মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ৫)

অদিতি ফাল্গুনী | ২৪ জানুয়ারি ২০০৮ ১১:১৫ অপরাহ্ন

কিস্তি:


শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম

মিশেল ফুকো

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

খণ্ড ১ : নির্যাতন

দ্বিতীয় অধ্যায়: বধ্যমঞ্চের জমকালো প্রদর্শনী

(গত সংখ্যার পর)

এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে প্রকাশ্য নির্যাতন ও মৃত্যুদণ্ড প্রদানের অস্তিত্ব শাস্তির অভ্যন্তরীন প্রতিষ্ঠানের বদলে অন্য কিছুর সাথে জড়িত ছিল। রুশ্চে (Rusche) এবং কির্শহেইমার (Kirchheimer) এই বিষয়টিকে যথার্থই এমন এক উৎপাদন ব্যবস্থার প্রভাব হিসেবে দেখেন যাতে শ্রম ক্ষমতা এবং মানব শরীরের না আছে কোন উপযোগ না কোন বাণিজ্য মূল্য।foucault-shiri.jpg……
মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪)
……..
শিল্পায়ন অর্থনীতিই তাদের উপর এই উৎপাদন ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়েছে। উপরন্তু, প্রকাশ্য নির্যাতনে মানব শরীরের প্রতি সাধিত ‘অবমাননা’ মৃত্যুর প্রতি সাধারণ ভাবে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সম্পর্কযুক্ত। এবং এমন এক দৃষ্টিভঙ্গিতে কেউ যে শুধু যথার্থ খ্রিষ্টিয় মূল্যবোধই শণাক্ত করবেন তা’ নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে আরো রয়েছে জৈবিক অবস্থান: অসুস্থতা ও ক্ষুধার ধ্বংস, মন্বন্তরের কালিক যত সংহার, পরিতাপযোগ্য শিশুমৃত্যুর হার, জৈব-আর্থনীতিক ভারসাম্যের অনিশ্চয়তা প্রভৃতি। এসকল উপাদান মৃত্যুকে আরো পরিচিত করেছে। সৃষ্টি করেছে এমন সব আনুষ্ঠানিকতার যা মৃত্যুকে অন্তর্ভুক্ত ও গ্রহণযোগ্য করা এবং মৃত্যুর আগ্রাসনকে চিরকালীন অর্থ প্রদানের প্রয়াস চালায়। কিন্তু, কেন প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রথা এত দীর্ঘ সময় ধরে চালু ছিল, তা’ বিশ্লেষণ করতে হলে ঐতিহাসিক সঙ্কটমুহূর্তগুলো লক্ষ্য করা প্রয়োজন। একথা ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না যে ১৭৬০ সালের অধ্যাদেশ কোন কোন ক্ষেত্রে পুরনো আইনগ্রন্থগুলোর কঠোরতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল। অথচ, এই অধ্যাদেশই ফরাসী বিপ্লবের সময় অবধি অপরাধ বিচারকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। পুসোর্ট, কমিশনারদের ভেতর যার দায়িত্ব ছিল বিভিন্ন নথিপত্র প্রস্তুত করা, মূলতঃ রাজার ইচ্ছার প্রতিনিধিত্ব করতেন। পুরনো আইনগ্রন্থের কঠোরতা বাড়ানোর জন্য তিনিই দায়ী ছিলেন, যদিও লামোইগনের মতো ম্যাজিস্ট্রেটরা এই কঠোরতা বাড়ানোর বিরোধী ছিলেন। ধ্রুপদী যুগে সম্রাট-বিরোধী বিক্ষোভের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, গৃহযুদ্ধের সময় বিক্ষোভ কমে আসা, সংসদ ভেঙে দিয়ে রাজার ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা ইত্যাদি সব কারণ মিলেই এত কঠোর একটি দণ্ড আইনের দীর্ঘকাল টিঁকে থাকার কারণ।

উপরোল্লিখিত বিষয়গুলো অবশ্য একদিক থেকে দেখলে শাস্তি ব্যবস্থার সাধারণ এবং বহিঃস্থ কিছু কারণ। যে শাস্তি ব্যবস্থায় কিনা এতটা নির্যাতনের বিধান রয়েছে। তারা শুধুই শারীরিক শাস্তির সম্ভাব্যতা এবং দীর্ঘ সময় ধরে টিঁকে থাকার বিষয়টিই ব্যাখ্যা করে না, বরং এই ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিক্ষিপ্ত প্রকৃতির নানা বিরোধিতার কারণও ব্যাখ্যা করে। এই সাধারণ প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে আমরা অবশ্যই শাস্তি ব্যবস্থার কার্যক্রম সংক্ষেপে আলোচনা করবো। আইনী আচরণে নির্যাতন বিষয়টি এত গভীরপ্রোথিত হওয়ার কারণ সম্ভবতঃ এর সত্যকে প্রকাশ করার এবং ক্ষমতার সচলতা দেখাবার শক্তি। আবার, এই শক্তিই মৌখিকের ওপর লিখিত বিবরণীর, প্রকাশ্যের উপর গোপন এবং স্বীকারোক্তি আদায়ের উপর তদন্ত প্রক্রিয়ার প্রভাব চাপিয়ে দেয়। এই একই শক্তি অপরাধীর দৃষ্টিগ্রাহ্য শরীরের উপর অপরাধের পুনরুৎপাদন সম্ভব করে। একই আতঙ্কজনক উপায়ে, অপরাধকে প্রকাশিত এবং নির্মূল হতে হতো। আবার, এই শক্তি অভিযুক্ত ব্যক্তির দেহকে সার্বভৌম সম্রাটের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার ক্ষেত্র হিসেবে তৈরি করতো। অভিযুক্তের শরীরকে তা ক্ষমতার নোঙর ভিড়াবার বিন্দুতে পরিণত করেছিল, পরিণত করেছিল শক্তির অসমতাকে নিশ্চিত করার সুযোগ হিসেবে। পরবর্তী সময়ে আমরা দেখতে পারব যে সত্য-ক্ষমতা সম্পর্ক শাস্তির যাবতীয় কৃৎকৌশলের কেন্দ্রে অবস্থান করে। সত্য-ক্ষমতা সম্পর্কের এই অবস্থান অধুনা কালের দণ্ড ব্যবস্থাতেও বিদ্যমান। তবে, অবশ্যই ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে এবং ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব সহকারে। আলোকায়ন যুগের উদ্ভাসের সাথে সাথেই প্রকাশ্য নির্যাতন এবং মৃত্যুদণ্ডকে ‘নিষ্ঠুরতা’ বলে নিন্দা জ্ঞাপন শুরু হলো। ‘নিষ্ঠুরতা’ শব্দটি প্রায়ই প্রকাশ্য নির্যাতন এবং মৃত্যুদণ্ড সম্পর্কে ব্যবহার করা হলেও তা’ করা হতো কোন সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যতিরেকেই। খোদ আইনবিদরাই এমনটি করতেন। পুরনো দণ্ডানুশীলনের ক্ষেত্রে, ‘নিষ্ঠুরতা’র দৃষ্টিভঙ্গিটি সম্ভবতঃ প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ডের অর্থনীতিকে সবচেয়ে ভাল ভাবে বিশেষায়িত করে। শুরু করতে গেলে, নিষ্ঠুরতা হলো কিছু বড় অপরাধের চারিত্র্য লক্ষণ। নিষ্ঠুরতা, রীতিমতো কলঙ্কজনক মুক্ততার সাথে, নির্দেশ করে স্বাভাবিক অথবা ইতিবাচক, দৈব বা মানবীয় অসংখ্য আইনকে। যে আইনগুলোকে সে আঘাত করে। নিষ্ঠুরতা নির্দেশ করে সেই গোপন ধূর্ততাও যা অপরাধী স্বয়ং বা অপরাধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস ও পদমর্যাদার সাথে করা হয়। নিষ্ঠুরতা আরো নির্দেশ করে সমাজে যে নৈরাজ্য পূর্বানুমান করে বা বয়ে নিয়ে আসে, যে ভীতি সে সমাজে জাগিয়ে তোলে। যেহেতু নিষ্ঠুরতা অপরাধকে সবার চোখে তার সমস্ত তীব্রতায় প্রকাশিত করে, সেহেতু শাস্তিকেও এই নিষ্ঠুরতার সমুচিত জবাব দেবার দায়িত্ব নিতে হয়। অপরাধীর স্বীকারোক্তি, বিবরণী, হলফনামা প্রভৃতির মাধ্যমে অপরাধকে আনা হয় প্রকাশ্য দিবালোকে। বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে শাস্তিকে পুনরুৎপাদিত হতে হয় যা অপরাধীর শরীরে অপমান এবং যন্ত্রণার আকারে প্রয়োগ করা হয়। নিষ্ঠুরতা হলো অপরাধের ঠিক সেই অংশটুকু, যা শাস্তি ‘নির্যাতনে’র নামে অপরাধীকে ফিরিয়ে দেয়। ফিরিয়ে দেয় শাস্তির প্রকাশ্য দিবালোকে প্রদর্শনীর জন্য। শাস্তির কৃৎকৌশলে অন্তর্নিহিত এই মূর্তি অপরাধের কেন্দ্রবিন্দুতেই অপরাধের দৃশ্যমান সত্যতা উৎপাদন করে। প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড ফৌজদারি প্রক্রিয়ার সেই অংশ গঠন করেছিল যা শাস্তির বাস্তবতাকে প্রতিষ্ঠা করে। উপরন্তু, অপরাধের নিষ্ঠুরতা সার্বভৌম সম্রাটকে ছুঁড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জের সন্ত্রাসকেও নির্দেশ করে বৈকি। ফলে, সম্রাটকেও শাস্তি দানের মাধ্যমে এমন উত্তর দিতে হয় যা অপরাধের নিষ্ঠুরতাকে ছাড়িয়ে অপরাধীকে বশ মানাবে এবং জয় করবে। বশ মানানোর এই কাণ্ডটি সম্পন্ন হবে শাস্তি প্রক্রিয়ায় অত্যধিক নিষ্ঠুরতা প্রয়োগের মাধ্যমে যা অপরাধকে ধবংস করবে। প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ডে নিষ্ঠুরতার এই ব্যবহারের ছিল দ্বৈত ভূমিকা। প্রথমত, এটি ছিল অপরাধ ও শাস্তির ভেতর যোগাযোগের নীতি এবং দ্বিতীয়ত, এটি ছিল অপরাধের অনুপাতে শাস্তির অতিরিক্ত প্রয়োগ। মৃত্যুদণ্ডের প্রকাশ্য প্রদর্শনী দর্শককে যোগাতো সত্য ও ক্ষমতার উভয়বিধ প্রদর্শনী। একই সাথে এ ছিল তদন্তের আনুষ্ঠানিকতার সমাহার এবং সেই আনুষ্ঠানিকতা যেখানে সম্রাটের বিজয় প্রদর্শিত হতো। এই উভয়বিধ আনুষ্ঠানিকতাই নির্যাতিত ব্যক্তির শরীরে যুক্ত হতো। উনিশ শতকের দণ্ড অনুশীলনে সত্যের ‘নির্মল’ অনুসন্ধান এবং শাস্তি হতে সম্পূর্ণ ভাবে অমোচনীয় সন্ত্রাসের ভেতর যতটা পারা যায় দূরত্ব সৃষ্টির চেষ্টা ছিল। দণ্ডযোগ্য অপরাধ এবং রাজশক্তির মাধ্যমে আরোপিত দণ্ডের ভেতরকার অসামঞ্জস্য চিহ্নিত করার প্রচেষ্টাও এর ছিল। সত্য এবং শাস্তির ভেতর বৈধ প্রতিক্রিয়া ব্যতীত অন্য কোন সম্পর্ক থাকা উচিত নয়। যে ক্ষমতা শাস্তি প্রদান করে তার উচিত নয় কোন অপরাধ করে তার হাতকে মলিন করা। অন্ততঃপক্ষে যে ধরনের অপরাধের জন্য সে শাস্তি দেয়, সেই অপরাধকে যেন ছাড়িয়ে না যায় তার কোন কাজ। ক্ষমতা প্রয়োগকারী যে শাস্তি সে প্রদান করে, সেই শাস্তি-নিরপেক্ষ নিষ্পাপতাই তার কাছ থেকে প্রত্যাশিত। ‘আমাদের এই নির্যাতনগুলো আইনের মাধ্যমে বন্ধ করতে দিন। এই সব নির্যাতন যেন সেই মুকুট পরা দৈত্যদের জন্যই মানায় যারা রোমানদের শাসন করতো (পাস্তোরেত, রাজহত্যাকারীর শাস্তি বিষয়ে, ২, ৬১। কিন্তু, আগের যুগের দণ্ড অনুশীলন অনুযায়ী, প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের ক্ষেত্রে সার্বভৌম সম্রাট এবং অপরাধের ভেতর যে নৈকট্য, মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগে শাস্তি এবং শাস্তির ‘প্রদর্শনী’র মিশ্রণ কোন বর্বর সংশয়ের ফলাফল ছিল না; যা তাদের একত্রে যুক্ত করেছিল তা’ হলো নিষ্ঠুরতার কৃৎকৌশল এবং এর প্রয়োজনীয় শ্রেণিবদ্ধকরণ। ব্যাখ্যার এই নিষ্ঠুরতা মহাপরাক্রমশালী সম্রাটের হাতে অপরাধীর কলঙ্ককে আনুষ্ঠানিক ভাবে ধবংস করার কাজটিই সংগঠিত করতো।

নিষ্ঠুরতার আকারে অপরাধ ও শাস্তির এই যুক্ততা ও একত্রবদ্ধতা আবছা ভাবে গৃহীত কোন প্রতিশোধের আইনের ফলাফল নয়। বিষয়টি বরং ছিল শাস্তির নানা আনুষ্ঠানিকতায় ক্ষমতার একটি নির্দিষ্ট কৃৎকৌশল। যে ক্ষমতা অপরাধীর শরীরে সরাসরি শক্তি প্রয়োগ করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং এর প্রকাশ্য প্রদর্শনীর মাধ্যমে বেগবান এবং জোরদারও হয়েছে। এই ক্ষমতা নিজেকে বারবার পরিচিত করেছে সশস্ত্র ক্ষমতা হিসেবে যার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজটির সাথে যুদ্ধ করার কাজের কিছুটা হলেও যোগসূত্র রয়েছে। এই ক্ষমতা নিয়ম-নীতিকে ব্যক্তিগত বন্ধন হিসেবে দেখে এবং সেই নিয়ম-নীতি ভঙ্গ করাকে অন্যায় মনে করে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার আহ্বান জানায়। আনুগত্যহীনতা হলো ক্ষমতার কাছে শত্রুতার নামান্তর এবং বিদ্রোহের প্রথম চিহ্ন, যা গৃহযুদ্ধ থেকে নীতিগত ভাবে খুব পৃথক নয়। স্রেফ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার যৌক্তিকতা বোঝাতে যে এই রাজকীয় ক্ষমতাকে প্রায়ই প্রকাশ্য প্রদর্শনীর আয়োজন করতে হতো, তা নয়। বরং কে কে তার শত্রুপক্ষ সেটা শণাক্ত করতে এবং তাদের হুমকি দেবার আকাঙ্খা হতেই এহেন প্রদর্শনীর আয়োজন করতে হতো। ধারাবাহিক তত্ত্বাবধানের অনুপস্থিতিতে, এই ক্ষমতা এক/একটি মহড়ার মাধ্যমে দর্শকমনে পুনরায় প্রভাব সৃষ্টি করতে চাইতো। আনুষ্ঠানিক প্রদর্শনীর মাধ্যমে এই ক্ষমতা নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করতো বাস্তবের ‘সর্বোচ্চ শক্তি’ হিসেবে।

‘নিষ্ঠুর’ শাস্তির বদলে ‘মানবিক’ শাস্তি চালু হওয়ার পেছনে যতগুলো কারণ ছিল, তার একটি কারণ অন্ততঃ এক্ষুনি বিশ্লেষণ হওয়া প্রয়োজন। যেহেতু এই কারণটি প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ডের অন্তর্গত একটি বিষয়, এর সক্রিয়তার অন্যতম উপাদান এবং এর চিরস্থায়ী নৈরাজ্যের নীতি।

প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের আনুষ্ঠানিকতায় মূল চরিত্র ছিল মানুষ যাদের বাস্তব ও তাৎক্ষণিক উপস্থিতি এই অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার কাজে দরকার হতো। একটি মৃত্যুদণ্ড যা সবাই দ্রুতই বাস্তবায়িত হতে চলেছে বলে জানে, সেটা যদি গোপনে করা হয়, তবে তার সামান্যই কোন অর্থ থাকে। এই দণ্ড প্রদানের মূল উদ্দেশ্য ছিল উদাহরণ সৃষ্টি করা। এবং ক্ষুদ্রতম অপরাধ সঙ্ঘটন করলেও শাস্তি আছে, এ ব্যপারে সবাইকে সচেতন করার মাধ্যমেই শুধু উদাহরণ সৃষ্টির কাজটি করা হতো না। বরং বরং দোষী ব্যক্তির উপর ক্ষমতার ক্রোধ সবটুকু বর্ষণের মাধ্যমে দর্শককে ভয় পাইয়ে দেওয়াটাও ছিল শাস্তির উদ্দেশ্য। ‘অপরাধের ক্ষেত্রে, সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো শাস্তির প্রয়োগ। এটাই ফৌজদারি কার্যবিধির লক্ষ্য ও অন্তিম গন্তব্য। সেইসাথে ফৌজদারি কার্যবিধির ফসলও এই শাস্তির প্রয়োগ যা উদাহরণ এবং সন্ত্রাসের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তির প্রতি উত্তম রূপে প্রয়োগ করা হয়। (ব্রুনো, প্রথম অধ্যায়ের সংখ্যাহীন মুখবন্ধ (Bruneau)।

কিন্তু, সন্ত্রাসের এই দৃশ্যে, জনতার ভূমিকা ছিল অস্পষ্ট। জনতাকে ডাকা হতো দর্শক হিসেবে। প্রকাশ্য প্রদর্শনী এবং অ্যামেন্ডে অনারেবল (amendes honorables) দেখতে তারা জড়ো হতো। পাবলিক স্কোয়ার বা রাস্তার পাশে কাঠের চাকা, ফাঁসিকাঠ বা বধ্যমঞ্চ স্থাপন করা হতো। মাঝে মাঝে নিহত ব্যক্তির লাশ তাদের অপরাধ সঙ্ঘটন করার স্থানের পাশেই কয়েকদিন ধরে প্রদর্শন করা হতো। মানুষকে শুধু জানলেই চলবে না, চোখেও দেখতে হবে। কারণ, তাদেরকে অবশ্যই ভীত করে তুলতে হবে। এছাড়াও তাদের শাস্তির স্বাক্ষী ও আশ্বাসদানকারী হয়ে উঠতে হবে। এবং অবশ্যই তাদের এই প্রদর্শনীতে কিছুটা হলেও অংশ নিতে হবে। জনতার ছিল শাস্তির সাক্ষী হওয়ার অধিকার এবং এই অধিকার তারা দাবিও করতো। একটি গোপন মৃত্যুদণ্ড প্রদান ছিল বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত মৃত্যুদণ্ড। এমন ক্ষেত্রে ধরে নেওয়া হতো যে অপরাধীকে প্রদত্ত মৃত্যুদণ্ড শাস্তির যাবতীয় প্রথাগত তীব্রতা মেনে দেওয়া হয়নি। শেষ মুহূর্তে যদি কখনো অপরাধীকে চোখের বাইরে নিয়ে যাওয়া হতো, তখন জনতা প্রতিবাদ করতো। ডাক বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা (যাকে স্ত্রী হত্যার জন্য প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান দেওয়া হয়)-কে যেমন মৃত্যুদণ্ড প্রদানের শেষ মুহূর্তে জনতার চোখের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। ‘তাকে একটি ভাড়া করা ঘোড়ার গাড়িতে তোলা হয়। কেননা, কর্তৃপক্ষ দেখলো যে জনতার হাত থেকে তাকে নিরাপদ স্থানে সরাতে না পারলে তার আক্রান্ত ও অপমানিত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। যেহেতু সমবেত জনতা তার দিকে চিৎকার করছিল এবং টিটকিরি দিচ্ছিল (হার্ডি, ১, ৩২৮)।’ নারী অপরাধী লেসকম্বাটকে যখন ফাঁসি দেওয়া হয়, বিশেষ লক্ষ্য রাখা হয়েছিল যে তার মুখ যেন ঢাকা থাকে। তাঁর ‘মাথা ও গলা একটি ওড়নায় ঢাকা ছিল। জনতা গুঞ্জন করে উঠলো এই বলে যে এই নারী তবে লেসকম্বাট নয় (আঞ্চেল, ৭০-৭১)।’ জনতা মৃত্যুদণ্ড প্রদান দেখার জন্য এবং কাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হচ্ছে তা’ দেখারও অধিকার দাবি করতো। প্রথম বারের মতো যখন গিলোটিন ব্যবহার করা হয়, তখন ক্রনিক দ্যু প্যারিস (Chronique de Paris)-এ এই মর্মে প্রতিবেদন আসে যে গিলোটিনের সামনে সমবেত জনতা এই বলে অভিযোগ করে যে তারা কিছু দেখতে পাচ্ছে না এবং শ্লোগান দান করে যে ‘আমাদের ফাঁসিকাঠ ফিরিয়ে দাও (লরেন্স, ৭১ এফএফ )।’ জনতার অংশগ্রহণের অধিকারও ছিল। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মিছিলে বহন করে নিয়ে যাওয়া হতো, প্রদর্শন করা হতো এবং অপমান করা হতো। তার কৃত অপরাধের ভয়াবহতার কথা অসংখ্য উপায়ে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হতো। সমবেত দর্শকদের অপমান ও কখনো কখনো শারীরিক হামলা বা আঘাতের মুখোমুখিও তাকে করা হতো। অপরাধীর প্রতি সাধারণ দর্শকদের প্রতিহিংসা প্রকাশের আহ্বান জানানো হতো। এবং, সম্রাটের প্রতিহিংসার অপ্রগলভ অংশ হিসেবে এই আহ্বান জানানো হতো। এমন নয় যে এটি কোন মৌলিক বিষয় ছিল। অথবা, এমনও নয় যে জনতার পক্ষ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য রাজাকে প্রতিহিংসা প্রকাশ করতে হতো। বরং জনতার দায়িত্ব ছিল রাজাকে সাহায্য করা যখন রাজা ‘তার শত্রুদের প্রতি প্রতিহিংসা’ গ্রহণ করতে চাইতেন, বিশেষতঃ যখন জনতার ভেতর থেকেই কোন কোন মানুষকে খুঁজে পাওয়া যেত রাজার শত্রু হিসেবে। এ যেন জনতার পক্ষ থেকে রাজাকে প্রদেয় কোন ‘বধ্যমঞ্চ সেবা’ যা রাজার প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার কাজে জনতার তরফে বিশেষ কোন দেনা। পুরনো অধ্যাদেশগুলোয় এই ‘সেবা’র কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ১৩৪৭ সালের আইনগ্রন্থে ঈশ্বরনিন্দাকারীদের শাস্তি সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে যে ঈশ্বর নিন্দাকারীদের ‘গলায় কাঠের চাকা ঝোলানোর প্রথম মুহূর্ত থেকে মৃত্যু অবধি জনসমক্ষে প্রদর্শন করা হবে। পাথর বা পাথরের মতো বস্তু ছোঁড়া না গেলেও কাদা ও অন্যান্য বর্জ্য পদার্থ তাদের মুখে ছোঁড়া যেতে পারে…যদি অপরাধী প্রথম মৃত্যুদণ্ড প্রদান প্রচেষ্টায় মারা না যায়, তবে আমাদের অভিপ্রায় হলো একটি জমজমাট হাট-বাজারের দিনে তাকে পুনরায় কাঠের চাকায় তোলা হবে এবং তার উপরের ঠোঁট ফেঁড়ে দেওয়া হবে যাতে তার দাঁতগুলো দেখা যায়।’ কোন সন্দেহ নেই যে ধ্রুপদী যুগে এহেন নির্যাতন সহ্য করার মাত্রা কমে আসে এবং নির্যাতনের মাত্রা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। নির্যাতনে নিষ্ঠুরতার উদ্ভব এবং শাস্তি দান ক্ষমতার জবরদখলের কারণেই নির্যাতন কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে থাকে। কিন্তু, নির্যাতনের নিষ্ঠুরতা প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ডের সাধারণ অর্থনীতির সাথে এত গভীরভাবে জড়িত ছিল যে একদম সাথে সাথেই নির্যাতন সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। এমনকি আঠারো শতকেও, যেমন ১৭৩৭ সালে মন্তিগনির (Montigny) মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সময়, জল্লাদ যখন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করছিল, এলাকার জেলে বধূরা মিছিল করে হাঁটছিল। তাদের হাতে উঁচু করে ধরা ছিল মন্তিগনির একটি কুশপুত্তলিকা এবং তারা সেই কুশপুত্তলিকার মাথা কাটছিল (আঞ্চেল, ৬৩)। এবং প্রায়শঃই, অপরাধীকে যখন খুব ধীরে ধীরে জনতার শোভাযাত্রার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হতো, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব ছিল তাদের ভিড়ের জনতার হাত থেকে রক্ষা করা। জনতার কাছে অপরাধ করার পরিণতির উদাহরণ ও আক্রমণের লক্ষ্য, এই উভয় হিসেবেই অপরাধীকে বাঁচানোটা ছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের কাজ। অপরাধী যেন জনতার জন্য একইসাথে একটি ‘হুমকি’ আবার তাদের হাতে ‘শিকার,’ একইসাথে জনতার কাছে আক্রান্ত হবার জন্য সম্রাটের তরফ থেকে ‘প্রতিশ্রুত’ আবার জনতার পক্ষে স্পর্শের অযোগ্য বা ‘নিষিদ্ধ’-ও বটে। নিজ শক্তি প্রদর্শনের জন্য জনতাকে সমবেত করে সম্রাট একমুহূর্তের জন্যই কেবল জনতার সন্ত্রাস সহ্য করতেন তার প্রতি আনুগত্যের স্মারক হিসেবে। এবং তার পরপরই সম্রাটের নিজের সুবিধার কথা ভেবেই জনতাকে আবার সংযত করা হতো।

এখন, বধ্যমঞ্চের চারপাশে অভিযুক্তকে আতঙ্কগ্রস্থ করে তোলার জন্য ডেকে আনা জনতাই কিন্তু আবার কখনো কখনো শাস্তি প্রয়োগকারী ক্ষমতাসম্পন্ন কর্তৃপক্ষের ক্ষমতাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। করতে পারে বিদ্রোহ ঘোষণা। সাধারণ মানুষের চোখে অন্যায় শাস্তি হিসেবে বিবেচিত কোন কোন হত্যাকাণ্ডকে প্রতিরোধ করা, জল্লাদের হাত থেকে কোন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ছিনিয়ে আনা, জোর খাটিয়ে তার জন্য ক্ষমা আদায়, কখনো কখনো জল্লাদদের পিছু ধাওয়া করা এবং হামলা করা, বিচারকদের নিগ্রহ করা এবং মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে শোরগোল তোলা–এসব কিছুই ছিল বিদ্রোহী জনতার ভেতর প্রচলিত ও জনপ্রিয় নানা আচরণ। এজাতীয় আচরণ মৃত্যুদণ্ডের রায় অতিক্রম করে রায়ের আনুষ্ঠানিকতা পালন ও মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগ করার কাজটিকেও কখনো কখনো সম্পূর্ণ ওলট-পালট করতে সমর্থ হতো। দাঙ্গার দায়ে অভিযুক্ত তিন অপরাধীর ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছিল। একটি বিখ্যাত শিশু অপহরণ ঘটনার পর কিছু বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। শিশু অপহরণের প্রতিবাদে যারা দাঙ্গা সূচনা করে, সেই তিন বিক্ষোভ সৃষ্টিকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে জনতা এই মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ওই তিন বিক্ষোভ সৃষ্টিকারীকে সন্ত জাঁ-এর কবরস্থানের দরজায় ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়, ‘যেহেতু পাহারা দেবার মতো মিছিল এবং দর্শনার্থীর সংখ্যা অনেক কম ছিল।’ আতঙ্কিত জল্লাদরা একজন অভিযুক্তের মাথা সাথে সাথে কেটে ফেলে। তীরন্দাজ বাহিনী কবরস্থানের সামনে বিক্ষুব্ধ জনতার উদ্দেশ্যে তীর ছুঁড়তে থাকে। ১৭৭৫ সালে শস্য নিয়ে দাঙ্গার সময়ও এমনটি ঘটেছিল। ১৭৮৬ সালেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয় যখন দিনমজুররা ভার্সেই অভিমুখে মিছিল করে যায় এবং তাদের গ্রেপ্তারকৃত সহযোদ্ধাদের মুক্তির দাবিতে আওয়াজ তোলে। কিন্তু, উপরের এই মামলাগুলো ছাড়াও অতীতের প্রচুর উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায় যেখানে স্বয়ং সম্রাটের তরফ থেকেই আদালতের রায় এবং মৃত্যুদণ্ডের পর পর জনতার ভেতর অভিযুক্তের বিরুদ্ধে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়েছে। এই উত্তেজনা শাস্তির ন্যায্যতাকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি করা হয়নি। এমনসব ক্ষেত্রে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ‘বধ্যমঞ্চের চারপাশে প্রচুর ঝামেলা’ সৃষ্টি হতো।

সাধারণতঃ এই ঝামেলাগুলো, একদম প্রাথমিক পর্যায়ে, শুরু হতো মৃত্যুদণ্ডের প্রতি জনতার সমর্থনসূচক চিৎকার ধ্বনি থেকে। কখনো কখনো হর্ষধ্বনিও দেওয়া হতো যা নিহত হবার আগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শুনতে হতো। জনতার এই প্রকাশ্য ও দীর্ঘ শোভাযাত্রার পুরো সময় জুড়েই অভিযুক্ত ব্যক্তি পেত ‘কোমল ও ভীরু হৃদয়ের মানুষদের সহানুভূতি এবং সাহসী ও কঠিন হৃদয় মানুষদের হত্যাদণ্ডের প্রতি প্রশংসা, অনুরাগ ও অভিযুক্তের প্রতি ঘৃণা (ফিল্ডিং, ৪৪৯)।’ তবে, বধ্যমঞ্চের পাশে জড়ো হওয়া মানুষেরা শুধুই অভিযুক্তের যন্ত্রণা দেখতে বা জল্লাদের রাগ ও উত্তেজনা বাড়াতেই যে জড়ো হতো, তা নয়। অভিযুক্ত ব্যক্তি, যার আর কিছুই হারানোর নেই, সে কীভাবে বিচারক, আইন, সরকার ও ধর্মকে গালিগালাজ করে তা দেখতেও মানুষ জড়ো হতো বৈকি। মৃত্যুদণ্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অবশ্য এই ক্ষণিকের অভিসম্পাতের অধিকার দেওয়া হতো যেহেতু তাকে নিষেধ করা বা শাস্তি দেবার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট থাকতো না। আসন্ন মৃত্যুর আচ্ছাদনের আওতায় অপরাধী যে কোন গালিগালাজ করতে পারতো এবং জনতা এই গালিগালাজ শুনতো হর্ষধ্বনি সহকারে। ‘যদি এমন কোন বর্ষলিপি থাকতো যে নির্যাতিত এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির শেষ মিনিটের কথাটিও সঠিকভাবে তুলে রাখা হতো, এবং পরবর্তীতে কেউ যদি সেই দলিল পাঠের সাহস করতেন, তবে দেখতে পেতেন যে নিষ্ঠুর কৌতূহল থেকে বধ্যমঞ্চের চারপাশে জড়ো হওয়া জনতাকে দু/এক কথা শোনানোর বেশি কিছুই করা হয়নি। সেই দলিল পাঠককে তখন বলা হবে যে চাকায় তুলে হত্যা করা হয়েছে এমন কেউই অদৃষ্টকে গালি-মন্দ করেনি তাকে এই অপরাধের পথে ঠেলে আনার জন্য, বিচারকদের ভৎর্সনা করেনি তাদের বর্বরতার জন্য, বধ্যমঞ্চের সচিবদের অভিসম্পাত করেনি যারা তাকে বধ্যমঞ্চে তুলে দিচ্ছে এবং ঈশ্বরের বিরুদ্ধে নিন্দা করেনি যার সে অঙ্গবিশেষ (ব্যুশে দ্য’আর্গিস, ১২৮-৯)। যদিও সম্রাটের আতঙ্ক জাগানিয়া ক্ষমতার মহড়া প্রদর্শনই ছিল মৃত্যুদণ্ড প্রদানের মুখ্য উদ্দেশ্য, এর একটি শোভাযাত্রা জাতীয় উৎসব মুখরতার দিকও ছিল। যে কার্নিভালে নিয়ম-কানুন যেত উল্টে, কর্তৃত্বকে উপহাস করা হতো এবং অপরাধীরা বীরে পরিণত হতো। লজ্জা উল্টে যেত। অভিযুক্তের অশ্রু ও কান্নার মতোই তার সাহসও শুধুমাত্র আইনকেই আহত করতো। পরিতাপের সাথে ফিল্ডিং বর্ণনা করেন, ‘মৃত্যু এবং লজ্জার বোধকে এক সূতোয় গাঁথা কল্পনায় যত সহজ, বাস্তবে ততটা নয়…যে কোন ব্যক্তি যিনি কোন মৃত্যুদণ্ড দেখেছেন বা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মিছিল দেখেছেন, তাকে আমি অনুরোধ করবো আমার একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে। প্রশ্নটি হলো: যখন মৃত্যুদণ্ড পাওয়া কোন অভাগা মানুষকে তিনি দেখেছেন, একটি গাড়িতে বাধা, অমোঘ ভাগ্যের দোরগোড়ায় পৌঁছে যে কিনা পাণ্ডুবর্ণ মুখে কাঁপছে, তাকে দেখে কি কোনভাবেই ওই ব্যক্তির জন্য কোন লজ্জা অনুভব হয়েছে? বরং ওই সাহসী ও দুর্ধর্ষ দুর্বৃত্তের বর্তমান পরিস্থিতিতে তার জন্য গৌরবই বোধ হয়। যে কেউই মৃত্যুদণ্ড পেতে যাওয়া মানুষকে দেখে লজ্জার পরিবর্তে তার জন্য গৌরবই বোধ করবেন (ফিল্ডিং, ৪৫০)।’ বধ্যমঞ্চের সামনে সমবেত মানুষ যারা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়াটা দেখেন, তাদের পক্ষে সম্রাটের সবচেয়ে নিষ্ঠুর প্রতিশোধ গ্রহণের সময়ও, রাজকীয় নিষ্ঠুরতার বদলা হিসেবে নিষ্ঠুরতা প্রদর্শনের একটা সম্ভাবনা থেকে যায়।

এহেন সম্ভাবনা বেশি থাকতো যদি অন্যায্যভাবে কোন নিষ্পাপ ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হতো–কিম্বা যদি কোন মানুষকে এমন কোন অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো, যে একই অপরাধের জন্য অপেক্ষাকৃত ধনী পরিবার বা অভিজাত বংশ পরিচয়ের মানুষকে তুলনামূলক হাল্কা দণ্ড দেওয়া হয়। আঠারো শতক নাগাদ দেখা যায় যে দণ্ডমূলক বিচার ব্যবস্থার কিছু অনুশীলন সমাজে আর সমর্থন পাচ্ছে না–বিশেষতঃ সমাজের নিম্নবর্গের মানুষ একদমই সমর্থন করছে না। এ থেকেই সহজে বোঝা যায় যে কেন মৃত্যুদণ্ডের রায় থেকে হঠাৎই নানা সামাজিক বিক্ষোভের সূচনা হতো। তখনকার সময়ের এক ম্যাজিস্ট্রেটের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যেহেতু পয়সার অভাবে সমাজের সবচেয়ে গরীব মানুষেরা আদালতে তাদের বলার কথাটি বলতে পারতো না, সেহেতু একমাত্র এই প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রদর্শনীতেই সাক্ষী ও আইনের সহসমন্বয়ক হিসেবে ডাক পেয়ে তারা কিছুটা হলেও হস্তক্ষেপ করতে পারত। হস্তক্ষেপ করতে পারতো সশরীরেই। শাস্তির কৃৎকৌশলে জোর করে ঢুকতে পারতো তারা। শাস্তির প্রভাবগুলো পুনর্বন্টন করতে পারতো। অন্য কোন অর্থে, দণ্ডমূলক আনুষ্ঠানিকতার সন্ত্রাস গ্রহণ করতে পারতো (দুপাতি, ১৭৮৬, ২৪৭)। সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী শাস্তির পার্থক্যের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ছিল। ১৭৮১ সালে শম্প্রে এলাকার কাউন্টি গির্জার যাজক ওই এলাকার ভূস্বামীর হাতে নিহত হন। কর্তৃপক্ষ তখন সামন্ত অধিপতিকে ‘মানসিক ভাবে অসুস্থ’ ঘোষণা করার মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডের হাত থেকে বাঁচাতে চেষ্টা করে। ‘স্থানীয় কৃষককুল, যারা তাদের পালকের (যাজক) সাথে ঘনিষ্ঠ মৈত্রীতে আবদ্ধ ছিল, ভয়ঙ্কর ভাবে রেগে যায় এবং তৎক্ষণাৎই তাদের সামন্ত ভূস্বামীকে এক হাত দেখে নিতে ও তার প্রাসাদে আগুন লাগাতে প্রস্তুত হয়ে পড়ে…যথার্থভাবেই প্রত্যেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর দায়িত্বহীনতা ও সামন্ত প্রভুকে প্রশ্রয় দানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। যেহেতু মন্ত্রী এত ঘৃণ্য একটি অপরাধের পর্যাপ্ত শাস্তি এড়ানোর মাধ্যমে খোদ ন্যায়বিচারকেই বঞ্চণা করেন (হার্ডি, ৪, ৩৯৪) ।’

আবার, গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত নয় এমন কিছু সাধারণ অন্যায়ের জন্য কঠিন শাস্তির বিরুদ্ধেও বিক্ষোভ ছিল (যেমন, ঘর ভাঙা)। অথবা, সামাজিক দুর্দশার সাথে জড়িত কিছু অপরাধের জন্য কঠিন শাস্তির বিরুদ্ধেও জনমনে ক্ষোভ ছিল। যেমন, দারিদ্র্যের কারণে করা ছিঁচকে চুরির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হলে অনেকেই অখুশী হয়। যেহেতু তখনকার দিনে দিনে ঘরে ঘরে প্রচুর গৃহভৃত্য ছিল। বাড়ির মনিব তাদের উপর কোন কারণে চটলে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা তাদের পক্ষে প্রায়ই বেশ কঠিন হতো। বাড়ির মালিক যদি সত্যিকারের চোরকে খুঁজতে যথেষ্ট তৎপর চরিত্রের না হতেন এবং আলস্যবশতঃ বাড়ির চাকরকেই চোখ বুঁজে চোর মনে করে বসতেন, তাহলে চাকরদের ভাগ্য হতো বিনা দোষে অনেক সময়ই অভিযুক্ত হওয়া, নিন্দা কুড়ানো, ফাঁসির দড়িতে ঝোলা ও ঘোর দুর্বৃত্ত হিসেবে বদনামের ভাগিদার হওয়া। গৃহভৃত্যদের এমন মৃত্যুদণ্ড প্রদান প্রায়ই প্রতিবাদ কুড়াতো (হার্ডি, ১, ৩১৯, ৩৬৭; ৩, ২২৭-৮, ৪, ১৮০)। ১৭৬১ সালে প্যারিস শহরে এক গৃহপরিচারিকার পক্ষে জনতা দাঙ্গা সঙ্ঘটন করে। ওই গৃহপরিচারিকার দোষ ছিল মালিকের দোকান থেকে স্রেফ এক টুকরো কাপড় চুরি করা। যদিও গৃহপরিচারিকা চুরির পরে তার অপরাধ স্বীকার করে মালিককে কাপড়ের টুকরো ফিরিয়ে দেয় এবং করুণা ভিক্ষা করে, মালিক আদালতে করা অভিযোগ প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃত হয়। মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের দিনে জনতা অবশ্য হতভাগ্য মহিলার ফাঁসি ঠেকায় ও মালিকের কাপড়ের দোকান লুট করে। ঘটনার শেষে ওই পরিচারিকাকে ক্ষমা করা হয়। কিন্তু অন্য এক মহিলা যে ওই নির্দয় মালিকের শরীরে একটি সুঁই ফোটানোর চেষ্টা করেছিল, তাকে তিন বছরের নির্বাসন দণ্ডে দণ্ডিত করা হয় (আঞ্চেল, ২২৬)।

আঠারো শতকের বৃহৎ আইনী কর্মকাণ্ডগুলো যে কেউ স্মরণ করতে পারবেন, যখন দার্শনিকদের আলোকিত মতামত আইনী বিষয়েও প্রবেশ শুরু করে। দেখা দেন কালাস, সিরভেন এবং শেভালিয়েহ দো লা বাহে (Chevalier de La Barre)-র মতো কিছু ম্যাজিস্ট্রেট। কিন্তু, দণ্ডমূলক অনুশীলনের বিরুদ্ধে প্রচুর মানুষের অংশগ্রহণে সৃষ্ট বিক্ষোভগুলোর ব্যাপারে তুলনামূলক কম মনোযোগ দেওয়া হয়। যদিও এই বিক্ষোভগুলো খুব কম ক্ষেত্রেই একটি জেলা বা বড়জোর একটি শহর ছাড়িয়ে আর প্রসারিত হয়েছে, তবু তাদের বাস্তবিক কিছু গুরুত্ব ছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমাজের নিম্নবর্গ থেকে সূত্রপাত হওয়া এই আন্দোলনগুলো তুলনামূলক ভাবে উচ্চপদে সমাসীন মানুষদের মাঝেও বিস্তার লাভ করেছে, করেছে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ। যারা এই আন্দোলনগুলোয় গ্রহণ করে তাদের দিয়েছে এক নতুন মাত্রা। যেমন ঘটেছে ফরাসী বিপ্লবের আগের বছরগুলোয়। ১৭৮৫ সালে পিতৃহত্যার মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত ক্যাথরিন এস্পিনাসের (Catherine Espinas) মামলা, চাকায় তুলে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের রায়ে দণ্ডিত শৌমন্তের (Chaumont) তিন ব্যক্তি (যাদের নিয়ে ১৭৮৬ সালে দুপাতি রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত স্মরণিকা) অথবা মেরি ফ্রাঁসোয়াঁ স্যালমন, যাকে বিষ প্রয়োগের অভিযোগে ১৭৮২ সালে রুয়ের সংসদ খুঁটিতে বেঁধে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের রায় দেয় কিন্তু ১৭৮৬ সাল নাগাদও সেই রায় বাস্তবায়িত না হওয়াটা বিপ্লবপূর্ব বছরগুলোয় আইনী বদলের ইঙ্গিত। স্বাভাবিকভাবেই, এই উত্তেজনাগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দণ্ডমূলক বিচারব্যবস্থা ও তার প্রকাশকে কেন্দ্র করে সঙ্ঘটিত হয়েছে। যা কিনা দৃষ্টান্তমূলক হওয়া উচিত ছিল, সেই এক চির বিক্ষোভকর অবস্থা। বধ্যমঞ্চের চারপাশে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ‘জনতার জন্য পীড়াদায়ক’ এবং ‘কর্তৃপক্ষের জন্য অপমানকর’ পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা কতবার জরুরি প্রমাণিত হয়েছে (আর্গেনসন, ২৪১)। এ ব্যাপারটি পরিষ্কার ছিল যে মাঝে মাঝেই জনতা দণ্ডপ্রদান অনুষ্ঠানের জাঁকজমকপূর্ণ প্রদর্শনীকে প্রত্যাখ্যান করতো যে জনতাকে উদ্দেশ্য করে এই অনুষ্ঠান আয়োজিত হত। বস্তুতঃ প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ডের আতঙ্ক বেআইনী কার্যক্রমের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়াতো। মৃত্যুদণ্ডের দিন জনতার দৈনন্দিন কাজ-কর্ম সব বন্ধ হয়ে যেত, সরাইখানাগুলো পরিপূর্ণ হতো মানুষে, কর্তৃপক্ষকে অপমান করা হতো, জল্লাদ, সৈন্য ও পাহারাদারদের উদ্দেশ্যে অপমান ও পাথর ছুঁড়ে মারা হতো। সাধারণ মানুষ প্রায়ই চেষ্টা করতো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ছিনিয়ে নেবার জন্য। হয় বাঁচানোর উদ্দেশ্যে অথবা আরো দ্রুততা ও নিশ্চয়তার সাথে তাকে মেরে ফেলতে। লড়াই ছড়িয়ে পড়তো। এবং চোরদের জন্য বধ্যমঞ্চের চারপাশে ভিড় করা কৌতুহলী জনতার চেয়ে উৎকৃষ্ট কোন শিকার ছিল না। (হার্ডি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলার কথা স্মরণ করেন যেখানে গুরুত্বপূর্ণ চুরির ঘটনা এমন বাসায় ঘটেছে যেখানে স্বয়ং পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন–৪, ৫৬)। কিন্তু, সর্বোপরি যে কারণে এই অসুবিধাগুলো রাজনৈতিক বিপদের চেহারা পায় তা হলো সাধারণ মানুষ কখনোই দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর চেয়ে দণ্ডদানকারীদের আপনার জন মনে করে নি। যেহেতু দণ্ডদানকারীদের কাজই ছিল অপরাধের ভয়াবহতা ও ক্ষমতার অপরাজেয়তা প্রদর্শন করা। শাস্তি প্রদানের সময় পরিমিতিহীন ও নিয়ন্ত্রণহীন আইনী সহিংসতার ব্যবহার সাধারণ মানুষকে যতটা ভয়ার্ত করে তুলেছে, ততটা ভয় আর কিছুতেই মানুষ পায় নি। ছোটখাট অপরাধে অভিযুক্ত মানুষেরা ছিল সমাজের এক বিশেষ শ্রেণীর সদস্য এবং তাদের ভেতর সংহতিও ছিল গভীর ও ধারাবাহিক। যেমন–ভবঘুরে, অকিঞ্চন দরিদ্র, পকেটমার, মিথ্যে ভিক্ষুক, চোরাই মালের গ্রহীতা ও কারবারি প্রমুখ। পুলিশী তল্লাশির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, পুলিশকে তথ্য যোগানো মানুষ বা ইনফর্মারদের পিছু ধাওয়া করা, রক্ষী বা পরিদর্শকদের উপর হামলা করা এই সংহতির প্রকাশ (রিশেট, ১১৮-১৯)। এবং দণ্ডমূলক ও পুলিশী নিপীড়নের এক বড় উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় দরিদ্র মানুষের ভেতর এই সংহতিতে ভফুন সৃষ্টি করা। তবু, প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের এই আনুষ্ঠানিকতার ভেতর থেকে দরিদ্র মানুষের এই সংহতি সার্বভৌম সম্রাটের ক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ শক্তিতে আত্মপ্রকাশ করে। যেহেতু প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রদানের সেই অনিশ্চিত উৎসবে সন্ত্রাসের পাল্টা জবাব তাৎক্ষণিক ভাবেই দেওয়া যেত। আঠারো ও উনিশ শতকের সংস্কারবাদীরা ভুলে যাননি যে শেষপর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড জনতাকে আর ভয়ার্ত করে না। জনতার অন্যতম প্রাথমিক চাওয়া হলো মৃত্যুদণ্ডের অবলুপ্তি।

প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রদানের অনুষ্ঠানে জনতার হস্তক্ষেপের ফলে যে রাজনৈতিক সমস্যা দেখা দিত, তা বিশদ ভাবে ব্যাখ্যা করতে হলে দু’টো ঘটনার উল্লেখই যথেষ্ট। প্রথম ঘটনাটি ঘটেছিল সতেরো শতকের শেষে আভিগনন এলাকায়। আতঙ্কজাগানিয়া নাটকের সব ধরনের প্রধান উপকরণই এতে ছিল: জল্লাদ ও অভিযুক্তের ভেতর শারীরিক সংঘর্ষ, দ্বন্দ্ব-যুদ্ধের ওল্টানো-পাল্টানো পরিস্থিতি জনতার হাতে জল্লাদের ধাওয়া খাওয়া, বিক্ষুব্ধ জনতা সৃষ্ট আসন্ন দাঙ্গার মুখে অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রাণে বেঁচে যাওয়া এবং শাস্তির কৃৎকৌশল ভয়ানক ভাবে উল্টে-পাল্টে যাওয়া। সংক্ষেপে মূল ঘটনাটা হলো: পিয়েহে দ্যু ফোহ নামে এক ব্যক্তির ফাঁসি হবার কথা ছিল। পিয়েহে ‘বেশ কয়েকবার ফাঁসিমঞ্চের সিঁড়িতে পা রাখার চেষ্টা করলেও পা সে ঠিকভাবে নাড়াতে পারছিল না।’ ‘এ অবস্থা দেখে, জল্লাদ পিয়েহের গায়ের আঁটোসাঁটো জামাটি ওর মুখের উপর টেনে দেয় এবং পিয়েহের হাঁটুর নিচে, পাকস্থলির উপর এবং পেটে আঘাত করে। জনতা যখন দেখল যে জল্লাদ পিয়েহেকে এত কষ্ট দিচ্ছে এবং তাদের এটাও বিশ্বাস হলো যে জল্লাদ হয়তো পিয়েহেকে বেওনেট দিয়ে মেরে ফেলছে…পিয়েহের প্রতি সমবেদনা ও জল্লাদের প্রতি ফুঁসে ওঠা ক্রোধ থেকে, জনতা বধ্যমঞ্চ লক্ষ্য করে এমনভাবে পাথর ছুঁড়ে মারতে লাগলো যে জল্লাদ দুটো মইয়ে ধাক্কা দিয়ে রোগীকে (অভিযুক্তকে) নিচে ফেলে দিল এবং তার কাঁধের উপর লাফ দিয়ে উঠে তাকে লাথি মারলো। এবং সেই সময় জল্লাদের বউ ফাঁসিকাঠের নিচ থেকে পিয়েহের পা ধরে টানতে থাকে। এতে করে জল্লাদ ও জল্লাদের বউ মিলে পিয়েহের মুখ থেকে রক্ত বের করে আনে। কিন্তু, পাথর বর্ষণের বেগ আরো গভীর হয়ে উঠলে (একটি পাথর ফাঁসিতে ঝোলানো ব্যক্তির মাথাতেও লাগে) জল্লাদ বাধ্য হয় মইটি সজোরে নিক্ষেপ করে এত দ্রুত নামার চেষ্টা করতে যে সে মই থেকে নামার মাঝপথেই মাটিতে পড়ে যায় এবং তার মাথা মাটিতে ঘা খায়। এক দঙ্গল মানুষ তখন জল্লাদের উপর হামলে পড়ে। জল্লাদ অবশ্য তার পায়ের উপর উঠে দাঁড়ায়। বেয়নেট হাতে সে সবাইকে এই বলে শাসাতে থাকে যে যে-ই তার সামনে আসবে, তাকেই সে শেষ করে দেবে। কিন্তু, এমনটি করতে গিয়েও সে কয়েকবার মাটিতে পড়ে যেতে থাকে। শেষপর্যন্ত যতক্ষণে উঠে দাঁড়াতে পারে, ততক্ষণে জনতা তাকে ঘিরে ধরেছে প্রচণ্ড পিটুনি দিতে। উত্তেজিত জনতা জল্লাদকে পিটায়, কাদায় গড়াতে দেয়, পার্শ্ববর্তী নদীতে চোবায় এবং শেষমেশ টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে চলে ইউনিভার্সিটি হয়ে কহদেলিয়েহ সেমেট্রিতে (Cordeliers Cemetery)। জল্লাদের চাকরকেও পিটানো হয় এবং মাথা ও শরীরে আঘাত নিয়ে সেই চাকরকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে যেখানে কয়েকদিন পর সে মারা যায়। যা হোক, কিছু আগন্তুক এবং অচেনা মানুষ মই বেয়ে উঠে ফাঁসির দড়িটা কেটে ফেলে এবং আরো কিছু মানুষ নিচ থেকে ফাঁসিতে ঝোলানো পিয়েহেকে ধরে ফেলে। যদিও পিয়েহে একটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে যতটা সময় নেয়, তারও চেয়ে বেশি সময় ধরে ফাঁসিতে ঝুলেছে। জনতা এরপর ফাঁসিকাঠ ভেঙ্গে ফেলে এবং জল্লাদের মই টুকরো টুকরো করে। শিশুরা ফাঁসিকাঠের ভাঙা টুকরো নিয়ে রোন (Rhone) নদীতে ফেলে দেয়।’ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অতঃপর একটি কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয় ‘যাতে করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে পুনরায় ধরতে না পারে এবং সেখান হতে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় সেইন্ট-আন্তোইনের (Saint-Antoine) চার্চে।’ আর্চবিশপ সেখানে পিয়েহেকে ক্ষমা প্রদান করেন, তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে রোগীর যথাযথ সেবা প্রদানের জন্য অনুরোধ করেন। শেষমেশ, এ কাহিনীর লেখক জানাচ্ছেন, ‘আমরা তার জন্য একটি নতুন স্যুট, দু’জোড়া জুতো তৈরি করেছি। আমরা তাকে মাথা থেকে পা অবধি সম্পূর্ণ নতুন পোশাকে সাজিয়েছি। আমার সহকর্মীরা তাকে শার্ট, চোগা ফুলপ্যান্ট এবং একটি পরচুলা দিয়েছে’ (দুহামেল, ৫-৬; এ জাতীয় ঘটনা উনিশ শতকেও কিছু ঘটছিল (লরেন্স, ৫৬ এবং ১৯৫-৮)।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটেছিল প্যারিসে। এক শতাব্দী পর। ১৭৭৫ সালের ঘটনা। শস্য নিয়ে দাঙ্গার পরপরই ঘটনাটি ঘটেছিল। জনতার ভেতর রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনার দরুন কর্তৃপক্ষ চেয়েছিল যে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের ঘটনাটি নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠিত হোক। বধ্যমঞ্চ ও জনতার ভেতর নিরাপদ দূরত্ব রাখা হয়। এবং সেই নিরাপদ দূরত্বের ভেতর আবার দুই সারি সৈন্য দাঁড় করানো হয় পাহারা দানের জন্য। এক সারি সৈন্যকে বধ্যমঞ্চের দিকে মুখোমুখি করে বিন্যস্ত করা হয়েছিল। অপর সারিকে রাখা হয়েছিল জনতার দিকে মুখোমুখি অবস্থানে যাতে বিক্ষুব্ধ জনতা দাঙ্গা শুরু করলে সৈন্যরা উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারে। সাধারণ মানুষের সাথে ক্ষমতাবান কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ এভাবেই ভেঙে গেল। এটি একটি প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রদান অনুষ্ঠান হলেও অনুষ্ঠানের জাঁকজমক অনেকটাই কমিয়ে আনা হয়েছিল। এটি পরিণত হয়েছিল সম্পূর্ণই এক ভীতি প্রদর্শন অনুষ্ঠানে। একটি শূন্য চত্বরে, সশস্ত্র প্রহরাধীন অবস্থায়, ন্যায়বিচার নিরিবিলি তার কাজ করে চলে। এমনকি যে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের কাজ চলছিল, সেটাও খুব উপর ও দূরের অবস্থান থেকে সাধারণ মানুষকে দেখানো হচ্ছিল। ‘দুটো ফাঁসিকাঠ, যেগুলো ছিল মোটামুটি আঠারো ফুট উঁচু, নিঃসন্দেহে উদাহরণবশতই, বিকাল তিনটা পর্যন্ত স্থাপন করা হয়নি। দুপুর দুটা হতে প্লাস দ্যু গ্রাভ এবং পার্শ্ববর্তী সমস্ত রাস্তা পদাতিক ও অশ্বারোহী বাহিনীর সৈন্যে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। সুইস ও ফরাসী সৈন্যরা ধারকাছের সব রাস্তায় টহল দিতে শুরু করে। মৃত্যুদণ্ড প্রদানের সময়টি প্লাস দ্যু গ্রাভে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। চারদিকে তাকিয়ে জনতা সর্বোচ্চ যা দেখতে পেয়েছে তা হলো বেওনেট খাড়া করে রেখে দুই সারি সৈন্য পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ানো যাদের এক দল তাকিয়ে আছে চত্বরের দিকে আর এক দল বাইরে জনতার দিকে তাকানো। দুই হতভাগ্য দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি পুরো সময়টি এই বলে কেঁদেছে যে তারা নির্দোষ এবং মই বেয়ে ফাঁসিকাঠে ওঠার সময়ও প্রতিবাদ করেছে (হার্ডি, ৩, ৬৭)।’ জনতাকে মৃত্যুদণ্ড দেখতে না দেওয়ার পেছনে রাষ্ট্রশক্তির শুধুই যে মানবতাবাদী কোন কারণ ছিল তা নয়, বরং এই দ্ব্যর্থতাবোধক আনুষ্ঠানিকতার সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কাও ছিল।

‘ফাঁসিকাঠ বক্তৃতা’য় এই একই দ্ব্যর্থতাবোধক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থিত হয়। মৃত্যুদণ্ডের আনুষ্ঠানিকতা এমন ভাবে প্রস্তুত করা হতো যে অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেই অ্যামেন্ডে অনারেবল ঘোষণার মাধ্যমে নিজের অপরাধ স্বীকার করবে। সে নিজের পাপ ঘোষণা করবে ব্যানার প্রদর্শনের মাধ্যমে (যে ব্যানারে তার কৃত অপরাধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে)। এবং স্বকৃত অপরাধ বিষয়ে এমন বিবরনী প্রদান করবে যা নিঃসন্দেহে তার কাছ থেকে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে আদায় করা হয়েছে। এছাড়াও, মৃত্যুদণ্ডের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে অভিযুক্তকে আর একবার কথা বলার সুযোগ দেওয়া হতো। না, তার নিষ্পাপতা ঘোষণার জন্য নয়। বরং তার অপরাধ স্বীকার করতে এবং তাকে দোষী সাব্যস্ত করায় ন্যায়বিচার রক্ষা হয়েছে এমনটি বলতে। আইনী ইতিবৃত্তগুলো ঘাঁটলে এজাতীয় বহু বক্তৃতা পাওয়া যাবে। আসলেই কি এমন বক্তৃতা দেওয়া হয়েছে? নিঃসন্দেহে অনেকগুলো ঘটনায় দেওয়া হয়েছে। নাকি এই বক্তৃতাগুলো সবই ছিল কাল্পনিক বক্তৃতা যা পরে উদাহরণ ও জনতার প্রতি সম্রাটের তরফ থেকে অপরাধ না করার জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ হিসেবে বিতরণ করা হয়? সন্দেহ নেই যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই বক্তৃতাগুলো ছিল সম্রাটের তরফ থেকে বিতরন করা কাল্পনিক যত বক্তৃতা। উদাহরণস্বরূপ, মধ্য আঠারো শতকের ব্রিটানিতে (Brittany) একটি ডাকাত দলের সর্দারনী মেরিওন লো গফের (Marion le Goff) মৃত্যুকালীন বক্তৃতার বিবরণীকে আমরা কি মূল্য দেব? বধ্যমঞ্চ থেকে সে নাকি কেঁদে উঠেছিল: ‘বাবা ও মায়েরা যারা আমাকে শুনতে পাচ্ছেন! আপনাদের সন্তানদের ভালমতো দেখে-শুনে রাখবেন এবং তাদের সৎ হবার শিক্ষা দেবেন। শৈশবে আমি ছিলাম মিথ্যুক এবং কোন কাজই ভাল করতে পারতাম না। আমি একটি ছয় ধারঅলা ছুরি চুরি করার মাধ্যমে অপরাধের রাস্তায় জড়িয়ে পড়ি…এরপর ফেরিঅলা আর গরু-বাছুর ব্যবসায়ীদের উপর ডাকাতি শুরু করি। শেষমেশ, আমি একটি ডাকাত দলকে নেতৃত্ব দান শুরু করি যার জন্য আমি আজ এখানে। আমার এই কাহিনী আপনারা আপনাদের ছেলে-মেয়েদের বলবেন যাতে তারা এ ঘটনা থেকে উদাহরণমূলক শিক্ষা লাভ করে (কোহে, ২৫৭)।’ স্রেফ শব্দবন্ধ ব্যবহারের দিক দিয়েও, এহেন বক্তৃতা হাটে বিক্রি হওয়া বড় কাগজ এবং প্রচারপুস্তিকায় খুঁজে পাওয়া সনাতনী নৈতিক মূল্যবোধের খুব কাছাকাছি যা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হবার অবকাশ কম। তবে, ‘অভিযুক্ত ব্যক্তির শেষ কথা’ জাতীয় বক্তব্যের উপস্থিতি নিজেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইন চাইতো যে অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেই কোন না কোনভাবে তার উপর সঙ্ঘটিত নির্যাতনকে বৈধতা দিক। অপরাধীকে বলা হতো নিজের করা অপরাধের কালো দিক খুলে বলার মাধ্যমে শাস্তিকে ন্যায্যতা দান করার কাজটি করতে। তাকে বলতে বলা হতো, তিন/তিনটি খুনের আসামী জাঁ-দমিনিক লাংলেদকে (Jean-Dominique Langlade) যেমন বলতে বলা হয়েছিল, ‘আমার ভয়াবহ কলঙ্কজনক ও পরিতাপযোগ্য কুকর্মের কথা শুনুন! আভিগনন শহরে যে অন্যায় আমি করেছি–যেখানে আমার স্মৃতি আজো বিভীষিকা–যেহেতু বন্ধুত্বের পবিত্রতা আমি অমানবিক ভাবে ভঙ্গ করেছি (দুহামেল, ৩২)।’ এক দিক থেকে দেখলে, ‘অভিযুক্ত ব্যক্তির শেষ কথা’ হিসেবে বিতরিত বড়কাগজ বা মৃত্যু সঙ্গীত বিচারের পরবর্তী পর্ব হিসেবে বিবেচনা করা হতো। অথবা, এই বড়কাগজ বা মৃত্যুসঙ্গীত সেই কৃৎকৌশলের পিছু পিছু অনুসরণ করেছে যার মাধ্যমে প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রদানের অনুষ্ঠান ফৌজদারি কার্যবিধির গোপন ও লিখিত সত্যকে অপরাধীর শরীর, অঙ্গভঙ্গি এবং বক্তব্যে হস্তান্তর করেছে। ন্যায়বিচার এই সন্দেহজাগানিয়া বিবরণ চায় সত্যে দৃঢ়প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য। এভাবেই মামলার রায়গুলো অপরাধীর ‘মরণোত্তর’ নানা জবানবন্দি তথা প্রমাণ দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। এমনকি, কখনো কখনো আবার মামলা শুরু হবার আগেই অপরাধ ও অপরাধীর ঘৃণ্য জীবনের নানা কাহিনী প্রচার হতো যেন উদার ও সহনশীল হিসেবে বিবেচিত আদালত অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়।

চোরাচালানকারীদের নিন্দার্থে ‘দ্য কম্পানী দেস ফেহমে’ (the Campagnie des Fermes) চোরাচালানকারীদের অপরাধ সবিস্তার বর্ননা করে কিছু ব্যুলেটিন ছাপে। ১৭৬৮ সালে কোম্পানী মন্তাইন নামে এক চোরাচালানী চক্রের নেতার বিরুদ্ধে কিছু বড়কাগজ বিতরণ করে, যেখানে লেখক নিজেই বলছেন: ‘কিছু চোর মন্তাইনের কুকর্মের ব্যাপারে সত্যকার স্বাক্ষ্য প্রদান করেছে, যখন কিছু কিছু চোর ঠিক নিশ্চিত নয় যে মন্তাইনই এসব করে কিনা। মন্তাইনের ব্যাপারে যারা স্বাক্ষ্য দিয়েছে, তারা তাকে একটি বন্য জন্তু হিসেবে বর্ণনা করেছে। সে যেন দ্বিতীয় হায়েনা যাকে গুলি করে মারা প্রয়োজন। ওভার্গনের খেপা মানুষদের মাথায় এখন এই চিন্তাই কাজ করছে (জুইলার্ড, ২৪)।

তবে, মৃত্যুর আগে অভিযুক্তের শেষ বয়ান জাতীয় সাহিত্যের প্রভাব বাস্তবে কতটুকু ছিল সে বিষয়ে কিছু অনিশ্চয়তা থেকেই যায়। অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেই নিজের অপরাধী থেকে বীরে রূপান্তর হবার ব্যাপারটি অনুভব করতে পারত। অপরাধীর করা অপরাধের ব্যাপক প্রচার এবং দেরিতে হলেও করা তার অনুশোচনা প্রকাশিত হবার মাধ্যমে এই বীরে রূপান্তরিত হবার ঘটনাটি ঘটে। আইন, ধনিক শ্রেণী, ক্ষমতাবান গোষ্ঠি, ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ এবং রক্ষীবাহিনী, খাজনা ও খাজনা আদায়কারীদের বিরুদ্ধে অপরাধী তখন আবির্ভূত হয় এমন এক সংগ্রামের যোদ্ধা হিসেবে যে সংগ্রামের সাথে বহু মানুষ খুব সহজেই একাত্মতাবোধ করতে পারে। বড় বড় আকারে সংঘটিত এই অপরাধগুলোর ঘোষণা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ সংগ্রামের অলক্ষ্য খিন্নতা ও অবসাদকে যেন মহাকাব্যিক উদ্ভাসের ঝড়ে উড়িয়ে নিতে চাইতো। অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি অনুশোচনা প্রদর্শন করতো, যদি সে ঈশ্বর এবং মানুষের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার মাধ্যমে বিচারের রায় মেনে নিত, তখন অন্য সবার কাছে সে প্রায়শ্চিত্ত পর্ব সেরে আসা এক মানুষ হিসেবে প্রতিভাত হতো। তারপর সে মারা যেত একদমই তার নিজের মতো করে। ঠিক যেন এক সন্তের মৃত্যু। তবে, মহত্ত্বের বিপরীতে অদম্যতাও ছিল অপরাধীর আর এক বড় অর্জন। নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েও যে অপরাধী নতি স্বীকার করেনি, সে আসলে এমন এক শক্তির প্রমাণ রাখে যাকে নতি স্বীকার করানোর ক্ষমতা পৃথিবীতে কেউ রাখে না। ‘মৃত্যুদণ্ড প্রদানের দিন–এটা প্রায় অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে–আমি বিন্দুমাত্র আবেগ প্রদর্শন করিনি। আমি আমার অ্যামেন্ডে অনারেবল সম্পন্ন করলাম। এবং শেষপর্যন্ত আমি যখন ক্রসের উপর শুয়ে পড়লাম, আমি ভয় পাওয়ার কোন চিহ্ন প্রকাশ করি নি (জে.ডি.লংলেদের অভিযোগ, যাকে ১৭৬৮ সালের ১২ এপ্রিল আভিগননে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কালো নায়ক অথবা মিটমাট সেরে ফেলা অপরাধী, দরিদ্র মানুষের সত্যিকারের অধিকারের রক্ষক অথবা একটি অপ্রতিরোধ্য শক্তি…যেভাবেই দেখা হোক না কেন, সংবাদপত্র, প্রচার পুস্তিকা, বর্ষপঞ্জি অথবা রহস্যরোমাঞ্চ নানা কাহিনীতে অপরাধীর গল্পগাছা যেভাবে প্রকাশিত হয় (এবং এই গল্পগাছার আড়ালে নিহিত থাকে এই নীতিকথা যে কিছুতেই যেন তার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা না হয়), তাতে ফুটে ওঠে প্রচুর সংগ্রাম এবং দ্বন্দ্বের সামগ্রিক স্মৃতি। মৃত্যুর পর একজন অভিযুক্ত অপরাধী সন্ত হয়ে উঠতে পারেন। তার স্মৃতিকে পরম শ্রদ্ধা করা হতে পারে, তার কবরে জনতা নিবেদন করতে পারে শ্রদ্ধার্ঘ্য। যেমন, ১৭৪০ সালে ব্রিটানিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তাঙ্গুইয়ের (Tanguy) ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছিল। একথা সত্য যে অভিযুক্ত হবার পূর্বে তাঙ্গুই তার স্বীকারোক্তি আদায়কারীর নির্দেশে একটি দীর্ঘ পাপস্বীকার পর্ব সম্পন্ন করে। এই ব্যাপারটি কি আসলে দেওয়ানি বিচার এবং ধর্মীয় প্রায়শ্চিত্তবিধির ভেতরকার এক ধরনের সংঘাতের ইঙ্গিত করে? কোহে, ২১) ইতোমধ্যেই অপরাধী একজন ইতিবাচক নায়কে রূপান্তরিত। এই অপরাধীরা ছিল এমন মানুষ যাদের জন্য গৌরব এবং নিন্দা পরস্পরবিচ্ছিন্ন কোন ব্যাপার ছিল না। বরং তাদের জন্য গৌরব ও নিন্দা পাশাপাশি সহাবস্থান করতো; বারবার ঘুরে-ফিরে আসত তাদের জীবনে। অপরাধকে কেন্দ্র করে রচিত যত সাহিত্য পাঠ করলে আমরা দেখতে পাব যে কিছু উল্লেখযোগ্য অপরাধীকে কেন্দ্র করে এই সাহিত্যগুলো রচনা করা হয়েছে। তবে, এজাতীয় রচনা না ‘জনপ্রিয় প্রকাশভঙ্গি’ হিসেবে রচিত হয়েছে না উপর থেকে নৈতিকতার বাণী প্রচার চাপিয়ে দেওয়ার এক সমন্বিত প্রচেষ্টা হিসেবে সৃষ্টি হয়েছে। অপরাধ বিষয়ক সাহিত্য যেন সেই ক্ষেত্র যেখানে দণ্ড অনুশীলনের দুটো বিনিয়োগ মিলিত হয়েছে। অপরাধকে কেন্দ্র করে এক ধরনের যুদ্ধ, এর শাস্তি এবং স্মৃতি মিলিত হয়েছে। অপরাধীদের এই বিবরণগুলো ছাপা ও প্রকাশিত হওয়ার অনুমতি পেত মূলতঃ এক ধরনের ভাবাদর্শগত নিয়ন্ত্রণ সৃষ্টির প্রত্যাশা হতে। অপরাধীর স্বীকারোক্তি সম্বলিত এসব বর্ষপঞ্জি, ব্রডশিট ছাপা ও বিতরণ করার কাজটি করা হতো কঠোর নিয়ন্ত্রণ বা কড়াকড়ির মাধ্যমে। তবে, এই যে অপরাধের গল্পগুলো এত ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পেত এবং বিশেষ করে সমাজের নিচু স্তরের মানুষ এগুলো পড়তো তাদের প্রধান পাঠ হিসেবে, তা শুধুই অপরাধীদের স্মৃতিকাহিনী পড়বার জন্য নয়, এগুলো তাদের দৃষ্টান্তও যোগাত বৈকি। ‘কৌতূহলে’র আগ্রহ একটি রাজনৈতিক আগ্রহও বটে। এভাবেই, এই অপরাধ বিষয়ক সাহিত্যগুলো দ্বি-মুখী পাঠবস্তু হিসেবে পড়া যেতে পারে। অপরাধীদের নিয়ে লেখা এ কাহিনীগুলোয় যেসব ঘটনা বর্ণনা করা হতো, এই ঘটনাগুলোর প্রভাব হিসেবে যা কিছু নথিবদ্ধ করা হতো এবং এই ‘উদাহরণযোগ্য’ অপরাধীদের বর্ণনা করতে গিয়ে যে গৌরব তাদের উপর ন্যস্ত করা হতো, এবং সাধারণতঃ যে ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হতো তা লক্ষণীয়। যেমন, পুরনো দিনের এই অপরাধপঞ্জিগুলো পড়তে গেলে যে কেউ দেখতে পাবেন ‘দুর্ভাগ্য,’ বা ‘বিভীষিকা’ কিম্বা ‘বিখ্যাত’ অথবা ‘শোচনীয়’ প্রভৃতি বিশেষণ ব্যবহার করা হচ্ছে। জীবনের ইতিহাস (The History of the Life), গুইলেরি ও তার সঙ্গীদের দুর্ধর্ষ যত ডাকাতি ও কৌশল এবং তাদের শোচনীয় ও অসুখী পরিণতি (Great Robberies and Tricks of Guilleri and his Companions and of their Lamentable and Unhappy End) প্রভৃতি গ্রন্থে উপরোক্ত বিশেষণগুলো ব্যবহৃত হয়েছে।

সম্ভবতঃ এজাতীয় সাহিত্যকে আমাদের তুলনা করা উচিত ‘বধ্যমঞ্চের চারপাশে সৃষ্ট গোলমালে’র সাথে। কেননা, ওই জাতীয় গোলমালে অভিযুক্ত ব্যক্তির নির্যাতিত শরীরের মাধ্যমে ক্ষমতার সাথে সাধারণ মানুষের দ্বন্দ্ব সূচিত হতো। যে সাধারণ মানুষ ছিল এই মৃত্যুদণ্ড প্রদান অনুষ্ঠানের সাক্ষী, অংশগ্রহণকারী, সম্ভাব্য এবং পরোক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষও বটে। মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের সাড়ম্বরতার প্রবাহে ক্ষমতা সম্পর্ক অপর্যাপ্তভাবে সংহত হতো যা আচারে পরিণত করাই ছিল এই দণ্ড প্রয়োগ অনুষ্ঠানের লক্ষ্য। ক্ষমতা ও সাধারণ মানুষের ভেতরকার দ্বন্দকে কেন্দ্র করেই প্রচুর বিবাদ-বিতর্ক দেখা দিত। অপরাধীর মৃত্যুর পর প্রকাশিত অপরাধের দায় স্বীকারমূলক বিবরণী বিচার ব্যবস্থার বৈধতা প্রদানে সহায়ক হলেও, অন্যদিকে আবার অপরাধী মহিমান্বিত হতো। মূলতঃ এ কারণেই দণ্ড ব্যবস্থার সংস্কারকরা দ্রুতই এই অপরাধ পঞ্জিকাগুলো বন্ধ করে দেবার দাবি তুলতে থাকেন। আবার এ কারণেই জনগণ প্রতিদিনকার তুচ্ছ ও খুঁটিনাটি যত বেআইনী কার্যক্রমের মহাকাব্যে এত প্রবল উৎসাহ দেখাতো। এ কারণেই বড়কাগজ বা ব্রডশিটগুলো তাদের গুরুত্ব হারিয়ে ফেলল। যেহেতু ততদিনে জনপ্রিয় বেআইনী কাজকর্মের রাজনৈতিক সক্রিয়তা বদলে গেছে।

দ্রুতই পুরনো অপরাধপঞ্জির জায়গায় অপরাধকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হলো নতুন ধাঁচের সাহিত্যের। এই নয়া সাহিত্যে অপরাধকে দেওয়া হলো মহিমা। অপরাধকে গণ্য করা হলো চারু কলার অন্যতম উপকরণ হিসেবে। কেননা, শুধুমাত্র ব্যতিক্রমী স্বভাবের মানুষই অপরাধ করতে পারে। কেননা, অপরাধ বলবান ও ক্ষমতাশালী মানুষের দানবিকতা প্রকাশ করে। যেহেতু খলতাও এক ধরনের বিশেষত্ব বৈকি। দ্যু কুইন্সি-র (de Quincey) অভিযান কাহিনী হতে শুরু করে ওতরান্তোর প্রাসাদ (Castle of Otranto) হয়ে বোদলেয়ার (Baudelaire) অবধি অপরাধের এক নতুন নন্দনতাত্ত্বিক পুনর্লিখন শুরু হলো। যা আবার একই সাথে অপরাধকে গ্রহণযোগ্য নানা আঙ্গিকে আত্মস্থ করে নেওয়াও বটে। বাহ্যিকভাবে দেখলে, অপরাধের এই নন্দনতাত্ত্বিক পুনর্লিখন হলো অপরাধের সৌন্দর্য ও মহত্ত্ব বিষয়ক নব উদ্ভাবনা। বাস্তবিকভাবে, এই পুনর্লিখন মূলতঃ এটাই স্বীকার করে নেয় যে মহত্ত্বেরও অধিকার আছে অপরাধ করার এবং এমনকি অপরাধ আসলে সত্যিকারের মহৎ ব্যক্তিদেরই একচ্ছত্র রাজ্য। বড় খুনীরা তো আর কোন ছিঁচকে অপরাধে হাত নষ্ট করে না। গাবোরিয়ৌ-এর (Gaboriau) সময় হতে অপরাধ বিষয়ক সাহিত্য তার প্রথম বাঁকটি বদলায়। ধূর্ততা, কৌশল, তীক্ষ্ণবুদ্ধি ইত্যাদির মাধ্যমে অপরাধী নিজেকে সন্দেহের উর্ধ্বে তুলে নেয়। তখন গোয়েন্দা ও খুনী, দু’জনের দু’টো বিশুদ্ধ মন দ্বৈরথে আবির্ভূত হবে। তাদের মধ্যকার লড়াই সংঘর্ষের মৌলিক আঙ্গিক গড়ে তুলবে। এভাবেই ধীরে ধীরে আমরা বহুদূরে সরে আসি অপরাধীর জীবন এবং অপরাধের বর্ণনামূলক সাহিত্য থেকে যেখানে অপরাধী তার অপরাধ স্বীকার করে এবং যে সাহিত্য তার মৃত্যুদণ্ডের নির্যাতন বিশদ ভাবে পুনরায় বর্ণনা করে। আমরা ঘটনার উন্মোচন এবং অপরাধ আবিষ্কারের ধীরগতিতে প্রদত্ত স্বীকারোক্তি থেকে বহুদূরে সরে এসেছি। ধীরে ধীরে আমরা চলে এসেছি মৃত্যুদণ্ড প্রদান থেকে তদন্তের জগতে। অপরাধী ও কর্তৃপক্ষের ভেতরকার পূর্বতন শরীরি লড়াইয়ের পরিবর্তে অপরাধী ও তদন্তকারী গোয়েন্দার ভেতরকার বুদ্ধির লড়াইয়ে আমরা প্রবেশ করেছি। এভাবেই, অপরাধ বিষয়ক নতুন ধাঁচের সাহিত্য সৃষ্টি হওয়ার ফলে শুধু যে অপরাধপঞ্জিকামূলক বড়কাগজগুলো হারিয়ে গেল তা-ই নয়। গ্রাম্য অপরাধীর যশোগাথা এবং নির্যাতন ও মৃত্যুদণ্ড ভোগের মাধ্যমে অপরাধী থেকে বীরে পরিণত হবার বিষণ্ন আখ্যানগুলোও গেল হারিয়ে। নয়া জমানায় ভিড়ের জনতা থেকে উঠে আসা মানুষ এতই সাদামাটা প্রাণী যে আগেকার দিনের অপরাধী তথা তীক্ষ্ণ সত্যের নায়ক সে আর নয়। এই নতুন যুগে আর কোন জনপ্রিয় বীর বা বিশাল মৃত্যুদণ্ডের কাহিনী শুনতে পাওয়া যায় না। নতুন সময়ের অপরাধীরা মন্দ হলেও বুদ্ধিমান। এবং তাকে শাস্তি দেওয়া হলেও তাকে আর আগের মতো তিলে তিলে নির্যাতন সইতে হয় না। অপরাধের নতুন সাহিত্য সমাজের নিম্নবর্গের পরিবর্তে অপর এক সামাজিক শ্রেণীকে অপরাধীকে দেখার জায়গা করে দেয়। ইতোমধ্যে সংবাদপত্র প্রতিদিনকার অপরাধ এবং শাস্তির ধূসর ও অ-বীরত্বব্যঞ্জক খুঁটিনাটি বর্ণনা দেবার কাজটি নিয়ে নিয়েছে। ভাঙ্গনের কাজটি এভাবেই সম্পন্ন হলো। সাধারণ মানুষ অপরাধের ঘটনায় তার অতীত গৌরব থেকে চ্যূত হলো। বড় বড় খুনগুলো এখন বিচক্ষণ মস্তিষ্ক ও ভাল ব্যবহার সম্পন্ন মানুষদের নিরিবিলি খেলা।

কিস্তি ৬

তথ্যনির্দেশ

৪. আর্গেনসন (Argenson), ২৪১। আরো দেখুন বার্বিয়েহ (Barbier), ৪৫৫ পৃষ্ঠা। এই সমগ্র ঘটনার প্রথম পর্বগুলো ছিল আঠারো শতকে দণ্ড আইনকে কেন্দ্র করে নানা জনপ্রিয় উত্তেজনার আর দশটা ঘটনার মতোই। পুলিশের লেফটেন্যান্ট জেনারেল বেহিয়েহ (Berryer), ‘যৌনতার দিক হতে উচ্ছৃঙ্খল কিছু শিশুকে তাদের (শিশুদের) পক্ষ থেকে তাদের ‘কুকর্মের’ স্বীকারোক্তি ছাড়াই আটক করে।’ রক্ষীরা ‘কেবলমাত্র টাকা পেলেই’ শিশুদের তাদের বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে সম্মত হয়। জানা গেছিল যে, আসলে ওই শিশুদের নাকি আটক করা হয়েছিল সম্রাটকে খুশি যোগানোর জন্য। ভিড়ের জনতা, কর্তৃপক্ষকে গোপনে তথ্য সরবরাহকারী এক দালালকে খুঁজে পেয়ে তাকে হত্যা করে ‘যতদূর সম্ভব ততদূর নিষ্ঠুরতায়’ এবং ‘মৃত্যুর পরও তার গলায় দড়ি দিয়ে তাকে মিঃ বেহিয়েহ-র বাড়ির দরজা অবধি টেনে নিয়ে যায়।’ এখন পুলিশের এই ইনফর্মার অতীতে ছিল এক চোর যাকে পুলিশ হয়তো তার চুরির সহযোগী রাফিয়াতের (Raffiat) সাথে চাকায় তুলে মৃত্যুদণ্ড দিত যদি সে পুলিশের ইনফর্মার হিসেবে কাজ করতে রাজি না হতো। আশপাশে নানা অপরাধের গোপন প্লট সম্পর্কে এই ইনফর্মারের অগাধ জ্ঞানকে পুলিশ প্রশংসা করতো। ইনফর্মারের নতুন পেশাতেও ‘তাকে উচ্চ প্রশংসা করা হতো।’ এভাবে নানাদিক থেকে চমকপ্রদ একটি উদাহরণ আমাদের হাতে আসে। সেটা হলো যে যুগ বদলের সাথে সাথে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা নয়, বরং পুলিশ দমন করছে আন্দোলন ও বিক্ষোভ। অপরাধী ও পুলিশের ভেতর নয়া যোগসাজশ তৈরি হচ্ছে এবং আঠারো শতক হতে এমন যোগসাজশের মাত্রা স্বাভাবিক হিসেব বাড়তেই থাকে। দাঙ্গায় সাধারণ জনতা সেইসব অপরাধীকে শাস্তি প্রদানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয় যে পুলিশের সাথে অন্যায় আঁতাতের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড এড়িয়েছে।

৫. এই নামকরা অপরাধীদের ভেতর দু’জনকে আবার আর, ম্যানদ্রোউ (R.Mandrou) বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন: কার্তোউশে (Cartouche) এবং ম্যানড্রিন (Mandrin)। এদের সাথে গুইলেরির নামও যোগ করা যায় (ম্যানদ্রোউ, ১১২)। ইংল্যাণ্ডে এদের মাপের অপরাধী ছিল জোনাথন ওয়াইল্ড, জ্যাক শেপার্ড এবং ক্লদ দুভাল।

৬. এই শিরোনাম শুধু বিব্লিওথেক দ্যু ত্রয়েস (Bibliotheque de Troyes)-এ নয়, বিব্লিওথেক দ্যু নোর্ম্যান্ডিতেও (Bibliotheque de Normandie) খুঁজে পাওয়া যায় (হেলট)।

৭. উদাহরণস্বরূপ লাক্রাতেল্লের (Lacretelle) কথা বলা যায়: ‘প্রবল আবেগের এই চাহিদা পূরণের জন্য, একটি বড় উদাহরণের প্রতিক্রিয়া গাঢ়তর করতেই কেবল অপরাধের এইসব ভয়ঙ্কর কাহিনী বিতরণ করার অনুমতি কেউ দিতে পারে। জনতার মাঝে যারা কবি তারা এই গল্পগুলো গানে গানে কি মুখে মুখে সারা দেশের প্রতিটি অংশে ছড়িয়ে দেয়। একদিন একটি পরিবার তার দরজার কাছে পরিবারের ছেলেদের করা অপরাধ এবং মৃত্যুদণ্ডের কাহিনী গানে শুনতে পায় (লাক্রাতেল্লে, ১০৬)।

a_falgun@yahoo.com

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

Sorry, the comment form is closed at this time.


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com