হাত বোলাতে থাকে নিজেই। বড্ড বড় আর এলোমেলো চুলগুলো। মনের গতির মতনই বেপরোয়া, উড়ন্ত, মুক্ত।

বোবা চোখের মানুষেরা ওকে ডাকছে ‘মুক্তি’ বলে। তা ভুল কিছু তো ডাকেনি। যার মনের বাড়ি মুক্ত দেশে, মনের গতি বেপরোয়া, চুলগুলো উড়ন্ত, বিশ্ব বিদ্যালয় যার বিচরণ স্থান এবং মুক্তপাঠের ছাত্র যে, তাকে ‘মুক্তি’ ডাকাটাই সমীচীন। ঠোঁটের কোন বাঁকা হাসি ফুটে উঠে তার।

টেনে হিচড়ে অনেক কায়দা করে তাকে নামিয়ে আনে বোবা চোখের দল। এতো কায়দা কৌশলের দরকার ছিলোনা। সে কোনো বাধা দেয়নি। এমনিই নেমে আসতো। কিন্তু ওই যে যাদের চোখ বোবা, নিজের মনের শক্তির ওপর তাদের আস্থা নেই। ছলা-কলা আর শরীরের বল না দেখলে তো তাদের শক্তি প্রকাশ পায়না।

ও বাধা দেয়নি। নেমে আসবার আগে শুধু পাশে বসে থাকা বন্ধু নিয়াজের হাতে নিজের খয়েরি রঙের ঝোলা ব্যাগটা দিয়ে এসেছে। নিয়াজ কিছু বলেনি। সেও না। দুজন তাকিয়েছে দুজনের দিকে, কয়েক মুহূর্ত। কিন্তু সে জানে নিয়াজ ঠিক ব্যাগটি বাবা-মা’র কাছে পৌঁছে দিবে। মা ব্যাগটি খুব যত্ন করে রেখে দিবে বাকি জীবন । বেঁচে না থাকা মানুষের ছুঁয়ে যাওয়া জিনিসগুলো প্রিয়জনদের কাছে খুব মূল্যবান। সে বেঁচে না থাকলেও খয়েরি ব্যাগটি বেঁচে থাকবে। নিয়াজ কিংবা মা কেউ সে ব্যাগ হারাতে দিবেনা।

ও দাঁড়িয়ে আছে ধানসিঁড়ির দিকে পিঠ দিয়ে। নিজের ইচ্ছেতে এমন করে দাঁড়িয়ে নেই। সামনে বোবা চোখের দল অস্ত্র হাতে। ওকে এমন করেই দাঁড়িয়ে থাকতে বলেছে। প্রতিদিন স্টিমার থেকে কয়েকজন মানুষকে নামায়, ধানসিঁড়ির বুকে ভাসাবে বলে। আজ সে একজনই মাত্র। সে ছাড়া আর কারো চেহারার সাথে ‘মুক্তি’র মিল পায়নি হয়তো। তাই মনযোগ এবং রাইফেলের কেন্দ্রবিন্দুতে সে দাঁড়িয়ে আছে। পেছনে তার ধানসিঁড়ি। আহা অভিমানী ধানসিঁড়ি, তাকে সে ফিরেও দেখছেনা। ধানসিঁড়ির টলটলে অভিমানী জল তো আর জানেনা, আর খানিক পরে, তার বুকেই ভাসবে সে, তার মাঝেই ডুববে, সময়হীন সময় ধরে।

যাওয়ার কথা ছিল তার আগরতলা। ঢাকায় পৌঁছে দেখে যাদের সাথে যাবার কথা তারা খানিক আগেই চলে গেছে, তাকে ছাড়াই। নির্দেশ এলো আবার ডেরায় ফিরে আসবার, নয় নম্বর সেক্টরে। তারপর অবস্থা বুঝে আবার পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বড্ড রোগাটে সে, হালকা পাতলা। মনের জোরের সাথে শরীরের জোর পাল্লা দিতে পারেনা। তাই সবসময় অস্ত্র ধরে সে লড়াই করেনা, খবর আদান প্রদান করতে হয়, তথ্য আনা-নেওয়া, সব কাজ সে খুব মন দিয়ে করে। ওই যে মুক্তপাঠের ছাত্র সে। মুক্ত হবার স্বপ্নে সব কাজ মন দিয়ে করে সে, নিজেই হয়ে ওঠে ‘মুক্তি’ I

দাঁড়িয়ে আছে, ধানসিঁড়ি’র সামনে। বোবা চোখওয়ালা’দের একটা নিয়ম আছে। ষ্টিমার ছাড়া পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করে। স্টিমারের ছাড়ার ভটভট শব্দে, রাইফেলের শব্দ মেলে। অতঃপর ধানসিঁড়ি’র বুকে ভাসাভাসি।

খানিক আগে মশার কামড়ে খানিক নড়ে গিয়েছিল সে। বকা খেয়েছে, নড়তে বারণ করেছে তাকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকে ভাষাহীন চোখওয়ালারা। শাসিয়েছে – আর কিছুক্ষণ, তারপর স্টিমার চলবে, গুলি চলবে, আর তাকে ধানসিঁড়ির ‘মাছলি’রা খাবে।

স্টিমার চলছে না। স্টিমার নষ্ট। অপেক্ষা চলছে, বেঁচে থাকবার, না থাকবার। সে খুব অস্থির। এ এমন অস্থিরতা যা বাইরে থেকে বোঝা যায়না। এ কেমন অস্থিরতা? না বেঁচে থাকবার অপেক্ষার মুহূর্তের অস্থিরতা? বোঝা যাচ্ছেনা। তবে সে জানে স্টিমার চলবেনা। সে জানে ভেতরে নিয়াজ আছে। তাই স্টিমার চলবেনা, চলতে দেবেনা। এমনটাই কথা ছিল, একজন ধরা পরলে, বাকিরা স্টিমার চলতে দেবেনা।

আচ্ছা, নিয়াজ তার ব্যাগটা সামলে রেখেছে তো? খয়েরি রঙের ঝোলা ব্যাগ, যে ব্যাগের ঝুলের দিকের সাদা সুতোগুলো খানিকটা বের হয়ে আছে।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষেরা অপেক্ষায় আছে, স্টিমার ছাড়বার। কিন্তু সে জানে স্টিমার ছাড়বেনা। সে জানে স্টিমারের ভেতরে আছে পারের হাটের চেয়ারম্যান। শান্তিবাহিনীর সদস্য। জানের হুমকি দিয়ে নামানো হবে তাকে স্টিমার থেকে। চেয়ারম্যান এসে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে তাকে, নইলে স্টিমারের মধ্যেই নীরবে মরবে চেয়ারম্যান। সব ব্যবস্থা করা আছে, প্ল্যান এ, বি, সি।

তবে সব উল্টেও যেতে পারে। সংগ্রামের বেহিসাবি সময়ে, সব প্ল্যানই পাল্টে যেতে পারে। চেয়ারম্যান কে খুঁজে না পাওয়া যেতে পারে। নিয়াজদের ওপর পাল্টা হামলা হতে পারে। অপেক্ষা করতে করতে, তাকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে ধানসিঁড়িতে ফেলে দিতে পারে। অথবা পারের হাটের চেয়ারম্যান নেমে এসে বলতে পারে, “ইয়ে মুক্তি হ্যায়।” তারপরে শুধু সে নয়, নিয়াজের দলকেও ভাসতে হবে ধানসিঁড়ি’তে।

সে অপেক্ষায় আছে। কিছু হবার, কিছু না হবার। তার এখন আর অস্থির লাগছেনা, ভয় তো নয়ই। সংগ্রামের দেশে ভয়কে বাস্তুহারা হতে হয়, দুটো একসাথে থাকতে পারেনা। সময় সংগ্রাম আর ভয় কে একসাথে থাকতে দেয়না। তাই তার ভয় হচ্ছেনা। বরং এক বোকা রোমান্টিক ভাবনায় তার নিজেকে জীবনানন্দ’র নায়ক মনে হচ্ছে। জীবনানন্দ কি তার জন্যই লিখে গেলেন – “ধানসিঁড়িটির তীরে … আবার আসিব ফিরে।” কি অদ্ভুত। ধানসিঁড়ি’র দিকে ফিরে তাকাতে ইচ্ছে করছে, মায়া দৃষ্টিতে। শ্রাবণের মেঘ দেখতে ইচ্ছে করছে, মাথা উঁচু করে, শঙ্খচিল, শালিক আর খয়েরি ব্যাগ । তার সামনে দাঁড়ানো বোবা চোখগুলো দেখতে ইচ্ছে করছেনা । সে চোখ বুঁজলো, আবারো চোখ মেলবে বলে।

আমি শুনছিলাম তাঁর ৭১’কে। দেখছিলাম ও। আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে আছি, আমি আমার বাবার দিকে তাকিয়ে আছি। বাবা দেখছে ৭১’কে, খুঁজছে খয়েরি ব্যাগ, জীবনের আনন্দ, ধানসিঁড়ি, শ্রাবণ মাস। আমি দেখছি তাকে, আমি জানি সেদিন স্টিমার ছাড়েনি। তারপরও আমি অপেক্ষা করছি পরেরটুকু জানবার। কিন্তু সে গভীর মনোযোগে ৭১’এ ডুবেছে, তাই আমি তাকে বিরক্ত করছি না।

আমি আমার বাবার দিকে তাকিয়ে আছি, তার চোখ দেখছি, সে চোখ বোবা নয়, সে চোখ কথা বলে।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন shams hoque — december ১৩, ২০১৬ @ ১১:২৪ পূর্বাহ্ন

      Thank you কিযী তাহনিন! I’m a little undecided whether you wrote your own experience or a story from experience but, in any case, write-ups like this in any form or style are a need of our time which is dwindling day by day. Regular writings in good number on ‘Ekushe, War of Liberation, our langaue and culture etc would be appreciated and beneficial for our mass people, not just the urban intelligentia. So-called post-modern or post post-modern or, even meta-modern ideas are cropping up in the field of our literature without expected influence on the readership as a whole . Congratulations! anyway. Shams Hoque

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com