ঢাকা লিট ফেস্ট : দেশবিদেশের মেলবন্ধনের প্রথম দিন

অলাত এহ্সান | ১৮ নভেম্বর ২০১৬ ১:০৫ অপরাহ্ন

Opening NAIPAL 0‘হে-অন-ওয়ে’ শহরকে অনেকে বইয়ের শহর বলেও চেনেন। মূলত যুক্তরাজ্যের অঙ্গরাজ্য ওয়েলস-এর রাজধানী ব্রেকনকসায়ারের বিপনী শহর এটি। শহরটিতে বইয়ের প্রাচুর্যে লেখকের সমাবেশ ঘটে অহরহ। দেশের তরুণ লেখক ও প্রকাশককে উৎসাহ দেয়ার জন্য ১৯৮৮ সালের মে-জুন মাসে এই হে-অন-ওয়ে শহরেই শুরু হয় ‘হে ফ্যাস্টিভ্যাল’। গত ২৯ বছরে ‘হে ফ্যাস্টিভ্যাল’এখন বিশ্বের বিভিন্ন শহর, যেমন–কেনিয়ার নাইরোবি, মালদ্বীপ, লেবালনের বৈরুত, উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্ট, কলম্বিয়ার কার্তাহেনা, ভারতের ক্যারালা ও কলকাতা, গ্রানাডা-আন্দালুসিয়া, আলহামরা, সেগোভিআ, ওয়েলসের ব্রিজেন-এ এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। সুতরাং হে ফ্যাস্টিভ্যাল এখন আর কোনো নির্দিষ্ট দেশ-শহরে সীমাবদ্ধ নেই। গত পাঁচ বছরের ধারাবাহিকতায় ঢাকায় এখন চলছে ‘হে ফেস্টিভ্যাল’-এর পাইলট প্রোগাম। তবে এটা অনেক বেশি স্বকীয়তা অর্জন করে। এর নাম ঢাকা লিটারেচার ফেস্টিভ্যাল সংক্ষেপে ঢাকা লিটফেস্ট।
বলার অপেক্ষা রাখে না, যেকোনো শহরেই এই উৎসব হোক না কেন, এটা ওই দেশের ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচয়িতাদেরই উৎসাহ বেশি হবে। তবে এটা শুধু মাত্র দেশ-বিদেশের লেখক-পাঠক সম্মিলন নয়। আয়োজক দেশ ও শহরের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশি লেখকদের নিকট নিজেদের সংস্কৃতিও তুলে ধরার সুযোগ বৃদ্ধি হয় এতে। সঙ্গে ওই দেশের সাহিত্যও ইংরেজি অনুবাদ হয়ে পাঠকের বিশ্ব দরবারেও উপস্থিত হওয়ার প্রক্রিয়া তরান্বিত হয়। ঢাকায় ষষ্ঠবারের মতো শুরু হয়েছে এই উৎসব। গত ১৭ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই উৎসব চলবে ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত। ৩ দিনব্যাপী এই উৎসবে বিদেশি লেখক-সাহিত্যিকদের সঙ্গে দেশের প্রবীণ তরুণ লেখক-পাঠকদেরও মিলন ঘটেছে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে।

২০১১ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে ‘হে ফেস্টিভ্যাল’ উদযাপিত হয় বিশেষ করে কাজী আনিস আহমেদ ও তাহমিমা আনামের উদ্যোগে। বিগত কয়েক বছরের ন্যায় এ বছর কাজী আনিস আহমেদ, সাদাফ সায্ ও আহসান আকবারের পরিচালনায় এবারের আয়োজনে দেশে-বিদেশের লেখকের অংশগ্রহণ উল্লেখ করার মতো। তিন দিনে বাংলা একাডেমির নবনির্মিত ভবনের ড. আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ হলকে প্রধান মঞ্চ, পাশেই কবি শামসুর রাহমান হলকে কে কে টি মঞ্চ, ড. এনামুল করিম ভবনের ভেতরে ব্রাঞ্চ মঞ্চ, বর্ধমান হাউসের উত্তরের প্রাঙ্গণকে বর্ধমান হাউস মঞ্চ, দক্ষিণকে লন, বটতলা মঞ্চ এবং পুকুরের পাশে তাঁবু করে কসমিক টেন্ট করে স্থায়ী-অস্থায়ী মোট সাতটি মঞ্চে ১০০টি পর্বে অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে প্রথম দিন ২৩টি পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় দিন ৩৮টি এবং তৃতীয় দিন ৩৯টি পর্ব অনুষ্ঠিত হবে।
এ বছরে আয়োজনের সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে সাহিত্য উৎসবে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ট্রিনিডাড এন্ড টোবাগোর লেখক-ঔপন্যাসিক ভি এস নাইপল। সাহিত্য পুরস্কারের জগতে সবচেয়ে সম্মানজনক নোবেল প্রাইজ ও ম্যান অফ বুকারসহ বিশ্বের বহু পুরস্কার ভূষিত তিনি। উপনিবেশ আর নির্বাসন নিয়ে রচিত তাঁর হাউস অফ মি. বিশ্বাস উপন্যাসকে ‘টাইম’ ও ‘দ্য নিউইয়র্ক বুক রিভিউ’ ম্যাগাজিন অভিহিত করেছেন ইংরেজি গদ্য সাহিত্যের ‘নতুন দ্রষ্টা’ ও ‘কিংবদন্তি’ হিসেবে। পরবর্তীকালে নিজের ন্যারেটিভের প্রকৃতি নানাভাবে পালটে নিলেও, মূলত ছোট জায়গা থেকে মুক্তি, সংকীর্ণ অস্তিত্ব থেকে মুক্তি, থেমে যাওয়া থেকে মুক্তির কথাই বলে গেছেন নিরন্তর স্যার নাইপল। বাংলাদেশে এটাই তার প্রথম সফর।
এছাড়া তিনদিনের এই সাহিত্য উৎসবে দুশতাধিক শিল্পী, সাহিত্যিক, লেখক, গবেষক, সাংবাদিকসহ আরও অনেকে অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে ২০১৬ সালের ম্যান বুকার পুরস্কার বিজয়ী ও ২০১৪ সালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন প্রাইজ ফর লিটারেচার ইভ উইল্ড জয়ী ডেবোরাহ স্মিথ, উত্তর কোরিয়ার লেখক হাইয়েনসিও লিসহ নেপাল, ভুটানসহ অনেক দেশের সাহিত্যিকরা এই লিট ফেস্টের আসর মাতাবেন।
গত ১৭ নভেম্বর বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় বাংলা একাডেমির মূল ফটক সাহিত্যপ্রেমিদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। সাড়ে ১১টায় বাংলা একাডেমির আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তন তথা প্রধান মঞ্চে শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার নির্দেশনায় ‘সুরের ধারা’ সংঠনের শিল্পীদের রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশনের মধ্যদিয়ে শুরু হয় আনু্ষ্ঠানিক কার্যক্রম।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই বক্তব্য রাখেন ঢাকা লিট ফেস্টের তিন পরিচালক যথাক্রমে কাজী আনিস আহমেদ, আহসান আকবর ও সাদাফ সায্। বিদেশি অতিথি ও উপস্থিতিকে ধন্যবাদ, অনুষ্ঠানের আকর্ষণীয় দিক, আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সাহিত্যকে তুলে ধরতে এই উৎসবের গুরুত্ব এবং বাংলাদেশের হাজার বছরের সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেন তারা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে বাংলা একাডেমি আয়োজিত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসবগুলোর কথা উল্লেখ করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যেও এমন আয়োজন, অতিথি ও দর্শকদের আগমনকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ অবদান রাখা গুণীদের স্মরণ করে বলেন, একদিকে ঢাকা ট্রান্সলেশন সেন্টারের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাহিত্য অনূদিত হচ্ছে, অন্যদিকে ঢাকা লিট ফেস্টের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাহিত্য বিশ্বদরবারে উপস্থাপিত হচ্ছে।
নোবেলজয়ী সাহিত্যিক ভি এস নাইপল সস্ত্রীক স্টেজে এসে ফিতা কেটে ঢাকা লিট ফেস্টের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি ঢাকা লিট ফেস্টের উদ্বোধন ঘোষণা করছি। এই লিট ফেস্ট উদ্বোধন আমার সাহিত্য জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।’
অনুষ্ঠান পরিক্রমায় মোট ৭টি সেশনে এক ও একাধিক স্টেজে অনুষ্ঠিত হয় ২২টি পর্ব। এর মধ্যে সাড়ে ১২টায় লনে নাগরিক সংগীত পরিবেশন করেন মেহেদী হাসান নীল ও তার বন্ধুরা। ঠিক একই সময় কসমিক টেন্টে দেখানো হয় ইন্দ্রনীল চৌধুরীর ডকুফিল্ম ‘ভালবাসার শহর’। বর্তমান সময়ে তরুণদের মধ্য হতাশা, ক্ষোভ, সংকট, কিভাবে যুদ্ধের পেছনে কাজ করছে তা এখানে দেখানে হয়। চলচ্চিত্র শেষে লেখক সংগীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচালকে নিয়ে আলোচনায় বসেন লেখক-সাংবাদিক সাদিয়া মাহজাবিন ইমাম।
দুপুর ১ টায় কেকে টি মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘ইমাজিনিং হিস্ট্রি’। আলোচনায় অংশ নেন তিন সাহিত্যিক-সাজিয়া ওমর, বাপ্পাদিত্য চক্রবর্তী এবং সাদ হোসেন। সাদ হোসেনের সঞ্চালনায় আলোচনায় বক্তারা সাহিত্য ও ইতিহাসের মিশ্রণ, হিস্টোরিক ফিকশন এবং ফিকশনাল হিস্ট্রি নিয়ে আলোচনা করেন। একই সময় প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের সাহিত্যে সাম্প্রতিক প্রবণতা নিয়ে পাঁচ লেখক, অনুবাদক, আলোচককে নিয়ে আড্ডা বসে প্রধান মঞ্চে। ‘ওয়াল্র্ড ফিকশন : হিডেন রিয়ালিটি’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নিকোলাস লেজার্ড, আঞ্জুম হাসান, মারসিয়া লুক্স কোয়ালি, রাইল ইলতোখি, এ্যামি সাকভিল্লে। এ সময় লন-এ চলা ‘ইংলিশ পোয়েট্রি রিসাইটেশন’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন স্টিভেন ফ্লোয়ার, মাকসুদুল হক, কারলস টরনার।
বেলা সোয়া ২টা থেকে সোয়া ৩টার মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় ৩টি পর্ব। প্রধান মঞ্চে ‘আমেরিকা : এক্সেপশন নো মোর’ পর্বে সদ্য অনুষ্ঠিত আমেরিকার নির্বাচন ও অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা করেন বারখা দত্ত, জেফরি ইয়ুং, বেন চুধাহ, মারসিয়া লুক্স কোয়ালি, কাজী নাবিল আহমেদ ও শ্রীরাম কাকরি। কেকে টি স্টেজে চলে ‘অ্যান ইনটিমেট আর্কিটেকচার: দ্য নিউরোসায়েন্স অব অ্যাসথেটিকস’ পর্বে সাহিত্য, স্থাপত্যবিদ্যা এবং স্নায়ুবিজ্ঞানের মধ্যেই কি চমৎকার মেলবন্ধন দেখালেন তিনবক্তা। সেশনের অতিথি ছিলেন ফিনল্যান্ডের বিখ্যাত লেখক ও স্থাপত্যবিদ জুহানি পালাসমা, আবেদ চৌধুরী, কাজী কে আসরাফ। এছাড়া ‘সাম্প্রদায়িকতার এপার ওপার’ শীর্ষক অপর আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবি মাসুদুজ্জামান, কবি জহর সেন মজুমদার, লেখক সেমন্তি ঘোষ, লেখক মাসুদুল হক। বক্তারা সাম্প্রদায়িকতার ঐতিহাসিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দিক নিয়ে আলোচনা করেন। আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন আহমেদ রেজা।
প্রাণবন্ত আলোচনায় অনুষ্ঠিত হয় ‘ক্রাইম প্লেস-দ্যা আর্ট অফ দ্যা সাসপেনশন’ শীর্ষক পর্বটি। ১টা ৪৫ থেকে ২ টা ৪৫ পর্যন্ত থ্রিলার ও ক্রাইম ধারা গল্প-উপন্যাস লেখার এনাটমি নিয়ে এন্থনি ম্যাকগোয়ান, লিওনোরা ক্রিস্টিনা স্কভ, রিচার্ড বিয়ার্ড আলোচনা করেন কেলি ফকনারের উপস্থাপনায়।
সাড়ে ৩টা থেকে সাড়ে ৪টার সেশনে অনুষ্ঠিত হয় ৬ পর্ব। এর মধ্যে প্রধান মঞ্চে বহুল আকাঙ্ক্ষিত মীর মোশাররফ হোসেনের (১৮৪৭-১৯১২) বিষাদ সিন্দুর ইংরেজি অনুবাদ অ্যান ওসান অফ সরো বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হয়। অনুবাদক ফখরুল আলমের উপস্থিতিতে এর বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। উপস্থাপনায় ছিলেন এমকে আরেফ। কেকে টি স্টেজে ‘গ্রাণ্টা : ট্রুথ এন্ড লাই’ পর্বে কার্তিকা ভিকের সঞ্চালনায় অংশ নেন এ্যামি এ্যামি সাকভিল্লে ও এলেক্স প্রিস্টন।
ব্র্যাক স্টেজে অভিনেতা ও টিভি ব্যক্তিত্ব ইরেশ যাকেরের সঙ্গে দুই তানিয়ার গল্প নিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত আলাপে মেতে ওঠেন কলকাতার লেখিকা অন্তরা গাঙ্গুলি। ১৯৯২ সালে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং এরপরের ঘটনাপ্রবাহ উপমহাদেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক আর চিন্তার ধারাবাহিকতায় তানিয়া নামের ভারতে ও পাকিস্তানের দুই কিশোরীকে নিয়ে উপন্যাস। লন্ডনের ব্লুমসবারি থেকে প্রকাশিত বইটি পত্রসাহিত্যের আদলে ব্যক্তি অস্তিত্ব, নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষেরই দলিল।
এ সময় কসমিক টেন্টে দেখানো হয় বিবিসি থেকে করা নোবেলজয়ী ভি এস নাইপলের ওপর নির্মিত বায়োগ্রাফিক ফিল্ম ‘দ্যা স্ট্রেঞ্জ লাক অফ ভি এস নাইপল’। এখানে তার বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে নোবেন পুরষ্কার পাওয়া পর্যন্ত তুলে আনা হয়েছে।
এদিকে ‘সময়ের কবিতা সময়ান্তের কবিতা’ পর্ব অনুষ্ঠিত হয় লন-এ। কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার অনুপস্থিতির কারণে কবি আসাদ চৌধুরীর সঞ্চালনায় কবিতা আবৃত্তি করেন কাজী রোজী, হাবিবুল্লাহ সিরাজী, আসাদ মান্নান, ঝর্ণা রহমান, শিহাব শাহরিয়ার, কুমার চক্রবর্তী, পাবলো শাহী, ওবায়েদ আকাশ, মুস্তাফিজ শফি, মিহির মুসাকি, গৌতম গুহ রায়, অনিকেত শামীম, অদিতি ফাল্গুনী, হাসান মাহমুদ, জুয়েল মজহার, জাফির সেুত, মাসুদ হাসান, মাহমুদ শাওন, শিমুল সালাহউদ্দিন ও ওয়াসিম পলাশ। অপরদিকে আবৃত্তি পরিষদের আয়োজনে বটতলায় অনুষ্ঠিত হয় চার কবির স্মরণে আবৃত্তি। ড. বিলকিস রহমানে সঞ্চালনায় এতে আবৃত্তি করেন খ্যাতনাম আবৃত্তিকার ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, আশরাফুল আলম, লায়লা আফরোজ, ডালিয়া আহমেদ, নাইলা কাকলী, মাহিদুল ইসলাম, রফিকুল আলম, মো. আহকাম উল্লাহ, ড. রূপা চক্রবর্তী এবং গোলাম সরোয়ার।
প্রধান মঞ্চে প্রথমদিনে ৪টা ৪৫ থেকে ৫টা ৪৫ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় উৎসবের অন্যতম আয়োজক ও লেখক সাদাফ সায-এর সঙ্গে ভারতের সাংবাদিক ও লেখক বারখা দত্তের বই নিয়ে আলোচনা। বইটি আলোচিত, একই সঙ্গে বিতর্কিতও। ‘দিস আনকোয়াট ল্যান্ড’ আলোচনা পর্বে লেখিকা দত্তের সঙ্গে কথা বলেন সায। এখানে লেখিকার লেখার বিভিন্ন দিক, বইয়ের চিন্তা ও বিন্যাস নিয়ে সবিস্তারে কথা বলেন। আমেরিকার নির্বাচন, ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্কের টানাপোড়েন, উপমহাদেশের রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে কথা বলেন দত্ত।

বিকেল ৪টা ৪৫ থেকে ৫টা ৪৫, এই সময় অনুষ্ঠিত হয় ৪টি পর্ব। এর মধ্যে কেকে টি স্টেজে ‘জার্নি এন্ড কোয়েস্ট ইন ট্রুথ’ পর্বে তসেরিং তাসির সঙ্গে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেন টিম কোপ, সাদিয়া দেহলভি, সিমন ব্রোগটন। লন-এ ব্র্যাক পপুলার থিয়েটারের আয়োজনে গাজীপুর থেকে আমন্ত্রিত অনির্বাণ গণনাটক দল উপস্থাপনা করে লোকনাটক। ব্র্যাক স্টেজে ‘আমিরানা’ পর্বে ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়া ও তার বিরুদ্ধে যুবকদের গণআন্দোলন নিয়ে কথা বলেন কবি বিজয় শেষাদ্রী ও জেফারি ইয়ুং।
কসকিম ট্রেন্টে ‘রিচার্ড বার্ড’স এডিটিং ওয়ার্কসপ’ পর্বটি বক্তা ও দর্শকের সরাসরি অংগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়। ফিকশন, নন-ফিকশন লেখক ও সম্পাদক রিচার্ড বার্ড ২ হাজার শব্দের একটি ফিকশনকে নির্মেদ করার জন্য কীভাবে সম্পাদনা করতে হবে তা হাতে কলমে দেখান।
প্রথম দিনের অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ ছিল সদ্যপ্রয়াত সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শমসুল হককে সম্মান জানানোর পর্বটি। সন্ধ্যা সোয়া ৬টা থেকে উৎসবের প্রধান মঞ্চে (আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তন) মঞ্চায়িত হয় সদ্যপ্রয়াত সৈয়দ শামসুল হকের নীল দংশন উপন্যাসের অনূদিত নাটকের মঞ্চায়ন। সাহিত্যিক পারভেজ হোসেনের সঞ্চালনায় তার আগে প্রয়াত এই সাহিত্যিকের সাহিত্য ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন প্রাবন্ধিক আহমাদ মাযহার, কবি সাজ্জাদ শরীফ এবং লেখকের ছেলে দ্বিতীয় সৈয়দ হক।
বক্তাদের আলোচনায় সৈয়দ হকের একটি সংক্ষিপ্ত লাইফ স্কেচ খুঁজে পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে তার সাহিত্যের যাত্রাটাও দেখা যায়। কবিতা থেকে শুরু। তিনি কবিতা থেকে শুরু করে কথাসাহিত্য, চলচ্চিত্র, সংগীত, অনুবাদ, মঞ্চ নাটক – ধারাকে চিহ্নিত করা হয়। শুরুতেই পারভেজ হোসেন সৈয়দ হককে রবীন্দ্র পরবর্তী সময়ের অন্যতম কিংবদিন্ততুল্য লেখক হিসেবে উল্লেখ করেন। আহমাদ মাযহার সৈয়দ হককে সাহিত্যজগতের সত্যিকারের তারকা হিসেবে উল্লেখ করেন। কবি সাজ্জাদ শরিফ সৈয়দ হককে উল্লেখ করেন রেনেসাঁমানব হিসেবে। সৈয়দ শামসুল হকের ছেলে দ্বিতীয় সৈয়দ হকের আলোচনায় উঠে আসে ব্যক্তি কবির জীবন।
তাদের আলোচনার শেষে সৈয়দ শামসুল হকের ‘নীল দংশন’ উপন্যাসটির ইংরেজিতে অনূদিত নাট্যরূপের মনোজ্ঞ মঞ্চায়ন করা হয়।
এ সময় বটলায় ‘বাউল ক্যারাভান’ পর্বে সংগীত তারকা মাকসুদের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে প্রথম দিনে অনুষ্ঠানমালা সম্পন্ন হয়।
লিট ফেস্টে অংশ নিয়েছে সময় প্রকাশ, বুক ওয়ার্ম, বেঙ্গল পাবলিকেশন, ব্রিটিশ কাউন্সিল, বাংলা একাডেমি, ডেইলি স্টার, প্রথমাসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান।
উল্লেখ্য, ঢাকা লিট ফেস্ট আয়োজিত হচ্ছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহযোগিতায়। এর টাইটেল স্পন্সর ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউন ও অনলাইন নিউজ পেপার বাংলা ট্রিবিউন, প্ল্যাটিনাম স্পন্সর ব্র্যাক। অনুষ্ঠানের সার্বিক আয়োজনে রয়েছে ‘যাত্রিক’। কো-হোস্ট হিসেবে রয়েছে বাংলা একাডেমি। এছাড়াও গোল্ড স্পন্সর হিসেবে রয়েছে, এনার্জিস, পূর্ণভা। গোল্ড পার্টনার হিসেবে থাকছে ব্রিটিশ কাউন্সিল। সিলভার স্পন্সর হিসেবে রয়েছে, ক্রিস্টোফারসন রব অ্যান্ড কোম্পানি ও ইউল্যাব। এছাড়া আরও পার্টনার হিসেবে রয়েছে বুকওয়ার্ম, সিকিউরেক্স, বেঙ্গল ইন্সটিটিউট আমরা, ইএমকে সেন্টার ইত্যাদি।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন zubaer — নভেম্বর ১৮, ২০১৬ @ ৭:৪৬ অপরাহ্ন

      প্রথম প্যারা থেকেই রিপোর্টে অজস্র ভুল রয়েছে। হে অনেক আগেই বাদ গেছে, ফেস্ট গত দুই-তিন বছর ধরে দেশ থেকে পরিচালিত হচ্ছে, এবং হে বা অন্য কোন বিদেশী সংস্থার কোন ইনভল্ভমেন্ট এখানে নেই। এতটুকু অর্গানাইজারদের সাথে আলাপ করলেই জানা যেতো। এছাড়া লেখকদের নামের বিকৃতিকরণ (অজ্ঞতাপ্রসূতই ধরে নিচ্ছি) অনভিপ্রেত। উদাহরণ – মারসিয়া লুক্স কোয়ালি, বেন চুধাহ!!! অলাত এহসানের থেকে আরো যত্নবান রিপোর্ট প্রত্যাশা করি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অলাত এহ্সান — নভেম্বর ১৯, ২০১৬ @ ১:৩৯ অপরাহ্ন

      ধন্যবাদ zubaer,
      আপনার প্রত্যাশাকে সাধুবাদ, সব সময়। প্রত্যাশাই, বোধ করি, প্রাপ্তিকে সুগম করে।
      তবে প্রথম প্যারায় রিপোর্টে তথ্যভুলের কথা যে বলেছেন, তা বোধ করি সমীচিন নয়। হলেও তা উৎসকেই দায়ি করতে হবে।
      কারণ আপনি নিশ্চয়ই জানেন, ষষ্ঠ আসরে আজকে যা ঢাকা লিট ফেস্ট তা চতুর্থ আসরেও হে ফেস্ট ছিল। সেই সময় হে ফেস্টের নিজস্ব ওয়েব সাইটে তা উল্লেখও ছিল। পঞ্চম ফেস্টে তা ঢাকা লিট ফেস্ট নাম নেয়। তখনও হে ফেস্টিভ্যালের ওয়েব সাইটে একে তাদের পাইলট প্রোগ্রাম দেখানো হয়েছে। তখনও লিট ফেস্ট মঞ্চে হে ফেস্টের কথা বারবারই উঠে এসেছে।
      এবার ষষ্ঠ আসরে যখন ঢাকা লিট ফেস্টকে স্বতন্ত্র বলা হচ্ছে, তখন তা আরো পরিষ্কার করা দরকার ছিল বৈকি। যেমন আমি তাদের ইনফরমেশন সেন্টারে গিয়ে খোঁজ নিয়েছি। ডেস্কে বসা কেউ তা পরিষ্কার করতে পারে নি। তাদের যে প্রকাশনাগুলো আছে তারা কোথাও পরিস্কার করেনি যে, তারা আর হে ফেস্টের পাইলট প্রোগ্রাম থাকছেন না। বিভ্রান্তির কারণ এটিও।
      আপনার মনে আছে নিশ্চয়, হে ফেস্টিভ্যাল কেন রাষ্ট্রীয় টাকায় হবে, তা নিয়ে প্রতিবাদ হয়েছে। ভাবা ভুল হবে না যে, সেই প্রতিবাদই তাদের ‘নামে’ বড় পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু উৎসব কি তার সেই অবস্থান থেকে খুব কিছু বদলেছে? পরিসর ও ইভেন্ট বৃদ্ধিকে নিশ্চয় আপনি গুণগত পরিবর্তন বলবেন না।
      সবচেয়ে বড় কথা, একটা দেশে আন্তর্জাতিক লেখক সম্মেলন হওয়া খুবই জরুরি। তাই আন্তর্জাতিক লেখক সম্মেলন করার উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা এদেশে আগেও ছিল। তবে আয়োজক ভিন্নতার কারণে অনুষ্ঠানও যে ভিন্ন হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মানে কারা করছে, কেন করছে, কীভাবে করছে, কখন করছে, তার ওপর উৎসবের দর্শন ও কার্যাবলি ভিন্ন হয়। সেদিক দিয়ে ঢাকা লিট ফেস্ট কোথায় অবস্থান করছে, তা নিয়ে বিচিত্র চিন্তা হতেই পারে, জরুরিও বটে।

      আর নামের উচ্চারণ ‘ভুল’, হয়তো অনভিপ্রেত এই ভুল।
      আপনাকে ধন্যবাদ পুনর্বার।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — নভেম্বর ২০, ২০১৬ @ ৮:৫৪ পূর্বাহ্ন

      আমি তো উৎসব বর্জন করেছি। কবিতা পড়তে যাইনি উৎসবে। অলাত এহসান আমাকে কবিতা পড়তে দেখেছেন লনে? আর্টস বা বিডিনিউজ এর কাছে এমন মানের লেখা আশা করি না।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন zubaer — নভেম্বর ২০, ২০১৬ @ ৪:৪৭ অপরাহ্ন

      শ্রদ্ধার সাথে বলি, আপনি যেহেতু এইখানে আর্টস সাংবাদিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ, এবং লেখাটি মূলত ফেস্টিভ্যালের উপর রিপোর্টাজ, সেহেতু বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্টের জন্যে ইভেন্টের তিন প্রধান অর্গানাইজারদের অন্তত একজনের সাথে আলাপ করার কোন বিকল্প নাই। এই ফেস্টিভ্যালের নাম-ধাম, ইতিহাস, পরিবর্তন, ধ্যান-ধারণা সম্পর্কে জানার সেটাই উত্তম মাধ্যম।

      অবশ্য সত্যি কথা এই যে ফেস্টিভ্যালের প্রতি ক্ষোভ একদমই নতুন না, এবং হাজার পরিবর্তন বা সদিচ্ছা থাকলেও কেউ কেউ এই ফেস্টিভ্যালের বিপক্ষে তাদের অবস্থান থেকে কোনদিনই নড়বেন না। সেটাও ঠিক আছে, কিন্তু নিরপেক্ষ রিপোর্টারের ঘাড়ে দায়িত্ব আরেকটু বেশিই বর্তায়।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com