আহারে, চলে গেলো মন খারাপের গাড়ি

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল | ৭ december ২০১৬ ৭:৪৪ অপরাহ্ন

ক.
আমি ভালোবেসে তাকে শাকিল না বলে, শালিক পাখি বলতাম। সে বলতো, ‘আপনি তো রবীন্দ্রনাথের প্রবাস-পাখি। দুলাল ভাই, দেশে ফিরে আসুন। আপনাকে আমাদের দরকার!’

বলতাম, কানাডায় না এলে কি খুনি নূরকে নিয়ে বই লিখতে পারতাম?

তখন জবাবে সে বলতো, তা ঠিক। আর আপনি জাতির পিতাকে নিয়ে একের পর এক যে কাজ করে যাচ্ছেন, আমরা আপনার কাছে কৃতজ্ঞ!
মাহবুবুল হক শাকিল, তোমার কাছেও আমরা কৃতজ্ঞ! তুমি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার রূপকার ভ্যাঙ্গুভারের বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম এবং কবি শহীদ কাদরী মারা যাবার পর যে ভূমিকা নিয়েছ, তা কোনো দিন ভুলবার নয়।

Dulalরফিক ভাই চলে যাবার পর তোমার কাছে যে সহযোগিতা পেয়েছি তা আজ আবারও মনে পড়ছে। তুমি প্রধানমন্ত্রীর শোকবাণী, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা করেছ। এবং তারচেয়েও বেশি শহীদ ভাইয়ের মৃত্যুর পর তুমি যে কত বার কাঁদতে কাঁদতে ফোন করে অস্থির করেছো। বলেছো- দুলাল ভাই, যে ভাবেই হোক শহীদ কাদরীকে দেশের মাটিতে ঘুমানোর ব্যবস্থা করেন। তুমি সারারাত জেগে ঢাকা-টরন্টো-নিউ ইয়র্ক ক্রমাগত ফোনের পর ফোন করে যাচ্ছিলে! এবং ৩৩ বছর বিদেশে থাকার একজন কবিকে দেশে নিয়ে যে সন্মান এবং মর্যাদা দিয়েছো, তা ভাবলে গর্বে বুক ভরে যায়।

এছাড়াও সৈয়দ শামসুল হকের অসুস্থতার সময় তোমার উদ্যোগ এবং আন্তরিকতা সবাই লক্ষ্য করেছে। তুমি অসুস্থ কবি হেলাল হাফিজকে সুচিৎকিসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিয়ে গেছো।

ফ্রাংফুর্ট বইমেলায় বাংলাদেশের প্রকাশনাকে অন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার পেছনে তোমার নেপথ্যের ভূমিকা আমাদেরকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু তুমি আমাদের ফেলে একাই চলে গেলে অনেক দূর। শালিক পাখি তুমি হয়ে গেলে অনন্তের পাখি!

খ.
২০১৫ সালের বইমেলায় দেখা হবার সাথে সাথে লিখে দিয়েছিলেন তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ খেরোখাতার পাতা থেকে। বইটি আনা হয়নি টরন্টোতে, তাই পড়াও হয়নি। তবে ফেইসবুকে দেয়া প্রায় সব কবিতা পড়তাম। সেদিন রাতে শুনছিলাম, পাঞ্জেরি থেকে প্রকাশিত আসাদুজ্জামান নূরের কন্ঠে শাকিলের কবিতার ক্যাসেট- রাতের এপিটাফ। ‘দুঃখ কিশোরী, আপনার চোখে জেগে থাকে সমস্ত সকাল/ শিশিরের গন্ধ, হিমমাখা চাঁদর/ মায়ের মমতার মতো ধোঁয়া ওঠা ভাপা পিঠা/ শীতের মুড়ি। এক কাপ চা/ দুই বেণী বোন আমার, দুঃখ কিশোরী বোন আমার’… শুনতে শুনতে চোখ ভিজে গিয়েছিলো।

তাঁর সর্বশেষ কবিতা ‘এলা, ভালবাসা, তোমার জন্য’তে দুটি বিষয় খুঁজে পাওয়া যায়। এক অভিমান। দুই মৃত্যুচিন্তা।

এক হেমন্ত রাতে অসাধারণ
সঙ্গম শেষে ক্লান্ত তুমি, পাশ ফিরে শুবে।
তৃপ্ত সময় অখন্ড যতিবিহীন ঘুম দিবে।
তার পাশে ঘুমাবে তুমি আহ্লাদী বিড়ালের মতো,
তার শরীরে শরীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে, মাঝ রাতে।
তোমাদের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকবে এক প্রগাঢ় দীর্ঘশ্বাস,
আরো একবার তোমাদের মথিত চুম্বন দেখবে বলে।
মৃতদের কান্নার কোন শব্দ থাকে না, থাকতে নেই,
নেই কোন ভাষা, কবরের কোন ভাষা নেই।
হতভাগ্য সে মরে যায় অকস্মাৎ বুকে নিয়ে স্মৃতি,
তোমাদের উত্তপ্ত সৃষ্টিমুখর রাতে। ভালবাসা, তোমার জন্য।

ব্যক্তিগত জীবনে নিজেকে অনেক কষ্ট দিয়েছেন শাকিল। কী ছিল সেই অভিমান? কার সাথে ছিল তাঁর অভিমান!

গ.
সুদর্শন শাকিলের অনেক গুণ ছিলো। বিশেষ করে মানুষের সাথে মেশার ক্ষমতা ছিলো অসাধারণ। আনিসুজ্জামান স্যারের কথায় বলতে চাই, ‘শাকিলের চলে যাওয়া গভীর বেদনাদায়ক। তার বয়স, সৃষ্টিশীলতা, সৃজনশীলতা, বুদ্ধিমত্তা কোনোটাই চলে যাওয়ার মতো না। তার পড়ালেখা, লেখনী, শিল্প-সাহিত্যতে ভীষণ ক্ষুরধার ছিল।’ অভিমানী শাকিল বেঁচে থাকলে শিল্প-সাহিত্যে অনেক অবদান রাখতে পারতেন, তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

এবং ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি আর রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি আদর্শগত পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন কবি মাহবুবুল হক শাকিল। রাজপথের মিছিল, মিটিং, প্রথাগত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ছেড়ে হাতে তুলে নিয়েছিলেন কলম’।

মাঝে মাঝে ইনবক্সে কথা হতো। কত টুকরো টুকরো কথা। ব্যক্তিগত, রাজনীতি, কবিতা। কখনো আকারে ইঙ্গিতে সেই ‘এলা’র কথা, কানাডা থেকে নূর চৌধুরীকে ফেরত নেয়ার কথা হতো। সর্ব শেষ আমাদের কথা হলো এই স্যাস্টাস নিয়ে।

‘মূলত আমি কেউ না, না রাজনীতিবিদ, না কবি, না গল্পকার, এমনকি নই তুমুল সংসারী| এক অভিশপ্ত চরিত্র যার কিছুই থাকতে নেই| সাধু কিংবা সন্ত নই, চোখ জ্বলজ্বল করে জীবনের লোভে| চন্দ্রাহত, বিষাদ এবং ভূতগ্রস্থ, বসে থাকি ব্রহ্মপুত্র ঘাটে, শেষ খেয়ার অপেক্ষায়’…..

আমি আঞ্চলিকতা বিশ্বাস করি না। তবু বলতে- ভাই আমরা তো ব্রহ্মপুত্রের সন্তান! তাই আমরা বড় ভাই, ছোট ভাই।

কিন্তু আমি দ্বিমত পোষন করি, বাকি কথাগুলোর। তবে ‘চোখ জ্বলজ্বল করে জীবনের লোভে’, তার এই লোভ ছিলো কবিতার জন্য। রাজনীতির জন্য নয়। যদিও তাঁর রক্তে মিশে ছিলো রাজনীতি।

দলের কাউন্সিল রেখে সাহিত্যপাগল শাকিল চলে গেছে লন্ডন-ফ্রাংকফুর্টের বইমেলায়। নেতাকর্মীদের রেখে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আড্ডা দিচ্ছেন প্রকাশক মাজহার-শাকিল, সাংবাদিক অঞ্জন-প্রণব, লেখক সাবের-শাকুরদের সাথে। মন্ত্রী-এমপি রেখে মিশে যাচ্ছে শিক্ষক আনিসুজ্জামান-সৈয়দ মনজুরুল ইসলামদের সাথে! ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকেও টাকা-পয়সা, অর্থ-বিত্ত পায়ে ঠেলে চলে এসেছে কবিতার কাছে, হয়েছে কবিতা-মাতাল। আহ, কবিতা! আহরে মন খারাপের গাড়ি…
Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Riyadh — december ৭, ২০১৬ @ ১০:০০ অপরাহ্ন

      নিরহংকারী একজন ভদ্রলোক ছিলেন…. মেনে নিতে পারছি না শাকিল ভাইয়ের এই অকাল প্রয়াণ। আমি ওনার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন newton — december ৮, ২০১৬ @ ১২:৩৩ অপরাহ্ন

      sakil vai. khub alpa samoye nije k proman korechen– ami nirlov kobi, ami manus k valobeshechi,kichu dite asechi ai vubone.take doya kori. tini valo thakben chirodin manuser ridoyee. tar chole jaowa mene neya jay na.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফকির সেলিম — december ১০, ২০১৬ @ ৯:২৬ অপরাহ্ন

      কবিতা-মাতাল। আহ, কবিতা! আহরে মন খারাপের গাড়ি…
      দুলাল ভাই-মনটা খুবই খারাপ–আপনার লেখা পড়ে আরো খারাপ হলো
      কিন্তু চমৎকার লেখা- শেষ কথাগুলো পড়ে মনটা ভালো হয়ে গেল–আহ কবিতা

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com