শাহাবুদ্দিন আহমেদ: আমি একজন শিল্পী হয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না

রাজু আলাউদ্দিন | ১৬ december ২০১৬ ১:৫৯ পূর্বাহ্ন

S. Aআন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শাহাবুদ্দিন আহমেদ কেবল বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় চিত্রশিল্পীই নন, তিনি ছিলেন একই সঙ্গে আমাদের অহংকার, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একজন, যার এক হাতে ছিল অস্ত্র আর অন্য হাতে তুলি। কিংবা তারই আদর্শ কাজী নজরুলের ভাষায় শাহাবুদ্দিনের ‘এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাশরী আর হাতে রণতুর্য। স্বাধীনতাযুদ্ধে প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ তার শিল্পীজীবনকে বদলে দিয়েছিলো চিরকালের জন্য, যে-বদল তার শৈল্পিক অভিব্যক্তিকেই কেবল বৈশিষ্টমন্ডিত করেনি, ছবির বিষয়বস্তুকেও দিয়েছে গনমুখিতা। বহু শহীদের আত্মত্যাগের ফলে যে-স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে তিনি তার অমরগাথা রচনা করেছেন ক্যানভাসে রং ও তুলির সুনিপুন টানে; রং এখানে রক্তের স্ফুলিঙ্গ হয়ে ছড়িয়ে আছে ক্রোধ ও সাহসের বার্তা রূপে। শোক এখানে শৌর্যের বীরোপম অভিব্যক্তি নিয়ে আমাদেরকে একথাই জানিয়ে দিচ্ছে যে স্বাধীনচেতা মানুষ অদম্য, মহত্তম স্বপ্নের কোনো বিনাশ নেই, তা গতি ও পেশিময় ইশারায় আমাদেরকে উজ্জীবিত করে। তার রংয়ের প্রক্ষেপ ও এর বিন্যাস এমনভাবে করা হয় যা দেখলে মনে হবে এগুলো ঠিক ক্যানভাসে থাকতে চাইছে না, কারণ রংয়ের মধ্যে তিনি অসামান্য দক্ষতায় এমন এক চাঞ্চল্য সঞ্চার করেন যে তা ক্যানভাসের সীমাবদ্ধতাকে ভেদ করে বেরিয়ে পড়ার জন্য শোরগোল তুলছে। বিন্যাসের গতিময় অভিব্যক্তি এই শোরগোলকে উস্কানি দিচ্ছে ক্যানভাসের ছোট্ট পরিসর থেকে অবারিত প্রান্তরের দিকে ছুটে যাওয়ার জন্য যেখানে রয়েছে যুদ্ধ শৌর্য প্রকাশের জন্য, যেখানে রয়েছে স্বাধীনতার বীজ শাখাপ্রশাখায় বিকশিত হওয়ার লক্ষ্যে। ঠিক এইভাবে শিল্পী শাহাবুদ্দিন অদৃশ্য ও অমেয়কে রংয়ের মাধ্যমে ধ্বনিময় করে তোলেন। যুদ্ধকালীন গেলোবারুদের শব্দ ও গন্ধকে তিনি রংয়ে রূপান্তরিত করেছেন, কিংবা এর উল্টোটাও সত্যি এই জন্য যে যুদ্ধের পর তার ছবিতে রংকে তিনি শব্দ ও গন্ধে রূপান্তরিত করেছেন। রূপান্তরের এই মহত্তম শিল্পীকে বিজয় দিবসে জানাই আমাদের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

শিল্পী শাহাবুদ্দিনের দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারটি গৃহীত হয়েছিল গত বছরের অক্টোবরের প্রথম দিকে, তার জন্মদিনের কয়েকদিন আগে।
কবি ও প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিনের সাথে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে শিল্পী শাহাবুদ্দিন স্বাধীনতাযুদ্ধে তার অভিজ্ঞতা ও চিত্রকলায় এর প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন। এছাড়াও আছে বঙ্গবন্ধুর সাথে তার প্রথম সাক্ষাতের স্মৃতিচারণ ও মূল্যায়ন। ভিডিওতে ধারণকৃত এই সাক্ষাৎকারের লিখিত রূপটি শিল্পীর পরামর্শে প্রমিত বাংলায় প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকারটির শ্রুতিলিখন করেছেন গল্পকার অলাত এহসান। বি. স.

রাজু আলাউদ্দিন: আপনি তো ’৭১-এর আগে থেকেই চিত্রকলার সঙ্গে ছিলেন, মানে আঁকতেন, আমার যদ্দূর মনে পড়ে। এবং পরবর্তীতে তুলি ছেড়ে আপনি অস্ত্র হাতে নিলেন। এবং এটার ছাপ আপনার চিত্রকলার ভেতরে আছে। আপনার যে স্বাধীনতাযুদ্ধ, তারপর শেখ মুজিব এবং সংগ্রামী অভিব্যক্তিগুলো–এই সবগুলোর সঙ্গে আপনার…

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: একটা জিনিস, তুমি প্রায়ই দেখছি ‘শেখ মুজিব’ বলছো, শেখ মুজিব বললে কিন্তু খাটো মনে হয়, সব সময় তিনি বঙ্গবন্ধু।

রাজু: আমি অবশ্য কোনো খাটো মনে করা থেকে বলিনি।

শাহাবুদ্দিন: জানি, আমি জানি। কিন্তু অন্যরা শিখবে কী করে তাহলে। (আচ্ছা, ঠিক আছে আমি তাহলে বঙ্গবন্ধু করেই বলছি-রাজু) কারণ ‘রবীন্দ্র,’ ‘রবীন্দ্র’–এ রকম কেমন লাগে না?

রাজু: কিন্তু তিনি যখন আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে যান তখন আমরা বলি ‘রবীন্দ্র’, ‘রবি ঠাকুরের গান’, আমরা তো আরো সংক্ষিপ্ত করে বলি ‘রবি’।

শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ, যেমন অনেকেই ‘ঠাকুর’ বলে না? ‘ঠাকুর পরিবার’,– মনে হয়, আহা তারা কত আত্মীয়! এই রকম মনে হয়।

রাজু: হ্যাঁ, তবে সাংস্কৃতিক আত্মীয়তার কারণে তো সেই আত্মীয়তার অভিব্যক্তি আসতে পারে, তাই না?

শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ, অন্তর থেকে ভালবাসলে ‘শালা মুজিব’ বললেও কিছু আসে নায় না, তাই না? কিন্তু যেহেতু এমন একটা দেশে আছি যেটার অস্তিত্ব কেউ কেউ স্বীকারই করতে চায় না। ওই জন্য বলছিলাম। আজ হোক কাল হোক একদিন তো হবেই সেই নাম। এই সময়টা খুব সেনসিটিভ, ডেলিকেট, এই সময় যদি আমরা না বলি, তাহলে ওরা আমাদের এই না-বলার সুবিধাট নেবে।

রাজু: ঠিক আছে আপনার এই কথাটা খুবই যুক্তিসঙ্গত। তো বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ আপনার ছবিতে রিপিটেডলি আসে। এবং সেটা আসার পেছনে, আমি মনে করি যে, একটা জাতির তিনি প্রতীক, বাঙালি জাতির, তাই না? এই বড় প্রতীক বা এই আইকন আপনি ধরেছেন আপনার ছবিতে। তার আগে আমার প্রশ্ন হলো, ’৭১-এ যুদ্ধে যাওয়ার আগ্রহ আপনার কি করে হলো?

শাহাবুদ্দিন: হুম, আগ্রহ। হঠাৎ করে কিন্তু আগ্রহ হয় না কখনো। এটা এ্যাকসিডেন্ট না। এটা তো আর এই না যে মারামারি করলাম, গন্ডগোল হয়েছে কোথাও–এরকম ছোট কোনো ঘটনা নয়। একটা স্বাধীনতা যুদ্ধে কোনো লোক যখন যায়, তখন একটা প্রস্ততি নিতে হয়; আমরা তো একটা জাতি, তুমি এর অংশ, এটা তো চট করে হয়ে যায়নি। আমার তো প্রয়োজন ছিল না যুদ্ধে যাওয়ার, তাই না? কারণ আমার তো নিজস্ব–তুমি তো একটু আগেই বললে ছবি আঁকার কথা– স্বপ্নই তো ছিল বড় শিল্পী হওয়ার, সেই ছোটবেলা থেকেই। যে-বংশের কেউ জানতোই না তুলি কাহাকে বলে। আমার বংশে কেউ কোনো দিন ছবি আঁকে নাই। আমার বাবা, উনি রাজনীতিবিদ। উনি ছোট্টবেলা থেকে, একই বয়সে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে, উনারা একই দলে একই সাথে, কলকাতায় আন্দোলন করেছেন সোহরাওয়ার্দি সাহেবের সাথে। তো ওইটার একটা প্রভাব… (আপনার মধ্যে ছিল–রাজু)। আমরা আট ভাই, আট ভাইর মধ্যে আমি দ্বিতীয়। তো সব ভায়েরাই ছাত্র আন্দোলনে জড়িত। বলতে গেলে ছাত্রলীগের। আমার বড় ভাই জগন্নাথ কলেজে ছাত্র লীগের ভিপি ছিলেন। তার পর উনি যখন জগন্নাথ কলেজে ছিলেন, তখন কলেজে সরকারবিরোধী রাজনীতিকদের যা হয় আর কি–উনাকে রাসটিকেট দিয়ে বের করে দিলেন। উনি নরসিংদি চলে গেলেন। আমাদের গ্রামের বাড়ি নরসিংদি, থানা রায়পুরা। গ্রামের নাম আলগি, আলগি (হাসি), মেঘনা নদীর পাড়ে। উনি ওখানে গিয়েও রাজনীতিতে জড়িয়ে পরলেন। আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে এসবে নেই। তার পরের ভাই, উনিও ঢাকা সিটির ছাত্রলীগের কি যেন ছিলেন। উনি এখন ইউরোপে, মানে ফ্রান্সে। তার পরের ভাই তেজগাঁ স্কুলে পড়তো। এই হলো পারিবারের রাজনৈতিক চালচিত্র। রাজনীতির সূত্রে যা হয়, প্রতিদিন খাবার টেবিলে বাবার বন্ধুরা আসা যাওয়া করতো। বঙ্গবন্ধুর দলের লোকেরা আসতো যেত, ওইগুলি…(আপনার মাথার মধ্যে ছিল, বা আপনার মনগঠনে এসব ছিল–রাজু )। আশ্চর্য, যদিও আমি এইগুলির প্রতিবাদ করতাম যে ‘খামাখা এইসব আবোলতাবোল কী বলে যাচ্ছে’… কারণ এর ফলে আমার ডিস্টার্ব হতো ছবি আঁকায়। কিন্তু আমি তখন কলেজে যেতাম, আর্ট কলেজে গিয়ে দেখি ওখানে সেই গন্ধ নাই, যে-গন্ধ আমি ঘরে পাই। আমার মনটা সম্পূর্ণ খারাপ হয়ে যেত। মনে হতো তারা ঠিক বাগড়ম্বর করছে।

আসলে তখনকার সময় আমাদের চারুকলা ছিল মস্কোপন্থীদের ঘাঁটি । মতিয়া গ্রুপ বলতো না… এর নাম শুনেছো নিশ্চয়ই। ওই গ্রুপই নাইনটি নাইন পার্সেন্ট। আরও কয়েকজন যারা তারা কিছুই করতো না। আমার কিন্তু একটু খটকা লাগতো, বাসায় শুনি এক রকম–আমি কিন্তু এসব বলছি ছয় দফার আগের ঘটনা–যে ওরা বলে, ‘জানিস, আমাদের নেতা ধর্মঘট ডেকেছে, এই হবে ওই হবে।’ আমি এসব শুনে বন্ধুদের বলি, ‘এই ধর্মঘট ডেকেছে কেন?’ এ নিয়ে কেউ কিছু বলতে পারলো না। ওরা এই জগতেরই না বা ওরা এই লাইনেরই না। আমার খুব খারাপ লাগতো। আমি ফার্স্ট ইয়ার থেকে সেকেন্ড ইয়ারে উঠি, তখন এই গণঅভ্যুত্থান, ছাত্র আন্দোলন আরম্ভ হলো। এই যে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। তোমার বয়স তখন কত?

রাজু: আমার জন্ম তো ৬৩ সালের পর।

শাহাবুদ্দিন: আসলে ওগুলোই বিরাট কারণ আমার মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার। যেহেতু ছাত্র আন্দোলন হচ্ছে, এই হচ্ছে ওই হচ্ছে, সব আরম্ভ হয়ে গেছে। তখন সংগ্রাম পরিষদে তোফায়েল আহমেদ, আ. স. ম. আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজ, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, ফেরদৌস কুরাইশী–এরা সব একত্রিত হয়ে গেল। এদের সবার দল এক হয়ে গেল। এখনকার এই বঙ্গবন্ধু তখন তো শুধুই শেখ মুজিব, তাই না? এই শেখ মুজিবকে জেলে ঢুকিয়েছে। আমার এখনও খেয়াল আছে, আমার বাবা-চাচারা বলতো, জানিস, লৌহমানব আইয়ুব খান মানে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, লৌহমানব এসেছে! কে যে বাঁচে আর কে মারা যায় বলা মুশকিল। কিন্তু আমাদের নেতা মুজিব ভাইয়ের কী সাহস! উনি ঠিকই ডাক দিয়েছেন: ‘গণতন্ত্র রক্ষা করতে হবে, আমাদের জান দিতে হবে, রক্ত দিতে প্রস্তুত হতে হবে।’ সবাই রাস্তায় নেমে গ্যাছে। এই আরম্ভ হলো আরকি। আমাদের ছাত্র সংগঠনের ভেতরে শিল্পী সাহিত্যিক কবির সংখ্যা কম। যারা গান বাজনা করে ছবি আঁকে তারা সব মস্কোপন্থী, তারা ভাল চিন্তা ভাবনা করে, প্রোগ্রেসিভ। ছাত্রলীগের মধ্যে ওটা নেই। যখন জানতে পারলো–আমার সব ভাই যেহেতু ছাত্র লীগ করে– তখন আমার ভাইকে তারা বললো, ‘তোর ভাই আর্ট কলেজে পড়ে, এইটা কোনো কথা হলো, আমরা পয়সা দিয়ে পোস্টার বানাই। আর তোর ভাই থাকতে আমাদের এতো কষ্ট করতে হয়!’ ওরা পয়সা দেয় ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেদেরই। ওরা পয়সা দেয়, তার বিনিময়ে ওরা শ্লোগান লিখে দেয়। তো আমার ভায়েরা এসে আমাকে পটায়। ভাইদের বলি ধ্যাৎ, রাখ এই সব, এইটা আমার জীবন না। আমি ছবি আঁকবো।



কিন্তু যেদিন আসাদ মারা যায়, আসাদ মরার ধর চারদিন আগে, আমাকে পটাবার জন্য ওই দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। বললো আর্ট কলেজ হয়ে জহিরুল হক হল, ইকবাল হল, একবার দেখে যাও। আমি বলি, ‘নাহ, কিসব বদমাইশ, চেহারা দেখেই পছন্দ হয় না, পড়াশুনা করে না কিচ্ছু না,’ কিন্তু ছাত্র ইউনিয়নের তো দেখি চেহারাই আলাদা। ওরা কথাবার্তা যখন বলতো–ওরা কিন্তু আমাকে অনেকবার চেষ্টা করেছে সমাজতন্ত্রে ভেড়াতে। আমি বলি খাইছে, কী বলে। ওদের কথাবার্তা অর্ধেকই বুঝি না। আসলেই বুঝতাম না। কী সব বলে সমাজতন্ত্র, কমিউনিজম, কীসব ভাষা ইউজ করে। কিন্তু ঘরে এসে দেখি তার অপজিট। কারণ আওয়ামী লীগতো আর ওই দিকের না। আমি মাঝে মাঝে প্রশ্ন করতাম বাবার কাছে, খাবার টেবিলে ভয়ে ভয়ে। বাবা বলতেন,হ্যাঁ, কী বলিস! আমাকে ধমক দিয়ে চ্যাপটা বানিয়ে ফেলতো। কত চড়-থাপ্পর খেয়েছি। যাইহোক, একদিন গেলাম, মায়া লাগলো, কারণ ভায়েরা বলছে। যাওয়ার সময় ইকবাল হলের একতলা থেকে ওঠার সময়ই দেখি সিরাজুল আলম খান, শাহজাহান সিরাজ। তখন আমি কাউকে চিনি না। মনে হয় কী মিটিং টিটিং করছিল, তখন আমার ভাই গিয়ে বললো, ‘আমার ছোট ভাইকে নিয়ে এসেছি’। সিরাজুল আলম খান, সবাই তাকে দাদাভাই ডাকে, দাদাভাই। দাদাভাই কে আবার? তো উনি বললো, ‘আরে আরে শিল্পী ভাই!’ আমি কেবল সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি, আমাকে ‘শিল্পী’ বানিয়ে ফেললো। খুব অনার করলো আমাকে। ‘এই, এই রাস্তা করে দে, রাস্তা করে দে, পাখা নিয়ে আয়, পাখা নিয়ে আয়।’ বেশ সম্মান দেখালো। উনাকে দেখে মনে হলো, যা ভাবছি তা তো নয়। বেশ পড়াশুনার ভাব আছে। আমি নিজেকে খুব অপরাধী ভাবলাম। কী ভুল ধারণাই করতাম। আমি স্লামালাইকুম বললাম। উনি বললেন, ‘আরে বস বস বস। আরে চা নিয়ে আয়।’ সত্যি সত্যি খুব সম্মান দিল। আমি খুব গর্ববোধ করলাম, প্রাউড ফিল করলাম। বসালো আমাকে। ‘এই যে দেখো, আপনি তো শিল্পী, তুমি বলি?’ আমি বলি, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ। আমি তো অনেক ছোট’। ‘তুমি তো বুঝবে। ওরা বুঝতে চায় না। কত বোঝাচ্ছি। দেখ, আমরা আন্দোলনের নতুন ধারায় যাচ্ছি, আমাদের বাঁচার তাগিদ, আমাদের বাঙালীদের কোনো উপায় নাই। এইসব বলে টলে, কী কী স্লোগান দিবে তা বলতে লাগলো। বলতো, “তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা-যমুনা”– এটা কেমন, বলতো?’ এই শ্লোগান শুনে আমার ভেতরে শিহরণ জেগে উঠলো। এতো সুন্দর!

রাজু: এটা কি উনার লেখা ছিল?

শাহাবুদ্দিন: সিরাজুল আলম খান, উনারই ছাত্র লীগের স্লোগান। তারপর “জাগো, জাগো…”।

রাজু: কিন্তু এটা কি উনার কাছে আগে থেকেই লেখা ছিল?

শাহাবুদ্দিন: না, তা না, উনি বলছেন আমাকে শ্লোগানটা।

রাজু: আপনি কি বললেন?

শাহাবুদ্দিন: উনি বললেন, ‘ “জাগো জাগো, বাঙ্গালি জাগো”। তারপর বলো তো আরেকটা, “জয় বাংলা…”। যেই এটা শুনলাম, আমি তখন একদম বরফ থেকে জল হয়ে গলে যেতে শুরু করেছি। ‘হ্যাঁ, দাদা ভাই, কী করতে হবে, বলুন’। ‘দেখলি তোরা…’। আসলে ওরা বলতে পার্টির অন্য লোকরা, ওরা বলতো এইটা ঠিক নয়, ওটা ঠিক নয়, মানে ভয় পেত। যেই ডিটারমাইনড হয়ে গেছে, সবাই স্লোগান দিয়ে দিলো। আর আমি ভজে গেলাম। অথচ, ওদের সম্পর্কে কী সব ভাবতাম; পড়াশুনা করে না, গুন্ডা পান্ডা সব। আসলে তো তা না। তখন আমাকে ক্যান্টিন দেখিয়ে বললো, ‘আপনি যেভাবে খুশি কাজ করেন।’ আমি বললাম, ‘আমার হাতের লেখা অত ভাল না। কিন্তু আমি ছবি আঁকতে রাজি আছি।’ ‘তাহলে এই স্লোগানগুলোর উপর বেজ করে আঁকবেন।’ ‘ওকে ওকে, কালকে থেকে আঁকবো।’ আমার জন্য সব রেডি করে দিল।
আমি দশটায়, সাড়ে দশটায় এলাম আর্ট কলেজে। এসে দেখি আমি একা, অতএব পার্টনার খুঁজি। তো পার্টনার কেউ হতে চায় না। এসব করলে আসলে হয়তো আর্টিস্ট শিল্পী হওয়া যাবে না–এই রকম একটা ভয় ঢুকে গেল আমার। আমি আমার অন্যান্য বন্ধুদের বলি পার্টনার হতে কিন্তু কেউ রাজি হয় না। পটিয়ে টটিয়ে একেএম কাইয়ুম–এখন সে চিটাগাং আর্ট কলেজের প্রফেসর–ওকে বললাম, ‘চাইর আনা পয়সা দিবো, আয় না আমার সাথে।’ ওর হাতের লেখা আবার ভালো। এদিকে যাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাকে বললাম, নীলক্ষেতের কাছে চিটাগাং রেস্টুরেন্ট, ঢাকা কলেজের সামনে, ওখান থেকে এক প্যাকেট বিরিয়ানি নিয়ে আসতে। ওকে (কাইয়ুম) বলতাম, ‘এই শোনো, তোমাকে কাজ করতে হবে।’ “তোমার আমার ঠিকানা/ পদ্মা মেঘনা যমুনা।” নদী আঁকি, লাঙ্গল আঁকি, গরু–এসব আঁকি আর ও এসব শ্লোগান লিখতো। এই আরম্ভ হলো।

রাজু: এর মধ্য দিয়ে সরাসরি আপনি রাজনৈতিকভাবে জড়িয়েও গেলেন আর কি। ছবিকে আপনি আর আলাদা রাখতে পারেননি তখন থেকেই। সেটি আপনার পরবর্তী জীবনেও আছে।

শাহাবুদ্দিন: যেদিন আসাদ মারা যায় সেই দিন আমরা একই সাথে মিছিলে গেলাম। শুধু যে একা তা নয়, মিছিল নিয়ে গেলাম শহীদ মিনারে, তখন নাজিরা বাজারে আমরা টিয়ার গ্যাস আর গুলির আওয়াজ শুনলাম, এসবের মুখোমুখি হলাম। তখন অবধি বুঝি নাই আসাদ গুলিতে মারা গেছে। আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলাম। আমরা ভিক্টোরিয়া পার্কের ওদিক গেলাম। সেখানে আবার হইচই। তখন ওল্ড ঢাকা আবার বিহারীদের আড্ডা ছিল। ওরা লাঠিসোটা নিয়ে ধর ধর ধর করতে লাগলো। আরে সর্বনাশ! দুই দিক থেকেই বিপদ। হলে কি হবে, ধীরে ধীরে ছাত্রদের সংখ্যা বাড়ছে দিনে দিনে। বিকেল বেলা শোনা গেল, ইয়েস, পুলিশের গুলিতে আসাদ মারা যায়। পরে ওইটাই বিরাট ফ্যাক্টর হিসেবে দেখা দিল। এই প্রথম সবগুলো শক্তি একত্রিত হয়ে গেল। এই যে “জয় বাংলা”–এটা সবার হয়ে গেল।
আমার এখনো খেয়াল আছে, আমার এখনও চোখে পানি চলে আসে সেকথা মনে হলে। আমি আঁকি তো, ইউনিভার্সিটির সামনে এখন যে-জাগয়াটায় অপরাজেয় বাংলা তখন ওই জায়গাটা খালি ছিল, ওখানে গাছ ছিল। গাছটা আছে তো এখনো। তো সেখানে সান শেডের উপর দাড়িয়ে সংগ্রাম পরিষদের সবাই বক্তৃতা দিচ্ছে। একজন আমাকে বললো, ‘তুমি আসো’।
চারদিকে দেখি সব খালি, আজকে মুহসিন হল যেখানে সেখানে সব ফাঁকা ছিল। দেখি যে সিরাজ ভাই পায়চারি করছেন সঙ্গে আরো কয়েকজন ছেলেমেয়ে।

মাইকে তখন ঘোষণা হচ্ছে–‘এখনই বক্তৃতা দিবেন…..।’ আমি উনার সাথে গেলাম এবং আমি খুব মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আমার দুর্বলতা চলে এলো ওনার প্রতি। তো ওনার সাথে আমি এক রিকশায় গেলাম, ভাইস-চ্যান্সেলরের বাড়ির সামনে গিয়ে দাড়ালাম। দূর থেকে, আমরা দুজন রিকশার উপরে বসে আছি। উনি চাদর গায় দিয়ে মুখ ঢেকে রাখলেন। আমি বললাম-আপনি যাবেন না?
‘না, না, না। শোন, এখনই তোফায়েল বত্তৃতা দিবে। ওরা কী বক্তব্য রাখবে তা ওদের শিখিয়ে দিয়েছি। দেখ, চুপ।’ উনি শুধু উৎকর্ণ হয়ে আছেন কখন সেই শব্দ ব্যবহার করবে।

আমি তো আর জানি না, উনি শিখিয়ে দিয়েছেন, প্রাকটিস করিয়েছেন। ‘আজকে ধুকে ধুকে মরছে আমাদের বাংলার সন্তানরা… শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা ভাসানী’–এইসব নাম বললো। তোফায়েল, তখন তোফায়েল হলেন মেইন হিট, তিনি তখন ভিপি। তোয়ায়েল শুরু করলেন, ‘ভাইয়েরা আমার, ভাই বোনেরা, আমাদের প্রিয় নেতা, নয়নমনি শেখ মুজিব..’। হঠাৎ আওয়াজ এল ‘বন্ধ কর, বন্ধ কর!’ কারণ উনার(শেখ মুজিবুর রহমান) নাম বলছে তো এই কারণে বন্ধ করতে বললো। আর তখন আব্দুর রউফ নামের একজন ছিলো, রংপুরের। ছাত্রলীগের উনি জিএস কি যেন ছিলেন, প্রেসিডেন্ট বোধহয়। ওরা প্রতিবাদ করে বলে ওঠে – “জয় বাংলা। জয় বাংলা”–একসাথে। এই তখন ‘জয়বাংলা’ শ্লোগান হয়ে গেল। রিকশাওয়ালারা রিকশা ফেলেই এই শ্লোগান ধরতে শুরু করেছে, কারণ জোস উঠে গেছে।

এই যে আপত্তিকারী ছিল যারা- যারা ছাত্র ইউনিয়নের, ভাসানীর ন্যাপের, অন্যান্য দলের ছিল যারা তারা এই শ্লোগান শুনবার পর একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। তখন তো ‘জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ’ করতো, এখন ‘জয় বাংলা’ চলে এসেছে। আর এমন আওয়াজ হলো, বিশ্ববিদ্যালয়, আর্ট কলেজের সবাই সেই নতুন শ্লোগান দিতে শুরু করলো। এইটা নতুন স্লোগান। এই স্লোগানেই সব এক হয়ে গেল। জোস উঠে গেল সবার। অন্যদের ইয়ে আর নাই… (অস্তিত্বই নাই-রাজু)। হ্যাঁ, হ্যাঁ। অন্যরা কারা জেলে টেলে ছিল এদের খবর আর নাই। এইভাবে “নয়নমনি”, “জয়বাংলা”, “শেখ মুজিব” চলে এলো।
Untitled-1
এই হলো প্রথম দিনের ঘটনা। দ্বিতীয় দিনের পর তৃতীয়দিন আমাদের ওল্ড ঢাকা যাওয়া হবে। ওল্ড ঢাকা তখন খুব রিস্কি। যেহেতু ওল্ড ঢাকা ছিল বিহারীদের আড্ডা, আর এদিকে ছিল মোহাম্মদপুরে। যাইহোক, রিস্ক নিয়ে মিছিলসহ বাহাদুর শাহ পার্কে যাওয়া হবে। ওইখানেই ফায়ার করে পুলিশ ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ওইখানে আসাদ ছিল। চারটার দিকে ইকবাল হলে আসাদের ডেডবডি নিয়ে আসা হলো আর সবাই বলতে লাগলো, ‘এই আমাদের আসাদ’। আরম্ভ হয়ে গেল আমাদের গণঅভ্যুত্থান। এই আন্দোলনে প্রতিদিন আমি ছিলাম।

রাজু: এটা খুব বিরল ঘটনা যে, কোনো শিল্পী বা লেখক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছেন। লেখকদের মধ্যে এইরকম কয়েকজন ছিলেন যেমন রফিক আজাদ, আরো কয়েক জন ছিলেন। কিন্তু চিত্রশিল্পী হিসেবে সম্ভবত আপনিই একমাত্র যিনি মুক্তিযোদ্ধা, প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন।

শাহাবুদ্দিন: শোন, আমার জানা মতে তুমি যাদের নাম বললে এরকম অনেকেই আছে যারা ইনভল্বড ছিলেন। কিন্তু একদম যোদ্ধা হিসেবে, যেমন ধর নাসিরউদ্দিন ইউফুস বাচ্চু, আমরা এক সাথে যুদ্ধ করেছি। তো যুদ্ধ করা আর দেখা–এর মধ্যে তফাৎ আছে। (তাতো বটেই-রাজু)। আর চিত্রশিল্পী হিসেবে, মানে সফল চিত্রশিল্পী হিসেবে, মনে হয় না পৃথিবীতে কেউ আছে। আমি খোঁজ নিয়েছি। ইভেন তোমার মেক্সিকো, স্পেন–এসব দেশে আমি খোঁজ নিয়েছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে কিনা। অনেকে করেছে কিন্তু চিত্রশিল্পী হিসেবে তারা অসফল, বুঝতে পেরেছ? সফল না হলে তুমি হয়তো আসতে না আমার কাছে। তো অনেকগুলো ফ্যাক্টর আছে। ফ্যাক্টরগুলো হলো যেমন ধর বঙ্গবন্ধু যে এতো উচ্চতায় যাবে– এটাতো কেউ কল্পনাও করেনি। কিন্তু তিনিই হয়ে উঠলেন আমাদের মুক্তিদাতা।



আমার কাছে বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারটা রহস্যময় মনে হয়, অনেক কিছুই যুক্তি দিয়ে ঘটনার তল খুঁজে পাওয়া যায় না। তুমি দেখ, তার চেয়ে অনেক শিক্ষিত লোক ছিল, অনেক বিজ্ঞ লোক ছিল। জয়নুল আবেদিনের ব্যাপারটাও একই। অনেকে কত সাধনা করেছে, কত কিছু করেছে, কত কি শিক্ষা, কিন্তু জয়নুল আবেদিন বেচারা, গ্রামের মুর্খ বাবা-মা, জীবনে শহর দেখে নাই। কিন্তু উনি কেন হলেন? মনে হয় প্রকৃতির কতগুলি শক্তি চলে আসে এই ধরনের মানুষের মধ্যে, ওটাকে রেসপেক্ট না করলে ওই জাতির পতন ঘটে।
রাজু: আমার কাছে যেটা ইন্টারেস্টিং লাগে যে, অতিমাত্রায় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা একজন শিল্পীকে দুর্বল করে ফেলে। (অফকোর্স, অফকোর্স-শাহাবুদ্দিন)। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঘটেনি। এটা মজার জিনিস। আমি এতো ডিটেইলে আগে জানতাম না। ব্যাপারটা জানার পর আরো বেশি বিস্মিত এই জন্য যে, এই সম্পৃক্ততা নিয়েও চিত্রকলায় আপনার যে সাফল্য, স্বাতন্ত্র্য এগুলি কিন্তু…

শাহাবুদ্দিন: আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা কিন্তু উল্টো হলো। এই যে গতি বল, স্পিড বল… ছোটবেলা আমি আঁকি যখন, আমার বয়স আর কত হবে? তার আগে একটা মজার ঘটনা বলি, ক্লাস ওয়ানে আমার রোল নাম্বার ওয়ান, টুতে টু, থ্রিতে থ্রি, ফোরে ফোর, ফাইভে ফাইভ। ফাইভ থেকে সিক্সে উঠতে গিয়ে রোল নাম্বার হয়ে গেল টুয়েন্টি সিক্স বোধ হয়। তারপর আরম্ভ হয়ে গেল অধঃপতন। দ্যাটস মিন আমি ছবি আঁকা ধরেছি।
রাজু: কত বছর বয়সে এটা ঘটলো?
শাহাবুদ্দিন: তখন হবে কত, এই বার-তের। যে-বয়সে সাধারণত পরিবর্তন ঘটে। আসলে আল্লাহর কোনো ইশারা ছিল কিনা কে জানে। কারণ বড় ভাইরা পড়তো, আশেপাশের যারা উপরের ক্লাশে পড়তো, ওদের বই দেখতাম। ছবি খুঁজতাম। খুঁজে খুঁজে সায়েন্সের ব্যাঙ বাঘ দেখতাম, রবীন্দ্রনাথ, সুভাষ বসু–এগুলি কপি করতাম। সরিষার তেল, চুলের তেল কাগজে মাখিয়ে কপি করে ছবি আঁকতাম। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে আঁকতাম। আমরা যেহেতু আট ভাই, ওরা অামার এই আঁকাআঁকির কথা বাবাকে বলে দিত: ‘শাহাবুদ্দিন পড়ে না, ফাঁকি দিচ্ছে।’ আমি আবার সুর করে পড়তে শুরু করি। এই করে প্রতিদিন আমি মার খেতাম, প্রতিদিন বকা দিত: ‘ বেয়াদব, শয়তান, বদমাইশ।’ ইভেন, এই যে আমি হাসলে একটা দাগ দেখতে পাচ্ছ–এটাও সেই মার খাওয়ার দাগ। তবে এরপরে আর মারেনি কোনোদিন।
এই যে দেখতে পাচ্ছ গালে টোল, এটা মারের চিহ্ন।
রাজু: তাই নাকি? আমি তো ভাবছি এইটা আপনার স্বাভাবিক টোল, অনেকেরই যেমন হয় (হ্যাঁ, ন্যাচারাল টোল আছে–শাহাবুদ্দিন)। তো আপনারটা ওখান থেকে এসেছে তাহলে? (হ্যাঁ, হ্যাঁ, সবারটা জন্ম থেকে আসে, আমারটা জন্মের না-শাহাবুদ্দিন)। এটা আপনাকে আলাদা করার জন্য যেমন, তেমনি বিউটি স্পট হিসেবেও ভাল।

শাহাবুদ্দিন: কিন্তু এটা তো তখন ছিল না। আসলে মার খাওয়ার কারণে হয়েছে। এবং ওই মার খাওয়ার পর আরো আমার ভেতরে জিদ চেপে বসলো–‘হ্যাঁ, জয়নুল আবেদিন হব, আল্লাহ আল্লাহ আমাকে বড় শিল্পী বানিয়ে দাও। আমি নামাজ পড়তে জানি না, কিন্তু মসজিদে নামাজ পড়ি-হে আল্লাহ আমাকে বড় শিল্পী বানিয়ে দাও। স্টিল আই বিলিভ।
রাজু: আল্লায় বিশ্বাস করেন আপনি?
শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ, আই বিলিভ ইন গড। কিন্তু আচারআচরণের ধারে কাছে আমি নাই। আই বিলিভ ইন গড, আমার যত দূর মনে হয়, তার উপরে আমার বিশ্বাসটা স্পষ্ট। কারণ হলো, যে কোনো কিছুর ওপর বিশ্বাস করলে না এগিয়ে যেতে পারবা। না হলে তুমি ডিসএপয়েন্টেড হয়ে যাও, দিশেহারা হয়ে যাও তো। ওই জন্যই তো সত্যিকার গাইডেন্স, কন্টোল দরকার। আর ‍তুমি দেখবে পৃথিবীকে গাইডেন্স ওই চার পাঁচজনই দেয়, বাকী সব ভেড়ার পাল আমরা, ফলো করি। হি হি হি..
রাজু: আচ্ছা, আর্ট কলেজে আপনার শিক্ষক হিসেবে জয়নুল আবেদিন ছিলেন। আর কাকে কাকে পেয়েছিলেন?

শাহাবুদ্দিন: বলেছি তো জয়নুলকে পেয়েছি। তাছাড়া ঢোকার পর যাকে যাকে পেয়েছি তাদের কাউকে চিনবে কি? আমাদের আনওয়ারুল হক ছিলেন, মারা গেছেন। আমিনুল ইসলামকে পেলাম। রফিকুন নবী ছিলেন আমাদের। কিন্তু মজাটা হলো এখানে যে আমার মা প্রতিদিন মারতো আর আমি কানতাম, এইটা রেগুলার ছিল। যে দিন বাবা আসতো না, মিটিং-টিটিং থাকতো, ওই দিন আমার কাছে বেহেস্ত। মার খুব খারাপ লাগতো, আঁকার স্বাধীনতা পাই না বলে।
রাজু: তখন আপনারা থাকতেন কোথায়? (এইখানে-শাহাবুদ্দিন)। ও, এইটাই আপনাদের পৈত্রিক ভিটা?
শাহাবুদ্দিন: পৈত্রিক না। আমার বাবা ব্যবসা করতেন কলকাতা থাকতেই, ছাত্রজীবনে থাকতেই। তখন তো জীবন অন্যরকম ছিল। আজকের মতন তো আর না। তারপর তো তিনি চলে এলেন, চলে আসার পর আমাদের গ্রামেই আলগি, খুব বেশি দূর না তো, এখানে আসতেন, বাসে করে আবার চলে যেতেন দুইদিন থেকে। তো আমি গ্রামেও পড়াশুনা করেছি। ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়েছি। থ্রি পর্যন্ত পড়ে এখানে আসার পর এখানে আবার ক্লাস ওয়ানেই দিল আমাকে। কারণ গ্রামের স্কুলের কোনো ভ্যালু নাই। হা হা হা… এজন্য পিছিয়ে গেছি বয়স হিসাবে। এখানে এসে কলাবাগানে বশির উদ্দিন রোডে ছিলাম ভাড়া। তারপর এইখানে, এটা তখন ডোবা-এই জায়গাটা কিনেন অামার বাবা। তারপর এইখানেই টিনের ঘর উঠিয়ে আমরা থাকি।
রাজু: আপনার ড্রয়িংয়ের টিচার কে ছিলেন?

শাহাবুদ্দিন: পারটিকুলারলি ড্রয়িংয়ের কেউ ছিল না।
রাজু: আচ্ছা, আচ্ছা। প্রশ্নটা এলো, কারণ আপনার যেসব কাজ দেখেছি তার পেছনে ড্রয়িংয়ের একটা …

শাহাবুদ্দিন: আমি বলছি কীভাবে এলো। যেমন ধর, মা খুঁজে বের করলো–আর্ট কলেজে শুক্রবার, রবিবার সকাল ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত বাচ্চাদের ক্লাস নেয় ছবি আঁকার। মা অামাকে ওইখানে নিয়ে গেল। ওইখানে, মানে আর্ট কলেজ যেটা, এখন ইন্সটিটিউট, তো ওইখানে শামসুন নাহার শিশু কলাভবন( বর্তমানে জয়নুল কলাভবন) নামে বাচ্ছাদের একটা স্কুল ছিল।
তখন ধরো সিক্সিটি সেভেন, আমি ঢুকছি সেখানে। তখন তো পাকিস্তানের এলিট ক্লাসের ছেলেমেয়েদেরকে নিয়ে যেত সেখানে। গাড়িতে করে তখন ধর ইস্পাহানি, বাওয়ানী, ওদের ছেলেমেয়েরা যেত.. (আপনার বাবাও কি এলিট ছিল না? তিনি পলিটিক্স করতেন, ব্যবসা করতেন –রাজু)। আমরা তো মধ্যবিত্ত, একদম মধ্যবিত্ত বলতে গেলে। টিনের ঘর, নলিবাঁশের বেড়ার ঘর ছিলো তো। না না, বাঙালি তো, বাঙালি কোনো ব্যবসায়ি সে সময় এলিট ছিল না। কোনো বাঙালি ছিল না। এখন না হচ্ছে। বল, কেউ ছিল ব্যবসা করতো বাঙালি?
রাজু: না, তেমন নাম পাওয়া যায় না। চট্টগ্রামে ছিল কি?
শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ, চট্টগ্রামে ছিল কয়েকজন।
রাজু: হিন্দুরা ছিল।
শাহাবুদ্দিন: হিন্দু ছিল যারা ইউপি থেকে এসছেন, আর কিছু ছিল যেমন ধর ড. কামাল হোসেন সাহেবের ফ্যামেলি। কিন্তু একদম এখান থেকে ছোটখাট মুদি দোকান বা বাবুর হাটের আরত–এই ধরনের ব্যবসাপাতি ছিল বাঙালিদের। যাইহোক, মা আমাকে নিয়ে গেল, আমি তো খুশি। মা বললো– ‘পাওয়া গেছেরে, ওইখানে গিয়া ভর্তি করিয়ে দেই তোকে।’ তিন টাকা দিয়ে ভর্তি করানো হলো আমাকে। তখন তিন টাকা তো অনেক! বুঝেছ তো, ৬৭ সালের কথা। তখন ধর, রিকশায় এখান থেকে ভাড়া ছিল দু’পয়সা। তখন তিন টাকা তো অনেক। বাবাকে না বলে মা আমাকে নিয়ে গেলেন সেখানে। কিন্তু সকালবেলা ঢুকতেই দেখি যে–তুমি গিয়েছে তো ইন্সটিটিউটে?– লিচু তলার লনটা পরিস্কার তখন, গেটের সামনে দুই-তিনটা গাড়ি। তখন তো গাড়ি দেখা মানে বিরাট ব্যাপার। বড় লোকরা ছাড়াতো গাড়ী কারোর ছিল না! দেখি বাচ্চা পোলাপাইনগুলি উর্দুতে কি সব বলে কিছুই বুঝি না। আমি মায়ের আঁচল ধরে আছি, আমার পড়নে ছিল হাফ প্যান্ট। আমি বলি আমি যাবো না।
‘বদমাইশ, এতো কষ্ট কইরা আইছি এইখানে, যাবি না!’ ওদেরকে আমার কাছে বিদেশি মনে হচ্ছে, লজ্জা লাগছিল। কমপ্লেক্স–বুঝছ তো, এইখানে আমি আঁকতে পারবো না বলে মনে হলো। তারপর শেষমেষ ভয়ে ভয়ে গেলাম। টিনের ঘর, এখনো আছে, রং-টং দিয়ে এন্টিকসের মতোই। জয়নুল আবেদিনের কবর আর কাজী নজরুল ইসলামের কবর, তার পাশেই টিনের ঘরটা। তো গিয়ে দেখি কেউ নেই। লুঙ্গি পড়া একজন লোক, পিওন, রং-টং কাগজ-টাগজ কি কি রেডি করছে। ওনাকে দেখে একটু শান্তি পেলাম–আহ লুঙ্গি পড়া! কে একজন মাকে বললো, ‘ও খালাম্মা, আসেন আসেন। ও খোকা, ভর্তি হবে? আসো আসো। এই নাও, কাগজ নাও, কলম নাও, আঁকো তো দেখি।’



আর ওরা কাগজপত্র ফর্ম ফিলাপ করে মা’র সাথে কি কি সব বলছেন।
আমি এদিক ওদিক দেখি। সেখানে আরো দশ-বারো জন হবে, আমিই একমাত্র বাঙালি। ওয়াও, এত বড় কাগজ। লাল নীল কত রঙের কাগজ। রঙের একটা ডিব্বা আমার কাছে দিল। আমি আঁকলাম। হেব্বি এনার্জি।
একজন বললেন, আবার আঁকো। ও, আচ্ছা! আবার আঁকলাম। ওয়াও! ‘দেখেন দেখেন আপনার ছেলেতো সাংঘাতিক। ও অনেক নাম করবে।’
-আমাকে আরেকটা কাগজ দিল, বেশ বড়। এই প্রথম আমার জীবনে এত বড় কাগজে আঁকলাম। ‘বাবা, তুমি বেঁচে থাক, অনেক বড় শিল্পী হবা। এই যে দেখ ওরা আসে, ফালতু, সপ্তাহে একবার একটা আঁকতে দেই, তা-ই পারে না। তুমি দুইটা এঁকে ফেললে! এই তো!’ সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল আমাকে, বাংলায়ই বললেন তিনি। অন্য ছাত্রগুলো কিছু কিছু বাংলা বলে। আর মা, মা’র আরেকটা ভূমিকা দারুণ। মা কিন্তু সুফিয়া কামালদের ‘মহিলা সমিতি’তে যুক্ত ছিলেন। মায়ের সাথে অন্য বাচ্চাগুলোকে পরিচয় করিয়ে দিলো। কাজে কাজেই বুঝুক আর না বুঝুক মা ইংলিশে-গুড, গুড, ভ্যারি গুড, গুড মর্নিং, হাউ আর ইউ বলে ম্যানেজ করে নিচ্ছিল। যেহেতু রাজনীতি-সচেতন এবং সমাজকর্মী ছিলেন তাই তিনি এসব সামাজিকতাটুকু জানতেন। এইগুলা আমি দেখতাম আর নিজের লজ্জা লাগতো, কারণ বুঝতে পারতাম বড়লোকের এই পুলাপানগুলো পাত্তা দিচ্ছে না আমার মাকে। এই ছিল ওখানকার পরিবেশ।
ক্লাশটা ছিল সপ্তায় দুই দিন। আমার রাতে ঘুম হতো না, কবে হবে সপ্তার শুক্রবার, রবিবার। শুক্রবার আমার বন্ধ ছিল, আমি তেজগাঁ স্কুলের ছাত্র। কিন্তু রবিবার খোলা, আমি রবিবার যেতাম না স্কুলে। আর্ট কলেজের ওইখানেই যেতাম, সারা দিন আর্ট কলেজের বাইরে ছবি আঁকা হচ্ছে, আমি এগুলি দেখতাম। ওদের সাহায্য করতাম। খোকা এইটা নিয়ে আসো, ওইটা নিয়ে আসো। সবার কাছে পরিচিত হয়ে গেছি আমি। এই আরম্ভ হলো। ওইদিকে স্কুলে রেজাল্ট খারাপ হচ্ছে, আর হেড মাস্টার এসে দিলো বকা।
রাজু: তার মানে একদিকে রেজাল্ট খারাপ হচ্ছে আর এদিকে ছবি ভাল হচ্ছে। পরস্পরবিরোধী, ইন্টারেস্টিং।
শাহাবুদ্দিন: এইসব কারণে রেজাল্ট খারাপ হচ্ছে। স্কুলের মাস্টার এসে বাবাকে রেজাল্টের কথা জানালেন। বাবা রাগ করে মারলেন আমাকে। তারপর তো ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে গেছে।
কিন্তু ওই যে পিয়ন, আর্ট কলেজের পিয়ন। হান্নানভাই নাম। উনারও অনেক অবদান আছে আমার জীবনে। উনি একদিন বললেন, ‘শাহাবুদ্দিন, তোমার মা-বাবাকে গিয়ে বলবে যে, এত তারিখে সকালবেলা যাতে রেডিও শোনে। তোমার ছবি গেছে করাচিতে।’ আমি বলি – ‘অ্যা, কয় কী! আমার ছবি গেছে কিসে? কয় কী!’ ‘তুমি আল্লাহর কাছে দোয়া কর, সবাই তো সুযোগ পায় না, কিন্তু তোমারটা গেছে।’
রাজু: এটা কত সালের ঘটনা বলছেন?
শাহাবুদ্দিন: সিক্সটি সেভেন-এর শেষের দিকে ধর আর কি, সিক্সটি এইট হবে। যাইহোক, আমি তাকে বললাম, ‘রেডিও! কেন, কি বলবো?’
‘বলবা যে তোমার দুইটা ছবি গেছে। ওরা পাঠাইছে। ওখানে বিশ্ব শিশুদিবসে প্রেসিডেন্ট বিশেষ গোল্ড মেডেল দেয়। চিত্রকলায় দুইটা বিভাগ–ক আর খ। ক হলো চিল্ড্রেন-১২ থেকে ১৬; আর খ হলো পুলাপাইন। (আপনি কি খ-এ?-রাজু)। না, ক-এ। সিক্সি সেভেন-সিক্সি এইটে আমার বয়স ১৫ হয়ে গেছে। আর ধরো স্পোর্টস: সাঁতার-টাতার এই সবে দিছে। আর বিশেষ স্কাউটে সাহসী ভূমিকা পালনের জন্য, যেমন কাউকে বাঁচাইছে-টাছাইছে, এসব মিলিয়ে ৭ জনকে এই পুরস্কার দেয়।
কিন্তু তখন আমি এইসব বুঝিটুজি না। উনি বললেন যে ‘যাও, গিয়ে বলবে যা বললাম। সরকার কবিরউদ্দিন খবর পড়ে, নিশ্চয় তোমার বাবা-মা খবর শোনে।’
আমি বাসার কাউকে বলি নাই। বলে লাভ নাই কোনো, জানি পাবো না, তাই। কিন্তু ডেটটা মনে রেখেছিলাম। সেদিন হয়েছে কী, কপালই আমার খারাপ, ভাবছি একা একা শুনবো, কিন্তু ওই দিন বাবা বাসায়। বাবা বাসায় থাকলেই আমরা ওই দিন ভিজা বিড়াল। সকালবেলা টেবিলে সাদা রুটি দিছে তখন, আর আলু ভাজি। রেডিও শোনেন বাবা, পলেটিক্সের খবর।
আমি কান পেতে আছি, দেখি কি বলে। আমি মনে মনে বলি–আল্লাহ যদি ছাপ্পর মাইরা দিয়া দেয়। হতেও তো পারে।
দেখি সরকার কবিরউদ্দিন খবর পড়ছে, আজকের বিশেষ বিশেষ খবর হলো, পূর্ব পাকিস্তানে কি সব হাবি-ঝাবি, বন্যা নাকি কি হয়েছিল। তারপর বললো আমাদের প্রেসিডেন্ট আইয়ু খান বন্যার জন্য এত সাহায্য-টাহায্য বলে শেষদিকে খেলাধুলা সংস্কৃতিসহ হেডলাইন বললো। বললো, আজ বিশ্ব শিশু দিবস। এই উপলক্ষ্যে ৭ জন শিশুকে পুরস্কৃত ঘোষণা করা হয়েছে।
আমার তো আর খাওয়া হয় না। তারপর এলো বিশেষ বিশেষ খবর।
দেখি খাওয়া দাওয়া শেষে সবাই চলে গেছে। কারোরই আর এদিকে ইন্টারেস্ট নাই। আমি একা বসে আছি। আব্বা তখন পাজামা পাঞ্জাবি পড়ছেন, বাইরে যাবেন। আর মা বলছেন, ‘এই, এই প্লেটটা দে, প্রত্যেকে খাওয়া শেষ কর। তাড়াতাড়ি শেষ কর।’ ভয়ে কিছু বলি না, আবার লজ্জা। ফট করে বললো আজ বিশ্ব শিশুদিবস। বিশেষ বিশেষ অবদানের জন্য ক-বিভাগে পূর্ব পাকিস্তান থেকে চিত্রকলায় শাহাবুদ্দিন আহমেদ….
-আমি এইটা শুনার পর প্লেট ট্লেট ফেলে টেবিলের উপরে উঠে দাড়িয়েছি–‘আমি, আমি, আমি।’ আসলে আমি ছাড়া আর কেউ শুনে নাই খবরটা।
প্লেট-ট্লেট পড়ে গেছে। কী হল! কী হল? আমি, আমি পেয়েছি, আমি পেয়েছি। আশেপাশে দুটা বাড়ি ছিল, সবাই ছুটে এলো। লাফালাফি করে প্লেট ভেঙেছি। ভেঙে আওয়াজ, হইচই হয়েছে। এরমধ্যে তো পার হয়ে গেছে খবর। প্রতিবেশি ছিল দুইজন। তখন তো টিনের ঘর। বেশি আওয়াজ হয় না। জোরে আওয়াজ হলে না হয় শোনা যেত।
-কী হল? কী হল? মারামারি নাকি? হইচই।
-দেখ তো, ছেলেটা পাগল হয়ে গেছে। এমনিতে তো মার খাই প্রতিদিন। দেখ তো কী বলে– ও পাইছে ও পাইছে।
ঠান্ডা হওয়ার পর আমি বলছি – আমি পেয়েছি আমার নাম বলেছে। ওই যে বললাম, সবাই ঠাট্টা করা আরম্ভ করে দিলো।
আমার তখন সন্দেহ ঢুকে গেল-অন্য কেউ হতে পারে। সন্দেহ ডুকে গেল আমার মধ্যে। আমি না ঝিম মেরে গেলাম। অন্যরা বললো–না, তোমার নাম তো আমরা শুনি নাই। আসলে কেউ খেয়ালই করে নাই। আচ্ছা এরপরে কী হলো? ধর, আটটার খবর হতে হতে সাড়ে আটটা, এসব হতে হতে পোনে নয়টা বেজে গেছে। তখন না এইসব বাড়ি-ঘর ছিল, রাস্তা দিয়ে বাস গেলে, রিকশা গেলে বাড়ি থেকে আওয়াজ শোনা যেত। আমার না মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। ‘মা, মা, তুমি জানো না, হান্নান ভাই আমাকে বলছিল খবরের কথা।’ এসবের মধ্যে আবার সবাই জড়ো হয়- মা তখন বললো, ‘না, এত পাগল হবে না ও।’ দেখি যে, হান্নান রিকশা নিয়ে দৌড়ে আসছে। (খবর শুনেছে আর কি-রাজু)। আসলে অফিসে আসছে, রাত্রের বেলা টেলিগ্রাম আসছে, তখন তো টেলিগ্রাম। টেলিগ্রাম আসছে রাতের বেলা, আর্ট কলেজে। হান্নান পেয়েছে সেই টেলিগ্রাম। সে সকালে গেছে অফিসে, গিয়ে সাড়ে আটটায় অফিস খুলেছে। খুলে দেখে যে টেলিগ্রাম। এই টেলিগ্রাম পেয়ে খুশির ঠেলায় হান্নান রিকশা ভাড়া না দিয়েই দৌড়। কারণ আমরা জড়ো হয়েছি–সেো সে দূর থেকে দেখেছে। আমি তাকে দেখেই বললাম, ‘ওই যে হান্নান ভাই আসছে।’ মা তো অবাক, হ্যাঁ, সত্যি সত্যি আমার পোলা! বাবা যে কি আদর করা শুরু করলো, সবাই চুমাচুমি, “আমার পুলায় পাইছে, আমার পুলায় পাইছে।” তখন ওই পুরস্কার পাওয়া মানে মিরাকল আরকি।
আচ্ছা! শান্তি পাইলাম আর কি।
ভাইয়েরা আমাকে কোলে নিল। বাহ বা!
বাবা জানতোই না আমি এগুলো করি। মা-ই না কেবল জানে। এইসব করার পর, আতাউর রহমান খান, আমার এখনো মনে আছে -ওই যে আওয়ামী লীগের ছিল -পরে বিরুদ্ধে চলে গেল, আতাউর রহমান ছিল না নাম? (জ্বী-রাজু)।
উনি আওয়ামী লীগ করেন, লিডার। ৭ নাম্বারে, ওই যে ‘চিত্রক গ্যালারি,’ ওই রোডে বাসা। বাবা দৌড়ে গিয়ে ওনাকে নিয়া আসছেন। ‘আরে, আমার ছেলে পেয়েছে।’
আতাউর রহমান এসে চুমাটুমা দিল, দেখলাম। ওই দিন থেকে আমার দরজাগুলি খুলে গেল। আই ওয়াজ এ্যাকসেপ্টেড।
রাজু: এবং আস্থা অর্জন করতে পারলেন যে আপনি পেরেছেন। সেই ছবিটার বিষয় কী ছিল?
শাহাবুদ্দিন: নৌকা, বুড়িগঙ্গা নদী। ওখানে শফিকুল আমিন ছিলেন প্রিন্সিপাল, উনারা মিলে এটা পাঠিয়েছিলেন। অন্যদেরও পাঠিয়েছে। তবে ওইখান থেকে আমার যে ছবি তা উনারা সিলেক্ট করে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু ওই ছবি আর জীবনে দেখি নাই। গেছি মেডেল নিতে আইয়ুব খানের। (করাচিতে গিয়ে ছিলেন?-রাজু)। হ্যাঁ হ্যাঁ, সেই করাচিতে মেডেলের ছবি তো আছে, সব আছে।
রাজু: কিন্তু আঁকা ওই ছবিটা আপনার কাছে নাই। আবার ওইটা ফেরতও পেলেন না।
শাহাবুদ্দিন: আজ অবধি আই ডোন্ট নো, নাথিং। এখন তো প্রশ্নই ওঠে না। যুদ্ধ না হলে হয়তো পেতাম। হি হি হি। কিন্তু, আশ্চর্য ব্যাপার দেখ, ক্লাসের দিন যে দিন যেতাম না, রবিবার, সকালে আসতাম কলেজে, সন্ধ্যার সময় ঘরে ঢুকতাম।
-তখনকার সময়ে যারা, যেমন আলভী (আবুল বারাক আলভী) উনারা যারা আউটডোরে আঁকতেন, সেকেন্ড ইয়ারে পড়েন। তারপরে ধরো, ‘আপরাজেয় বাংলা’র খালেদ ভাই, পাগলা খালেদ, এদের কাজগুলি দেখতাম। যার ফলে, আমরা যখন আর্ট কলেজে ঢুকি, অন্যরা কিছুই দেখেনি, আমি অনেক এ্যাডভান্সড ছিলাম, বুঝেছ। সবাই থতমত খেয়ে যেত। কী করে হলো?
রাজু: আপনি বললেন যে, আপনি অন্যদের চেয়ে এ্যাডভান্সড ছিলেন। আপনি তো অন্যদের চিত্রকলাও দেখতেন ওই বয়সে, যারা আর্টিস্ট ছিলেন।
শাহাবুদ্দিন: অফ কোর্স অফ কোর্স। ওদের কারণেই তো সেটা হয়েছে। তখন তো এত সুবিধা ছিল না, কিন্তু ওরা যে ওয়াটার কালারটা করতো, কেমনে ব্রাশ টানতো, সেসব দেখে হজম করতাম।
এগুলি অলরেডি আমার মধ্যে ঢুকে গেছে। অন্যরা হয়তো একবারই দেখছে বা দেখার সুযোগই পায় নাই। আমি যদি এগুলা না দেখতাম? (আপনার কাজ হয়তো অন্যরকম হতো-রাজু)। হ্যাঁ, অন্য রকম হতো। তবে কাজগুলো আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। পরবর্তীকালে আমি যখন আর্ট কলেজে ঢুকলাম, তখন অতি সহজ হয়ে গেল আমার জন্য। ঢুকতেই শিক্ষকরা থতমত হয়ে গেল–অনেক ট্যালেন্টেড তো। তবে স্বপ্ন কিন্তু আমার জয়নুল আবেদিন হবই। উনার যে কোনো ছবি দেখলেই আমি মুখস্ত করতাম। কাজে কাজেই তার গতিটা আমার পছন্দ আগাগোড়াই।



রাজু: জয়নুল আবেদিনকে কী কারণে আপনি এতো বেশি পছন্দ করতেন?
শাহাবুদ্দিন: কারণ ওই যে ষাঁড়…। যেমন ধর, কেন ওনার উপর লেখা তোমার পছন্দ? উনাকে নিশ্চয়ই তোমার ভাল লাগে, লাগার কারণ থাকে তো, তাই না? (তা তো নিশ্চয়ই-রাজু)। আমার কাছে তার যা ভালো লাগতো, ওই যে ষাঁড় বললাম না, নয়তো তার গতি, যে কোনো কারণেই হোক। যেমন ষাঁড়, যেমন গুণ টানছে, ঠেলা গাড়ি ঠেলছে-এইগুলি আগাগোড়াই হঠাৎ করে কিন্তু হয় নাই। এগুলো আমার ভাল লাগাতো। অন্যদের কাজ অতটা ভালো লাগতো না। তাই কাজে কাজেই তার ছবি মুখস্ত করতাম। কত এঁকেছি, কিন্তু উনার সাথে দেখা হলো না আর। শুনছি উনি নাকি গুরু। একদিন উনি আমাকে ডাকবেন এই স্বপ্ন। এবং হলোও তাই।
রাজু: পরেতো দেখা হয়েছে। সেটা কত সালে?
শাহাবুদ্দিন: তার মধ্যে তো অনেক আন্দোলন হয়ে গেল। এই যে আমি সিক্সিটি এইটে ডুকলাম, সিক্সটি নাইনে গণঅভুত্থান। সেভেনটি ওয়ানে তো যুদ্ধ আরম্ভ হয়ে গেল। সেভেনটি ওয়ানে তো চলেই গেলাম। সেই যাওয়াটা, কেন গেলাম?
এটা কিন্তু, একটা হলো ডেসটিনি। আসলে ডেসটিনি কিন্তু কঠিন জিনিস।
রাজু: কী রকম?
শাহাবুদ্দিন: এক হলো সবাই চলে গেছে। ২৫ শে মার্চ আমরা এখানে, কলাবাগানে। ২৬ শে মার্চ, পরে ২৭ শে মার্চ সকালবেলা কারফিউ উইথড্র হইল। আর ‘পাকিস্তান আর্মি জিন্দাবাদ’ কি সব উর্দু-মুর্দু বললো। মাইকে এনাউন্স করলো। আবার ইংলিশেও বললো ‘কারফিউ হ্যাভ টু আওয়ার্স’, এগারটা পর্যন্ত আছে। ‘বিলিভ ইন পাকিস্তান জিন্দাবাদ’, ‘অল ইন্ডিয়ান মারডালো’–এইসব শুনলাম। হ্যাঁ কারফিউ উইথড্রো হলো। ‘কারফিউ’ শব্দটা প্রথম বাঙালিদের কানে এলো আরকি।
আর আমি দেখি যে, নয়টায় কারফিউ নাই- সব দেখি দৌড়াদৌড়ি করছে। এদিকে সমানে শেল পড়ছে স্টাফ কোয়াটারের কয়েকটা টিনের ঘরে। টিনে পড়লে তো আওয়াজ ভীষণ, সবাই দৌড়াচ্ছে, মনে হয় কেয়ামত। এতো বাড়ি-ঘর ছিল না বলেই না মানুষ মরছে কম। তাও আমি একা একা গ্রিন রোডে গিয়া দেখি আট-নয়টা রিকশা সব ছ্যাতরা-ভ্যাতরা হয়ে পড়ে আছে। এই প্রথম দেখলাম ডেড বডি। আবার সেই চিত্রক গ্যালারির ওইদিকে হেটে হেটে মিরপুর রোডের দিকে এলাম। ওইদিকে ডেড বডি দেখি নাই, আবার মিরপুর রোডের দিকে এসে দেখি পড়ে আছে ডেড বডি। জাল দিয়া ঢাকা কিছু ট্রাকে সৈন্যরা, একটা দুইটা ট্রাক রাস্তায় পড়ে থাকা লাশগুলো সরিয়ে নিচ্ছে। দূর থেকে দেখি সব দৌড়াদৌড়ি, বস্তা-টস্তা নিয়া একবার এই দিকে যায় একবার ওইদিকে যায়।
আমি একা একা এগুলি দেখছি, কতজন মরলো। এসব করে এলাম লেকে, ধানমন্ডি লেকে। দেখি লেকে অনেকগুলি ডেড বডি ভাসছে। মোড়ে মোড়ে আর্মি। কিছু বলে না। এই করতে করতে সোয়া দশটা বেজে গেছে। ৩২ নম্বর রোডের দিকে যাবো, দেখি উনার (শেখ মুজিবুর রহমান) বাড়িতে কি হলো। লেক সার্কাসের কাছে যেই গেছি, দেখি দশ বারোটা ট্রাক। ভয়ে আর ওই দিকে গেলাম না। কোনো বাঙালি আর যায় না ওই দিক। এই দিক ওই দিক করে প্রায় পোনে এগারটার দিকে বাসায় ফিরেছি। এসে দেখি দুই রিকশায় বাবা-মা, ভাইরা সবাই গাট্টি বোস্তা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আমার জন্য।
আমাকে দেখে বললো তাড়াতাড়ি আয়। দেখি সবাই গ্রামে যাচ্ছে। আমি বলি যে, আমি যাবো না, আপনারা যান। বাবা আমার গালে কসে দিল এক থাপ্পর : ‘বদমাইশ কোথাকার, সারাটা জীবন জ্বালাইলি।’ বলে ‘সময় নাই, এখন সব মারা যাবে, কারণ কারফিউ উইড্রো শেষ।’
‘ফালাও, চলো, চলো সব।’
মা তখন ঢিলা দিয়ে চাবি দিল আর বললো, ‘বাবা, কিছু ডাল আছে আর আলু আছে।’ কাঁদতে কাঁদতে বললো, ‘নে চাবি।’
আমাদের তখন বেড়ার ঘর, অর্ধেক ইট বিছানো। পিছনে রান্নাঘর, পুড়াটাই বেড়ার। আমি পেছন দিয়ে গিয়ে বেড়া ভাঙলাম। সামনে তালা মারা, বাইরে থেকে দেখে মনে হয় কেউ নাই। বেড়ার ফাঁক দিয়া ঢুকলাম, বেড়া আবার ঠিকঠাক করে ভাবলাম, যা শালা, আঁকুম ছবি। এই তো টাইম আঁকার। নিরবে আঁকবো সব। কী আঁকবো?
নজরুল বিদ্রোহ করেছিল। এই আইডিয়া ঢুকলো আমার ভিতরে, বিদ্রোহের ছবি আঁকবো। আমি শুনেছি, ওই আর্ট কলেজের লোকরা বলতো গুয়ের্নিকা ছবির কথা, আরও কী কী যেন। যারা পচা ছবি আঁকে তারা এসব বেশি জানে। ওদের কাছে শুনেছি এসব, রাশিয়ান মুভমেন্ট -এসব কী কী বলে।
ধরো, এগারোটা-বারোটা বাজলো। সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মিরপুর রোড বেশ দূর, সৈন্যরা ঠক ঠক ঠক ঠক করে ডিউটি দেয় যে, ওই আওয়াজ পাওয়া যায়। তারপর উ-উ-উ-উ করে একটা জিপ যায়–এরকম।
আমার মধ্যে তখন আরম্ভ হলো ভয়। বারোটা, একটা। আলু-মালু দিয়ে রান্না করলাম কিছু। এই আরম্ভ হলো রান্না শিখা। দিন গেল, রাত তো হলো। আর তো ঘুম হয় না। একা, আর তো কেউ নেই। এই করতে করতে দুই দিন গেল, ছবি তো আর আঁকা হয় না, যার জন্য রয়ে গেলাম। কীসের নজরুল-মজরুল, কিছুই হলো না। (হা হা হা-রাজু)। এইভাবে তিন দিন।
একটা রেডিও, যেই রেডিওতে পুরস্কার পাওয়ার খবর শুনেছিলাম, ওইটা যে তাড়াহুড়া করতে গিয়ে পড়ে গেছিল, ওটা ঠিকঠাক করলাম। ঠিকঠাক করে শুনি আরে বাজে তো! রেডিওতে তিন দিন কলকাতা শুনলাম–বাংলাদেশে যুদ্ধ চলছে; “আমার সোনার বাংলা” বাজছে। আমি বলি-ওয়াও! কী আকর্ষণ! যুদ্ধ হচ্ছে! কিসের যুদ্ধ হচ্ছে তা তো জানি না। ‘মুক্তিযুদ্ধের এই দিনে আমাদের নেতা, প্রিয় নেতা’- দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘আমাদের মাঝে বেঁচে আছে, উনার ডাকে সারা বাংলা জেগে উঠেছে।’
আমার ভিতরে আগুন জ্বলছে। এইভাবে তিন দিন কাটালাম। সারা রাত ঘুমাই না, সকাল হলে ঘুমাই। আলো, রৌদ্র। রাত হলে ভয় ঢুকে যায়। ওরকম করে ধরো সাতাশ, আটাশ, উনত্রিশ, এপ্রিলের ৩ তারিখে ডিসিশন নিয়েছিলাম। কিন্তু এখন বের হতে সাহস পাই না। এত ভয় ঢুকে গেছে। এখন কী করি? তারপরও সন্ধ্যার সময় পিছনের বেড়া ফাঁক করে–পিছনে আবার একটা রেশন দোকানের মালিক ছিল, আওয়ামী লীগ করতো বাবার সাথে–গেলাম ওদের বাড়িতে। ধীরে ধীরে নিঃশব্দে গেলাম। বলাতো যায় না, কে কী বলে দেয়। নক করলাম ভয়ে ভয়ে। দেখি সব চুপচাপ। শব্দ শুনে বললো, ‘অ্যা, কে? কে?’
ফাঁক দিয়ে দেখলো আমি। ‘আরে তুমি!পাগল নাকি। যুবক, এই বয়সে, কী ব্যাপার?’ আমি বলি, ‘সবাই চলে গেছে’, এই বলে আমি, হাউমাউ করে কান্নাকাটি করলাম। আমি একা, ছবি আঁকবো বলে রয়ে গেছি। তারা খাওয়ালো আমাকে আগে। বললো,খাও নাই? না, তিনদিন খাই নাই। খেয়েছিলাম তো ওই আমার করা আলু ভর্তা। আসলে শিখি নাইতো, ভাবি সহজ আসলে সহজ না। হা হা হা।
প্যাট ভরে খেয়ে টেয়ে একটু শান্তি পেলাম। মানুষ পাওয়াতে একটু সাহস বাড়লো। এরপর তারা বললো, বাবা চলে যাও, রেশন সপের আর্মিরা আসে, ওরা খোঁজ নেয়, কতজন ছিল, কে কোথায় গেছে–এইসব আর কি। আমি বললাম,‘ ঠিক আছে আমি কালকেই চলে যাবো।’ ওনারা বললো গ্রিন রোডের ওই ফাঁক-ফুক দিয়ে তেজগাঁ রেলস্টেশনের ওই দিক দিয়ে যাওয়া যায়। এসব জেনে নিলাম। কারণ নরসিংদী ভৈরব রায়পুরা যেতে হলে তেজগাঁও ওই লাইন দিয়ে যেতে হয়। ঘুমাতে ঘুমাতে দেরি, তাই উঠতে দশটা বেজে গেল। হঠাৎ শুনি-ঠক-ঠক, ঠক-ঠক, নক। সব তো বন্ধ। কেউ বুঝতে পারবে না যে ভেতরে কেউ আছে। ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে দেখি হাসান। হাসান আমাদের বাসার সামনে স্টাফ কোয়ার্টারের পেছনে থাকে, মুক্তিযোদ্ধা, মারা গেল গতমাসে।
-হাসান।
-শাহাবুদ্দিন ভাই!
আমার অনেক ছোট, ধরো চার বছরের ছোট।
-আরে হাসান!
-খোলেন, দরজা খোলেন।
-দরজা খুলে দেখি ওর হাতে চারটা ঠোঙ্গা। আমি বলি তুমি পিছন দিয়ে আসো। ও পিছন দিয়ে এলো।
-আরে আরে, তুমি জানো কিভাবে আমি এখানে? বলে, ‘আমি আন্দাজ করছি এই বাড়িতে কেউ না কেউ থাকবে। দেখেন কী নিয়া আসছি।’
দেখি যে ঠোঙ্গায় সাবানের মতো কী যেন, বুঝি না। বলে, এক্সপ্লোসিভ, বোম।
-বোম! হ্যাঁ। বলে কি!
বলে, আমরা ওইখান থেকে ট্রেনিং নিয়া আসছি, এইটাই দিছে, এই প্রথম হিট, এপ্রিলের ৩ তারিখ। জাস্ট পেনিক তৈরি করার জন্য আমরা এটা করলাম। যাক ওর কাছ থেকে কিছু শিখলাম, তারপরও সাহস পাই না। ওইসব মেটারিয়াল দিয়ে বোমা বানিয়ে নিয়ে আসছে ও । কোথায় মারা হবে? জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কিভাবে গেলা ট্রেনিং নিতে?
এই এই ভাবে ওই পাড়ে গেছি, বললো, জাস্ট বিগিনিং তো তাই এইগুলি দিছে যারা গেছে। আমি বললাম-ও, আচ্ছা। ওই প্রথম, ওইদিনই সন্ধ্যায় আরম্ভ হলো। লেটস গো। প্রথম মারি দ্বীন মুহাম্মদের বাড়িতে। (বোমা মারলেন?-রাজু)
হ্যাঁ, দ্বীন মুহাম্মদের নাম শুনেছো তো?
রাজু: দ্বীন মুহাম্মদ নিয়ে একটু বলেন তো। কোন দ্বীন মুহাম্মদ?
শাহাবুদ্দিন: দ্বীন মুহাম্মদ, বাংলা একাডেমির ডিজি ছিলেন।
রাজু: ও, আচ্ছা, আচ্ছা। কাজী দ্বীন মুহাম্মদ। ওনার বাড়িতে বোমা মারলেন।
শাহাবুদ্দিন: হে হে হে। এখন অনেকের নাম বলা উচিত না, কারণ ওরা রিভেঞ্জ নিয়ে নিবে। ধরো, ওদের আত্মীয়-স্বজন আছে।
রাজু: না না, এখন আপনার উপর রিভেঞ্জ নেয়ার সাহস কে করবে!
শাহাবুদ্দিন: তো পরের দিন…
রাজু: দ্বীন মুহাম্মদের বাড়ি মারলেন এই কারণে যে সে স্বাধীনতা-বিরোধী বক্তৃতা দিছিল?
শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ, বক্তৃতা দিয়েছিল এবং স্ট্রংলি। সে বলছিল, আমাদের মুসলমানের সংস্কৃতি–কী সব হাবিজাবি– ধ্বংসের মুখে নিয়ে যাচ্ছে তারা। হা হা হা। তারপর আমেরিকান কালচারাল সেন্টার ছিল ধানমন্ডিতে, মারলাম ওইখানে। আমি ডিটেইলসে পরে যাবো। আচ্ছা, তারপর সাংহাই হোটেলে মারলাম। এইটা যখন হয় তখনতো দৌড়াদৌড়ি বাঁচাও বাঁচাও। আমরাও বাঁচাও বাঁচাও বললাম। এর মাঝে চিত্রা সিনহার নাম শুনেছো? (জ্বী, জ্বী-রাজু) নায়িকা, কাজী জহির ছিল ডাইরেক্টর। তার নায়িকা। তখন ওই যে লাল ইট, উনারা ওই বাড়িতে ভাড়া থাকতো। তখন টিনের ঘর। আমাদের ধারণা ছিল, আমরা মানে দু’জন, আমি আর হাসান–ধারণা ছিল উনি নায়িকা, তার ওপর হলো হিন্দু, নিশ্চিতভাবেই তারা আমাদের জয় বাংলার লোক। তখন এসব বোমা হামলা বা মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ প্রথম শুরু হয়েছে। উনি রেডিও শোনেন মোমবাতিটাতি জ্বালিয়ে, পর্দা দিয়ে, যাতে বাইরে থেকে লোকজন বোঝে ভেতরে কেউ থাকে না।



আমরা টিনের ঘরের পাশে গিয়া আলাপ করি, বলি মুক্তিযোদ্ধারা এসেছেন। জানতাম উনি ঠিকই শুনেছেন।
উনি দরজা খুলে দিলেন। খুলে বলেন, ‘এই, এই, তোমারা আমাদের মেরে ফেলবে। বাইরে থাকো কেন, ভেতরে ঢোকো। মুক্তিযোদ্ধারা আঘাত করা শুরু করেছে। আমরার ভেতরে ঢুকে বললাম, ‘চাচা স্লালামালাইকুম।’ আমরা বলে দিছি যে আমরাই আঘাত করেছি, জোশের ঠেলায় বলে দিলাম। তারা এই কথা শুনে তো ভয় পেযে গেল। কী সর্বনাশ! সর্বনাশ হয়ে যাবে! উনি টাকা দিল, দেড়শ টাকা। ওই পাড়ে চলে যাও, কার্ফু নেই।
তখনকার সময় দেড়শ টাকা, ক্যান ইউ ইমাজিন?
এরপর আমরা খুঁজতে শুরু করলাম কাকে কাকে আমাদের দলে নেবো।
আমার এক বন্ধু ছিল আজাদ হাফিজ। গণসংগীত গাইতো, ও মারা গেলে গতমাসে। আজাদ হাফিজ, নাম শুনেছো?
রাজু: আজাদ হাফিজ, না মনে পড়ছে না।
শাহাবুদ্দিন: মাজাহারুল ইসলাম আছিলেন না, আর্কিটেক্ট, (হ্যাঁ হ্যাঁ, মাজাহারুল ইসলাম–রাজু) তার মেয়েকে বিয়ে করেছিল। আজাদ ছোটবেলা থেকেই স্কুলের ন্যাঙটা বন্ধু আমার। সেও কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা। (আচ্ছা–রাজু) আজাদকে বললাম, ওকে, চল ওই পাড়ে। আমি ওকে নিয়ে গেলাম আমাদের বাড়িতে। আমাদের বাড়ি মেঘনা নদীর পাড়ে গিয়ে দেখি কি মাইকে গান বাজছে “জয়, জয়, হবে হবেই জয়”। আমি দেখি মায়ের ছল ছল আঁখি। আমাকে দেখে তো মায় বেহেস্ত পেয়ে গেছে। ছেলে বেঁচে আছে, কতদিন পর দেখলো। ২৭শে মার্চে গেল তারা, আমি গেলাম ১৫ এপ্রিল। তারা জানতো না আমি কোথায় আছি, বেঁচে আছি কিনা। তো গিয়া দেখি আমাদের বাড়িতে শরণার্থী ঘাঁটিতে হাজার হাজার শরণার্থী। আমার চাচারা নৌকা নিয়া যায় ওপাড়ে। আমার বাবা ছিলেন তখন আগরতলা দূর্গাপুরের আওয়ামী লীগের অফিসের হেড। ওখান থেকে আবার সন্ধ্যার সময় একে ওকে পাঠিয়ে দেয়, এক একজনের মাধ্যমে ম্যাসেজ বিনিময় হচ্ছে। এক একজনকে এক একটা দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। আরে, এ যে দেখছি আরেক দেশ! স্বাধীন। দুই দিন দুধ-টুধ খেলাম, তিনদিনের দিন দেখি আর্মি রেইড দিছে। ক্যামনে জানি জেনে গেছে। গানবোট দিয়ে দেখি শালারা ঘেরাও করছে। মা-ভাইদের নিয়া, ধানক্ষেতে গিয়ে আমরা লুকিয়ে পরলাম। আর্মিরা কিন্তু আবার ভয় পেতো। বেশি দিন থাকতো না। ভয়ে সন্ধ্যা হলেই চলে যেত। আবার এসে এটা সেটা করতো।
আমি বলি লেটস গো। আগরতলায় এলাম। আমার চাচা এলেন আগরতলায়। তখন কতগুলি ঘটনা–সকলেরই হয়েছে–কিন্তু আমারটা না কেমন জানি। আমি আর আজাদ একটা ব্যাগ নিলাম।
তো গিয়ে দেখি জয় বাংলা অফিস। হাজার হাজার মানুষ। ভীড়-ভাট্টা। এইটা আগরতলা। ঠেলেঠুলে ঢুকলাম। ঢুকে দেখি কেউ সাহায্য চাচ্ছে, সার্টিফিকেট চায়, ওই শরণার্থী ক্যাম্পের জন্য। আমি শেষ পর্যন্ত গিয়া পৌঁছলাম, পরিচয় দিলাম তাইবুদ্দিনের ছেলে আমি, শাহাবুদ্দিন।
সেখানের কর্মকর্তা টেনেটুনে ঢুকালো আরকি, আমার বন্ধুসহ। বললাম, আমার বাবা কই? যে বাড়িতে ছিল সেই রাজবাড়ির ছাদে ঘুমাচ্ছেন। তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। চারিদিকে মানুষ আর মানুষ। আশেপাশে কোন রুম খালি নাই। দু’তলায় উঠে গিয়ে দেখি হারমোনিয়াম….
রাজু: দেশাত্মকবোধক গান চলতেছে?
শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ। গানের রিহার্সেল হচ্ছে। দেখি দুইজন গান গাচ্ছেন, তাদেরকে চিনি না তখন। সব ঠেলে ঠুলে উপরে গেলাম। আমার যে বন্ধু ওতো গান গায় আগে থেকেই। ওরা বংশপরম্পরায় গান গায়। ও বলে ওই যে গান গায় আবদুল জাব্বার। আর উনি হলেন আপেল, আপেল মাহমুদ। তাদের দুইজনকেই আমি চিনি না। উপরে গিয়া দেখি বিশ জনের মতো ঘুমাচ্ছেন।
আব্বা কই? খুঁজি, আব্বা কই? দেখি যে চার্জ (ইনচার্জ?-রাজু)। হ্যাঁ, দেখি যে গায়ে একটা গেন্জি, মাথার তলে গামছা দিয়া ঘুমাচ্ছেন। আ হা, মাই গড। অামার চোখে পানি চলে এলো।
আজাদকে বললাম, আব্বা কী কষ্ট করছে এই বয়সে আর আমরা ঘুরে বেড়াই। লেটস গো। আমরা এত টায়ার্ড, খেতে পাইনা, কিছু নাই, যাইহোক, আমরা গিয়ে চিড়া কিনলাম। এক পয়সার চিড়া। আর একটা কলা এমনি মাগনা দিয়ে দিল। চিড়া কলা খেয়ে পানি পুনি খেয়ে ওইখানেই এক ভাঙ্গা গাড়ির নিচে গিয়ে ঘুমিয়ে পরলাম। আসলে প্রস্রাবের গন্ধে আমরা ঘুমাতেই পারিনি। ঘুমানোর পর ডিসিশন নিলাম কলকাতা যাব।
এর মাঝে বাবাকে খবর দেয়া হয়েছে আমরা এসেছি। আব্বা তো খুঁজছেন সবাইকে নিয়ে, কোথায় গেল আমার পাগলা ছেলেটা। সাবধান, ও কিন্তু ছবি আঁকে, ও কিন্তু পাগল আছে। সবাই খুঁজে বের করলো আমাকে। কে জানি বললো আপনের বাবায় তো কান্নাকাটি করছে।
আব্বার কাছে গেলাম। আমি বললাম, আমি যুদ্ধের অবস্থা দেখেছি। আমি কলকাতায় যাবো, ছবি আঁকবো।
হ্যাঁ, আমি তবে চিঠি লিখে দেই। ওইখানে মনসুর ভাই আছে। (ক্যাপ্টেন আবুল মনসুর আহমদ-রাজু)। হ্যাঁ। খন্দকার মোশতাক আছে। অর্থাৎ সব বন্ধুবান্ধব আর কি। ইউসুফ আলী(স্বাধীনতার পর শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন) আছে। তখনও সব তত ইমপর্টেন্ট না। আর তাজউদ্দিন ভাই আছেন। তোর বিপদ হলে এইটা তাদের দিবি। চিঠি দিলাম, যা আর্ট কলেজে ভর্তি হ।
প্রথমে ট্রাকে তারপর ট্রেনে। চারদিন লাগে যেতে। গোহাটি টোহাটি ঘুরে চারদিনই লাগে। ট্রেনে ওঠার আগে রব ভাইয়ের সাথে দেখা। দেখে সালাম দিলাম।
– আরে আরে আরে, আসেন আসেন আসেন।
– রব ভাই ছোট করে লিলে দেন, আমি ছাত্র লীগের কর্মী।
তিনি লিখে দিলেন। এইটাই হেল্প করেছে আমাকে। চার দিন ট্রেনে, সব ফ্রি।
রাজু: আপনাদের জন্য ফ্রি ছিল নাকি সবার জন্য?
শাহাবুদ্দিন: শরণার্থীদের জন্য। আসলে এই যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ডকুমেন্টারি দেখি না? একজাক্টলি সেইম। খালি ল্যান্ডস্কেপটা এক না। মানুষের চেহারাটা এক না। (কিন্তু ঘটনা প্রায় একই-রাজু)। চারদিন দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমরা তো ইয়ং, বুড়ারা বসে আছে। খুঁজি পরিচিত কেউ আছে কিনা। দেখি যে তিনটা ছেলে, মনে হয় ঢাকারই হবে, ওরাও দেখে আমাদের। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করি কোথায় যান আপনারা। বলে যে-ঢাকায় থাকি। কোথায়?
– পুরানা পল্টন।
– অ্যাঁ, আপনারা?
– সেগুনবাগিচা। আর আপনি?
– কলাবাগান আমি। আজাদও কলাবাগান। তো একটা খাতির হল। এই জমলো কথাবার্তা। কে উনারা? একজন হলো বাচ্চু (নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু), আর অন্যজন হলো আসাদ–ওই যে নায়ক। (রাইসুল ইসলাম আসাদ?– রাজু)। হ্যাঁ, ওরা। আর একজন আছে, তোমরা চিনবা না, এখন ব্যবসা করে। ওদের বন্ধু। এদের সাথে গল্পগুজব করতে করতে চারদিনে এলাম। এর মাঝে খোচ-পাচরা, আমাশা ধরে বসেছে। এসে আমি আর আজাদ, সকাল আটটার সময় আর্ট কলেজে গেলাম। গিয়ে দেখি গেট বন্ধ। কিন্তু গেটের সামনে শরণার্থীরা লাইন ধরে বসে আছে। কলকাতায় আরো বেশি। “জয় বাংলা জয় বাংলা” চারিদিকে এই শ্লোগান।
গেটে নক করতেই দেখি দাড়োয়ান ছুটে আসছে। জয় বাংলা, আপনারা কি এখনি আসছেন? কী খবর ওই পাড়ে? (সব নতুন নতুন খবর চাই, তাইতো?-রাজু)। হ্যাঁ হ্যাঁ। আমরা যতদূর জানি বললাম। তারা খুব এনার্জি পেল। আমি বললাম-আমি আর্ট কলেজের ছাত্র।
– অ্যা! আসেন আসেন। প্রিন্সিপাল সাহেব আছেন, কলেজ কিন্তু ছুটি। চিন্তামনি কর বাবু প্রিন্সিপাল। নাম শুনেছি আগে। দেখতে কেমন? এই করতে করতে নয়টা বাজছে। এভাবে আরো দশ-বিশ মিনিট। দেখি যে তিনি এসছেন।
– এসে তিনি আমাদের দেখলেন। বসুন বসুন বসুন। মিষ্টি দিল আর চা দিলো। খেলাম। আর এত খোঁচ-পাচড়া হয়েছে যে স্থির হলে বসতো পারছিলাম না। উনি বললেন কী খবর?
আমার বন্ধু বলছে, তবে বেশি সাহস পায় না। আমি বললাম-দাদা, আমার বন্ধু গান গায় আর আমি তো আর্ট কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।
– ও! তোমাদের আর্ট কলেজে কে কে আছে বলতো? আমাদের সময়ের কাউকেই চিনলো না, পুরানাদের চিনে। আমি বললাম-দাদা, আমার বাবা হচ্ছেন ওমুক। তিনি বললেন, ও, আপনি ছবি আঁকবেন? কিন্তু কী করবো দেখুন না, সব বন্ধ করে দিয়েছি। বাংলাদেশে যুদ্ধ হচ্ছে, আমরা কি বসে থাকবো? বন্ধ করে দিয়েছি। ছবি আঁকার এখন তো সময় নয়। যান, ধর্মতলায় যান। ধর্মতলায় শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী সমিতি করা হয়েছে। ওইখানে কামরুল হাসান আছে। মুস্তফা মনোয়ার আছে, আরো আছে। শঙ্খ ঘোষদা আছে (শঙ্খ ঘোষ?-রাজু)। শঙ্খ ঘোষ।
রাজু: ও, শঙ্খ ঘোষও ছিলেন?
শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ। আরো বললো, সত্যজিৎ রায় বাবু আছে। তারাপদ বাবু আছে-এসব কি কি যেন বললো। যাক, জেনে নিলাম। আঁকাআঁকি হলো না। মিষ্টিটিষ্টি খেয়ে নমস্কার জানিয়ে বিদায় নিয়ে এলাম। তো গেলাম ধর্মতলায়। গিয়ে দেখি ওরে বাপরে, এ যে আরেক জগৎ! এই দিনাজপুর, রাজশাহীর বুদ্ধিজীবী–কাউকেই চিনি না। হঠাৎ দেখি কামরুল হাসান আর মুস্তাফা মনোয়ার। কামরুল হাসানকে দেখে তো আমি উজ্জীবিত। আমি তো তার ছাত্র, উনি তো আমাকে চিনেন। বললাম-স্লামালাইকুম স্যার। স্যার খুব আপনভাবে নিলেন। বললাম-স্যার কিছু মনে না করলে যদি চার আনা পয়সা দেন, খোচ-পাঁচড়ার ওষুধপত্র লাগবে।
– আমি কোঁথা থেকে পাঁবো চাঁর আনা। আমি নিজেই তো হাঁত পাঁতি।
– চলো চলো, তোমরা নাম লিখিয়েছো? আমি বলি যে না।
– কবে এলে?
দেখি যে ব্যানার্জি বাবু হলেন সভাপতি।
রাজু: কোন ব্যানার্জি?
শাহাবুদ্দিন: কী যেন, ওই যে, সাহিত্যিক, আছেন না ? (হ্যাঁ হ্যাঁ–রাজু)।
রাজু: তারাশঙ্করও তো ছিলেন বোধ হয় এসবের মধ্যে?
শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ। তারপর নির্মলেন্দু চৌধুরী ছিলেন। তো নাম লেখালাম। এড্রেস, নাম দ্বিতীয় বছরের ছাত্র। এবার আজাদ। আমি বললাম যে, তুই একই জিনিস লেখ, আর লিখবি তুই গান করছ। আসলে আজাদ নরমাল স্কুলে পরতো, বয়সে তো ছোট, তাহলে তো আর হবে না। একই জিনিস লিখে দিল। বিশেষ যোগ্যতা-গান। সঙ্গে সঙ্গে ওর ডিমান্ড হয়ে গেল। যান, আপনি পাঁচ তলায় যান, পাঁচ তলায় গানের রিহার্সেল হচ্ছে। আপনার প্রয়োজন বেশি। আসলেই তাই। আর আপনি? আপনারটা পরে জানাচ্ছি, এই প্লাসটিকের ব্যাগটা নেন। বেশ ওজন। দেখি যে অমৃত বাজার, আনন্দ বাজার–পুরানা পেপার আরকি।
– কাজে নাগবে আপনার। আপাতত নেন। আরো সব দিচ্ছি।
সাত টাকা দিলো আমাকে। সাত টাকা? অনেক টাকা!।
বললো-যান, শ্যামবাজারে হোস্টেল আছে, তারাশঙ্করের হোস্টেলইতো মনে হয়, হ্যাঁ-ওনার হোস্টেলে যান আপাতত রেস্ট নেন। আর পাঁচ তলা একটু দেখে আসেন।
আমি গেলাম পাঁচ তলায়। গিয়ে দেখি-“জাগো, জাগো, অনশন বন্দী ওঠরে যত” । রিহার্সেল দিচ্ছে। কে? নির্মলেন্দু চৌধুরী। কী হান্ডসাম! ও মাই গড! মুগ্ধ হয়ে গেলাম। যাদের দিচ্ছে তাদের কেউকেই আমি চিনি না। সব ইয়ং– রাজশাহী দিনাজপুর থেকে এসছে। গ্রামের গায়ক-গায়িকা আছে না, ওদের রিহার্সেল দিচ্ছে। অনেকে একেবারেই আনাড়ি। কিন্তু সেই আনাড়িরাই কিন্তু বাজিমাৎ করে দিল। ওখান থেকেই হয়েছে-“জয় জয় বাংলার জয়” (হবে নিশ্চয়-রাজু)হ্যাঁ, হ্যাঁ। সে এক আশ্চর্য, আশ্চর্য দৃশ্য! যাইহোক আমরা ওষুধের দোকান খোঁজ করি, খোচ-পাঁচড়া আসলেই যন্ত্রণা। আমরা ওষুধ কিনলাম আর কলিজি দিয়ে ভাত খেলাম।
রাজু: কী দিয়ে ভাত খেলেন?
শাহাবুদ্দিন:
কলিজা, গরুর কলিজা, সস্তা হোটেলে। তারপর শ্যামবাজারের হোটেলে গেলাম। চিরকুটেতো এড্রেস সব লিখেই দিয়েছে। ঢুকে দেখি যে আমাদেরই সব। বলে যে, সবই তো আপনাদের দেশেরই, বাংলাদেশের, দোতলায় রুম খালি আছে, ওখানে যান।



একে তো আমাদের পায়খানা ধরেছে, ভাবলাম -রুমে ব্যাগটা রেখে আসি, রুমটা দেখি গিয়ে। হোস্টেলের রুম যা হয় সে রকমই এক রুম। ঢুকতেই ওরা (আগে থেকে আসা শরণার্থী) আবার পাগলের মতো খুঁজছে আমাদের–নতুন আসছি তো, নতুন খবর চায়। ওপার থেকে আসছেন? কখন আসছেন? আমি বলি–প্লিজ, আমি আসতেছি, আসতেছি। রুমে ব্যাগ রেখে এলাম। এসে দেখি মাঝে একজন গোল হয়ে বসে গল্প করছেন, গামছা পেতে। জহির রায়হান। (আচ্ছা, তাই?–রাজু)। উনার সময়ের গল্প বলছেন, কতজন কত কি করে না? আমরা বন্ধুদের হলে যেমন করি।
বাপরে! জহির রায়হান!
আমাদের কতগুলো প্রশ্ন করলেন তিনি। আমরা বললাম আমাদের অভিজ্ঞতা-এই এই এই। ওইখানে যে বোমা মেরেছি তা বলি না। কারণ ভয় ঢুকেছে কখন কী ফাঁদে পড়ে যাই। বললাম যে, ওমুক ওমুক জায়গায় দুইবার আঘাত করেছে। (আমাদের ঘটনাই বললাম। হা হা হা)।
রাজু: হা হা হা। আচ্ছা। তারপর?
শাহাবুদ্দিন: ওই যে মেঘনা নদীতে যে অভিজ্ঞতা এইসবও বললাম। ওরা বললো-ঠিক আছে, রেস্ট নেন। তো রেস্ট নিতে নিতে তিনটা বেজে গেল। স্নান করতে গেছি পাশের এক কুয়ায়। গিয়ে দেখি সেখানে দুইটা লোকাল ছেলে। বললাম, নমস্কার।
ওরা আমাদের টিটকারি মেরে বলছে–কী দাদা, বাঁশ দিয়া কি স্বাধীনতা হবে। আমরা হাসি কারণ, আমরা তো পরের বাড়িতে।
রাজু: পরের বাড়িতে, সেটাই, হ্যাঁ।
শাহাবুদ্দিন: বলছে, –আমরা হোস্টেল ছেড়ে দিয়েছি আপনারা এখানে নাক ডেকে ঘুমাবেন বলে?
আরে শালা! এই তো, ইউরেকা! না ভাই, হ্যাঁ, আমরা তো মুক্তিযুদ্ধে যাবো।
হ্যাঁ, মুক্তিযুদ্ধে যাবেন! এগুলি বলে লাভ নেই, বাঁশ দিয়া স্বাধীনতা হয় না।
আসলে ওরা হচ্ছে নকশালিস্ট। নকশালিস্টরা পছন্দ করছে না। (তাই, নাহ!–রাজু)। নকশালিস্টরা বিরুদ্ধে ছিল তো।
রাজু: হ্যাঁ, এরা চীনাপন্থী তো, তাই না?
শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ। এরা হলো নেগেটিভ। কিন্তু কিছু করতেও পারছিল না। কারণ সেখানে নাইনটি নাইন পয়েন্ট নাইন্টি নাইন পার্সেন্ট তো এই দিকে। সব এক হয়ে গেছে তো। কিন্তু রাগটা আমাদের উপর দিয়ে চালিয়ে দিল। লাগছে কিন্তু আমাদের। (লাগবে তো বটেই–রাজু)। টিটকারি। উপরে উঠে বলি, এইখানে থাকা যাবে নারে। আমাদেরকে বেইজ্জতি করে দিল। কাউকে না বলে, চল ভাগি। সন্ধ্যার সময়ই ভাগলাম।
কই যাও? কই যাও?
বললাম ঢাকায় যাই। আমি ভাবলাম, জাহান্নামে যাক, মরুকগা সব। চল ঢাকায় যাই। ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিলাম, অসুস্থ দুজনই। কিন্তু আগরতলা যে যাবো আবার সেই চারদিনের ভ্রমণ– শরীরে সেই ক্ষমতা নাই। একমাত্র পথ, সাতক্ষীরা, ওই যে বর্ডার আছে না? ইছামতির ওই পাড়ে গেলাম। শরণার্থী ক্যাম্পে গিয়ে জিজ্ঞাসা করি–আপনেরা ক্যামনে আসলেন। হ্যাঁ, এই তো, সব ওপেন। ওকে। আমরা বাদাম কিনলাম। খেয়ে দেয়ে ভাবলাম, সন্ধ্যার সময় যাবো। তো খেয়ে দেয়ে, বর্ডারের কাছে এসে দেখি যে সব কিছু কী রকম নিরব হয়ে গেছে। আর শরণার্থী আসে না। আমরা ভাবলাম রাত্রি বলে হয়তো আসে না। আমরা খেয়ে দেয়ে, পান খেলাম। ওকে, লেটস গো, মরবো তো মরবো ঢাকায় গিয়ে মরবো। দেখি যে সন্ধ্যার সময় নদীর পাড়ে হাল্কা আলো। ওই যে খোলা স্পেস, কোনো নৌকা নাই, শরণার্থী নাই, তাই আলোময় দেখায়। একটু আগে দেখলাম ভীড় ভাট্টা, এখন খালি কেন! আমরা ভাবলাম হয় তো রাত্রি বলে। আসলে রাত্রি হলে আর্মিরা দুই পাশ ব্লক করে দেয়। যাক, রাত তো যাক। আমরা তো তখন ইন্ডিয়াতেই আছি। দেখি, নদীর পাড়ে চার পাঁচটা নৌকা। আমরা একটা নৌকা খুলে ভাসছি কি, কোথা থেকে পিছন দিয়া সেনারা এসে বললো–হ্যান্ডস আপ, হল্ট।

রাজু: ইন্ডিয়ান আর্মিরা?

শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ, হ্যাঁ। ওরা না আবার গুলি করে দেয়! এমন সময় লাফ দিলাম নৌকা থেকে। ওরা এসে পিছন দিয়ে হাত বাঁধছে। ওরা ইন্ডিয়ান সোলজার—শালা লোক, স্পাই পাকতা।
DSC00059
আরে শালা! একটাও বাঙালি না। হায় হায় স্পাই বলছে আমাদের! ( এ তো আরেক সর্বনাশ–রাজু)। এই তো, স্পাই হিসাবে বেঁধে নিয়ে গেল আমাদেরকে। নিয়ে এলো ওদের হেড কোয়ার্টারে। চোখ খোলার পর চেহারা দেখে ধন্দে পরে গেল ওরা। বললাম আমরা স্টুডেন্ট। আমরা আশেপাশে বাঙালি খুঁজি। (উদ্ধার করে যদি কেউ এই আশায়?–রাজু)। তখন ইংলিশ, উর্দূ বা হিন্দি, এত কিছু বলতে পারি না। অবশেষে এক বাঙালি সৈন্য পেলাম। ওই সৈন্যকে দেখে, ওরে ভাই, ওরে দাদা, আমরা এই, আমার বাবা এই এই বললাম। বুঝলো। আবার হাসে ওরা। বাঁচবার জন্য কত কী বলবে তোমরা–আমাদের বলে সে। তোমাদের ছাড়া হবে না, মুক্তিফৌজের হাতে ছাড়া হবে।
তা যাক, বেঁচে গেলাম।
বারটার সময় মুক্তিযোদ্ধা আসছে। আমরা তো দূর থেকে দেখি।
ওরা আসছে দুই জন– লে. বারি আর তার ড্রাইভার। ড্রেস পরা আছে রেজিমেন্টের। রেজিমেন্টের অন্যদের সাথে কথাবার্তা বললো,
কাহা হে বন্ধু। কোলাকুলি করলো। কাহা হে স্পাই? এসে দিল দুই থাপ্পর আমাদের। শালা কুত্তার ছা।
রাজু: কে, লে. বারি?
শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ। তখনো সে স্পাই হিসেবে দেখছে আমাদের।
রাজু: তখনো পরিচয় পায়নি বলে…
শাহাবুদ্দিন: লাথি খাবি শালা, ওঠ।
হায় হায়, এ তো সর্বনাশ, জীবনের ভয়ে কিছু বলি না। দেখি যে ইন্ডিয়ান আর্মিদের চেয়ে বেশি দাপট ওদের। কিন্তু এর মধ্যে আমার কিউরিসিটি–ওরা কি বাঙালি। আবার আমাদের বলে স্পাই। কখন যে কী এ্যাকসিডেন্ট ঘটিয়ে ফেলে। আমাদের নিয়ে আসে। হারিকেনের আলোয় দেখি, অনেক বিরাট একটা স্কুল। চার দিকে মাঠ। ওটার এককোণায় খড়কুটা দিয়ে একটা কোয়ার্টার বানিয়েছে, হাতে তৈরি দেশি অস্ত্র দিয়ে আমাদের দুইজনকে ধাক্কা দিয়ে ওখানে ফেললো। বলে থাক, রাতটা এইখানে কাটা, পরে দেখা যাবে, সকালবেলা।’ আমি বলি এই যে শোনেন, আমার বাবা তাইবুদ্দিন আহমেদ, আগরতলা দুর্গাপুরের ক্যাম্প চিফ, আমি জয়বাংলার, ছাত্র লীগের, এইসব বললাম আর কি।
‘স্পাইরা এই সবই বলে। যা যা, ঘুমা, দেখা যাক।’ (আচ্ছা!- রাজু ) কিন্তু তখন আবার হাত বেঁধে দিয়েছে, যদি পালিয়ে যাই। আমরা দুইজন আল্লাহ আল্লাহ করি।
শেষ পর্যন্ত স্পাই হয়ে মারা যাবো…। সারা রাত আল্লাহ আল্লাহ করলাম। চোখের পানি ফেললাম– এ আমরা কী করলাম। এর মধ্যে ও দোষ দেয় আমারে, আমি দোষ দেই ওরে। শালা তোর জন্যই এই রকম হলো।
ওমা, সকালবেলা! ধরো আযানের পর পর, ওখানে তো আর আযান হয় না, হাই স্কুলের মাঠে দেখি যে লুঙ্গিপরা যুবকরা মাঠে দৌঁড়াদৌঁড়ি করে, লেফট-রাইট, লেফট-রাইট করছে।

রাজু: মানে ট্রেনিং ক্যাম্প?
শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ। অবাক হয়ে গেলাম। ভয়-ভীতি সব ভুলে গেলাম। হঠাৎ দেখি যে এক হাবিলদার এসে ডাকলো। এই আপনাদের দুইজনকে ক্যাপ্টেন সাব ডাকছে। আসেন। হাতের বাঁধন খুলে দিল। গিয়ে দেখি, মাটির ঘরে যেখানে হেড মাস্টার বসে ওইখানেই অফিস কক্ষ। ওইখানে বসে জুতা পরছেন একজন। ওই সব জুতা, আর্মিদের জুতা।
রাজু: আর্মিদের বুট জুতা আরকি।
শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ। বললেন, শুনুন, বসুন। আপনাদের চেহারা দেখে তো মনে হয় আপনারা ভাল ঘরের সন্তান, আপনারা এই দিকে কোথায় এসেছিলেন? কার বাবা কোথায় আওয়ামী লীগের …
আমি তো তাড়াতাড়ি দাঁড়িয়েছি, স্যার আমার বাবা। ও, আচ্ছা। ঠিক আছে আপনারা বসেন। আমার নাম এই (ভুলে গেছি নামটা) কিন্তু বলুন কেন এইভাবে কী…
আমি বললাম সব ঘটনা। আর এই দিক দিয়ে হাউমাউ কান্না শুরু হয়ে গেছে আমাদের।
তার পর উনি বললেন, ঠিক আছে। কে কি করেন? তিনি এই প্রথম জানলেন আর্ট কলেজের কথা।
‘ও আর্ট কলেজের! আপনি ছবি আঁকেন? ‘আপনি’ আরম্ভ হয়ে গেল। (আচ্ছা! —রাজু)। ‘চা খান’। ওপরের লেভেলের লোকতো, ক্যাপ্টেন, তারা একটু অন্য রকম।
‘সরি, আগে বলেননি কেন।’ আমি কতবার বলেছি। হা হা হা।
রাজু: কেউ শুনে নাই। বা শুনলেও পাত্তা দেয় নাই।

শাহাবুদ্দিন: ‘দেখুন আমাকে এখনই যেতে হবে, আমার জন্য অপেক্ষায় আছে। আপনারা আমার গেস্ট। আপনারা আপাতত হাত মুখ ধুয়ে যা খুশি খান। হাবিলদারকে বলে গেলেন, ওনারা যা চায় দিয়ে দিবা। উনি চলে গেলেন। হাবিলদারকে বললাম,
দেন, একটু পরোটা দেন।
পরোটা তো নাই।
কী আছে? আসলেই পরোটা নাই।
কী একটা সাদা রুটি আর আলু ভাজি আছে। আর চা।
রাজু: যা আছে আর কি (হাস্যচ্ছলে)।
শাহাবুদ্দিন: যা আছে আর কি। খেয়ে দেয়ে, এর মধ্যে আটটা বেজে গেছে, আমরা এখন তাজা হয়েছি। বের হয়ে আশপাশ দেখছি। ক্রলিং শেখাচ্ছে চার মুক্তিযোদ্ধাদের, পাঁচজন ক্যাপটেনও আছে। মেজর জলিলের আন্ডারে ওই এলাকাটা। শুনলাম সব। আমাদের ঝামেলা শেষ। জেনারেল-টেনারেলরা সব সম্মান দিচ্ছে আমাদেরকে। এদিকে আমরা ওই ব্যাটারে খুঁজি যে ধাক্কা দিয়ে ফেলে থাপ্পর মেরেছিল, ক্যাপ্টেন বারী। শুনি যে, অপারেশনে গেছে সে। ওকে, দশটার পর ট্রেনিংয়ের রেস্ট এক ঘন্টা। তারপর ওরা আসছে, বললো, আপনারা কারা ভাই, কোত্থেকে আসছেন? শুনলো সব। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। আমাদের তখন টয়লেট চাপছে। টয়লেট করতে গিয়া দেখি বিশ পঁচিশজন লাইন ধরেছে। আমরা নিজেদের কন্ট্রোল করতে পারছিলাম না। দৌঁড় দিয়া এক কোণায় গিয়া বসেছি। এদিক দিয়ে সব হাহা করে উঠেছে।
আরে। বেজ্জাতি তো হয়ে গেল দেখছি!
আসলে কি আর করা। ন্যাচারাল তো। খুব আরাম পেলাম।
এই ঘটনায় আমরা ইনসাল্ট ফিল করলাম। মনে হলো এখানে থাকা যাবে না। এইখান থেকে ভাগো। কিন্তু কিভাবে ভাগি?
দিনের বেলা দেখি যে শরণার্থী যাচ্ছে আসছে। আসলে দিনের বেলাই শেষ। এই শরণার্থীদের সাথে আমরা পার হয়ে এলাম। (আচ্ছা–রাজু) সাতক্ষীরা আসার পর আমাদের কোনো পয়সা কড়ি নাই। তখন তো পাকিস্তান। কারে কি বলি, কিন্তু দেখি যে সবাই জয় বাংলার। বাসের ড্রাইভার বলে আসেন, খুলনা পর্যন্ত যাবেন, সামনে বসেন। ওরা ভাবছে আমরা মুক্তিযোদ্ধা।
‘ভয়ের কারণ নাই, আমরা আছি তো।’ ড্রাইভার বললো।
ওকি, সামনে দেখি চেকপোস্ট। ‘সাবধান, আমরা জান দিবো, আপনি নরমাল হতে থাকেন।’

রাজু: তারপরে?
শাহাবুদ্দিন: চেক করলো, দেখলো নরমাল প্যাসেঞ্জার। আমাদের চেহারা তো ইয়ং। সো, আমাদের দিকে তাকিয়ে উর্দূতে কিছু বললো। স্টিমারেও একই ঘটনা। এইভাবে ঢাকায় এলাম। আবার ব্যাক করলাম এই বাড়িতে। এসে দেখি কি আছে। সব খাবার টাবার যা ছিল তাতে পোকা জন্মে গেছে।
রাজু: এখান এসে পরে আপনি প্লাটুন কমান্ডার কিভাবে হলেন?
শাহাবুদ্দিন:ওখান থেকে তো একটা অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছিলাম। পাড়ার ৯ জন ছেলে নিয়ে আবার পাড়ি দেই। এইবার গিয়ে একেবারে ডাইরেক্ট মুক্তিযুদ্ধে ঢুকি। ওদেরকে না জানিয়ে আমার বাবাকে অফিসে গিয়ে বললাম–দেন, আমাদের সার্টিফিকেট দেন। মুক্তিযোদ্ধার ছেলে না রাজাকারের ছেলে তার সার্টিফিকেট তো লাগবে। তিনি সার্টিফিকেট দিলেন। আমি নয় জন নিয়ে আগরতলার মেলাঘর গেলাম। মেলাঘর-এ ছিলেন খালেদ মোশারফ, নাম করা সেক্টর কমান্ডার। দুই নাম্বার সেক্টর কমান্ডার-এর দায়িত্বে ছিলেন তিনি। উনার আওতায় ছিল ঢাকা ও কুমিল্লা। ঢাকা তো ক্যাপিটাল, এর আলাদা একটা ভূমিকা আছে।

তখন মনে হয় মে মাস, ৭ তারিখ হবে। নতুন কে কে আছ লাইন ধর। দেখা গেল অনেক, প্রায় আশি জনের মতো।
সবাই লাইনে দাঁড়াল। ওকে। কারা ঢাকার, কারা সাভার কারা নারায়ণগঞ্জ?
তো, আমরা ঢাকার দেখলাম সত্তুরের মতো। এই গোপিবাগ, নারিন্দা, ধানমন্ডি। যেহেতু ধানমন্ডি কালাবাগানের নয় জন আমরা, আমরা একত্র হযেছি। হ্যাঁ দেখা গেল খিলগাঁওয়ের দুইজন, মতিঝিলের ১ জন, এরকমভাবে ৭০ জন।
তো একজন হাবিলদার বললেন, ‘আচ্ছা ভাই, আমরা তো দেশের স্বাধীনতার জন্য, দেশের মায়ায় মা-বাবাকে ফেলে আমরা যুদ্ধ করতে এসছি। এইবার শুনুন, আইন শৃঙ্খলা দরকার, একটা সুন্দর বাহিনীর একজন কমান্ডার দরকার। কে কমান্ডার হতে চান, হাত তোলেন।
কেউ হাত তোলে না। আবার বললো, জানেন কমান্ডারের কি দায়িত্ব। হাত তোলেন, হাত তোলেন ।
কেউ হাত তোলে না। এখন আমার সাথে যে নয় জন, তারা বললো, শাহাবুদ্দিন ভাই, হাত তোলেন না কেন? ওরা জানে অলরেডি ছবি আঁকি, যুদ্ধ করতে আসছি, কিন্তু তাই বলে কমান্ডারের দায়িত্ব নিতে আমি পারবো না। এসব যখন আমার সঙ্গীরা বলছে তা উনাদের কানে গিয়ে পৌঁছাল। কে কে, কার কথা বলছেন হাত তোলেন, হাত তোলেন। ওরা আমামে ঠেলে দিল সামনের দিকে। ‘লজ্জার কী আছে, আসেন। বুকে সাহস নাই যুদ্ধ করবার? আমি বলি ঠিক আছে, ঠিক আছে। ‘আপনারা দেখেন ওনাকে।’ অমাার দিকে তাকিয়ে উনি বললেন, ‘আপনার পরিচয় দেন, পরিচয় দেন।’ আমি বললাম আমি আর্ট কলেজের ছাত্র, দ্বিতীয় বর্ষের, ঢাকার। সব থ খেয়ে গেছে কী বলে এই লোক!

রাজু: হা হা হা, আচ্ছা। সবচেয়ে গ্ল্যামারাস কমান্ডার, প্লাটুন কমান্ডার।
শাহাবুদ্দিন: এই দেখি যে, সবাই বোকা বনে গেছে। প্রথমত বুঝতে পারছে না, আর্ট কলেজ কি। ‘আমি ছবি আঁকি ভাই’।
ওদের ধারণা, ছবি আঁকার ছেলেরা একটু ভদ্র হয়। এক বাক্যে সবাই হাত উঠিয়েছে।
‘হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ, আমরা মেনে নিলাম, উনিই হবেন কমান্ডার।’
আর আমি বলি, ‘না-না-না, এত বড় দায়িত্বে আমি নাই।’
‘নাহ, কী বলেন, হতেই হবে।
হয়ে গেল। ওকে। (এ্যাকসেপ্টেড–রাজু )।
‘হ্যাঁ, একসেপ্ট।’
‘ওকে আপনার দায়িত্বে ৭৫ জন। এই- এই- এই ওনারা হলেন আপনার দায়িত্বে।’
৭৫ টা মগ দিলো। ৭৫ টা চামিচ দিলো। এইগুলি আপনার দায়িত্বে।
আমি বলি, এই যে দেখলেন, আমি এইগুলির দায়িত্ব নিতে চাইছিলাম না। ৭৫টা মগ, চামিচ দিয়ে আমি কি করবো। হাহাহা (উভয়)।
রাজু: তো এইভাবে আপনি প্লাটুন কমান্ডার হলেন?
শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ, এইভাবে প্লাটুন কমান্ডারের দায়িত্ব নিলাম। পরে তো দেখি এটার সাংঘাতিক একটা ভ্যালু। ( বিরাট দায়িত্ব।–রাজু)। বিরাট ভূমিকা। কিন্তু অন্যান্য প্লাটুন কমান্ডার দেখি থাপ্পর থুপ্পুর মারে। একেবারে আর্মির মতো। আমিতো এটা করতে পারি না। দেখি যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে আমার গ্রুপে, ভাবে যে আমি দুর্বল। আমি সবাইকে একদিন ডাকলাম। দেখ, আমার বন্ধুরা, আদর ভালবাসা নিয়ে দেশ স্বাধীন করার জন্য এখানে এসছি। জীবনে ভাবি নাই তোমাদের সাথে আমার এখানে দেখা হবে। তোমাদের আদর করি বলি বলে ভেবো না আমি দুর্বল। অন্য প্লাটুন কমান্ডাররা শুয়োরের বাচ্চা, কুত্তার বাচ্চা বলে গালি দেয়, এইটা কি ভাল? না, ভদ্রভাবে যদি বলি–তুমি এই কাজটা করো। কোনটা ভাল? তোমরা আসলেই মুর্খ।
এইসব বলার পর দেখি পরিবর্তন হয়ে গেছে।
রাজু: আচ্ছা, তাই?
শাহাবুদ্দিন: তারপর দেখি আমাকে কী শ্রদ্ধা। উল্টা মডেলের মতো হয়ে গেছি ওদের কাছে। অন্যরা আসতে চায় আমার গ্রুপে।
রাজু: ভদ্র বলে, হ্যাঁ।
শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ, হ্যাঁ। আসলে একেকটা একেক রকম। তারপর সরাসরি যুদ্ধে। ব্যাটল ফিল্ড। আমাদের গেরিলা ট্রেনিং দেয়া হয়েছে। সেই গেরিলা ট্রেনিংয়ে গিয়ে হয়ে গেল উল্টা: ব্যাটল্ডফিল। সেই ব্যাটল্ডফিল আমার কাছে মনে হয়েছে সিনেমার মতো। এইগুলি না হলে হয়তো আমি এতটা শক্তিশালী হতাম না। আমার পেইন্টিংয়ে যে এফেক্ট হয়, এইটার দুইটা দিক।
DSC00131
রাজু: যেমন গতি তো সাংঘাতিক প্রধান হয়ে আসে আপনার ছবিতে।
শাহাবুদ্দিন: তখনকার সময় যে ডেড বডি, পানি ভাতের মতো হয়া গেছে আমার কাছে। কারণ ব্যাটল্ডফিল্ডের মধ্য দিয়ে গেছি। টাইমের পর এতো স্পেস। শোনো, একবার এ্যাম্বুসে পড়ে গিয়েছিলাম। পরলাম গিয়ে টয়লেটের ভিতর। কিরা খেয়েছি আমি, কিরা।
রাজু: এই রকম ছিল, না?
শাহাবুদ্দিন: এইগুলি ডেন্জারাস তো, এসব আমি বহন করছি। আমি ভাগ্যবান যে আমি বেঁচে আছি। কত জন তো শহীদ হয়েছে। ওদের কথা কে বলবে? (হ্যাঁ, হ্যাঁ– রাজুআমি একজন শিল্পী হয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না। শিল্পীর ভূমিকাটা কী? সাহিত্যিকের ভূমিকাটা কী? আমি যে সৃষ্টি করছি তা কি এমনি? ‘সৃষ্টি’ শব্দটার মানে কী?
সৃষ্টি এতো ফাইজলামি নাতো। তাহলে তো সবাই সৃষ্টি করতো। সৃষ্টির কতগুলো লক্ষ্য আছে। লক্ষ্য হচ্ছে ট্রুথ। তুমি ছাড়া তো পৃথিবীর কেউ তো জানে না। তুমি কী, তাই না? সেই ট্রুথ আমি যদ্দুর পারি ধরার চেষ্টা করি। দ্যাটস ইজ দ্যা সিমবল আই টুক ফ্রম বঙ্গবন্ধু, আই টুক ফ্রম রবীন্দ্রনাথ, আই ফিল প্রাউড। তোমরা ছিলে বলে আমি এতদূর এসেছি। শুধু তোমাদের কারণে।
এই যে এতো শহীদ হয়েছে। তোমাদের কথা বলার জন্য আমাকে রেখে দেয়া হয়েছে। এগুলো আমি অনুভব করি।
রাজু: আপনি ফ্রান্সে গেলেন কত সালে?
শাহাবুদ্দিন: ১৯৭৪ সালে।
রাজু: ১৯৭৪ সালে গেলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর আগেই।
শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ।
রাজু: আপনি তো শেখ মুজিবকে দেখেছেন।
শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ, কত কতবার।
রাজু: দু’ একটা ঘটনা বলবেন, কাইন্ডলি।
শাহাবুদ্দিন: কত ঘটনাই আছে। আউলা-ঝাউলা হয়ে যায়। (আউলা-ঝাউলা হোক, কোনো সমস্যা নাই–রাজু )।
শাহাবুদ্দিন:আমার ধারণা ছিল উনি বোধ হয় ছবি টবি বুঝেন না। (ধুম পানের জন্য কথায় সামান্য ছেদের পর আবার)
রাজু: হ্যাঁ, উনার সঙ্গে দেখা হলো।
শাহাবুদ্দিন: দেখা তো আগেও হয়েছে, যখন ছয় দফা দিলেন। ওটা আরেক কাহিনী।
রাজু: আপনি বলতে চাচ্ছিলেন, উনি ছবি বোঝেন কিনা না…
শাহাবুদ্দিন: আমার ধারণা ছিল উনি ছবি বোঝেন না। উনি রাজনীতিবিদ তো, এমনিতেই তো বহুলোক বোঝে না। আমাদের প্লাটুনের, তারপর বাচ্চুদেরও (নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু) একটা অঙ্গীকার ছিল যে, বঙ্গবন্ধু যতদিন না আসবে, আমরা আর্মস জমা দেব না। তাজউদ্দিন গভমেন্ট এসে বললো, মুক্তিযুদ্ধ হয়ে গেছে, এখন অস্ত্র জমা দাও। সবাই জমা দিছে। আমরা দেই নাই। যে না, বঙ্গবন্ধু যত দিন না আসেন ততদিন জমা দেবো না।
১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু আসলেন। আমরা বোধহয় ১৭ই বা ১৮ ই জানুয়ারি, আমি ঠিক ভুলে গেছি। গণভবন, রমনা পার্কের ওইখানে বসতেন, তো ওইখানে আমরা জমা দেই। ওই ছবিটা দেখবা মিউজিয়ামে আছে। (আচ্ছা- রাজু )।
ওই জমা দেয়ার সময় সামনাসামনি হইলাম। তারপর পরিচয়, চা চক্র। তখন বললো, বাবা, তোমরা কে কী কর। আমার কাছে এসছেন। সেই একই ঘটনা।
জিজ্ঞেস করলেন, কী কর, কোথায় আছ?
এই যে জয়নুল আবেদিন ইন্টটিটিউট, ছবি আঁকি।
তিনি বললেন, এ্যা, ছবি আঁক!
এই তিনি তাকালেন আমার দিকে, সেই তাকানোটা ‘আই ক্যান নট ফরগেট। মনে হয়েছে আমার বাবা। ‘ছবি আঁক? কেমন আঁক দেখতে চাই।’
তখন তো অনেক ভিড়ভাট্টা, উনি এত বিজি স্বাধীন হওয়ার পর।
উনার কাছে অবাস্তব মনে হয়েছে। তখন তো মাত্র বিশ বাইশ বছর বয়স আমার। কচি খোকা। ছবি আঁকে। উনার শ্রদ্ধা তিনগুণ বেড়ে গেছে।
ওই সূত্রে বললাম, ‘ওকে, আমি দেখাবো আপনাকে।’
উনার জন্য বড় একটা ছবি এঁকেছিলাম, পাঁচ ফিট বাই আট ফিট হার্ডবোড-এ, ওইটা নিয়ে যাই। ওটা জমা দিতে গিয়েই তাঁর সাথে গভীরতাটা বাড়ে।
তখন কেবিনেট মিটিং হচ্ছিল। সবাই ছিলেন, তাজউদ্দিন থেকে শুরু করে সবাই। চৌদ্দ জন উপরের লেভেলের, সব মিলে বাইশ জন। অপেক্ষা শেষ হওয়ার পর, হানিফ ভাই, যিনি মেয়র ছিলেন, উনি তখন ইয়ে… উনি বললেন, মিটিং শেষ হয়ে গেছে।
এত বড় ছবি নিয়ে দোতলায় নেয়া যায় না, তাও আমি নিচে নামতে চাই না।
রাজু: আসলে ওইটা কি তাঁর পোর্ট্রটে ছিল?
শাহাবুদ্দিন: না, মুক্তিযুদ্ধের ওপর এঁকেছি, বিষয় জেলখানা। উনাকে বেজ করেই, বাঙালিদের জেলখানায় রেখেছিল না, হাত বেঁধে জেল খানায় ফেলে রাখতো।
রাজু: এইটা ছিল ছবির বিষয়, আচ্ছা।
শাহাবুদ্দিন: ওইটা যখন নিয়ে যাই, সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা। লজ্জা লাগে যে, ওরা দেখবে। ঢুকতেই দেখি, এক কোনায় বঙ্গবন্ধু ফাইল-টাইল দেখছেন, পিওনরা এনেছে। আমাকে দেখেই বললেন, আসো আসো আসো।
রাজু: দেখেই চিনে ফেলছেন?
শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ, আগাগোড়াই আমার লম্বা চুল।
আমি আর খেয়াল করি নাই, আশেপাশে কে কে আছে। উনি খুললেন। খোলার পর– ‘এই দেখ দেখ, আরে তাজউদ্দিন, দেখ দেখ, কী সর্বনাশ!’ আমি দৌঁড় দিয়ে পেছনে দাঁড়িয়ে দেখছি… ( কার কী অভিব্যক্তি –রাজু ) অভিব্যক্তি।
উনারা ‘বাহ্ বা, খুব সুন্দর।’ সবাই্ খুব প্রশংসা করলেন।
আসলে এইটার ওপর নজর না তাদের। তাদের অন্য প্রবলেম। বঙ্গবন্ধু আবার টার্ন নিলেন। অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখলেন। এইটাই আমার কাছে ভালো লেগেছিল। অন্তরটা ভরে গেছে আমার। বুক ভরে গেছে, মন ভরে গেছে।
তোফায়েল ভাই এসে বললেন, ‘শাহাবুদ্দিন কিন্তু অনেক কাজ করেছে আমাদের ছাত্রলীগের কর্মী হিসাবে। ওই যে বললাম না, যুদ্ধের আগে কাজ করেছিলাম।
রাজু: হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ। তখনকার স্মৃতি।
শাহাবুদ্দিন: বললাম, ‘না না না কাকা, আমি ছাত্রলীগ করি টরি না।
রাজু: শেখ মুজিবকে আপনি কাকা বলতেন?
শাহাবুদ্দিন: যেহেতু আগে আসতেন আমাদের বাড়ি। বললেন, ‘দেখ, আমরা তো এত বুঝি-টুঝি না, বিদেশিরা আসে এখানে, কত বিদেশি এমবাসির লোক আসে এখানে। এইখানে টানা ছবিটা। কোথায় টানাবি? এই যে সোহরাওয়ার্দি ও শেরে-বাংলার ছবি ওয়ালে। আমি বললাম, ওয়ালটা বেশ।
‘অ্যা, বেশ, এখনি ডাকো, টাঙাও এখানে।’
ওদেরকে বললেন, ‘আমার সোনার ছেলেরা ছবি আঁকতে পারে, যুদ্ধও করতে পারে’। আমি খুব প্রাউড ফিল করলাম। অন্যরা কিন্তু এতো কিছু করলো না, যেহেতু উনি বললেন খুব সুন্দর সুন্দর (হাত তালি)…।
রাজু: সব সময় এমনই হয়।
শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ। (হাসি)। এসবের পর একটা ছবি তুললাম তাঁর সাথে। ছবিটা আছে এখনো। আলম ভাই তুলেছিল। একদিকে উনি, আরেকদিকে আমি। এই যে ভ্যালুটা, তাঁর কাছে মনে হলো তাঁর সন্তান ছবি আঁকে! উনি তো বোঝেন। অন্যরা তো বোঝেই না। অন্যরা কি বললো না বললো তাতে কিছু আসে যায় না। তার কাছে মনে হয়েছিল সব প্রয়োজন। চিত্রকলারও দরকার আছে। বললেন, ‘দেখ, আমাদের তো কিছুই নাইরে, তোরাইতো গড়বি, এগুলি তো সম্পদ।’
আরে, সর্বনাশ! তখন এতো বুঝি-টুঝি নাই। জাস্ট মজা পায়েছি, শান্তি পেলাম। পরে তোফায়েল ভাই বললেন বঙ্গবন্ধুকে ‘স্যার, কোনো পয়সা-কড়ি?’
আমি বললাম ‘না না না। আমি একপয়সাও নিবো না। এর চেয়ে আর বড় কী আছে। ‘ঠিক আছে, বেঁচে থাকো, দেখা হবে।’
তখনো বলিনি আমার বাবার কথা। মনে মনে ভাবলাম বলবো একদিন।
রাজু: আচ্ছা, আচ্ছা।
শাহাবুদ্দিন: এর মাঝে আমি জানি জয়নুল আবেদিন, অন্তরে আছেন তো উনি, কোনো দিন আমাকে ডাকবেন। অপেক্ষায় আছি। উনি নিশ্চয়ই আমাকে ডাকবেন। এমন একজন উপযুক্ত শিল্পী হবো যাতে আমাকে ডাকেন উনি। এটারই আমি অপেক্ষায় আছি। কিন্তু শান্তি পাচ্ছি না। সবাই যায় আর্ট কলেজে যারা পড়ে, যারা যুদ্ধে গিয়েছিলাম। গল্প শুনি। আমার সেই ছোটবেলার স্বপ্ন, অপেক্ষায় আছি। আমি এইভাবে যেতে রাজি না। আমাকে দেখাতে হবে আমার স্বপ্ন, আমি তোমার কাছাকাছি আসছি।
কী ঘটলো? তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনে মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয়মূলক একটা অনুষ্ঠান করতেন বেলাল বেগ। তখন একবার গেছি সাধারণ মুক্তিযোদ্ধার পরিচয়ে। শাহাবুদ্দিন, প্লাটুন কমান্ডার বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছে– এই সব বললো। তুমি জান, আমি প্রথম পতাকা উঠাই?

রাজু: আচ্ছা। প্রথম পতাকা উঠিয়েছিলেন।
শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ, যাইহোক, গেল এটা। দ্বিতীয়বার বিশেষ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয়। বিশেষ ছবি আঁকা। এইটা, তখন টেলিভিশনে চার ঘন্টা হতো, বিকেলে আরম্ভ হতো, নয়টার সময় শেষ হয়ে যেত। সবাই দেখতো। জয়নুল আবেদিন দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন। আর্ট কলেজের ছেলে? উনি লোক পাঠালেন পরের দিন সকালে, এই ছেলেকে ধরে নিয়ে আসো। ওনার ইন্সটিটিউটের ছাত্র, আবার মুক্তিযোদ্ধাও। তাও আবার প্লাটুন কমান্ডার। এই যে বললাম না, অপেক্ষায় ছিলাম।
রাজু: হ্যাঁ, হ্যাঁ।
শাহাবুদ্দিন: তো, এলিফেন্ট রোড দিয়ে আর্ট কলেজে যাবো সকালে, হঠাৎ দেখি যে ইকবাল ভাই, যে জয়নুল আবেদিনের ছবি চুরি করে বিক্রি করেছিল।
রাজু: হায় হায়, বলেন কি? আর্টিস্ট ইকবাল?
শাহাবুদ্দিন: না।
রাজু: অন্য ইকবাল? আচ্ছা আচ্ছা।
শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ। তার ভাই, ছোটগল্প-টল্প লিখতো, কী নাম যেন, জনকণ্ঠে দায়িত্বশীল পদে ছিল । মারা গেল গত বছর, দুই বছর হয়েছে। (আচ্ছা-রাজু)। তার নামটা যেন কী? অনেক ছবি নিয়ে গেছে আমার কাছ থিকা মাগনা– বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আঁকা ছবি। (তাই? —রাজু)। আরে, আমাদের লোক তো, চিনবা তো বটেই।
রাজু: লেখালেখি করে?
DSC00061
শাহাবুদ্দিন: বাচ্ছাদের জন্য লেখে, বলো তো কে? (বাচ্চাদের জন্য লেখে?– রাজু)। নাম করা লোক। একলাস।
রাজু:ও আচ্ছা, একলাসউদ্দিন আহমেদ।
শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ, একলাস ভাই–
রাজু: আচ্ছা, আচ্ছা। উনার ভাই হলো ইকবাল!
শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ। ছোট ভাই। তো সেই লোক আমাকে দেখে বললো, ‘হ্যাঁ, তোমার নাম শাহাবুদ্দিন, আরে বাবা তোমার এত নাম ডাক, আসো ওঠো, রিকশায় ওঠো।
কোথায় যাবো?
‘সেগুন বাগিচায়, জয়নুল আবেদিন সাব তোমারে ডাকছে।’
‘ওয়াও, বলে কী!’ ব্যাগ ট্যাগ ফেলে স্যারকে পা ধরে সালাম দিলাম, আমার স্বপ্ন সার্থক হয়েছে।
উনি চোখের পানি ছেড়ে দিলেন আর ভাবিকে ডাকলেন। মায়া, স্নেহ, প্রাউড–এসবের এক মিলিত অনুভূতি ছিল তার মধ্যে।
শোন, এটা হলো গভীর উপলব্ধির ব্যাপার। এক সেকেন্ডেই অনুভব করে ফেলেছেন যে আমি তার প্রিয়। আমি মাথা নত করে দিলাম। সেই যে ছোটবেলা থেকে মেনে এসেছি, উনি গুরু।
এই যে ছবিতে স্পেস ছাড়া, উনার কাছ থেকে আমি শিখেছি। এগুলি থিওরিটিক্যাল। প্যারিসে যাওয়ার পরে এই যে স্পেস ছেড়ে দিয়েছি (একটা পেইন্টিং দেখিয়ে)–এটা ওনার কাছ থেকে শেখা। আসলে উনি কিন্তু খুব সিম্পল করেছেন তার ছবিকে। জয়নুল আবেদিনের ছবি তো খুব সিম্পল।
রাজু: হ্যাঁ, হ্যাঁ হ্যাঁ।
শাহাবুদ্দিন: একদম সহজ, কিন্তু কী কঠিন! এক্সপ্রেশন এর চেয়ে ভাল আর কেমন করে হয়। এমনিতে তো উনি গ্রেট। তো এসব উনি আমাকে দেখিয়েছেন। বলতেন, এখানে স্পেস ছেড়ে দাও। ভয়ে আমার হাত কাঁপতো। কিন্তু এগুলি কাজে লেগেছে আমার। উনাকেই কিন্তু আমি বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে যাই। বঙ্গবন্ধুকে আমি বললাম যে ‘বঙ্গবন্ধু, উনিতো দেখা করতে চান।’ আঁতকে উঠলেন তিনি–‘কে ! কে!’ দেখ, আসলেই এক ইনক্রেডিবল ম্যান। আমি বলাম যে, শিল্পচার্য জয়নুল আবেদিন। উনি তখন বললেন, ‘না, না, উনি আসবেন কেন। আমি উনার কাছে যাবো। উনি গুরু, আমি উনার কাছে যাবে। গুরু উনি।’
রাজু: উনি বললেন যে উনিই যাবেন?
শাহাবুদ্দিন: বললেন, ‘উনি আমার গুরু, আমিই তো যাব।’ তথমত খেয়ে গেলাম।
আমি বলি, কবে যাওয়া যায়?
‘আমি তো খুব ব্যাস্ত। একদিন সকালে এসে নিয়ে যাবে তো আমায়।
আমার তো বুকটা ভরে গেল। আমি গেলাম ওইখান থেকেই জয়নুল আবেদিনের বাসায়। গিয়ে ওনাকে বললাম, আপনাকে ‘গুরু’ বলেছেন, আর আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। ‘অ্যাঁ, বল কি! না- না- না , এটা হতে পারে না। উনি তো বঙ্গবন্ধু, আমি তো পুটি মাছ। না না না, উনার তো সময় অনেক মূল্যবান, আমি যাবো। কিন্তু একটা জিনিস; সঙ্গে একজনকে নিয়ে যেতে হবে।’
‘কাকে?’
‘হাসনাত আবদুল হাই’।
আমি বলি, ‘ফালান তো এসব।’
রাজু: হাসনাত আবদুল হাইকে নিতে চেয়েছিলেন কেন?
শাহাবুদ্দিন: আসলে ওনারা বন্ধু। তখনো আমি চিনি না।
রাজু: হা হা হা। আপনি বললেন ‘ফালান তো’ হা হা হা…।
শাহাবুদ্দিন: যাইহোক, অবশেষে উনি বললেন, ‘দেখ, উনি মহৎ লোক, একটা দেশের পিতা, একটা রেভ্যুলুশন করে দেশ স্বাধীন করেছেন, আমি তো কিছুই করি নাই সেই তুলনায়। উচিত নয়, উনি হয়তো আসবেন, এটা অন্যায় হবে, আমার জন্য অন্যায় হবে। আমিই যাবো। তুমি একটু ম্যানেজ করো।
আমার মনে হলো, ‘ঠিক, ঠিক, আপনি যেটা বললেন।’ আমি আবার এলাম, আর্ট কলেজে গেলাম না আর। এসে, রফিকুল্লাহ চৌধুরী ছিলেন সেক্রেটারি, আমি বলি শোনেন, এই এই ব্যাপার বলেছেন।
বললেন, ‘তাই? আচ্ছা, এক কাজ কর। কালকে সকালে উনাকে নিয়ে আস। আমি ওনাকে ম্যানেজ করি। উনি যাতে না জানে।’ বঙ্গবন্ধু বহুত ডায়নামিক তো, হয়তো বলে ফেলবেন, লেটস গো। উল্টাপাল্টা যদি করে ফেলেন।
তো, তাই হলো, নিয়ে গেলাম। আমিই নিয়ে গেছি। আমি সামনাসামনি দেখতে চাই আমার দুই প্রিয় ব্যক্তিকে।
গিয়ে রুমে ঢুকেছি। জয়নুল আবেদিনের তো চোখে সমস্যা, পানি পড়তো।
‘স্লালামাইকুম’ (শিল্পাচার্য)।
‘আসেন, আসেন’(বঙ্গবন্ধু)।
দুইজন দুইজনের দিকে হাত বাড়ালেন। আমি মাঝে দাঁড়ায়ে আছি। জয়নুল আবেদিনকে এমন করে বুকে ধরলেন তিনি।
‘বসেন, পাগলাটার জন্য আপনার বাসা দেখা হলো না।’ উনি বললেন।
‘না না না, আপনি কী বলেন। আমার জীবন ধন্য। দেশের কৃতি সন্তান…’
‘আপনার কী দরকার, বলুন।’
‘দেশ স্বাধীন হয়েছে। কত কিছু প্রয়োজন, কিছুই তো আপনার নেই। সোনার গাঁয় একটা জায়গা খামাখা পড়ে আছে…
‘রফিকুল্লাহ’।
বাহ্! কী ক্ষমতা, কী ডাইনামিক! আসলে তাকে মনে হচ্ছিল সিংহ কী, সিংহের বাবা।
‘সোনার গাঁয় আমার গুরু যা চায়, বাংলাদেশ চাইলে সারা বাংলাদেশ।’
ওয়াও! আর থাকে কী।
রাজু: হ্যাঁ, সেটাই। কী শ্রদ্ধাবোধ!
শাহাবুদ্দিন: আরও বললেন, ‘আমরা কেউ না, কিছু না। আমরা সব ধসে যাবো। এইগুলি থেকে যাবে।’
আসলে বড় মানুষ বড় মানুষকে বুঝতে পারে। ‘আপনারা এত কষ্ট করে এখানে আসছেন। ওরা (পাকিস্তানিদেরকে ইঙ্গিত করে) তো কিছুই দিতে পারে নাই, সব ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। এবার সোনার বাংলা ওরা করবে (শাহাবুদ্দিনের দিকে ইঙ্গিত করে)। আমরা দিয়া যাবো।’

রাজু: একটা জিনিস, আপনি তো শেখ মুজিবকে দেখেছেন, এই যে শিল্পানুরাগ, এই যে শ্রদ্ধাবোধ এগুলো বলছেন। তারই সন্তান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে ওই গুণাবলী কি আপনি দেখেন?
শাহাবুদ্দিন: অফকোর্স, অফকোর্স। আসলে ব্যাপার হচ্ছে কি, আমরা আট ভাই, আমি কোনো দিন বোনের সাহচর্য পাইনি। ধরো, একটা ঘরে একটা বোন থাকলে কী অবস্থা হয়– সেই ধারণা আমার নেই। আমাকে যদি বল আমার জীবনের দুইটা জিনিস কী–একটা হলো পাঁচ বছরের আর্ট কলেজ আমার জীবনের গোল্ডেন পিরিয়ড। আরেকটা জিনিস হলো, তাকে বোনের মতো পাওয়া। এত কিছু হওয়ার পরও–আমি তাকে (প্রধানমন্ত্রী)এত কাছ থেকে দেখেছি– ৭৫ হয়ে গেল, এতসব দুর্যোগের পরও, তিনি এখনো ভেঙে পড়েননি।
তাকে অনেক সিকিউরিটির মধ্যে থাকতে হচ্ছে। কারণ ওই দিকে শয়তানরা তাকে মারার জন্য খুঁজে ফিরছে। বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের দুইজন এখনও রয়ে গেছে অধরা। অনেক কষ্ট করে অবশেষে তাকে পেলাম সেভেন্টি এইটের শেষ দিকে, লন্ডনে। দেখা হলো তার সাথে। সেই সূত্র থেকে তিনি আমার বড় আপা। আমি প্রায়ই বলি আপনি প্রেসিডেন্ট হন আর যা-ই হন আপনি আমার আপাই থাকবেন।
তার সবচেয়ে বড় গুণ হলো, টলারেন্স, মাফ করে দেয়ার ব্যাপারটা ওনার মধ্যে আছে।
রাজু: আচ্ছা। তবে এদেরকে তো আর মাফ করে দেয়া ঠিক হবে না। এই যুদ্ধাপরাধীদের, তাই না?
শাহাবুদ্দিন: না ওইটা তো পলিটিক্যাল। আমি বলছি, আমার কাছে সবচেয়ে যেটা মনে হয় তাহলো, উনি রাজনীতিবিদ হয়েও তার মধ্যে একটা মাতৃ-ভূমিকা আছে, সেটা তিনি পালন করেন। মা। মায়ের যে ভূমিকা আছে না, তাই। অনেক মা আছে তারা কিছুই করে না, হয়তো জানেও না। এইটা তার এক ট্রিমেন্ডাস গুণ। যতবারই যাই, ততবারই তাকে নতুনভাবে আবিস্কার করি।
রাজুএগুলি হলো বংশের কতগুলো বৈশিষ্ট্য।
শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ। কেউ কিন্তু জানে না উনার মায়ের ভূমিকাটা। মানে বঙ্গবন্ধুর স্ত্রীর ভূমিকা আসলে কেউই জানে না। বঙ্গবন্ধু এত দূর আসতে পারতেন না। এই যে এত বছর জেলে ছিলেন, সংসার-টংসার (উনিই তো সামলেছেন– রাজু)।
হ্যাঁ, উনিই সামলেছেন। তারপর আবার ছেলেমেয়েদের শিক্ষার যাতে ব্যাঘাত না ঘটে। এত সোজা না কিন্তু!
রাজু: না না, মোটেই না।
শাহাবুদ্দিন: মার কাছ থেকে এই স্বভাব পেয়েছেন তিনি। তারপর তো যখন উনি দেশে এলেন, রাষ্ট্রপ্রধান হলেন, তখন উনি সবই সামলেছেন। তারপর এই পঁচাত্তরে একসিডেন্ট। যার কারণে একটা জিনিস হয়েছে, প্রায়ই কিন্তু উনি বলেন, সত্যি সত্যিই বলেন, কেউ বিশ্বাস করুক আর না করুক, আমি তো জানি, তার ভেতর থেকে ভয়-ভীতিটা চলে গেছে।
রাজু: হুম, এটা ঠিক।
শাহাবুদ্দিন: ইনোসেন্ট কতগুলো মানুষকে ওরা মেরে ফেলেছে, যেমন এই যে রাসেলকে, কী নিষ্ঠুরভাবে মেরেছে, তুমি চিন্তা করতে পার? রাসেলের মৃত্যুটাই ওনাকে বেশি কষ্ট দেয়। কারণ, রাসেল বলেছিল– আমাকে দুই আপার কাছে পাঠিয়ে দাও, আমাকে মেরো না।
রাজু: উফ! কী বেদনাদায়ক!
শাহাবুদ্দিন: জানো তো? ওরা বলছে ঠিক আছে, ঠিক আছে। মরে নাই তো তখনো, মা’র কাছে ছিল তো ভয়ে। তারপরে বেরিয়ে আসছে। আসার পর, ওরা বললো, তোমাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। ধরে নিয়ে ব্রাশ ফায়ার, চুলে ধরে নিয়ে এসে বললো, চল, বইনের কাছে যাবি। ক্যান ইউ ইমাজিন? বল, এইটা কেউ মেনে নিতে পারে?
রাজু: না-না, কেউ মেনে নিতে পারবে না।
শাহাবুদ্দিন: এত বেদনা নিয়ে একটা মানুষ বেঁচে আছে, তুমি চিন্তা করতে পার? সাধারণ মানুষ হলে তো পাগল হয়ে যেত। উনি এগুলো নিয়ে এখনও দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।
রাজু: হ্যাঁ, নিজের পরিবারের সবাইকে মেরে ফেলেছে। এবং আমি মনে করি যে, এই যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারটা তিনি শুরু করতে পারলেন, এবং উনি এটা কন্টিনিউ করবেন আমরা জানি, এটা একটা বিরাট সাফল্য।
শাহাবুদ্দিন: পৃথিবীর কোন দেশ সাপোর্ট দিছে, বল?
রাজু: সাপোর্টতো দেয়ই নাই, অনেকে বিরোধিতাও করেছে।
শাহাবুদ্দিন: কেবল যে-দেশটি আমাদের বন্ধু ছিলো সেই একাত্তরে, উনারা তাকে সাপোর্ট দিয়েছে– ভারত। নইলে পারতো না। (হ্যাঁ, সেটা ঠিক–রাজু)। চারিদিক থেকে চাপ এসছে। কিন্তু নো, তিনি বললেন, ডু অর ডাই। এই চরিত্রটা তিনি বাপের কাছ থেকে পেয়েছেন। ওই যে বললাম না, বঙ্গবন্ধু আইয়ুব খানের সময় মানি না, মানি না বলে মার্শাল ল’র বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। মাত্র বিশ পঁচিশ জন নিয়ে উনি নামছেন। এনাফ। চিন্তা কর, বাঙালি ভয়ে সব দৌড়, মওলানা ভাষানীর দলও তো। তো এগুলি উনার ভেতরে আছে।
রাজু: এবার অন্য বিষয়ে বলি, আপনি তো এখানকার চিত্রকলা দেখছেন,এবং বাইরের চিত্রকলাও দেখছেন। বাইরে কাদের চিত্রকলা আপনার প্রিয়?
শাহাবুদ্দিন: অনেক, তার মধ্যে যেমন ধরো, আগাগোড়াই সব ইমপ্রেসনিস্টদের কাজ আমার পছন্দ। আমি তাদের দ্বারা ইনফ্লুয়েন্সড হয়েছি। বিশেষ করে মোনেট দ্বারা আমি বেশি ইনফ্লুয়েন্সড হয়েছি। তুলুস লুত্রেক, তারপর সেজান–এদের দ্বারাও ইনফ্লুয়েন্সড হয়েছি। তাছাড়া ক্লাসিকদের মধ্যে গয়া, দেলাক্রোয়া, মাইকেল এঞ্জেলো, নিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি কিছু কিছু। তারপর কনটেমপোরারিদের মধ্যে ফ্রান্সিস বেকন হচ্ছে আমার মেইন ব্যক্তি যার ছবি দেখার পর আমার প্যালেট পরিবর্তন করে ফেলেছি যাতে এই স্টাইলটা আসে। আসলে তার পেইন্টিংয়ের যন্ত্রণা যেটা আমার সাথে যায়, কিন্তু তার অভিজ্ঞতা আর আমার অভিজ্ঞতা তো এক নয়, তাই না?
রাজু: না, এক নয়। এইজন্য আপনারটা ডিফারেন্ট হয়েছে।
শাহাবুদ্দিন: এখন ধরো, আমাদের তো নদীমাতৃক দেশ, আমার শৈশব তো মেঘনা নদীতে। চৌকিতে বসে নদীতে মাছ ধরেছি। (ও, আচ্ছা, আচ্ছা- রাজু)। যেহেতু নদীর পানিতে মাছ আসতো, লাডি মাছ, লাডি মাছ বলে আমাদের ওখানে।
রাজু: মানে টাকি মাছ, তাইতো? লাডি মাছ বলে আপনাদের ওখানে।

শাহাবুদ্দিন: হ্যাঁ, টাকি মাছ, লাডি মাছ ধরেছি। লাডি মাছ তো ভোলার মতো নয়, এগুলি ইউজ করতে হয়।
রাজু: আর কার কার কাজ প্রিয়? পিকাসো আপনার ভাল লাগে না?
শাহাবুদ্দিন: পিকাসোর ব্রু পিরিয়ডটা আমাকে আকর্ষণ করে। ব্লু পিরিয়ডটা ভাল লাগে, (আচ্ছা আচ্ছা–রাজু) তাকে আমার এমনিতেও ভালো লাগে, কিন্তু ইনফ্লুয়েন্সড হই নাই। আসলে এ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিং আমি সেভেনটি সেভেন থেকে সেভেনটি এইট (১৯৭৭–৭৮) পর্যন্ত করেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে এতো সহজ, আমি কোনো ফিলিংস খুঁজে পাই নাই।
রাজু: আচ্ছা। আর…
শাহাবুদ্দিন: আমার কোনো ফিলিংস নেই। আমি আনহ্যাপি। এতো দূর এলাম, এই নিয়ে পরে থাকবো? দেখ, ওই বলিষ্ঠতা, ওই ডায়নামিজম। যেমন ধরো আর্কিটেক্ট লুই আই কানের এ্যাসেমব্লি, না করলেও তো চলতো। এই বিশালতা,এই বলিষ্ঠতা কিন্তু তোমাকে আমাকে জাগিয়ে তুলছে।
রাজু: বলিষ্টতার কথা যে আপনি বললেন…

শাহাবুদ্দিন: ডাইনামিজম। ডাইনামিজমের ইয়েটা আসে কখন? তোমার ব্যক্তিত্বের মধ্যে যদি থাকে, কিংবা তোমার পরিবেশ থেকেও আসতে পারে। সমুদ্রের ঝড় তুফান পার হওয়ার পর তোমার ডাইনামিজন কিন্তু অন্যরকম হয়ে যাবে। আমি এতো কিছু পার হয়ে এসেছি, এত কিছু করার পর আমার মধ্যে এই ডায়নামিজম এসেছে। পঁচাত্তরে এতো কিছু ঘটনার পরও যদি এখন আমি ফুল আঁকলাম, ই আঁকলাম–এটা অবাস্তব, এটা হতে পারে না।
রাজু: হ্যাঁ, হ্যাঁ। আরেকটা জিনিস, সেটা হলো, আমাদের এখানকার শিল্পী যারা বেঁচে আছেন এবং যারা প্রয়াত, তাদের কার কার ছবি আপনার ভাল লেগেছে?
শাহাবুদ্দিন: জয়নুল আবেদিন। তার পর ধরো, কামরুল হাসানের কাজ দারুণ।
রাজু: তাঁর ওই ফোক মোটিভের কাজগুলো?
শাহাবুদ্দিন: ফোক ঠিক না, ওরিয়েন্টাল মোটিভ, ওই যে মহিশ-টহিশের কাজ, শেষদিকের বেশি কাজ। এমনিতে ওনার হাত ভাল তো, বেশি পিকাসো হয়ে গেছে, তবে তার আগ পর্যন্ত, আই লাইক কামরুল হাসান। তার কলা গাছে কলার রংটংগুলি সুন্দর। তারপর সুলতান ভাই। তার এ্যাপ্রোচটা উনার খুব পরিস্কার। উনি ইনোসেন্ট। আর এখন পেইন্টিংয়ের মধ্যে আমিনুল ইসলাম। এরপর নো বডি এলস। এরপর ইয়ং।
যেমন ধরো, সোলাজের নাম শুনেছে? (কার নাম?–রাজু)। সোলাজ, নাম বোধ শুনবে না। টাপিয়েস?
রাজু: টাপিয়েস, হ্যাঁ, স্প্যানিস।
শাহাবুদ্দিন: জ্যাকসন জোন, রশন বেয়ার এদের নাম শুনেছো নিশ্চয়ই। (হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ–রাজু)। যেমন রশন বেয়ার, ধরতে পারছো কে? জ্যাকসন জোন, আমেরিকার। দেখবা আমেরিকান ফ্ল্যাগ আঁকা, এন্ডি ওয়ারহোলদের আগের। রশন বেয়ার, ডেঞ্জারাস পেইন্টার। উনার ইন্টারভিউ, এই যে আমার ইন্টারভিউ তুমি যেরকম নিয়েছো, আমেরিকার এক লোক নিয়েছে এইভাবে। বই বের করবে আমেরিকায়। রশন বেয়ারের ইন্টারভিউ নিয়েছে, শিল্পী শাহাবুদ্দিনের ইন্টারভিউ নিয়েছে। একটা বই বের করবে, তুমি যেরকম করবে না, সেরকম একটা ভলিউম করার কথা। যেদিন বই বের হবে, তার আগের দিন ওনার এ্যাইডস ধরা পরলো। হোমো ছিল।

সেখানে জ্যাকসন জন ছিল, তারপর ক্রিস্টপ ছিল, দেখবা যে ব্রিজ-ট্রিজ তাবু দিয়ে ডেকে দিয়েছে, নিউ কাইন্ড অফ আর্টস। অস্ট্রেলিয়ায় যেরকম আইল্যান্ড আছে না, পুরা আইল্যান্ড সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়েছে, নিউ কাইন্ড অফ আর্টস। এই জাতীয়। তো অনেকের ইন্টারভিউ নিয়েছিল, কতজনের জানি নিয়েছিল, আনা (স্ত্রী শিল্পাসমলোচক আনা ইসলামকে ইঙ্গিত করে) জানে। তো আমার সাথেই বেশি কথা হয়েছিল। এখন আমারটা আমি বলি কী করে। তারপরও আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম আমার সাক্ষাৎকার কেন নিচ্ছেন এত বড় বড় শিল্পীদের পাশে? উত্তরে উনি বললেন, ‘পু মোয়া তু এ লো মেইয়ো( আমার কাছে তুমি শ্রেষ্ঠ)’।
রাজু: আর ইয়াং কার কথা বলতে চাচ্ছিলেন?
শাহাবুদ্দিন: ইয়াং অনেকেই আছে, কিন্তু দুর্ভাগ্য কি জানো, আশ্চর্য, আশ্চর্য, বাংলাদেশ ঘুরলে আমার ভয়ই লাগে।
রাজু: কেন?
শাহাবুদ্দিন: এতো ট্যালেন্ট, আমার ভয়ই লাগে। (আচ্ছা–রাজু)। জেলাস ফিল করি। গুণ আছে। কিন্তু ঘটনা হলো পাঁচ বছর আগে আমি এক রকম দেখেছি, পরে অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। কারণ আছে কিন্তু, কারণটা হলো, আমাদের তালিটা (করতালি বাজিয়ে), তালিটা প্রয়োজন কিন্তু, সেই তালিটা ঠিক মতো পাচ্ছে না। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে তালিটা আসছে। সেটা ক্ষতিকর হয়ে যাচ্ছে। (ও, আচ্ছা, আচ্ছা- রাজু)। বুঝেছো? আমি আবারও বলছি তোমাকে, ওই যে তখন যদি (মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়কে ইঙ্গিত করে) আমি টাকার জন্য করতাম তাহলেই শেষ হয়ে যেতাম। টাকাটা আমার কাছে কিছু না। শোনো, যখন তুমি অর্থনির্ভর হয়ে যাও, তখন কিন্তু তুমি মেটেরিয়াল, ফিলোসফিক্যালি তখন তুমি চাও আর না চাও, পকেটে এক লাখ টাকা থাকলে তোমার অন্যরকম পার্সোনালিটি। তুমি অন্যভাবে কথা বলবে।
রাজু: হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি।
শাহাবুদ্দিন: ঠিক এটাই ঘটছে। সেনসেটিভ ব্যাপারতো । টাকা থাকলেই আর্টিস্ট হয় না। আর গরীব হলেই আর্টিস্ট হবে না–সে রকম লেখা নাই তো। টাকা থাকলে তো সব বড় লোকের ছেলেরা আর্টিস্ট হতো।
রাজু: হ্যাঁ, আর্টিস্ট হয়ে যেতো, কিন্তু সেটা তো হয় না।
শাহাবুদ্দিন: না। কিন্তু কতগুলি ডিসিপ্লিন আছে। বলে না, সাধনা করতে হবে, চর্চা করতে হবে। কতজনই করে চর্চা, এভরিডে চর্চা করে, তারপরও হয় না কেন? হয় না, অর্থাৎ এই ডিসিপ্লিন মানতে হয়তো, স্যাক্রিফাইজ থাকতে হয়।
রাজু: সেইটা বোধ হয় নাই আপনি বলতে চাচ্ছেন, তাই তো?
শাহাবুদ্দিন: যেহেতু ফ্যাশনের মতো করে নিচ্ছে, যেহেতু টাকা চাচ্ছে, গাড়ি ছিল না, গাড়ি চালাচ্ছে–এইসব চাহিদার দ্বারা আকৃষ্ট হচ্ছে ইয়ংরা। ওরা ট্যালেন্টেড কিন্তু গাইডেন্সের অভাব তো, ফট করে হয়তো বিয়ে করে গাড়ি, বিত্তবেসাত হয়ে যায়… পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।
রাজু: শেষ, হ্যাঁ, শেষ হয়ে যাচ্ছে।

শাহাবুদ্দিন: আগেকার যুগে, যেমন কামরুল হাসান, জয়নুল আবেদিনের সময়, চল্লিশ বছর যাবৎ তারা দিয়ে গেছেন। এখন কিন্তু উল্টো। এখন তুমি চল্লিশ বছরে আরম্ভ করো। আরম্ভ করেছ, কারণ এখন প্রতিযোগিতা বেড়ে গেছে।
আগে বিক্রি হলো কি হলো না, কিচ্ছু আসে যায় না। খাবার আছে। নো প্রবলেম। একটা দুইটা ছবি আঁকতো মাসে। এখন এভরিডে। এখন আমি প্রতিদিন আঁকার পরও পারছি না। তুমি মাসে একটা এঁকে তো পারবে না। ট্যালেন্ট আমারও আছে, তোমারও আছে। ধরো ব্যাপারটা হলো কমপিটিশনে ইয়ংরা এই যে চল্লিশ, তারপর আর পারে না। যেহেতু ও ইনভল্ব হয়ে যাচ্ছে অন্যকিছুতে।
রাজু: টাকা, অন্যান্য…
শাহাবুদ্দিন: ইনভল্ব হয়ে পড়ছে সামাজিক ব্যাপারে, তারপর ধরো, বিশেষ করে সেক্স-এ। সেক্সটা তো মূল সম্পদ ক্রিয়েটরের জন্য, একটা সাধনার বিষয়। এই যে বললাম না, সাধনা ফ্যাসনের দিকে।
তার পরে আছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অস্থিতিশীলতা, পরিবর্তন, আরও কত কি আছে…– এগুলো তাকে প্রভাবিত করছে না। সে স্কেপ করছে এগুলো থেকে। এই স্কেপ করার মানে তো তুমি আর নাই।
রাজু: শিল্পী মরে যায়।
শাহাবুদ্দিন: ধরো, আমি যদি সুন্দরবনে যাই, এখন সুন্দরবনে গিয়ে যদি আমি ঢাকার ছবি আঁকি তাহলে খামাখা সুন্দরবনে গেলাম ক্যান?
রাজু: হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন।
শাহাবুদ্দিন: এখন তুমি যদি মেক্সিকোতে যাও, মেক্সিকোতে গিয়ে যদি বাংলাদেশের মতোই চলো, তাহলে মেক্সিকোতে গিয়া কি লাভ হলো। ইউ মাস্ট টেক সামথিং ফ্রম মেক্সিকো। ওখানকার নেচার, ওখানকার জীবন–এগুলো নেবে না? এগুলি হজম করতে হবে। কঠিন জিনিস কিন্তু।
রাজু: হ্যাঁ, অবশ্যই।
শাহাবুদ্দিন: কিছু কিছু লোক পারে এগুলা। ওইটার জন্য কিন্তু অনেক জিনিসের দরকার হয়, তার মধ্যে মনে কর পার্টনার। এখন পার্টনারও কিন্তু ক্রিয়েট করতে হয়। তারপর লাকের(Luck) ব্যাপারও আছে। থাকে না?
রাজু: ঠিকই বলেছেন। আগামী ১১ তারিখে (১১ অক্টোবর) আপনার জন্মদিন। তো এই সুযোগে আপনাকে জন্মদিনের অগ্রিম শুভেচ্ছা জানিয়ে রাখি। আশা করি এগার তারিখে আবার দেখা হবে। অনেক ধন্যবাদ শাহাবুদ্দিন ভাই, আপনি মূল্যবান সময় দিলেন। দীর্ঘ সময় আপনার থেকে ছিনিয়ে নিলাম।
শাহাবুদ্দিন: হা-হা-হা (হাসি)। তোমাকেও ধন্যবাদ।
রাজু: আমি জানি, আরো অনেক কিছু আপনার সঙ্গে বলার আছে। পরবর্তীতে অবশ্যই তা নিয়ে বলা যাবে।
শাহাবুদ্দিন: ঠিক, ঠিক। ভাল থেকো।

সাক্ষাৎকারগ্রহিতার অনুমতি ছাড়া এই সাক্ষাৎকারে ব্যবহৃত কোন ছবি ব্যবহার করা যাবে না।

শ্রুতিলিখন: অলাত এহ্সান

ইতিপূর্বে আর্টস-এ প্রকাশিত রাজু আলাউদ্দিন কর্তৃক গৃহীত ও অনূদিত অন্যান্য সাক্ষাৎকার:
দিলীপ কুমার বসুর সাক্ষাৎকার: ভারতবর্ষের ইউনিটিটা অনেক জোর করে বানানো

রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে সনজীদা খাতুন: “কোনটা দিয়ে কাকে ঠেকাতে হবে খুব ভাল বুঝতেন”

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাক্ষাতকার: “গান্ধী কিন্তু ভীষণভাবে সমাজতন্ত্রবিরোধী ছিলেন”

নন্দিতা বসুর সাক্ষাতকার: “তসলিমার মধ্যে অনেক মিথ্যা ভাষণ আছে”

ভরদুপুরে শঙ্খ ঘোষের সাথে: “কোরান শরীফে উটের উল্লেখ আছে, একাধিকবারই আছে।”

শিল্পী মনিরুল ইসলাম: “আমি হরতাল কোনো সময়ই চাই না”

মুহম্মদ নূরুল হুদার সাক্ষাৎকার: ‘টেকনিকের বিবর্তনের ইতিহাস’ কথাটা একটি খণ্ডিত সত্য

আমি আনন্দ ছাড়া আঁকতে পারি না, দুঃখ ছাড়া লিখতে পারি না–মুতর্জা বশীর

আহমদ ছফা:”আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই”

অক্তাবিও পাসের চোখে বু্দ্ধ ও বুদ্ধবাদ: ‘তিনি হলেন সেই লোক যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি ’

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০০৯: রেডিও আলাপে হার্টা ম্যুলার

কবি আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুর রাহমান-এর দুর্লভ সাক্ষাৎকার

হুমায়ুন আজাদ-এর সঙ্গে আলাপ (১৯৯৫)

নির্মলেন্দু গুণ: “প্রথমদিন শেখ মুজিব আমাকে ‘আপনি’ করে বললেন”

গুলতেকিন খানের সাক্ষাৎকার: কবিতার প্রতি আমার বিশেষ অাগ্রহ ছিল

নির্মলেন্দু গুণের সাক্ষাৎকার: ভালোবাসা, অর্থ, পুরস্কার আদায় করতে হয়

ঈদ ও রোজা প্রসঙ্গে কবি নির্মলেন্দু গুণ: “ আমি ওর নামে দুইবার খাশি কুরবানী দিয়েছি”

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (9) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — december ১৬, ২০১৬ @ ৯:২৯ পূর্বাহ্ন

      প্রথমদিকে শিল্পীকে একটু ডিস্টার্বড মনে হলেও, রাজু ভাই নিজ আন্তরিকতার গুণে তার হৃদয়ে প্রবেশ করে, আসল শাহাবুদ্দিন বের করে এনেছেন। দুর্দান্ত সাক্ষাৎকার হে সাক্ষাৎকারসম্রাট। অভিনন্দন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন kazi mushfiqus saleheen — december ১৬, ২০১৬ @ ১:৪২ অপরাহ্ন

      Hell of a interview.Good Job. Eloquent and resourceful .Raju Vai ,Keep in mind to publish it sometime.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন razualauddin — december ১৬, ২০১৬ @ ২:৪৯ অপরাহ্ন

      প্রিয় শিমুল,
      আপনি ঠিকই ধরেছেন । শাহাবুদ্দিন ভাই শেখ মুজিবের ব্যাপারে খুব স্পর্শকাতর। তবে তিনিও হয়তো বুঝতে পেরেছেন যে আমি মুজিবানুরাগী। এ্ই জন্য দেখবেন পরে অজান্তেই বহুবার ‍‘মুজিব’ বলার পরও তিনি আর কিছু বলেন নি। প্রাথমিক বাধাটা কেটে যাওয়ার পর তিনি অবশ্য দীর্ঘ সময় কথা বলার পরও বিরক্তি বোধ করেননি। তার মানে তিনি বলার মুড ফিরে পেয়েছিলেন বা সেই মুডটা তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। আপনি তো এখন আমাদের প্র্রথম সারির সাক্ষাতকার গ্রহিতাদের একজন, ফলে আপনি জানেন সাক্ষাতকার গ্রহণের সময় কতটা স্পর্শকাতর সংবেদনশীলতা নিয়ে পুরো ব্যাপারটিকে হ্যান্ডেল করতে হয়। সাক্ষাতকারটি আপনার ভালো লেগেছে জেনে খুবই অনুপ্রাণিত বোধ করছি। আপনাকে শুভেচ্ছা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন razualauddin — december ১৬, ২০১৬ @ ২:৫২ অপরাহ্ন

      Dear kazi mushfiqus saleheen

      Thanks for your comment. Yes, i have a plan to publish it in form of book.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইয়াছিন আহমদ — december ১৬, ২০১৬ @ ১১:১৯ অপরাহ্ন

      আমি আপনার এই সাক্ষাৎকারটাসহ অনেকগুলো সাক্ষাৎকার পড়লাম। পড়ে মনে হল আপনি সাক্ষাৎকারের রাজা। ধন্যবাদ এইসব গুণী মানুষদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য এবং আমাদেরকে পড়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Ahmed Ahsanuzzaman — december ১৬, ২০১৬ @ ১১:২৩ অপরাহ্ন

      It’s a wonderful interview. The interview has created a space for the artist to open up. Fabulous! Thank you. Ahmed Ahsanuzzaman, Khulna University

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন লোকমান হেকিম — december ১৮, ২০১৬ @ ১:০৪ অপরাহ্ন

      চমৎকার একটি সাক্ষাৎকার একটানে পড়ে ফেললাম। ধন্যবাদ রাজু আলাউদ্দিন এবং শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদকে। এই সাক্ষাৎকারের কিছু বিষয় ভবিষ্যতে উদ্ধৃত হবে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন কারনেই। প্রথমদিকে একটু আড়ষ্ট মনে হলেও সাক্ষাৎকারটিতে দুর্দান্ত গতি আছে। শিল্পীর আঁকা ছবির মতোই। আপনার প্রতিটি সাক্ষাৎকারই এজন্য অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে আমরা পড়ি।

      তবে শিল্পীর সক্রিয় যুদ্ধ জীবনের আরো কিছু স্মৃতি আনা যেতে পারত। যেমন ঢাকার গেরিলা যুদ্ধ সম্পর্কে।

      আরেকটি বিষয়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গুন বর্ণনা প্রসঙ্গে তাঁর বংশীয় যে প্রভাব বর্ণনা করা হয়েছে তা আনলেই ভাল হতো। এমনিতেই এদেশের মানুষ নিয়তিবাদী। নিয়তিবাদ মানুষের অর্জিত গুনকে ম্লান করে দেয়।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শাহজাহান সৌরভ — december ২০, ২০১৬ @ ৫:১৫ অপরাহ্ন

      শিল্পীকে বিনম্র শ্রদ্ধা। সাক্ষাতকারটি অসাধারণ হয়েছে। ছোট গল্পের মতো খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেলো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাপস গায়েন — december ২৬, ২০১৬ @ ৯:২৫ অপরাহ্ন

      ‘আমার সোনার ছেলেরা ছবি আঁকতে পারে, যুদ্ধও করতে পারে’- বঙ্গবন্ধুই পারেন এমন করে বলতে । শিল্পী শাহাবুদ্দিনের চিত্রকর্ম যখন প্রথম দেখি, তখন সেই কাজের ভিতরে গতি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম, ভেবেছিলাম ইউজিন দেলোক্রয়ার ছবির কথা । চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিনের সাথে কবি রাজু আলাউদ্দিনের এই আলাপচারিতা মুক্তিযুদ্ধের জন্য এক অসামান্য দলিল হয়ে রইল । গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা রইল শিল্পী শাহাবুদ্দিনের প্রতি আর কবি রাজু আলাউদ্দিন, আপনাকে আমার আলিঙ্গন !

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।