অমৃত সমান : সালাহ্উদ্দীন আহমদের জীবনস্মৃতি

সনৎকুমার সাহা | ২৯ নভেম্বর ২০১৬ ৫:৩৭ অপরাহ্ন

border=0আমি ইতিহাস পড়িনি। সরাসরি তাঁর ছাত্র নই। কিন্তু নির্দ্বিধায় যাঁদের গুরু মেনেছি, তিনি তাঁদের একজন। অন্যজন আমার পাঠ্য বিষয়ের শিক্ষক প্রফেসর মুশাররফ হোসেন। কিন্তু প্রফেসর হোসেনের কাছেও তিনি শুধু অগ্রজ বন্ধুই ছিলেন না। ছিলেন অবিমিশ্র শ্রদ্ধার, অন্তহীন আস্থার, দৃঢ়চেতা, সদা প্রশান্ত এক মনীষী। মাঝে মাঝে মজা করে তাঁর ধৈর্যচ্যূতি ঘটাতে মুশাররফ হোসেন নানাভাবে তাঁকে উস্কে দেবার চেষ্টা করতেন। কিন্তু হার মানতেন বারবার। মনে হয়, তিনিও এমনটিই চাইতেন। পরে বলতেন, এই একজন মানুষ। মানুষই, কিন্তু দেবতারও প্রণম্য। অবশ্য দেবতা বলতে তিনি বুঝতেন, বাস্তবে দ্বান্দ্বিক জটিলতার অসংখ্য টানা-পড়েনের ভেতর বিবেকশুদ্ধ আচরণ যাঁর কখনও বিচলিত হয় না, তাঁকে। এই মানুষটি প্রফেসর সালাহ্উদ্দীন আহমেদ। ঠিক দু বছর আগে ১৯ অক্টোবর, ২০১৪-য় তাঁর জীবনাবসান। বয়স নব্বই অতিক্রান্ত। দীর্ঘ জীবনই বলা যায়। কিন্তু কখনোই তা বাতিলের মিছিয়ে হারিয়ে যায় না। আক্ষেপ এখনও মাথা কোটে।

কথাগুলো নতুন কিছু নয়। তবু আর একবার বলি তাঁর জীবনস্মৃতি ফিরে দেখা পড়ার আবেগে। বইটির প্রকাশনা তাঁর মরণোত্তর। ২০১৫-র মহান একুশে বইমেলায়। শেষের দিনগুলোয় নিজে হাতে লেখেননি। একাকী হয়ে পড়া গার্হস্থ্য জীবনে সার্বক্ষণিক সেবক অমল কৃষ্ণ হাওলাদারের ছেলে আশিস কুমার শ্রুতিলিখন নেয়। কিছুদূর এগোলে শুনে শুনে কম্পিউটারে ধরে রাখতে শুরু করে। পরে স্যর দেখে দেন। এই ভাবেই এগোচ্ছিল। কিন্তু শেষ হয় না। ১৮ অক্টোবর রাতে অন্যদিনের মতোই ঘুমোতে যান। ঘুমের ভেতরে অসুস্থ হয়ে পড়া। পরদিন সকালে অমল ও আশিস টের পায়। অতি কষ্টে শুধু বলতে পারেন তিনি একবার, ‘আমি মনে হয় আর নেই।’ তারপরে মহাপ্রস্থান। অসম্পূর্ণ তাঁর পাণ্ডুলিপি গুছিয়ে নিয়ে ছাপার ব্যবস্থা করেন অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ। প্রকাশনার দায়িত্ব নেয় ঢাকার অ্যাডর্ন পাবলিকেশন্স। একটা অদ্ভুত মিল, প্রকাশের আগে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পূর্বাপর দেখে দেন প্রফেসর সালাহ্উদ্দীন আহমেদই। তাঁর স্মৃতিকথাও পুরো হলো না। তবে বঙ্গবন্ধুর বইটিতে তাঁর ব্যক্তিত্ব যেমন তাঁর নিজস্বতা নিয়ে সর্বাত্মক ফুটে ওঠে, এটিতেও স্যারকে চিনে নিতে এতটুকু ভুল হয় না। না-বলা অংশ অনেকটাই আমাদের জানা। কারণ, তিনি তখন লোকমান্য একজন। সবাই তাঁকে চেনে। এখানে তাঁর হয়ে ওঠার অংশটিই আমাদের মুগ্ধ আকর্ষণ পুরোপুরি ধরে রাখে। এতটুকু তাল কাটে না। প্রসন্নতার মাধুর্য্যে আমরা আবিষ্ট হই। প্রাচীন শ্রুতি যেমন পবিত্র, এই শ্রুতিলিখনই আমার কাছে তেমন মনে হয়। পড়ে আমাদের আত্মশুদ্ধি ঘটে।

বইটির ধারাবাহিকতা থেকে সরে এসে একটা কথা আগাম জানাই। আশা করি এতে ‘মহাভারত অশুদ্ধ’ হবে না। তাঁর সহধর্মিনী ছিলেন হামিদা খানম। নিজেই তাঁর নাম গভীর অনুরাগে বার বার উচ্চারণ করেছেন। তবু মনে হয়, যেন সবটা ফুটলো না। বিশেষ করে যাঁরা তাঁদের দেখেননি-জানেননি, তাঁরা বোধহয় শুধু বিষয়-বর্ণনাতেই আটকে থাকবেন। অন্তর্দেশের হদিস না-ও পেতে পারেন। রঘুবংশ-এ কালিদাস যেমন অজরাজার কাছে রানী ইন্দুমতিকে চিনিয়েছেন ‘গৃহিনী সচিব সখি মিথ ললিতে কলাবিধৌ’― স্যর-এর কাছে হামিদা ভাবীও ছিলেন ঠিক তাই। তাঁদের পরিচয় কিন্তু গত শতকের চল্লিশের দশকে। ভাবী ওই সময়েই কলকাতা বেথুন কলেজের অধ্যাপক। স্যর ট্রেড ইউনিয়ন, রেডক্রস―এইসব নিয়ে ব্যস্ত। তার ভেতরেও স্যর জানাচ্ছেন, ‘হামিদাকে দেখে আমার ভীষণ ভালো লেগে গেল। তাঁর চেহারা, কথাবার্তা এবং ব্যক্তিত্বের মধ্যে এমন একটা মাধুর্য ছিল, যেটা আমাকে অভিভূত করলো।…’ তিনিই উপযাচক হয়ে একদিন গিয়ে, তাঁর কথাতেই শুনি, ‘হামিদাকে একপাশে ডেকে নিয়ে বললাম, আপনাকে আমার খুব ভালো লেগেছে; আপনি কি আমাকে বিয়ে করতে রাজি হবেন?’ এইভাবে তাঁদের বিয়ে ঠিক হয়। যেটা বলবার তা হলো, পারস্পরিক ভালোলাগা ছাড়াও ছিল তাঁদের একে অন্যে অটুট আস্থা। Till death do us part― তা ম্লান হয়নি।

salauddan-1তবে বিয়ে ঠিক তখনই ঘটে না। ভাবী ছিলেন দর্শনের মেধাবী ছাত্রী। অসাধারণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখায় ১৯৪৭-এর আগস্টেই উচ্চতর শিক্ষার বৃত্তি পেয়ে তাঁর বিলেত যাওয়া আগে থেকে নির্ধারিত ছিল। ঠিক হয়, পড়াশোনা শেষে তিনি ফিরে আসবেন ঢাকায়। স্যরও কলকাতার পাট চুকিয়ে চলে যাবেন ওখানে। তারপর বিয়ে। ঘটেও তাই। ভাবী ১৯৪৯-এ লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে অর্নাস করে ফিরে আসেন। তখনও জাহাজে যাতায়াত। ফেরার পথে তা ভিড়বে বম্বে বন্দরে। স্যর ঢাকা থেকে গিয়ে সেখান থেকে তাঁর বাগদত্তাকে নিয়ে এলেন। বিয়ে হলো ডিসেম্বরে। স্যর অকপটে লিখেছেন(অবশ্য সব লেখাই তাঁর অকপট। কপটতা তাঁর ও ভাবীর ছিল স্বভাববিরুদ্ধ) : ‘হামিদার মতো একজন প্রিয়দর্শিনী, গুণবতী, মমতাময়ী রমণীকে নিজের জীবনসঙ্গিনী হিসেবে পেয়ে আমি নিজেকে পরম সৌভাগ্যবান মনে করেছিলাম। তার গানের গলা ছিল অসাধারণ; রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুলগীতি গাইতে খুব ভালোবাসতো, কিন্তু চাকরিতে ঢোকার পর গানের চর্চা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এ কথা বলতে আমার দ্বিধা নেই যে আমি হামিদাকে পেয়েছিলাম কেবল প্রিয়তমা স্ত্রী হিসেবে নয়, তাঁকে পেয়েছিলাম পরম বন্ধু হিসেবেও।’

এখন পেছন ফিরে তাকিয়ে আমার মনে হয়, ভাবী যদি পাকিস্তানের সরকারি উচ্চতর শিক্ষা-ব্যবস্থায়, তা সে যত মর্যাদারই হোক, জড়িয়ে না পড়তেন, তা হলে হয়তো তাঁর সৃষ্টিশীল প্রতিভা আরো বিকশিত হতো। অবশ্য যে প্রায় দু দশক আগে তাঁর স্মৃতিকথা লিখে রেখে গেছেন, ঝরা বকুলের গন্ধ, তা আমার বিবেচনায়, বাংলা ভাষায় এ জাতীয় সেরা বই-এর একটি। তাঁর আপন বড় ভাই, আবদুল আহাদ ছিলেন অবিভক্ত বাংলায় রবীন্দ্রসংগীত গাইবার প্রধান বিশেষজ্ঞদের অন্যতম। এ থেকেও আন্দাজ করতে পারি, ভাবী গানের চর্চার অবকাশ যদি পেতেন, তবে তাঁর অর্জন কোথায় গিয়ে পৌঁছুত।

আমি স্যর-এর কাছাকাছি প্রথম আসতে পারি গত শতকে ষাটের দশের মাঝামাঝি সময়ে। তখনও কিন্তু ভাবী ঢাকায়, আর স্যর রাজশাহীতে। ভাবী ও স্যর ছিলেন নিঃসন্তান। ছুটি হলে স্যর যেতেন ঢাকায়, কখনো-কখনো ভাবীও আসতেন। সেই সূত্রেই তাঁর সঙ্গে পরিচয়। অমন ব্যক্তিত্ব ও রুচিশীলতা খুব কম জনের ভেতর দেখেছি। তাঁর উপস্থিতি কোনো আসরে সবাইকেই তাঁদের সীমানার ব্যাপারে সচেতন রাখতো। অধ্যাপক বদরুদ্দীন উমরের মতো প্রতিভাবান একরোখা ধারালো তার্কিকও ভেবেচিন্তে কথা বলতেন। হামিদা ভাবীর চিরবিদায় ঘটে স্যর চলে যাবার বছর দু-আড়াই আগে। তখনই কেবল স্যরকে আকুল ও অসহায় দেখেছি। এর পর-পরই তাঁর যে বইটি(ইতিহাস ঐতিহ্য জাতীয়তাবাদ গণতন্ত্র : নির্বাচিত প্রবন্ধ) বেরোয়, তা উৎসর্গ করেন ভাবীর স্মৃতিতে। সঙ্গে জুড়ে দেন, রবীন্দ্রনাথের পঙ্ক্তি : ‘নয়ন সমুখে তুমি নাই, নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই।’ এ তাঁর আতিশয্য নয়। স্যরকে যেমন জেনেছি, শান্ত সত্য বোধ ছাড়া তিনি একটি বাক্যও লেখেননি। আরো মনে করি, যে কাজ তাঁকে প্রথম আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দয়ে, সেই বিখ্যাত বই Social Ideas and Social Change in Bengal 1818-1835-এর উৎসর্গপত্রে লেখা, ‘For Hamida.’

স্যর তর্কেও পরিশীলিত রুচি দিয়ে বক্তব্যের দৃঢ়তাকে ধরে রাখতেন। বোধহয় তাঁর শেষ মতান্তর ঘটে বঙ্গবন্ধুর ৭-মার্চের ভাষণ নিয়ে, তাঁরই একজন স্নেহধন্য প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে। স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট তিনি যেভাবে ইতিহাসের নৈর্ব্যক্তিকতায় তুলে ধরেন, তাতে তর্কের বিষয় অকিঞ্চিৎকর হয়ে যায়। বক্তব্যে এতটুকু শৈথিল্য আসে না। কিন্তু মনোমালিন্যের কোনো সুযোগ রাখেন না। এটা কৌশল নয়, তাঁর অন্তর্জাত শর্তহীন মানবিক মূল্যবোধ। এবং তার পেছনে কাজ করেছে তাঁর হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা। এক আলোকিত পথে সেই অভিজ্ঞতার নির্মাল্য ফুটে উঠতে দেখি এই অসম্পূর্ণ ফিরে দেখা-য় । হয়তো এটিই আমাদের শেষ সম্বল।

একটু আগেই বলেছি, স্যর-এর সঙ্গে আমার প্রথম মুখোমুখি পরিচয় গত শতকের ষাটের দশকে মধ্যবর্তী কালে। দেখেছি অবশ্য তাঁকে আরো আগে। ভাসা ভাসা জানতাম, তিনি ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছেন। ডক্টর এ.আর. মল্লিকের খুবই ঘনিষ্ঠ। ঘনিষ্ঠ ডক্টর মুশাররফ হোসেন ও অধ্যাপক বদরুদ্দীন উমরেরও। আসলে তাঁদের গোটা দলটিই আমাদের আকর্ষণ করতো বেশি। কারো জীবন-কাহিনি জানার তেমন আগ্রহ জাগেনি। তবে তাঁদের ভেতরে স্যর একা থাকতেন, মাঝে মাঝে ভাবী আসতেন, দীর্ঘ ছুটিতে তিনিও যেতেন ঢাকায়, এটা চোখে পড়তো। একটু ঘনিষ্ঠ হলে তাঁর বাসায় গিয়ে কখনো-কখনো সারাদিন কাটিয়েছি, অনেক ভালো-ভালো গান শুনেছি। তাঁর ছিল চমৎকার এক লং-প্লেয়িং রেকর্ডার। আর ছিল সমৃদ্ধ রেকর্ডের সংগ্রহ। রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ড তো ছিলই, তখন এমন থাকা আমাদের প্রতিবাদকেও ফুটিয়ে তুলতো। সেই সঙ্গে ছিল অতুলপ্রসাদের অসাধারণ সব গান। মঞ্জু গুপ্ত, কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়, এঁদের গাওয়া। অনেক গান তাঁর বাসাতেই আমার প্রথম শোনা। তিনি বিরক্ত হতেন না, বরং প্রশ্রয়ই দিতেন।

Salahuddin-Ahmed_0001আসলে তিনি ছিলেন সত্যিকারের সমঝদার। ভাবী যে গান গাইতেন, এটা তখন জানতাম না। জানলে উৎসাহ আমাদের আরো বাড়তো। তবে স্যর-এর জীবনকথা শোনার আলাদা আগ্রহ জাগেনি। পেনসিলভেনিয়া ও লন্ডনে গবেষণায় তাঁর অসাধারণ খ্যাতি তাঁকে যেভাবে বিশিষ্ট করে তুলেছিল, তাতে আর কিছু জানার প্রয়োজন আছে, এটা মনেও হয়নি। মাঝে মাঝে কানে আসতো, দেশভাগের আগে তিনি মানবেন্দ্রনাথ রায়ের র‌্যাডিক্যাল হিউম্যানিজম-এ আকৃষ্ট হয়েছিলেন, যেমন হয়েছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই অঙ্কশাস্ত্রের অধ্যাপক, একাত্তরের শহীদ হবিবুর রহমান ও উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডক্টর আলী মুহাম্মদ ইউনূস। ডক্টর ইউনূসকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়নি। হঠাৎই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এখানে কিন্তু র‌্যাডিক্যাল হিউম্যানিজম চর্চার কোনো আয়োজন গড়ে ওঠেনি। স্যরকে বা অধ্যাপক হবিবুর রহমানকে দেখে আমরা এর বৈশিষ্ট্য কিছু আঁচ করে নিতাম। তা তাঁদের আকর্ষণ বাড়াতো।

এই সময়ের কথা অবশ্য বইতে প্রক্ষিপ্ত কিছু এসেছে। পরেরটা আগে, এইভাবে কোনো কোনো মানুষ বা ঘটনা স্মৃতির টানে ঢুকে পড়েছে। মনে হয়, পরিকল্পনা করে নয়। হয়তো পুরোটা বলা হলে তারা আবার ফিরে আসতো। আমরাও আরো নানা দিকে তাঁর জীবনের বিস্তার দেখতাম। কিন্তু কাল তার আগেই তাঁকে ছিনিয়ে নিলো। এই আক্ষেপ আমাদের যাবে না। ১৯৫৮ থেকে ’৬১ পর্যন্ত বিলেতে থেকে এসে তিনি ডক্টরেট করেছেন। ধারাবাহিক কাহিনিতে এই পর্বের মাঝখানে এসে ছেদ পড়েছে।। পরে জাতীয় জীবনে সংশয়ে-সংকটে তাঁর যে স্থিতধী রূপ আমরা দেখেছি, তার পরিচয় এখানে মিলবে না। এমনটিই কি সংগত? আমরা যেভাবে তাঁকে পেয়েছি, তিনি কি সেভাবে নিজেকে দেখতেন? প্রখর মেধা, গভীর মানবিক দৃষ্টি, প্রসন্ন সততা ও বিনয়ী, কিন্তু দৃঢ় আত্মসম্মানবোধের যে সমন্বয় তাঁর ভেতরে অবিরাম কাজ করেছে― সচেতনভাবে তিনি তাদের মেলাতেন কি? তাতেও তাঁর আত্মরূপই ফুটে উঠতো, যেমন ফুটে উঠেছে এই ফিরে দেখা-য়। সব কিছু না মেলাবার স্বয়ংক্রিয়তাতেও বিরল রুচিবোধের প্রকাশ ঘটে। স্যর-এর সব লেখা পড়ার সময় আপনা থেকেই আমরা তাঁর সামনে প্রণত হই।

এই আত্মকথার শুরুতেই পাই তাঁর পারিবারিক পটভূমির বর্ণনা। তবে সবার আগে স্মরণ করেছেন তাঁর মা-কে। উচ্ছ্বাস নেই। তারপরেও মনে গভীর দাগ কেটে যায়। সূচনা-বাক্যেই পড়ি, ‘সুদূর অতীতের কথা স্মরণ করতে গিয়ে যখন পিছনে ফিরে তাকাই, তখন প্রথমেই যাঁর মুখচ্ছবি আমার স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে তিনি আমার জন্মদাত্রী মা।’ এর অনুসরণে এসে যায়―‘মা-কে হারিয়েছি সেই কতকাল আগে। ১৯৪৪ সালে, আমি তখন এমএ ক্লাসের ছাত্র। আজও মা-র কথা ভুলতে পারিনি। বঙ্কিমচন্দ্রের সেই অসাধারণ উক্তি মনে পড়ে―‘মা মরিয়া গেলে মা-র গল্প করিতে কত আনন্দ।’ সত্যি, মা-র গল্প বলে কি শেষ করা যায়? সে গল্প কত আনন্দের, কত গর্বের। মা-র কাছে আমি চিরঋণী…তিনি আমার অন্তরাত্মাকে নির্মাণ করে দিয়েছেন, যা নিয়েই আমি আমার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ধারণ করে বেঁচে আছি।…’ না, এ শুধু ঋণস্বীকার নয়, তার প্রয়োজনও অনর্থক। এ তাঁর মৌলসত্তায় অবিনশ্বর শ্রেয়োবোধের উৎস নির্দেশ।

স্যর অকপটে জানাচ্ছেন, শৈশবে তিনি খুব দুরন্ত ছিলেন। মুখে যা আসতো, তাই বলতেন। ভালো-মন্দ জ্ঞান ছিল না। মা শাসন করতে চাইলে পিতামহী ও তাঁরই মতো স্নেহশীলা দীর্ঘদিনের এক গৃহপালিকা বাড়ির তখন একমাত্র এই শিশুকে আড়াল করতেন। একবার নানাবাড়িতে গিয়েও তিনি একইরকম আচরণ করতে থাকেন। হঠাৎ সবার সামনে মা-কে ‘হারামজাদী’ বলে গাল দেন। দুঃখে-অপমানে মা কেঁদে ফেলেন। এভাবে মা-কে কাঁদতে তিনি আগে দেখেননি। অবাক হয়ে, আর ভয় পেয়ে তিনি ছুটে গিয়ে মা-কে জড়িয়ে ধরে তাঁর কোলে মুখ লুকোন। বুঝতে পারেন না, কেন তিনি কেঁদে ফেললেন। মা বলেন : ‘বাবা, তুমি সকালের সামনে আমাকে গালি দিলে, তাতে আমি মনে খুব কষ্ট পেয়েছি।’ শুনে তাঁরও মনে খুব অনুশোচনা হয়। তিনি ওইভাবে মায়ের কোলে মাথা রেখেই বলেন, ‘আম্মা, আমি আর কখনো দুষ্টুমি করবো না।’ সত্যি-সত্যি তাঁর সব দুষ্টুমি চলে যায়। তবে এতদিন পরে পেছন ফিরে তাকিয়ে তাঁর মনে হয়, বাচ্চাদের দস্যিপনা কি প্রাণচাঞ্চল্য সবটাই খারাপ নয়। নইলে তারা হয়ে পড়তে পারে অন্তর্মুখী ও নিঃসঙ্গ। অবশ্য তাঁর এই লেখা পড়ে মনে হয়, বেশ কিছু সমবয়সী মেধাবীদের সাহচর্য-সান্নিধ্য পাবার কারণে পরে তাঁকে তেমন সংকটে পড়তে হয়নি।

একটা সমৃদ্ধ পারিবারিক উত্তরাধিকার তাঁর ছিল। এটা যে অতি বিশিষ্ট, বইটি পড়ার পরেই তা জানলাম। আশ্চর্য, এ নিয়ে আগে তিনি কিছু বলেননি। আমিও এমন হাবা, কখনও কোনো কৌতূহল হয়নি। বংশমর্যাদা নিয়ে যাঁদের জাঁক করতে দেখেছি, বেশিরভাগই মনে হয়েছে, মাকাল ফল। তিনি যা বলেছেন, যেন তথ্য শুধু। এতটুকু আড়ম্বর নেই। আত্মপরিচয় দেবার জন্য ওটুকু প্রয়োজন তাই। কিন্তু তাতেই আমার চোখ কপালে ওঠে। একই সঙ্গে বুঝতে পারি, তাঁর চিন্তার ঔদার্য ও আভিজাত্য অত সহজে আসে কী করে। মেধার চর্চাই বা কেন অমন স্বাভাবিক ও প্রখর। তাঁর সময়ের বাঙালিদের ভেতর, এবং এখনও, পরশ্রীকাতরতা একটা সামান্য লক্ষণ। এটা তাঁকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করে না। হিংসা ও লোভ তিনি জয় করেছেন বললে ভুল হবে। এসব তাঁর ভেতরে দানাই বাঁধেনি। শৈশব কেটেছে তাঁর এক আলোকিত পরিমণ্ডলে। মা-র মনের স্বচ্ছ-স্বাভাবিক সৌন্দর্য তিনি পেয়েছিলেন। আরো পেয়েছিলেন মুক্ত ও উন্নত চিন্তার এক আবহ।

আগে জানতাম না― তিনি নিজেও কোথাও জাহির করেননি, এখানে শুরুতেই আপন পশ্চাৎপট খুলে দেখাতে অনাড়ম্বর বর্ণনা দিয়েছেন,―১৮৯২ সালে তাঁর নানা ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের নামী ছাত্র। হাতের ছাপ থেকে অপরাধী চেনার পদ্ধতিকে উন্নত করায় তাঁর বিশেষ সুনাম হয়। কাজের স্বীকৃতিতে উত্তর বিহারের মতিহারিতে তিনি বিশাল এলাকা জুড়ে জায়গা-জমি পান। পিতামহ, যাঁর নাম, শুধুই আহ্মদ, তিনিও ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে পাশ করা প্রথম শ্রেণীর স্নাতক। এম.এ-তেও একইরকম নজরকাড়া ফল। প্রেসিডেন্সি কলেজের ইংরেজ অধ্যক্ষ তাঁর বিষয়ে বলেছিলেন, ‘Distinguished student of Calcutta University of wide reading and culture.’ ― এটা ১৮৮৭ সালের কথা। স্যর-এর বাবা ফয়জুল মহীও প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়েছেন। তবে আকস্মিক পিতৃবিয়োগের ফলে আনুষ্ঠানিক পাঠ শেষ করেন সিটি কলেজ থেকে। স্যর নিজেও পড়েছেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেটা চল্লিশের দশকে। নানা দিক থেকে নানা জনের সঙ্গে খোলামেলাভাবে মেশার ফলে তাঁর ভেতরে কূপম-ুকতা বাসা বাঁধেনি। বাড়ির পরিবেশক, বিশেষ করে মায়ের সমদর্শিতাও তাঁর মনের বিকাশে সহায় হয়েছিল।

নিজের হয়ে-ওঠার স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে নব্বই পেরিয়ে উদার দৃষ্টিতে পেছন দিকে তাকিয়ে তাঁর মনে হয় : ‘বহুমুখী বিষয়ে আগ্রহ জাগরণ, অনুসন্ধিৎসু মনোভাব, মুক্তচিন্তা ও যুক্তিবাদী মানসিকতা শিশুর বিকাশে অনেকখানি সাহায্য করতে পারে। মনে হয় শৈশব থেকে আমি এই সব গুণ কিছুটা আত্মস্থ করতে পেরেছিলাম। বয়স বাড়ার সঙ্গে গতানুগতিক লেখাপড়ার সঙ্গে সংগীত, শিল্প, সাহিত্য, ইতিহাস দর্শন এবং সেই সঙ্গে সমাজ-কল্যাণ, রাজনীতি প্রভৃতি বিষয়ে আমার আগ্রহের সীমা ছিল না,…মনের দিক থেকে আমি ছিলাম মুক্তবিহঙ্গ। আমার চিন্তাচেতনাকে কোনো বিশেষ ধর্মীয় অনুশাসন বা সামাজিক বিধিনিষেধ বা অন্ধবিশ্বাস বা কুসংস্কার সীমাবদ্ধ করে রাখতে পারেনি। উদার ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদের বীজ অতি শৈশবেই আমার মনে অঙ্কুরিত হয়েছিল।’

এর প্রতিফলন শুধু তাঁর ভেতরেই ঘটেনি। ঘটেছে বৃহত্তর পরিসীমায় গোটা পরিবারেই। তাঁর কথকতায় উঠে আসে, আত্মীয়-স্বজন সবাই পৃথিবীর নানা জায়গায় ছড়িয়ে। কোথাও কোনো ছন্দ কাটে না। ইংরেজি-বাংলা ছাড়া উর্দুতেও তাঁর অসাধারণ দখল। এবং তা বাজারে উর্দু নয়। রীতিমতো খানদানি। এটা কিন্তু তাঁকে তাঁর বাঙালি পরিচয় থেকে এতটুকু দূরে ঠেলেনি। বরং তাঁর গ্রহণক্ষমতার পরিচয়ই আরো স্পষ্ট হয়েছে।

স্যর জানাচ্ছেন, শৈশবে তাঁকে কোরআন পাঠ ও নামাজ পড়া শিখিয়েছিলেন তাঁর মা। মা কিছু কিছু অর্থ বলে দিলেও রেওয়াজ ছিল তোতাপাখির মতো মুখস্থ আউড়ে যাবার। এই সময়ে তাঁর স্কুলে ভর্তি হওয়া। তখন বাংলা পাঠ্যবইয়ে তাঁর প্রথম পরিচয় ঘটে রবীন্দ্রনাথের ‘বল দাও মোরে বল দাও, প্রাণে দাও মোরে শক্তি’- এই গান/কবিতাটির সাথে। এমন উপাসনার আবেদন তাঁর কাছে অসম্ভব ভালো লেগে যায়। কারো কথায় নয়, নিজের মনেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, মোনাজাতের সময় এই পংক্তি ক’টি তিনি মনে মনে পাঠ করবেন। এমনটি শুরু করে একদিন তিনি মা-কে জানালেন তাঁর মোনাজাতে প্রার্থনার বিষয়টি। মা হকচকিয়ে গেলেন। কিন্তু বারণ করলেন না। এখন আমাদের মনে হয়, ওই গানটির বাণীতেই পুরো ফুটে উঠেছে, স্যর যা হতে চেয়েছেন, এবং হয়েছেন, তা-ই। কোথাও বিচ্যুতি নেই।

Salahuddin-Ahmed_0002কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবন তাঁর মনের দুয়ার আরো খুলে দেয়। চল্লিশের দশক। দেশে স্বাধীনতা আন্দোলন, রাজনৈতিক-সাম্প্রদায়িক টানাপড়েন, মহাযুদ্ধে পৃথিবী উত্তাল― এমন পরিস্থিতিতে কারো ভালো-মন্দ বিচারবোধ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়া স্বাভাবিক। আবেগের আবিলতাও তাকে আচ্ছন্ন করতে পারে। স্যর কিন্তু তাঁর উদ্বেগকে অন্তর্জাত কল্যাণ-এষণার ওপরে ছাপিয়ে যেতে দেননি। তিনি ট্রেড-ইউনিয়ন কর্মকাণ্ডে যোগ দিয়েছেন ― তাতে তাঁর উর্দু-জানা খুব কাজে লেগেছে, মানবেন্দ্রনাথ রায়ে র‌্যাডিক্যাল হিউম্যানিজম-এর আদর্শে আকৃষ্ট হয়েছেন, পরে যখন দাঙ্গার বিষাক্ত ছোবলে দেশ ক্ষত-বিক্ষত, তখন রেডক্রসে যুক্ত হয়ে আর্তত্রাণে আত্মনিয়োগ করেছেন। শুধু নিজের কথা কখনো ভাবেননি। মানুষে-মানুষে বিভেদ টেনে কোনো বাধার প্রাচীর তোলায় আকৃষ্ট হননি। শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন তাঁর শিক্ষকদের। বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, প্রমথনাথ বিশী, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়― এঁদের তিনি প্রথমে পেয়েছিলেন রিপন (বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ) কলেজে। পরে প্রেসিডেন্সি কলেজে এসে সুশোভন সরকারকে। হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ও সুশোভন সরকার ছিলেন কিংবদন্তিতূল্য শিক্ষক ও চিন্তাবিদ। দুজনেরই বিষয় ইতিহাস। এবং উভয়েই বামপন্থী ঘরানার। স্যর, কোনো তুলনা করেননি। তবে পড়ে মনে হয়, এঁরা তাঁর মনে ছাপ ফেলেছিলেন বেশি; যদিও মুগ্ধ করেছিলেন তাঁরা সবাই।

প্রেসিডেন্সি কলেজে রণজিৎ গুহ তাঁর সতীর্থ ছিলেন। আরো ছিলেন পরে প্রখ্যাত সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী। এঁদের তিন জনের আন্তরিক সৌহার্দ্য ছিল। অবশ্য জীবনের স্রোত প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন দিকে বাঁক নেয়। রণজিৎ গুহ গোপনে কম্যুনিস্ট আন্দোলনে জড়িত ছিলেন। স্যর ও জহুর হোসেন চৌধুরী বেশি আকৃষ্ট এম. এন. রায়ের র‌্যাডিক্যাল হিউম্যানিজম-এ। অবশ্য পারস্পরিক বন্ধুত্বে এর ফলে কোনো বাধা আসেনি।

রণজিৎ গুহর আদি নিবাস এই বাংলায়― বরিশালে। তাঁর বাবা দেশভাগের পরেও ঢাকায় থেকে যান। হাইকোর্টের বিচারপতি হন। স্যর-এর লেখা থেকে এটা জানতে পাই। বিয়ের পর স্যর ভাবীকে নিয়ে রণজিৎ গুহ-র বাবা-মা’র সঙ্গে দেখা করতে গেলে তাঁরা খুব খুশি হন। এদিকে রণজিৎ গুহ আগেই য়োরোপ হয়ে বিলেত চলে আসেন। সেখানে A Rule of Property for Bengal নামে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ওপর এক অসাধারণ কাজ করে ডক্টরেট হন। স্কলার হিসেবে তাঁর স্বীকৃতি মেলে সব জায়গায়। ইংল্যান্ড, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়াতে সুনামের সঙ্গে অধ্যাপনা করে বিদেশিনী স্ত্রীকে নিয়ে ভিয়েনাতে থিতু হন। তবে তাঁর বিশাল খ্যাতি সাব অলটার্ন স্টাডিজ বা নিম্নবর্গের ইতিহাস রচনায় তিনি পথপ্রদর্শক ও প্রধান মনীষী বলে। আজ উত্তর উপনিবেশিক ও উত্তর আধুনিক ইতিহাস ও দর্শনে এক মৌলিক চিন্তাবিদ হিসেবে তাঁর নামও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।

আমি কিন্তু মনে করি, নিম্নবর্গের ইতিহাসের কুহকে যাঁরা মজেছেন, মানবপ্রগতির মূল ধারা থেকেই তাঁরা ভ্রষ্ট হয়েছেন। পেছনে বস্তুগত উপাদান ছিল বাংলায় নকশাল আন্দোলন, ল্যাটিন আমেরিকায় প্রতিবাদী ভাবনার উত্থান ও ষাটের দশকের শেষে প্যারিসে ছাত্র জনতার নিয়ম ভাঙার উৎসাহ। আজ এতদিন পরে মনে হয়, এসবের পেছনেই উসকানি ছিল নতুন প্রজন্মের বিশ্বায়িত পুঁজি ও প্রযুক্তির। গোটা পৃথিবীকে টুকরো টুকরো নপুংসক খন্ডে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিতে পারলে, আর সেইসব জায়গায় এনজিও মার্কা ধুরন্ধর দালাল-মুৎসুদ্দির টাউটগিরি চালু করতে পারলে রাষ্ট্রের বা স্থানীয় উৎপাদিকা শক্তির প্রতাপ বা প্রভাব প্রশমিত হবে। এক ধরনের পরনির্ভরতা ও পরগাছাবৃত্তি প্রধান হয়ে উঠবে। বাইরের মূল চালিকাশক্তি নির্বিবাদে ত্রাতার ভূমিকায় মৌরুসিপাট্টা বজায় রাখবে। আজকের পশ্চিম বাংলার দিকে তাকালে অবস্থা কি এই রকমই মনে হয় না? চোর-ছ্যাঁচোর-চাঁদাবাজদের পোয়াবারো। ক্ষমতার মাতব্বর যারা, তারাই প্রশ্রয় দেন চাঁদাবাজিতে। অনেকেরই তাদের নকশাল সংযোগ ছিল। মেধাবী আরবান গেরিলা হয়ে তখন যারা প্রাণে বেঁচেছিলেন, তাদের বেশিরভাগেরই স্থায়ী নিবাস এখন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। যখন যেমন, তখন তেমন― এই নীতিতে তারই ধারাবাহিকতায় দেখি আফগানিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যে মৌলবাদী শক্তির উদ্ভব-উত্থান। দেখি আমাদের বাংলাদেশে মৌলবাদের গদিয়ানদের ‘মডারেট’ বলে চিহ্নিত করা। কেউ বিগড়ে গেলে তখন ত্বরিৎ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে যথারীতি। এখানকার মৌলবাদীরা ‘মডারেট’, কারণ তাদের কাছে ওরা বশংবদ। আজ জানতে পাই, সাবঅলটার্ন স্টাডিজের পণ্ডিতরা খোলখুলি ঘোষণা করছেন, ‘সাবঅলটার্ন স্টাডিজ আর ডেড’। রণজিৎ গুহ নিজে লিখেছেন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে অসাধারণ গ্রন্থ কবির নাম ও সর্বনাম। লিখেছেন দয়া : রামমোহন রায় ও আমাদের আধুনিকতা। এতে কি পশ্চিমবঙ্গে কোনো বোধোদয় হবে? উচ্ছন্নে যাবার কি কিছু বাকি আছে? মেধাপাচারও এর অনিবার্য পরিণতি। স্যর কিন্তু বিষয়টিকে এদিক থেকে দেখেননি। তাঁর স্মৃতিকথায় তেমন বলার সুযোগও নেই। এই বই-এর কথাতে এমন ভাবনার আমদানি, মনে হতে পারে, গরুর রচনা লিখতে গিয়ে শ্মশানঘাট চেনানো। অপরাধ মাথা পেতে নিই। তবে বিষয়টি উত্থাপনের একটা সুযোগ পেয়ে নিজেকে সংযত রাখা সম্ভব হলো না। এর দায় স্যর-এর নয়। পুরোপুরি আমার।

প্রফেসর হীরেন মুখার্জিকে স্যর যে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছেন, তা পুরোপুরি যথার্থ। স্বাধীনতার পর অন্তত তিনবার ভারতের লোকসভায় কম্যুনিস্ট পার্টি থেকে তিনি নির্বাচিত সদস্য। শোনা যায়, পণ্ডিত নেহেরু তাঁর বক্তৃতাই সবচেয়ে মন দিয়ে শুনতেন। বিষয়ের গুরুত্বই শুধু এর কারণ নয়, তাঁর অসাধারণ বাগ্মিতাও। এই মনীষীকে আমার একবার দেখার বিরল সৌভাগ্য হয়। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমার সরাসরি স্যর, প্রফেসর মুশাররফ হোসেন ছিলেন প্রবাসী সরকারের পরিকল্পনা সেল-এর অন্যতম সদস্য। দায়িত্বের ভেতরে এটাও ছিল, ওখানকার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার যৌক্তিকতা তুলে ধরে তাঁদের সক্রিয় সমর্থন পাবার চেষ্টা করা। একদিন তিনি প্রফেসর হীরেন মুখার্জির সঙ্গে দেখা করার জন্য তাঁর কাছ থেকে কিছু সময় চেয়ে নেন। আমাকেও সঙ্গে নেন। প্রফেসর মুখার্জির সৌজন্য আমাদের মুগ্ধ করে। দেখা যায়, তাঁর চিন্তাভাবনা স্যর-এর সঙ্গে একই তরঙ্গদৈর্ঘ্য। তিনি আরো বলেন, ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আগের রাতেই তাঁর কথা হয়েছে। আমাদের বেশি উদ্বিগ্ন হবার কোনো কারণ নেই। তবে জোর দেন, আমরা যেন ছত্রভঙ্গ হয়ে না পড়ি।

এম.এন. রায়ের মনীষা ও ব্যক্তিত্ব যে সালাহ্উদ্দীন স্যরকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছিল, তাঁর সীমানাহীন মানবতাবোধের প্রতিধ্বনি যে তাঁর ভেতরেও বেজেছিল, এ কথা অকুণ্ঠ চিত্তে বলতে পেরে মনে হয় তিনিও তৃপ্তি পেয়েছেন। বিশেষ করে রায়ের সমদর্শী মনোভাবের পরিচয় তিনি পেয়েছিলেন। তাঁর বই Historical Role of Islam তখন খুব আলোড়ন তুলেছিল। ইসলামের ইতিবাচক দিকগুলোর ব্যাপারে অন্যরা যে উদাসীন, এ জন্য তিনি দায়ী করেছিলেন অমুসলিম বৃহত্তর জনসমুদয়কেই। তরুণ মুসলিম শিক্ষিত সমাজে এতে তাঁর অনুরাগীদের সংখ্যা বাড়ে। তা ছাড়া তাঁর রোমাঞ্চকর জীবনকথাও তাঁকে এক ব্যতিক্রমী নায়কে পরিণত করেছিল। অল্প বয়সে অনুশীলন পার্টিতে যোগ দিয়ে তিনি অস্ত্র সংগ্রহের গোপন উদ্দেশ্য নিয়ে দেশ ছেড়ে মেক্সিকোয় এসে সেখানে কম্যুনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা করেন। রাশিয়া সোভিয়েট বিপ্লবের পর তিনি সেখানে লেনিনের পাশে কমিনটার্নের নীতি নির্ধারণী সভার সদস্য হন। লেনিনের উপনিবেশিকতা বিষয়ক মূল প্রস্তাবের সঙ্গে তাঁর সংযোজনীও গৃহীত হয়। কিন্তু স্ট্যালিনের আমলে তিনি আর টিকতে পারেন না। তিরিশের দশকের শুরুতে পালিয়ে ভারতে ফিরে এলেও প্রায় দশ বছর কারাবাসের পর মুক্তি পান। কংগ্রেসে যোগ দিলেও মতে মেলে না। শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে এসে র‌্যাডিক্যাল হিউম্যানিজমের মতবাদ খাড়া করেন। এতে মানুষই মানুষের নির্ভেজাল পরিচয়। দল, মত, সংস্কার― সবই অবান্তর। গণতন্ত্রও দলহীন।

মুশকিল হলো, গণমানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কোথাও ছিল না বললেই চলে। এ যেন একা ঘরে বসে ড্রয়িং বোর্ডে কোনো স্থাপত্যের নকশা আঁকা। সব সদিচ্ছা নিয়েও তা গণমানুষের কাছে পৌঁছোয় না। তিনিও ঝোঁকেন ব্যক্তিমানুষের দিকে। যদিও মেধার দীপ্তি তাঁকে আলোকিত রাখে। অনেক সংবেদনশীল ব্যক্তিকে তা আকর্ষণও করে। যেমন করে সালাহ্উদ্দীন স্যরকে, জহুর হোসেন চৌধুরীকে, আমাদের একাত্তরে শহীদ জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে, শহীদ হবিবুর রহমানকে। কিন্তু পরে র‌্যাডিক্যাল হিউম্যানিজমের বার্তা বৈঠকী আড্ডাতে ফুরোয়। অথবা রূপান্তরিত হয় নৈরাজ্যিক উন্মাদনার দায়িত্বহীন আত্মরতিতে।

দেশভাগের সময় পূর্ববাংলার অধিকাংশ চরম মানবতন্ত্রী ভাবুক ঢাকায় চলে আসেন। এক রকম সম-সময়ে এম.এন. রায়ের জীবনাবসানে সংঘটির জ্বালানি প্রায় ফুরিয়ে যায়। পতাকা বইবার দায়িত্ব বর্তায় তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী শিবনারায়ণ রায়, অম্লান দত্ত ও গৌরকিশোর ঘোষের ওপর। ক্রিয়ায়-প্রতিক্রিয়ায় তাঁরা শুধু সমাজতান্ত্রিক ভাবনার সঙ্গেই দূরত্ব বাড়িয়ে চলেন না, রাষ্ট্রের যৌক্তিক প্রয়োজনও প্রশ্নবিদ্ধ করতে থাকেন। ব্যক্তির সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সামাজিক কল্যাণকে মেলাবার কোনো পথ তাঁরা খুঁজে পান না; অথবা এসব নিয়ে মাথা ঘামান না। ভূ-রাজনৈতিক চাপে একটু একটু করে সরতে সরতে কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডমের ছত্রছায়ায় নিশ্চিন্ত বোধ করেন। সাম্প্রদায়িক বিষয়ে উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে দশ বছর আগে রায় যা বলেছিলেন, তাতেই নিশ্ছিদ্র আস্থা রেখে চলেন।

একাত্তরে প্রফেসর মুশাররফ হোসেনের সঙ্গ ধরে এক সন্ধ্যায় অম্লান দত্তের সঙ্গে পরিচিত হবারও সুযোগ পাই। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তিনি যে জায়গায় জোর দেন, তা হলো, অখণ্ড পাকিস্তান বজায় রাখাই উপমহাদেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য অধিকতর কল্যাণকর। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে বৈষম্য বা সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারে দূরত্ব তুলনায় অবান্তর। আমরা হতাশ হয়ে ফিরে আসি। এসব বিষয় সালাহ্উদ্দীন স্যর-এর অভিজ্ঞতার ভেতরে পড়েনি। ভালোই হয়েছে, তাঁর প্রসন্নতার যৌক্তিক ভূমি টাল খায়নি। একটা কথা অবশ্য এখানে যোগ করা দরকার। ওই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়েও আবু সয়ীদ আইয়ুব লিখেছিলেন তাঁর অবিস্মরণীয় প্রবন্ধ ‘তোমায় ভালোবাসি’। এই বাংলাদেশই ছিল তাঁর উদ্দিষ্ট।

চল্লিশের দশকে তাঁর কলকাতা জীবনের যে মনোগ্রাহী বিবরণ সালাহ্উদ্দীন স্যর এই বইতে দিয়েছেন, তা যেমন চিত্তাকর্ষক, তেমনই মানবিক বোধে উজ্জ্বল। কত কিংবদন্তি পুরুষ, কত অসাধারণ মহিলা, কত সামান্য জনের ভেতর অসামান্যের ছোঁয়া― আমাদের ঋদ্ধ করে, অনেক গ্লানির ভেতরে বেঁচে থাকার স্বাদকে শুদ্ধতর করে। স্যর কিন্তু কোথাও নাটুকেপনায় প্রশ্রয় দেন না। প্রকৃত ঐতিহাসিকের নিরাসক্তি বজায় রেখে বর্ণনা দেন। আমার অবাক লাগে অত আগের ঘটনা সব স্যর কেমন খুঁটিনাটিসমেত মনে রেখেছেন। পড়ে শোনানোর প্রলোভনও জাগে। কিন্তু খাপছাড়া বলায় আসল স্বাদ হারিয়ে যাবার আশঙ্কা। বিষয় মহিমা ফুটিয়ে তোলাও আমার সাধ্যের বাইরে। আমি শুধু আবেদন করতে পারি, যাঁরা মানুষের মুখ চিনতে, তার সত্য পরিচয় পেতে আগ্রহী, তাঁরা এ বই যেন অবশ্যই পড়েন। স্যর-এর লেখার সঙ্গে যাঁদের পরিচয় আছে, তাঁরা জানেন, তার স্বাদ কেমন। এতটুকু বাহুল্য নেই। বলবার কথা কিছু বাদও পড়ে না। আর দৃষ্টি গৌতম বুদ্ধের মতো। প্রসন্ন ও প্রশস্ত।

ছেচল্লিশে নোয়াখালী-কুমিল্লার দাঙ্গায় রেডক্রসের কর্মী হিসেবে আর্ত-পীড়িতের সেবার কাজে তিনি এ অঞ্চলে এসেছিলেন। মহাত্মা গান্ধীও তখন এখানে। এম.এন. রায়ের শিষ্য হিসেবে গান্ধীকে তাঁর ভ্রান্ত মনে হতো। কিন্ত তাঁকে সামনাসামনি দেখে তাঁর ভাবনা পাল্টে যায়। অনেকটা রবীন্দ্রনাথের ‘রবিবার’ গল্পের অভিকের শেষ আকুতি, ‘তোমায় চেয়েছিলাম বুদ্ধি দিয়ে, এবার পেতে চাই আমার সমস্ত দিয়ে’― এইরকমই মনে হয় গান্ধীর আবেদন। এবং তা জাত-মত নির্বিশেষে সবার কাছে। প্রখ্যাত সাংবাদিক ড. সাউদ হোসেনের একটি মন্তব্য তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘The saint as statesman’। উদ্ধৃত করেছেন গান্ধী-হত্যার পর আইনস্টাইনের বার বার বলার মতো কথাটিও : ‘Generations to come, it may well be, will scarce believe that such a man as this one ever in flesh and blood walked upon this Earth.’

কলকাতাবাসে স্যর-এর সবচেয়ে বড়, বলা যায় অতুলনীয় প্রাপ্তি―বিষয়টি আগেও বলেছি― লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের দর্শনের তরুণী অধ্যাপিকা হামিদা খানমের তাঁকে বিয়ে করতে রাজি হওয়া। দেশ ভাগ হচ্ছে। ওই পরিস্থিতিতে কনে লন্ডন যাচ্ছেন। পড়াশোনা শেষে দু বছর পর ফিরে আসবেন ঢাকায়। সেখানে ইডেন কলেজে যোগ দেবেন। স্যরও ঢাকায় গিয়ে তাঁর জন্যে অপেক্ষা করবেন। বিয়ে হবে তারপর। এতে বর-কনে কারোরই কোনো উদ্বেগ নেই। দুশ্চিন্তা নেই। পারস্পরিক আস্থা কতটা থাকলে এমন হতে পারে, ভেবে কূল পাই না। ১৯৪৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর ঢাকায় তাঁদের বিয়ে হয়। আমি যখন থেকে তাঁদের দেখেছি, তখন থেকে ভাবীর মৃত্যুতে তাঁদের চিরবিচ্ছেদ পর্যন্ত, প্রতি সময়েই মনে হয়েছে তাঁরা যেন নবদম্পতি। তবে বাইরে কোনো উচ্ছ্বাস নেই। নিশ্চিন্ত পারস্পরিক নির্ভরতা, আর বোধের গভীরে বিরল সহমর্মিতা। একদিনই শুধু স্যরকে অসহায় আবেগে মুহূর্তের জন্য কাতর হতে দেখেছি। ভাবী যখন আর নেই, তখন। ২০১১-য়। পরে আবার তিনি স্থিত অবস্থায় ফিরে আসেন। সমাজ-সংসারে তাঁর যে কাজ, তাতে এতটুকু ঘাটতি থাকে না। চেতনায় ভাবী কিন্তু অক্ষয় হয়ে থেকে যান। রবীন্দ্রনাথের মহুয়া-র একাধিক কবিতায় যেন তাঁরা দুজন জীবন্ত ফুটে ওঠেন। তা মিলিয়ে যায় না।

কলকাতা থেকে ঢাকা রেডক্রস অফিসে এসে স্যর দেখেন, তাঁর উপযোগী সব কাজ আগেই ভাগাভাগি হয়ে গেছে। বিরক্ত হয়ে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে ইস্তফা দিয়ে কিছুদিন তিনি বেকার থাকেন। তবে বেশিদিন দুর্ভোগ সইতে হয় না। জগন্নাথ কলেজে অধ্যাপনার চাকরি জুটে যায়। তিনি তাতে যোগ দেন। ভাগ্য দেবতা তখন থেকে আমৃত্য তাঁকে এই বৃত্তিতে বেঁধে ফেলেন। মননশীলতার চর্চা তাঁর ব্রত হয়ে দাঁড়ায়। এক বিন্দু ফাঁকি থাকে না তাতে। জগন্নাথ কলেজে তাঁর সহকর্মী ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ও বাঙালি চেতনার জীবন্ত প্রতীক অধ্যাপক অজিত গুহ। বইটিতে এঁদের স্মরণ করে, মনে হয়, তিনি তৃপ্তি পেয়েছেন।

১৯৫২ সালে ফুলব্রাইট স্কলারশিপের জন্য মনোনীত হয়ে ভাবী ও স্যর, দুজনেই একত্রে এক বছরের জন্য আমেরিকা যান। স্যর পেনসিলভেনিয়া থেকে ইতিহাসে এম. এ. করেন। ভাবী কাজ করেন উচ্চশিক্ষা প্রশাসনের ওপর । সময়টা তাঁদের ভালোই কাটে। এই বইতে তার চিত্তাকর্ষক বর্ণনা আছে। তবে আদেখলাপনা নেই এতটুকু। সভ্য-রুচিবোধ স্যর ও ভাবীর মজ্জাগত।

ফিরে এসে জগন্নাথ কলেজে স্যর বেশিদিন থাকেননি। ১৯৫৪ সাল থেকে নতুন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাক্রম চালু হয়। যে ক’টি বিষয় দিয়ে শুরু, তার ভেতর ইতিহাসও একটি। ভাবীই সেখানে তাঁকে কাজের জন্য আবেদন করায় উদ্যোগী করেন। তিনি নিজে কিন্তু থাকছেন ঢাকায়। ব্যক্তিগত সুবিধা-অসুবিধা, ওই সময়ের সামাজিক রীতি-নীতি, প্রত্যাশা-প্রত্যাখ্যান কিছুই তাঁর কাছে গুরুত্ব পায়নি। নিজেদের পারস্পরিক আস্থা ও ভালোবাসাই মূল বিষয়। সেখানে কোনো খাদ ছিল না। স্যর যে রাজশাহীতে নিয়োগ পেলেন, এতেও বিস্ময়ের কিছু ছিল না। ডক্টর এ.আর. মল্লিকও যোগ দেবেন। তবে সরকারি কলেজ থেকে ছাড়পত্র পাবার সব ঘাট পার হতে কিছু দেরি হচ্ছিলো। তাই শুরুতে স্যর একাই ইতিহাস বিভাগ সচল করেন। ক’ মাস পরে ডক্টর মল্লিক এসে দায়িত্ব নেন। শুধু তাই নয়, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সুস্থ, প্রগতিশীল, মেধাবী চিন্তানায়কদের যে সমাবেশ ঘটেছিল, তাঁদের কর্মকাণ্ডেও তিনি নেতৃত্ব দেন। স্যর পরম তৃপ্তির সঙ্গে এই সব কথা জানান। পঁয়ষট্টি সালে ডক্টর মল্লিক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার দায়িত্ব নিয়ে চলে যান। স্যর পাকাপাকি রাজশাহী ছাড়েন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের এক বছর পর, বাহাত্তরে। এই বই-এর অসম্পূর্ণ মূল কাণ্ড কিন্তু শেষ হয় ১৯৫৮-৬১ তে, স্যর যখন লন্ডনে ডক্টরেট করছেন, তার মাঝখানে। তবে মাঝে মাঝে পরের বিষয়ও ছায়া ফেলে যায়। বিশেষ করে তাঁর সমমনা সহকর্মী ও কৃতী ছাত্রছাত্রীদের কথা বলায় তাঁর ক্লান্তি নেই(বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ডক্টর খলিকুজ্জামান আহমদের স্ত্রী ডক্টর জাহেদা খাতুন ছিলেন রাজশাহীতে তাঁর কৃতী ছাত্রী। এখানে সস্নেহে তিনি তাঁর কথা লিখেছেন। একবার ঢাকায় তাঁকে দেখি। আমি তো আগে থেকে তাঁকে চিনতাম না। স্যর-এর প্রিয় ছাত্রী ছিলেন জানলে মন খুলে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারতাম)। কিছু কিছু মনে রাখার মতো ঘটনারও। একটা জায়গা থেকে উদ্ধৃতি দিই। এ নয়, যে আর সব অনুল্লেখ্য। গোটা বইতে কিছুই বাদ দেবার নয়। তবে এই প্রসঙ্গটায় আমার নিজের দুবর্লতা আছে।―

…আমরা পরমতসহিষ্ণুতায় বিশ্বাস করতাম। আমরা কোনোরকম অন্ধবিশ্বাস বা গোঁড়ামি― সেটা ধর্মীয় হোক বা রাজনৈতিক, কোনোটাকে প্রশ্রয় দিইনি।…বিশ্ববিদ্যালয়ে চিন্তার স্বাধীনতা থাকা অপরিহার্য। আমরা এক শোষণমুক্ত আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতাম।…এইসব বিক্ষিপ্ত ভাবনা-চিন্তা প্রকাশ করার কাজটি কিছুটা সহজ হয়ে গেল যখন জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ও মুস্তফা নূরউল ইসলামের যৌথ সম্পাদনায় পূর্বমেঘ নামে একটি ব্যতিক্রমধর্মী সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ হতে শুরু হলো। রাজশাহী থেকে প্রকাশিত এই নতুন পত্রিকার প্রকাশক ছিলেন ড.এ.আর. মল্লিক।…বলতে দ্বিধা নেই লেখক হিসেবে আমার আত্মপ্রকাশ হয়েছিল এই পূর্বমেঘ-এর মধ্য দিয়ে। বদরুদ্দীন উমরের সাড়া জাগানো লেখাগুলো প্রকাশিত হতে লাগলো পূর্বমেঘ-এ। উমরের এই লেখাগুলি নিয়ে যখন ‘সাম্প্রদায়িকতা’ ও ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’ নামে দুটি বই প্রকাশিত হলো তখন একটা প্রচ- আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছিল।…অচিরে পূর্বমেঘ দেশের একটি উচ্চমানের সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিল।…

পূর্বমেঘ অবশ্য প্রকাশ পেতে শুরু করেছিল ষাটের দশকের গোড়ায়। সম্ভবত স্যর তখনও লন্ডন থেকে ফেরেননি। আর, বদরুদ্দীন উমরের আলোড়ন সৃষ্টিকারী লেখাগুলো বেরোতে থাকে বোধহয়, ১৯৬৬-তে। এই বই-এ স্যর-এর কথা বলায় আকস্মিক যবনিকা পতন ১৯৬০-৬১-তে। স্মৃতির রোমন্থনে পরের কথা কেমন আগে চলে আসে, এ তার একটি নমুনা।

রবীন্দ্রনাথের একটা গানের কলি, ‘শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে!’ এই বই পড়ার পরও তেমন মনে হয়। আরো মনে পড়ে,― একেবারে অন্য ভাবনার, ছেলেবেলায় পড়া কবিতা থেকে―‘কত নতুন ফুলের বনে বিষ্টি দিয়ে যায়,/পলে পলে নতুন খেলা কোথায় ভেবে যায়!’ স্যর-এর বেলাতেও বুঝি এরকম। তবে স্যর-এর রাজশাহী ছাড়ার পেছনে, আমার মনে হয়, সুচিন্তিত একটা তাগিদ ছিল। বিশেষ করে ভাবীর। ১৯৭০ সালে স্যর-এর গলব্লাডারে অস্ত্রোপচার হয়। তখনও এটা ছিল এক ঝুঁকির ব্যাপার। তারপর থেকে এখানে স্যর-এর একা থাকায় ভাবীর দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়। তাতে প্রথম সুযোগে তাঁর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগ গড়ে তোলার দায়িত্ব নিয়ে যাওয়া। পরে সেখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। শুদ্ধ মনীষায় তিনি পান সর্বত্র খ্যাতি ও শ্রদ্ধা। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী সম্পাদনার দায়িত্ব তাঁর ওপরে পড়ে। কারণ, তাঁকেই মনে করা হয় সবচেয়ে নিরাসক্ত ও উপযুক্ত। আমাদের আফশোস, এখানে ১৯৬১-তেই তাঁর ধারাবাহিক কথা বলায় ছেদ পড়লো। নইলে পরের তরঙ্গবিক্ষুব্ধ সময়ের কথা আরো উন্মোচিত হতো। তাঁর কৃতী ছাত্রছাত্রীদের তালিকায় সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম, মুনতাসীর মামুন, এখানে সবার ওপরে জায়গা করে নিতেন। অবশ্য যতটা পড়ার সুযোগ পেলাম, তাতেই আমাদের অশেষ পূন্য সঞ্চয়।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (5) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাহানা মৌসুমী — নভেম্বর ২৯, ২০১৬ @ ১১:৪১ অপরাহ্ন

      অসাধারণ স্মৃতি-তর্পণ! স্মরিত সালাহউদ্দীন আহমদের মনীষা উজ্জ্বল দীপের মতো আলোর বিভায় মণ্ডিত। সে দীপালোক অনবদ্য বর্ণনায় আমাদের সামনে তুলে ধরলেন আরেকজন প্রণম্য শিক্ষক, লেখক সনৎকুমার সাহা! বিডি আর্টসকে ধন্যবাদ। এই লেখা পাঠের বিরল সৌভাগ্যের সুযোগ দানের জন্যে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাইফুর রহমান তপন — নভেম্বর ৩০, ২০১৬ @ ১:০৩ অপরাহ্ন

      অসাধারণ!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন shams hoque — নভেম্বর ৩০, ২০১৬ @ ১:২৬ অপরাহ্ন

      I’m amazed to read yet another type of academic discourse on an important part of our cultural history. The previous book review a while ago by Sanat Kumar Saha enchanted my reader mind with a different type of flare and enriching ingredients but this one taking my imagination and horizon of my thinking in another direction. I’m afraid, this is is demanding my time and energy to engage more time in reading which will surely have an adverse effect on my teaching. I promise to myself in, and in sincere gratitude to Sanat Kumar Saha, that I’ll read more about the cultural input he has put in his writing but without sacrificing my teaching. I’m sure though, I’ll never be able to reach their height as a teacher—–neither of Salah Uddin Sir, nof Sanat Saha Sir. Here comes humble salute both of these stalwarts of our culture.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন priscilla raj — নভেম্বর ৩০, ২০১৬ @ ৩:১১ অপরাহ্ন

      সালাহ্উদ্দীন আহমদের অমৃতস্মৃতির অমৃতসমান অ্যাখ্যান। ভাষার অপূর্ব পরিমিতি এভাবেই বহু ব্যঞ্জনায় বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। সুবিখ্যাত শিক্ষক ও লেখক সনৎকুমার সাহার জন্য অজস্র শ্রদ্ধা। বিডিনিউজ২৪-কেও ধন্যবাদ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com