ফেদেরিকো গারথিয়া লোরকা-র জন্য গোলাপ

ওমর শামস | ১৬ নভেম্বর ২০১৬ ১:১০ অপরাহ্ন

Lorca১ ভূমিকা :
অগাস্ট ১৯, ১৯৩৬ ফেদেরিকো গারথিয়া লোরকা (Federico Garcia Lorca)-র মৃত্যু দিন, জন্ম – জুন ৫, ১৮৯৮। এই লেখাটুকু আজকে লোরকা এবং তার কবিতা-কাজের স্মরণ, সঙ্গে–সঙ্গে শ্রদ্ধা তর্পণ। লোরকা সারা পৃথিবীর কবিতায় ইউনিক। তিনি অনন্য তাঁর কবিতার বিষয়ে, কবিতার ধারণায়, কলাকৌশলে, ভাষা-ধ্বনি প্রয়োগে, জীবন যাপনেও। আমি তাঁর নাটক বা ছবির কথা বলছি না এখানে। লোরকার ১৮ বছরের কবিতা রচনার মধ্যে ৪ টি ধারা আছে :
১. প্রস্তুতির ও প্রাথমিক বছরগুলো (১৯১৮-১৯২৭)/ Impresiones y Paisajes, 1918; Libro de Poemas, 1921
২. জিপসি বালাদ (১৯২৬-২৮) /Romancero Gitano, 1928
৩. নিউ ইয়র্কে লেখা কবিতা (১২২৯-৩০) /Poeta en Nueva York, 1940
৪. তার পরের কবিতা (১৯৩১-৩৬)/ Llanto por Ignacio Sanchez Mejias, 1935; The Tamarit Divan, 1940
এর মধ্যে মৌলিক ও মূল্যবান হচ্ছে জিপসি বালাদ এবং নিউইয়র্কে কবি। মোটা দাগে জিপসি বালাদের মধ্যে লোরকা গীতলতা এবং চিত্রকল্প ব্যাবহার করে ঐতিহ্যগত লোকজ জিনিশে নতুনত্ব ভরিয়ে দিলেন। নিউইয়র্কে লেখা কবিতাগুলোয়, যা পরে Poeta en Nueva York (নিউইয়র্কে কবি) কাব্য গ্রন্থে প্রকাশিত হয়, তিনি চিত্রকল্প এবং কোলাজ এমন ভাবে বিচ্ছিন্ন আবার একই সঙ্গে সংগ্রথিত করেছেন যে এগুলো সুররিয়ালিস্টিক অভিধা প্রাপ্ত হয়ে উঠেছে। এইসব কথা আমরা আরেকটু বিশদভাবে নিচে বলবো।
উল্লিখিত রচনার বাইরে, লোরকা নাটক লিখেছিলেন, গান বেঁধেছিলেন, ছবি এঁকেছিলেন।

২. জিপসি বালাদ :
লোরকার বালাদগুলোর বিষয় হচ্ছে গ্রানাদার জিপসিদের জীবন, আর মুখ্যভাবে বললে, জিপসিদের প্রবৃত্তি, প্রবণতা, আবেগ। লোরকা নিজে বলেছিলেন, কবিতাগুলো আংশিক জিপসি (algun trozo), এর মধ্যে মূলত রয়েছে আন্দালুসিয়ার প্রবণতা (retabla andaluz)। এদের জীবনে দারিদ্র, অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা তো রয়েছেই, কিন্তু প্রবণতা হচ্ছে : এক ধরণের লোকজ ধর্মবোধ আবার যৌনতা –ভালোবাসা নয় অবদমিত দৈহিক প্রবৃত্তি; এ ছাড়া ওদের মধ্যেকার হিংসা, কলহ, নারী নিয়ে প্রতিযোগিতা, পারিবারিক যৌনতা, খুন। এগুলো বিষয় নিয়ে বলা যে সমস্যা-সংকুল, লোরকা তা জানতেন। হিস্পানিক ঐতিহ্যর মধ্যেকার বালাদ রচয়িতা লোপে দে ভেগা (Lope de Vega) এবং লুইস গঙ্গোরা (Luis Gongora)-র রচনা লোরকা জানতেন। তাই তাঁর রচনা একেবারে প্রচলিত গেঁয়ো ফর্ম নয়;( ১) তিনি গানের ৮ মাত্রা কাহারবার চলন রাখলেন ছন্দে, (২) গল্প-কাহিনীকে কোলাজের মতো করে কেটে-ছেঁদে রহস্যময় করে তুললেন (৩) উপমা-চিত্রপল্পের নিজস্ব ব্যবহার আনলেন (৪) ফ্লামেঙ্কো (flamenco) গানের জগতের দুয়েন্দে (duende)-র ধারণা যতোটুকু পদ্যে আনা সম্ভব তা কবিতায় চারিয়ে দিলেন।
দুয়েন্দে সম্বন্ধে ১৯২২-এ সঙ্গীতকার মানুয়েল দে ফাইয়্যা (Manuel de Falla)-র এক উৎসবে বক্তৃতা দিয়েছিলেন; পরে এই বিষয়ে তিনি দুয়েন্দে-র তত্ত্ব ( Juego y Teoria del Duende, 1933 /”Play and Theory of the Duende”) নামে একটি নিবন্ধও রচনা করেছিলেন। ভারতীয় সঙ্গীতে আমরা যাকে “দরদ” বলি সাধারণ ভাষায়, উস্তাদরা যাকে বলেন, “রুহ্দারী”, সেটাই হিস্পানিক ধারণায় দুয়েন্দে। অর্থাৎ , শিল্প রচনার মধ্যে অনুপ্রে্রণায় আত্মার-ভর-করাকেই দুয়েন্দে বলা যেতে পারে। এ জিনিশ গানে আছে, চিত্রকলাতে আছে, কবিতায়ও ভাবা যেতে পারে। লোরকা চিত্রী যুরবারান (Zurbaran), গইয়্যা (Goya)-র আলো ব্যাবহারের মধ্যে, বাখ (Bach)-এর সঙ্গীতের মধ্যে দুয়েন্দে-র সন্ধান পেয়েছেন। তিনি নতুন যে মাত্রা যোগ করেন সেটা হচ্ছে “মৃত্যুকে টেনে আনা” : হিস্পানিক জীবন ও শিল্পের মধ্যে মৃত্যুর নিঃশব্দ পদচারণা ও তার প্রকাশকেও লোরকা দুয়েন্দে–র অন্তর্গত মনে করেছেন। গানে মীড়-সুরে-তানে যে পারলৌকিক দ্যোতনা আনা যায়; চিত্রশিল্পে আলোর ভেদে, “কিয়ারসোকুরো”-তে যে বোধ–গভীরতা আনা যায়; কবিতায়ও চিত্রকল্প এবং কোলাজ দিয়ে সেই ধরনের তীব্রতা আনা যায় – এইটেই লোরকা করে দেখাতে চেয়েছেন, করে দেখিয়েছেন। এখানেই কবিতা, যদি তা পারে, সার্থক পরাবাস্তবতা ও ম্যাজিক রিয়ালিজমে পৌঁছে যেতে সক্ষম।
লোরকা ১৯২৬ সনে হোরখে গিয়েন (Jorge Guillen)-কে লিখেছিলেন, “আমি মিথ-জগতের জিপসির সঙ্গে একালের সম্যক সাধারণ জিপসির মিশ্রণ ঘটাই, এবং এর প্রয়োগ-ফল অদ্ভূত। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, এ জিনিশটার নতুন সৌন্দর্য আছে। চরিত্রগুলোর যে ছবি আমি আঁকি, আমি চাই, সেগুলো তারা যে জগতে বাস করে তার কল্পছবি হয়ে প্রতিভাত হোক”।
লোরকা ১৮ টি বালাদ লিখেছিলেন। তার মধ্যে ৩ টি কবিতার থিম যৌনতা সংক্রান্ত : ১. প্রেথিওসা ও হাওয়া ২. অবিশ্বাসিনী বৌ ৩. থামার ও আমনন। প্রথম কবিতাটি কবির নিজের কল্পনা-উত্থিত। তরুণী প্রেথিওসা লরেল আর ক্রিস্টাল কাচ লতানো পথে চাঁদের তাম্বুরিন বাজাতে বাজাতে যাচ্ছে । রাত্রি ভরে যাচ্ছে মাছে। আর রিরংসা উন্মত্ত সেন্ট ক্রিস্তোবালেন (ক্রিস্টোফার) হাওয়ার রূপ ধরে এসে বলেন, “তোর ঘাগরা ওঠাই, দেখি তোর পেটের গোলাপ নীল”।

বাজিয়ে চাঁদের আংটা,
প্রেসিওশি আসে বেয়ে –
জাগে হাওয়া তারে দেখে
ঘুমোয় না যারা কখনোই।
ক্রিস্তোবালোন ন্যাংটা
জ্যোতিষ্ক জিভ-ভরা, দ্যাখে
জিপসি বাজায় –
উদাস মধুর বাঁশি।

“মেয়ে, ওঠাই না তোর ঘাগ্‌রা
তোরে দেখি, তোর
পেটের গোলাপ নীল,
মেলি আমার প্রাচীন আঙুলে।”

প্রেথিওসা, পালিয়ে ইংরেজ কনসালের বাসায় আত্মরক্ষা করে। কনসাল তার জন্য এক গ্লাস উষ্ণ দুধ নিয়ে আসেন, যখন বাইরে হাওয়া টিনের চালে উন্মত্ত হয়ে ওঠে। ঘটনাটা কাল্পনিক, কিন্তু উপমা, নাটক এবং সংগীতে (কাহারবা-র চলনে) এবং কোলাজের কৌশলে একটা বিস্তৃত চিত্রকল্প ও ব্যাঞ্জনা সৃষ্টি করতে সক্ষম।
আমার এবং থামনন বাইবেলের গল্প, ভাইবোনের মধ্যে যৌনতা। অবিশ্বাসিনী বৌ, লোরকার বহুল পঠিত বালাদ। রমণীকে জিপসি নিয়ে গ্যালো নদীর ধারে যৌন-বাসনা তৃপ্তির জন্য। কিন্তু, সে কুমারী নয় বুঝে প্রেমে পড়লো না, শুধু সুন্দর একখানা ডালি উপহার দিলো। কাহিনী, লোকজ গানে নয়, চিত্রকল্পে চূর্ণ হয়ে কোলাজে এবং ৮ সিলেবল্‌-এ কি ভাবে রহস্য হয়ে ওঠে সেখানেই লোরকার চারিত্র, গুণ, এবং নিজস্বতা ।
লোরকার নিজের প্রিয় এবং পাঠক মহলে সমধিক পরিচিত বালাদ হচ্ছে, নিশিডাকের বালাদ (Romance Somnabulo) :
সবুজ তোমারে চাই তোমারে সবুজ,
একা তরী সাগরের পার এবং
একলা ঘোড়া পাহাড়ের প্রান্তরে।
স্বপ্ন সে দ্যাখে দোতালায়, সবুজ
মাংশ আর কেশেরা সবুজ –
চোখ তার শীতল রূপোর।
সবুজ তোমারে চাই তোমারে সবুজ।
জিপসি চাঁদের নিচে সবে তারে দ্যাখে,
কিন্তু সে দ্যাখে না কিছুই।

“বন্ধুরে, বদলাতে চাই ঘোড়া
তোমার ভবন বিনিময়ে,
রেকাব বদলে দাও আয়না তোমার,
ছুরির বদলে দাও তোমার তোশক;
কাব্রার গিরিপথ ফেলে মরতে
এসেছি হেথা, বন্ধু !”
“পারতাম যদি আমি, বাছা,
নিতাম তোমার উপহার,
কিন্তু, আমি তো হে নই আমি আর,
বাড়িটিও নয় আর আমার বাড়ি!”
“বন্ধু, মরতে চাই রে হেথা, শান্তিতে
বিছানায় – লোহাগড়া, লিনেন চাদর
ছাওয়া”। দেখছো না ক্ষত!”

বালাদটির শুরু ধুয়া দিয়ে, “সবুজ তোমারে চাই, তোমারে সবুজ”, যা একটি বিমূর্ত বাসনা। এবং এর সঙ্গে-সঙ্গে একটি সাগর এবং একটি পাহাড়ের দৃশ্যের কোলাজ। অতঃপর, যেন কোন শীতল রুপোর চোখ-অলা রমণী ব্যালকনি দোতালায় আধো বাস্তবে, আধো স্বপ্নে। কিন্তু ঘটনাটি একজন জখম হওয়া জিপসির, যে ব্যাল কনির নিচে এসে বলে, সে আহত তার গলায় ক্ষত। সে শুধু শান্তিতে একটি বিছানায়, শাদা-শুভ্র লিনেনে মরতে চায়। সেহেতু সে তার নিজস্ব সব কিছু, ঘোড়া–রেকাবী-ছুরি ইত্যাদি দিতে প্রস্তুত। প্রতিভাত হয়, ব্যালকনিতে যে আছে সে নারী নয়, যে আছে সে পুরুষ এবং জানায় মেয়েটি তার জন্য অপেক্ষা করতো। অতঃপর তারা দুজনে উপরে উঠে যায়। ইতিমধ্যে নিচে সিভিল গার্ডরা এসে দরোজায় কড়া নাড়ে। কাহিনী এই, কিন্তু তার কাব্যিক বুনন, চিত্রকল্প, সংলাপ, আলো–ছায়া রহস্য, নারী-পুরুষের অস্পষ্টতা এবং জিপসি জীবনের অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে এক মূর্ত -বিমূর্ত আধুনিক লিরিক বালাদ তৈরী করেছে যা সম্পূর্ণ লোরকার কৃতিত্ব। ঐতিহ্য অবশ্যই লুকিয়ে রয়েছে, কিন্তু এ কোন গ্রামীণ পাঁচালি নয়।
কাইজ্যা (Reyerta) কবিতাটিতে দুই জিপসি তরুণের মধ্যে ড্যাগারের লড়াই, যার ফলে একজনের মৃত্যু । কিন্তু লোরকা শুরু করেন, খাঁড়ির মধ্যে ছুরি, রক্তের সৌন্দর্যে স্নাত, ঝলসায় মাছের মতো – এখানেও যৌন অনুষঙ্গ। জলপাই গাছের তলায় দুই বুড়ি কাঁদে, কাইজ্যার ষাঁড় দেয়াল ভেঙ্গে ছোটে, কালো ফেরেশতারা বরফ আর পট্টি নিয়ে হাজির, তাদের পাখা বিশাল ছুরির ব্লেডের। যে খুন, তার কপালে বেদানার দানা – এখন সে আগুনের ক্রুশে ছুটে চলে। কাজি এসে বলেন, সেই পুরনো কেচ্ছা : রোমান আর কার্থেজিয়ানদের যুদ্ধ এবং খুন। গল্প জিপসি জীবনের প্রতিহিংসা, খুনোখুনির কিন্তু উপস্থাপন চিত্রকল্পের মধ্যে দিয়ে।
হিস্পানিক সিভিল গার্ডের বালাদ (Romance de la Guardia Civil Espanola) হচ্ছে স্পানীশ সান্ত্রী কর্তৃক জিপসি গোত্রের উপরে ত্রাস, খুন, লুট, ধ্বংস, অত্যাচার – নিরীহদের উপরে অন্যায়ের পরাকাষ্ঠা। যখন জিপসিরা নিজেদের পর্ব, অনুষ্ঠান, আনন্দে নিয়োজিত আসোয়ারি সিভিল গার্ডের দল তলোয়ার নিয়ে তাদের আক্রমণ করলো, ধ্বংস করলো তাদের সন্তদের ছবি-মূর্তি, রক্তাক্ত করলো দৌড়নো তরুণী-বৃদ্ধাদের, হত্যাযজ্ঞের পরে পড়ে থাকলো এক নৈঃশব্দের টানেল। কাহিনী পুরাতন, কিন্তু নির্মাণ, উপস্থাপনা, চিত্রণ – সেখানে লরকার কল্পনা প্রতিভা ছাড়া এ জিনিশ সহজ নয়।

৩. নিউইয়র্কে কবি :
ব্যাক্তিগত কারণে মানসিকভাবে লোরকা যখন কিছুটা বিধ্বস্ত জুন, ১৯২৯-এ, তখন তিনি নিউ- ইয়র্কে আসেন, কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে পড়ার ছুতোয়। ১৯৩০-এ কিউবা, আর্জেন্টিনা বেড়িয়ে স্পেনে ফেরত যান। যান্ত্রিকতার, ব্যবসার, জনসংখ্যার, গতির নিউ-ইয়র্ক লোরকার মোটেই ভালো লাগে নি। এই সময়ে তিনি যা লিখেছিলেন সবই এই নেতি-প্রতিক্রিয়ার। এই কবিতাগুলো তাঁর মৃত্যুর পরে Poeta en Nueva York গ্রন্থ নামে প্রকাশিত হয়। হারলেমের নিগ্রোদের প্রতি তাঁর সহানুভূতি প্রকাশ পেয়েছে হারলেমের রাজার প্রতি বন্দনা কবিতায়, ওয়াল্ট হুইটম্যানকে তিনি বন্ধুবাৎসল্যের সঙ্গে অনুভব করেছেন কিন্তু নিউ-ইয়র্কের (Ciudad sin Sueño/ City That Does Not Sleep) মানুষ ঘুমোতে পারছে না :
কেউ ঘুমোয় না আকাশে। কেউ না, কেউ না,
কেউ ঘুমোয় না।
চাঁদের জন্তুগুলো শুঁকে আর চরে বেড়াচ্ছে কেবিনগুলোয়,
জ্যান্ত ইগুয়ানাগুলো আসবে তাদের কামড়াতে যারা স্বপ্ন দ্যাখে না।
আর মানুষ যারা শটিত কল্জে নিয়ে পালাবে, তারা দ্যাখা পাবে কর্নারে
অবিশ্বাস্য কুম্ভীর নক্ষত্রর প্রতি প্রতিবাদরত।

কেউ ঘুমোয় না আকাশে। কেউ না, কেউ না,
কেউ ঘুমোয় না।
কবরে এক মরা আছে, বহুদূরে,
যে তিন বছর ধরে কেঁদেছে
কেননা তার হাঁটুতে শুকনো চড়া ঠেকেছে ;
আর সেই ছেলেটা যাকে সকালে কবর দিলো, এতো কেঁদেছিলো
যে একটা কুকুর ডাকতে হয়েছিলো তার কান্না থামাতে।

জীবন স্বপ্ন নয়। সাবধান! সাবধান! সাবধান!
আমরা সিঁড়ি ভেঙ্গে পড়ি ভূতলের আর্দ্রতা গিলে খেতে
কেননা বিস্মৃতি নেই, না স্বপ্ন!
অথবা আমরা বরফের ছুরিধার বেয়ে উঠি মৃত ডালিয়ার মর্মরে।
কিন্তু বিস্মৃতি নেই, না স্বপ্ন;
মাংশ আছে। চুম্বন আমাদের মুখ জোড়া দ্যায়
নতুন নাড়ির জটলায়,
আর যার ব্যাথা আছে, সে সারাক্ষণ ব্যথা পাবে,
আর যে মৃত্যুকে ভয় পায় সে কাঁধে করে বয়ে যাবে।
……………
নিয়ে যেতে হবে সেই দেয়ালে যেখানে অপেক্ষায়
সাপ আর ইগুয়ানা,
যেখানে অপেক্ষায় ভালুকের দাঁত,
যেখানে অপেক্ষা করছে বালকের মমি-হাত
এবং উষ্ট্রের রোম খাড়া হয়ে ওঠে বেগুনি-নীল শিহরণে।

কেউ ঘুমোয় না আকাশে। কেউ না, কেউ না,
কেউ ঘুমোয় না।
যদি কেউ চোখ বোজে, চাবুক! ছেলেরা, চাবুক!
ল্যান্ডস্কেপ হোক অবারিত চখের,
আগুনে জ্বলুক ক্ষত তিতো।
পৃথিবীতে কেউ ঘুমোয় না। কেউ না, কেউ না,
আমি আগেই বলেছি।

নিউ ইয়র্ক (New York) কবিতায় সেই একই নগর যন্ত্রণার কথা :
প্রত্যেক দিন তারা নিউ ইয়র্ককে খুন করে,
হাঁস, চার কোটি,
শুয়োর, পাঁচ কোটি,
পায়রা, দু’হাজার মৃত্যুন্মুখদের আনন্দ হেতু,
গরু, এক কোটি,
ভেড়া, এক কোটি,
মোরগ, দু’ কোটি,
যে সব আকাশ টুকরো-টুকরো করে ফ্যালে।
…………
আমি এইসব ফাঁকা অফিসের চক্রান্তকে আক্রমণ করি,
যারা যন্ত্রণা প্রকাশ করে না,
যারা বনাঞ্চলের প্রচেষ্টা বিনাশ করে।
ভক্ষিত হতে আমি আমাকে গো–পালে উৎসর্গ করি
যখন জমিন ভরে যায় হাম্বায়,
যখন হাডসন নদী জমে ওঠে তেলে।

Landscape of a Vomiting Multitude, কবিতায় কোনি আইল্যান্ড-এ সমবেত জনতার ভিড় এবং যান্ত্রিক ব্যবসার মধ্যে তিনি একই অনিকেত নির্বেদ লক্ষ্য করেন শহুরে সভ্যতায়। ১৯২৯-এ লোরকা স্টক মার্কেটের ধস চাক্ষুস দেখেছিলেন। একে অবক্ষয় হিশেবে চিহ্নিত করেছিলেন তিনি কবিতায়। Brooklin Bridge Nocturn, Landscape of the Urinating Multitudes, Christmas on Hudson – সবই লোরকার দৃষ্টিতে নাগরিক অবক্ষয়ের সুররিয়ালিস্টিক চিত্রণ।

৪. মৃত্যু ও গোলাপ :
Oda a Federico Garcia Lorca, পাবলো নেরুদার বিখ্যাত কবিতা। মোটেই সোজা কবিতা নয়, আগা-মাথা-পা সুররিয়ালিস্টিক ইমেজারিতে ভরা। যতোই আপাত অসঙ্গতিপূর্ণ মনে হোক, লোরকার জন্য তীব্র আবেগমথিত কবিতাটি এবং কিছু সঙ্গতি পাঠককে ধরিয়েই দ্যায়। এই কবিতাটির অনুবাদসহ, আমার নিজের লেখা লোরকার উদ্দেশ্যে একটি রচনা নিচে উদ্ধৃত হলো। নেরুদার কবিতাটি সম্পর্কে তাঁর স্মৃতিচারণ শুনুন: “ একাবার আমি গারথিয়া লোরকার ওপর বক্তৃতা দিয়েছিলাম তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পরে। শ্রোতাদের থেকে একজন প্রশ্ন করলো, তোমার “Ode a Federico Garcia Lorca”-তে তুমি কেন বলেছো যে “লোরকার জন্য হাসপাতাল নীল রঙ করে দ্যায়”। “শোন বন্ধু”, আমি বললাম, “কোন কবিকে এই ধরণের জিজ্ঞাসা করা মানে কোন মহিলাকে তার বয়েস জিজ্ঞেস করা। কবিতা কোন স্থির বস্তু নয় বরং একটা গতিশীল স্রোত যা প্রায় সময়ই সৃজকের হাত এড়িয়ে যায়। তাঁর কাঁচা উপকরণ কখনো বস্তুগত জিনিশ আবার তা নয়, যা আছে আবার নেই। যাই হোক আমি আপনাকে সৎ উত্তর দেবার চেষ্টা করবো। আমার কাছে নীল হচ্ছে সবচেয়ে সুন্দর রঙ। মানুষ যখন দ্যাখে তখন তা স্পেসের নির্দেশনা দ্যায়, আকাশের গম্বুজের মতো, মুক্তি এবং আনন্দের দিকে উদ্যত। ফেদেরিকোর উপস্থিতি এক ধরণের আনন্দের মেজাজ তৈরী করতো তার চারপাশে। আমার বাক্যটি হয়তো এই অর্থ দ্যায় যে এমন কি হাসপাতাল, হাসপাতালের বিষণ্ণতাও লোরকার ম্যাজিক বদলে যেতে পারতো, হঠাত করে বদলাতে পারতো অপরূপ নীল দালানে।”

Ode to Lorca
পাবলো নেরুদা
যদি আমি এক নির্জন গৃহের মধ্যে কাঁদতে পারতাম,
যদি আমি আমার চোখ উপড়িয়ে খেতে পারতাম,
আমি তা করতাম তোমার ক্রন্দসী কমলা গাছের কন্ঠস্বরের জন্য,
আর তোমার আচীৎকার উদ্গত কবিতার জন্য।

তোমার জন্য হাসপাতালগুলো নীল রঙ করা,
সব ইশকুল, সাগরতীরের দোকান বেড়েই চলেছে,
আহত ফেরশতারা ছেয়ে যাচ্ছে পালকগুচ্ছে,
বৈবাহিক মাছেরা ঢেকে যাচ্ছে আঁশে-আঁশে,
এবং সজারু উড়ে যাচ্ছে আকাশে:
তোমার জন্য কালো-পর্দা দর্জি দোকানগুলো
ভরছে রক্ত আর চামুচে
গিলছে লাল ফিতে, মরছে চুম্বনে
এবং পরছে শাদা বেশ।

যখন তুমি নীম গাছের পোষাকে উড়তে থাকো,
যখন তুমি ঝড়ের চালের মতো উড়তে থাকো,
যখন গাইবার জন্য নাড়ি আর দাঁত ঝাঁকাও –
গলা আর আঙুল –
তুমি এতো মধুর যে আমি মরে যেতে পারতাম,
লাল লেকের জন্য মরে যেতে পারতাম,
যেখানে হেমন্তের মধ্যে তুমি ছিলে
ওল্টানো ঘোড়া আর রক্তাক্ত দেবতাদের ভিতরে –
আমি মরে যেতে পারতাম কবরখানার জন্য যারা
জল ও সমাধিসহ প্রবহমান ছাই নদীর মতো,
নদী, আহত সৈনিকে ভরা হাসপাতালের মতো গিজগিজে
যা হঠাৎ করে উথলে ওঠে মৃত্যুর দিকে নদীতে
ভরে মার্বেলের নম্বরে, গলিত মুকুটে, সৎকারের তেলে:
মরে যেতে পারতাম দেখবো বলে রাত্তিরে
ডুবন্ত বহমান ক্রুশ দেখে-দেখে – পাড়ে রোরুদ্যমান,
কেননা পরিত্যক্তভাবে, বিক্ষতভাবে তুমি কাঁদছো
মরণের নদীতীরে – ভরন্ত তোমার চোখ
অশ্রুতে, অশ্রুতে, অশ্রুতে।
রাত্তিরে হারিয়ে যাওয়া নিঃসঙ্গ যদি আমি
ধোঁয়া, বিস্মৃতি, অপচ্ছায়া লুটোতে পারতাম
রেলগাড়ি আর জাহাজের থেকে কালো ফানেলে,
দাঁতে ছাই – আমি তাই করতাম
বৃক্ষ যাতে তুমি বাঁচো তার জন্য,
গুল্ম–লতার জন্য – তোমার হাড় ঢেকে-রাখা গুল্ম–লতা,
রাত্রির নিভৃতের সংলাপী।

ভেজা-পিঁয়াজগন্ধী নগর অপেক্ষা করে
তোমার সঙ্গীতোল্লাসের গমনের জন্য,
তোমাকে অনুসরণ করে শান্ত শুক্রাণু নৌকো,
তোমার চুলে বাসা বাঁধে সবুজাভ বাবুই –
শামুক ও সপ্তাহ, তারাও।
গুটানো পাল আর জামরুল গাছগুলো
নিশ্চিতভাবে চরে বেড়ায় যখন তারা দেখতে পায়
তোমার পনেরো চোখ-অলা মাথা
আর খুনে নিমজ্জিত মুখ।

যদি আমি পৌরসভাকে ঝুলে ভরিয়ে
ফেলতাম, এবং ক্রন্দনশীল, ভাঙতাম ঘড়ি –
সে হতো তোমার বাড়ি দেখবার নিমিত্ত যে কখন
আসে গ্রীষ্ম বিধ্বস্ত চোয়ালসহ,
আসে মেহমান মরন্ত পোশাক পরিহিত,
আসে মৃত লাঙ্গল আর গ্যাঁদা ফুল,
আসে গোরখোদক ও অশ্বারোহী,
আসে সমস্ত গ্রহ ও রক্তাক্ত ম্যাপ,
আসে লক্ষীপ্যাঁচা – ছায়াচ্ছন্ন, আসে মুখোশধারী মানুষ
হেঁচড়িয়ে বিশাল ছুরিবিদ্ধ যুবতী,
আসে শিকড়, শিরা, হাসপাতাল,
বসন্ত এবং পিপড়ে,
আসে যামিনী বিছানাসহ যেখানে একজন
নিঃসঙ্গ দস্যু মাকড়াসার মধ্যে মরে যাচ্ছে,
আসে ঘৃণাসহ গোলাপ এবং আলপিন,
আসে একটি হলদেটে ঘট,
আসে দিন বাতাসের একটি শিশু নিয়ে,
আসি আমি, সঙ্গে অলিবিয়ের, নোরা,
বিথেন্তে আলেইহান্দ্রে, দেলিয়া,
মারুকা, মালবা, মারমা, মারিয়া লুইসা ই লোরকো,
লা রুবিয়া, রাফায়েল উগারতে,
কোতাপস, বেবে, মানোলা আলতোগিয়ের্‌রে,
মোলিনারি,
রোজালেস, কনচা মেন্দেজ,
এবং অন্যান্যরা যাদের আমি ভুলে গিয়েছি।

এসো তোমাকে মুকুট পরাই, সুস্বাস্থ্য ও
প্রজাপতির তরুণ, বিশুদ্ধ তরুণ
কালো বিদ্যুতের মতো চিরন্তন মুক্ত;
শুধু তোমার আমার মধ্যে
এখন যখন পাথরের কাছে কেউ নেই
এসো তুমি আর আমি কথা বলি ঠিক
তোমার আমার চরিত্রানুযায়ী:
কবিতা কি যদি তা না সেই রাত্রির জন্য যার মধ্যে
তিক্ত এক ছুরি তোমাকে আমাকে খুঁজে পায়,
সেই দিনের জন্য, সেই সন্ধ্যার জন্য, সেই
ভাঙা কোণার জন্য যেখানে মানুষের
বিধ্বস্ত হৃদয় মরার জন্য প্রস্তুতি নেয়।

সব কিছুর ওপরে রাত্রে,
রাত্তিরে তারা আছে,
সবই নদীর ভিতরে
দরিদ্র বাড়ীর জানালায় ঝোলানো ফিতের মতো।
হয়তো অদের কেউ মরেছে,
হয়তো চাকরী হারিয়েছে অফিসে,
হাসপাতালে, এলিভেটরে, খনিতে,
ভয়ানক আহত মানুষ ভুগতে থাকে
আর সর্বত্রই প্রতিবাদ ও কান্নাঃ
যখন অনন্ত নদীর মধ্যে বইছে নক্ষত্র
তখন জানালা ভরে কান্না,
চৌকাঠগুলো ক্ষয়ে যাচ্ছে কান্নায়,
শোবার ঘরগুলো ভিজে যাচ্ছে কান্নায়,
যারা ঢেউ-স্বরূপ হয়ে কার্পেট কামড়াতে আসছে।

ফেদেরিকো,
পৃথিবী দ্যাখো, রাস্তা,
ভিনিগার,
ট্রেন স্টেশনে বিদায়
যখন ধূম্র সিদ্ধান্তশীল চাকাগুলোকে
মেলে ধরে সেইখানে যেখানে কিছুই নেই
শুধু বিচ্ছেদ, পাথর ও রেল লাইন ছাড়া।
এতো মানুষ শুধু জিজ্ঞেস করছে সর্বত্র।
রক্তাক্ত অন্ধ, বদরাগী, আর হতাশাগ্রস্থ,
দুর্ভাগা, কাঁটাগাছ এবং
সন্ত্রসী যার পিঠে ঈর্ষা ।

জীবন এরকমই, ফেদেরিকো,
এইখানে জিনিশ যা আমার বন্ধুত্ব দিতে পারে –
তুমি তো নিজেই কতো কিছু জানো,
অন্যরা আস্তে আস্তে জানবে।

পাতাল থেকে লোরকা

ওমর শামস
Life is no dream! Beware and beware and beware!
We tumble downstairs to eat of the damp of the earth —-
——- and let there be seen in the moon
The perfidious goblets , the theater’s skull, and the bane.
—— Federico G. Lorca
১.
ধ’সে পড়ি, ধ’সে পড়ি প্রগাঢ় পাতালে, আমি বলেছিলাম!

যখন শ্যাওলাদীর্ণ দেয়ালের সামনে গুলি করা হলো,
আমরা ধ’সলাম – দেয়াল-দেহ-স্বপ্ন-গম্বুজ – গ্রানাদার তলে।
ঝ’রে পড়লো আমার পিয়ানোর পাপড়ি, বালাদের বেলফুল,
জ্বল্‌জ্বলে জরি – রক্তাক্ত জিপ্‌সির ঘাগরার থেকে।

ধ’সলাম, ধ’সলাম গ্রানাদার তলে;
কি কালো বেদনার জলপাই! ঝর্‌লো, ঝর্‌লো।

আহা! আমার শুভ্র মেষ!
আহা! আমার অনিক্স শিঙয়ের, শ্বেতপালকের, রূপোর খুরের শুভ্র মেষ!
সুরেলা সবুজের অনন্তর মধ্যে শাদা কার্পাসের মেষ, চর্‌ছিলো।
কালো এক কোত্থেকে ফেরেশ্‌তা, কি বিস্তীর্ণ পাখার পালকে
ঢেকে ফেললো সূর্য, সব রশ্মি;
আর চিতার পাহাড় থেকে নেমে এলো
উদ্ভ্রান্ত, মাতাল, দাঁতাল শুয়োর –
এক পাল ছুটে-ছুটে বল্লমে দীর্ণ ক’রে গ্যালো একখানা শাদা পালকের হৃৎপিণ্ড।

খ’শে পড়ি, খ’শে পড়ি
খোশা থেকে মেদ, খ’শে পড়ি
হাড় থেকে মাস, খ’শে পড়ি –
আন্ধারে কাঁচপোকা চোখ কুরে খায়।

অন্ধকারে সিংহ আসে খেতে যকৃৎ, ফুস্‌ফুস, সবুজ প্লীহারে।
বলি নিকি, আস্‌বে-আস্‌বে ওরা – আর্ডভার্ক, ইগুয়ানা খাব খেতে –
তোমাদের স্বপ্ন সব কুচি-কুচি ক’রে খেয়ে যাবে,
বাজের বাতাসে স-ব খোয়াবনামার পাতা উড়ে যাবে, বলি নিকি!

এখানে অনন্ত রাত, অ্যালার্মে অখণ্ড নিনাদ, আর তমসা পাঠায় পিণ্ড ,
পিপীলিকা, নেকড়ে, নেউল, চিল – অজস্র ।

একটি বিষ পিঁপড়ে কামড়ে দিয়েছিলো আমার গ্রীবার আঁচিলে –
বিভা ও বিষাদ, গল্‌গল ক’রে বেরোলো – একটি অসমাপ্ত বালাদ :
সেই হলুদ ঘাগরা-পরা বার্সিলোনার মেয়ে যে ভালোবাসা প্রত্যাশা করেছিলো,
কিন্তু পায়নি : চোখের সুর্মা, কর্সেটের ফিতে, পায়ের মল –
তার কাহার্‌বা – নাকে ধিন্‌ ।

খান্‌-খান্‌ চিৎকার! দু-গজ দূরের বালক, তার হাত ঠেকেছে প্রকাণ্ড পাথরে,
সে কি ক’রে পাবে তার স্বপ্নের মেঘ, কদ্‌বেল, মার্বেল
ক-বে হারানো ঘুড়ি?

নিনাদ-কান্নার মধ্যে অশনির মতো ছুটে যায় এক অন্ধকারের মা,
তার ছেলে যুদ্ধ করছে ফ্রন্টে ; আজ আলমেরিয়ায়, কাল বৈরুতে – তাকে বাঁচাতে।

পিয়ানোর রীড থেকে লাল, আর্ত বেসুন,
ঝ’রে পড়ে, ঝ’রে পড়ে খুন –
জাগুয়ার আর ইগুয়ানা গর্জায় – শুঁকে-শুঁকে আসে থাবায়
আমাদের খণ্ডিত, অসমাপ্ত খাব, খাবনামা ছিঁড়ে-ছিঁড়ে, গিলে-গিলে খায়।

২.
রাফায়েল, আলেহান্দ্রে, পাবলো, সেজার তোমরা শুনতে পাও,
শুনতে কি পাও পাতালের ধ্বনি? মিগেল হের্‌নান্দেস,
আহা! তুমি চ’লে গেছ সেই স্কাইলার্কের পিছু-পিছু –
ডালে উঠে যার ডাক তুমি দিয়েছিলে – কুহু-কুহু – মনে পড়ে!

থাক, থাক – স্বপ্নের কবুতর তবু তোমাদের কাছে থাক,
ডাকুক স্বপ্নের ফেরিঅলা, উড়ুক খোয়াবনামা,
বসুক শিমূল ডালে বিল থেকে বক – উত্তুঙ্গ মেঘ।
আহা, স্বপ্ন তবু তোমাদের কাছে থাক –
এলাচির বোয়েমে, কি বালিশের গিলাফে, আঁচলের গিঁটে –
ডম্বরু তাণ্ডবে বাজবেই – বাজুক তোরাবোরা-ফালুজায়-সদ্যোত্থিত-দ্বীপে।

আমি কান পেতে থাকি, শোনাও-শোনাও তোমাদের সদ্যতম শ্লোক :
কি লিখেছ আলেহান্দ্রে, পাবলো নেরুদা,
কান্টো, কি নতুন গজল্‌, স্বপ্ন জ্বল্‌জ্বলে?
কি লিখেছে কবিকুল, অন্যান্য ভাষার?
বর্ণ-স্বর-স্বপ্ন যার অনাবিষ্কৃত পাখি, ফুল, অচেনা অর্কিড।
শোনাও, শোনাও – আমি কান পেতে থাকি।

হাড় শির্‌-শির্‌ করছে,
চোখ, গ্রানাদার ক্ষেত খুঁড়ে-ফুঁড়ে আকাশ দেখতে পাচ্ছে,
মরা ডালে কি আবার শিষ ধ’রলো?

বুক জুড়ে গ্যালো। আহা! কবিতা কি, যদি তা নতুন প্রজাপতি না ডেকে আনে?
যদি না আসহকলার অতীত কোন রঙ দ্যায় আকাশে?
যদি না হাসি ফোটাতে পারে একটি সবুজ শিশুর, হারিয়ে দিতে পারে মৃত্যু?
Verde que te quiero verde
সবুজ, তোমারে চাই, তোমারে সবুজ
হাওয়ারা সবুজ আর শাখারা সবুজ ।
এই তো আমার বুকের পাশেই গীটার ; অন্ধকারের মৃত স্বপ্ন ফেলে
আমি জীবন্ত, অনন্ত স্বপ্নের কাছে আসছি, আমি আসছি —
Yo vengo ! আমি এসেছি।

[ উপরের কবিতাটি আমার নিজের, লোরকা-র স্মৃতিতে ]

৫. বন্ধু আলবের্তি, আলেইহান্দ্রে, নেরুদা-র স্মৃতি:
৫.১ রাফায়েল আলবের্তি:
রাফায়েল আলবের্তি লোরকা-র স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন (The Lost Grove (trans. Gabriel Berns), Berkeley and Los Angeles: University of California Press ) :
“মুহূর্ত অবশেষে এলো, হেমন্তের এক বিকেলে। গ্রেগোরিও প্রিয়েতো, যিনি সাম্প্রতিক একটি চিঠিতে আমাকে স্মরণ করালেন, তিনি আমাকে গ্রানাদার কবির সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিলেন। আমরা ছাত্র-হলের বাগানে ছিলাম যেখানে গারথিয়া লোরকা আইনজ্ঞ হবার উদ্দেশ্যে পড়াশুনা করছিলেন কয়েক বছর। অক্টোবর, কবি গ্রানাদার থেকে সদ্যই ফেরত এসেছিলেন। তিনি ছিলেন শ্যামলা, জলপাই-রঙ ত্বক, কপালের উপর এক ঝুঁটি চুল। চোখ তার জ্বল-জ্বল করছিলো, আর তার মৃদু মুখাভাস যে কোন মুহূর্তে অট্টহাসির প্রাণখোলায় পরিণত হতে পারতো। সে দেখতে যতোটা জিপসি ছিলো তার চেয়ে বেশি ছিলো গ্রামীণ – সংস্কৃতি এবং খর্বতা দুটোই মেশানো, একান্তই আন্দালুসের মাটির থেকে জাত। আমাকে আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলো – হাসি আর উচ্ছ্বসিত অঙ্গভঙ্গি করে। সে জোরের সঙ্গে বলল যে আমাকে চেনে এবং আমার পরিবারের গ্রানাদার আত্মীয়দেরও সে জানে।…
সেই রাতে ছাত্রাবাসে, তার কিছু বন্ধুসহ যাদের মধ্যে ছিলো লুইস বানুয়েল, – তখনো ফিল্ম ডিরেক্টর হিশেবে খ্যাত নয় – মালাগার থেকে হোসে মারানো ভিয়্যা, আরেকজন পাতলা মত তরুণ যার সোনালি অদ্ভুত হাস্যকর ছোট্ট গোঁফ ছিলো – নাম পেপিন বেল্লা – যাকে শুরুর থেকেই আমার ভীষণ ভালো লেগেছিলো। ডিনারের পরে আমারা গেলাম বাগানে, সুন্দর পপলার গাছে ঘেরা এবং যার ভিতরে কানালিয়্যা থেকে আসা সরু খাল, যার পাশে ওলিয়্যান্ডার আর জেসমিন ঝোপ ঢেউয়ে-ঢেউয়ে ছাত্রদের ঘরের পাশে গজানো। আমি ফেদেরিকো-কে কবিতা পড়তে কখনো আগে শুনি নি, কিন্তু তার সুপাঠের খ্যাতি ছিলো। তার সুখ্যাতির কারণ যে যথেষ্ঠ, তা আমি বুঝলাম। গারথিয়া লোরকা তার সাম্প্রতিক জিপসি বালাদ, যা সে গ্রানাদার থেকে নিয়ে এসেছিলো, সেটা পড়ে শোনালো:
সবুজ তোমারে চাই, তোমারে সবুজ
অবিস্মরণীয় আমদের রাতের সম্মিলন। ফেদেরিকো যাই করছিলো, তার মধ্যে কিছু যেন অদম্য – ম্যাজিক, দুয়েন্দে – ছিলো। যে তাকে একবার দেখেছে, শুনেছে সে কি করে তাকে ভুলবে?”

৫.২ হোরখে আলেইহান্দ্রে :
লোরকার সমকালের, সমবয়সী কবি হোরখে আলেইহান্দ্রে তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন। জিপসি বালাদ রচনাকালে তাঁদের মধ্যে যেসব চিঠি আদান-প্রদান হয়, তার থেকে লোরকার ৩টি চিঠির প্রাসঙ্গিক অংশ নিচে মুদ্রিত হলো।
. (মার্চ ২, ১৯২৬) : আমি জিপসি বালাদ শেষ করছি। নতুন থিম যদিও পুরনো প্রসঙ্গ। সিভিল গার্ডরা আন্দালুসিয়ায় ঢুকে বেরিয়ে যায়। আদিরসাত্মক বালাদ : অবিশ্বাসিনী বৌ অথবা হাওয়া ও প্রেথিওথা (প্রিকোসিয়া), তোমাকে পড়ে শোনাতে চাই। হাওয়া ও প্রেথিওথা, জিপসি গাথা আমার নিজের উদ্ভাবন। বইয়ের এই অংশে, আমি মিথ-জগতের জিপসির সঙ্গে একালের সম্যক সাধারণ জিপসির মিশ্রণ ঘটাই, এবং এর প্রয়োগ-ফল অদ্ভূত। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, এ জিনিশটার নতুন সৌন্দর্য আছে। চরিত্রগুলোর যে ছবি আমি আঁকি, আমি চাই, সেগুলো তারা যে জগতে বাস করে তার কল্পছবি হয়ে প্রতিভাত হোক এবং তাতে বালাদগুলো টানটান আর পাথরের মতো পোক্ত হয়ে উঠবে। আমি দেড় মাস ধরে এক্সক্সক্স বালাদটি লিখেছি, …… কিন্তু আমি খুশি । বালাদ বাঁধা হয়েছে। জিপসির মুখ থেকে যে খুন বেরুচ্ছে, তা আর রক্ত নয় …… সেটা হাওয়া!
এটা বালাদের বই হবে, কেউ বলতে পারে আন্দালুসিয়ার কাব্য। অন্তত পক্ষে তাই! আমার প্রতি আন্দালুসিয়া মুখ ফেরায় না …… ।
. (নভেম্বর ৮, ১৯২৬) : আমি নিশ্চিত হতে চাই যে তোমাকে “সিভিল গার্ডের বালাদ” পড়ে শোনাবো, যা আমি এখন লিখছি। আমি এতদূর করেছি। সিভিল গার্ডরা এসে নগর ধসিয়ে ফেলেছে। পরে গার্ডরা ব্যারাকে ফিরে গিয়ে সেখানে কাযাল্লা-র সঙ্গে মদ্যপান করে, জিপসিদের মৃত্যু কামনা করে। লুট-ধ্বংসের বর্ণনা বিশাল হবে। নিজেরা না জেনেই তারা রোমান যোদ্ধা বনে যাবে। বালাদটি লম্বা কিন্তু শ্রেষ্ঠ হবে। সিভিল গার্ডদের শেষ দৃশ্য দুর্দান্ত হবে।
যখন এটা এবং জিপসি সাধু ওলায়া-র বালাদ শেষ হবে, তখন বইটা পুরো হবে। আমার মনে হয়, ভালো বই। এর পরে, এই বিষয় আমি আর ছোঁবো না, কোনদিন না! কোনদিন না!
৩. হোরখে গিয়েন-কে লেখা চিঠি (১৯২৭) : “জিপসি মিথ ব্যাপারটা আমাকে কিছুটা বিরক্ত করে। এটা আমার জীবন এবং চরিত্রকে বিমূঢ় করে দ্যাখায়। আর সেটা আমি মোটেও চাই না। জিপসিরা একটা থিম আর কিছু না। আমি তো সেলাইয়ের সুচ কিম্বা জলসেচ-প্রান্তরের বই লিখতে পারতাম। তা ছাড়া, এই জিপসিপনা আমাকে অশিক্ষিত, গেঁয়ো এবং প্রিমিটিভ কবি হিশেবে দ্যাখায়, যা তুমি জানো আমি মোটেই নই।”
৫.৩
পাবলো নেরুদা :
আত্ম-জীবনীতে পাবলো নেরুদা, ফেদেরিকো গারথিয়া লোরকা সম্বন্ধে স্মৃতিচারণ করেছেন : “আমি দেখেছি, স্পেনের এক মিলিয়ন মানুষ মৃত। এক মিলিয়ন নির্বাসিত। মনে হচ্ছিলো মনুষ্যজাতির বিবেক থেকে একটা রক্তাপ্লুত কাঁটা কোনদিন তুলে ফ্যালা যাবে না। তবু, এখন যে সব ছেলেরা মুরিশ গার্ডের সামনে মার্চ করে যাচ্ছে, তারা সেই যুদ্ধের মর্মান্তিক সত্য কথা জানে না। আমার জন্য এর শুরু ১৯৩৬ এর অগাস্ট ১৯। একজন অভিজ্ঞ চিলিয়ান, ববি দেগলান, মাদ্রিদের সির্কো প্রিসে এরিনা-য় কুস্তির প্রমোটার ছিলো । এই খেলা নিয়ে আমার কিছু সংশয় ছিলো, কিন্তু সে আমাকে বোঝালো – গারথিয়া লোরকাকে নিয়ে এরিনা-য় সেই সন্ধ্যায় আসতে, দেখার জন্য যে এই স্পোর্ট কতোটা গুণসম্পন্ন। আমি লোরকাকে রাজি করালাম এবং নির্ধারিত সময়ে ওখানে মিলিত হবার কথা ঠিক করলাম। মুখোশধারী “ট্রোগলোডাইট” আর “আবিসিনিয়ান গলাচিপা”-র মধ্যে মজার যুদ্ধ এবং “ভূতুড়ে ওরাংওটাং” দেখবার জন্য। ফেদেরিকো আসে নি। সেই মুহূর্তে, সে তখন মৃত্যু পথের যাত্রী। তারপর আমাদের আর দ্যাখা হয় নি, তার তারিখ ছিলো অন্য ঠগীর সঙ্গে। আমার কবিতাকে-বদলে-দেয়া স্পানীশ গৃহযুদ্ধ, আমার জন্য শুরু হয়েছিলো একজন কবির অন্তর্ধান দিয়ে।
আহা, কি কবি! ওকে ছাড়া অন্য কারুর মধ্যে এমন শীল, জিনিয়াস, খরদীপ্তি, ডানাওলা-মন-সহ একটি ক্রিস্টাল-হৃদয়-ঝর্ণার সমাহার আমি দেখি নি। ফেদেরিকো গারথিয়া লোরকা ছিলো বাঁধন–ছেঁড়া “দুয়েন্দে”, তার ছিলো এক চুম্বুক-স্পন্দন যা তার হৃদয়ে জাগাতো জীবন-ফুর্তি, বিকীরণ ঘটাতো প্লানেটের মতো। খোলা মনের, কমিকাল, মাটির এবং মফস্বলের, এক আশ্চর্য সংগীত-ট্যালেন্ট, অপূর্ব “মাইম”, সহজেই ভীতু এবং কুসংস্কারগ্রস্থ, নূরানী এবং মহৎ – সে ছিল যুগ-যুগের গণ–সংস্কৃতির স্পেনের চূড়ামণি। আরব-আন্দালুসিয়ার শিকড় থেকে থেকে জ্বলে উঠেছিলো, জেসমিনের মতো খশ্‌বুতে ভরিয়ে দিয়েছিলো স্পানীশ স্টেজ, হায়! যা আজকাল চিরদিনের জন্য অন্তর্হিত।
উপমার ওপরে গারথিয়া লোরকার মারাত্মক দখল আমাকে বশীভূত করেছিলো। তার দিক থেকে, অনেক সময় সে আমাকে আমার সাম্প্রতিক কবিতা পড়তে বলতো, আর পড়ার মাঝপথে চেঁচিয়ে উঠতো : “ থামো, থামো, আমি নিজেকে তোমার দ্বারা প্রভাবিত করছি।”
……………
ফেদেরিকো তার মৃত্যুর আভাস পেয়েছিলো। একটা থিয়েটার ট্যুর থেকে ফিরে সে আমাকে ফোন করেছিলো এক অদ্ভূত ঘটনার কথা বলতে। লা বার্রাকা ট্রুপের সঙ্গে সে ছিলো; কাস্টিল এলাকায় শহরতলীতে একটা গ্রামে ওরা ক্যাম্প করেছিলো। ট্যুরের চাপে ক্লান্ত ফেদেরিকোর ঘুম আসছিলো না। ভোরে উঠে সে বাইরে ঘুরতে গিয়েছিলো। শীত, ছুরির মতো শীত ছিলো, কাস্টিল যা বহিরাগতদের জন্য জমিয়ে রাখে। কুয়াশা, শাদা দলায় জট হয়েছিলো, সব কিছুকে ভূতুড়ে বানিয়ে।
বিশাল জং ধরা লোহার জালি। ভাঙ্গা মূর্তি, স্তম্ভ পড়েছিলো নষ্ট পাতার ওপর। একটা জমিদার গোছের বাড়ির সামনে পার্কে ঢোকার গেটে ও দাঁড়িয়েছিলো। এর পরিত্যক্ত অবস্থা, সেই সময় এবং শীত নির্জনতাকে আরো তীব্র করে তুলেছিলো। ভোরের মধ্যে কিছু ঘটবে, এই আশংকায় ফেদেরিকোর মনে ফাঁপর এলো। সে একটা ভাঙ্গা পিলারের চূড়ার ওপর বসে পড়লো।
ভাঙ্গা স্তূপের মধ্যে লতা-পাতা সরিয়ে একটা ছোট মেষ শাবক এলো অজানা থেকে, নৈঃশব্দকে কিছুটা সহনীয় করে – যেন নির্জনতার ওপর একটা পাপড়ি ঝরে পড়লো। কবিকে তখন একা-একা মনে হলো না। হটাৎ করে একদল বুনো শুয়োর হাজির হলো ঐ জায়গায়। চার, পাঁচটা জন্তু ছিলো –অর্ধেক বুনো – পাশবিক ক্ষুধার্ত আর পাথরের মতো তাদের ক্ষুর। তারপর ফেদেরিকো একটা খুন-জাগানিয়া দৃশ্যের সম্মুখীন হলো। শুয়োরগুলো মেষ-শিশুটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং কবি ভয়ে দেখল যে, টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে তারা ভক্ষণ করলো।
এই রক্তক্ষয়ী ঘটনায়, ফেদেরিকো সঙ্গে-সঙ্গে তাদের দলকে নিয়ে আবার রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো। গৃহযুদ্ধের তিন মাস আগে, যখন সে আমাকে এই ঘটনা বলেছিলো, ফেদেরিকো তখনও এই ভয়াবহতায় অস্থির ছিলো। পরে আমি ধীরে ধীরে বুঝেছিলাম যে এই ঘটনা আসলে তার নিজের মৃত্যুর পূর্বাভাস ছিলো। ফেদেরিকো লোরকাকে শুধু গুলি করা হয় নি, তাকে হত্যা করা হয়েছিলো।”

৫. নির্যাস :
কীটস-এর মতো লোরকা-ও তরুণ বয়সে ঝরে যাওয়া এক কবি। কিন্তু নিজস্ব স্থান আছে। জিপসী বালাদগুলোতে একটি বিশেষ গোত্রের জীবনের সংকট ও উদ্দীপনা উভয়ই প্রকাশ করেছেন। গীতিকবিতার সঙ্গে কাহিনীআভাসকে চিত্রকল্পের মধ্যে দিয়ে ফুটিয়েছেন। দ্বিতীয় পর্বে নগরজীবনের অশান্তিকে অদ্ভুত সব উপমা দিয়ে চিত্রিত করেছেন। তাঁর ইউনিক কাব্য চারিত্রকে অস্বীকার করবার উপায় নেই।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com