মনির : ক্রম-পরিণতি ও বৈচিত্র্যের সফল শিল্প-ব্যক্তিত্ব

অলাত এহ্সান | ২০ নভেম্বর ২০১৬ ১০:৩৫ অপরাহ্ন

monir-2গভীর সংদেনশীলতার কারণেই সাহিত্যিক-শিল্পীরা সমাজে আশু পরিবর্বতন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে আগেই আঁচ করতে পারেন। স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে, বিশেষ করে ষাটের দশকের শিল্পী-সাহিত্যিকদের অন্বেষাই এ দেশের স্বাতন্ত্র ও প্রাণশক্তি চেনাতে মূখ্যভূমিকা রেখেছে। শিল্পীদের সেই অন্বেষাকে গভীরতর করার ক্ষেত্রে প্রধান কারিগর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। তার মধ্যদিয়েই দেশভাগোত্তর এদেশের শিল্পকলার সেই ধারা চর্চার সূচনা। পরবর্তীকালে তাদের উত্তরসূরি প্রতিভাবান শিল্পীদের হাতে বৈচিত্র্যে ও বৈভবে সমৃদ্ধ হয়েছে চিত্রকলার ধারা, গড়ে উঠেছে এর গৌরবময় ইতিহাস। মনিরুল ইসলাম এই প্রতিভাবান শিল্পীদের অন্যতম। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সফিউদ্দিন আহমেদ, কামরুল হাসান, আমিনুল ইসলাম, মোহাম্মদ কিবরিয়ার শিষ্য তিনি। জয়নুলোত্তর শিল্পীদের মধ্যে তিনিই বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক পরিচিতদেরও একজন। কাজের নিজস্বতা, ধরন ও সমৃদ্ধিই তাকে এখানে উন্নীত করেছে।
পঞ্চাশের দশকের শেষার্ধ থেকে শুরু করে ষাটের দশকের প্রথমে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করেন মনিরুল ইসলাম। ঠিই তখন থেকেই তার শিল্পীজীবন ধরলে আজ তা সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে তিনি দ্বিতীয় আবাস গড়েছেন স্পেন। সেখানে স্থায়ীভাবে বাস করে শিল্পচর্চা করেছেন। হয়ে উঠেছেন মাদ্রিলেনঞ-বাঙালি। ছাপচিত্রের জন্য খ্যাতিমান এই শিল্পী এচিংয়ে এমন একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছেন, যা স্পেনে ‘মনির-স্কুল’ বলে পরিচিত।
অর্থাৎ এই সময়ে তার চিত্রকর্ম একই রকম থাকেনি। তা সম্ভবই না। কখনো থাকে না। বদলে গেছে, বিষয় বস্তু থেকে প্রকরণ, এমনকি আঁকার সরঞ্জাম-উপাদান, সবকিছুতে এই পরিবর্তন। প্রত্যাহিক জীবনের প্রায় সব কিছু থেকেই তিনি শিল্পের সন্ধান পান। এমনি একটা পোড়া রুটির বুক থেকেও। ১৯৬১ থেকে ২০১৬, এই দীর্ঘ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সব পেন্টিং ও দিক নিয়ে প্রকাশ হলো শিল্পবিষয়ক বই ‘মনির’। এর মধ্যদিয়ে তার আঁকা ছবির পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের একটা রেখাচিত্র পাওয়া যাবে। গতকাল শনিবার ঢাকা লিট ফেস্টের সমাপনী দিনে কসমিক টেন্ট-এর মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়।

Monir0বিকাল সাড়ে তিনটায় চিত্রপ্রেমী ও বোদ্ধাদের উপস্থিতিতে এ অনুষ্ঠানে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী ও শিল্পীর ঘণিষ্ট বন্ধু আসাদুজ্জামান নূর, বাংলাদেশে নিযুক্ত স্পেনের রাষ্ট্রদূত এদুয়ার্দো দে লা ইগলেসিয়া, এনার্জিস লিমিটেডের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জেরিন হোসেন। অনুষ্ঠনটি সঞ্চালনা করেন চিত্রসমালোচক মোস্তফা জামান। এসময় উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট, শিল্পী রোকেয়া সুলতানা, এনার্জিস লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর জাভেদ হোসেনসহ দেশ-বিদেশের অতিথিবৃন্দ। বইটি প্রকাশনা পৃষ্ঠপোষকতা করেছে এনার্জিস লিমিটেড।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই শিল্পী মনিরুলের উপর নির্মিত দুইটি তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয় মঞ্চের স্ক্রিনে। এতে শিল্পীর শিল্পভাবনা, জীবনযাপন, আঁকার মুহূর্তকে তুলে ধরা হয়।

মনিরুল ইসলামের জন্ম ১৯৪৩ সালের ১৭ আগস্ট। বাংলাদেশের জামালপুরে। তৎকালীন ঢাকার আর্ট কলেজে অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন তিনি। শুরুতেই চিত্রকলায় নিজের ধরনটি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরে তার শিক্ষক শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের একান্ত আগ্রহেই ১৯৬৬-১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা করেন। তারপর স্পেন সরকারের বৃত্তি নিয়ে উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি বিদেশে পাড়ি জমান। সেই থেকে সাড়ে ৪ দশকের অধিক সময়ে স্পেন তার সেকেন্ড হোম। এ সময়ে স্পেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার বহু একক ও যৌথ প্রদর্শনী হয়েছে। এছাড়া তিনি স্পেন, ফ্রান্স, মিসর, ভারত, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহু আন্তর্জাতিক চারুকলা প্রদর্শনীতে বিচারক হিসেবে কাজ করেছেন।

অনুষ্ঠানে স্ক্রিনে এক-একটি চিত্রকর্ম দেখানোর পাশাপাশি জানতে চাওয়া হচ্ছিল শিল্পীর মত ও ব্যাখ্যা আর তার পেছনের গল্প। প্রাণবন্ত উপস্থাপনার সঙ্গে শিল্পীর স্মৃতিচারণে ও কোনো কোনো ছবির পেছনের গল্প ও ঘটনা উদ্ধারে সহায়তা করেন শিল্পীবন্ধু মন্ত্রী ও অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর।
শিল্পীর সঙ্গে ঘনিষ্ট বন্ধুতার সূত্র টেনে আসাদুজ্জামান নূর উল্লেখ করেন, শিল্পীর জীবনে তার গ্রামের প্রভাব ও নদীর পাড়ের সময়গুলো। তিনি জানান চা-পাতা, কফি, মাটি, বালিকে তিনি ব্যবহার করেন ছবিকে বাঙ্ময় করে তোলার জন্য। তাছাড়া সবাই যখন পলিশ করা বোর্ডে আঁকছেন, শিল্পী মনিরুল ইসলাম ফেলনাকেই করে তুলছেন মূল্যবান। সংবাদপত্রের পুরনো সংখ্যা, ম্যাগাজিন, খাকিরঙা বাশ কাগজ, বাতিল বাক্স, কাঠি, এমনকি সিগারেটের খোসায় আঁকছেন তিনি। শিল্পী বলেন, একটা সাদা পেপার দেখে আমি চমকে উঠি। জীবন তো এমন নয়। আমার কাছে কিছুই ফেলনা নয়। শিল্প উঠে আসে জীবন থেকে। তাই প্রত্যাহিক এই ফেলনাও শিল্পকে মূর্ত করে তুলতে পারে। এবং যা তিনি করেননি আগে, তা করতে তিনি আনন্দ পান। আর এই সব তার শিল্পকে জীবন্ত করে তোলে।
অনুষ্ঠানে বারবারই উঠে আসে তার চিত্রশিল্পে তার অবদান-প্রসঙ্গ। দীর্ঘ সাড়ে চার দশকের স্পেন বাসের ফলে রাজধানীতে ‘মাদ্রিলেনঞর চেয়েও মাদ্রিলেনঞ’ খ্যাত হন। আবার চিত্রকর্মে তিনি বাংলার বিষয়-আশয়কেই ফুটিয়ে তোলেন। ফলে তার ভেতরে প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের একটা মেলবন্ধন পাওয়া যায়। শিল্পীবন্ধু আসাদুজ্জামান নূর আরো নির্দিষ্ট করে দেন, শিল্পী মনিরুল ইসলামের বাংলা বলতে তিনি তার চাঁদপুরকেই বোঝেন। সেখানের নদী, মাঠ, ছায়াঘেরা গ্রাম, গৃহস্থের উঠান, ফল বাগানকেই বোঝেন। তার ভেতরে স্পেনের ঐতিহ্য ও জ্ঞানের প্রাচুর্য পেয়েছেন, একইভাবে বাংলাদেশের প্রকৃতির সঙ্গে তার আত্মিক সম্বন্ধ গড়ে উঠেছে। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশের একুশে পদক, শিল্পকলা একাডেমী পদকসহ বিভিন্ন পদক ও সম্মাননা পেয়েছেন। ‘এমনও হয়েছে যে খুব সকালবেলা দেখেছি ও কাজ করছে। এটাই তার ধ্যান-জ্ঞান। সে খুবই পরিশ্রমী শিল্পী, আমি বলতে পারি না তিনি কখন বা কোথায় ঘুমান।’ অজস্র স্মৃতি থেকে বলেন আসাদুজ্জামান নূর।‘আমি প্রতিদিনই মনিরের ছবিতে নতুনত্ব খুঁজে পাই। আমি খুব আনন্দিত।’

Monir3‘তিনি স্পেনকে সব চেয়ে ভালভাবে বুঝেছেন। তিনি একজন স্প্যানিশও। বাংলাদেশ ও স্পেনের মধ্যে তিনি গুরুত্বপূর্ণ সেতু। তার মধ্য দিয়ে দুই দেশে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান সুগম হয়েছে। ১৯৯৭ সালে তিনি স্পেনের রাষ্ট্রীয় পদক এবং ২০১০-এ তিনি ভূষিত হন স্পেনের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা অর্ডার অব অফিসার কুইন ইসাবেলা পুরস্কারে যা খুবই বিরল।’ বলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত স্পেনের রাষ্ট্রদূত এদুয়ার্দো দে লা ইগলেসিয়া।
এনার্জিস লিমিটেডের জেরিন হোসেন তার এই সংকলের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘আমরা কেবল তার সৃষ্টির সংকলনই করেছি। সৃষ্টিটা তারই। শিল্পীদের সারা জীবনের শিল্পকর্ম তাদের যার যার অধীনে থাকে। সাধারন মানুষের কাছে পৌঁছায় না। তাই এই উদ্যোগ।’
বইটিতে শিল্পীর শুরু থেকে তার বৈচিত্রপূর্ণ ক্রম-পরিণতির দীর্ঘ যাত্রার সরণীকে তুলে ধরা হয়েছে। অনেক দুর্লভ চিত্রও এখানে সংযোজিত হয়েছে। যেমন বইয়ের প্রথমেই শিল্পীর মায়ের প্রয়াণ-পরবর্তী মুহূর্তে আঁকা স্কেচটিও দেয়া হয়েছে। এই ছবিটি প্রসঙ্গে শিল্পী বলেন‘এটা আমার জন্য খুবই অনুভূতিশীল ও মূল্যবান মুহূর্তকে ধরে রাখা।’
বইটি সকল শিল্পরসিক ও বোদ্ধাদের প্রয়োজন মেটাবে বলে মনে করেন বইয়ের প্রকাশক ও আয়োজকরা।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Firoz Uddin — নভেম্বর ২১, ২০১৬ @ ৯:২৪ অপরাহ্ন

      Thanks to all who contributed to publications of this Great Artist. May God bless him long life with sound health.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com