রৌদ্রময় অনুপস্থিতি : বাংলা কবিতার আলোক

প্রদীপ কর | ২৭ নভেম্বর ২০১৬ ৭:০৭ অপরাহ্ন

Alok
ছবি: অমিতাভ দাসের ক্যামেরায় কবি আলোক সরকার

সামগ্রিক কোলাহলের ভিতরই হয়তো সৃজন সম্ভব এক নিভৃতলোক। সময় হয়তো সেই মৌলিক ধ্যানের মগ্নতায় মিশে থাকে পরম সাধনায়। নিভৃতির মৌলিক সাধনা। বাংলা কবিতার শরীরে মিশে আছে যে বিশেষ কতকগুলি সময়, পঞ্চাশের দশক সেরকমই একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবর্ণ সময়। ভাঙা দেশে, ভাঙা মানুষের যন্ত্রণা পেরিয়ে এসে, অনেক না-পাওয়ার বেদনাকে অতিক্রম করে এক বিষন্ন স্বাধীনতার জন্ম। প্রাণের ভাষাকে অনন্তজীবন দেবার জন্য অকাতরে প্রাণত্যাগ… এইসব ভাঙাগড়ার মধ্যেই স্পষ্ট চিহ্নিত হয়ে উঠেছে বাংলা কবিতার পঞ্চাশকাল।

একটি তাৎপর্যপূর্ণ সময়ের মধ্যেই একদল কৃত্তিবাসী যখন ফুটপাথ বদল করতে করতে মধ্যরাতে শাসন করছে কলকাতা শহর, তখন, তার সমান্তরালে আরেক দল, বিশিষ্ট হয়ে উঠছেন ‘শতভিষা’ (১৯৫১) পত্রিকাকে অবলম্বন করে ভিন্নধারার কাব্য প্রয়াসে যার নেতৃত্বে ছিলেন কবি আলোক সরকার। ঐতিহাসিকভাবেই সত্য এই যে, এই দশকের প্রথম প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থটিও কবি আলোক সরকার রচিত উতল নির্জন। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সকলেই বুঝতে পারলেন বিশুদ্ধ কবিতার এক অন্য আলোক উদ্ভাসিত। যদিও, খুবই দুর্ভাগ্যজনকভাবে উল্লেখ করতে হয়, সম্মান, পুরস্কার ইত্যাদি সাহিত্যের সাধারণ মূল্যায়নগুলি তাকে নিয়ে হয়েছে অনেক ধীরে, অনেক পরে। ফলতঃ বাংলা কবিতায় অন্য আলোর উজ্জ্বল প্রভা সবার কাছে তেমন করে পৌঁছায়নি। ভাবি, এই-ই তো অনিত্য, যে, কোলাহল মুখরতায় মিশে থাকতে পারে হাজার হাজার মুখ কিন্তু ধ্যান তো একক। মগ্নতা তো সব সময়েই নিভৃতির। ‘হাজার ঝরাপাতার বুকে পায়ের চিহ্ন মর্মরিত আছে’ (আলোকিত সমন্বয়। নাম কবিতা) যিনি লিপিবদ্ধ করেন কিংবা বলেন:

অনেক দিন ফিরে আসার পরও
যারা পুরোনো ছবিকে নতুন নামে বলছে
তাদের ভিতরের আঁধার
কত গোপন হুহু করছে।

কেউ শুনতেই পাচ্ছে না এমন গোপন।
(আধার। সমাকৃতি ১৯৯৫)

Alok-1
ছবি: সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার হাতে কবি আলোক সরকার। ছবি সৌজন্য গৌতম মণ্ডল

আবহমান বাংলা কবিতার চেনা সুর তাঁর হাতে বড্ড অচেনা হয়ে বাজে। বাজিয়েছেন সুদীর্ঘ পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে। রৌদ্রময় অনুপস্থিতি, আশ্রয়ের বহির্গৃহ, অমূলসম্ভব রাত্রি, চিত্রার্পিত, স্তব্ধতার চলাফেলা, পবিত্র মানুষদের জন্য -এরকম উল্লেখযোগ্য ৩০টি কাব্যগ্রন্থ। প্রবহমান সাহিত্য, জীবনানন্দসহ বেশ কিছু অনন্য প্রবন্ধ গ্রন্থ। কয়েক খন্ডে প্রকাশিত কবিতাসমগ্র, গদ্যসমগ্র, কাব্যনাট্য সমগ্র, ছোটোগল্প, উপন্যাস জুড়ে বাঙালির পাঠপ্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় বুনেছেন স্বাতন্ত্র্যের বীজ। নিমগ্ন অমোঘ সব উচ্চারণ ধ্বনিত হয়েছে। তাঁর কবিতার সঙ্গে ‘বিশুদ্ধ’ শব্দটি মূল্যবান মানে সংযোজিত হয়। কালিদাসের কুমারসম্ভব কাব্যের অনুবাদেও আমরা সেই উচ্চারণই খুঁজে পাই। তাঁর অসাধারণ আত্মজীবনী জ্বালানী কাঠ, জ্বলো যেন প্রকৃতিরই অংশবিশেষ! সমগ্র রচনাক্ষেত্রেই লক্ষ্য করি এক বিশুদ্ধ আলোক। তাঁর উপস্থিতিতে বাংলাভাষাই হয়ে উঠেছে পবিত্র, আলোকউজ্জ্বল।

শোনো জবাফুল
তোমার মাটি সরস আছে তো
তোমার গায়ে
রোদ্দুরের কাপড় আছে তো
তোমার জন্য আমাদের খুব
ভাবনা হয়।

Alok-2
ছবি:কবি আলোক সরকার-এর কাব্যগ্রন্থ স্তব্ধতার চলাফেরা হাতে কবি শঙ্খ ঘোষ। ছবির সৌজন্য গৌতম মণ্ডল

কত অনায়াস মায়া সঞ্চারিত হয় তাঁর পংক্তিমালায়। শোনো জবাফুল কবিতাগ্রন্থটির জন্য ২০১৫তে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন কবি। তার আগে শ্রেষ্ঠ কবিতার জন্য ২০০৬-এ রবীন্দ্রপুরস্কার।
তাঁর নৈঃশব্দের অন্তস্রোত কবিতার বই থেকে একটি কবিতা সম্পূর্ণরূপে উদ্ধৃত করতে ইচ্ছে হয়:

হাওয়াকে বলি

তুমি তো একমুহূর্ত থাকো না
তোমার আবার ভালোবাসা

যারা থাকতে জানে না
তারা ভালোবাসতেও জানে না।
থাকতে কি আর চাই না?
সবাইকে বলি
আমাকে নাও, কেউ নেয় না।

তাদের খোঁজেই সারাদিন ছোটাছুটি
ফুলের পাড়ায়
জলের ওপরে।

যারা হারিয়ে যায়
তাদের কথা কেউ ভাবে না।

গাছ ফুলের কথা ভাবে না
নদী জলের কথা ভাবে না।

আমি সবার কথা ভাবি।
যে ধুলোগুলো উড়ে গেছে
তাদের কথা ভাবি
যে ছায়াগুলো মুছে গেছে
তাদের কথাও ভাবি।

যারা ভালোবাসা জানে
তারাই মনে রাখা জানে।

কবির জন্ম ১৯৩৩-এ পশ্চিমবঙ্গেই। যদিও তার পূর্বপুরুষেরা বাংলাদেশের ফরিদপুরের। ১১ বছর বয়সে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ১৯৪২-এ মাত্র একবারই তিনি এসেছিলেন এ দেশে। যদিও এদেশের প্রতি ভালোবাসা ছিল আমৃত্যুকাল। কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে গত ১৮ নভেম্বর রাত্রি ৯ টায় কবি যাত্রা করলেন আরেক নিভৃতলোকে। কলকাতার হালতুর নন্দীবাগানের বাসায় রেখে গেলেন স্ত্রী ও পুত্রকে। রেখে গেলেন তাঁর অসংখ্য উজ্জ্বল সৃষ্টি। বাংলা কবিতার নিজস্ব অহংকার।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আশরাফ জুয়েল — নভেম্বর ২৭, ২০১৬ @ ৮:৩৪ অপরাহ্ন

      অসাধারণ একটি আলোচনা। খুব ভাল লাগল। ধন্যবাদ সংশ্লিষ্ট সকলকে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — নভেম্বর ২৮, ২০১৬ @ ১২:২৩ পূর্বাহ্ন

      বড় সংক্ষিপ্ত হয়ে গেলো। বিস্তৃত মূল্যায়নমূলক আলোচনা চাই কবি আলোক সরকারের কবিতা নিয়ে। তাঁর নিভৃত যাপন ও কাব্যচর্চা নিয়ে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Dr. Binoy Barman — নভেম্বর ২৮, ২০১৬ @ ১১:৫২ অপরাহ্ন

      লেখাটি ছোট হলেও ঋদ্ধ। এটি আলোক সরকারের বিশুদ্ধ কাব্যচারিতাকে সঠিকভাবে তুলে ধরেছে। প্রদীপ করের গদ্যভঙ্গিমাও চমৎকার। সাবলীল ও সুচারু।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com