নবুয়োসি আরাকি: কামোত্তেজক নয়, কামাশ্রয়ী ফটোগ্রাফি

মাজুল হাসান | ২২ নভেম্বর ২০১৬ ৬:৫৪ অপরাহ্ন

লেন্সের মতো বদলাচ্ছে অ্যাভিন্যুয়ের আকাশ
ভেতরে কাঠের কটেজে সাদাকালো সমীরণ
স্মৃতি ওকে আবেগচালিত ডাউনোসার বলো
সেই কবে বিলুপ্ত, তবু মগজে কুণ্ডলিত কাম
সাপ; সরীসৃপ; হিমরক্তের প্রেমিকের মতো

Araki-3আরাকি’র তোলা গায়িকা লেডি গাগার ছবি

নবুয়োসি আরাকি— দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী জাপানী ফটোগ্রাফির ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র। কামাশ্রয়ী, ঋজু, খনিশ্রমিকের মতো শরীরবৃত্তীয়। নারী একাকী এক তুষারাচ্ছাদিত মেরু। আর কে না জানে চোখ-ধাঁধানো শুভ্রতাই রহস্যময় গোলকধাঁধা। সবমিলিয়ে নবুয়োসি বহুলআলোচিত। বিতর্কিত। কিন্তু অবধারিত। পূর্বজ ফটোগ্রাফারদের ধারাবাহিকতা, জাপানী ঐতিহ্যবাহী সচিত্র যৌনফ্যান্টাসি সুঙ্গার উত্তরাধিকারসহ আরাকি বিশ্বফটোগ্রাফিতে যোগ করেছেন নিজস্ব টার্ম ‘পার্সোনাল ফটোগ্রাফি’ বা ‘ব্যক্তিগত স্থিরচিত্র’ ধারণা।
শিল্পীর বাইরে গোলাপ শুধুই গোলাপ। ব্যক্তির বাইরে সব শূন্য। লালের সাথে তাই সঙ্গম অবধারিত। ফায়ারপ্লেসে আগুন আর বৃক্ষ হত্যা। একাকার উদ্দেশ্য-বিধেয়। স্রষ্টা বললো— আমি তোমাকে সৃষ্টি করেছি। স্রষ্টা ও সৃষ্টি যুগপৎ যাত্রী কসমিক লংড্রাইভে। তুলোট কিংবা ইটকাঠের বিছানার উত্তাপ লেগে আছে বুনটে, ট্যাক্সিক্যাবে। জানালা দিয়ে শুধু শহরের বদলে-যাওয়া দেখা। ব্যালকনিতেই ধরা দেয় পরিবর্তন সবার আগে। প্রায় ৫ দশক ধরে যে-মানুষটি ব্যক্তিগত সেন্টিমেন্টাল জার্নি চালিয়ে যাচ্ছেন সেই নবুয়োসি আরাকির ছবির সামনে দাঁড়ালে ভেসে ওঠে এক সমান্তরাল বাস্তব। যিনি নিজেই বলেন, ইমেজ আর লাই। মিথ্যা মিথ্যা সব মিথ্যা, নকল। কিন্তু কবির কলমের মতো শিল্পীর তুলি কিংবা ক্যামেরা-ফ্ল্যাশেই গোলাপ সবচেয়ে আফিমরঙা, চিত্তহরী সুগন্ধী।

নবুয়োসির ফটোগ্রাফির পথচলা শুরু ‘সেন্টিমেন্টাল জার্নি’ দিয়ে। ১৯৭১ সালে প্রকাশিত এই ফটোপিক্টোরিয়ালে ধরা আছে এক আটপৌরে দম্পতির আবেগঘন, সাদামাটা হানিমুনযাত্রা। স্ত্রী ইয়োকো আরাকির সাথে নবুয়োসির সেই দিনযাপনের স্থিরপ্রকাশ ‘সেন্টিমেন্টাল জার্নি’— যা জাপানের ফটোগ্রাফি-ইতিহাসের খোলনলচে বদলে দেয়। এত ব্যক্তিগত, এত রাখঢাকহীন, জৌলুসহীন, শুধু মুঠোমুঠো অদৃশ্য আবেগ… আহা, মনে পড়ে ইয়োকোর ট্রেনে চেপে বসা আর পালছাড়া নৌকার পাটাতনে নিশ্চিন্ত উড়াল! সাদাকালো হানিমুনসুইট, আলোছায়াময় সঙ্গমদৃশ্য, ঘুরে বেড়ানো সব ধরা আছে সেন্টিমেন্টাল জার্নি-তে। এই যাত্রাপথেই সহসা সচল হয়ে ওঠে পুরো জাপান, প্রাচ্যের ফটোগ্রাফি। নির্ধারিত হয় — শ্লীলতা-অশ্লীলতা-নগ্নতার নতুন সংজ্ঞা। ব্যক্তিগত ফটোগ্রাফি উন্নীত হয় প্রদর্শনযোগ্যতায়।
এই সেন্টিমেন্টাল জার্নি আরও বিস্তৃত হয় ১৯৯০ সালে স্ত্রী ইয়োকোর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। সেন্টিমেন্টাল জার্নি— উইন্টার জার্নি-তে ইয়োকোর ফুলেফুলে-ছাওয়া কফিন, তার সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে পোষা বিড়াল চিরো, তাদের দাম্পত্য মিথস্ক্রিয়ার প্রতীক। মৃত্যুর বছর-দেড়েক আগে মাত্র ৪ মাস বয়সী চিরোকে বাড়িতে এনেছিল ইয়োকো। সেই থেকে ও পরিবারের সদস্য। ১৯৭১-এ হানিমুনযাত্রার মধ্য দিয়ে যে-সেন্টিমেন্টের ভ্রমণ শুরু, নব্বইয়ে এসে তা রূপ নেয় এক অদ্ভূত মেলাঙ্কলিতে। খুব কঠিন ছিল মৃত ইয়োকোর ছবি তোলা নবুয়োসির জন্য। তবুও ছবি তুলেছেন শক্ত হাতে। কারণ ওর কাছে ছবির বাইরে কোনো জীবন নেই। ক্যামেরা যেন ওর কাছে স্মৃতির মহাফেজখানা, সচিত্র ডায়েরি। যে-ডায়েরি শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠতে চায় ভিন্ন কোনো অর্থউৎপাদনের আধার। এই যেমন : সেন্টিমেন্টালের প্রথমপর্বের শেষ ছবি ছিল তুষারাচ্ছাদিত প্রান্তরে একটি বেড়ালের দাপাদাপি, সেই একই ছবি দিয়েই শেষ উইন্টার জার্নিও। কিন্তু এখন বিড়ালের তাৎপর্য বদলে যায়, মনে হয় ওটা নবুয়োসি নিজেই, খুঁজছেন হারিয়ে-যাওয়া ইয়োকোকে। অথবা বলার চেষ্টা— জীবন হলো তুষারঝড়েও আনন্দ খুঁজে নেয়া।

ইয়োকো শুধু প্রেমিকা বা স্ত্রী নন; নবুয়োসির সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী মডেল, শিল্পসমঝোতার, সাদা-কালোর এপিঠ ওপিঠ। একবার নবুয়োসিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল— তুমি এভাবে যে ব্যক্তিগত ছবি ছেপে দাও, এটা তো অন্যের প্রাইভেসির লঙ্ঘন। তোমার বউয়ের হানিমুনের ছবি তুমি ছেপে দিয়েছ, ওর নগ্নতা, ব্যক্তিগত আবেগ— সব। কিন্তু সত্যি হলো, সেন্টিমেন্টাল জার্নির প্রথম খণ্ড প্রকাশের পেছনে ইয়োকোর ভূমিকা নবুয়োসির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। জানা যায়, সেই বই নিজের বসের কাছে পর্যন্ত আগ্রহ নিয়ে বিক্রি করেছিলেন ইয়োকো। সেই ইয়োকোর মৃত্যুর ২০ বছর পর ২০১০ সালে মারা যায় চিরো। প্রকাশিত হয় সেন্টিমেন্টাল জার্নির তৃতীয় পার্ট : ‘সেন্টিমেন্টাল জার্নি — স্প্রিং জার্নি’। এখানে দেখা যায় ইয়োকোর শূন্য বিছানায় চিরোর বেড়ে-ওঠা, জানালা দিয়ে শূন্যতার দিকে তাকানো, যেন ভিন্নরূপে খুঁজে ফেরা ইয়োকোকে। স্ত্রীর মতোই নবুয়োসি চিরোর শারীরিক অবস্থার অবনতির ডকুমেন্টেশন রেখেছেন এইসব ছবিতে। যার শেষ দৃশ্য পুষ্পাচ্ছাদিত চিরোর নিথর দেহ। বস্তুতপক্ষে এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় নবুয়োসির সেন্টিমেন্টাল ট্রিলোজি।

বস্তুতপক্ষে আরাকি সেই জাতের শিল্পী যিনি নিজেকেও তার ছবির অংশ করে তোলেন। কখনো কখনো নিজেই ঢুকে পড়েন ফ্রেমে। হয়ে ওঠেন সক্রিয় সাবজেক্ট। সেন্টিমেন্টাল জার্নিতে স্ত্রীর সাথে সঙ্গমচিত্রই শুধু নয়, ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত আরেক বিখ্যাত পিক্টোরিয়াল ‘Tokyo Luckey Hole’-এ আমরা নবুয়োসিকে দেখতে পাই টোকিওর রেডলাইট এরিয়ায়। সেখানে আলোআঁধারির বাসিন্দাদের উপলব্ধি করতে তিনি একরকম ডেরা গাড়ছেন সেখানে। ঘুরছেন দিনের পর দিন। সাথে এক বন্ধু। সেই বন্ধুটি কখনো মডেল হয়েছেন তার ছবির, আবার কখনো নবুয়োসি নিজেই যোগ দিয়েছেন ছবির মুহূর্ত তৈরিতে। বিষয়টা এমন : আগুনে পুড়েই আগুনের বর্ণনা লেখা, পানিতে ডুবে জলপ্রপাতের সন্ধান করা। আর বহুবিধ পরি। আরাকির ছবিতে নারী আর যৌনতা একাকার। নারী একই সাথে তার ক্যানভাস ও ম্যাটার। কখনো কখনো দুটোকেই আলাদা করা দুরূহ। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো আরাকির মেয়েরা কামউত্তেজিত করে না। বরং ভিন্ন কিছু বলার চেষ্টা করে সেই নগ্নতা। আরাকি নিজেই মজা করে বলেন, তার বন্ধুরা তার ছবি দেখে মাস্টার্বেশন করতে পারে না, এই নিয়ে তাদের আক্ষেপের অন্ত নেই। এই যে মাস্টার্বেশন করতে না পারা সেটাই হয়তো প্রমাণ করে শিল্পিত নন্দনের, অন্ততপক্ষে শিল্পী আরাকির ইন্টেনশন। কী অদ্ভূত, একটা নারীদেহ তার গোপনসাম্রাজ্য মেলে আছে, মধ্য-অধাঞ্চলের ঢেউ ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে, কিন্তু কামনা জাগ্রত হচ্ছে না— কী ভয়ঙ্কর!

হ্যাইয়োন উই তার পিএইচ.ডি থিসিসের অংশ হিসেবে নবুয়োসির একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। Crossing Boundaries: An Interview with Nobuyoshi Araki শিরোনামের সেই সাক্ষাৎকারে নবুয়োসিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল— তুমি এমন ছবি তোলো কি করে?
সশব্দ হাসিতে ফেটে পড়ে তার জবাব ছিল— সেক্স থেকে। সেক্স থেকে আমি এইসব ছবির প্রেরণা পাই।
— সেটা কেমন? তুমি কি তোমার সব মডেলের সাথে শোও?
— অবশ্যই।
নবুয়োসির ভাষ্য, সঙ্গমের মাধ্যমেই তিনি তার মডেলের সাথে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলেন। আর একবার আস্থার সেতু তৈরি হলেই মনমতো মুহূর্ত উপহার দেন তার মডেলরা। সেই যুক্তিতেই টোকিওর রেডলাইট জোনে আরাকিকে দেখা যায় কখনো রেফারি (ফটোগ্রাফার) আবার কখনো খেলোয়াড়ের (খদ্দের) ভূমিকায়। প্রশ্ন ওঠে এই যে অংশগ্রহণমূলক ফটোগ্রাফি এর কারণ কি? এটা কতটুকু জরুরি? খুনীর চরিত্রে অভিনয় করতে হলে সত্যি খুন করতে হবে! সেই প্রশ্নের জবাবে নবুয়োসি বলছেন, এটা তিনি করেন ভেতরের আগল ভাঙার জন্য। নবুয়োসি বলছেন, ‘আমাকে আমরা-আপনার মধ্যকার প্রতিবন্ধকতাটা ভাঙতে হয়েছে। বলতে পারি, ফোটগ্রাফির পূর্ববর্তী ধারণা ও ঐতিহ্যকে ভাঙতে পেরছি। অতীতে ফটোগ্রাফাররা ভাবতো তাদের বিষয়বস্তুতা মুছে ফেলতে হবে, যতোটা সম্ভব। আমি নিজেকে ‘সাবজেক্টিভ’ ফটোগ্রাফার হিসেবে বিবেচনা করি। চেষ্টা করি সাবজেক্টের যতো কাছাকাছি যাওয়া যায়, এজন্য নিজেকে ফ্রেমের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলি আমি। এটা আমার ছবিকে কেবল একটা আর্টওয়ার্ক হওয়া থেকে বাঁচিয়ে দেয়। তখন যারা সেই ছবি তুলে দেন তখন সেটা হয়তো আমার চেয়েও ভালো হয় (হাসি)। কখনো কখনো আমি আমার ক্যামেরাটা সাবজেক্টের হাতে গছিয়ে দেই এবং সে আমার ছবি তোলে’।
(I needed to break down the me-and-you barrier. I can say that I have collapsed the previous tradition of photography that emphasized objectivity. In the past, photographers felt they had to eliminate their subjectivity as much as possible. I consider myself a “subjective” photographer. I try to get as close as possible to the subject by putting myself within the frame. In addition, this action avoids making my photographs mere works of art. Photographs taken by others are better photos than I took [laughs]. Sometimes I give my camera to a subject and my subject takes a picture of me’)

শিল্পের জন্য যৌনতার দ্বারস্থ হওয়ার এমন ঘটনা খুব অভাবনীয় নয় বটে, তবে কলগার্লের হাতে ক্যামেরা তুলে দিয়ে তাকে বলা— এইবার তোমার নাগরটির একখান ছবি তোলো তো! সেই বারবনিতার তোলা ছবি নবুয়োসি অবলীলায় হজম করে নিয়েছেন তার পিক্টোরিয়ালে। এটা কি আনএথিক্যাল নয়? অন্যের তোলা ছবি নিজের নামফলকখচিত বইয়ে গিলে নেয়া? এর ব্যাখ্যায় নবুয়োসি হাসতে হাসতে বলেন, আরে ক্যামেরাটা তো আমার, এইটা দিয়ে যা উঠবে সব আমার। হাহাহা।

আসলে, নবুয়োসি নিজেই সর্প, নিজেই ওঝা। ওর কাছে কামদংশিত হয়ে বিষে-নীল হওয়ার প্রক্রিয়াটিই ফটোগ্রাফি। একটি বাঁধভাঙা আইডিয়ার বাস্তবায়ন। এখানেই নবুয়োসির বিশেষত্ব ওর আইডিয়া, ছবি সাজানোর চোখ, ডাইরির মতো চলমান, কখনো সময় ধরে, আবার কখনো বিষয়বস্ত মুখ্য হয়ে সময়ক্রমকে উপেক্ষা কিংবা হেঁয়ালি করে। প্রকৃতপক্ষে নবুয়োসি কি দেখাতে চান, কেন দেখাতে চান, কিভাবে দেখাতে চান— এর সবকিছু নির্ধারণ করেন স্রষ্টাসুলভ সত্তা থেকে, যে কি-না আবার প্রেমিকও।

Araki-1
সেন্টিমেন্টাল জার্নির (প্রথম খণ্ড) বিখ্যাত ছবি

অনেকসময় নবুয়োসি খুবই কর্তৃত্ববাদী, কোনো কোনো নারীবাদীও নিতে পারবেন না তার ছবি। স্যাডিস্টের মতো বেঁধে নারীকে কেবল একটি শরীর, যৌনগুহা কিংবা কাদামাটির দলায় পরিণত করা— জাপানী বন্ডেজ ফর্ম কিনবাকু-তে সুপ্রাচীনকালের চর্চা। এটা নিপীড়নমূলক পুরুষতন্ত্রের একটি বিকৃতকাম। জাপানী যৌনফ্যান্টাসি সুঙ্গা-য় পাওয়া যায় হাত-পা বেঁধে নারীকে ধর্ষণ অথবা ডমিনেটিং সাবমিশনের ছবি। নবুয়োসি সেই ‘কিনবাকু’ ফর্মের নতুন অর্থ তৈরির চেষ্টা করেছেন বলে অনেক ফটোবোদ্ধা বলে থাকেন। সুঙ্গার প্রভাব আরাকির কাজে বহুলাংশে পরিলক্ষিত হলেও একটি ব্যাপারে আরাকি অনন্য। সুঙ্গা যেখানে পুরোপুরি যৌনাশ্রয়ী ও উত্তেজনা সৃষ্টির নিমিত্তে, আরাকি সেখানে একটি নগ্ন বিষাদগ্রস্ততা ও নগ্নতার তৃতীয় ব্যঞ্জনা তৈরি করতে চান। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে আরাকির ‘It Was Once A Paradise’ পিক্টোরিয়ালটির কথা। এখানে একপৃষ্ঠায় সাদাকালো আর অন্যপৃষ্ঠায় রঙিন মডেলের বন্ডেজ ফিগার পাশাপাশি তুলে ধরা হয়েছে। সাদাকালো ছবিগুলো— যেখানে ঘুরেবেড়ায় খেলনা ডাইনোসার, সাপ, সরীসৃপ।এগুলো স্ত্রী ইয়োকোর মারা যাবার পর, এমনকি একমাত্র সঙ্গী বিড়াল চিরোর মৃত্যুর পর অতীতধূসরতার প্রতীক। সেই নির্মিত প্রতীকী জগতের সাথে নারীদেহের একটা সাদৃশ্য স্থাপনের চেষ্টা দেখা যায় এই বইয়ে। যেখানে যোনিমুখের কাছে হা-করে-চেয়ে-থাকা খেলনা ডাইনোসারের সাথে সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যায় একটা মধ্যশুঁড় ফুলের। কাত-হয়ে-পড়ে-থাকা এসির সাথে শোকেসে হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা নারীর। এ ব্যাপারে Charles Merewether-এর কথা কোট করতে চাই। তিনি বলছেন, এই ছবিগুলো নারীর, তার শরীরের, অন্যের কাছে মেলে ধরা, বাহিরের কাছে মেলে ধরা। এই ছবিগুলো পর্নোগ্রাফিক নয়, যৌনতারও নয়। বরং, সেগুলো ঘনিষ্ঠ পোট্রেট এবং যে কেউ বুঝতে পারবেন এগুলোর ভেতর থেকে একধরণের রাসায়নিক বিষক্রিয়ার আঁচ আসছে। ওদের মুখে ও এক্সপ্রেসেশনে একটা সৌন্দর্য আছে, এক ধরণের কার্বীকতা যা উৎসর্গ করা হয়েছে ফটোগ্রাফারের সমীপে।
(‘The photographs are about individual woman, their bodies, their exposure to another, to the outside . These photographs are neither pornographic nor sexual. Rather, they are intimate portraits and one can feel a kind of intoxication that comes from this contact. There is a beauty to their face and their expression, a kind of poetry to the generosity that they offer to the photographer.’)

Araki-4আরকি’র একটি এক্সিবিশনের ছবি

২০১২ সালে প্রকাশিত ‘ইট ওয়াজ ওয়ান্স অ্যা প্যারাডাইস’-এ নারী-মডেলের নগ্নতা নিয়ে যত বিতর্ক তার আড়ালে ভুলে গেলে চলবে না — এই যে স্বর্গচ্যুতি, বিরান প্যাসেজ, তাতে হেঁটে-বেড়ানো সরীসৃপ, ডাইনোসার, আর একটা বিড়ালের গুটিশুটি পায়ে হেঁটে চলা, অবাক বিস্ময়ে তাকানো— সবই স্ত্রী ইয়োকো আর স্মৃতিময় দাম্পত্যযাত্রার প্রতীক বিড়াল চিরোর মৃত্যুপরবর্তী নবুয়োসির মানসিক স্থিতি। চিরোর মৃত্যুর পর আরেকটি বিড়ালকে মডেল হিসেবে বিভিন্ন ছবিতে ব্যবহার করেছেন নবুয়োসি, এটা ওর স্মৃতির বেড়াল; যেখানে অবধারিতভাবে এসেছে আরাকির যৌনাভিজ্ঞতা, বয়সের ভারে এখন যা মেঘমেদুর, নবুয়োসির এভাবে বন্ডেজ মডেলের ছবি তোলা, তাদের সাথে আস্থা অর্জনের কথা বলে যৌনসংস্রব— এ-সবকিছু নিয়ে বিস্তর সমালোচনা। কেউ বলেন— পুঁজিবাদী বিকৃতি, কেউ বলেন — নৈরাজ্যময়, স্যাডিস্ট আচরণের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু জীবনের সেই ভিন্ন রিয়্যালিটি কোথাও-না-কোথাও বিরাজিত (হয়তো নবুয়োসির ফ্যান্টাসাইজড ব্রেইন সেগুলোর চারণভূমি)।
যেমনটা বলেছিলেন আব্রাহাম লিঙ্কন— ‘কোনো ছবিই খারাপ নয়, সেগুলো প্রমাণ করে তোমাকে কখনো কখনো দেখতে অমন লাগে’। তাই শ্লীলতা-অশ্লীলতা নয়, ছবি ফ্রেমবন্দি রেপ্লিকা, ওগুলোকে ফটোগ্রাফারের মানসিক স্থিতির শিল্পিত বহিঃপ্রকাশ হিসেবে পাঠ করা যেতে পারে। আর এ-কারণেই হয়তো অ্যানসেল অ্যাডামস বলতেন— ‘You don’t take a photograph, you make it.’ আরাকি সেটাই বিশ্বাস করেন। তার কাছে ছবি শুধু ছবি না একটা আইডিয়া, একটা স্তর থেকে দেখা। যেমনটা আমরা দেখি ২০০৫ সালের টোকিও সামার ডায়েরি-তে। এর সাবটাইটেল ছিল ‘ফ্রম অ্যা কার-উইন্ডো’। এই সিরিজে নবুয়োসি ট্যাক্সির জানালা দিয়ে তুলেছেন টোকিওর জনজীবন। যেন একটি জানালারূপী ফ্রেম দিয়ে আরেকটি ক্যামেরাফ্রেমের ভেতর দিয়ে তোলা ছবি। আবার একটা সময় উল্টোটা করেছেন নবুয়োসি। বাইরে থেকে ছবি তুলেছেন অন্দরের। এভাবে জায়গা বদলের ফলে পরিবর্তিত হয় দৃষ্টিভঙ্গি, বদলে যায় উদ্দেশ্য-বিধেয়। আপাত দুই ছুটন্ত বস্তুর পরস্পরকে দেখা ও ক্রমশ অবস্থান পরিবর্তন আরাকির বেশকিছু পিক্টোরিয়ালের বিষয়বস্তু।

শুধু ছবি তোলেননি, কখনো কখনো এঁকেছেনও তাতে। ছবির ওপর চালিয়েছেন তুলি; চিত্রাশ্রয়ী হরফে ভরে তুলতে চেয়েছেন আকাশের শূন্যতা। এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে তার Sky Letters, Sky Paintings সিরিজের কথা। যেখানে সাদাকালো আকাশ মৃত্যুর প্রতীক। তাতে খানিক হরফই হলো জীবনের কিছু অর্থবোধকতা।
অসংখ্য রঙিন ছবি তুললেও নবুয়োসির বিখ্যাত ছবিসিরিজগুলো সাদা-কালো। টেড গ্রান্ট বলেছিলেন, রঙিন ছবিতে পারিপার্শ্ব মুখ্য,সাদাকালোতে ধরা দেয় আত্মার প্রতিচ্ছবি (When you photograph people in color, you photograph their clothes. But when you photograph people in Black and white, you photograph their souls!) সেই কথা নবুয়োসি মানতেন কি না, তা উনিই জানবেন; কিন্তু তারও আছে নিজস্ব কিছু গোঁড়ামি বা স্বচ্ছন্দের জায়গা। সারাজীবনে একটাও অটোক্যামেরায় ছবি তোলেননি। তার সাফ কথা, ডিজিটাল ক্যামেরায় ছবি তোলে গর্ধভরা। হয়তো ম্যানুয়াল ক্যামেরায় প্রাকৃতিক কিংবা প্রয়োজনমতো আলো তৈরি করে নিয়ে ছবি তোলা, তাকে হাতের মুঠোতে ফ্রেমে আনা, নাটাইয়ের মতো ঢিল দেয়া, এখানে যে স্রষ্টার আনন্দ সেটাকে উপভোগ করেন আরাকি। একটা সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, জীবনে একবারই ডিজিটাল ক্যামেরা ব্যবহার করবেন। সেটা বসানো থাকবে তার কফিনে। একটা অটোক্লিক। ব্যস। পরিপূর্ণ হবে নবুয়োসি আরাকির সেন্টিমেন্টাল জার্নি; রচিত হবে শেষাংশ— এক ক্ষাপাটে দানব ও দ্রষ্টার পরিসমাপ্তি।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (6) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শঙ্খচূড় ইমাম — নভেম্বর ২২, ২০১৬ @ ৯:৪১ অপরাহ্ন

      মজার ব্যাপার হলো আরাকির মেয়েরা কামউত্তেজিত করে না। বরং ভিন্ন কিছু বলার চেষ্টা করে সেই নগ্নতা। আরাকি নিজেই মজা করে বলেন, তার বন্ধুরা তার ছবি দেখে মাস্টার্বেশন করতে পারে না, এই নিয়ে তাদের আক্ষেপের অন্ত নেই। এই যে মাস্টার্বেশন করতে না পারা সেটাই হয়তো প্রমাণ করে শিল্পিত নন্দনের, অন্ততপক্ষে শিল্পী আরাকির ইন্টেনশন। কী অদ্ভূত, একটা নারীদেহ তার গোপনসাম্রাজ্য মেলে আছে, মধ্য-অধাঞ্চলের ঢেউ ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে, কিন্তু কামনা জাগ্রত হচ্ছে না— কী ভয়ঙ্কর!
      ##
      অতীতে ফটোগ্রাফাররা ভাবতো তাদের বিষয়বস্তুতা মুছে ফেলতে হবে, যতোটা সম্ভব। আমি নিজেকে ‘সাবজেক্টিভ’ ফটোগ্রাফার হিসেবে বিবেচনা করি। চেষ্টা করি সাবজেক্টের যতো কাছাকাছি যাওয়া যায়, এজন্য নিজেকে ফ্রেমের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলি আমি। এটা আমার ছবিকে কেবল একটা আর্টওয়ার্ক হওয়া থেকে বাঁচিয়ে দেয়। তখন যারা সেই ছবি তুলে দেন তখন সেটা হয়তো আমার চেয়েও ভালো হয় (হাসি)। কখনো কখনো আমি আমার ক্যামেরাটা সাবজেক্টের হাতে গছিয়ে দেই এবং সে আমার ছবি তোলে’।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন shams hoque — নভেম্বর ২৩, ২০১৬ @ ২:৫৫ অপরাহ্ন

      A beautiful prose write-up on a unique area of art and literature. At times it reads like superb poetry. It’s almost a flawless piece but I’d prefer not to have the word “বস্তুতপক্ষে” in the beginning of the paragraph 5.
      Shams Hoque

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাজুল হাসান — নভেম্বর ২৩, ২০১৬ @ ৭:৩২ অপরাহ্ন

      shams hoque, শুকরিয়া। ঠিক বলেছেন। সত্যি ৫ম প্যারায় ‘বস্তুতপক্ষে’ শব্দটি ‘কাবব মে হাড্ডি’র মতো লাগছে, এটি লেখার প্রবাহমানতা ও গীতলতাকে খর্ব করেছে। আর্টস সম্পাদক যদি সদয় হন, তবে শব্দটি বাদ দিতে অনুরোধ করছি। আর এতো মনযোগ দিয়ে পড়েছেন দেখে প্রাণিত হলাম। শুভেচ্ছা

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন shams hoque — নভেম্বর ২৪, ২০১৬ @ ২:১৪ অপরাহ্ন

      Dear Majul Hasan,
      So nice of you to have acknowledged my humble opinion on your beautiful article. Keep up the good work. Good luck!
      Shams Hoque

      PS: I read all the work presented in this page of Arts.bdnews as, I think, Razu Alauddin, another avid reader and very powerful writer, does a good job in putting up good writings, poetry, book review etc. I know for sure, Razu bhai will take note of your request. Shams Hoque

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আলমগীর হক — নভেম্বর ২৫, ২০১৬ @ ৪:২৪ পূর্বাহ্ন

      নাবুয়োসি, তাঁর ছবি নিয়ে আমি লেখেছিলাম কিন্তু সে সকল পার্ভারস ও ইঙ্গিতময় কাম অনুষঙ্গের সচিত্র ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে যায়! তবে মাজুলের লেখায় টিকটিকি, নগ্ন পুতুল ও গোলাপ নিয়ে সিরিজের সচিত্র ব্যাখ্যা করতে পারতেন, ফ্রয়েড কিংবা ১৭ শতকের উকিও ছবির সাথে তুলনামূলক আলোচনা রাখতে পারতেন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাজুল হাসান — নভেম্বর ২৬, ২০১৬ @ ৬:৩৮ অপরাহ্ন

      আলমগীর হক, প্রিয় সুধী- আপনার প্রতিক্রিয়ার জন্য ধন্যবাদ। আমি আসলে নবুয়োসির কাজ ও তার নিজের ইন্টারপ্রেটেশন পাঠকদের জানাতে চেয়েছি মাত্র। ভালো মন্দ বিচার করিনি। আর ফ্রয়েড কিংবা অন্য তুলনামূলক আলোচনায় যাওয়ার মতো জ্ঞানগত গভীরতা আমার নাই। আমি বরং জাপানি ট্রাডিশনাল সুঙ্গার সাথে নবুয়োসির ছবির একটা তুলনামূলক আলোচনা করতে পারতাম, তার একটা আভাসও আছে এখানে। কিন্তু বিস্তারে যাইনি; তাতে লেখা আকার ও শাখাপ্রশাখায় আরও দীর্ঘ হতো। ভবিষ্যতে এবিষয়ে লেখার ইচ্ছে আছে। শেষ পর্যন্ত আমি নবুয়োসি’র একটা ইন্ট্রোডাক্টরি লেখাই লিখতে চেয়েছি- একজন ডেভিলিশ ইনোসেন্ট ফটোগ্রাফার। শুভেচ্ছা জানবেন।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com