জ্যাক লন্ডনের দুষ্প্রাপ্য ছবি

রেশমী নন্দী | ২৪ নভেম্বর ২০১৬ ১০:৩৪ পূর্বাহ্ন

London আলোকচিত্র: ১৯০৬ সালে জ্যাক লন্ডন সান ফ্রান্সিস্কো উপসাগরের তীরে ছবি তুলছেন।

বিখ্যাত সাহিত্যিক জ্যাক লন্ডনের অনেক লেখায় পাওয়া যায় তাঁর বিচিত্র জীবনের ছায়া। তবে আলোকচিত্রী হিসেবে তাঁর দক্ষতা খুব বেশি মানুষের দেখার সৌভাগ্য হয়নি। লেখালেখির মতো সমান দক্ষতায় জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে তিনি ধারণ করে রেখেছেন তাঁর তোলা অনবদ্য কিছু ছবিতে। তাঁর দুঃসাহসী জীবনাচারণ সেই সাথে সংবাদদাতা হিসেবে তাঁর কাজের পরিধি-সবমিলিয়ে বিশ শতকের গোড়ার দিককার জীবনের অসাধারণ প্রতিচ্ছবি এসব আলোকচিত্র।
The Call of the Wild-এর মতো উপন্যাসের জন্য তিনি বিখ্যাত, যার উপজীব্য তাঁরই দুঃসাহসী অভিযান, পর্বতারোহন কিংবা দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে পাড়ি দেবার অভিজ্ঞতা। আর্নেষ্ট হেমিংওয়ের আগ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন পৌরুষদীপ্ত লেখকের আর্দশ । তিনি একাধারে ছিলেন একজন সমাজবিজ্ঞানী, ভবঘুরে, নাবিক, যুদ্ধ সংবাদদাতা এবং “ওয়েষ্টার পায়রেট”। তাঁর প্রপৌত্রী টারনেল এ্যাবোটের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্যদের ধরা ঝিনুক চুরি করতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিতেও দ্বিধা করেন নি। উনিশ শতকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম ও পূর্ব উপকূলে এ ধরনের দস্যুবৃত্তি হতো সমানে। জ্যাক লন্ডনের ছোট গল্প “What Life Means to Me”তেও এর বর্ণনা পাওয়া যায়। পরে অবশ্য এসব ছেড়েছুড়ে দেন তিনি।

London-1আলোকচিত্র: ১৯০৬ সালে সান ফ্রান্সিস্কোতে ভূমিকম্পের পর জ্যাক লন্ডনের তোলা ক্যারি স্ট্রীটের ছবি।
ঠিক একশ বছর আগে নভেম্বরের ২২ তারিখ, ক্যালিফোর্নিয়ায় মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে মারা যান জ্যাক লন্ডন। তাঁর মৃত্যুর একশো বছর পূর্তির কিছু আগে ইতালীর কনট্রাস্ট বুকস পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর আলোকচিত্র নিয়ে বই Jack London. The paths men take। প্রায় ১২শ ছবির দুর্লভ সংযোজন বিখ্যাত লেখকের বৈচিত্র্যময় জীবনের পাশাপাশি ফুটিয়ে তুলেছে সেই সময়কার সমাজবাস্তবতা। বইটিতে লন্ডন, জাপান, চীন, কোরিয়া, ভূমিকম্প-পরবর্তী সান ফ্রান্সিসকো এবং দক্ষিন প্রশান্ত মহাসাগরে তোলা ছবিগুলোর সাথে সংযুক্ত রয়েছে তাঁর লেখার নানা উদ্ধৃতি।
১৯০২ সালে “The People of the Abyss,” লেখার সময় তিনি যখন তৎকালীন কুখ্যাত পূর্ব লন্ডনের (এখন যা শহরের অন্যতম আধুনিক এলাকা) বসবাসরতদের জীবন দেখতে ছেঁড়াখোঁড়া পোষাক পড়ে সে এলাকা চষে বেরিয়েছিলেন। এক বর্ণনায় তিনি লিখেছেন,” বাজারে থুড়থুড়ে বুড়ো নারী পুরুষ ময়লা ঘেটে পঁচা আলু, মটরশুটির মতো সবজী খোঁজার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, ছোটছোট বাচ্চারা পঁচে যাওয়া ফলের চারপাশে মাছির মতো জটলা পাকিয়ে আছে, ধাক্কাধাক্কি করে খুঁজে বের করছে আংশিক ভালো থাকা ফল, সাথে সাথে গপাগপ খেয়ে নিচ্ছে।”
১৯০৬ সালে সান ফ্রান্সিসকোর ভূমিকম্পের সময়কার ছবিগুলো যে কাউকে নাড়িয়ে দেবে। আমেরিকার কলিয়ার ম্যাগাজিনের হয়ে তিনি সেসময় কাজ করছিলেন। বর্ণনায় তিনি লেখেন, “ ইতিহাসের কোথাও কোন আধুনিক শহরের এরকম ধ্বংসপ্রাপ্তির নজীর নেই। সান ফ্রান্সিসকো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। কেবল বেঁচে আছে এর স্মৃতি আর শহরের বাইরের কিছু ঘর।” সেই সময়কার ছবি ও বর্ণনা থেকে যে কেউ স্পষ্ট বুঝতে পারবে ঠিক কেমন ছিল সেই সময়। তাঁর প্রপৌত্রী এ্যাবোট এসব ছবি প্রসঙ্গে বলেন, “ওগুলোর কথা ভাবলেও গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।” আমেরিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহরের মাঝখানে শরনার্থী শিবিরের ছবিতে মানুষের দুর্দশা ২০১৬ ইউরোপে শরনার্থী সংকটের প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ এক শিক্ষাও বটে।
London-2আলোকচিত্র: ১৯০৭ সালে জ্যাক লন্ডনের তোলা মার্কেসাস দ্বীপজুঞ্জের নুকু হিবার অধিবাসীদের ছবি।
“দি সান ফ্রান্সিসকো একজামিনার”-এর সংবাদদাতা হিসেবে রাশিয়া- জাপানের যুদ্ধক্ষেত্রে কর্মরত অবস্থায় তাঁর ক্যামেরা কেড়ে নেয় জাপানী সৈন্যরা। নিয়ম ভেঙ্গে রাস্তার কিছু ছেলের ছবি তোলার জন্য তাঁকে আটকও করা হয়।
বইয়ে উল্লেখিত উদ্বৃতিগুলো বিংশ শতকের গোড়ার দিককার রচনা হিসেবে আশ্চর্যরকম প্রাসঙ্গিক। তাঁর ছবিও এমন বাস্তবতার গল্প আমাদের শোনায় যে অতীতের সাথে বর্তমানের তুল্যমূল্য চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠে।
সান ফ্রান্সিসকো ১১০ বছর পরে আগের চেয়েও সমৃদ্ধশালী, কিন্তু জ্যাক লন্ডনের সময়ের মতোই এখনো গৃহহীনরা এখানে প্রবল। প্রপৌত্রী এ্যাবোট তাই বলেন, “চারপাশের সবকিছু আমাদের পুরোনো দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়। এখনো শহরের রাস্তায় এত গৃহহারা মানুষ রাত কাটায়। ১৯০২ সালে তোলা এসব ছবির দিকে তাকালে মনে হবে যেন ওকল্যান্ডে কিংবা সান ফ্রান্সিসকোর ২০১৬ সালে তোলা ছবি। যথোপযুক্ত কারণেই ছবিগুলো শিউরে উঠার মতো।”

তথ্যসূত্র: দি নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং কনট্রাষ্ট বুকস ওয়েবসাইট
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মারুফ — নভেম্বর ২৫, ২০১৬ @ ৪:২১ অপরাহ্ন

      জ্যাক লন্ডন আমার সবচেয়ে প্রিয় লেখকদের একজন | কল অব দ্য ওয়াইল্ড, হোয়াইট ফ্যাং, সি উলফ-এর মতন উপন্যাস আর অসাধারণ সব ছোট গল্প — আমার কৈশোরের চমতৎকার কিছু সময় পেয়েছি এই লেখকের কল্যাণে|

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com