হুমায়ূননামা

কামরুল হাসান | ১৩ নভেম্বর ২০১৬ ১:১৯ পূর্বাহ্ন

Humayunইতিহাসের পাতায় যে-হুমায়ুন আমাদের প্রথম নাড়া দিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি বাবর পুত্র হুমায়ুন। একবার কঠিন অসুখে পতিত হলে ভারতবর্ষে মোঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবর সৃষ্টিকর্তার দরবারে প্রাণপ্রিয় পুত্রের জন্য আকুল প্রার্থনা জানিয়েছিলেন, যেন তার নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও পুত্রের জীবন রক্ষা পায়। ঘটেছিলোও তাই। হুমায়ুন ধীরে ধীরে আরোগ্যলাভ করেন আর বাবর শয্যাশায়ী হন। সেটাই ছিল বাবরের অন্তিম শয়ান। সম্রাটরা সাধারণত খুব একটা দয়ালু হন না, নিষ্ঠুর সব যুদ্ধে সংখ্যাতীত মানুষের রক্তভেজা প্রান্তরের ওপর দিয়ে বিজয়ের রথ চালিয়ে তারা সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। তাই সম্রাট-হৃদয় পাষাণে গড়া; কিন্তু সম্রাট যখন পিতা, তখন তিনি স্নেহার্দ্র। বাবরের প্রার্থনা ইতিহাসের পাতায় সন্তানের জন্য পিতার আত্মোৎসর্গের এক অনুপম দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

আরেক হুমায়ুন ভারতবর্ষের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি হুমায়ুন কবির। ছাত্রজীবনে অসামান্য মেধাবী মানুষটি শেরে বাংলার কৃষক-প্রজা পার্টি দিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করলেও পরবর্তী সময়ে জওহরলাল নেহেরু এবং লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মন্ত্রীসভায় শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। ব্রিটিশ পরবর্তী ভারতে শিক্ষানীতি ও শিক্ষা-কাঠামো নির্মাণে তাঁর সবিশেষ অবদান রয়েছে। কৃষক-শ্রমিকের কল্যাণকামী মানুষটি ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, ছিলেন বিধানসভা ও রাজ্যসভায় একাধিকবার নির্বাচিত সদস্য। এবং এক সময় মওলানা আবুল কালাম আজাদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তবে তার সাথে আমাদের পরিচয় রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, কবি হিসেবে। শৈশবে পাঠ্যবইয়ের পাতায় তাঁর কবিতা আমরা পাঠ করেছি সাগ্রহে, পরিণত বয়সে তাঁর প্রবন্ধ আমাদের চেতনা ও উপলব্ধির জগৎকে সমৃদ্ধ করেছে।

তৃতীয় হুমায়ুনও একজন কবি, তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তরুণ, মেধাবী শিক্ষক। প্রথম কাব্য কুসুমিত ইস্পাত লিখে সমীহ জাগিয়েছিলেন বোদ্ধা মহলে। বিপ্লবী চেতনার কারণেই জড়িয়ে পড়েছিলেন গোপন সশস্ত্র রাজনীতির সাথে। সরাসরি নন, একটি গোপন সশস্ত্র রাজনৈতিক দলের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং সেটা সম্ভবত ঘটেছিল তাঁর একজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের ওই দলটির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততার কারণে। যদি ঘূর্ণাক্ষরেও জানতেন না তিনি একদল বোধহীন, ভ্রান্তস্বপ্নবিলাসী অতিবিপ্লবীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন, তাহলে সে পথ হয়তো মাড়াতেন না। ইন্দিরা রোডের বাসা থেকে ডেকে এনে সমুখের পার্কটির অন্ধকারে তাকে হত্যা করে পূর্বপরিচিত ‘কমরেডগণ’। ইস্পাতকঠিন এক মেধাবী কুসুমের অকালমৃত্যু ঘটে। মনে পড়ে, তাঁর মৃত্যুতে লেখা ফরহাদ মযহারের কবিতা- ‘আমি ডেকে বলতে পারতাম, হুমায়ুন’-এর কথা।

চতুর্থ হুমায়ুন বাংলা ভাষার এক বিরল প্রতিভা, ক্ষণজন্মা পুরুষ। তিনি হুমায়ুন আজাদ। একদিকে ভাষাবিজ্ঞানী, অন্যদিকে শাসন করেছেন সাহিত্যের জগৎ। ইনিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। কলমকে লাঙল বানিয়ে কেবল মুগ্ধ চাষার মত বাংলা সাহিত্যের প্রান্তরে সোনার ফসল ফলাননি, তাকে সত্যিকারের এক তরবারি বানিয়ে ছিন্নভিন্ন করেছেন অজ্ঞতা আর পশ্চাৎপদতার সকল আবরণ। ক্ষুরধার, যুক্তিপূর্ণ লেখনির মাধ্যমে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন করে দিচ্ছিলেন। সত্যপ্রকাশে অকুতোভয় সব্যসাচী এই লেখক মৌলবাদী চেতনার যুক্তিহীন অন্ধত্ব, স্বদেশ ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচক ছিলেন। এটা তিনি করেছিলেন স্বদেশ, মানুষ ও বিজ্ঞানের প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসা থেকে। এটা সহ্য হয়নি মৌলবাদী শক্তির। একুশে বইমেলা থেকে বাড়ি ফেরার পথে ঘাতকরা তাকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করে। সে যাত্রা প্রাণে বেঁচে গেলেও ঐ ঘৃণ্য আঘাতের কারণেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে অনাথ করে অকালে চলে যান না-ফেরার দেশে। যে-ধর্মান্ধ, অবিবেচক সন্ত্রাসীদল প্রতিভাপূর্ণ মানুষটিকে আঘাত করেছিল তাদের দশ সহস্রকে একত্রিত করলেও একজন হুমায়ুন আজাদ সৃষ্টি হবে না।

পঞ্চম হুমায়ূন সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যের রাজপুত্র, ইতিহাসের হুমায়ুনের মতই। স্বাধীনতার পরপরই তার যুগল উপন্যাস নন্দিত নরকে এবং শঙ্খনীল কারাগার প্রকাশিত হবার ক্ষণ থেকে পরবর্তী চল্লিশ বছর ধরে তিনি পাঠকমহলে একচ্ছত্রাধিপতির আসনেই বসেছিলেন। একটা সময় ছিল যখন দুই হুমায়ুন– হুমায়ূন আহমেদ এবং হুমায়ুন আজাদ মিলে শাসন করেছেন একুশের বইমেলা। বইমেলার প্রথম কিছু বছর কবিতা রাজত্ব করলেও পরে কথাসাহিত্যের তুমুল জনপ্রিয়তার কাছে কবিতা টিকতে পারেনি। তখন বইমেলার দুই রাজা ছিলেন কবি শামসুর রাহমান এবং কবি নির্মলেন্দু গুণ। যেহেতু হুমায়ূন আহমেদ জনপ্রিয় ধারার ঔপন্যাসিক, তাঁর সঙ্গে বিক্রি ও পাঠকপ্রিয়তায় পেরে ওঠেননি হুমায়ুন আজাদ। হুমায়ূন আহমেদের এই জনপ্রিয়তা এমনই ছিল যে সম্ভবত তাঁর একার যত বই বিক্রি হতো, অন্য সকল লেখক মিলে তত বই বিক্রি হতো না। তাঁর বই বিক্রি করে বেশ কিছু প্রকাশক রীতিমত বিত্তবান হয়েছেন। হুমায়ূন আহমেদের একটি পাণ্ডুলিপি পাওয়ার জন্য প্রকাশক অগ্রিম গাড়ি কিনে দিয়েছেন– এমন ঘটনাও ঘটেছে; অথচ একটি রঙিন টেলিভিশন কেনার জন্য তিনি, হুমায়ূন আহমেদ, প্রথম টিভি নাটকটি লিখেছিলেন। তিনি বইমেলায় এলে পাঠকের ভীড়ে বুকস্টলে ঢোকা যেত না, তিনি হাঁটলে পেছনে ভক্তদের একটি মিছিল তৈরি হতো। সাহিত্য রচনা করে শুধু জীবনধারণ নয়, ধনাঢ্যও যে হওয়া যায়– এ দৃষ্টান্ত হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশে প্রথম তৈরি করেছেন। বস্তুত আমাদের লাখো টাকার বইমেলাকে একশ কোটি টাকার বইমেলায় রূপান্তরিত করার মূল কৃতিত্ব তাঁর জাদুকরী সাহিত্যের। টিভিনাটকের প্রতি দর্শক আগ্রহের জোয়ারও তাঁরই সৃষ্টি। একক মানুষ হিসেবে এমন কৃতিত্ব বিস্ময়কর!

কেবল উপন্যাস নয়, ছোটগল্প, নাটক, চলচ্চিত্র– যেখানে তিনি হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলেছে। সকলের প্রত্যাশাকে তিনি শুধু ছাড়িয়ে যাননি, বিমূঢ় করে রেখেছেন। আমরা মুগ্ধবিস্ময়ে এক মহীরুহের উত্থান দেখেছি, দেখেছি মেধার স্পর্ধায় আকাশ ছোঁয়াকে। তাঁর মেদুর উপন্যাসগুলো যখন একঘেঁয়ে হয়ে উঠছিল তখন সৃষ্টি করলেন হিমু, মিসির আলির মতো কিছু অবিস্মরণীয় চরিত্র, চলে গেলেন সায়েন্স ফিকশনের মিশোলে এক রহস্যময় সাহিত্য নির্মাণের জগতে। এই রহস্যময়তা তাঁর লেখাতে কমবেশি আগাগোড়াই ছিল। সাহিত্যের মধ্যমণি থাকাকালীনই চলে গেলেন টিভি নাটকে, সেখানে তুমুল জনপ্রিয় সব নাটক এবং সিরিয়াল যেমন অয়োময়, বহুব্রীহি, এইসব দিনরাত্রি, কোথাও কেউ নেই প্রভৃতি তৈরি করে তাঁর ভক্তপরিধি পাঠক ছাড়িয়ে দর্শকদের মাঝে ছড়িয়ে দিলেন। শতকরা পঞ্চাশভাগ শিক্ষিতের দেশে দর্শকের সংখ্যা যে পাঠকের চেয়ে ঢের বেশি, তা তো সকলেই জানি। তিনি হয়ে উঠলেন কিংবদন্তি, ফলে তাঁর বইয়ের কাটতি আরও বেড়ে গেল, তৈরি হল হুমায়ূন আহমেদ ক্রেজ। নব্বইয়ের মাঝামাঝি নির্মাণ করলেন আগুনের পরশমনি। প্রথম সিনেমা জয় করে নিল আটটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার। এরপরে তৈরি করা শ্রাবণ মেঘের দিন, শ্যামল ছায়া সহ প্রতিটি চলচ্চিত্রে তাঁর বিদগ্ধ রুচি, কুশলতা ধরা পড়েছে। বইবিমুখ মানুষদের যেমন তিনি বইমুখী করেছেন, তেমনি সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ করে প্রেক্ষাগৃহে ফেরাতে চেয়েছেন সিনেমাবিমুখ রুচিশীল দর্শকদের।

মধ্যবিত্ত জীবনের খুঁটিনাটি, চেনাজানা সব চরিত্র ছিল তাঁর সাহিত্যের মূল উপজীব্য। চমকহীন মধ্যবিত্তের জীবন; সে জীবনেরই টানাপড়েনের নির্মল আনন্দকর সব কাহিনী বয়ান করেছেন গভীর মমতায়। গল্প বলায় জাদুকর মানুষটি ছিলেন অত্যন্ত আবেগপূর্ণ এবং জীবনসুরার মাতাল প্রেমিক। ভালবাসতেন জ্যোৎস্না ও বৃক্ষাবলী। তবে সবচেয়ে বেশি ভালবাসতেন মানুষকে। সরল ও প্রবহমান এক গদ্যে পাঠককে চুম্বকের মত ধরে রাখতেন। সাধারণত রহস্যোপন্যাসে এরকমটা দেখা যায়। সে অর্থে তার উপন্যাস বা ছোটগল্পের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য পাঠককে চুম্বকের মতো ধরে রাখতে পারার শক্তি, উপন্যাসে রহস্যোপন্যাসের আবহ সৃষ্টি করা। চমৎকার এক লিখনভঙ্গিমা আয়ত্ত্ব করেছিলেন। একজন গভীর পর্যবেক্ষক হিসেবে যাপিত জীবনের ঘটনাবলীকে দুর্দান্ত রসবোধে লিপিবদ্ধ করার বিরল ক্ষমতা ছিল তাঁর। কৌতুহলী চোখে দেখেছেন জীবনকে আর অন্যান্য সফল লেখকের মতই অসম্ভব প্রখর ছিল স্মৃতি। শেষজীবনে এসে লেখা আত্মজীবনীমূলক পাঁচটি গ্রন্থে যার প্রমাণ ছড়িয়ে আছে।

হুমায়ূন আহমেদের লেখা নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। তাঁর বড়গল্পধর্মী উপন্যাসসমূহকে কেউ কেউ ‘অপন্যাস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। পশ্চিম বাংলার জনপ্রিয় ধারার উপন্যাসের মতোই উপন্যাসে সংলাপের আধিক্য দেখা যায়, সেখানে প্রেক্ষাপটের বর্ণনা বা প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণ কম। যে কোনো ভাষার সাহিত্যে দুটি ধারা থাকে– একটি চিরায়ত ধারা, যা ক্ল্যাসিকধর্মী, অন্যটি জনপ্রিয় ধারা। হুমায়ূন আহমেদ জনপ্রিয় ধারার লেখক– এটা তিনি নিজেও অস্বীকার করেননি। যে বইমেলাতে হুমায়ূন আহমেদের বই হু-হু করে বিক্রি হয়েছে, একটি মেলাতেই মুদ্রিত হয়েছে একাধিক সংস্করণ, প্রকাশকগণ পাঠক চাহিদার সঙ্গে তাল সামলাতে পারেননি, সেই একই বইমেলায় মাহমুদুল হকের উপন্যাস অবিক্রিত থেকে গেছে, তেমন বিক্রি হয়নি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বা শহীদুল জহিরের উপন্যাস। পাঠককে কৈশোর অতিক্রম করতে দিচ্ছে না তাঁর লেখা, কিংবা কেবল উঠতি বয়সের যুবক-যুবতীরাই তার উপন্যাসের পাঠক– এমনি অভিযোগ ছিল হুমায়ূন আহমেদের প্রতি। তিনি এসব সমালোচনাকে অগ্রাহ্য করে নিজের কাজ করে গেছেন অবিচল নিষ্ঠায়; এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে গিয়ে হতবাক করে দিয়েছেন সমালোচকদের, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস লিখে সমীহ আদায় করে নিয়েছেন। হুমায়ূন বিরুদ্ধতা থেকে হুমায়ূন মুগ্ধতায় ফিরে আসার গল্প আমাদের বোদ্ধা সমালোচকদেরই গল্প। তিনি জনপ্রিয় আর ধ্রুপদী সাহিত্যের দূরত্ব কমিয়ে এনেছিলেন।

বস্তুত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা কথাসাহিত্যে লোকপ্রিয় ধারার যে ঐতিহ্য সৃষ্টি করে গেছেন তারই সার্থক উত্তরসূরী হলেন হুমায়ূন আহমেদ। আমাদের শৈশবে আমরা গোগ্রাসে শরৎ সাহিত্য গিলেছি। মনে আছে ঢাকা থেকে লঞ্চে আমাদের মামাবাড়ি শরীয়তপুরের ডামুড্যা যাবার প্রাক্কালে সদরঘাটে শরৎবাবুর বইগুলো ঝাঁপিতে বিক্রি হতে দেখতাম। একেকটির দাম ছিল কয়েক আনা। দস্যু বনহুর, দস্যু বাহরাম কাটিয়ে আমাদের হাতে আসে নীহাররঞ্জন গুপ্ত, শংকর, বিমল মিত্র প্রমুখ জনপ্রিয় লেখকদের উপন্যাসগুলো। ওই বাংলায় বেগবান থাকলেও বাংলাদেশে একটা শূন্যতা কিন্তু তৈরি হচ্ছিল, সে শূন্যতাকেই চমৎকারভাবে পূরণ করেছেন হুমায়ূন আহমেদ। বিপণনের ভাষায় যাকে বলা হয় market opportunity, তিনি তাই আঁকড়ে ধরেছেন চমৎকার দক্ষতায়। একারণেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন– ‘শরৎচন্দ্রের পরেই হুমায়ূন আহমেদ।’ সুনীল জনপ্রিয় ধারার ভেতর নিজেকে অন্তর্ভূক্ত করতে চাননি, যদিও তার প্রচুর জনপ্রিয় ও হালকা উপন্যাস রয়েছে আর সম্ভবত জনপ্রিয়তায় তিনি এ দু’জনের ঠিক মধ্যিখানে রয়েছেন।

হুমায়ূন আহমেদের ঈর্ষণীয় সাফল্য অনেকেরই পছন্দ হয়নি। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কাহিনী বা ট্রাজেডি এদের কাছে মুখরোচক খাদ্যের মতো। একজন লেখককে বিচার করতে হবে তাঁর লেখা দিয়েই, ব্যক্তিজীবন দিয়ে নয়। তাহলে আজীবন স্ত্রীর সাথে কলহরত লিউ টলস্টয় বা দাম্পত্য জীবনে চরম অসুখী জীবনানন্দ দাশকে কেউ পাঠ করত না। ভুবনবিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনও দু’বার বিয়ে করেছিলেন। সুতরাং হুমায়ূন আহমেদের জীবনের অভাবনীয় বাঁক পরিবর্তনকে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করাই ভালো। তাঁর কৃতিত্ব, মেধা বা অবদানের সাথে একে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। ইংরেজ কবি এজরা পাউন্ড ছিলেন ফ্যাসিজমের কট্টর সমর্থক। ব্যক্তি এজরা পাউন্ড স্বভাবতই আমাদের পছন্দের মানুষ নন, কিন্তু তার কবিতার ঐশ্বর্যকে আমরা কী করে অস্বীকার করি? একই কারণে আমরা বাতিল করতে পারব না কবি আল মাহমুদকে। বিখ্যাত মানুষদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সাধারণের কৌতুহল থাকবেই, কিন্তু ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বিশ্বাস কিংবা জীবনাচরণ দিয়ে তাদের কৃতির বিচার করলে ভুল হবে, তা হবে একপেশে।

শেষ যে হুমায়ুনের কথা বলব তিনিও প্রয়াত হয়েছেন সম্প্রতি। তিনি লেখক ছিলেন না, কিন্তু অসামান্য সব লেখার নাট্যরূপকে অভিনয়ের জাদুতে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতেন। অন্য চারজনের মতো তিনি কবি ছিলেন না, কিন্তু তার অভিনয়-দক্ষতা কবিতার ঝঙ্কার সৃষ্টি করত দর্শক হৃদয়ে। তিনি হুমায়ুন ফরীদি, মৃত্যু তাকেও অকালে নিয়ে গেছে না-ফেরার ভুবনে। এই ছয় হুমায়ুনের মাঝে অসামান্য মিলটি হল– এরা প্রত্যেকেই মেধাবী ছিলেন, প্রত্যেকেই ছিলেন সাহিত্যানুরাগী, তিনজন তো সাহিত্যের অসামান্য স্রষ্টা। সম্রাট হুমায়ুনও প্রচণ্ড সাহিত্যানুরাগী ছিলেন, ছিলেন কবি। স্মরণযোগ্য যে, লাইব্রেরির ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে পা হড়কে পড়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

সমগ্র দেশ হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণে কেঁদেছিল। আর কোনো হুমায়ুনের মৃত্যুতে গণমানুষের ভেতর এমন আবেগ তৈরি হয়নি। প্রতি বছর তাঁর নতুন লেখার অপেক্ষায় বইমেলার দিকে তাকিয়ে থাকতেন যে সংখ্যাতীত পাঠক, তারা আজ বেদনায় চোখ মুছছেন। সংখ্যাতীত পাঠক যেমন তাঁর শূন্যতা অনুভব করবে, তেমনি তাকে ‘মিস’ করবে নাটক ও চলচ্চিত্রের বিপুল দর্শকবৃন্দ। মরণব্যাধি ক্যান্সার এই বিরল প্রতিভাবান লেখককে বাঁচতে দিল না। বেঁচে থাকলে তিনি যে আমাদের আরও অনেক চমক দেখাতেন সন্দেহ নেই, সমৃদ্ধ করতেন আমাদের সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্রের ভাণ্ডার। এ এক বিপুল ক্ষতি! জীবনের মঞ্চ থেকে বিষন্নচিত্তে আমরা এক এক করে হুমায়ুনদের প্রস্থান দেখলাম। কিন্তু তাঁরা তো কেউই চিরতরে চলে যাননি, তাঁরা আছেন ইতিহাস ও সাহিত্যের পৃষ্ঠায়, কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের মুগ্ধ মণিকোঠায়!

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (19) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন iftekhar asif — নভেম্বর ১৩, ২০১৬ @ ৮:২৩ পূর্বাহ্ন

      sir onk vlo lekha hoese ….. loved it ……..

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Wasif Mohammad — নভেম্বর ১৩, ২০১৬ @ ৮:৩৬ পূর্বাহ্ন

      Sir, the best part is that you explained why some jealous people hate him.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জুনান নাশিত — নভেম্বর ১৩, ২০১৬ @ ১২:২৪ অপরাহ্ন

      লেখাটি ভালো লেগেছে।ঝরঝরে, গতিময়। ধন্যবাদ কামরুল হাসান।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Shams Arefin — নভেম্বর ১৩, ২০১৬ @ ২:০১ অপরাহ্ন

      বস্তুত আমাদের লাখো টাকার বইমেলাকে একশ কোটি টাকার বইমেলায় রূপান্তরিত করার মূল কৃতিত্ব তাঁর জাদুকরী সাহিত্যের। টিভিনাটকের প্রতি দর্শক আগ্রহের জোয়ারও তাঁরই সৃষ্টি। একক মানুষ হিসেবে এমন কৃতিত্ব বিস্ময়কর!
      তিনি জনপ্রিয় আর ধ্রুপদী সাহিত্যের দূরত্ব কমিয়ে এনেছিলেন।
      সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন– ‘শরৎচন্দ্রের পরেই হুমায়ূন আহমেদ।’

      অসাধারণ লেখা কামরুল হাসান ভাই

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Luipa — নভেম্বর ১৩, ২০১৬ @ ৩:০৪ অপরাহ্ন

      I loved it… Thank you sur

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন RASHEDUL ISLAM — নভেম্বর ১৩, ২০১৬ @ ৩:৪২ অপরাহ্ন

      NICE WRITING. SPECIALLY START FROM HISTORY TO CURRENT.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জেরীন তাসনিম — নভেম্বর ১৩, ২০১৬ @ ৪:৪১ অপরাহ্ন

      My habit of reading story books started with Humayun Ahmed’s books. Thanks to my favorite sir and poet for this amazing piece of writing.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Md. Rafiqul Islam — নভেম্বর ১৩, ২০১৬ @ ৫:০৪ অপরাহ্ন

      পাঠক প্রিয় সুলেখক হুমায়ুন আহমেদ স্যারকে সততার সাথে খুব সুন্দর করে উপস্থাপন ও পুনঃপরিচিত করার জন্য তোমায় ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন monir — নভেম্বর ১৩, ২০১৬ @ ৬:৩২ অপরাহ্ন

      Everybody should to Respect him & his Work’s (Natok).He was only one Hero of All kind of ENTERTAINMENT.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Zaman — নভেম্বর ১৪, ২০১৬ @ ১২:০৬ অপরাহ্ন

      লেখাটি তথ্যবহুল ভালো লেগেছে। আরো লেখা পড়ার আশায়-ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Shahriar Huq — নভেম্বর ১৪, ২০১৬ @ ৩:১০ অপরাহ্ন

      Actually, as a fan of Humayun Ahmed I found the article very interesting. Specially

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন alvee — নভেম্বর ১৪, ২০১৬ @ ৩:৪১ অপরাহ্ন

      Sir oshadharon lekha. class e apni je vabe sohoj kore kono topic bojhan, thik e lekhatao sohoj-sorol vabe likhecchen.

      Sir ekta abdar ache “amra kobe apnar lekha natok TV te dekhte pabo”.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Sumaiya Akter — নভেম্বর ১৪, ২০১৬ @ ৪:৫২ অপরাহ্ন

      অসাধারণ লেখা। যতো পড়ি, আরো পড়তে ইচ্ছা করে।

      হুমায়ূন আহমেদ প্রিয় লেখক ছিলেন। সম্প্রতি তাঁর বৈবাহিক জীবন উপজীব্য করে চলচ্চিত্র বানাচ্ছেন এক পরিচালক। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এই লেখাতে স্যার আপনি একজন লেখককে বিচার করতে বলেছেন তার লেখা দিয়ে। প্রকৃত জ্ঞানী যারা, তাঁরাই আসলে এভাবে ভাবতে পারে।
      অনেক তথ্যসমৃদ্ধ এবং দারুন যত্ন নিয়ে লেখা। অসম্ভব ভালো লাগলো, স্যার। ধন্যবাদ এরকম সুন্দর একটি লেখা আমাদের উপহার দেয়ার জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন dilruba shahana — নভেম্বর ১৬, ২০১৬ @ ৫:৩৪ অপরাহ্ন

      হুমায়ূন আহমেদের প্রতি সবার শুভ কামনা যে কতদূর ব্যপ্ত ছিল তার সামান্য উপলব্ধির সুযোগ হয়েছিল একদিন এই মেলবোর্নে। ভারতের অত্যন্ত জনপ্রিয় কৃতি লেখক সমরেশ মজুমদার মার্চ ২০১২তে বাংলা সাহিত্য সংসদ-এর নিমন্ত্রণে এখানে এসেছিলেন। সাহিত্য সভায় বক্তব্য দেওয়ার প্রথমে সমরেশ বললেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের পর বাংলা ভাষায় যে সাহিত্যিক সব চেয়ে বেশী পঠিত উঁনি আজ নিউইয়র্কে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন। আসুন তাঁর জন্য আমরা সবাই একমিনিট প্রার্থনা করি’।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Sadia Mehnaz Mounata — নভেম্বর ১৭, ২০১৬ @ ১:১২ অপরাহ্ন

      বাঙ্গালী সভ্যতা, সাহিত্য, রাজনীতি হুমায়ুনময়। স্যার আর এক হুমায়ুন; হুমায়ুন ফরিদী আমার অনেক প্রিয় একজন অভিনেতা ছিলেন। হুমায়ুন আহমেদ এর শেষের দিকের কিছু লেখা নিয়ে সংশয় থাকলেও প্রথম দিককার তার কিছু উপন্যাস তাকে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এক উঁচু স্থানে নিয়ে গেছে। ধন্যবাদ স্যার এমন একটি লেখার জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Taher Rahman — নভেম্বর ১৭, ২০১৬ @ ১:২২ অপরাহ্ন

      স্যার অসাধারন একটি লেখা। তবে হুমায়ুন আহমেদ এর সাহিত্য নিয়ে আপনার আরও কিছু মতামত আশা করেছিলাম। হুমায়ুন আহমেদ কে তার প্রথম দিককার কিছু উপন্যাস দিয়ে বিচার করা কি যৌক্তিক? আর শেষের দিকে তার লেখার মান পড়ে যাওয়ার কারণই বা কি? শেষের দিকে হুমায়ুন কি আর একটু এক্সপেরিমেন্টাল হতে পারতেন না? তবে স্যার ঠিক বলেছেন তার ব্যক্তিগত জীবন নয় তার সাহিত্য দিয়েই তাকে বিচার করা উচিত। অনেক ধন্যবাদ স্যার।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Aysha Tasnim — নভেম্বর ১৭, ২০১৬ @ ৮:৪২ অপরাহ্ন

      Humayun Ahmed is my all time favorite writer.There are many writer who write article about Humayun Ahmed but this article is the best written article that i have ever read.sir,you are a multi-talented person and i fell proud to be a student of yours.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Sanjida — নভেম্বর ১৭, ২০১৬ @ ১১:২১ অপরাহ্ন

      Personally I love Humayan Ahmed Sir’s writing… But yes it’s so true what have you written about him by your words’ magic Kamrul sir….. I had read it very carefully and found how wonderfully you describe about Humayan sir in simple way…. Really Kamrul sir you peoples are the Words Magician….

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন SOUDH ISLAM — নভেম্বর ২১, ২০১৬ @ ৬:৩১ অপরাহ্ন

      ” একজন লেখককে বিচার করতে হবে তাঁর লেখা দিয়েই, ব্যক্তিজীবন দিয়ে নয় ” মূল্যবান একটা কথা বলেছেন স্যার…

      আপনার লেখাটা পরার সময় যেন এক এক করে সবগুলো হুমায়ূনের জীবনী চোখের সামনে ভেসে উঠছিল

      আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ স্যার এটি লেখার জন্য

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com